Showing posts with label নারী মহিয়সী. Show all posts
Showing posts with label নারী মহিয়সী. Show all posts

Sunday, 13 October 2024

কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা ও রসায়নবিদ এলিস বল

 

কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা ও রসায়নবিদ এলিস বল

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়




আজ তোমাদের এমন একজনের গল্প শোনাব, যিনি মারা গিয়েছিলেন মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে। তার অল্পদিন আগে তিনি কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসাতে এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যুর পরে অন্যরা তাঁর কাজকে নিজেদের বলে প্রকাশ করেন। কিন্তু সত্য চিরকাল চাপা থাকে না, তাই মৃত্যুর আশি বছরের বেশি পরে হলেও শেষ পর্যন্ত সঠিক মানুষই স্বীকৃতি পেয়েছেন।

যাঁর গল্প বলছি, তাঁর নাম এলিস অগুস্টা বল। এলিস ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ, তাঁর বাবা জেমস প্রেসলি বল ছিলেন উকিল, সম্পাদক এবং আলোকচিত্রগ্রাহক বা ফটোগ্রাফার। মা লরাও আলোকচিত্রীর কাজ করতেন। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে এলিস ছিলেন তৃতীয়, বড় দুই দাদার নাম উইলিয়াম ও রবার্ট, ছোট বোন অ্যাডি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন প্রদেশের সব থেকে বড় শহর সিয়াটলে ১৮৯২ সালের ২৪ জুলাই এলিসের জন্ম হয়েছিল।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১২ সালে ফার্মাসিউটিকাল কেমিস্ট্রি বা ভেষজ রসায়ন নিয়ে স্নাতক হলেন এলিস। তার দু' বছর পরে হলেন ফার্মাসি বা ভেষজবিদ্যাতে স্নাতক। এই সময় জার্নাল অফ দি আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটিতে তিনি ও তাঁর শিক্ষক দশ পাতার এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেই সময় কোনো মহিলার পক্ষে গবেষণাপত্র ছাপানোই ছিল বিরল ঘটনা, এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার জন্য তা ছিল আরো অসাধারণ।

স্নাতক হওয়ার পরে মাস্টার্স করবেন ঠিক করলেন এলিস। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই তাঁকে ছাত্রী হিসাবে পেতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের হনলুলুতে কলেজ অফ হাওয়াই-এ ভর্তি হলেন। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ হল প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রদেশ। ছোটবেলাতে তাঁর পরিবার এক বছর হাওয়াইতে কাটিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি থেকেই তিনি সেই কলেজকে বেছে নিয়েছিলেন। সেই কলেজ এখন হয়েছে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে মাস্টার্স করার সময় কাভা নামের একটি ভেষজ উদ্ভিদের শিকড়ে কী কী রাসায়নিক দ্রব্য থাকে তা গবেষণা করে আবিষ্কার করেন। কাভা মাথা যন্ত্রণা, উৎকণ্ঠা, বৃক্কের রোগ ইত্যাদির চিকিৎসাতে ব্যবহার হয়। এলিস হলেন হাওয়াই কলেজের প্রথম নারী ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মাস্টার্স। এর পরে তিনি সেখানেই পড়ানো শুরু করেন, এক্ষেত্রেও কৃষ্ণাঙ্গ ও নারী দুই ক্ষেত্রেই তিনি প্রথম।

কাভা বিষয়ে তাঁর চুয়াল্লিশ পাতার থিসিসটি হাওয়াই কুষ্ঠ চিকিৎসাকেন্দ্রের ডাক্তার হ্যারি হলমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি এলিসের কাছে এক বিশেষ সমস্যার সমাধানের জন্য এলেন। সে কথায় যাওয়ার আগে সেই সময় কুষ্ঠ রোগীদের অবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। কুষ্ঠ রোগের বিশেষ কোনো চিকিৎসা ছিল না। ভীষণ সংক্রামক হওয়াতে সুপ্রাচীন কাল থেকেই কুষ্ঠ রোগীকে জনবসতি থেকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হত। তোমরা যদি বেন হুর সিনেমাটা দেখ তাহলে যীশু খ্রিস্টের সময় কুষ্ঠরোগীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হত জানতে পারবে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে আগে এই রোগ ছিল না, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমে সেই রোগ সেখানে যায়। ১৮৬৬ সাল থেকে হাওয়াইয়ের আদি অধিবাসীদের কুষ্ঠ হলে তাদের জোর করে এক দুর্গম উপদ্বীপ কালাউপাপাতে পাঠিয়ে দেওয়া হত, সেখানে শুধু কুষ্ঠরোগীরাই থাকত, কোনো কোনো সময় রোগীর আত্মীয়রাও তাদের সঙ্গে যেত। নৌকা ছাড়া কালাউপাপাতে যাওয়ার বিশেষ উপায় ছিল না, মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই থাকতে হত। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক জ্যাক লন্ডন কালাউপাপা সম্পর্কে বলেছিলেন নরকের গহ্বর, পৃথিবীর সব থেকে অভিশপ্ত স্থান। ১৮৯০ সালে প্রায় ১১০০ মানুষ সেই উপদ্বীপে থাকতেন। শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে অবশ্য অন্য ব্যবস্থা, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারত।

সেই যুগে কুষ্ঠ রোগের প্রধান ওষুধ ছিল চালমুগরার তেল। চিন বা ভারতে দীর্ঘদিন ধরে এই তেল চামড়ার রোগের চিকিৎসাতে ব্যবহার হত। ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক ফ্রেডরিক মোয়াট কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসার জন্য চালমুগরার কথা প্রথম পশ্চিমী ডাক্তারদের সামনে আনেন। মোয়াট তিরিশ বছর ভারতে ছিলেন, তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পড়িয়েছিলেন। ১৮৫৩ সালে তিনি কলকাতাতে এক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঠান, যদিও সরকার সেই মুহূর্তে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

চালমুগরার তেল ব্যবহার করা ছিল প্রচণ্ড কঠিন। তা এতই বিস্বাদ ছিল যে খেলে বমি হয়ে যেত। প্রচণ্ড আঠালো বলে তা বাইরে থেকে লাগানো যেত না কারণ চামড়া তা শোষণ করে না। চালমুগরার তেল জলে দ্রাব্য নয়, ফলে ইঞ্জেকশন আকারে দিলে তা চামড়ার নিচে ফোস্কার মতো হয়ে থেকে যেত, ছড়িয়ে পড়ত না। হলমান এলিসকে এই সমস্যার সমাধানের অনুরোধ করেন।

এলিস দেখেন যে চালমুগরার তেলে আছে চালমুগরিক অ্যাসিড এবং হাইডনোকার্পিক অ্যাসিড। এবার তিনি তার থেকে জীবাণুনাশী ফ্যাটি অ্যাসিডগুলো আলাদা করে তাদের এস্টার তৈরি করেন। এস্টারগুলো জলে দ্রাব্য, ফলে ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরে তা রক্তস্রোতের মাধ্যমে শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দেখা গেল এস্টারে রূপান্তরের পরেও তাদের জীবাণুনাশী ক্ষমতার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু এই বিষয়টা প্রকাশের আগেই ১৯১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর এলিসের মৃত্যু হয়।অসুস্থতার জন্য কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে তিনি সিয়াটল ফিরে এসেছিলেন। কোন অসুখ তাঁর হয়েছিল তা নিয়ে সন্দেহ আছে। হাওয়াইয়ের এক খবরের কাগজে লেখা হয়েছিল যে গ্যাসমুখোশের কার্যকারিতা দেখানোর সময় তিনি দুর্ঘটনাবশত বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাসের কবলে পড়েন। সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল যেখানে অস্ত্র হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছিল, তাই গ্যাসমুখোশ কেমনভাবে ব্যবহার করা হয় সরকার থেকে সাধারণ মানুষকে তা শেখানো হচ্ছিল। হাওয়াই কলেজ অবশ্য দুর্ঘটনার কথা অস্বীকার করে। তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসাবে যক্ষার কথা বলা হয়েছে।

