Monday, 13 November 2023

শতবর্ষে অধ্যাপক সমরেন্দ্রনাথ ঘোষাল

 

শতবর্ষে অধ্যাপক সমরেন্দ্রনাথ ঘোষাল

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


সারা পৃথিবীতে স্নাতকস্তরের পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী মাত্রেই একটি বিশেষ পরীক্ষার কথা জানতেই হয়, তার নাম ঘোষালের পরীক্ষা। যাঁর নামে এই পরীক্ষা সেই অধ্যাপক সমরেন্দ্রনাথ ঘোষালের এই বছর আমরা জন্মশতবার্ষিকী পালন করছি। এই লেখাতে আমরা অধ্যাপক ঘোষালের জীবন ও কৃতিত্ব সম্পর্কে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করব।

সমরেন্দ্রনাথ ঘোষালের জন্ম বোলপুরের কাছে রায়পুর গ্রামে ১৯২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল থেকে তিনি ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন। ওই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বাংলা ও সংস্কৃতে সর্বোচ্চ নাম্বার পাওয়ার জন্য তিনি দুটি রৌপ্যপদক পেয়েছিলেন। দু'বছর পরে তিনি ইন্টারমিডিয়েট স্তরে বিজ্ঞান নিয়ে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে পাস করেন। এরপরে তিনি কলকাতাতে এসে স্কটিশ চার্চ কলেজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে ভর্তি হন। দু'বছর পরে তিনি বিএসসি পাস করেন, পদার্থবিজ্ঞানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দ্বিতীয় হওয়ার জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোহিনীমোহন রায় রৌপ্য পদক পেয়েছিলেন। এরপর এমএসসি পড়ার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজে ভর্তি হন ও সেখান থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে উত্তীর্ণ হন।



অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে পড়াচ্ছেন। তিনি নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা ও জীবপদার্থবিদ্যা বিষয়ে আধুনিক গবেষণার জন্য বিভাগের অভ্যন্তরেই ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স তৈরি করেছিলেন। তাঁর কনিষ্ঠ সহকর্মী নীরজনাথ দাশগুপুকে তিনি জীবপদার্থবিদ্যা বিষয়ে গবেষণার জন্যভারতের প্রথম ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপ তৈরির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সমরেন্দ্রনাথ মেঘনাদের কাছে গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন, মেঘনাদ তাঁকে নীরজনাথের কাছে গবেষণার জন্য একটি বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। ১৯৪৫ সালের ১ মার্চ সমরেন্দ্রনাথ গবেষণাতে যোগ দেন। তবে সেখানে তিনি বেশিদিন ছিলেন না। সেই বছরই নভেম্বর মাস নাগাদ একটি সরকারি বৃত্তি নিয়ে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলেতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য গিয়েছিলেন।

বার্কলের রেডিয়েশন ল্যাবরেটরি তখন পৃথিবীবিখ্যাত। সেখানে আর্নেস্ট লরেন্স প্রথম সাইক্লোট্রন কণাত্বরক তৈরি করেছিলেন,। সে জন্য তিনি ১৯৩৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। মেহঘনাদ নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যাতে গবেষণার জন্য কলকাতাতে এশিয়ার প্রথম সাইক্লোট্রন তৈরি করবেন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, লরেন্স তাঁকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেন। মেঘনাদের ছাত্র বাসন্তীদুলাল নাগচৌধুরি তার কয়েকবছর আগে লরেন্সের কাছে ডক্টরেট করেন ও সাইক্লোট্রনের যন্ত্রাংশ কিনে কলকাতাতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই কারণে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও বার্কলের রেডিয়েশন ল্যাবরেটরিরি মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই কারণেই সম্ভবত সমরেন্দ্রনাথ গবেষণার জন্য বার্কলেকেই বেছে নিয়েছিলেন। সেখানে এমিলিও সেগ্রের অধীনে তিনি গবেষণা শুরু করেন। বার্কলেতে থাকার সময়ে তিনি দুটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন, দুটিই ফিজিক্যাল রিভিউ গবেষণা পত্রিকাতে একক ভাবেই তিনি লিখেছিলেন। প্রবন্ধ দু'টির শেষে তিনি সেগ্রেকে উৎসাহ ও পরামর্শ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে দ্বিতীয়টিতে তাঁর সেই বিখ্যাত গবেষণাটির কথা তিনি প্রকাশ করেছিলেন।

