Saturday, 18 October 2025

গ্রহান্তরের বার্তা, ভয়নিচের পুঁথি ও ডলফিনের ভাষা

 

গ্রহান্তরের বার্তা, ভয়নিচের পুঁথি ও ডলফিনের ভাষা

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে নামটা শুনে সুররিয়াল কবিতা সম্পর্কে আলোচনা মনে হলেও এটা আদতে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখা। মানুষ বহু কাল আগে থেকেই জানতে চেয়েছে সে কি এই মহাবিশ্বে একা? নাকি কোথাও আছে তার কথা বলার সঙ্গী? সৌরজগতে অন্য কোথাও এককোশী প্রাণ থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু উন্নত প্রাণী নেই। তাই খুঁজতে হবে অন্য নক্ষত্রের জগতে। কিন্তু সশরীরে সেখানে যাওয়া, এমনকি রোবট মহাকাশযান পাঠানোও আমাদের ক্ষমতার বাইরে। হয়তো উন্নত সভ্যতার পক্ষে তা সম্ভব, তবে তাদেরও যে অনেক সময় লাগবে সন্দেহ নেই। আইনস্টাইন দেখিয়েছেন আলোর থেকে বেশি দ্রুত যাওয়ার বা সঙ্কেত পাঠানোর সুযোগ নেই। তাই বার্তা বিনিময়ই আমাদের কাছে একমাত্র উপায়। সেই সম্ভাব্য বার্তার কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়েই এই লেখা।

অন্য নক্ষত্রের প্রাণীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিশেষ করে রেডিওতরঙ্গের উপর জোর দেওয়া হয়। রেডিও বার্তা আমরা অন্য নক্ষত্রের উদ্দেশ্যে পাঠিয়েছি, কিন্তু তা কারো কাছে পৌঁছানোর আশা আমরা করি না, কারণ আমাদের ক্ষমতা সীমিত। সত্যিই যদি ভিন গ্রহের সভ্যতা থাকে, তাহলে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে সেই সম্ভাবনাই বেশি। আমরা সবে অন্য নক্ষত্রে খবর পাঠানোর ক্ষমতা আয়ত্ত করেছি। প্রযুক্তির বিবর্তন হয় অত্যন্ত দ্রুত হারে; দু'শো বছরেরও কম সময়ে আমরা ঘোড়ার গাড়ি থেকে মহাকাশযানে পৌঁছেছি। যদি বিশ্ব উষ্ণায়ন, পরিবেশ দূষণ, জাতিবৈরিতা ইত্যাদি সমস্যার সমাধান করে মানব সভ্যতা আরো হাজার বছর টিকে থাকতে পারে, তাহলে সে যে প্রযুক্তির কোন স্তরে গিয়ে পৌঁছোবে আমরা অনুমানও করতে পারি না। আমাদের মহাবিশ্বের বয়স তেরোশো আশি কোটি বছর, অধিকাংশ নক্ষত্রই বহু কোটি বছর ধরে আলো দিচ্ছে। তাই ভিনগ্রহে রেডিওবার্তা প্রেরণকারী সভ্যতা থাকলে তাদের আমাদের থেকে এগিয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি। সেই কারণে শোনার উপর বিজ্ঞানীরা বেশি জোর দিচ্ছেন। ছয় দশকের বেশি সময় ধরে মহাকাশ থেকে আসা রেডিও সঙ্কেত বিশ্লেষণ করে চলেছে সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টালিজেন্স বা সেটির বিভিন্ন প্রকল্প। ২০১৬ সালে শুরু হয়েছে ব্রেকথ্রু লিসন (Breakthrough Listen); স্টিফেন হকিং-এর মতো বিজ্ঞানীরা একে সমর্থন করেছিলেন।

এই কান পাতার ফল কিছু পাওয়া গেছে কি? ১৯৬৭ সালে এক গবেষক ছাত্রী জোসেলিন বেল রেডিও টেলিস্কোপে এক অদ্ভুত সঙ্কেত খুঁজে পেয়েছিলেন; তার পর্যায়কাল আমাদের পারমাণবিক ঘড়ির মতো নিখুঁত। বেল ও তাঁর মাস্টারমশাই অ্যান্টনি হিউইশ অবশ্য ভিনগ্রহের সঙ্কেত খুঁজছিলেন না, তবু মজা করে তার নাম দিয়েছিলেন এলজিএম অর্থাৎ লিটল গ্রীন মেন। পরে অবশ্য সবুজ মানুষদের কথা আর আসেনি, কারণ বোঝা যায় সেই সঙ্কেতের উৎস হল নিউট্রন নক্ষত্র। এই আবিষ্কারের জন্য হিউয়িশ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন; অনেকেরই মতে বেলকে বঞ্চিত করা হয়েছে। তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।

কেমন করে আমরা এই ধরনের প্রাকৃতিক সঙ্কেত থেকে বার্তাকে আলাদা করব? এখানে একটা পুরানো বইয়ের গল্প বলি, তার নাম ভয়নিচ পুঁথি। এক পুরানো জিনিসপত্রের ডিলার উইলফ্রিড ভয়নিচ ১৯১২ সালে এটি আবিষ্কার করেন। লেখার কায়দা ও ছবি থেকে অনুমান করা হয় এটি ইতালির রেনেসাঁসের সময় লেখা। তার পক্ষে সমর্থনও মিলেছে, রেডিওকার্বন ডেটিং থেকে জানা গেছে এই পুঁথিটি ১৪০৪ থেকে ১৪৩৮ সালের মধ্যে লেখা হয়েছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে বোহেমিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ২৪৬ পৃষ্ঠার হাতে লেখা এই পুঁথিটি ছ'শো স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে কিনেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। সঙ্গের ছবিতে সেই পুঁথির একটি পৃষ্ঠার কিছুটা দেওয়া হল। লেখার পাশাপাশি পুঁথিতে আছে মানুষ, অচেনা গাছপালা, দুর্গ, ড্রাগন ইত্যাদির ছবি।

ভয়নিচ পুঁথির এক অংশ (সূত্র উইকিপেডিয়া)

এই পুঁথির বৈশিষ্ট্য কী? আবিষ্কারের পরে একশো বছর কেটে গেছে। এখনো পর্যন্ত সেই পুঁথিটি কোন ভাষায় বা কোন বর্ণমালায় লেখা সেটাই আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। কিছু কিছু দাবি এসেছে, কিন্তু তারা ধোপে টেকেনি। এ কথাও এসেছে সে পুঁথিটা পুরো জালিয়াতি, ইচ্ছা করেই অর্থহীন কিছু চিহ্ন বসিয়ে সম্রাটকে ঠকানো হয়েছে। আমরা কেমন করে বুঝব লেখাটার আদৌ কোনো অর্থ আছে নাকি এটা শুধু কতকগুলো চিহ্নকে ইচ্ছামতো এলোমেলোভাবে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে?

গণিতের এক সূত্র থেকে আমরা ভয়নিচ পুঁথিকে পরীক্ষা করতে পারি, তার নাম জিফের সূত্র (Zipf's law)। ১৯৩২ সালে ভাষাবিজ্ঞানী জর্জ জিফ এটির কথা বলেন যদিও তাঁর আগে আরো অনেকেই এই ধরনের সূত্রের দিকে নির্দেশ করেছিলেন। ধরা যাক কোনো একটি বইতে কোন শব্দ কতবার এসেছে ক্রমানুসারে সাজানো হল। দেখা যাবে প্রথম শব্দটি দ্বিতীয় শব্দের থেকে দুগুণ বেশি ব্যবহার হয়েছে, তৃতীয়টির থেকে তিনগুণ বেশি। কিছুটা এদিক ওদিক হলেও আমাদের জানা সব স্বাভাবিক ভাষাই এই নিয়ম মেনে চলে। পরে বিখ্যাত গণিতজ্ঞ বেনোয়া ম্যান্ডেলব্রট এটির কিছুটা পরিবর্তন করেন। জিফ-মেন্ডেলব্রট সূত্র অনুসারে f(r) অর্থাৎ কোন শব্দ কতবার আসবে, তা তার ক্রম বা rank (r)- এর নির্দিষ্ট রাশিমালা (r+b)-a-ঘাতের সমানুপাতী। সুত্রটিকে সঙ্কেতের আকারে লিখলে হবে