এলিসকে চালমুগরার তেল বিষয়ে গবেষণাতে সাহায্য করছিলেন তাঁর কলেজের রসায়নের অধ্যাপক আর্থার ডিন। এলিসের মৃত্যুর পরে তিনি আর এক রসায়নের অধ্যাপক রিচার্ড রেনশ্যালের সঙ্গে চালমুগরার তেলকে ব্যবহার করার এই কায়দাকে ডিন পদ্ধতি নাম দিয়ে প্রকাশ করেন; সেখানে এলিস বলের কোনো উল্লেখই ছিল না। ডিন তার আগে বা পরে কখনোই ওষুধ নিয়ে কোনো কাজ করেননি।

এই নতুন পদ্ধতি খুবই ভালো কাজ করছিল। ১৯২০ সালে এক ডাক্তার রিপোর্ট করেন যে হাওয়াইতেই ৭৮ জন রোগীকে এই ভাবে ইঞ্জেকশন দিয়ে সুস্থ করা সম্ভব হয়েছে। ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে নতুন কোনো রুগীকে কালাউপাপাতে পাঠানো হয়নি। বস্তুত অ্যান্টিবায়োটিকের আগে পর্যন্ত এটি ছিল কুষ্ঠ রোগ চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতি, অবশ্য সব সময় তাতে সাফল্য আসত না। কুষ্ঠ হয় যে জীবাণুর জন্য তার নাম মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি; সালফোন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পরে তার বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব হয়। আর্থার ডিন পরে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম রাখা হয়।

এলিস নিজের কথা বলার জন্য পৃথিবীতে ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন হলমান। তিনি ১৯২২ সালে এক গবেষণাপত্রে সরাসরি বল পদ্ধতির কথা বলেন, এবং লেখেন ডিন পদ্ধতির সঙ্গে বল পদ্ধতির মূলগত কোনো তফাত নেই। তা সত্ত্বেও এলিস বলের কথা প্রায় সবাই ভুলে গিয়েছিল। এলিসের মৃত্যুর অনেক দশক পরে স্ট্যানলি আলি ও হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যাথরিন টাকারা প্রায় কুড়ি বছর পরিশ্রম করে পুরানো কাগজপত্র খুঁজে প্রমাণ করেন যে এলিস বলই চালমুগরার তেলকে ব্যবহারের উপযোগী করেছিলেন।

২০০০ সালে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র চালমুগরা গাছের সামনে এলিসের স্মৃতিতে একটি ফলক বসিয়েছেন। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে ২৯ ফেব্রুয়ারিকে এলিস বল দিন হিসাবে পালন করা শুরু হয়, ২০২২ থেকে সেটি পালটে ২৮ ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে। লন্ডন স্কুল অফ ট্রপিকাল মেডিসিন এন্ড হাইজিনের মূল ভবনের দেওয়ালে তাঁর নাম খোদাই করে রাখা হয়েছে। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দাবি তুলেছে ডিন হলের নাম পরিবর্তন করে এলিস বল হল রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা একমত যে এলিস বল সেই যুগে যা করেছেন, অসাধারণ প্রতিভা না থাকলে তা সম্ভব নয়। কোনো সন্দেহ নেই যে সে যুগে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর পক্ষে এই সাফল্য অর্জন ছিল আরো কঠিন কাজ। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে প্রয়াত হলেও তাঁর গবেষণা হাজার হাজার মানুষকে নরকযন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করেছে। 

প্রকাশ: সায়ন্তনী ২০২৪ পুজো সংখ্যা

Saturday, 2 December 2023

জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আঠারো উনিশ শতকের কয়েকজন মহিলা জ্যোতির্বিজ্ঞানী


জ্যোতির্বিজ্ঞান ও আঠারো উনিশ শতকের কয়েকজন মহিলা জ্যোতির্বিজ্ঞানী

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


আধুনিক বিজ্ঞানের প্রথম যুগ নারীদের দূরে সরিয়ে রেখেছিল। সমাজের বাধা অতিক্রম করে বিজ্ঞানের অঙ্গনে প্রবেশ করতে তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম জ্যোতির্বিদ্যার থেকে, নানা বাধা পেরিয়ে সেই বিজ্ঞানেও কয়েকজন মহিলা অবদান রেখে গেছেন। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সব থেকে পুরানো সংগঠন হল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি অফ লন্ডন। ১৮২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সোসাইটি ১৮৩১ সালে নাম পরিবর্তন করে হয় রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি। কিন্তু ১৯১৫ সালের আগে মহিলারা এই সোসাইটির সদস্য হতে পারতেন না। তবে সাম্মানিক সদস্য হওয়ার সুযোগ ছিল, কয়েকজন নারী সেই সম্মান পেয়েছিলেন। এই লেখাতে আমরা তাঁদের মধ্যে চারজনের কথা সংক্ষেপে শুনব।

১৮৩৫ সালে প্রথম দুই মহিলাকে সোসাইটির সাম্মানিক সদস্য করা হয়, তাঁরা হলেন ক্যারোলাইন লুক্রেশিয়া হার্শেল ও মেরি সমারভিল। ক্যারোলাইন হার্শেলের তাঁর জন্ম ১৭৫০ সালে জার্মানির হ্যানোভারে। তাঁর দাদা বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হার্শেল। ইউরেনাস গ্রহের আবিষ্কার, তারাদের সাপেক্ষে সূর্যের প্রকৃত গতি, আমাদের ছায়াপথের প্রথম মডেল, শ্বেত বামন নক্ষত্র, যুগ্ম নক্ষত্র — উইলিয়ামের আবিষ্কারের তালিকা শেষ হবে না। সেই সময় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ উইলিয়াম হার্শেলের অনেক আবিষ্কারের সময় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন ক্যারোলাইন। 

ক্যারোলাইন হার্শেল

 

উইলিয়ামের প্রথম জীবন বেশ কষ্টে কেটেছিল। তিনি জার্মানি থেকে ইংল্যান্ডে চলে আসেন। জ্যোতির্বিদ্যা ছিল তাঁর শখ। তাঁকে বাড়ির কাজে সাহায্যের জন্য ক্যারোলাইন ইংল্যান্ডে আসেন। ক্যারোলাইন বাড়িতে পড়াশোনার বিশেষ সুযোগ পাননি। দশ বছর বয়সে টাইফাস রোগের জন্য তাঁর বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তাঁর উচ্চতা ছিল মাত্র চার ফুট তিন ইঞ্চি। হার্শেল তাঁকে নিজের কাজের সহকারী করে নিয়েছিলেন; সে যুগের সেরা দূরবিনগুলি তাঁর হাতেই তৈরি। ক্যারোলাইন তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। ইউরেনাস আবিষ্কারের পর উইলিয়ামের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, রাজার অনুগ্রহে একজন সহকারী রাখার অর্থও মঞ্জুর হয়।

