Tuesday, 26 February 2019

সূর্যের জীবনকথা


সূর্যের জীবনকথা

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


     
     আমাদের পৃথিবীর আকাশে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জ্যোতিষ্ক নিঃসন্দেহে সূর্য। সম্ভবত সমস্ত প্রাচীন সমাজই সূর্যকে দেবতারূপে কল্পনা করেছে। তার আলোকে ব্যবহার করে সবুজ উদ্ভিদ খাবার তৈরি করে, সেই খাবারই সমস্ত জীবজগতকে বাঁচিয়ে রেখেছে। নিউক্লিয় শক্তি আবিষ্কারের আগে আমাদের সমস্ত রকম শক্তির উৎস ছিল সূর্য। সূর্য আমাদের জীবনকে অন্য ভাবেও নিয়ন্ত্রণ করে, কারণ আমরা সময়ের হিসাব করি দিন-রাত্রি মাস বছরের হিসাবে যা পৃথিবী ও সূর্যের আপেক্ষিক গতির উপরে নির্ভর করে। এই লেখাতে আমরা সূর্যের জন্ম ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করব।  সূর্যের গঠন সম্পর্কে কোনো কথা এই লেখাতে নেই, আমরা শুধু তার কেন্দ্রে শক্তি উৎপাদনের দিকে নজর রাখব।
      সূর্য একটা মাঝারি মাপের তারা।  তার জন্ম হল কেমন করে? তার জন্মের সময় মানুষের থাকার প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু মহাকাশে যে হাজার হাজার কোটি নক্ষত্র আছে তাদের পর্যবেক্ষণ করে তারাদের সৃষ্টি ও জীবনকথা সম্পর্কে আমাদের মোটামুটি একটা ধারণা হয়েছে। সেই জ্ঞানের সাহায্যে আমরা সূর্যের জন্ম ও শৈশব সম্পর্কে অনুমান করতে পারি। 
      আমাদের আলোচনাতে কৃষ্ণ বস্তু বা কৃষ্ণ শক্তির কোনো ভূমিকা নেই। তাদের কথা বাদ দিলে আমরা জানি যে আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গার মোট ভরের আটানব্বই শতাংশ হল দুটো মৌল, হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম। সূর্যের ভরেরও আটানব্বই শতাংশ এই দুটি মৌল। অবশিষ্ট দুই শতাংশ যে ভারি মৌল আছে, বর্তমান দশা পর্যন্ত সূর্যের মধ্যে সেগুলি তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। আমরা জানি এই সমস্ত মৌল নানাভাবে বিভিন্ন তারকার জীবনের শেষভাগে সৃষ্টি হয়। আমরা এও জানি যে আদি যুগের তারকাদের মধ্যে হাইড্রোজেন এবং হিলিয়াম ছাড়া অন্য মৌলিক পদার্থ ছিল না। তার অর্থ সূর্য মহাবিশ্বের প্রথম যুগের তারকা নয়, অন্য তারকার মৃতদেহের অবশেষ তার মধ্যে আছে। পৃথিবীর, এমন কি আমাদের দেহেরও প্রায় সমস্ত পরমাণুর উৎস সেই মৃত তারকার দেহাবশেষ -- আমরা সবাই আক্ষরিক অর্থে নক্ষত্রের সন্তান। আমাদের সূর্যের বয়স হল চারশো ষাট কোটি বছরের মতো। পক্ষান্তরে মহাবিশ্বের বয়স তেরোশো আশি কোটি বছর।
      আমাদের ছায়াপথে অনেক বিশাল বিশাল মহাজাগতিক মেঘ আছে, যাদের অধিকাংশই হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম, এই দুটো মৌলিক পদার্থ দিয়েই তৈরি। এই সব মেঘ আণবিক মেঘ (molecular cloud) নামেও পরিচিত। এক একটা মেঘ হয়তো কয়েকশো পারসেক চওড়া এবং তাদের ভর হয়তো আমাদের সূর্যের ভরের কয়েকশো গুণ থেকে কয়েক হাজার গুণ। ভর বেশি হলেও বিশাল আয়তনের জন্য এদের ঘনত্ব খুব কম, এক ঘন সেন্টিমিটারে কয়েকশো অণু পাওয়া যাবে। তুলনায় আমাদের বাতাসে এক ঘন সেন্টিমিটারে অণুর সংখ্যা 3X1019 অর্থাৎ তিন লক্ষ কোটি কোটির কাছাকাছি। (এখানে বলে রাখি পারসেক হল জ্যোতির্বিদ্যাতে নক্ষত্রদের দূরত্ব মাপার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত একক। এক পারসেক (pc) হল 3.26 আলোকবর্ষের সমান এবং এর মাপ হল 3.1X1016 মিটার। সূর্যের ভর M☉=2X1030 কিলোগ্রাম।) মহাবিশ্বের তাপমাত্রা খুব কম, তাই এই মেঘদের তাপমাত্রা সাধারণত হয় 10 থেকে 100 কেলভিনের মধ্যে। (কেলভিন হল তাপমাত্রার পরম একক যা শুরু হয় -273.15o ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে।)
      এই বিশাল মেঘ নিজেরই অভিকর্ষের টানে নিজেই সংকুচিত হতে চায়। তাকে বাধা দেয় মেঘের গ্যাসের চাপ যা অভিকর্ষের বিপরীতে কাজ করে। গ্যাসের চাপ (P) কেলভিন স্কেলে তার তাপমাত্রা (T) ও গ্যাসের কণার ঘনত্ব (r) এই দুইয়ের উপর নির্ভর করে। আদর্শ গ্যাসের ক্ষেত্রে আমরা জানি P=rkT। এখানে k হল বোলজম্যানের ধ্রুবক। মহাজাগতিক মেঘের গ্যাসকে আমরা আদর্শ গ্যাস হিসাবে কল্পনা করতেই পারি। মেঘের ভিতরে তাপমাত্রা ও ঘনত্ব এই দুটি রাশিই ক্ষুদ্র, তাই গ্যাসের চাপও খুবই কম। অভিকর্ষজ বল যদি চাপের থেকে উদ্ভূত বলের থেকে বেশি হয়, সে ক্ষেত্রে মেঘ সংকুচিত হতে শুরু করতে পারে। এই ঘটনা প্রথম বলেছিলেন বিজ্ঞানী জেমস জিনস, তাই তাঁর নামানুসারে এই সীমাকে আমরা জিনস সীমা বলি। যেমন নির্দিষ্ট আয়তনের ও নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় মেঘের সংকোচন শুরুর জন্য মেঘের যে ন্যূনতম ভর হওয়া প্রয়োজন, তাকে বলে জিনস ভর। বাস্তবে অবশ্য এই সঙ্কোচনের বিষয়টা আরো অনেক জটিল, তবে সেই বিস্তারিত আলোচনাতে আমরা যাব না।
      একটা বলকে উপর থেকে ফেলে দিলে সে যত নিচে নামে, তার বেগ তত বাড়ে, কারণ স্থিতিশক্তি গতিশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ঠিক তেমনি মেঘের গ্যাস অণুগুলি যত কেন্দ্রের দিকে যায় তাদের বেগ তত বাড়ে। আমরা জানি যে গ্যাসের তাপমাত্রা হল তার অণুগুলির বেগের প্রকাশ। এর অর্থ, মেঘ যত সংকুচিত হবে, তত তার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া উচিত। তাপমাত্রা বাড়লে গ্যাসের চাপ বাড়বে, তার জন্য সংকোচন বাধা পাবে। তবে কিছুটা তাপ মেঘ থেকে অবলোহিত বিকিরণ আকারে বেরিয়ে যায় কারণ যে কোনো বস্তু সবসময়ই তাপ বিকিরণ করে। সংকোচনের ফলে মেঘের তাপমাত্রা বাড়ে, কিন্তু তার আশপাশের তাপমাত্রা কমই থাকবে -- তাই মেঘ যে পরিমাণ তাপ তার পরিবেশের থেকে পাবে, তার থেকে বেশি পরিমাণ তাপ ছেড়ে দেবে। সেই কারণে রুদ্ধতাপ (adiabatc) পরিবর্তনে তাপমাত্রা যে হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, মেঘের তাপমাত্রা তার থেকে অনেক কম হারে বাড়ে।
