Monday, 19 November 2018

শতবর্ষ পরে সাহা সমীকরণ




শতবর্ষ পরে সাহা সমীকরণ

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

      আজ থেকে একশো বছর আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে  বসে তরুণ গবেষক মেঘনাদ সাহা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলেন নক্ষত্রলোক তথা মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি। অধিকাংশ যুগান্তকারী আবিষ্কারের মতোই সাহার গবেষণার সম্পূর্ণ তাৎপর্য বুঝতে বিজ্ঞানীদের অনেক সময় লেগেছে, এমন কি স্বয়ং আবিষ্কর্তাও তা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন নি। মেঘনাদের ক্ষেত্রে অবশ্য তার মূল কারণ বিজ্ঞানের কেন্দ্র অর্থাৎ ইউরোপ-আমেরিকা থেকে তাঁর দূরত্ব। সে দূরত্ব শুধুমাত্র ভৌগোলিক নয়, পরাধীন দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি তাচ্ছিল্য ও ঔদাসীন্য যে মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করেছিল সে বিষয়ে মেঘনাদ যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। সে সমস্ত পৃথক আলোচনার বিষয়, আমরা এই নিবন্ধে শুধুমাত্র সাহা সমীকরণের উৎস ও বিশেষ করে জ্যোতির্পদার্থবিদ্যাতে তার তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করব।



