Saturday, 29 August 2026

যুদ্ধবিরোধী পাগওয়াশ কনফারেন্স ও জোসেফ রটব্ল্যাট

 

যুদ্ধবিরোধী পাগওয়াশ কনফারেন্স ও জোসেফ রটব্ল্যাট

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


১৯৯৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছিলেন বিজ্ঞানী জোসেফ রটব্ল্যাট ও পাগওয়াশ কনফারেন্সেস অন সায়েন্স এন্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স, সংক্ষেপে পাগওয়াশ সম্মেলন। নামে সম্মেলন হলেও পাগওয়াশ বস্তুত নিউক্লিয় অস্ত্র বিরোধী একটি আন্দোলন যার সূচনা করেছিলেন রটব্ল্যাট। নোবেল কমিটি জানিয়েছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিউক্লিয় অস্ত্রের ভূমিকা কমানোর জন্য এবং ভবিষ্যতে নিউক্লিয় অস্ত্র সম্পূর্ণ বাতিল করার জন্য চেষ্টার জন্যই এই পুরস্কার। এই নিবন্ধে আমরা পাগওয়াশ আন্দোলনের ইতিহাস ও রটব্ল্যাটের খুব সংক্ষেপে ফিরে দেখব।

পাগওয়াশ আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ছিলেন জোসেফ রটব্ল্যাট। তাঁর জন্ম পোল্যান্ডের ওয়ারশতে ১৯০৮ সালের ৪ নভেম্বর। তাঁদের পরিবার ছিল বেশ সচ্ছল, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তাঁরা আর্থিক দুরবস্থায় পড়েন, জোসেফকে কিশোর বয়সেই কাজ খুঁজতে বেরোতে হয়। দিনের বেলা ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন, রাত্রিবেলা পড়াশোনা -- এভাবেই পদার্থবিদ্যাতে এমএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ওয়ারশ'র রেডিওলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে গবেষণা শুরু করেন। তিনি বিভিন্ন পদার্থকে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করে ফলাফল দেখেছিলেন। টোলা গ্রাইন নামের এক পোলিশ সাহিত্যের ছাত্রীর প্রেমে পড়েন রটব্ল্যাট এবং কয়েকবছরের মধ্যে তাঁদের বিয়ে হয়।

১৯৩৯ সালের শুরুতেই নিউক্লিয় ফিউশন বা বিভাজন বিক্রিয়া আবিষ্কার হয়। রটব্ল্যাট সেই বিষয়ে গবেষণা শুরু করে দেখেন ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াসকে নিউট্রন দিয়ে ধাক্কা মারলে তা দু টুকরো হয়ে যায়, সঙ্গে বেরোয় একাধিক নিউট্রন, যারা আবার অন্য নিউক্লিয়াসকে ভেঙে দিতে পারে। একে বলে শৃঙ্খল বিক্রিয়া। অবশ্য এই বিষয়ে তাঁর গবেষণা ছাপানোর আগেই ফ্রান্সে ফ্রেডরিক জোলিও কুরি বিষয়টি প্রকাশ করেন। তবে রটব্ল্যাট বুঝতে পারেন যে শৃঙ্খল বিক্রিয়া ব্যবহার করে অত্যন্ত শক্তিশালী বোমা তৈরি সম্ভব। কিন্তু বিজ্ঞানীর কাজ নয় মারণাস্ত্র তৈরি করা, এই ভেবে তিনি সেই বিষয়ে আর এগোতে চাননি, যদিও মনে সেই কথা থেকে গিয়েছিল।

এর পরেই তিনি এক বৃত্তি নিয়ে ব্রিটেনের লিভারপুলে নিউট্রনের আবিষ্কারক জেমস চ্যাডউইকের গবেষণাগারে যোগ দেন। রটব্ল্যাটের বৃত্তি এতই কম ছিল যে তিনি স্ত্রীকে লিভারপুলে আনতে পারেননি। চ্যাডউইক ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাসে রটব্ল্যাটের বৃত্তি দ্বিগুণ করে দেন। তখন রটব্ল্যাট স্ত্রীকে আনার জন্য পোল্যান্ডে গিয়েছিলেন, কিন্তু একটা সামান্য অস্ত্রোপচারের জন্য টোলা দু' সপ্তাহ পরে তাঁর সঙ্গে যোগ দেবেন বলেন। ১ সেপ্টেম্বর নাৎসি জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। স্ত্রীকে পোল্যান্ড থেকে নিয়ে আসার সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। বেলজেক কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নাৎসিরা টোলাকে খুন করে। অবশ্য সে খবর রটব্ল্যাট যুদ্ধের পরে পেয়েছিলেন। তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেননি।

জার্মানি অতি দ্রুত পোল্যান্ড দখল করে। রটব্ল্যাটের তখন মনে হয় যে বোমার বিষয়ে গবেষণা করা উচিত, কারণ হিটলারের জার্মানি যদি কোনোভাবে নিউক্লিয় অস্ত্র তৈরি করতে পারে, বিপক্ষেরও সেই অস্ত্র না থাকলে তাকে থামানো সম্ভব হবে না। তিনি চ্যাডউইককে তাঁর আগের চিন্তাভাবনার কথা জানান। চ্যাডউইককে আগে অনেকেই এই কথা বলেছিলেন, কিন্তু গোপনীয়তার স্বার্থে তিনি সে কথা রটব্ল্যাটকে প্রকাশ করেননি। তার পরিবর্তে তিনি রটব্ল্যাটকে এই নিয়ে আরো গবেষণা চালিয়ে যেতে বলেন এবং তাঁকে সাহায্য করার জন্য দুজন তরুণ সহকারীর ব্যবস্থা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিপক্ষের মূল শক্তি ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন ও আমেরিকা। শেষের দুই দেশ প্রথমে গোপনে আলাদা আলাদাভাবে বোমা বিষয়ে গবেষণা চালাচ্ছিল। গবেষণার ফল থেকে রটব্ল্যাট ও অন্যান্য বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন যে বোমা বানানো সম্ভব, কিন্তু তার জন্য প্রচুর কাঠখড় পোড়াতে হবে। যুদ্ধরত ব্রিটেনের পক্ষে সেই কাজ অসম্ভব। আমেরিকার মূল ভূখণ্ড কখনোই আক্রান্ত হয়নি, তাই সিদ্ধান্ত হয় যে দুই দেশের বিজ্ঞানীরা আমেরিকাতেই একসঙ্গে কাজ করবেন। নিরাপত্তার কারণে আমেরিকা একমাত্র ব্রিটিশ নাগরিকদেরই প্রকল্পে যোগ দিতে দেয়। সেই মতো ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা আমেরিকাতে যান। রটব্ল্যাট পোল্যান্ডের নাগরিক, তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব নিতে রাজি হননি। তাঁর জন্য নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে হয়; ব্রিটিশ নাগরিক না হলেও তাঁকে বোমা তৈরির মানহাটান প্রকল্পের অংশীদার করা হয়। রটব্ল্যাট আমেরিকা যান ১৯৪৪ সালে, তখনই জার্মানি যুদ্ধে হারতে শুরু করেছে। মানহাটান প্রকল্পের বিশালত্ব দেখে তাঁর মনে হয় জার্মানির পক্ষে বোমা বানানো কঠিন। তবে বোমা বানানোর কোন সহজতর উপায় জার্মানি আবিষ্কার করে ফেলতে পারে, এই ভেবে সেই মুহূর্তে তিনি প্রকল্প থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি।

কিছুদিন পরেই তিনি বুঝতে পারেন যে মার্কিন প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর কর্তৃত্ব চাপানো। রটব্ল্যাট সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশেষ করে তার সর্বাধিনায়ক স্ট্যালিনকে অপছন্দই করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে যুদ্ধের আগে সোভিয়েত-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তিই হিটলারকে পোল্যান্ড আক্রমণের সুযোগ করে দিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একই পক্ষে লড়াই করছে; সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চক্রান্তকে তিনি মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না।

১৯৪৪-এর শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরে দাঁড়িয়ে জার্মান বাহিনিকে পশ্চাদপসরণে বাধ্য করে এবং ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনি ফ্রান্সের বিশাল অংশকে দখলমুক্ত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মান পরমাণু প্রকল্পের খবর নেওয়ার জন্য ইউরোপে এক বিশেষ দল পাঠায়। সেই দল সিদ্ধান্ত করে যে জার্মানরা নিউক্লিয় বোমা তৈরির কাছে পৌঁছতে পারেনি। রটব্ল্যাট বোঝেন নিউক্লিয় মারণাস্ত্র তৈরির পিছনে মূল যুক্তিটিই অচল, তাই তিনি মানহাটান প্রকল্প থেকে পদত্যাগ করতে চান। মার্কিন গোয়েন্দারা সন্দেহ করে যে তিনি বোমা সংক্রান্ত তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে তুলে দিতে চাইছেন। তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়, কিন্তু কোনো অভিযোগের বিন্দুমাত্র প্রমাণ না পেয়ে তাঁকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় মার্কিন সরকার।

