Sunday, 16 August 2026

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা: কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা: কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


কোয়ান্টাম বলবিদ্যা হল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম স্তম্ভ, এমনকি প্রধান স্তম্ভ বললেও সম্ভবত বাড়িয়ে বলা হবে না। এখানে ‘আধুনিক বিজ্ঞান’ বলতে আমরা ঠিক কী বোঝাতে চাই, সেটাও বলে নেওয়া ভালো। পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ এবং তার উপর নির্ভর করে আরোহী যুক্তির সাহায্যে গৃহীত সাধারণ সিদ্ধান্ত, এই হল আধুনিক বিজ্ঞানের কর্মপদ্ধতি বা এক কথায় সায়েন্টিফিক মেথড। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এই শর্তগুলি অবশ্যই পূরণ করে। কিন্তু প্রায়ই তার সিদ্ধান্তগুলি আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞানের বিপরীতে যায়। তার কিছু উদাহরণ আমরা দেখব।

তার আগে বলা দরকার যে আমাদের অভিজ্ঞতারও সীমাবদ্ধতা আছে, এবং তার জন্য আমাদের জ্ঞানও অসম্পূর্ণ। সাধারণভাবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে আমরা প্রয়োগ করি অণুপরমাণুর জগতে, সেগুলিকে আমরা দেখতেও পাই না, বা অন্য কোনোভাবে সরাসরি অনুভব করতেও পারি না। ফলে আমাদের জানা জগতের নিয়মকে যখন তার উপর প্রয়োগ করতে চাই, তখনই নানা অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি হই।

আরও একটা কথা বলে নিই, এই প্রবন্ধে আলোচিত কোনো মতই আমার নিজের নয়, কিন্তু সেগুলিকে যেভাবে উপস্থাপন করেছি তাতে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা যথেষ্টই আছে। বিষয়টা অত্যন্ত জটিল, অন্তত আমার কাছে তো বটেই। তবে এই সংশয় শুধুমাত্র আমার একার নয়। এই লেখাতে কিছু প্রশ্নের কথাও আসবে, যেগুলোর সর্বজনসম্মত উত্তর এখনও অজানা।

প্রথমে, একটা পরীক্ষার কথা ভাবা যাক। ধরা যাক আমার হাতে একটা বন্দুক আছে। সামনে আছে একটা দেওয়াল যার মধ্যে পাশাপাশি সমান্তরালভাবে দুটো লম্বাটে গর্ত কাটা রয়েছে, আর এই দেওয়ালের পিছনেও আছে আর একটা দেওয়াল। এবার আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে থাকলাম। কিছু গুলি নিশ্চয় ওই দুটো গর্ত দিয়ে গিয়ে পিছনের দেওয়ালে আঘাত করবে। বুঝতে অসুবিধা নেই যে পিছনের দেওয়ালে কেবল সামনের দেওয়ালের ছিদ্রের অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে দুটো লম্বাটে এলাকার মধ্যেই গুলি বেঁধার চিহ্ন আমরা দেখতে পাব।

এবার দ্বিতীয় পরীক্ষা। এ ক্ষেত্রে বন্দুকের জায়গায় নেওয়া হয়েছে একটা ইলেকট্রন গান, যার থেকে গুলির বদলে বেরোয় ইলেকট্রন। আগের পরীক্ষার মতো এখানেও রয়েছে একটা দেওয়াল, বা বলা ভালো একটা পর্দা, যার ওপর অমনই সমান্তরালে দুটো লম্বাটে গর্ত কাটা আছে। আগের বার যেখানে দু’নম্বর দেয়াল ছিল, সেখানে এবার এমন একটা পর্দা রাখা হল যেটার ওপর ইলেকট্রন এসে পড়লে সেটা কোথায় পড়েছে তা আমরা বুঝতে পারব। পরীক্ষা দুটো আপাতদৃষ্টিতে প্রায় একই রকম, কিন্তু দু-ক্ষেত্রেই কি আমরা একই ফল পাব? এবারেও কি পিছনের পর্দাতে মাত্র দুটো জায়গাতে গিয়ে পড়বে ইলেকট্রনগুলো


 

উত্তর হল, না। সঙ্গের ছবিতে দেখা যাচ্ছে কেমনভাবে ইলেকট্রনগুলো পর্দার ওপর পড়ে পরপর গায়ে-গায়ে থাকা ঘন ও হালকা পটির (band) ঝালর তৈরি করে। বোঝার সুবিধার জন্য পটির সংখ্যা অবশ্য কম দেখানো হয়েছে ছবিতে। এমনও ঘটা সম্ভব যে, বন্দুকের পরীক্ষায় পিছনের দেওয়ালের যে-অংশে একটাও গুলি পড়ার কথা নয়, পরের পরীক্ষায় ঠিক সেখানেই ইলেকট্রনের সংখ্যা আশপাশের থেকে বেশি! এই পরীক্ষাটার সাধারণ নাম দ্বিছিদ্র পরীক্ষা যেহেতু দুটো ছিদ্রের মধ্য দিয়ে কণা পাঠানোর আয়োজন এতে রয়েছে।

অসংখ্যবার এই 'দ্বিছিদ্র পরীক্ষা’ করা হয়েছে, এবং প্রত্যেকবারই এক ফল পাওয়া গেছে। ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বোঝা গেল, কেবল কোনো তরঙ্গের বেলাতেই এ ধরনের ঘন ও হালকা পটির বিন্যাস দেখতে পাওয়া সম্ভব। আলোকতরঙ্গ নিয়েও এরকম পরীক্ষা করা হয়েছিল অতীতে, এবং সেখানেও এ রকম পটির ঝালর দেখা গেছে। সত্যি বলতে কী, আলো যে এক প্রকার তরঙ্গ, তা এই ধরনের পরীক্ষা থেকেই প্রমাণিত হয়েছিল। অথচ ইলেকট্রনকে তো আমরা এক ধরনের কণা হিসেবেই গণ্য করি সচরাচর! এই পরীক্ষার সূত্রেই আজ আমরা বলি, কোনো বস্তুর একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গ ধর্ম আছে; ইলেকট্রন যখন একটা গান থেকে বেরোচ্ছে এবং পর্দায় গিয়ে পড়ছে, তখন তাকে কণা হিসাবে ধরে নেওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এর মাঝখানে তার তরঙ্গ ধর্মও প্রতিভাত হচ্ছে।

