Showing posts with label মৃত্যুসংবাদ. Show all posts
Showing posts with label মৃত্যুসংবাদ. Show all posts

Monday, 29 April 2024

পিটার হিগস (১৯২৯-২০২৪)

পিটার হিগস (১৯২৯-২০২৪)

 গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

 

দিনটা ছিল ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর। চুরাশি বছরের পিটার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ঘোষণা হতে আধ ঘণ্টা বাকি আছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। এডিনবার বন্দর তাঁর বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়, কিছুক্ষণ সেখানে হাঁটাহাঁটি করার পরে সমুদ্রের ধারে এক পাবে বসেই দুপুরের খাবার সারলেন। তারপরে ঢুকলেন এক শিল্প প্রদর্শনীতে। ঘণ্টা চারেক পরে যখন বাড়ি ফিরছেন, এক প্রতিবেশী তাঁকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন। 'প্রফেসর হিগস, অভিনন্দন। আমার মেয়ে লন্ডন থেকে ফোন করে আপনার পুরস্কারের খবরটা দিয়েছে।'

'কী পুরস্কার?’ পিটার অবশ্য জানতেন কোন পুরস্কার সেদিন ঘোষণা হবে। এও জানতেন যে সেই বছর তাঁর নামই পুরস্কারের তালিকায় থাকার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি। তাই সহকর্মী, সংবাদমাধ্যম, বন্ধু, আত্মীয় সকলের ফোন এড়ানোর জন্যই তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। মোবাইল ফোন তিনি ব্যবহার করেন না, তাই সুইডিশ অ্যাকাডেমি পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করার পরে অন্যতম প্রাপক পিটার হিগসের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারেনি। বাড়ি ফিরে গিয়ে তিনি ফোনের রেকর্ড করা মেসেজগুলো শুনে নিলেন।

এই ছিলেন পিটার হিগস; কখনোই নিজেকে সামনে আনতে চাইতেন না। তার আগের বছর যখন সার্নে সাংবাদিক সম্মেলন করে হিগস বোসন কণার আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করা হয়, হিগস সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরতে তিনি শুধু বলেছিলেন সেই দিনটা এই সমস্ত বিজ্ঞানীর যাঁরা কয়েক বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কণাটির সন্ধান পেয়েছেন। সেদিন তিনি কিছু বলবেন না।

নিজেকে আড়াল করার এই অভ্যাস কিন্তু কোনোভাবেই দুর্বলতা নয়। এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ষাট ও সত্তরের দশকে উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকদের উপরে শাস্তি নামিয়ে আনতে চেয়েছে, বিরোধিতা করেছেন পিটার হিগস। বিশ্ববিদ্যালয় বর্ণবিদ্বেষী দক্ষিণ আফ্রিকার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে, প্রতিবাদ করেছেন পিটার হিগস। বিজ্ঞানের বিষয়েও কোনো আপোস করেন নি। পরমাণু অস্ত্র বিরোধী সংগঠনের সদস্য হয়েছেন, আবার সেই সংগঠন যখন পরমাণু শক্তির বিরোধিতা করেছে, তার সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন। পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, কিন্তু যখন তিনি মনে করলেন যে জিন প্রযুক্তির বিরোধিতা করে গ্রিনপিস বিজ্ঞানবিরোধী কাজ করছে, তার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

আজ থেকে ষাট বছর আগে ১৯৬৪ সালে পিটার হিগস কণা পদার্থবিদ্যার এক প্রধান সমস্যার সমাধানের পথ দেখিয়েছিলেন। শুধু তিনি নন, প্রায় একই সময়ে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রাঁসোয়া আংলেয়ার ও রবার্ট ব্রাউট, এবং লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের জেরাল্ড গুরালনিক, রিচার্ড হ্যাগেন, ও টমাস কিবল প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব করেন। সমস্যাটা ছিল এই যে কনা পদার্থবিদ্যার প্রধান ভরসা যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল, যা সুন্দভাবে সেই বিজ্ঞানের সমস্ত কিছুকে ব্যাখ্যা করতে পারে, সেখানে ভরযুক্ত কণাকে স্থান দেওয়া যাচ্ছে না। অদ্ভুত এক পরিস্থিতি, যেখানে ইলেকট্রনের মতো কণার ভর আছে আমরা জানি, কিন্তু অঙ্কের উত্তর মেলাতে গেলে তাকে শূন্য ধরতে হবে। তিন দল বিজ্ঞানীই একই কথা বললেন, বললেন কণাগুলি আসলে ভরশূন্যই, মহাবিশ্বব্যাপী এক বিশেষ ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়া করেই তারা ভর পায়। কিন্তু প্রমাণ কী? এমন তো কোনো জায়গা নেই সেখানে ঐ বিশেষ ক্ষেত্রটি নেই, কাজেই কণাকে ভরশূন্য করা যাবে না। হিগস বলেছিলেন, এই ক্ষেত্রকে কখনো কখনো একটা কণার আকারে দেখা যাবে। ওই বিশেষ ক্ষেত্রটির নাম দেওয়া হয়েছিল হিগস ক্ষেত্র, আর কণাটির নাম হিগস বোসন। বোসন, কারণ তা সত্যেন্দ্রনাথ বসু আবিষ্কৃত বোস সংখ্যায়ন মেনে চলে। প্রসঙ্গত, এই বছর বোস সংখ্যায়ন আবিষ্কারের শতবর্ষ।

পরের প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা হিগস কণার সন্ধান চালিয়েছিলেন। কণাটার ভর নিশ্চয় খুব বেশি, তাই আইনস্টাইনের সূত্র অনুযায়ী তাকে দেখতে অনেকটা শক্তিকে একজায়গায় আনতে হবে। অবশেষে সার্নের সাতাশ কিলোমিটার পরিধির কণাত্বরক লার্জ হ্যাড্রনিক কলাইডারে ধরা পরেছিল সেই কণা। প্রায় ছ'হাজার বিজ্ঞানীর সেই দলে অনেক ভারতীয়ও ছিলেন, ছিলেন আমাদের কলকাতার সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স-এর গবেষকরা। তার পরের বছর হিগস ও আংলেয়ারকে মৌলিক কণার ভরের উদ্ভব সংক্রান্ত আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। আগে থেকেই অনুমান করে পুরস্কার ঘোষণার দিন শহর ছেড়ে পাহাড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন হিগস, কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়। অগত্যা বাড়ি ছেড়ে সমুদ্রতীরের পাবে অবস্থান।

অন্তর্মুখী হিগস নিজের নামে কণার নামকরণে খুশি হননি, তিনি অন্য নাম প্রস্তাব করেছিলেন। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যান তাঁর বেস্ট সেলার বইতে হিগস কণার নাম দিয়েছিলেন গড পার্টিকল অর্থাৎ ঈশ্বরকণা। নাস্তিক হিগসের সেই নামও বিশেষ অপছন্দের ছিল। আত্মপ্রচারবিমুখ হিগস ছিলেন আজকের বিজ্ঞান দুনিয়াতে ব্যতিক্রম। যখন প্রতিমুহূর্তেই বিজ্ঞানীরা প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য ব্যাস্ত, গুণমানের পরিবর্তে সংখ্যাই যখন মূল কথা, তখন সেই বিখ্যাত কাজটির পরে সারা জীবনে তিনি দশটি প্রবন্ধও লেখেননি। তিনি নিজেই বলেছিলেন যে এই যুগে তিনি চাকরিই পেতেন না; এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ছাঁটাই করেনি তার একমাত্র কারণ ১৯৮০ সালেই তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল।