      আমরা সবাই বর্ণালী কথাটা শুনেছি। বর্ণালীতে আলো বিভিন্ন রঙে ভেঙে যায়। বিভিন্ন রঙের আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আলাদা আলাদা। সূর্যের বা অন্যান্য নক্ষত্রের আলোর বর্ণালীতে আমরা উজ্জ্বল পশ্চাৎপটের ওপর কালো কালো দাগ দেখতে পাই। এই ধরনের বর্ণালীকে বলে শোষণ বর্ণালী। এর উৎস কী?  বিভিন্ন মৌলিক পদার্থ বিভিন্ন রঙের আলো শোষণ করে। সূর্যের কেন্দ্রের অঞ্চল (যেখানে নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়াতে তাপ উৎপন্ন হয় বলে আমরা এখন জানি) প্রচণ্ড উত্তপ্ত, সেখান থেকে আলো বেরোয়। সূর্যের একদম বাইরের স্তর আলোকমণ্ডল (photosphere) ও বর্ণমণ্ডল (chromosphere) যে সমস্ত মৌল আছে, তারা তাদের চরিত্র অনুযায়ী কোনো কোনো তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে, ফলে সেই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছায় অপেক্ষাকৃত অনেক কম পরিমাণে। বর্ণালীতে সেই সমস্ত তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জায়গায় কালো দাগগুলো দেখতে পাওয়া যায়। তাই সূর্যের বা অন্য নক্ষত্রের শোষণ বর্ণালী বিশ্লেষণ করে কোন কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জায়গায় কালো দাগ অর্থাৎ অন্ধকার, তা দেখে কোন কোন মৌলের পরমাণু সেখানে আছে তা বলা সম্ভব।
      বর্ণালীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষকরা নক্ষত্রদের কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন। তাদের নাম দেওয়া হয় O, B, A, F, G, K এবং M রঙের দিক থেকে বললে O শ্রেণির তারা নীল, তার পর রঙ ক্রমশ লালের দিকে যায়। M তারা লাল। কিন্তু এই শ্রেণি বিভাগের সঙ্গে তারকাদের গঠন বা ভৌত প্রকৃতির সম্পর্ক কী সে বিষয়ে কোনো ধারণা আমাদের ছিল না। অবশেষে ভিনের সূত্র ব্যবহার করে তারার বর্ণালী বিশ্লেষণ করে তারাদের উপরিতলের তাপমাত্রা সম্ভব হয়। তখন বোঝা গেল যে O তারাদের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশী। তারপর তাপমাত্রা কমতে থাকে। M তারাদের তাপমাত্রা সবচেয়ে কম। গত শতাব্দীর একদম শুরুতে বর্ণালীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে জার্মানিতে এজনার হার্জস্প্রুং ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি নরিস রাসেল তারাদের ঔজ্জ্বল্য ও তাদের বাইরের পিঠের তাপমাত্রার মধ্যে একটা সম্পর্ক খুঁজে পান।
      তারাদের শ্রেণি অর্থাৎ তাপমাত্রার সঙ্গে বিভিন্ন মৌলের শোষণ বর্ণালীর চরিত্রের পরিবর্তন হয়বিভিন্ন মৌল বা আয়নের তীব্রতার হ্রাস বৃদ্ধি ও হার্ভার্ড শ্রেণি বা তাপমাত্রার সম্পর্ক আমরা দেখতে পাচ্ছিলামযেমন O শ্রেণির তারাদের বর্ণালিতে হিলিয়ামের শোষণ রেখা খুব শক্তিশালী। অন্যদিকে K বা M তারাদের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাতুর রেখা খুবই তীব্র। এর সঙ্গে যোগ করতে হবে আয়নের কথা। নিস্তড়িৎ পরমাণু থেকে নক্ষত্রের অভ্যন্তরের উচ্চ তাপমাত্রায় ইলেকট্রন বেরিয়ে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে পরমাণুটি আয়নে পরিণত হবে। এই ধরনের আয়নদের রেখাও বর্ণালীতে পাওয়া যাচ্ছিল। কোনো ভাবেই নক্ষত্রদের তাপমাত্রার সঙ্গে তার বর্ণালীর সম্পর্ক বোঝা যাচ্ছিল না। মেঘনাদ সাহা এই নিয়ে চিন্তা করছিলেন। অন্য একটা সমস্যা তাঁকে ভাবিয়েছিল। সূর্যের সবচেয়ে বাইরের অংশ হল বর্ণমণ্ডল, সেখানে ক্যালসিয়াম আয়নের রেখা দেখতে পাওয়া যায়। অথচ তার ভিতরের অংশ হল আলোকমণ্ডল, সেখানে ক্যালসিয়াম আয়ন নয়, নিস্তড়িৎ ক্যালসিয়াম পরমাণুর রেখা দেখা যায়। এর কারণ কী হতে পারে?  
      ১৯১৯ সাল। মেঘনাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার ক্লাসে তাপগতিতত্ত্ব পড়াচ্ছিলেন। রাসয়ানিক বিক্রিয়ার বিষয় পড়াতে গিয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে জার্মান বিজ্ঞানী এগার্টের একটি প্রবন্ধ। এগার্ট নক্ষত্রের ভিতরে উচ্চ তাপমাত্রায় পরমাণু ও আয়নের ভেঙে যাওয়াকে তাপগতিতত্ত্বে রাসয়ানিক বিক্রিয়ার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। মেঘনাদ দেখলেন যে এগার্টের পদ্ধতিতে কয়েক বছর আগে আবিষ্কৃত নিলস বোরের পরমাণুর মডেল ব্যবহার করা প্রয়োজন। ১৯২০ সালে philosophical Magazine – এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধ সাহা যে সমীকরণ দেন, তা পরবর্তী কালে সাহা আয়নের সমীকরণ (Saha Ionization Equation) হিসেবে পরিচিত হয়েছে সাহা ধরে নেন সূর্যের মধ্যে উচ্চ তাপমাত্রার জন্য পরমাণুরা আয়ন ও ইলেকট্রনে ভেঙে যায় এবং একই সঙ্গে আয়ন ও ইলেকট্রন যুক্ত হয়ে পরমাণু গঠন করে এই দুই বিক্রিয়া তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকে সাহার গবেষণার বৈশিষ্ট্য হল যে চিরায়ত তাপগতিবিদ্যা ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে টেনে দেখান পরমাণুর আয়নন বিভব (ionization potential) এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় কোনো পরমাণুকে আয়ন ইলেকট্রনে ভাঙতে গেলে যে পরিমাণ শক্তি দিতে হয়, তাকে বলে আয়নন বিভব
      সাহার সমীকরণের রূপটি হল
log x2P/(1-x2) = -u/4.571T +2.5 logT - 6.5
এখানে P হল প্রমাণ বায়ুমণ্ডলের চাপের মাপে নক্ষত্রের ভিতর গ্যাসের চাপ, x হল গ্যাসের আয়ননের মাত্রা, u ক্যালরিতে আয়নন বিভব এবং T কেলভিন স্কেলে গ্যাসের তাপমাত্রা  জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরি নরিস রাসেল পরে দেখালেন যে P হল মুক্ত ইলেকট্রন গ্যাসের চাপ সমীকরণ থেকে দেখা যাচ্ছে এই চারটি ভৌত রাশি অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত এদের মধ্যে কিছু জানা থাকলে বাকিগুলি নির্ণয় করা সম্ভব
      সমীকরণ থেকে সাহা দেখাতে পারলেন যে সূর্যের বর্ণমণ্ডলে তাপমাত্রা, চাপ ও অন্যান্য ভৌত অবস্থা এমন যে সেখানে সমস্ত ক্যালসিয়াম পরমাণু একটি করে ইলেকট্রন ছেড়ে আয়নিত হয়ে যায় আবার কেন্দ্রের আরো কাছের আলোকমণ্ডলে তাপমাত্রা বেশী বটে, কিন্তু চাপও অনেক বেশী তাই সেখানে ক্যালসিয়াম পরমাণুর ইলেকট্রন ছাড়ার সম্ভাবনা কম ফলে আলোকমণ্ডলের বর্ণালীতে নিস্তড়িৎ ক্যালসিয়াম পরমাণুর এবং বর্ণমণ্ডলে আয়নের চিহ্ন দেখার সম্ভাবনা বেশি
      সাহার গবেষণা আরো এক সমস্যার সমাধান করলো সূর্যে রুবিডিয়াম, সিজিয়াম ইত্যাদি ধাতুর চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না সাহা বললেন এদের আয়নন বিভব কম, তাই এরা সহজে আয়নিত হয়ে যায় কোন মৌলের আয়ন যে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো শোষণ করে তা ঐ মৌলের পরমাণুর থেকে আলাদা আয়নিত হয়নি এমন অবস্থায় ঐ মৌলের পরমাণুর চিহ্ন পেতে হলে অপেক্ষাকৃত শীতল অঞ্চলে দেখতে হবে সৌর কলঙ্কের তাপমাত্রা কম, তাই সেখান থেকে আসা আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে রুবিডিয়ামের চিহ্ন পাওয়া যাবে অচিরেই দেখা গেল সাহার কথা ঠিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী হেনরি নরিস রাসেল সৌরকলঙ্কের বর্ণালীতে রুবিডিয়ামকে খুঁজে পেলেন
      সাহা এই সময় অপর একটি গবেষণা পত্র প্রকাশের জন্য পাঠিয়েছিলেন এর অল্প পরেই তিনি ইংল্যান্ডে আলফ্রেড ফাউলারের ল্যাবরেটরিতে যান ফাউলারের পরামর্শে তিনি গবেষণাপত্রটি নতুন করে লেখেন বিদেশের পরীক্ষাগারে কাজ করার সুবাদে সাম্প্রতিকতম তথ্য ব্যবহারের সুযোগ তিনি পান তার ফলে মূল তত্ত্বটি অপরিবর্তিত থাকলেও প্রবন্ধটির মানের অনেক উন্নতি ঘটে এটিও তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজের মধ্যে অন্যতম
      এই প্রবন্ধে সাহা বিভিন্ন তারার বর্ণালীর এক সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা বহু তারার বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করেছিলেন তারাদের রঙের সঙ্গে তাপমাত্রার একটা সম্পর্ক ছিল বলে বোঝা যাচ্ছিল যেমন নীল তারারা বেশী উত্তপ্ত, লাল তারাদের তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম কিন্তু তার সঙ্গে তারাদের মধ্যে ভিন্ন মৌলের পরমাণুর শোষণ বর্ণালীর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না সাহা দেখান যে তাঁর সমীকরণ সহজেই তারার তাপমাত্রার সঙ্গে শোষণ বর্ণালীর সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিতে পারে যেমন অতি উত্তপ্ত তারাতে সমস্ত হাইড্রোজেন আয়নিত হয়ে যায়, ফলে হাইড্রোজেনের শোষণ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য ঐ তারাদের বর্ণালীতে থাকে না আমরা জানি যে ধাতুর আয়নন বিভবের মান কম, সুতরাং অপেক্ষাকৃত কম তাপমাত্রাতেই ধাতু আয়নিত হয়ে যায় কোনো সাধারণ পরমাণু এবং তার আয়নের শোষণ তরঙ্গদৈর্ঘ্য কিন্তু এক নয় যদি তারার তাপমাত্রা এতই কম হয় যে কোনো ধাতুর পরমাণু আয়নিত না হয়ে অস্তিত্ব বজায় থাকতে পারে, একমাত্র তখনই এই তারার বর্ণালীতে ধাতুর পরমাণুর শোষণের চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় এভাবে সাহার কাজের ফলে এক দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হয়ে যায় আগে মনে করা হত যে বিভিন্ন তারার উপাদান হয়তো আলাদা এখন বোঝা গেল যে তা নয়, তারাদের বর্ণালীর পার্থক্য হয় মূলত তাদের তাপমাত্রার পার্থক্যের জন্য
