Tuesday, 6 January 2026

জ্যোতির্বিদ্যাতে একটি ভুল পরিমাপ ও একটি সঠিক তত্ত্ব

 

জ্যোতির্বিদ্যাতে একটি ভুল পরিমাপ ও একটি সঠিক তত্ত্ব

শ্বেত বামন নক্ষত্র গবেষণার ইতিহাস

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


নক্ষত্ররা কত বড়? সূর্যের ব্যাস প্রায় চোদ্দ লক্ষ কিলোমিটার। আমরা সবাই জানি অনেক নক্ষত্র সূর্যের থেকে বড়। দূরের নক্ষত্রের ব্যাস মাপা মোটেই সহজ নয়। তারা এত দূরে আছে যে আমাদের সব থেকে শক্তিশালী দূরবিনেও তাদের বিন্দুর মতো দেখায়। সূর্য ছাড়া যে প্রথম নক্ষত্রের ব্যাস মাপা সম্ভব হয়েছিল, সে হল লাল দানব নক্ষত্র আর্দ্রা। তার কারণ সে আমাদের অপেক্ষাকৃত কাছে আছে, আর অনেক বড়ও বটে। ১৯২০ সালে মেপে দেখা গিয়েছিল আর্দ্রার ব্যাস সূর্যের প্রায় ন'শো গুণ। আমাদের কাছের কিছু দানব নক্ষত্র ছাড়া সরাসরি ব্যাস মাপা প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই সম্ভব হয়নি, তার জন্য পরোক্ষ পদ্ধতির সাহায্য নিতে হয়।

এ তো গেল দানব তারাদের কথা। আবার কয়েক ধরনের তারা আছে যারা সূর্যের থেকে অনেক ছোট। এই লেখাতে যে নক্ষত্রের কথা বলব, তার নাম শ্বেত বামন। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এরা আয়তনে খুব ছোট। কিন্তু কত ছোট, সেটাই ছিল প্রশ্ন। শ্বেত বামনের ব্যাস মাপার জন্য এক বিশেষ পদ্ধতির সাহায্য নিতে হয়েছিল। সেই পদ্ধতি বোঝার জন্য এই তারাদের সম্পর্কে আমাদের কিছুটা জানতে হবে। তার সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে জ্যোতির্বিদ্যার এক বিখ্যাত বিতর্কের ইতিহাস; সেই কথাও আমাদের গল্পে আসবে।

নক্ষত্র তো গ্যাসের পিণ্ড, সে কেন নিজের মাধ্যাকর্ষণের টানে আরো ছোটো হয়ে যায় নাবিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন দেখিয়েছিলেন যে নক্ষত্রের বিকিরণের চাপ ও উত্তপ্ত গ্যাসের চাপ মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে কাজ করে নক্ষত্রকে ছোট হতে দেয় না। কিন্তু যখন কোনো তারকার জ্বালানি ফুরিয়ে যায় তখন এই দুই বল আর মাধ্যাকর্ষণের সমান থাকবে না। তারকা নিজের মাধ্যাকর্ষণের টানে আস্তে আস্তে ছোটো হতে থাকবে। যত ছোটো হবেস্বাভাবিক ভাবে ততই তার ঘনত্ব বাড়তে থাকবে। এডিংটনের সহকর্মী র‍্যালফ ফাউলার দেখালেন যে নতুন আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম তত্ত্ব প্রয়োগ করলে দেখা যায় তারাদের ঘনত্ব একটা নির্দিষ্ট মানের চেয়ে বেশি হতে পারে না। পদার্থের সেই ঘন অবস্থায় ইলেকট্রনেরা যে চাপ তৈরি করে, তা মাধ্যাকর্ষণকে প্রতিহত করে। সহজ অঙ্ক কষে দেখা গেল এই অবস্থায় নক্ষত্রদের এক ঘন সেন্টিমিটার, মানে বড়ো চামচের এক চামচ, পদার্থের ভর হবে একশো কিলোগ্রাম। পরোক্ষ পদ্ধতিতে শ্বেত বামনের এই রকম ঘনত্বের মাপই পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু প্রায় সকলেই সকলেই মনে করেছিলেন যে সেটা ভুল।

