সম্পাদকের কথা
আধুনিক যুগে প্রাচীন সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্ম বিষয়ক আলোচনার এক বিশেষ গুরুত্ব আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোন পথে আমরা আধুনিক কালে এসে পৌঁছেছি, সে সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান আমাদের ভবিষ্যত পথের দিশা দেখায়। কিন্তু যখন সেই আলোচনা যখন দেশের প্রাচীন ইতিহাসকে গৌরবান্বিত করার লক্ষ্যে সাক্ষ্যপ্রমাণ বা যুক্তি এড়িয়ে বিশ্বাসের পথ ধরে বা মিথ্যা সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করে তখন তাকে আর বস্তুনিষ্ঠ বলা যায় না। দুর্ভাগ্যক্রমে আমাদের দেশে বর্তমানে সেই ধরনের আলোচনাই প্রধান স্থান অধিকার করছে। মহাকাব্য বা পুরাণের গল্পে বিজ্ঞানপ্রযুক্তিকে খুঁজে পাওয়ার কথা এমনকি দেশের সর্বোচ্চ মহল থেকেও প্রচারিত হচ্ছে।
সমাজের এক বিরাট অংশের মধ্যে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ আঁকড়ে ধরার প্রবণতাও স্পষ্ট। এই সব গ্রন্থের রচনাকাররা যে যুগের যে সমাজের মানুষ, তাঁরা সেই যুগের সেই সমাজে দাঁড়িয়েই সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজেছিলেন। মানবপ্রকৃতির পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ সন্দেহ নেই, তাই হাজার হাজার বছর পূর্বের মানুষের আশাআকাঙ্ক্ষা আমাদের থেকে খুব আলাদা ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সমাজের চরিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে পুরানো পথ অনেক ক্ষেত্রেই আর সমস্যার সমাধান করতে পারছে না।
এই দুই সমস্যার প্রতি চোখ বন্ধ রেখে নিজের বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতা বিজ্ঞানীদের অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করা গেলেও মেঘনাদ সাহা সেই দলে পড়বেন না। বিজ্ঞানের গজদন্ত মিনার থেকে নেমে এসেছিলেন তিনি; তবে বিজ্ঞানকে পরিত্যাগ করে নয়। আদ্যন্ত বিজ্ঞান জগতের মানুষ মেঘনাদ ধর্ম, সমাজ ইত্যদিকেও বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতেই দেখেছিলেন। গোলাপি চশমা দিয়ে প্রাচীন যুগকে দেখার তিনি বিরোধী ছিলেন। আবার প্রাচীন সমাজের এক মূল চালিকাশক্তি যে ধর্ম, সে বিষয়েও তিনি সচেতন ছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে নিজের কথা নিয়ে যাওয়ার বিষয়েও তিনি সচেষ্ট ছিলেন। সেই বিষয়ে তাঁর কয়েকটি লেখা এই বইতে সংকলিত হয়েছে। বহু দশক আগে লেখা হলেও আজও সেগুলি সমান প্রাসঙ্গিক।
এই সংকলনের প্রথম রচনাটি ব্যতীত বাকি লেখাগুলি ভারতবর্ষ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে যেমন মেঘনাদের লেখা ছিল, তেমনি ছিল তার সমালোচনা ও মেঘনাদের প্রত্যুত্তর। বোঝার সুবিধার জন্য সাধারণভাবে মেঘনাদ সাহার রচনার সঙ্গে সেই সমালোচনাগুলিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়, এখানেও তা করা হয়েছে। এই ধরনের সম্পাদনার কাজে আমার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। তাই এই সংকলনভুক্তির সময় রচনাগুলির ক্ষেত্রে কী করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রথমেই পেশ করা যাক।
প্রবন্ধগুলির বয়স আশি বছরের বেশি, সেগুলিকে আধুনিক পাঠকের কাছে আনার জন্য কিছু টীকা যোগ করা হয়েছে। খুব সুপরিচিত ভারতীয় ব্যক্তিত্ব ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হয়েছে। বিদেশি সভ্যতা, স্থান ইত্যাদির ক্ষেত্রেও টীকা যোগ করা হয়েছে। লেখাগুলিতে ইতিহাসের কালনির্ণয় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে, তাই প্রয়োজনে কালনির্দেশ করা হয়েছে। মূলত সেই কারণে গ্যালিলিও, নিউটন বা ডারউইনের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রেও টীকা পাওয়া যাবে। বই বা রচনার ক্ষেত্রে প্রকাশের তারিখ, এবং প্রয়োজনে পৃষ্ঠা সংখ্যা দেওয়া আছে।
