Sunday, 22 February 2026

কেতাব-ই প্রকাশিত আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের প্রবন্ধ ও বক্তৃতাবলী গ্রন্থের ভূমিকা

 

'আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রবন্ধ ও বক্তৃতাবলী' বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৭ সালে। লেখকের জীবৎকালে এই বইটির আরো দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৩১ সালে আরো কিছু প্রবন্ধ ও লেখা নিয়ে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় খণ্ড। দুটি খণ্ডেরই প্রথম প্রকাশক ছিলেন চক্রবর্তী চ্যাটার্জি এন্ড কোং। এই বইটি সেই প্রথম খণ্ডের পুনঃপ্রকাশ। মোট বাইশটি প্রবন্ধ এতে আছে, যাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রফুল্লচন্দ্রের বক্তৃতার সারাংশ বা অনুলিখন। প্রফুল্লচন্দ্র শুধুমাত্র গজদন্তমিনারনিবাসী শিক্ষক ও গবেষক ছিলেন না। তিনি আমাদের দেশে আধুনিক রসায়ন শিল্পের সূচনা করেছিলেন; অন্যান্য নানা শিল্পের সঙ্গেও তাঁর যোগ ছিল। বন্যাত্রাণ সহ নানা সামাজিক কার্যকলাপের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর খদ্দর উদ্যোগেরও তিনি এক উৎসাহী সমর্থক ছিলেন। সেই সব কথা এই বইয়ের নানা প্রবন্ধে এসেছে; তাদের অধিকাংশেরই লক্ষ্য বাঙালি তরুণসমাজ।

বইয়ের সূচনাতে আছে প্রফুল্লচন্দ্রের এক সংক্ষিপ্ত জীবনী। এটি প্রফুল্লচন্দ্রের অনুমতিক্রমে প্রসন্নকুমার রায়ের একটি লেখার উপর আহরিত। মূল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'প্রকৃতি' পত্রিকাতে। প্রসন্নকুমার রায় ছিলেন খুলনার খানপুর হায়ার এডুকেশন স্কুলের প্রধান শিক্ষক। প্রফুল্লচন্দ্রের জন্মস্থান খুলনা; ১৯১৫ সালে খুলনার বাগেরহাটে এক শিক্ষক সম্মেলনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সেই সম্মেলনে তাঁর ভাষণ এই বইয়ের 'শিক্ষাবিষয়ক কয়েকটী কথা' লেখাতে সংকলিত হয়েছে। এই সময় বাগেরহাটে একটি কলেজ স্থাপনের দাবি উঠতে শুরু করে, প্রফুল্লচন্দ্রও সেই কাজে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রসন্নকুমার রায়ও এই কলেজ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সূত্রে প্রফুল্লচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর দৃঢ় যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল। ১৯১৮ সালে কলেজটি তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তার নাম সরকারি প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ।

শিক্ষাব্যবস্থা, শিল্পোদ্যোগ ও ব্যাবসা, সমাজ, গ্রন্থাগার -- নানা বিষয়ে সংকলিত লেখাগুলি প্রফুল্লচন্দ্রের গভীর জ্ঞানের পরিচয় প্রকাশ করে। সেগুলি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আমার সাধ্যাতীত। তবে লেখাগুলি পড়তে বসলে একটা কথা বারবার মনে এসেছে। বইটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশের পরে প্রায় একশো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, অনেকগুলি প্রবন্ধ বা বক্তৃতা তার থেকেও বেশি পুরানো। মনে হতেই পারে একশো বছর পরে এই পুনঃপ্রকাশ কি কেবলমাত্র বইটির ঐতিহাসিক মূল্যের জন্য? এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দেশে ও সারা পৃথিবীতে বহু যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছে, তাদের অভিঘাত থেকে বাঙালি মুক্ত থাকতে পারে নি। দুটি বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা আন্দোলন, ছেচল্লিশের দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ ও স্বাধীনতা, উদ্বাস্তু সমস্যা ইত্যাদি বাঙালি মননে স্থায়ী ছাপ ফেলেছে। ভাবলে আশ্চর্য লাগে তা সত্ত্বেও আমাদের জাতীয় চরিত্রের বিশেষ পরিবর্তন ঘটেনি। প্রফুল্লচন্দ্র যে সমস্ত দোষের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন, সেগুলি এখনো বর্তমান। তেমনি কোনো বাঙ্গালি তরুণের সামনে সমস্যাগুলির চরিত্রও একশো বছরে পরিবর্তন হয়নি।