সত্যিই শ্বেত বামনদের ঘনত্বের একটা সর্বোচ্চ মান আছে কিনা জানতে হলে তার ভর ও ব্যাস সরাসরি জানতে হবে। সে সময় মাত্র তিনটি শ্বেত বামনের কথা জানা ছিল, তার মধ্যে সব থেকে কাছেরটির নাম সিরিয়াস বি। ফ্রিয়েডরিশ উইলহেল্ম বেসেল রাতের আকাশের সব থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র লুব্ধক বা সিরিয়াসের তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে বলেন যে সেটি আসলে যুগ্ম নক্ষত্র, তার একটি অদৃশ্য সঙ্গী আছে। সেই সঙ্গীটি দূরবিনে ধরা দিল 1862 সালে, ঔজ্জ্বল্য খুব কম বলে তাকে আগে দেখা যায়নি। তাকে প্রথম দেখতে পেয়েছিলেন মার্কিন লেন্স নির্মাতা আলভিন গ্রাহাম ক্লার্ক। দূরবিনের লেন্স বানানো ছিল তাঁদের পারিবারিক ব্যাবসা, একটি লেন্স পরীক্ষা করতে গিয়ে তিনি সেটিকে আবিষ্কার করেছিলেন। এর নাম দেওয়া হল সিরিয়াস বি। যে নক্ষত্রটাকে খালি চোখে দেখা যায়, তার নাম হল সিরিয়াস এ। এর প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে ১৯১০ সালে হার্ভার্ড মানমন্দিরের মহিলা জ্যোতির্বিদ উইলিয়ামিনা ফ্লেমিং দেখান যে হার্শেলের দেখা নক্ষত্রটির বাইরের স্তরের তাপমাত্রা খুব বেশি। বেশি তাপমাত্রা মানে একক ক্ষেত্রফল থেকে বেশি শক্তি বেরোয়, সুতরাং এই তারাদের এত কম উজ্জ্বলতার একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে, এরা নিশ্চয় আয়তনে খুব ছোট বা বামন।

এডিংটন বুঝলেন এত ঘন তারাদের কাছাকাছি মাধ্যাকর্ষণ এত বেশি হয় যে নিউটনের সূত্র পুরোপুরি কাজ করবে না; প্রয়োজন হবে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী খুব শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র থেকে আলোও সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য যায় বেড়ে, ফলে নীল আলো রং পাল্টে লালের দিকে যায়। শ্বেত বামনের ভর জানা থাকলে, তা থেকে যে আলো বেরোচ্ছে তার রং বা তরঙ্গদৈর্ঘ্য কতটা পাল্টাল তা মেপে, তার পরে হিসাব করে তার ব্যাস বার করা যায়। এডিংটন ঠিক করলেন সেটাই করতে হবে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী এডিংটন যোগাযোগ করলেন মার্কিন বিজ্ঞানী ওয়াল্টার অ্যাডামসের সঙ্গে। অ্যাডামস সে যুগের সেরা জ্যোতির্বিদদের অন্যতম, তার উপর তিনি আবার সে সময় পৃথিবীর সব থেকে বড় দূরবিন হুকার দূরবিন যেখানে ছিল সেই মাউন্ট উইলসন মানমন্দিরের অধিকর্তা। হুকারের আয়নাটা ছিল ২৫৪ সেন্টিমিটার চওড়া। এডিংটন বুঝেছিলেন সেই দূরবিন ছাড়া তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন মাপা সম্ভব নয়।

অ্যাডামসও বুঝলেন মাপটা মোটেই সহজ নয়। মূল সমস্যা হল সিরিয়াস এ তার সঙ্গীর থেকে প্রায় আট হাজার গুণ বেশি উজ্জ্বল; দুইয়ের মধ্যে দূরত্বও খুব বেশি নয়। খুব ভালো ভাবে মাপতে না পারলে সিরিয়াস এ-র থেকে আসা আলোর থেকে শ্বেত বামনের আলোকে আলাদা করতে পারা সম্ভব নয়। তিনি এডিংটনকে জিজ্ঞাসা করলেন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কতটা পরিবর্তন তিনি আশা করছেন। সিরিয়াস বি-র ভর সূর্যের ভরের কাছাকাছি। এডিংটনের হিসাব মতো তার ব্যাসার্ধ হওয়া উচিত কুড়ি হাজার কিলোমিটারের আশেপাশে; তার জন্য আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পালটাবে পনের হাজার ভাগের এক ভাগ। আজ থেকে ঠিক একশো বছরে আগে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে অ্যাডামস মেপে দেখলেন এডিংটনের হিসাব একদম মিলে যাচ্ছে। তিন বছরের মধ্যে তিনি মাপটাকে আরো নিখুঁত করে দেখলেন সিরিয়াস বি-এর ব্যাসার্ধ হল ২৩,৭০০ কিলোমিটার। এই মাপকেও এডিংটনের তত্ত্ব থেকে ব্যাখ্যা করা যায়।

