Tuesday, 25 February 2020

নাৎসি জার্মানি ও উচ্চশিক্ষা


উচ্চশিক্ষার উপর আক্রমণ: ইতিহাস ফিরে দেখা
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

       সাম্প্রতিককালে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হিংসার বিস্তার যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন নয় যে ছাত্র বা শিক্ষকদের উপর আক্রমণ নতুন ঘটনা; পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের আক্রমণের স্মৃতি এখনো মিলিয়ে যায়নি।  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক ছাত্রদের হাতে একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছেন।  যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়েও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে। ভারতবর্ষের অন্য রাজ্যেও এধরনের নিদর্শন পাওয়া যাবে। 
       কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির চরিত্র কিছুটা আলাদা। দিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং উত্তরপ্রদেশের আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিস ঢুকে ছাত্রদের উপর আক্রমণ করেছে। দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ও শিক্ষকরা বহিরাগতদের সন্ত্রাসের শিকার -- কিন্তু তাতে পুলিসের এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদতের অভিযোগ উঠেছে। অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানেও একই ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। তার থেকেও বড় কথা হল যে সরকারি স্তরে এ ধরনের ঘটনাতে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরের কথা, এমনকি মৌখিক নিন্দাটুকুও করা হয়নি। বরঞ্চ যারা আক্রান্ত, তাদেরই দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমে ও সোশ্যাল মিডিয়াতে চলেছে নানা রকমের ভিত্তিহীন প্রচার।
       জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপিকা জয়তী বসু এক নিবন্ধে লিখেছেন যে তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর এই আক্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আধুনিক যুগে শিক্ষার সঙ্গে  উদারবাদ ও সহিষ্ণুতা অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, সে সমস্ত বর্তমান কেন্দ্রীয় রকারের পছন্দ নয়। নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে, তার সামনের সারিতে আছে ছাত্ররা। জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ছাত্রদের এক শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পরে পুলিস অমানবিক আক্রমণ চালায়, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিও ভাঙচুর করে। তিনি বলেছেন উচ্চশিক্ষার উপর আক্রমণ অন্য ভাবেও শুরু য়েছে। ২০১৩-১৪ সালে উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ ছিল মোট জাতীয় উৎপাদনের ০.৬ শতাংশ, সেটা যথেষ্টই কম ছিল। ২০১৮-১৯ বাজেটে তা  আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ০.২ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি মুখস্থবিদ্যা এবং প্রযুক্তির উপরে নয়, স্বাধীন চিন্তার উপর জোর দিয়ে অন্ধ আনুগত্যের পথে  বাধা সৃষ্টি করে। চিন, মিশর, হাঙ্গেরি বা তুর্কির মতো দেশে স্বৈরশাসকরা তাই একইভাবে উচ্চশিক্ষার উপরে আঘাত নামিয়ে আনছে। একই সঙ্গে আগে উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে সমাজের যে সমস্ত অংশের প্রবেশাধিকার সংকুচিত ছিল, যেমন নারী, তথাকথিত নিচু জাত এবং প্রান্তবাসী, তারা শিক্ষার সুযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক ও আর্থিক বঞ্চনার সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। উচ্চশিক্ষা তাদের নিজেদের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করার সুযোগ করে দিচ্ছে। বিতর্ক ও প্রশ্নকে জোর করে চাপা দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও দেশের পক্ষে ক্ষতিকর হয়।
       ভারতের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে হিংসা বিদেশেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিশ্ববিখ্যাত গবেষণা পত্রিকা ‘নেচার’ ১৬ জানুয়ারি এক নিবন্ধে ভারত সরকারের কাছে শিক্ষাঙ্গনে হিংসা বন্ধের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। নিবন্ধের সূচনাটুকু অনুবাদ করি। ‘গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সারা পৃথিবী দেখেছে যে শিক্ষাবিদ ও ছাত্রসহ ভারতের নাগরিকরা পথে নেমেছে। বৈষম্যমূলক নতুন নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে জানাতে ভারতের সংবিধানের মুখবন্ধ পাঠে সমবেত হয়েছে হাজার হাজার মানুষ।’ উপরের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা উল্লেখ করে পত্রিকাটি লিখেছে যে আন্তর্জাতিক মহ এই নিয়ে উদ্বিগ্ন। প্রতিবাদীদের মধ্যে আছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত দুই নোবেল জয়ী অভিজিত বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভেঙ্কি রামকৃষ্ণন, তাঁরা দুজনেই নতুন নাগরিকত্ব আইনটিরও বিরোধী। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যসাধনের মূল স্তম্ভ, সরকারি নীতির প্রতিবাদ করা জনগণের অধিকার। ভারত ও সারা বিশ্বের শিক্ষাবিদরা সঙ্গত কারণেই শিক্ষাক্ষেত্রে বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞানবিষয়ক মুখ্য উপদেষ্টা বিজয়রাঘবন বলেছেন, শিক্ষাঙ্গন শিক্ষা, আলোচনা, ভিন্ন মতের মধ্যে বিতর্ক ও গবেষণার জায়গা, সেখানে হিংসার কোনো স্থান নেই।’ প্রশাসনকে সেই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে পত্রিকা।
       বিশ্ববিদ্যালয় যে স্বাধিকার, স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের ও প্রশ্ন করার অধিকার ইত্যাদি নানা কথা বলবে শাসকদের পক্ষে তা অরুচিকর। কেন্দ্রীয় সরকারি হিসাবেই গত তিন বছর ধরে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়দের মধ্যে জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম স্থান অধিকার করে আছে অথচ তার ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকদের দেশ-বিরোধী প্রমাণ করার জন্য চেষ্টার অন্ত নেই। আমাদের রাজ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়েও আমাদের রাজ্যের শাসক দলের একই রকম মাথাব্যথা। অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরি এক বক্তৃতাতে বলেছিলেন, ‘কী রাজ্যে কী কেন্দ্রের এক্তিয়ারে যেগুলি সবচেয়ে সফল অগ্রণী প্রতিষ্ঠান, মূল্যায়ন তালিকায় যারা পুরোভাগে থাকে, তাদের প্রতিই কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে খড়গহস্ত। অন্য প্রতিষ্ঠানের হিংসা-তাণ্ডব-ভাঙচুর, দুর্নীতি-অনাচার, বিভ্রাট-অপশাসন সব কিছুর সঙ্গে তাঁদের দিব্যি সহাবস্থান, সেগুলি ছোট করে দেখাতে, তার হয়ে সাফাই গাইতে এমনকি অস্তিত্ব অস্বীকার করতে তাঁরা উন্মুখ।‘ আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার সীমিত, তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক ভাবেই বিশেষ সুবিধাভোগী ও সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তাদের উপর আক্রমণ শাসক দলের কাছে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের একটা সহজ রাস্তা।
      এই প্রসঙ্গে স্মরণ করি যে নতুন নাগরিকত্ব বিরোধী বিলের প্রতিবাদে একদল বিজ্ঞানী একটি আবেদন স্বাক্ষর করেছিলেন। বর্তমান সরকারের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের যোগাযোগ বড়ই ক্ষীণ, কর্তাব্যক্তিরা ইতিহাস নয়, কল্পকথায় বিশ্বাসী এবং আধুনিক বিজ্ঞানকে ততদূরই বিশ্বাস করেন যতদূর প্রাচীন শাস্ত্রে পাওয়া যাবে বলে তাঁদের ধারণা। তাই বিজ্ঞানীদের প্রতিবাদে তাঁরা কর্ণপাত করেন নি। খবরে প্রকাশ প্রতিবাদীদের মধ্যে যাঁরা সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় কিনা তাই নিয়ে সরকার ভাবনা চিন্তা করছে। কোনো কোনো উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা যাবে না এমন বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে
      পাঠক মাত্রেই উপরে আলোচিত ঘটনাক্রম জানেন। উচ্চশিক্ষার উপর নিয়ন্ত্রণ জারির চেষ্টা  বিশ্বে আগেও হয়েছে। তার সবচেয়ে কুখ্যাত ঘটনা ও তার ফলাফলকে স্মরণ করার জন্য এই লেখা। ঘটনাস্থল ছিল জার্মানি, সময় নাৎসিদের শাসনকাল।