রটব্ল্যাটকে সাবধান করে দেওয়া হয় যে কোনোভাবেই যেন তাঁর পদত্যাগের কারণ অন্য বিজ্ঞানীরা জানতে না পারেন। তাই তিনি সঙ্গীদের বলেন যে পরিবারের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি ইউরোপে ফিরে যাচ্ছেন। তিনি ব্রিটেনে ফিরে তাঁর পুরানো কাজে যোগ দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানে নিউক্লিয় বোমা ফেলা পর্যন্ত তিনি এ বিষয়ে মুখ খোলেননি, কিন্তু তার পর থেকে নানা বক্তৃতায় আলোচনায় তিনি নিউক্লিয় বোম বিষয়ে গবেষণা অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আহ্বান জানাতে থাকেন। সে জন্য তিনি সমালোচিতও হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর বিশ্বাস থেকে তিনি সরে যাননি।

রটব্ল্যাট দেখেছিলেন অনেক বিজ্ঞানী তাঁরই মতো জার্মান পরমাণু অস্ত্রের সম্ভাবনার আশঙ্কাতে গবেষণাতে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে সেই বোমার প্রয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সরে দাঁড়াননি। তিনি বোঝেন যুদ্ধের সময় মানবতা ভূলুণ্ঠিত হয়, তখন একসময়ের বন্ধুও চরম শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। মারণাস্ত্র সংক্রান্ত কোনো গবেষণা করবেন না বলে তিনি মেডিক্যাল ফিজিক্স বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। বিশেষ করে জীবকোশের উপর বিকিরণের প্রভাব ও ক্যান্সার নিরাময়ে তার প্রয়োগের উপরে তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ করেন।

এই সময়ে অনেকেই নিউক্লিয় অস্ত্র বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পক্ষই হাইড্রোজেন বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর পরে সেই উদ্বেগ চরমে ওঠে। রটব্ল্যাট দেখান যে হাইড্রোজেন বোমা শুধু যে সাধারণ পরমাণু বোমার থেকে হাজারগুণ বেশি শক্তিশালী তা নয়, তার থেকে যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণও বেরোয় অনেক বেশি। এই সময়ে রেডিওর এক অনুষ্ঠানে দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ বারট্রান্ড রাসেলের সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। রাসেল ও রটব্ল্যাট আলোচনা করে ঠিক করেন যে বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদদের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করা হবে। সেই আবেদনে সই করেন এগারোজন -- তাঁদের মধ্যে ছিলেন রাসেল, আলবার্ট আইনস্টাইন, ফ্রেডরিক জোলিও কুরি, লাইনাস পাউলিং, মাক্স বর্ন, সিসিল পাওয়েল, হিদেকি ইউকাওয়া, পার্সি ব্রিজম্যান ও হেরম্যান মুলার এই ন'জন নোবেলজয়ী। অপর দুই স্বাক্ষরকারী হলেন লিওপোল্ড ইনফেল্ড ও রটব্ল্যাট। রটব্ল্যাটই ছিলেন এঁদের মধ্যে বয়সে সব থেকে ছোট। আইনস্টাইন মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরে সেটি রাসেলের কাছে পৌঁছায়।

রাসেল-আইনস্টাইন ঘোষণাপত্র নামে পরিচিত এই বিবৃতিতে নিউক্লিয় অস্ত্রের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করে সমস্ত দেশের রাষ্ট্রনায়কদের কাছে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমস্ত বিরোধ মেটানোর আবেদন জানানো হয়। বিবৃতি প্রশ্ন করেছিল, আমরা কি মানবজাতির শেষ দেখব? নাকি মানবজাতি চিরকালের মতো যুদ্ধ পরিত্যাগ করবে? শুধু নিউক্লিয় অস্ত্র নয়, ঘোষণাপত্র সমস্ত রকম যুদ্ধেরই অবসান চেয়েছিল। এই ঘোষণাপত্রটিই পাগওয়াশ সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্যকে প্রকাশ করে। ১৯৫৫ সালের ৯ জুলাই লন্ডনে এক ভিড়ে ঠাসা সাংবাদিক সম্মেলনে ঘোষণাপত্রটি প্রকাশ করেন রাসেল ও রটব্ল্যাট। সভাপতিত্ব করেন রটব্ল্যাট। যুক্তির সাহায্যে রাসেল সাংবাদিকদের আগ্রাসী প্রশ্নের উত্তর দেন। ঘোষণাপত্রটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করে, সংবাদমাধ্যমে সেটি নানাভাবে আলোচিত হয়।

রাসেল-আইনস্টাইন ঘোষণাপত্রে নিউক্লিয় অস্ত্রের বিপদ বিষয়ে আলোচনার জন্য বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুর আহ্বানে সেটি ভারতেই হওয়ার কথা হয়েছিল, কিন্তু সেই সময় সুয়েজ খাল সংক্রান্ত রাজনৈতিক সমস্যার জন্য পূর্ব গোলার্ধে সম্মেলন করা সম্ভব হয়নি। কানাডার শিল্পপতি সাইরাস ইটন সম্মেলনের জন্য খরচ দিতে রাজি হন, শর্ত ছিল সেটি তাঁর জন্মস্থান পাগওয়াশ গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। সেই অনুযায়ী প্রথম সম্মেলনটি হয় পাগওয়াশে ইটনেরই এক বাড়িতে ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে। এর পরে আর একবারই পাগওয়াশে সম্মেলন হয়েছিল, কিন্তু সেই নামটাই স্থায়ী হয়ে গেছে।

প্রথম সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সাতজন, জাপান ও সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে তিনজন করে, কানাডা ও ব্রিটেন থেকে দুজন করে, এবং অস্ট্রেলিয়া, চিন, ফ্রান্স, পোল্যান্ড ও অস্ট্রিয়া থেকে একজন করে। মাত্র বাইশজনের এই সম্মেলনে ছিলেন তিনজন নোবেলজয়ী, সোভিয়েত আকাদেমি অফ সায়েন্সের সহ-সভাপতি, ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশনের এক প্রাক্তন সভাপতি, এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউক্লিয় বিজ্ঞানীদের মুখপত্র বুলেটিন অফ দি অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস-এর সম্পাদক। বিজ্ঞানীরা প্রায় সবাই সবাইকে চিনতেন, বা তাঁদের সম্পর্কে জানতেন, ফলে আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ হয়েছিল। এর পরের সমস্ত সম্মেলনেও একই নীতি অনুসরণ করা হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো ব্যক্তির কোনোরকম যোগাযোগ থাকলেই ইঙ্গ-মার্কিন মহলে কমিউনিস্ট বা সোভিয়েত গুপ্তচর হিসাবে তাদের চিহ্নিত করা হত। রটব্ল্যাট ও পাগওয়াশের সঙ্গে যুক্ত পশ্চিমি বিজ্ঞানীদের অনেকবারই সেই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে, এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরেও তাঁদের সেই কথা শুনতে হয়েছে। অথচ রটব্ল্যাটই সোভিয়েত ইউনিয়ন আয়োজিত সম্মেলনে যোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন।

প্রথম পাগওয়াশ সম্মেলনের রিপোর্ট মুখ্য রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সম্মেলনের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে এই ধরনের আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ভারতে দ্বাদশ (উদয়পুর, ১৯৬৪), ২৫তম (চেন্নাই, ১৯৭৬) ও ৫১তম (আগ্রা, ২০০২) পাগওয়াশ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত রটব্ল্যাট ছিলেন পাগওয়াশ কনফারেন্সের মহাসচিব বা সেক্রেটারি জেনারেল। আবার ১৯৮৮ সাল থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি পাগওয়াশের সভাপতি ছিলেন। পাগওয়াশ আন্দোলনে ছোট ছোট সভার উপরে জোর দেওয়া হয়, এবং দেশের নীতিনির্ধারণ পদ্ধতিতে অংশীদার বিজ্ঞানীদের যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়। পাগওয়াশ আন্দোলন কখনোই খুব একটা প্রকাশ্যে আসে না, সম্মেলনে একমাত্র আমন্ত্রিতরাই অংশ নিতে পারে। পাগওয়াশ ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ ও কথাবার্তার উপরে জোর দেয়।

