Showing posts with label কল্পবিজ্ঞান প্রবন্ধ. Show all posts
Showing posts with label কল্পবিজ্ঞান প্রবন্ধ. Show all posts

Friday, 20 November 2020

শতবর্ষে আইজ্যাক আসিমভ

 

শতবর্ষে আইজ্যাক আসিমভ

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

    কল্পবিজ্ঞান বা সায়েন্স ফিকশনের স্বর্ণযুগ ধরা হয় গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের শেষ থেকে পঞ্চাশের দশকের শেষ পর্যন্ত সময়কালকে। তিরিশের দশকে কল্পবিজ্ঞান ছিল মূলত রূপকথার আধুনিক সংস্করণ; স্বর্ণযুগের লেখকরা কাহিনির বিজ্ঞানকে বাস্তবোচিত করে তোলেন। সমাজ ও বিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্ক তাঁদের লেখায় ধরা দেয়। সেই সময়ের সব থেকে বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখকদের মধ্যে পড়বেন রে ব্র্যাডবুরি, আর্থার সি ক্লার্ক, রবার্ট হেইনলেইন, ফ্রেডরিক পোল ও আইজ্যাক আসিমভ। এঁদের মধ্যে আসিমভ বয়সে ছোটদের দলে পড়লেও লেখা শুরু করেছেন অনেকেরই আগে। তিনি যখন প্রথম গল্প প্রকাশ করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স উনিশ। জন ক্যাম্পবেল সম্পাদিত Astounding Science Fiction পত্রিকার জুলাই ১৯৩৯ সংখ্যাটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই কল্পবিজ্ঞানে স্বর্ণযুগের সূচনা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। ঘটনাচক্রে সেই সংখ্যাতে আসিমভের গল্প প্রথম ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল। 

       কোনো একটি বিশেষ গল্প বা উপন্যাস নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগে এই নিবন্ধে নেই, তবে প্রথম প্রকাশিত সেই Trends গল্পটিতেই আমরা আসিমভের পরবর্তী অনেক রচনার মূল সূত্র খুঁজে পাই। গল্প লেখার কয়েক মাস পরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল, গল্পে সেই ভবিষ্যৎবাণীও ছিল। তবে সেই সময়ে অধিকাংশ মানুষই যুদ্ধ যে আসন্ন সে কথা অনুমান করেছিলেন, তাতে আসিমভের আলাদা করে কোনো কৃতিত্ব নেই। মহাকাশ অভিযানের সামাজিক বিরোধিতা ছিল এই গল্পের উপজীব্য, সেখানে এসেছে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির প্রতি বৃহত্তর সমাজের সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কথা। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের বিরোধিতা সমাজে আরো অনেক বিস্তার লাভ করেছে সন্দেহ নেই, সেই দিক থেকে আসিমভকে আমরা ভবিষ্যৎবক্তার দলে ফেলতে পারি। 

       আসিমভের জন্মের দিন সঠিক জানা নেই, তিনি নিজে লিখতেন ১৯২০ সালের ২ জানুয়ারি। সেই হিসাব ধরলে আমরা তাঁর জন্ম শতবর্ষ পেরিয়ে এলাম। বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত রাশিয়াতে তাঁর জন্ম, তাঁর তিন বছর বয়সে তাঁর বাবা মা গৃহযুদ্ধবিদীর্ণ রাশিয়া ছেড়ে আমেরিকাতে চলে আসেন। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন নিয়ে মাস্টার্স পাস করেন ১৯৪১ সালে, এর পর ১৯৪৮ সালে সেই প্রতিষ্ঠান থেকেই রসায়নে ডক্টরেট করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য গবেষণাতে ছেদ পড়েছিল। ১৯৪৯ সালে তিনি বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ মেডিসিনে জৈবরসায়ন পড়ানো শুরু করছিলেন। লেখালেখির জন্য গবেষণা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পড়ানো তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালে তিনি প্রফেসর পদে উন্নীত হন। ১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৮৩ সালে এক অস্ত্রোপচারের সময় তাঁকে যে রক্ত দেওয়া হয়েছিল, তা থেকে তাঁর এইচআইভি সংক্রমণ ঘটেছিল, কিন্তু ডাক্তাররা  সেই কথা প্রকাশ করতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পরে তাঁর স্ত্রী আত্মজীবনীতে সেই কথা লিখেছিলেন।

       ব্যক্তি আসিমভ বেশ বিতর্কিত চরিত্র। গবেষণা না করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একসময় তাঁকে বরখাস্ত করেছিলেন, দু’বছর লড়াই করে তিনি চাকরি ফিরে পেয়েছিলেন। মহিলাদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার কখনো কখনো ভদ্রতার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইকিউ নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করা হয়; আসিমভ ছিলেন উচ্চ আইকিউসম্পন্ন ব্যক্তিদের সংস্থা মেনসার মার্কিন শাখার সহসভাপতি। তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে মেনসার অনেক সদস্য অতিরিক্ত আগ্রাসী ব্যবহার করে, অথচ মেনসার সদস্যপদ নিয়ে তাঁর বেশ অহঙ্কার ছিল। নিজের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে তাঁর ধারনা বেশ উঁচু ছিল সন্দেহ নেই, তিনি মনে করতেন জীবনে তাঁর থেকে বুদ্ধিমান দুজনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল, জ্যোতির্বিদ কার্ল সাগান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী মার্ভিন মিনস্কি।

       বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্য অনেক প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন আসিমভ, সেই বিষয়ে তাঁর লিখিত বইয়ের সংখ্যা একশো কুড়ি। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিদ্যা – নানা বিষয়ে তিনি বই লিখেছিলেন, প্রায় সবগুলিই বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সাধারণের জন্য বিজ্ঞান লিখতে গিয়ে বিজ্ঞানকে অতিসরলীকরণের পথে হাঁটেননি আসিমভ। বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা করাতে তাঁর অসাধারণ দক্ষতার জন্য শুধু সাধারণ মানুষ নয়, তাঁর বইগুলি সেই বিষয়ে গবেষকদেরও উপকারে লেগেছিল। লিখেছেন জৈবসসায়নের পাঠ্য পুস্তক। বিশ্বউষ্ণায়ন, বায়ুদূষণ ইত্যাদি বিষয়ে লিখেছেন সত্তরের দশকেই; এই সমস্ত পরিবেশগত সমস্যার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে তাঁর বিশেষ ভূমিকা আছে।  

       লেখালেখির বাইরেও বিজ্ঞান চেতনা প্রসারের জন্যও তিনি সচেষ্ট ছিলেন। তথাকথিত অলৌকিক ঘটনার পিছনে সত্য উদ্ঘাটনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে উঠেছিল একটি সংস্থা, কমিটি ফর দি সায়েন্টিফিক ইনভেস্টিগেশন অফ দি ক্লেমস অফ দি প্যারানর্মাল, পরবর্তীকালে যা নাম পালটে হয়েছে কমিটি ফর স্কেপটিকাল এনকোয়ারি। আসিমভ ছিলেন এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, তাঁর খ্যাতির সুবাদেই এই সংস্থা সাধারণের মধ্যে পরিচিতি লাভ করেছিল। তিনি ছিলেন স্বঘোষিত নাস্তিক, গত শতাব্দীর মধ্যভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন ইহুদির পক্ষে এই স্বীকারোক্তি খুব সহজ কথা ছিল না।

       আসিমভের সমস্ত রচনা নিয়ে আলোচনা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়, আমরা শুধু তাঁর কল্পবিজ্ঞান রচনার দিকেই চোখ রাখব।। কল্পবিজ্ঞানের বাইরে বেশ কয়েকটি রহস্য কাহিনি তিনি লিখেছিলেন, কিন্তু সেগুলি আমাদের আলোচনার পরিধির বাইরে। কল্পবিজ্ঞানেও মাত্র কয়েকটি গল্প বা উপন্যাসের মধ্যেই এই প্রবন্ধ সীমাবদ্ধ থাকবে। নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ব্যক্তিগত পছন্দই প্রাধান্য পেয়েছে, তাই সেই বিষয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন।

       আসিমভ লিখতে ভালবাসতেন, সমস্ত লেখা মিলিয়ে মোট ছাপা শব্দের পরিমাণ দু কোটি ছাপিয়ে যাবে। তাঁর লেখালেখির জীবনকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। কল্পবিজ্ঞানের স্বর্ণযুগের শুরুতেই প্রথম গল্প প্রকাশ করলেও তিনি তখনই বিশেষ পরিচিতি লাভ করেননি, তবে কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি সবচেয়ে বিখ্যাত লেখকদের মধ্যে জায়গা করে নেন। উনিশশো পঞ্চাশের দশকের শেষে স্বর্ণযুগের অবসান হয়। এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনার সুযোগ এই লেখাতে নেই, তবে একথা বলা যেতেই পারে যে স্বর্ণযুগের সমাপ্তিতে কল্পবিজ্ঞানের ধারা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কল্পবিজ্ঞানের উপর অনেক বেশি পড়তে শুরু করেছিল। আসিমভ এই সময় কল্পবিজ্ঞান লেখা পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে বিজ্ঞানের বই লেখা শুরু করেন। তাঁর সব সেরা লেখাগুলি সেই স্বর্ণযুগের দুই দশকের মধ্যের রচনা। প্রায় দেড় দশক পরে তিনি আবার কল্পবিজ্ঞানের জগতে ফিরে আসেন। কিন্তু একমাত্র The Gods Themselves উপন্যাস ছাড়া এই সময়ের অন্য লেখাগুলির মধ্যে আমি পুরানো আসিমভকে খুঁজে পাই না। প্রথম যুগে লেখা বেশ কয়েকটি অসাধারণ গল্পকে তিনি এই সময় উপন্যাসের রূপ দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলি আমার খুবই সাধারণ মানের মনে হয়। এই সময় তাঁর বিখ্যাত Foundation সিরিজে তিনি আরও কয়েকটি উপন্যাস যোগ করেছিলেন, কিন্তু তার জন্য মাঝে মাঝেই গল্পের মধ্যে স্ববিরোধিতা এসেছে, গল্পের রসও ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তাই আমি আলোচনার জন্য তাঁর প্রথম যুগের কয়েকটি লেখাই বেছে নিয়েছি।