হিগসের জন্ম হয় ইংল্যান্ডে ১৯২৯ সালের ২৯ মে। তাঁর স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন কিংবদন্তী পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক। ডিরাকের বিভিন্ন কৃতিত্বের কথা শুনে হিগসের পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহ জন্মায়। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে তিনি পদার্থবিদ্যাতে বিএসসি, এমএসসি ও ডক্টরেট করেন। ১৯৬০ সালে তিনি এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন, ১৯৯৬ সালে অবসর নেওয়ার পরে তিনি হয়েছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের এমিরিটাস অধ্যাপক। অবশেষে ৯৪ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর প্রয়াণ ঘটল। 

 

সৃষ্টির একুশশতক-এ পাঠিয়েছি   

Sunday, 21 April 2024

পিটার হিগস (২৯ মে, ১৯২৯ - ৮ এপ্রিল, ২০২৪)

  

পিটার হিগস (২৯ মে, ১৯২৯ - ৮ এপ্রিল, ২০২৪) 


গত ৮ এপ্রিল প্রয়াত হলেন ২০১৩ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পিটার হিগস। তাঁর জন্ম হয় ইংল্যান্ডে ১৯২৯ সালের ২৯ মে। তাঁর পড়াশোনা ব্রিস্টলে, সেই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন কিংবদন্তী পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক। ডিরাকের বিভিন্ন কৃতিত্বের কথা শুনে তাঁর পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহ জন্মায়। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে তিনি পদার্থবিদ্যাতে বিএসসি, এমএসসি ও গবেষণা করে ডক্টরেট করেন। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন, ১৯৯৬ সালে অবসর নেওয়ার পরে তাঁকে সেই প্রতিষ্ঠানেই এমিরিটাস অধ্যাপক করা হয়। ২০১২ সালে সার্নের লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডারে যে বোসন কণাটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, তার প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৬৪ সালে হিগস তার কথা প্রথম বলেছিলেন। সেই অত্যন্ত মৌলিক গবেষণার স্বীকৃতিতেই হিগসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

হিগসের গবেষণার তাৎপর্য অল্প কথায় বলা কঠিন। সংক্ষেপে বলা যায়, মৌলিক কণাদের জন্য আমাদের এখনো পর্যন্ত সব সেরা তত্ত্বের নাম হল স্ট্যান্ডার্ড মডেল। মহাবিশ্বে বল চার প্রকার, মাধ্যাকর্ষণ, তড়িৎচৌম্বক বল, পীন বা সবল বল এবং ক্ষীণ বা দুর্বল বল। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মধ্যে প্রথমটিকে স্থান দেওয়া সম্ভব হয়নি, কিন্তু বাকি তিনটি বলের সাহায্যে মৌলিক কণারা কেমনভাবে নিজেদের মধ্যে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া করে, তার ব্যাখ্যা স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু, এই মডেলের এক সমস্যা ছিল যে একমাত্র ভরশূন্য মৌলিক কণাদের জন্যই সে কাজ করে। কিন্তু ইলেকট্রন, মিউয়ন, বিভিন্ন কোয়ার্ক বা অন্য সমস্ত ভরযুক্ত মৌলিক কণাদের এই মডেলে জায়গা হবে কেমন করে?

এই সমস্যার সমাধানে প্রায় একই সময়ে কয়েক দল বিজ্ঞানী আলাদা আলাদা ভাবে প্রস্তাব করেন যে মৌলিক কণাগুলি আসলে ভরহীন, কিন্তু মহাবিশ্বে এমন এক বিশেষ ফিল্ড বা ক্ষেত্র আছে যার সঙ্গে ক্রিয়ার মাধ্যমে তারা বল পায়। এই ক্ষেত্রের নাম আমরা পরে দিয়েছি হিগস ক্ষেত্র। তার সঙ্গে যে কণার ক্রিয়ার পরিমাণ যত বেশি, তার ভর তত বেশি। বিজ্ঞানী মহলে একটা সুপরিচিত উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করা যাক। একটি ঘরের দুপাশে দুটি দরজা আছে; ঘরে বেশ কিছু লোক ইতস্তত ঘোরাফেরা করছেন। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ যদি এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান, তাঁর বিশেষ সময় লাগবে না, কারণ তাঁর সঙ্গে কারোরই কথা হবে না। কিন্তু যদি এমন একজন ঢোকেন যাঁর কয়েকজনের সঙ্গে পরিচিতি আছে, স্বাভাবিকভাবেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে বা গতি কমিয়ে অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন, ফলে তাঁর ঘর পেরোতে সময় লাগবে। আর যদি প্রবেশকারী কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি হন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে, সেলফি তুলতে, অটোগ্রাফ নিতে হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে; ফলে তাঁর অনেকটাই বেশি সময় লাগবে। আমাদের উপমাতে ঘরের মধ্যের মানুষজন হলেন হিগস ক্ষেত্র এবং প্রবেশকারী হলেন মৌলিক কণা; ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়ার মাধ্যমে কণার ভরের সৃষ্টি হচ্ছে। ভরশূন্য কণা আলোর গতিতে চলাফেরা করে, ভর বৃদ্ধি পেলে তার বেগ কমে যায়। ক্রিয়া যত বেশি, ভরও তত বেশি।

প্রায় একই সময়ে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রাঁসোয়া আংলেয়ার ও রবার্ট ব্রাউট, এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটার হিগস, এবং লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের জেরাল্ড গুরালনিক, রিচার্ড হ্যাগেন, ও টমাস কিবল প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব করেন। হিগস একটি অতিরিক্ত কথা বলেছিলেন। এই তত্ত্বকে প্রমাণ করব কেমন করে, বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া কিছু মানে না। মহাবিশ্বের সর্বত্রই এই ক্ষেত্র অবস্থান করে, কাজেই আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয় সত্যিই ক্ষেত্রের বাইরে গেলে কণাদের ভর শূ্ন্য হয়ে যায় কিনা। হিগস বলেছিলেন যে এই ক্ষেত্রকে কখনো কখনো একটা কণার আকারে দেখা যাবে। আগের উপমাতে ফিরে যাই, ধরা যাক ঘরে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন, সেই কথা শুনতে অনেকে ভিড় করবে। আবার শ্রোতাদের মধ্যে একজন অন্য একজনকে বলতে গেলেন, আরো কয়েকজন শুনতে এলেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালালেন। এভাবে একটা জটলা ঘরের এক পাশ থেকে অন্য পাশে চলে গেল। হিগস বোসন হিগস ক্ষেত্রের সেইরকম এক উত্তেজনা, একে আমাদের যন্ত্রে খুঁজে পাওয়া গেলে প্রমাণ হবে যে বিজ্ঞানীদের ধারণা ঠিক। এই কণাটি বোসন, কারণ এ সত্যেন্দ্রনাথ আবিষ্কৃত বোস পরিসংখ্যান মেনে চলে।