ঠাণ্ডা যুদ্ধের সময় যখন মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন পাগওয়াশ সম্মেলন অনেক চুক্তি বা আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছিল। বিশেষ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ এখানে করা যেতে পারে। ১৯৬১ সালে পাগওয়াশ সম্মেলনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন সোভিয়েত আকাদেমি অফ সায়েন্সের সহসভাপতি আলেকজান্ডার টোপচিয়েভ। মার্কিন রাষ্ট্রপতি জন কেনেডির বিজ্ঞান বিষয়ক পরামর্শদাতা জেরোম উইজনার পাগওয়াশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তিনি টোপচিয়েভকে কেনেডির কাছে নিয়ে যান। যে আলোচনার সূত্রপাত হয়, দু' বছর পরে তার থেকেই ভূমির উপরে নিউক্লিয় অস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করতে সোভিয়েত ও মার্কিন পক্ষের মধ্যে পার্শিয়াল টেস্ট ব্যান ট্রিটি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক হো চি মিন এবং মার্কিন রাজনীতিবিদ হেনরি কিসিঙ্গারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে পাগওয়াশ আন্দোলন। মার্কিন সমরসচিব রবার্ট ম্যাকনামারা ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধের পিছনে পাগওয়াশের ভূমিকার উল্লেখ করেছেন। সোভিয়েত আকাদেমির সহসভাপতি ও সুপ্রিম সোভিয়েতে স্পিকার মিখাইল মিলিয়নসিকভ পাগওয়াশ সম্মেলনে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইলের স্বপক্ষে বলেছিলেন, তিনিই পরে তার বিরোধিতা করেন। ১৯৬৭ সালে ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত মার্কিন প্রতিরক্ষা বিষয়ক গ্রুপ আলোচনাতে বসেছিল, গ্রুপের সদস্যরা সবাই ছিলেন পাগওয়াশের সঙ্গে যুক্ত। সোভিয়েত পক্ষে মিলিয়নসিকভ ছাড়াও ছিলেন বিখ্যাত সোভিয়েত বিজ্ঞানী পিওতর কাপিৎজা। এই সমস্ত আলোচনার ফলেই ১৯৭২ সালে সোভিয়েত ও মার্কিন দুই পক্ষের মধ্যে অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ১৯৮৪ সালে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান স্টার ওয়ার্স বা স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিশিয়েটিভ শুরু করার আগের বারো বছর এই চুক্তির ফলে মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতা কিছুটা স্তিমিত ছিল। পাগওয়াশের মূল লক্ষ্য হল যুদ্ধের অবসান; তাই পরবর্তীকালে পাগওয়াশ আন্দোলন শুধুমাত্র নিউক্লিয় নিরস্ত্রীকরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাসায়নিক অস্ত্র বা জৈব অস্ত্রের প্রয়োগ বন্ধ করার যে চুক্তি হয়, সেগুলির পিছনেও তার কিছু ভূমিকা আছে।

অনেকেই মনে করেন বিজ্ঞানীদের কাজ গবেষণা করা, তাকে কীভাবে ব্যবহার হবে সেই নীতির দায়িত্ব রাজনীতিবিদদের -- বিজ্ঞান মূল্য নিরপেক্ষ। রটব্ল্যাট কিন্তু এই মতের শরিক ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নিউক্লিয় অস্ত্রের বিপদের পিছনে বিজ্ঞানীদেরও দায়িত্ব আছে। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি ব্রিটিশ সরকারের মুখ্য সামরিক উপদেষ্টা লর্ড জুকেরম্যানকে উদ্ধৃত করে বলেন যে প্রযুক্তিবিদ পরমাণু অস্ত্রের উন্নতি করার সিদ্ধান্ত নেয়, মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতা বা আর্মস রেসের পিছনে মুখ্য ভূমিকা তারই, কোনো সেনাপতির নয়।

তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে রটব্ল্যাট বলেছিলেন যে অন্তত দশ শতাংশ সময় নিজের গবেষণার বাইরের বিষয় নিয়ে চিন্তা করা উচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজ্ঞানীদের গজদন্ত মিনারকে চুরমার করে দিয়ে তাঁদের সমাজের ও নিজেদের বিবেকের মুখোমুখি করে। মানহাটান প্রকল্পে বিংশ শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় পদার্থবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদদের মধ্যে অনেকে যুক্ত ছিলেন। রটব্ল্যাটই একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি নৈতিক কারণে মানহাটান প্রকল্প থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। আরো কয়েকজন বিজ্ঞানী ভিতর থেকে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে জেমস ফ্রাঙ্ক বা নিল্‌স বোরের নাম উল্লেখযোগ্য। কিন্তু প্রকল্পের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানীরা সেই মতকে আমল দেননি। রটব্ল্যাটের জীবন সেই আয়না যা বিজ্ঞানীকে নিজের বিবেকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।


জ্ঞান ও বিজ্ঞান আগস্ট ২০২৬


Saturday, 22 August 2026

নোবেল পুরস্কার ও ভারতবর্ষ: কিছু অল্পপরিচিত তথ্য

    

নোবেল পুরস্কার ও ভারতবর্ষ: কিছু অল্পপরিচিত তথ্য

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


আজ পর্যন্ত যে সমস্ত ভারতীয় নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, আমরা প্রায় সকলেই তাঁদের নাম জানি।নোবেল পুরস্কারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর নোবেল কমিটির কাছে মনোনয়ন জমা পড়ে, সাধারণত তাঁরা তার মধ্যে থেকেই প্রাপককে বেছে নেন। পঞ্চাশ বছর সেই সমস্ত তথ্য গোপন থাকে; সেই কারণে এই বছর ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত মনোনয়নের তালিকা নোবেল পুরস্কারের ওয়েব সাইটে পাওয়া যায়। অবশ্য বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই গোপনীয়তা অনেক সময়েই রাখা হয় না, অনেক সংগঠন কাকে মনোনীত করছে তা ঘোষণা করে দেয়। তবে এই লেখাতে আমরা ১৯৭৪ সালের পরের কোনো কথা আলোচনাতে আনব না।

সুব্রহ্মণিয়ান চন্দ্রশেখর, হরগোবিন্দ খোরানা, ভেঙ্কি রামকৃষ্ণনের মতো কয়েকজন আছেন যাঁরা জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও বিদেশী নাগরিক হিসাবে পুরস্কার পেয়েছেন। এঁদের বাইরেও অন্তত দু'জন আছেন, যাঁদের জন্ম ব্রিটিশ ভারতে, কিন্তু তাঁদের আমরা সঠিক অর্থে ভারতীয় বলব না। ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতিতে রোনাল্ড রস শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন ১৯০২ সালে। তাঁর জন্ম আলমোড়াতে। ১৯০৭ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী জঙ্গল বুক-এর বিখ্যাত লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং জন্মেছিলেন বম্বে অর্থাৎ বর্তমান মুম্বাইতে। তবে যখন পুরস্কার ঘোষণা হয়, দুজনেই তখন গ্রেট ব্রিটেনের স্থায়ী বাসিন্দা। নোবেল কমিটিও এঁদের কাউকেই ভারতীয় হিসাবে গণ্য করে না। আরো কয়েকজন বিদেশী ভারতে গবেষণার জন্য শারীরবিদ্যাতে নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, তাঁদেরও আমরা আলোচনার বাইরে রাখছি। অবিভক্ত ভারতের নাগরিকদের আমরা অবশ্য ভারতীয়ই ধরছি।

বিজ্ঞান ও অর্থনীতির পুরস্কারগুলির জন্য কমিটি কিছু সংখ্যক নির্বাচিত ব্যক্তিদের থেকে মনোনয়ন আহ্বান করে। বিজ্ঞানে যে সমস্ত ভারতীয়ের নাম নোবেলের জন্য কখনো না কখনো মনোনীত হয়েছিল, তাঁদের সবাই সুপরিচিত। পদার্থবিজ্ঞানে মেঘনাদ সাহা (), সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১১), হোমি জেহাঙ্গির ভাভা (), ই সি জি সুদর্শন (), রসায়নে জি এন রামচন্দ্রন () ও টি আর শেষাদ্রি (), এবং শারীরবিদ্যাতে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী ()-র সমর্থনে বিভিন্ন সময়ে মনোনয়ন জমা পড়েছিল। (বন্ধনীর মধ্যে সমর্থনে জমা পড়া মনোনয়নপত্রের সংখ্যা দেখানো হয়েছে।)

নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য নোবেল কমিটি মনোনয়ন চেয়ে পাঠায়। তা ছারাও আগের নোবেলজয়ীরা, বিভিন্ন দেশের সাহিত্য আকাদেমির প্রধানরা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা মনোনয়ন জমা দিতে পারেন। শান্তির নোবেল পুরস্কারের জন্য পূর্বতন প্রাপক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ অনেকেই মনোনয়ন পাঠাতে পারেন।