তখনো ফটোগ্রাফি আবিষ্কার হয়নি, ক্যারোলাইন উইলিয়ামের পর্যবেক্ষণ লিখে রাখতেন। সেই সমস্ত পর্যবেক্ষণ সুশৃঙ্খলভাবে প্রকাশের উপযোগী করতেন। নিজে পর্যবেক্ষণ করতেন, এবং অঙ্ক কষে জ্যোতিষ্কের অবস্থান ও কক্ষপথও নির্ণয় করতেন। তাই দাদা বোনকেই সহকারী বেছে নেন। ক্যারোলাইন হলেন প্রথম পেশাদার মহিলা জ্যোতির্বিদ, এবং ইংল্যান্ডের ইতিহাসে প্রথম বেতনভুক মহিলা সরকারী কর্মচারী। উইলিয়ামের জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণের রেকর্ড প্রকাশের উপযোগী করেন ক্যারোলাইন। ১৭৯৮ সালে রয়্যাল সোসাইটির গবেষণাপত্রিকা ফিলোজফিক্যাল ম্যাগাজিনে সেই তালিকাতে তাঁর নামও লেখক হিসাবে আছে। তিনিই প্রথম মহিলা যাঁর গবেষণা ফিলোজফিক্যাল ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। তিনি রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির প্রথম মহিলা স্বর্ণপদক বিজয়ী এবং তার প্রথম দুজন সাম্মানিক মহিলা সদস্যের একজন। উইলিয়ামের ছেলে জন তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা জ্যোতির্বিদ ছিলেন, ক্যারোলাইন ও জন চিঠিপত্রে জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে আলোচনা করতেন।

উইলিয়ামকে যখন সাহায্য করতে হত না, ক্যারোলাইন নিজে তখন একটি ছোট দূরবিন দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন। ধূমকেতু খোঁজার জন্য সেটি উইলিয়াম ক্যারোলাইনের জন্যই বানিয়েছিলেন। ১৭৮৩ সালে তিনি তিনটি নীহারিকা খুঁজে পেয়েছিলেন। ১৭৮৬ থেকে ১৭৯৭ সালের মধ্যে আটটি ধূমকেতু ক্যারোলাইন আবিষ্কার করেছিলেন। প্রথম আবিষ্কারের দিনটা ছিল ১ আগস্ট, ১৭৮৬। সেটি নিঃসন্দেহে পুরোপুরি ক্যারোলাইনের একার কৃতিত্ব, দাদা সেই সময় সেখানে ছিলেন না।

হার্শেলদের আকাশ পর্যবেক্ষণ নিরুপদ্রব ছিল না। উত্তর ইউরোপের শীতে সারা রাত বাইরে কাটানোর মূল্য হিসবে নিউমোনিয়া ছিল খুব স্বাভাবিক ঘটনা। অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের আগে নিউমোনিয়া ছিল প্রাণঘাতী রোগ। একবার অন্ধকারে বরফে ঢাকা মাঠের উপর দিয়ে দৌড়োতে গিয়ে এক লোহার গজাল ক্যারোলাইনের পায়ে ঢুকে গিয়েছিল। অনেক দিন তাঁকে বিছানাতে কাটাতে হয়েছিল। কিন্তু নিজের আঘাত নয়, ক্যারোলাইন চিন্তিত ছিলেন তাঁর দুর্ঘটনার ফলে উইলিয়ামের আকাশ পর্যবেক্ষণে কতটা অসুবিধা হবে তাই নিয়ে। তিনি সবসময়েই বিশ্বাস করতেন যে উইলিয়ামই আসল, তাঁর নিজের কাজটা এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়।

উইলিয়ামের মৃত্যুর পরে ক্যারোলাইন জার্মানি ফিরে যান। সেখানে তিনি উইলিয়ামের রেকর্ড থেকে আড়াই হাজার নীহারিকার এক তালিকা বানিয়েছিলেন। তাঁর তৈরি করা জ্যোতিষ্কের তালিকাগুলি এখনো আকাশ পর্যবেক্ষণে ব্যবহার হয়। বিশেষ করে জার্মানিতে প্রকাশিত তালিকাটির উপর ভিত্তি করে পরের নিউ গ্যালাকটিক ক্যাটালগ (NGC) তৈরি হয়েছিল। এখনো আকাশে অনেক আলোকউৎসকে NGC সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। তাঁর ছিয়ানব্বই বছর বয়সে প্রুশিয়ার সম্রাট তাঁকে এক স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন। তাঁর আবিষ্কৃত ধূমকেতুগুলি ছাড়াও একটি গ্রহাণু, চাঁদের বুকে একটি গহ্বর, দুটি নক্ষত্রমণ্ডল ও একটি কৃত্রিম উপগ্রহের নাম তাঁর নামে দেওয়া হয়েছে।

মেরি সমারভিল ছিলেন রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির প্রথম দুই সাম্মানিক নারী সদস্যের অপরজন। তাঁর জন্ম ১৭৮০ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্কটল্যান্ডে। তাঁর বাবা উইলিয়াম ফেয়ারফ্যাক্স ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর ভাইস অ্যাডমিরাল। ক্যারোলিনের সঙ্গে মেরির একটা পার্থক্য ছিল, তিনি একাই গবেষণা করেছিলেন। তিনি ছিলেন স্বশিক্ষিত, বই পড়ে তিনি বীজগণিত, জ্যামিতি, ক্যালকুলাস, গতিবিদ্যা ইত্যাদি শিখেছিলেন। নিউটনের বিখ্যাত বই 'প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা' তিনি পড়েছিলেন। ক্যালকুলাসের কিছু সমস্যার সমাধান করে তিনি ছদ্মনামে প্রকাশ করেছিলেন। পিয়ের-সিমোঁ লাপ্লাসের লেখা গ্রহনক্ষত্রদের গতিবিধি ও মাধ্যাকর্ষণ সংক্রান্ত বিখ্যাত বইটি তিনি ফরাসি থেকে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছিলেন, বহুদিন সেটি ইংল্যান্ডে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ব্যবহার হত। 

মেরি সমারভিল

 

মেরির প্রথমবার বিয়ে হয় ১৮০৪ সালে তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয় স্যামসন গ্রেগের সঙ্গে। তাঁরা লন্ডনে থাকতেন। কিন্তু তাঁর স্বামী মেয়েদের বিদ্যাচর্চার প্রয়োজন আছে মনে করতেন না। ১৮০৭ সালে স্যামসনের মৃত্যু হলে মেরি স্কটল্যান্ডে ফিরে যান। ১৮১২ সালে তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ হয় অপর এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় ডাক্তার উইলিয়াম সমারভিলের সঙ্গে। ইউলিয়াম মেরিকে পড়াশোনা ও গবেষণা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। সূর্যালোকের বেগুলি রশ্মির চৌম্বক ধর্ম বিষয়ে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ ১৮২৬ সালে ফিলোজফিকাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিই এই পত্রিকাতে প্রকাশিত কোনো মহিলার একক লেখা প্রথম প্রবন্ধ। ইউরেনাসের তার গতিবিধি ব্যাখ্যা করার জন্য আরো দূরের একটি গ্রহের কথা যাঁরা প্রথম বলেছিলেন, মেরি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।