প্রথমেই আসি শিক্ষার কথায়। এখনো বাঙালি ছাত্র নোট পড়েই পাস করতে অভ্যস্ত; শুধুমাত্র কারো কারো ক্ষেত্রে নোট-এর জায়গা নিয়েছে মাল্টিপল চয়েজ ধরনের প্রশ্নোত্তর। এখনো পাঠ্যের বাইরে বইয়ের প্রতি তার আকর্ষণ কম, হয়তো প্রফুল্লচন্দ্রের সময়ের থেকেও কম। প্রফুল্লচন্দ্র দুঃখ করেছেন যে তাঁর এক ছাত্র, রসায়নে ডিএসসি, ইউরোপেও তাঁর পরিচিতি আছে, শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক কিং লিয়ার-এর পাত্রপাত্রীদেরও নাম শোনেননি। পরিস্থিতির কি বিশেষ পরিবর্তন ঘটেছে? এখনো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাতে জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় না। এখনো স্কুলের ছুটির পরে অভিভাবকরা ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেটে পড়ার দিকে পাঠিয়ে দেন; খেলাধুলার বা মুক্তচিন্তার অবসর তাদের দেওয়া হয় না। প্রফুল্লচন্দ্র লিখেছিলেন দুর্বল ছাত্রদের জন্য প্রাইভেট টিউশনের কথা, এখন তা সর্বব্যাপী। এখনো উচ্চশিক্ষাতে আসা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর লক্ষ্য কোনোমতে একটা ডিগ্রি লাভ, যা তাদের জীবনসংগ্রামকে কয়েকবছর পিছিয়ে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য সাধন করে না। এখনো শিক্ষাকে পরীক্ষা ব্যবস্থার লেজুড় করেই রাখা হয়েছে। যাঁরা বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত তাঁরা জানেন যে পরিস্থিতির ক্রমশই অবনতি ঘটছে, উন্নতি নয়। উচ্চতর কর্তৃপক্ষ কোনোরকমে পরীক্ষা নিতে পারলেই সন্তুষ্ট, পঠনপাঠনের জন্য আদৌ তাঁদের মাথাব্যথা আছে কিনা সন্দেহ।

প্রফুল্লচন্দ্র লিখেছেন যে সরকার শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতিকল্পে শিক্ষকের থেকে পরিদর্শকের সংখ্যাবৃদ্ধিতেই বেশি উৎসাহী। তিনি কিভাবে বিষয়টিকে দেখেছেন? বাগেরহাটে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেছিলেন, "ইন্সপেক্টরেরা যে মন্তব্য প্রকাশ করেন তদনুযায়ী কাজ করা, আর বিধবার একাদশী করা দুইই সমান। করিলে লাভ নাই, না করিলে ক্ষতি যথেষ্ট। এইরূপ পরিদর্শনের প্রাচুর্যের ফলে হইয়াছে এই, স্কুলের কর্তৃপক্ষের নজর আজকাল কোনক্রমে বাহিরের ঠাট বজায় রাখিবার দিকে। ভিতরে যথার্থ কাজ কিরূপ হইতেছে তৎপ্রতি কেহ একবার চাহিয়েও দেখেন না।" বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষাতে নানা রকম নিয়ন্ত্রণকারী বা পরিদর্শনকারী সংস্থার কার্যকলাপ দেখায় একশো বছর অতিক্রান্ত হলেও আচার্যের কথাগুলির সত্যতা বিন্দুমাত্র কমেনি। অবশ্য শিক্ষার ক্ষেত্রে এই চিত্র শুধু বাংলা নয়, সারা ভারতের জন্যই সত্য। প্রসঙ্গত বলি, প্রফুল্লচন্দ্র ছিলেন নিখিল বঙ্গ (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ) কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির প্রথম সভাপতি।

