Showing posts with label নানা কথা. Show all posts
Showing posts with label নানা কথা. Show all posts

Saturday, 22 August 2026

নোবেল পুরস্কার ও ভারতবর্ষ: কিছু অল্পপরিচিত তথ্য

    

নোবেল পুরস্কার ও ভারতবর্ষ: কিছু অল্পপরিচিত তথ্য

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


আজ পর্যন্ত যে সমস্ত ভারতীয় নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, আমরা প্রায় সকলেই তাঁদের নাম জানি।নোবেল পুরস্কারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বছর নোবেল কমিটির কাছে মনোনয়ন জমা পড়ে, সাধারণত তাঁরা তার মধ্যে থেকেই প্রাপককে বেছে নেন। পঞ্চাশ বছর সেই সমস্ত তথ্য গোপন থাকে; সেই কারণে এই বছর ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত মনোনয়নের তালিকা নোবেল পুরস্কারের ওয়েব সাইটে পাওয়া যায়। অবশ্য বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই গোপনীয়তা অনেক সময়েই রাখা হয় না, অনেক সংগঠন কাকে মনোনীত করছে তা ঘোষণা করে দেয়। তবে এই লেখাতে আমরা ১৯৭৪ সালের পরের কোনো কথা আলোচনাতে আনব না।

সুব্রহ্মণিয়ান চন্দ্রশেখর, হরগোবিন্দ খোরানা, ভেঙ্কি রামকৃষ্ণনের মতো কয়েকজন আছেন যাঁরা জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও বিদেশী নাগরিক হিসাবে পুরস্কার পেয়েছেন। এঁদের বাইরেও অন্তত দু'জন আছেন, যাঁদের জন্ম ব্রিটিশ ভারতে, কিন্তু তাঁদের আমরা সঠিক অর্থে ভারতীয় বলব না। ম্যালেরিয়ার চিকিৎসা বিষয়ে গবেষণার স্বীকৃতিতে রোনাল্ড রস শারীরবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন ১৯০২ সালে। তাঁর জন্ম আলমোড়াতে। ১৯০৭ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী জঙ্গল বুক-এর বিখ্যাত লেখক রুডইয়ার্ড কিপলিং জন্মেছিলেন বম্বে অর্থাৎ বর্তমান মুম্বাইতে। তবে যখন পুরস্কার ঘোষণা হয়, দুজনেই তখন গ্রেট ব্রিটেনের স্থায়ী বাসিন্দা। নোবেল কমিটিও এঁদের কাউকেই ভারতীয় হিসাবে গণ্য করে না। আরো কয়েকজন বিদেশী ভারতে গবেষণার জন্য শারীরবিদ্যাতে নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, তাঁদেরও আমরা আলোচনার বাইরে রাখছি। অবিভক্ত ভারতের নাগরিকদের আমরা অবশ্য ভারতীয়ই ধরছি।

বিজ্ঞান ও অর্থনীতির পুরস্কারগুলির জন্য কমিটি কিছু সংখ্যক নির্বাচিত ব্যক্তিদের থেকে মনোনয়ন আহ্বান করে। বিজ্ঞানে যে সমস্ত ভারতীয়ের নাম নোবেলের জন্য কখনো না কখনো মনোনীত হয়েছিল, তাঁদের সবাই সুপরিচিত। পদার্থবিজ্ঞানে মেঘনাদ সাহা (৭), সত্যেন্দ্রনাথ বসু (১১), হোমি জেহাঙ্গির ভাভা (৫), ই সি জি সুদর্শন (১), রসায়নে জি এন রামচন্দ্রন (৩) ও টি আর শেষাদ্রি (২), এবং শারীরবিদ্যাতে উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচারী (৬)-র সমর্থনে বিভিন্ন সময়ে মনোনয়ন জমা পড়েছিল। (বন্ধনীর মধ্যে সমর্থনে জমা পড়া মনোনয়নপত্রের সংখ্যা দেখানো হয়েছে।)

নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য নোবেল কমিটি মনোনয়ন চেয়ে পাঠায়। তা ছারাও আগের নোবেলজয়ীরা, বিভিন্ন দেশের সাহিত্য আকাদেমির প্রধানরা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা মনোনয়ন জমা দিতে পারেন। শান্তির নোবেল পুরস্কারের জন্য পূর্বতন প্রাপক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ অনেকেই মনোনয়ন পাঠাতে পারেন।

কয়েকজন ভারতীয়ের নাম শান্তি ও সাহিত্যের জন্য মনোনীত ব্যক্তিদের দুই তালিকাতেই পাওয়া যাবে, তাঁদের মধ্যে প্রথমেই আসবে ভারতের রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের নাম। তিনি মোট ষোল বার সাহিত্যের জন্য এবং এগারো বার শান্তির নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। আর এক ভারতীয় যাঁর নাম এই দুই বিভাগেই এসেছিল তিনি হলেন শ্রী অরবিন্দ; দুটি পুরস্কারের জন্যই তিনি একবার করে মনোনীত হয়েছিলেন।

রাধাকৃষ্ণন বা অরবিন্দের পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আরো দুজন ভারতীয়ের নাম এই তালিকাতে আসবে, যাঁরা এখন বিস্মৃতপ্রায়। হরিমোহন ব্যানার্জি পাঁচবার শান্তি ও একবার সাহিত্যের জন্য মনোনীত হন। সঞ্জীব চৌধুরি দুবার সাহিত্য ও আটবার শান্তির নোবেলের জন্য মনোনীত হয়েছেন।

শান্তির নোবেলের জন্য অনেকেই মনোনয়ন জমা দিতে পারেন। তাই মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকায় মহাত্মা গান্ধী (১২), জহরলাল নেহরু (১৩), বিনোবা ভাবে (১১)-র পাশাপাশি এমন অনেক নাম আছে, যাঁরা এখন প্রায় বিস্মৃত। সাহিত্যের মনোনীত ব্যক্তিদের তালিকায় আছে রবি দত্ত (২), বিজয়চন্দ্র মজুমদার (২), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (৩) ও সুনীতিকুমার চ্যাটার্জি (২), ইন্দিরা দেবী ধনরাজগির (১) ও প্রতাপ ট্যান্ডন (১) । এঁদের মধ্যে ইন্দিরা দেবী ও প্রতাপ ট্যান্ডন এখনো জীবিত। সুইডিশ অ্যাকাডেমির নোবেল কমিটির সদস্যরা প্রতিবছর কমিটির প্রথম সভাতে নাম প্রস্তাব করতে পারেন। প্রথমবার প্রস্তাবিত হওয়ার পরে সুনীতিকুমার ও তারাশঙ্করের নাম এভাবেই এসেছিল।