      কিন্তু এই পরিস্থিতি চিরকাল চলতে পারে না। মেঘের ঘনত্ব বেড়ে গেলে তার স্বচ্ছতা কমে যায়, তখন কেন্দ্রের তাপ বাইরে না বেরোতে পেরে মেঘের মধ্যেই আটকে পড়ে। অন্যভাবে বললে, গ্যাসের অণুর ঘনত্ব বাড়লে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে অবলোহিত রশ্মির ফোটনগুলি বাইরের দিকে যেতে বাধা পায়। ফলে মেঘের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। মনে রাখতে হবে এই সময় স্বাভাবিক ভাবেই মেঘের কেন্দ্রের তাপমাত্রার বাইরের অংশের থেকে বেশি হয়। এই সময় দুটি ঘটনা ঘটে যা কিছুটা তাপকে গতিশক্তি থেকে অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত করে। তাপমাত্রা যখন নয় হাজার কেলভিনের কাছাকাছি পৌঁছোয় তখন হাইড্রোজেন অণু দুটি পরমাণুতে ভেঙে যায়। হিলিয়ামের অণুতে একটাই পরমাণু থাকে, তাই তার ভাঙার প্রশ্ন ওঠে না। আবার তিরিশ হাজার কেলভিনের কাছাকাছি তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের পরমাণুরা ইলেকট্রন ছেড়ে আয়নে পরিণত হয়। এই দুটি ঘটনাই তাপ শোষণ করে, সেই তাপ গ্যাসের চাপ বাড়াতে সরাসরি কাজে লাগে না। তবে তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাসের চাপও বৃদ্ধি পায়, তাই অভিকর্ষ জনিত সঙ্কোচন খুব শ্লথ হয়ে যায়। বোঝা যাচ্ছে যে নক্ষত্রের কেন্দ্রে উচ্চ তাপমাত্রায় তড়িৎআধানহীন পরমাণুর অস্তিত্ব থাকতে পারে না, তা আয়ন ও ইলেকট্রনে ভেঙে যায়।
      আর একটা ঘটনা এই সংকোচনের সময় ঘটে যা নক্ষত্র সৃষ্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখেছি যে মহাজাগতিক মেঘের ভর সূর্যের কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার গুণ, কিন্তু কোনো নক্ষত্রই ঐরকম ভারি নয়। বাস্তবে একটা মহাজাগতিক মেঘ থেকে অনেকগুলো তারার জন্ম হতে পারে। মেঘ যত সংকুচিত হতে থাকে, তত তার ঘনত্ব বাড়ে। ঘনত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জিনস ভরের মান কমতে থাকে। ফলে একটা সময় সেই মান এত কমে যায় যে মেঘের একটা অংশের ভর তার থেকে বেশি হয়ে যায়। তখন ওই টুকরোটা সম্পূর্ণ মেঘের কেন্দ্রের দিকে সংকুচিত না হয়ে ঐ খণ্ডিত অংশের কেন্দ্রের দিকে পতিত হয়। এভাবে মেঘের নানা টুকরো আলাদা আলাদা ভাবে নিজের নিজের কেন্দ্রের দিকে সংকুচিত হয়ে শেষ পর্যন্ত একের বেশি তারার জন্ম দেয়। যে টুকরোটা শেষ পর্যন্ত একটা নক্ষত্রের জন্ম দেয় তাকে আমরা বলি আদি-তারা (protostar)।
      সৌর জগতের সমান ভরের একটা মেঘ যখন হাইড্রোজেনকে আয়নিত করার অবস্থায় পৌঁছায়, তখন তার ব্যাসার্ধ মোটামুটি সাত কোটি কিলোমিটার, অর্থাৎ সূর্যের ব্যাসার্ধের একশো গুণের কাছাকাছি। এই সময় আদি-তারাটির সংকোচন শ্লথ হয়ে যায়। কেন্দ্রের তাপমাত্রা অবশ্য একই সঙ্গে বৃদ্ধি পেতে থাকে কারণ কেন্দ্রের ঘনত্ব বেশি, তাই সেখান থেকে বিকিরণ বাইরে আসতে বাধা পায়। যে আদি-তারা থেকে আমাদের সূর্যের জন্ম তা এভাবে ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে, সময় লেগেছে আনুমানিক দশ লক্ষ থেকে এক কোটি বছর। একসময় আদি-তারার কেন্দ্রের তাপমাত্রা এতটাই বৃদ্ধি পায় যে কেন্দ্রে নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়া শুরু হয়। উচ্চ তাপমাত্রা ছাড়া সংযোজন বিক্রিয়া কেন সম্ভব নয় সে বিষয়ে আমরা পরে আলোচনা করব। আদি-তারার কেন্দ্রে নিউক্লিয় বিক্রিয়া শুরু হলে এবার তাকে আমরা সাধারণ অর্থে তারা বলতে পারি।
      একটা বিষয় সহজেই বোঝা যায়, তারার কেন্দ্রে অভিকর্ষজ সঙ্কোচনের বাইরে একটা নতুন তাপের উৎসের জন্ম হল। নিউক্লিয় বিক্রিয়ার ফলে প্রচুর তাপ তৈরি হয় যা নক্ষত্রকে আরো উত্তপ্ত করে তোলে। আমাদের সূর্যের মতো নক্ষত্রদের ক্ষেত্রে গ্যাসের চাপ তখন এত বেড়ে যায় যে গ্যাসের সংকোচন বন্ধ হয়ে এক সাম্যাবস্থায় পৌছায়। আমাদের সূর্যের কেন্দ্রের ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে 150 গ্রাম। সূর্যের থেকে অনেকগুণ ভারি নক্ষত্ররা যখন এই সাম্যাবস্থায় পৌঁছায়, তখন তাদের তাপমাত্রা আরো অনেক বেশি হয়। কোনো উৎস থেকে বিকিরণের চাপ (Prad) উৎসের কেলভিন স্কেলে তাপমাত্রার চতুর্থ ঘাতের সমানুপাতে বৃদ্ধি পায় (PradµT4), অর্থাৎ তাপমাত্রা দুগুণ বাড়লে বিকিরণের চাপের পরিমাণ বাড়বে ষোল গুণ। সে জন্য এই সমস্ত নক্ষত্রদের ক্ষেত্রে সাম্যাবস্থাতে গ্যাসের চাপের সঙ্গে বিকিরণের বহির্মুখী চাপকেও হিসাবে রাখতে হবে।
      সূর্যের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের সৌরজগত সৃষ্টি হয়েছিল। মহাজাগতিক মেঘের কেন্দ্র সূর্যের জন্ম দিয়েছিল। বাইরের অংশ থেকে গ্রহদের জন্ম হয় নানা জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যেগুলো সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। আমাদের সৌরজগতের বাইরে অন্যান্য নক্ষত্রের গ্রহ আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের ধারণার অনেক পরিবর্তন দরকার। সেই দীর্ঘ আলোচনা আমরা এই লেখায় আনবো না।
      সূর্যের ভিতরে কী বিক্রিয়া ঘটে সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে একটু ইতিহাস আলোচনা করে নেওয়া যাক। নিউক্লিয় শক্তি যে তারাদের শক্তির উৎস, এ কথা প্রথম বলেছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন। ১৯২০ সালে তিনি বলেছিলেন যে অপেক্ষাকৃত হালকা নিউক্লিয়াসরা মিলে ভারি নিউক্লিয়াস তৈরি করে এবং একই সঙ্গে কিছুটা ভর শক্তি হিসাবে মুক্ত হয়। এটাই নক্ষত্রদের শক্তির উৎস। জেমস জিনস তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। জিনস বলেন যে নক্ষত্রদের অভ্যন্তরে নিউক্লিয় বিক্রিয়া সম্ভব নয়, কারণ সেখানে যথেষ্ট তাপমাত্রা নেই।
      কথাটা শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও জিনস সেই যুগের বিচারে ভুল বলেননি। নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়ার জন্য উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন কেন? মনে রাখতে হবে গ্যাসের তাপমাত্রা হল তার অণুদের গতিশক্তির প্রকাশ। নিউক্লিয় বলের পাল্লা খুব কম, দুই ফেমটোমিটারের কাছাকাছি। (এক ফেমটোমিটার = 10-15মিটার)  তাই দুই নিউক্লিয়াসকে খুব কাছাকাছি না আনলে তাদের মধ্যে সংযোজন বিক্রিয়া সম্ভব নয়। কিন্তু নিউক্লিয়াসের চার্জ বা আধান ধনাত্মক, তারা পরস্পরকে বিকর্ষণ করে। সেই বিকর্ষণকে অতিক্রম করে দুই নিউক্লিয়াস পরস্পরের কাছে আসতে তখনই পারে যদি তাদের আপেক্ষিক বেগ বা গতিশক্তি খুব বেশি হয়।  ল্যাবরেটরিতে নিউক্লিয় বিক্রিয়া করার জন্য আমরা অ্যাকসিলারেটর বা কণাত্বরক ব্যবহার করে নিউক্লিয়াসদের গতিশক্তি বাড়াই।  গ্যাসের ক্ষেত্রে অধিক গতিশক্তির অর্থ অধিক তাপমাত্রা, তাই নক্ষত্রের অভ্যন্তরে সংযোজন বিক্রিয়া একমাত্র উচ্চ তাপমাত্রাতেই হতে পারে। কিন্তু জিনস দেখালেন যে সেই তাপমাত্রাও সংযোজন বিক্রিয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়।  যেমন সূর্যের কেন্দ্রে আছে আয়নিত হাইড্রোজেন অর্থাৎ প্রোটন। দুটো প্রোটনকে যদি দুই ফেমটোমিটার দূরত্বের মধ্যে আসতে হয়, তাহলে প্রোটনের গতিশক্তি 1 মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট অর্থাৎ দশ লক্ষ ইলেকট্রন ভোল্টের বেশি  হওয়া প্রয়োজন। (1 ইলেকট্রন ভোল্ট = 1.6X10-19 জুল)। সূর্যের কেন্দ্রে তাপমাত্রা হল দেড় কোটি ডিগ্রি কেলভিন, এই তাপমাত্রায় প্রোটনদের গড় শক্তি হল মাত্র 1 কিলো ইলেকট্রন ভোল্ট অর্থাৎ হাজার ইলেকট্রন ভোল্টের কাছাকাছি। তাই জিনস বলেছিলেন যে সূর্যের কেন্দ্রে দুটো প্রোটনের পক্ষে বিক্রিয়া করা সম্ভব নয়।