হিগস কণাকে যন্ত্রে তৈরি করা মোটেই সহজ নয়, কারণ এর ভর খুব বেশি। আধুনিক গবেষণাগারে কণাত্বরক দিয়ে উচ্চশক্তিতে দুটি কণার সংঘর্ষ ঘটিয়ে নতুন কণা সৃষ্টি করা হয়। আমরা আইনস্টাইনের ভর ও শক্তির সমতুল্যতা সূত্র জানি, সুতরাং বেশি ভরের কণা সৃষ্টি করতে হলে সংঘর্ষের শক্তি অবশ্য বেশি হতে হবে। যে কণাত্বরক যত বড়, তা দিয়ে তত উচ্চশক্তির সংঘর্ষ ঘটানো সম্ভব। অবশ্য হিগস কণার ভর কত তা স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে জানা যায় না, তবে ভর কম হলে আমাদের ছোটখাটো কণাত্বরকে তাকে আগেই খুঁজে পাওয়া যেত। পৃথিবীর সব থেকে বড় কণাত্বরক, লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার, যার রিংটার পরিধি হল সাতাশ কিলোমিটার, তা দিয়েই শেষ পর্যন্ত হিগস বোসনকে খুঁজে পাওয়া গেল; দেখা গেল তার ভর প্রোটনের ভরের মোটামুটি একশো তেত্রিশগুণ। হিগস বোসন খুবই স্বল্পস্থায়ী, সৃষ্টির পরেপরেই তা ভেঙে অন্য অনেক কণা সৃষ্টি হয়। সেই সমস্ত কণা আমাদের যন্ত্রে ধরা পড়ে, তার থেকে বোঝা গেল যে সত্যিই হিগস কণা তৈরি হয়েছিল। এই গবেষণাতে ভারত সহ অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা যুক্ত ছিলেন। হিগস বোসনের সন্ধান পাওয়ার পরের বছরেই হিগস ও ফ্রাঁসোয়া আংলেয়ারকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল। তার আগেই অবশ্য হিগস পদার্থবিজ্ঞানের প্রায় সমস্ত পরিচিত পুরস্কারই পেয়েছেন, তাদের মধ্যে আছে হিউজেস পদক, রাদারফোর্ড পদক, উল্‌ফ পুরস্কার, ডিরাক পদক, সাকুরাই পদক, অস্কার ক্লাইন সম্মান, ইত্যাদি। নোবেল পুরস্কারের পরে পাওয়া সম্মানের মধ্যে আছে পৃথিবীর প্রাচীনতম পুরস্কার, রয়্যাল সোসাইটির কপলি পদক।

তাঁর গবেষণা এত স্বীকৃতি পেলেও ব্যক্তি হিগস কিন্তু অনেক দিক থেকেই বর্তমান বিজ্ঞানীমহলের অধিকাংশের থেকে আলাদা। 'পাবলিশ অর পেরিশ'-এর যুগেও প্রবন্ধ ছাপার ইঁদুর দৌড়ে তিনি কখনোই নাম লেখান নি। ১৯৬৪ সালের পরে তাঁর মোট প্রকাশিত বিজ্ঞানপ্রবন্ধের সংখ্যা দুই অঙ্কে পোঁঁছায়নি। তিনি নিজেই বলেছিলেন আধুনিক কালে তিনি চাকরিই পেতেন না। এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চাকরি যায়নি তার একমাত্র কারণ ছিল যে ১৯৮০ সালেই তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল, কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল যে হয়তো তিনি একদিন পুরস্কার পাবেন। হিগসের নিজের কথায়, 'না পেলে যে কোনো সময় ছাঁটাই করা যাবে।'

অন্য অনেক বিজ্ঞানীর মতো হিগস গজদন্তমিনারে বাস করতেন না, বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ ছিল। নিজের মত স্পষ্ট করে জানাতে তিনি ভয় পেতেন না। উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ছাত্র আন্দোলন বিরোধী আচরণের এবং বর্ণবিদ্বেষী দক্ষিণ আফ্রিকার কোম্পানিদের সঙ্গে এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগের সমালোচনা করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। নিউক্লিয় অস্ত্র বিরোধী আন্দোলন সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্টের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, কিন্তু তা যখন নিউক্লিয় বিদ্যুতেরও বিরোধিতা করে, তখন তিনি তার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তেমনি পরিবেশবাদী গ্রিনপিস সংগঠনের সদস্য হইয়েছিলেন, কিন্তু সেই সংগঠন যখন জিন প্রযুক্তির বিরোধিতা শুরু করে, তখন তিনি সদস্যপদ ত্যাগ করেন। প্যালেস্টাইনের প্রতি ইজরায়েলের মনোভাবের প্রতিবাদে তিনি জেরুজালেমে দিয়ে উলফ পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার এই সম্মান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। ২০১২ সালে অবশ্য তিনি অনুরূপ এক সম্মান গ্রহণ করেছিলেন, কারণ তাঁকে ভুল বোঝানো হয়েছিল যে ব্রিটেনের রাণীই সেই সম্মান দেন, তার সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। হিগস ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, তাঁর প্রস্তাবিত কণাটি গড পার্টিকল বা ঈশ্বরকণা নামে পরিচিত হওয়াতে তিনি খুব বিরক্ত হয়েছিলেন।

হিগস লোকচক্ষুর অন্তরালে কাজ করাই পছন্দ করতেন, তিনি মোবাইল ফোন, ইমেল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন না। ঘটনাচক্রে কণাটির সঙ্গে একমাত্র তাঁর নাম যুক্ত হওয়াটাকে তিনি পছন্দ করতেন না, তিনি নিজে তার পরিবর্তন করতে চেয়েছিলেন। সার্নের আবিষ্কারের পরে প্রচারমাধ্যম তাঁকে নিয়ে যে মাতামাতি শুরু করেছিল, তা তাঁর নিতান্তই অপছন্দ ছিল। ২০১৩ সালের নোবেল পুরস্কারের তালিকাতে তাঁর নাম থাকবে বলে সকলেই অনুমান করেছিলেন। সংবাদমাধ্যমকে এড়াতে তিনি পুরস্কার ঘোষণার দিন আগেভাগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। কয়েকঘণ্টা এডিনবার শহরে ঘোরাঘুরির পরে তিনি যখন বাড়ি ফিরছেন, তখন পরে এক প্রতিবেশী তাঁকে খবরটা দেয়। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে তিনি আশা করেননি যে তাঁর জীবৎকালে কণাটি খুঁজে পাওয়া যাবে। তাই সার্নের আবিষ্কারের খবর পেয়ে প্রথমে তাই তাঁর ভালো লেগেছিল, কিন্তু তার পরেই মনে হয়েছিল যে তাঁর শান্তিপূর্ণ জীবন শেষ হতে চলেছে। কিছুটা মজা করেই হয়তো বলেছিলেন, ওই একটি কণা তাঁর জীবনকে ধ্বংস করে দিল। তাঁর আবিষ্কারকে ঘিরে এত উত্তেজনা তিনি নিজে অপছন্দ করতেই পারেন, কিন্তু সন্দেহ নেই যে হিগস ও অন্যান্যরা বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছেন।