আমাদের আলোচ্য সময়কালে দুজন ভারতীয় নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন। ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর নাম প্রস্তাব করেছিলেন টমাস মুর। ওই একবারই রবীন্দ্রনাথের নাম প্রস্তাবিত হয়। সেই বছর সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মোট ৩২টি নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল। এঁদের মধ্যে কার্ল গুস্তাফ ভার্নার ভন হাইডেনস্টাম (১৯১৬), হেনরিক পন্টোপিডান (১৯১৭), কার্ল অ্যাডলফ গেজেলরুপ (১৯১৭), কার্ল স্পিটেলার (১৯১৯), আনাতোলে ফ্রান্স (১৯২১), গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দা (১৯২৬) ও আঁরি বের্গসন (১৯২৭) পরে নোবেল পুরস্কার জিতবেন। প্রতিটি বিষয়ের নোবেল পুরস্কার বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট নোবেল কমিটি। সাহিত্যের পুরস্কারের জন্য সুপারিশ যায় সুইডিশ অ্যাকাডেমির কাছে। অ্যাকাডেমি সেই সুপারিশ মানতে বাধ্য নয়; রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছিল। কমিটি সুপারিশ করেছিল ফরাসি লেখক এমিল ফাগের নাম, কিন্তু অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রনাথকেই নির্বাচিত করে। রবীন্দ্রনাথ নিজে একবারই কোনো নাম প্রস্তাব করেছিলেন; ১৯৩৫ সালে তিনি আইরিশ-ভারতীয় লেখক জেমস কাজিন্‌সকে সাহিত্যে নোবেলের জন্য মনোনীত করেন।

১৯৩০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন। তাঁর নামে ১৯২৯ সালের পুরস্কারের জন্য দুটি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল, প্রস্তাবক ছিলেন চার্লস ফেব্রি ও নিল্‌স বোর। পরের বছর তাঁকে মনোনীত করেছিলেন নিল্‌স বোর, জাঁ পের‍্যাঁ, ওরেস্ট খোলসন, ইউজিন ব্লখ, লুই দ্য ব্রয়ি, মরিস দ্য ব্রয়ি, রিচার্ড ফেইফার, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, জোহানেস স্টার্ক ও চার্লস উইলসন। এঁদের মধ্যে বোর, পের‍্যাঁ, লুই দ্য ব্রয়ি, রাদারফোর্ড, স্টার্ক ও উইলসন ছিলেন নোবেলজয়ী।

১৯৩০ সালের মনোনয়নের তালিকাতে পদার্থবিজ্ঞানের অনেক রথীমহারথীর নাম পাওয়া যাবে। তাঁদের মধ্যে পরে যাঁরা এই পুরস্কার পাবেন, তাঁরা হলেন ভার্নার হাইজেনবার্গ (১৯৩২), এরভিন শ্রোয়ডিঙ্গার (১৯৩৩), মাক্স বর্ন (১৯৫৪), ক্লিন্টন ডেভিসন (১৯৩৭), পিটার ডিবাই (১৯৩৬, রসায়ন) ও অটো স্টার্ন (১৯৪৩)। সেই বছর মেঘনাদ সাহার নামও প্রথমবারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল, প্রস্তাবক ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসু ও শিশির কুমার মিত্র।

নোবেল কমিটি প্রাথমিকভাবে তিনজনের নাম নির্বাচিত করে রিপোর্ট তৈরি করে; সেই তিনজন হলেন রামন, মেঘনাদ ও রবার্ট উড। মেঘনাদ ও রবার্ট উডের ক্ষেত্রে কমিটি মনে করেছিল যে তাঁদের আবিষ্কার যথেষ্ট মৌলিক নয়। সাহার ক্ষেত্রে রিপোর্টের সারসংক্ষেপে লেখা হয়েছিল, ‘Saha’s work is proved to be very important for modern astrophysics, but this can hardly be seen as a new physical discovery, more as an application to known physical accumulated astrophysical data. With all recognition for the value of Saha’s achievements, the Committee find itself not in the position to recommend him for the reception of the Nobel Prize for physics.” (সুইডিশ ভাষা থেকে রাজিন্দর সিং কর্তৃক অনূদিত।) পরে আরো কয়েকবার মেঘনাদের নাম এসেছিল, নোবেলজয়ী আর্থার কম্পটন দুবার তাঁর নাম প্রস্তাব করেন, তবে কমিটি নতুন করে বিবেচনার প্রয়োজন বোধ করেনি।

রামনের ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল আরো জটিল, তাই কমিটি তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিল। এখন আমরা যাকে রামন এফেক্ট বলি, দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী গ্রিগরি লান্ডসবার্গ ও লিওনিদ মান্ডেলস্টাম রামনের কয়েকদিন আগেই তা দেখেছিলেন। তাঁদের নামও সেই বছর পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল। কিন্তু রামনের প্রবন্ধটি তাঁদের অনেক আগেই প্রকাশিত হয়।

বিজ্ঞানে আগে প্রকাশকেই যে গুরুত্ব দেওয়া হয় তার অনেক নিদর্শন আছে। সন্দেহ নেই রামন তাঁর কাজের গুরুত্ব সোভিয়েত বিজ্ঞানীদের আগেই বুঝেছিলেন। আবিষ্কারটি হয় ১৯২৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি; রামন ১৬ মার্চ বাঙ্গালোরে এক বক্তৃতাতে তিনি ব্যাখ্যা করেন। কলকাতাতে ফিরে তিনি বক্তৃতাটি অবিলম্বে ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিক্স-এ ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। তিনিই ছিলেন জার্নালটির সম্পাদক। লেখাটি প্রকাশ হয় ৩১ মার্চ, সঙ্গে সঙ্গে ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি প্রেস সারা রাত কাজ করে একদিনের মধ্যে প্রবন্ধটির দু' হাজার কপি ছাপায়, পরের দিনই রামন সারা পৃথিবীর এই বিষয়ে গবেষণারত সমস্ত সুপরিচিত বিজ্ঞানীদের কাছে সেগুলি ডাকযোগে পাঠিয়ে দেন।