      এডিংটন অবশ্য জিনসের আপত্তিতে বিচলিত হননি। তাঁর বিখ্যাত বই ‘The Internal Constitution of Stars’-এ তিনি বলেছিলেন, ‘We do not argue with the critic who urges that the stars are not hot enough for this process; we tell him to go and find a hotter place.’ এডিংটন এই কথা লিখেছিলেন ১৯২৬ সালে, তার দু বছরের মধ্যেই নব আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দেখিয়ে দেয় যে জিনসের আপত্তিকে কেমন করে এড়ানো যায়।

      এড়ানো কথাটা আমি সচেতন ভাবে ব্যবহার করেছি। সঙ্গের ছবির দিকে দেখা যাক। এখানে অনুভূমিক অক্ষ বরাবর দুটি প্রোটনের মধ্যে দূরত্ব (R) এবং উল্লম্ব অক্ষ বরাবর তাদের মধ্যে বলের জন্য স্থিতিশক্তির পরিমাপ (Veff) দেখানো হয়েছে। রেখাটা দুইটি প্রোটনের মোট স্থিতিশক্তিকে সূচিত করছে। মনে রাখা প্রয়োজন যে স্থিতিশক্তির মান, বিকর্ষণ বলের জন্য ধনাত্মক ও আকর্ষণ বলের জন্য ঋণাত্মক হয়। দেখা যাচ্ছে যে দুই প্রোটনের মধ্যে দূরত্ব দুই ফেমটোমিটারের কম হলে তারা নিউক্লিয় বলের মারফত পরস্পরকে আকর্ষণ করবে। তখন নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়া সম্ভব। কিন্তু দুই ফেমটোমিটার দূরত্বে আসতে হলে তার গতিশক্তি সর্বোচ্চ স্থিতিশক্তি অর্থাৎ রেখাটার সর্বাধিক উচ্চতার থেকে বেশি হতে হবে। দুটি ধনাত্মক আধানের মধ্যে বিকর্ষণ বল কুলম্বের সূত্র মেনে চলে, তাই এই ধরনের বাধাকে বলে কুলম্ব ব্যারিয়ার। বিজ্ঞানের ভাষায় একটা তুলনা দিয়ে দেখানো যাক। ধরা যাক একটা উঁচু দেয়াল আছে। আমি একটা বল যদি দেয়ালের উল্টোদিকে পাঠাতে চাই, তাহলে দেয়ালের থেকেও বেশি উঁচুতে ছুঁড়তে হবে। আমার যদি সেই শক্তি না থাকে, তাহলে বলকে আমি দেয়ালের উল্টোদিকে পাঠাতে পারব না। জিনসের আপত্তি এইখানে।
      কোয়ান্টাম বলবিদ্যা দেখাল যে গতিশক্তি সর্বোচ্চ স্থিতিশক্তির থেকে বেশি না হলেও দুটো প্রোটনের পক্ষে কাছাকাছি আসা সম্ভব। এই ঘটনাকে বলে টানেলিং। এ যেন বলটা বারবার দেয়ালে ছুঁড়ছি, হঠাৎ করে একবার দেয়াল না টপকে এবং ফুটো না করে হঠাৎ দেয়ালের ওপাশে চলে গেল। আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতার বাইরের এই ধরনের ঘটনার কথা শুনতে খুব অদ্ভুত লাগলেও নানা রকম ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিতে টানেলিংকে নিয়মিত কাজে লাগানো হয়। টানেলিঙের বিশদ অঙ্কে আমরা যাব না, তবে সেই অঙ্ক দেখায় যে সেই সম্ভাবনা খুবই কম। সূর্যের তাপমাত্রায় সেই সম্ভাব্যতার মান মাত্র 10-10। অন্যভাবে বললে, যদি সূর্যের ভিতরে এক হাজার কোটি বার এক জোড়া প্রোটন পরস্পরের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করে, তাহলে একবার মাত্র সফল হবে। আমাদের পৃথিবীর কোনো পরীক্ষাগারে দুই নিউক্লিয়াসের মধ্যে টানেলিঙের মাধ্যমে এই ধরনের বিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা কঠিন, তার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। দুটি প্রোটনের ক্ষেত্রে বিক্রিয়া দেখা আরো শক্ত, সে কথা পরে আলোচনা করব। কিন্তু সূর্যের হাইড্রোজেনের পরিমাণ বিশাল, তাই ঐ রকম ক্ষুদ্র সম্ভাবনা সত্ত্বেও টানেলিং প্রক্রিয়াতেই এক সেকেন্ডে সূর্যের মধ্যে 3.8X1026 জুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হয়। আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র থেকে আমরা বুঝতে পারি যে সূর্যের কেন্দ্রে প্রতি সেকেন্ডে চল্লিশ লক্ষ টনের বেশি ভর শক্তি হিসাবে মুক্ত হচ্ছে। আমাদের বিচারে বিপুল হলেও সূর্যের ভরের তুলনায় তা নগণ্য, তাই সূর্য শত শত কোটি বছর ধরে এইভাবে আলো দিয়েছে ও আরো দেবে।
      এবার আমরা সূর্যের কেন্দ্রে কী কী বিক্রিয়া ঘটে তা আলোচনা করতে পারি। যে বিক্রিয়াগুলি পরপর ঘটে তাদের একসঙ্গে বলা হয় বিক্রিয়া শৃঙ্খল (Chain reaction)। সূর্যে একাধিক এইরকম বিক্রিয়া শৃঙ্খল ঘটে। আমরা তাদের মধ্যে শুধুমাত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, অর্থাৎ প্রথম প্রোটন-প্রোটন শৃঙ্খল (ppI chain)   নিয়ে আলোচনা করব, অন্যগুলি আমাদের আলোচনার বাইরে থাকবে।
      শুধু প্রথম নয়, যে কোনো প্রোটন-প্রোটন শৃঙ্খলই শুরু হয় প্রোটনের সংযোজন বিক্রিয়াতে -- প্রথমে দুটি প্রোটন বা সাধারণ হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস (11H) মিলিত হয়ে তৈরি করে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ ভারি হাইড্রোজেন বা ডয়টেরিয়ামের নিউক্লিয়াস (12H ) – এর  মধ্যে থাকে একটা প্রোটন ও একটা নিউট্রন। (X মৌলের কোনো আইসোটোপকে ZAX, এভাবে লেখা হয়।এখানে Z হল পরমাণু ক্রমাঙ্ক, যা ওই পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটনের সংখ্যার সঙ্গে সমা্‌ এবং A হল ভরসংখ্যা। নিউক্লিয়াসে নিউট্রনের সংখ্যা হল A-Z।) তার সঙ্গে তৈরি হয় পজিট্রন (e+) ও ইলেকট্রন নিউট্রিনো (νe) । সমীকরণের আকারে লিখতে পারি
11H + 11H →12H + e+ + νe