লেখাগুলিতে বেশ কিছু সংস্কৃত বা ইংরাজি উদ্ধৃতি আছে। তাদের উৎসগুলি খুঁজে বার করার চেষ্টা করা হয়েছে, অবশ্য সব ক্ষেত্রে সাফল্য আসেনি। বিশেষ করে সংস্কৃত উদ্ধৃতিগুলির ক্ষেত্রে পত্রিকাতে বেশ কিছু জায়গায় কিছু ভুল ছাপা হয়েছে, সেই ত্রুটি লেখকের না হরফশিল্পীর বোঝার এখন কোনো উপায় নেই। সূর্যসিদ্ধান্ত থেকে উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে কিছু অশুদ্ধি ছিল, খুব সম্ভবত সেগুলি পত্রিকাতে মুদ্রণের ত্রুটি। মেঘনাদ সাহা স্বামী বিজ্ঞানানন্দের পুস্তক থেকে উদ্ধৃত করেছেন, সেই পুস্তক অনুসারে সংশ্লিষ্ট ত্রুটিগুলি সংশোধন করা হয়েছে। একইভাবে আর্যভটের গীতিকাপাদ থেকে উদ্ধৃত শ্লোকটিতেও মুদ্রিত রূপে ত্রুটি ছিল। এই ধরনের ভুল সংশোধন করেছি। বাহুল্য বোধে এগুলি অবশ্য পৃথকভাবে উল্লেখ করিনি। মোহিনীমোহন দত্ত লিখিত প্রবন্ধের ক্ষেত্রে দুটি উদ্ধৃতি মূল বইটিতে খুঁজে পাইনি, বা বিকৃত রূপে ছাপা হয়েছে। প্রবন্ধটি ভারতবর্ষে মুদ্রিত হওয়ার পূর্বে মূল বইটির কোনো দ্বিতীয় সংস্করণ হয়েছে বলেও জানতে পারিনি। সংশ্লিষ্ট টীকাগুলিতে সেই কথা পাওয়া যাবে। কোনো কোনো সংস্কৃত বা ইংরাজি বাক্যের বাংলা অনুবাদ লেখার মধ্যেই পাওয়া যাবে। আশি বছর আগের ভারতবর্ষ পত্রিকার পাঠকরা সম্ভবত সংস্কৃতে আমাদের যুগের থেকে বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন; তাই সংস্কৃত উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে অনুবাদ না থাকলে টীকাতে তা যোগ করা হয়েছে। ইংরাজি উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে নতুন করে অনুবাদের প্রয়োজন বোধ করিনি। মেঘনাদ কখনো কখনো তাঁর অন্য লেখার উল্লেখমাত্র করেছেন, যথাসম্ভব সেই লেখাগুলির উৎস দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সংকলনের টীকাগুলির সঙ্গে বিভ্রান্তি এড়াতে মূল নিবন্ধগুলির পাদটীকাগুলি লেখার মধ্যেই বন্ধনীতে বাঁকা অক্ষরে দেখানো হয়েছে।
বানানের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। বাংলা শব্দে রেফ-এর ক্ষেত্রে দ্বিত্ব বর্জন করা হয়েছে এবং কয়েকটি অশুদ্ধ বানান শুদ্ধ করা হয়েছে। মেঘনাদ একটী, দুটী ইত্যাদি লিখেছেন, সেগুলিকে আমাদের চেনা রূপে লেখা হয়েছে। এছাড়া বানান ও ভাষার ক্ষেত্রে 'ভারতবর্ষ’ পত্রিকাতে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলির ক্ষেত্রে রূপের বিশেষ কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
এবার আসে লেখাগুলির প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনার কথা। এই প্রসঙ্গে বলা দরকার, মেঘনাদের মতের সঙ্গে সবসময় যে আমি একমত তা নয়, তবে তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা সম্ভবত হয়তো সম্পাদকের কাজ নয়। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে মেঘনাদ এগুলি লিখেছিলেন, তা আলোচনা করতে গেলে কিছুটা ব্যক্তিগত মতকে এড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে এই প্রবন্ধগুলি আজও প্রাসঙ্গিক, তাই পাঠক ইচ্ছা করলে এই ভূমিকার অবশিষ্ট অংশ ছেড়ে মূল সংকলনে চলে যেতে পারেন।
খুব সংক্ষেপে মেঘনাদের জীবন কথা আমরা জেনে নিই। মেঘনাদের জন্ম ১৮৯৪ সালে ঢাকার কাছে শেওড়াতলি গ্রামে অতি দরিদ্র পরিবারে। জাতের বিচারেও তাঁরা ছিলেন তথাকথিত নীচু জাতের অন্তর্ভুক্ত। এই দুই কারণে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য তাঁকে তীব্র সংগ্রাম করতে হয়েছিল। প্রেসিডেন্সি কলেজে উচ্চশিক্ষা লাভের পরে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগে তিনি ও তাঁর সহপাঠী সত্যেন্দ্রনাথ বসু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনির্মিত বিজ্ঞান কলেজে অধ্যাপনা ও গবেষণা শুরু করেন। এই সময়েই ১৯২০ সালে তিনি জ্যোতির্পদার্থবিদ্যাতে আয়নন সমীকরণ আবিষ্কার করেন যা তাঁকে বিজ্ঞানজগতে বিশ্বখ্যাতি এনে দেয়। অল্পদিন বিদেশে কাটিয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। ১৯২৩ সালে তিনি এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৩৮ সালে আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে ফিরে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স যা পরে পৃথক কেন্দ্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং এখন তাঁর নাম বহন করে। তিনি নির্দল হিসাবে দাঁড়িয়ে প্রথম লোকসভাতে জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে অকস্মাৎ তাঁর মৃত্যু হয়।