       শিক্ষাদানের পাশাপাশি স্বাধীন চিন্তার বিকাশে উৎসাহদানের জন্য জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে মধ্যযুগেও খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখা হত। প্রায় দুই শতাব্দী আগে ১৮৩৭ সালে গটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপককে সরকারের বিরোধিতা করার জন্য পদচ্যুত করা হয় -- এর ফলে সাধারণের মধ্যে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল যা সে যুগে এক বিরল ঘটনা। আধুনিক যুগে জার্মান শিক্ষাপদ্ধতি ৎকর্ষ বৃদ্ধির পক্ষে সহায়ক ছিল। নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৯০ সাল থেকে,  ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত বিজ্ঞান ও সাহিত্যে মোট ৪১ জন জার্মান সেই পুরস্কার লাভ করেন। জার্মান অধ্যাপকদের সামাজিক প্রতিষ্ঠা ও সুযোগসুবিধা ছিল সারা পৃথিবীর শিক্ষাবিদদের ঈর্ষার বস্তু।
      জার্মানিতে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসে ১৯৩৩ সালে। নাৎসি মতবাদের এক মূল স্তম্ভ ছিল ইহুদি বিরোধিতা। নাৎসিরা ইহুদিদের নিচু শ্রেণির মানুষ মনে করত এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় ও তার পরের দুঃখকষ্টের জন্য তাদের দায়ী করেছিল। নাৎসিরা সরকারে আসার পরে তাদের উপর নিপীড়ন চরমে উঠেছিল, সে ইতিহাস সকলেই জানেন। একই সঙ্গে চিন্তার জগতে একাধিপত্য কায়েম করার জন্য শিক্ষা, বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষাকে নিজের কবলে আনার জন্য সচেষ্ট হয় নাৎসিরা। শিক্ষাবিদদের হিটলার বিশ্বাস করতেন না, তিনি চেয়েছিলেন নাৎসি মতবাদ বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে পড়াতে হবে এবং সমস্ত শিক্ষাতেই একটা নাৎসি ঝোঁক আনতে হবে।
      হিটলারের ক্ষমতায় আসার তিন মাসের মধ্যেই তাই নতুন সিভিল সার্ভিস আইন জারি করে প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, সব স্তরের শিক্ষককে তার আওতায় আনা হয়। ইহুদি এবং সরকারবিরোধীদের সরাসরি পদচ্যুত করা হয়। ঠাকুমা, ঠাকুরদা, দাদু বা দিদিমার মধ্যে একজন ইহুদি হলেই তাঁর চাকরি যায়। উদারবাদীরাও সরকার বিরোধী পরিচয়ে বরখাস্ত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের মধ্যে পনেরো শতাংশ এই আইনের আওতায় চাকরি হারান, তাঁদের এক তৃতীয়াংশ ছিলেন ইহুদি। বাকি দুই তৃতীয়াংশ তাঁদের রাজনৈতিক মতামতের জন্য বরখাস্ত হন।
      আমাদের দেশে ছাত্ররা ও জনসাধারণ মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টির চেষ্টা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে পথে নেমেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে দেশ শিক্ষাতে সেই সময় সারা পৃথিবীতে শীর্ষস্থান অধিকার করেছিল, সেই জার্মানিতে এই ধরনের ঘটনার কী প্রতিবাদ হয়েছিল। প্রাথমিক ভাবে আশ্চর্য মনে হলেও বাস্তব এই যে বিশেষ কোনো প্রতিবাদ শিক্ষাবিদ বা ছাত্রমহল থেকে শোনা যায়নি।  কারণ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিক থেকে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলি শিক্ষাদানের পাশাপাশি উগ্র জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি স্পষ্টতই ছিল আক্রমণকারী, অথচ ১৯১ সালে সাড়ে চারশোজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জার্মানির সামরিক অভিযানকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছিলেন। বিরোধিতা করেছিলেন মাত্র তিনজন, তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। যুদ্ধে পরাজয়ের পরে জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত ভাইমার প্রজাতন্ত্র অনেক অধ্যাপকেরই অপছন্দ ছিল। আবারও আইনস্টাইন ছিলেন ব্যতিক্রম, তিনি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের অঘোষিত মুখপত্রের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ছাত্রদের মধ্যেও নাৎসিদের প্রভাব ছিল খুবই বেশি, ছাত্রদের অধিকাংশ সংগঠন থেকে আগেই ইহুদিদের বিতাড়িত করা হয়েছিল। তাই ছাত্রদের থেকেও নতুন আইনের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ আসেনি।
      অধ্যাপকদের মনোবৃত্তি কিরকম হয়েছিল তার একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক পিটার ড্রুকের ছিলেন অস্ট্রিয়ান, নতুন নীতি চালু হওয়ার সময় তিনি দেশে ফিরে যাবেন কিনা চিন্তা করছিলেন। ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে সবচেয়ে উদার, অধ্যাপকরা তাঁদের শিক্ষাদীক্ষা এবং গণতন্ত্রনিজেদের বিবেকের প্রতি আনুগত্য নিয়ে গর্ব বোধ করতেন। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন নাৎসি কমিশার নিয়োগ করা হল, তাঁর হাতেই সমস্ত ক্ষমতা। কমিশার সমস্ত অধ্যাপকদের এক সভাতে ডেকে ঘোষণা করেন যে সমস্ত ইহুদি অধ্যাপকদের অবিলম্বে বরখাস্ত করা হচ্ছে। বিভাগীয় প্রধানদের অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করে কমিশার বলেন যে তাঁরা যে কোনো রকম বিরোধিতা করলে তাঁদের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে। সভায় ছিলেন এক বিশিষ্ট শরীরতত্ত্ববিদ যিনি উদারনীতি ও স্বাধীনতার পক্ষে তাঁর একনিষ্ঠ সমর্থনের জন্যও বিখ্যাত ছিলেন, ড্রুকের তাঁর নাম বলেন নি। কমিশারের বক্তৃতার শেষে সবাই যখন তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে, তিনি উঠে বললেন, ‘এ সব তো খুব ভালো কথা, কিন্তু শরীরতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণার জন্য কি বেশি টাকা পাওয়া যাবে?’ কয়েকজন অধ্যাপক ইহুদি সহকর্মীদের সঙ্গে সভা থেকে বেরিয়ে গেলেও বাকিরা কিন্তু তাঁদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ড্রুকের আচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে জার্মানি ত্যাগ করেন।
       ছাত্ররাও পিছিয়ে ছিল না। তারা ঘোষণা করে যে জার্মান সাহিত্যকে অ-জার্মান প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হবে। এক বিরাট বহ্ন্যুৎসবের আয়োজন করা হয় যেখানে আগুনে নিক্ষিপ্ত হয় সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কার্ল মার্ক্স, বের্টোল্ট ব্রেখট, স্টিফেন জুইগ, আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো ইহুদি দার্শনিক বিজ্ঞানী বা সাহিত্যিকদের বই।
      জার্মানির কথায় আবার ফিরে যাব, কিন্তু তার আগে আমাদের দেশের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করা যাক। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিন্তু হচ্ছে না, সবাই এখনো পর্যন্ত সরকারি সিদ্ধান্তকে মু বুজে মেনে নিচ্ছে না, প্রতিবাদ বিভিন্ন মহল থেকে আসছে। এ থেকে বোঝা যায় যে উগ্র জাতীয়তাবাদ এখনো পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি। অবশ্যই তার একটা বড় কারণ গত নয় দশকে সারা পৃথিবীর পটপরিবর্তন। দক্ষিণপন্থী চিন্তাভাবনা নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে খুবই শক্তিশালী, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তা সর্বগ্রাসী। বিশে করে শিক্ষাপ্রাঙ্গগুলি সারা পৃথিবীতেই এখনো উদারবাদের ঘাঁটি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে রিপাবলিকানরা বাকি সমস্ত প্রতিষ্ঠানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হলেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে তাদের বিশেষ জায়গা নেই।  কিন্তু সাধান না হলে ভারতে ভবিষ্যতে যে জার্মানির মতো অবস্থা হবে না তা নিশ্চিত হয়ে বলা যায় না।
      ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের বিখ্যাত দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জুডিথ বাটলারের ২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘The Criminaliztion of Knowledge’ থেকে অংশবিশেষ উদ্ধৃত করি। ‘If and when the government or any other external power intervenes with political interests in the university to mandate or censor its curriculum, its direction, its standards, then the autonomous judgement of the faculty is undermined, and knowledge is restricted and distorted. The exercise of the freedom to think is punishable under such conditions. And when administrators ally with those external powers, they participate in the destruction of their own institutions.’ সরকার বা বাইরের শক্তি শিক্ষাঙ্গনে হস্তক্ষেপ আমাদের দেশে নতুন নয়। এ কথাও বলা বাহুল্য যে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি সবসময়েই থাকবেন যাঁরা নিজেদের সুবিধার জন্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ বা সমাজের স্বার্থকে বিসর্জন দিতে তৈরি থাকবেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাধিকার হরণের সুযোগ নিয়ে তাঁদেরই সরকার প্রশাসনিক পদে দেখতে পছন্দ করবে। আমাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকিয়ে আমরা বাটলারের কথার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেখতে পাই। নাৎসি জার্মানিতেও এই ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু যে শিক্ষাবিদ আদর্শগতভাবে এই ধরনের হস্তক্ষেপকে সমর্থন করেন তিনি শুধু একটা প্রতিষ্ঠান নয়, গোটা ব্যবস্থাটার অনেক বেশি অনেক বেশি ক্ষতি করেন।