ইলেকট্রনের এরকম আচরণের পিছনে আছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনিশ্চয়তা নীতি। এই নীতির বক্তব্য হল, যতক্ষণ না আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, ততক্ষণ কণাটির গতিশীল অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছুই আমরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।

বন্দুকের গুলি বা আমাদের পরিচিত যে-কোনো বস্তুই নিউটনের গতিবিদ্যা মেনে চলে। এই সূত্র কাজে লাগিয়ে আমরা যে-কোনো মুহূর্তে তার অবস্থান ও ভরবেগ নির্ণয় করতে পারি। আমি দেখি বা না দেখি, প্রতি মুহূর্তে তার অবস্থান ও ভরবেগ যে নির্দিষ্ট ভাবে বলা যেতে পারে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ক্ষেত্রে কিন্তু তা বলা চলে নাযে-মুহূর্ত অবধি আমি কোনো কণাকে পর্যবেক্ষণ করছি না, সেই মুহূর্ত অবধি কণাটির অবস্থান বা ভরবেগ সুনিশ্চিত নয়। কণার অন্যান্য অনেক চরিত্র বা ধর্ম সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে।

এই প্রসঙ্গে আসে হাইজ়েনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির কথা। ভের্নার হাইজ়েনবার্গ দেখিয়েছিলেন, কোনো কণার ভরবেগ ও অবস্থান একই সঙ্গে নির্ভুল ভাবে নির্ণয় সম্ভব নয়। অবস্থান যত নির্ভুলভাবে নির্ণয় করব, ভরবেগের ক্ষেত্রে ভুলটা তত বেশি হবে। যে-কোনো নির্দিষ্ট অভিমুখে কোনো কণার অবস্থান নির্ণয়ের ত্রুটি ও ভরবেগ নির্ণয়ের ত্রুটির গুণফল একটা নির্দিষ্ট মানের থেকে কমানো সম্ভব নয়। সেই ন্যূনতম মানটি প্লাঙ্কের ধ্রুবকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ‘প্লাঙ্কের ধ্রুবক’ কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের এক সর্বব্যাপী ধ্রুবক, এটির কথা প্রথম এসেছিল মাক্স প্লাঙ্কের গবেষণাতে। কিন্তু এটির মান এতই কম যে আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতাতে এই অনিশ্চয়তাকে আমরা অনুভব করতে পারি না।

হাইজ়েনবার্গের অনিশ্চয়তাকে আমরা দু’ভাবে ভাবতে পারি। এক, ইলেকট্রনের অবস্থান ও ভরবেগ সুনির্দিষ্ট কিন্তু আমরা তা নির্ণয় করতে পারছি না, সেটা প্রকৃতির সীমাবদ্ধতা। দুই, এ সবের কোনো সুনির্দিষ্ট মানেরই অস্তিত্ব নেই। নানা রকম মান থাকতে পারে, এবং তাদের সম্ভাবনাও নির্ণয় করা যায়। আমাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রথম অবস্থাটাকে মেনে নিতে অসুবিধা নেই, আমরা প্রায়শই বিভিন্ন সম্ভাবনার মধ্যে একটিকে রূপায়িত হতে দেখি। কয়েন টস করার সময় হেড বা টেল, যে-কোনো একটি পড়ার সম্ভাবনা আছে। কোনটি পড়বে তা আগে থেকে বলতে পারি না কারণ কয়েনটা কত জোরে বা কিভাবে ছোড়া হল, কোথায় পড়বে, সেই সময় হাওয়ার বেগ কত ইত্যাদি নানা বিষয় আমাদের জানা নেই। থাকলে আমরা নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারতাম হেড ও টেলের মধ্যে কোনটি পড়বে।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ‘কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা’ দিয়েছিলেন নিলস্‌ বোর ও হাইজ়েনবার্গ (কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা: এরকম নামের কারণ বোর ছিলেন ডেনমার্কে কোপেনহাগেনের বাসিন্দা, এবং হাইজ়েনবার্গ জার্মান হলেও বোর-এর সান্নিধ্যেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রাথমিক কাজগুলো করেছিলেন)সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রথমটা সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে মিললেও দ্বিতীয়টাই আসলে সঠিক। কণার আচরণ সংক্রান্ত এই অনিশ্চয়তাই বাস্তব, এটা আমাদের পরিমাপ পদ্ধতির বা যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা নয়। ইলেকট্রনটা গান থেকে রওনা হওয়া এবং পিছনের পর্দার ওপর পড়ার মধ্যবর্তী সময়ে আমরা তাকে কোনোভাবে পর্যবেক্ষণ করিনি, তাই সে কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে তা বলার অধিকার আমাদের নেই। কাজেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভাষায় বলা উচিত, প্রতিটি ইলেকট্রন দুটো ছিদ্র দিয়েই যায়! আমরা যখন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে জানার চেষ্টা করি যে, কোন ছিদ্র দিয়ে ইলেকট্রনটি গেছে, একমাত্র তখনই সে একটা নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে।

আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতায় এমন কোনো ঘটনা অসম্ভবকোনো বস্তুই এক সঙ্গে দু’ জায়গায় থাকতে পারে না। যে-কোনো একটা ইলেকট্রন কোনো একটা নির্দিষ্ট ছিদ্র দিয়েই নিশ্চয় গেছে। সেটা ধরার জন্য তাহলে আর-একটা পরীক্ষা করা যাক। আমরা ওই দুটো ছিদ্রের পিছনে এমন যন্ত্র রাখলাম যেগুলো কোনো ইলেকট্রন ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মাত্র আমাদের সঙ্কেত পাঠাবে। আশ্চর্য! এবার পর্দাতে কিন্তু আর ঝালর আসবে না, প্রথম পরীক্ষায় বন্দুকের গুলি যে-প্যাটার্ন তৈরি করেছিল, সেটাই ফিরে আসবে। অর্থাৎ যখনই আমরা জানতে পারছি ইলেকট্রনটা কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে, ঝালর আর থাকছে না।

মনে রাখতে হবে যন্ত্রটা আছে ছিদ্রের পিছনে; তার মানে ইলেকট্রনের পক্ষে আগে থেকে জানা সম্ভব নয় যে ছিদ্রের পিছনে কী আছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ করছি বলেই ইলেকট্রনটা একটি নির্দিষ্ট ছিদ্রের ভিতর দিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ইলেকট্রন ও বন্দুকের গুলি একই রকম প্যাটার্ন তৈরি করবে।