এই সংকলনের প্রথম প্রবন্ধটি The Cultural Heritage of India: Sri Ramakrishna Centenary Memorial বইয়ের তৃতীয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। এটি লেখা হয়েছিল ইংরাজিতে। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের (১৮৩৬-১৮৮৬) জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে এই সংকলনে স্থান পেয়েছিল ঠিক একশোটি প্রবন্ধ। প্রথম খণ্ডের শুরুতেই প্রকাশক ও জন্ম শতবার্ষিকী কমিটির প্রকাশনা উপসমিতির আহ্বায়ক স্বামী অবিনাশানন্দের লিখিত ভূমিকাতে এই প্রকাশনার উদ্দেশ্য জানতে পারি। তিনি লিখেছিলেন, ‘So far as the philosophical aspects are concerned, the aim of the proposed volume is not to bring out a new book on the history of Indian philosophy, nor merely to describe the various religious systems and sects, but to attempt to show the hopes and aspirations of the race, the meaning and value of life as the great teachers, saints and propounders of the different schools taught and illustrated in their own lives, and how their respective followers understood these teachings and strove to live up to them in their everyday life and conduct.’ মেঘনাদের প্রবন্ধটি এই উদ্দেশ্য কতটা পূরণ করেছিল তা পাঠক বিচার করবেন। ১৯৩৭ সালে তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হলেও লেখা থেকে মনে হয় প্রবন্ধটি কয়েকবছর আগে অর্থাৎ ১৯৩৩-১৯৩৪ সালে লেখা হয়েছিল।
তৃতীয় খণ্ডটি ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে ভারতীয় সভ্যতার কৃতিত্ব নিয়ে আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট ছিল। এর মধ্যে অন্যতম বিষয় ছিল বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস। এই বিষয়ে লেখা প্রবন্ধগুলির সবগুলিই ছিল জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়ন, আয়ুর্বেদ, উদ্ভিদবিদ্যা ইত্যাদি বিজ্ঞানে অতীতে বা বর্তমানকালে ভারতবর্ষে অর্জিত সাফল্যের কাহিনি, একমাত্র মেঘনাদের লেখাটিই ছিল ব্যতিক্রম। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে চিন্তাশীল মানুষ মাত্রেই মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, প্রবন্ধে সেই কথাই উঠে এসেছে। 'বিজ্ঞান ও ধর্ম' নামক এই প্রবন্ধে মেঘনাদ এমন এক নতুন ধর্মকে আহ্বান জানিয়েছেন যে বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি অবলম্বন করবে। মেঘনাদ সারা জীবন সমস্যার সমাধানে বিজ্ঞানের প্রয়োগের উপর জোর দিয়েছিলেন; এই সংকলেনের অন্য নিবন্ধগুলিতেও আমরা তার পরিচয় পাব।
এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ সম্পর্কে আর একটিই কথা বলার আছে। মেঘনাদ এভাবে শুরু করেছিলেন, "পশ্চিমা জাতিগুলি চিরকাল বিশ্বাস করিয়া আসিয়াছে যে কদাচিৎ কখনও দুর্ভিক্ষ, মহামারী, যুদ্ধ প্রভৃতি বিপর্যয় ঘটিলেও পৃথিবীর ক্রমবর্ধমান অগ্রগতি অক্ষুণ্ণই আছে। এই বিশ্বাসই চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে তাহাদের অত্যাশ্চর্য সাফল্যের মূলে।" তার পরে তিনি লিখেছেন বর্তমানে সেই বিশ্বাস থেকে পশ্চিমি জগৎ আস্তে আস্তে সরে আসছে। এখানে মেঘনাদ একটু অত্যুক্তি করেছিলেন সন্দেহ নেই, পাশ্চাত্যের জাতিরাও চিরকাল প্রগতির ধারণাতে বিশ্বাসী ছিল না। মধ্যযুগে তারাও বিশ্বাস করত যে নতুন কিছু জানার নেই, সবই প্রাচীন পণ্ডিতরা বলে গেছেন। খ্রিস্টধর্ম প্রাতিষ্ঠানিক চেহারা নেওয়ার পর এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয়েছিল। প্রাচীন গ্রিক চিন্তাবিদরা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে পড়েছিলেন। ইসলামের অভ্যুত্থানের পরে ধর্মযুদ্ধের সময় পশ্চিমী জগৎ আবার নতুন চিন্তার সংস্পর্শে আসে। কিন্তু আরব দার্শনিকেরাও প্রাচীন চিন্তাবিদদের, বিশেষ করে অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা করার কথা