      সাহা সমীকরণ আমাদের নক্ষত্রের ভিতরে বিভিন্ন অংশে চাপ ও তাপ নির্ণয় করার সুযোগ করে দিল। শুধু তাই নয়, এই সমীকরণ থেকেই আমরা নক্ষত্ররা কী কী মৌলিক পদার্থও দিয়ে তৈরি তা বার করতে পারি। আমরা দেখেছি যে সমীকরণ থেকে বোঝা যাচ্ছিল যে সমস্ত নক্ষত্রের উপাদানই এক। কোন মৌল কত পরিমাণে আছে, তা জানার জন্য এর আগে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। যেমন এক পদ্ধতিতে ধরা হয়েছিল যে মৌলের শোষণ রেখার তীব্রতা যত বেশি, তার পরিমাণও তত বেশি হেনরি নরিস রাসেল দেখলেন যে পৃথিবীর উপরিভাগে ভূত্বকে যে ছটি মৌল সবচেয়ে বেশি আছে, সৌর বর্ণালীতে তাদের তীব্রতার মান খুব বেশি তাই একটা ধারণা জন্মেছিল যে সূর্য ও পৃথিবী আসলে একই উপাদান দিয়ে তৈরি রাসেলেরও আগে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে হেনরি রোল্যান্ড বলেছিলেন যে পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি সূর্যের মতো হত, তাহলে তার বর্ণালীও সূর্যের মতোই হত
      আমরা দেখে নিই এই ছটি মৌল কী কী ভূত্বকে অক্সিজেন আছে ৪৬.১ শতাংশ, সিলিকন আছে ২৮.২ শতাংশ, অ্যালুমিনিয়াম ৮.২ শতাংশ, লোহা ৫.৬ শতাংশ, ক্যালসিয়াম ৪.১ শতাংশ ও সোডিয়াম আছে ২.৪ শতাংশ। সূর্যের বর্ণালী বিশ্লেষণ করে যে ঠিক এই সংখ্যাগুলোই পাওয়া যাচ্ছিল তা নয়, কিন্তু তাদের মধ্যে মিল ছিল। সাহার সমীকরণ কিন্তু অন্য কথা বলছিল, আর সে কথা বুঝতে পেরেছিলেন এক তরুণী বিজ্ঞানী সিসিলিয়া পেইন।
      সাহার সমীকরণ থেকে দেখা যাচ্ছিল যে নক্ষত্রের ভিতর সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আছে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। অথচ পৃথিবীতে হাইড্রোজেনের পরিমাণ খুব কম, হিলিয়াম নেই বললেই চলে। মেঘনাদ সমেত প্রায় কোনো বিজ্ঞানীই তাই বিশ্বাস করতে পারেন নি, ভেবেছিলেন যে কোনো কারণে হয়তো এই দুটি গ্যাসের জন্য সাহা সমীকরণ কাজ করে না। সিসিলিয়া পেইন ছিলে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটনের ছাত্রী, তিনি হেনরি রাসেলের সঙ্গেও কাজ করছিলেন। তিনিই প্রথম জোর দিয়ে বলেন যে সাহা সমীকরণ ঠিক, সূর্য সহ অধিকাংশ নক্ষত্রের মূল উপাদান হল হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। এ ব্যাপারে তিনি এডিংটন ও রাসেল দুজনের সঙ্গেই দ্বিমত পোষণ করেন। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল পেইনই ঠিক, সূর্যের মোট ভরের আটানব্বই শতাংশই হল হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম। শুধু সূর্য কেন, আধুনিক কালে আমরা জানি যে মহাবিশ্বের মধ্যে সাধারণ যে সমস্ত পদার্থ আছে, তারও প্রায় ৭৪ শতাংশ হল হাইড্রোজেন ও প্রায় ২৪ শতাংশ হিলিয়াম। বাকি সমস্ত মৌলের পরিমাণ মাত্র দুই শতাংশ
      হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের পরিমাপের গুরুত্ব জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানে খুব বেশি। প্রথমত সূর্য সহ অধিকাংশ নক্ষত্রের অভ্যন্তরে  নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়ায় চারটি হাইড্রোজেন পরমাণুর নিউক্লিয়াস মিলে তৈরি করে একটি হিলিয়াম পরমাণুর নিউক্লিয়াসএই প্রক্রিয়ায় যে শক্তি উৎপন্ন হয় তাই হল নক্ষত্র থেকে যে তাপ বা আলো বেরোয় তার উৎস। নক্ষত্রের মূল উপাদান যে হাইড্রোজেন তা না জানলে আমরা কোনোদিনই নক্ষত্রদের শক্তি আসে কোথা থেকে তা বুঝতে পারতাম না। তেমনি বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের সময় হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি হয়েছিল। সেই সময় মহাবিশ্বের তাপমাত্রা ও ঘনত্ব আমরা বিশ্বে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের অনুপাত থেকে বুঝতে পারি। এ সবই অবশ্য সাহার গবেষণার অনেক পরের ঘটনা।
      তাই সাহার এই গবেষণা তাই জ্যোতির্পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে যুগান্তর ঘটিয়েছিল বললে মোটেই বাড়িয়ে বলা হবে না দেড় দশক পরে ১৯৩৬ সালে Oxford University Press থেকে প্রকাশিত Theoretical Astrophysics গ্রন্থে লেখক রোসল্যান্ড লিখছেন, ‘…. It was the Indian Physicist Meghnad Saha who (1920) first attempted to develop a consistent theory of the spectral sequence of the stars from the point of view of atomic theory. …..From that time dates the hope that a thorough analysis of stellar spectra will afford complete information about the state of the stellar atmospheres, not only as regards the chemical composition, but also as regards the temperature and various deviations from a state of thermal equilibrium, the density distribution of the various elements, the value of gravity in the atmosphere and its state of motion. The impetus given to Astrophysics by Saha’s work can scarcely be overestimated, as nearly all later progress in this field has been influenced by it and much of the subsequent work has the character of refinements of Saha’s ideas.’ সংক্ষেপে বলা যায় যে সাহার গবেষণাই তাদের অভ্যন্তরের ভৌত অবস্থা সম্পর্কে অনেক সঠিক তথ্য পাওয়ার পথ খুলে দেয় এবং জ্যোতির্পদার্থবিদ্যাকে এক পরিমাণগত বিজ্ঞানে পরিণত করে বিখ্যাত আর্থার এডিংটনের মতে গ্যালিলিওর টেলিস্কোপ আবিষ্কারের পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সেরা দশটি আবিষ্কারের অন্যতম হল সাহা আয়নন সমীকরণ
      একশ বছর পরেও সাহা সমীকরণ কোথায় কোথায় আমাদের প্রয়োজন, সে বিষয়ে দু একটা কথা বলে শেষ করা যাক নক্ষত্রের মডেল করতে সাহা সমীকরণ দরকার হয় কারণ সেখানে আয়ন ও ইলেকট্রনের সংখ্যা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় সাহার সমীকরণ পরমাণুর আয়নন ছাড়া অন্য কাজেও লাগে যেমন কোনো কোনো বিক্রিয়াতে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে প্রোটন বা নিউট্রন যুক্ত হতে পারে, আবার একই সঙ্গে উচ্চ তাপমাত্রায় প্রোটন বা নিউট্রন নিউক্লিয়াস থেকে বেরিয়েও যেতে পারে নিউক্লিয়াসে প্রোটন বা নিউট্রনের একটা বন্ধনী শক্তি আছে যা পরমাণুর আয়নন বিভবের সঙ্গে তুলনীয় এই দুই বিপরীত প্রক্রিয়া যদি তাপীয় সাম্যাবস্থায় থাকে তাহলে সাহা সমীকরণ ব্যবহার করা হয় এ ধরণের বিক্রিয়া ঘটে মহাকাশে এক্স রে বার্স্টার বা সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় বিশেষ করে সুপারনোভা বিস্ফোরণ লোহার থেকে ভারি মৌল সৃষ্টির অন্যতম উৎস বলে আমরা মনে করি।
      বিগ ব্যাঙের পরে মহাবিশ্বের বিবর্তন বুঝতে বিভিন্ন স্তরে সাহা সমীকরণ প্রয়োগ করতে হয়। যেমন আদিতে তাপমাত্রা ও ঘনত্ব ছিল খুব বেশি, তখন নিউট্রিনো ও ইলেকট্রনের বিক্রিয়ার মাধ্যমে নিউট্রন ও প্রোটন পরস্পরের মধ্যে পরিবর্তিত হচ্ছিলমহাবিশ্ব যত প্রসারিত হচ্ছিল, তত শীতল হচ্ছিল। তাপমাত্রা একটু কমলে প্রোটন ও নিউট্রন মিলে তৈরি করে ভারি হাইড্রোজেনের পরমাণু। এই দুই ঘটনাকেই আমরা আয়ননের অনুরূপ ভাবতে পারি। আবার বিগ ব্যাঙের পরে দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা ছিল পরমাণুর অস্তিত্বের পক্ষে বেশি। একটি প্রোটন ও একটি ইলেকট্রন যুক্ত হয়ে হাইড্রোজেন পরমাণু তৈরি করে। উচ্চ তাপমাত্রায় পরমাণু আবার ভেঙেও যেতে পারে।  ফলে এই সময়েও হাইড্রোজেন পরমাণু এবং প্রোটন-ইলেকট্রন তাপীয় সাম্যাবস্থায় ছিল। তাই সাহা সমীকরণ এখানেও প্রযোজ্য। 
      মেঘনাদ সাহা তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ আবিষ্কার করেছিলেন কলকাতাতে বসে, সে বিষয় গবেষণাপত্রগুলিও তিনি ভারত থেকেই প্রকাশের জন্য প্রথম পাঠান। কিন্তু সেগুলি যখন প্রকাশিত হয়, তখন সাহা ফাউলারের গবেষণাগারে কাজ করেছিলেনতাই বহুদিন পাশ্চাত্যে ধারণা ছিল যে সাহা ফাউলারের অধীনে কাজ করেই তাঁর তাপ আয়নন সমীকরণ আবিষ্কার করেন সাহার কাজের মূল অংশ কিন্তু কলকাতায় বসে করা, পরে ফাউলারের গবেষণাগার থেকে অনেক নতুন তথ্য পাওয়ার ফলে তিনি তাঁর সমীকরণের পক্ষে আরো বেশি প্রমাণ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন অনেক অসুবিধার মধ্যে প্রায় কোনো পরিকাঠামো ছাড়াই তিনি সর্বোচ্চ মানের গবেষণা করেছেন শুধুমাত্র নক্ষত্র নয়, মহাবিশ্বের বিবর্তনের ইতিহাস জানতে প্রয়োজন সাহা সমীকরণ। আবিষ্কারের একশো বছর পরেও তা সমান প্রাসঙ্গিক।