সম্ভবত লান্ডসবার্গ ও মেন্ডেলস্টামের কাছেও তা পৌঁছেছিল। তাঁদের প্রবন্ধটি তাঁরা পাঠিয়েছিলেন সেই বছর ৬ মে, জুলাই মাসে তা প্রকাশিত হয়। নোবেল কমিটির রিপোর্টে লেখা হয় লান্ডসবার্গ ও মেন্ডেলস্টামের প্রবন্ধে রামনের কাজের উল্লেখ আছে, এবং তাঁরা তাঁদের আবিষ্কারের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসাবে রামনের কথারই প্রতিধ্বনি করেছেন। সেই কারণে তাঁদের কাজকে স্বাধীন বলা যায় না। তা ছাড়াও তাঁরা জোর দিয়ে বলেন রামন দেখিয়েছেন যে সমস্ত পদার্থেই এই ক্রিয়া দেখা যাবে, দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী শুধুমাত্র কেলাসিত পদার্থের কথা বলেছিলেন। তাই রামনকেই আবিষ্কারকের সম্মান দিতে হয়। মনে রাখতে হবে যে সেই ক্রিয়াটি তখনই তাঁর নামেই পরিচিত হয়েছিল, নোবেল পুরস্কারের ঘোষণাতে আছে রামনকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে ‘for his work on the scattering of light and for the discovery of the effect named after him.’ তাই রামনকে নির্বাচিত করে নোবেল কমিটি কোনো ভুল করেনি।

রামন নিজে পাঁচ জনকে নোবেলের জন্য মনোনীত করেন, তাঁরা হলেন অটো স্টার্ন, এনরিকো ফের্মি, আর্নেস্ট লরেন্স, সুব্রহ্মণিয়ান চন্দ্রশেখর ও জি এন রামচন্দ্রন। এঁদের মধ্যে রামচন্দ্রন ছাড়া বাকিরা পরে পুরস্কার জিতেছেন। মেঘনাদ সাহা একটিই মনোনয়ন পাঠিয়েছিলেন, তাঁর পছন্দ ছিলেন আর্নল্ড সমারফেল্ড। বিভিন্ন সময় সমারফেল্ডের নামে মোট বিরাশিটি মনোনয়ন জমা পড়েছিল, কিন্তু পুরস্কার তাঁর অধরাই রয়ে যায়। ১৯৫১ সালেই এক পথ দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়; মৃত ব্যক্তির নাম নোবেলের জন্য বিবেচনা করা হয় না।

শেষ করি সত্যেন্দ্রনাথের কথা দিয়ে। তাঁকে কোনো বিদেশি বিজ্ঞানী কখনো পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেননি। প্রথমবার তাঁর সমর্থনে মনোনয়ন জমা পড়ার পরে তা বিবেচনার জন্য নোবেল কমিটি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অস্কার ক্লাইনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ক্লাইন বোস সংখ্যায়নের কাজটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে স্বীকার করলেও অন্য অনেকের থেকে কম কৃতিত্বের বলে রিপোর্টে লেখেন। তাই বোস সংখ্যায়নের বেশ কয়েকটি প্রয়োগকে পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলেও সত্যেন্দ্রনাথের নাম পুরস্কৃতদের তালিকাতে পাওয়া যাব না। তবে বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবনের জন্য নোবেল পুরস্কারজয়ী উলফগ্যাং কেটার্লের কথাই এখানে শেষ কথা হতে পারে, ‘ব্রহ্মাণ্ডের অর্ধেক কণা যাঁর নাম বহন করে, তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল কিনা তাতে কী আসে যায়?’


জার্মানির ওল্ডেনবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বন্ধু রাজিন্দর সিং দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় নোবেল পুরস্কার প্রাপক ও মনোনয়নকারীদের নিয়ে কাজ করে চলেছেন এবং বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ ও বই প্রকাশ করেছেন। অনেক তথ্য তাঁর লেখা থেকে নেওয়া হয়েছে। বাকি তথ্য নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া গেছে। 

 

প্রকাশ অর্চি পত্রিকা, একাদশ সংখ্যা, কলকাতা বইমেলা ২০২৬  

Monday, 3 August 2026

জ্ঞান ও বিজ্ঞান, সম্পাদকীয় জুলাই ২০২৬

 

প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল আইজ্যাক নিউটনের মহাগ্রন্থ প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা। ১৬৮৭ সালের জুলাই মাসের ৫ তারিখ এডমন্ড হ্যালি চিঠিতে নিউটনকে জানান যে বইটি ছাপা সম্পূর্ণ হয়েছে। রয়্যাল সোসাইটির অর্থাভাবের জন্য হ্যালি নিজের দায়িত্বে ও খরচে বইটি ছাপিয়েছিলেন। বইয়ের ভূমিকাতে নিউটন নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে লিখেছিলেন, ‘আমি এই প্রয়াসকে প্রকৃতির দর্শনের গাণিতিক নীতি হিসাবে উপস্থাপিত করছি, কারণ গতি সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাকৃতিক বল বিষয়ে অনুসন্ধান, সেই বল থেকে অন্যান্য ঘটনার ব্যাখ্যা -- এই হল এই দর্শনের উদ্দেশ্য। আমরা যান্ত্রিক বলবিদ্যার সূত্র থেকে সমস্ত প্রাকৃতিক ঘটনাকে ব্যাখ্যা করতে সমর্থ হব, এই আমার ইচ্ছা।’ যান্ত্রিক বিশ্বদর্শনের (Mechanical philosophy) এই তূর্যধ্বনি থেকেই জন্ম নিল নিয়তিবাদ (Determinism)। সে ঘোষণা করল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বর্তমান সম্পর্কে সম্পূর্ণ জ্ঞান থেকে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব -- সমস্ত ঘটনাই পূর্বনির্দিষ্ট। পদার্থবিদ্যার পরের দু'শো বছরের ইতিহাস শুধু যান্ত্রিক বলবিদ্যার জয়যাত্রার ইতিহাস। সে সৃষ্টি করেছিল চিরায়ত পদার্থবিদ্যার এক সৌধ যার ভিত্তির দৃঢ়তা নিয়ে কারো বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না।

আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে আর এক জুলাই মাসে সেই সৌধের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন মাক্স বর্ন। তিনি দেখিয়েছিলেন উপর থেকে দেখলে সৌধে কোনো ত্রুটি চোখে পড়বে না, কিন্তু তার ভিত্তি গড়েছিল যে নিউটনিয় নিয়তিবাদ তা প্রকৃতপক্ষে অলীক; আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মূলগতভাবে সম্ভাবনাময়। ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাপ্তিলগ্ন থেকেই সেই সৌধে ফাটল দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু মনে হয়েছিল যে মেরামত করে হয়তো তাকে আবার আগের মতো করা যাবে। ১৯২৬ সালের ২১ জুলাই মাক্স বর্ন এক প্রবন্ধ লিখে দেখালেন তা হওয়ার নয়।