তার কয়েক বছর পরে শ্বেত বামন নিয়ে এক তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে তরুণ সুব্রহ্মনিয়ান চন্দ্রশেখর কেমব্রিজে গবেষণা শুরু করেন, যেখানে তখন ছিলেন এডিংটন ও ফাউলার। চন্দ্রশেখর ভাবলেন যে শ্বেত বামন নিয়ে অঙ্ক কষার সময় ফাউলার তো ধরে নিয়েছেন ইলেকট্রনরা নিউটনের গতিসূত্র মেনে চলে। কিন্তু আমরা জানি যে যদি কোনো কণা আলোর বেগের কাছাকাছি বেগে চলে, তাহলে তাদের জন্য নিউটনের বলবিদ্যা কাজ করে না। আইনস্টাইন আবিষ্কৃত বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদই একমাত্র তার গতিবিধি ব্যাখ্যা করতে পারে। চন্দ্রশেখর বুঝতে পারলেন যে নক্ষত্র যখন মাধ্যাকর্ষণের টানে ছোটো হয়ে আসে, তখন তার ভিতরের ইলেকট্রনের বেগ খুব বেড়ে যায়। তার ফলে ফাউলারের তত্ত্বের পরিবর্তন হতে বাধ্য। তিনি দেখলেন শ্বেত বামনের ভর সূর্যের থেকে ১.৪ গুণের বেশি হওয়া সম্ভব নয়। তার থেকে বেশি ভরের তারাদের মাধ্যাকর্ষণ আরো বেশি, তাই ইলেকট্রনের চাপ মাধ্যাকর্ষণকে প্রতিহত করতে পারবে না। তারাটা ছোটো হতে হতে একটা বিন্দুতে পর্যবসিত হবে যার ঘনত্ব অসীম। আমরা যাকে আজ কৃষ্ণ গহ্বর নামে চিনি, সেটাই হল ভারী তারাদের অন্তিম পরিণতি ।

চন্দ্রশেখরের গবেষণার ফল প্রকাশের পরিণতি হল বিস্ময়কর। ফাউলারের অধীনে তিনি গবেষণা করেছিলেন। এডিংটনও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, গবেষণার খবর নিতেন। এডিংটনই তখন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ; তাঁর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পেয়ে চন্দ্রশেখর নিজেও খুব খুশী ছিলেন। হঠাৎই হল বিনা মেঘে বজ্রপাত। ১৯৩৫ সালের ১১ই জানুয়ারি রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির এক সভায় চন্দ্রশেখর তাঁর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ঠিক পরে বলতে ওঠেন এডিংটন। তিনি কোনো বৈজ্ঞানিক যুক্তি ছাড়াই চন্দ্রশেখরের গবেষণাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন। চন্দ্রশেখর হতচকিত হয়ে যান। তিনি অনেকবার এডিংটনের সঙ্গে তার গবেষণা নিয়ে আলোচনা করেছেন, কখনো তো এডিংটন তাঁর কাজকে ভুল বলেন নি। হঠাৎ প্রকাশ্যে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের এক সভায় এরকম ব্যক্তিগত আক্রমণ তাঁকে স্তম্ভিত করে দেয়। চন্দ্রশেখর উঠে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করতে যান, কিন্তু সভাপতি তাঁকে সেই সুযোগ দেন নি।

চন্দ্রশেখর জানতেন এডিংটন যা বলছেন তা পুরোপুরি ভুল। তিনি আরো অবাক হয়ে যান এই ভেবে যে এডিংটন নিজে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ বিষয়ে প্রথম সারির বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অন্যতম। অন্য কেউ না বুঝুক, তিনি তো চন্দ্রশেখরের গবেষণার প্রকৃত অর্থ বুঝবেন! এডিংটনের খ্যাতি তখন এতই বেশি যে কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানী তাঁর বিপক্ষে দাঁড়িয়ে চন্দ্রশেখরকে সমর্থন করেননি। চন্দ্রশেখরের আবিষ্কারের তাৎপর্য বুঝতে বুঝতে আরো প্রায় তিরিশ বছর গড়িয়ে যায়। অনেক বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক মনে করেন যে এর ফলে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান অন্তত দুই দশক পিছিয়ে গেছে।