ভাবতে পারেননি; সেই চিন্তার দৈন্য ইউরোপেও সংক্রামিত হয়েছিল। কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার তাই মানুষের চিন্তার ইতিহাসেও এক যুগান্তকারী ঘটনা, কারণ প্রাচীন গ্রিক বা রোমানদের লেখায় সেই নতুন মহাদেশের কথা ছিল না। ইউরোপীয় ভাষাসমূহে ‘ডিসকভারি’ বা সমার্থক শব্দগুলির ইতিহাস সেই পরিবর্তনের সাক্ষী। মেঘনাদ তা জানতেন না এমন, নয়, এই সংকলনের অন্য প্রবন্ধেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। চিন্তা ও কর্মের ক্ষেত্রে ইউরোপের যে অত্যাশ্চর্য সাফল্যের কথা মেঘনাদ বলেছেন, মধ্যযুগে তা নিতান্তই অনুপস্থিত ছিল।
অবশিষ্ট সব কটি প্রবন্ধ এক সুত্রে গাঁথা। এই রচনাগুলির পিছনে এক ইতিহাস আছে। গান্ধীজীর চিন্তাধারা অনুসরণ করে কংগ্রেসের মূল অংশ মনে করত চরকা ও কুটিরশিল্পই দেশের বিকাশের একমাত্র পথ, এ সম্পর্কে মেঘনাদের তীব্র আপত্তি ছিল। তাঁর মত ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সোভিয়েত ইউনিয়নের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার চোখ-ধাঁধানো সাফল্য সেই মুহূর্তে অন্যান্য পিছিয়ে পড়া দেশকে এগোনোর পথের দিশা দেখাচ্ছে। সোভিয়েত মডেলের একটা মূল কথা ছিল বিজ্ঞানের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে পরিকল্পনামাফিক ব্যাপক অংশের জনগণের উন্নয়ন; শুধু মেঘনাদ নয়, সারা পৃথিবীতে অনেক চিন্তাবিদই তাতে প্রভাবিত হয়েছিলেন।
মেঘনাদের শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বলেছিলেন যে একটা দেশ কত এগিয়ে, তা তার সালফিউরিক অ্যাসিড ও ইস্পাত তৈরির পরিমাণ থেকে বোঝা যায়। প্রফুল্লচন্দ্র নিজে রসায়ন শিল্পের উন্নতিকল্পে বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠা করেছেন। পক্ষান্তরে যুক্তপ্রদেশের কংগ্রেসি মন্ত্রীসভার শিল্পমন্ত্রী কৈলাসনাথ কাটজু একটা দেশলাই বানানোর কারখানার উদ্বোধন করে দেশ ভারি শিল্পের পথে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছেন, এ কথা জেনে মেঘনাদের মনে হল দেশের বিশাল সংখ্যক দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতির জন্য ভারি শিল্পের প্রয়োজনীয়তা কংগ্রেসকে বোঝাতে হবে।
১৯৩৮ সালে কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন সুভাষচন্দ্র, তাঁর সঙ্গে মেঘনাদের ভালোই যোগাযোগ ছিল। ১৯২২ সালে অবিভক্ত বাংলাতে যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, মেঘনাদ ছিলেন তার ত্রাণ কমিটির সম্পাদক। সুভাষচন্দ্র কমিটির পক্ষ থেকে ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গে। সে বছরই সুভাষচন্দ্রের আমন্ত্রণে মেঘনাদ বঙ্গীয় যুবক সম্মেলনের সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালের আগস্ট মাসে মেঘনাদ প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান সায়েন্স নিউজ অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সাধারণ সভাতে তাঁকে সভাপতি করা হয়। সেই সভাতে মেঘনাদ তাঁর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করেন, May I enquire whether the India of future is going to revive the philosophy of village life, of bullock cart, thereby perpetuating servitude, or is she going to be a modern industrialized nation which, having developed all her natural resources will solve the problem of poverty, ignorance and defence and will take an honoured placed in the comity of nations and begin a new cycle in civilization?’ সুভাষচন্দ্র উত্তরে বলেন, "... national reconstruction will be possible only with the aid of science and our scientists.” মেঘনাদের সঙ্গে আলোচনার পরে সোভিয়েত মডেলের অনুসরণে সুভাষচন্দ্র তৈরি করলেন জাতীয় পরিকল্পনা কমিটি। এই কমিটিই স্বাধীনতার পরে প্ল্যানিং কমিশনে রূপান্তরিত হয়, যা অবশ্য বর্তমানে বিলুপ্ত। মেঘনাদ এই কমিটির কাজে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