কয়েকজন ভারতীয়ের নাম শান্তি ও সাহিত্যের জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের দুই তালিকাতেই পাওয়া যাবে, তাঁদের মধ্যে প্রথমেই আসবে ভারতের রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের নাম। তিনি মোট ষোল বার সাহিত্যের জন্য এবং এগারো বার শান্তির নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। আর এক ভারতীয় যাঁর নাম এই দুই বিভাগেই এসেছিল তিনি হলেন শ্রী অরবিন্দ; দুটি পুরস্কারের জন্যই তিনি একবার করে মনোনীত হয়েছিলেন।

রাধাকৃষ্ণন বা অরবিন্দের পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আরো দুজন ভারতীয়ের নাম এই তালিকাতে আসবে, যাঁরা এখন বিস্মৃতপ্রায়। হরিমোহন ব্যানার্জি পাঁচবার শান্তি ও একবার সাহিত্যের জন্য মনোনীত হন। সঞ্জীব চৌধুরি দুবার সাহিত্য ও আটবার শান্তির নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছেন।

শান্তির নোবেলের জন্য অনেকেই মনোনয়ন জমা দিতে পারেন। তাই মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকায় মহাত্মা গান্ধী (১২), জহরলাল নেহরু (১৩), বিনোবা ভাবে (১১)-র পাশাপাশি এমন অনেক নাম আছে, যাঁরা এখন প্রায় বিস্মৃত। সাহিত্যের মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকায় আছে রবি দত্ত (), বিজয়চন্দ্র মজুমদার (), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় () ও সুনীতিকুমার চ্যাটার্জি (), ইন্দিরা দেবী ধনরাজগির () ও প্রতাপ ট্যান্ডন () । এঁদের মধ্যে ইন্দিরা দেবী ও প্রতাপ ট্যান্ডন এখনো জীবিত। সুইডিশ অ্যাকাডেমির নোবেল কমিটির সদস্যরা প্রতিবছর কমিটির প্রথম সভাতে নাম প্রস্তাব করতে পারেন। প্রথমবার প্রস্তাবিত হওয়ার পরে সুনীতিকুমার ও তারাশঙ্করের নাম এভাবেই এসেছিল।

আমাদের আলোচ্য সময়কালে দুজন ভারতীয় নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন টমাস মুর। ওই একবারই রবীন্দ্রনাথের নাম প্রস্তাবিত হয়। সেই বছর সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মোট ৩২টি নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল। এঁদের মধ্যে কার্ল গুস্তাফ ভার্নার ভন হাইডেনস্টাম (১৯১৬), হেনরিক পন্টোপিডান (১৯১৭), কার্ল অ্যাডলফ গেজেলরুপ (১৯১৭), কার্ল স্পিটেলার (১৯১৯), আনাতোলে ফ্রান্স (১৯২১), গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দা (১৯২৬) ও আঁরি বের্গসন (১৯২৭) পরে নোবেল পুরস্কার জিতবেন। প্রতিটি বিষয়ের নোবেল পুরস্কার বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট নোবেল কমিটি। সাহিত্যের পুরস্কারের জন্য সুপারিশ যায় সুইডিশ অ্যাকাডেমির কাছে। অ্যাকাডেমি সেই সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়; রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছিল। কমিটি সুপারিশ করেছিল ফরাসি লেখক এমিল ফাগের নাম, কিন্তু অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথকেই নির্বাচিত করে। রবীন্দ্রনাথ নিজে একবারই কোনো নাম প্রস্তাব করেছিলেন; ১৯৩৫ সালে তিনি আইরিশ-ভারতীয় লেখক জেমস কাজিন্‌সকে সাহিত্যে নোবেলের জন্য মনোনীত করেন।

১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন। তাঁর নামে ১৯২৯ সালের পুরস্কারের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল, প্রস্তাবক ছিলেন চার্লস ফেব্রি ও নিল্‌স বোর। পরের বছর তাঁকে মনোনীত করেছিলেন নিল্‌স বোর, জাঁ পের‍্যাঁ, ওরেস্ট খোলসন, ইউজিন ব্লখ, লুই দ্য ব্রয়ি, মরিস দ্য ব্রয়ি, রিচার্ড ফেইফার, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, জোহানেস স্টার্ক ও চার্লস উইলসন। এঁদের মধ্যে বোর, পের‍্যাঁ, লুই দ্য ব্রয়ি, রাদারফোর্ড, স্টার্ক ও উইলসন ছিলেন নোবেলজয়ী।

১৯৩০ সালের মনোনয়নের তালিকাতে পদার্থবিজ্ঞানের অনেক রথীমহারথীর নাম পাওয়া যাবে। তাঁদের মধ্যে পরে যাঁরা এই পুরস্কার পাবেন, তাঁরা হলেন ভার্নার হাইজেনবার্গ (১৯৩২), এরভিন শ্রোয়ডিঙ্গার (১৯৩৩), মাক্স বর্ন (১৯৫৪), ক্লিন্টন ডেভিসন (১৯৩৭), পিটার ডিবাই (১৯৩৬, রসায়ন) ও অটো স্টার্ন (১৯৪৩)। সেই বছর মেঘনাদ সাহার নামও প্রথমবারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল, প্রস্তাবক ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসু ও শিশির কুমার মিত্র।

নোবেল কমিটি প্রাথমিকভাবে তিনজনের নাম নির্বাচিত করে রিপোর্ট তৈরি করে; সেই তিনজন হলেন রামন, মেঘনাদ ও রবার্ট উড। মেঘনাদ ও রবার্ট উডের ক্ষেত্রে কমিটি মনে করেছিল যে তাঁদের আবিষ্কার যথেষ্ট মৌলিক নয়। সাহার ক্ষেত্রে রিপোর্টের সারসংক্ষেপে লেখা হয়েছিল, ‘Saha’s work is proved to be very important for modern astrophysics, but this can hardly be seen as a new physical discovery, more as an application to known physical accumulated astrophysical data. With all recognition for the value of Saha’s achievements, the Committee find itself not in the position to recommend him for the reception of the Nobel Prize for physics.” (সুইডিশ ভাষা থেকে রাজিন্দর সিং কর্তৃক অনূদিত।) পরে আরো কয়েকবার মেঘনাদের নাম এসেছিল, নোবেলজয়ী আর্থার কম্পটন দুবার তাঁর নাম প্রস্তাব করেন, তবে কমিটি নতুন করে বিবেচনার প্রয়োজন বোধ করেনি।

রামনের ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল আরো জটিল, তাই কমিটি তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিল। এখন আমরা যাকে রামন এফেক্ট বলি, দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী গ্রিগরি লান্ডসবার্গ ও লিওনিদ মান্ডেলস্টাম রামনের কয়েকদিন আগেই তা দেখেছিলেন। তাঁদের নামও সেই বছর পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল। কিন্তু রামনের প্রবন্ধটি তাঁদের অনেক আগেই প্রকাশিত হয়।

বিজ্ঞানে আগে প্রকাশকেই যে গুরুত্ব দেওয়া হয় তার অনেক নিদর্শন আছে। সন্দেহ নেই রামন তাঁর কাজের গুরুত্ব সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের আগেই বুঝেছিলেন। আবিষ্কারটি হয় ১৯২৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি; রামন ১৬ মার্চ বাঙ্গালোরে এক বক্তৃতাতে তিনি ব্যাখ্যা করেন। কলকাতাতে ফিরে তিনি বক্তৃতাটি অবিলম্বে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিক্স-এ ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। তিনিই ছিলেন জার্নালটির সম্পাদক। লেখাটি প্রকাশ হয় ৩১ মার্চ, সঙ্গে সঙ্গে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি প্রেস সারা রাত কাজ করে একদিনের মধ্যে প্রবন্ধটির দু' হাজার কপি ছাপায়, পরের দিনই রামন সারা পৃথিবীর এই বিষয়ে গবেষণারত সমস্ত সুপরিচিত বিজ্ঞানীদের কাছে সেগুলি ডাকযোগে পাঠিয়ে দেন।