আজকাল জাতীয় শিক্ষানীতি কথাটা বেশ শোনা যাচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার সেটি চালু করার জন্য বদ্ধপরিকর, অধিকাংশ রাজ্য সরকারও সেটি বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিচ্ছেন। যাঁরা এই শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছেন, অনুমান করি তাঁরা কেউ প্রফুল্লচন্দ্রের 'জাতিগঠনে বাধা -- ভিতরের ও বাইরের' প্রবন্ধটি পড়ে দেখেননি। প্রফুল্লচন্দ্র লিখছেন, "আমরা এখন "জাতীয়" শিক্ষা চাই। কিন্তু জাতীয় শিক্ষা কি?” নানা ধর্মের নানা মতের মানুষের আলোচনা করে তিনি দেখিয়েছেন যে জাতীয় শিক্ষা চালু করাতে “মতের অনৈক্য" আসল কাজে বাধা দেবে।

শিক্ষার পরেই আসে জীবিকা নির্বাহের কথা। এখনো বেকারত্ব একটা বড় সমস্যা। এখনো বাঙালি যেনতেন প্রকারেণ একটা চাকরির জন্য চেষ্টাই করে এবং অবাঙালি ব্যবসাদারদের প্রতি বিদ্রূপ করেই আত্মতৃপ্তি লাভ করে। প্রফুল্লচন্দ্র বারবার বাঙালি তরুণদের ব্যাবসা করার কথা বলেছেন। উপদেশ দেওয়া সব থেকে সহজ কাজের একটা, নিজের জীবনে তাকে রূপায়ণ করা অনেক বেশি কঠিন। সেই কঠিন কাজটি করে দেখিয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। বেঙ্গল কেমিক্যাল স্থাপন করে ভারতবর্ষে গবেষণাগার ও শিল্পোদ্যোগের মধ্যে প্রথম সংযোগ স্থাপন তিনি করেছিলেন। এই সংকলনের নানা প্রবন্ধে তিনি তরুণদের পরিশ্রম করার কথা বলেছিলেন; কারখানা তৈরির সময় প্রয়োজনীয় সামগ্রী কোথায় কোথায় পাওয়া যাবে, তা তিনি নিজেই শহরে ঘুরে ঘুরে খুঁজে বার করতেন। প্রতিদিন কলেজের পরে তিনি আগের দিনের অর্ডারগুলি দেখে সেগুলি পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। বাঙালির আবেগপূর্ণ ভাবপ্রবণতার কঠোর সমালোচনা তিনি করেছেন। আমরা জানি স্বদেশি আন্দোলনের সময় বাংলাতে অনেকগুলি শিল্প স্থাপিত হয়; কিন্তু কোনোটিই বৃহৎ পুঁজিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়নি, এবং শেষ পর্যন্ত মূলধন ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে তাদের প্রায় কোনোটিই ফলপ্রসূ হয়নি। প্রথমেই অনেক বড় আকারে শুরুর পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা সাধারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে পারেনি। প্রফুল্লচন্দ্র দেখিয়েছেন যে বাংলার শিল্পসংস্থাগুলি না পারলেও বোম্বাইয়ের প্রতিষ্ঠানগুলি স্বদেশি আন্দোলনের সুযোগ নিতে পেরেছে। বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠার ইতিহাস শিক্ষা দেয় কেমনভাবে পরিকল্পনা করে প্রফুল্লচন্দ্র অগ্রসর হয়েছিলেন, যার ফলে মাত্র সাতশো টাকা মূলধন নিয়ে শুরু করা কোম্পানির বিক্রয়ের পরিমাণ পঁচিশ বছরের মধ্যে পাঁচ লক্ষ ও তার দশ বছরের মধ্যে পাঁচগুণ বেড়ে পঁচিশ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছিল। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি এই সংকলনটির প্রথম প্রকাশকের কথা। কলেজ স্ট্রিটে এঁদের বইয়ের দোকান অনেকেই চেনেন। এই ব্যবসার প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্রের ছাত্র।