আমরা দেখছি যে সমীকরণের দুপাশে আধান সমান, কারণ প্রোটন ও পজিট্রনের আধান সমান। নিউট্রন ও নিউট্রিনো আধানশূন্য কণা। এই বিক্রিয়ার হার খুব কম। প্রথমত দুটো প্রোটনের মধ্যে বিক্রিয়ার জন্য তাদের কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা কম, উপরন্তু তারা কাছাকাছি এলেই যে সংযোজন বিক্রিয়া হবে তা নয়। আমরা জানি যে চাররকমের বল আছে - স্ট্রং ফোর্স বা পীন বল, তড়িৎচৌম্বক বল, উইক বা ক্ষীণ বল ও মাধ্যাকর্ষণ। নিউক্লিয় বল হল পীন বলের উদাহরণ। উপরের বিক্রিয়াটি কিন্তু পীন বল নয়, উইক ফোর্স বা ক্ষীণ বলের মাধ্যমে ঘটে। নামেই বোঝা যাচ্ছে যে বলটি দুর্বল, তাই দুটি প্রোটনের মধ্যে এই বিক্রিয়াটির হার খুবই কম। এতই কম যে সূর্যের কেন্দ্রে একটি প্রোটনের গড় আয়ু হাজার কোটি বছরের কাছাকাছি। সেই জন্যই সূর্য সাড়ে চারশো কোটি বছরের বেশি সময় ধরে আলো দিচ্ছে এবং আরো চারশো আশি কোটি বছর ধরে দিতে থাকবে।
      পরের বিক্রিয়াগুলি পীন বলের মাধ্যমে ঘটে, তাই তাদের হার অনেক দ্রুত। ডয়টেরিয়ামের নিউক্লিয়াস তৈরি হওয়ার এক সেকেন্ডের মধ্যেই সে অন্য প্রোটনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে।
      11H + 12H →23He
এই বিক্রিয়াতে তৈরি হয় হিলিয়ামের আইসোটোপ 23He, একই সঙ্গে গামা রশ্মি ও 23He-এর গতিশক্তি রূপে শক্তি বেরিয়ে আসে। এর পরের ধাপে দুটি     23He মিলে তৈরি করে হিলিয়ামের সবচেয়ে সুস্থিত আইসোটোপ 24He।
23He + 23He →24He + 211H
এই বিক্রিয়াতেও গতিশক্তি মুক্ত হয়। এই বিক্রিয়ার সময়কাল তিন লক্ষ বছর।
      পরের বিক্রিয়াগুলো যতই দ্রুত হোক না কেন, প্রথম বিক্রিয়ার মাধ্যমে ডয়টেরিয়ামের নিউক্লিয়াস তৈরি না হলে সেগুলো ঘটার উপায় নেই। তাই প্রোটন-প্রোটন শৃঙ্খলের সময়কাল প্রথম বিক্রিয়ার সময়কালের সমান, অর্থাৎ হাজার কোটি বছর। আমরা দেখতে পাচ্ছি যে প্রথম দুটি বিক্রিয়া একবার করে ঘটলে একটি 23He তৈরি হয়। তৃতীয়টিতে দুটি 23He অংশ নেয়, তাই সেটি একবার ঘটার জন্য প্রথম বিক্রিয়াদ্বয় দুবার করে হওয়া প্রয়োজন।সব মিলিয়ে সূর্যের কেন্দ্রে যে পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন হয় তাকে আমরা লিখতে পারি,
411H →24He + 2e+ + 2νe
অর্থাৎ চারটি প্রোটন বা সাধারণ হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস মিলে একটি হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস, দুটি পজিট্রন ও দুটি নিউট্রিনো তৈরি করে। নিউট্রিনোর ভর খুব কম, এতই কম যে তা এখনো মাপা সম্ভব হয়নি। আমাদের হিসাবের জন্য তাকে শূন্য ধরে নিতে পারি। বিক্রিয়ার ডানদিকের মোট ভর বাঁদিকের চারটে প্রোটনের ভর অপেক্ষা কম, এই ভরের পার্থক্যই শক্তিরূপে মুক্ত হয়। পজিট্রন তৈরি হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একটা ইলেকট্রনের সঙ্গে মিলে ধ্বংস হয়ে যায়, দুই কণার মোট ভর গামা রশ্মিতে পরিবর্তিত হয়। এভাবে মোট শক্তি মুক্ত হয় 26.73 মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট। নিউট্রিনোরা বিশেষ বিক্রিয়া করে না, তাই সূর্য তাদের ধরে রাখতে পারে না। দুটি নিউট্রিনো মিলে গড়ে 0.52 মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি নিয়ে বেরিয়ে চলে যায়। হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে রূপান্তরের সময় প্রতিটি বিক্রিয়াতে যে অবশিষ্ট 26.21 মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি পাওয়া যায়, তাই হল সূর্যের শক্তির উৎস।
      সূর্যের অভ্যন্তরে নিউক্লিয় বিক্রিয়া কিন্তু হিলিয়াম তৈরির পরে আর এগোতে পারে না। হিলিয়াম ও প্রোটন মিলে কোনো নতুন মৌলের নিউক্লিয়াস তৈরি হয় না কারণ সেই রকম কোনো নিউক্লিয়াসের অস্তিত্বই থাকা সম্ভব নয়।  হিলিয়ামের নিউক্লিয়াসদের মধ্যে বিক্রিয়ার জন্য যে তাপমাত্রা ও ঘনত্ব লাগে, তা সূর্যের কেন্দ্রে এখন নেই। তাই 24He হল প্রোটন-প্রোটন শৃঙ্খলের অন্তিম পরিণতি। এই বিক্রিয়া শৃঙ্খল সূর্যের অভ্যন্তরে নিরন্তর হয়ে চলেছে এবং হাইড্রোজেন হিলিয়ামে পরিবর্তিত হচ্ছে। সূর্য যে মেঘ থেকে জন্ম নিয়েছিল, তার ভরের 71% ছিল হাইড্রোজেন এবং 27% ছিল হিলিয়াম। এখন  সূর্যের কেন্দ্রের অংশে হিলিয়ামের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে 64% এবং হাইড্রোজেনের পরিমাণ কমে হয়েছে 34%।
      এভাবে চলতে চলতে চারশো আশি কোটি বছর পরে সূর্যের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন শেষ হয়ে যাবে। যে সব তারকা তাদের কেন্দ্রে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি করে, তাদের বলে মূল অনুক্রমের তারকা। হাইড্রোজেন শেষ হলে সূর্য মূল অনুক্রম ত্যাগ করবে। তখন অতি দ্রুত অর্থাৎ ষাট কোটি বছরেরও কম সময়ে সে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাবে। হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের বিক্রিয়ার মাধ্যমে কেন্দ্রে তৈরি হবে কার্বন ও অক্সিজেন। একই সঙ্গে তার বাইরের অংশ বিরাট বড় হয়ে বুধ, শুক্র এবং সম্ভবত পৃথিবীকেও গ্রাস করে নেবে। তারকার এই অবস্থাকে বলে লাল দানব (Red giant)। সূর্যের শেষ পরিণতি শ্বেত বামন নক্ষত্র। সূর্যের থেকে অনেক বেশি তারকাদের পরিণতি আবার ভিন্ন। তারকাদের অন্তিমকালের বিভিন্ন ধাপগুলি খুবই আকর্ষণীয়, কিন্তু তাদের নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই লেখা অতি দীর্ঘ হয়ে যাবে। 
      আমরা যে আলোচনা করলাম তা সাধারণ ভাবে সঠিক হলেও এখনো পর্যন্ত সূর্য সম্পর্কে আমরা সমস্ত কিছু যে বুঝতে পেরেছি তা নয়। তাই সূর্য আজও বিজ্ঞানীদের গবেষণার বস্তু। সূর্যের থেকে ভারি তারাদের সম্বন্ধে কয়েকটা কথা সংক্ষেপে বলে আমাদের আলোচনা শেষ করা যাক। প্রথম শৃঙ্খল ছাড়াও আরো দুটি প্রোটন প্রোটন শৃঙ্খল আছে যারা এই আলোচনায় এলো না। নক্ষত্রের কেন্দ্রের তাপমাত্রা এক কোটি আশি লক্ষ কেলভিন পেরিয়ে গেলে সেই দুটিই শক্তি উৎপাদনের প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়।আগেই বলেছি সূর্যের কেন্দ্রের তাপমাত্রা দেড় কোটি কেলভিন, তাই প্রথম শৃঙ্খলটিই সূর্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষাকৃত ভারি তারাদের কেন্দ্রের তাপমাত্রা বেশি হয়। মূল অনুক্রমের তারারা সবাই যে প্রোটন প্রোটন শৃঙ্খলের সাহায্যেই হিলিয়াম সৃষ্টি করে তা নয়। সূর্যের থেকে অপেক্ষাকৃত ভারি তারাদের মধ্যে কার্বন-নাইট্রোজেন-অক্সিজেন চক্র বা সিএনও চক্র হাইড্রোজেনকে হিলিয়ামে পরিবর্তিত করে। এই চক্রে কার্বন ইত্যাদি মৌলগুলি অনুঘটকের কাজ করে অর্থাৎ তারা বিক্রিয়াতে অংশ নিলেও শেষপর্যন্ত তাদের কোনো পরিবর্তন হয় না। এই চক্র প্রোটন প্রোটন শৃঙ্খলের থেকে অনেক দ্রুত কাজ করে। তাই যে সমস্ত নক্ষত্রের ভিতরে এই চক্র চলে তারা অনেক বেশি উজ্জ্বল, আবার তাদের আয়ুও অনেক কম। যেমন সূর্যের থেকে পঁচিশ গুণ ভরের কোনো তারা মাত্র ষাট লক্ষ বছর মূল অনুক্রম পর্যায়ে থাকে -- পক্ষান্তরে আমাদের সূর্য সেই পর্যায়ে কাটাবে প্রায় হাজার কোটি বছর। আমাদের সূর্যের ভিতরে সিএনও চক্র হয় না, কারণ তার জন্য কেন্দ্রের তাপমাত্রা অন্তত দু কোটি কেলভিন হওয়া প্রয়োজন। মূল অনুক্রম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে নক্ষত্রদের ভিতরে আরো নানা বিক্রিয়ার মাধ্যমে হিলিয়ামের থেকে ভারি মৌল তৈরি হতে পারে, কিন্তু তা পৃথক নিবন্ধের বিষয়।