প্রকাশঃ মুক্তমন পত্রিকা, সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা
     




       
     

Wednesday, 7 November 2018

কলকাতায় সি ভি রামন


লকাতায় সি ভি রামন


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

        সন্ধ্যাবেলা বৌবাজার স্ট্রিট আর কলেজ স্ট্রিট জংশনে ট্রাম থেকে নেমে এলেন এক দীর্ঘদেহী দক্ষিণ ভারতীয় তরুণসকালে তিনি অফিস যাওয়ার সময় ট্রাম থেকে দেখেছিলেন একটা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড। অল্পদিন তিনি কলকাতায় এসেছেন, তাঁর স্কট লেনের ভাড়াবাড়ির থেকে বেশি দূরে নয় জায়গাটা। ২১০ নম্বর বৌবাজার (বর্তমানে বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী) স্ট্রিটের বাড়িটার দরজা তাঁর জন্য খুলে দিলেন আশুবাবু, আশুতোষ দে। তাঁকে নিয়ে গেলেন অমৃতলাল সরকারের কাছে। আগন্তুক কোনো রকম ভূমিকা না করেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘বাইরে লেখা আছে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সকিন্তু ভিতরে তো কাউকে কাজ করতে দেখলাম না। এখানে কী হয়?’
        সালটা ছিল ১৯০৭। এভাবেই চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন ও ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের যোগাযোগের সূচনা, যে যোগাযোগ বজায় থাকবে সাতাশ বছর। ১৮৭৬ সালে অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার। ভারতীয়দের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চা ও গবেষণার উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হলেও অর্থাভাবে সে কাজ বিশেষ এগোয়নি। শুধুমাত্র বিজ্ঞান বিষয়ক কিছু বক্তৃতার মধ্যে তা সীমাবদ্ধ ছিল। সেই হতাশা নিয়েই মহেন্দ্রলাল মারা যান ১৯০৪ সালেতার তিন বছর পরে তাঁর ছেলে অমৃতলাল রামনকে অ্যাসোসিয়েশনের ল্যাবরেটরি ব্যবহারের সাদর অনুমতি দিলেন। আরো একুশ বছর পরে রামন মহেন্দ্রলালের স্বপ্নকে পূরণ করবেন। কলকাতা বাসের এই সময়টাকে রামন মনে করতেন তাঁর জীবনের স্বর্ণযুগ।
        রমানাথন চন্দ্রশেখরন আয়ার ও পার্বতী আম্মালের দ্বিতীয় পুত্র চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন বা সি ভি রামনের জন্ম ১৮৮৮ সালের ৭ নভেম্বর। ১৮৯২ সালে চন্দ্রশেখরন বিশাখাপত্তনমে এক কলেজে বিজ্ঞান পড়ানো শুরু করেন। সেখানেই রামনের শিক্ষাজীবনের শুরু। মাত্র এগারো বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাস করলেন রামন। বাবার কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। মাদ্রাজে সে সময় বিজ্ঞানেও বি এ ডিগ্রিই দেওয়া হত। রামন ছিলেন কলেজের সর্বকালের কনিষ্ঠতম ছাত্র। ১৯০৪ সালে বিএ এবং ১৯০৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এমএ, দুটি পরীক্ষাতেই প্রথম। ইতিমধ্যে রামন ছাপিয়ে ফেলেছেন তাঁর প্রথম গবেষণাপত্র। আলোকবিজ্ঞানের উপরে তাঁর সেই কাজ প্রকাশিত হল লন্ডনের ফিলোজফিক্যাল ম্যাগাজিনে, রামনের বয়স তখনো আঠারো হয়নি। পরীক্ষা দিলেন সরকারের ফিনান্সিয়াল সিভিল সার্ভিসে। এবারেও প্রথম। এই সময়েই রামনের বিয়েদক্ষিণভারতীয় ব্রাহ্মণ সামাজিক রীতি নানাভাবে ভেঙেছিলেন রামন। নিজে পছন্দ করেছিলেন তাঁর স্ত্রী লোকসুন্দরী আম্মালকে। ব্রাহ্মণ হলেও লোকসুন্দরীরা ছিলেন অন্য গোষ্ঠীরসর্বোপরি কোনো রকম পণ নিতে অস্বীকার করেছিলেন রামন।
        ফিনান্সিয়াল সার্ভিসে রামনের প্রথম চাকরিস্থল হল ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা কয়েক বছর পরেই কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তরিত হবে সেই সময় রামন যদি কাজ শুরু করতেন, তাহলে তাঁর প্রথম পোস্টিং কলকাতাতে হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মস্থান কলকাতা; রামনের সঙ্গে সেই শহরের যোগাযোগ রামন এবং ভারতের বিজ্ঞান দুপক্ষেরই প্রয়োজন ছিল
        গবেষণা শুরু করলেন রামন সোমবার থেকে শনিবার প্রতিদিন নিয়ম করে সকাল সাড়ে পাঁচটায় তিনি অ্যাসোসিয়েশনে যেতেন পৌনে দশটায় বাড়ি ফিরতেন, কোনোরকমে চান খাওয়া সেরে ট্যাক্সি ধরে অফিস অফিস থেকে পাঁচটায় বেরিয়ে সোজা অ্যাসোসিয়েশন রাত সাড়ে নটা থেকে দশটায় বাড়ি রবিবার সারা দিন অ্যাসোসিয়েশন গবেষণার সঙ্গী সহকারী শুধুমাত্র আশুবাবু। গবেষণা শুরু করেছিলেন স্বনবিদ্যা বা শব্দবিজ্ঞান বিষয়ে রামনের পরিবারে সঙ্গীতের চল ছিল, তাঁর বাবা বেহালা বাজাতেন ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রের উপর রামন অত্যন্ত মৌলিক কাজ করেছিলেন। রামনের উৎসাহে এমনকি কোনোদিন কলেজের চৌকাঠ না পেরোনো আশুবাবুও একা গবেষণাপত্র ছাপিয়েছিলেন ব্রিটেনের প্রসিডিংস অফ দি রয়্যাল সোসাইটিতে।
২১০ বৌবাজার স্ট্রিটের সেই বাড়ি