প্রফুল্লচন্দ্র বারবার স্বাধীন ব্যাবসার কথা বলেছেন; তার থেকে একটা কথা মনে হতেই পারে, তাহলে কি উচ্চশিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই? তিনি কখনোই উচ্চশিক্ষাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেননি। তিনিই আধুনিক ভারতে রসায়নবিজ্ঞানের সূচনা করেন, তাঁর ছাত্ররাই আমাদের দেশে সেই বিষয়ে গবেষণাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। প্রফুল্লচন্দ্র মিত্র, নীলরতন ধর, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় -- এমন অনেক নামই বলা যেতে পারে। এমনকি পদার্থবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা বা পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ মাস্টারমশাই বলতে প্রফুল্লচন্দ্রকেই বুঝতেন। প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিকাঠামো তৈরির জন্য তিনি জীবনের যাবতীয় সম্বল দান করে দিয়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকেই সি ভি রামনের বিরোধী ছিলেন, বিশেষ করে আশুতোষের মৃত্যুর পরে তাঁর নানা সমস্যা হয়েছিল। এর জন্য এক পক্ষকে দায়ী করা যায় না। কিন্তু রামনের পাশে একজন যদি সব সময় দাঁড়িয়ে থাকেন, তিনি হলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ছাত্রদের তিনি নিজের ছেলের মতো ভালবাসতেন। বিদেশের বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা তাঁর ছাত্র জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের প্রশংসা করেছেন, সেই খবর পেয়ে এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “... জানিয়া আমি হর্ষোৎফুল্ল হইয়াছি। আমার জীবনে আমি এ রকম বিমল সুখ কখনো সম্ভোগ করি নাই।” ছাত্রদের জন্য তিনি স্যার আশুতোষের সঙ্গে তর্ক করতেও পিছপা হননি। রসায়নের ছাত্রী ও পরবর্তীকালের বিখ্যাত বিজ্ঞানীও অসীমা চট্টোপাধ্যায়ও তাঁর সাহায্য পেয়েছিলেন।

আসলে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন না করে শুধুমাত্র নোট মুখস্থ করে পাস করার তীব্র বিরোধী ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। এজন্য তিনি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির তীব্র সমালোচনা করেছেন, বলেছেন ডিগ্রি প্রসবের কারখানা। একই সঙ্গে কিন্তু গভীর স্বদেশপ্রেম থেকে তিনি সেই ডিগ্রির প্রতি অবহেলারও বিরোধিতা করেছেন। মেঘনাদ সাহা ও জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ যে বিদেশে গিয়ে গবেষণা করেও সেখানে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য লালায়িত হননি, সে জন্য তাঁদের তিনি প্রশংসা করেছেন। এই বিষয়ে এমনকি স্যার আশুতোষও তাঁর সমালোচনার পাত্র হয়েছিলেন। মেঘনাদকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে তাঁর ও দুই জ্ঞানের কার্যকলাপের সাহায্যে "বিলাতী মাটি স্পর্শ না করিলেও একটি বিলাতী degree"-র মোহ ঘোচানোর চেষ্টা তিনি করবেন; “দুঃখের বিষয় আশুবাবুর মত লোকও এই মোহাচ্ছন্ন।” দেশে বসেই বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির ব্যবস্থা করে আমাদের যে নীতিপ্রণেতারা আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন, তাঁরা প্রফুল্লচন্দ্রের এই কথা স্মরণে রাখলে ভালো করবেন।

এখনো আমাদের সামনে অন্যতম সমস্যা হল জাতিভেদ প্রথা, এটি অবশ্য সমগ্র ভারতবর্ষের জন্যই প্রযোজ্য। প্রফুল্লচন্দ্র অনেক জায়গায় বলেছেন যে বাংলাতে জাতিভেদ প্রথার কঠোরতা অপেক্ষাকৃত কম। তবে বাংলাতেও এখনো সেই প্রথা লুপ্ত হয়নি, বরঞ্চ কোনো কোনো ঘটনা থেকে মনে হয় হয়তো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখনো এখানে খবরের কাগজে পাত্রপাত্রী কলমে জাতপাত গর্বের সঙ্গে লেখা হয়। প্রবন্ধগুলি লেখার সময় আইনসভাতে মুসলমান ও নিম্নবর্ণের জন্য সংরক্ষণ নিয়ে বিতর্ক চলছিল, প্রফুল্লচন্দ্র সেই সংরক্ষণকে উচ্চবর্ণের হিন্দুসমাজের সঙ্কীর্ণতা ও পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে দেখেছেন।