                                                                                          গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 

প্রকাশ সংবাদ প্রতিদিন,  ২০২৪

Tuesday, 26 December 2023

প্রয়াত হলেন এম এস স্বামীনাথন

প্রয়াত হলেন এম এস স্বামীনাথন


    ভারতের সবুজ বিপ্লবের রূপকার বিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথন গত ২৮ সেপ্টেম্বর প্রয়াত হয়েছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। তাঁর জন্ম হয়েছিল বর্তমান তামিলনাড়ুর কুম্ভকোনমে ১৯২৫ সালের ৭ অগস্ট।  ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার, কিন্তু ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে এয়। এই দুর্ভিক্ষে তিরিশ লক্ষ লোক মারা গিয়েছিল। ভারতের খাদ্য সমস্যা মেটানোর দিশা পাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি কৃষিবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।  মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি করার পরে দিল্লির ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট (আইএআরআই) থেকে জেনেটিক্স ও উদ্ভিদপ্রজনবিদ্যা নিয়ে এমএসসি করেন। স্বল্পকাল ইউনেস্কো বৃত্তি নিয়ে হল্যান্ডে গবেষণার পরে তিনি কেমব্রিজ থেকে ডক্টরেট করেন। আমেরিকার উইন্সকন্সিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পনেরো মাস গবেষণার পরে সেখানে অধ্যাপনার সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে ১৯৫৪ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। কয়েক মাস পরে তিনি  আইএআরআইতে চাকরি পান।  
    স্বাধীনতার আগেই ভারতে ফলন ছিল জনসংখ্যার অনুপাতে কম। ব্রহ্মদেশ, পুর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাঞ্জাবের মতো উর্বর অঞ্চল ভারত থেকে আলাদা হওয়ার পরে সমস্যা আরো বাড়ে। অন্যদিকে স্বাধীনতার পরে জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ঘটতে থাকে; কৃষি কোনোভাবেই তার সঙ্গে তাল রেখে উঠতে পারছিল না। ফলে ভারতকে বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতে হত। বয়স্কদের হয়তো আমেরিকার পিএল ৪৮০ গমের কথা মনে আছে, সেই গমের গুণমান ছিল অত্যন্ত খারাপ, এবুং সেই সাহায্যের পরিবর্তে আমেরিকার শর্ত মেনে নিতে হত। স্বামীনাথনের মতো তরুণ বিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটান। মার্কিন কৃষিবিজ্ঞানী নর্মান বোরলাগের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গবেষণা করে স্বামীনাথন  মেক্সিকোর বামন প্রজাতির গম ও জাপানি গমের মিলন ঘটিয়ে ভারতে চাষের উপযোগী নতুন এক ধরনের গমের জন্ম দেন। পরে এক সাক্ষাৎকারে স্বামীনাথন বলেছিলেন মহেঞ্জোদড়োর যুগ থেকে চারহাজার বছরের ইতিহাসে যে ফলন হত, ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৮ এই চার বছরেই তাকে দ্বিগুণ করা সম্ভব হয়েছিল। চাষীদেরও সেই উচ্চ ফলনশীল শস্য ব্যবহারে সম্মত করার পরে ১৯৬৮ সালে গমের ফলন আগের বছরের তুলনায় তিরিশ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পায়। বোরল্যাগ শুধু ভারত নয়, এশিয়ার অনেক দেশকেই উচ্চফলনশীল শস্য গবেষণাতে সাহায্য করেছিলেন;  সেই অবদানের স্বীকৃতিতে ১৯৭০ সালে তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। বোরল্যাগ তার ঠিক আগে স্বামীনাথনকে লিখেছিলেন যে সবুজ বিপ্লবের কৃতিত্ব ভারত সরকারের অফিসারদের, বিজ্ঞানীদের, নানা সংস্থার ও চাষীদের; কিন্তু মেক্সিকোর বামন প্রজাতির গমের গুরুত্ব স্বামীনাথনই বুঝতে পেরেছিলেন। তা না হলে হয়তো এশিয়াতে সবুজ বিপ্লব সম্ভব হতো না। যে কোনো রকম বিপ্লবের মতো সবুজ বিপ্লবেরও নিঃসন্দেহে ভালো ও খারাপ  দুই দিকই আছে, তা নিয়ে আলোচনার পরিসর ভিন্ন। কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে ভারতকে খাদ্যে স্বনির্ভর করার পিছনে আছে সবুজ বিপ্লব।
    স্বামীনাথনের সভাপতিত্বে ন্যাশনাল কমিশন অন ফার্মারস শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে উৎপাদন খরচের দেড়গুণ রাখার  সুপারিশ করেছিল। সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলনের এই প্রধান দাবি কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নিলেও এখনো রূপায়িত করেনি। তিনি পরিবেশ রক্ষা করে কৃষির জন্য সচেষ্ট ছিলেন। স্বামীনাথন ১৯৭২ থেকে ১৯৮০ ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চের অধিকর্তা ছিলেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৮৮ তিনি ছিলেন ফিলিপাইন্সের ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা। চিন, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, কেনিয়া সহ বহু দেশের কৃষি গবেষণাতে তিনি সাহায্য করেছিলেন।
    ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজের প্রথম প্রাপক স্বামীনাথন, সেই অর্থে গড়ে তুলেছিলেন স্বামীনাথন রিসার্চ ফাউন্ডেশন। আলবার্ট আইনস্টাইন পুরস্কার, ম্যাগসেসে পুরস্কার, পদ্ম বিভূষণ সহ বহু সম্মান তিনি পেয়েছেন। ২০০৭ সাল থেকে তিনি ছ' বছর রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য ছিলেন। টাইমস পত্রিকার বিচারে বিংশ শতাব্দীর সব থেকে প্রভাবশালী কুড়ি জন এশীয়ের তালিকাতে তিন ভারতীয়ের একজন ছিলেন স্বামীনাথন, অন্য দুজন  গান্ধী  ও রবীন্দ্রনাথ।

                                        গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 

সৃষ্টির একুশ শতক পত্রিকার নভেম্বর ২০২৩ সংখ্যায় প্রকাশিত

Monday, 13 November 2023

একুশ শতক পত্রিকাতে বিজ্ঞানী বিকাশ সিংহের অবিচুয়ারি

গত ১১ আগস্ট, ২০২৩ প্রয়াত হলেন বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তাঁর জন্ম মুর্শিদাবাদে কান্দির পুরানো রাজপরিবারে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার পরে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং কেমব্রিজ থেকে বিএ ও এমএ সম্পূর্ণ করে লন্ডনের কিংস কলেজে গবেষণা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি মুম্বাইয়ের ভাভা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে যোগ দেন।

১৯৮৪ সালে তিনি কলকাতার ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার বা ভিইসিসি-তে একটি বিভাগের প্রধান হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৮৭ থেকে ২০০৯ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভিইসিসির অধিকর্তা। একই সঙ্গে ১৯৯২ থেকে ২০০৯ কলকাতার সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের অধিকর্তার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। এর মধ্যেই কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও হয়েছিলেন। একই সঙ্গে দুটি বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে তিনি সফলভাবে পরিচালনা করেছেন। নিজে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ হলেও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে বহু নতুন বিষয়ে গবেষণার সূচনাতে সাহায্য তিনি করেছিলেন। ভিইসিসি-তে মেডিক্যাল সাইক্লোট্রনের পরিকল্পনা সেই সময়েই নেওয়া হয়। এই সাইক্লোট্রনে যে সমস্ত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি হয় তারা ক্যান্সার সহ বহু রোগের নিরাময় বা নির্ধারণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেই সাইক্লোট্রন এখন অনেক কম খরচে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করছে। কনিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও ছাত্রদের দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতেন বিকাশ সিংহ।

নিউক্লিয় বিক্রিয়া বিষয়ে গবেষণা দিয়ে বিকাশ সিংহের বিজ্ঞানী জীবনের সূচনা হয়েছিল। দেশে ফিরে কয়েক বছর পরে তিনি কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমা বিষয়ে মন দেন। এই বিষয়ে তিনি পৃথিবীর পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম; চল্লিশ বছর আগে ১৯৮৩ সালে এই বিষয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। বিগ ব্যাঙের পরে ব্রহ্মাণ্ডের অতি ঘন অতি উত্তপ্ত অবস্থাতে কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমার অস্তিত্ব ছিল; পৃথিবীর পরীক্ষাগারে দুটি ভারি নিউক্লিয়াসের মধ্যে উচ্চশক্তির সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেই আদি অবস্থাকে পুনরায় সৃষ্টি করা সম্ভব। বিকাশ সিংহ জোর দিয়েছিলেন তার থেকে বেরিয়ে আসা ফোটন, ইলেকট্রন ও মিউয়ন কণা পর্যবেক্ষণের উপরে। তাঁর উদ্যোগেই এই নিয়ে তাত্ত্বিক ও পরীক্ষামূলক গবেষণার দুটি দল দেশে তৈরি হয়েছিল।