দেখতে দেখতে চলে গেল প্রায় সাত বছর। ইতিমধ্যে অল্পদিনের জন্য রেঙ্গুন ও নাগপুরে বদলি হয়েছিলেন, গবেষণাতে অসুবিধা হয়েছিল। তবে সেই বদলি নিতান্তই অল্পদিনের জন্য, আবার কলকাতাতে ফিরে এসেছেন। ইতিমধ্যে রামনের জীবনে আর এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এলো। সেই কথা আলোচনার আগে কলকাতায় উচ্চশিক্ষার সেযুগের পরিস্থিতি জেনে নেওয়া জরুরি।
আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন ১৯০৬ সালে, তারপরেই বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি বিষয়ে এম এ পড়ানো শুরু করেছেন। এর আগে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হত না, শুধুমাত্র ডিগ্রি দেওয়া হত। কলকাতায় সে সময় এমএসসি পড়ানো হত শুধু প্রেসিডেন্সি কলেজে, ১৮৮৪ সালে তা শুরু হয়েছিল  আশুতোষের ইচ্ছা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ানো গবেষণা শুরু করবেন কিন্তু বিদেশী সরকার তাঁকে এর জন্য কোনো সাহায্য করতে রাজি নয় ভারতীয়দের বিজ্ঞান শিখিয়ে বিদেশী তাদের লাভ কী?  শুধু বিজ্ঞান নয়, যে সব শিক্ষা শাসিতদের প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে শেখায় -- তা বিদেশী শাসনের পক্ষে বিপজ্জনক
 বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ইংরাজদের স্কুলকলেজের বাইরে জাতীয় শিক্ষার জন্য অনেকেই সাহায্য করছিলেন, আশুতোষ তাঁদের কাছে গেলেনব্যারিস্টার স্যার তারকনাথ পালিত প্রায় সমস্ত সম্পত্তি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করলেন। এর পরিমাণ হল সাড়ে চোদ্দ লক্ষ টাকা ও বালিগঞ্জে তাঁর নিজের বাড়ি  অন্য এক ব্যারিস্টার, স্যার রাসবিহারী ঘোষ, দুবারে মোট সাড়ে একুশ লক্ষ টাকা দান করেছিলেন।  সেদিনের এক টাকা আজকের প্রায় পাঁচশো টাকার সমান। অর্থাৎ দুজনে মিলে আজকের হিসাবে একশো পঁচাত্তর কোটি টাকার বেশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করেছিলেন। সেই দানেই শুরু হল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান কলেজ প্রথমেই যে টি বিভাগ প্রতিষ্ঠা হল, তার মধ্যে ছিল পদার্থবিজ্ঞান। রাজাবাজারে পালিতের বাগানবাড়িতে তৈরি হল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কলেজ। ঠিকানা ৯২ আপার সার্কুলার (বর্তমানে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র) রোড। ২৭ মার্চ ১৯১৪ তার ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন আশুতোষ। ১৯১৬ সালের ১ জুলাই পদার্থবিদ্যা বিভাগে পঠনপাঠন শুরু হয়।

আপার সার্কুলার রোডে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কলেজ

 পালিত ও ঘোষের শর্ত ছিল তাঁদের দানের টাকায় কয়েকটি অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করতে হবে সেই মতো অন্যান্য কয়েকটি বিষয়ের সঙ্গে সঙ্গে পদার্থবিদ্যা বিভাগে পালিত অধ্যাপক এবং ঘোষ অধ্যাপক পদ সৃষ্টি হয়। তাঁদের দানের শর্ত অনুযায়ী এই পদের অধ্যাপকদের ভারতীয় হতেই হবে। মাত্র কয়েক বছর আগে স্বামী বিবেকানন্দের প্রেরণায় জামসেদজী টাটার উৎসাহে বাঙ্গালোরে তৈরি হয়েছিল ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স। কিন্তু প্রথম দিকে সেখানে ইংল্যান্ড থেকে আসা দ্বিতীয় শ্রেণির বিজ্ঞানীরাই মূলত চাকরি পেয়েছিল, তার ফলে সেখানে গবেষণার মান ছিল খুবই নিচু। ভারতীয় অধ্যাপকরা যাতে বিশ্বমানের গবেষণা করতে পারেন, সে জন্য চাকরি পাওয়ার পরে প্রয়োজনে বিদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দু’বছর গবেষণা করার কথা দানের শর্তে ছিল। তাঁরা সেজন্য সবেতন ছুটি পেতেন। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগে কয়েকটি গবেষক বা রিসার্চ ফেলোর পদ চালু করা হয়।
১৯১৪ সালের ২৪শে জানুয়ারি পালিত গভর্নিং বডির সভাতে পদার্থবিজ্ঞানে সি ভি রামন এবং রসায়নে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রকে পালিত অধ্যাপকের পদে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সভাতে সদস্য ছিলেন উপাচার্য স্যার আশুতোষ, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার পি ব্রুল, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, ডাক্তার নীলরতন সরকার, রেভারেন্ড জে ওয়াট, বিচারপতি বি কে মল্লিক এবং লর্ড সত্যপ্রসন্ন সিনহা। সেই দিনই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট এক সভায় এই নিয়োগে সম্মতি দেয়। কিন্তু ৩০ জানুয়ারি সেনেটে কয়েকজন ইউরোপীয় সদস্য নিয়োগের পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি তোলেন। ফলে ভোটাভুটি হয়, ভোটে আশুতোষের প্রস্তাব জেতে। আশুতোষের ইচ্ছা ছিল জগদীশচন্দ্রকে পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যাপক পদে নিয়োগ করা, কিন্তু তিনি রাজি হননি।
একা একা আংশিক সময়ে খুব সামান্য পরিকাঠামোর মধ্যে গবেষণা করেও রামন যথেষ্ট পরিচিতি লাভ করেছিলেন, না হলে আশুতোষের চোখ তাঁর উপরে পড়ত না। তখনই রামন মোট বাইশটা গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছেন, যার মধ্যে ষোলটা বিদেশের সেরা জার্নালগুলিতে। ঠিক আগের বছর মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে গবেষণার জন্য বিশেষ পুরস্কার দিয়েছে। আশুতোষ অবশ্য অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আগে তিনি গণিত বিষয়ে বেশ কয়েকবার সেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন। সেই সূত্রেই রামনের নাম তাঁর কাছে অপরিচিত ছিল না। সেনেটে তাঁর নিয়োগের পক্ষে জোর সওয়াল করেছিলেন আশুতোষ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো মহেন্দ্রনাথ রায়।
রামন যে চাকরি করতেন, তাঁর মাইনে বেড়ে দাঁড়াত মাসে দুহাজার টাকা পালিত অধ্যাপকের পদে পাবেন আটশো টাকা, বাড়িভাড়া বাবদ আরো দুশো টাকা শুধু তাই নয়, মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই রামনের সাফল্যে সবাই নিশ্চিত ছিলেন যে এক সময় তিনি ফিনান্সিয়াল সার্ভিসে শীর্ষস্থানে উঠবেন এবং ভাইসরয়ের কাউন্সিলের সদস্য হবেন। কোনো ভারতীয়ের পক্ষে সরকারি স্তরে তা ছিল সর্বোচ্চ সম্মান। রামন অধ্যাপক পদে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে সামান্যও দ্বিধা করেননি, শুধু বলেছিলেন যে দেশের বাইরে দু’বছর গবেষণার শর্ত তুলে না নিলে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগ দিতে পারবেন না। তাছাড়া তিনি জানতে চেয়েছিলেন যে পড়ানো তাঁর পক্ষে বাধ্যতামূলক কিনাবিশ্ববিদ্যালয় জানায় যে তাঁর জন্য বিদেশে গবেষণা বা ক্লাস নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। সরকারি চাকরি ছেড়ে আসার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি লেগেছিল, তা পাওয়ার পরে ১৯১৭ সালের ২ জুলাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। চিঠিতে যাই লিখুন, রামন প্রথম থেকেই ইলেকট্রন তত্ত্বের উপর ক্লাস নিয়েছিলেন। তবে সবসময়ই তাঁর গবেষণার প্রধান জায়গা ছিল অ্যাসোসিয়েশন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পরে রামন পুরোপুরি গবেষণাতে মন দিতে পারলেন। অবশ্য ভারতবর্ষের নানা জায়গায় পড়ানো, বিদেশে কনফারেন্সে যোগদান ও ল্যাবরেটরি পরিদর্শন, বিভিন্ন সরকারি কমিটিতে অংশগ্রহণ ছাড়াও বিভাগীয় প্রধান হিসাবে তাঁকে অনেক দায়িত্ব পালন করতে হত। ১৯৩৩ সালের ১ এপ্রিল রামন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যান। তিনি বাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সের ডাইরেক্টর হিসাবে যোগ দেন। মাঝের ষোল বছর তিনি ছিলেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রামনের জীবন একেবারে মসৃণ ছিল তা নয়। অর্থবরাদ্দের সীমাবদ্ধতার জন্য সকল অধ্যাপকের গবেষণাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। সে সময় পদার্থবিদ্যা বিভাগে একই সঙ্গে তিন নক্ষত্র বিরাজ করতেন। রামন বিভাগে যোগদান করার আগে থেকেই সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহা দুজনেই ছিলেন পালিত অধ্যাপকের সহকারী। তবে তাঁরা কখনোই রামনের সঙ্গে কোনো গবেষণা করেন নি, রামনও কোনোদিন তাঁদের এই নিয়ে কিছু বলেন নি। সত্যেন্দ্রনাথ ১৯২১ সালে ঢাকা চলে যান, তিনি যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন তার অনেক আগেই রামন কলকাতা ছেড়েছেন। রামনের সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের বিশেষ কোনো মনোমালিন্য ছিল না। বয়সে তরুণ হলেও মেঘনাদ তাঁর সাহা সমীকরণের জন্য রামনের আগেই বিশ্বখ্যাতি লাভ করেন। ১৯২১ সালে তিনি পদার্থবিদ্যা বিভাগে খয়রা অধ্যাপক পদে যোগ দেন। বিশেষ করে গবেষণার সুযোগসুবিধা নিয়ে তাঁর সঙ্গে রামনের বারবার বিরোধ বেঁধেছিল। সেই বিবাদে আশুতোষকে বা তৎকালীন উপাচার্যকে মধ্যস্থতা করতে হয়েছিল। তামিল ব্রাহ্মণ রামনের হিমালয়প্রমাণ অহং এবং সমাজের নিচুস্তর থেকে সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় উঠে আসা মেঘনাদের স্বাভিমানকে মেলানোর কোনো জায়গা খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত গবেষণার সুযোগের অভাবে মেঘনাদ ১৯২৩ সালে কলকাতা ছেড়ে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। রামন কলকাতা ছাড়ার কয়েক বছর পরে তিনি ফিরে আসেন।
রামন প্রধানত আলো ও শব্দ বিষয়ে গবেষণা করতেন। সারা দেশ থেকে তাঁর কাছে বহু ছাত্র গবেষণার জন্য আসত। তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিশিরকুমার মিত্র, বিধুভূষণ রায়, ফণীন্দ্রনাথ ঘোষ,‌ ব্রজেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুকুমারচন্দ্র সরকার তাঁর অন্য ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কে আর রমানাথন, কে এস কৃষ্ণন, এল এ রামদাস প্রমুখ। রমানাথন আমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রথম অধিকর্তা হয়েছিলেন। কৃষ্ণন হয়েছিলেন দিল্লীর ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরির প্রথম অধিকর্তা বেশ কয়েকবার ইউরোপ ও আমেরিকাতে যান রামন, রামন এফেক্ট আবিষ্কারের আগেই তিনি সেখানকার বিজ্ঞানী মহলে বিশেষ সমাদর লাভ করেছিলেন। বিদেশ থেকে বিজ্ঞানীরা ভারতে এলে তাঁর সঙ্গে অবশ্যই দেখা করতেন।
বিজ্ঞান কলেজে রক্ষিত রামনের পিয়ানো