তবে মেঘনাদের লেখা থেকেই স্পষ্ট যে তিনি রাশিয়ার পদ্ধতি হুবহু ভারতে চালাতে চাননি। এই সংকলনের দ্বিতীয় প্রবন্ধ 'একটি নতুন জীবনদর্শন থেকে উদ্ধৃত করি, ‘যদি কোনো আদর্শকে ফলবান করিতে হয়, তাহা হইলে উহাকে কেবল বস্তুবাদের উপর প্রতিষ্ঠা করাই যথেষ্ট নয়। রুশিয়ার বর্তমান জাতীয় জীবন খানিকটা অপূর্ণ, কারণ এখানে আদর্শে ও কার্যের ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সম্পূর্ণ অভাব। যদি আমরা আমাদের সভ্যতার উৎসকে পুনরুজ্জীবিত করিতে চাই, তাহা হইলে আমাদের জীবনাদর্শকে সামাজিক মৈত্রী, সার্বজনীন প্রীতি ও নৈতিকতার উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে।’
দিল্লিতে কংগ্রেস কমিটির মিটিঙে একদিন পরে পৌঁছেছিলেন মেঘনাদ; আগের দিনই জাতীয় পরিকল্পনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন বিখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বেশ্বরাইয়া। কিন্তু মেঘনাদ তাতে সন্তুষ্ট হতে পারলেন না, তাঁর মনে হল কমিটির শীর্ষে কোনো প্রধান রাজনৈতিক নেতা না থাকলে তার সুপারিশের কোনো মূল্য থাকবে না। তাঁর অনুরোধে বিশ্বেশ্বরাইয়া জহরলাল নেহরুর সমর্থনে সভাপতি পদ থেকে সরে দাঁড়াতে রাজি হলেন।
এলাহাবাদে অধ্যাপনার সুবাদে জওহরলালের সঙ্গে মেঘনাদের যোগাযোগ ছিল। প্ল্যানিং কমিটির সভাপতি হওয়ার জন্য জহরলাল নেহরুকে অনুরোধ করলেন মেঘনাদ। তিনি রাজি হলেও সাহার সন্দেহ গেল না, নেহরুর পক্ষে বাস্তবে গান্ধীজীর প্রভাবকে অগ্রাহ্য করা কঠিন। তাই এমন একজনের শরণাপন্ন হলেন যাঁর কথা গান্ধী বা নেহরু কেউই সহজে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। ১৯২১ সালে জার্মানিতে তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা হয়েছিল, কবি তাঁকে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সতের বছর পরে সেই আমন্ত্রণ রক্ষা করার সময় হল। রবীন্দ্রনাথও দেশের উন্নয়ন বিষয়ে তাঁর বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হলেন, জহরলালকে চিঠি দিলেন।
(পরবর্তীকালে অবশ্য জহরলালের সঙ্গে মেঘনাদের মতের মিল হয়নি। প্রধানমন্ত্রী নেহরু কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ার উপর জোর দিয়েছিলেন; মেঘনাদের মত ছিল গবেষণার মূল কেন্দ্র হওয়া উচিত বিশ্ববিদ্যালয়। সারা পৃথিবীতেই বিশ্ববিদ্যালয়ই গবেষণার মূল কেন্দ্র; অনেকেই মনে করেন নেহরুর নীতি অনুসরণের ফলে আমাদের দেশে বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশ ব্যাহত হয়েছে। তবে সেই আলোচনা এই অরিধির বাইরে।)
‘একটি নতুন জীবন দর্শন’ শীর্ষক এই বক্তৃতাতে গান্ধীজীর নীতি, অর্থাৎ গ্রামে প্রত্যাবর্তন এবং কুটির ও হস্তশিল্পের উপরেই নির্ভরতার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি যখন লোকসভা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ভাবেন, তখন তিনি কংগ্রেসের কাছেই প্রথম গিয়েছিলেন। কংগ্রেস শর্ত দেয় যে গান্ধীজীর চরকা ও কুটির শিল্পনীতিকে তিনি বিজ্ঞানবিরোধী ও পশ্চাৎমুখী বলেছেন, সেই কথা তাঁকে প্রত্যাহার করতে হবে। সে কথা মেনে না নিয়ে তিনি নির্দল প্রার্থী হিসাবে বামপন্থীদের সমর্থনে প্রথম লোকসভাতে উত্তর কলকাতা কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সংকলনের প্রবন্ধগুলি পড়লে বোঝা যাবে মেঘনাদ কেন গান্ধীজীর নীতির বিরোধিতা করেছিলেন।
মেঘনাদ আধুনিক রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনে বিজ্ঞানের প্রয়োগের উপর জোর দিয়েছিলেন। সেই কথা আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বিজ্ঞানপ্রযুক্তির বিকাশের উপর জাতিভেদপ্রথার কুফলের কথা বলেন। তিনি স্বয়ং এই প্রথার শিকার হয়েছিলেন। মেঘনাদের আলোচনাতে তাঁর শিক্ষক আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের প্রভাব স্পষ্ট। প্রফুল্লচন্দ্র ‘A History of Hindu Chemistry’-তে লিখেছিলেন, ‘In ancient India the useful arts and sciences, as distinguished from mere handicrafts, were cultivated by the higher classes.... unfortunately a knowledge of these perished with the institution of the caste system in its most rigid form.’