সেগ্রে পৃথিবীবিখ্যাত বিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মির ছাত্র, তিনি ১৯৫৫ সালে বার্কলের নতুন সাইক্লোট্রনের সাহায্যে অ্যান্টিপ্রোটন আবিষ্কারে এক মুখ্য ভূমিকা নেন, এর জন্য ১৯৫৯ সালে তিনি ও আওয়েন চেম্বারলেন পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। সেগ্রে ছিলেন ইহুদি, হিটলারের প্ররোচনাতে ইতালির ফ্যাসিস্ট সরকার যখন ইহুদিদের উপর নিপীড়নমূলক আইন চালু করেছিল, তখন তিনি ঘটনাচক্রে বার্কলেতেই ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ও সন্তান আমেরিকাতে তাঁর সগে যোগ দেন। সেগ্রের বাবা আত্মগোপন করতে পারলেও তাঁর মা ফ্যাসিস্টদের হাতে নিহত হন।

সমরেন্দ্রনাথ বার্কলেতে যে বিষয়ে গবেষণা করেছিলেন, তার সঙ্গে ফের্মি ও সেগ্রের কাজের ঘনিষ্ট যোগাযোগ আছে। ফের্মি নিউট্রন ব্যবহার করে নিউক্লিয় বিক্রিয়া বিষয়ে গবেষণার জন্য ১৯৩৮ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেই কাজে সেগ্রে তাঁর সহযোগী ছিলেন। সেই গবেষণাকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখযা করার জন্য বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিল্‌স বোর কম্পাউন্ড যৌগ নিউক্লিয়াসের মডেলের কথা বলেছিলেন। সমরেন্দ্রনাথের গবেষণা বোরেরে সেই মডেলের পক্ষে পরীক্ষামূলক প্রমাণ দেয়। আজও আমরা নিউক্লিয় বিজ্ঞানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বোরের সেই মদেল ব্যবহার করি। সংক্ষেপে আমরা সেই মডেল সম্পর্কে জেনে নেব।

নিউক্লিয় বিক্রিয়াতে দুটি নিউক্লিয়াসকে পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে একটি কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে বেশ কিছুটা অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চারিত হয়। বোর বলেছিলেন যে এই কম্পাউণ্ড নিউক্লিয়াসটি এতক্ষণ স্থায়ী হয় যে তার ভিতরের কণাগুলির মধ্যে সমস্ত অতিরিক্ত শক্তিটা পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যার নিয়ম মেনে ভাগ হয়ে যায়। অবশ্য এই কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস চিরস্থায়ী নয়, কারণ এর শক্তি সাধারণ অবস্থা থেকে বেশি। তাই প্রোটন, নিউট্রন, আলফা কণা ইত্যাদি ত্যাগ করে এই নিউক্লিয়াস শক্তি কমায়। (আলফা কণা হল হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস, এর মধ্যে আছে দুটি প্রোটন ও দুটি নিউট্রন।) বোর বলেছিলেন যে কণাদের মধ্যে শক্তিটা যেহেতু পরিসংখ্যানগত বলবিদ্যার অনুসারে ভাগ হয়ে যায়, সেই জন্য এই কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস থেকে প্রোটন নিউট্রন ইত্যাদি বেরোনোর সম্ভাবনা নিউক্লিয়াসটা কিভাবে তৈরি হয়েছে তার উপর নির্ভর করে না। চলতি কথায় আমরা বলি যে কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস হল এমন এক সিস্টেম বা তন্ত্র যে তার জন্মের স্মৃতি মনে রাখতে পারে না।

বোরের মডেল যে ঠিক, তা প্রমাণ হবে কেমন করে? বার্কলের ষাট ইঞ্চি ব্যাসের সাইক্লোট্রন ও রৈখিক ত্বরক দুটিই ব্যবহার করে ঘোষাল দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে দস্তা মৌলের একই কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস তৈরি করলেন। ( হল X মৌলের নিউক্লিয়াস যাতে Z সংখ্যক প্রোটন ও (A-Z) সংখ্যক নিউট্রন আছে। ) নিকেলের নিউক্লিয়াস , ও সাইক্লোট্রন থেকে পাওয়া আলফা কণার বিক্রিয়াতে কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস তৈরি করলেন। আবার একই নিউক্লিয়াস তৈরি করলেন রৈখিক ত্বরক থেকে পাওয়া প্রোটন ও তামার নিউক্লিয়াস -র বিক্রিয়াতে।

