যাত্রী আমি ওরে
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
মানুষ পৃথিবীর গণ্ডিতে আবদ্ধ থেকে সন্তুষ্ট নয়। ঊর্ধ্ব আকাশে তারাগুলি তার প্রতি ইঙ্গিত করে; সে সেই আহ্বানে সাড়া দিতে চায়। তাই আকাশের প্রতি সে বার্তা পাঠায়, বলে এই বিপুল মহাবিশ্বে তারও আছে স্থান। কিন্তু শুধু বার্তা পাঠানোই মানুষের কাছে যথেষ্ট নয়। সশরীরে না হলেও, সে নক্ষত্রদের উদ্দেশ্যে তার দূতকে পাঠাতে চায়। সেই দূত যখন অন্য নক্ষত্রজগতে পোঁছাবে, তখন হয়তো পৃথিবীতে কোনো মানুষ থাকবে না; তবু থেকে যাবে তার চিহ্ন। তারই জন্য সৌরজগতের বাঁধন ছিঁড়তে চেয়েছে তার কয়েকটি মহাকাশযান, যাদের নাম পায়োনিয়ার, ভয়েজার এবং সর্বশেষে নিউ হরাইজন। নামগুলোর অনুবাদ করা যাক -- অগ্রদূত, যাত্রী এবং নব দিগন্ত। আজ শোনা যাক দুই যাত্রীর কথা।
এই লেখা যাঁরা পড়ছেন তাঁদের অনেকের জন্মের আগে পৃথিবী ছেড়েছিল পায়োনিয়ার-১০ ও ১১ এবং ভয়েজার-১ ও ২। নিউ হরাইজন অবশ্য অনেক পরে রওনা হয়। ২০০৬ সালে যাত্রা শুরু করে সে ২০১৫ সালে প্লুটোর খুব কাছ দিয়ে যায়। নিচের সারণীতে এই সব মহাকাশযানের উৎক্ষেপণকাল ও বর্তমানে সূর্য থেকে দূরত্ব দেওয়া আছে। (এইউ পুরো কথাটা হল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট, যা পৃথিবী থেকে সূর্যের গড় দূরত্বের সমান। এর মান হল প্রায় ১৫০ কোটি কিলোমিটার) এই সবগুলিই উৎক্ষেপণ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল এরোনটিক্স এন্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সংক্ষেপে নাসা। ভয়েজার-২ এখন এতই দুরে আছে যে তার থেকে আমাদের কাছে রেডিও সঙ্কেত আসতে সময় লাগে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা। তা সত্ত্বেও সূর্যের কাছের নক্ষত্ররা এখনও তার থেকে প্রায় একই পরিমাণ দূরে রয়ে গেছে। ভয়েজাররা কাছের কোনো নক্ষত্রমণ্ডলের দিকে যাচ্ছে না, তবে চল্লিশ হাজার বছর পরে তারা দুটি আলাদা নক্ষত্রের থেকে ১.৭ আলোকবর্ষ দূর দিয়ে যাবে।
-
-
-
যান
উৎক্ষেপণের সময়
সূর্য থেকে দূরত্ব (এইউ)
পায়োনিয়ার-১০
৩ মার্চ, ১৯৭২
১৩৯
পায়োনিয়ার-১১
৬ এপ্রিল, ২৯৭৩
১১৭
ভয়েজার-১
২০ আগস্ট, ১৯৭৭
১৬৯
ভয়েজার-২
৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৭
১৪১
নিউ হরাইজন
১৯ জানুয়ারি, ২০০৬
৬৩
-
-
সৌরজগৎ থেকে কি এই মহাকাশযানগুলি বেরিয়ে গেছে? সে কথার জন্য জানতে হবে সৌরজগতের শেষ কোথায়? এই প্রশ্নের অনেকরকম উত্তর হয়। আগে মনে করা হল প্লুটোই সৌরজগতের শেষ সীমা, সেই কথা ধরলে পাঁচ মহাকাশযানই এখন সৌরজগৎ ছেড়েছে। কিন্তু আধুনিক উত্তর অন্যরকম। সূর্য থেকে প্রতিমুহূর্তে বেরিয়ে আসছে কণার স্রোত যার নাম সৌরবায়ু। তা ছড়িয়ে পড়ছে চতুর্দিকে। যেখানে সৌরবায়ুর চাপ ছায়াপথের বায়ুর চাপের থেকে কম হবে, সেখানেই সৌরজগতের শেষ সীমা বলে ধরা যেতে হয়। এই সীমাকে বলে হেলিওপজ (Heliopause)। এর মধ্যের অঞ্চলকে বলে হেলিওস্ফিয়ার (Heliosphere), বাংলাতে বলি সৌরমণ্ডল। পাঠককে মনে করিয়ে দিই, সূর্যের গ্রিক নাম হল Helios।
