Monday, 3 August 2026

জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সম্পাদকীয় জুলাই ২০২৬

 

প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল আইজ্যাক নিউটনের মহাগ্রন্থ প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা। ১৬৮৭ সালের জুলাই মাসের ৫ তারিখ এডমন্ড হ্যালি চিঠিতে নিউটনকে জানান যে বইটি ছাপা সম্পূর্ণ হয়েছে। রয়্যাল সোসাইটির অর্থাভাবের জন্য হ্যালি নিজের দায়িত্বে ও খরচে বইটি ছাপিয়েছিলেন। বইয়ের ভূমিকাতে নিউটন নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে লিখেছিলেন, ‘আমি এই প্রয়াসকে প্রকৃতির দর্শনের গাণিতিক নীতি হিসাবে উপস্থাপিত করছি, কারণ গতি সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাকৃতিক বল বিষয়ে অনুসন্ধান, সেই বল থেকে অন্যান্য ঘটনার ব্যাখ্যা -- এই হল এই দর্শনের উদ্দেশ্য। আমরা যান্ত্রিক বলবিদ্যার সূত্র থেকে সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হব, এই আমার ইচ্ছা।’ যান্ত্রিক বিশ্বদর্শনের (Mechanical philosophy) এই তূর্যধ্বনি থেকেই জন্ম নিল নিয়তিবাদ (Determinism)। সে ঘোষণা করল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বর্তমান সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান থেকে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব -- সমস্ত ঘটনাই পূর্বনির্দিষ্ট। পদার্থবিদ্যার পরের দু'শো বছরের ইতিহাস শুধু যান্ত্রিক বলবিদ্যার জয়যাত্রার ইতিহাস। সে সৃষ্টি করেছিল চিরায়ত পদার্থবিদ্যার এক সৌধ যার ভিত্তির দৃঢ়তা নিয়ে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না।

আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে আর এক জুলাই মাসে সেই সৌধের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন মাক্স বর্ন। তিনি দেখিয়েছিলেন উপর থেকে দেখলে সৌধে কোনো ত্রুটি চোখে পড়বে না, কিন্তু তার ভিত্তি গড়েছিল যে নিউটনিয় নিয়তিবাদ তা প্রকৃতপক্ষে অলীক; আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মূলগতভাবে সম্ভাবনাময়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তিলগ্ন থেকেই সেই সৌধে ফাটল দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু মনে হয়েছিল যে মেরামত করে হয়তো তাকে আবার আগের মতো করা যাবে। ১৯২৬ সালের ২১ জুলাই মাক্স বর্ন এক প্রবন্ধ লিখে দেখালেন তা হওয়ার নয়।

বিজ্ঞানীরা অনুমান করছিলেন অণুপরমাণুর জগৎ নিউটনের বলবিদ্যা নয়, নব আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু সমস্যা ছিল যে সেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দুটি রূপ, ভার্নার হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স ও এরভিন শ্রয়ডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ, তাদের মনে করা হচ্ছিল পরস্পরবিরোধী। হাইজেনবার্গ নিউটনের নিয়তিবাদকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছিলেন, শ্রয়ডিঙ্গার সেখানেই আবার ফিরে যেতে চাইছিলেন। বর্ন দুই তত্ত্বের মাঝে এক সেতু গড়লেন; দেখালেন প্রকৃতিতে কার্যকারণ সম্পর্ক নিয়তিবাদের শৃঙ্খলে বাঁধা নয়, এক কারণ থেকে একাধিক কার্য সম্ভব, এবং নানা কার্যের সম্ভাবনা নির্ণয় করতে পারলেও ঠিক কোনটিই হবে তা আগে থেকে বলা আমাদের সাধ্যাতীত।

পদার্থবিজ্ঞানে সম্ভাবনার এই প্রবেশ অনেকেরই পছন্দ হয়নি, তাঁদের মধ্যে পড়বেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তাদের মধ্যে তিনজন -- মাক্স প্লাঙ্ক, আলবার্ট আইনস্টাইন, এবং লুই দ্য ব্রগলি। কিন্তু প্রকৃতি বিজ্ঞানীর মতামতের উপর নির্ভর করে না, যে কথা আইনস্টাইনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের অপর এক মূল স্থপতি, নীলস্‌ বোর।

একশো বছর পরেও বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার চরিত্র নিয়ে তর্ক করে চলেছেন। সেই তর্কে যোগ দিয়েছেন দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিকরা; কারণ কোয়ান্টাম সাধারণ কোনো তত্ত্ব নয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক কাঠামো সম্পর্কেই আমাদের ধ্যানধারণাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সেই তর্কের মীমাংসা এখনো আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে, কিন্তু তার জন্য কোয়ান্টাম বলবিদ্যা থেমে থাকেনি। আধুনিক প্রযুক্তির অধিকাংশই কোয়ান্টাম নির্ভর, সেই হিসাবে গত শতাব্দী এক অর্থে কোয়ান্টামের শতাব্দী।


                                            গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 

No comments:

Post a Comment