প্রকাশ ঃ আকাশগঙ্গা ত্রৈমাসিক বিজ্ঞান পত্রিকা জানুয়ারি ২০১৯ 




Sunday, 13 January 2019

জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণা


জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণা

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

      “জার্মান, ফরাসি, ইংরেজ, ইতালি প্রভৃতি বুধমন্ডলী-মণ্ডিত মহারাজধানীতে তুমি কোথায় বঙ্গভূমি? কে তোমার অস্তিত্ব ঘোষণা করে? সে বহু গৌরবর্ণ প্রতিভামণ্ডলীর মধ্য হতে এক যুবা যশস্বী বীর বঙ্গভূমির, আমাদের মাতৃভূমির নাম ঘোষণা করলেন, সে বীর জগৎ প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক, ডঃ জে সি বোস। একা, যুবা বাঙ্গালি বৈদ্যুতিক, আজ বিদ্যুতবেগে পাশ্চাত্যমন্ডলীকে নিজের প্রতিভা মহিমায় মুগ্ধ করলেন ... সমগ্র বৈদ্যুতিকমন্ডলীর শীর্ষস্থানীয় আজ জগদীশ চন্দ্র বসু, ভারতবাসী, বঙ্গবাসী। ধন্য বীর।“
      ১৯০০ সালে প্যারী বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, তিনি এভাবেই জগদীশচন্দ্রের বন্দনায় মুখর হয়েছিলেন। প্যারীর বিজ্ঞান প্রদর্শনী যে শতকের অন্তিম লগ্নকে চিহ্নিত করেছিল সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের সমাজে শিক্ষাতে সাহিত্যে ধর্মে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। আজ তাকে আমরা নবজাগরণ বা রেনেসাঁ বলে চিহ্নিত করি। সেই যুগের সমস্ত পুরোধাদের কথা স্মরণে রেখেও জগদীশচন্দ্রের কথা আলাদা করে বলতে হয়, কারণ আধুনিক বিজ্ঞানে তিনি আমাদের দেশে অগ্রপথিক। বিজ্ঞানের, বিশেষ করে মৌল বিজ্ঞানের, একটা আন্তর্জাতিক চরিত্র আছে। বিজ্ঞানীকে নিজের দেশকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, তাঁর প্রতিযোগিতা হয় সারা বিশ্বের সমস্ত বিজ্ঞানীর সঙ্গে। সেখানে জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে সমসাময়িক  বিজ্ঞানীদের তুলনায় কী অবস্থায় ছিলেন সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক। 
জগদীশচন্দ্র বসু ( নভেম্বর ৩০, ১৮৫৮ - নভেম্বর ২৩, ১৯৩৭)

      বিজ্ঞান চর্চার একটা প্রাথমিক শর্ত হল সমাজে বিজ্ঞানের ঐতিহ্য। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে জগদীশচন্দ্রের সে সৌভাগ্য ছিল না কারণ তিনি যখন কাজ শুরু করছেন, তার থেকে হাজার বছরেরও বেশি আগে ভারতে মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চা প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই কানাগলিতে ঢুকে পড়েছিল।  প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস আমাদের সবারই জানা; চরক, সুশ্রুত, আর্যভট্ট, ভাস্করাচার্য, শ্রীধরাচার্যদের নাম প্রাচীন যুগের বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। কিন্তু তারপরেই আসে এক অন্ধকার যুগ। এই নিবন্ধে তার কারণ বিশ্লেষণ করার অবকাশ নেই, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর হিন্দু রসায়নের ইতিহাস গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে শঙ্করের মায়াবাদ ও জাতব্যবস্থাই ভারতের বিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেছে। এমনকি ইসলামের অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আরবে মৌলিক বিজ্ঞানের যে চর্চা শুরু হয়েছিল, আমাদের দেশে তার বিশেষ কোনো প্রভাব পড়েনি। ফলে আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চার কোনো পরম্পরাই ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবশিষ্ট ছিল না। ভারতের সমাজে গুরুবাক্যের প্রতি যে প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখানোই রীতি, তা কখনোই বিজ্ঞান চর্চার পাথেয় হতে পারে না। বিজ্ঞানের অগ্রগতি একমাত্র পুরাতনকে প্রশ্ন করা ও সম্ভব হলে তাকে ভুল প্রমাণ করার মাধ্যমেই সম্ভব। তাই যে সমাজে জগদীশচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল, সেখানে বিজ্ঞান চর্চার পথ প্রশস্ত ছিল না।
      শুধু যে ভারতীয় সমাজ বিজ্ঞানচর্চার পক্ষে বাধাস্বরূপ ছিল তা নয়, পরাধীন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসকরাও বহুদিন পর্যন্ত তাঁর অনুকূল ছিলেন না। দেশে কোনো বিজ্ঞান চর্চার উপযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল না। সরকারি অর্থসাহায্য দূরে থাক, পদে পদে ছিল বিধিনিষেধ। ভারতীয়দের প্রাপ্য ছিল তাচ্ছিল্য আর অবহেলা। প্রেসিডেন্সি কলেজে  একই চাকরিতে জগদীশচন্দ্রের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল সাহেব অধ্যাপকদের অর্ধেক মাইনে, তিনি তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। তিন বছর বিনা বেতনে চাকরি করার পরে ব্রিটিশ সরকার তাঁর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। একটা পুরানো বাথরুমকে সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করেছিলেন, কলেজে এইটুকু জায়গাই জুটেছিল তাঁর পরীক্ষাগারের জন্য। ক্লাস এমনভাবে দেওয়া হত যাতে তাঁর গবেষণাতে ব্যাঘাত পড়ে। তাঁর শিক্ষক ও বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক লর্ড র‍্যালেকে তিনি এক রবিবার তাঁর ল্যাবরেটরি দেখিয়েছিলেন বলে তাকে কলেজ কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর চিঠি ধরায় – কেন তিনি ছুটির দিনে এক বহিরাগতকে কলেজে ঢুকতে দিয়েছেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের প্রতিযোগিতা সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে, কিন্তু তাঁরা প্রায় কেউই এই ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হননি। সরকারের আনুকূল্য তাঁদের সঙ্গে ছিল। জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণাকে এই পটভূমিতে দেখলে আমাদের মনে হবে নবজাগরণের প্রাণপুরুষদের মধ্যেও তিনি অনন্য।