নামে স্ফিয়ার হলেও একে দেখতে গোলকের মতো নয়, এর আকারটা নিচের ছবির মতো। সূর্য ছায়াপথে স্থির নয়। জাহাজ যাওয়ার সময় তার ঢেউ সামনের দিকে খুব অল্প দূরত্ব যেতে পারে, কিন্তু পিছনে অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যকে জাহাজ, সৌরবায়ুকে তার ঢেউ আর ছায়াপথকে জল ভাবলে সৌরমণ্ডলের আকার বোঝা সহজ হবে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভয়েজার মহাকাশযানরা গেছে সামনের দিকে, তাই তারা এখন সৌরমণ্ডলের বাইরে।
সত্যিই কি এই রকম কোনো সৌরমণ্ডলের অস্তিত্ব আছে? শুধু সৌরবায়ু নয়, সূর্যের চৌম্বক ক্ষেত্রও হেলিওস্ফিয়ারের মধ্যে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী, তাই তা মহাজাগতিক রশ্মির চার্জড বা আধানিত অংশকে কিছুটা বিক্ষিপ্ত করতে পারে। ভয়েজার মহাকাশযানরা যখন সূর্যের থেকে ১২০ এইউ দূরত্বে গিয়ে পৌঁছেছিল, তখন হঠাৎই তাদের যন্ত্রে সূর্য থেকে আসা কণার সংখ্যা কমে যায় এবং মহাজাগতিক রশ্মির সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাই বোঝা যায় যে বিজ্ঞানীদের মডেল সঠিক, সত্যই সৌরমণ্ডলের অস্তিত্ব আছে।
সৌরজগতে পাঁচ মহাকাশযানের অবস্থান (চিত্রটি জেমিনি এআই অঙ্কিত)
উপরের ছবি থেকে মহাকাশযানদের পথ একেবারে সরলরেখা মনে হলেও তা আসলে সত্যি নয়। এত কম সময়ে (অর্থাৎ মাত্র পঞ্চাশ বছরে!) কোনো সাহায্য ছাড়াই কোনো যানকে এত দূরে পৌঁছে দেওয়া আমাদের ক্ষমতার বাইরে। বিজ্ঞানীরা সাহায্য পেয়েছেন যাদের থেকে, তাদের দুজনকে প্রাচীন মানুষ দেবতা বলে জানত। নিচের ছবিতে ভয়েজার মহাকাশযানদের পথ দেখানো হয়েছে। ভয়েজার-১ বৃহস্পতি ও শনির খুব কাছ দিয়ে গেছে, ভয়েজার ২ তার সঙ্গে ইউরেনাস ও নেপচুনকেও তার যাত্রাপথে যোগ করেছে। এই রকম পথের উদ্দেশ্য কী? একটা উদ্দেশ্য নিশ্চয় এই সব গ্রহ পর্যবেক্ষণ, কিন্তু তার সঙ্গে অন্য একটা কারণও ছিল।
সৌরজগতে ভয়েজারদের পথ
হিন্দু পুরাণে শনির দৃষ্টি সব সময়েই ক্ষতি করেছে, কিন্তু ভয়েজাররা তার এবং অন্য গ্রহদের 'কৃপাদৃষ্টি' লাভ করেছিল। দেখা যাক কেমনভাবে। একটা ঢিল উপরে ছুঁড়লে সে প্রথমে অনেক বেশি বেগে রওনা হয়, তারপর তার বেগ কমে আসে। তার কারণ পৃথিবীর টান। সূর্যের থেকে দূরে যাওয়ার সময়েও সূর্যের মাধ্যাকর্ষণ মহাকাশযানের উপরে একই রকমভাবে কাজ করে, ফলে যান যত দূরে যায়, তার গতিবেগ তত কমতে থাকে। গ্রহরা ভয়েজার মহাকাশযানের গতিবেগকে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে যে পদ্ধতিতে তাকে বলে গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট বা স্লিংশট এফেক্ট। বিষয়টা বোঝা শক্ত নয়। কোনো বোলার যখন অভিষেক শর্মাকে বল করে, তখন প্রায়ই বল যে গতিতে এসেছিল, তার থেকে অনেক বেশী গতিতে বাউন্ডারির বাইরে চলে যায়। অভিষেকের ব্যাট বলকে এসে আঘাত করে তার দিক ও বেগ দুইই পরিবর্তন করে। একইভাবে মহাকাশযানের গতিপথ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যে গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ তার ঝুঁটি পাকড়ে ধরে আরো বেগে ছুঁড়ে দিতে পারে। তাতে করে গ্রহের বেগ সামান্য হ্রাস পায় বটে, তবে তা ধর্তব্যের মধ্যে নয়।
