Showing posts with label পরিবেশ. Show all posts
Showing posts with label পরিবেশ. Show all posts

Saturday, 20 January 2018

বিটি বেগুনঃ পক্ষে বিপক্ষে

২০১০ সালে লেখাটা প্রকাশের পরে এই ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে।গবেষণাতেও অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তাই এখন সম্ভবত লেখাটার মূল্য শুধুই সেই সময়ের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার নিদর্শন হিসাবে। তবে নৈতিক বিচারের পরিবর্তন নিশ্চয় এখনো ঘটেনি। সমস্ত রকম গবেষণার ক্ষেত্রেই সেই মানদণ্ড একইরকম ।









Saturday, 15 July 2017

জল সংরক্ষণ



 আয় বৃষ্টি ঝেঁপে
শম্পা গাঙ্গুলী

      টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন একসময় চোখে পড়ত- একটি লোক ছাতা উল্টে বৃষ্টির জল ধরে আনছে। বিজ্ঞাপনটির অর্থ পরিষ্কার- বৃষ্টির জল সঞ্চয়।একটু গভীর করে ভাবলে এর দুটো মানে দাঁড়ায়। অন্যান্য জলসম্ভার খরচে যতটা সম্ভব মিতব্যয়ী হয়ে তাকে রোজকার নানা কাজে ব্যবহার করা।অন্যদিকে, এই জলকে শোধন করে ভূগর্ভে ফিরিয়ে দিয়ে মাটির তলায় জলসম্ভারের পুনঃসঞ্চার(Recharge) ঘটানো।পরিভাষায় একেই  Rain Water Harvesting বলে।
      পৃথিবীর অস্তিত্ব যতদিন আছে, বৃষ্টিপাত ও জলের জোগান ততদিন অক্ষুণ্ণ থাকবে। অফুরন্ত এই সম্পদ।তবে কেন এই সঞ্চয়ের দরকার? আবার পৃথিবীর তিনভাগই তো জল। কিন্তু যে বিপুল জলরাশি পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে তার বেশিটাই যে নোনা সমুদ্র। সেই জল পানের বা অন্যান্য কাজের উপযুক্ত নয়। আমরা যে জল নানা কাজে ব্যবহার করি তার সবটাই আসে বৃষ্টি বা তুষারপাত থেকে। সমুদ্র থেকে বাষ্পীভূত হয়ে পুনরায় ঘনীভবনের মাধ্যমে বৃষ্টির জল সৃষ্টি হয় বলে তা বিশুদ্ধ ধরে নেওয়া হয়। তাই এই জল সঞ্চয় করা দরকার। বৃষ্টির খানিকটা মাটির ওপর দিয়ে বয়ে যায়, কিছুটা নদীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।প্রবল বর্ষণে অনেক সময় মাটির ওপরের আস্তরণ ধুয়ে গিয়ে নদীতে পড়ে। ফলে একদিকে ক্ষয়ের ফলে মাটি অনুর্বর হয়ে চাষবাসের ক্ষতি করে বা পাহাড়ি অঞ্চলে ধস-ভূমিকম্প ঘটায়; আবার অন্যদিকে নদীকে অগভীর করে তুলে বন্যা বাড়ায়। তাই অঝোর এই বৃষ্টিপাতের সুনিয়ন্ত্রিত ও সুষম বণ্টন প্রয়োজন। মাটির ওপর দিয়ে যাবার সময় বৃষ্টির জলের বাকি অংশটুকু চলে যায় মাটির নিচে। মাটির ঠিক নিচেই যে অসম্পৃক্ত স্তর আছে তা জলকে ধরে রাখতে পারে না।ফলে জল আরও নিচে নেমে যায়। অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে কিছুটা জল সেখানে থাকে। তাকে সবিরাম সম্পৃক্ত স্তর বলে।
      তার তলায় আছে স্থায়ী সম্পৃক্ত স্তর। এখানেই স্থায়ী ভৌমজল(Ground Water) থাকে। সাধারণত ২৩০০ ফুট নিচে এই জলতলের সন্ধান মেলে। এর তলার শিলায় কাদার ভাগ এত বেশি যে জল আর নিচে নামতে পারে না। আমরা জলসেচ, গৃহস্থালিতে, কলকারখানায়, বাড়ি তৈরির কাজে সবচেয়ে বেশি এই মাটির নিচের জলকেই গভীর ও অগভীর নলকূপ, পাতকুয়োর মাধ্যমে তুলে প্রয়োজন মেটাই। মনে হতে পারে- আবার বৃষ্টি হলেই তো খরচ হওয়া জলের পরিপূরণ ঘটবে। কিছুটা হয়ও তাই। কিন্তু তবুও আজ আমরা সবাই সুপেয় জল নিয়ে চিন্তিত। তার কারণ মাত্রাতিরিক্ত ভাবে মাটির নিচের জলকে টেনে তোলার ফলে অমৃত সমান এই জল ক্রমেই নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে ও গরল উঠে আসছে। ফলস্বরূপ ঘটছে জলদূষণ। শিল্প-কলকারখানার বর্জ্য বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ যেমন ক্যাডমিয়াম, সিসা, পারদ ও তেজস্ক্রিয় বর্জ্য পদার্থ নদীতে ও সমুদ্রে মিশছে। পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ, তা ভূগর্ভে বা সমুদ্রগর্ভে যেখানেই হোক না কেন, সেখানকার জলকে দূষিত করে তার গুণগত মানের অবনতি ঘটাচ্ছে। জলবাহী বিষাক্ত পদার্থগুলো ঢুকছে প্রাণীদেহে ও মানুষের শরীরে। এর মারাত্মক প্রভাবে পরিবেশ দিনে দিনে তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। যত্রতত্র কূপ, নলকূপ খুঁড়ে পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে। দুরারোগ্য রোগের কারণ ঘটাচ্ছে। ভারতের মধ্যপ্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গে নানা জেলায় ও বাংলাদেশের অনেক জায়গায় আর্সেনিক সমস্যা আজ এক ভয়াবহ আকার নিচ্ছে।
      এই ভৌমজল আহরণে আরও কিছু অসুবিধা আছে। ভৌমজলের প্রধান উৎস বৃষ্টির জল। সুতরাং ভৌমজলের সম্ভার নির্ভর করে বৃষ্টির স্থায়িত্ব, পরিমাণ, শিলার প্রবেশ্যতা, ভূমির ঢাল ও প্রবেশ্য শিলার তলায় অপ্রবেশ্য শিলার উপস্থিতির ওপর। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমির ঢাল বেশি বলে বৃষ্টির জল বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারে না, ফলে ভূগর্ভে খুব কম জল প্রবেশ করে। জম্বু-কাশ্মীরে মাটির নিচের জলতল বছরে ২০ সে মি করে নেমে যাচ্ছে। মরু অঞ্চলে শিলার প্রবেশ্যতা খুব বেশি বলে গরমকালে, বিশেষত গ্রামগুলির চিত্র করুণ। বহুদূরের কোনো গভীর কূপ বা জলাধার থেকে মেয়েদের মাথায় আট-দশটা ঘড়া করে পরিবারের এক সপ্তাহের জল বয়ে আনতে হয়। শহরেও, গভীর নলকূপে মোটর চালিত পাম্প লাগিয়ে বিদ্যুতের অনেক দাম মিটিয়ে তবে জল মেলে। দিল্লী, জয়সলমীর, জয়পুর, জলন্ধরে গরমকালে এ ছবি আমরা পাই। বর্ষার চিত্রটাও আমাদের অপরিচিত নয়। আধঘণ্টা ভারি বর্ষণেই কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি -- এমনকি খরাপ্রবণ রাজস্থানের শহরও হাঁটু জলে ডুবে যায়। কারণ চারদিকের ইট-কাঠ-কংক্রিটের বাঁধুনি, দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের প্রবল জোয়ার  ভাসায় শহরতলিকে। সুতরাং মাটির নিচে জলের নামার পথে no entry থাকায় ভূগর্ভের জলসম্ভার বিশেষ লাভবান হয় না। ঘাটতি পূরণ হয় সামান্য -- লাভবান হয় জমা জলে মশার বংশধরেরা।