এই কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াসের শক্তি সাধারণ অবস্থার নিউক্লিয়াসের থেকে বেশি। পরীক্ষাতে অনেক সংখ্যক নিউক্লিয়াস তৈরি হয়, তাদের মধ্যে কয়েকটি হয়তো একটি নিউট্রন ত্যাগ করে; কয়েকটি দুটো নিউট্রন, কয়েকটি আবার একটি নিউট্রন ও একটি প্রোটন ত্যাগ করে। বোরের মডেল যদি ঠিক হয়, তাহলে এই বিভিন্ন ভাবে পথের সংখ্যক্সার অনুম্পাত দুই বিভিন্ন পরীক্ষাতে একই হবে, কারণ একবার কম্পাউন্ড নিউক্লিয়াস তৈরি হয়ে গেলে সে কোন পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে তা আর আদৌ গুরুত্বপূর্ণ নয়। ঘোষাল দেখালেন সত্যিই তাই, দুটি বিভিন্ন পরীক্ষাতে অনুপাতের একই মান পাওয়া গেল। এর পর থেকে কম শক্তির বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে আনরা বোরের মডেল ব্যবহার করে আসছি। ১৯৫০ সালে ফিজিক্যাল রিভিউ পত্রিকাতে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

এটি সমরেন্দ্রনাথের সব থেকে বিখ্যাত কাজ হলেও সমরেন্দ্রনাথ আরো বেশ কিছু গবেষণা করেছিলেন; তাদের কয়েকটির উল্লেখ করি। স্বল্পকাল ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে থাকলেও তিনি সেখানে পরমাণুর ভর সংক্রান্ত এক তাত্ত্বিক গবেষণাতে অংশ নিয়েছিলেন, ১৯৪৮ সালে তা প্রকাশিত হয়। এছাড়া প্রেসিডেন্সি কলেজে এক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার সূচনা তিনি করেছিলেন; ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে তিনি পরমাণুর ভর মাপার বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র তিনি তৈরি করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রেসিডেন্সি কলেজে গবেষণার সুযোগ কম ছিল, পড়ানোর চাপ ছিল অনেক বেশি। তার মধ্যেও তাঁর এই কাজ বিশেষ কৃতিত্বের দাবি রাখে।

১৯৫০ সালে যখন তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে, ততদিনে ডক্টরেট সম্পূর্ণ করে সমরেন্দ্রনাথ কলকাতায় ফিরে এসেছেন। স্বল্পকাল ইনটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে কাটিয়ে তিনি ১৯৫১ সালে লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে রিডার পদে যোগ দেন। মেঘনাদ সাহার আহ্বানে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন ও ১৯৫৪ স্লালের ২০ জুলাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে তারিণীচরণ সুর রিডার পদে যোগ দেন। ততদিনে ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে, তবে অধ্যাপক ঘোষালকে ডেপুটেশনে ইনস্টিটিটিউটে কাজ করতে পাঠানো হয়। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপক পদে যোগ দেন। সেখানেই ছিলেন ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত, মাঝে স্বল্প সময়ের জন্য তিনি কলেজের অধ্যক্ষপদের দায়িত্বও সামলেছিলেন। এর পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগে ডায়রেক্টর অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশন পদে কাজ করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে খয়রা অধ্যাপক পদে যোগ দেন, সেখান থেকে অবসর নেন ১৯৮৮ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেসিডেন্সি কলেজ দুই প্রতিষ্ঠানেই তিনি বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব সামলেছিলেন। ২০০৭ সালের ৩০ জুলাই তিনি প্রয়াত হয়েছেন।

পড়ানোর বিষয়ে তাঁর সুনাম ছিল। ক্লাসে বিভিন্ন বিষয় পড়াতেন, জটিল গণিতের সময়েও বই বা কাগজ দেখার প্রয়োজন পড়ত না। অবসরের আগেও তিনি পাঠ্য বই লিখেছিলেন, পরেও সেই কাজ করেছিলেন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর স্তরে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা, পারমাণবিক ও নিউক্লিয়া পদার্থবিদ্যা বিষয়ে বেশ কয়েকটি পাঠ্যবই তিনি লিখেছিলেন, সেগুলি এখনো খুবই জনপ্রিয়। পশ্চিমবং রাজ্য পুস্তক পর্ষদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে বাংলায় লেখা তাঁর পাঠ্যবই, পরমাণূ ও কেন্দ্রক গঠন পরিচয়। বইটি এখন দু' খণ্ডে পাওয়া যায়। অধ্যাপক ঘোষাল ইন্ডিয়ান ফিজিক্যাল সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরই উদ্যোগে শুরু হয়েছিল ইয়ং ফিজিস্টস কলোকিয়াম, চল্লিশ বছর পেরিয়েও সাফল্যের সঙ্গে সেটি নিয়মিত অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে।