এই ধরনের পরীক্ষা করে দেখার মতো যন্ত্র আছে পৃথিবীর দুটি পরীক্ষাগারে; একটি হল আমেরিকার ব্রুকহাভেনের রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কোলাইডার, অন্যটি হল সার্নের লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার। বিকাশ সিংহের চেষ্টাতে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষাগারের গবেষণাতে অংশ নেন। তাঁর চেষ্টাতেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেরা যন্ত্র বানিয়ে পরীক্ষাতে ব্যবহার করেছেন; তাঁদের তৈরি ফোটন মাল্টিপ্লিসিটি ডিটেক্টর এবং মিউয়ন চেম্বার এখন এই সমস্ত পরীক্ষাগারে কাজ করে চলেছে। দেশে তৈরি হয়েছে মানস নামের সেমিকন্ডাক্টর চিপ, এই প্রযুক্তি যে ভারতে সম্ভব তা কেউ কল্পনাই করতে পারত না। ভারতে একের পর এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্র আয়োজন করে সেখানে সারা পৃথিবীর প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের তিনি নিয়ে এসেছিলেন।

কোনো ভারতীয় ব্যক্তিগতভাবে কী করল, তার থেকে বিকাশ সিংহের কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে দেশ হিসাবে ভারত কী কাজ করছে। ভারত এখন সার্নের সহযোগী সদস্য। জার্মানিতে তৈরি হচ্ছে আর সর্বাধুনিক নতুন পরীক্ষাগার ফেসিলিটি ফর অ্যান্টিপ্রোটন এন্ড আয়ন রিসার্চ; অংশীদারত্বের হিসাবে ভারত এখন সেই প্রকল্পে তৃতীয়। এই সমস্ত প্রচেষ্টার নেতৃত্বে ছিলেন বিকাশ সিংহ। শুরুতে ভারত থেকে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের আন্তর্জাতিক পরীক্ষাতে অংশ নিচ্ছিল। এখন সারা ভারতের মোট পঁচিশটি গবেষণা কেন্দ্র ও পনেরটি শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন ফেয়ার-এ কাজের অংশীদার। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কথা আলাদা করে বলতেই হয়, কারণ আন্তর্জাতিকমানের যন্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রযুক্তির উন্নতি করতে পারছে এবং ব্যবসার পরিমাণ বাড়াতে পারছে।

পঁচাত্তর বছর বয়সেও পৃথিবীর প্রথম সারির গবেষণা পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একক গবেষণা। বিজ্ঞান প্রসারে ও প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকাতে বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি করতেন। 'সৃষ্টি এবং কৃষ্টি: বন্ধনহীন গ্রন্থি' এবং 'স্থান, কাল ও বিশ্বলোক', এই দুই বইতে তাঁর রচনাগুলি গ্রন্থিত হয়েছে। তিনি ছিলেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের উপদেষ্টামণ্ডলীর ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কাউন্সিলের সদস্য। সাহিত্য বা ইতিহাসেও তাঁর উৎসাহ ছিল। পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মান, রবীন্দ্র পুরস্কার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু জন্মশতবার্ষিকী পুরস্কার, মেঘনাদ সাহা পুরস্কার, ইত্যাদি তিনি পেয়েছেন।

নিজে যা বিশ্বাস করেন তা সোজাসুজি বলতেন তিনি, অবিজ্ঞান ও পবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। ২০২০ সালে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকাতে এক সাক্ষাৎকারে বিকাশ সিংহ বলেন সমস্ত পশ্চিমী চিন্তাভাবনার মূল ভারতীয় চিন্তাতে পাওয়া যাবে, এটা একেবারেই ভুল ধারণা এবং তা হয় একান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত বা তার পিছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে। ভারতীয় দর্শনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও তিনি বলেছিলেন পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাই সেখানে পাওয়া যাবে না। তিনি সাক্ষাৎকারে চারটি উদাহরণের কথা বলেছিলেন। আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, রেনে দেকার্তের দর্শনের পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গেলসের শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বের কথা। কখনো কোনো বামপন্থী দলের সদস্য না হয়েও মার্ক্স-এঙ্গেলসের তত্ত্বের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় বিজ্ঞান গবেষণাতে এক বিরাট শূন্যস্থানের সৃষ্টি হল। 

 

সৃষ্টির একুশ শতক পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০২৩ সংখ্যাতে প্রকাশিত 

Saturday, 28 October 2023

প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ

 প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ

 

গত ১১ আগস্ট, ২০২৩ প্রয়াত হলেন বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ। বিজ্ঞানী ও বিশেষত বিজ্ঞান প্রশাসক হিসাবে তিনি ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার জগতে বিরাট অবদান রেখে গেছেন সন্দেহ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্তরের পরীক্ষাতে ভারতের অংশগ্রহণের সূচনা তাঁর নেতৃত্বে ও উৎসাহেই সম্ভব হয়েছিল।

 

বিকাশ সিংহ (চিত্রঋণ বিশ্বরূপ গাঙ্গুলী)

 

বিকাশ সিংহের জন্ম মুর্শিদাবাদে কান্দির পুরানো রাজপরিবারে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুন। তাঁদের বাড়িতে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর যাতায়াত ছিল। পরিণত বয়সে বিকাশ সিংহের স্মৃতিচারণাতে সেই কথা অনেকবার এসেছে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে ১৯৬৪ সালে স্নাতক হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অমলকুমার রায়চৌধুরি, সমরেন্দ্রনাথ ঘোষাল ও শ্যামল সেনগুপ্তের নাম কলকাতার পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে প্রবাদপ্রতিম হয়ে গিয়েছে। ঘটনাচক্রে এই বছর এই তিনজনের শতবর্ষ।

এর পর বিকাশ সিংহ ইংল্যান্ডে পড়তে যান। তিনি কেমব্রিজের কিংস কলেজ থেকে ১৯৬৭ সালে বিএ এবং ১৯৬৮ সালে এমএ-তে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে ১৯৭০ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ তিনি লন্ডনের কিংস কলেজে গবেষণা করেছিলেন। তারপর রাজা রামান্নার আহ্বানে তিনি দেশে ফিরে মুম্বাইয়ের ভাভা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে যোগ দেন।

১৯৮৪ সালে তিনি কলকাতার ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার বা ভিইসিসির একটি বিভাগের প্রধান হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৮৭ সালে তিনি ভিইসিসির অধিকর্তার দায়িত্ব পান। এত অল্প বয়সে দেশের কোনো মুখ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। ১৯৯২ সালে তিনি কলকাতার সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের অধিকর্তার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত একই সঙ্গে দুটি বড় প্রতিষ্ঠান চালনার দায়িত্ব শুধু যে তিনি সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন তা নয়, দুটিকেই তিনি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর সময়েই এই দুই প্রতিষ্ঠানে বহু নতুন বিষয়ে গবেষণা শুরু হয়। নিজে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ হলেও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার বিষয়ে তাঁর কুণ্ঠা ছিল না। তাঁর উদ্যোগে ভিইসিসি-তে মেডিক্যাল সাইক্লোট্রনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই সাইক্লোট্রনে যে সমস্ত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি হয় তারা ক্যান্সার সহ বহু রোগের নিরাময় বা নির্ধারণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেই মেডিক্যাল সাইক্লোট্রন এখন কলকাতার উপকণ্ঠে কাজ শুরু করেছে এবং অনেক কম খরচে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করছে। ততিনি অধিকর্তা থাকার সময় সাহা ইন্সটিটিউটে বায়োফিজিক্স, সারফেস ফিজিক্স জাতীয় আধুনিক বিষয়ে গবেষণা সামনের সারিতে আসে। ভিইসিসি-র সুপারকন্ডাক্টিং সাইক্লোট্রন, রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়ন বিম প্রকল্প, সাহা ইন্সটিটিউটের অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অ্যাকসিলারেটর ফ্রেনা - এই সমস্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে দুই ইনস্টিটিউটে গবেষণাতে নতুন জোয়ার আসে। কিছুদিন তিনি একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও সামলেছেন। কনিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও ছাত্ররা যাতে ঠিক মতো কাজ করতে পারে, তাদের কোনো অসুবিধা না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখতেন বিকাশ সিংহ।