      বস্তুতপক্ষে সমস্যা আরও অনেক। ভারতের মতো মৌসুমি জলবায়ুর দেশে আঞ্চলিক বৃষ্টির তারতম্যে বছরে কোথাও ১২০০ সেমি আবার কোথাও ২৫ সেমি বৃষ্টি হয়। তাই অতিবর্ষণযুক্ত অঞ্চলকে বন্যা আর মরু অঞ্চলকে খরার হাত থেকে বাঁচাতে হলে কোথাও অবাধ বারিধারাকে আবার কোথাও কয়েক ফোঁটা জলকে ধরে রাখতে হবে। অনিয়মিত বর্ষা এবং অত্যধিক জনসংখ্যাবৃদ্ধি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় যতই জলসংকট তৈরি করতে চাক না কেন, সঞ্চিত জলসম্ভার দিয়ে বছরে একাধিকবার অনেক খাদ্যশস্য ফলিয়ে সবাই অন্তত খেয়ে পরে বাঁচতে পারবে। এছাড়া এত সব সমস্যার সঙ্গে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো পরিবেশ দূষণ পৃথিবীকে গরম করে তুলছে। বৃষ্টির পরিমাণ অনেক জায়গায় কমছে, তার আগমন ও স্থায়িত্বকালও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। পর্বতচূড়ার বরফ গলে কমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন নদীতে জলস্ফীতি ঘটছে তেমন অন্যদিকে নিত্যবহ নদীগুলোতে ক্রমে উৎস-জলের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, বরাক ইত্যাদি বরফগলা জলে পুষ্ট নদীগুলো অনিত্যবহ হয়ে পড়ছে।
      নদীর জলবন্টন নিয়ে আন্তঃরাজ্য সমস্যা (কাবেরীর জল নিয়ে কর্ণাটক ও তামিলনাডুর মধ্যে), আন্তঃদেশীয় সমস্যা (গঙ্গা ও তিস্তা নিয়ে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে) আজ পৃথিবীর অনেক দেশের এক কঠিন সমস্যা। আমাদের দেশে জনপ্রতি জলের ব্যবহার আগে ছিল বছরে ৫০০০ ঘনমিটার, যা এখন জলসংকটের ফলে নেমে এসেছে ২২০০ ঘনমিটার। সারা পৃথিবীর গড় পরিসংখ্যানটি হল ৮৫০০ ঘনমিটার। সবথেকে বড়ো কথা হল মাটির নিচ বা নদী, হ্রদ- যেখান থেকেই জল সংগ্রহ করি না কেন, তা কমবেশি ব্যয়সাপেক্ষ। পাম্প, নলকূপ, কূপ, জলাধার, খাল ইত্যাদি তৈরির প্রাথমিক ও পৌনঃপুনিক খরচও যথেষ্ট। আবার সেই জল কমবেশি দূষিত তো বটেই। তাই বৃষ্টির জল ভূগর্ভে যাবার বা নদীনালায় নামার আগেই তাকে যদি আমরা প্রতিটি বাড়িতে বিভিন্ন উপায়ে সরাসরি সঞ্চয় করে রাখতে পারি তাহলে অনেক সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই তার সমাধান হয়ে যায়। বিশাল ও দীর্ঘকালীন পঞ্চবার্ষিকী নদী পরিকল্পনা করে সরকারের কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ ব্যয়ও হয় না, আর আমরাও বিষপান করে তিলে তিলে মরি না। অদূর ভবিষ্যতে আমেরিকার একটা কোম্পানি বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহের জন্য ভারতের মধ্য পশ্চিমাঞ্চলের জলসম্ভারকে কাজে লাগিয়ে এক বিশাল জলপ্রকল্প রূপায়ণের অনুমোদন পেতে চলেছে। অর্থাৎ আমাদের দেশের জলকেই বিদেশি লগ্নিকারীদের মাধ্যমে বোতলবন্দি করে চড়া দামে আবার আমাদের বিক্রি করা হবে। বুঝুন অবস্থাটা!
      অমূল্য এই বৃষ্টির জল ধরে রাখার নানান উপায় মানুষ প্রাচীন কাল থেকেই উদ্ভাবন করে এসেছে। আজ থেকে প্রায় দু হাজার বছর আগে ইজরায়েলের নেজেভ মরুভূমিতে, মালয়েশিয়া, থাইল্যাণ্ড ও চিনের লোয়েস মালভূমিতে মানুষ বড়ো বড়ো জালায় বৃষ্টির জল সঞ্চয় করতে শিখেছিল। প্রাচীন রোম শহর এমন সুপরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সঞ্চিত বৃষ্টির জল দিয়ে তারা পানীয় জলের চাহিদা মেটাত ও ঘরবাড়ি ঠাণ্ডা রাখতে পারত। আন্দিজ পর্বতের বৃষ্টিচ্ছায়া অঞ্চলে, আলাস্কা ও হাওয়াই দ্বীপে একই পদ্ধতিতে বৃষ্টির সুব্যবহার মানুষ করেছে। ১৯২০ সাল পর্যন্ত আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামগুলোতে ও ৬৫ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া প্রদেশে চ্যাপ্টা বড়ো বড়ো গ্যালভানাইজড লোহার পাত কাঠের কাঠামোতে লাগিয়ে বৃষ্টির জল ধরে রাখার কথা জানা যায়।
      তবে বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে বৃষ্টির জল সঞ্চয় ও শোধন পদ্ধতি। এই সমস্যা নিয়ে সচেতনতা যত বাড়ছে সমাধান করতে দিনে দিনে তত বেশি সংখ্যক মানুষ আগ্রহী হচ্ছে। কতকগুলো সহজ উপকরণের সাহায্যে সহজ পদ্ধতিতে নিজ নিজ সাধ্যের মধ্যেই বাড়ির আশপাশের বৃষ্টির জল ধরে রাখা যায়। যথেষ্ট স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিবারের জলসংকট এতে মেটানো সম্ভব। প্রধানত তিনটে উপকরণ এক্ষেত্রে দরকার। সেগুলো হল- জল সংগ্রহের ক্ষেত্র(Catchment Area), সংগ্রহের আধার (Collecting Device) এবং পরিবহন বা সংবহনের পদ্ধতি(Conveyance System)।
      জলসংগ্রহের ক্ষেত্র হিসেবে বাড়ির ছাদকে (অন্তত ২০ বর্গমিটার) সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে পারি। কী পরিমাণ ও কতটা বিশুদ্ধ জল পাওয়া যাবে সেটা নির্ভর করে ছাদটা কত বড়ো ও ছাদ তৈরির পদ্ধতির ওপর। ছাদ কংক্রিট সিমেন্ট, টিন, এলুমিনিয়াম সিট, এসবেস্টস, টালি বা বাঁশের তৈরি হতে পারে। যত বেশি ঢাল হবে তত দ্রুত প্রবাহ হবে। তবে ছাদ পরিষ্কার রাখতে হবে। ছাদ ছাড়া বৃষ্টির জল সংগ্রহের ক্ষেত্র হিসাবে বাড়ির চারপাশের জমিকে ব্যবহার করা যেতে পারে। আশপাশের অসংখ্য ফাটল ও অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে প্রচুর জল মাটির নিচে চলে যায়। গাছপালা ও মাটির আবরণ থাকলে জমির ওপরের জলপ্রবাহ কমে যায়।এজন্য বাড়ির চারপাশের এলাকা যেমন রাস্তা, বাগান, চাতাল ইত্যাদিকে কংক্রিটে ঢালাই করে একদিকে ঢালযুক্ত শক্ত কঠিন আবরণে পরিণত করে তোলা যায়। মৃত্তিকার স্তরে বৃষ্টির জলের প্রবেশ্যতা রোধ করতে রোলার ব্যবহার মাটিকে সুদৃঢ় ও আঁটোসাঁটো করতে পারি। এছাড়া রাসায়নিক ভাবে সোডিয়াম বা সিলিকন যৌগের দ্রবণ ব্যবহার করা যেতে পারে বা প্লাস্টিকের সিট, এসফল্ট বা টালি দিয়ে আশপাশ আবৃত করা যায়। কৃত্রিম পদ্ধতিতে বাষ্পীভবন কমিয়ে ও মৃত্তিকাক্ষয় রোধ করে অনেক বেশি পরিমাণ পরিষ্কার জলসংগ্রহের ক্ষেত্র গড়ে তোলা যায়।
      জল সংগ্রহের আধার বা জলাধার হিসেবে বড়ো বড়ো ট্যাঙ্ক মাটির নিচে বা ওপরে তৈরি করা যায়। তবে মানুষ, পশুপাখি বা পরিবেশের বিভিন্ন বর্জ্য পদার্থ যাতে জলাধারে না যায় তার জন্য ভালো আঁটযুক্ত ঢাকনা ব্যবহার করতে হবে। এতে জমা পরিষ্কার জলে মশা বা শ্যাওলা জন্মানো রোধ করা যাবে। বড়ো বড়ো ঢালাই করা সিমেন্টের জলাধার হলে ভালো। জলাধারের আয়তন নির্ভর করবে শুষ্ক ঋতুর দৈর্ঘ্য, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং জনপ্রতি জলের চাহিদার ওপরে। এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে বেশ কয়েকমাস শুষ্ক ঋতু থাকে, বৃষ্টি তিন চারমাস হয়। এক্ষেত্রে এক একটি জলাধারের ক্ষমতা এমন হওয়া উচিৎ যাতে অন্তত দু-তিন সপ্তাহের জল মজুত থাকে। ধরা যাক তিনজনের পরিবারে ন্যূনতম ৩(জন)X৯০(লি)X২০(দিন)=৫৪০০লিটার জল সঞ্চয় করা প্রয়োজন। পাইপ দিয়ে পরস্পর যুক্ত একাধিক পলিথিনের জলাধার (ধারণ ক্ষমতা কমপক্ষে ১০০০-২০০০ লিটার) ব্যবহারও সুবিধাজনক। থাইল্যান্ডে ১৯৮০-এর দশকে দশ লক্ষের বেশি ২০০০ লিটারের জার ও ১৯৯১-৯৩ সালের মধ্যে ত্রিশ-চল্লিশ হাজার আরও বড়ো জলাধার তৈরি করা হয়।