       সমসাময়িক বিখ্যাত লেখক আর্থার সি ক্লার্কের সঙ্গে আসিমভের তুলনা করলে আমরা তাঁর লেখার মূল বৈশিষ্ট্যগুলো চিহ্নিত করতে পারি। লেখালেখির ক্ষেত্রে সম্পাদক জন ক্যাম্পবেল ছিলেন আসিমভের পিতৃপ্রতিম, অথচ সচেতনভাবেই ক্যাম্পবেলের জাতিবাদী ও ফ্যাসিবাদী চিন্তাভাবনাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ক্লার্কের লেখাও জাতিধর্মবর্ণ বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাবাদের জয়গান গেয়েছে। ক্লার্কের রচনাতে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা খুব কম। নিজে বিজ্ঞানের ডক্টরেট ও শিক্ষক, জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই লিখেছেন; কিন্তু কাহিনি রচনাতে আসিমভের কল্পনার উড়ান অনেক বেশি। তাঁর রচনা আমাদের নিয়ে যায় দূর ভবিষ্যতে, যেখানে গোটা ছায়াপথই হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবসভ্যতার ক্রীড়াভূমি।

       ক্লার্কের মতোই আসিমভও ছিলেন অপরিমেয় আশাবাদী, অথচ তাঁর কাহিনিতে দেখি বিজ্ঞানের প্রগতি  সমাজের বিকাশকে বিশেষ পরিবর্তন করতে পারেনি। প্রায়শই তা বন্দী হয়ে গেছে প্রাচীনযুগের পুরোহিততন্ত্র ও মধ্যযুগীয় সামন্ততন্ত্রের ঘেরাটোপে। এ কিন্তু কোনো সমালোচনা নয়, সমাজ ও ইতিহাস বিষয়ে অন্তর্দৃষ্টি আসিমভের ভবিষ্যতের কাহিনি লেখার প্রধান শক্তি। ক্লার্কের লেখাতে পাত্রপাত্রীরা ভবিষ্যৎ সমাজের অংশ। আসিমভের ভবিষ্যত সমাজ আমাদের বর্তমানের প্রতিচ্ছবি, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা  বিজ্ঞানের সাহায্যে প্রগতির পথ সন্ধান করেছে। তাঁর End of Eternity উপন্যাস সচেতনভাবেই ইতিহাসের পৌনঃপুনিকতার শিকল ভাঙতে চেয়েছে।

       তাঁর সব থেকে বিখ্যাত লেখাগুলির মধ্যে পড়বে Foundation সিরিজের কাহিনিগুলি, আসিমভ সেখানে সচেতনভাবেই গিবনের বিখ্যাত ইতিহাস The Decline and fall of Roman Empire-কে অনুসরণ করেছেন। অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতা, হাতে কলমে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার পরিবর্তে অতীতের পণ্ডিতদের লিখিত বইয়ের সাক্ষ্যের উপর গুরুত্ব দান, সামরিক শক্তির উপর অতিনির্ভরতা – নানা কারণে রোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়েছিল। প্রথম বইয়ের সূচনাতে ছায়াপথব্যাপী সাম্রাজ্য একই কারণে ধ্বংস হচ্ছে, (যদিও প্রথম বইয়ের সূচনাটা আসিমভ লিখেছিলেন কয়েকটি গল্প প্রকাশের পরে, সেগুলিকে একসঙ্গে করে উপন্যাস হিসাবে প্রকাশের সময়)। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ইউরোপে নেমে এসেছিল অন্ধকার যুগ, পুরোহিততন্ত্রের রমরমার সময়। ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণ শুরু হয়েছিল ফ্লোরেন্স ও ভেনিসের বণিকদের হাত ধরে। তারপরে আসে শিল্পবিপ্লব ও গণতন্ত্রের যুগ। আসিমভের গল্পও একই ধারা অনুসরণ করেছে, কিন্তু তা কখনোই ঐতিহাসিক কাহিনি নয়। এই পরিবর্তন ইতিহাসের অমোঘ কিন্তু উদ্দেশ্যহীন পরিবর্তন নয়, তা সচেতন হস্তক্ষেপের ফল। এখানেই প্রকাশ পেয়েছে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁর অপরিমেয় আশাবাদ। সেই আশাবাদের প্রতিফলন দেখতে পাই Nemesis উপন্যাসে, যেখানে মানুষ সৌরজগতের সঙ্গে সংঘর্ষে উদ্যত এক নক্ষত্রকে তার প্রযুক্তির সাহায্যে সরিয়ে দিয়েছে।

       এই গল্পগুলিতেই আসিমভ এনেছেন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কল্পনাটিকে, সাইকোহিস্ট্রি। আসিমভ যে কটি শব্দ ইংরাজি অভিধানে যুক্ত করেছেন, তার মধ্যে এটি অন্যতম। ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, মনোবিদ্যা ও পরিসংখ্যানবিদ্যার মিলিত রূপ সাইকোহিস্ট্রি মানবসভ্যতা কোন পথে এগোবে তা নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে। সিরিজের পরের গল্পগুলিতে অবশ্য আসিমভ এই ধারা থেকে সরে এসেছিলেন, ফলে সাইকোহিস্ট্রি প্রায় পুরোপুরি মনোবিদ্যার পথ ধরেছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য সাইকোহিস্ট্রির এই ধারণার মূল লুকিয়েছিল আসিমভের প্রথম দিকের Homo Sol ইত্যাদি কয়েকটি গল্পে, যদিও সেগুলি তখন বিশেষ পরিচিত হয়নি। একই সঙ্গে আসিমভ দেখিয়েছিলেন সমাজের অবক্ষয়ের যুগে যে কোনো রকমের জ্ঞানচর্চাকেই সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে, তার নানা উদাহরণ আমরা এখন আমাদের সমাজে দেখতে পাচ্ছি।

       ইংরাজি অভিধানে আরও দুটি শব্দ আমরা আসিমভের কল্যাণে পেয়েছি, রোবোটিক্স ও পজিট্রনিক। আসিমভের যন্ত্রমানবরা রোবোটিক্সের তিনটি নিয়ম মেনে চলে, অনেক গল্পকার এই নিয়মগুলি তাঁদের কাহিনিতে ব্যবহার করেছেন। তাঁর রোবটদের মস্তিষ্ক পজিট্রন নিয়ন্ত্রিত, তা সে বাস্তবে যতই অসম্ভব হোক না কেন। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে রোবটদের মধ্যে মানবিক গুণ সঞ্চারিত হয়েছে, এক সময় মানুষের সঙ্গে তাদের কোনো প্রভেদ করাই সম্ভব নয়।

       রোবটের কাহিনিকেও নিয়ন্ত্রণ করেছে আসিমভের ইতিহাস চেতনা । প্রাচীন গ্রিস ও রোম পশ্চিমে সভ্যতার আলো দেখিয়েছিল, কিন্তু তাদের ভিত্তি ছিল দাসদের শ্রম। নানা সময় ক্রীতদাসদের বিদ্রোহ সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে দিয়েছিল। আসিমভের রোবটদের পক্ষে বিদ্রোহ করার কোনো উপায় নেই, তিন নিয়মের শৃঙ্খলে তারা বন্দী। তাহলে কি এভাবে দাসের পরিবর্তে রোবট শ্রমের ভিত্তিতে প্লেটোর আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা হতে পারে?  আসিমভের উত্তর হল, না। তাঁর কাহিনিতে পৃথিবী থেকে প্রথম যে মানুষরা ছায়াপথের অন্য গ্রহ জয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল, তাদের বলা হয় স্পেসার। তাদের সহায় হয়েছিল রোবট। পৃথিবীর সমাজে রোবট প্রযুক্তি সহ বিজ্ঞান প্রযুক্তির যে কোনো অগ্রগতিকেই সন্দেহের চোখে দেখা হয়, অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশই পৃথিবী পিছিয়ে পড়ে। কিন্তু রোবটের উপর অতিনির্ভরতা শেষ পর্যন্ত স্পেসার সমাজদেরও ধ্বংসের পথেই নিয়ে যায়। পৃথিবী থেকে আবার মানুষ ছায়াপথের নানা গ্রহে বসতি স্থাপন করে, কিন্তু রোবট শ্রমের উপর তারা নির্ভর করেনি। রোবটের উপরে অনেকগুলি ছোট বড় গল্প ছাড়াও Caves of Steel, Naked Sun, Robots of Dawn উপন্যাসগুলিতে আসিমভ প্রযুক্তির অন্ধ বিরোধিত ও তার উপর অতিনির্ভরতা, এই দুয়ের দ্বন্দ্বকে তুলে ধরেছেন।