বিজ্ঞানীরা অনুমান করছিলেন অণুপরমাণুর জগৎ নিউটনের বলবিদ্যা নয়, নব আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম বলবিদ্যার নিয়ম মেনে চলে। কিন্তু সমস্যা ছিল যে সেই কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দুটি রূপ, ভার্নার হাইজেনবার্গের ম্যাট্রিক্স ও এরভিন শ্রয়ডিঙ্গারের তরঙ্গ সমীকরণ, তাদের মনে করা হচ্ছিল পরস্পরবিরোধী। হাইজেনবার্গ নিউটনের নিয়তিবাদকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করছিলেন, শ্রয়ডিঙ্গার সেখানেই আবার ফিরে যেতে চাইছিলেন। বর্ন দুই তত্ত্বের মাঝে এক সেতু গড়লেন; দেখালেন প্রকৃতিতে কার্যকারণ সম্পর্ক নিয়তিবাদের শৃঙ্খলে বাঁধা নয়, এক কারণ থেকে একাধিক কার্য সম্ভব, এবং নানা কার্যের সম্ভাবনা নির্ণয় করতে পারলেও ঠিক কোনটিই হবে তা আগে থেকে বলা আমাদের সাধ্যাতীত।

পদার্থবিজ্ঞানে সম্ভাবনার এই প্রবেশ অনেকেরই পছন্দ হয়নি, তাঁদের মধ্যে পড়বেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তাদের মধ্যে তিনজন -- মাক্স প্লাঙ্ক, আলবার্ট আইনস্টাইন, এবং লুই দ্য ব্রগলি। কিন্তু প্রকৃতি বিজ্ঞানীর মতামতের উপর নির্ভর করে না, যে কথা আইনস্টাইনকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন কোয়ান্টাম তত্ত্বের অপর এক মূল স্থপতি, নীলস্‌ বোর।

একশো বছর পরেও বিজ্ঞানীরা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার চরিত্র নিয়ে তর্ক করে চলেছেন। সেই তর্কে যোগ দিয়েছেন দার্শনিক, শিল্পী, সাহিত্যিকরা; কারণ কোয়ান্টাম সাধারণ কোনো তত্ত্ব নয়, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মৌলিক কাঠামো সম্পর্কেই আমাদের ধ্যানধারণাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। সেই তর্কের মীমাংসা এখনো আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে, কিন্তু তার জন্য কোয়ান্টাম বলবিদ্যা থেমে থাকেনি। আধুনিক প্রযুক্তির অধিকাংশই কোয়ান্টাম নির্ভর, সেই হিসাবে গত শতাব্দী এক অর্থে কোয়ান্টামের শতাব্দী।


                                            গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 

Monday, 6 October 2025

দুই বন্ধু

 

দুই বন্ধু

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

দুই বন্ধুর প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯১১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। একজন ওই কলেজেরই ছাত্র, ইন্টারমিডিয়েট পাস করে বিএসসি ম্যাথামেটিক্স ক্লাসে ভর্তি হয়েছেন। অন্যজন একই ক্লাসের নতুন ছাত্র। তবে একে অন্যের নাম জানতেন। কারণ ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতে তাঁরা ছিলেন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। একজন দুটি পরীক্ষাতেই তৃতীয় হয়েছিলেন। অন্যজন ম্যাট্রিকে পঞ্চম, ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম। প্রথমজনের নাম মেঘনাদ সাহা, দ্বিতীয়জনের নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। প্রথম পরিচয় কেমন করে হয়েছিল কেউ লিখে যাননি। নিখিলরঞ্জন সেন মেঘনাদের সঙ্গে ঢাকাতে পড়েছিলেন, আবার ইন্টারমিডিয়েট পড়েছিলেন কলকাতাতে সত্যেনের সঙ্গে; হয়তো তিনিই দুজনের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে দুই বন্ধুর জীবন এক গ্রন্থিতে বাঁধা পড়েছিল।

মেঘনাদের জন্ম হয়েছিল ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকার কাছে শেওড়াতলি গ্রামে, সত্যেনের তার পরের বছর ১ জানুয়ারি কলকাতার গোয়াবাগানে। তাঁদের বয়সের তফাত তিন মাসেরও কম, জন্মস্থানের দূরত্ব তিনশো কিলোমিটার। সে যুগের যোগাযোগ ব্যবস্থার বিচারে তিনশো কিলোমিটার দূরত্বটা খুব কম নয়। কিন্তু তাঁরা জন্মসূত্রে বাঙালি সমাজের এমন দুই স্তরের বাসিন্দা, ইতিহাসের সেই মুহূর্তে যাদের মধ্যে দূরত্বকে কিলোমিটারে প্রকাশ করতে পারলে তার মাপ হতো আরো অনেক বেশি। জাতের বিচারে মেঘনাদ ছিলেন বৈশ্য সাহা, বাঙালী হিন্দু সমাজে তখন যাদের স্থান ছিল অত্যন্ত নিচু। একাধিকবার তাঁকে স্কুল কলেজের সরস্বতী পূজার মণ্ডপ থেকে বার করে দেওয়া হয়। কলকাতার হিন্দু হস্টেলে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে বসে খাওয়ার অধিকার তাঁর ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথের পরিবার কুলীন কায়স্থ, তাঁকে কখনো এই পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়নি।

শুধু জাতপাতের বিচারে নয়, আর্থিক অবস্থাতেও দুজনের অনেক অমিল। মেঘনাদের পরিবার ছিল হতদরিদ্র, গ্রাম্য মুদি বাবা জগন্নাথ ছেলের পড়া ছাড়িয়ে দোকানে বসাতে চেয়েছিলেন। কখনো অন্যের বাড়িতে থেকে, কখনো বা ছাত্রবৃত্তির উপর ভরসা করে পড়াশোনা চালিয়েছেন মেঘনাদ। মা শেষ সম্বল হাতের বালা বিক্রি করে ছেলের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফি ভরেছেন। সত্যেন্দ্রনাথের বাবা সুরেন্দ্রনাথ ছিলেন রেলের চাকুরে, পাশাপাশি ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস বলে এক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। সেকালের বিচারে বাঙালী সমাজে তাঁরা যথেষ্ট সচ্ছল। আর্থিক সমস্যা কখনো সত্যেনের শিক্ষালাভের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