জ্যোতির্বিদ্যা ছাড়াও অনেক বিষয়ে তাঁর উৎসাহ ছিল। বেশ কয়েকটি বই লিখেছিলেন মেরি সমারভিল। ১৮৩১ সালে তাঁর লেখা প্রথম বই দি মেকানিজম অফ দি হেভেন্‌স' প্রকাশিত হয়। তিন বছর পরে প্রকাশিত হয় অন দি কানেকশন অফ দি ফিজিক্যাল সায়েন্সেস। বইটির পনের হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল; জার্মান ও ইতালিয়ান ভাষাতে অনূদিত হয়েছিল। ডারউইনের অরিজিন অফ স্পিসিস প্রকাশের আগে বিজ্ঞান বিষয়ক কোনো ইংরাজি বই এত সংখ্যায় বিক্রির নজির নেই। ১৮৪৮ সালে প্রকাশিত হয় 'ফিজিক্যাল জিওগ্রাফি’, ইংরাজি ভাষায় এই বিষয়ের প্রথম বই। ১৮৬৯ সালে ঊননব্বই বছর বয়সে প্রকাশিত হয় 'মলিকিউলার এন্ড মাইক্রোস্কোপিক সায়েন্স’, বইটি লিখতে তিনি সময় নিয়েছিলেন দশ বছর। ১৮৭২ সালের ২৯ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তার পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী 'পার্সোনাল রিকালেকশনস'। সে যুগের অনেক বৈজ্ঞানিকের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল ও নিয়মিত চিঠি বিনিময় হত। তাঁর নামে একটি গ্রহাণু, চাঁদের বুকে একটি গহ্বর ও একটি কৃত্রিম উপগ্রহের নাম রাখা হয়েছে। ২০১৭ সালে জনগণের ভোটে ব্যাঙ্ক অফ স্কটল্যান্ডের নতুন দশ পাউন্ডের নোটে তাঁর ছবি ছাপার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

১৯০৩ সালে সোসাইটি মার্গারেট লিন্ডসে হাগিন্স ও অ্যাগনেস মেরি ক্লার্ককে সাম্মানিক সদস্যপদ দেয়। মার্গারেট লিন্ডসে হাগিন্সের জন্ম ১৮৪৮ সালে আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে। তাঁর বাবা জন মারে ছিলেন উকিল। মার্গারেটের মা হেলেন লিন্ডসে মারা যাওয়ার জন আবার বিয়ে করেন। সেই সময় থেকে জনের বাবা রবার্ট ছিলেন মার্গারেটের সঙ্গী। রবার্ট ছিলেন শৌখিন জ্যোতির্বিদ, তিনি মার্গারেটের মনে এই বিষয়ে আগ্রহ জাগিয়েছিলেন। মার্গারেট জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে নানা বইপত্র পড়ে নিজে নিজে শিখতেন। ১৮৭৩ সালে একটি প্রবন্ধে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হাগিন্সের তৈরি একটি বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের কথা পড়ে নিজেই একটি বর্ণালীবীক্ষণ তৈরি করেন। এক যন্ত্রনির্মাতার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে উইলিয়াম হাগিন্সের আলাপ হয়, ১৮৭৫ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। দুজনে একসঙ্গে কাজ শুরু করেন। 

মার্গারেট লিন্ডসে হাগিন্স

 

উইলিয়াম সবসময়েই তাঁদের গবেষণাকে দুজনের যৌথ কাজ বলতেন। মার্গারেটের দায়িত্ব ছিল দূরবিনের মাধ্যমে নক্ষত্রটিকে দেখা, তারপর দুজনে মিলে তার বর্ণালীর ফটোগ্রাফ তুলতেন। সেই সময় ফটোগ্রাফির অনেক উন্নতি হয়েছিলেন,। মার্গারেট ও উইলিয়াম প্রথম জ্যোতির্বিদ্যাতে সেই নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ করেন। তাঁরা অভিজিৎ নক্ষত্রের হাইড্রোজেনের বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। ১৮৮৯ সালে মার্গারেটের নাম প্রথম কোনো গবেষণাপত্রিকাতে লেখক হিসাবে প্রকাশিত হয়; সেটির বিষয় ছিল গ্রহের বর্ণালী পর্যবেক্ষণ। অন্য অনেক নক্ষত্র ও নীহারিকার বর্ণালী তাঁরা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। নীহারিকের বর্ণালীতে তাঁরা অনেক অচেনা চিহ্ন খুঁজে পান। প্রথমে ভাবা হয়েছিল এ কোনো অজানা মৌলের চিহ্ন, মার্গারেটের বন্ধু অ্যাগনেস মেরি ক্লার্ক সেই প্রস্তাবিত মৌলের নাম দেন নেবুলিয়াম। অনেক বছর পরে বোঝা যায় সেটি ছিল আয়নিত অক্সিজেনের বর্ণালী। ১৮৯২ সালে দেখতে পাওয়া নোভা পর্যবেক্ষকদের একদম প্রথম সারিতে ছিলেন হাগিন্স দম্পতি। তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে নোভার থেকে হাইড্রোজেন গ্যাস প্রচণ্ড গতিতে বাইরের দিকে বেরিয়ে যাচ্ছে। ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁদের যৌথ বই, 'ফটোগ্রাফিক আটলাস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ স্টেলার স্পেকট্রা'। এরপর থেকে তাঁরা পরীক্ষাগারে বর্ণালী পর্যবেক্ষণে মন দেন। তাঁরা সূর্যের বর্ণালীতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ নির্ণয়ের কাজ করেছিলেন। পরবর্তীকালে মেঘনাদ সাহার সমীকরণ তাঁদের পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা দেবে। মার্গারেট প্রাচীনযুগে জ্যোতির্বিদ্যাতে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন ও এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকাতে সেই বিষয়ে লিখেছিলেন। তিনি ও উইলিয়াম ১৯০৩ থেকে ১৯০৫ সাল পর্যন্ত তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়েও গবেষণা করেছিলেন। উইলিয়ামের মৃত্যু হয় ১৯১০ সালে। পাঁচ বছর পরে ১৯১৫ সালের ১৪ মার্চ মার্গারেট প্রয়াত হন।

অ্যাগনেস মেরি ক্লার্ক মুলত জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক বেশ কয়েকটি বই লেখার জন্য পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর বইগুলি সমকালে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল, পেশাদার বিজ্ঞানীদের তা সাহায্য করেছিল। অ্যাগনেসের জন্ম ১৮৪২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আয়ারল্যান্ডের কর্কে। তাঁর বাবা জন উইলিয়াম ক্লার্ক ছিলেন ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। জন ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজে পড়েছিলেন; অ্যাগনেসের মা ক্যাথরিনও ছিলেন উচ্চ শিক্ষিতা। তিন ছেলেমেয়েকে তাঁরা বাড়িতেই শিক্ষা দিয়েছিলেন। জনের একটি টেলিস্কোপ ছিল, অ্যাগনেস ছোটবেলা থেকেই সেটি ব্যবহার করতেন। মাত্র পনের বছর বয়সেই তিনি জ্যোতির্বিদ্যার এই ইতিহাস লেখা শুরু করেন।

অ্যাগনেসের স্বাস্থ্য ভালো ছিল না। দিদি এলেন ও তিনি সেই জন্য ১৮৬৭ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত ইতালির ফ্লোরেন্সেই বেশি সময় কাটান। ১৮৭৭ সাল থেকে তাঁদের পরিবার লন্ডনে বাস শুরু করেন। সেই বছরেই সুপরিচিত এডিনবার রিভিউ পত্রিকাতে অ্যাগনেসের দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, তার মধ্যে একটি ছিল কোপার্নিকাসের সময়ে ইতালির জ্যোতির্বিদ্যার ইতিহাস। প্রবন্ধগুলি উচ্চপ্রশংসিত হয়েছিল, এরপর থেকে তিনি প্রতিবছর দুটি করে প্রবন্ধ লেখার আমন্ত্রণ পান। শেষ পর্যন্ত মোট পঁয়ত্রিশটি প্রবন্ধ তিনি এডিনবার রিভিউতে লিখেছিলেন। 

