যুদ্ধবিরোধী পাগওয়াশ কনফারেন্স ও জোসেফ রটব্ল্যাট
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
১৯৯৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছিলেন বিজ্ঞানী জোসেফ রটব্ল্যাট ও পাগওয়াশ কনফারেন্সেস অন সায়েন্স এন্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স, সংক্ষেপে পাগওয়াশ সম্মেলন। নামে সম্মেলন হলেও পাগওয়াশ বস্তুত নিউক্লিয় অস্ত্র বিরোধী একটি আন্দোলন যার সূচনা করেছিলেন রটব্ল্যাট। নোবেল কমিটি জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিউক্লিয় অস্ত্রের ভূমিকা কমানোর জন্য এবং ভবিষ্যতে নিউক্লিয় অস্ত্র সম্পূর্ণ বাতিল করার জন্য চেষ্টার জন্যই এই পুরস্কার। এই নিবন্ধে আমরা পাগওয়াশ আন্দোলনের ইতিহাস ও রটব্ল্যাটের খুব সংক্ষেপে ফিরে দেখব।
পাগওয়াশ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন জোসেফ রটব্ল্যাট। তাঁর জন্ম পোল্যান্ডের ওয়ারশতে ১৯০৮ সালের ৪ নভেম্বর। তাঁদের পরিবার ছিল বেশ সচ্ছল, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাঁরা আর্থিক দুরবস্থায় পড়েন, জোসেফকে কিশোর বয়সেই কাজ খুঁজতে বেরোতে হয়। দিনের বেলা ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন, রাত্রিবেলা পড়াশোনা -- এভাবেই পদার্থবিদ্যাতে এমএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ওয়ারশ'র রেডিওলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে গবেষণা শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন পদার্থকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে ফলাফল দেখেছিলেন। টোলা গ্রাইন নামের এক পোলিশ সাহিত্যের ছাত্রীর প্রেমে পড়েন রটব্ল্যাট এবং কয়েকবছরের মধ্যে তাঁদের বিয়ে হয়।
১৯৩৯ সালের শুরুতেই নিউক্লিয় ফিউশন বা বিভাজন বিক্রিয়া আবিষ্কার হয়। রটব্ল্যাট সেই বিষয়ে গবেষণা শুরু করে দেখেন ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসকে নিউট্রন দিয়ে ধাক্কা মারলে তা দু টুকরো হয়ে যায়, সঙ্গে বেরোয় একাধিক নিউট্রন, যারা আবার অন্য নিউক্লিয়াসকে ভেঙে দিতে পারে। একে বলে শৃঙ্খল বিক্রিয়া। অবশ্য এই বিষয়ে তাঁর গবেষণা ছাপানোর আগেই ফ্রান্সে ফ্রেডরিক জোলিও কুরি বিষয়টি প্রকাশ করেন। তবে রটব্ল্যাট বুঝতে পারেন যে শৃঙ্খল বিক্রিয়া ব্যবহার করে অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা তৈরি সম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানীর কাজ নয় মারণাস্ত্র তৈরি করা, এই ভেবে তিনি সেই বিষয়ে আর এগোতে চাননি, যদিও মনে সেই কথা থেকে গিয়েছিল।
এর পরেই তিনি এক বৃত্তি নিয়ে ব্রিটেনের লিভারপুলে নিউট্রনের আবিষ্কারক জেমস চ্যাডউইকের গবেষণাগারে যোগ দেন। রটব্ল্যাটের বৃত্তি এতই কম ছিল যে তিনি স্ত্রীকে লিভারপুলে আনতে পারেননি। চ্যাডউইক ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে রটব্ল্যাটের বৃত্তি দ্বিগুণ করে দেন। তখন রটব্ল্যাট স্ত্রীকে আনার জন্য পোল্যান্ডে গিয়েছিলেন, কিন্তু একটা সামান্য অস্ত্রোপচারের জন্য টোলা দু' সপ্তাহ পরে তাঁর সঙ্গে যোগ দেবেন বলেন। ১ সেপ্টেম্বর নাৎসি জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। স্ত্রীকে পোল্যান্ড থেকে নিয়ে আসার সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। বেলজেক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নাৎসিরা টোলাকে খুন করে। অবশ্য সে খবর রটব্ল্যাট যুদ্ধের পরে পেয়েছিলেন। তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি।