      এই তিনটি উপন্যাস ও Foundation-এর মধ্যের সময়কালে ছায়াপথব্যাপী সাম্রাজ্য স্থাপিত হয়েছে।  তিনটি উপন্যাসের মাধ্যমে তার ইতিহাস লিখেছেন আসিমভ, Pebble in the Sky, The Stars Like Dust ও The Currents of Space। দুই মহাযুদ্ধের মধ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মহাশক্তি হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশের ছায়া তাঁর লেখাতে পড়েছিল।  বিখ্যাত ঐতিহাসিক আর্নল্ড টয়নবির মতে সভ্যতার ইতিহাস চক্রাকার -- যে কোনো সভ্যতাই এক সময় মধ্যগগনে পৌঁছয়, তারপর তার ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। আসিমভ তাঁর উপন্যাসগুলির সূত্রকে টয়নবির এই মতের সাহায্যে বেঁধেছেন, কিন্তু তাঁর আশাবাদ তাঁকে সেই চক্রাকার পরিবর্তনের থেকে বেরোনোর গল্পও লিখতেও প্রেরণা জুগিয়েছে। জন্মমৃত্যুর কাহিনি লিখলেও ছায়াপথ সাম্রাজ্য যখন তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়, সেই সময়ের কোনো উল্লেখযোগ্য কাহিনি তাঁর লেখাতে আসেনি। এই কাহিনিগুলিতে রোবটদের কোনো ভূমিকা নেই। সেটা স্বাভাবিক, তার কারণ এগুলি তাঁর রোবটের কাহিনি প্রকাশের আগে লেখা। বেশ কয়েকটি গল্প ও উপন্যাসের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত রোবটদের কাহিনি, ছায়াপথ সাম্রাজ্য এবং Foundation সিরিজ এক বিন্দুতে পৌঁছেছে, কিন্তু সেগুলির অধিকাংশই তাঁর পরবর্তীকালের রচনা, এবং কাহিনি হিসাবে বেশ দুর্বল।

       বেশ কয়েকটি অসাধারণ ছোট গল্প লিখেছেন আসিমভ। তাঁর Nightfall গল্পটি বহুবার পাঠকদের বিচারে কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গল্প নির্বাচিত হয়েছে, আমাদের আলোচনা তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি। গল্পটির শুরু হয়েছে কবি ও দার্শনিক র‍্যালফ এমারসনের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। এমারসন বলেছিলেন যে যদি এক হাজার বছরে একবার মাত্র যদি আকাশের নক্ষত্ররা আমাদের দৃষ্টিগোচর হত, মানবজাতি তাহলে জন্ম জন্ম ধরে তাকে স্বর্গের আবির্ভাব ভেবে পূজা করত। আসিমভ গেলেন এমারসনের বিপরীত দিকে। একটি গ্রহের আকাশে ছটি সূর্যের মতো তারা আছে, ফলে সেখানে রাত্রি প্রায় নামেই না। দু’হাজার পঞ্চাশ বছর পরপর গ্রহ নক্ষত্রের এমন অবস্থান হয় যে গ্রহণের ফলে সেই গ্রহে রাত্রি আসে।  আকাশে দেখা দেয় তিরিশ হাজার নক্ষত্র, যাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে মানুষের কোনো ধারণা ছিল না। বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তুলনায় মানবজীবনের ক্ষুদ্রতার বোধ মানুষকে উন্মাদ করে দেয়, সভ্যতার পতন ঘটে।

       কল্পবিজ্ঞানের জন্য যে কটি পুরস্কার দেওয়া হয় সবকটি পেয়েছেন আসিমভ, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একাধিকবার। Foundation-এর গল্পগুলি কল্পবিজ্ঞানের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সিরিজ হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে। তিনি মনে করতেন যে বিজ্ঞান ও শিল্পকলার মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো দেওয়াল নেই, নিজের লেখাতে বার বার সে কথা তিনি প্রমাণ করেছেন। তিনি সেই যুগের লেখক যে যুগ বিশ্বাস করত যে বিজ্ঞানপ্রযুক্তি আমাদের সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে পারবে। ষাটের দশকে সেই বিশ্বাসের অবসান ঘটেছিল, আসিমভও কল্পবিজ্ঞান লেখা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরে্র লেখায় আর প্রথম যুগের আসিমভকে আমরা পাই না। জর্জ অরওয়েলের 1984, অলডাস হাক্সলির Brave New world বা মার্গারেট অ্যাটউডের The Handmaid’s Tale যে ডিস্টোপিয়ান ভবিষ্যতের কথা বলে, আসিমভের আশাবাদ তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি আঁকে। তাই হয়তো মৃত্যুর তিন দশক পরেও তাঁর লেখা পাঠকের মন জয় করে নেয়, চলচ্চিত্রায়িত হয়, আধুনিক সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়।


প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার শারদীয় ২০২০

      

Sunday, 21 October 2018

উর্সুলা লেগুইনের সাহিত্য




উর্সুলা লেগুইনের সাহিত্যঃ প্রকৃত নামের ইন্দ্রজাল  

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

‘... do you know, by your own experience, what patriotism is?’
‘No’, I said,  ... ‘If by patriotism you don´t mean the love of one`s homeland, for that I do know.’
‘No, I don’t mean love, when I say patriotism. I mean fear. The fear of the other. And its expressions are political, not poetical: hate, rivalry, aggression. It grows in us
, that fear.’
                              (The Left Hand of Darkness)