নানা সম্মান অধ্যাপক ঘোষাল পেয়েছিলেন। ২০০১ সালে তাঁর বিখ্যাততম গবেষণাটির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁর পুরানো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কটিশ চার্চ কলেজ তাঁকে বিশেষ সম্মানে ভূষিত করে। ভারতের নিউক্লিয় বিজ্ঞানের সব থেকে বড় সম্মেলন প্রতিবছর পরমাণু শক্তি বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত হয়। ২০০১ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে তাঁকে সম্বর্ধিত করা হয় ও তাঁর গবেষণা বিষয়ে আলোচনার জন্য একটি বিশেষ সেশনের ব্যবস্থা করা হয়। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছিল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৯৮ সালে তাঁকে বিশিষ্ট শিক্ষক সম্মানে ভূষিত করেছিল। তাঁর জন্মের শতবর্ষে তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি।

(এই নিবন্ধের নানা তথ্যের জন্য আমি অধ্যাপক ঘোষালের পুত্র শ্বেতকেতু ঘোষাল, পৌত্রী সুদক্ষিণা ঘোষালের কাছে ঋণী। অধ্যাপক ঘোষালের ছবিটিও তাঁদের সৌজন্যে প্রাপ্ত। অধ্যাপক ঘোষালের মৃত্যুর পরে 'ফিজিক্স টিচার’ পত্রিকায় প্রকাশিত সাহা ইনস্টিটিউটের প্রাক্তন অধ্যাপক হরষিত মজুমদারের লেখা শোকবার্তা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট ও সিন্ডিকেট রেকর্ড থেকেও কিছু তথ্য পেয়েছি।

 

জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার ২০২৩ অক্টোবর নভেম্বর (শারদীয়) সংখ্যাতে প্রকাশিত। 

একুশ শতক পত্রিকাতে বিজ্ঞানী বিকাশ সিংহের অবিচুয়ারি

গত ১১ আগস্ট, ২০২৩ প্রয়াত হলেন বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ। বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তাঁর জন্ম মুর্শিদাবাদে কান্দির পুরানো রাজপরিবারে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুন। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনার পরে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং কেমব্রিজ থেকে বিএ ও এমএ সম্পূর্ণ করে লন্ডনের কিংস কলেজে গবেষণা করেছিলেন। ১৯৭৬ সালে তিনি মুম্বাইয়ের ভাভা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে যোগ দেন।

১৯৮৪ সালে তিনি কলকাতার ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার বা ভিইসিসি-তে একটি বিভাগের প্রধান হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৮৭ থেকে ২০০৯ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভিইসিসির অধিকর্তা। একই সঙ্গে ১৯৯২ থেকে ২০০৯ কলকাতার সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের অধিকর্তার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। এর মধ্যেই কিছুদিন পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যও হয়েছিলেন। একই সঙ্গে দুটি বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে তিনি সফলভাবে পরিচালনা করেছেন। নিজে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ হলেও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে গুরুত্ব দিয়ে বহু নতুন বিষয়ে গবেষণার সূচনাতে সাহায্য তিনি করেছিলেন। ভিইসিসি-তে মেডিক্যাল সাইক্লোট্রনের পরিকল্পনা সেই সময়েই নেওয়া হয়। এই সাইক্লোট্রনে যে সমস্ত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি হয় তারা ক্যান্সার সহ বহু রোগের নিরাময় বা নির্ধারণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেই সাইক্লোট্রন এখন অনেক কম খরচে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করছে। কনিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও ছাত্রদের দিকে বিশেষভাবে নজর রাখতেন বিকাশ সিংহ।

নিউক্লিয় বিক্রিয়া বিষয়ে গবেষণা দিয়ে বিকাশ সিংহের বিজ্ঞানী জীবনের সূচনা হয়েছিল। দেশে ফিরে কয়েক বছর পরে তিনি কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমা বিষয়ে মন দেন। এই বিষয়ে তিনি পৃথিবীর পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম; চল্লিশ বছর আগে ১৯৮৩ সালে এই বিষয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। বিগ ব্যাঙের পরে ব্রহ্মাণ্ডের অতি ঘন অতি উত্তপ্ত অবস্থাতে কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমার অস্তিত্ব ছিল; পৃথিবীর পরীক্ষাগারে দুটি ভারি নিউক্লিয়াসের মধ্যে উচ্চশক্তির সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেই আদি অবস্থাকে পুনরায় সৃষ্টি করা সম্ভব। বিকাশ সিংহ জোর দিয়েছিলেন তার থেকে বেরিয়ে আসা ফোটন, ইলেকট্রন ও মিউয়ন কণা পর্যবেক্ষণের উপরে। তাঁর উদ্যোগেই এই নিয়ে তাত্ত্বিক ও পরীক্ষামূলক গবেষণার দুটি দল দেশে তৈরি হয়েছিল।