      খুব সংক্ষেপে জগদীশচন্দ্রের জীবনীর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। ভগবানচন্দ্র বসু ও বামাসুন্দরী দেবীর পুত্র জগদীশচন্দ্রের জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহে। বাবা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বাবা ও মায়ের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মহত্ত্ব ছেলের মনে প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর শৈশব কেটেছিল বাবার কর্মস্থল ফরিদপুরে। দশ বছর বয়েসে কলকাতায় এসে প্রথমে হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল এবং সেখান থেকে স্নাতকস্তরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। ডাক্তারি পড়া জন্য ইংল্যান্ড যাত্রা করেছিলেন জগদীশ, কিন্তু শারীরিক কারণে ডাক্তারি ছেড়ে পদার্থবিদ্যা পড়া শুরু করেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ট্রাইপস’ এবং একই সঙ্গে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ানো শুরু করেন। কলেজের অধ্যক্ষ বা শিক্ষাদপ্তরের অধিকর্তা কেউই খুব উৎসাহী ছিলেন না, কিন্তু তখনকার ভাইসরয় লর্ড রিপনের হস্তক্ষেপে তাঁর যোগদানে বাধা কাটে।
      শুধুমাত্র শিক্ষাদান করে জগদীশচন্দ্র সন্তুষ্ট ছিলেন না। যে বয়সে সাধারণত অন্যান্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী শক্তির ক্ষয় শুরু হয়, সেই মধ্যতিরিশে জগদীশচন্দ্র সিদ্ধান্ত করলে যে বাকি জীবন তিনি বিজ্ঞান গবেষণাতে নিয়োজিত করবেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ভিতরে সামান্য পরিসরে সরকারি সাহায্য ছাড়াই যে গবেষণা শুরু করেছিলেন, তা তাঁকে বিজ্ঞানী মহলে খ্যাতি এনে দেয়। ১৮৯৬ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি দেয়। ১৯২০ সালে ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হয়েছিলেন। জাতিসঙ্ঘ বা লিগ অফ নেশনসের ইন্টারন্যাশনাল ইন্টালেকচুয়াল কোঅপারেশন কমিটির সদস্য হয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র।  ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বসু বিজ্ঞান মন্দির। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তিনি জগদীশচন্দ্রকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু ঘটে।
      জগদীশচন্দ্র গবেষণা শুরু করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে, ক্রমে তাঁর আগ্রহ উদ্ভিদের শারীরবিদ্যার প্রতি গিয়েছিল। উদ্ভিদ গবেষণাতে পদার্থবিজ্ঞানীর যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেছিলেন জগদীশচন্দ্র। সে জন্য সে সময় প্রতিষ্ঠিত উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা তাঁর সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু আজ আমরা তাঁকে জীবপদার্থবিদ্যা বা বায়োফিজিক্সের একেবারে প্রথম যুগের অগ্রপথিক বলে চিহ্নিত করতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা হল যে তাঁর প্রয়োজনের সমস্ত যন্ত্রপাতি তাঁর নির্দেশমতো এদেশের স্বল্পশিক্ষিত কারিগররাই বানাতেন। তিনি পাট, গন্ধক ইত্যাদি সাধারণ বস্তু ব্যবহার করে রেডিয়োতরঙ্গের নানা ধর্ম প্রমাণ করেছিলেন। সম্পূর্ণ নিজের আর্থিক সঙ্গতির উপর নির্ভর করে বিদেশের গবেষণাগারের তুল্য যন্ত্র নির্মাণ করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে মেধার কোনো বিকল্প হয় না। তরুণ গবেষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘সর্বদা শুনিতে পাওয়া যায় যে, আমাদের দেশে যথোচিত উপকরণবিশিষ্ট পরীক্ষাগারের অভাবে অনুসন্ধান অসম্ভব। এ কথা যদিও অনেক পরিমাণে সত্য, কিন্তু ইহা সম্পূর্ণ সত্য নহে। ... আমাদের অনেক অসুবিধা আছে, অনেক প্রতিবন্ধক আছে সত্য, কিন্তু পরের ঐশ্বর্যে আমাদের ঈর্ষা করিয়া কি লাভ? অবসাদ ঘুচাও। দুর্বলতা পরিত্যাগ কর। মনে কর, আমরা যে অবস্থাতে পড়ি না কেন সে-ই আমাদের প্রকৃষ্ট অবস্থা। ভারতই আমাদের কর্মভূমি, এখানেই আমাদের কর্তব্য সমাধা করিতে হইবে।”    
      শুধুমাত্র উদ্ভিদবিজ্ঞানে পদার্থবিদ্যার পদ্ধতির প্রয়োগ নয়, বহু ক্ষেত্রেই জগদীশচন্দ্র ছিলেন তাঁর সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের থেকে অনেকটা অগ্রসর।  ১৯৭৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন নেভিল মট, তাঁর মতে জগদীশচন্দ্র তাঁর সময়ের থেকে অন্তত ষাট বছর এগিয়ে ছিলেন। তিনি আরো বলেছেন যে পি বা এন শ্রেণির অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর হল আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের প্রাণ, জগদীশচন্দ্রের গবেষণাতেই প্রথম তাদের ধারণা পাওয়া যায়।
      জগদীশচন্দ্র গবেষণা শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ বিষয়ে, তিনি বিজ্ঞানী অলিভার লজের লেখা ‘হাইনরিখ হার্জ এন্ড হিজ সাকসেসরস’ বইটি পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। হার্জ ছিলেন এ বিষয়ে  সে যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মাইকেল ফ্যারাডে দেখান যে তড়িৎ ও চুম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক আছে। ডায়নামোর সৃষ্টির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়েছিল বলে ফ্যারাডের গবেষণাগারকে আধুনিক সভ্যতার আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হয় না। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখান যে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত আছে এক তরঙ্গ। আলো একধরনের তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। এরপর ১৮৮৬ সালে হার্জ নিজের ল্যাবরেটরিতে রেডিয়োতরঙ্গ সৃষ্টি করতে ও ধরতে সক্ষম হন।