অ্যাগনেস মেরি ক্লার্ক

 

সমকালীন জ্যোতির্বিদ্যার গবেষণার সম্পর্কে লেখার জন্য বিজ্ঞানী মহলে অ্যাগনেসের পরিচিতি হয়। ১৮৮০ সালে তিনি প্রকাশ করেন 'দি কেমিস্ট্রি অফ স্টারস'। সেই প্রবন্ধকে কেন্দ্র করেই জন্ম হয় তাঁর প্রথম বইয়ের, 'এ পপুলার হিস্ট্রি অফ অ্যাস্ট্রোনমি অফ দি নাইনটিন্‌থ সেঞ্চুরি'। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত এই বইটি পেশাদার জ্যোতির্বিদদের কাছেও অবশ্যপাঠ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এর আগে এই ধরনের সমস্ত বইতে কোপার্নিকাস থেকে নিউটনের কাল পর্যন্ত জ্যোতির্বিজ্ঞানের কথা লেখা হত। অ্যাগনেসের বইতে প্রথম আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যার বিবরণ পাওয়া গেল। সমস্ত প্রধান ইউরোপিয় ভাষা জানতেন অ্যাগনেস, তিনি সব সময় মূল প্রবন্ধ পড়ে তবেই তার সম্পর্কে লিখতেন। বইটির চারটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। এমন কি প্রকাশের তিরিশ বছর পরে সুদূর ভারতবর্ষে মেঘনাদ সাহার গবেষণার প্রেরণা ছিল এই বই।

বই প্রকাশের আগে অ্যাগনেসের সংগে কোনো পেশাদার জ্যোতির্বিদের সরাসরি পরিচয় ছিল না। এর পরেই তাঁর সঙ্গে মার্গারেট হাগিন্সের পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার মানমন্দির থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি তিন মাস সেখানে কাটান। সেখানে করা তাঁর পর্যবেক্ষণ মানমন্দিরে প্রকাশিত হয়। ১৮৯০ সালে তিনি তাঁর দ্বিতীয় বই দি সিস্টেম অফ দি স্টারস প্রকাশ করেন। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর তৃতীয় বই 'প্রবলেমস ইন অ্যাস্ট্রোফিজিক্স'। ১৯০৫ সালে প্রকশিত হয় 'মডার্ন কসমোজেনিস'। এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকার একাদশ সংস্করণে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস এবং তিরিশ জন জ্যোতির্বিদের জীবনী লেখেন। ব্রিটেনে ১৮৮২ সালে থেকে প্রকাশিত হতে শুরু করে ডিকশনারি অফ ন্যাশনাল বায়োগ্রাফি সংকলন। সেখানে অন্তত ১৬৫টি প্রবন্ধ লিখেছিলেন অ্যাগনেস। ১৯০৭ সালের ২০ জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যু পর্যন্ত লিখে গেছেন অ্যাগনেস। তাঁর মৃত্যুর পরে এডিনবার রিভিউতে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা শেষ প্রবন্ধ, সেটি ছিল আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ে গবেষণার বিবরণ। চাঁদের বুকে একটি গহ্বরের নাম তাঁর নামে দেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সাল থেকে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি তাঁর নামে একটি পদক চালু করেছে; জ্যোতির্বিদ্যা বা ভূপদার্থবিদ্যার ইতিহাস বিষয়ে গবেষণার জন্য এই পদক দেওয়া হয়।

১৯১৫ সালের আগে আরো তিনজন মহিলাকে সোসাইটির সাম্মানিক সদস্যপদ দেওয়া হয়েছিল। জ্যোতির্বিদ্যার জন্য অর্থ সাহায্য করার জন্য অ্যানে শিপশ্যাঙ্কসকে ১৮৬২ সালে সাম্মানিক সদস্যপদ দেওয়া হয়েছছিল। তিনি কেমব্রিজ মানমন্দিরকে দশ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন। সেই অর্থে কেনা দূরবিনের নাম তাঁর নামে রাখা হয়েছিল। চাঁদের বুকে একটি গহ্বরও তাঁর নাম বহন করে। মার্কিন যুক্তরাষ্টের হার্ভার্ড মানমন্দিরের দুই কর্মী উইলেমিনা ফ্লেমিং ও অ্যানি জাম্প ক্যাননকেও যথাক্রমে ১৯০৭ ও ১৯১৪ সালে সাম্মানিক সদস্য পদ দেওয়া হয়েছিল। জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে দুজনেরই বিপুল অবদান আছে, এই প্রবন্ধে স্বল্পপরিসরে তার পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। সামান্য সুযোগ পেয়েই এই নারীরা প্রতিবন্ধকতার পাহাড় জয় করতে পেরেছিলেন। সেই সমস্ত বাধা কিছুটা হলেও দূর হয়েছে সন্দেহ নেই, তার পিছনে আছে এঁদের মতো নারী বিজ্ঞানীদের অবদান। 

 

প্রকাশ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার, শারদীয় ২০২৩  






Tuesday, 9 November 2021

কিছু নতুন তথ্যের আলোতে বিভা চৌধুরি

 

কিছু নতুন তথ্যের আলোতে বিভা চৌধুরি

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার ফলে বিজ্ঞানী বিভা চৌধুরির নাম সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা পরিচিত হয়েছে। তাঁর স্মৃতিতে আকাশে একটি নক্ষত্রের নামকরণ হয়েছে। বিভা প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট করেছিলেন। ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করার পর তাঁর থিসিস অনুমোদিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালে। ডিগ্রি হাতে পেয়েছিলেন ১৯৫২ সালে; এই দেরির কারণ আমরা জানি না। তারও আগে, ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৫ সালে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষণার সময় তাঁর গাইড দেবেন্দ্রমোহন বসু এবং তিনি ফটোগ্রাফিক পদ্ধতি অবলম্বন করে মহাজাগতিক রশ্মিতে পাই মেসন বা আধুনিক ভাষায় পায়ন কণা আবিষ্কারের খুব কাছে পৌঁছেছিলেন, যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভালো প্লেটের অভাবে তাঁরা শেষ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে সেই দাবি রাখতে পারেননি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে ব্রিটেনে সিসিল পাওয়েল নিশ্চিতভাবে এই কণাটিকে সনাক্ত করেছিলেন। কয়েকবছর পরে পাওয়েল নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, তার পিছনে পাই মেসন আবিষ্কারে তাঁর সাফল্যেরও ভূমিকা ছিল।