      নাৎসিদের বিরোধিতা করেছিলেন কয়েকজন সন্দেহ নেই। কয়েকজন ইহুদি বা উদারবাদী না হয়েও এই নতুন নীতির প্রতিবাদে পদত্যাগও করেছিলেন। কেউ কেউ আবার বরখাস্ত সহকর্মীদের সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু গোপনে, কারণ তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হত। যেমন এক অধ্যাপক পল কাহলে তাঁর এক ইহুদি বন্ধুকে সাহায্য করেছিলেন বলে তাঁকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় যে তিনি চাকরি ছেড়ে ব্রিটেনে চলে যান। কিন্তু বেশ কিছু ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীরা শুধুমাত্র প্রতিবাদ করেন নি বা নীরবে পাশ কাটিয়ে গেছেন তা নয়, নাৎসি মতবাদের পক্ষে বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক যুক্তি হাজির করেছিলেন।  ফ্রেইবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার ছাত্র ও সহকর্মীদের বলেন যে নাৎসিদের সমর্থন করা উচিত কারণ জার্মানির আত্মার নিশ্বাস নেওয়ার জন্য তাজা বাতাসের প্রয়োজন। প্রশ্ন করা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা হল স্বার্থপরতা ও নেতিবাচক। অথচ সিভিল সার্ভিস আইনের পরে তাঁর সহকর্মী ধ্যাপকরা তাঁকেই ভোট দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাচিত করেন। হিটলার ক্ষমতায় আসার এক মাসের মধ্যে গটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ইহুদি অধ্যাপককে বরখাস্ত করা হয়। পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী জেমস ফ্রাঙ্ক যখন তার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেন, তখন গটিনগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক অধ্যাপক চিঠি লিখে তাঁর বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতের অভিযোগ আনেন। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে বলা হয়েছিল ইহুদি ধাপ্পাবাজি – এই কথাটা কিন্তু নাৎসি পার্টির নেতা বা সরকারের উচ্ছিষ্ট ভোগে উন্মুখ অপরিচিত অধ্যাপকদের থেকে আসেনি। যে দু’জন বিজ্ঞানী আপেক্ষিকতা তত্ত্বের উপর আক্রমণের নেতৃত্ব দেন, তাঁরা ভালোই জানতেন যে আপেক্ষিকতা তত্ত্ব পরীক্ষাতে প্রমাণিত। ফিলিপ লেনার্ড ও জোহানেস স্টার্ক যথাক্রমে ১৯০৫ এবং ১৯১৯ সালে পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। কিন্তু ইহুদি বিদ্বেষ তাঁদের চিন্তাশক্তিকে আচ্ছন্ন করেছিল।
      বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পরিস্থিতি উত্তরোত্তর খারাপ হয়েছিল। হিটলার যখন ক্ষমতায় আসেন তখন জার্মানিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে মোট ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছি১,২৭,৮২০। ছ’বছরের মধ্যে ১৯৩৯ সালে তা অর্ধেকেরও বেশি কম দাঁড়ায় মাত্র ৮,৩২শুধুমাত্র ইহুদি ছাত্রদের বিতারণ দিয়ে এই ঘটনার ব্যাখ্যা করা যাবে না, কারণ তারা সংখ্যায় খুব বেশি ছিল না। নাৎসিরা উচ্চশিক্ষাকে পছন্দ করত না এবং সাধারণ ভাবে মৌলিক জ্ঞানার্জনের বিরোধী ছিল। উচ্চশিক্ষাতে সুযোগ পেতে গেলে পুরুষদের জন্য মিলিটারি সার্ভিস ও মহিলাদের জন্য লেবার সার্ভিস করা হয়েছিল বাধ্যতামূলক। এই সমস্ত কারণে ছাত্রসংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে। নারীশিক্ষার অবস্থা আরও খারাপ হয়। আইন করে অধ্যাপক পদে মহিলাদের নিয়োগ বন্ধ করা হয়। মহিলা ডাক্তারদের চিকিৎসা করতে দেওয়া হত না। এই সব কারণে ছাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পায়।
       নাৎসি শাসনকালে ইহুদি শিক্ষাবিদদের জার্মানি ত্যাগের ইতিহাস খুবই পরিচিত। যাঁরা তা সত্ত্বেও দেশে রয়ে গিয়েছিলেন, তাঁদের শেষ পর্যন্ত স্থান হয় কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। সেখানে  ষাট লক্ষ ইহুদিকে খুন করা হয়েছিল, বন্দী অধ্যাপকদের অধিকাংশই ছিলেন সেই তালিকায়। সবচেয়ে বিখ্যাত দেশত্যাগীদের মধ্যে রয়েছেন আইনস্টাইন। ছাত্রসংখ্যা হ্রাসের ফল কী হয়েছিল তা অনুমানের বিষয়, কিন্তু নাৎসি শাসনের ফলে বিজ্ঞানের ভরকেন্দ্র যে জার্মানি থেকে নতুন দুনিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হয়েছিল সন্দেহ নেই। শুধুমাত্র পদার্থবিদ্যাতেই পাঁচজন দেশত্যাগী বিজ্ঞানী পরবর্তীকালে নোবেল পুরস্কার জিতেছেন। আরও তিনজন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর জন্ম যুদ্ধপূর্ব জার্মানিতে, কিন্তু তাঁদের পরিবার দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।
       বিজ্ঞানীদের দেশত্যাগের ফল বোঝার জন্য মার্কিন পরমাণু বোমা প্রকল্পের পিছনের ইতিহাসের দিকে চোখ রাখা যাক।পরমাণু বোমার পিছনে আছে নিউক্লিয় বিভাজন বিক্রিয়া। জার্মান অটো হান এই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাস জানে যে তার পিছনে হানের দীর্ঘদিনের সহযোগী লিজে মাইটনারের ভূমিকা তাঁর থেকে কম নয়। বস্তুত পরীক্ষার ফল ব্যাখ্যার জন্য হানকে মাইটনারের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। মাইটনার কিন্তু তখন জার্মানি থেকে গোপনে পালিয়ে গেছেন। ফলে নিউক্লিয় বিভাজনের কথা গোপন রাখার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। বস্তুত এ বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশের আগেই ডেনমার্কের বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিল্‌স বোরের মারফত সেই খবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছে যায়। আইনস্টাইন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টকে এক চিঠিতে পরমাণু বোমা তৈরি সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন করে দিয়েছিলেন। এই চিঠি লিখতে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন লিও জিলার্ড, ইউজিন উইগনার এবং এডওয়ার্ড টেলার। এঁরা সবাই জার্মান নন, কিন্তু তিনজনেই ইহুদি এবং প্রাণ বাঁচাতে নাৎসি অধিকৃত ইউরোপ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। জিলার্ড শৃঙ্খল বিক্রিয়ার আবিষ্কর্তা যা পরমাণু বোমা ও রিঅ্যাক্টরের প্রাণ স্বরূপ। টেলার এবং উইগনার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে হাইড্রোজেন বোমা নির্মাণে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন। পরমাণু বোমা প্রকল্পের প্রধানতম বিজ্ঞানীদের মধ্যে ছিলেন এনরিকো ফের্মি ও নিল্‌স বোর। ফের্মি ইতালিয়ান,  তাঁর দেশেও হিটলারের প্রভাবে মুসোলিনি ইহুদি বিরোধী আইন চালু করেন। বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ডেনমার্ক অধিকার করে নেওয়ার পরে সেখানে ইহুদিদের উপর আক্রমণ নেমে আসে। বোর বা ফের্মি ইহুদি ছিলেন না, কিন্তু তাঁদের স্ত্রীরা ছিলেন ইহুদি। স্ত্রীদের রক্ষা করতে তাঁদের দেশত্যাগ করতে হয়েছিল।
       হিটলারের জার্মানিতে শিক্ষাক্ষেত্রে ইহুদিদের উপর আক্রমণ দিয়ে যে ঘটনাক্রম শুরু হয়েছিল, দেশের প্রায় সার্বিক ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে তার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পঁচাত্তর বছর পরেও জার্মানি বিজ্ঞান গবেষণাতে তার অতীত শীর্ষ অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছোতে পারেনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটা জরুরি। জার্মানিতে প্রতিবাদের কণ্ঠ ধ্বনিত হয়নি, তাই নাৎসিরা ষাট লক্ষ ইহুদিকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে খুন করতে পেরেছিল। বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ না করাটা অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর নামান্তর। লিজে মাইটনার অটো হানকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, “You all worked for Nazi Germany. And you tried to offer only a passive resistance. Certainly, to help buy off your conscience you helped a persecuted person here and there, but millions of innocent human beings were allowed to be murdered without any kind of protest being uttered. ...  you first betrayed your friends, then the men and women who worked with you in that you let them stake their lives on a criminal war – and finally that you betrayed Germany itself, because even when the war was already quite hopeless, you did not once arm yourselves against the senseless destruction of Germany.” উচ্চশিক্ষার উপর আক্রমণ এক বৃহৎ পরিকল্পনার অংশবিশেষ। নিরপেক্ষ থাকা বা নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ সেই পরিকল্পনা বানচাল করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। ছাত্ররা ও আরও সঠিকভাবে বললে তরুণ সমাজ সেই কথা হৃদয় থেকে উপলব্ধি করেছে ও পথে নেমে প্রতিবাদ করছে। 