জার্মানি অতি দ্রুত পোল্যান্ড দখল করে। রটব্ল্যাটের তখন মনে হয় যে বোমার বিষয়ে গবেষণা করা উচিত, কারণ হিটলারের জার্মানি যদি কোনোভাবে নিউক্লিয় অস্ত্র তৈরি করতে পারে, বিপক্ষেরও সেই অস্ত্র না থাকলে তাকে থামানো সম্ভব হবে না। তিনি চ্যাডউইককে তাঁর আগের চিন্তাভাবনার কথা জানান। চ্যাডউইককে আগে অনেকেই এই কথা বলেছিলেন, কিন্তু গোপনীয়তার স্বার্থে তিনি সে কথা রটব্ল্যাটকে প্রকাশ করেননি। তার পরিবর্তে তিনি রটব্ল্যাটকে এই নিয়ে আরো গবেষণা চালিয়ে যেতে বলেন এবং তাঁকে সাহায্য করার জন্য দুজন তরুণ সহকারীর ব্যবস্থা করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিপক্ষের মূল শক্তি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও আমেরিকা। শেষের দুই দেশ প্রথমে গোপনে আলাদা আলাদাভাবে বোমা বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছিল। গবেষণার ফল থেকে রটব্ল্যাট ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে বোমা বানানো সম্ভব, কিন্তু তার জন্য প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হবে। যুদ্ধরত ব্রিটেনের পক্ষে সেই কাজ অসম্ভব। আমেরিকার মূল ভূখণ্ড কখনোই আক্রান্ত হয়নি, তাই সিদ্ধান্ত হয় যে দুই দেশের বিজ্ঞানীরা আমেরিকাতেই একসঙ্গে কাজ করবেন। নিরাপত্তার কারণে আমেরিকা একমাত্র ব্রিটিশ নাগরিকদেরই প্রকল্পে যোগ দিতে দেয়। সেই মতো ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা আমেরিকাতে যান। রটব্ল্যাট পোল্যান্ডের নাগরিক, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিতে রাজি হননি। তাঁর জন্য নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে হয়; ব্রিটিশ নাগরিক না হলেও তাঁকে বোমা তৈরির মানহাটান প্রকল্পের অংশীদার করা হয়। রটব্ল্যাট আমেরিকা যান ১৯৪৪ সালে, তখনই জার্মানি যুদ্ধে হারতে শুরু করেছে। মানহাটান প্রকল্পের বিশালত্ব দেখে তাঁর মনে হয় জার্মানির পক্ষে বোমা বানানো কঠিন। তবে বোমা বানানোর কোন সহজতর উপায় জার্মানি আবিষ্কার করে ফেলতে পারে, এই ভেবে সেই মুহূর্তে তিনি প্রকল্প থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।
কিছুদিন পরেই তিনি বুঝতে পারেন যে মার্কিন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর কর্তৃত্ব চাপানো। রটব্ল্যাট সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশেষ করে তার সর্বাধিনায়ক স্ট্যালিনকে অপছন্দই করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে যুদ্ধের আগে সোভিয়েত-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তিই হিটলারকে পোল্যান্ড আক্রমণের সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই পক্ষে লড়াই করছে; সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চক্রান্তকে তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না।
১৯৪৪-এর শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরে দাঁড়িয়ে জার্মান বাহিনিকে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করে এবং ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনি ফ্রান্সের বিশাল অংশকে দখলমুক্ত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মান পরমাণু প্রকল্পের খবর নেওয়ার জন্য ইউরোপে এক বিশেষ দল পাঠায়। সেই দল সিদ্ধান্ত করে যে জার্মানরা নিউক্লিয় বোমা তৈরির কাছে পৌঁছতে পারেনি। রটব্ল্যাট বোঝেন নিউক্লিয় মারণাস্ত্র তৈরির পিছনে মূল যুক্তিটিই অচল, তাই তিনি মানহাটান প্রকল্প থেকে পদত্যাগ করতে চান। মার্কিন গোয়েন্দারা সন্দেহ করে যে তিনি বোমা সংক্রান্ত তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে তুলে দিতে চাইছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়, কিন্তু কোনো অভিযোগের বিন্দুমাত্র প্রমাণ না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় মার্কিন সরকার।