সত্যেন্দ্রনাথ পড়েছিলেন কলকাতার তিনটি স্কুলে। নর্মাল স্কুল ছিল বাড়ির কাছে, বাড়ি পরিবর্তন করার পরে পড়েছিলেন নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে। সবশেষে তাঁর বাবা তাঁকে হিন্দু স্কুলে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করেছিলেন যাতে তাঁর প্রতিভা সঠিক দিশা পায়। ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হলেন হিন্দু স্কুল থেকে রাস্তা পেরিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে। মেঘনাদের পড়াশোনা শুরু পাঠশালায়, তারপর গ্রামে স্কুল না থাকায় দূরের শিমুলিয়া গ্রামে গিয়ে অন্যের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা। ছাত্রবৃত্তির টাকা সম্বল করে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, কিন্তু বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বাংলার ছোটোলাটকে বিক্ষোভ দেখানোর অপরাধে সেখান থেকে বিতাড়ন। অগত্যা ভরসা ঢাকার কিশোরীলাল জুবিলি স্কুল। ম্যাট্রিক পাস করার পরে ঢাকা কলেজ। সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পাস করলেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজ তখন গোটা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে নামকরা কলেজ। সারা বাংলাদেশ এমনকি বাংলার বাইরে থেকেও ছেলেরা এসে সেই কলেজে ভর্তি হয়। মেঘনাদ সত্যেন দুজনেই সেখানে গণিতে অনার্স নিয়ে পড়লেন। দু বছর পরে বিএসসি পাস করলেন দুজনে, ভর্তি হলে প্রেসিডেন্সির কলেজের এমএসসিতে। দুজনেরই বিষয় এক, মিশ্র গণিত। ১৯১৫ সালে এমএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন দুই বন্ধু। বিএসসি এবং এমএসসি, দুই পরীক্ষার ফলই এক। প্রথম সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দ্বিতীয় মেঘনাদ সাহা।

কেমন কেটেছে কলেজের চার বছর? দুজনেই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের খুব প্রিয় ছাত্র, জগদীশচন্দ্রের কাছেও পড়েছেন। কলেজে দুজনের বন্ধুত্ব হয়েছে আরো কয়েকজনের সঙ্গে যাঁরা ভবিষ্যতে ভারতবর্ষের বিজ্ঞানের স্থপতি হিসাবে কাজ করবেন -- রসায়নে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নীলরতন ধর, গণিতে নিখিলরঞ্জন সেন, পদার্থবিদ্যাতে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, স্নেহময় দত্ত। কলেজে বন্ধুত্ব হলেও দুজনের খুব ঘনিষ্ঠতা হয়নি; সেই ঘনিষ্ঠতা আসবে পরে, গবেষণা ও অধ্যাপনার সময়। কলেজ ছাত্র সত্যেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুবৃত্ত বিরাট, সেখানে অক্লেশে স্থান পায় বয়সে ছোটরা, আর্টস বা অন্য বিষয় নিয়ে পড়া ছাত্ররা, সঙ্গীত বা শিল্পকলাতে উৎসাহীরা। পরে তাঁদের অনেকেই বিখ্যাত হবেন। প্রতিদিন বিকাল সন্ধেতে হেদোর পুকুরের ধারে তাঁদের আড্ডা বসে, কিন্তু সেখানে মেঘনাদের উপস্থিতির খবর পাই না। অবশ্য তাঁর সেখানে যাওয়ার সময়ও নেই, খরচ চালাতে সাইকেল চড়ে কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ টিউশনি করে বেড়াতে হয় তাঁকে। তাই মেঘনাদের বন্ধুবৃত্ত কলেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাঙাল ভাষাতে কথা বলা শহুরে আদবকায়দা না জানা ছাত্রটিকে নাগরিক কলকাতা আপন করে নেয়নি। মেঘনাদের সামাজিক হেনস্থার প্রতিবাদে তাঁর সঙ্গেই হিন্দু হস্টেল ছেড়েছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ ঘোষ ও নীলরতন ধর, কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। অনেক বছর পরে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিচারণে সে সময় মেঘনাদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ না করাটা তাঁর ভুল বলেই স্বীকার করবেন।

কলেজের বাইরে কলকাতাতে মেঘনাদের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল কিছু মানুষের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে সবার আগে থাকবেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। সেই নামে তাঁকে কেউ কেউ হয়তো চিনতেন না, কিন্তু যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেতা বাঘা যতীন তখন সকলের কাছেই পরিচিত। ঢাকাতে থাকাকালীন অনুশীলন সমিতির নেতা পুলিনবিহারী দাসের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল মেঘনাদের, সেই সূত্রেই বাঘা যতীনের সঙ্গে আলাপ। মেঘনাদ চেয়েছিলেন তাঁর দলে যোগ দিতে, বাঘা যতীন তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, “দেশসেবাতে তোমার পথ ভিন্ন।” চাকরি পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিপ্লবীদের সঙ্গে মেঘনাদের যোগাযোগ। রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হওয়াও পিছিয়ে গিয়েছিল। প্রথমবার বিদেশ থেকে ফেরার সময় বার্লিন থেকে মেঘনাদ নিয়ে এসেছিলেন সেই সঙ্কেতবার্তা, যা প্রবাসী ও দেশের সশস্ত্র বিপ্লবীদের পরস্পরকে চিনতে সাহায্য করবে।

সত্যেন্দ্রনাথ কি কখনো বিদেশী শাসন থেকে মুক্তির কথা ভাবেননি? আইনস্টাইন তাঁকে জিজ্ঞাসা করবেন, “ধরুন আপনার সামনে একটা বোতাম আছে যা টিপলেই দেশ ইংরাজ শাসন মুক্ত হবে। আপনি কী করবেন?” সত্যেন্দ্রনাথের উত্তর, “কোন চিন্তা না করেই টিপে দেব।” গরীব ঘরের যে ছেলেরা পয়সার অভাবে স্কুলে ভর্তি হতে পারে না, কলেজে পড়ার অবসরে তাদেরকে বিনা মাইনেতে পড়াতেন সত্যেন। সেই নাইট স্কুল চালাত বিপ্লবীরা। প্রিন্সিপাল ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ডি এন মল্লিক। প্রথমবার বিদেশ যাওয়ার সময় সত্যেন্দ্রনাথ মারফত বার্লিনে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের কাছে অর্থ পৌঁছেছিল। তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সহযোগী অবনী মুখার্জী কলকাতাতে এসে সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, ঢাকাতেও তাঁর সাহায্য পেয়েছিলেন। প্রৌঢ় সত্যেন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেছিলেন ছাত্র, মেঘনাদ বা সত্যেন্দ্রনাথের সাফল্যের পিছনে অনুপ্রেরণা কী ছিল। সত্যেন্দ্রনাথ উত্তর দিয়েছিলেন, “দ্যাখ, আমাদের মনে হত সাহেবরা যা পারে, আমরা তা পারবো না কেন? বিজ্ঞানে আমরা যে সাহেবদের চেয়ে কম নই, তা দেখিয়ে দিতে হবে।”