      জগদীশচন্দ্র এই রেডিয়োতরঙ্গ বিষয়েই কাজ শুরু করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি প্রথম রেডিয়োতরঙ্গ তৈরি করতে এবং তা ধরতে সক্ষম হন। রেডিয়ো আবিষ্কারক হিসাবে যাঁদের নাম আসে, তাঁদের একজন, মার্কনি ১৮৯৭ সালে প্রথমবার প্রকাশ্যে পরীক্ষা করে দেখান। অপরজন হলেন রাশিয়ার আলেকজান্ডার পোপভ, তিনিও ১৮৯৫ সালের আগে কাজটা করে উঠতে পারেন নি। কিন্তু জগদীশচন্দ্র বেতার সম্প্রচার নয়, মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণাতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি তাঁর এই সংক্রান্ত গবেষণার কোনো পেটেন্ট নেননি। তার সুযোগ নিয়েছিলেন মার্কনি, যাঁদের মতো গবেষকদের বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক জে ডি বার্নাল বলেছেন ‘শৌখিন সুযোগসন্ধানী বিজ্ঞানকর্মী’।
      পেটেন্ট না নেওয়ার ক্ষেত্রে জগদীশচন্দ্রের চিন্তাধারা খুবই সুস্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন আবিষ্কারই মুখ্য, আবিষ্কারক গৌণ। তাঁর আবিষ্কারের ব্যবসায়িক ব্যবহারের এক প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘বন্ধু, তুমি যদি এদেশের টাকার উপর মায়া দেখিতে—টাকা—টাকা কি. ভয়ানক সর্বগ্রাসী লোভ। আমি যদি এই যাঁতাকলে একবার পড়ি, তাহা হইলে উদ্ধার নাই। দেখ, আমি যে কাজ লইয়া আছি, তাহা বাণিজ্যিক লাভালাভের উপায় মনে করি না। আমার জীবনের দিন কমিয়া আসিতেছে, আমার যাহা বলিবার তাহার সময় পাই না ...’।  ব্যক্তি জগদীশচন্দ্রের ক্ষেত্রে এই মনোভাব নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু হয়তো এর ফল আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের অনুকূল হয়নি। একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে বিজ্ঞানের জগতে তাঁর নিজের অবদান প্রতিষ্ঠার পক্ষে অন্তরক হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর এই মনোবৃত্তি।
      জগদীশচন্দ্র যে রেডিয়োতরঙ্গ তৈরি করেছিলেন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছিল এক থেকে পাঁচ মিলিমিটার। তাঁর তৈরি গ্রাহকযন্ত্রের নাম তিনি দিয়েছিলেন কৃত্রিম অক্ষিপট বা আর্টিফিসিয়াল রেটিনা।  তিনিই প্রথম মিলিমিটার তরঙ্গ তৈরি করেছিলেন যা আজকাল কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগে ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ব্যবহার হয়। এই তরঙ্গের প্রতিফলন, প্রতিসরণ, অপবর্তন, সমবর্তন ইত্যাদি ধর্ম প্রমাণ করার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি দেয়। বেতারযন্ত্রে গ্রাহককে বলা হয় কোহেরার। মার্কনি যে কোহেরার ব্যবহার করেন, আধুনিক ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে তা জগদীশচন্দ্রের ডিজাইন মেনে তৈরি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে রেডিয়ো আবিষ্কারক হিসাবে কোনো একজনকে চিহ্নিত করাটা অনৈতিহাসিক, অনেক বিজ্ঞানীই স্বাধীনভাবে এই বিষয়টিতে অবদান রেখেছেন।
      জগদীশচন্দ্রের সমর্থনে ভগিনী নিবেদিতার প্রয়াস সুবিদিত, তাঁর মাধ্যমেই জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের মার্কিন শিষ্যা সারা বুলের সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের যোগাযোগ হয়েছিল। বিবেকানন্দের চেষ্টায় সারা বুল জগদীশচন্দ্রের হয়ে তাঁর এই কৃত্রিম অক্ষিপটের পেটেন্ট নিয়েছিলেন। এটি হল গ্যালেনা বা লেড সালফাইড নামক অর্ধপরিবাহী নির্মিত গ্রাহকযন্ত্র। জগদীশচন্দ্রই প্রথম অর্ধপরিবাহীকে এই কাজে ব্যবহার করেন। আধুনিক যুগে আলোর গ্রাহক হিসাবে অর্ধপরিবাহী নির্মিত ফটোডায়োডের ব্যবহার হয়, গ্যালেনাও সেই কাজে সক্ষম। এই বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়েই তিনি এন ও পি এই দুই শ্রেণির অর্ধপরিবাহীর সম্মুখীন হন এবং দেখেন যে এই দুই ধরনের অর্ধপরিবাহী দিয়ে তৈরি যন্ত্র তড়িৎপ্রবাহের সুপরিচিত ওহমের সূত্র মেনে চলে না। এই কাজের মধ্যে ভবিষ্যতের ডায়োডের ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু জগদীশচন্দ্রসহ কোনো বিজ্ঞানীই সে কথা সে যুগে বুঝতে পারেননি। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সেই স্তরে তা সম্ভবও ছিল না। তাঁর এই গবেষণা পরবর্তীকালে সলিড স্টেট ফিজিক্স বা কঠিন পদার্থের বিজ্ঞানের সূচনাতে কিছুটা সাহায্য করেছিল।  
      জগদীশচন্দ্র তাঁর অর্ধপরিবাহী গবেষণার তাৎপর্য যে বুঝতে পারেননি, তা তাঁর কথা থেকেই স্পষ্ট। ১৯০১ সালে তিনি যখন গ্যালেনা নির্মিত গ্রাহকযন্ত্রের কথা আলোচনা করছেন, তখন তিনি মূলত তা ব্যবহার করে বিদ্যুতের প্রভাবে জড় ও জীবের প্রতিক্রিয়ার উপর জোর দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সংক্ষেপে তাঁর পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার আলোচনা সমাপ্ত করা যাক। তিনি দুটি প্রিজম ব্যবহার করে রেডিয়ো তরঙ্গের তীব্রতা পরিবর্তনের যে পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, তা ১৯৯৫ সালে আরিজোনার রেডিও মানমন্দিরে কাজা লাগানো হয়। রেডিয়ো তরঙ্গের জন্য প্রথম ওয়েভগাইড বা তরঙ্গচালক তাঁর সৃষ্টি। মাইক্রোওয়েভ বা মিলিমিটার ওয়েভে বহুলব্যবহৃত শিঙার মতো আকৃতির হর্ন অ্যন্টেনা তিনি তৈরি করেছিলেন। তিনি প্রথম সূর্য থেকে রেডিয়োতরঙ্গের কথা বলেন এবং অনুমান করেন যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাকে শোষণ করে নেয়। ১৮৯৭ সালের তাঁর সেই কথা প্রমাণ হতে সময় লেগেছিল আরো অর্ধেক শতাব্দী।
      জগদীশচন্দ্রের সাফল্য আলোচনার সঙ্গে সঙ্গেই বলতে হবে যে পদার্থবিজ্ঞানে ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কারের সঙ্গে  যে নবযুগের সূচনা ঘটেছিল এবং কোয়ান্টম তত্ত্ব ও আপেক্ষিকতা তত্ত্ব যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, জগদীশচন্দ্র সে বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। তিনি তখন গবেষণার নতুন ক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর ছাত্র বিখ্যাত রসায়নবিজ্ঞানী জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মন্তব্য দিয়ে আলোচনার এই পর্যায়ের যবনিকা ফেলা যাক। ‘A physicist cannot help regretting that Bose should have left this promising and then unexplored region of physical investigations—in which he could have been a pioneer—for physics-physiological investigations, where his appearance was resented by the orthodox physiologists and his work was much hampered by their opposition.’