রটব্ল্যাটকে সাবধান করে দেওয়া হয় যে কোনোভাবেই যেন তাঁর পদত্যাগের কারণ অন্য বিজ্ঞানীরা জানতে না পারেন। তাই তিনি সঙ্গীদের বলেন যে পরিবারের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি ইউরোপে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি ব্রিটেনে ফিরে তাঁর পুরানো কাজে যোগ দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানে নিউক্লিয় বোমা ফেলা পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে মুখ খোলেননি, কিন্তু তার পর থেকে নানা বক্তৃতায় আলোচনায় তিনি নিউক্লিয় বোম বিষয়ে গবেষণা অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানাতে থাকেন। সে জন্য তিনি সমালোচিতও হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস থেকে তিনি সরে যাননি।
রটব্ল্যাট দেখেছিলেন অনেক বিজ্ঞানী তাঁরই মতো জার্মান পরমাণু অস্ত্রের সম্ভাবনার আশঙ্কাতে গবেষণাতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেই বোমার প্রয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সরে দাঁড়াননি। তিনি বোঝেন যুদ্ধের সময় মানবতা ভূলুণ্ঠিত হয়, তখন একসময়ের বন্ধুও চরম শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। মারণাস্ত্র সংক্রান্ত কোনো গবেষণা করবেন না বলে তিনি মেডিক্যাল ফিজিক্স বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। বিশেষ করে জীবকোশের উপর বিকিরণের প্রভাব ও ক্যান্সার নিরাময়ে তার প্রয়োগের উপরে তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ করেন।
এই সময়ে অনেকেই নিউক্লিয় অস্ত্র বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পক্ষই হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর পরে সেই উদ্বেগ চরমে ওঠে। রটব্ল্যাট দেখান যে হাইড্রোজেন বোমা শুধু যে সাধারণ পরমাণু বোমার থেকে হাজারগুণ বেশি শক্তিশালী তা নয়, তার থেকে যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণও বেরোয় অনেক বেশি। এই সময়ে রেডিওর এক অনুষ্ঠানে দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ বারট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। রাসেল ও রটব্ল্যাট আলোচনা করে ঠিক করেন যে বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। সেই আবেদনে সই করেন এগারোজন -- তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাসেল, আলবার্ট আইনস্টাইন, ফ্রেডরিক জোলিও কুরি, লাইনাস পাউলিং, মাক্স বর্ন, সিসিল পাওয়েল, হিদেকি ইউকাওয়া, পার্সি ব্রিজম্যান ও হেরম্যান মুলার এই ন'জন নোবেলজয়ী। অপর দুই স্বাক্ষরকারী হলেন লিওপোল্ড ইনফেল্ড ও রটব্ল্যাট। রটব্ল্যাটই ছিলেন এঁদের মধ্যে বয়সে সব থেকে ছোট। আইনস্টাইন মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরে সেটি রাসেলের কাছে পৌঁছায়।
রাসেল-আইনস্টাইন ঘোষণাপত্র নামে পরিচিত এই বিবৃতিতে নিউক্লিয় অস্ত্রের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করে সমস্ত দেশের রাষ্ট্রনায়কদের কাছে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্ত বিরোধ মেটানোর আবেদন জানানো হয়। বিবৃতি প্রশ্ন করেছিল, আমরা কি মানবজাতির শেষ দেখব? নাকি মানবজাতি চিরকালের মতো যুদ্ধ পরিত্যাগ করবে? শুধু নিউক্লিয় অস্ত্র নয়, ঘোষণাপত্র সমস্ত রকম যুদ্ধেরই অবসান চেয়েছিল। এই ঘোষণাপত্রটিই পাগওয়াশ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্যকে প্রকাশ করে। ১৯৫৫ সালের ৯ জুলাই লন্ডনে এক ভিড়ে ঠাসা সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণাপত্রটি প্রকাশ করেন রাসেল ও রটব্ল্যাট। সভাপতিত্ব করেন রটব্ল্যাট। যুক্তির সাহায্যে রাসেল সাংবাদিকদের আগ্রাসী প্রশ্নের উত্তর দেন। ঘোষণাপত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করে, সংবাদমাধ্যমে সেটি নানাভাবে আলোচিত হয়।