      জলসংবহন পদ্ধতি বলতে জলসংগ্রহের ক্ষেত্র থেকে বৃষ্টির জলকে জলাধারে পাঠানোর পর্যায়টিকে বোঝায়। বৃষ্টি পড়ার প্রথম কিছুক্ষণ পর্যন্ত নোংরা ও বালি-কাঁকড় যুক্ত বৃষ্টির জল যাতে বেরিয়ে যায় সেই ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। জলাধারের সঙ্গে ছাদ বা অন্যান্য জলসঞ্চয়ের ক্ষেত্র হিসাবে যে পাইপ দিয়ে যুক্ত থাকে সেখানে একটা কল লাগানো থাকবে। বৃষ্টি শুরু হওয়ার সময় কলটি বন্ধ থাকলে নোংরা জল জলাধারে ঢুকবে না, কিছুক্ষণ পরে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়লে কলটা খুলে দিলে জলাধারের ভেতরে পরিষ্কার জলসঞ্চয় ঘটবে।এছাড়া আরও অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করা যায়। ছাদের সঙ্গে জলাধার সংযোগকারী মোটা মোটা PVC পাইপগুলোর মধ্যে বড়োমুখওয়ালা ফানেল আটকে দিতে হবে এমনভাবে যে প্রথম বৃষ্টির জল ধীরে ধীরে পাইপের গা বেয়ে ফানেল ও পাইপের মধ্যের ফাঁক দিয়ে নেমে বেরিয়ে যাবে। পরে প্রবল বর্ষণের সময় পরিষ্কার জল ফানেলের মধ্য দিয়ে জলাধারে প্রবেশ করবে। এই ফানেল লাগানো পাইপটির মুখ জলাধারের সংযোগকারী পাইপের মুখ অপেক্ষা বড়ো হবে যাতে জলাধার ভর্তি হয়ে গেলে অতিরিক্ত জল বেরিয়ে যেতে পারে। সংবহনের সময় PVC পাইপগুলোর মধ্যেই জলশোধন বিভিন্ন ভাবে করা যেতে পারে। পাইপের একটা অংশে জলাধারে জলপ্রবেশের আগে এই শোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। সবচেয়ে উপরে থাকবে মোটা দানার বালির স্তর(৫-১০মিমি পুরু), তার তলায় ছোটো নুড়ি ও তার তলায় বড়ো নুড়ি পাথরের স্তর(৫-২৫ সেমি পুরু), এটাতে খরচ খুবই কম। বালির বদলে কাঠকয়লা দিয়েও জলশোধন করে নেওয়া যায়। এইভাবে জলের ঘোলাটে ভাব, নোংরা ও জীবাণু ইত্যাদি রোধ করা যায়। তবে জলকে পুরোপুরি বিশুদ্ধ করতে গেলে বিদেশি কোম্পানির তৈরি RPC(Rain Purification Centre) কিনতে হবে যা খরচ সাপেক্ষ। এক্ষেত্রে Multi Staged Water Treatment Method-এ আয়ন বিনিময় প্রক্রিয়ার দ্বারা বৃষ্টির জলকে পুরোপুরি বিশুদ্ধ জলে পরিণত করা যায়।RPC ব্যবহার করে ১০০০ লিটার পানীয় জল পরিশুদ্ধ করতে খরচ পড়ে ১০০-১৫০ টাকা। সাধারণভাবে ব্যবহারের জন্য এরূপ জল পরিশোধনের দেশীয় ফিল্টারের দাম ২২০০টাকা। এছাড়া আরও একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি হল অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে জীবাণুমুক্ত করে সক্রিয় চারকোল দ্বারা শোধন।
      বৃষ্টির জল সরাসরি ব্যবহার ছাড়াও Rain Water Harvesting-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মাটির তলার জলসম্ভারের পুনঃসঞ্চার। প্রাকৃতিক নানা কারণে এবং অপরিকল্পিতভাবে যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে সর্বত্র ভৌমজলস্তর নেমে যাচ্ছে ও দূষিত হচ্ছে, একথা আগেই আলোচিত হয়েছে। বৃষ্টির জলের দ্বারা পুনঃসঞ্চার করে এই ঘাটতি পূরণ না করতে পারলে হয়তো ভৌমজল একদিন নিঃশেষিত হয়ে যাবে। তাই গর্ত, কুয়ো, সোকপিট, টিউবওয়েল ইত্যাদির সাহায্যে মাটির নিচে বিভিন্ন গভীরতায় খুব সহজে পরিষ্কার বৃষ্টির জল পাঠিয়ে পুনঃসঞ্চার করা যায়। এগুলি অসংখ্য ছিদ্রযুক্ত হওয়ায় ভূগর্ভের জলকে পুনরায় সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে। এক্ষেত্রে একটা ফিল্টার ব্যবহার করলে ভালো। দেশীয় এরকম ফিল্টারের দাম ৬০০ টাকা। এইরকম গর্ত (recharge pit) খুঁড়তে ২৫০০-৫০০০ টাকা, সুড়ঙ্গ (recharge trench) তৈরি করতে ৫০০০-১০০০০ টাকা, টিউবওয়েল তৈরি করতে ১৫০০-২৫০০ টাকা, কুয়ো (recharge through dug well) ৫০০০-৮০০০ টাকা ও গভীর নলকূপ (recharge well) তৈরিতে ৫০০০০-৮০০০০ টাকা আনুমানিক ব্যয় হয়।
নিচের ছবিতে জলসঞ্চয়ের একটি ক্ষেত্র- বাড়ির ছাদ, জল সংবহন পদ্ধতি, মাটির ওপর ও নিচের জলাধার এবং পুনঃসঞ্চার কূপের মাধ্যমে গভীর ভৌমজলের পুনঃসঞ্চারণ প্রক্রিয়াটি বোঝানো হয়েছে।
জলসম্পদ সংরক্ষণের জন্য ভারত সরকার জলকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং এর জন্য ‘জলসম্পদ মন্ত্রক’ গঠন করেছে। ১৯৮৭ সালে ‘জাতীয় জলনীতি’ গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আইন প্রণয়ন করে বৃষ্টির জলসংরক্ষণের পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০০১ সালে জুন মাসে নগরোন্নয়ন মন্ত্রক দিল্লিতে এই আইনটি বলবৎ করে। সেখানে বলা হয়েছে ১০০ বর্গমিটারের চেয়ে বড়ো ছাদযুক্ত নতুন বাড়িতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর, উওরপ্রদেশের কানপুর, অন্ধ্রপ্রদেশের হায়দ্রাবাদে, হরিয়ানা, রাজস্থানের সব শহরে ও মুম্বাইতে ‘রেন ওয়াটার হার্ভেস্টিং’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। খুব সম্প্রতি তামিলনাডুতে মিউনিসিপ্যাল আইন অনুসারে (জুলাই ১৯, ২০০৩) সরকারি, বেসরকারি সমস্ত নতুন নির্মাণের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
      বৃষ্টির জল সঞ্চয় প্রকল্প রূপায়ণ আমাদের প্রত্যেকের কাছে অত্যাবশ্যক। আশা করা যায় এর মাধ্যমে অদূর ও সুদূর ভবিষ্যতে জলসংকট মিটবে, মাটির নিচের জলতল উঠে আসবে। পানীয় জলের চাহিদা মিটবে, গুণগত মানও বাড়বে। মৃত্তিকা ক্ষয়, আবদ্ধ জলের সমস্যা মিটবে। সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে খরাক্লিষ্ট ও মরু অঞ্চলের মানুষ। তবে এই প্রকল্প রূপায়ণে কতকগুলি সীমাবদ্ধতা আছে। অঞ্চলটিতে বৃষ্টির প্রকৃতি ও স্থায়িত্বের ওপর সঞ্চয় ও পুনঃসঞ্চার নির্ভর করে। অঞ্চলটির প্রাপ্ত জলসম্ভার, মৃত্তিকার আস্তরণ, প্রবেশ্যতা, ভূমির ঢাল ও ভৌমজলের গভীরতা ও তার গুণগত মান সম্পর্কে একটা সমীক্ষার প্রয়োজন। স্থানটিতে কতটা পরিমাণ জলপ্রবাহ ঘটে, জমিটিতে কী পরিমাণ শিল্প, বসতি ও জনসংখ্যা বা সবুজ উদ্ভিদের আবরণ আছে তা দেখা দরকার। এসবের জন্য অবশ্য একান্ত জরুরি সাধারণ মানুষের মধ্যে বৃষ্টির জল সঞ্চয় সম্বন্ধে সচেতনতা তৈরি করা। যার জন্য সাধারণ মানুষকে প্রশিক্ষণ দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। এর জন্য শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজনে বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী সংস্থার সক্রিয় অংশগ্রহণ আর গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা। তবেই আমরা বৃষ্টির জলের সঠিক ব্যবহার করে দেশের জল-সমস্যার সমাধান করতে পারব।