f(r) ~ (r+b)a

এখানে b a হল ধ্রুবরাশি। জিফের সূত্র অনুসারে সূচক a-র মান -১।

শেক্সপিয়ারের রচনার জিফ বিশ্লেষণ


বিষয়টা একটু বিশদে বোঝানোর জন্য আমি শেক্সপিয়ারের সমগ্র রচনাতে প্রথম পঞ্চাশটি সবথেকে বেশি ব্যবহৃত শব্দ বেছে নিয়েছি। প্রতিটি শব্দ কতবার শেক্সপিয়ার ব্যবহার করেছেন (Frequency of words) এবং জিফ-মেন্ডেলব্রট সূত্রে সঙ্গে তার মিল কেমন তা ছবির আকারে দেখিয়েছি। বিন্দুগুলি প্রকৃত সংখ্যা ও রেখাটি জিফ মেন্ডেলব্রট সুত্রের মান দেখাচ্ছে। দেখার সুবিধার জন্য ব্যবহারের সংখ্যাকে লগ স্কেলে দেখানো হয়েছে। ছবি থেকে স্পষ্ট যে জিফ-মেন্ডেলব্রট সূত্র ভালোভাবেই খাটে। পৃথিবীর সমস্ত ভাষাই এই নিয়ম মেনে চলে। অবশ্য একটা বা দুটো বাক্যের জন্য এই সূত্র খাটবে না। পরিসংখ্যানবিদ্যার মূল শর্তই হল যে সংখ্যা যথেষ্ট বেশি হতে হবে।

যে কোনো স্বাভাবিক ভাষা এই সূত্র মেনে চলে, তার কারণও বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন। দীর্ঘদিন কোনো ভাষা ব্যবহার হলে স্বাভাবিকভাবেই তা বিবর্তিত হতে হতে এমন হয়ে দাঁড়ায় যেন সব থেকে কম পরিশ্রমে সব থেকে বেশি অর্থ বোঝানো যায়। এখানে সূচক a-ই এখানে সবথেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার মান যত কম হবে, বড় শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা তত বাড়বে। দু' বছরের কম বয়সের শিশুদের জন্য সূচকের মান হয় -., কারণ তখন তারা বড় শব্দ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে যায়। কিন্তু ঠিকঠাক কথা বলতে শেখার পর সুচক --এ পৌঁছে যায়।

কৃত্রিম ভাষার ক্ষেত্রে কী হয়? দীর্ঘ কম্পিউটার প্রোগ্রামও জিফের সূত্র অনেকটা মেনে চলে বলে দেখা যায়, কারণ সেগুলি যে সমস্ত ভাষাতে লেখা সেগুলি বহু লোক বহুদিন ধরে ব্যবহার করছে। কিন্তু বিখ্যাত ফ্যান্টাসি লর্ড অফ দি রিংস-এর রচয়িতা তাঁর উপন্যাসের চরিত্র এলফ্‌দের জন্য যে ভাষা লিখেছিলেন, তার উপরে জিফ-এর সুত্র কাজ করে না, কারণ তার কোনো বিবর্তন হয়নি। আশ্চর্য হল যে ভয়নিচের পুঁথিও জিফের সুত্র মেনে চলে। অর্থাৎ এটি সম্ভবত টলকিয়েনের এলভিশের মতো কোনো নতুন ভাষা নয়, ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে বিবর্তিত এক ভাষা। সম্ভবত বলছি তার কারণ জিফের সূত্র আমাদের জানা সমস্ত ভাষার ক্ষেত্রে খাটলেও তাকে প্রমাণ করা যায়নি, তাই অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন ভাষা জিফের সূত্র মেনে চলে, তা বলে জিফের সূত্র মানলেই যে অর্থ থাকবে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

প্রাকৃতিক ও অর্থবহ সঙ্কেতকে আলাদা করার দ্বিতীয় এক উপায় হল তার এনট্রপি বিশ্লেষণ। এনট্রপি শব্দের অর্থ বিশৃঙ্খলা। আপনার কিবোর্ডে অনেকক্ষণ ধরে চোখ বুজে যথেচ্ছ টাইপ করুন, তারপর দেখুন কোন অক্ষর কতবার এসেছে। দেখা যাবে মোটামুটি সব অক্ষরই প্রায় সমান সংখ্যায় আসবে। এই হল বিশৃঙ্খল অবস্থা, এর এনট্রপি খুব বেশি। একে পরিভাষাতে বলে নয়েজ, অধিকাংশ প্রাকৃতিক সঙ্কেতের চরিত্র এই রকম। আবার ধরুন একটাই কি বহুবার টাইপ করলেন, এটি সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল। পালসারের সঙ্কেত এই চরিত্রের। অর্থবহ বাক্যে এনট্রপি হবে মাঝামাঝি। চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল সঙ্কেত যেমন কোনো তথ্য বহন করতে পারে না, সম্পূর্ণ শৃঙ্খলাবদ্ধ সঙ্কেতের পক্ষেও তা সম্ভব নয়।

তথ্য তত্ত্ব (Information theory)-র জনক ক্লড শ্যানন পদার্থবিদ্যার অনুসরণ করে লেখার এনট্রপির পরিমাপ করার এক ফর্মুলা দিয়েছিলেন। ধরা যাক ইংরাজি শুধুমাত্র অক্ষরের কথা, বড় বা ছোট হাতের আলাদা করব না বা দাঁড়ি কমা সেমিকোলন ইত্যাদি যতি চিহ্ন বা শূন্যস্থানকে হিসাবে ধরব না। সেক্ষেত্রে উপরে বর্ণিত সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থার শ্যানন এনট্রপির মান হয় ৪.৭। আবার একটিই অক্ষর বারবার এলে অর্থাৎ সম্পূর্ণ শৃঙ্খলাবদ্ধ হলে এনট্রপির মান হয় শূন্য। আমি একটি ইংরাজি গল্পের লেখার শ্যানন এনট্রপির মান মেপে পেয়েছি ৪., অর্থাৎ গল্পটির অর্থ আছে। তবে এই উদাহরণটি অত্যন্ত সরল; তথ্যতত্ত্ব অনেক জটিল ও সমৃদ্ধ। একই পদ্ধতিতে ভয়নিচের পুঁথির শ্যানন এনট্রপি মেপে পাওয়া গেছে ৩.৭। তুলনাতে টমাস হার্ডির উপন্যাসের ও দান্তের ডিভাইন কমেডির এনট্রপি হল ৪.২। এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল বিন্যাসের এনট্রপি হয় ৬।

এই দুই অস্ত্র প্রয়োগ করে আমরা প্রাকৃতিক সঙ্কেতকে রেডিওবার্তার থেকে আলাদ করতে পারি। দুইই দেখাচ্ছে যে ভয়নিচের পুঁথির অর্থবহন করে। অথচ আমরা এমনকি আধুনিক কম্পিউটারের সাহায্যেও তার সঙ্কেত ভেদ করতে পারিনি। কাজেই ভিনগ্রহীদের সঙ্কেত পেলে আমরা হয়তো তাকে প্রাকৃতিক সঙ্কেতের থাকা আলাদা করে চিনতে পারব, কিন্তু আমরা তার অর্থ উদ্ধার করতে পারব তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। একশো আলোকবর্ষ দূরের তারাকে ব্রহ্মাণ্ডের হিসাবে পাশের ঘর বলতে হবে, সেখানে সঙ্কেত পাঠিয়ে উত্তর পেতে দু'শো বছর লাগবে। আরো দূরের নক্ষত্রের সময়টা আরো বাড়বে। কাজেই বার্তাপ্রেরকদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার সুযোগ নেই। বিজ্ঞানীরা নানা রকম ভাবে ভেবে চলেছেন যে কেমন করে এমন বার্তা পাঠানো সম্ভব যা যে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী পড়তে সক্ষম হবে। বিশেষ করে জোর দেওয়া হয়েছে গণিতের উপর, কারণ তার ভাষা অবশ্যই সার্বজনীন। দুই আর তিন যোগ করলে পাঁচ আসবেই, তা ভাষা বা বুদ্ধিমত্তার চরিত্রের উপর নির্ভর করে না। 