সম্প্রতি মনুসংহিতা নির্ভর করে আইন চালুর কথা উঠেছে। প্রফুল্লচন্দ্র একাধিক জায়গায় মনুসংহিতার তীব্র সমালোচনা করেছেন, কারণ তা জাতিপ্রথাকে দৃঢ়ভাবে প্রয়োগ করতে চায়। এই বইয়ের 'বাঙ্গালীর মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার', 'অন্নসমস্যা ও তাহার সমাধান' ‘জাতিভেদ' সহ অনেক নিবন্ধে ও তাঁর বিখ্যাত 'হিস্টরি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি' বইতে তিনি ভারতের বিজ্ঞানের অধোগতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসাবে জাতিভেদ প্রথার দিকে নির্দেশ করেছেন। জাতিভেদ প্রথার জন্যই তথাকথিত উচ্চবর্ণের মধ্যে শ্রমবিমুখতা ও নিম্নবর্ণের মধ্যে শিক্ষার অভাব সৃষ্টি হয় এবং হাতেকলমে বিজ্ঞানচর্চা ব্যাহত হয়। বৌদ্ধ ধর্মের অবনতির সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরভ্যুদয় হয় এবং সমাজ শাস্ত্রকারদের নিয়মের শিকলে বাঁধা পড়ে। ফলে অনুসন্ধান-প্রবৃত্তি লুপ্ত হয়। শব ব্যবচ্ছেদ, বিদেশ ভ্রমণ ইত্যাদির প্রতি নিষেধাজ্ঞার ফলে জাতি কূপমণ্ডূকতার গহ্বরে পড়ে। জাতিভেদ প্রথার জাঁতাকলে পড়ে শিক্ষার সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য বা শিল্পোদ্যোগের বিচ্ছেদের প্রতি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ইংল্যান্ডের সঙ্গে তুলনা করে দেখিয়েছেন কেমনভাবে অশিক্ষিত কারিগরদের প্রয়াসে শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছিল, কিন্তু আমাদের দেশে জাতিভেদ প্রথা দেশে সেই পথ বন্ধ করে দেয়। স্মরণ করি প্রফুল্লচন্দ্রের ছাত্র মেঘনাদ সাহা সমাজের নিম্নস্তরে জন্মেছিলেন, এবং তার জন্য তাঁকে সারা জীবন অনেক সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। ভারতবর্ষ পত্রিকার পাতাতে পন্ডিচেরি আশ্রমের অনিলবরণ রায়ের সঙ্গে বিতর্কে মেঘনাদ সাহা প্রফুল্লচন্দ্রের এই কথার প্রতিধ্বনি করেছিলেন।

প্রফুল্লচন্দ্রের লেখায় বারবার নারীদের কথাও এসেছে। তিনি খেদের সঙ্গে বলেছেন জাতীয় শিক্ষা পরিষৎ প্রতিষ্ঠার সময় অনেকে অনেক টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু "সে সময়ে পৃথিবীতে স্ত্রীজাতি ব'লে যে কেউ আছেন" একথা দাতারা ভুলে গিয়েছিলেন। আগেই অসীমা চট্টোপাধ্যায়ের কথা বলেছি। তিনি যখন গবেষণা করবেন বলে মনস্থির করেন, তখন প্রফুল্লচন্দ্র নিজের অর্থ থেকে তাঁর বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। নারীশিক্ষার সঙ্গে সমাজের উন্নতির সম্পর্ক তাঁর চোখে এড়ায়নি। পরিবারের মধ্যে শিক্ষা মানেই ভালো এমন কোনো ধারণা প্রফুল্লচন্দ্রের ছিল না। নারীশিক্ষার প্রয়োজন বোঝাতে তিনি লিখেছেন যে তার অভাবে "ঠাকুরমারূপী একজন যথেচ্ছচারী সম্রাট” বালিকা বধূদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সুযোগ দেন না। ফলে পুরুষরাও ছোটবেলা থেকে ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কারই শেখে এবং তা তাদের ছেলেদের শেখায়। ছেলে বিদ্যালয়ে গ্রহণের কারণ শিখে এল, কিন্তু "দিদিমা এক কথাতেই ছেলের যুক্তিতর্ক ঠাণ্ডা করিয়া দিলেন।” এখনো আমরা গ্রহণের সময় খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে রাখি। ট্র্যাডিশনের দোহাই দিয়ে যুক্তি ও বিবেচনাকে শিকেয় তুলে মিথ্যার সঙ্গে আপোস আমরা করি, ফলে আমাদের ভিতর ও বাহির আলাদা হয়ে পড়ে। মুখে পণপ্রথার বিরোধিতা করা যুবক বিয়ের সময় গুরুজনদের কথা মানার দোহাই দিয়ে পণের প্রতি চোখ বুজে থাকে।