এবার ভাবুন, আমরা ছিদ্রের পিছনের যন্ত্রটাকে বন্ধ রেখেছি। ইলেকট্রনটা প্রথম পর্দাটা পেরোনোর পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যন্ত্রটাকে চালু করব কিনা। অর্থাৎ আমি কখন যন্ত্রটাকে চালু করব, আর কখন করব না, তা আগে থেকে নির্ধারিত নয়। অথচ ইলেকট্রন ছিদ্র পেরোনোর পরে যন্ত্র চালু করলেও আমরা ঝালর পাব না। ইলেকট্রন চেনার যন্ত্রের জায়গায় একটা দাঁড়িপাল্লা বা স্কেল রাখলে কিন্তু ঝালরের কোনো পরিবর্তন হবে না, কারণ সেগুলো ইলেকট্রন শনাক্ত করার যন্ত্র নয়। ইলেকট্রন নিয়ে পরীক্ষার কথা বলা হচ্ছে বলে এই কণাটির কথাই বারে বারে উঠছে, কিন্তু যে-কোনো ক্ষুদ্র অণু বা পরমাণু, কিংবা পরমাণুর যে-কোনো কণা-উপাদান নিয়ে পরীক্ষা করা হলেও তা থেকে এরকমই ফল মিলবে।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের এই অদ্ভুত চরিত্রের জন্য অনেকে দাবি করেন যে ইলেকট্রন (বা অন্য কোনো কণা) কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে তা একমাত্র কোনো সচেতন পর্যবেক্ষকের পক্ষেই নির্ণয় করা সম্ভব। অর্থাৎ বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তি বা চেতনার ভূমিকা আছে। এই মতকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার কোনো উপায় জানা নেই। তবে অনেক বিজ্ঞানীই কোয়ান্টাম জগতের এই ‘খাপছাড়া’ চরিত্রকে সমর্থন করেন না, এঁদের মধ্যে আছেন বহু প্রখ্যাত ব্যক্তিও। যেমন আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের বিখ্যাত প্রশ্ন, কেউ যখন চাঁদের দিকে তাকাচ্ছে না, তখন কি চাঁদের অস্তিত্ব নেই? রজার পেনরোজ, ইলিয়া প্রিগোঝিনের মতো নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরাও এই মতের বিরোধিতা করেছেন। বিশেষ করে প্রিগোঝিন অণুপরমাণুর জগৎ ও আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎকে তাপগতিতত্ত্বের এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলার ধারণার সাহায্যে নির্দিষ্টভাবে আলাদা করতে চেয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীদের মতামত তো আর প্রমাণ নয়, তাই বিজ্ঞান এখনও তাকে স্বীকার করে না। প্রকৃত সত্য এটাই যে এই সমস্যার সমাধান এখনও আমাদের জানা নেই।

অপর একটি উদাহরণের কথা বলি। আমাদের জীবন সূর্য থেকে পাওয়া শক্তির ওপর নির্ভরশীল। সূর্যে এই শক্তি সৃষ্টির জন্য যে নিউক্লিয় বিক্রিয়াগুলি হয়, তাতে এক ধরনের ঘটনা ঘটে, যার নাম টানেলিং বা সুড়ঙ্গখনন। শব্দটা রূপকার্থে ব্যবহৃত, সত্যি সত্যি কোনো সুড়ঙ্গের দেখা এখানে মিলবে না। ধরা যাক দুটি প্রোটনের মধ্যে বিক্রিয়া হচ্ছে। এখানে টানেলিং-এর সময় কণার বেগের মান দাঁড়ায় ‘অবাস্তব’— এটা গণিতজগতের শব্দ, এর সঙ্গে জড়িত আছে -1-এর বর্গমূল (√-1)। এই অবাস্তব মানকে কোনোভাবেই মাপা সম্ভব নয়, অবাস্তব বেগের কথা আমরা চিন্তাও করতে পারি না; অথচ অন্য কোনোভাবে এই বিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়। শুধু সূর্যে কেন, আমাদের নানা ইলেকট্রিকাল ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রে টানেলিং-এর ঘটনাকে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। এই বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এই বিষয়ে গবেষণার জন্যই।

আমরা যখন কোনো বস্তুর অস্তিত্বের কথা বলি, তখন তার কতকগুলি সুনির্দিষ্ট ধর্মের প্রেক্ষিতে তাকে চিন্তা করি। আমাদের অভিজ্ঞতায় যে-কোনো বস্তু একই সময়ে একটাই জায়গায় অবস্থান করে, এবং তার নির্দিষ্ট বেগ থাকে। অথচ দ্বিছিদ্র পরীক্ষা দেখাচ্ছে একই সঙ্গে একই বস্তুর দুটি ভিন্ন স্থানে থাকার সম্ভাবনা আছে (উপরের উদাহরণের বেলায় একই ইলেকট্রন থাকে দুটি ছিদ্রপথে)। আবার টানেলিং-এর সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, বস্তুর বেগ অবাস্তব (বিশেষ গাণিতিক অর্থে) হতে পারে। এই সমস্ত কিছুকে আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সঙ্গে মেলানো সহজ নয়, হয়তো বা অসম্ভব। অভিজ্ঞতার কাছাকাছি আসে এমন একটি ব্যাখ্যার কথা পরে আলোচনায় আসবে, কিন্তু আমরা দেখব সেখানেও সমস্যা আছে।

আইনস্টাইন সারা জীবন কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় নিহিত এই অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্ভাবনাভিত্তিক চরিত্র প্রকৃতপক্ষে অলীক। আসলে সমস্ত চরিত্রই নির্দিষ্ট, কিন্তু তারা লুকানো আছে, সরাসরি আমাদের কাছে প্রকাশিত হচ্ছে না। যেমন, প্রতিটি ইলেকট্রন সম্পর্কে কিছু বাড়তি তথ্য জানা থাকলে আমরা না মেপেই হয়তো বলতে পারব সে কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে। একে বলা হয় Theory of local hidden variable, বাংলাতে বলি ‘স্থানীয় লুকানো চলরাশির তত্ত্ব’। ‘স্থানীয়’ বলতে ঠিক কী বোঝায় সে কথায় আমরা পরে আসছি। ১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন এবং আরও দুই বিজ্ঞানী বরিস পোডোলস্কি ও নাথান রোজেন যে-পরীক্ষার কথা প্রস্তাব করেছিলেন, তার থেকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতে বাস্তবতার চরিত্র সম্পর্কে একটা প্রশ্ন ওঠে। সেটি এই তিন বিজ্ঞানীর পদবীর আদ্যক্ষর নিয়ে ইপিআর (EPR) প্যারাডক্স বা কূটাভাস নামে পরিচিত।