সম্ভবত লান্ডসবার্গ ও মেন্ডেলস্টামের কাছেও তা পৌঁছেছিল। তাঁদের প্রবন্ধটি তাঁরা পাঠিয়েছিলেন সেই বছর ৬ মে, জুলাই মাসে তা প্রকাশিত হয়। নোবেল কমিটির রিপোর্টে লেখা হয় লান্ডসবার্গ ও মেন্ডেলস্টামের প্রবন্ধে রামনের কাজের উল্লেখ আছে, এবং তাঁরা তাঁদের আবিষ্কারের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসাবে রামনের কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সেই কারণে তাঁদের কাজকে স্বাধীন বলা যায় না। তা ছাড়াও তাঁরা জোর দিয়ে বলেন রামন দেখিয়েছেন যে সমস্ত পদার্থেই এই ক্রিয়া দেখা যাবে, দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী শুধুমাত্র কেলাসিত পদার্থের কথা বলেছিলেন। তাই রামনকেই আবিষ্কারকের সম্মান দিতে হয়। মনে রাখতে হবে যে সেই ক্রিয়াটি তখনই তাঁর নামেই পরিচিত হয়েছিল, নোবেল পুরস্কারের ঘোষণাতে আছে রামনকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে ‘for his work on the scattering of light and for the discovery of the effect named after him.’ তাই রামনকে নির্বাচিত করে নোবেল কমিটি কোনো ভুল করেনি।

রামন নিজে পাঁচ জনকে নোবেলের জন্য মনোনীত করেন, তাঁরা হলেন অটো স্টার্ন, এনরিকো ফের্মি, আর্নেস্ট লরেন্স, সুব্রহ্মণিয়ান চন্দ্রশেখর ও জি এন রামচন্দ্রন। এঁদের মধ্যে রামচন্দ্রন ছাড়া বাকিরা পরে পুরস্কার জিতেছেন। মেঘনাদ সাহা একটিই মনোনয়ন পাঠিয়েছিলেন, তাঁর পছন্দ ছিলেন আর্নল্ড সমারফেল্ড। বিভিন্ন সময় সমারফেল্ডের নামে মোট বিরাশিটি মনোনয়ন জমা পড়েছিল, কিন্তু পুরস্কার তাঁর অধরাই রয়ে যায়। ১৯৫১ সালেই এক পথ দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়; মৃত ব্যক্তির নাম নোবেলের জন্য বিবেচনা করা হয় না।

শেষ করি সত্যেন্দ্রনাথের কথা দিয়ে। তাঁকে কোনো বিদেশি বিজ্ঞানী কখনো পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেননি। প্রথমবার তাঁর সমর্থনে মনোনয়ন জমা পড়ার পরে তা বিবেচনার জন্য নোবেল কমিটি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অস্কার ক্লাইনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ক্লাইন বোস সংখ্যায়নের কাজটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করলেও অন্য অনেকের থেকে কম কৃতিত্বের বলে রিপোর্টে লেখেন। তাই বোস সংখ্যায়নের বেশ কয়েকটি প্রয়োগকে পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলেও সত্যেন্দ্রনাথের নাম পুরস্কৃতদের তালিকাতে পাওয়া যাব না। তবে বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবনের জন্য নোবেল পুরস্কারজয়ী উলফগ্যাং কেটার্লের কথাই এখানে শেষ কথা হতে পারে, ‘ব্রহ্মাণ্ডের অর্ধেক কণা যাঁর নাম বহন করে, তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল কিনা তাতে কী আসে যায়?’


জার্মানির ওল্ডেনবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বন্ধু রাজিন্দর সিং দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নোবেল পুরস্কার প্রাপক ও মনোনয়নকারীদের নিয়ে কাজ করে চলেছেন এবং বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ ও বই প্রকাশ করেছেন। অনেক তথ্য তাঁর লেখা থেকে নেওয়া হয়েছে। বাকি তথ্য নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া গেছে। 

 

প্রকাশ অর্চি পত্রিকা, একাদশ সংখ্যা, কলকাতা বইমেলা ২০২৬  

Sunday, 16 August 2026

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা: কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

কোয়ান্টাম বলবিদ্যা: কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


কোয়ান্টাম বলবিদ্যা হল আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম স্তম্ভ, এমনকি প্রধান স্তম্ভ বললেও সম্ভবত বাড়িয়ে বলা হবে না। এখানে ‘আধুনিক বিজ্ঞান’ বলতে আমরা ঠিক কী বোঝাতে চাই, সেটাও বলে নেওয়া ভালো। পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ এবং তার উপর নির্ভর করে আরোহী যুক্তির সাহায্যে গৃহীত সাধারণ সিদ্ধান্ত, এই হল আধুনিক বিজ্ঞানের কর্মপদ্ধতি বা এক কথায় সায়েন্টিফিক মেথড। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা এই শর্তগুলি অবশ্যই পূরণ করে। কিন্তু প্রায়ই তার সিদ্ধান্তগুলি আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া জ্ঞানের বিপরীতে যায়। তার কিছু উদাহরণ আমরা দেখব।

তার আগে বলা দরকার যে আমাদের অভিজ্ঞতারও সীমাবদ্ধতা আছে, এবং তার জন্য আমাদের জ্ঞানও অসম্পূর্ণ। সাধারণভাবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে আমরা প্রয়োগ করি অণুপরমাণুর জগতে, সেগুলিকে আমরা দেখতেও পাই না, বা অন্য কোনোভাবে সরাসরি অনুভব করতেও পারি না। ফলে আমাদের জানা জগতের নিয়মকে যখন তার উপর প্রয়োগ করতে চাই, তখনই নানা অদ্ভুত সমস্যার মুখোমুখি হই।

আরও একটা কথা বলে নিই, এই প্রবন্ধে আলোচিত কোনো মতই আমার নিজের নয়, কিন্তু সেগুলিকে যেভাবে উপস্থাপন করেছি তাতে ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা যথেষ্টই আছে। বিষয়টা অত্যন্ত জটিল, অন্তত আমার কাছে তো বটেই। তবে এই সংশয় শুধুমাত্র আমার একার নয়। এই লেখাতে কিছু প্রশ্নের কথাও আসবে, যেগুলোর সর্বজনসম্মত উত্তর এখনও অজানা।

প্রথমে, একটা পরীক্ষার কথা ভাবা যাক। ধরা যাক আমার হাতে একটা বন্দুক আছে। সামনে আছে একটা দেওয়াল যার মধ্যে পাশাপাশি সমান্তরালভাবে দুটো লম্বাটে গর্ত কাটা রয়েছে, আর এই দেওয়ালের পিছনেও আছে আর একটা দেওয়াল। এবার আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে থাকলাম। কিছু গুলি নিশ্চয় ওই দুটো গর্ত দিয়ে গিয়ে পিছনের দেওয়ালে আঘাত করবে। বুঝতে অসুবিধা নেই যে পিছনের দেওয়ালে কেবল সামনের দেওয়ালের ছিদ্রের অবস্থানের সঙ্গে মিলিয়ে দুটো লম্বাটে এলাকার মধ্যেই গুলি বেঁধার চিহ্ন আমরা দেখতে পাব।

এবার দ্বিতীয় পরীক্ষা। এ ক্ষেত্রে বন্দুকের জায়গায় নেওয়া হয়েছে একটা ইলেকট্রন গান, যার থেকে গুলির বদলে বেরোয় ইলেকট্রন। আগের পরীক্ষার মতো এখানেও রয়েছে একটা দেওয়াল, বা বলা ভালো একটা পর্দা, যার ওপর অমনই সমান্তরালে দুটো লম্বাটে গর্ত কাটা আছে। আগের বার যেখানে দু’নম্বর দেয়াল ছিল, সেখানে এবার এমন একটা পর্দা রাখা হল যেটার ওপর ইলেকট্রন এসে পড়লে সেটা কোথায় পড়েছে তা আমরা বুঝতে পারব। পরীক্ষা দুটো আপাতদৃষ্টিতে প্রায় একই রকম, কিন্তু দু-ক্ষেত্রেই কি আমরা একই ফল পাব? এবারেও কি পিছনের পর্দাতে মাত্র দুটো জায়গাতে গিয়ে পড়বে ইলেকট্রনগুলো


 

উত্তর হল, না। সঙ্গের ছবিতে দেখা যাচ্ছে কেমনভাবে ইলেকট্রনগুলো পর্দার ওপর পড়ে পরপর গায়ে-গায়ে থাকা ঘন ও হালকা পটির (band) ঝালর তৈরি করে। বোঝার সুবিধার জন্য পটির সংখ্যা অবশ্য কম দেখানো হয়েছে ছবিতে। এমনও ঘটা সম্ভব যে, বন্দুকের পরীক্ষায় পিছনের দেওয়ালের যে-অংশে একটাও গুলি পড়ার কথা নয়, পরের পরীক্ষায় ঠিক সেখানেই ইলেকট্রনের সংখ্যা আশপাশের থেকে বেশি! এই পরীক্ষাটার সাধারণ নাম দ্বিছিদ্র পরীক্ষা যেহেতু দুটো ছিদ্রের মধ্য দিয়ে কণা পাঠানোর আয়োজন এতে রয়েছে।