তবু কিছু আশা আছে, এবং তার পিছনেও আছে বিবর্তনের সাক্ষ্য। আমি চিনা ভাষার বিন্দুবিসর্গ জানি না; আমাকে একটা সে ভাষার বই দিলে আমি তার অর্থ উদ্ধার করব কেমন করে? আমার একটা অভিধান লাগবে। প্রাচীন মিশরের ভাষা আধুনিক মানুষ পড়তে পারত না। রসেটা নামের বিখ্যাত পাথরে একই লেখা মিশরিয় চিত্রলিপি ও ডেমোটিক ভাষায় এবং প্রাচীন গ্রিক ভাষায় লেখা আছে। সেটি আবিষ্কারের পরে মিশরীয় চিত্রলিপির অর্থ উদ্ধার হয়েছিল। আমাদের সিন্ধুলিপি এখনো দুর্বোধ্য, তার একটা বড় কারণ অনুরূপ কিছু আমরা এখনো পাইনি। তাই দুই সভ্যতার মধ্যে বার্তা বিনিময়ের আগে একটা অভিধান দরকার। যাঁরা বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ কার্ল সাগান-এর লেখা কন্ট্যাক্ট উপন্যাসটি পড়েছেন, তাঁদের মনে পড়বে কেমন করে ভিনগ্রহীরা বার্তার সঙ্গে অভিধানও পাঠিয়েছিল।

কিন্তু অভিধান লেখাও মোটেই সহজ নয়। আমাদের ভাষা আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। ছবি না দেখিয়ে মরুভূমির দেশের লোককে নদীর অর্থ বোঝানো কঠিন। জন্মান্ধ মানুষকে রামধনুর কথা বোঝাতে পারব? জিনতত্ত্ব ও ভাষাবিজ্ঞান থেকে দেখা যায় আফ্রিকাতে পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লক্ষ বছর আগে এক আদি ভাষার জন্ম হয়, সেই পৃথিবীর সমস্ত ভাষার জননী। একই উৎস থেকে সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও নানা ভাষার এত পার্থক্য যে এক ভাষাভাষী লোক অন্য ভাষা বুঝতে পারে না। তাহলে আমরা ভিন গ্রহের মানুষের ভাষা বুঝব কেমন করে?

গ্রহান্তরের মানুষের সঙ্গে বার্তা বিনিময়ের সমস্যাটা হয়তো আরো জটিল। মুখের ভাষাকেই সঙ্কেতের সাহায্যে লেখা হয়, সেটাই আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু সেটাই কি একমাত্র উপায়? বধিরদের জন্য আছে ইশারার ভাষা। পৃথিবীতে অনেক প্রাণী আছে যারা শব্দের মাধ্যমে নয়; রঙ, গন্ধ বা অঙ্গভঙ্গীর সাহায্যে বার্তা বিনিময় করে। অক্টোপাস গায়ের রঙ পরিবর্তন করে তার মুড বোঝায়। মৌমাছিদের নাচ অন্য মৌমাছিদের মধুর সন্ধান দেয়। সেই সব ভাষার ব্যাকরণ কি আমাদের ভাষার সঙ্গে মিলবে

তবু সব ভাষার মধ্যে একটা সাধারণ চরিত্র থাকতেও পারে, তা হল ব্যাকরণ। মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়ার এক মূকবধিরদের স্কুলের গল্প শোনাই। ১৯৭৭ সালে নিকারাগুয়াতে প্রথম এমন স্কুল তৈরি হয়। সেই স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের স্পেনিয় ভাষা শেখানো শুরু হল। ঠোঁটের নড়াচড়া থেকে কথা বুঝতে বধিরদের শেখানো হচ্ছিল এবং আঙুলের সাহায্যে ইঙ্গিত করে অক্ষরগুলি চেনানো হচ্ছিল। এই পদ্ধতিতে শব্দকে পরপর অক্ষর সাজিয়ে বোঝানো হয়, কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা শব্দ কাকে বলে তাই জানত না; তারা পড়তেও জানত না। শিক্ষকশিক্ষিকারাও এই পদ্ধতিতে খুব একটা সড়গড় ছিলেন না। কিছু দিন পরে তাঁরা খেয়াল করলেন তাঁদের ছাত্রছাত্রীরা খুব সহজেই নিজেদের মধ্যে আভাসে ইঙ্গিতে অনর্গল কথা বলছে, কিন্তু সেই পদ্ধতি তাঁরা শেখাননি এবং ভাষাটাও স্পেনিয় নয়। বিশেষজ্ঞরা এসে দেখলেন শিক্ষার্থীরাই নিজেদের প্রয়োজনে সম্পূর্ণ নতুন এক ভাষার জন্ম দিয়েছে। সেটিকে এখন বলা হয় নিকারাগুয়ান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ।

প্রশ্ন হল এই ভাষার ব্যাকরণ কোথা থেকে এলো? আমরা দেখেছি শিশুরা খুব সহজে কথা বলতে শেখে। বিখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ নোয়াম চমস্কি দেখিয়েছেন এমন কি যখন সেরকম কোনো তাগিদ থাকে না, (চমস্কির ভাষায় Poverty of Stimulus) সেক্ষেত্রেও শিশুরা কথা বলতে শুরু করে দেয়, এবং তাদের ভাষা অনেকটাই ব্যাকরণ মেনে চলে। চমস্কি অনুমান করেছেন জন্মসূত্রেই আমাদের মস্তিষ্কের একটা অংশ ব্যাকরণ বুঝতে পারে। কম্পিউটারের ভাষায় হার্ডওয়্যার হল কম্পিউটারের যন্ত্রপাতি, যাকে পরিবর্তন করতে গেলে যন্ত্রটারই পরিবর্তন করতে হবে, সফটওয়ার হল কম্পিউটারের ভাষায় লেখা প্রোগ্রাম। আমরা বলতে পারি ব্যাকরণ মস্তিষ্কের হার্ডওয়্যারের উপর নির্ভর করে, আর ভাষা হল সফটওওয়ার। মস্তিষ্কে ব্যাকরণের জন্য হার্ডওয়্যারের জন্ম এলো কোথা থেকে? আমাদের মস্তিষ্কের হার্ডওয়ার হল জিনগত, বিবর্তনের ফসল। অর্থাৎ ব্যাকরণ জ্ঞান হয়তো প্রাণীকে অস্তিত্বের সংগ্রামে কিছু সুবিধা দেয়। সেক্ষেত্রে উন্নত যে কোনো প্রাণী, সে যে গ্রহেই জন্মাক না কেন, তার মস্তিষ্ক সমতুল্য অঙ্গে একই ধরনের কিছু আছে। তাই যদি হয়, তাহলে ভাষার ব্যাকরণ হয়তো আদৌ ভাষার উপর নির্ভর করে না, সেক্ষেত্রে কোনোদিন ভিনগ্রহীদের সঙ্কেত পেলে আমরা হয়তো তার অর্থ বুঝতে পারব।

কত পুরানো এই হার্ডওয়্যার? এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ভাষার সৃষ্টি মানুষকে বুদ্ধিমত্তার বিকাশের পথে এগিয়ে দিয়েছিল। মানুষ ভাষার আবিষ্কার করেছে কত বছর আগে? বিবর্তন শিক্ষা দেয় আধুনিক মানুষ ও নিয়ান্ডারথাল প্রজাতি হিসাবে আলাদা হয় মোটামুটি পাঁচ থেকে আট লক্ষ বছর আগে, যদিও আধুনিক বিজ্ঞান দেখায় তার পরেও এই দুয়ের মধ্যে আন্তঃপ্রজনন ঘটেছিল এবং আধুনিক মানুষের দেহে নিয়ান্ডারথাল জিন আছে। নিয়ান্ডারথালদের স্বরযন্ত্র বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত করেছেন তাদের কথা বলার ক্ষমতা ছিল। দুই ভিন্ন প্রজাতি আলাদা আলাদা করে কথা বলার ক্ষমতা অর্জন করেছিল, তার থেকে বেশি সম্ভাবনা দুয়ের সাধারণ পূর্বপুরুষেরই সেই ক্ষমতা ছিল।