(প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, ফেব্রুয়ারি, ২০২০)

Friday, 20 December 2019

‘এবং আইনস্টাইন’ – প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞানপ্রবন্ধের সংকলন


‘এবং আইনস্টাইন’ – প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞানপ্রবন্ধের সংকলন

  গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

       ‘এবং আইনস্টাইন’ অর্পণ পালের কয়েকটি বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন। নামটিতে অভিনবত্ব আছে, লেখক প্রথমেই বলেছেন ‘বইয়ের মূল ভরকেন্দ্র বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।‘প্রথম পর্বের ছটি প্রবন্ধের সেটা সর্বাঙ্গীণ ভাবেই সত্যি। আইনস্টাইন সেখানে আছেন, এমনকি নাম উল্লেখ না থাকলেও আছেন। লেখক বলেননি, কিন্তু দ্বিতীয় পর্বের জন্যও ঠিক তেমনি এক ভরকেন্দ্র তিনি বেছে নিয়েছেন। সেখানে আছেন বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের প্রায় সব তালিকাতেই যিনি আইনস্টাইনকে সরিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করে নিয়েছেন, সেই আইজ্যাক নিউটন।
       লেখক শুরুতে আইনস্টাইনের এক সংক্ষিপ্ত জীবনী যোগ করেছেন, ফলে পরের লেখাগুলি পড়তে সুবিধা হয়েছে। প্রথম প্রবন্ধে এসেছ ঠিক একশো বছর আগের এক পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের কথা। সেই সময় ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটনের উদ্যোগে সূর্যের মাধ্যাকর্ষণে তারার আলো কতটা বেঁকে যায় তা মাপা হয়েছিল। এডিংটন ঘোষণা করেন যে আইনস্টাইনের চার বছর আগের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের অংকের সঙ্গে তা মিলে গেছে। বিশ্বযুদ্ধ ক্লান্ত মানুষের কাছে দুইবিরোধী শিবিরের দুই বিজ্ঞানীর এই যৌথ কৃতিত্ব অন্য এক বার্তা নিয়ে এসেছিল। এডিংটনের অনুসৃত পদ্ধতি নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ আপেক্ষিকতা আইনস্টাইনের অন্যান্য বিখ্যাত তত্ত্বের মতো একবারে পূর্ণতা পায়নি, দশ বছরের চেষ্টাতে আইনস্টাইন তাঁর লক্ষ্যে পৌঁছেছিলেন। এই সমস্ত ইতিহাসও লেখাতে এসেছেএকশো বছর পরে জ্যোতির্বিদ্যা এমন স্তরে উঠেছে, যে কৃষ্ণগহ্বরের ছবি তোলা সম্ভব হয়েছে, সফল হয়েছে মহাকর্ষ তরঙ্গের সন্ধান। এ দুইই সেই সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্বের ভবিষ্যৎবাণী। তাই এই লেখাটি আজ খুবই প্রাসঙ্গিক।
       দ্বিতীয় নিবন্ধের বিষয় আইনস্টাইনের সমসাময়িক অপর এক জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রিৎজ হেবার। হেবার এক জটিল মানুষ। একদিকে তিনি বাতাসের নাইট্রোজেন থেকে অ্যামোনিয়া সংশ্লেষ পদ্ধতি আবিষ্কার করে সারের উৎপাদনে বিপ্লব এনেছেন, অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর তৈরি রাসয়ানিক অস্ত্র বহু সৈন্যের মৃত্যুর জন্য দায়ীসেই নিয়ে তাঁর স্ত্রীর ক্লারার সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ হয়েছিল, স্ত্রীর আত্মহত্যাও তাঁকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত করতে পারে নি। লেখক উদ্ধৃত করেছেন হেবারের মত, যুদ্ধের সময় বিজ্ঞানীর দায়িত্ব শুধুমাত্র দেশের প্রতি। এই আলোচনা আজ আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আরো প্রাসঙ্গিক, কারণ প্রবন্ধটা পড়তে গিয়ে মনে পড়ে গেল যে ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পরেই জার্মান আগ্রাসনকে ধিক্কার জানিয়ে চারজন জার্মান অধ্যাপক এক বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন আইনস্টাইন। সেই বিবৃতি ছিল জার্মানির বেলজিয়াম আক্রমণকে সমর্থনে তিরানব্বই জন জার্মান অধ্যাপক পণ্ডিতের বিবৃতির প্রত্যুত্তর। তিরানব্বই জনের মধ্যে অনেকে পরে তাঁদের মত পরিবর্তন করেছিলেন, হেবার কিন্তু তাঁদের মধ্যে পড়বেন না। অথচ আইনস্টাইন ও হেবার দুজনে ছিলেন বন্ধু। ফ্যাসিবাদের কাছে শেষ পর্যন্ত উগ্র দেশপ্রেমও ইহুদি পরিচয়ের পাশে গৌণ হয়েছিল, এটাই হেবারের জীবনের ট্রাজেডি।
       তৃতীয় প্রবন্ধে এসেছেন ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক, কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক এবং আইনস্টাইনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতিরানব্বই জনের বিবৃতির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম, আবার এক বছরের মধ্যেই তিনি নিজের ভুল বুঝে প্রকাশ্যে জার্মানির সমালোচনা করেছিলেন। হিটলারের উত্থানের সঙ্গে অনেক জার্মান বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের তত্ত্বকে ইহুদি বিজ্ঞান বলে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন, প্ল্যাঙ্ক কিন্তু বিজ্ঞানের ব্যাপারে কোনোরকম আপোস করতে রাজি ছিলেন না। ইহুদি বিজ্ঞানীদের রক্ষা করার জন্য তিনি হিটলারের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যে কোনো রকম সমঝোতা ব্যর্থ হতে বাধ্য। প্ল্যাঙ্কও তাই ফ্যাসিস্ট আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন।
       চতুর্থ প্রবন্ধটির বিষয় বর্তমান বহুচর্চিত, সত্যেন্দ্রনাথের আইনস্টাইনকে লেখা সেই বিখ্যাত চিঠি এবং সত্যেন্দ্রনাথ ও আইনস্টাইনের সম্পর্ক। বিষয়টি পরিচিত হলেও প্রবন্ধের মধ্যে সংক্ষিপ্ত আকারে সত্যেন্দ্রনাথের  জীবন আলেখ্য ও আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর মতবিনিময়কে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন লেখকপরের লেখাটিতে আছে ফ্যাসিবাদ থেকে আত্মরক্ষার জন্য আইনস্টাইনের জার্মানি ত্যাগের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাসের সময় তিনি কয়েকজন পরিচিত বিজ্ঞানীর অনুরোধে স্বাক্ষর করেছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টকে লেখা এক চিঠিতে, যেখানে হিটলারের হাতে নিউক্লিয়ার বোমার বিপদ সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছিল। এই ঘটনা প্রবাহের প্রথম পর্ব শেষ হয় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিউক্লিয় বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে। আইনস্টাইনের ভর ও শক্তির তুল্যতা সূত্র নিউক্লিয় বোমা তৈরিতে কোনো ব্যবহারিক কাজে লাগে নি, আইনস্টাইন বোমা তৈরির সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিলেন না। কিন্তু যখন যুদ্ধের পরে জানা গেল যে জার্মানি সেই অস্ত্র তৈরির কাছাকাছিও পৌঁছোয় নি, তখন আইনস্টাইন সেই চিঠিতে স্বাক্ষরের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা করেছেন। এই পর্বের শেষ প্রবন্ধটি আইনস্টাইনের নোবেল পুরস্কার নিয়ে, সে কথায় আমরা পরে আসব।
       দ্বিতীয় পর্বের প্রথম প্রবন্ধটির বিষয় নিউটনের অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিনিউটন অ্যালকেমি ও বাইবেলের ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে অনেক কথা লিখেছিলেন। আধুনিক যুগে আমরা অ্যালকেমির পরশপাথর তৈরির চেষ্টাকে আমরা বিদ্রূপ করতে অভ্যস্ত, কিন্তু নিউটনের যুগে রসায়ন ও অ্যালকেমির মধ্যে সীমারেখা স্পষ্ট ছিল না। বিজ্ঞানের ঐতিহাসিকরা অনেকে মনে করেন যে সাদা আলো যে নানা রঙের আলোর সমাহার, সেই ধারণা নিউটন তাঁর অ্যালকেমি চর্চা থেকেই পেয়েছিলেন। প্রায় এক কোটি শব্দ সমন্বিত সেই পাণ্ডুলিপির ইতিহাসও যথেষ্ট চমকপ্রদ
       পরের লেখাতে আছেন জিওদার্নো ব্রুনো, আধুনিক বিজ্ঞানের প্রথম শহিদ। ক্যাথলিক চার্চের বিরাগভাজন হয়ে গ্যালিলিও নিজের মতকে ভুল বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। কেপলার ছিলেন জার্মান, নিউটন ইংরেজ – দুজনেরই জন্ম প্রটেস্টান্ট দেশে। প্রটেস্টান্ট চার্চ ছিল অপেক্ষাকৃত সহনশীল, তাঁদের বিজ্ঞান গবেষণাতে তা কোনো বাধা সৃষ্টি করেনি। গ্যালিলিও ও ব্রুনোর সমসাময়িক কেপলার তাঁদের মতোই কোপার্নিকাসপন্থী ছিলেন নিউটন অবশ্য পরের যুগের মানুষ।  ব্রুনো দার্শনিক, বিজ্ঞানী নন।  গ্যালিলিও ভুল স্বীকার করে চরম শাস্তি এড়িয়েছিলেন। ব্রুনোর মত ছিল আরো বেশি বাইবেল বিরোধী। তিনি শুধু যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে বলেছিলেন তা নয়, তিনি বলেছিলেন যে  মহাকাশে আছে অসংখ্য গ্রহ, সেখানে থাকতে পারে মানুষের মতো আরো উন্নত জীব। ক্ষমা তিনি চাইবেন না, তাই তাঁকে পুড়ে মরতেই হল।
       এই পর্যায়ের তৃতীয় প্রবন্ধের বিষয় নিউটন ও রবার্ট হুকের সম্পর্ক। মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কারের ক্ষেত্রে হুক কৃতিত্ব দাবী করেছিলেন। এছাড়াও আরো নানা কারণে হুক ও নিউটনের মধ্যে বিবাদ বেঁধেছিল।  হুককে আমরা এতদিন দেখেছি নিউটনের চোখে, যিনি নিজের কৃতিত্বের কোনো ভাগীদারকে সহ্য করতে পারতেন না। ক্যালকুলাস আবিষ্কার নিয়ে লিবনিৎজের সঙ্গে তাঁর বিতণ্ডার ইতিহাস অনেকেরই জানা। আধুনিক যুগ হুকের পুনর্মূল্যায়ন করছে। সংকলনের শেষ লেখাতে এসেছেন নিউটনের গুণমুগ্ধ এক বিজ্ঞানী এডমন্ড  হ্যালির বহুমুখী কৃতিত্ব নিউটনের আলোতে ঢাকা পরে গেছে, আমরা শুধু মনে রেখেছি তাঁর নামাঙ্কিত ধূমকেতুটিকে। লেখক হ্যালিকে নতুন করে চিনিয়েছেন।
       পরিশেষে কয়েকটা ভিন্নমতও প্রকাশ করি। আইনস্টাইন যখন রবীন্দ্রনাথকে বোসের খবর জিজ্ঞাসা করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের মনে আড়াই দশকেরও বেশি সময় পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কহীন জগদীশচন্দ্রের নাম আসেনিতিনি ভেবেছিলেন দেবেন্দ্রমোহন বোসের কথা, যিনি গোটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়টা জার্মানিতে কাটিয়েছেনডিরাক সত্যেন্দ্রনাথকে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেছিলেন, এই কাহিনিতে বিশ্বাস করা শক্তডিরাকের মনোবৃত্তি ছিল একেবারেই ভিন্নরকমতিনি যদি বিশ্বাস করতেন সত্যেন্দ্রনাথকে নোবেল দেওয়া উচিত, তাহলে মনোনয়নের জন্য তিনি অন্যের মতামতের অপেক্ষা করতেন না
       আইনস্টাইনের নোবেল পুরস্কার সংক্রান্ত প্রবন্ধে লেখক বলেছেন আপেক্ষিকতাবাদ কেনা দিয়ে আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যাকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা যেনইচ্ছা না থাকলেও দিতে হয় তাই দেওয়াএকথার সঙ্গে একেবারেই একমত হওয়া গেল নাআপেক্ষিকতাবাদের জন্য আইনস্টাইন সাধারণ মানুষের মধ্যে বিখ্যাত, কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটানোর ক্ষেত্রে আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা তাঁর অন্য কোনো কাজের থেকে কোনোমতেই পিছিয়ে থাকবে না। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ব্যাখ্যা করার জন্য আমাদের অবশ্য প্রয়োজন কোয়ান্টাম বলবিদ্যাতার জন্মের পিছনে আছে চারটি মৌলিক আবিষ্কার: প্ল্যাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব, আইনস্টাইনের আলোকতড়িৎ তত্ত্ব, নিলস বোরের পরমাণুর মডেল এবং সত্যেন্দ্রনাথ বোসের প্ল্যাঙ্কের সূত্রের ব্যাখ্যা। প্ল্যাঙ্ক সহ কোনো বিজ্ঞানীই সেই সময় কোয়ান্টাম তত্ত্বের গুরুত্ব বুঝতে পারেন নি। আইনস্টাইনই প্রথম তা উপলব্ধি করে তাকে আলোকতড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যাতে ব্যবহার করেছিলেন। আইনস্টাইন নিজে অবশ্য কোয়ান্টাম বলবিদ্যাকে শেষ কথা মনে করতেন না, কিন্তু সে স্বতন্ত্র প্রশ্ন।
       প্রবন্ধগুলি সহজ ভাষায় লেখা, প্রায় সবকটিই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছিল। সংকলনের সময় বিষয় নির্বাচনে মুনশিয়ানা লক্ষণীয়, দুই শতাব্দীর দুই সেরা বিজ্ঞানীর যুগ তরুণ লেখকের কলমে উঠে এসেছে। পাঠক অনেক নতুন তথ্য খুঁজে পাবেন, আবার অনেক পুরানো কথাও নতুন আলোতে এসেছে। বইয়ের ছাপা সুন্দর, সৃষ্টিসুখ প্রকাশনা বইটি প্রকাশ করে আমাদের ধন্যবাদার্হ হয়েছেন
                                                            