      হ্যারি পটারকে নিয়ে উন্মাদনা যখন চরমে, তখন আমার এক সহকর্মী আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, গল্পগুলোর মধ্যে কী আছে। আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘উর্সুলা লেগুইন যদি পি জি উডহাউসের ভাষায় ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুলের কাহিনি লিখতে বসতেন, তাহলে হ্যারি পটারের মতো গল্প পাওয়া যেত।’ আবার ২০১৭ সালের নোবেল জয়ী সাহিত্যিক কাজিও ইশিগুরোর ‘দি বারিড জায়ান্ট’ পড়তে বসে মনে পড়ে গেছে লেগুইনের আর্থসি সিরিজের কথা। সেখানে পেয়েছি একই রকম মিতকথন, একই রকম সাদায় কালোতে মেশানো চরিত্র। লেখার এই বিশেষ গুণ লেগুইনের সাহিত্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
      ইশিগুরোকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল ‘দি বারিড জায়ান্ট’-কে তিনি কি কল্পকাহিনি মনে করেন। তাঁর উত্তর ছিল, এইসব ভাগ, জঁর বা তকমা প্রকাশকদের সৃষ্টি, তাঁদের প্রচারের পক্ষে সুবিধাজনক। লেখককে কোনো বিশেষ তকমাতে আটকে রাখা যায় না। লেগুইনের সঙ্গে এই কথা নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য বিতর্কও হয়েছিল। লেগুইনের মনে হয়েছিল ইশিগুরো কল্পকাহিনির প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করেছেন। শেষ বিচারে সম্ভবত দুজনে খুব আলাদা কথা বলেন নি -- লেগুইনও মেনে নিয়েছিলেন যে ইশিগুরো কল্পকাহিনিকে মূলধারা থেকে আলাদা করতে চান নি।
উর্সুলা কে লেগুইন (আলোকচিত্র ঃ Gorthian,  CC BY-SA 3.0)
      উর্সুলা কে লেগুইন (২১ অক্টোবর ১৯২৯ -- ২২ জানুয়ারি ২০১৮) ব্যক্তিগতভাবে কল্পকাহিনি অর্থাৎ ফ্যান্টাসি কিংবা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যিক হিসাবে পরিচিত হতে পছন্দ করতেন না।  মেইনস্ট্রিম বা মূলধারা তাঁর লেখায় সেই তকমা লাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করেছিল। বরঞ্চ তিনিই মূলধারাকে পালটে দিয়েছিলেন, বাধ্য করেছিলেন তাঁকে স্বীকার করতে। আজও কল্পবিজ্ঞান বা কল্পকাহিনি অনেকের কাছেই মূলধারার সাহিত্য হিসাবে গণ্য হয় না। তাঁদের প্রতি অনুরোধ, ২০০৭ সালের নোবেলজয়ী লেখিকা ডরিস লেসিঙের বই ‘শিকাস্টা’-র ভূমিকাটা পড়ে দেখুন।  লেসিঙের ‘ক্যানোপাস ইন আর্গসঃ আর্কাইভস’ সিরিজের পাঁচটি বই কাঠামোর দিক থেকে নিখাদ কল্পবিজ্ঞান, তার প্রথম বই ‘শিকাস্টা’। উপন্যাসটির ভূমিকায় ১৯৭৮ সালে  তিনি লিখেছিলেন যে বর্তমানে কল্পবিজ্ঞান হল সাহিত্যের সবচেয়ে উদ্ভাবনী ধারা। আমাদের চারদিকের জগতটা প্রতিদিন আরো উদ্ভট, আরো অবিশ্বাস্য হচ্ছে, তার ফলে ঔপন্যাসিকরাও বাস্তবতার বেড়া ভেঙে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। ওলাফ স্টেপলডনের ‘লাস্ট এন্ড ফার্স্ট মেন’ এবং তথাকথিত “সিরিয়াস” উপন্যাসকে আলাদা আলাদা তাকে সাজানোর মনোভঙ্গিটা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন লেসিঙ।   
      লেসিঙের কথার সূত্র ধরেই বলি, লেগুইনের কল্পবিজ্ঞান বা কল্পকাহিনি হল জীবনকে অন্যভাবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়াস। আধুনিক কল্পবিজ্ঞানের জগতটাকে পালটে দিয়েছিলেন লেগুইন। নারীবাদের উচ্চকিত ঘোষণা না থাকলেও নারীবাদী কল্পবিজ্ঞানের তিনি প্রথম স্রষ্টা। অনেক সমালোচকেরই মতে লেগুইনের সর্বশ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘দি লেফট হ্যান্ড অফ ডার্কনেস’ (প্রকাশকাল ১৯৬৯)। উপন্যাসের গেথেন গ্রহের মানুষরা উভলিঙ্গ, কিন্তু আমরা যে অর্থে সাধারণত শব্দটা ব্যবহার করি সেই অর্থে নয়। গেথেনের মানুষরা আমাদেরই বংশধর, কিন্তু তাদের লিঙ্গ সাধারণভাবে নির্দিষ্ট নয়। একমাত্র ঋতুকালেই তাদের মধ্যে মিলন সম্ভব এবং সেই সময় পরিস্থিতির, বিশেষ করে সঙ্গীর চরিত্রের উপর, নির্ভর করে কোনো বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে পুরুষ বা নারী রূপের প্রকাশ ঘটে। যাদের লিঙ্গ পরিবর্তন হয় না, সেরকম মানুষকে সেখানে পার্ভার্ট বা বিকৃতকাম মনে করা হয়।     
      লেগুইন গেথেন নয়, আসলে আমাদেরই সমাজব্যবস্থার উপর নারী-পুরুষের দৈহিক পার্থক্যের প্রভাব দেখতে চাইছেন। পৃথিবী থেকে একজন সাধারণ অর্থে পুরুষ, জেনলি আই, সেই গ্রহে দূত হয়ে এসেছে। প্রতি মুহূর্তে তার সঙ্গে গেথেনের অধিবাসীদের ভুল বোঝাবুঝি হয়। নারী-পুরুষে বিভক্ত যে সমাজে আই-এর জন্ম, সে তার ধ্যান-চিন্তা-ধারণাকে গড়ে তুলেছে, এবং তার সঙ্গে গেথেনের সমাজের মৌলিক পার্থক্য আছে। অপরাধ গেথেনে হয়, কিন্তু দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ হয় না। একই ব্যক্তি একই সঙ্গে কোনো সন্তানের বাবা, আবার অন্য কোনো সন্তানের মা -- তার ফলে আমাদের চেনা পরিবারের ছক সেখানে অচল। লেগুইন নারী-পুরুষের মধ্যে স্বীকৃত সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসেছেন, আমাদের সমাজের উপর পিতৃতান্ত্রিকতার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
      এই গ্রহেরই পটভূমিকায় অন্য একটি গল্প ‘উইন্টার্স কিং’ (প্রকাশকাল ১৯৬৯) যখন ‘দি উইন্ডস টুয়েলভ কোয়ার্টার্স’ বইতে সংকলিত হয়েছিল, লেগুইন গল্পটিকে সামান্য পালটে দিয়েছিলেন। নতুন রূপে গল্পটিতে রাজা বা King-এর জন্য She সর্বনামের ব্যবহার চমকে দেয়, বারবার ফিরে পড়তে হয়। অন্যান্য কল্পবিজ্ঞান অ্যালিয়েন খুঁজতে ভিনগ্রহে যায়, লেগুইনের অ্যালিয়েনরা অন্য গ্রহে থাকলেও তারা আমাদের মতোই মানুষ – কিন্তু তাদের আর আমাদের মধ্যে উঠেছে দুর্লংঘ্য দেওয়াল। সেই দেওয়াল তৈরি করেছে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, যা আমাদের চিন্তাভাবনাকে একটা লক্ষ্মণরেখার মধ্যে বেঁধে রাখতে চায়। লেসিঙের মতোই তিনি নতুন জগত নির্মাণ করছেন, আমাদের বহুদিনের সযত্ন লালিত ধ্যানধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, আমাদের বাধ্য করছেন চেনা গণ্ডির বাইরে বেরোতে। এই প্রবন্ধের শুরুর উদ্ধৃতিটি ‘দি লেফট হ্যান্ড অফ ডার্কনেস’ থেকে নেয়া, তা আমাদের বর্তমান সমাজের ক্ষেত্রে কতটা প্রযোজ্য তা ব্যাখ্যা করে বলার বোধহয় অপেক্ষা রাখে না।
      লেগুইন তাঁর লেখাতে রূপক আরোপ করতে চাইতেন না, তিনি নিজে বিশ্বাস করতেন যে তিনি শুধু একটা গল্প বলতে চান। কিন্তু ‘দি লেদ অফ হেভেন’-এর (প্রকাশকাল ১৯৭১) কোনো পাঠক যদি আমার মতো  গল্পের ভিতরে গভীর কোনো অর্থ খুঁজে পায় তাহলে তাকে বোধহয় দোষ দেয়া যাবে না। গল্পের ২০০২ সালের পৃথিবী বিশ্বউষ্ণায়নের শিকার। মধ্য প্রাচ্যে যুদ্ধ চলছে, আমেরিকাতেও জীবনযাত্রার মান ক্রমশই নামছে। জর্জ অর নামের এক ড্রাফটসম্যান গল্পের মুখ্য ভূমিকায়, সে যা স্বপ্ন দেখে তা বাস্তবে পরিণত হয়। অন্য সকলের কাছেই সেই নতুন বাস্তবটা চিরকালের জন্য সত্য, তাদের স্মৃতিতে অতীতটাও নতুন বাস্তবের অনুসারে পালটে যায়। শুধু অরের স্মৃতিতে পুরানো অতীতের ছবি ধরা থাকে। বাঁধা গতের বাইরে চিন্তা করার জন্য সমাজ জর্জ অরের উপর মনোরোগীর তকমা লাগিয়ে দেয়। হেবার নামের এক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ তার এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে পৃথিবীর মঙ্গল করতে চায়, কিন্তু অরের কল্পনার নতুন বিশ্ব প্রতিটি পরিবর্তনের পরে খারাপ থেকে আরো খারাপের দিকে যায়। হেবারের উপচিকীর্ষা ক্রমশ ক্ষমতালোভে পর্যবসিত হয়। হেবারের চরিত্রের মাধ্যমে ইউটিলিটারিয়ানিজম বা হিতবাদের কঠোর সমালোচনা করেছেন লেগুইন।
      সমালোচকদের মতে জর্জ অরের নাম দেওয়ার সময় লেগুইন হয়তো জর্জ অরওয়েলের কথা ভাবছিলেন। হতে পারে, কারণ ‘নাইনটিন এইটি ফোর’-এর লেখকের মতোই লেগুইনও সমাজকে নানা দিক থেকে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর আর একটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি ডিসপজেসডঃ অ্যান অ্যাম্বিগুয়াস ইউটোপিয়া’ (প্রকাশকাল ১৯৭৪)। এই উপন্যাসে তিনি পুঁজিবাদ, পিতৃতন্ত্র, সমাজবাদ, নৈরাজ্যবাদ নানা ধরণের সমাজব্যবস্থাকে পাশাপাশি রেখেছেন। লেগুইনের গল্পের  ইউটোপিয়া কিন্তু কল্পনার স্বর্গ নয়, অ্যাম্বিগুয়াস অর্থাৎ সন্দেহাকীর্ণ বা দ্ব্যর্থক। গল্পের মূল চরিত্র শেভেক এক পদার্থবিজ্ঞানী, সে সময়ের চরিত্র নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার করেছে, দেখিয়েছে সময় যে সবসময় সরল ভাবে এগোয় বলে আমরা মনে করি তা আসলে ভুল। শেভেকের আবিষ্কারের মতোই উপন্যাসও সময়ের সঙ্গে রৈখিকভাবে এগোয়নি। গল্প কখনো ভবিষ্যৎ থেকে অতীতে ফিরে গেছে, কখনো বা এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে ঝাঁপ দিয়েছে। লেগুইন কখনো পাঠককে নিশ্চিন্তে থাকতে দেবেন না, প্রতি মুহূর্তে তাঁর মনোযোগ দাবি করেন।
      কল্পবিজ্ঞান থেকে এবার আসি লেগুইনের কল্পকাহিনিতে। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত ‘দি ওয়ার্ড অফ আনবাইন্ডিং’ গল্পটি যে জগতের ইঙ্গিত দিয়েছিল, সেই জগতেই লেগুইন রচনা করেছেন পাঁচটি উপন্যাস ও আরো কয়েকটি গল্প। এগুলি একত্রে ‘আর্থসি’ নামে পরিচিত। আর্থসির জগত হল এক দ্বীপমালা ও সমুদ্রের বিশ্ব। সেখানে সমাজে জাদুবিদ্যা এক প্রধান স্থান অধিকার করে আছে -- কিন্তু তা সংযত, নমিত, নিজেকে সে জাহির করে না। জেড নামের এক কিশোর জাদুবিদ্যার এক অসাধারণ প্রতিভা, কিন্তু কৈশোরের অপরিণামদর্শিতাতেই সে ভুলক্রমে এক ছায়াজীবকে সৃষ্টি করে, যে জেডকে ধ্বংস করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কেমনভাবে জেড সেই ছায়াজীবের মুখোমুখি হল, তাই নিয়েই প্রথম উপন্যাস ‘এ উইজার্ড অফ আর্থসি’-র (প্রকাশকাল ১৯৬৮) কাহিনি। এই উপন্যাস মূলত জেডের বয়ঃপ্রাপ্তির কাহিনি -- কৈশোরের বলগাহীন প্রতিভা অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সংযমের শাসনে বাঁধা পড়ে। উপন্যাসের সমাপ্তি আমাকে বিস্মিত করেছিল, বাধ্য করেছিল পুরো উপন্যাস আবার ঘুরে পড়তে। দেখেছিলাম লেগুইন বারে বারে উপন্যাসের সমাপ্তির ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিন্তু  লেখনীর মুনশিয়ানা এমনই যে একমাত্র দ্বিতীয়বার পাঠেই তারা আমার চোখে ধরা পড়েছিল।
      সর্বকালের সেরা কল্পকাহিনিকারদের মধ্যে লেগুইন অবশ্যই জায়গা করে নেবেন। আমার বিচারে টলকিয়েনের ‘দি লর্ড অফ দি রিংস’ আর লেগুইনের ‘আর্থসি’ সিরিজের উপন্যাসগুলি একই স্থান অধিকার করে নেবে। এই সিরিজের প্রথম তিনটি উপন্যাস প্রকাশিত হয় চার বছরের মধ্যে, সেগুলি প্রথমে কিশোরসাহিত্য হিসাবেই পরিচিত হয়েছিল এবং যথেষ্ট খ্যাতি কুড়িয়েছিল। কিন্তু লেগুইন তাতে খুশি হননি, তার সঙ্গত কারণও ছিল। ‘দি লর্ড অফ দি রিংস’-এর মতোই দশ বছরের শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক, সকলের কাছেই এই উপন্যাসগুলির আবেদন। অসাধারণ গল্প বলার নৈপুণ্যে এবং কল্পনার শক্তিতে  উপন্যাসগুলি যেমন পাঠককে ধরে রাখে, তেমনি তার অন্তর্নিহিত অর্থ আমাদের জীবন এবং, আরো বিশেষ করে বললে, মৃত্যুর মুখোমুখি হতে শেখায়। মার্গারেট অ্যাটউডের মতো সাহিত্যিকও আর্থসি-র গল্পগুলির আবেদনকে সার্বজনীন বলেই মনে করেছেন, সেগুলো পরবর্তীকালে বয়স্কদের মধ্যেও বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
লেখা শুরুর সময় বলেছিলাম হ্যারি পটারের গল্পের কথা।  আর্থসি-তেই প্রথম খুঁজে পাই জাদুবিদ্যা শেখার স্কুলের কথা। প্রতিভাধর জেড সেই স্কুলে গিয়ে এক শত্রু তৈরি করবে যে তারই সঙ্গে এক অচ্ছেদ্য বাঁধনে বাঁধা। সে প্রথম সাক্ষাতেই জেডকে আক্রমণ করে তার দেহে আঘাতের চিহ্ন এঁকে দেবে। তাকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দেবে তার এক প্রিয়জন। যখনই ছায়াজীব জেডের কাছাকাছি আসে, তখনই সেই পুরানো ক্ষতচিহ্ন তাকে যন্ত্রণা দেয়। গল্পটা চেনা লাগছে কি? এই প্রবন্ধ লিখতে বসে দেখলাম অনেকেই জে কে রাউলিঙের উপর লেগুইনের প্রভাবের কথা বলেছেন। তবে দুজনের লেখাতে তফাতও কম নয়। রাউলিঙের লেখা উচ্চকিত, লে গুইনের ভাষা তুলনায় মৃদু। রাউলিঙের জাদুকরদের জগত আমাদের বিশ্বের সঙ্গে সমান্তরালে অবস্থান করে। তারা আমাদের পাশের বাড়িতে থাকে, কিন্তু আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অঙ্গ নয়। তাদের জাদু অধিকাংশ সময়েই চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। লেগুইনের আর্থসিতে জাদুকররা সমাজের স্বাভাবিক অংশ, আলাদা করে সম্ভ্রমের পাত্র নয়। চাষী, কামার বা জেলের মতো জাদুকরদেরও উপার্জন করে খেতে হয়।
আমার ব্যক্তিগত মত আর্থসি সিরিজের প্রথম উপন্যাসই গল্প হিসাবে সবচেয়ে সুখপাঠ্য। কিন্তু পরের উপন্যাসগুলিতে লেগুইন মানবপ্রবৃত্তির আরো গভীরে প্রবেশ করেছেন, তাকে বিশ্লেষণ করেছেন। একটা বিশেষ উদাহরণ দেখা যাক। প্রথম দিকের গল্পে নারী চরিত্রগুলি তেমন রূপ পায়নি। ‘দি লেফট হ্যান্ড অফ ডার্কনেস’-এর স্রষ্টার কাছে যে ধরনের নারীকে আমরা আশা করি, চরিত্রগুলি তার কাছাকাছিও পৌঁছায়নি। দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দি টম্বস অফ আটুয়ান’-এর (প্রকাশকাল ১৯৭১) কথক টেনার নারী, উপন্যাসে সে এক মুখ্য ভূমিকা অধিকার করেছে। কিন্তু গল্পে সে পশ্চাৎপট ছাড়া কিছু নয়। জেডই গল্পের নায়ক, পাদপ্রদীপের সমস্ত আলোই পড়েছে তার উপরে। 
      তৃতীয় উপন্যাস ‘দি ফার্দেস্ট শোর’-এর (প্রকাশকাল ১৯৭২) সমাপ্তিতে জেড তার সমস্ত জাদুক্ষমতা হারিয়ে সাধারণ মানুষে পরিণত হয়েছিল। আঠারো বছর পরে লেগুইন যখন আবার আর্থসিতে ফিরে গেলেন, তখন পেলাম এক অন্য ধারার গল্প। পশ্চাৎপট একই, কিন্তু সমাজকে আমরা দেখলাম অন্য চোখে। টেনারের নারীত্বকে স্বীকার করে জেডের যেন নবজন্ম হল চতুর্থ উপন্যাস ‘টেহানু’-তে (প্রকাশকাল ১৯৯০)। জাদুকরশ্রেষ্ঠ জেড নয়, আমরা খুঁজে পেলাম মানুষ জেডকে। লেগুইন দেখালেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সীমাবদ্ধতা, লিখলেন নারীদের প্রাপ্য স্থান ও অধিকার থেকে বঞ্চনার কাহিনি। আর্থ সির জাদুবিশ্ব নিশ্চয় পৃথিবী নয়, তার সমাজও প্রথম দর্শনে আমাদের সমাজের থেকে আলাদা। কিন্তু লেগুইনের লেখনীর গুণে তারা এক জায়গায় এসে মেলে।
তাঁর লেখা থেকে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ট্রু নেম অর্থাৎ প্রকৃত বা জন্মগত নামের ধারণা। অনেক প্রাচীন সমাজ বিশ্বাস করত যে প্রত্যেক জিনিসের বা প্রাণীর এক জন্মগত নাম আছে। সেই নামের মধ্যে তার সমস্ত চারিত্রবৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে, তাই তা জানতে পারলে সেই বস্তু বা প্রাণীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ‘দি রুল অফ নেমস’ (প্রকাশকাল ১৯৬৪) গল্প থেকে শুরু করে আর্থসি-র প্রত্যেকটি গল্পে এই ধারণার অসাধারণ ব্যবহার করেছেন লেগুইন। ‘এ উইজার্ড অফ আর্থসি’ উপন্যাসে ছায়াজীবের প্রকৃত নাম আবিষ্কারের মধ্যে দিয়েই জেডের মুক্তি ঘটে।
সারা জীবন নানা সম্মান পেয়েছেন উর্সুলা লেগুইন। কল্পবিজ্ঞান ও কল্পকাহিনির জন্য যে কটি পুরষ্কার দেওয়া হয়, তাদের সবগুলির তালিকাতেই তাঁর নাম পাওয়া যাবে, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকবার। তাঁর গল্পে একাকার হয়ে গেছে নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, মনস্তত্ত্ব, পরিবেশবিজ্ঞান। তাই লেগুইনের লেখার ড্রাগনরা কিন্তু শুধু গল্পের মধ্যে বাস করে না। তাঁর এক সতর্ক বার্তা দিয়েই লেখা শেষ করি।
People who deny the existence of dragons are often eaten by dragons. From within.