আরো আগে? বনমানুষ বা গ্রেট এপদের থেকে মানুষ প্রজাতি হিসাবে পৃথক হয়েছিল পঞ্চাশ লক্ষ থেকে এক কোটি বছর আগে। কোনো গরিলা বা শিম্পাঞ্জি অবশ্যই ভাষার উদ্ভাবন করেনি, কিন্তু তাদের শেখানো সম্ভব। সান ফ্রানসিসকো চিড়িয়াখানার গরিলা কোকো প্রায় আমেরিকান সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের প্রায় এক হাজার শব্দ বুঝতে পারত ও ব্যযহার করতে পারত। নেভাদা চিড়িয়াখানার ওয়াশো নামের শিম্পাঞ্জি ছশো এমন শব্দ চিনেছিল, এমনকি নতুন শব্দ তৈরি করতেও পারত; হাসকে বলেছিল জলপাখি। সুতরাং ভাষার সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা হয়তো পঞ্চাশ লক্ষ বছরের থেকেও বেশি পুরানো।

এর পরের প্রশ্ন হল ভাষার সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশের ক্ষমতা কি মানুষ আর বনমানুষদেরই একচেটিয়া? নাকি বিবর্তন অন্য প্রাণীদেরও সেই ক্ষমতা দিয়েছে। ধরা যাক ভেরভেট বাঁদরের কথা। তারা দল বেঁধে যখন খাবারের সন্ধান করে, তখন একজন পাহারা দেয়। সাবধান করার জন্য পাহারাদার তিন রকমের আওয়াজ করে, যাকে আমরা বলব লেপার্ড, সাপ ও ঈগল। লেপার্ড শুনলে ভেরভেটরা গাছে উঠে পড়ে, সাপ শুনলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঘাসের দিকে দৃষ্টি দেয়, আর ঈগল শুনলে কাছের শিকড়বাকড়ের মধ্যে আশ্রয় নেয়। একে কি ভাষা বলব?

জিনগত দিকে থেকে ভেরভেট বাঁদর ও মানুষের দূরত্ব হয়তো খুব বেশি নয়, দুইই প্রাইমেট বর্গের মধ্যে পড়ে। সেই তুলনায় ডলফিনরা মানুষের অনেক দূরের আত্মীয়। ডলফিনের মস্তিষ্ক মানুষের থেকে বড়, অবশ্য তার মূল কারণ তাদের দেহও অনেক বড়। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত যে তাদের ভাষা খুবই জটিল, তাতে বিভিন্ন জিনিস বোঝাতে বিভিন্ন শব্দ আছে, এবং সেই শব্দ সাজিয়ে ডলফিনরা বাক্য গঠন করে, বাক্যের শেষে যতি দেয়; অবশ্য সেই বাক্যের অর্থ এখনো আমরা উদ্ধার করতে পারিনি। পূর্ণবয়স্ক বটলনোস ডলফিনের হুইসলের দৈর্ঘ্যের জিফ সূচক হল -.৯৫, অর্থাৎ আমরা না বুঝতে পারলেও সম্ভবত তার অর্থ আছে। (এই লেখার জিফ-মেন্ডেলব্রট বিশ্লেষণ করে সূচক পেয়েছি -.৬২, তার মানে কি আমার ভাষার থেকে ডলফিনদের ভাষা উন্নত? অনুমান করি তা নয়; বাংলা ভাষাতে যুক্তাক্ষরের ব্যবহার খুব বেশি, তাকে আমি হিসাবে নিইনি। আমাদের ভাষার জিফ সূচক বিষয়ে কোনো গবেষণার সন্ধান আমি পাইনি। তবু সূচকের মান থেকে মনে হয় একটু বড় শব্দ ব্যবহারের দিকে আমার ঝোঁক আছে, এবং বিজ্ঞান সংক্রান্ত লেখাতে একটু বড় শব্দ বেশি ব্যবহারই স্বাভাবিক।) ডলফিনের ভাষার এনট্রপি বিশ্লেষণও তার অর্থবহতার দিকে ইঙ্গিত করছে। প্রত্যেক ডলফিনদের আলাদা আলাদা নাম আছে; বাচ্চা জন্মানোর পরে মা ডলফিন তাকে একটা বিশেষ আওয়াজ করে ডাকতে থাকে, সে ঐ শব্দের সাহায্যে নিজেকে চিহ্নিত করে, পরে দলের অন্যরাও সেই শব্দের সাহায্যে তাকে চেনে। আমাদের মস্তিষ্ক ও হাতের দক্ষতার বিবর্তন একই সঙ্গে হয়েছিল, অথচ ডলফিনের হাতের সমতুল্য কোনো অঙ্গই নেই। আরো দূরে যাই; অমেরুদণ্ডী প্রাণী অক্টোপাস নিজের গায়ের রঙ পাল্টে এবং নানা অঙ্গভঙ্গির সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করে। কোনো কোনো প্রজাতির অক্টোপাস একশোর মতো এমন 'শব্দ'-কে ব্যবহার করে বেশ জটিল বার্তা দেয় বলে অনুমান করা হয়। মানুষ, ডলফিন ও অক্টোপাসের সাধারণ পূর্বপুরুষ ভাষার সাহায্যে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারত না। তার অর্থ বিবর্তনে ভাষা একাধিকবার উদ্ভাবিত হয়েছে। তাই অনুমান করি ভাষা হয়তো যে কোনো উন্নত জীবেরই বৈশিষ্ট্য, ব্যাকরণ হয়তো প্রজাতি নিরপেক্ষ। 

তবে সব ভাষা আমরা কি পড়তে পারব? জগতের চেহারা হয়তো কেমনভাবে তার খবর নিচ্ছি তার উপরেও নির্ভর করে। ডলফিন জলের তলা পর্যবেক্ষণের জন্য শব্দতরঙ্গকে ব্যবহার করে; শব্দতরঙ্গে তাকে বাধার পিছনেও দেখতে দেয় আলো যেখানে অচল। আমাদের আলোর জগৎ তার সঙ্গে মিলবে কি?

সূর্যের আলোতে দেখার জন্যই আমাদের চোখ অভিযোজিত। সূর্যের আলোতে অতিবেগুনি রশ্মির পরিমাণ কম, তাই আমাদের চোখ অতিবেগুনি আলোতে সাড়া দেয় না। সূর্যের থেকে অনেক বেশি উত্তপ্ত নক্ষত্রের গ্রহের কোন প্রাণী হয়তো অতিবেগুনি আলোতে দেখতেই অভ্যস্ত; তার কাছে জগতের চেহারা সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা যে রঙ দেখি, বাস্তবে তার কোন অস্তিত্ব নেই; তা আমাদের মস্তিষ্কের সৃষ্টি। ধরা যাক, সবুজ রঙের কথা। যদি কোনো বস্তু থেকে শুধু সবুজ রঙের আলো বেরোয়, তাকে আমরা সবুজ দেখি। কিন্তু যদি সেই বস্তু থেকে লাল ছাড়া অন্য সব রঙের আলো বেরোয়, তাকেও আমরা সবুজ দেখি। তাই রঙের বিষয়টা অন্য গ্রহের প্রাণীর কাছে হয়তো আদৌ বোধগম্য হবে না।

অনেক প্রাণীই দ্বিমাত্রিক ছবি বুঝতে পারে না। বনমানুষ বা ডলফিন আয়নায় নিজেকে চিনতে পারে, কিন্তু অক্টোপাস পারে না। অক্টোপাস সম্ভবত আয়নার প্রতিবিম্বকেই বুঝতে পারে না । তার সম্ভাব্য কারণটা খুব আকর্ষণীয়। আলোর পোলারাইজেশন বা সমবর্তন বলে একটা ধর্ম আছে, যা আলোর কম্পনের সঙ্গে যংশ্লিষ্ট। ত্রিমাত্রিক সিনেমাতে এই ধর্ম ব্যবহার করা হয়, আমাদের চোখ সেটা দেখতে পারে না, তাই বিশেষ চশমা ব্যবহার করতে হয়। অক্টোপাসের চোখ সমবর্তন ধরতে পারে। আয়নাতে প্রতিফলনের সময় আলোর সমবর্তন চরিত্র পাল্টে যায়, তাই মূল বস্তু আর তার প্রতিবিম্ব অক্টোপাসের কাছে আলাদা। 