এবং আইনস্টাইন
লেখক অর্পণ পাল
সৃষ্টিসুখ প্রকাশনা
মূল্য: ১৩৯ টাকা

(প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার, নভেম্বর ২০১৯)

Saturday, 30 November 2019

চন্দ্রযান -২ঃ সাফল্য ও ব্যর্থতাকে অতিক্রম করে বিজ্ঞান গবেষণা




চন্দ্রযান -২ঃ সাফল্য ও ব্যর্থতাকে অতিক্রম করে বিজ্ঞান গবেষণা

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

       এই পত্রিকার আগস্ট সংখ্যায় চন্দ্রযান-২ এর উৎক্ষেপণের খবর দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছেন যে বিক্রম ল্যান্ডারকে সফ্‌ট ল্যান্ডিং (পুরানো এক লেখায় পড়েছিলাম পালকের মতো অবতরণ) শেষ পর্যন্ত করানো সম্ভব হয়নি।সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখে পূর্বনির্ধারিত সূচী অনুযায়ী বিক্রমকে চন্দ্রযান থেকে বিচ্ছিন্ন করাতে বিজ্ঞানীরা সফল হয়েছিলেন, কিন্তু সে যখন চন্দ্রপৃষ্ঠের দু’কিলোমিটার উপরে তখন রকেটের নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়। তিনশো তিরিশ মিটার উচ্চতায় বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেই সময় তার নামার বেগ ছিল সেকেন্ডে ৫৮ মিটার, যা নিরাপদ মাত্রার উপরে। বিক্রম সম্ভবত চন্দ্রপৃষ্ঠে ৫০ মিটার প্রতি সেকেন্ড বেগ নিয়ে নেমেছিল, যা অনেকটাই বেশি। এই হার্ড ল্যান্ডিঙের পর বিক্রমের চিহ্ন অবলোহিত ক্যামেরাতেখুঁজে পাওয়া গেলেও তার সঙ্গে আর যোগাযোগ স্থাপন করা যায় নি। মূল চন্দ্রযান অবশ্য চাঁদের চারপাশে আবর্তন করছে এবং তথ্য পাঠাচ্ছে।
       এই অভিযানকে নিয়ে নানা পরস্পরবিরোধী খবর পাওয়া যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে উৎক্ষেপণের দিন ছিল ১৪ জুলাই, কিছু ত্রুটি ধরা পড়ার জন্য তা শেষ মুহূর্তে পিছিয়ে করা হয় ২২ জুলাই। উৎক্ষেপণ আটদিন পিছিয়ে গেলেও অবতরণের দিন পালটানো হয় নি। সমালোচনা হয়েছে যে নতুন কেন্দ্রীয় সরকারের একশোতম দিনকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যেই অবতরণের দিন অপরিবর্তিত রাখার জন্য সরকারের থেকে হয়তো চাপ এসেছিল। ভারত এই প্রথম সফ্‌ট ল্যান্ডিঙের চেষ্টা করেছিল। এর আগে কেবলমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন চাঁদের বুকে মহাকাশযান নামাতে সক্ষম হয়েছে। মাত্র কয়েকমাস আগে ইজরায়েলের অবতরণ যান চাঁদে নামার সময় দুর্ঘটনাতে পড়েছিল। বিষয়টা মোটেই সহজ নয়, নানা সমস্যা আছে। যেমন চাঁদের খুব কাছে যখন ব্রেক করার জন্য ল্যান্ডিং রকেট চালানো হবে, তখন চাঁদের থেকে ক্ষুদ্র ধূলিকণা ছিটকে এসে রকেটের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে, সেই কথা মাথায় রেখে রকেট ডিজাইন করতে হয়। এ ধরনের নানা সমস্যার জন্য অনেক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো কিছুই কাজে এলো না। ভন্দ্রযান-২ অবশ্য কক্ষপথ থেকে ভচাঁদ সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধানের কাজ করে চলেছে, তার সময়কাল বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
       এই অভিযান নিয়ে এক অদ্ভুত উন্মাদনা দেশে সৃষ্টি করা হয়েছিল, যা অনেক বিজ্ঞানীই পছন্দ করেননি। রেটিং বানানোর জন্য গণমাধ্যম এ ধরনের কাজ করেই থাকে, কিন্তু এবারে সরকারি স্তরেও তাতে মদত ছিল।  অবতরণের লাইভ টেলিকাস্ট খুবই স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু সেই সময় মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি মোটেই স্বাভাবিক ঘটনা নয়।অবতরণের ঘটনার সাক্ষী হওয়ার জন্য আগে থেকে বাছাই করে কিছু ছাত্রছাত্রীকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অনেকেই ঐতিহাসিক ঘটনা চোখে দেখবেন বলে টেলিভিশনের সামনে রাত জেগে বসেছিলেন।এই সমস্ত ঘটনা বিজ্ঞানীদের উপরে চাপ সৃষ্টি করে।
       চন্দ্রযান-১ বা মঙ্গলযানের সাফল্য যেমন এসেছে, তেমনি কোনো কোনো অভিযানে ব্যর্থতা আসবে সেটাই স্বাভাবিক। আমাদের ভারতীয়দের একটা সমস্যা হল যে আমরা সাদা এবং কালোর বাইরে যে ধূসর এলাকা রয়েছে, তা সাধারণত মনে রাখতে পারি না। বিরাট কোহলি দুই তিন ইনিংসে রান না পেলেই তার সমালোচনাতে মুখর হই। এক্ষেত্রেও ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার সমালোচনা হয়েছিল, কিন্তু মহাকাশ গবেষণা সংস্থার কর্মকাণ্ডের প্রতি সমর্থন তার থেকে বেশি এসেছে। সেই কথাটা ভালো, কিন্তু সম্ভবত অবিমিশ্র ভালো নয়। সংস্থার প্রধান সাংবাদিক সম্মেলনে বলতে বাধ্য হয়েছিলেন অভিযান ৯৫ শতাংশ সফল। পরে ৯৮ শতাংশ সাফল্যের কথাও শোনা গেছে। এ ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থনে বাধ্য হওয়াটা নিজেদেরভুলত্রুটি খুঁজে বার করাতে বাধা সৃষ্টি করে।
       বিজ্ঞান এগোয় সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার মধ্যে  দিয়ে।  কিন্তু সমালোচনা ঐ বিশেষ ক্ষেত্রের  বিশেষজ্ঞদের থেকে আসতে হবে। স্টুডিওতে বসে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞও তা নিয়ে মতামত দেবেন, বিজ্ঞান গবেষণা ঠিক ততটা সহজ নয়। বিজ্ঞানপ্রযুক্তিতে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও স্বাভাবিক, শুধু তাই নয় ব্যর্থতার ভূমিকাও ভবিষ্যতের সাফল্যের পিছনে কম নয়। Failures are the pillars of success, এই প্রাচীন প্রবাদটা বিজ্ঞান প্রযুক্তি গবেষণার ক্ষেত্রে যতটা প্রযোজ্য, অন্য কোনো ক্ষেত্রে তত নয়। মনে রাখতে হবে যে কোনো কিছু প্রথমবারের জন্য করতে গেলে পা রাখতে হবে এমন এলাকায় যেখানে আগে কারোর পদচিহ্ন পড়েনি। ভুল পথে যাওয়াটা সেখানে স্বাভাবিক, তার মধ্যে দিয়েই এগোতে হবে। তা না হলে বুঝতে হবে যে নতুন কিছু নয়, পুরোনো পথেই চলেছে বিজ্ঞান। কিন্তু বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালের সঙ্গে যদি চন্দ্রযানের অবতরণকে একই আসনে বসানো হয়, তাতে বিজ্ঞানীদের উপরে চাপ আসতে বাধ্য। বিক্রমের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের শরীরি ভাষা সেই ইঙ্গিতই দিয়েছিল। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থারঅতীত ইতিহাস দেখায় যে ভবিষ্যতে সাফল্য আসবেই,  প্রয়োজন সরকার ও দেশবাসীর সমর্থন।  একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের জন্য  বিজ্ঞান গবেষণাকে ব্যবহার শেষ পর্যন্ত সুফল নাও দিতে পারে।
নাসার ক্যামেরাতে তোলা বিক্রমের অবতরণস্থলের চিত্র 