আইনস্টাইনদের এই গবেষণাপত্র প্রকাশের পরে তিরিশ বছর অবধি এমন কোনো পরীক্ষার কথা চিন্তা করা যায়নি যেখানে তাঁদের মত ঠিক না ভুল তা প্রমাণ করা যাবে। ১৯৬৪ সালে সেই কাজটি করলেন জন স্টুয়ার্ট বেল। বিষয়টি বেশ জটিল, আমরা এই লেখাতে তার মধ্যে যাব না। বেল যে-ধরনের পরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা করা সম্ভব হয়েছে এবং দেখা গেছে কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তাই বাস্তব। এই সমস্ত পরীক্ষার জন্য জন ক্লাউজার, আলাঁ আস্পে ও অ্যান্টন জেইলিঙ্গার, এই তিনজন বিজ্ঞানীকে ২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এখন এটা প্রমাণিত যে অণুপরমাণুর জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, তা সম্ভাবনার ওপরেই নির্মিত, তার নীচে অন্য কোনো স্থানীয় বাস্তবতা লুকিয়ে নেই।

এই ধরনের পরীক্ষাতে দেখা গেছে, দুটি কণা বিরাট দূরত্বেও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। এটিকে বলা হয় বিজড়িত (Entangled) অবস্থা। এরকম দুটো বিজড়িত কণার মধ্যে একটির কোনো চরিত্র পরিমাপ করলেই সঙ্গে সঙ্গে অপরটির চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। ধরা যাক একটি কণা আছে পৃথিবীতে, অপরটি আছে নেপচুন গ্রহের পাশে কোনো মহাকাশযানে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী শূন্য মাধ্যমে কোনো কিছুই আলোর থেকে দ্রুত যেতে পারে না। পৃথিবী থেকে নেপচুনে আলো যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, অথচ পৃথিবীর কণাটির পরিমাপের সঙ্গে সঙ্গেই নেপচুনের কণাটিরও পরিবর্তন ঘটবে। নেপচুনের দূরত্বে এই পরীক্ষাটা করা আমাদের বর্তমান প্রযুক্তির অতীত, কিন্তু পৃথিবী ও কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্যে তা সত্যিই করে দেখা সম্ভব হয়েছে। কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে সঙ্কেত বিনিময়ের প্রয়োজন নেই; দুটি কণার দূরত্ব যত বড়ই হোক না কেন, ধরে নিতে হবে তারা একই তন্ত্র বা সিস্টেমের অংশ। তার সঙ্গে আপেক্ষিকতার বিরোধ ঘটে না।

বাস্তবে কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা কিন্তু বিশেষ নতুন কিছু বলে না, বা কোনো নতুন দিকনির্দেশ দেয় না। তাই অনেক বিজ্ঞানীরই এটা 'না-পসন্দ'। তাঁদের মতে, কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা হল আসলে কোনো কিছু চিন্তা না করে অঙ্ক কষার প্রস্তাব। অঙ্কের উত্তর সঠিক আসছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সে ব্যাখ্যাটিও সঠিক; ব্যাখ্যাটি তো বিশেষ কিছু বলেইনি।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যরকম ব্যাখ্যাও সম্ভব, যদিও সেগুলিতেও সমস্যা আছে। এই ভিন্ন ব্যাখ্যাগুলির একটির সূচনা করেছিলেন বস্তুর তরঙ্গ ধর্মের আবিষ্কারক লুই দ্য ব্রয়; পরে সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যান ডেভিড বোম। এখানে ধরে নেওয়া হয় যে প্রতিটি কণার নির্দিষ্ট অবস্থান, ভরবেগ ইত্যাদি আছে, কিন্তু আমাদের কাছে তা নিশ্চিত রূপে প্রতিভাত হচ্ছে না, তার কারণ সূচনাতে আমরা সেটির সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারিনি।

আবার আমরা কয়েন টসের কথায় ফিরে যাই। তার সঙ্গে এই দ্য ব্রয়-বোম-এর ব্যাখ্যার পার্থক্য প্রথম দৃষ্টিতে চোখে পড়ে না। তাহলে সেই ব্যাখ্যা মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়? সমস্যা এটাই যে, সেখানে একটি কণার চরিত্র তার সঙ্গে বিজড়িত অন্য সমস্ত কণার উপর নির্ভর করে, অর্থাৎ তা অস্থানিক, তা শুধুমাত্র ওই কণাটির সঙ্গে যুক্ত নয়। যেমন, কোনো কণার বেগ নির্ভর করে তার সঙ্গে বিজড়িত অন্য সমস্ত কণার অবস্থান ও গতির দশার উপর। এই বাস্তবতাও আমাদের সাধারণ ধারণার বাইরে। আইনস্টাইন এই কারণেই বোম-এর তত্ত্বকেও মেনে নিতে পারেননি, তিনি বারবারই স্থানীয় বাস্তবতার উপর জোর দিয়েছিলেন।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতে তরঙ্গ অপেক্ষকের কথা আসে, কিন্তু কোপেনহাগেন ব্যাখ্যাতে তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই, তা নেহাতই একটি গাণিতিক প্রকরণ। দ্য ব্রয়-বোমের তত্ত্বে সেই তরঙ্গের বাস্তব অস্তিত্ব আছে, তা কণার পথ দেখিয়ে দেয়, তাই তার নাম হল পাইলট তরঙ্গ। কিন্তু এই তরঙ্গের কোনো শক্তি বা ভরবেগ নেই; সেই কারণে তাকে ধরার কোনো উপায়ও আমাদের নেই। আমাদের পরিচিত বস্তুর চরিত্রের সঙ্গে এই সমস্ত ধারণাকে মেলানো সহজ নয়।

বোমের তত্ত্বে কোনো মুহূর্তে একটি কণার কোনো পরিবর্তন ঘটলে সঙ্গে সঙ্গেই অন্য সমস্ত কণার চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তন ঘটায় যে বল, তাকে বলা হয় ‘অ্যাকশন অ্যাট আ ডিসট্যান্স’এর মোদ্দা কথাটা হল, একটি বস্তু অন্য বস্তুর উপরে প্রভাব ফেলছে, কিন্তু মাঝখানে কোনো মাধ্যম নেই। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব এই ধরনের বলের কথাই বলে। এই চরিত্রও আমাদের অভিজ্ঞতার বিপক্ষে যায় এবং নিউটনের সময়েই এ সম্পর্কে আপত্তি উঠেছিল। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে এ রকম কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতে সেই সমস্যাই আবার ফিরে আসছে।