অসংখ্যবার এই 'দ্বিছিদ্র পরীক্ষা’ করা হয়েছে, এবং প্রত্যেকবারই এক ফল পাওয়া গেছে। ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে বোঝা গেল, কেবল কোনো তরঙ্গের বেলাতেই এ ধরনের ঘন ও হালকা পটির বিন্যাস দেখতে পাওয়া সম্ভব। আলোকতরঙ্গ নিয়েও এরকম পরীক্ষা করা হয়েছিল অতীতে, এবং সেখানেও এ রকম পটির ঝালর দেখা গেছে। সত্যি বলতে কী, আলো যে এক প্রকার তরঙ্গ, তা এই ধরনের পরীক্ষা থেকেই প্রমাণিত হয়েছিল। অথচ ইলেকট্রনকে তো আমরা এক ধরনের কণা হিসেবেই গণ্য করি সচরাচর! এই পরীক্ষার সূত্রেই আজ আমরা বলি, কোনো বস্তুর একই সঙ্গে কণা ও তরঙ্গ ধর্ম আছে; ইলেকট্রন যখন একটা গান থেকে বেরোচ্ছে এবং পর্দায় গিয়ে পড়ছে, তখন তাকে কণা হিসাবে ধরে নেওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এর মাঝখানে তার তরঙ্গ ধর্মও প্রতিভাত হচ্ছে।

ইলেকট্রনের এরকম আচরণের পিছনে আছে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অনিশ্চয়তা নীতি। এই নীতির বক্তব্য হল, যতক্ষণ না আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, ততক্ষণ কণাটির গতিশীল অবস্থা সম্পর্কে অনেক কিছুই আমরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারি না।

বন্দুকের গুলি বা আমাদের পরিচিত যে-কোনো বস্তুই নিউটনের গতিবিদ্যা মেনে চলে। এই সূত্র কাজে লাগিয়ে আমরা যে-কোনো মুহূর্তে তার অবস্থান ও ভরবেগ নির্ণয় করতে পারি। আমি দেখি বা না দেখি, প্রতি মুহূর্তে তার অবস্থান ও ভরবেগ যে নির্দিষ্ট ভাবে বলা যেতে পারে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ক্ষেত্রে কিন্তু তা বলা চলে নাযে-মুহূর্ত অবধি আমি কোনো কণাকে পর্যবেক্ষণ করছি না, সেই মুহূর্ত অবধি কণাটির অবস্থান বা ভরবেগ সুনিশ্চিত নয়। কণার অন্যান্য অনেক চরিত্র বা ধর্ম সম্পর্কেও একই কথা বলা চলে।

এই প্রসঙ্গে আসে হাইজ়েনবার্গের অনিশ্চয়তা নীতির কথা। ভের্নার হাইজ়েনবার্গ দেখিয়েছিলেন, কোনো কণার ভরবেগ ও অবস্থান একই সঙ্গে নির্ভুল ভাবে নির্ণয় সম্ভব নয়। অবস্থান যত নির্ভুলভাবে নির্ণয় করব, ভরবেগের ক্ষেত্রে ভুলটা তত বেশি হবে। যে-কোনো নির্দিষ্ট অভিমুখে কোনো কণার অবস্থান নির্ণয়ের ত্রুটি ও ভরবেগ নির্ণয়ের ত্রুটির গুণফল একটা নির্দিষ্ট মানের থেকে কমানো সম্ভব নয়। সেই ন্যূনতম মানটি প্লাঙ্কের ধ্রুবকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ‘প্লাঙ্কের ধ্রুবক’ কোয়ান্টাম বিজ্ঞানের এক সর্বব্যাপী ধ্রুবক, এটির কথা প্রথম এসেছিল মাক্স প্লাঙ্কের গবেষণাতে। কিন্তু এটির মান এতই কম যে আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতাতে এই অনিশ্চয়তাকে আমরা অনুভব করতে পারি না।

হাইজ়েনবার্গের অনিশ্চয়তাকে আমরা দু’ভাবে ভাবতে পারি। এক, ইলেকট্রনের অবস্থান ও ভরবেগ সুনির্দিষ্ট কিন্তু আমরা তা নির্ণয় করতে পারছি না, সেটা প্রকৃতির সীমাবদ্ধতা। দুই, এ সবের কোনো সুনির্দিষ্ট মানেরই অস্তিত্ব নেই। নানা রকম মান থাকতে পারে, এবং তাদের সম্ভাবনাও নির্ণয় করা যায়। আমাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্রথম অবস্থাটাকে মেনে নিতে অসুবিধা নেই, আমরা প্রায়শই বিভিন্ন সম্ভাবনার মধ্যে একটিকে রূপায়িত হতে দেখি। কয়েন টস করার সময় হেড বা টেল, যে-কোনো একটি পড়ার সম্ভাবনা আছে। কোনটি পড়বে তা আগে থেকে বলতে পারি না কারণ কয়েনটা কত জোরে বা কিভাবে ছোড়া হল, কোথায় পড়বে, সেই সময় হাওয়ার বেগ কত ইত্যাদি নানা বিষয় আমাদের জানা নেই। থাকলে আমরা নিশ্চিত ভাবেই বলতে পারতাম হেড ও টেলের মধ্যে কোনটি পড়বে।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ‘কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা’ দিয়েছিলেন নিলস্‌ বোর ও হাইজ়েনবার্গ (কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা: এরকম নামের কারণ বোর ছিলেন ডেনমার্কে কোপেনহাগেনের বাসিন্দা, এবং হাইজ়েনবার্গ জার্মান হলেও বোর-এর সান্নিধ্যেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রাথমিক কাজগুলো করেছিলেন)সেই ব্যাখ্যা অনুযায়ী প্রথমটা সাধারণ বুদ্ধির সঙ্গে মিললেও দ্বিতীয়টাই আসলে সঠিক। কণার আচরণ সংক্রান্ত এই অনিশ্চয়তাই বাস্তব, এটা আমাদের পরিমাপ পদ্ধতির বা যন্ত্রের সীমাবদ্ধতা নয়। ইলেকট্রনটা গান থেকে রওনা হওয়া এবং পিছনের পর্দার ওপর পড়ার মধ্যবর্তী সময়ে আমরা তাকে কোনোভাবে পর্যবেক্ষণ করিনি, তাই সে কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে তা বলার অধিকার আমাদের নেই। কাজেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভাষায় বলা উচিত, প্রতিটি ইলেকট্রন দুটো ছিদ্র দিয়েই যায়! আমরা যখন বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে জানার চেষ্টা করি যে, কোন ছিদ্র দিয়ে ইলেকট্রনটি গেছে, একমাত্র তখনই সে একটা নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে।

আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতায় এমন কোনো ঘটনা অসম্ভবকোনো বস্তুই এক সঙ্গে দু’ জায়গায় থাকতে পারে না। যে-কোনো একটা ইলেকট্রন কোনো একটা নির্দিষ্ট ছিদ্র দিয়েই নিশ্চয় গেছে। সেটা ধরার জন্য তাহলে আর-একটা পরীক্ষা করা যাক। আমরা ওই দুটো ছিদ্রের পিছনে এমন যন্ত্র রাখলাম যেগুলো কোনো ইলেকট্রন ছিদ্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়া মাত্র আমাদের সঙ্কেত পাঠাবে। আশ্চর্য! এবার পর্দাতে কিন্তু আর ঝালর আসবে না, প্রথম পরীক্ষায় বন্দুকের গুলি যে-প্যাটার্ন তৈরি করেছিল, সেটাই ফিরে আসবে। অর্থাৎ যখনই আমরা জানতে পারছি ইলেকট্রনটা কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে, ঝালর আর থাকছে না।

মনে রাখতে হবে যন্ত্রটা আছে ছিদ্রের পিছনে; তার মানে ইলেকট্রনের পক্ষে আগে থেকে জানা সম্ভব নয় যে ছিদ্রের পিছনে কী আছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ করছি বলেই ইলেকট্রনটা একটি নির্দিষ্ট ছিদ্রের ভিতর দিয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ইলেকট্রন ও বন্দুকের গুলি একই রকম প্যাটার্ন তৈরি করবে।

এবার ভাবুন, আমরা ছিদ্রের পিছনের যন্ত্রটাকে বন্ধ রেখেছি। ইলেকট্রনটা প্রথম পর্দাটা পেরোনোর পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেব যন্ত্রটাকে চালু করব কিনা। অর্থাৎ আমি কখন যন্ত্রটাকে চালু করব, আর কখন করব না, তা আগে থেকে নির্ধারিত নয়। অথচ ইলেকট্রন ছিদ্র পেরোনোর পরে যন্ত্র চালু করলেও আমরা ঝালর পাব না। ইলেকট্রন চেনার যন্ত্রের জায়গায় একটা দাঁড়িপাল্লা বা স্কেল রাখলে কিন্তু ঝালরের কোনো পরিবর্তন হবে না, কারণ সেগুলো ইলেকট্রন শনাক্ত করার যন্ত্র নয়। ইলেকট্রন নিয়ে পরীক্ষার কথা বলা হচ্ছে বলে এই কণাটির কথাই বারে বারে উঠছে, কিন্তু যে-কোনো ক্ষুদ্র অণু বা পরমাণু, কিংবা পরমাণুর যে-কোনো কণা-উপাদান নিয়ে পরীক্ষা করা হলেও তা থেকে এরকমই ফল মিলবে।