('এখন পর্যাবরণ' পত্রিকার ২০০৩ সালের উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত)


     
                 

  




      
                    

  


Monday, 12 June 2017

সমুদ্রতলের পরিবর্তন --- বিপন্ন সভ্যতা

সমুদ্রতলের পরিবর্তন --- বিপন্ন সভ্যতা
শম্পা গাঙ্গুলী

      সম্প্রতি রাষ্ট্রসংঘের সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস এনভারনমেন্ট প্রোগ্রাম বিশ্ব পরিবেশের উপর তাদের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ বা সমুদ্রতলের উচ্চতা ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ভাবে চলতে থাকলে একবিংশ শতাব্দি শেষ হওয়ার আগে তা এক ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনবে। Intergovernmental Panel on Climate Change (আইপিসিসি) সারা পৃথিবীতে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর গবেষণা করে। তারা নানা সময় সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধি বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাদের সঙ্গে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞই একমত। তাঁদের মতে এই ভাবে চললে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রতল বেড়ে যেতে পারে এক মিটারের কাছাকাছি। সুতরাং একবিংশ শতাব্দিতে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হতে চলেছে -- এটা অনস্বীকার্য।   
      সমুদ্রতল বলতে আমরা সমুদ্রে জলতলের গড় উচ্চতার কথা বলে থাকি। জোয়ার আর ভাটার সময়ে এই গড় উচ্চতার সাপেক্ষে ভূপৃষ্ঠের কোনো জায়গার উচ্চতা বা গভীরতা মাপা হয়। এই গড় উচ্চতা স্থিতিশীল নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবর্তন হয়। এই পরিবর্তনকেও আমরা দু ভাগে ভাগ করতে পারি। কখনো কখনো খুব অল্প সময়ের মধ্যে সমুদ্রতল  দ্রুত ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে যায়। আবার দীর্ঘকাল ধরে একই দিকে প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। অসংখ্য জটিল কারণ পৃথিবীব্যাপী এই সমুদ্রতলের উত্থান বা পতনের জন্য দায়ী। ভূতাত্ত্বিক যুগে সমুদ্রস্তরের বিশাল ওঠানামা ঘটেছে। পলল চক্র বিশ্লেষণ করে জানা গেছে আঠারো হাজার বছর আগে শেষ হিমযুগের সময় কুমেরুতে এতটাই বরফ সঞ্চিত ছিল যে, সমুদ্রতল প্রায় বর্তমানের তুলনায় গড়ে ১৩০ মিটার নীচে ছিল এবং মহিসোপানগুলোর (Continental shelf) বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল শুষ্ক ভূমি। হিমবাহ-পরবর্তী যুগে প্রাথমিকভাবে সমুদ্রতলের উত্থান খুব তাড়াতাড়ি হয়েছে। যেমন ছ’হাজার বছর আগে হলোসিন যুগে সমুদ্রতল সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বেড়েছে, প্রতি ১০০ বছরে ১ মিটার। গত তিন হাজার বছরে এই তলের উচ্চতা প্রায় একইরকম ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রতি বছরে ০.১ থেকে ০.২ মিলিমিটার। প্রথম লেখচিত্রে শেষ হিমযুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সমুদ্রতলের উত্থান দেখানো হয়েছে।  ১৯০০ সালের পর থেকে এই হার ক্রমবর্ধমান, বছরে ১ থেকে ২ মিলিমিটার। কৃত্রিম উপগ্রহের পাঠানো তথ্যের বিশ্লেষণে দেখা যায় সমুদ্র পৃষ্ঠ ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে উঠে আসছে প্রতি বছরে গড়ে ৩.২ মিলিমিটার। এত দ্রুত হারে সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি বিশ্ব উষ্ণায়নের ফসল। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুটো প্রধান প্রক্রিয়া -- প্রথমত সমুদ্র গরম হচ্ছে ফলে সমুদ্র জলের তাপীয় প্রসারণ হচ্ছে এবং দ্বিতীয়ত, হিমবাহে সঞ্চিত বরফ গলছে।

 

১নং লেখচিত্রঃ শেষ হিমযুগ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সমুদ্রতল (প্রবাল ও পিট জীবাশ্ম থেকে পাওয়া তথ্য)