এই ধরনের পরীক্ষা করে দেখার মতো যন্ত্র আছে পৃথিবীর দুটি পরীক্ষাগারে; একটি হল আমেরিকার ব্রুকহাভেনের রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কোলাইডার, অন্যটি হল সার্নের লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার। বিকাশ সিংহের চেষ্টাতে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষাগারের গবেষণাতে অংশ নেন। তাঁর চেষ্টাতেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেরা যন্ত্র বানিয়ে পরীক্ষাতে ব্যবহার করেছেন; তাঁদের তৈরি ফোটন মাল্টিপ্লিসিটি ডিটেক্টর এবং মিউয়ন চেম্বার এখন এই সমস্ত পরীক্ষাগারে কাজ করে চলেছে। দেশে তৈরি হয়েছে মানস নামের সেমিকন্ডাক্টর চিপ, এই প্রযুক্তি যে ভারতে সম্ভব তা কেউ কল্পনাই করতে পারত না। ভারতে একের পর এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্র আয়োজন করে সেখানে সারা পৃথিবীর প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের তিনি নিয়ে এসেছিলেন।

কোনো ভারতীয় ব্যক্তিগতভাবে কী করল, তার থেকে বিকাশ সিংহের কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে দেশ হিসাবে ভারত কী কাজ করছে। ভারত এখন সার্নের সহযোগী সদস্য। জার্মানিতে তৈরি হচ্ছে আর সর্বাধুনিক নতুন পরীক্ষাগার ফেসিলিটি ফর অ্যান্টিপ্রোটন এন্ড আয়ন রিসার্চ; অংশীদারত্বের হিসাবে ভারত এখন সেই প্রকল্পে তৃতীয়। এই সমস্ত প্রচেষ্টার নেতৃত্বে ছিলেন বিকাশ সিংহ। শুরুতে ভারত থেকে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের আন্তর্জাতিক পরীক্ষাতে অংশ নিচ্ছিল। এখন সারা ভারতের মোট পঁচিশটি গবেষণা কেন্দ্র ও পনেরটি শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন ফেয়ার-এ কাজের অংশীদার। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কথা আলাদা করে বলতেই হয়, কারণ আন্তর্জাতিকমানের যন্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রযুক্তির উন্নতি করতে পারছে এবং ব্যবসার পরিমাণ বাড়াতে পারছে।

পঁচাত্তর বছর বয়সেও পৃথিবীর প্রথম সারির গবেষণা পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একক গবেষণা। বিজ্ঞান প্রসারে ও প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকাতে বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি করতেন। 'সৃষ্টি এবং কৃষ্টি: বন্ধনহীন গ্রন্থি' এবং 'স্থান, কাল ও বিশ্বলোক', এই দুই বইতে তাঁর রচনাগুলি গ্রন্থিত হয়েছে। তিনি ছিলেন বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের উপদেষ্টামণ্ডলীর ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কাউন্সিলের সদস্য। সাহিত্য বা ইতিহাসেও তাঁর উৎসাহ ছিল। পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মান, রবীন্দ্র পুরস্কার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু জন্মশতবার্ষিকী পুরস্কার, মেঘনাদ সাহা পুরস্কার, ইত্যাদি তিনি পেয়েছেন।

নিজে যা বিশ্বাস করেন তা সোজাসুজি বলতেন তিনি, অবিজ্ঞান ও পবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। ২০২০ সালে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকাতে এক সাক্ষাৎকারে বিকাশ সিংহ বলেন সমস্ত পশ্চিমী চিন্তাভাবনার মূল ভারতীয় চিন্তাতে পাওয়া যাবে, এটা একেবারেই ভুল ধারণা এবং তা হয় একান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত বা তার পিছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে। ভারতীয় দর্শনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও তিনি বলেছিলেন পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাই সেখানে পাওয়া যাবে না। তিনি সাক্ষাৎকারে চারটি উদাহরণের কথা বলেছিলেন। আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, রেনে দেকার্তের দর্শনের পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গেলসের শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বের কথা। কখনো কোনো বামপন্থী দলের সদস্য না হয়েও মার্ক্স-এঙ্গেলসের তত্ত্বের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় বিজ্ঞান গবেষণাতে এক বিরাট শূন্যস্থানের সৃষ্টি হল। 

 

সৃষ্টির একুশ শতক পত্রিকার সেপ্টেম্বর ২০২৩ সংখ্যাতে প্রকাশিত 

Saturday, 28 October 2023

প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ

 প্রয়াত হলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ

 

গত ১১ আগস্ট, ২০২৩ প্রয়াত হলেন বিজ্ঞানী বিকাশ চন্দ্র সিংহ। বিজ্ঞানী ও বিশেষত বিজ্ঞান প্রশাসক হিসাবে তিনি ভারতের বিজ্ঞান গবেষণার জগতে বিরাট অবদান রেখে গেছেন সন্দেহ নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক স্তরের পরীক্ষাতে ভারতের অংশগ্রহণের সূচনা তাঁর নেতৃত্বে ও উৎসাহেই সম্ভব হয়েছিল।