রাসেল-আইনস্টাইন ঘোষণাপত্রে নিউক্লিয় অস্ত্রের বিপদ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর আহ্বানে সেটি ভারতেই হওয়ার কথা হয়েছিল, কিন্তু সেই সময় সুয়েজ খাল সংক্রান্ত রাজনৈতিক সমস্যার জন্য পূর্ব গোলার্ধে সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। কানাডার শিল্পপতি সাইরাস ইটন সম্মেলনের জন্য খরচ দিতে রাজি হন, শর্ত ছিল সেটি তাঁর জন্মস্থান পাগওয়াশ গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। সেই অনুযায়ী প্রথম সম্মেলনটি হয় পাগওয়াশে ইটনেরই এক বাড়িতে ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে। এর পরে আর একবারই পাগওয়াশে সম্মেলন হয়েছিল, কিন্তু সেই নামটাই স্থায়ী হয়ে গেছে।
প্রথম সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাতজন, জাপান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তিনজন করে, কানাডা ও ব্রিটেন থেকে দুজন করে, এবং অস্ট্রেলিয়া, চিন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া থেকে একজন করে। মাত্র বাইশজনের এই সম্মেলনে ছিলেন তিনজন নোবেলজয়ী, সোভিয়েত আকাদেমি অফ সায়েন্সের সহ-সভাপতি, ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের এক প্রাক্তন সভাপতি, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয় বিজ্ঞানীদের মুখপত্র বুলেটিন অফ দি অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর সম্পাদক। বিজ্ঞানীরা প্রায় সবাই সবাইকে চিনতেন, বা তাঁদের সম্পর্কে জানতেন, ফলে আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছিল। এর পরের সমস্ত সম্মেলনেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির কোনোরকম যোগাযোগ থাকলেই ইঙ্গ-মার্কিন মহলে কমিউনিস্ট বা সোভিয়েত গুপ্তচর হিসাবে তাদের চিহ্নিত করা হত। রটব্ল্যাট ও পাগওয়াশের সঙ্গে যুক্ত পশ্চিমি বিজ্ঞানীদের অনেকবারই সেই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও তাঁদের সেই কথা শুনতে হয়েছে। অথচ রটব্ল্যাটই সোভিয়েত ইউনিয়ন আয়োজিত সম্মেলনে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন।
প্রথম পাগওয়াশ সম্মেলনের রিপোর্ট মুখ্য রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সম্মেলনের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে এই ধরনের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতে দ্বাদশ (উদয়পুর, ১৯৬৪), ২৫তম (চেন্নাই, ১৯৭৬) ও ৫১তম (আগ্রা, ২০০২) পাগওয়াশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রটব্ল্যাট ছিলেন পাগওয়াশ কনফারেন্সের মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল। আবার ১৯৮৮ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি পাগওয়াশের সভাপতি ছিলেন। পাগওয়াশ আন্দোলনে ছোট ছোট সভার উপরে জোর দেওয়া হয়, এবং দেশের নীতিনির্ধারণ পদ্ধতিতে অংশীদার বিজ্ঞানীদের যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। পাগওয়াশ আন্দোলন কখনোই খুব একটা প্রকাশ্যে আসে না, সম্মেলনে একমাত্র আমন্ত্রিতরাই অংশ নিতে পারে। পাগওয়াশ ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ ও কথাবার্তার উপরে জোর দেয়।
ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় যখন মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন পাগওয়াশ সম্মেলন অনেক চুক্তি বা আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছিল। বিশেষ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ এখানে করা যেতে পারে। ১৯৬১ সালে পাগওয়াশ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন সোভিয়েত আকাদেমি অফ সায়েন্সের সহসভাপতি আলেকজান্ডার টোপচিয়েভ। মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন কেনেডির বিজ্ঞান বিষয়ক পরামর্শদাতা জেরোম উইজনার পাগওয়াশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনি টোপচিয়েভকে