তাই বিজ্ঞানীরা ডলফিন, বানর, বনমানুষ, অক্টোপাস ইত্যাদিরা কেমনভাবে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখে তা বুঝতে চাইছেন। মানুষের সৃষ্ট পুঁথির রহস্য উদ্ধার করতে আমরা পারছি না, তাই ভিনগ্রহীদের বার্তার অর্থ উদ্ধার হয়তো সহজ হবে না। ভিনগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে কিনা জানি না, হলেও ডলফিনের বা অক্টোপাসের ভাষা আমাদের সাহায্য করবে কিনা তাও ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু যেদিন এই পৃথিবীরই অন্য প্রাণীদের ভাষা বুঝতে পারব, সেদিন হয়তো আমাদের একাকীত্ব ঘুচবে, মানুষ পাবে কথা বলার সঙ্গী। 

(প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, উৎসব সংখ্যা ২০২৫, কার্টুন ছবিগুলি Chat GPT-র সাহায্যে আঁকা) 


Monday, 6 October 2025

দুই বন্ধু

 

দুই বন্ধু

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

দুই বন্ধুর প্রথম দেখা হয়েছিল ১৯১১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে। একজন ওই কলেজেরই ছাত্র, ইন্টারমিডিয়েট পাস করে বিএসসি ম্যাথামেটিক্স ক্লাসে ভর্তি হয়েছেন। অন্যজন একই ক্লাসের নতুন ছাত্র। তবে একে অন্যের নাম জানতেন। কারণ ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতে তাঁরা ছিলেন পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। একজন দুটি পরীক্ষাতেই তৃতীয় হয়েছিলেন। অন্যজন ম্যাট্রিকে পঞ্চম, ইন্টারমিডিয়েটে প্রথম। প্রথমজনের নাম মেঘনাদ সাহা, দ্বিতীয়জনের নাম সত্যেন্দ্রনাথ বসু। প্রথম পরিচয় কেমন করে হয়েছিল কেউ লিখে যাননি। নিখিলরঞ্জন সেন মেঘনাদের সঙ্গে ঢাকাতে পড়েছিলেন, আবার ইন্টারমিডিয়েট পড়েছিলেন কলকাতাতে সত্যেনের সঙ্গে; হয়তো তিনিই দুজনের আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন। সেই থেকে দুই বন্ধুর জীবন এক গ্রন্থিতে বাঁধা পড়েছিল

মেঘনাদের জন্ম হয়েছিল ১৮৯৩ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকার কাছে শেওড়াতলি গ্রামে, সত্যেনের তার পরের বছর ১ জানুয়ারি কলকাতার গোয়াবাগানে। তাঁদের বয়সের তফাত তিন মাসেরও কম, জন্মস্থানের দূরত্ব তিনশো কিলোমিটার। সে যুগের যোগাযোগ ব্যবস্থার বিচারে তিনশো কিলোমিটার দূরত্বটা খুব কম নয়। কিন্তু তাঁরা জন্মসূত্রে বাঙালি সমাজের এমন দুই স্তরের বাসিন্দা, ইতিহাসের সেই মুহূর্তে যাদের মধ্যে দূরত্বকে কিলোমিটারে প্রকাশ করতে পারলে তার মাপ হতো আরো অনেক বেশি। জাতের বিচারে মেঘনাদ ছিলেন বৈশ্য সাহা, বাঙালী হিন্দু সমাজে তখন যাদের স্থান ছিল অত্যন্ত নিচু। একাধিকবার তাঁকে স্কুল কলেজের সরস্বতী পূজার মণ্ডপ থেকে বার করে দেওয়া হয়। কলকাতার হিন্দু হস্টেলে অন্য ছাত্রদের সঙ্গে বসে খাওয়ার অধিকার তাঁর ছিল না। সত্যেন্দ্রনাথের পরিবার কুলীন কায়স্থ, তাঁকে কখনো এই পরিস্থিতির সামনে পড়তে হয়নি।

শুধু জাতপাতের বিচারে নয়, আর্থিক অবস্থাতেও দুজনের অনেক অমিল। মেঘনাদের পরিবার ছিল হতদরিদ্র, গ্রাম্য মুদি বাবা জগন্নাথ ছেলের পড়া ছাড়িয়ে দোকানে বসাতে চেয়েছিলেন। কখনো অন্যের বাড়িতে থেকে, কখনো বা ছাত্রবৃত্তির উপর ভরসা করে পড়াশোনা চালিয়েছেন মেঘনাদ। মা শেষ সম্বল হাতের বালা বিক্রি করে ছেলের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফি ভরেছেন। সত্যেন্দ্রনাথের বাবা সুরেন্দ্রনাথ ছিলেন রেলের চাকুরে, পাশাপাশি ইন্ডিয়ান কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস বলে এক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতাসেকালের বিচারে বাঙালী সমাজে তাঁরা যথেষ্ট সচ্ছল। আর্থিক সমস্যা কখনো সত্যেনের শিক্ষালাভের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

সত্যেন্দ্রনাথ পড়েছিলেন কলকাতার তিনটি স্কুলে। নর্মাল স্কুল ছিল বাড়ির কাছে, বাড়ি পরিবর্তন করার পরে পড়েছিলেন নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে। সবশেষে তাঁর বাবা তাঁকে হিন্দু স্কুলে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করেছিলেন যাতে তাঁর প্রতিভা সঠিক দিশা পায়। ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হলেন হিন্দু স্কুল থেকে রাস্তা পেরিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে। মেঘনাদের পড়াশোনা শুরু পাঠশালায়, তারপর গ্রামে স্কুল না থাকায় দূরের শিমুলিয়া গ্রামে গিয়ে অন্যের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা। ছাত্রবৃত্তির টাকা সম্বল করে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল, কিন্তু বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বাংলার ছোটোলাটকে বিক্ষোভ দেখানোর অপরাধে সেখান থেকে বিতাড়ন। অগত্যা ভরসা ঢাকার কিশোরীলাল জুবিলি স্কুল। ম্যাট্রিক পাস করার পরে ঢাকা কলেজ। সেখান থেকে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পাস করলেন।

প্রেসিডেন্সি কলেজ তখন গোটা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে নামকরা কলেজ। সারা বাংলাদেশ এমনকি বাংলার বাইরে থেকেও ছেলেরা এসে সেই কলেজে ভর্তি হয়। মেঘনাদ সত্যেন দুজনেই সেখানে গণিতে অনার্স নিয়ে পড়লেনদু বছর পরে বিএসসি পাস করলেন দুজনে, ভর্তি হলে প্রেসিডেন্সির কলেজের এমএসসিতে। দুজনেরই বিষয় এক, মিশ্র গণিত। ১৯১৫ সালে এমএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন দুই বন্ধুবিএসসি এবং এমএসসি, দুই পরীক্ষার ফলই একপ্রথম সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দ্বিতীয় মেঘনাদ সাহা।