      সমুদ্রতলের হ্রাস-বৃদ্ধি নতুন ঘটনা নয়। পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাব এখন যে কটা মহাদেশ আছে সেগুলো একসময়ে দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে একসঙ্গে ছিল। সেই বিরাট ভূখণ্ডের নাম দেওয়া হয়েছে প্যাঞ্জিয়া। সে সময়ে সেই মহাদেশের একসঙ্গে অনেকটা জায়গা জুড়ে জমে থাকত বরফ। তার চারপাশের সমুদ্র প্যানথালাসা নামে পরিচিত। ৩৬ কোটি বছর আগে কার্বোনিফেরাস যুগে মহাদেশীয় চলন দ্রুত গতিতে শুরু হয়। ৩০ থেকে ২০ কোটি বছর আগে প্যাঞ্জিয়া ভেঙে আধুনিক মহাদেশগুলির জন্ম। পশ্চিমমুখী চলনে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের উৎপত্তি। অন্যদিকে নিরক্ষরেখামুখী চলনের জন্য গণ্ডোয়ানাল্যাণ্ডের কিছু অংশ উত্তরে সরে যাওয়ায় ভারত মহাসাগরের সৃষ্টি হয়। মহাদেশগুলো সরে সরে যাওয়ার জন্য তাদের ফাঁকে ফাঁকে সমুদ্রের তলার প্রসারণ ঘটে সৃষ্টি হয় আটল্যান্টিক ও ভারত মহাসাগর।   অবশিষ্ট যে জলভাগ পড়ে ছিল তাকেই আজ আমরা প্রশান্ত মহাসাগর নামে চিনি।      
      এইভাবে ক্রমে মহাদেশীয় পাতগুলোর চলনের ফলে একই জায়গায় বরফ জমার সুযোগ থাকে না। বরফের চাদর গলে জল হওয়াকে সমুদ্র পৃষ্ঠীয় তলে উচ্চতা বৃদ্ধির একটা অন্যতম কারণ ধরা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে ৩২ কোটি বছর আগের যুগে সমুদ্রতল অনেক নীচে ছিল। ১৪ কোটি বছর আগে আদি-ক্রিটেশিয়াস যুগে মেরুতে বরফের চাদর গলে যায়। ফলে সমুদ্রতল বেড়ে পৌঁছেছিল বর্তমানের থেকে ২৫০ মিটার উঁচুতে। সেই তল আবার নামতে থাকে  মধ্য-ক্রিটেশিয়াস যুগে ১০ কোটি বছর আগে। পরে আবার তা বেড়েছিল। দেখা যাচ্ছে হিমবাহ ও তুষার চাদরের হ্রাসবৃদ্ধি সমুদ্রপৃষ্ঠকে বিশেষ প্রভাবিত করেছে। হিমযুগে এদের বৃদ্ধি মহাসাগর থেকে বিপুল জলরাশিকে এনে মহাদেশীয় বরফের মধ্যে আটকে রাখে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের অবনমন ঘটে। অন্যদিকে দুই হিমযুগের মধ্যবর্তী সময়ে যখন পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে, বরফ গলে গিয়ে উত্থান ঘটেছে পৃথিবীব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের ।
      সমুদ্রতলের ওঠানামার অন্য ভূতাত্ত্বিক কারণও আছে। পাতের চলনের ফলে কোথাও দুটো মহাদেশীয় পাত পরষ্পরকে ধাক্কা মেরে বিভিন্ন যুগে ভঙ্গিল পর্বত সৃষ্টি করেছে এবং সামুদ্রিক পাতের সংকোচন ঘটিয়ে সমুদ্রের জলতলকে দিয়েছে নামিয়ে; আবার কোথাও বা সামুদ্রিক পাত প্রসারিত হয়ে সমুদ্র-তলকে উঠিয়ে দিয়েছে। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে গণ্ডোয়ানাল্যাণ্ড আর ইউরেশিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত অগভীর সমুদ্রখাত টেথিস হিমালয় পর্বত সৃষ্টির সাথে সাথে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এই সময়  ভূত্বকের মহাদেশীয় অংশ  হ্রাস পায় এবং সমুদ্রতল প্রায় ২৬ মিটার নেমে যায়। আবার অন্যদিকে দুটো সামুদ্রিক পাতের বিপরীতমুখী চলনের সময় ভূঅভ্যন্তর থেকে ম্যাগমা বেরিয়ে এসে সমুদ্রের তলায় শৈলশিরা, মালভূমি ও আরও অনেক ভূমিরূপ সৃষ্টি করে। এর ফলে সমুদ্রের জলধারণ ক্ষমতা কমে গিয়ে জলতল উঠে আসে। সাড়ে বাইশ কোটি বছর থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি বছর আগের যুগের নাম মায়োসিন। এই সময় মধ্য-মহাসাগরীয় শৈলশিরার আয়তন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে সমুদ্রের জলতল অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। এইভাবে বারবার পৃথিবীর বুকে আলোড়নের ফলে মহাসাগরগুলোর জলধারণক্ষমতার তারতম্য ঘটেছে আর তার ফলেই সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামা ।
      তাহলে বলা যেতে পারে যুগে যুগে সমুদ্রের সার্বিক পরিবর্তন প্রধানত দুটো দীর্ঘস্থায়ী বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। প্রথম কারণটা ভূতাত্ত্বিক। পাতের চলনের ফলে সমুদ্র-তলের সংকোচন-প্রসারণ সমুদ্রগুলোর জল ধারণ ক্ষমতার তারতম্য ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় কারণ পৃথিবীব্যাপী জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনে বারেবারে হিমযুগের আগমন। মহাদেশীয় বরফের গলন অথবা কঠিনীভবন সমুদ্রে জলের পরিমাণের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী কারণের মধ্যে তাপমাত্রার সঙ্গে জলের ঘনত্বের তারতম্যের ফলে সমুদ্রের জলের পরিমাণের পার্থক্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শেষ কারণটার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে জলবায়ু, যা বর্তমান কালের বিজ্ঞানীদের কপালে কতটা ভাঁজ ফেলছে। আশাকরি তা একটু বাদেই পরিষ্কার হবে।