বিভার জন্ম সম্ভবত ১৯১৩ সালে, তিনি বেথুন কলেজিয়েট স্কুল থেকে এন্ট্র্যান্স পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কলেজ থেকে ১৯৩৬ সালে এমএসসি করার পরে তিনি বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষণা করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট করতে যান। দেশে ফিরে তিনি চার বছর কাটিয়েছিলেন বম্বের টাটা ইন্সটিটিউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, সংক্ষেপে টিআইএফআর-এ। এর পর সম্ভবত অল্প কিছুদিন শিবপুরের বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়েরিং কলেজে কাটান। তারপর তিনি আবার বিদেশে চলে যান কয়েক বছরের জন্য। ফ্রান্সে ও আমেরিকাতে কয়েক বছর কাটানোর পরে দেশে ফিরে আমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি বা পিআরএল-এর সঙ্গে যুক্ত হন। সেখান থেকে অবসর নেওয়ার পর আবার কলকাতায় এসে গবেষণা করেছিলেন। ১৯৯১ সালের ২ জানুয়ারি তাঁর প্রয়াণ ঘটে।

তাঁকে নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হওয়ার ফলে কিছু নতুন তথ্য আমাদের সামনে এসেছে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড খুঁজে জানা গেছে যে তিনি ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স ও বিএসসি পড়েছিলেন সিটি কলেজ থেকে। সিটি কলেজে তখন পদার্থবিদ্যাতে অনার্স ছিল না, তিনি ডিস্টিংশন সহ বিএসসি পাস করেছিলেন। টিআইএফআর-এর অধ্যাপক বন্দনা নানাল ও পিআরএল-এর অধ্যাপক শ্রুবাবতী গোস্বামী বিভার চাকরির সময়ের কিছু নথি উদ্ধার করেছেন। তার থেকে পাওয়া কিছু তথ্য সম্প্রতি ফিজিক্স নিউজ পত্রিকার এক বিশেষ সংখ্যাতে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া রাজিন্দর সিং ও সুপ্রকাশ রায় বিভা চৌধুরির যে জীবনী লিখেছিলেন ‘A Jewel Unearthed: Bibha Chowdhuri, The Story of an Indian Woman Scientist', সম্প্রতি তার একটি ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। সেখানেও এই তথ্যগুলি সংকলিত হয়েছে। শ্রুবাবতী গোস্বামীর উদ্ধার করা নথির সূত্র অনুসরণ করে জানা গিয়েছে যে আমেরিকাতে বিভা বিশিষ্ট বিজ্ঞানী জন লিন্সলের সঙ্গে দু'মাস কাজ করেছিলেন, দেশে ফেরার পরেও তাঁদের মধ্যে গবেষণা বিষয়ে চিঠি মারফত আলোচনা হত। সন্ধান করে দেখা যায় যে লিন্সলেকে লেখা বিভার দুটি চিঠি আমেরিকার ফের্মিল্যাব আর্কাইভে সংরক্ষিত আছে। আর্কাইভ কর্তৃপক্ষ অনুরোধে সাড়া দিয়ে চিঠি দুটির প্রতিলিপি পাঠিয়েছেন, তাঁদের ধন্যবাদ জানাই। বিভার গবেষণার পরিপ্রেক্ষিত এই চিঠি দুটি থেকে কিছুটা স্পষ্ট হচ্ছে। সম্ভবত আগে কোথাও এই চিঠি দুটির বিষয় আলোচনা হয়নি।

আমরা জানি যে বিভা ভারতে ফটোগ্রাফিক প্লেট নিয়ে কাজ করলেও ম্যানচেস্টার ক্লাউড চেম্বার নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তিনি সেখানে কসমিক রে শাওয়ার বিষয়ে কাজ করেছিলেন প্যাট্রিক ব্ল্যাকেটের ল্যাবরেটরিতে, ব্ল্যাকেট ১৯৪৮ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। মহাজাগতিক রশ্মি প্রোটন ইলেকট্রন বা ফোটনের মতো মৌলিক কণা হতে পারে, কিংবা লোহার মতো ভারি নিউক্লিয়াসও হতে পারে। এদের শক্তি খুব বেশি। বায়ুমণ্ডলের একদম উপর দিকে কোনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে ধাক্কা লেগে সে সাধারণত অনেক নতুন কণা তৈরি করে, তারাও আবার বায়ুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ বা ক্ষয় ইত্যাদি পদ্ধতিতে আরো অনেক কণা তৈরি করে। ফলে পৃথিবীতে যখন সেই সমস্ত কণা এসে পৌঁছায় তখন কয়েক বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে একসঙ্গে তারা ধরা পড়ে। একে বলে এয়ার শাওয়ার।

বিভা কিন্তু দেশে ফটোগ্রাফিক প্লেট নিয়ে গবেষণার কথা ভোলেন নি বলেই মনে হয়। টিআইএফআর-এর রেকর্ড থেকে দেখা যাচ্ছে ডক্টরেট ডিগ্রি জমা দেওয়ার পরেই তিনি প্যারিতে লুই লাপ্রিন্স-রিঙ্গের পরীক্ষাগারে ছমাস কাজ করার জন্য ভারত সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। তাঁর আবেদনের সমর্থনে তাঁর গাইড ও থিসিসের পরীক্ষক জন উইলসন এক চিঠি দিয়েছিলেন। স্বাধীন ভারতের বিজ্ঞান বিষয়ক অনেক সিদ্ধান্তই নিতেন হোমি জাহাঙ্গির ভাবা, তিনি এক চিঠি লিখে উইলসনের কনফিডেনশিয়াল মতামত চেয়েছিলেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেছিলেন যে লাপ্রিন্স-রিঙ্গের পরীক্ষাগারে ফটোগ্রাফিক পদ্ধতি নিয়ে কাজ হয়, বিভার থিসিসের কাজ হল মেঘকক্ষ নিয়ে। উইলসনের গোপনীয় উত্তরে কিন্তু বিভার সম্পর্কে অবিমিশ্র প্রশংসা ছিল না, তিনি লিখেছিলেন যে বিভাকে প্রথম শ্রেণির পদার্থবিজ্ঞানী বলা যায় না, কিন্তু তাঁকে নির্দেশ দিলে তিনি ভালোই কাজ করতে পারেন। তবে নতুন কোনো বিষয়ে তাঁকে যেতে উৎসাহ দেওয়া ঠিক হবে না। আশ্চর্য হল ভাবা এবং উইলসন দুজনেই বিভার ভারতে থাকাকালীন কাজগুলোর কথা বিস্মৃত হয়েছিলেন, সে সময় তো তিনি ফটোগ্রাফিক প্লেট নিয়েই কাজ করেছিলেন!

তা সত্ত্বেও সম্ভবত সরকারি সাহায্য অনুমোদিত হয়েছিল, বিভা প্যারিতে কিছুদিন ছিলেন। সেখানে কী করেছিলেন জানার উপায় নেই, কিন্তু এর পর থেকে আর ফটোগ্রাফিক প্লেট নিয়ে কাজের সুযোগ বিভা পান নি। ১৯৪৯ সালেই দেশে ফিরে বিভা ১ নভেম্বর মুম্বাইতে ভাবার প্রতিষ্ঠান টাটা ইন্সটিটিউট ফর ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ বা টিআইএফআর-এ যোগ দেন। তাঁর আবেদনের সমর্থনে ভাবাকে এক চিঠিতে ব্ল্যাকেট লিখেছিলেন যে বিভার থিসিসের পরীক্ষকরা তাঁর ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য সুপারিশ করেছেন, তাঁরাও দেখেছেন, ব্ল্যাকেট নিজেও তার পরে দেখেছেন যে তাঁর কাজ খুব ভালো। বিভা একজন সক্ষম কর্মী, তাঁর বিচারবুদ্ধির উপর ভরসা রাখা যায়, এবং ভবিষ্যতে ভালো কাজ করার মতো অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। উইলসনের সঙ্গে ব্ল্যাকেটের মতামতের পার্থক্য স্পষ্ট। অনুমান করি ব্ল্যাকেটের চিঠি ভাবার মতের পরিবর্তন ঘটিয়েছিল। স্থায়ী চাকরি নয়, প্রাথমিকভাবে পাঁচ বছরের মেয়াদে রিসার্চ ফেলো, ইন্সটিটিউটের অ্যাকাডেমিক চাকরির সর্বনিম্ন ধাপ। নথিপত্র থেকে দেখা যাচ্ছে যে বিভা ক্লাউড চেম্বার গ্রুপের দায়িত্বে ছিলেন। ভাবা নিজে মহাজাগতিক রশ্মি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছিলেন, তাঁর উৎসাহে মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে গবেষণার এক বড় গ্রুপ তৈরি হয়েছিল।