প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, উৎসব সংখ্যা ২০১৮

Friday, 2 February 2018

শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ আর্থার সি ক্লার্ক

শতবর্ষে আর্থার সি ক্লার্ক
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
      আর্থার সি ক্লার্কের নামের সঙ্গে কল্পবিজ্ঞান বা জনপ্রিয় বিজ্ঞান সাহিত্যের পাঠকদের পরিচয় করানোর কোনো প্রয়োজন নেই। গত একশো বছরের সেরা তিনজন কল্পবিজ্ঞান লেখকের নাম বাছতে গেলে যে কোনো তালিকায় তাঁর নাম আসবেই। ক্লার্কের অন্য পরিচয়ও আছে। তাঁর এত কল্পনা পরবর্তীকালে বাস্তবায়িত হয়েছে যে তাঁকে অনেকেই মহাকাশ যুগের ভবিষ্যৎবক্তা বা প্রফেট বলেছেন।  ১৯৯৪ সালে তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়েছিল -- অবশ্য সাহিত্য নয়, শান্তির ক্ষেত্রে। আজকের দিনে পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ বিপ্লবের পিছনে আছে ভূসমলয় উপগ্রহ যারা পৃথিবীর আকাশে একই জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত ক্লার্কের লেখা এক প্রবন্ধে এই বিষয়টা সকলের নজরে আসে, যদিও ধারণাটা তাঁর নিজস্ব আবিষ্কার নয়। তাঁরই সম্মানে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন ভূসমলয় কক্ষপথের নাম দিয়েছে ক্লার্ক কক্ষপথ। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উন্নতি নানা দেশের মানুষকে আরো কাছাকাছি এনে বিশ্বে শান্তি আনতে সাহায্য করেছে, সে জন্যই তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য উঠেছিল।