      এখন দেখা যাক ইতিহাসে মানুষের সভ্যতার বিকাশকে সমুদ্রতলের ওঠানামা কতখানি প্রভাবিত করেছে। আফ্রিকায় এক থেকে দুই লক্ষ বছর আগে আধুনিক মানুষের জন্ম হয়েছিল। জিন গবেষণা ইঙ্গিত করছে যে যদি আমরা আজকের পৃথিবীর সকল মানুষদের মা, তাদের মা – এইভাবে বংশতালিকা তৈরি করি, তাহলে সবগুলো তালিকা গিয়ে মিলে যাবে মোটামুটি দেড় লক্ষ বছর আগে এক নারীতে । সেই নারীর সম্ভাব্য বাসস্থান পূর্ব আফ্রিকার ইথিয়োপিয়া-তানজানিয়া অঞ্চল। বাইবেলের কথা মনে রেখে বিজ্ঞানীরা সেই নারীর নাম রেখেছেন ইভ, যদিও বুঝতেই পারছেন এই ইভের সঙ্গে বাইবেলের গল্পের কোনো সম্পর্ক নেই। আফ্রিকা অন্য দুই মহাদেশ এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে স্থলপথে যুক্ত, তাই খুব তাড়াতাড়িই এই দুই জায়গায় মানুষ বসতি স্থাপন করতে সক্ষম হয়। সঠিক কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও মোটামুটি একটা হিসাব পাওয়া সম্ভব। আনুমানিক পঁচাত্তর হাজার থেকে এক লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা থেকে এশিয়াতে মানুষ প্রথম পৌঁছেছিল। ভারতে সত্তর হাজার বছর আগে মানুষ বসতি স্থাপন করেছিল। পশ্চিম ইউরোপে যেতে মানুষের সামান্য দেরি হয়ে গিয়েছিল। তাহলেও চল্লিশ হাজার বছর আগেই এই তিন মহাদেশের সর্বত্র মানুষকে খুঁজে পাওয়া যেত। কিন্তু সে সময় দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কৌশল মানুষের আয়ত্তে আসেনি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে তাহলে সুদূর অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকা-- এই দুই মহাদেশে মানুষের পদচিহ্ণ কবে প্রথম পড়েছিল। কেমন করেই বা সেখানে তারা গিয়েছিল?
      আগেই দেখেছি অন্তিম হিমযুগে সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশের  উচ্চতা আজকের দিনের থেকে মোটামুটি ১৩০ মিটার নীচে ছিল। এশিয়া এবং আলাস্কা স্থলপথে বেরিং ল্যাণ্ডব্রিজ দিয়ে যুক্ত ছিল, যা এখন জলের তলায়। আনুমানিক পনেরো হাজার বছর আগে এশিয়া থেকে এই পথ দিয়ে আদিম মানুষ পদব্রজে উত্তর আমেরিকায় পৌঁছোয়। ভারত থেকে মানুষ এই সময় হেঁটে গিয়ে শ্রীলঙ্কাতে বসতি স্থাপন করেছিল। অস্ট্রেলিয়া যদিও পঞ্চাশ হাজার বছর আগে দ্বীপ মহাদেশই ছিল, কিন্তু তখন সমুদ্রতল অনেক নীচে থাকায় দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দ্বীপগুলি থেকে জলপথে তখন সেখানে যাওয়া সহজ ছিল। এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে সে সময়ই মানুষ অস্ট্রেলিয়া পৌঁছোয়। তাসমানিয়া ও নিউ গিনি, যারা এখন দ্বীপ, তারা তখন অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল।  সঙ্গের মানচিত্রে মানুষ কত বছর আগে কোন পথে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে পৌঁছেছিল, তা দেখানো হয়েছে।
আধুনিক মানুষের পরিযাণ

      সমুদ্রতল নেমে গিয়ে একদিন মানব সভ্যতার প্রসারে সাহায্য করেছিল। আজ অতি দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের জন্য সেই সভ্যতাই সংকটের সম্মুখীন। সমুদ্রতল দ্রুত উঠে আসছে এবং মানুষই তার জন্য দায়ী। ভূতাত্ত্বিক কারণের উপর খোদকারি করার অবস্থায় আমাদের বিজ্ঞান এখনো পৌঁছয়নি। কিন্তু বর্তমানে সমুদ্রতলের দ্রুত বৃদ্ধির একটা অন্যতম কারণ বিশ্ব জুড়ে উষ্ণতার বৃদ্ধি। অনিয়ন্ত্রিত ভাবে কয়লা ও খনিজ তেল পোড়ানোর সময় তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড। বসতি ও শিল্পের প্রয়োজনে নির্বিচারে বনভূমি ধংস তাকে অক্সিজেনে রূপান্তরিত করার মূল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া সালোক সংশ্লেষকে ব্যাহত করছে।  ফলে বায়ুমণ্ডলে এই গ্যাসের পরিমাণ ক্রমশই বেড়ে চলেছে। পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে সূর্যের তাপকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে যেতে বাধা দেয় এই কার্বন ডাই অক্সাইড ও তার মতো অন্যান্য গ্রীন হাউস গ্যাস। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশই বেড়ে চলেছে। ১৮১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৮৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এই অতিরিক্ত তাপের নব্বই শতাংশই সমুদ্র জলের মধ্যে সঞ্চিত থাকে। ৭০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত সমুদ্রের জলে জমা হয় ষাট শতাংশের বেশি তাপ।  তার ফলে সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা বাড়ে এবং জলের তাপীয় প্রসারণ ঘটে। ১৯৭১ থেকে ২০১০, এই  চার দশকে সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ০.৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। সমুদ্র-জলে এই তাপসঞ্চয়ের মাত্রা নিম্ন অক্ষাংশের তুলনায় উচ্চ অক্ষাংশে বেশি বলে জল প্রসারণের মাত্রাও উচ্চ অক্ষাংশে বেশি। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ ও তুষার চাদর খুব দ্রুত গলে যাচ্ছে। এল-নিনো এবং লা-নিনোর মত সমুদ্রস্রোত পৃথিবীর জলবায়ুকে খেয়াল খুশি মত ওলট-পালট করছে। জানিয়ে রাখি এল-নিনো হল উষ্ণ সমুদ্র-স্রোত যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে জলের তাপমাত্রা বাড়ার জন্য পেরু উপকূলের শীতল হামবোল্ট স্রোতকে সরিয়ে দিয়ে বয়ে যায়। ফলে সমুদ্রের উপর বৃষ্টিপাত বেড়ে সেখানের জলতলকে বাড়ায়। কিন্তু একই সঙ্গে ক্রান্তিয় অঞ্চলের মৌসুমি বায়ু শুষ্ক হয়ে স্থলভাগের উপর বৃষ্টি কমায় ও সেখানে খরা সৃষ্টি করে। ঠিক উল্টোটা হয় লা-নিনোর সময় । ২০১০-১১ সালে লা-নিনোর জন্য অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে স্থলভাগে বৃষ্টিপাত বেড়ে সেখানকার জলসঞ্চয় একদিকে যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি সমুদ্রতল সাময়িকভাবে নামিয়ে দিয়েছে।  তবে সমুদ্রতলের উচ্চতার উপর এদের প্রভাব সাময়িক।
গ্রীনল্যাণ্ডের তুষার চাদর