এমএসসি পাস করলেন দুজনে, এবার কী? মেঘনাদ ভাবলেন চাকরি করবেন, কিন্তু বাদ সাধল সরকার। বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহে ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষাতে বসার অনুমতি মিলল না। সত্যেন কয়েক জায়গায় দরখাস্ত করলেন, সঙ্গে ডি এন মল্লিকের সুপারিশ পত্র। এমএসসিতে রেকর্ড নাম্বার পেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ, তা দেখে ডি এন মল্লিক বলেছিলেন, “এত নম্বর পেয়েছ পরীক্ষায়, বড় বেমানান লাগছে হে।” গুরুবাক্য মিথ্যা হয়নি। বিহারের কলেজ বা কলকাতার আবহাওয়া অফিস একই কথা বলে ফিরিয়ে দিল, তারা সেকেন্ড ক্লাস এমএসসি খুঁজছে। এত ভালো ছাত্র তাদের দরকার নেই।

দুজনেরই ইচ্ছা গবেষণা করবেন, কিন্তু সুযোগ কোথায়? এক সহপাঠী শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ এসে খবর দিলেন, তিনজনকে ডেকেছেন স্যার আশুতোষ। ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে সরে যাওয়ার ঠিক আগে বিজ্ঞান কলেজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তিনি। সেখানে ১৯১৬ সাল থেকে চালু হবে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে এমএসসি পড়ানো ও গবেষণা। উপাচার্য পদে না থাকলেও আশুতোষই বিজ্ঞান কলেজের প্রাণ। রসায়ন বিভাগে আছেন দুই অধ্যাপক, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও প্রফুল্লচন্দ্র মিত্র। পদার্থবিজ্ঞানে দুই অধ্যাপকের একজন সি ভি রামন কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে, তখনো ছাড়পত্র পাননি। অন্যজন দেবেন্দ্রমোহন বসু উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়াতে আটকা পড়েছেন। ছাত্রদের পড়াবে কে? দুই বন্ধুর সম্পর্কে তিনি খবর নিয়েছেন। গণিতের ছাত্র হলে কি হবে, তারা যে পদার্থবিদ্যা পড়াতে পারবে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত।

দুজনকে ডেকে পাঠালেন বাংলার বাঘ। সত্যেনকে দায়িত্ব দিলেন আপেক্ষিকতা পড়ানোর, মেঘনাদ পড়াবেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব। তাঁদের পদ হল পদার্থবিজ্ঞানে পালিত অধ্যাপকের সহকারী, যদিও পালিত অধ্যাপক পদে আরো এক বছরেরও বেশি পরে যোগ দেবেন রামন। নামে সহকারী হলেও অবশ্য দুই বন্ধু কোনোদিনই রামনের সঙ্গে কাজ করেন নি, চিরকালই গবেষণাতে তাঁরা স্বাধীন। শৈলেনের উপর দায়িত্ব পড়েছিল পদার্থবিদ্যা বিভাগের ল্যাবরেটরি তৈরির। সে সুযোগ তাঁর হয়নি, কিন্তু সে অন্য গল্প।

কাজ সহজ নয়, পড়াতে হবে এমন দুটি বিষয় যেগুলি তখন সদ্যোজাত। কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম হয়েছে ১৯০০ সালে, তা তখনো পরিবর্তনশীল। সাধারণ আপেক্ষিকতা বিষয়ে আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে, তার পরের বছরেই তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে ঢুকবে। গণিতে এমএসসি পড়তে গিয়ে সত্যেন ও মেঘনাদ পদার্থবিদ্যার এই দুই নতুন তত্ত্বের সম্মুখীন হননি। তার থেকেও বড়ো সমস্যা হল বিষয়দুটি নতুন বলে কোনো পাঠ্যবই নেই। ছাত্রদের পড়াবেন কেমন করে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে লেখা আছে শিক্ষকরা মূল গবেষণাপত্র থেকে পড়াবেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। দুটি বিষয়েই অধিকাংশ গবেষণাপত্রগুলি জার্মান ভাষায় লেখা -- কারণ যাঁরা কাজগুলি করছেন, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ বিজ্ঞানীই জার্মান। সে যুগে তাঁরা প্রবন্ধ লেখেন তাঁদের মাতৃভাষায়।

মেঘনাদ জার্মান কিছুটা জানতেন, ইন্টারমিডিয়েটে পড়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ শিখেছিলেন ফরাসি, তাতে চলবে না। দুজনে মিলে ভর্তি হয়ে গেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান শেখার ক্লাসে। সেখানে সহপাঠী পেলেন আর এক বিখ্যাত পণ্ডিতকে, ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। নিজেরা শিখলেন, কিন্তু ছাত্রদের কী হবে? তাদের সবার পক্ষে তো একটা নতুন ভাষা শেখা সম্ভব নয়। ভেবেচিন্তে দুই বন্ধু আইনস্টাইনের কাছ থেকে তাঁর আপেক্ষিকতা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রগুলি অনুবাদ করে ছাপা অনুমতি চাইলেন। অনুমতি দিলেন আইনস্টাইন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হল আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মূল গবেষণাপত্রগুলির প্রথম ইংরাজি অনুবাদ। অনুবাদক মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ভূমিকা লিখলেন তাঁদের থেকে এক বছরের সিনিয়র প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের তরুণ শিক্ষক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ।

দুজনেই হাতড়াচ্ছেন গবেষণার পথ। কখনো কখনো তাঁদের উৎসাহ এক জায়গায় এসে মেলে। গ্যাসের অবস্থার সমীকরণ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র লিখে ফেললেন দুই বন্ধু, সেটি সত্যেন্দ্রনাথের প্রথম পেপার। সেই গবেষণা ছিল তাপগতিবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত। তাপগতিবিদ্যার তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা। দুই বন্ধুর দুই শ্রেষ্ঠ কীর্তি সাহা সমীকরণ ও বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন দুইই পদার্থবিদ্যার এই শাখার মধ্যেই পড়বে, সেই যৌথ গবেষণা তাঁদের ভবিষ্যৎ পথে প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু সেই শেষ, আর কোনো গবেষণাপত্রের লেখক তালিকায় একই সঙ্গে দুই বন্ধুর উপস্থিতি পাওয়া যাবে না।