রামনের গবেষণার পরিচয় দেয়া এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়, আমরা শুধু রামন এফেক্ট বা রামন ক্রিয়া আবিষ্কারের ইতিহাসের কথা সংক্ষেপে দেখব। কাল্টিভেশনের ল্যাবরেটরিতে তিনি তাঁর নামাঙ্কিত এফেক্টকে চিহ্নিত করেছিলেন। এ কাজে তাঁকে সহায়তা করেছিলেন কে এস কৃষ্ণন। ১৯২১ সালে প্রথমবার ইউরোপ যাত্রা করেন রামন। ফেরার সময় জাহাজ থেকে সমুদ্রের জল দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে সমুদ্র নীল কেন? আকাশের রঙ কেন নীল তার কারণ বায়ুমণ্ডল কর্তৃক আলোর বিচ্ছুরণ  দিয়ে ব্যাখ্যা করেছিলেন লর্ড র‍্যালে। তিনি বলেছিলেন যে সমুদ্রের রঙ আসলে আকাশের রঙের প্রতিফলন। নানাভাবে রামন নিশ্চিত হলেন তা নয়তিনি দেখালেন যে সমুদ্রের জল নিজেই আলোকে বিচ্ছুরণ করে বলেই সমুদ্রের জলের রঙ নীল। এর পর থেকে তিনি আলোর বিচ্ছুরণ নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েন।
দু বছর পরে রামন ও তাঁর ছাত্র রমানাথন জল ও অ্যালকোহল কর্তৃক আলোর বিচ্ছুরণ সংক্রান্ত পরীক্ষানিরীক্ষার সময় এক নতুন রঙের আলোর খুব ক্ষীণ চিহ্ন দেখতে পান। এর উৎস তাঁরা বুঝতে পারেন নি, ভেবেছিলেন যে তাঁদের ব্যবহৃত স্যাম্পল হয়তো যথেষ্ট বিশুদ্ধ নয়প্রসঙ্গত বলে রাখি যে আলো হল তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ, বিভিন্ন রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য আলাদা আলাদা। ১৯২৫ সালে কৃষ্ণনও একই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন। ১৯২৭ সালে অপর এক ছাত্র ভেঙ্কটেশ্বরন দেখেন যে গ্লিসারিন কর্তৃক বিচ্ছুরিত সূর্যের আলোর রঙ হওয়া উচিত ছিল নীল, কিন্তু তা হয়েছে সবুজ। রামন বুঝতে পারেন যে তিনি এক বিরাট আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি এসে গেছেন। কৃষ্ণনকে তিনি পরীক্ষা শুরু করতে নির্দেশ দেন। সেটা ছিল ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ২৮ ফেব্রুয়ারি বোঝা গেল যে বিচ্ছুরিত আলোতে এক নতুন রঙের আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে। আবিষ্কৃত হল রামন এফেক্ট। পাঁচ বছর আগে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী অ্যাডলফ স্মেকাল তাত্ত্বিকভাবে এই নতুন রঙের আলোর কথা ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন। কোয়ান্টম তত্ত্ব থেকে রামন এফেক্টকে সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়, কিন্তু সেই সময় এই ঘটনাকে প্রত্যক্ষ করা মোটেই সহজ ছিল না। রামন এফেক্ট এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে আবিষ্কারের দু বছরের মধ্যেই তার উপর দুশোর বেশি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছিল।
রামন ও রামন এফেক্ট আবিষ্কারে ব্যবহৃত বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্র

রামন প্রথম থেকেই তাঁর আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি পরের দিনই অর্থাৎ ২৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতার স্টেটসম্যান খবরের কাগজে এই আবিষ্কারের খবর প্রকাশের ব্যবস্থা করেন ৮ মার্চ রামন নেচার পত্রিকায় তাঁর আবিষ্কারের বিষয়ে এককভাবে গবেষণা পত্র পাঠান। ৩১ মার্চ তা প্রকাশিত হয়। তিনি বিদেশী বিজ্ঞানীদের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করেছিলেন। সুইডেনের নোবেল জয়ী বিজ্ঞানী মানে সিগবান এবং জার্মান বিজ্ঞানী আর্নল্ড সমারফেল্ড তাঁর গবেষণার প্রশংসা করে চিঠি দিয়েছিলেন। রামনের এই দ্রুততার প্রয়োজন ছিল, কারণ মে মাসেই দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী মেন্ডেলশাম ও ল্যান্ডসবার্গ এই বিষয়ে তাদের গবেষণা প্রকাশ করেন। তাঁরা এমনকি রামনের আগেই এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাতে অবশ্য রামনের কৃতিত্ব বিন্দুমাত্র খাটো হয় না। রামন তাঁদের গবেষণার বিষয় জানতেন না। সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা যদি তাঁদের কাজের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন থাকতেন ও তাঁদের পরীক্ষার ফল বিষয়ে নিশ্চিত হতেন, তাহলে তাঁরা নিশ্চয় আরো আগেই গবেষণাপত্র প্রকাশ করতেন। রামনকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করার সময় নোবেল কমিটি এই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন, কাজেই রামনই যে পুরস্কারের যোগ্য প্রাপক তা নিয়ে সন্দেহ নেই।
২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ স্টেটসম্যান পত্রিকাতে প্রকাশিত সংবাদ

রামন এফেক্ট ব্যবহার করলে বিশ্লেষণের সময় নমুনার কোনো ক্ষতি হয় না। তাই রাসয়ানিক বা গঠন বিশ্লেষণের সময় রামন এফেক্টের কার্যকারিতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।  লেজার আবিষ্কারের পরে লেজার রামন বিশ্লেষণ আরো নানা জায়গায় ব্যবহৃত হচ্ছে।  রসায়ন শিল্পে, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে, ভূতত্ত্বে, ঔষধ শিল্পে। জীববিদ্যা, ইলেকট্রনিক্স – কত জায়গায় যে রামন এফেক্ট কাজে লাগছে তা লিখে শেষ করা যাবে না।
১৯৩০ সালে রামন নোবেল পুরস্কার পান, এশিয়ার প্রথম বিজ্ঞানী যিনি এই সম্মান লাভ করেছিলেন। পুরস্কারের প্রস্তাবক ছিলেন দশজন বিজ্ঞানীতাঁদের মধ্যে ছিলে ছ’জন নোবেলজয়ী -- নিলস বোর, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, লুই দ ব্রয়লি, জোহানেস স্টার্ক, চার্লস উইলসন ও জাঁ পেরিন। রামন নোবেল পুরস্কার নিতে রওনা হন ১৯৩০ সালের ২১শে নভেম্বর, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি ঘোষণা করেছিল 
২১০ নম্বর বৌবাজার স্ট্রিটের বাড়িটা আর নেই, সেখানে তৈরি হয়েছে গোয়েঙ্কা কলেজ। কাল্টিভেশন স্থানান্তরিত হয়ে চলে গেছে যাদবপুরে। তা এখন কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। বাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সের অধিকর্তা হওয়ার ডাক পেয়ে রামন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়  ছেড়েছিলেন নিজের ইচ্ছায়, কিন্তু অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিচ্ছেদ খুব সুখের হয়নি। সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে এই লেখা অনেক দীর্ঘ হয়ে পড়বে। শুধুমাত্র এটুকু বলাই যথেষ্ট যে সেই ইতিহাস রামন বা কলকাতার শিক্ষামহলের তৎকালীন নেতৃত্ব, কারোর পক্ষেই গৌরবের নয়।  আরো ছত্রিশ বছর বাঁচলেও একবার কলকাতা ছাড়ার পরে রামন আর কোনোদিন কলকাতায় পদার্পণ করেননি।
        
প্রকাশঃ সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনা পত্রিকার শারদীয় সংখ্যা, ১৪২৫, পরিমার্জিত