বক্তৃতাটি কোথায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল জানতে পারিনি। তবে প্রকাশের পরে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হল তার থেকেই এই সংকলনের পরের প্রবন্ধগুলির জন্ম। প্রবন্ধটি ছিল গান্ধীজীর নীতির সমালোচনা, কিন্তু গান্ধীবাদীদের নয়, হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসীদের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মেঘনাদ। তার মধ্যে প্রধান ছিল পন্ডিচেরির অরবিন্দ আশ্রমের অনিলবরণ রায়ের লেখাটি। সেটি ভারতবর্ষ পত্রিকাতে ১৩৪৬ সালের বৈশাখ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। অনিলবরণ জাতিভেদপ্রথাসহ প্রাচীন ভারতের রীতিনীতির সপক্ষে নানা যুক্তির অবতারণা করেন। তিনি বলেন পশ্চিমী সমালোচকদের কথার পুনরুক্তি না করে মেঘনাদের উচিত ছিল হিন্দুর দর্শন, ধর্ম ও ভারতের ইতিহাস সম্বন্ধে প্রকৃত তথ্য জানার কোনো চেষ্টা করা।
ছোটবেলা থেকে জাতিভেদ প্রথা ও দারিদ্রের শিকার মেঘনাদ । কলকাতার নাগরিক সমাজেও পূর্ববঙ্গ থেকে আগত তরুণ নানা সময়ে ব্যঙ্গের শিকার হয়েছেন। নিজের কৃতিত্বে তিনি বিশ্বের দরবারে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও বিদেশী বিজ্ঞানীদের মুরুব্বিয়ানার মনোভাবও তাঁকে আহত করত। শৈশব-কৈশোর-প্রথম যৌবনের সেই অবহেলা ও অপমান তাঁর মনে স্থায়ী দাগ কেটে গিয়েছিল। অনিলবরণ রায়ের উপদেশ দানের ভঙ্গি এবং জাতিভেদ প্রথার প্রতি সমর্থন তাঁর পছন্দ হয়নি। ফল স্বরূপ আমরা ভারতবর্ষ পত্রিকাতে পেলাম অসাধারণ ক'টি প্রবন্ধ।
প্রথম প্রবন্ধটি তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে ভারতবর্ষ পত্রিকাতে ১৩৪৬ সালের জৈষ্ঠ্য ও আষাঢ় এবং পৌষ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। মেঘনাদের সম্ভবত ইচ্ছা ছিল পরপর তিন মাসেই লেখাটি সমাপ্ত করার; কিন্তু কাজের চাপে তা হয়ে ওঠেনি। পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় লেখা হয়েছিল, "অধ্যাপক সাহাকে জাতীয় পরিকল্পনা কমিটীর সভা উপলক্ষে প্রায় এক মাস বোম্বায়ে বাস করিতে হইয়াছিল সেজন্য তাঁহার প্রবন্ধের শেষাংশ শ্রাবণে প্রকাশিত হইল না।” প্রথমটির কিছু বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছিল, তখন মেঘনাদ আরো একটি লেখা লেখেন। ফাল্গুন মাসে সেটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরের মাসে ভারতবর্ষ-এ মোহিনীমোহন দত্তের নামে মেঘনাদের লেখার সমালোচনা করে একটি লেখা বেরোয়, একই সঙ্গে ছাপা হয় মেঘনাদের প্রত্যুত্তর। অনেক পরে শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়ের এক চিঠির উত্তরে অনিলবরণ রায় জানান মোহিনীমোহন দত্তের নামে তিনিই সমালোচনাটি লিখেছিলেন।
এই প্রবন্ধগুলির বিস্তারিত আলোচনাতে যাওয়ার প্রয়োজন এই ভূমিকাতে নেই। মেঘনাদ নানা বিষয় আলোচনাতে এনেছেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মত উদ্ধৃত করে এবং জ্যোতির্বিদ্যার সাক্ষ্য থেকে ঋক্বেদ রচনার কাল নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। প্রাক-বৈদিক সভ্যতার দেবদেবীরা কেমনভাবে হিন্দু ধর্মের মধ্যে স্থান পেয়েছে তা দেখিয়েছেন। জাতীয় পরিকল্পনার উদ্দেশ্য এবং দেশের উন্নয়নে বিজ্ঞান প্রযুক্তির ভূমিকা তিনি এই লেখাতে ব্যাখ্যা করেছিলেন। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি কেমনভাবে ঘটে, বিজ্ঞানের যুক্তি বলতে কী বোঝায় – এই সমস্ত নিয়ে একজন প্রথম শ্রেণির বিজ্ঞানীর মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় পঞ্জিকাতে ভুল থাকার ফলে কেমনভাবে আমাদের বছর গোনাতে ভুল রয়ে গেছে তা বুঝিয়ে দিয়েছেন; স্মরণীয় যে পরে তিনি স্বাধীন ভারতে পঞ্জিকা সংস্কারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ভারতীয় শাস্ত্রের ধারণার প্রতি বিদেশী বিজ্ঞানীদের বা আধুনিক বিজ্ঞানের তথাকথিত সমর্থন প্রসঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করে মেঘনাদ দেখান যে তাঁর সমালোচকরা বিজ্ঞান আদৌ বোঝেননি বা ভুল ব্যাখ্যা করছেন।
অনিলবরণ প্রাচীন ভারতীয় ও বিশেষ করে হিন্দু সংস্কৃতি বিষয়ে মেঘনাদের জ্ঞানের প্রতি কটাক্ষ করেছিলেন; মেঘনাদের লেখাতে তার যোগ্য জবাব পাওয়া যাবে। এখানে আমরা কয়েকটি কথা যোগ করতে চাই। মেঘনাদ কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার বা লেখার আগে সেই বিষয়ে পড়াশোনা করে নিতেন। এখানে আমরা এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সহকর্মী সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের বিভাগীয় প্রধান বিশিষ্ট পণ্ডিত ক্ষেত্রেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মত উদ্ধৃত করতে পারি। ১৯৭৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নর্দান ইন্ডিয়া পত্রিকাতে এক চিঠিতে তিনি লেখেন, “ইতিহাসের প্রতি তাঁর (মেঘনাদ সাহার) ছিল গভীর ভালোবাসা। ইতিহাস তিনি অত্যন্ত বিস্তৃতভাবে অধ্যয়ন করেছেন। ... ইতিহাসের নানা বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম। বিশেষত প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ববিদ্যা বিষয়ে। ... মোহেঞ্জোদারো সভ্যতার শিলালিপি উদ্ধারে ড. সাহার খুব আগ্রহ ছিল। এই বিষয়ে তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেছিলেন। ... ড. সাহার এই ইতিহাস প্রীতির পাশাপাশি পৃথিবীর নানা ধর্ম বিষয়ে আগ্রহ ছিল। তিনি এসব বিষয় অত্যন্ত গভীরভাবে পড়েছেন।” সায়েন্স এন্ড কালচার পত্রিকায় ভারতে প্রত্নতাত্ত্বিক খনকার্য, মহাভারতের কালনির্ণয়, সিন্ধুসভ্যতা ইত্যাদি বিষয়ে কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।
পাঠক দেখবেন লেখাতে জায়গায় জায়গায় খরশান ব্যঙ্গের আশ্রয় নিয়েছিলেন মেঘনাদ। প্রাচীন শাস্ত্র থেকে যাঁরা আধুনিক বিজ্ঞানের তত্ত্ব খুঁজে বার করেন, তাঁদের সম্পর্কে মেঘনাদের ‘সবই ব্যাদে আছে’ ব্যঙ্গোক্তি আজ প্রবাদে পরিণত। মেঘনাদের ভাষা জায়গায় জায়গায় বেশ কঠোর, তার কারণ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। বলেছিলেন, ‘আমি সনাতনীদের এই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, আমার বন্ধু যেমন বলতেন ঠাট্টা করে, সবই “ব্যাদে আছে”, “বেদে আছে” এই মনোভাবটা অনেক সময়ে যদি নিদান করতে হয় তাহলে মাঝে মাঝে শক্ত কথাই বলতে হয়।’ (কথা প্রসঙ্গে, সত্যেন্দ্রনাথ বসু রচনা সংকলন, তৃতীয় সংস্করণ, বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ, পৃ ২৭৭)