 

বিকাশ সিংহ (চিত্রঋণ বিশ্বরূপ গাঙ্গুলী)

 

বিকাশ সিংহের জন্ম মুর্শিদাবাদে কান্দির পুরানো রাজপরিবারে ১৯৪৫ সালের ১৬ জুন। তাঁদের বাড়িতে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর যাতায়াত ছিল। পরিণত বয়সে বিকাশ সিংহের স্মৃতিচারণাতে সেই কথা অনেকবার এসেছে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে ১৯৬৪ সালে স্নাতক হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে অমলকুমার রায়চৌধুরি, সমরেন্দ্রনাথ ঘোষাল ও শ্যামল সেনগুপ্তের নাম কলকাতার পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে প্রবাদপ্রতিম হয়ে গিয়েছে। ঘটনাচক্রে এই বছর এই তিনজনের শতবর্ষ।

এর পর বিকাশ সিংহ ইংল্যান্ডে পড়তে যান। তিনি কেমব্রিজের কিংস কলেজ থেকে ১৯৬৭ সালে বিএ এবং ১৯৬৮ সালে এমএ-তে উত্তীর্ণ হওয়ার পরে ১৯৭০ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট করেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৭৬ তিনি লন্ডনের কিংস কলেজে গবেষণা করেছিলেন। তারপর রাজা রামান্নার আহ্বানে তিনি দেশে ফিরে মুম্বাইয়ের ভাভা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টারে যোগ দেন।

১৯৮৪ সালে তিনি কলকাতার ভেরিয়েবল এনার্জি সাইক্লোট্রন সেন্টার বা ভিইসিসির একটি বিভাগের প্রধান হয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৮৭ সালে তিনি ভিইসিসির অধিকর্তার দায়িত্ব পান। এত অল্প বয়সে দেশের কোনো মুখ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। ১৯৯২ সালে তিনি কলকাতার সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের অধিকর্তার দায়িত্বও নিয়েছিলেন। ২০০৯ সাল পর্যন্ত একই সঙ্গে দুটি বড় প্রতিষ্ঠান চালনার দায়িত্ব শুধু যে তিনি সাফল্যের সঙ্গে পালন করেন তা নয়, দুটিকেই তিনি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তাঁর সময়েই এই দুই প্রতিষ্ঠানে বহু নতুন বিষয়ে গবেষণা শুরু হয়। নিজে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ হলেও পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানকে সর্বাগ্রে স্থান দেওয়ার বিষয়ে তাঁর কুণ্ঠা ছিল না। তাঁর উদ্যোগে ভিইসিসি-তে মেডিক্যাল সাইক্লোট্রনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এই সাইক্লোট্রনে যে সমস্ত তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ তৈরি হয় তারা ক্যান্সার সহ বহু রোগের নিরাময় বা নির্ধারণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সেই মেডিক্যাল সাইক্লোট্রন এখন কলকাতার উপকণ্ঠে কাজ শুরু করেছে এবং অনেক কম খরচে তেজস্ক্রিয় পদার্থ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করছে। ততিনি অধিকর্তা থাকার সময় সাহা ইন্সটিটিউটে বায়োফিজিক্স, সারফেস ফিজিক্স জাতীয় আধুনিক বিষয়ে গবেষণা সামনের সারিতে আসে। ভিইসিসি-র সুপারকন্ডাক্টিং সাইক্লোট্রন, রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়ন বিম প্রকল্প, সাহা ইন্সটিটিউটের অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অ্যাকসিলারেটর ফ্রেনা - এই সমস্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে দুই ইনস্টিটিউটে গবেষণাতে নতুন জোয়ার আসে। কিছুদিন তিনি একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও সামলেছেন। কনিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও ছাত্ররা যাতে ঠিক মতো কাজ করতে পারে, তাদের কোনো অসুবিধা না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর রাখতেন বিকাশ সিংহ।

বিকাশ সিংহ নিউক্লিয় বিক্রিয়া বিষয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন। এক বিশেষ তত্ত্ব যার নাম অপটিকাল মডেল, সেখানে তাঁর দখল ছিল প্রশ্নাতীত। লন্ডনের কিংস কলেজে ছ' বছরে প্রকাশিত কুড়িটি গবেষণাপত্র পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষ্য দেয়। এরপরে তিনি কোয়ার্ক গ্লুয়ন প্লাজমা বা কিউজিপি বিষয়ে মন দেন। এই বিষয়ে তিনি পৃথিবীর পথিকৃৎদের মধ্যে অন্যতম; চল্লিশ বছর আগে ১৯৮৩ সালে এই বিষয়ে তাঁর প্রথম প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল। এই সমস্ত গবেষণাতে তাঁর অনেক সঙ্গীর মধ্যে তিনজনের নাম আলাদা করে বলতে হয়, তাঁরা হলেন দীনেশ কুমার শ্রীবাস্তব, শিবাজি রাহা ও প্রয়াত ভাস্কর দত্ত। বিকাশ সিংহের পরে ভিইসিসির অধিকর্তা হন শ্রীবাস্তব। শিবাজি রাহা দীর্ঘদিন বোস ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা ছিলেন।