কেমন করে বোঝা যাবে কে ঠিক, চন্দ্রশেখর না এডিংটন। চন্দ্রশেখরের হিসাব মতো শ্বেত বামনের ঘনত্ব অনেক বেশি হতে পারে, সুতরাং তার ব্যাসার্ধ অনেক কম হওয়া উচিত। সিরিয়াস বি-এর ব্যাসার্ধ মাপলে বোঝা যবে কার মত ঠিক।

অন্য একদিক থেকেও এডিংটনের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠল। এডিংটনই প্রথম বলেছিলেন যে নক্ষত্রের অভ্যন্তরে নিউক্লিয় বিক্রিয়াই হল তার শক্তির উৎস। ১৯৩৮ সালে হান্স বেথে ও চার্লস ক্রিচফিল্ডের গবেষণার ফলে বোঝা গেল সেই বিক্রিয়ার প্রধান জ্বালানি হল হাইড্রোজেন। সিরিয়াস বি-এর ব্যাসার্ধের যে মাপ অ্যাডামস পেয়েছিলেন, এডিংটনের তত্ত্বে তা বসালে দেখা যাচ্ছিল নক্ষত্রটার ভরের আটষট্টি শতাংশই হল হাইড্রোজেন। বিশেষ করে বেথের গবেষণা থেকে হিসাব করে দেখা গেল ওই পরিমাণ হাইড্রোজেন থাকলে সিরিয়াস বি-এর মধ্যে যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া হবে, তার থেকে শক্তি তৈরি হবে আমাদের সূর্যের থেকে বহু লক্ষ গুণ বেশি। অথচ বাস্তবে আমাদের সূর্য সিরিয়াস বি-এর থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো গুণ বেশি শক্তি বিকিরণ করে।

এই সমস্যার একমাত্র সমাধান হল হাইড্রোজেন শূন্য সিরিয়াস বি। শ্বেত বামন সৃষ্টির তত্ত্বও সেই কথা বলে, কারণ হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষে হওয়ার পরেই নক্ষত্রের পক্ষে শ্বেত বামনে রূপান্তরিত হওয়া সম্ভব। তবে ১৯৩৮ সালের আগে সেই কথা জানা ছিল না, তাই এডিংটনের তত্ত্বকে কেউ প্রশ্ন করেন নি। এমনকি চন্দ্রশেখরও তাঁর তত্ত্বে হাইড্রোজেনের উপস্থিতি ধরে নিয়েছিলেন। ১৯৪০-র দশকে পর্যবেক্ষণ করেও শ্বেত বামন নক্ষত্রের ভিতরে হাইড্রোজেনের চিহ্ন বিশেষ পাওয়া গেল না। কিন্তু হাইড্রোজেন না থাকলে শ্বেত বামনের ঘনত্ব অনেক বেড়ে যাবে, তাই তার ব্যাসার্ধ অনেক কম হওয়া উচিত।

কারণটা বোঝা শক্ত নয়। হাইড্রোজেন পরমাণুতে আছে একটা প্রোটন ও একটা ইলেকট্রন। অন্য সব পরমাণুর ভরের তুলনায় ইলেকট্রনের সংখ্যা হাইড্রোজেন পরমাণুর অর্ধেক বা তারও কম। যেমন হিলিয়াম পরমাণু হাইড্রোজেনের থেকে চারগুণ ভারী, কিন্তু সেখানে ইলেকট্রনের সংখ্যা দুই। শ্বেত বামনে হাইড্রোজেন না থাকলে তার ভিতরে ইলেকট্রনের সংখ্যা হবে কম, ফলে মাধ্যাকর্ষণকে আটকাতে হলে নক্ষত্রটার ঘনত্ব, তথা ইলেকট্রনের ঘনত্ব, অন্তত দু'গুণ বেশি হওয়া প্রয়োজন। এডিংটনের হিসাবই দেখাচ্ছে তা হলে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের পরিবর্তন হওয়া উচিত ছ'হাজার ভাগের এক ভাগ; অর্থাৎ অ্যাডামস যা মেপেছেন তার দ্বিগুণেরও বেশি। কাজেই আবার সিরিয়াস বি-এর ব্যাসার্ধ মাপা প্রয়োজন।