তার পরিবর্তে যদি আমরা ধরেও নিই যে এই বল কণাগুলির মধ্যে সঙ্কেত বিনিময়ের মাধ্যমে বাহিত হয়, তাহলে সেই সঙ্কেতকে আলোর থেকে দ্রুতগামী হতে হবে, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী যা অসম্ভব। বিজড়িত কণার ক্ষেত্রে এই কথা আগে এসেছে। অন্য ভাবে ভাবা যাক। ধরা যাক দ্বিছিদ্র পরীক্ষাতে দুটি ছিদ্রের প্রতিটি দিয়ে একটি ইলেকট্রনের যাওয়ার সম্ভাবনা পঞ্চাশ-পঞ্চাশ, কিন্তু যে মুহূর্তে তাকে আমরা প্রথম ছিদ্রে পেলাম, সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়টিতে তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে গেল। ছিদ্রগুলোর দূরত্ব যতই হোক না কেন, এর কোনো অন্যথা হবে না। যদি কোনো সঙ্কেত প্রথম ছিদ্রে ইলেকট্রনের আসার খবরটা অন্য ছিদ্রে নিয়ে যায়, তার বেগ আলোর থেকে বেশি, এমনকি অসীমও হতে পারে। অবশ্য এই সঙ্কেতকে আমরা তথ্য পাঠাতে ব্যবহার করতে পারব না, কিন্তু অসীম বেগের কল্পনা করাও আমাদের পক্ষে কঠিন।

বারবার বলা হচ্ছে যে, কোয়ান্টাম হল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুপরমাণুর জগৎ, রোজকার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার সংঘাত। কিন্তু আমাদের বাস্তব জগৎও অণুপরমাণু দিয়েই গঠিত। ঠিক কোনখানে কোয়ান্টাম জগতের শেষ আর সাধারণ জগতের শুরু, তার কি কোনো সীমানা টানা সম্ভব? কোয়ান্টাম জগৎ সাধারণভাবে আমাদের অনুভূতির বাইরে, একমাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই তার সম্পর্কে আমরা জ্ঞানলাভ করতে পারি। যন্ত্র হল আমাদের সাধারণ বৃহদায়তন (macroscopic) জগতের অঙ্গ, আণুবীক্ষণিক (microscopic) জগতের সঙ্গে তার ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে আমাদের জ্ঞান এখনও সীমিত।

আরও অনেক সমস্যার মুখোমুখি আমাদের হতে হয় যেগুলোর সমাধানের পথ নিয়ে অনেকেই চিন্তা করছেন, কিন্তু সঠিক পথ কেউ পেয়েছেন এমন কথা বলা যায় না। অথচ কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বিজ্ঞানের সব থেকে সফল তত্ত্ব, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটি যে-বাস্তবতার কথা বলে তাকে বোঝার অক্ষমতার মূলে কি আমাদের অভিজ্ঞতার অভাব? অনেকেই সেই কথা বলে কোয়ান্টাম লজিকের অবতারণা করেন। অনেকে মনে করেন যে প্রতি মুহূর্তে আমাদের জগৎ অসংখ্য জগতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, যাদের কোনোটির সঙ্গে কোনোটির যোগাযোগ নেই। ইলেকট্রনটি একই সঙ্গে দুটি ছিদ্র দিয়েই যায়, কিন্তু দুটি ভিন্ন জগতে, যাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না। এই মতকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। এই সমস্ত তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কোপেনহাগেন ব্যাখ্যার মধ্যে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল তা নির্ণয় করা যেতে পারে এমন কোনো পরীক্ষা এখনও পর্যন্ত কল্পনা করা সম্ভব হয়নি।


নির্বাচিত তথ্যসূত্র


বিজ্ঞান: ব্যক্তি যুক্তি সময় সমাজ, পলাশ বরন পাল, অনুষ্টুপ, ২০১৬

The Road to Reality, Roger Penrose, Vintage, 2006

In Search of Schrödinger's Cat, John Gribbin, Black Swan, 1985

Science, Order, and Creativity: A Dramatic New Look at the Creative Roots of Science and Life, David Bohm, Bantam Press, 1987

প্রকাশঃ শূন্য দ্বিতীয় সংখ্যা 

Monday, 3 August 2026

জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সম্পাদকীয় জুলাই ২০২৬

 

প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল আইজ্যাক নিউটনের মহাগ্রন্থ প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা। ১৬৮৭ সালের জুলাই মাসের ৫ তারিখ এডমন্ড হ্যালি চিঠিতে নিউটনকে জানান যে বইটি ছাপা সম্পূর্ণ হয়েছে। রয়্যাল সোসাইটির অর্থাভাবের জন্য হ্যালি নিজের দায়িত্বে ও খরচে বইটি ছাপিয়েছিলেন। বইয়ের ভূমিকাতে নিউটন নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে লিখেছিলেন, ‘আমি এই প্রয়াসকে প্রকৃতির দর্শনের গাণিতিক নীতি হিসাবে উপস্থাপিত করছি, কারণ গতি সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাকৃতিক বল বিষয়ে অনুসন্ধান, সেই বল থেকে অন্যান্য ঘটনার ব্যাখ্যা -- এই হল এই দর্শনের উদ্দেশ্য। আমরা যান্ত্রিক বলবিদ্যার সূত্র থেকে সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হব, এই আমার ইচ্ছা।’ যান্ত্রিক বিশ্বদর্শনের (Mechanical philosophy) এই তূর্যধ্বনি থেকেই জন্ম নিল নিয়তিবাদ (Determinism)। সে ঘোষণা করল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বর্তমান সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান থেকে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব -- সমস্ত ঘটনাই পূর্বনির্দিষ্ট। পদার্থবিদ্যার পরের দু'শো বছরের ইতিহাস শুধু যান্ত্রিক বলবিদ্যার জয়যাত্রার ইতিহাস। সে সৃষ্টি করেছিল চিরায়ত পদার্থবিদ্যার এক সৌধ যার ভিত্তির দৃঢ়তা নিয়ে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না।

আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে আর এক জুলাই মাসে সেই সৌধের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন মাক্স বর্ন। তিনি দেখিয়েছিলেন উপর থেকে দেখলে সৌধে কোনো ত্রুটি চোখে পড়বে না, কিন্তু তার ভিত্তি গড়েছিল যে নিউটনিয় নিয়তিবাদ তা প্রকৃতপক্ষে অলীক; আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মূলগতভাবে সম্ভাবনাময়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তিলগ্ন থেকেই সেই সৌধে ফাটল দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু মনে হয়েছিল যে মেরামত করে হয়তো তাকে আবার আগের মতো করা যাবে। ১৯২৬ সালের ২১ জুলাই মাক্স বর্ন এক প্রবন্ধ লিখে দেখালেন তা হওয়ার নয়।

বিজ্ঞানীরা অনুমান করছিলেন অণুপরমাণুর জগৎ নিউটনের বলবিদ্যা নয়, নব আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু সমস্যা ছিল যে সেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দুটি রূপ, ভার্নার হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স ও এরভিন শ্রয়ডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ, তাদের মনে করা হচ্ছিল পরস্পরবিরোধী। হাইজেনবার্গ নিউটনের নিয়তিবাদকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছিলেন, শ্রয়ডিঙ্গার সেখানেই আবার ফিরে যেতে চাইছিলেন। বর্ন দুই তত্ত্বের মাঝে এক সেতু গড়লেন; দেখালেন প্রকৃতিতে কার্যকারণ সম্পর্ক নিয়তিবাদের শৃঙ্খলে বাঁধা নয়, এক কারণ থেকে একাধিক কার্য সম্ভব, এবং নানা কার্যের সম্ভাবনা নির্ণয় করতে পারলেও ঠিক কোনটিই হবে তা আগে থেকে বলা আমাদের সাধ্যাতীত।

পদার্থবিজ্ঞানে সম্ভাবনার এই প্রবেশ অনেকেরই পছন্দ হয়নি, তাঁদের মধ্যে পড়বেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তাদের মধ্যে তিনজন -- মাক্স প্লাঙ্ক, আলবার্ট আইনস্টাইন, এবং লুই দ্য ব্রগলি। কিন্তু প্রকৃতি বিজ্ঞানীর মতামতের উপর নির্ভর করে না, যে কথা আইনস্টাইনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের অপর এক মূল স্থপতি, নীলস্‌ বোর।

একশো বছর পরেও বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার চরিত্র নিয়ে তর্ক করে চলেছেন। সেই তর্কে যোগ দিয়েছেন দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিকরা; কারণ কোয়ান্টাম সাধারণ কোনো তত্ত্ব নয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক কাঠামো সম্পর্কেই আমাদের ধ্যানধারণাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সেই তর্কের মীমাংসা এখনো আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে, কিন্তু তার জন্য কোয়ান্টাম বলবিদ্যা থেমে থাকেনি। আধুনিক প্রযুক্তির অধিকাংশই কোয়ান্টাম নির্ভর, সেই হিসাবে গত শতাব্দী এক অর্থে কোয়ান্টামের শতাব্দী।


                                            গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 

Saturday, 4 April 2026

যাত্রী আমি ওরে

    

যাত্রী আমি ওরে

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

   

মানুষ পৃথিবীর গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকে সন্তুষ্ট নয়। ঊর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি তার প্রতি ইঙ্গিত করে; সে সেই আহ্বানে সাড়া দিতে চায়। তাই আকাশের প্রতি সে বার্তা পাঠায়, বলে এই বিপুল মহাবিশ্বে তারও আছে স্থান। কিন্তু শুধু বার্তা পাঠানোই মানুষের কাছে যথেষ্ট নয়। সশরীরে না হলেও, সে নক্ষত্রদের উদ্দেশ্যে তার দূতকে পাঠাতে চায়। সেই দূত যখন অন্য নক্ষত্রজগতে পোঁছাবে, তখন হয়তো পৃথিবীতে কোনো মানুষ থাকবে না; তবু থেকে যাবে তার চিহ্ন। তারই জন্য সৌরজগতের বাঁধন ছিঁড়তে চেয়েছে তার কয়েকটি মহাকাশযান, যাদের নাম পায়োনিয়ার, ভয়েজার এবং সর্বশেষে নিউ হরাইজন। নামগুলোর অনুবাদ করা যাক -- অগ্রদূত, যাত্রী এবং নব দিগন্ত। আজ শোনা যাক দুই যাত্রীর কথা।

এই লেখা যাঁরা পড়ছেন তাঁদের অনেকের জন্মের আগে পৃথিবী ছেড়েছিল পায়োনিয়ার-১০ ১১ এবং ভয়েজার- ২। নিউ হরাইজন অবশ্য অনেক পরে রওনা হয়। ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে সে ২০১৫ সালে প্লুটোর খুব কাছ দিয়ে যায়। নিচের সারণীতে এই সব মহাকাশযানের উৎক্ষেপণকাল বর্তমানে সূর্য থেকে দূরত্ব দেওয়া আছে। (এইউ পুরো কথাটা হল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট, যা পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্বের সমান। এর মান হল প্রায় ১৫০ কোটি কিলোমিটার) এই সবগুলিই উৎক্ষেপণ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল এরোনটিক্স এন্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সংক্ষেপে নাসা। ভয়েজার- এখন এতই দুরে আছে যে তার থেকে আমাদের কাছে রেডিও সঙ্কেত আসতে সময় লাগে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা। তা সত্ত্বেও সূর্যের কাছের নক্ষত্ররা এখনও তার থেকে প্রায় একই পরিমাণ দূরে রয়ে গেছে। ভয়েজাররা কাছের কোনো নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে যাচ্ছে না, তবে চল্লিশ হাজার বছর পরে তারা দুটি আলাদা নক্ষত্রের থেকে . আলোকবর্ষ দূর দিয়ে যাবে।


যান

উৎক্ষেপণের সময়

সূর্য থেকে দূরত্ব (এইউ)