Saturday, 3 November 2018

শতবর্ষ পেরিয়ে অধ্যাপক বাসন্তীদুলাল নাগচৌধুরি


শতবর্ষ পেরিয়ে অধ্যাপক বাসন্তীদুলাল নাগচৌধুরি
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
       গত বছর অধ্যাপক বাসন্তীদুলাল নাগচৌধুরির জন্মের একশ বছর অতিক্রান্ত হল। সাধারণভাবে তিনি বিডি নাগচৌধুরি নামেই পরিচিত হয়েছিলেন। ভারতের প্রথম নিউক্লিয় পদার্থবিদদের মধ্যে তাঁর নাম উল্লেখযোগ্য। ভারত সরকারের বিভিন্ন বিজ্ঞান বিষয়ক কমিটিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেজন্য  তিনি পদ্মবিভূষণ সম্মান পেয়েছিলেন। মেঘনাদ সাহার সংস্পর্শে এসে তাঁর জীবনের ধারা নির্ধারিত হয়েছিল। এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে আমরা তাঁর জীবনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের প্রতি দৃষ্টি রাখব।


       বাসন্তীদুলালের জন্ম কলকাতায় ১৯১৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বরতাঁদের পৈতৃক বাড়ি অবিভক্ত ভারতের ঢাকার কাছে বারোদি গ্রামেবাবা উমেশচন্দ্র নাগ ছিলেন ইংরাজির অধ্যাপক, তিনি বিভিন্ন সময়ে স্কটিশ চার্চ কলেজ, বিদ্যাসাগর কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রংপুর কলেজে পড়িয়েছিলেন। পরে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরাজি বিভাগে যোগ দেন বাসন্তীদুলালের মাতামহ ছিলেন জুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ডায়রেক্টর। মা লীলামঞ্জরীও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক বোঝাই যায় তাঁদের বাড়িতে লেখাপড়ার চল ছিল, বাসন্তীদুলাল ছোটবেলা থেকেই ছিলেন একনিষ্ঠ পাঠক। উমেশচন্দ্র লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে ডক্টরেট করেছিলেন। বাসন্তীদুলালের এক ছোটো ভাই ডাক্তারি পাস করার পরে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা করে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ও বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সসে শারীরবিদ্যা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। মাত্র তেরো বছর বয়সে বাসন্তীদুলাল বেনারস হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হন। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বিএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। তারপর পদার্থবিদ্যাতে এমএসসি পড়ার জন্য ভর্তি হন এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। সালটা ছিল ১৯৩৫।
       এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাওয়ার অন্যতম কারণ ছিল সেখানে তখন পড়াচ্ছেন মেঘনাদ সাহা১৯২৩ থেকে ১৯৩৮, এই পনের বছর সাহা এলাহাবাদে ছিলেন। বাসন্তীদুলাল তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এই সময়ই বাসন্তীদুলাল বিপ্লবী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন, কয়েকবার লক আপেও    কাটিয়েছিলেন। তাঁকে দেখে মেঘনাদের নিজের ছাত্রাবস্থার কথা মনে পড়েছিল। তিনিও অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বাঘা যতীন তাঁকে বলেন মেঘনাদের মতো মেধাবী ছেলেদের সরাসরি স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ না নিয়ে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে দেশের মুখ উজ্জ্বল করার চেষ্টা করা উচিত। বাসন্তীদুলালকে সাহা বোঝালেন পড়াশোনা করাটা কতটা জরুরি, পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে হস্টেল থেকে নিয়ে এসে নিজের বাড়িতেই কিছুদিন লুকিয়ে রেখেছিলেন।
       বাসন্তীদুলাল এমএসসি পাস করার পরে পরেই মেঘনাদ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা বিভাগে পালিত অধ্যাপকের পদে যোগ দেন। বাসন্তীদুলালও তাঁর সঙ্গে কলকাতায় আসেন। পরমাণু শক্তি তখনও ভবিষ্যতের স্বপ্ন, কিন্তু মেঘনাদ সাহা তখনই নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানের গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। কলকাতাতে শুরু করলেন নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানের পাঠক্রম। কিন্তু সে কাজে প্রধান অন্তরায় হল যন্ত্রপাতির অভাব। পদার্থবিজ্ঞানের মূল কথা হল পরীক্ষানিরীক্ষা, কিন্তু যন্ত্র না থাকলে তা সম্ভব নয়। নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানে প্রথম যেটা দরকার তা হল কণাত্বরক। দুটি নিউক্লিয়াসের মধ্যে বিক্রিয়া ঘটানো শক্ত কারণ নিউক্লিয়াসের আধান ধনাত্মক, তাই এক নিউক্লিয়াস অন্য নিউক্লিয়াসকে বিকর্ষণ করে। সেই বিকর্ষণকে অগ্রাহ্য করে বিক্রিয়া তখনই হতে পারে যখন সংঘর্ষরত দুটি নিউক্লিয়াসের মধ্যে অন্তত একটার গতিশক্তি খুব বেশি। নিউক্লিয়াসের গতিশক্তি বাড়াতে পারে কণাত্বরক বা অ্যাক্সিলারেটর। মেঘনাদ বুঝলেন নিউক্লিয় বিজ্ঞানে গবেষণার চাবিকাঠি হল কণাত্বরক।
       সেই সময় সবচেয়ে আধুনিক কণাত্বরক হল সাইক্লোট্রন। সাইক্লোট্রন যন্ত্রে একটা কণাকে প্রায় বৃত্তাকার পথে বারবার ঘোরানো হয় এবং অল্প অল্প করে তার শক্তি বাড়ানো হয়। সাইক্লোট্রনের আবিষ্কর্তা আর্নেস্ট লরেন্স, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলেতে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন। লরেন্স মেঘনাদের পূর্বপরিচিত, মেঘনাদ ১৯৩৭ সালে তাঁর অতিথি হিসাবে গিয়ে লরেন্সের সাইক্লোট্রন দেখেছেন। মেঘনাদ বাসন্তীদুলালকে বার্কলেতে পাঠালেন গবেষণার জন্য। তরুণ বাসন্তীদুলালের কাছে সে এক নতুন অভিজ্ঞতা, কী করতে হবে তা নিয়ে তাঁর নিজের কোনো স্পষ্ট ধারণাই নেই। সেটা ছিল ১৯৩৮ সালের দ্বিতীয় অর্ধ। পরের বছর লরেন্স পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাবেন। সে বছরই শুরু হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যোগদান করে ১৯৪১ সালের শেষে।
       ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বাসন্তীদুলাল ডক্টরেট করেন লরেন্সেরই ল্যাবরেটরিতে অপর এক ভবিষ্যৎ নোবেল জয়ীর কাছে কাজ করে, তাঁর নাম এমিলিও সেগ্রে। সেগ্রে ১৯৫৯ সালে অ্যান্টিপ্রোটন আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাবেন। নভেম্বর মাসে ডক্টরেটের জন্য থিসিস জমা দিলেন বাসন্তীদুলাল, বিষয় ছিল তিনটি নতুন কৃত্রিম তেজস্ক্রিয় মৌল যেগুলি বার্কলেতে বানানো সম্ভব হয়েছে। কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়া বিষয়ে তাঁর আগ্রহ চিরদিন থাকবে। ১৯৪১ সালে দেশে ফিরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন তিনি।
       এর মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে। সাহা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা সাইক্লোট্রনের জন্য অর্থ সংগ্রহ  করেছেন, মূল লক্ষ্য চিকিৎসাতে নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানের প্রয়োগ। নেহরুর চেষ্টায় টাটারা তাঁকে ষাট হাজার টাকা দিয়েছেন টাটা ট্রাস্টের কাছে লেখা চিঠিতে মেঘনাদ সাইক্লোট্রনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য বাসন্তীদুলালের নামই লিখেছিলেন। অনেক টালবাহানার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেট সেই টাকা নিতে রাজি হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ও সমপরিমাণ টাকা দে। সাইক্লোট্রনের জন্য লরেন্সের সঙ্গে কথা বলেছেন সাহা, লরেন্স রাজি হয়েছেন যন্ত্রাংশ পাঠাতে। লরেন্স ও ডোনাল্ড কুকসের তত্ত্বাবধানে আমেরিকান রোলিং মিলস কোম্পানি সাইক্লোট্রনের পরিকল্পনা ও মূল যন্ত্রাংশগুলি তৈরি করে। যন্ত্রাংশের দাম অবশ্য অনেক বেশি, কিছু কিছু বার্কলে থেকে উপহার হিসাবে পাওয়া গেল। মেঘনাদ বাসন্তীদুলালকে সাইক্লোট্রন অফিসার পদে নিয়োগ করে যন্ত্রাংশ কলকাতায় পাঠানোর ভার দিয়েছেনবাসন্তীদুলাল সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। সেটা মোটেই সহজ কাজ ছিলনা। সাইক্লোট্রনে যে তড়িৎচুম্বক লাগে তারই ওজন ছিল পঞ্চাশ টন। দেশে ফেরার আগে সমস্ত যন্ত্রপাতি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন বাসন্তীদুলাল।
       ১৯৪২ সালে সাইক্লোট্রনের জন্য আলাদা করে বাড়ি তৈরি করতে হয়। মেঘনাদ পদার্থবিদ্যা বিভাগের ভিতরেই তৈরি করলেন ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স। সাইক্লোট্রনের বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ একসঙ্গে আসা সম্ভব নয়। ১৯৪১ সালের শেষে জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করেছে, আমেরিকাও যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। ফলে জাহাজ চলাচলে সমস্যা দেখা দিয়েছে। বাকি সব কিছু এলেও ভ্যাকুয়াম পাম্পগুলি যে মালবাহী জাহাজে আসছিল তা সিঙ্গাপুরের কাছে জাপানি আক্রমণে ডুবে যায়। শান্তিস্বরূপ ভাটনগরের নেতৃত্বাধীন বোর্ড অফ সায়েন্টিফিক রিসার্চ সাইক্লোট্রন তৈরির জন্য দেড় লক্ষ টাকা মঞ্জুর করলেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপে অত সূক্ষ্ম পাম্প তৈরির সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। ফলে সাইক্লোট্রনের কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কাজ শুরু করার জন্য বাসন্তীদুলালকে আবার বার্কলেতে ফিরে যেতে হয় ১৯৪৭ সালে। সেখানে একবছর তিনি সাইক্লোট্রনের উপর কাজ করেন। লরেন্স তাঁকে আবার সাহায্য করেছিলেন। ১৯৫৪ সালে সেগ্রে কলকাতায় এসেছিলেন, তিনি সাইক্লোট্রনের বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি নিয়মিত চিঠিতেও মতামত পাঠাতেন। অবশেষে ১৯৬০ সালে সাইক্লোট্রন আংশিক কাজ শুরু করল। যন্ত্র পুরোপুরি কার্যকর হতে লেগে গিয়েছিল ১৯৬৬ সাল।
       সেই যুগের পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে আমরা হয়তো বিডি নাগচৌধুরিদের সামনে সমস্যার গভীরতাটা বুঝতে পারব। সাইক্লোট্রন এমন যন্ত্র নয় যে কিনে এনে বসিয়ে দেওয়া যাবে। বিভিন্ন অংশ বিদেশ থেকে নিয়ে এলেও তাদের একসঙ্গে করে বসানোর কাজটা মোটেই সহজ নয়, সে সময় ভারতে কোনো  বিশেষজ্ঞ থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ইঞ্জিনিয়ারিঙের সমস্যা সমাধান করতে হত পদার্থবিজ্ঞানীদের। যুদ্ধের জন্য অনেক জিনিস দেশে অমিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপ এই ধরনের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই। মেঘনাদের সঙ্গে নেহরুর সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। ১৯৪০-এর দশকে দেশের বিজ্ঞান গবেষণার অনুদানকে নিয়ন্ত্রণ করেন শান্তিস্বরূপ ভাটনগর ও হোমি জাহাঙ্গির ভাবা ভাবার সঙ্গে মেঘনাদের সম্পর্ক কোনোদিনই ভালো নয়, ভাটনগরের সঙ্গেও  তাঁর পুরানো বন্ধুত্ব নানা কারণে ভেঙে যাওয়ার মুখে। ফলে কলকাতার ইন্সটিটিউটের জন্য অর্থ বরাদ্দও নিতান্ত অপ্রতুল। বিজ্ঞানীর সংখ্যাও কম, যৌথ ভাবে কাজ করার অভ্যাস তখনো দেশে গড়ে ওঠেনি। বাসন্তীদুলালকে মূলত তরুণ ছাত্রদের সহায়তায় কাজ করতে হয়েছিল। রাঁচির হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসে সাহায্য তিনি নিয়েছিলেন। মেশিন দেখাশোনার জন্য ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকের আগে সম্ভব হয়নি।     
       বিডি নাগচৌধুরি সাইক্লোট্রন অফিসারের দায়িত্ব পালন করার সঙ্গে সঙ্গে ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবৈতনিক লেকচারার। ১৯৪৬ সালে হলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম তারিণীচরণ শূর রিডার, সেই পদে ছিলেন ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত।  মেঘনাদ সাহা শূর এনামেল এন্ড স্টাম্পিং ওয়ার্কসের থেকে দুই লক্ষ টাকা জোগাড় করেছিলেন এই পদের জন্য। মেঘনাদ সাহা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তারকনাথ পালিত অধ্যাপক হিসাবে অবসর নেওয়ার পরে ১৯৫৩ সালে বাসন্তীদুলাল ওই পদে যোগদান করেন। ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন পালিত অধ্যাপক। মেঘনাদ সাহা ১৯৫১ সালে লোকসভাতে নির্বাচিত হন। ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন আরো অনেক আগেই, প্রথমে সচিব, মাঝে সভাপতি ও দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে অধিকর্তা। তিনি বহু কাজের মাঝে সময় কম পাচ্ছেন, তাই তাঁর অনুপস্থিতিতে বাসন্তীদুলালকে ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৫৬ সালে সাহার মৃত্যুর পরে বাসন্তীদুলাল ইন্সটিটিউটের কার্যকরী অধিকর্তার দায়িত্ব নেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৭ তিনি ছিলেন ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা, তখন তার নাম হয়েছে সাহা ইন্সটিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স। অল্প কিছুদিন তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উর্বানাতে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বার্কলেতে অতিথি অধ্যাপক ছিলেন, ১৯৬৭-৬৭ সালে হয়েছিলেন সে দেশের লিঙ্কন অধ্যাপক।