দেশভাগ প্রফুল্লচন্দ্র দেখেননি, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা তাঁর চোখ এড়ায়নি। বর্তমানে আমাদের সামনের সেটি অন্যতম বড় সমস্যা। সেই প্রসঙ্গও বারবার নানা প্রবন্ধে এসেছে। এখনো অনেক সময়েই যে সমস্ত অনৈতিহাসিক কথা শোনা যায়, প্রফুল্লচন্দ্রের লেখা থেকে তার বিরুদ্ধে জোরালো যুক্তি পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন যে জোর করে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরকরণের কথা ভুল, কারণ তা হলে রাজধানীর সন্নিকটেই মুসলিমদের সংখাধিক্য হত। মুসলমানের সংখ্যা প্রত্যন্ত গ্রামে সর্বাধিক এবং তারা সমাজের নিম্নস্তরেই অবস্থান করে, এ থেকে বোঝা যায় জাতিভেদ প্রথার কঠোরতাই হিন্দুধর্ম ত্যাগের মুখ্য কারণ। তেমনি ভারতবর্ষে জ্ঞানচর্চার অধঃপতনের কারণ হিসাবে তিনি মুসলিম আক্রমণ নয়, জাতিভেদ প্রথা ও শঙ্করাচার্যের মায়াবাদকে চিহ্নিত করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন যে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে মিলনকে স্থায়ী করার কোনো চেষ্টা কি সত্যই করা হয়েছে?

এই সমস্ত কারণেই প্রবন্ধগুলি এখনো প্রাসঙ্গিক। প্রকাশক কিতাব-ই এই বইটি পুনঃপ্রকাশ করে একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কাজ করেছেন। সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে প্রফুল্লচন্দ্রের স্বচ্ছ ও গভীর চিন্তা এই সংকটপূর্ণ সময়ে আমাদের পথ দেখাতে পারে।

শেষ করার আগে কয়েকটি কথা যোগ করি। প্রবন্ধগুলি থেকে দেখা যায় একশো বছর আগে বহুলব্যবহৃত নানা শব্দের ব্যবহার এখন কিছুটা আপত্তিকর হয়ে পড়েছে। তেমনি সংকলনের সময় লেখাগুলির উৎস বা কালনির্দেশ হয়তো একশো বছর আগে বাহুল্য মনে হয়েছিল; এখন তার অভাব অনুভূত হয়। প্রফুল্লচন্দ্রের জীবনী, প্রকাশিত রচনা সংকলন ইত্যাদি উৎস ব্যবহার করে সেই অভাব কিছুটা পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে, নিচে সেই প্রয়াস দেওয়া হল। মনে রাখতে হবে কিছু প্রবন্ধ প্রথমে পত্রিকাতে বেরিয়েছিল। তাদের কিছু আবার পরে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এর পরে সেগুলি বর্তমান বইতে সংকলিত হয়। প্রথম প্রকাশের পরে কিছু পরিবর্তন হয়তো প্রফুল্লচন্দ্র করেছিলেন, কিন্তু পত্রিকার পুরানো সংখ্যা দেখার সুযোগ না পাওয়ায় সে বিষয়ে বিশদে বলা সম্ভব হল না।


বাঙ্গালীর মস্তিষ্ক ও তাহার অপব্যবহারঃ কুমুদিনী মিত্র সম্পাদিত সুপ্রভাত পত্রিকাতে ১৯০৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এরপর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত বেঙ্গলী পত্রিকাতে ইংরাজিতে অনূদিত হয়ে বর্ধিত আকার প্রকাশিত হয়। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ থেকে 1919 সালে বই হিসাবে প্রকাশিত হয়।

অন্নসমস্যাঃ 1920 সালে বই হিসাবে প্রকাশিত হয়।

সমাজ সংস্কার সমস্যাঃ বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রেস থেকে 1919 সালে বই হিসাবে প্রকাশিত হয়। এটি Indian National Social Conference-এ প্রদত্ত বক্তৃতা। বইতে বক্তৃতার তারিখ দেওয়া আছে 1918; এটি সম্ভবত ছাপার ভুল, কারণ সম্মেলনটি হয়েছিল 1917 সালে। 1918 সালে প্রকাশিত প্রফুল্লচন্দ্রের Essays and Discourses বইতে সঠিক সালটি দেওয়া আছে।