পায়োনিয়ার-১০

৩ মার্চ, ১৯৭২

১৩৯

পায়োনিয়ার-১১

৬ এপ্রিল, ২৯৭৩

১১৭

ভয়েজার-

২০ আগস্ট, ১৯৭৭

১৬৯

ভয়েজার-

৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭

১৪১

নিউ হরাইজন

১৯ জানুয়ারি, ২০০৬

৬৩

সৌরজগৎ থেকে কি এই মহাকাশযানগুলি বেরিয়ে গেছে? সে কথার জন্য জানতে হবে সৌরজগতের শেষ কোথায়? এই প্রশ্নের অনেকরকম উত্তর হয়। আগে মনে করা হল প্লুটোই সৌরজগতের শেষ সীমা, সেই কথা ধরলে পাঁচ মহাকাশযানই এখন সৌরজগৎ ছেড়েছে। কিন্তু আধুনিক উত্তর অন্যরকম। সূর্য থেকে প্রতিমুহূর্তে বেরিয়ে আসছে কণার স্রোত যার নাম সৌরবায়ু। তা ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে। যেখানে সৌরবায়ুর চাপ ছায়াপথের বায়ুর চাপের থেকে কম হবে, সেখানেই সৌরজগতের শেষ সীমা বলে ধরা যেতে হয়। এই সীমাকে বলে হেলিওপজ (Heliopause) এর মধ্যের অঞ্চলকে বলে হেলিওস্ফিয়ার (Heliosphere), বাংলাতে বলি সৌরমণ্ডল। পাঠককে মনে করিয়ে দিই, সূর্যের গ্রিক নাম হল Helios

নামে স্ফিয়ার হলেও একে দেখতে গোলকের মতো নয়, এর আকারটা নিচের ছবির মতো। সূর্য ছায়াপথে স্থির নয়। জাহাজ যাওয়ার সময় তার ঢেউ সামনের দিকে খুব অল্প দূরত্ব যেতে পারে, কিন্তু পিছনে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যকে জাহাজ, সৌরবায়ুকে তার ঢেউ আর ছায়াপথকে জল ভাবলে সৌরমণ্ডলের আকার বোঝা সহজ হবে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভয়েজার মহাকাশযানরা গেছে সামনের দিকে, তাই তারা এখন সৌরমণ্ডলের বাইরে।

সত্যিই কি এই রকম কোনো সৌরমণ্ডলের অস্তিত্ব আছে? শুধু সৌরবায়ু নয়, সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রও হেলিওস্ফিয়ারের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী, তাই তা মহাজাগতিক রশ্মির চার্জড বা আধানিত অংশকে কিছুটা বিক্ষিপ্ত করতে পারে। ভয়েজার মহাকাশযানরা যখন সূর্যের থেকে ১২০ এইউ দূরত্বে গিয়ে পৌঁছেছিল, তখন হঠাৎই তাদের যন্ত্রে সূর্য থেকে আসা কণার সংখ্যা কমে যায় এবং মহাজাগতিক রশ্মির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাই বোঝা যায় যে বিজ্ঞানীদের মডেল সঠিক, সত্যই সৌরমণ্ডলের অস্তিত্ব আছে।




 সৌরজগতে পাঁচ মহাকাশযানের অবস্থান (চিত্রটি জেমিনি এআই অঙ্কিত)

উপরের ছবি থেকে মহাকাশযানদের পথ একেবারে সরলরেখা মনে হলেও তা আসলে সত্যি নয়। এত কম সময়ে (অর্থাৎ মাত্র পঞ্চাশ বছরে!) কোনো সাহায্য ছাড়াই কোনো যানকে এত দূরে পৌঁছে দেওয়া আমাদের ক্ষমতার বাইরে। বিজ্ঞানীরা সাহায্য পেয়েছেন যাদের থেকে, তাদের দুজনকে প্রাচীন মানুষ দেবতা বলে জানত। নিচের ছবিতে ভয়েজার মহাকাশযানদের পথ দেখানো হয়েছে। ভয়েজার- বৃহস্পতি শনির খুব কাছ দিয়ে গেছে, ভয়েজার তার সঙ্গে ইউরেনাস নেপচুনকেও তার যাত্রাপথে যোগ করেছে। এই রকম পথের উদ্দেশ্য কী? একটা উদ্দেশ্য নিশ্চয় এই সব গ্রহ পর্যবেক্ষণ, কিন্তু তার সঙ্গে অন্য একটা কারণও ছিল।



  

সৌরজগতে ভয়েজারদের পথ

হিন্দু পুরাণে শনির দৃষ্টি সব সময়েই ক্ষতি করেছে, কিন্তু ভয়েজাররা তার এবং অন্য গ্রহদের 'কৃপাদৃষ্টি' লাভ করেছিল। দেখা যাক কেমনভাবে। একটা ঢিল উপরে ছুঁড়লে সে প্রথমে অনেক বেশি বেগে রওনা হয়, তারপর তার বেগ কমে আসে। তার কারণ পৃথিবীর টান। সূর্যের থেকে দূরে যাওয়ার সময়েও সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ মহাকাশযানের উপরে একই রকমভাবে কাজ করে, ফলে যান যত দূরে যায়, তার গতিবেগ তত কমতে থাকে। গ্রহরা ভয়েজার মহাকাশযানের গতিবেগকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে যে পদ্ধতিতে তাকে বলে গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট বা স্লিংশট এফেক্ট। বিষয়টা বোঝা শক্ত নয়। কোনো বোলার যখন অভিষেক শর্মাকে বল করে, তখন প্রায়ই বল যে গতিতে এসেছিল, তার থেকে অনেক বেশী গতিতে বাউন্ডারির বাইরে চলে যায়। অভিষেকের ব্যাট বলকে এসে আঘাত করে তার দিক বেগ দুইই পরিবর্তন করে। একইভাবে মহাকাশযানের গতিপথ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যে গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ তার ঝুঁটি পাকড়ে ধরে আরো বেগে ছুঁড়ে দিতে পারে। তাতে করে গ্রহের বেগ সামান্য হ্রাস পায় বটে, তবে তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়

একই পদ্ধতি নিয়েছিল আমাদের দেশ। কেন চাঁদে পৌঁছাতে চন্দ্রযানের এক মাসের বেশি সময় লাগল অথচ নিল আর্মস্ট্রংরা তিন দিনে পৌঁছে গিয়েছিলেন? কারণ নাসা ব্যবহার করেছিল স্যাটার্ন ভি রকেট যাতে জ্বালানি ছিল ২৬৩০ টন। চন্দ্রযানের রকেট এলভিএম থ্রি- জ্বালানির পরিমাণ ৩৫০ টন, তা দিয়ে সরাসরি চাঁদে যাওয়া সম্ভব নয়। ভূসমলয় কক্ষপথ পর্যন্ত ভার বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই রকেট তৈরি করা হয়েছিল, তার উচ্চতা হল পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ৩৬,০০০ কিলোমিটার। এলভিএম থ্রি বেশ কয়েকবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছে, প্রত্যেকবার যখন পৃথিবীর কাছে এসেছে, পৃথিবীর আকর্ষণকে ব্যবহার করে তার বেগ বাড়ানো হয়েছে। এভাবে বেগ কমানোও সম্ভব, চাঁদের চারদিকে কক্ষপথে চন্দ্রযানকে স্থাপনের জন্য সেটাই করা হয়েছিল। নিচের রেখাচিত্রটা দেখুন, দেখবেন প্রতিবার সাক্ষাতের সময় চারটি গ্যাসদানব কেমনভাবে ভয়েজার--এর বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছিল।