কেনেডির কাছে নিয়ে যান। যে আলোচনার সূত্রপাত হয়, দু' বছর পরে তার থেকেই ভূমির উপরে নিউক্লিয় অস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করতে সোভিয়েত ও মার্কিন পক্ষের মধ্যে পার্শিয়াল টেস্ট ব্যান ট্রিটি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক হো চি মিন এবং মার্কিন রাজনীতিবিদ হেনরি কিসিঙ্গারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে পাগওয়াশ আন্দোলন। মার্কিন সমরসচিব রবার্ট ম্যাকনামারা ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধের পিছনে পাগওয়াশের ভূমিকার উল্লেখ করেছেন। সোভিয়েত আকাদেমির সহসভাপতি ও সুপ্রিম সোভিয়েতে স্পিকার মিখাইল মিলিয়নসিকভ পাগওয়াশ সম্মেলনে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইলের স্বপক্ষে বলেছিলেন, তিনিই পরে তার বিরোধিতা করেন। ১৯৬৭ সালে ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত মার্কিন প্রতিরক্ষা বিষয়ক গ্রুপ আলোচনাতে বসেছিল, গ্রুপের সদস্যরা সবাই ছিলেন পাগওয়াশের সঙ্গে যুক্ত। সোভিয়েত পক্ষে মিলিয়নসিকভ ছাড়াও ছিলেন বিখ্যাত সোভিয়েত বিজ্ঞানী পিওতর কাপিৎজা। এই সমস্ত আলোচনার ফলেই ১৯৭২ সালে সোভিয়েত ও মার্কিন দুই পক্ষের মধ্যে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান স্টার ওয়ার্স বা স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ শুরু করার আগের বারো বছর এই চুক্তির ফলে মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতা কিছুটা স্তিমিত ছিল। পাগওয়াশের মূল লক্ষ্য হল যুদ্ধের অবসান; তাই পরবর্তীকালে পাগওয়াশ আন্দোলন শুধুমাত্র নিউক্লিয় নিরস্ত্রীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাসায়নিক অস্ত্র বা জৈব অস্ত্রের প্রয়োগ বন্ধ করার যে চুক্তি হয়, সেগুলির পিছনেও তার কিছু ভূমিকা আছে।
অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞানীদের কাজ গবেষণা করা, তাকে কীভাবে ব্যবহার হবে সেই নীতির দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের -- বিজ্ঞান মূল্য নিরপেক্ষ। রটব্ল্যাট কিন্তু এই মতের শরিক ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নিউক্লিয় অস্ত্রের বিপদের পিছনে বিজ্ঞানীদেরও দায়িত্ব আছে। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারের মুখ্য সামরিক উপদেষ্টা লর্ড জুকেরম্যানকে উদ্ধৃত করে বলেন যে প্রযুক্তিবিদ পরমাণু অস্ত্রের উন্নতি করার সিদ্ধান্ত নেয়, মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতা বা আর্মস রেসের পিছনে মুখ্য ভূমিকা তারই, কোনো সেনাপতির নয়।
তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে রটব্ল্যাট বলেছিলেন যে অন্তত দশ শতাংশ সময় নিজের গবেষণার বাইরের বিষয় নিয়ে চিন্তা করা উচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজ্ঞানীদের গজদন্ত মিনারকে চুরমার করে দিয়ে তাঁদের সমাজের ও নিজেদের বিবেকের মুখোমুখি করে। মানহাটান প্রকল্পে বিংশ শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় পদার্থবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদদের মধ্যে অনেকে যুক্ত ছিলেন। রটব্ল্যাটই একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি নৈতিক কারণে মানহাটান প্রকল্প থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আরো কয়েকজন বিজ্ঞানী ভিতর থেকে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে জেমস ফ্রাঙ্ক বা নিল্স বোরের নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু প্রকল্পের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা সেই মতকে আমল দেননি। রটব্ল্যাটের জীবন সেই আয়না যা বিজ্ঞানীকে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
জ্ঞান ও বিজ্ঞান আগস্ট ২০২৬