      জগদীশচন্দ্রের গবেষণার কালকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমভাগ ১৮৯৫ সাল থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত যখন তিনি বেতারতরঙ্গ বিষয়ে কাজ করেছেন। ১৮৯৯ সাল থেকে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা দিক পরিবর্তন করতে থাকে। গ্রাহক যন্ত্র নির্মাণের সময় তিনি দেখেন যে কিছু কিছু পদার্থ বারবার ব্যবহার করলে তাদের প্রতিক্রিয়া ক্রমশ শ্লথ হতে থাকে, কিন্তু সময় দিলে তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। তাঁর সামনে সুযোগ এসেছিল কঠিন পদার্থের বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার, কিন্তু জগদীশচন্দ্রের  প্রতিভা বেছে নিয়েছিল অন্য পথ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে আসে জীবের প্রতিক্রিয়া ও ক্লান্তির কথা। তিনি পরীক্ষা করে দেখান যে জড় ও জীবের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে খুব স্পষ্ট সাদৃশ্য আছে। এর থেকে তিনি ভাবতে শুরু করেন যে জড় ও জীবের মধ্যে একটা ঐক্য আছে। উপনিষদের মধ্যে তিনি তাঁর মতের সমর্থন খুঁজে পান। এই অত্যন্ত বিতর্কিত প্রসঙ্গে আলোচনা এই প্রবন্ধের পরিসরে করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি  প্রাচীন শাস্ত্রে তাঁর মতের সমর্থন খুঁজে নিতেই পারেন, কিন্তু অন্য বিজ্ঞানীদের কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমের বিজ্ঞান জগতে, তাঁর এই ধরনের চিন্তা অনেকটাই অবৈজ্ঞানিক মনে হয়েছিল। জগদীশচন্দ্র এই নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন, কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনে হয়েছিল তিনি নিজের মতের সমর্থন করতে গিয়ে সেই পরীক্ষার ফলকেও ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছেন যা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একেবারেই অনভিপ্রেত।  একই সঙ্গে তিনি সেই সময় পা রাখছেন বিজ্ঞানের এক নতুন জগতে, উদ্ভিদবিজ্ঞানে, যে বিষয়ে তাঁর কোনো প্রথাগত শিক্ষা নেই। পদার্থবিদ্যা থেকে আহরিত তাঁর পদ্ধতি সে যুগের প্রতিষ্ঠিত উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে অবোধ্য ঠেকেছিল। এই দুইয়ের যুগপৎ ফল হল এই যে উদ্ভিদের শারীরবিদ্যা বিষয়ে তাঁর পরবর্তী গবেষণা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিজ্ঞানজগতে অনেকটাই অবহেলিত হয়ে পড়ে। ফলে সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ পথিক রয়ে গেছেন। ১৯০২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বিতীয় বহুবিতর্কিত পর্বে তিনি জড় ও জীবের ঐক্য সন্ধান করেছেন। তৃতীয় পর্ব শুরু হয়েছিল ১৯০২ সালে যখন তিনি উদ্ভিদের শারীরবিদ্যাতে মনোনিবেশ করেছেন। প্রবন্ধ শেষের আগে আমরা খুব সংক্ষেপে এই তৃতীয় ভাগের দিকে চোখ রাখি।
      একটা কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন। সাধারণভাবে শোনা যায় জগদীশচন্দ্র গাছের প্রাণ আছে একথা আবিষ্কার করেন। কথাটা সর্বৈব ভুল। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ উদ্ভিদের প্রাণের কথা জানে। জগদীশচন্দ্র দেখান যে বাইরে থেকে বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনার প্রয়োগ করলে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাড়া একই রকম হয়। এই অতি সাধারণ কথাটা এখানে বলতে হল, কারণ পাঠ্য পুস্তক থেকে শুরু করে বহু জায়গায় এই ভ্রান্তি চোখে পড়ে।
      উদ্ভিদের শারীরবিদ্যা সংক্রান্ত জগদীশচন্দ্রের গবেষণার প্রথমেই বলতে হয় তাঁর তৈরি নানা অত্যন্ত সুবেদী যন্ত্রের কথা যার সাহায্যে তিনি উদ্ভিদের নড়াচড়াকে কোটিগুণ পর্যন্ত বিবর্ধিত করে দেখিয়েছেন। এসের অদ্যে রয়েছে ক্রেস্কোগ্রাফ, রেসোন্যান্ট রেকর্ডার, প্লান্ট ফাইটোগ্রাফ, ফটোসিন্থেটিক রেকর্ডার, ইত্যাদি যন্ত্র। এই সমস্ত যন্ত্রের সাহায্যে তিনি দেখালেন যে আপাতদৃষ্টিতে যে উদ্ভিদ নড়াচড়াতে সক্ষম নয়, তারাও লজ্জাবতী লতা বা বনচাঁড়াল উদ্ভিদের মতোই সাড়া দেয়, শুধুমাত্র তাদের সাড়া অনেক মৃদু। বিষ প্রয়োগে তাদের মৃত্যুযন্ত্রণা প্রাণীরই অনুরূপ। তিনি দেখান যে উদ্ভিদের এ ধরনের সাড়া বিদ্যুৎনির্ভর। বাইরে থেকে প্রয়োগ করা উত্তেজনার প্রভাবে উদ্ভিদের দেহে বিদ্যুৎপ্রবাহ নিয়ে তিনি কাজ করেন। কোশের মধ্যে তড়িৎদ্বার প্রবেশ করিয়ে তিনি দেখান যে ফ্লোয়েম ও প্রোটোজাইলেম কলার মধ্য দিয়ে এই প্রবাহ হয়। সে সময় তাঁর এই মত প্রায় কেউ স্বীকার না করলেও পরবর্তীকালে উদ্ভিদের শরীরে তড়িৎ মাধ্যমে সঙ্কেত বহন ও তার পর্যায়ক্রমিক আচরণের মাধ্যমে জৈব ছন্দের সমর্থনে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। উদ্ভিদের বৃদ্ধির উপর আলো, তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ, রেডিয়োতরঙ্গ ইত্যাদির প্রভাব তিনি নিরূপণ করেন। তিনি বলেন যে উদ্ভিদের কোশ ব্যাটারি বা তড়িৎচালক কোশের মতোই শক্তি সঞ্চয় করে রাখে। আলোকের বিকিরণের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শক্তি কোশে জমা থাকে ও বৃদ্ধি ইত্যাদি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতে কাজে লাগে।
      সালোক সংশ্লেষের সময় বেরোনো অক্সিজেনের মাত্রা তিনি মেপেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন যে এই প্রক্রিয়ায় কিছু উদ্ভিদ ম্যালিক অ্যাসিড তৈরি করে। উদ্ভিদের মূল থেকে পাতায় জল যাওয়ার পদ্ধতির নাম রসের ঊর্ধ্বগমন। সাধারণভাবে মনে করা হয় যে এর জন্য দায়ী, শিকড়ের চাপ, জাইলেম কলার কৈশিকতা এবং গাছের পাতার প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট টান অর্থাৎ একেবারেই ভৌত প্রক্রিয়া।। জগদীশচন্দ্র সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে এই জলশোষণ উদ্ভিদ কোশের স্বাভাবিক ধর্ম। সে সময় অবশ্য তাঁর মতকে অবহেলা করা হয়েছিল। কিন্তু এক শতাব্দী পরেও যে রসের ঊর্ধ্বগমন প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তার থেকে বোঝা যায় যে উদ্ভিদবিজ্ঞানে শিক্ষিত না হয়েও তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানে তাঁর আরো নানা উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে, কিন্তু স্থানাভাবে তা নিয়ে আলোচনা করা গেল না।
      জগদীশচন্দ্র তাঁর গবেষণার কথা সাধারণের জন্য বাঙলায় লিখে প্রকাশ করতেন, সেই যুগে এটা খুব কম কথা ছিল না। এর জন্য তাঁকে বিজ্ঞান সংক্রান্ত পরিভাষা সৃষ্টি করতে হয়েছিল।  রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ও নিবেদিতা তাঁর গবেষণাতে আগ্রহী হয়েছিলেন। পরাধীন ভারতে বিশেষ করে শিক্ষিত বাঙালীদের মধ্যে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা বিষয়ে একটা কৌতূহল জেগেছিল। জগদীশচন্দ্রের সাফল্য ছিল ভারতীয়দের ক্ষমতা সম্পর্কে ইংরেজদের তাচ্ছিল্যের মনোভাবের সমুচিত প্রত্যুত্তর। জগদীশচন্দ্র নিজেও নবজাগ্রত জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকেই তাঁর গবেষণার প্রেরণা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
        জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণা বিষয়ে ইতি টানার আগে একটা কথা বলা প্রয়োজন। তাঁর গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যোগ্য উত্তরসূরি আসেনি। তার কারণ আলোচনার জন্য পৃথক নিবন্ধের প্রয়োজন। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে সেই সময় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছিল, যার ফলে ছাত্ররা সেই দিকেই আকৃষ্ট হচ্ছিল। প্রফুল্লচন্দ্র বা রমন কলকাতাতে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে যে ধরনের পরম্পরা বা স্কুল তৈরি করেছিলেন, নিজের গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও জগদীশচন্দ্রের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। জীববিজ্ঞানের সীমাহীন সম্ভাবনার কথা আমরা আজ বলে থাকি, কিন্তু সে যুগে তার কথা কারো মাথায় আসেনি। ফলে সারা জীবনই জগদীশচন্দ্র নিঃসঙ্গ পথিক রয়ে গেলেন।

প্রকাশঃ জাগ্রত বিবেক নভেম্বর ২০১৮