  

ভয়েজার--এর গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট (Credit Cmglee)

পায়োনিয়ার মহাকাশযান দুটিতে দূরগ্রহের সভ্যতার উদ্দেশ্যে এক ফলক রাখা হয়েছিল, যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব কার্ল সাগান। দুই ভয়েজারের জন্যও নাসা সাগানকেই বার্তা নির্মাণের দায়িত্ব দেয়। এবার সাগান একটি ফোনোগ্রাফ রেকর্ড তৈরি করেন; তখনও কমপ্যাক্ট ডিস্ক আবিষ্কার হয়নি। তাতে ছিল পৃথিবীর সমস্ত পরিচিত ভাষাতে শুভেচ্ছা বার্তা, নানা প্রাকৃতিক শব্দ এবং ডিজিটাল ছবি। তবে মহাকাশে নক্ষত্রদের মধ্যে যা দূরত্ব, তাতে কেউ কখনো এই সব মহাকাশযানদের সন্ধান পাবে, তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই বার্তা আসলে আমাদের নিজেদের উদ্দেশে, তার মুখ্য বক্তব্য হল ছায়াপথে অন্য সভ্যতা থাকা সম্ভব, এবং কাছের সভ্যতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো প্রযুক্তি এখন আমাদের আয়ত্তে।

ভয়েজার মিশনদের কথা বললেই মনে আসে সাগান বর্ণিত 'পেল ব্লু ডট'-এর কথা। নিচের ছবিটা সাদা কালো, তার মধ্যেও হয়তো তার চিহ্ন বোঝা যাবে। ডানদিকের হালকা পটির মাঝামাঝি জায়গাটা ভালো করে দেখলে আবছা যে বিন্দুটা দেখা যাচ্ছে, ওই হল সেই 'পেল ব্লু ডট' -- 'শো কোটি কিলোমিটার দূর থেকে ভয়েজার--এর ক্যামেরাতে ধরা পড়া পৃথিবী।


  

পেল ব্লু ডট (চিত্র নাসা)

সাগানের লেখা অনুবাদ না করে পাঠকদের জন্য তুলে দিলাম, ‘Look again at that dot. That's here. That's home. That's us....The Earth is a very small stage in a vast cosmic arena.... To my mind, there is perhaps no better demonstration of the folly of human conceits than this distant image of our tiny world. To me, it underscores our responsibility to deal more kindly and compassionately with one another and to preserve and cherish that pale blue dot, the only home we've ever known.’ এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পৃথিবীতে তার থেকেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য হিংসা দ্বেষ পরপীড়নে অভ্যস্ত আমাদের কাছে ওই বিন্দু কী বার্তা দেয়? সেই বার্তা শুনতে কি আমরা প্রস্তুত?

প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও ভয়েজারদের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ বজায় আছে, যদিও ব্যাটারি বাঁচাতে কিছু কিছু যন্ত্র বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দুই মহাকাশযানই সূর্যের থেকে অনেক দূরে, সেখানে সৌরশক্তি কাজে লাগবে না। তাই ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্লুটোনিয়ামের আইসোটোপ; তার তেজস্ক্রিয়তা যে কোনো রাসায়নিক ব্যাটারির থেকে বহু লক্ষগুণ বেশি শক্তি যোগায়। এখনো পর্যন্ত ভয়েজার- হল একমাত্র মহাকাশযান যা ইউরেনাস নেপচুনকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। চার দানব গ্রহের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে অনেক তথ্য আমাদের জানিয়েছে এই দুই যান। জানিয়েছে বৃহস্পতির উপগ্রহ আইয়োতে অগ্ন্যুৎপাতের কথা। এই প্রথম আমরা পৃথিবীর বাইরে কোথাও আগ্নেয়গিরির সন্ধান পেয়েছি। চার দানবের তেইশটা নতুন উপগ্রহদের খবর দিয়েছে দুই ভয়েজার। শনি এবং বৃহস্পতির বলয়, চার দানব গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক খবর আমরা ভয়েজারদের থেকে পেয়েছি। বিজ্ঞানীরা তার থেকে গ্রহের সৃষ্টি, তাদের গঠন ইত্যাদি বিষয়ে অনেক নতুন কথা আবিষ্কার করেছেন। সৌরমণ্ডলের সীমানা এবং তার বাইরের আন্তঃনক্ষত্র মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস হল দুই ভয়েজার। এখনো সেই সব তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

যাত্রীদের যাত্রা শেষ হবে না, তারা যাত্রা করেছে অনন্তের পথে। হয়তো কোটি বছর পরে অন্য কোনো নক্ষত্রের অন্য কোনো প্রাণীর কাছে সে পৌঁছে দেবে আমাদের বার্তা আমরাও ব্ৰহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটনে ব্ৰতী। তখনো যদি পৃথিবীতে সভ্যতার অস্তিত্ব থাকে, তা হয়তো বা পাড়ি দিয়েছে অন্য নক্ষত্ৰলোকেও। ভাবতে ইচ্ছা হয় যে ভবিষ্যতের মানুষেরই অন্য কোনো মহাকাশযানের সঙ্গে দেখা হতে পারে আজকের যাত্রীর। প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সঙ্গে আধুনিক মানুষের যে তফাৎ আমাদের সঙ্গে আমাদের সেই ভবিষ্যতের পার্থক্য তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে নিশ্চয়। সুদূর অতীত থেকে আসা এই বার্তাকে তারা কী দৃষ্টিতে দেখবে? শিশুর প্রচেষ্টা বয়স্কদের প্রশ্ৰয় লাভ করে হয়তো তারা এই চেষ্টাকে সম্ভ্রমের চোখেই দেখবে, কারণ তারা নিশ্চয় জানবে জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টা মনুষ্যত্ব বিকাশের সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ

প্রকাশ- সন্ধিৎসা, ফেব্রুয়ারি ২০২৬