একই পদ্ধতি নিয়েছিল আমাদের দেশ। কেন চাঁদে পৌঁছাতে চন্দ্রযানের এক মাসের বেশি সময় লাগল অথচ নিল আর্মস্ট্রংরা তিন দিনে পৌঁছে গিয়েছিলেন? কারণ নাসা ব্যবহার করেছিল স্যাটার্ন ভি রকেট যাতে জ্বালানি ছিল ২৬৩০ টন। চন্দ্রযানের রকেট এলভিএম থ্রি-র জ্বালানির পরিমাণ ৩৫০ টন, তা দিয়ে সরাসরি চাঁদে যাওয়া সম্ভব নয়। ভূসমলয় কক্ষপথ পর্যন্ত ভার বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এই রকেট তৈরি করা হয়েছিল, তার উচ্চতা হল পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ৩৬,০০০ কিলোমিটার। এলভিএম থ্রি বেশ কয়েকবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেছে, প্রত্যেকবার যখন পৃথিবীর কাছে এসেছে, পৃথিবীর আকর্ষণকে ব্যবহার করে তার বেগ বাড়ানো হয়েছে। এভাবে বেগ কমানোও সম্ভব, চাঁদের চারদিকে কক্ষপথে চন্দ্রযানকে স্থাপনের জন্য সেটাই করা হয়েছিল। নিচের রেখাচিত্রটা দেখুন, দেখবেন প্রতিবার সাক্ষাতের সময় চারটি গ্যাসদানব কেমনভাবে ভয়েজার-২-এর বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ভয়েজার-২-এর গ্র্যাভিটি অ্যাসিস্ট (Credit Cmglee)
পায়োনিয়ার মহাকাশযান দুটিতে দূরগ্রহের সভ্যতার উদ্দেশ্যে এক ফলক রাখা হয়েছিল, যার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণের অন্যতম ব্যক্তিত্ব কার্ল সাগান। দুই ভয়েজারের জন্যও নাসা সাগানকেই বার্তা নির্মাণের দায়িত্ব দেয়। এবার সাগান একটি ফোনোগ্রাফ রেকর্ড তৈরি করেন; তখনও কমপ্যাক্ট ডিস্ক আবিষ্কার হয়নি। তাতে ছিল পৃথিবীর সমস্ত পরিচিত ভাষাতে শুভেচ্ছা বার্তা, নানা প্রাকৃতিক শব্দ এবং ডিজিটাল ছবি। তবে মহাকাশে নক্ষত্রদের মধ্যে যা দূরত্ব, তাতে কেউ কখনো এই সব মহাকাশযানদের সন্ধান পাবে, তার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এই বার্তা আসলে আমাদের নিজেদের উদ্দেশে, তার মুখ্য বক্তব্য হল ছায়াপথে অন্য সভ্যতা থাকা সম্ভব, এবং কাছের সভ্যতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো প্রযুক্তি এখন আমাদের আয়ত্তে।
ভয়েজার মিশনদের কথা বললেই মনে আসে সাগান বর্ণিত 'পেল ব্লু ডট'-এর কথা। নিচের ছবিটা সাদা কালো, তার মধ্যেও হয়তো তার চিহ্ন বোঝা যাবে। ডানদিকের হালকা পটির মাঝামাঝি জায়গাটা ভালো করে দেখলে আবছা যে বিন্দুটা দেখা যাচ্ছে, ওই হল সেই 'পেল ব্লু ডট' -- ছ'শো কোটি কিলোমিটার দূর থেকে ভয়েজার-১-এর ক্যামেরাতে ধরা পড়া পৃথিবী।
পেল ব্লু ডট (চিত্র নাসা)
সাগানের লেখা অনুবাদ না করে পাঠকদের জন্য তুলে দিলাম, ‘Look again at that dot. That's here. That's home. That's us....The Earth is a very small stage in a vast cosmic arena.... To my mind, there is perhaps no better demonstration of the folly of human conceits than this distant image of our tiny world. To me, it underscores our responsibility to deal more kindly and compassionately with one another and to preserve and cherish that pale blue dot, the only home we've ever known.’ এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পৃথিবীতে তার থেকেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য হিংসা দ্বেষ পরপীড়নে অভ্যস্ত আমাদের কাছে ওই বিন্দু কী বার্তা দেয়? সেই বার্তা শুনতে কি আমরা প্রস্তুত?