কোয়ান্টাম তত্ত্বের এই অদ্ভুত চরিত্রের জন্য অনেকে দাবি করেন যে ইলেকট্রন (বা অন্য কোনো কণা) কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে তা একমাত্র কোনো সচেতন পর্যবেক্ষকের পক্ষেই নির্ণয় করা সম্ভব। অর্থাৎ বিশ্বে বুদ্ধিবৃত্তি বা চেতনার ভূমিকা আছে। এই মতকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার কোনো উপায় জানা নেই। তবে অনেক বিজ্ঞানীই কোয়ান্টাম জগতের এই ‘খাপছাড়া’ চরিত্রকে সমর্থন করেন না, এঁদের মধ্যে আছেন বহু প্রখ্যাত ব্যক্তিও। যেমন আইনস্টাইন। আইনস্টাইনের বিখ্যাত প্রশ্ন, কেউ যখন চাঁদের দিকে তাকাচ্ছে না, তখন কি চাঁদের অস্তিত্ব নেই? রজার পেনরোজ, ইলিয়া প্রিগোঝিনের মতো নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরাও এই মতের বিরোধিতা করেছেন। বিশেষ করে প্রিগোঝিন অণুপরমাণুর জগৎ ও আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগৎকে তাপগতিতত্ত্বের এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলার ধারণার সাহায্যে নির্দিষ্টভাবে আলাদা করতে চেয়েছেন। তবে বিজ্ঞানীদের মতামত তো আর প্রমাণ নয়, তাই বিজ্ঞান এখনও তাকে স্বীকার করে না। প্রকৃত সত্য এটাই যে এই সমস্যার সমাধান এখনও আমাদের জানা নেই।

অপর একটি উদাহরণের কথা বলি। আমাদের জীবন সূর্য থেকে পাওয়া শক্তির ওপর নির্ভরশীল। সূর্যে এই শক্তি সৃষ্টির জন্য যে নিউক্লিয় বিক্রিয়াগুলি হয়, তাতে এক ধরনের ঘটনা ঘটে, যার নাম টানেলিং বা সুড়ঙ্গখনন। শব্দটা রূপকার্থে ব্যবহৃত, সত্যি সত্যি কোনো সুড়ঙ্গের দেখা এখানে মিলবে না। ধরা যাক দুটি প্রোটনের মধ্যে বিক্রিয়া হচ্ছে। এখানে টানেলিং-এর সময় কণার বেগের মান দাঁড়ায় ‘অবাস্তব’— এটা গণিতজগতের শব্দ, এর সঙ্গে জড়িত আছে -1-এর বর্গমূল (√-1)। এই অবাস্তব মানকে কোনোভাবেই মাপা সম্ভব নয়, অবাস্তব বেগের কথা আমরা চিন্তাও করতে পারি না; অথচ অন্য কোনোভাবে এই বিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করাও সম্ভব নয়। শুধু সূর্যে কেন, আমাদের নানা ইলেকট্রিকাল ও ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রে টানেলিং-এর ঘটনাকে নিয়মিত ব্যবহার করা হয়। এই বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এই বিষয়ে গবেষণার জন্যই।

আমরা যখন কোনো বস্তুর অস্তিত্বের কথা বলি, তখন তার কতকগুলি সুনির্দিষ্ট ধর্মের প্রেক্ষিতে তাকে চিন্তা করি। আমাদের অভিজ্ঞতায় যে-কোনো বস্তু একই সময়ে একটাই জায়গায় অবস্থান করে, এবং তার নির্দিষ্ট বেগ থাকে। অথচ দ্বিছিদ্র পরীক্ষা দেখাচ্ছে একই সঙ্গে একই বস্তুর দুটি ভিন্ন স্থানে থাকার সম্ভাবনা আছে (উপরের উদাহরণের বেলায় একই ইলেকট্রন থাকে দুটি ছিদ্রপথে)। আবার টানেলিং-এর সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, বস্তুর বেগ অবাস্তব (বিশেষ গাণিতিক অর্থে) হতে পারে। এই সমস্ত কিছুকে আমাদের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানের সঙ্গে মেলানো সহজ নয়, হয়তো বা অসম্ভব। অভিজ্ঞতার কাছাকাছি আসে এমন একটি ব্যাখ্যার কথা পরে আলোচনায় আসবে, কিন্তু আমরা দেখব সেখানেও সমস্যা আছে।

আইনস্টাইন সারা জীবন কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় নিহিত এই অনিশ্চয়তাকে স্বীকার করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্ভাবনাভিত্তিক চরিত্র প্রকৃতপক্ষে অলীক। আসলে সমস্ত চরিত্রই নির্দিষ্ট, কিন্তু তারা লুকানো আছে, সরাসরি আমাদের কাছে প্রকাশিত হচ্ছে না। যেমন, প্রতিটি ইলেকট্রন সম্পর্কে কিছু বাড়তি তথ্য জানা থাকলে আমরা না মেপেই হয়তো বলতে পারব সে কোন ছিদ্র দিয়ে গেছে। একে বলা হয় Theory of local hidden variable, বাংলাতে বলি ‘স্থানীয় লুকানো চলরাশির তত্ত্ব’। ‘স্থানীয়’ বলতে ঠিক কী বোঝায় সে কথায় আমরা পরে আসছি। ১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন এবং আরও দুই বিজ্ঞানী বরিস পোডোলস্কি ও নাথান রোজেন যে-পরীক্ষার কথা প্রস্তাব করেছিলেন, তার থেকে কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতে বাস্তবতার চরিত্র সম্পর্কে একটা প্রশ্ন ওঠে। সেটি এই তিন বিজ্ঞানীর পদবীর আদ্যক্ষর নিয়ে ইপিআর (EPR) প্যারাডক্স বা কূটাভাস নামে পরিচিত।

আইনস্টাইনদের এই গবেষণাপত্র প্রকাশের পরে তিরিশ বছর অবধি এমন কোনো পরীক্ষার কথা চিন্তা করা যায়নি যেখানে তাঁদের মত ঠিক না ভুল তা প্রমাণ করা যাবে। ১৯৬৪ সালে সেই কাজটি করলেন জন স্টুয়ার্ট বেল। বিষয়টি বেশ জটিল, আমরা এই লেখাতে তার মধ্যে যাব না। বেল যে-ধরনের পরীক্ষার প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা করা সম্ভব হয়েছে এবং দেখা গেছে কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তাই বাস্তব। এই সমস্ত পরীক্ষার জন্য জন ক্লাউজার, আলাঁ আস্পে ও অ্যান্টন জেইলিঙ্গার, এই তিনজন বিজ্ঞানীকে ২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এখন এটা প্রমাণিত যে অণুপরমাণুর জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে যে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, তা সম্ভাবনার ওপরেই নির্মিত, তার নীচে অন্য কোনো স্থানীয় বাস্তবতা লুকিয়ে নেই।

এই ধরনের পরীক্ষাতে দেখা গেছে, দুটি কণা বিরাট দূরত্বেও নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে। এটিকে বলা হয় বিজড়িত (Entangled) অবস্থা। এরকম দুটো বিজড়িত কণার মধ্যে একটির কোনো চরিত্র পরিমাপ করলেই সঙ্গে সঙ্গে অপরটির চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। ধরা যাক একটি কণা আছে পৃথিবীতে, অপরটি আছে নেপচুন গ্রহের পাশে কোনো মহাকাশযানে। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী শূন্য মাধ্যমে কোনো কিছুই আলোর থেকে দ্রুত যেতে পারে না। পৃথিবী থেকে নেপচুনে আলো যেতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, অথচ পৃথিবীর কণাটির পরিমাপের সঙ্গে সঙ্গেই নেপচুনের কণাটিরও পরিবর্তন ঘটবে। নেপচুনের দূরত্বে এই পরীক্ষাটা করা আমাদের বর্তমান প্রযুক্তির অতীত, কিন্তু পৃথিবী ও কৃত্রিম উপগ্রহের মধ্যে তা সত্যিই করে দেখা সম্ভব হয়েছে। কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে সঙ্কেত বিনিময়ের প্রয়োজন নেই; দুটি কণার দূরত্ব যত বড়ই হোক না কেন, ধরে নিতে হবে তারা একই তন্ত্র বা সিস্টেমের অংশ। তার সঙ্গে আপেক্ষিকতার বিরোধ ঘটে না।