কিন্তু সমস্যা হল সিরিয়াস এ ও বি তো আকাশে এক জায়গায় থাকে না, তারা পরস্পরকে প্রদক্ষিণ করছে। ফলে আমাদের দৃষ্টির সাপেক্ষে তারা আকাশে কখনো একজন অন্যজনের কাছে আসে, কখনো দূরে সরে যায়। নিচের ছবিতে বাঁদিকে ১৯০০ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত আকাশে সিরিয়াস এ (A) ও বি (B)-র আপেক্ষিক অবস্থান দেখানো হল। হল দুই নক্ষত্রের ভরকেন্দ্র। ডানদিকে দেখা যাচ্ছে তাদের ভরকেন্দ্র C-এর সাপেক্ষে দুই নক্ষত্রের প্রকৃত অবস্থান। দেখা যাচ্ছে অ্যাডামস যখন মেপেছিলেন, সেই ১৯২০-এর দশকে নক্ষত্রদুটি অনেকটা দূরত্বে ছিল। কিন্তু ১৯৪০ সালে যখন আবার মাপার কথা উঠল, অখন তারা আকাশে এতই কাছাকাছি ছিল যে তাদের আলোকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব ছিল না।



সেই বিশ্লেষণের সুযোগ এল ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে, যখন দুই নক্ষত্রের আলোকে আলাদা করা সম্ভব হল। মাউন্ট পালোমারের ৫০৮ সেন্টিমিটার ব্যাসের হেল দূরবিন দিয়ে বিজ্ঞানী জেসি গ্রিনস্টাইন, জন ওক ও হ্যারি শিপম্যান মেপে দেখলেন সিরিয়াস বি-এর মাধ্যাকর্ষণের জন্য আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পাল্টায় অনেক বেশি, চার হাজার ভাগের এক ভাগের কাছাকাছি। তার থেকে সিরিয়াস বি-এর ব্যাসার্ধ পাওয়া গেল সাড়ে পাঁচহাজার কিলোমিটারের থেকে সামান্য বেশি। নিচের ছবিতে একটানা রেখা ও কাটাকাটা রেখা দিয়ে যথাক্রমে চন্দ্রশেখর ও এডিংটনের তত্ত্ব থেকে শ্বেত বামনের ভরের (M) সঙ্গে ব্যাসার্ধের (R) সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। (আমরা ধরে নিয়েছি যে হাইড্রোজেন অনুপস্থিত।) সিরিয়াস বি-এর অবস্থান B অক্ষর দিয়ে দেখানো হয়েছে। দেখা যাচ্ছে এডিংটনের তত্ত্বে সিরিয়াস বি-এর ব্যাসার্ধকে ব্যাখ্যা রা কখনোই সম্ভব নয়, কারণ তা একটা মানের থেকে কম হবে না। চন্দ্রশেখরের তত্ত্ব সেদিক দিয়ে সম্পূর্ণ সফল।



অ্যাডামসের ভুল হয়েছিল কোথায়? এখন আমরা বুঝি তিনি দুই নক্ষত্রের আলোকে পৃথক করতে পারেননি। তার সব থেকে বড় প্রমাণ হল তিনি সিরিয়াস বি-তে হাইড্রোজেনের চিহ্ন পেয়েছিলেন; তখন কেউই বোঝেননি সেটা অসম্ভব। এই নতুন মাপ চন্দ্রশেখরের তত্ত্ব প্রকাশের প্রায় চল্লিশ বছর পরে পাওয়া গেল। এই সময়ের মধ্যে এডিংটন প্রয়াত হয়েছেন, শ্বেত বামন বিষয়ে চন্দ্রশেখরের সিদ্ধান্তই সকলে মেনে নিয়েছেন। শ্বেত বামনের সর্বোচ্চ ভরকে আমরা আজ চন্দ্রশেখর সীমা বলে নাম দিয়েছি, ছবিতে Mch দিয়ে সেটাই দেখানো হয়েছে। আমরা এও জানি যে শ্বেত বামন ও কৃষ্ণগহ্বরের মধ্যে আরো একটা স্তর আছে। যে সমস্ত তারাদের মোটামুটি তিন গুণের কম, সেগুলো জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে নিউট্রন তারাতে রূপান্তরিত হয়। অবশ্য ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে সে কথা জানা সম্ভব ছিল না। অবশেষে ১৯৮৩ সালে চন্দ্রশেখর তাঁর পঞ্চাশ বছর আগে করা গবেষণার জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। সেই স্বীকৃতির পিছনে এই সিরিয়াস বি-এর ব্যাসার্ধ পরিমাপেরও একটা ভূমিকা ছিল, কারণ চন্দ্রশেখরের তত্ত্ব যে নির্ভুল, তার পরীক্ষামূলক প্রমাণ তার থেকে পাওয়া গিয়েছিল। 

 

প্রকাশ সন্ধিৎসা নভেম্বর ২০২৫  

No comments:

Post a Comment