জাতিভেদঃ প্রবাসী পত্রিকা, ১৩২৭ জ্যৈষ্ঠ (পৃষ্ঠা ১১৭)। বইতে উল্লেখ না থাকলেও স্পষ্টতই এটি একটি বক্তৃতা যার অনুলেখক রতনমণি চট্টোপাধ্যায়। তারিখ অজ্ঞাত। প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

পাতিত্য সমস্যাঃ প্রবাসী পত্রিকা, ১৩২৭ শ্রাবণ (পৃষ্ঠা ৩২৪)। এটিও বক্তৃতা, বইতে দেওয়া আছে ২১ মার্চ প্রদত্ত, কিন্তু সালের উল্লেখ নেই। অনুমান করি প্রকাশের বছরেই অর্থাৎ 1920 সেটি প্রফুল্লচন্দ্র দিয়েছিলেন।

উপরোল্লিখিত প্রবন্ধদুটি এক করে 1920 সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল স্টিম প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়।

জাতি গঠনে বাধা - ভিতরে ও বাহিরেঃ প্রবাসী পত্রিকা, ১৩২৭ চৈত্র (পৃষ্ঠা ৪৮৯)। চক্রবর্তী চ্যাটার্জি এন্ড কোং থেকে 1921 সালে বই আকারে প্রকাশিত।

মিথ্যার সহিত আপোষ ও শান্তিক্রয়ঃ বঙ্গবাণী পত্রিকা, ১৩৩১ অগ্রহায়ণ (পৃষ্ঠা ৩৯৫)। সম্পাদক বিজয়চন্দ্র মজুমদার। চক্রবর্তী চ্যাটার্জি এন্ড কোং থেকে 1925 সালে বই আকারে প্রকাশিত।

সাধনা ও সিদ্ধিঃ প্রবাসী পত্রিকা, ১৩২৯ বৈশাখ (পৃষ্ঠা ৮১)

বঙ্গীয় যুবক সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ জীবিকা-অর্জনঃ মানসী পত্রিকা, ১৩১৭ কার্তিক। সম্পাদক ফকিরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও সুবোধচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।

শিক্ষা বিষয়ক কয়েকটি কথাঃ প্রবাসী পত্রিকা, ১৩২৪ শ্রাবণ (পৃষ্ঠা ৩৪১)

পাঠাগার ও প্রকৃত শিক্ষাঃ প্রবাসী পত্রিকা, ১৩২৬ জ্যৈষ্ঠ (পৃষ্ঠা ৯৭)

অধ্যয়ন ও জ্ঞানলাভঃ প্রবাসী পত্রিকা, ১৩২৫ আষাঢ় (পৃষ্ঠা ২৫৫)

জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তাঃ বঙ্গবাণী পত্রিকা, ১৩২৯ ফাল্গুন। সম্পাদক দীনেশচন্দ্র সেন ও বিজয়চন্দ্র মজুমদার।

বাঙ্গালা ভাষায় নূতন গবেষণাঃ মাসিক বসুমতী পত্রিকা, ১৩২৯ জ্যৈষ্ঠ (পৃষ্ঠা ১৮১)। সম্পাদক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ।

ঘর সামলাওঃ সরলা দেবী সম্পাদিত ভারতী পত্রিকা, ১৩৩৩ বৈশাখ (পৃষ্ঠা ১৬)

পল্লীর ব্যাথাঃ মাসিক বসুমতী পত্রিকা, ১৩৩৪ জ্যৈষ্ঠ (পৃষ্ঠা ১৮১)। সম্পাদক সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও সত্যেন্দ্রকুমার বসু।

এছাড়া 'অর্থনৈতিক সমস্যা -- বাঙ্গালী কোথায়' উল্লেখ না থাকলেও স্পষ্টতই বক্তৃতার সারাংশ এটির এবং 'অন্নসমস্যা ও তাহার সমাধান' এবং 'জাতিভেদ ও তাহার প্রায়শ্চিত্ত’ এই দুটি বক্তৃতা এই বইয়ের আগে কোথাও প্রকাশিত হয়েছিল কিনা জানতে পারিনি। আরও তিনটি প্রবন্ধেরও পূর্বপ্রকাশের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি; এমন হতেও পারে সেগুলি এই বইতেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।