বাস্তবে কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা কিন্তু বিশেষ নতুন কিছু বলে না, বা কোনো নতুন দিকনির্দেশ দেয় না। তাই অনেক বিজ্ঞানীরই এটা 'না-পসন্দ'। তাঁদের মতে, কোপেনহাগেন ব্যাখ্যা হল আসলে কোনো কিছু চিন্তা না করে অঙ্ক কষার প্রস্তাব। অঙ্কের উত্তর সঠিক আসছে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে সে ব্যাখ্যাটিও সঠিক; ব্যাখ্যাটি তো বিশেষ কিছু বলেইনি।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যরকম ব্যাখ্যাও সম্ভব, যদিও সেগুলিতেও সমস্যা আছে। এই ভিন্ন ব্যাখ্যাগুলির একটির সূচনা করেছিলেন বস্তুর তরঙ্গ ধর্মের আবিষ্কারক লুই দ্য ব্রয়; পরে সেটিকে এগিয়ে নিয়ে যান ডেভিড বোম। এখানে ধরে নেওয়া হয় যে প্রতিটি কণার নির্দিষ্ট অবস্থান, ভরবেগ ইত্যাদি আছে, কিন্তু আমাদের কাছে তা নিশ্চিত রূপে প্রতিভাত হচ্ছে না, তার কারণ সূচনাতে আমরা সেটির সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারিনি।

আবার আমরা কয়েন টসের কথায় ফিরে যাই। তার সঙ্গে এই দ্য ব্রয়-বোম-এর ব্যাখ্যার পার্থক্য প্রথম দৃষ্টিতে চোখে পড়ে না। তাহলে সেই ব্যাখ্যা মেনে নিতে অসুবিধা কোথায়? সমস্যা এটাই যে, সেখানে একটি কণার চরিত্র তার সঙ্গে বিজড়িত অন্য সমস্ত কণার উপর নির্ভর করে, অর্থাৎ তা অস্থানিক, তা শুধুমাত্র ওই কণাটির সঙ্গে যুক্ত নয়। যেমন, কোনো কণার বেগ নির্ভর করে তার সঙ্গে বিজড়িত অন্য সমস্ত কণার অবস্থান ও গতির দশার উপর। এই বাস্তবতাও আমাদের সাধারণ ধারণার বাইরে। আইনস্টাইন এই কারণেই বোম-এর তত্ত্বকেও মেনে নিতে পারেননি, তিনি বারবারই স্থানীয় বাস্তবতার উপর জোর দিয়েছিলেন।

কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতে তরঙ্গ অপেক্ষকের কথা আসে, কিন্তু কোপেনহাগেন ব্যাখ্যাতে তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই, তা নেহাতই একটি গাণিতিক প্রকরণ। দ্য ব্রয়-বোমের তত্ত্বে সেই তরঙ্গের বাস্তব অস্তিত্ব আছে, তা কণার পথ দেখিয়ে দেয়, তাই তার নাম হল পাইলট তরঙ্গ। কিন্তু এই তরঙ্গের কোনো শক্তি বা ভরবেগ নেই; সেই কারণে তাকে ধরার কোনো উপায়ও আমাদের নেই। আমাদের পরিচিত বস্তুর চরিত্রের সঙ্গে এই সমস্ত ধারণাকে মেলানো সহজ নয়।

বোমের তত্ত্বে কোনো মুহূর্তে একটি কণার কোনো পরিবর্তন ঘটলে সঙ্গে সঙ্গেই অন্য সমস্ত কণার চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে। সেই পরিবর্তন ঘটায় যে বল, তাকে বলা হয় ‘অ্যাকশন অ্যাট আ ডিসট্যান্স’এর মোদ্দা কথাটা হল, একটি বস্তু অন্য বস্তুর উপরে প্রভাব ফেলছে, কিন্তু মাঝখানে কোনো মাধ্যম নেই। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব এই ধরনের বলের কথাই বলে। এই চরিত্রও আমাদের অভিজ্ঞতার বিপক্ষে যায় এবং নিউটনের সময়েই এ সম্পর্কে আপত্তি উঠেছিল। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে এ রকম কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন পড়ে না। কিন্তু কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতে সেই সমস্যাই আবার ফিরে আসছে।

তার পরিবর্তে যদি আমরা ধরেও নিই যে এই বল কণাগুলির মধ্যে সঙ্কেত বিনিময়ের মাধ্যমে বাহিত হয়, তাহলে সেই সঙ্কেতকে আলোর থেকে দ্রুতগামী হতে হবে, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী যা অসম্ভব। বিজড়িত কণার ক্ষেত্রে এই কথা আগে এসেছে। অন্য ভাবে ভাবা যাক। ধরা যাক দ্বিছিদ্র পরীক্ষাতে দুটি ছিদ্রের প্রতিটি দিয়ে একটি ইলেকট্রনের যাওয়ার সম্ভাবনা পঞ্চাশ-পঞ্চাশ, কিন্তু যে মুহূর্তে তাকে আমরা প্রথম ছিদ্রে পেলাম, সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়টিতে তাকে পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্য হয়ে গেল। ছিদ্রগুলোর দূরত্ব যতই হোক না কেন, এর কোনো অন্যথা হবে না। যদি কোনো সঙ্কেত প্রথম ছিদ্রে ইলেকট্রনের আসার খবরটা অন্য ছিদ্রে নিয়ে যায়, তার বেগ আলোর থেকে বেশি, এমনকি অসীমও হতে পারে। অবশ্য এই সঙ্কেতকে আমরা তথ্য পাঠাতে ব্যবহার করতে পারব না, কিন্তু অসীম বেগের কল্পনা করাও আমাদের পক্ষে কঠিন।

বারবার বলা হচ্ছে যে, কোয়ান্টাম হল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুপরমাণুর জগৎ, রোজকার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার সংঘাত। কিন্তু আমাদের বাস্তব জগৎও অণুপরমাণু দিয়েই গঠিত। ঠিক কোনখানে কোয়ান্টাম জগতের শেষ আর সাধারণ জগতের শুরু, তার কি কোনো সীমানা টানা সম্ভব? কোয়ান্টাম জগৎ সাধারণভাবে আমাদের অনুভূতির বাইরে, একমাত্র যন্ত্রের মাধ্যমেই তার সম্পর্কে আমরা জ্ঞানলাভ করতে পারি। যন্ত্র হল আমাদের সাধারণ বৃহদায়তন (macroscopic) জগতের অঙ্গ, আণুবীক্ষণিক (microscopic) জগতের সঙ্গে তার ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া বিষয়ে আমাদের জ্ঞান এখনও সীমিত।

আরও অনেক সমস্যার মুখোমুখি আমাদের হতে হয় যেগুলোর সমাধানের পথ নিয়ে অনেকেই চিন্তা করছেন, কিন্তু সঠিক পথ কেউ পেয়েছেন এমন কথা বলা যায় না। অথচ কোয়ান্টাম বলবিদ্যা বিজ্ঞানের সব থেকে সফল তত্ত্ব, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এটি যে-বাস্তবতার কথা বলে তাকে বোঝার অক্ষমতার মূলে কি আমাদের অভিজ্ঞতার অভাব? অনেকেই সেই কথা বলে কোয়ান্টাম লজিকের অবতারণা করেন। অনেকে মনে করেন যে প্রতি মুহূর্তে আমাদের জগৎ অসংখ্য জগতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে, যাদের কোনোটির সঙ্গে কোনোটির যোগাযোগ নেই। ইলেকট্রনটি একই সঙ্গে দুটি ছিদ্র দিয়েই যায়, কিন্তু দুটি ভিন্ন জগতে, যাদের আর কোনোদিন দেখা হবে না। এই মতকে প্রমাণ বা অপ্রমাণ করার কোনো উপায় নেই। এই সমস্ত তত্ত্ব ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কোপেনহাগেন ব্যাখ্যার মধ্যে কোনটা ঠিক কোনটা ভুল তা নির্ণয় করা যেতে পারে এমন কোনো পরীক্ষা এখনও পর্যন্ত কল্পনা করা সম্ভব হয়নি।


নির্বাচিত তথ্যসূত্র


বিজ্ঞান: ব্যক্তি যুক্তি সময় সমাজ, পলাশ বরন পাল, অনুষ্টুপ, ২০১৬

The Road to Reality, Roger Penrose, Vintage, 2006

In Search of Schrödinger's Cat, John Gribbin, Black Swan, 1985

Science, Order, and Creativity: A Dramatic New Look at the Creative Roots of Science and Life, David Bohm, Bantam Press, 1987

প্রকাশঃ শূন্য দ্বিতীয় সংখ্যা