এক জটিল সময়ে তিনি সাহা ইন্সটিটিউট পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, মেঘনাদ সাহার চেষ্টাতে দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতে বরাদ্দ হয়েছে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা। এতদিন পর্যন্ত যে পরিমাণ অর্থ ইন্সটিটিউটে এসেছিল, এ তার থেকে কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু টাকা আসার আগেই সাহার মৃত্যু ইন্সটিটিউটের ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিলে। বিশেষ করে দেশের উঁচু মহলে অনেকেরই সঙ্গে সাহার নীতি ও মতের পার্থক্য ছিল, ইন্সটিটিউটের অকালমৃত্যু ঘটলে তাঁরা খুব দুঃখিত হতেন না। ইন্সটিটিউট তৈরি হয়েছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে, কিন্তু ১৯৫১ সাল থেকেই তা স্বশাসিত। অর্থের প্রায় সবটাই আসে ডিপার্টমেন্ট অফ অ্যাটমিক এনার্জি থেকে। ফলে রাজ্য সরকার, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইন্সটিটিউটের মধ্যে এক ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুসারে ইন্সটিটিউট পরিচালিত হয়। এই জটিলতার মধ্যেও বাসন্তীদুলালের চেষ্টাতে সাহা ইন্সটিটিউট আরো প্রসারিত হয়। তৃতীয় পরিকল্পনাতে সাহা ইন্সটিটিউটের বরাদ্দ আবারও দুগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। বাসন্তীদুলাল যখন অধিকর্তার দায়িত্ব ছেড়ে গেলেন, তার পরের এক বছরেই কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে ইন্সটিটিউট পেয়েছিল একচল্লিশ লক্ষ টাকারও বেশি। তাঁর সময়েই সাহা ইন্সটিটিউটে নিউট্রন জেনারেটর, পারমাণবিক ভরের বর্ণালীবীক্ষ যন্ত্র, নিউক্লিয় ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্স যন্ত্র ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল। সাইক্লোট্রনের কথা আগেই বলেছি। নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যাতে তত্ত্বীয় গবেষণার জন্য নতুন বিভাগের জন্মও হয় তাঁরই উৎসাহে। প্লাজমা পদার্থবিদ্যাতে গবেষণা শুরু করার জন্য তিনি টোকিয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। বিজ্ঞান প্রশাসনের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত।
       এই দক্ষতারই সুবাদে হয়তো তাঁর কথা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পৌঁছয়। ১৯৬৭ সালে ডাক আসে প্ল্যানিং কমিশন থেকে। ১৯৬৭ থেকে ১৯৭০ ছিলেন কমিশনের বিজ্ঞান বিষয়ক সদস্য। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২ বিজ্ঞান প্রযুক্তি সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটির সভাপতি, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ ডিফেন্স রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ডিআরডিও) ডিরেক্টর জেনারেল ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা, ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৮ দিল্লীর জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ বিজ্ঞান প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত মানবসম্পদ সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি  -- এক কর্মময় জীবনের চালচিত্র। এর সঙ্গে লিখেছেন পরিকল্পনা, উন্নয়ন, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে বহু প্রবন্ধ, নানা পত্রিকায় সেগুলি প্রকাশিত হয়েছে।
       বিজ্ঞানী হিসাবে বিডি নাগচৌধুরি কেমন ছিলেন, সে কথা বিচার করতে গেলে কয়েকটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন। মেঘনাদ সাহার নির্দেশে তিনি সাইক্লোট্রন তৈরির কাজে লেগেছিলেন। আমরা দেখেছি কোন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাঁকে প্রায় আড়াই দশক সেই বিষয়ে কাজ করতে হয়েছে। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সেই তাঁকে ইন্সটিটিউটের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। নানা সমস্যা, অনেকের বিরোধিতা, এ সমস্ত তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছিল।  এর পরে পঞ্চাশ বছর বয়সে তাঁকে সম্পূর্ণ অন্য দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। দেশ গঠনের সে আহ্বানে তিনি সাড়া দিয়েছিলেন। তাই অন্য অনেকের মতো বিজ্ঞান নিমগ্ন থাকার সুযোগ তাঁর হয়নি। তার মধ্যেই তিনি নিউক্লিয় বিজ্ঞানে সাইক্লোট্রন তৈরির দায়িত্ব পালন করা ছাড়াও নানা বিষয়ে গবেষণা করেছেন। কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়া বিষয়ে তাঁর উৎসাহ ছিল, জীবপদার্থবিজ্ঞানে সেই ধরনের পদার্থের প্রয়োগে তিনি দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন। তেজস্ক্রিয়তা মেপে পাথরের বয়স নির্ণয় করাতে দেশে তিনি পথিকৃৎ। তাঁরই উৎসাহে সাহা ইন্সটিটিউটে প্লাজমা বিষয়ে গবেষণার সূচনা হয়। অর্ধপরিবাহী পদার্থ বিষয়েও তিনি গবেষণা করেছেন। দেশেবিদেশে নানা বিখ্যাত জার্নালে তাঁর অনেকগুলি গবেষণা পত্র প্রকাশিত হয়েছিল।  
বাসন্তীদুলালের চরিত্রের মধ্যে পরস্পর বিরোধিতা ছিল না বললে অন্যায় হবে। ১৯৬৮ সালে প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য হিসাবে এক লেখায় তিনি লিখেছিলেন যে ভারতের বিজ্ঞানীদের কিছুটা ঝুঁকি নিতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। আমরা জানি যে তাঁর শিক্ষক মেঘনাদ সাহা জীবনে বহুবার ঝুঁকি নিয়েছিলেন -- সাইক্লোট্রন তৈরি করার সিদ্ধান্ত তার একটা বড় উদাহরণ। এক দশকের বেশি ইন্সটিটিউট পরিচালনাতে কিন্তু বাসন্তীদুলাল নাগচৌধুরিকে সেই রকম কোনো ভূমিকাতে দেখা যায়নি।  বিজ্ঞানীদের মধ্যে মত বিনিময়ের গুরুত্ব বোঝাতে ১৯৬৯ সালে এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘(দেশে) বিজ্ঞানভিত্তিক সমালোচনা ও মূল্যায়নের শক্তিশালী ঐতিহ্য গড়ে ওঠার মতো সময় পাওয়া যায়নি। সরকারি প্রশাসন কেন্দ্রীভূতই আছে, বিস্তারিত তথ্য প্রায়শই আমলাতন্ত্রের কবলে ... এই পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাচারী ও পায়াভারি কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে বিজ্ঞান প্রযুক্তির বিকাশ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।‘ সাহা ইন্সটিটিউটে ও পরে বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কাজ করার সময় বিডি নাগচৌধুরিকে নিশ্চয় এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, পুরোপুরি সমাধান ছিল তাঁর ক্ষমতার অতীত।
মেঘনাদ সাহা হয়তো ডিআরডিওর অধিকর্তার আসনে তাঁর ছাত্রকে দেখলে অবাক হয়ে যেতেন। সাহা গবেষণাতে গোপনীয়তার বিরোধী ছিলেন, তা নিয়ে তাঁর সঙ্গে নেহরু বা হোমি জাহাঙ্গির ভাবার বিরোধও লেগেছে বারবার। তবে কখনোই তা প্রকাশ্যে যাতে না আসে তা নিয়ে সাহা সচেতন ছিলেন। প্রতিরক্ষা গবেষণা বিষয়ে সাহার আদর্শবাদী চিন্তাধারাও হয়তো ষাটের বা সত্তরের দশকের  পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খেত না।  প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে তাঁকে প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। তার মধ্যে দুটির উল্লেখ করা প্রয়োজন। ১৯৭০ সাল থেকেই ডিআরডিও ভারতে মিসাইল তৈরির কাজে হাত লাগায়। বাসন্তীদুলালই হায়দ্রাবাদের ল্যাবরেটরিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বহন করে নিয়ে যান। প্রথম পরিকল্পনা ছিল অনেকটাই অবাস্তব, দুবছর পরে প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে তা অনেকটা পরিবর্তন করেন বাসন্তীদুলাল। এভাবেই ভ্যালিয়ান্ট মিসাইল প্রকল্পের জন্ম। এছাড়া ১৯৭৪ সালের পোখরানে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণেও ডিআরডিওর ডিরেক্টর জেনারেল হিসাবে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তাঁর অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে তিনি বেশ কিছু প্রবন্ধ ও বক্তৃতায় বিজ্ঞান প্রশাসন সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। প্রশাসন ও বিজ্ঞানীর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তাঁর লেখার কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ল্যাবরেটরির মধ্যে সমালোচনা ও বিতর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন প্রতিষ্ঠানের আমলাতন্ত্রের চাপে নবীন বিজ্ঞানীরা অনেক সময় বাঁধাধরা গবেষণার পথ বেছে নেন। তাঁদের মধ্যে হতাশা ও বিচ্ছিন্নতার জন্ম হয়। তরুণ ও প্রবীণ বিজ্ঞানীদের বেতনের বৈষম্যও এর একটা কারণ। নবীন বিজ্ঞানীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানে স্বশাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন সরকার অনেক সময় এদের যথাযথ সম্মান দেয় না। প্রশাসনের অধিকর্তাকে সেরা বিজ্ঞানী না হলেও চলবে, কিন্তু তাঁকে পরিচালনাতে দক্ষ হতে হবে। বিজ্ঞান গবেষণার চরিত্র যে বদলে গেছে, তাও তাঁর নজর এড়ায় নি। বার্কলেতে তিনি সাইক্লোটনকে কেন্দ্র করে একদল বিজ্ঞানীর একজন হিসাবে কাজ করেছেন, কলকাতাতে সাইক্লোট্রন গ্রুপ তৈরি করেছেন। তিনি দেখেছেন যে ব্যক্তিগত গবেষণাতে যে রকম খেয়ালখুশি মতো কাজ করা যায়, যৌথ গবেষণাতে সেই স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। দেশ গঠনের কাজে বিজ্ঞানকে যুক্ত হতে হবে, তার জন্য যৌথ গবেষণার গুরুত্ব খুব বেশি। এই সমস্ত বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা অর্জন করতে পেরেছিলেন বলেই তিনি স্বশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি বিজ্ঞান দপ্তর দুইই সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করেছিলেন।
শিক্ষা বিষয়েও তাঁর চিন্তাধারা ছিল স্বচ্ছ। আধুনিক যুগে আমরা আন্তঃবিষয়ক গবেষণার কথা বলি, বাসন্তীদুলাল ষাটের দশকেই এর গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন । শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান নয়, তিনি বলতেন যে সমাজের ভবিষ্যৎ সমস্যার কথাও মাথায় রাখতে হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ধার করা প্রযুক্তি হল পিছিয়ে থাকা প্রযুক্তি। তাঁর উপাচার্য থাকার সময় জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য প্রসারণ ঘটেছিল।
       বিডি নাগচৌধুরির অপর এক দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা দরকার, তা হল পরিবেশ বিষয়ে তাঁর চিন্তা। ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ তিনি ছিলেন পরিবেশ ও পরিকল্পনার সমন্বয় সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির সভাপতি। পরিবেশ বিষয়ে তাঁর বেশ কিছু কাজ আছে। ১৯৮৭ সালে তিনি ও শালিগ্রাম ভাট ১৯৮৭ সালে একটি বই লেখেন, Global environment Movement: A New Hope for Mankind।  বইয়ের ভূমিকায় মেঘনাদ সাহার ছাত্র বিখ্যাত শিক্ষাবিদ দৌলত সিং কোঠারি লিখেছিলেন যে ভারতীয় চিন্তা ও দর্শনের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি বইটির বৈশিষ্ট্য, লেখকরা দেখিয়েছেন অহিংসা ও বিজ্ঞান ছাড়া মানুষের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। নাগচৌধুরিরা বলেছিলেন পরিবেশ আন্দোলনকে সারা বিশ্বের সঙ্গে একসঙ্গে দেখতে হবে। সারা বিশ্বকে একই সমাজ হিসাবে ভাবতে হবে। জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সময়েই শুরু হয় School on Environmental Sciences -- এর জন্য তিনি সেলিম আলির মতো পরিবেশবিদদের পরামর্শ নিয়েছিলেন। পরিবেশ সংক্রান্ত আইনের ক্ষেত্রে তিনি বিশেষজ্ঞ হিসাবে পরিচিত ছিলেন। রাষ্ট্রসংঘের পরিবেশ সংক্রান্ত কমিটির সদস্য ছিলেন ছ’বছর, ১৯৭৬ থেকে ১৯৮২।
সারা জীবনে অনেক স্বীকৃতি পেয়েছেন বিডি নাগচৌধুরি। ১৯৭৫ সালে দেশসেবার স্বীকৃতি হিসাবে তিনি পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি স্টকহোল্‌মের ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন অফ সায়েন্সের প্রোগ্রাম কমিটির সভাপতি ছিলেন ১৯৭৬ সাল থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। তিন বছর ছিলেন ওই সংগঠনের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য। ইতালির ট্রিয়েস্টের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিকাল ফিজিক্সের সায়েন্টিফিক কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৪। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের ও বিদেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির তিনি ছিলেন সদস্য। দেশের তিনটি বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিরই তিনি ফেলো  নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণে তিনি বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সঙ্গে যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক এই মানুষটির সম্পর্ক ছিল খুব নিবিড়। ১৯৮৬ সালে বিজ্ঞান মঞ্চ শুরু হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার সময় থেকে বেশ কয়েক বছর তিনি ছিলেন সংগঠনের সভাপতি। তখনই তাঁর শরীর খুব ভালো নয়, অন্য ব্যস্ততাও আছে। তার মধ্যেও সময় করে মঞ্চের খবর রাখতেন। বিজ্ঞান মঞ্চ প্রকাশিত একটি বইয়ের ভূমিকাতে তিনি লিখেছিলেন নতুন ভারতবর্ষ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন যুক্তিনির্ভর চেতনা ও বিজ্ঞান মানসিকতা। কুসংস্কার দূর করে ভারতের যুক্তিবাদী চিন্তাধারার ঐতিহ্যকে সামনে আনতে হবে। অন্যত্র তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যে বিজ্ঞানীরা ধর্মীয় কুসংস্কার কাটিয়ে উঠতে পারেন না, তাঁদের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
ব্যক্তি জীবনে তিনি খুব সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী দীপালি নাগ। তাঁদের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্রের মতো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তির সমাগম ঘটেছিল। তাঁদের এক পুত্র দীপঙ্করও অধ্যাপক। বিডি পরে বেহালাতে জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন।  বাসন্তীদুলালের সহকর্মীরা মনে করতে পারেন যে ছোটো গাড়ি নিজেই চালিয়ে তিনি সাহা ইন্সটিটিউটে বা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসে আসতেন, সহকর্মীদের জোরাজুরি করতেন গাড়িতে ওঠার জন্য। তাঁর অনুজ সহকর্মীরা স্মৃতিচারণ করেছেন যে গাড়িটা খুব নতুন ছিল না, মাঝে মাঝেই খারাপ হত, ঠেলতে হত। ইন্সটিটিউটের ছাত্রদের সমস্যার দিকে খেয়াল রাখতেন। তাঁর অধীনে গবেষণা করে অনেকেই ডক্টরেট করেছেন, তাঁর সবাই পরবর্তীকালে নিজেদের ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০০৪ সালের ২৬ জুন তাঁর মৃত্যু হয়।
তথ্যসুত্রঃ
১। স্মৃতিচিত্রঃ অধ্যাপক বাসন্তীদুলাল নাগ চৌধুরি – শ্যামল চক্রবর্তী
২। Nucleus and the Nation- Robert Anderson
৩। Basanti Dulal Nag Chaudhuri, Biographical Memoirs of the Fellows of Indian National Science Academy – Atri Mukhopadhyay

প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার শারদীয় ২০১৮ (পরিমার্জিত)