      আর্থার চার্লস ক্লার্কের জন্ম ১৯১৭ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের সমারসেটে। ছোটবেলায় অর্থাভাবে পড়াশোনা বিশেষ এগোয়নি। ১৯৩৭ সালে অ্যামেচার সায়েন্স ফিকশন স্টোরিস নামের একটি ছোট পত্রিকায় তাঁর প্রথম গল্প ট্রাভেল বাই ওয়্যার (Travel by Wire!) ছাপা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রয়াল এয়ারফোর্সে রাডার সংক্রান্ত গবেষণাতে যুক্ত হয়েছিলেন, সেই নিয়ে লিখেছিলেন আত্মজীবনী ভিত্তিক উপন্যাস গ্লাইড পাথ (Glide Path)। যুদ্ধের পরে কিংস কলেজ থেকে অঙ্ক ও পদার্থবিদ্যা নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।.১৯৫১ সালে প্রকাশিত হত প্রথম উপন্যাস প্রিলুড টু স্পেস (Prelude to Space)। হয়েছিলেন ব্রিটিশ ইন্টারপ্ল্যানেটারি সোসাইটির সভাপতি। মহাকাশ নিশ্চয় তাঁর প্রথম প্রেম, কিন্তু সমুদ্রও খুব কাছাকাছি থাকবে। সমুদ্রের তলায় স্কুবা ডাইভিং করে জীবজগত পর্যবেক্ষণ তাঁর এতই ভালো লেগেছিল যে বছরের সব সময় সেই সুযোগ পাওয়ার জন্য শ্রীলঙ্কাতে বসবাস শুরু করেন। সেই কথা লিখেছেন তাঁর দি ভিউ ফ্রম সেরেন্ডিপ (The View from Serendip) বইতে। সেখানেই ১৯শে মার্চ ২০০৮ তাঁর জীবনাবসান হয়। বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের জন্যও তিনি সারাজীবন প্রচুর কাজ করেছেন। তবে এই লেখাতে আমরা মূলত তাঁর কল্পবিজ্ঞানের দিকেই চোখ রাখব। তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা তিরিশের বেশি, গল্পের সংখ্যাও শতাধিক। তাদের মধ্যে মাত্র কয়েকটির কথাই এই লেখাতে আসবে। বেছে নেওয়ার পিছনে আমার ব্যক্তিগত পছন্দই কাজ করেছে, নিশ্চয় সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন না, তবে এগুলির মধ্যে ক্লার্কের লেখার মূল বৈশিষ্ট্যগুলি ফুটে উঠেছে বলেই আমার বিশ্বাস।
       ক্লার্কের নামের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় স্কুলে। জীবনে প্রথম যে ইংরাজি সায়েন্স ফিকশন গল্পসংগ্রহ পড়েছিলাম তাতে ছিল ক্লার্কের গল্প জুপিটার ফাইভ। শুধু নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র ব্যবহার করে একটা গল্পের ক্লাইম্যাক্স লেখা যায় সেটা না পড়লে বিশ্বাস হত না। কিন্তু তার থেকে অনেক বড়ো আকর্ষণ ছিল লেখকের কল্পনাশক্তি। জুপিটার ফাইভ বৃহস্পতির এক উপগ্রহ, ক্লার্ক তাকে বানিয়েছিলেন এক ইন্টারস্টেলার বা আন্তর্নক্ষত্র যান। তারপর থেকে সুযোগ পেলেই ক্লার্কের গল্প খুঁজতাম।
      কল্পবিজ্ঞানের সীমারেখা গত অর্ধ শতাব্দীতে অনেক দিকে প্রসারিত হয়েছে। সেই গল্পগুলো আমার নিজের পছন্দ যেখানে  যেখানে নতুন বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিকে গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজে তার প্রভাব কী পড়তে পারে তা নিয়ে তার স্রষ্টা চিন্তা করেছেন। একটা সহজ উদাহরণ নিতেই পারি। বাংলা ভাষাতে সবচেয়ে জনপ্রিয় কল্পবিজ্ঞান চরিত্র নিশ্চয় প্রফেসর শঙ্কু। আমাদের ছোটোবেলাতে আমরা শঙ্কুর গল্পগুলো পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকতাম। এখনকার ছোটোরাও নিশ্চয় পড়ে কারণ সবচেয়ে বেশি বিক্রির তালিকায় এই বইগুলো সবসময়েই জায়গা করে নেয়। কিন্তু এগুলো আমার কাছে কল্পবিজ্ঞানের থেকে অ্যাডভেঞ্চারের পর্যায়ে পড়বে। গল্পগুলোর মধ্যে বিজ্ঞান খুবই কম -- শুধুমাত্র কয়েকটা নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ -- কিন্তু তার চেয়েও কম আছে সমাজে সেই বিজ্ঞানের প্রভাব। ধরুন শঙ্কুর মিরাকিউরলের মতো সর্বরোগহর বটিকা -- তা যদি কোনোদিন তৈরি হয় সমাজটা একেবারে পাল্টে যাবে। সত্যজিৎ রায় এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন বলেই বারবার লিখেছেন শঙ্কুর কোনো আবিষ্কার তাঁর গিরিডির গবেষণাগারের বাইরে বানানো সম্ভব নয়।  মূল ধারার কল্পবিজ্ঞান কিন্তু এভাবে সমাজকে এড়িয়ে যাবে না, বরঞ্চ এই আবিষ্কারের ফলে সমাজের কী পরিবর্তন হবে, তাকেই মুখ্য উপজীব্য করবে। বাংলা ভাষার আমার অন্যতম প্রিয় চরিত্র ঘনাদা। প্রেমেন্দ্র মিত্রের গল্পে বিজ্ঞানে তেমন কোনো বড় ত্রুটি নেই। সমাজে বিজ্ঞানের প্রভাবও এসেছে অনেক ভাবেই, তা সে কৃত্রিম ক্লোরোফিল তৈরিই হোক বা তেলের বিকল্প শক্তির উৎস সন্ধানই হোক। তবে সেখানেও অ্যাডভেঞ্চারই মুখ্য, বিজ্ঞান সেখানে গল্পের মুখ্য অংশ নয়, পটভূমি। বিজ্ঞানের গল্পকারদের দু’রকমের ঝোঁক সম্পর্কে সচেতন থাকতে হয়। অনেক সময় অতিরিক্ত তত্ত্ব গল্পের গতিতে বাধা হয় দাঁড়ায়। কখনো আবার বিজ্ঞান যেন শুধু নামেই আসে, অলৌকিক জাদুবিদ্যার সঙ্গে তার পার্থক্য করা শক্ত হয়ে পড়ে। ক্লার্কের লেখা এই দুই দোষ থেকে মুক্ত তো  বটেই – সমাজকেও তা কখনো এড়িয়ে যায়নি।
      ক্লার্কের কল্পবিজ্ঞানকে আমরা দু ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথম ভাগে থাকবে সেই সমস্ত গল্প যেখানে ব্যবহৃত বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আমাদের আয়ত্তের সামান্য বাইরে, কিন্তু কল্পনার অতীত নয়। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত ছোটোদের জন্য লেখা আয়ল্যান্ডস ইন দি স্কাই (Islands in the Sky) উপন্যাসের কথা ধরা যাক। স্পেস স্টেশনে প্রতিদিনের জীবন এক ছোটো ছেলের জবানিতে বর্ণিত হয়েছে। উপন্যাস হিসাবে কখনোই এটা ক্লার্কের প্রথম শ্রেণির লেখা নয়, কিন্তু বিবরণ এতটাই বাস্তব যে পড়তে বসলে মনেই থাকে না স্পেস স্টেশন দূরের কথা, প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহও এই লেখা প্রকাশের ছ’বছর পরের ঘটনা।  মহাকাশে হাসপাতাল, চাঁদে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক লঞ্চার -- এ সমস্ত আমরা এখনই বানাতে পারি, বাধা শুধু অর্থ। দি ডিপ রেঞ্জ, ডলফিন আয়ল্যান্ড বা দি ঘোস্ট ফ্রম দি গ্রিন ব্যাঙ্কস – এদের আমরা এই পর্যায়ে ফেলতে পারি।
      এই ধরনের উপন্যাসের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হল দি ফাউন্টেনস অফ প্যারাডাইস (The Fountains of Paradise). শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ইতিহাস এবং মানুষের মহাকাশ জয়ের স্বপ্নকে অসাধারণ মুনশিয়ানাতে ক্লার্ক বেঁধেছেন এক সুরে। সাধারণভাবে ক্লার্কের লেখাতে আমাদের জানা বিজ্ঞানে কোনো ভুল পাওয়া যায় না। কিন্তু এই লেখাতে তিনি যেন নিজেকেও ছাপিয়ে গিয়েছেন। স্পেস এলিভেটর তৈরি করে মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন মানুষ অর্ধ শতাব্দীর থেকেও বেশি পুরানো। সেই এলিভেটরের এরকম বর্ণনা জনপ্রিয় বিজ্ঞানের প্রবন্ধেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ, কিন্তু গল্পের দুরন্ত গতিতে কোনো ছেদ পড়েনি। পঞ্চম শতাব্দীর রাজা কালিদাস পৃথিবীতে স্বর্গকে নামিয়ে আনতে চেয়েছিলেন, আর একবিংশ শতাব্দীতে ইঞ্জিনিয়ার মর্গান পৃথিবী থেকে স্বর্গে অর্থাৎ মহাকাশে যাওয়ার উপায় তৈরি করবেন। যুগের পরিবর্তন ঘটেছে, পাল্টে গেছে পাত্রপাত্রী। পরিবর্তন হয়নি রঙ্গমঞ্চের, থেকে গেছে মানুষের স্বর্গকে স্পর্শ করার দুঃসাহস। দোষে গুণে পিতৃহন্তা কালিদাস চরিত্রটি জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর লেখাতে দ্বীপরাষ্ট্রটির ইতিহাস ভূগোল সংস্কৃতির সঙ্গে এমনই নিবিড় পরিচয় ঘটেছিল যে আমরা যখন শ্রীলঙ্কা বেড়াতে গিয়েছিলাম, তখন সিগিরিয়া রক, ক্লার্ক যার নাম দিয়েছেন যক্ষগল, দেখানোর জন্য কোনো গাইডের দরকার হয়নি।
      ডলফিন আইল্যান্ড (Dolphin Island) একটি ছোট ছেলের জবানিতে লেখা। জাহাজে লুকিয়ে থাকা  বাড়ি-পালানো ছোটো ছেলের গল্প পশ্চিমী সাহিত্যে নতুন নয়। ছোট্ট জনি আশ্রয় পেয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছের এক দ্বীপের ডলফিন গবেষণা কেন্দ্রে। স্কুবা ডাইভিংপ্রেমী ক্লার্ক সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের বিচিত্র জীবজগতের ছবি এঁকেছেন। ডলফিন সুসি বা স্পুটনিকের কাহিনী এতই বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে যে বইটি পড়ার পরে আমার প্রথম কাজ হয়েছিল ডলফিনদের বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে খবর নেওয়া। জেনেছি বিজ্ঞানীদের মধ্যে ডলফিনের বুদ্ধির পরিমাপ নিয়ে বিতর্ক আছে। তা থাকুক, কিন্তু গল্পের রস তাতে বিন্দুমাত্র কমবে না। প্রজাতি হিসাবে মানুষ বড়ো একা, ভাব বিনিময়ের জন্য আমরা মহাকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। ক্লার্ক আমাদের বলছেন, ঘরের কাছেই আছে কথা বলার সঙ্গী, আমাদের শুধু তার ভাষাটা শিখতে হবে।