      ইউনাইটেড নেশনসের রিপোর্ট অনুসারে শেষ ১০০ বছরে বিশ্বজনীন সমুদ্রতল (Eustatic Sea Level) গড়ে বেড়েছে ১০-২০ সেন্টিমিটার। আগামী ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রজলের তাপীয় প্রসারণ ও বরফ গলনের জন্য আরও ৮৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। দ্বিতীয় লেখচিত্রে ১৭০০ সালে থেকে বর্তমান পর্যন্ত সমুদ্রতলের বৃদ্ধির মাপ দেখানো হয়েছে। ভবিষ্যত সমুদ্রতল আরও কতটা বাড়বে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন তাও লেখচিত্র থেকে বোঝা যাচ্ছে। আইপিসিসির সাম্প্রতিকতম রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৯৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে সমুদ্রতল বৃদ্ধি পেয়েছে ৩.২ মিলিমিটার। এর মধ্যে সমুদ্র জলের তাপীয় প্রসারণের জন্য বৃদ্ধি ১.১ মিলিমিটার, গ্রীনল্যাণ্ড ও আন্টার্টিকার তুষার চাদরের গলনের ফলে বৃদ্ধির পরিমাণ দু ক্ষেত্রেই ০.৩ মিলিমিটার এবং অন্যত্র হিমবাহের গলনের ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে ০.৯ মিলিমিটার। তাহলে দেখা যাচ্ছে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে সমুদ্রতলের বৃদ্ধির জন্য মূলত দায়ী বিশ্বউষ্ণায়ণ।  
২নং লেখচিত্রঃ ১৭০০ সাল থেকে আগামী ২১০০ সাল পর্যন্ত সমুদ্রতল

       বছরে ৩.২ মিলিমিটার বৃদ্ধিটা খুব বেশি নয় বলে মনে হতেই পারে। কিন্তু এ ভাবে চলতে থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রতল আশি সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার বেড়ে যাবে। তার ফল হতে পারে সাংঘাতিক। বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশ সহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে তা পঙ্গু করে দিতে পারে।
      প্রথমেই ধরা যাক ভারতের কথা। আমাদের দেশের উপকূল ভাগের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫০০ কিলোমিটার। উপকূল অঞ্চলের জনবসতি ঘনত্ব খুব বেশি।  সমুদ্রতলের উত্থানের ফলে ২০৫০ সাল নাগাদ শুধু ভারতেই প্রায় চার কোটি মানুষ বিপন্ন হয়ে পড়বে। জলের উচ্চতা ১ মিটার বাড়লে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষকে সরাতে হবে। পৃথিবীর যে দশটা মহানগরের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে, তাদের মধ্যে দুটি ভারতে অবস্থিত – মুম্বাই ও কলকাতা।
      মনে হতেই পারে কলকাতা তো সমুদ্রতল থেকে প্রায় পাঁচ মিটার উচ্চতায়, তাই এক মিটার জল বাড়লে কি আর সমস্যা হবে? আসলে কলকাতা গাঙ্গেয় বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত বলে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস এখানে বিপদ ডেকে আনতে পারে। উষ্ণায়নের ফলে ঝড়ঝঞ্ঝার তীব্রতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭০ সালে এক ঝড় পাশের দেশ বাংলাদেশে নয় মিটার জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি করেছিল। কয়েক বছর আগে আইলা ঝড়ের সময় সুন্দরবনের অবস্থার কথাও নিশ্চয় অনেকের মনে আছে। তার সঙ্গে অন্য এক সমস্যাও আছে। জাকার্তা, ব্যাঙ্কক, হো চি মিন সিটি, টোকিয়োর মতো নদী বদ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত এশিয়ার কয়েকটি শহর ক্রমশ মাটির তলায় তলিয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু রিপোর্ট অনুযায়ী ভূগর্ভের জল তুলে নেওয়ার ফলে কলকাতাও এই বিপদে পড়ছে। গত পঞ্চান্ন বছরে ডায়মণ্ডহারবারে জোয়ার ভাঁটা ও এই অঞ্চলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বৃদ্ধির তথ্য বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞ্ররা দেখিয়েছেন এই অঞ্চল বছরে প্রায় ৪ মিলিমিটার বসে যাচ্ছে। এর উপর আসে জোয়ার ও বানের সময় জলোচ্ছ্বাস। সব মিলিয়ে কলকাতা, বিশেষ করে তার দক্ষিণ অংশ, বিরাট সমস্যার সম্মুখীন হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ অংশ বন্যা, ভূগর্ভের জলের লবণীভবন, জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলের ক্ষয়, ঝড়, উপকুলের সম্পদ হানি, জলনিকাশি ব্যবস্থার অবনতি ইত্যাদি কারণে বিপন্ন। 
সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস

      এশিয়ার দেশগুলি সমুদ্রতলের বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি বিপদের সম্মুখীন হতে চলেছে, কারণ এখানে উপকূল অঞ্চলে জনবসতি সর্বাধিক। ভারতের কথা আগেই বলেছি। ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের আড়াই কোটি, চিনের এবং ইন্দোনেশিয়ার দু কোটি করে, ফিলিপাইন্সের দেড় কোটি, এবং জাপান ও ভিয়েতনামের এক কোটি করে মানুষ উঠে আসা সমুদ্রতলের ফলে বিপদে পড়বেন। সবচেয়ে সমস্যায় পড়বেন সমাজের অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অংশের মানুষেরা। বিপদ শুধুমাত্র যে তাঁদের বাসস্থানের তা নয়, চাষবাস সহ তাঁদের জীবিকার উপরেই আঘাত নেমে আসতে চলেছে । সমুদ্রতল উত্থান এখনই ইস্রায়েল ও থাইল্যাণ্ডের ভৌম জলের ভাণ্ডারকে বেশ কিছু জায়গায় লবণাক্ত করে ফেলেছে। পৃথিবীর অন্যতম উর্বর দুই বদ্বীপ চীনের ইয়াংসে ও ভিয়েতনামের মেকংকে গ্রাস করছে সমুদ্রের নোনা জল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান সহ বহু উন্নত দেশের উপকূলের নগরগুলিও বিপন্ন। অনেক ছোটো ছোটো দ্বীপ পৃথিবী থেকে  মুছে যাচ্ছে। এক মিটার জল বাড়লে বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চল ও দ্বীপভূমি পানীয় জলের অভাবে বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চলে জায়গায় জায়গায় একশো কিলোমিটার পর্যন্ত সমুদ্র ঢুকে আসতে পারে। শুধুমাত্র সুন্দরবন প্লাবিত হলেই তা হবে পরিবেশের পক্ষে ভয়ঙ্কর। বেশ কিছু প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ লুপ্ত হবে। আমাজন অববাহিকার বনভূমিও একই সমস্যায় পড়বে।
      এক মিটার সমুদ্রতলের বৃদ্ধির অর্থ সারা পৃথিবীতে অন্তত ২২০০ বর্গকিলোমিটার ভূমি সমুদ্রের তলায় চলে যাবে। উপকূল ও বদ্বীপ অঞ্চল যে ক্রমশ উচ্চতা হারাচ্ছে, তা বাদ দিয়েই এই  হিসাব করা হয়েছে। অধিকাংশ দেশেই আর্থসামাজিক কারণেই উপকূল অঞ্চলে জনবসতির ঘনত্ব খুব বেশি। উপকূলের কৃষির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে মৎস্যচাষ, পর্যটন শিল্প, বসতি ইত্যাদি। ফলে বিশ্ব অর্থনীতির উপর বিরাট আঘাত আসবে। এর পাশাপাশি প্রভাব পড়বে বাস্তুতন্ত্রে --  উপকূলের ম্যানগ্রোভ অরণ্য ধংস হচ্ছে, বিনাশ ঘটছে প্রবাল প্রাচীরের, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামুদ্রিক প্রাণী, উদ্ভিদ। এক হিসাবে অনুমান করা হয়েছে সমুদ্রতলের উত্থানের জন্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হবে ষাট লক্ষ কোটি টাকা।  এখনো পর্যন্ত যা বলা হল, তা সবই ২১০০ সালের কথা মাথায় রেখে। আরও দীর্ঘকালীন হিসাব আরও নৈরাশ্যজনক। হাজার বছরের মধ্যে গ্রীনল্যাণ্ডের তুষার চাদর সম্ভবত সম্পূর্ণ গলে যেতে পারে। তাহলে সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়বে অন্তত ৭ মিটার। যদি কোনোদিন আন্টার্টিকার বরফ চাদর গলে যায়, সমুদ্রতল উঠে আসবে ২৬০ মিটার! আগেই বলেছি, এমনই ঘটেছিল আদি-ক্রিটেশিয়াস যুগে।
মালদ্বীপের রাজধানী মালেঃ সমুদ্রতলের উচ্চতা বাড়লে কী হতে পারে এই রকম দ্বীপে?

      বর্তমানে সমুদ্রতলের বৃদ্ধির মূল কারণ যেহেতু বিশ্ব উষ্ণায়ন, তাই বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাসের পরিমাণ কমানো ছাড়া এই সমস্যার কোনো দীর্ঘকালীন সমাধান সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা সবাই জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ শিল্পোন্নত দেশগুলি এই ব্যাপারে কালক্ষয় ও দীর্ঘসূত্রিতার নীতি নিয়েছে। বহুদিন পর্যন্ত আমেরিকা উষ্ণায়ণকেই অস্বীকার করে চলেছিল। অথচ শিল্পোন্নত দেশগুলিই ঐতিহাসিক ভাবেই এর  জন্য দায়ী। শিল্প বিপ্লবের সময় থেকে তারা যে পরিমাণ কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করেছে, তা এখনো বায়ুমণ্ডলে রয়ে গেছে। তাদের মাথা পিছু গ্রীন হাউস গ্যাস তৈরির পরিমাণ উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলির তুলনায় আজও অনেক বেশি।
      একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে রাখতে হবে -- এখন থেকে ব্যবস্থা নিলেও সমুদ্রতলের বৃদ্ধি সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ হয়ে যাবে না। বায়ুমণ্ডলে যদি গ্রীন হাউস গ্যাসের পরিমাণ আর না বাড়ে, তাহলেও সমুদ্রজলে অবরুদ্ধ তাপের জন্য এখনো কয়েক শতাব্দি জলতল বাড়তেই থাকবে। তাই এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এক বিরাট সংখ্যার মানুষের জন্য বিকল্প বাসস্থান ও জীবিকার ব্যবস্থা করার প্রস্তুতি নিতে হবে । ভবিষ্যত বন্যার কথা মাথায় রেখে দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা নিতে হবে। নীচু অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য বাঁধের ব্যাবস্থা আশু প্রয়োজন। সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে নির্মাণ কাজ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। দুঃখের হলেও মেনে নিতে হবে আমাদের দেশে অন্তত এবিষয়ে কোনো সচেতনতা বা অগ্রগতি চোখে পড়ছে না।
      সমুদ্রতলে বৃদ্ধি বিষয়ে আইপিসিসি বা রাষ্ট্রসংঘের বিশ্লেষণের সঙ্গে সমস্ত বিশেষজ্ঞ যে একমত, তা নয়। কারো কারো মতে বিপদটা আসলে আরও অনেক বেশি। কেউ কেউ আবার বলেছেন সমুদ্রতলের বৃদ্ধি আসলে হচ্ছেই না, বা হলেও তার পিছনে মানুষের কোনো ভূমিকা নেই। বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সমর্থকদের বিশেষ করে দ্বিতীয় দলে পাওয়া যায়। তাঁরা নানাভাবে দেখাতে চান যে আইপিসিসির তথ্য আসলে ভুল। কিন্তু দীর্ঘকালীন তথ্য বিচার করে অধিকাংশ বিজ্ঞানীই এখন একমত যে সমুদ্রতলের বৃদ্ধি সত্যিই আমাদের সামনে বিপদ ডেকে আনছে।  প্রয়োজন তাই এ বিষয়ে চেতনার প্রসার এবং অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে জনমত গঠন। ইউনাইটেড নেশনসের এর একটা তথ্য অবশ্য কিছুটা আশাব্যাঞ্জক। তারা বলছে সমুদ্রজলের তাপীয় প্রসারণ উচ্চ অক্ষাংশে প্ল্যাঙ্কটনের বংশের আরও দ্রুত বৃদ্ধি ঘটাবে। প্ল্যাঙ্কটনের জলের  মধ্যকার কার্বনকে ধরে রাখার ক্ষমতা আছে। এর ফলে বাতাসের কার্বন ডাই অক্সাইড কমার কথা। বাস্তুতন্ত্রের এই হেরফেরে জলবায়ুতে ভবিষ্যতে এমনটা যদি ঘটে তবে তা সূদুর কালে কী প্রভাব ফেলবে সমুদ্রতলে সেটা আন্দাজ করা সত্যিই কঠিন। 

তথ্যসূত্র
১। Global Environmental Outlook 6: United Nations Environment Programme, 2016
২। Fifth Assessment Report of the Inter-Governmental Panel on Climate Change, 2013



প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক উৎসব সংখ্যা ১৪২৩ (২০১৬)