এবার ভিন্ন পথে বয়ে চলল দুজনের জীবনধারা। থিসিস জমা দিলেন মেঘনাদ, পেলেন ডক্টরেট ডিগ্রি, ডিএসসি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে আবিষ্কার করলেন বিখ্যাত তাপ আয়নন সমীকরণ। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে উঁকি মারার সেই চাবিকাঠিকে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানী মহলে সাড়া জাগাল, শুরু হল জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার নব যুগের। তা প্রকাশের আগেই অবশ্য মেঘনাদ পাড়ি দিয়েছেন ইংল্যান্ডে, সেখান থেকে জার্মানি। কিন্তু মন পড়ে রয়েছে দেশে। আশুতোষেরও মনে আছে তাঁর কথা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পৃথিবীর বিজ্ঞানজগতে প্রথম তুলে ধরেছেন মেঘনাদ। তাই প্রথম সুযোগেই পদার্থবিদ্যা বিভাগে তৈরি করলেন এক নতুন পদ, খয়রা অধ্যাপক। মেঘনাদ এসে যোগ দিলেন সেই পদে। সেটা ১৯২১ সাল।

সত্যেন কিন্তু তার কয়েকমাস আগে কলকাতা ছেড়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদ তাঁর মেলেনি। মেঘনাদের মতোই বিদেশে গবেষণার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এক জায়গায় দুই বন্ধুর জীবনে তফাত হয়ে গিয়েছিল। এমএসসি পড়তে পড়তেই মায়ের আদেশ মেনে বিয়ে করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ; বিদেশে গবেষণার জন্য বৃত্তি তাই নিয়মের জালে আটকে গিয়েছিল। আশুতোষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মেঘনাদের মতো মসৃণ নয়। একবার তো আশুতোষের করা প্রশ্নপত্রে একটা অঙ্কের ভুল নিয়ে দুজনের তুমুল তর্ক হয়ে গেল। দশ বছর আগে ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় এসেছিলেন মেঘনাদ, দশ বছর পরে কলকাতা থেকে ঢাকা গেলেন তাঁর বন্ধু। ১৯২১ সালেই যোগ দিলেন নতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার রিডার পদে। আশুতোষ অবশ্য তখন বেশি বেতন দিয়ে কলকাতায় ধরে রাখতে চেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথকে, রাজি হননি তিনি।

মেঘনাদ সত্যেন কেউই জানতেন না, ঢাকার চাকরির ক্ষেত্রেও দুজনে ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী। মেঘনাদ বিদেশ থেকে আবেদন পাঠিয়েছিলেন, কলকাতায় এসে সত্যেনকে আবেদন করতে বলেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ফিলিপ হার্টগ। ঢাকার পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান ওয়াল্টার জেনকিন্সের রিপোর্টে দুজনেরই প্রশংসা ছিল, শেষ পর্যন্ত সত্যেন্দ্রনাথের পক্ষেই তাঁর মত। তাই একই বছর উত্তর কলকাতার বাসিন্দা সত্যেন্দ্রনাথ গেলেন ঢাকা; ঢাকার অনতিদূরে জন্মানো মেঘনাদ হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

ঢাকা থেকে মেঘনাদকে চিঠিতে লিখলেন সত্যেন, ‘মাসখানেকের উপর তোমাদের দেশে এসেছি। এখানকার কাজ এখনও আরম্ভ হয়নি। তোমাদের ঢাকা কলেজে জিনিস অনেক ছিল, কিন্তু অযত্নে তাদের যে দুর্দশা হয়েছে তা বোধ হয় নিজেই জান।’

দুজনের কর্মস্থান আবার এক হবে ১৯৪৫ সালে যখন সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকা থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবেন, হবেন খয়রা অধ্যাপক। কলকাতা ছেড়ে এসেছিলেন প্রতিশ্রুতিবান এক অখ্যাত তরুণ, ফিরে যাবেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী। মেঘনাদও মাঝে দেড় দশক এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে ১৯৩৮ সালে পালিত অধ্যাপক হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার যোগ দিয়েছেন। দুই বন্ধুই ততদিনে অনেক পরিণত, বিশেষ করে মেঘনাদ তো নানা কাজে ভীষণ ব্যস্ত। দুজনের মধ্যে যোগাযোগের সূত্র ততদিনে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে।

সত্যেন কলকাতা ছাড়ার পরে মেঘনাদ কলকাতায় বেশিদিন থাকতে পারেননি, রামনের সঙ্গে বিবাদের ফলে তিনি দু বছরের মধ্যেই চলে যান এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে এক ঝাঁক ছাত্র তৈরি করেছেন যাঁরা পরে দেশের নানা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। সত্যেন্দ্রনাথের ছাত্রের সংখ্যা কম, তাঁদের কারোরই বিজ্ঞান প্রশাসনে আগ্রহ ছিল না। মেঘনাদ নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা বিষয়ে গবেষণার জন্য কলকাতাতে তৈরি করলেন ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স। তার বাইরেও কলকাতারই ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের অধিকর্তা হয়েছিলেন, একইসঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন মেঘনাদ। সত্যেন্দ্রনাথ হয়েছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য, সে অভিজ্ঞতা তাঁর পক্ষে খুব সুখের হয়নি। ১৯৫২ সালে মেঘনাদ সাহা বামপন্থীদের সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসাবে কংগ্রেস প্রার্থীকে পরাজিত করে লোকসভায় নির্বাচিত হলেন, সেই বছরই রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কিন্তু যৌথভাবে তাঁরা কোনো কাজ রাজনীতির অঙ্গনে করেননি।