টিআইএফআর-এ বিভা ছিলেন চার বছর, কিন্তু এই সময়ের কাজের ভিত্তিতে তাঁর গবেষণাপত্রের সংখ্যা মাত্র এক। নতুন প্রতিষ্ঠানে ল্যাবরেটরি তৈরিতে বেশি সময় লাগে, গবেষণাপত্র ছাপানোর সুযোগ কম। মহিলা এবং চুপচাপ বিভার পক্ষে হয়তো কাজেরও অসুবিধা হচ্ছিল। ভারতবর্ষে প্রথম যুগের প্রায় সমস্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানেই মহিলারা এই সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলেন। গত সাত দশকে পরিস্থিতির হয়তো কিছুটা উন্নতি হয়েছে, তবে সবটাই যে পালটেছে এমন কথা হয়তো জোর দিয়ে বলা যায় না। অসুবিধার কারণেই হয়তো মেয়াদের আগেই টিআইএফআর ছাড়েন বিভা। কাগজপত্র থেকে দেখা যায় শিবপুরে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ডক্টর এস কে চক্রবর্তীর অধীনে পরমাণু শক্তি কমিশনের অনুমোদিত “Design and development of instruments for cosmic radiation and a study of allied theoretical problems” প্রকল্পে সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসাবে বিভার নিযুক্তি কমিশনে অনুমোদিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকর্ড থেকে অনুমান করি যে এস কে চক্রবর্তী ছিলেন গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। হয়তো বিভা প্রকল্পে অল্প দিনের জন্য কাজ করেছিলেন, কিন্তু তার কোনো রেকর্ডের সন্ধান পাওয়া যায় নি। সেই বছরের শেষ দিকে তিনি যোগ দিলেন ফ্রান্সে পূর্বপরিচিত লাপ্রিন্স-রিঙ্গের পরীক্ষাগারে।

লাপ্রিন্স-রিঙ্গে ইউরোপে পরীক্ষামূলক কণা পদার্থবিদ্যার অগ্রগতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন, বিখ্যাত সার্ন ল্যাবরেটরির সৃষ্টির মূলে যে কজন বিজ্ঞানী ছিলেন, তিনিও তাঁদের মধ্যে পড়বেন। এক বিশেষ ধরনের মৌলিক কণাকে বলা হয় হাইপারন, এই নামটা তাঁর সৃষ্টি। বিভা কাজ করেছিলেন আল্পসের এইগুইল দু মিদি-তে ৩৬৮০ মিটার উচ্চতায় এক ল্যাবরেটরিতে। দু'বছর ফ্রান্সে ছিলেন বিভা। এখানেও মেঘকক্ষ ব্যবহার করেছিলেন এই সময়, আরো কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে কে-মেসন, বা আধুনিক ভাষায় ক্যাওন কণা নিয়ে কাজ করেছিলেন। এ সময় তাঁরা একটি গবেষণাপত্র ছাপিয়েছিলেন। দু'বছর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসাবে যোগ দিলেন। পড়ানোর পাশাপাশি যোগ দিয়েছিলেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েন হাজেনের পরীক্ষাগারে; সেখানে নেভি কসমিক রে রিসার্চের অর্থানুকূল্যে চার মাস রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট ছিলেন। পিআরএল-এ বিভার জমা দেওয়া জীবনী পঞ্জি থেকে দেখা যাচ্ছে যে দেশে ফেরার আগে বিভা দু'মাস কাটিয়েছিলেন এমআইটি অর্থাৎ ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে এক প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী ব্রুনো রসির পরীক্ষাগারে। ব্রুনো রসিই প্রথম এয়ার শাওয়ারের কথা বলেছিলেন। তাঁর ল্যাবরেটরিতে এয়ার শাওয়ার ধরার এক সম্পূর্ণ নতুন যন্ত্র তৈরিতে অংশ নিয়েছিলেন বিভা। নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ভলক্যানো র‍্যাঞ্চে সিন্টিলেটর বা প্রতিপ্রভ পদার্থ দিয়ে বানানো সেই গ্রাহক যন্ত্র বসানো হয়েছিল, সেই সময় তা ছিল মহাজাগতিক রশ্মির সব থেকে আধুনিক ও বড় গ্রাহক যন্ত্র। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর কাজে লেগেছিল। এই কাজের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন দুই বিজ্ঞানী, জন লিন্সলে ও লিভিও স্কার্সি; তাঁদের সঙ্গে কাজ করেছিলেন এবং পরে চিঠিতে যোগাযোগ রেখেছিলেন বিভা।

দেশে ফিরে তিনি কোদাইকানালে কাউন্সিল ফর সায়েন্টিফিক এন্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চের এক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিলেন বিভা। সেটা সম্ভবত ১৯৫৯ সাল। কোদাইকানালে অবস্থিত প্রকল্পটি ছিল পিআরএল-এর, এর পর ১৯৬১ সালে পিআরএল-এ পুল অফিসার হিসাবে যোগ দেন। এও সেই অর্থে স্থায়ী চাকরি নয়। এর পর ১ জুলাই ১৯৬৬ হলেন পিআরএল-এর ফেলো, সেখান থেকে অবসর নেন ৩১ অক্টোবর ১৯৭৬। পিআরএল-এ বিভা মূলত দুটি প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কর্ণাটকে কোলার সোনার খনির ভিতরে গ্রাহক যন্ত্র বসিয়ে এয়ার শাওয়ারে মিউয়ন পর্যবেক্ষণ করছিলেন বিভা, ১৯৬২ সাল থেকে সেই কাজ তিনি করেছিলেন। কোদাইকানালের প্রকল্পের সঙ্গে এর তফাতটা লক্ষণীয়। কোদাইকানাল হল তামিলনাড়ুর ২০০ মিটার উঁচু এক শহর, অন্য দিকে কোলার খনির ভিতরে মাটির তলায় প্রায় ২০০ মিটার নিচে। কোলারের তলাতে রাখা গ্রাহক যন্ত্রে একমাত্র খুব উচ্চশক্তিসম্পন্ন মিউয়ন কণারাই ধরা পড়বে, অন্যদিকে কোদাইকানালের পাহাড়ের উপরে কম শক্তির কণারাও ধরা দেবে।