      দি ডিপ রেঞ্জ (The Deep Range) উপন্যাসও সমুদ্রের পটভূমিতে, সেখানে ক্লার্ক আমাদের নিয়ে গেছেন মহাসাগরের গভীরে। সমুদ্রে প্ল্যাঙ্কটন চাষের মাধ্যমে পৃথিবীর খাদ্য সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। এই উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্রের সঙ্গে আমাদের ফাউন্টেনস অফ প্যারাডাইসে দেখা হয়েছে, তিনি বৌদ্ধ ধর্মগুরু মহানায়ক থেরো। আগের গল্পে থেরো মর্গানের বিরোধিতা করে ব্যর্থ, এই উপন্যাসে তিনি তিমি শিকার নিষিদ্ধ করাতে সফল। কী শ্রদ্ধার সঙ্গে চরিত্রটিকে (নাকি চরিত্র দুটিকে?) সৃষ্টি করেছিলেন ক্লার্ক! অধিকাংশ কল্পবিজ্ঞানকারদের মতো তিনি ভবিষ্যৎ সমাজে ধর্ম ও বিজ্ঞানের সম্পর্ককে এড়িয়ে যাননি, যদিও ব্যক্তিগত ভাবে তিনি ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন না বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তবে আমার কাছে এই উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ অন্য জায়গায়। প্রাচীন কাল থেকে সাগরযাত্রী নাবিকরা সমুদ্রসর্পের গল্প আমাদের শুনিয়েছে। টেনিসনের কবিতায় সমুদ্রের তলায় যে ক্রাকেন ঘুমিয়ে আছে, তার রহস্য উদ্ধারের চেষ্টা করেছিল আমাদের গল্পের মুখ্য চরিত্র ওয়াল্টার ফ্রাঙ্কলিন। শেষ মুহূর্তে সে চেষ্টা বিফল হয়, সমুদ্র তার রহস্যকে গোপনই রেখে দিল।
      গল্পের এই ভাগে যে বিস্ময় ও রহস্যের আবহ তৈরি হয়েছিল, তা আমার কাছে ক্লার্কের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ। ক্লার্কের সাহিত্যের দ্বিতীয় অংশ, যেখানে তিনি অতিদূর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, সেখানে এই আবহ সৃষ্টিতে তিনি বহুবার সক্ষম হয়েছেন। নিউটনের তিনটি সূত্রের অনুকরণে ভবিষ্যৎ বিজ্ঞান প্রযুক্তি সম্পর্কে  ক্লার্ক তিনটি সূত্র দিয়েছিলেন, তার মধ্যে তৃতীয়টি সবচেয়ে বিখ্যাত -- পশ্চাৎপদ কোনো সভ্যতার কাছে অনেক এগিয়ে থাকা প্রযুক্তি আর জাদুবিদ্যাতে কোনো পার্থক্য থাকবে না। যেখানেই ক্লার্ক তাঁর নিজের তৃতীয় সূত্র মেনেছেন, মহান কল্পবিজ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছে। মনে করুন মুঘল আমলের কোনো মানুষকে আপনি টেলিভিশন দেখাতে পারলেন। তার কাছে আপনি হবেন মহান জাদুকর, না হলে একটা গোটা জগতকে ঐ বাক্সে আপনি ঢোকাবেন কেমন করে? প্রযুক্তির বিবর্তন হয় ডারউইন নয়, লামার্কের পথ ধরে – এক প্রজন্মের অভিজ্ঞতা পরের প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করে। ঘোড়ার গাড়ি থেকে শুরু করে দু’শো বছরের মধ্যে  বিজ্ঞান-প্রযুক্তি যদি চাঁদে নামা রকেট তৈরি করতে পারে, তাহলে আমাদের থেকে হাজার বা লক্ষ বছর এগিয়ে থাকা সভ্যতা আমাদের অবোধ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক।  
      ক্লার্কের      সবচেয়ে পরিচিত উপন্যাস নিশ্চয় ২০০১ঃ এ স্পেস ওডিসি (2001: A Space Odyssey)। সেন্টিনেল নামে একটি ছোটো গল্প পরে উপন্যাসে রূপান্তরিত হয়েছিল। এর চলচ্চিত্র রূপায়ণ করেছিলেন স্ট্যানলি কুব্রিক, কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক চলচ্চিত্রদের মধ্যে তা একেবারে প্রথম সারিতে জায়গা করে নেবে।  তার পরে আরো তিনটি উপন্যাসের মাধ্যমে গল্প শেষ হয়েছিল। মানুষের উপর নজর রাখছে কোনো এক উন্নত সভ্যতার যন্ত্র মনোলিথ। তার প্রযুক্তি আমাদের কল্পনাতীত, যন্ত্র হলেও তার রীতিমত ব্যক্তিত্ব আছে। কখনো সেই সভ্যতা মানুষের বিকাশে সাহায্য করছে, কখনো বা তাকে ধ্বংসে উদ্যত – কিন্তু কোনোটারই কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। গল্পের অপর একটি চরিত্র মানুষেরই তৈরি কম্পিউটার হ্যাল। সে কখনো মহাকাশযানের অভিযাত্রীদের মেরে ফেলতে চায়, আবার কখনো সাহায্য করে। তার এই পরিবর্তনের কারণ আমরা বুঝতে পারি, কিন্তু ক্লার্কের সূত্র মেনেই মনোলিথের উদ্দেশ্য ও প্রযুক্তি আমাদের বুদ্ধির অতীত।
      রাঁদেভু উইথ রাম (Randezvous with Rama) আরো একটি প্রিয় উপন্যাস। সৌরজগতের বাইরে থেকে এক বিশাল মহাকাশযান এসেছিল, যার নাম আমরা দিয়েছিলাম রাম। মানুষের এক অভিযান রামের উপর অবতরণ করে। সেখানে রামের নির্মাতা রামানদের সঙ্গে মানুষের দেখা হয় না। কী উদ্দেশ্যে সে সৌরজগতে এসেছে, তার প্রযুক্তি, কোনো কিছুই প্রকাশ পায় না। আমাদের সভ্যতাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে রাম সৌরজগৎ ত্যাগ করে। এই গল্পটিও সহলেখক নাসার বিজ্ঞানী জেন্ট্রি লীর সঙ্গে মিলে লেখা পরের তিনটি উপন্যাসে অনুসৃত হয়েছে, কিন্তু তারা আমার মন ভরায় নি। পরের গল্পগুলিতে রাম সৃষ্টির উদ্দেশ্য বোঝা গেছে, এমনকি বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরির উদ্দেশ্যও আলোচিত হয়েছে। ক্লার্ক কি নিজের সূত্র ভুলে গিয়েছিলেন? প্রযুক্তি সভ্যতার তিনটি ধাপ আছে বলে মনে  করা হয়। প্রথম ধাপে সভ্যতা একটি গ্রহের, দ্বিতীয় ধাপে একটি সৌরজগতের এবং তৃতীয় ধাপে গোটা ছায়াপথের সমস্ত সম্পদকে ব্যবহার করবে। আমরা এখনো প্রথম ধাপে পৌঁছোইনি, আর রামানরা আছে অন্তত দ্বিতীয় ধাপে। হোমো ইরেকটাসের সঙ্গে আধুনিক মানুষের প্রযুক্তিগত যে পার্থক্য, আধুনিক মানুষ ও রামানদের পার্থক্য তার থেকে বেশি। রামের মতো মহাকাশযান তৈরির উদ্দেশ্য কি এত সহজে বোঝা যাবে?
      ছেড়ে দিন রাম সৃষ্টির উদ্দেশ্য। দু’শো বছর আগে যদি কেউ বলতেন সময়ের গতি যে মাপছে তার বেগের উপর নির্ভর করে, বা একটি কণা একই সময়ে দুটি ভিন্ন জায়গায় অবস্থান করে, কোনো বিজ্ঞানী সেকথা মেনে নিতেন? বিশেষ আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টম বলবিদ্যা আমাদের দেখিয়েছে এই দুটো কথাই সত্যি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ব্যাখ্যা করার জন্য এই দুই সত্যকে প্রয়োজন, আপনি অ্যারিস্টটলকে সে কথা বিশ্বাস করাতে পারতেন? এত সহজে আমরা ব্রহ্মাণ্ডের উদ্দেশ্যকে খুঁজে পাব? কোনো উদ্দেশ্য কি আদৌ আছে? নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন ভাইনবার্গ লিখেছিলেন, The more the Universe seems comprehensible, the more it also seems pointless। বিশ্বকে আমরা সেদিন বুঝতে পারব যেদিন আমাদের বিজ্ঞান সমস্ত মূল তত্ত্ব আবিষ্কার করে ফেলবে। ক্লার্ক কি মনে করছেন আমরা সেই স্তরে পৌঁছে গেছি? রাম সিরিজের প্রথম গল্পেই তো তিনি অক্লেশে নিউটনের তৃতীয় সূত্রকে অগ্রাহ্য করার কথা লিখেছিলেন। বিজ্ঞানে একাধিকবার এরকম হয়েছে যে আমরা ভেবেছি আমাদের জানার আর বিশেষ কিছু বাকি নেই, তারপরের ইতিহাস আমাদের ভুল দেখিয়ে দিয়েছে। মনে পড়ে ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্কের এক অধ্যাপক তাঁকে বলেছিলেন যে পদার্থবিজ্ঞানে আর মৌলিক কিছু আবিষ্কারের সুযোগ নেই। প্লাঙ্কের গবেষণাই কোয়ান্টম তত্ত্বের জন্ম দিয়ে পদার্থবিদ্যার নতুন দিগন্ত খুলে দিল। ক্লার্ক কি তাঁর নিজের প্রথম সূত্রের শেষাংশ ভুলে গেছেন - যদি কোনো বয়স্ক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী কোনো কিছুকে অসম্ভব বলেন, খুব সম্ভবত তিনি ভ্রান্ত?
      এই প্রসঙ্গে আরও একটি উপন্যাসের নাম করতেই হয়, চাইল্ডহুডস এন্ড (Childhood’s End)। এরও প্রথম অংশ একটি ছোটো গল্প হিসাবে প্রকাশিত হয়েছিল। পৃথিবী অধিকার করেছে অন্য সৌরজগতের প্রাণী ওভারলর্ডরা। একমাত্র কোনো অবিচার দেখলেই তারা মানুষের জীবনে হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু তারা কেন দেখা দেয় না,  তাই নিয়ে কৌতূহল ও ক্ষোভ দুইই আছে। প্রথম অংশের শেষে আমরা জানলাম যে ইহুদি-খ্রিস্টান ধর্মের কল্পিত শয়তানের সঙ্গে ওভারলর্ডদের চেহারার এত মিল যে মানুষ তাদের সহজে মেনে নিতে পারত না –- তাই তারা নিজেদের দীর্ঘদিন লুকিয়ে রেখেছিল। তাদের সাহায্যে পৃথিবীতে এক স্বর্ণযুগ আসে। তাদের প্রযুক্তি আমাদের বিজ্ঞানের অগম্য, তারা এও বলে যে ব্রহ্মাণ্ডের উদ্দেশ্য চিরদিনই মানুষের চিন্তার বাইরে থাকবে। কেন ওভারলর্ডরা পৃথিবীতে এসেছে? অবশেষে জানা গেল যে মানুষ বিবর্তনের পরের ধাপ ওভারমাইন্ডে যাওয়ার জন্য তৈরি, সেখানে যাওয়ার পথ সুগম করতেই তাদের পাঠানো হয়েছে। ওভারমাইন্ড কিন্তু মানুষ কেন, এত উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন ওভারলর্ডদেরও বিশ্লেষণের অতীত। ওভারমাইন্ড বিস্ময়ের জন্ম দেয়, কিন্তু আমি তার সঙ্গে একাত্ম বোধ করতে পারিনা -- সে আমাদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। এখানে ক্লার্ক প্রায় এক অতীন্দ্রিয় অনুভূতির কাছাকাছি নিয়ে গেছেন পাঠককে।
      ক্লার্ক ছিলেন সঠিক অর্থেই বিশ্বনাগরিক। শ্রীলঙ্কার কথা আগেই বলেছি। কয়েকটি ভারতীয় বংশোদ্ভূত চরিত্র তাঁর গল্পে এসেছে। ওডিসিতে আছেন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ ডক্টর চন্দ্র, হ্যাল যাঁর কাছে সন্তানতুল্য। দি হ্যামার অফ গডের মুল চরিত্র মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন রবার্ট সিং। এই গল্পেই যে গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষ হতে হতে পৃথিবী বেঁচে যায়, তার নাম দিয়েছেন ধ্বংসের দেবী কালীর নামে। তাঁর পছন্দের পরিবেশ মহাকাশ কোনো দেশের সীমাকে স্বীকার করে না, তাইতো তাঁর গল্পে বৃহস্পতির কোনো উপগ্রহে প্রথম পা রাখে চিনের অভিযাত্রীদল। শীতল যুদ্ধের পরিবেশেও তিনি সোভিয়েত মার্কিন যৌথ অভিযানের কথা লিখতে পারেন। তিনি সংস্কৃতির মিশ্রণে বিশ্বাসী ছিলেন -- তাঁর গল্পে শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মগুরুর জন্ম হয় স্কটল্যান্ডে, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্ম মিলে সৃষ্টি হয় নতুন এক ধর্ম।  

      এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ তাঁর সাহিত্যের প্রতি কতটা সুবিচার করল, তা ঠিক করার ভার পাঠকের। জীবৎকালেই তিনি নাইটহুড সহ নানা সম্মান পেয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ায় আবিষ্কৃত এক ফসিল ডাইনোসরের নাম দেওয়া হয়েছে সেরেন্ডিপাসেরাটপস আর্থারসিক্লারকেই। মহাকাশে একটি গ্রহাণুর নামকরণ হয়েছে ক্লার্ক। দুর্ভাগ্যক্রমে এটির নাম্বার ৪৯২৩, কারণ তাঁর প্রাপ্য ২০০১ নম্বর গ্রহাণুটি জনৈক আলবার্ট আইনস্টাইন আগে থেকে দখল করে রেখেছেন। ক্লার্কের প্রায় সমস্ত লেখায় আছে মানবপ্রকৃতির জয়গান এবং মানুষের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অপরিমেয় আশাবাদ। সেখানে মানুষে মানুষে যে সংঘাত হয়েছে, তার পিছনে ব্যক্তিস্বার্থ নেই, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রগতি ও স্থিতাবস্থার দ্বন্দ্ব। এমন প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তিনি প্রগতির পক্ষে।

প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার জানুয়ারি ২০১৮, পরিমার্জিত