বিকাশ সিংহ নিউক্লিয় বিক্রিয়া বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। এক বিশেষ তত্ত্ব যার নাম অপটিকাল মডেল, সেখানে তাঁর দখল ছিল প্রশ্নাতীত। লন্ডনের কিংস কলেজে ছ' বছরে প্রকাশিত কুড়িটি গবেষণাপত্র পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষ্য দেয়। এরপরে তিনি কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমা বা কিউজিপি বিষয়ে মন দেন। এই বিষয়ে তিনি পৃথিবীর পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম; চল্লিশ বছর আগে ১৯৮৩ সালে এই বিষয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই সমস্ত গবেষণাতে তাঁর অনেক সঙ্গীর মধ্যে তিনজনের নাম আলাদা করে বলতে হয়, তাঁরা হলেন দীনেশ কুমার শ্রীবাস্তব, শিবাজি রাহা ও প্রয়াত ভাস্কর দত্ত। বিকাশ সিংহের পরে ভিইসিসির অধিকর্তা হন শ্রীবাস্তব। শিবাজি রাহা দীর্ঘদিন বোস ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা ছিলেন।

কিউজিপি নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা প্রয়োজন। প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে আছে কোয়ার্ক কণা। কোয়ার্ক কণাদের মধ্যে গ্লুয়ন কণা বিনিময়ের সাহায্যে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া হয়। সাধারণভাবে কোয়ার্ক কণারা প্রোটন নিউট্রন ইত্যাদির মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু সৃষ্টির আদিতে বিগব্যাঙের সময় মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও উত্তপ্ত। তখন সেই প্রচন্ড ঘনত্বে কোয়ার্করা খুব কাছাকাছি ছিল, ফলে আলাদা করে প্রোটন নিউট্রন মেসন ইত্যাদি কণার কথা বলা যেত না। এই অবস্থা বা দশাকে বলা হয় কিউজিপি। ব্রহ্মাণ্ড যত প্রসারিত হয়েছে, তার ঘনত্ব ও তাপমাত্রা হ্রাস পেয়েছে, এক সময় কোয়ার্করা প্রোটন ইত্যাদির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ল। এই ঘটনাকে এক প্রকার দশা পরিবর্তন বলতে পারি। পৃথিবীর পরীক্ষাগারে দুটি ভারি নিউক্লিয়াসের মধ্যে উচ্চশক্তির সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেই আদি অবস্থাকে পুনরায় সৃষ্টি করা সম্ভব। সেই অবস্থাকে দেখা যায় নানা ভাবে, বিকাশ সিংহ জোর দিয়েছিলেন তার থেকে বেরিয়ে আসা ফোটন, ও ইলেকট্রন ও মিউয়ন কণা পর্যবেক্ষণের উপরে।

বিকাশ সিংহকে কেন্দ্র করে কিউজিপি নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণার একটি দল দেশে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তাতেই তিনি সন্তুষ্ট হননি। তিনি জোর দিলেন পরীক্ষা করে দেখার উপর। এবং এখানেই বিজ্ঞান প্রশাসক হিসাবে আমরা তাঁর অন্য একটি রূপ দেখতে পাই। এই ধরনের পরীক্ষা করে দেখার মতো যন্ত্র আমাদের দেশে নেই। পৃথিবীর দুটি পরীক্ষাগার কিউজিপি বিষয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাতে নেতৃত্ব দিয়েছে, একটি হল আমেরিকার ব্রুকহাভেনের রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কোলাইডার, অন্যটি হল সার্নের লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার। বিকাশ সিংহের চেষ্টাতে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষাগারের গবেষণাতে অংশ নেন। তাঁর দূরদৃষ্টি থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ভারতকে যদি মর্যাদার সঙ্গে এই সমস্ত জায়গাতে কাজ করতে হয়, তাহলে শুধুমাত্র পরীক্ষার সময়ে অংশ নেওয়া বা তার তথ্য বিশ্লেষণ করলে চলবে না। তাঁর চেষ্টাতেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেরা যন্ত্র বানিয়ে পরীক্ষাতে ব্যবহার করেছেন; তাঁদের তৈরি ফোটন মাল্টিপ্লিসিটি ডিটেক্টর এবং মিউয়ন চেম্বার এখন এই সমস্ত পরীক্ষাগারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে কাজ করে চলেছে। এই জন্য দেশেই তৈরি হয়েছে মানস নামের সেমিকন্ডাক্টর চিপ, এই প্রযুক্তি যে ভারতে সম্ভব তা কেউ কল্পনাই করতে পারত না। ভারতে একের পর এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্র আয়োজন করে সেখানে সারা পৃথিবীর প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের তিনি নিয়ে এসেছিলেন।

একজন বা দুজন ভারতীয় ব্যক্তিগতভাবে কী করল, তার থেকে বিকাশ সিংহের কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে দেশ হিসাবে ভারত কী কাজ করছে। ভারত এখন সার্নের সহযোগী সদস্য, তার পিছনে তাঁর প্রচেষ্টার কথা বলতেই হবে। জার্মানিতে তৈরি হচ্ছে আর সর্বাধুনিক নতুন পরীক্ষাগার ফেসিলিটি ফর অ্যান্টিপ্রোটন এন্ড আয়ন রিসার্চ, সংক্ষেপে ফেয়ার। বিকাশ সিংহ পরিকল্পনা স্তর থেকেই ভারত যেন তাতে অংশ নেয় তার চেষ্টা করেছিলেন। অংশীদারত্বের হিসাবে ভারত এখন সেই প্রকল্পে তৃতীয়।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সবাইকে নিয়ে চলার জন্য বিকাশ সিংহ চেষ্টা করে গেছেন। শুরুতে ভারত থেকে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের আন্তর্জাতিক পরীক্ষাতে অংশ নিচ্ছিল। এখন শুধুমাত্র কলকাতা থেকেই ভিইসিসি ছাড়াও সাহা ইনস্টিটিউট, বোস ইন্সটিটিউট, কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এই সমস্ত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। সারা ভারতের মোট পঁচিশটি গবেষণা কেন্দ্র ও পনেরটি শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন ফেয়ার-এ কাজের অংশীদার। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কথা আলাদা করে বলতেই হয়, কারণ আন্তর্জাতিকমানের যন্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রযুক্তির উন্নতি করতে পারছে এবং ব্যবসার পরিমাণ বাড়াতে পারছে। তিনি ফেয়ার-এর পরিচালনা কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।