কেমন কেটেছে কলেজের চার বছর? দুজনেই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের খুব প্রিয় ছাত্র, জগদীশচন্দ্রের কাছেও পড়েছেন। কলেজে দুজনের বন্ধুত্ব হয়েছে আরো কয়েকজনের সঙ্গে যাঁরা ভবিষ্যতে ভারতবর্ষের বিজ্ঞানের স্থপতি হিসাবে কাজ করবেন -- রসায়নে জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, নীলরতন ধর, গণিতে নিখিলরঞ্জন সেন, পদার্থবিদ্যাতে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, স্নেহময় দত্ত। কলেজে বন্ধুত্ব হলেও দুজনের খুব ঘনিষ্ঠতা হয়নি; সেই ঘনিষ্ঠতা আসবে পরে, গবেষণা ও অধ্যাপনার সময়। কলেজ ছাত্র সত্যেনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুবৃত্ত বিরাট, সেখানে অক্লেশে স্থান পায় বয়সে ছোটরা, আর্টস বা অন্য বিষয় নিয়ে পড়া ছাত্ররা, সঙ্গীত বা শিল্পকলাতে উৎসাহীরা। পরে তাঁদের অনেকেই বিখ্যাত হবেন। প্রতিদিন বিকাল সন্ধেতে হেদোর পুকুরের ধারে তাঁদের আড্ডা বসে, কিন্তু সেখানে মেঘনাদের উপস্থিতির খবর পাই না। অবশ্য তাঁর সেখানে যাওয়ার সময়ও নেই, খরচ চালাতে সাইকেল চড়ে কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ টিউশনি করে বেড়াতে হয় তাঁকে। তাই মেঘনাদের বন্ধুবৃত্ত কলেজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বাঙাল ভাষাতে কথা বলা শহুরে আদবকায়দা না জানা ছাত্রটিকে নাগরিক কলকাতা আপন করে নেয়নি। মেঘনাদের সামাজিক হেনস্থার প্রতিবাদে তাঁর সঙ্গেই হিন্দু হস্টেল ছেড়েছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ ঘোষ ও নীলরতন ধর, কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। অনেক বছর পরে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিচারণে সে সময় মেঘনাদের পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ না করাটা তাঁর ভুল বলেই স্বীকার করবেন।

কলেজের বাইরে কলকাতাতে মেঘনাদের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল কিছু মানুষের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে সবার আগে থাকবেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। সেই নামে তাঁকে কেউ কেউ হয়তো চিনতেন না, কিন্তু যুগান্তর দলের বিপ্লবী নেতা বাঘা যতীন তখন সকলের কাছেই পরিচিত। ঢাকাতে থাকাকালীন অনুশীলন সমিতির নেতা পুলিনবিহারী দাসের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল মেঘনাদের, সেই সূত্রেই বাঘা যতীনের সঙ্গে আলাপ। মেঘনাদ চেয়েছিলেন তাঁর দলে যোগ দিতে, বাঘা যতীন তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, “দেশসেবাতে তোমার পথ ভিন্ন।” চাকরি পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বিপ্লবীদের সঙ্গে মেঘনাদের যোগাযোগ। রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হওয়াও পিছিয়ে গিয়েছিল। প্রথমবার বিদেশ থেকে ফেরার সময় বার্লিন থেকে মেঘনাদ নিয়ে এসেছিলেন সেই সঙ্কেতবার্তা, যা প্রবাসী ও দেশের সশস্ত্র বিপ্লবীদের পরস্পরকে চিনতে সাহায্য করবে।

সত্যেন্দ্রনাথ কি কখনো বিদেশী শাসন থেকে মুক্তির কথা ভাবেননি? আইনস্টাইন তাঁকে জিজ্ঞাসা করবেন, “ধরুন আপনার সামনে একটা বোতাম আছে যা টিপলেই দেশ ইংরাজ শাসন মুক্ত হবে। আপনি কী করবেন?” সত্যেন্দ্রনাথের উত্তর, “কোন চিন্তা না করেই টিপে দেব।” গরীব ঘরের যে ছেলেরা পয়সার অভাবে স্কুলে ভর্তি হতে পারে না, কলেজে পড়ার অবসরে তাদেরকে বিনা মাইনেতে পড়াতেন সত্যেন। সেই নাইট স্কুল চালাত বিপ্লবীরা। প্রিন্সিপাল ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ডি এন মল্লিক। প্রথমবার বিদেশ যাওয়ার সময় সত্যেন্দ্রনাথ মারফত বার্লিনে প্রবাসী ভারতীয় বিপ্লবীদের কাছে অর্থ পৌঁছেছিল। তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মানবেন্দ্রনাথ রায়ের সহযোগী অবনী মুখার্জী কলকাতাতে এসে সত্যেন্দ্রনাথের সাহায্যে অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, ঢাকাতেও তাঁর সাহায্য পেয়েছিলেন। প্রৌঢ় সত্যেন্দ্রনাথকে প্রশ্ন করেছিলেন ছাত্র, মেঘনাদ বা সত্যেন্দ্রনাথের সাফল্যের পিছনে অনুপ্রেরণা কী ছিল। সত্যেন্দ্রনাথ উত্তর দিয়েছিলেন, “দ্যাখ, আমাদের মনে হত সাহেবরা যা পারে, আমরা তা পারবো না কেন? বিজ্ঞানে আমরা যে সাহেবদের চেয়ে কম নই, তা দেখিয়ে দিতে হবে।”

এমএসসি পাস করলেন দুজনে, এবার কী? মেঘনাদ ভাবলেন চাকরি করবেন, কিন্তু বাদ সাধল সরকার। বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সন্দেহে ফিনান্সিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষাতে বসার অনুমতি মিলল না। সত্যেন কয়েক জায়গায় দরখাস্ত করলেন, সঙ্গে ডি এন মল্লিকের সুপারিশ পত্র। এমএসসিতে রেকর্ড নাম্বার পেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ, তা দেখে ডি এন মল্লিক বলেছিলেন, “এত নম্বর পেয়েছ পরীক্ষায়, বড় বেমানান লাগছে হে।” গুরুবাক্য মিথ্যা হয়নি। বিহারের কলেজ বা কলকাতার আবহাওয়া অফিস একই কথা বলে ফিরিয়ে দিল, তারা সেকেন্ড ক্লাস এমএসসি খুঁজছে। এত ভালো ছাত্র তাদের দরকার নেই।

দুজনেরই ইচ্ছা গবেষণা করবেন, কিন্তু সুযোগ কোথায়? এক সহপাঠী শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষ এসে খবর দিলেন, তিনজনকে ডেকেছেন স্যার আশুতোষ। ১৯১৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ থেকে সরে যাওয়ার ঠিক আগে বিজ্ঞান কলেজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তিনি সেখানে ১৯১৬ সাল থেকে চালু হবে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে এমএসসি পড়ানো ও গবেষণা। উপাচার্য পদে না থাকলেও আশুতোষই বিজ্ঞান কলেজের প্রাণ। রসায়ন বিভাগে আছেন দুই অধ্যাপক, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় ও প্রফুল্লচন্দ্র মিত্রপদার্থবিজ্ঞানে দুই অধ্যাপকের একজন সি ভি রামন কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে, তখনো ছাড়পত্র পাননি। অন্যজন দেবেন্দ্রমোহন বসু উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলে। বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়াতে আটকা পড়েছেন। ছাত্রদের পড়াবে কে? দুই বন্ধুর সম্পর্কে তিনি খবর নিয়েছেন। গণিতের ছাত্র হলে কি হবে, তারা যে পদার্থবিদ্যা পড়াতে পারবে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত।

দুজনকে ডেকে পাঠালেন বাংলার বাঘ। সত্যেনকে দায়িত্ব দিলেন আপেক্ষিকতা পড়ানোর, মেঘনাদ পড়াবেন কোয়ান্টাম তত্ত্ব। তাঁদের পদ হল পদার্থবিজ্ঞানে পালিত অধ্যাপকের সহকারী, যদিও পালিত অধ্যাপক পদে আরো এক বছরেরও বেশি পরে যোগ দেবেন রামননামে সহকারী হলেও অবশ্য দুই বন্ধু কোনোদিনই রামনের সঙ্গে কাজ করেন নি, চিরকালই গবেষণাতে তাঁরা স্বাধীন। শৈলেনের উপর দায়িত্ব পড়েছিল পদার্থবিদ্যা বিভাগের ল্যাবরেটরি তৈরির। সে সুযোগ তাঁর হয়নি, কিন্তু সে অন্য গল্প।