চাঁদের কথা


চাঁদের কথা
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

       আকাশে সূর্যের পরেই সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হল চাঁদ, তাকে নিয়ে মানুষের কৌতূহল চিরদিনেরচাঁদকে নিয়ে দেশবিদেশের পু্রাণে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। মহাভারতের গল্পে কুরুপাণ্ডবদের সবার চন্দ্রবংশে জন্ম, অর্থাৎ তারা চাঁদের বংশধর। অন্য এক গল্পে আবার চাঁদের জন্ম হয়েছিল সমুদ্রমন্থনে, শিব তাকে নিজের জটায় বসিয়ে নিয়েছিলেন। পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল এরোনটিক্স এন্ড স্পেস অ্যাশমিনিস্ট্রেশন বা নাসার মহাকাশযান অ্যাপোলো-১১-এর মহাকাশচারীরা চাঁদে পা দিয়েছিলেন। গ্রহ-উপগ্রহ মিলিয়ে পৃথিবীর বাইরে একমাত্র যেখানে মানুষের পা পড়েছে তা হল চাঁদ।

চাঁদের বুকে নিল আর্মস্ট্রং (চিত্রঃ নাসা)
       আমাদের সৌরজগতে চাঁদ সবচেয়ে বড় উপগ্রহ নয়। গ্রহরাজ বৃহস্পতির উপগ্রহ গ্যানিমিড, আইয়ো ও ক্যালিস্টো বা শনির উপগ্রহ টাইটান চাঁদের থেকে আয়তনে বড়। কিন্তু এক দিক থেকে চাঁদ সৌরজগতে প্রথম স্থান দখল করে আছে। চাঁদ আয়তনে পৃথিবীর পঞ্চাশ ভাগের এক ভাগ। এটা অন্য যে কোন গ্রহ-উপগ্রহ জোড়ার থেকে বেশি। এর পরেই আছে নেপচুনের উপগ্রহ ট্রাইটন, সে হল নেপচুনের ছ’হাজার ভাগের একভাগেরও কম। প্লুটোর উপগ্রহ চ্যারন অবশ্য এই হিসেবে অনেক বড় কিন্তু প্লুটোকে এখন আর গ্রহ বলা হয় না, কাজেই চ্যারনকে হিসাবের মধ্যে রাখা যায় না। চাঁদ আয়তনে প্লুটোর তিনগুণের থেকেও বেশি বড়। চাঁদের আকর্ষণ তার বায়ুমণ্ডলকে ধরে রাখতে পারে নি, তাই চাঁদ বায়ুশূন্য।
       প্রাচীন কাল থেকেই জানা ছিল চাঁদের আলো নেই, সূর্যের আলো প্রতিফলন করেই তার আলো। কারণটা খুব সোজা, চাঁদের কলা। চাঁদের যদি আলো থাকত, তাহলে সবসময়ই তাকে গোল দেখতাম, সূর্যকে যেমন দেখি। সূর্যের আলো চাঁদের অর্ধেকটাকে আলোকিত করে, বলা যাক সেই অংশে চাঁদের দিন। আমরা যখন চাঁদের দিকে তাকাই, তখন শুধু আলোকিত অংশটা দেখতে পাই। যতটা আলোকিত অংশ আমাদের দিকে মুখ করে আছে সেই অনুযায়ী চাঁদ আমাদের কাছে কখনো একফালি, কখনো অর্ধেক, পূর্ণিমাতে পূর্ণচন্দ্র।  অমাবস্যাতে তাকে দেখা যায় না, তখন আলোকিত অংশটা আমাদের পৃথিবীর উল্টোদিকে। একেই বলে চাঁদের কলা। সঙ্গের ছবিটাতে বিষয়টা আরো পরিষ্কার হবে। পৃথিবীর পাশের ছোট বৃত্তটা হল চাঁদের কক্ষপথ, সেখানেও বিভিন্ন অবস্থানে চাঁদের কোন অংশ আলোকিত তা দেখা যাচ্ছে। আর বড় বড় বৃত্ত দিয়ে বোঝানো হয়েছে পৃথিবী থেকে চাঁদকে কেমন দেখতে লাগে

চাঁদের কলা
       চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ কেন হয় আমরা জানি। পৃথিবীর ছায়া যখন চাঁদের উপর পড়ে তখন চন্দ্রগ্রহণ, উপরের ছবিটা থেকে বোঝা যাচ্ছে সেটা পূর্ণিমার দিনই সম্ভব। ঠিক তেমনি অমাবস্যার সময় পৃথিবী আর সূর্যের ঠিক মাঝখানে যদি চাঁদ এসে পড়ে, তখন সূর্যগ্রহণ হয়। মানুষের বিজ্ঞানের ইতিহাসে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের আলাদা গুরুত্ব আছে । প্রাচীন যুগের বিজ্ঞানীরা যখন বুঝলেন যে চন্দ্রগ্রহণের কারণ পৃথিবীর ছায়া, তখন চাঁদের বুকে সেই ছায়ার আকার দেখে তাঁরা নিশ্চিত হয়েছিলেন যে পৃথিবী গোলউপরের ছবিটা থেকে মনে হতে পারে তাহলে প্রতি অমাবস্যা পূর্ণিমাতে গ্রহণ হয় না কেন? আসলে চাঁদ যে তলে পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে আর পৃথিবী যে তলে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, সে দুটো নিজেদের মধ্যে পাঁচ ডিগ্রি কোণ করে আছে। নিচের ছবিটাতে দেখতে পাচ্ছ যে সব অমাবস্যাতে চাঁদের ছায়া পৃথিবীতে পড়বে না, আবার সব পূর্ণিমাতে পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়বে না