অবসর নেওয়ার পরেও কাজ থামাননি বিকাশ সিংহ। পঁচাত্তর বছর বয়সেও পৃথিবীর প্রথম সারির গবেষণা পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একক গবেষণা। বিজ্ঞান প্রসারে ও প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকাতে বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি করতেন। 'সৃষ্টি এবং কৃষ্টি: বন্ধনহীন গ্রন্থি' এবং 'স্থান, কাল ও বিশ্বলোক', এই দুই বইতে তাঁর রচনাগুলি গ্রন্থিত হয়েছে। আমৃত্যু বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের উপদেষ্টামণ্ডলীর ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কাউন্সিল সদস্য ছিলেন তিনি। সাহিত্য বা ইতিহাসেও তাঁর উৎসাহ ছিল। রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী বিকাশ সিংহের উৎসাহেই নিউটাউনে তৈরি হয়েছে টেগোর সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড ফিলোজফি। পেয়েছেন অনেক পুরস্কার, পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মান, রবীন্দ্র পুরস্কার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু জন্মশতবার্ষিকী পুরস্কার, মেঘনাদ সাহা পুরস্কার, ইত্যাদি।

এখন যখন বিজ্ঞানের নামে অবিজ্ঞান ও অপবিজ্ঞানের চর্চা প্রাধান্য পাচ্ছে, সেই সময় নিজে যা বিশ্বাস করেন তা সোজাসুজি বলা প্রয়োজন তা তিনি বুঝেছিলেন। ২০২০ সালে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকাতে এক সাক্ষাৎকারে বিকাশ সিংহ বলেন সমস্ত পশ্চিমী চিন্তাভাবনার মূল ভারতীয় চিন্তাতে পাওয়া যাবে, এটা একেবারেই ভুল ধারণা এবং তা হয় একান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত বা তার পিছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে। ভারতীয় দর্শনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও তিনি বলেছিলেন পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাই সেখানে পাওয়া যাবে না। তিনি সাক্ষাৎকারে চারটি উদাহরণের কথা বলেছিলেন। আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, রেনে দেকার্তের দর্শনের পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গেলসের শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বের কথা। কখনো কোনো বামপন্থী দলের সদস্য না হয়েও মার্ক্স-এঙ্গেলসের তত্ত্বের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় বিজ্ঞান গবেষণাতে এক বিরাট শূন্যস্থানের সৃষ্টি হল। 

 

প্রকাশঃ দেশহিতৈষী,  ১৮ আগস্ট, ২০২৩

Wednesday, 15 September 2021

শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ স্টিভেন ভাইনবার্গ

শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ স্টিভেন ভাইনবার্গ

( ৩ মে, ১৯৩৩ - ২৩ জুলাই, ২০২১)


আমরা যখন কলেজের ছাত্র ছিলাম, তখন যে ক'জন পদার্থবিজ্ঞানী আমাদের কাছে আইডল ছিলেন, কালের নিয়মে তাঁরা অনেকেই প্রয়াত হয়েছেন। একে একে চলে গেছেন রিচার্ড ফেইনম্যান, আবদুস সালাম, হান্স বেথে, স্টিফেন হকিং, মারে গেলম্যান, এরকম আরো অনেকে। ২৩ জুলাই ২০২১ তারিখে সেই তালিকায় সর্বশেষ নাম যোগ হল স্টিভেন ভাইনবার্গের।

ভাইনবার্গ, সালাম ও শেলডন গ্ল্যাশো ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ভাইনবার্গ আমাদের কালের পদার্থবিজ্ঞানীদের মধ্যে একেবারে প্রথম সারিতে জায়গা করে নেবেন। শুনেছি একসময় কোনো গবেষণাপত্রে কৃতজ্ঞতা স্বীকার অংশে সেই বিষয়ে ভাইনবার্গের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বললেই তা ছিল অবিলম্বে প্রকাশের চাবিকাঠি। শেষে এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে ভাইনবার্গকে বলতে হয়েছিল যে সেই কথা লেখার আগে যেন তাঁর থেকে অনুমতি নেওয়া হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের ক্ষেত্রে তাঁর ‘দি ফার্স্ট থ্রি মিনিট্‌স’ বইটির তুলনা চলতে পারে শুধুমাত্র স্টিফেন হকিঙের 'এ ব্রিফ হিস্টরি অফ টাইম’-এর। সেই বই জীবনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ করে দিয়েছিল এমন বিজ্ঞানীর সংখ্যা কম নয়।

পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসকে আমরা এক অর্থে ইউনিফিকেশনের অর্থাৎ একীকরণের ইতিহাস বলতে পারি। নিউটন দেখিয়েছিলেন যে পৃথিবীর টানে কোনো বস্তুর পতন এবং গ্রহনক্ষত্রের চলাফেরা আসলে একই মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রকাশ। মাইকেল ফ্যারাডে ও সমসাময়িক আরো অনেকের গবেষণা থেকে প্রমাণ হয় যে তড়িৎ ও চুম্বক আসলে একই বল তড়িৎচৌম্বক বলের দুই রূপ। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখালেন আলোও এক প্রকার তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ অর্থাৎ আলোকবিজ্ঞান এবং তড়িৎচৌম্বক বিদ্যা আলাদা কিছু নয়। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দুই দশকে আইনস্টাইন তাঁর দুই আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন, তার মধ্যে দ্বিতীয়টি অর্থাৎ সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব হল মাধ্যাকর্ষণেরই উন্নততর রূপ। সেই সময় আমরা দুটি মৌলিক বলের কথা জানতাম, মাধ্যাকর্ষণ ও তড়িৎচৌম্বক বল। জীবনের শেষ চার দশক আইনস্টাইন এই দুটিকে একীকরণের চেষ্টা করে গিয়েছিলেন।

শুরু থেকেই ব্যার্থতাই ছিল আইনস্টাইনের সেই চেষ্টার ভবিতব্য। তার কারণ এই নয় যে সেই দুটি বলের একীকরণ সম্ভব নয়; তা সম্ভব কিনা আমরা আজও জানি না। কিন্তু আসলে মৌলিক বলের সংখ্যা দুই নয়। আমরা এখন আরো দুটি মৌলিক বলের কথা জনেছি, স্ট্রং ফোর্স বা পীন বল এবং উইক ফোর্স বা ক্ষীণ বল। নিউক্লিয়াসের মধ্যে প্রোটন নিউট্রনরা যে বলে বাধা থাকে, তা হল পীন বল। অন্যদিকে বিটা তেজস্ক্রিয়া বা কোনো কোনো মৌলিক কণার ক্ষয়ের জন্য দায়ী হল ক্ষীণ বল। গত ছয় দশকে এই দুটি এবং তড়িৎচৌম্বক বলকে একীকরণের কাজে কিছু দূর এগোনো গেছে।

১৮৭৯ সালে ম্যাক্সওয়েল প্রয়াত হয়েছিলেন, তার ঠিক একশ বছর পরে বিংশ শতাব্দীর প্রথম সার্থক একীকরণের স্বীকৃতি হিসাবে ভাইনবার্গদের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। ভাইনবার্গের বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এই লেখার পরিসরে সম্ভব নয়। সংক্ষেপে বলা যায় যে তাঁর এবং গ্ল্যাশো ও সালামের গবেষণা থেকে বোঝা যায় যে ক্ষীণ বল ও তড়িৎচৌম্বক বল হল একই বলের প্রকাশ। এই অনুমান করাটাও মোটেই সহজ ছিল না, কারণ নামেই প্রকাশ ক্ষীণ বল হল অত্যন্ত ক্ষীণ, তড়িৎচৌম্বক বলের থেকে তা কোটি কোটি গুণ দুর্বল। বিশেষ করে ভাইনবার্গ দেখিয়েছিলেন যে ব্রোকেন সিমেট্রি বা ভগ্ন প্রতিসাম্য এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