প্রায় পঞ্চাশ বছর পরেও ভয়েজারদের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ বজায় আছে, যদিও ব্যাটারি বাঁচাতে কিছু কিছু যন্ত্র বন্ধ করে রাখা হয়েছে। দুই মহাকাশযানই সূর্যের থেকে অনেক দূরে, সেখানে সৌরশক্তি কাজে লাগবে না। তাই ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয়েছে প্লুটোনিয়ামের আইসোটোপ; তার তেজস্ক্রিয়তা যে কোনো রাসায়নিক ব্যাটারির থেকে বহু লক্ষগুণ বেশি শক্তি যোগায়। এখনো পর্যন্ত ভয়েজার-২ হল একমাত্র মহাকাশযান যা ইউরেনাস ও নেপচুনকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। চার দানব গ্রহের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে অনেক তথ্য আমাদের জানিয়েছে এই দুই যান। জানিয়েছে বৃহস্পতির উপগ্রহ আইয়োতে অগ্ন্যুৎপাতের কথা। এই প্রথম আমরা পৃথিবীর বাইরে কোথাও আগ্নেয়গিরির সন্ধান পেয়েছি। চার দানবের তেইশটা নতুন উপগ্রহদের খবর দিয়েছে দুই ভয়েজার। শনি এবং বৃহস্পতির বলয়, চার দানব গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র ইত্যাদি সম্পর্কে অনেক খবর আমরা ভয়েজারদের থেকে পেয়েছি। বিজ্ঞানীরা তার থেকে গ্রহের সৃষ্টি, তাদের গঠন ইত্যাদি বিষয়ে অনেক নতুন কথা আবিষ্কার করেছেন। সৌরমণ্ডলের সীমানা এবং তার বাইরের আন্তঃনক্ষত্র মহাকাশ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের অন্যতম প্রধান উৎস হল দুই ভয়েজার। এখনো সেই সব তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
যাত্রীদের যাত্রা শেষ হবে না, তারা যাত্রা করেছে অনন্তের পথে। হয়তো কোটি বছর পরে অন্য কোনো নক্ষত্রের অন্য কোনো প্রাণীর কাছে সে পৌঁছে দেবে আমাদের বার্তা – আমরাও ব্ৰহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ব্ৰতী। তখনো যদি পৃথিবীতে সভ্যতার অস্তিত্ব থাকে, তা হয়তো বা পাড়ি দিয়েছে অন্য নক্ষত্ৰলোকেও। ভাবতে ইচ্ছা হয় যে ভবিষ্যতের মানুষেরই অন্য কোনো মহাকাশযানের সঙ্গে দেখা হতে পারে আজকের যাত্রীর। প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সঙ্গে আধুনিক মানুষের যে তফাৎ আমাদের সঙ্গে আমাদের সেই ভবিষ্যতের পার্থক্য তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে নিশ্চয়। সুদূর অতীত থেকে আসা এই বার্তাকে তারা কী দৃষ্টিতে দেখবে? শিশুর প্রচেষ্টা বয়স্কদের প্রশ্ৰয় লাভ করে। হয়তো তারা এই চেষ্টাকে সম্ভ্রমের চোখেই দেখবে, কারণ তারা নিশ্চয় জানবে জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টা মনুষ্যত্ব বিকাশের সাধনার অপরিহার্য অঙ্গ।
প্রকাশ- সন্ধিৎসা, ফেব্রুয়ারি ২০২৬
No comments:
Post a Comment