বিভিন্ন পূর্ণিমা ও অমাবস্যাতে চাঁদ, পৃথিবী ও সূর্যের অবস্থান
       চাঁদের ব্যাসার্ধ হল মোটামুটি ১৭৪০ কিলোমিটার। পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের কক্ষপথটা ঠিক বৃত্তাকার নয়, উপবৃত্তাকার। সবচেয়ে কাছে যখন তখন পৃথিবী ও চাঁদের দূরত্ব মোটামুটি ৩,৬৪,০০০ কিলোমিটার, আবার সবচেয়ে বেশি দূরত্ব হল ৪,০৫,০০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। যখন খুব কাছে আসে, তখনকার পূর্ণিমাকে বলে সুপারমুন। চাঁদের গড় দূরত্বটা এমন যে পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য আর চাঁদ প্রায় একই কোণ করে থাকে। সেজন্য চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়ে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটাতে পারে। সূর্যের প্রচণ্ড ঔজ্জ্বল্যের জন্য তার দিকে তাকানো শক্ত, জ্যোতির্বিদদের যন্ত্রপাতিও আকাশে সূর্যের কাছাকাছি কম উজ্জ্বল জিনিস দেখতে পায় নাতাই সূর্যগ্রহণের সময়টাকে বিজ্ঞানীরা নানা ভাবে কাজে লাগান, তার দুটো তোমাদের বলি। সূর্য থেকে বাইরের দিকে উত্তপ্ত গ্যাস থামের আকার নিয়ে বেরিয়ে আসে, একে বলে সৌরশিখা  (solar prominence)এমনি সময় একে পর্যবেক্ষণ করা শক্ত। ১৮৬৮ সালের ৮ আগস্ট ভারত থেকে এক সূর্যগ্রহণ দেখা গিয়েছিল। সেই সময় এক ইংরেজ ও এক ফরাসি বিজ্ঞানী সূর্যের বাইরের সৌরশিখা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, তার থেকে শেষ পর্যন্ত এক নতুন মৌলের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই মৌল হল প্রথম আবিষ্কৃত নিষ্ক্রিয় গ্যাস হিলিয়াম, তা পরে পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। আবার ১৯১৯ সালের ২৯ মে সূর্যগ্রহণের সময় ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন সূর্যের পাশ দিয়ে আসা নক্ষত্রের আলো সূর্যের জন্য কতটা বেঁকে যায় তা মেপেছিলেন। তার থেকেই বোঝা যায় যে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্ব মাধ্যাকর্ষণ ব্যাখ্যা করতে নিউটনের তত্ত্বের থেকে বেশি সফল। আধুনিক জ্যোতির্বিদ্যাতেও চাঁদ কাজে লেগেছে, কিন্তু সে কথা আজ থাক
       তোমরা সত্যজিৎ রায়ের গল্প ‘কম্পু’ নিশ্চয় পড়েছ। সেখানে প্রফেসর শঙ্কুকে একজন জাপানি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী জিজ্ঞাসা করেছিলেন, গ্রহণের সময় চাঁদ যে সূর্যকে একদম ঠিকঠাক ঢেকে দিতে পারে, তার কারণ বিজ্ঞান বলতে পারবে? আগেই আমরা দেখলাম পৃথিবী থেকে চাঁদ আর সূর্যের কৌণিক মাপ প্রায় সমান। শঙ্কু উত্তর দিতে পারেনি নি। একশো কোটি বছর আগে বা পরে হলে সন্ন্যাসী কিন্তু এই প্রশ্নটা করতেন না। কেন জানো? আসলে চাঁদ পৃথিবীর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই একশো কোটি বছর আগে চাঁদের কৌণিক মাপ আরো বেশি ছিল, পৃথিবী থেকে তাকে সূর্যের থেকে অনেক বেশি বড়ো লাগত। সহজেই তা সূর্যকে ঢেকে দিতে পারত। আবার একশ কোটি বছর পরে চাঁদের কৌণিক মাপ এত ছোট হয়ে যাবে যে সে সূর্যকে আর পুরোপুরি ঢাকতে পারবে না। এ জন্যও দায়ী চাঁদ, কিন্তু সে কথায় যাওয়ার আগে চাঁদের টানে কেমন করে জোয়ার ভাঁটা হয়, তা বুঝে নেয়া যাক। অনেক জায়গায় লেখা থাকে চাঁদের টানে পৃথিবীর জলরাশি ফুলে ওঠে, তাই জোয়ার হয়। আবার সেই জোয়ারের জন্য জল অন্য জায়গা থেকে চলে আসে, সেখানে তখন জল কমে গিয়ে ভাঁটা হয়। পৃথিবীর যে দিকটা  চাঁদের দিকে, সেদিকে জোয়ার কেন হয় বোঝা গেল, কিন্তু পরিষ্কারভাবে বোঝা গেলনা যে যেদিকটা চাঁদের উল্টোদিকে, সেখানেও জোয়ার হয় কেন।
       তোমরা জানো নিউটনের সূত্র অনুযায়ী পৃথিবী চাঁদকে যে বলে আকর্ষণ করে, চাঁদও পৃথিবীকে সমান বলে আকর্ষণ করে। তাহলে চাঁদ পৃথিবীর চারদিকে ঘোরে, পৃথিবী চাঁদের চারদিকে নয় কেন? কারণ পৃথিবী চাঁদের থেকে আশি গুণেরও বেশি ভারী, তাই একই বল দুজনের উপরে কাজ করলেও চাঁদের গতিকে সে আশি গুণ বেশি পরিবর্তন করে। বিজ্ঞানের ভাষায় চাঁদের ত্বরণ আশি গুণ বেশি। খুব ঠিকঠাক বললে চাঁদ ও পৃথিবীর একটা ভরকেন্দ্র আছে, দুজনেই তার চারদিকে পাক খায়। কিন্তু ভরকেন্দ্রটা হল পৃথিবীর মধ্যে, তাই পৃথিবীর আবর্তন সহজে বোঝা যায় না। সঙ্গের ছবিটা দেখ। এখানে CM (Centre of Mass) বিন্দুটা হল ভরকেন্দ্র, চাঁদ আর পৃথিবী দুজনেই ঐ ভরকেন্দ্রকে ঘিরে পাক খাচ্ছে।
পৃথিবী ও চাঁদের আবর্তন
       সে না হয় হল, কিন্তু তার সঙ্গে জোয়ার ভাঁটার সম্পর্ক কি? একটা কথা মনে রেখ, এই আকর্ষণ বলের জন্য চাঁদ পৃথিবীর দিকে সরে সরে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি পৃথিবী চাঁদের দিকে সরে যাচ্ছে। তাহলে একজন অন্যজনের উপর পড়ে যাচ্ছে না কেন? কারণ তাদের আর একটা গতি আছে। চাঁদ আর পৃথিবীর কেন্দ্র দুটোকে জুড়ে একটা সরলরেখা কল্পনা কর, আকর্ষণ বল ঐ রেখা বরাবর কাজ করে।  চাঁদ ও পৃথিবী ঐ রেখা বরাবর পরস্পরের দিকে সরে যায়। কিন্তু অন্য গতিটা ঠিক ওই রেখার সঙ্গে লম্বভাবে কাজ করে। এই দুই গতির মোট ফলটা হয় যে দুজনেই তাদের সাধারণ ভরকেন্দ্রের চারদিকে ঘুরতে থাকে।
       পৃথিবী চাঁদের দিকে সরে যাচ্ছে বললাম বটে, কিন্তু এখানে একটা কথা বলা হয়নি। আমরা জানি দুটো বস্তুর মধ্যে মাধ্যাকর্ষণ বল দূরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতে পাল্টায়। সহজ কথায় দূরে গেলে আকর্ষণ বল কমে যায়। তাহলে পৃথিবীর উপর চাঁদের আকর্ষণ বল সব জায়গায় নিশ্চয় সমান নয়। যেদিকটা চাঁদের বেশি কাছে তার উপর আকর্ষণ বেশি, পৃথিবীর কেন্দ্রের উপর তার থেকে কম, আবার যেদিকটা চাঁদের থেকে দূরে তার উপর আকর্ষণ আরো কম। কিন্তু পৃথিবী মাটি পাথর মিলিয়ে একটা কঠিন বস্তু, তাই তার কেন্দ্র যতটা সরবে, দুপাশের মহাদেশ ও সমুদ্রের তলাটাও প্রায় ততখানি সরবে। অন্যদিকে মহাসমুদ্রের জল তরল, তা পৃথিবীর কেন্দ্রের সঙ্গে অত শক্তভাবে বাঁধা নেই। তাই চাঁদের দিকের জল সেদিকের সমুদ্রের তল বা মহাদেশের থেকে বেশি সরে যায়, ফলে সমুদ্রতল ফুলে ওঠে। এবার ভাব বিপরীত দিকের কথা। সেখানে চাঁদের আকর্ষণ কম, তাই মহাসমুদ্রের জল কম সরবে। কিন্তু সমুদ্রের তলা ও মহাদেশ চাঁদের দিকে বেশি সরবে, কারণ তা পৃথিবীর কেন্দ্রের সঙ্গে শক্তভাবে যুক্ত। ফলে আমরা দেখব সেখানেও জল ফুলে উঠছেএই হল চাঁদের উল্টো দিকের জোয়ারের কারণ। পাশের  ছবিটা দেখ, এখানে পৃথিবীর কঠিন অংশ আর সমুদ্রের জল কতটা করে সরবে দেখানো হয়েছে। তীর চিহ্নটা যত বড়, সরণ তত বেশি। দেখতে পাচ্ছ, সমুদ্রের জল কেমন করে ফুলে উঠছে। বোঝার সুবিধার জন্য অনেক বাড়িয়ে দেখিয়েছি।
চাঁদের টানে জোয়ার ভাঁটা