প্রতিসাম্য আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, যদিও তা বুঝতে আমাদের সময় লেগেছে। নিউটনের বলবিদ্যার সূত্র গ্যালিলিও বর্ণিত প্রতিসাম্য মেনে চলে। ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ কিন্তু নিউটনের সূত্রের সঙ্গে মেলে না। সেই সমীকরণ যে প্রতিসাম্য মেনে চলে তা হল লরেঞ্জ প্রতিসাম্য, বিজ্ঞানী হেনড্রিক লরেঞ্জের নামানুসারে তার নাম। বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদে আইনস্টাইন দেখান যে নিউটনের বলবিদ্যার সূত্রগুলি সম্পূর্ণ সঠিক নয়, কারণ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে খাপ খায় প্রকৃতপক্ষে লরেঞ্জের প্রতিসাম্য। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে এমি নোয়েথার প্রতিসাম্য সম্পর্কে এক গুরুত্বপূর্ণ উপপাদ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটা খুব সাধারণ উদাহরণ নেয়া যাক। বিজ্ঞানের সূত্র পরীক্ষাটা কোথায় করা হচ্ছে তার উপর নির্ভর করে না, একে বলে সরণের প্রতিসাম্য। নোয়েথারের উপপাদ্য প্রয়োগ করে দেখানো যায় যে কোনো সিস্টেম বা তন্ত্রে এই প্রতিসাম্য থাকলে তার ভরবেগের মোট পরিমাণ ধ্রুবক। তার পর থেকেই বিজ্ঞানীরা প্রতিসাম্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলেন। কণা পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে প্রতিসাম্যের গুরুত্ব বিরাট। ভাইনবার্গ কিন্তু একটু অন্য পথ নিয়েছিলেন। তিনি দেখালেন যে তড়িৎচৌম্বক বল ও ক্ষীণ বল আসলে একই বল, কিন্তু তাদের মধ্যে এক প্রতিসাম্য ভগ্ন হওয়ার ফলে তারা পৃথক বল হিসাবে আমাদের কাছে প্রকাশিত হয়। ভাইনবার্গদের তত্ত্ব থেকে তিনটি নতুন বোসন কণার কথা আসে। ১৯৮৩ সালে সার্নের কণাত্বরকের সাহায্যে সেগুলিকে খুঁজে পাওয়া যায়, সেজন্য তার পরের বছর কার্লো রুবিয়া এবং সাইমন ভ্যান ডার মির পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

ভাইনবার্গ সারা জীবনে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন, তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। তাঁর জন্ম ১৯৩৩ সালের ৩ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। তাঁর বাবা ও মা ছিলেন ইহুদি, ইউরোপ থেকে আমেরিকাতে তাঁরা চলে এসেছিলেন। পড়াশোনা নিউইয়র্কের ব্রন্‌ক্স হাই স্কুল ফর সায়েন্সে, সেখানে তাঁর এক ক্লাসের বন্ধু ছিলেন শেলডন গ্ল্যাশো। তাঁরা স্কুলের কল্পবিজ্ঞান ক্লাবের সদস্য ছিলেন, আবার স্কুল ছাড়ার তিন দশক পরে নোবেল পুরস্কার নিতেও একসঙ্গেই গিয়েছিলেন। কোনো হাই স্কুলের ক্ষেত্রে একই ক্লাসে দুই নোবেলজয়ীর উদাহরণ আর নেই, যদিও গ্ল্যাশোর স্মৃতিচারণে সেখানকার বিজ্ঞান শিক্ষা সম্পর্কে খুব একটা প্রশংসা শোনা যায় না। এরপর ভাইনবার্গ কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। একবছর ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে কাটানোর পর তিনি আবার দেশে ফিরে যান। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যাম ট্রিম্যানের সঙ্গে গবেষণা করে তিনি ডক্টরেট করেছিলেন।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলেতে কিছুদিন গবেষণা করার পর তিনি বার্কলেতে চাকরি পেয়েছিলেন। এরপর হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি, সংক্ষেপে এমআইটি। ১৯৮২ সালে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে যোগ দেন, বাকি জীবন তিনি এখানেই কাটিয়েছিলেন।

সাধারণত খুব কম সংখ্যক শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীই তাঁদের গবেষণা সাধারণ মানুষের জন্য লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ভাইনবার্গ সেখানে পৃথক। তাঁর ‘দি ফার্স্ট থ্রি মিনিট্‌স’ এর কথা আগে বলেছি, এই বইতে তিনি বিগ ব্যাং-ও তার পরে মৌলিক পদার্থের সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। ‘ড্রিমস অফ এ ফাইনাল থিওরি’-তে স্ট্রিং থিওরি নিয়ে আলোচনা খুঁজে পাওয়া যাবে; স্ট্রিং থিওরি চারটি মৌলিক বলকে একীকরণের চেষ্টা করে চলেছে।

শুধু আধুনিক বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়েও ভাইনবার্গ আগ্রহী; সেই বিষয়ে তাঁর বিখ্যাত বই ‘টু আন্ডারস্ট্যান্ড দি ওয়ার্ল্ড’। কখনো কৌতুক, কখনও বিদ্রুপ মেশানো ভাইনবার্গের লেখার ভঙ্গিটি ভারী চমৎকার। এই বই অবশ্য ঐতিহাসিকদের খুব একটা পছন্দ হয় নি। সোজা কথা বলতে অভ্যস্ত ভাইনবার্গ এই বইতে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। প্লেটো তাঁর কাছে silly, অ্যারিস্টটল tedious; আধুনিক বিজ্ঞানের বিপ্লবের সঙ্গে যে দুই দার্শনিকদের নাম প্রথমেই আসে,সেই ফ্রান্সিস বেকন ও রেনে দেকার্তে তাঁর কাছে most overrated। প্রাচীন অন্ধকার যুগ থেকে আধুনিক আলোকময় যুগের দিকে প্রগতির সরলরৈখিক ইতিহাসকে বলা হয় হুইগ (Whig), কথাটা এক্ষেত্রে খুব সম্মানের নয়। আধুনিক ঐতিহাসিকরা কোনো যুগের ইতিহাসকে দেখতে চান সেই যুগের নিরিখে, আজকের বিচারে নয়। স্বাভাবিক ভাবেই হুইগ ইতিহাস তাঁদের পছন্দ নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসের ক্ষেত্রে নিজেকে হুইগপন্থী ঘোষণা করতে ভাইনবার্গের কিন্তু কোনো দ্বিধা নেই। তার কারণ তিনি বিশ্বস করেন যে বিজ্ঞানে একটা value judgement বা মূল্য বিচার সম্ভব। সেই তত্ত্বই বেশি সঠিক যা প্রকৃতির বর্ণনা বা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে বেশি সফল।

ভাইনবার্গ ছিলেন নাস্তিক, আরো সঠিকভাবে বললে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের তীব্র বিরোধী। তাঁর এক বিখ্যাত উক্তি, 'ধর্ম ছাড়াই ভালো মানুষরা ভালো এবং খারাপ মানুষরা খারাপ কাজ করে। কিন্তু ভালো মানুষদের দিয়ে খারাপ কাজ করাতে ধর্মকে প্রয়োজন।” তিনি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতেন যে অবিজ্ঞান এবং ধর্মের বিজ্ঞান বিরোধিতা প্রতিহত করতে বিজ্ঞানীদের আরো সক্রিয় হতে হবে। ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার জন্য আয়োজিত এক সম্মেলনে মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছিলেন এই দুয়ের মধ্যে আলোচনা হোক, কিন্তু গঠনমূলক আলোচনা সম্ভব নয়। তাঁর প্রয়াণে পদার্থবিজ্ঞানের এক যুগের অবসান ঘটল।


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

 

প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, আগস্ট ২০২১ 

গুরুচণ্ডা৯-তে প্রকাশিত এই লেখাটাতে ভাইনবার্গের একটি বই "To Explain the World" নিয়ে আলোচনা করেছিলাম।