বিভা কাজ শুরু করেছিলেন ফটোগ্রাফিক প্লেট দিয়ে, তারপর ম্যানচেস্টারে ডক্টরেট করার সময় এবং পরে ফ্রান্সে মেঘকক্ষ ব্যবহার করেছিলেন। টিআইএফআর-এ তিনি ক্লাউড চেম্বার গ্রুপের দায়িত্বে ছিলেন। যে কোনো যন্ত্রের মতো মেঘকক্ষও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, বিভা সেই সমস্তই আত্মস্থ করেছিলেন। রসির ল্যাবরেটরিতে দু মাস থাকার সময় তিনি সম্পূর্ণ নতুন পদ্ধতিতে কাজ করা এক যন্ত্র তৈরিতে অংশ নিয়েছিলেন। বিভা বুঝেছিলেন যে মেঘকক্ষের যুগ শেষ হয়ে আসছে, তার জায়গা নিচ্ছে সেই নতুন পদ্ধতি যেখানে সিন্টিলেশন বা প্রতিপ্রভা ব্যবহার করা হয়। আমেদাবাদে এসে তিনি সে সমস্ত নতুন পদ্ধতি ব্যবহার করে গ্রাহকযন্ত্র বানিয়েছিলেন, তাই দিয়েই তিনি কোলার ও অন্যত্র পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। ভলক্যানো র‍্যাঞ্চ এক্সপেরিমেন্টের অন্যতম নেতা জন লিন্সলেকে চিঠি লিখে আমেদাবাদে পরীক্ষানিরীক্ষা বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন, সেই চিঠি দুটি ফের্মিল্যাব থেকে পাওয়া গেছে।

প্রথম চিঠিটি তারিখবিহীন, আর্কাইভ থেকে দেখা যাচ্ছে সেটি ১৯৫৯ সালের। দ্বিতীয় চিঠিটির তারিখ ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি। চিঠি থেকে দেখা যাচ্ছে যে লিন্সলে তাঁকে নিজের গবেষণাপত্রের কপি পাঠাতেন। কোদাইকানালে পরীক্ষার পরিকল্পনার ব্যাপারে সম্ভবত বিভার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, হয়তো বা তিনি একাই এ বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি লিন্সলের কাছে সেই বিষয়ে নানা পরামর্শ চেয়েছিলেন। সব থেকে বড় সমস্যা ছিল ইলেক্ট্রনিক কম্পিউটারের অভাব, তখন ভারতে একমাত্র ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিটিউট ছাড়া কোথাও কম্পিউটার ছিল না। দ্বিতীয় চিঠিতে তিনি লেখেন যে কোলারে টিআইএফআর-এর গবেষকদলের গবেষণা লিন্সলের গবেষণার ফলের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। চিঠির সুর থেকে বোঝা যায় যে কাজের বাইরেও তাঁদের কিছুটা বন্ধুত্ব হয়েছিল, বিভা লিন্সলের পরিবার সম্পর্কে খবর নিয়েছেন। বিভার বোন ম্যাসাচুসেটসে গেছেন, লিন্সলে ও তাঁর স্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য।

বিভার জীবনীতে এখনো কিছু ফাঁক রয়ে গেছে। বসু বিজ্ঞান মন্দিরে কাজ করার সময় বিভা বিখ্যাত নেচার পত্রিকাতে চারটি ও আমেরিকা থেকে প্রকাশিত প্রথম শ্রেণির গবেষণাপত্রিকা ফিজিক্যাল রিভিউতে একটি প্রবন্ধ ছাপিয়েছিলেন। এর বাইরে ভারত থেকে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর চারটি প্রবন্ধ। অথচ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য থিসিস জমা দেননি, কেন তার কারণ আমাদের জানা নেই। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের প্রকল্পে তিনি কাজ করেছিলেন কিনা আমরা জানি না। টিআইএফআর-এ চাকরির সময় ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা ভাবাকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে তিনি কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে যোগ দেবেন, কিন্তু সেটি কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা কেন সেখানে শেষ পর্যন্ত যাননি, সেই বিষয়েও আমরা অজ্ঞ। পিআরএল-এ আবেদন করার সময় তিনি একটি তিন পৃষ্ঠার জীবনীপঞ্জী জমা দিয়েছিলেন, তাতে তখনো পর্যন্ত যে সমস্ত গবেষণাপত্র তিনি বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশ করেছিলেন, তার তালিকা দেওয়া ছিল। সেই তালিকায় তাঁর নেচার-এ প্রকাশিত প্রথম লেখাটি বা ফিজিক্যাল রিভিউ ও ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিক্সে প্রকাশিত দুটি প্রবন্ধের উল্লেখ নেই। বিভা কি খুব তাড়াতাড়ি করে লিখতে গিয়ে সেগুলির কথা ভুলে গিয়েছিলেন? যে বিভা নেচার-এর মতো বিখ্যাত জার্নালে পরপর প্রবন্ধ ছাপিয়ে গবেষক জীবন শুরু করেছিলেন, আমেদাবাদে থাকাকালীন সমস্ত গবেষণা পাঠাতেন শুধু ভারতীয় বিজ্ঞানপত্রিকাতে। আজও আমরা বিদেশী পত্রিকাতে প্রকাশিত না হলে সেই গবেষণার কদর করি না, অধিকাংশ ভারতীয় বিজ্ঞানীরই লক্ষ্য থাকে ইউরোপ বা আমেরিকা থেকে প্রবন্ধ প্রকাশ করার। লিন্সলেকে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে তিনি ১৯৬২ সালের মার্চ মাস থেকে কোলারে টিআইএফআর-এর প্রকল্পের সহযোগিতায় কাজ শুরু করতে চলেছেন। কিন্তু ১৯৭১ সালের আগে পিআরএল থেকে তিনি কোনো গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন নি, এবং যে কটি ছাপিয়েছেন সবই তাঁর একমাত্র ছাত্র যোগেশচন্দ্র সাক্সেনার সঙ্গে। তাঁর ও টিআইএফআর-এর গবেষকদলের কোনো যৌথ গবেষণাপত্র কোনোদিন প্রকাশিত হয়নি। বিভা কি বড় দলের সঙ্গে গবেষণাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না? অথবা কি একমাত্র মহিলা বলে তাঁর অবদান মনে রাখা হত না?
কলকাতাতে ফিরে তিনি একই সঙ্গে একাধিক ইন্সটিটিউটের গবেষকদের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছেন, এবং তাঁদের স্মৃতি অনুযায়ী তিনি খুব ভালোভাবেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলেন। কলকাতা থেকে তাঁর একাধিক গবেষণাপত্র বিদেশের পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞানে ভারতের প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রিপ্রাপ্ত মহিলা, যিনি গবেষকজীবনের শুরুতেই এক খুব বড় আবিষ্কারের কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, কেন তিনি পরবর্তীকালে আঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি পান নি, তা বুঝতে গেলে এই সমস্ত প্রহেলিকার উত্তর খোঁজা জরুরি।

 


জন লিন্সলেকে লেখা বিভার তারিখবিহীন চিঠির অংশ

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার Fermilab Archives, তাদের রেকর্ড অনুযায়ী এটি ১৯৫৯ সালে লেখা)


তথ্যসূত্রঃ

A Jewel Unearthed: Bibha Chowdhuri, The Story of an Indian Woman Scientist, Rajinder Singh and Suprakash C Roy, 2017

Bibha Chowdhuri – The First Woman Scientist at the TIFR, Suprakash C Roy and Rajinder Singh, Physics News, Vol. 51, Januray-June 1921

John Linsley Papers, Fermilab Archive

বিস্মৃত বাঙালিঃ নক্ষত্রের নাম বিভা, গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়, প্রকাশিতব্য 

বিভা চৌধুরির জীবন ও গবেষণা সম্পর্কে একপর্ণিকা পত্রিকার এই প্রবন্ধে  লিখেছিলাম। 

 

প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার শারদ২০২১