কিউজিপি নিয়ে কিছু কথা এখানে বলা প্রয়োজন। প্রোটন ও নিউট্রনের মধ্যে আছে কোয়ার্ক কণা। কোয়ার্ক কণাদের মধ্যে গ্লুয়ন কণা বিনিময়ের সাহায্যে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া হয়। সাধারণভাবে কোয়ার্ক কণারা প্রোটন নিউট্রন ইত্যাদির মধ্যে আবদ্ধ থাকে। কিন্তু সৃষ্টির আদিতে বিগব্যাঙের সময় মহাবিশ্ব ছিল অত্যন্ত ক্ষুদ্র ও উত্তপ্ত। তখন সেই প্রচন্ড ঘনত্বে কোয়ার্করা খুব কাছাকাছি ছিল, ফলে আলাদা করে প্রোটন নিউট্রন মেসন ইত্যাদি কণার কথা বলা যেত না। এই অবস্থা বা দশাকে বলা হয় কিউজিপি। ব্রহ্মাণ্ড যত প্রসারিত হয়েছে, তার ঘনত্ব ও তাপমাত্রা হ্রাস পেয়েছে, এক সময় কোয়ার্করা প্রোটন ইত্যাদির মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ল। এই ঘটনাকে এক প্রকার দশা পরিবর্তন বলতে পারি। পৃথিবীর পরীক্ষাগারে দুটি ভারি নিউক্লিয়াসের মধ্যে উচ্চশক্তির সংঘর্ষ ঘটিয়ে সেই আদি অবস্থাকে পুনরায় সৃষ্টি করা সম্ভব। সেই অবস্থাকে দেখা যায় নানা ভাবে, বিকাশ সিংহ জোর দিয়েছিলেন তার থেকে বেরিয়ে আসা ফোটন, ও ইলেকট্রন ও মিউয়ন কণা পর্যবেক্ষণের উপরে।

বিকাশ সিংহকে কেন্দ্র করে কিউজিপি নিয়ে তাত্ত্বিক গবেষণার একটি দল দেশে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু তাতেই তিনি সন্তুষ্ট হননি। তিনি জোর দিলেন পরীক্ষা করে দেখার উপর। এবং এখানেই বিজ্ঞান প্রশাসক হিসাবে আমরা তাঁর অন্য একটি রূপ দেখতে পাই। এই ধরনের পরীক্ষা করে দেখার মতো যন্ত্র আমাদের দেশে নেই। পৃথিবীর দুটি পরীক্ষাগার কিউজিপি বিষয়ে পরীক্ষানিরীক্ষাতে নেতৃত্ব দিয়েছে, একটি হল আমেরিকার ব্রুকহাভেনের রিলেটিভিস্টিক হেভি আয়ন কোলাইডার, অন্যটি হল সার্নের লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার। বিকাশ সিংহের চেষ্টাতে ভারতীয় বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষাগারের গবেষণাতে অংশ নেন। তাঁর দূরদৃষ্টি থেকে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ভারতকে যদি মর্যাদার সঙ্গে এই সমস্ত জায়গাতে কাজ করতে হয়, তাহলে শুধুমাত্র পরীক্ষার সময়ে অংশ নেওয়া বা তার তথ্য বিশ্লেষণ করলে চলবে না। তাঁর চেষ্টাতেই ভারতীয় বিজ্ঞানীরা নিজেরা যন্ত্র বানিয়ে পরীক্ষাতে ব্যবহার করেছেন; তাঁদের তৈরি ফোটন মাল্টিপ্লিসিটি ডিটেক্টর এবং মিউয়ন চেম্বার এখন এই সমস্ত পরীক্ষাগারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবে কাজ করে চলেছে। এই জন্য দেশেই তৈরি হয়েছে মানস নামের সেমিকন্ডাক্টর চিপ, এই প্রযুক্তি যে ভারতে সম্ভব তা কেউ কল্পনাই করতে পারত না। ভারতে একের পর এক আন্তর্জাতিক আলোচনাচক্র আয়োজন করে সেখানে সারা পৃথিবীর প্রথম সারির বিজ্ঞানীদের তিনি নিয়ে এসেছিলেন।