কাজ সহজ নয়, পড়াতে হবে এমন দুটি বিষয় যেগুলি তখন সদ্যোজাত। কোয়ান্টাম তত্ত্বের জন্ম হয়েছে ১৯০০ সালে, তা তখনো পরিবর্তনশীল। সাধারণ আপেক্ষিকতা বিষয়ে আইনস্টাইনের তত্ত্ব প্রকাশিত হয় ১৯১৫ সালে, তার পরের বছরেই তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে ঢুকবে। গণিতে এমএসসি পড়তে গিয়ে সত্যেন ও মেঘনাদ পদার্থবিদ্যার এই দুই নতুন তত্ত্বের সম্মুখীন হননি। তার থেকেও বড়ো সমস্যা হল বিষয়দুটি নতুন বলে কোনো পাঠ্যবই নেই। ছাত্রদের পড়াবেন কেমন করে? বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাসে লেখা আছে শিক্ষকরা মূল গবেষণাপত্র থেকে পড়াবেন। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। দুটি বিষয়েই অধিকাংশ গবেষণাপত্রগুলি জার্মান ভাষায় লেখা -- কারণ যাঁরা কাজগুলি করছেন, তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ বিজ্ঞানীই জার্মান। সে যুগে তাঁরা প্রবন্ধ লেখেন তাঁদের মাতৃভাষায়।

মেঘনাদ জার্মান কিছুটা জানতেন, ইন্টারমিডিয়েটে পড়েছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ শিখেছিলেন ফরাসি, তাতে চলবে নাদুজনে মিলে ভর্তি হয়ে গেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান শেখার ক্লাসে। সেখানে সহপাঠী পেলেন আর এক বিখ্যাত পণ্ডিতকে, ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়। নিজেরা শিখলেন, কিন্তু ছাত্রদের কী হবে? তাদের সবার পক্ষে তো একটা নতুন ভাষা শেখা সম্ভব নয়। ভেবেচিন্তে দুই বন্ধু আইনস্টাইনের কাছ থেকে তাঁর আপেক্ষিকতা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রগুলি অনুবাদ করে ছাপা অনুমতি চাইলেন। অনুমতি দিলেন আইনস্টাইন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হল আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের মূল গবেষণাপত্রগুলির প্রথম ইংরাজি অনুবাদ। অনুবাদক মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ভূমিকা লিখলেন তাঁদের থেকে এক বছরের সিনিয়র প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের তরুণ শিক্ষক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ।

দুজনেই হাতড়াচ্ছেন গবেষণার পথ। কখনো কখনো তাঁদের উৎসাহ এক জায়গায় এসে মেলে। গ্যাসের অবস্থার সমীকরণ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র লিখে ফেললেন দুই বন্ধু, সেটি সত্যেন্দ্রনাথের প্রথম পেপার। সেই গবেষণা ছিল তাপগতিবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত। তাপগতিবিদ্যার তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যা। দুই বন্ধুর দুই শ্রেষ্ঠ কীর্তি সাহা সমীকরণ ও বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন দুইই পদার্থবিদ্যার এই শাখার মধ্যেই পড়বে, সেই যৌথ গবেষণা তাঁদের ভবিষ্যৎ পথে প্রথম পদক্ষেপ। কিন্তু সেই শেষ, আর কোনো গবেষণাপত্রের লেখক তালিকায় একই সঙ্গে দুই বন্ধুর উপস্থিতি পাওয়া যাবে না।

এবার ভিন্ন পথে বয়ে চলল দুজনের জীবনধারা। থিসিস জমা দিলেন মেঘনাদ, পেলেন ডক্টরেট ডিগ্রি, ডিএসসি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে আবিষ্কার করলেন বিখ্যাত তাপ আয়নন সমীকরণ। নক্ষত্রের অভ্যন্তরে উঁকি মারার সেই চাবিকাঠিকে সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানী মহলে সাড়া জাগাল, শুরু হল জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার নব যুগের। তা প্রকাশের আগেই অবশ্য মেঘনাদ পাড়ি দিয়েছেন ইংল্যান্ডে, সেখান থেকে জার্মানি। কিন্তু মন পড়ে রয়েছে দেশেআশুতোষেরও মনে আছে তাঁর কথা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পৃথিবীর বিজ্ঞানজগতে প্রথম তুলে ধরেছেন মেঘনাদতাই প্রথম সুযোগেই পদার্থবিদ্যা বিভাগে তৈরি করলেন এক নতুন পদ, খয়রা অধ্যাপক। মেঘনাদ এসে যোগ দিলেন সেই পদে। সেটা ১৯২১ সাল।

সত্যেন কিন্তু তার কয়েকমাস আগে কলকাতা ছেড়েছেনকলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদ তাঁর মেলেনি। মেঘনাদের মতোই বিদেশে গবেষণার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু এক জায়গায় দুই বন্ধুর জীবনে তফাত হয়ে গিয়েছিল। এমএসসি পড়তে পড়তেই মায়ের আদেশ মেনে বিয়ে করেছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ; বিদেশে গবেষণার জন্য বৃত্তি তাই নিয়মের জালে আটকে গিয়েছিল। আশুতোষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক মেঘনাদের মতো মসৃণ নয়। একবার তো আশুতোষের করা প্রশ্নপত্রে একটা অঙ্কের ভুল নিয়ে দুজনের তুমুল তর্ক হয়ে গেল। দশ বছর আগে ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় এসেছিলেন মেঘনাদ, দশ বছর পরে কলকাতা থেকে ঢাকা গেলেন তাঁর বন্ধু। ১৯২১ সালেই যোগ দিলেন নতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার রিডার পদে। আশুতোষ অবশ্য তখন বেশি বেতন দিয়ে কলকাতায় ধরে রাখতে চেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথকে, রাজি হননি তিনি

মেঘনাদ সত্যেন কেউই জানতেন না, ঢাকার চাকরির ক্ষেত্রেও দুজনে ছিলেন প্রতিদ্বন্দ্বী। মেঘনাদ বিদেশ থেকে আবেদন পাঠিয়েছিলেন, কলকাতায় এসে সত্যেনকে আবেদন করতে বলেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য ফিলিপ হার্টগ। ঢাকার পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধান ওয়াল্টার জেনকিন্সের রিপোর্টে দুজনেরই প্রশংসা ছিল, শেষ পর্যন্ত সত্যেন্দ্রনাথের পক্ষেই তাঁর মত। তাই একই বছর উত্তর কলকাতার বাসিন্দা সত্যেন্দ্রনাথ গেলেন ঢাকা; ঢাকার অনতিদূরে জন্মানো মেঘনাদ হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

ঢাকা থেকে মেঘনাদকে চিঠিতে লিখলেন সত্যেন, ‘মাসখানেকের উপর তোমাদের দেশে এসেছি। এখানকার কাজ এখনও আরম্ভ হয়নি। তোমাদের ঢাকা কলেজে জিনিস অনেক ছিল, কিন্তু অযত্নে তাদের যে দুর্দশা হয়েছে তা বোধ হয় নিজেই জান।’

দুজনের কর্মস্থান আবার এক হবে ১৯৪৫ সালে যখন সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকা থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবেন, হবেন খয়রা অধ্যাপককলকাতা ছেড়ে এসেছিলেন প্রতিশ্রুতিবান এক অখ্যাত তরুণ, ফিরে যাবেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানী। মেঘনাদও মাঝে দেড় দশক এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটিয়ে ১৯৩৮ সালে পালিত অধ্যাপক হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবার যোগ দিয়েছেন। দুই বন্ধুই ততদিনে অনেক পরিণত, বিশেষ করে মেঘনাদ তো নানা কাজে ভীষণ ব্যস্ত। দুজনের মধ্যে যোগাযোগের সূত্র ততদিনে খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছে

সত্যেন কলকাতা ছাড়ার পরে মেঘনাদ কলকাতায় বেশিদিন থাকতে পারেননি, রামনের সঙ্গে বিবাদের ফলে তিনি দু বছরের মধ্যেই চলে যান এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে এক ঝাঁক ছাত্র তৈরি করেছেন যাঁরা পরে দেশের নানা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। সত্যেন্দ্রনাথের ছাত্রের সংখ্যা কম, তাঁদের কারোরই বিজ্ঞান প্রশাসনে আগ্রহ ছিল না। মেঘনাদ নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা বিষয়ে গবেষণার জন্য কলকাতাতে তৈরি করলেন ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স। তার বাইরেও কলকাতারই ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অফ কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের অধিকর্তা হয়েছিলেন, একইসঙ্গে দুটি প্রতিষ্ঠানকে সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন মেঘনাদ। সত্যেন্দ্রনাথ হয়েছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য, সে অভিজ্ঞতা তাঁর পক্ষে খুব সুখের হয়নি। ১৯৫২ সালে মেঘনাদ সাহা বামপন্থীদের সমর্থিত নির্দল প্রার্থী হিসাবে কংগ্রেস প্রার্থীকে পরাজিত করে লোকসভায় নির্বাচিত হলেন, সেই বছরই রাজ্যসভার মনোনীত সদস্য হলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু। কিন্তু যৌথভাবে তাঁরা কোনো কাজ রাজনীতির অঙ্গনে করেননি।

বিজ্ঞান জগতের বাইরে তাঁদের দুজনেরই বিস্তার ছিল। সত্যেন্দ্রনাথের বহুমুখী প্রতিভা বিকাশের পথ খুঁজে নিয়েছিল সঙ্গীতে, শিল্পকলায়, সাহিত্যে। সত্যেন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন গায়ক দিলীপকুমার রায় ও ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, কবি বিষ্ণু দে, শিল্পী যামিনী রায়। মেঘনাদ সত্যেন্দ্রনাথ দুজনেরই স্বপ্ন ছিল দেশের সেবা, পথ ছিল আলাদা। সত্যেন বিশ্বাস করতেন দেশের উন্নতির জন্য মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা জরুরি। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার জন্য তৈরি করেছিলেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। মেঘনাদ সাহার আগ্রহ ছিল দেশের উন্নতিতে সরাসরি বিজ্ঞানের প্রয়োগ, সেজন্য রাজনীতি জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন তিনি লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়ানো তারই অঙ্গ। সুভাষচন্দ্র, নেহরু, শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ হয়েছিল। শিল্পায়ন, জাতীয় পরিকল্পনা, নদী পরিকল্পনা, ক্যালেন্ডার সংস্কার – নানা বিষয়ে স্বাধীনতার আগে ও পরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন মেঘনাদ।

নানা দিক থেকে দুজনে ছিলেন বিপরীত চরিত্রের মানুষ। মেঘনাদ সাহার পিতৃদত্ত নাম ছিল মেঘনাথ, সামাজিক বৈষম্যের শিকার কিশোর নিজেই মধুসূদনের কাব্যের চিরন্তন প্রতিবাদী চরিত্রটি থেকে বেছে নিয়েছিল নিজের নাম। শৈশব-কৈশোর-যৌবনে নানা অবহেলা-বঞ্চনার শিকার মেঘনাদ সবসময়েই নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন। এক বিদেশী বিজ্ঞানী একটি সূত্র আবিষ্কার করেছেন, মেঘনাদ বিখ্যাত বিদেশী পত্রিকাতে লিখে স্মরণ করিয়ে দিলেন অনেক বছর আগেই তিনি এই সূত্রের কথা লিখে গেছেন। অনেক বছর পরে একটা চিঠিতে মেঘনাদ লিখবেন, ‘ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদের এক অংশ দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যাতে আমার প্রথম জীবনের অবদানকে ছোট করে দেখাচ্ছেন’ সারা জীবন মেঘনাদ এই নিরাপত্তাহীনতার শিকার। খ্যাতি বিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথের কোনো আগ্রহ নেই। আইনস্টাইন সত্যেন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত গবেষণাপত্রটি অনুবাদের সময় নিজের বিচারমতো একটি সংশোধন করে সত্যেন্দ্রনাথের প্রস্তাবিত মৌলিক কণার ঘূর্ণন প্রসঙ্গটি বাদ দিয়ে দেন। অল্প দিন পরেই দুই বিদেশি বিজ্ঞানী ঘূর্ণন সংক্রান্ত প্রকল্প স্বাধীনভাবে প্রস্তাব করবেন। তিনি যে এক অত্যন্ত মৌলিক আবিষ্কার থেকে বঞ্চিত হলেন, সত্যেনের তাতে তাপ উত্তাপ নেই। নানা কারণে তাঁর একসময়কার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে মেঘনাদের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ অজাতশত্রু।

১৯৫৬ সালে সাহার মৃত্যু পর্যন্ত দুই বন্ধু এক বিভাগে কাজ করলেও কৈশোর-যৌবনের বন্ধুত্বের সেই উত্তাপ আর কখনো ফিরে আসে নি। তাঁদের ছাত্ররা ১৯৪৭ সালের এক ঘটনার কথা বলেছেন। একদিন দুপুরবেলা মেঘনাদ সাহা সত্যেন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকলেন। দুজনের এক মিটিঙে উপস্থিত হওয়ার কথা। ঘরে তখন উপস্থিত এক বংশীবাদক। মেঘনাদ সত্যেন্দ্রনাথকে মিটিঙের কথা মনে করিয়ে দিলেন। সত্যেন উত্তর দিলেন। ‘বাজনা শুনবে? এই লোকটা বাঁশীতে বেহাগ বাজাবে।’ মেঘনাদ উত্তর না দিয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। এই শীতলতার পিছনে ব্যক্তিগত অসূয়ার স্থান ছিল না। সমস্যা হয়েছিল বিভাগ পরিচালনাতে। সত্যেন্দ্রনাথ বিভাগীয় প্রধান, বিভাগে সরকারি বেসরকারি অনুদান কম আসে আসে না। কিন্তু তা সমস্তই মেঘনাদের ইনস্টিটিউটের জন্য, বিভাগ পরিচালনাতে সত্যেন্দ্রনাথের হাত পা বাঁধা।

দুই ভিন্ন শহরে কাজের জন্য দুই বন্ধুর সম্পর্ক অপেক্ষাকৃত শীতল হয়ে পড়তেই পারে, কিন্তু সত্যেনের প্রতিভার উপর অগাধ আস্থা ছিল তাঁর বন্ধুর। ১৯৩৮ সালে ঢাকাতে এসেছিলেন মেঘনাদ সাহা। আয়নমণ্ডল থেকে বেতার তরঙ্গের প্রতিফলন বিষয়ে একটি কাজ করেছিলেন তিনি, সেই প্রসঙ্গে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি বলেন যে তিনি একটা জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। বন্ধুকে এ ব্যাপারে সাহায্য করার অনুরোধ জানান মেঘনাদ। বন্ধু তাঁকে নিরাশ করেননি – কয়েকদিন পরিশ্রমের পরেই সত্যেন্দ্রনাথ সমস্যাটির সমাধান করে ফেলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ 


১৯২৪ সালের মার্চ মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা নিতে এসেছেন মেঘনাদ। আছেন সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে; বন্ধুকে বললেন ঠিক আগের বছর বিকিরণ সংক্রান্ত ম্যাক্স প্লাঙ্কের সমীকরণ সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। একটির লেখক উলফগ্যাং পাউলি। অন্যটি লিখেছিলেন পল এহরেনফেস্ট ও আলবার্ট আইনস্টাইন। প্রবন্ধ দুটি তিনি বন্ধুর কাছে রেখে যান, বিশেষ করে পাউলির প্রবন্ধটিতে একটা বিশেষ সমীকরণের দিকে তিনি সত্যেনকে নজর দিতে বলেন। সেই সমস্যার সমাধান করতে গিয়েই সত্যেন্দ্রনাথ এক নতুন সংখ্যায়নের প্রস্তাব করেছিলেন যাকে আমরা আজ বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন বলে চিনি। এর পরে আইনস্টাইনকে চিঠি লেখার গল্প আমাদের সকলেরই জানা। এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের বিজ্ঞানীমহলে বিখ্যাত হয়ে যান সত্যেন্দ্রনাথ। দুজনের বন্ধুত্বের স্মারক হয়ে থাকবে পদার্থবিজ্ঞানের নতুন শাখা কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানবিদ্যার জন্মের এই ইতিহাস।