এই প্রবন্ধগুলি রচনার পরে আট দশক কেটে গেছে। ভাবলে দুঃখ হয় যে প্রবন্ধগুলি আজও প্রাসঙ্গিক; অপবিজ্ঞান প্রচারকরা এখনও কুযুক্তির আশ্রয় নিয়ে চলেছেন। বেদ না পড়েই তাঁরা বেদের মধ্যে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির সমস্ত আধুনিক আবিষ্কারকে খুঁজে পান, মহাকাব্য ও পুরাণের গল্পের মধ্যে শল্যচিকিৎসাকে সন্ধান করেন। বিজ্ঞান মানসিকতার দিক থেকেও আমরা এখনো খুব বেশি এগোতে পারিনি।
এখানেই শেষ করা যেত, কিন্তু দীর্ঘদিন বিজ্ঞানজগতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের সুবাদে একটা কথা মনে আসে, যা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। মেঘনাদের লেখা ও তাঁর বিরুদ্ধ সমালোচনার ক্ষেত্রে একটা পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। মেঘনাদের সমালোচক জগৎ বা বিবর্তনের উদ্দেশ্য খুঁজেছেন। মোহিনীমোহন দত্তের নামে লেখা প্রবন্ধের উদ্ধৃতিগুলি থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। ওই প্রবন্ধে The Great Design নামের যে সংকলনটির উল্লেখ করা হয়েছে, তার একটা মূল বক্তব্য ছিল যে এমন কোনো শক্তি বা চৈতন্যের অস্তিত্ব আছে যা বিবর্তনকে গাইড করছে। ডারউইনিয় বিবর্তনবাদকে যাঁরা মেনে নিতে পারছিলেন না অথচ অস্বীকারও করতে পারছিলেন না, তাঁরাই এই শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন। আধুনিক যুগে 'ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন'-এর তত্ত্ব একই কথা বলে, কিন্তু সেটা একই রকম অবৈজ্ঞানিক। পক্ষান্তরে সদ্যপ্রয়াত পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী স্টিভেন ভাইনবার্গ যখন তাঁর বিখ্যাত বই ‘The First Three Minutes’-এ লিখেছিলেন, ‘The more the Universe seems comprehensible, the more it also seems pointless.’ বিজ্ঞানীমহল থেকে এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে অনেকেই সোচ্চার হন, বলেন যে ব্রহ্মাণ্ডের কোনো উদ্দেশ্য থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। হয়তো এই বিপুল ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের নশ্বর জীবনের কোনো উদ্দেশ্য আছে ভেবে আমরা মানসিক শান্তি পেতে পারি, কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে তার কোনো অর্থ নেই। মেঘনাদ দেশের মানুষের জীবনযাপনের উন্নতি চান, তার পথ দেখাবে বিজ্ঞানপ্রযুক্তি; কোনো কাল্পনিক আশা দিয়ে নিজেকে ভোলাতে তিনি রাজি নন।
টীকা নির্মাণের কাজে শ্যামল চক্রবর্তী সম্পাদিত বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা রচনা সংকলন কিছু ক্ষেত্রে কাজে লেগেছে। ক্ষেত্রেশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চিঠিটিও ওই বই থেকে পেয়েছি। শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত Collected Works of Meghnad Saha থেকে মেঘনাদ সাহার ইংরাজি ভাষায় লেখা প্রবন্ধের খোঁজ পেয়েছি। অত্রি মুখোপাধ্যায় লিখিত মেঘনাদের জীবনী 'অবিনাশ মেঘনাদ’ থেকে নানা তথ্য ব্যবহার করেছি। শ্যামল ভদ্র, রিক চট্টোপাধ্যায় ও অজয় ঘটক সম্পাদিত Darwin of Stellar Astrophysis: Meghnad Saha বই থেকে কিছু তথ্য পেয়েছি। প্রকাশক রাজা পোদ্দারের উৎসাহেই এই সংকলন প্রকাশিত হল, তাঁকে ধন্যবাদ জানাই।
প্রকাশক - খোয়াবনামা প্রান্তজনের কথা
প্রচ্ছদঃ Dayamoy Bandyopadhyay
মূল্য- ১৭০ টাকা
প্রকাশ কাল- ২২ শে শ্রাবণ, ৮ আগস্ট
কলকাতা বইমেলা ২০২৬-এ স্টল নাম্বার ৪৬৯
অনলাইনে বই পেতে হোয়াটসঅ্যাপ করুন এই নাম্বারে - 70030 85933

No comments:
Post a Comment