বিজ্ঞান জগতের বাইরে তাঁদের দুজনেরই বিস্তার ছিল। সত্যেন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভা বিকাশের পথ খুঁজে নিয়েছিল সঙ্গীতে, শিল্পকলায়, সাহিত্যে। সত্যেন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন গায়ক দিলীপকুমার রায় ও ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কবি বিষ্ণু দে, শিল্পী যামিনী রায়। মেঘনাদ সত্যেন্দ্রনাথ দুজনেরই স্বপ্ন ছিল দেশের সেবা, পথ ছিল আলাদা। সত্যেন বিশ্বাস করতেন দেশের উন্নতির জন্য মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা জরুরি। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার জন্য তৈরি করেছিলেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। মেঘনাদ সাহার আগ্রহ ছিল দেশের উন্নতিতে সরাসরি বিজ্ঞানের প্রয়োগ, সেজন্য রাজনীতি জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ানো তারই অঙ্গ। সুভাষচন্দ্র, নেহরু, শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়েছিল। শিল্পায়ন, জাতীয় পরিকল্পনা, নদী পরিকল্পনা, ক্যালেন্ডার সংস্কার – নানা বিষয়ে স্বাধীনতার আগে ও পরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন মেঘনাদ।

নানা দিক থেকে দুজনে ছিলেন বিপরীত চরিত্রের মানুষ। মেঘনাদ সাহার পিতৃদত্ত নাম ছিল মেঘনাথ, সামাজিক বৈষম্যের শিকার কিশোর নিজেই মধুসূদনের কাব্যের চিরন্তন প্রতিবাদী চরিত্রটি থেকে বেছে নিয়েছিল নিজের নাম। শৈশব-কৈশোর-যৌবনে নানা অবহেলা-বঞ্চনার শিকার মেঘনাদ সবসময়েই নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। এক বিদেশী বিজ্ঞানী একটি সূত্র আবিষ্কার করেছেন, মেঘনাদ বিখ্যাত বিদেশী পত্রিকাতে লিখে স্মরণ করিয়ে দিলেন অনেক বছর আগেই তিনি এই সূত্রের কথা লিখে গেছেন। অনেক বছর পরে একটা চিঠিতে মেঘনাদ লিখবেন, ‘ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের এক অংশ দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যাতে আমার প্রথম জীবনের অবদানকে ছোট করে দেখাচ্ছেন।’ সারা জীবন মেঘনাদ এই নিরাপত্তাহীনতার শিকার। খ্যাতি বিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথের কোনো আগ্রহ নেই। আইনস্টাইন সত্যেন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গবেষণাপত্রটি অনুবাদের সময় নিজের বিচারমতো একটি সংশোধন করে সত্যেন্দ্রনাথের প্রস্তাবিত মৌলিক কণার ঘূর্ণন প্রসঙ্গটি বাদ দিয়ে দেন। অল্প দিন পরেই দুই বিদেশি বিজ্ঞানী ঘূর্ণন সংক্রান্ত প্রকল্প স্বাধীনভাবে প্রস্তাব করবেন। তিনি যে এক অত্যন্ত মৌলিক আবিষ্কার থেকে বঞ্চিত হলেন, সত্যেনের তাতে তাপ উত্তাপ নেই। নানা কারণে তাঁর একসময়কার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে মেঘনাদের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ অজাতশত্রু।

১৯৫৬ সালে সাহার মৃত্যু পর্যন্ত দুই বন্ধু এক বিভাগে কাজ করলেও কৈশোর-যৌবনের বন্ধুত্বের সেই উত্তাপ আর কখনো ফিরে আসে নি। তাঁদের ছাত্ররা ১৯৪৭ সালের এক ঘটনার কথা বলেছেন। একদিন দুপুরবেলা মেঘনাদ সাহা সত্যেন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকলেন। দুজনের এক মিটিঙে উপস্থিত হওয়ার কথা। ঘরে তখন উপস্থিত এক বংশীবাদক। মেঘনাদ সত্যেন্দ্রনাথকে মিটিঙের কথা মনে করিয়ে দিলেন। সত্যেন উত্তর দিলেন। ‘বাজনা শুনবে? এই লোকটা বাঁশীতে বেহাগ বাজাবে।’ মেঘনাদ উত্তর না দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। এই শীতলতার পিছনে ব্যক্তিগত অসূয়ার স্থান ছিল না। সমস্যা হয়েছিল বিভাগ পরিচালনাতে। সত্যেন্দ্রনাথ বিভাগীয় প্রধান, বিভাগে সরকারি বেসরকারি অনুদান কম আসে আসে না। কিন্তু তা সমস্তই মেঘনাদের ইনস্টিটিউটের জন্য, বিভাগ পরিচালনাতে সত্যেন্দ্রনাথের হাত পা বাঁধা।

দুই ভিন্ন শহরে কাজের জন্য দুই বন্ধুর সম্পর্ক অপেক্ষাকৃত শীতল হয়ে পড়তেই পারে, কিন্তু সত্যেনের প্রতিভার উপর অগাধ আস্থা ছিল তাঁর বন্ধুর। ১৯৩৮ সালে ঢাকাতে এসেছিলেন মেঘনাদ সাহা। আয়নমণ্ডল থেকে বেতার তরঙ্গের প্রতিফলন বিষয়ে একটি কাজ করেছিলেন তিনি, সেই প্রসঙ্গে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে তিনি একটা জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। বন্ধুকে এ ব্যাপারে সাহায্য করার অনুরোধ জানান মেঘনাদ। বন্ধু তাঁকে নিরাশ করেননি – কয়েকদিন পরিশ্রমের পরেই সত্যেন্দ্রনাথ সমস্যাটির সমাধান করে ফেলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ 


১৯২৪ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিতে এসেছেন মেঘনাদ। আছেন সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে; বন্ধুকে বললেন ঠিক আগের বছর বিকিরণ সংক্রান্ত ম্যাক্স প্লাঙ্কের সমীকরণ সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। একটির লেখক উলফগ্যাং পাউলি। অন্যটি লিখেছিলেন পল এহরেনফেস্ট ও আলবার্ট আইনস্টাইন। প্রবন্ধ দুটি তিনি বন্ধুর কাছে রেখে যান, বিশেষ করে পাউলির প্রবন্ধটিতে একটা বিশেষ সমীকরণের দিকে তিনি সত্যেনকে নজর দিতে বলেন। সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়েই সত্যেন্দ্রনাথ এক নতুন সংখ্যায়নের প্রস্তাব করেছিলেন যাকে আমরা আজ বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন বলে চিনি। এর পরে আইনস্টাইনকে চিঠি লেখার গল্প আমাদের সকলেরই জানা। এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে বিখ্যাত হয়ে যান সত্যেন্দ্রনাথ। দুজনের বন্ধুত্বের স্মারক হয়ে থাকবে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন শাখা কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানবিদ্যার জন্মের এই ইতিহাস।