একজন বা দুজন ভারতীয় ব্যক্তিগতভাবে কী করল, তার থেকে বিকাশ সিংহের কাছে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে দেশ হিসাবে ভারত কী কাজ করছে। ভারত এখন সার্নের সহযোগী সদস্য, তার পিছনে তাঁর প্রচেষ্টার কথা বলতেই হবে। জার্মানিতে তৈরি হচ্ছে আর সর্বাধুনিক নতুন পরীক্ষাগার ফেসিলিটি ফর অ্যান্টিপ্রোটন এন্ড আয়ন রিসার্চ, সংক্ষেপে ফেয়ার। বিকাশ সিংহ পরিকল্পনা স্তর থেকেই ভারত যেন তাতে অংশ নেয় তার চেষ্টা করেছিলেন। অংশীদারত্বের হিসাবে ভারত এখন সেই প্রকল্পে তৃতীয়।

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সবাইকে নিয়ে চলার জন্য বিকাশ সিংহ চেষ্টা করে গেছেন। শুরুতে ভারত থেকে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠান এই ধরনের আন্তর্জাতিক পরীক্ষাতে অংশ নিচ্ছিল। এখন শুধুমাত্র কলকাতা থেকেই ভিইসিসি ছাড়াও সাহা ইনস্টিটিউট, বোস ইন্সটিটিউট, কলকাতা ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এই সমস্ত প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। সারা ভারতের মোট পঁচিশটি গবেষণা কেন্দ্র ও পনেরটি শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন ফেয়ার-এ কাজের অংশীদার। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কথা আলাদা করে বলতেই হয়, কারণ আন্তর্জাতিকমানের যন্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে তারা নিজেদের প্রযুক্তির উন্নতি করতে পারছে এবং ব্যবসার পরিমাণ বাড়াতে পারছে। তিনি ফেয়ার-এর পরিচালনা কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন।

অবসর নেওয়ার পরেও কাজ থামাননি বিকাশ সিংহ। পঁচাত্তর বছর বয়সেও পৃথিবীর প্রথম সারির গবেষণা পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর একক গবেষণা। বিজ্ঞান প্রসারে ও প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন, নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকাতে বিজ্ঞান বিষয়ে লেখালেখি করতেন। 'সৃষ্টি এবং কৃষ্টি: বন্ধনহীন গ্রন্থি' এবং 'স্থান, কাল ও বিশ্বলোক', এই দুই বইতে তাঁর রচনাগুলি গ্রন্থিত হয়েছে। মৃত্যু বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের উপদেষ্টামণ্ডলীর ও পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের কাউন্সিল সদস্য ছিলেন তিনি। সাহিত্য বা ইতিহাসেও তাঁর উৎসাহ ছিল। রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী বিকাশ সিংহের উৎসাহেই নিউটাউনে তৈরি হয়েছে টেগোর সেন্টার ফর সায়েন্স এন্ড ফিলোজফি। পেয়েছেন অনেক পুরস্কার, পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ সম্মান, রবীন্দ্র পুরস্কার, সত্যেন্দ্রনাথ বসু জন্মশতবার্ষিকী পুরস্কার, মেঘনাদ সাহা পুরস্কার, ইত্যাদি।

এখন যখন বিজ্ঞানের নামে অবিজ্ঞান ও অপবিজ্ঞানের চর্চা প্রাধান্য পাচ্ছে, সেই সময় নিজে যা বিশ্বাস করেন তা সোজাসুজি বলা প্রয়োজন তা তিনি বুঝেছিলেন। ২০২০ সালে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকাতে এক সাক্ষাৎকারে বিকাশ সিংহ বলেন সমস্ত পশ্চিমী চিন্তাভাবনার মূল ভারতীয় চিন্তাতে পাওয়া যাবে, এটা একেবারেই ভুল ধারণা এবং তা হয় একান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত বা তার পিছনে অন্য উদ্দেশ্য আছে। ভারতীয় দর্শনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেও তিনি বলেছিলেন পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাই সেখানে পাওয়া যাবে না। তিনি সাক্ষাৎকারে চারটি উদাহরণের কথা বলেছিলেন। আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, রেনে দেকার্তের দর্শনের পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেছিলেন মার্ক্স ও এঙ্গেলসের শ্রেণি ও শ্রেণি সংগ্রামের তত্ত্বের কথা। কখনো কোনো বামপন্থী দলের সদস্য না হয়েও মার্ক্স-এঙ্গেলসের তত্ত্বের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় বিজ্ঞান গবেষণাতে এক বিরাট শূন্যস্থানের সৃষ্টি হল। 

 

প্রকাশঃ দেশহিতৈষী,  ১৮ আগস্ট, ২০২৩