       এবার আসা যাক চাঁদ কেন পৃথিবীর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে সেই কথায়। পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য আস্তে আস্তে বাড়ছে, তার জন্যও দায়ী চাঁদের টানে জোয়ার ভাঁটাপৃথিবী নিজের চারদিকে তেইশ ঘণ্টা ছাপ্পান্ন মিনিটে একবার পাক খায়, একে বলে নাক্ষত্র দিনচাঁদ পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় সাতাশ দিন সাত ঘণ্টার মতো। এটা কিন্তু দুটো পূর্ণিমা বা দুটো অমাবস্যার মধ্যের পার্থক্য নয়, সেটা সাড়ে উনত্রিশ দিন। এ হল চাঁদের নাক্ষত্র মাসদেখা যাচ্ছে চাঁদ অনেক আস্তে ঘোরে, জলরাশি এগিয়ে যেতে চায়, চাঁদ তাকে পিছন থেকে টেনে ধরে। এই টেনে ধরার ফলে পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারপাশে ঘূর্ণন বেগ কমে যাচ্ছে আর দিন লম্বা হচ্ছেযেমন একশো কোটি বছর আগে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য ছিল আঠারো ঘণ্টার মতো। কুড়ি কোটি বছরে পরে তা বেড়ে হবে পঁচিশ ঘণ্টা।
       যারা উঁচু ক্লাসে পড়, তারা জানো ঘূর্ণনের জন্য কৌণিক ভরবেগ বলে একটা রাশি আছে। নিউটনের সূত্রে ভরবেগের কথা আছে, ভরকে বেগ দিয়ে গুণ করলে তাকে পাওয়া যায়। বাইরে থেকে বল না দিলে ভরবেগের মান পাল্টায় না। কৌণিক ভরবেগ অনেকটা ওই ভরবেগেরই মতো, খালি সরলরেখায় গতির জন্য নয়, বৃত্তাকার পথে গতির জন্য তাকে আমরা ব্যবহার করি। বাইরে থেকে তাকে জোর করে না পালটালে তার মানও একই থাকে। যেমন, চাঁদের ভরবেগকে তার কক্ষপথের ব্যাসার্ধ দিয়ে গুণ করলে তার আবর্তনের কৌণিক ভরবেগ পাওয়া যায়। এখানে তিনটি কৌণিক ভরবেগ আছে, পৃথিবীর নিজের চারদিকে ঘূর্ণনের জন্য, চাঁদের নিজের চারদিকে ঘূর্ণনের জন্য এবং পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের আবর্তনের জন্য। পৃথিবীর ঘূর্ণন বেগ কমে যাচ্ছে অর্থাৎ তার কৌণিক ভরবেগ কমে যাচ্ছে। মোট কৌণিক ভরবেগের মান পালটায় না, সুতরাং পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের আবর্তনের  জন্য যে কৌণিক ভরবেগ আছে, তার মান বেড়ে যাচ্ছে। চাঁদের আবর্তনের জন্য কৌণিক ভরবেগ চাঁদ ও পৃথিবীর দূরত্বের বর্গের অনুপাতে বাড়ে। তাই কৌণিক ভরবেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চাঁদ পৃথিবীর থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
চাঁদের আকাশে পৃথিবী (চিত্রঃ নাসা)
       তোমরা হয়তো বলবে, তৃতীয়টা অর্থাৎ চাঁদের কৌণিক ভরবেগটা বাড়ছে না কেন? বাড়ছে না কারণ চাঁদের কৌণিক ভরবেগ বাড়ার সুযোগ নেই। চাঁদের একটা পাশই আমরা দেখতে পাই, অন্যদিকটা আমাদের দিকে কখনোই আসে না। আবার পৃথিবী থেকে আমরা চাঁদকে আকাশে পূর্বদিকে উঠতে ও পশ্চিমদিকে ডুবতে দেখি, কিন্তু চাঁদের আকাশে পৃথিবী এক জায়গায় স্থির হয়ে থাকে। কেন জানো? চাঁদ পৃথিবীকে আবর্তন করতে যতটা সময় নেয়, নিজের চারদিকে পাক খেতেও ঠিক একই সময় নেয়। ভাবো তো পৃথিবীর জোয়ার ভাঁটার কথা। পৃথিবীর ঘূর্ণন বেগ কমতে কমতে চাঁদের আবর্তনকালের সঙ্গে সমান হয়ে যাবে, তখন আর ওই ফুলে ওঠা অংশ চাঁদের সাপেক্ষে এগিয়ে যাবে না। এর পর আর পৃথিবীর বেগের পরিবর্তন হবে না। চাঁদ পৃথিবীর থেকে অনেক ছোট, তাই পৃথিবীর টানে চাঁদের ক্ষেত্রে সেটা আগে ঘটেছে। সে জন্যই চাঁদের নিজের অক্ষের চারদিকে ঘূর্ণন কাল আর পৃথিবীর চারদিকে আবর্তন কাল সমান। তার আর পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয়।  সৌরজগতের প্রায় সমস্ত বড় উপগ্রহই এইরকম ভাবে গ্রহের দিকে একটা মুখ ফিরিয়ে রাখে। প্লুটো আর চ্যারনের ভর অনেক কাছাকাছি, তাই চ্যারন যেমন প্লুটোর দিকে একটা মুখ ফিরিয়ে থাকে, প্লুটোও তাই। সেজন্য চ্যারনের আকাশে প্লুটো যেমন দাঁড়িয়ে থাকে, প্লুটোর আকাশেও চ্যারন তেমনি স্থির। পাঁচ হাজার কোটি বছর পরে পৃথিবী আর চাঁদেরও ওই অবস্থা হওয়ার কথা, অবশ্য যদি অতদিন তাদের অস্তিত্ব আদৌ থাকে।
       প্রশ্ন করতেই পারো, চাঁদে তো সমুদ্র নেই, তাহলে জোয়ার ভাঁটার কথা কেন? পৃথিবীর কেন্দ্রে যে তরল ম্যাগমা আছে, তারও জোয়ার ভাঁটা হয়। চাঁদের কেন্দ্রও একসময় তরল ছিল, তার জোয়ার ভাঁটা হত। তার জন্য চাঁদের ঘূর্ণন ক্রমশ কমেছে। এখনো পৃথিবীর টানে চাঁদের দুই প্রান্ত ফুলে ওঠে, যদিও তার পরিমাণ কম। এই ফুলে ওঠাটাও আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জায়গা পরিবর্তন করে, তার ফলে একই ধরনের ফল হয়। 
       চাঁদ না থাকলে কী হত? জ্যোতিষীকে জিজ্ঞাসা করলে সে তোমার জীবনকে চন্দ্র কেমনভাবে প্রভাবিত করে তা বোঝাতে শুরু করবে। তার বাজে কথা শোনার দরকার নেই, কিন্তু চাঁদ কি পৃথিবীতে জীবনকে কোনোভাবে প্রভাবিত করেছে? আমরা জানি পৃথিবী কক্ষপথের সঙ্গে সাড়ে তেইশ ডিগ্রি কোণ করে আছে, সেজন্য ঋতু পরিবর্তন হয়। এই কোণটা কয়েক হাজার বছরে এক ডিগ্রি মতো বাড়ে কমে। অঙ্ক কষে দেখা যায় চাঁদ না থাকলে এই বাড়া কমাটা অনেক বেশি হতো, কোণটা বেড়ে পঁচাশি ডিগ্রি পর্যন্ত হতো। সূর্য তাহলে কখনো মেরুর প্রায় উপরে, আবার লক্ষ বছর পরে হয়তো নিরক্ষরেখার উপরে লম্বভাবে কিরণ দিতলক্ষ বছর বেশি মনে হয়ে পারে, কিন্তু জীবের বিবর্তনের পক্ষে তা সামান্য সময়। পৃথিবীর জীবজগত হয়তো সম্পূর্ণ অন্যরকম হতো
       চাঁদের জন্ম কিভাবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন। অ্যাপোলো অভিযানগুলো প্রায় চারশো কিলোগ্রাম চাঁদের পাথর পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে। সোভিয়েত মহাকাশ অভিযানও অল্প পাথর এনেছে। তাছাড়া কিছু কিছু উল্কাপাথর পাওয়া গেছে যারা চাঁদ থেকে এসেছে। এই সব পাথর থেকে দেখা গেছে চাঁদের বয়স মোটামুটি সাড়ে চারশো কোটি বছর। পৃথিবী তার থেকে সামান্য বড়। কিভাবে এই বয়স বার করা হয়েছে সে কথা বলতে গেলে এই লেখা আর শেষ হবে না, পরে কোনোদিন সেই আলোচনা করা যাবে। চাঁদের জন্ম সম্পর্কে মোটামুটি চার রকম মত আছে। একটা একটা করে সেগুলো দেখা যাক। তার সঙ্গে তাদের সমস্যাগুলোও জেনে রাখি।
       একটা মত হল পৃথিবী আর চাঁদ একই সঙ্গে জন্মেছে। তা হলে চাঁদের জন্ম সম্পর্কে জানতে গেলে আমাদের সৌরজগতের জন্ম কেমনভাবে হল জানতে হবে। ছায়াপথে অনেক মহাজাগতিক মেঘ আছে, তাদের ভর সূর্যের অনেক গুণ। তাদের থেকেই আমাদের সৌরজগতের জন্ম বলে সবাই মেনে নিয়েছেন। খুব সহজ কথায় বললে একটা বড় মহাজাগতিক মেঘ নিজের মাধ্যাকর্ষণের টানে ছোট ছোট হতে হতে সৌরজগতের জন্ম দিয়েছে। কেন্দ্রটা হয়েছে সূর্য, আর তার বাইরের দিকের টুকরোগুলো হয়েছে গ্রহ। পৃথিবী আর চাঁদ একই সঙ্গে জন্ম নিয়েছে ঐ মহাজাগতিক মেঘের সংকোচনের ফলে। কিন্তু এই মত পৃথিবী ও চাঁদের উপাদানের পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে পারে না। পৃথিবীর মোট ভরের তিরিশ শতাংশ হল লোহা, চাঁদের ক্ষেত্রে সেটা দশ শতাংশের কমদুটো কাছাকাছি মেঘের টুকরোর মধ্যে এত তফাত কেন হবে?
       দ্বিতীয় মত হল যে চাঁদ ছিল আদি-পৃথিবীর মধ্যে। সে অনেক জোরে ঘুরত, তার ফলে দু টুকরো হয়ে চাঁদ ও এখনকার পৃথিবীর জন্ম। কিন্তু টুকরো হতে গেল ঘূর্ণন বেগ খুব বেশি হতে হবে, তার মানে মোট কৌণিক ভরবেগও হবে বেশি। পৃথিবী ও চাঁদের ঘূর্ণন ও আবর্তন মিলিয়ে এখন যে মোট কৌণিক ভরবেগ, তা খুবই কম, তার পক্ষে আদি-পৃথিবীকে টুকরো করা সম্ভব নয়। মনে রেখো কৌণিক ভরবেগ বাইরে থেকে জোর না দিলে পরিবর্তন হয় না।
       তৃতীয় মতটা হল চাঁদ আগে ছিল একটা ছোট গ্রহ, পৃথিবীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পৃথিবীর অভিকর্ষে বাঁধা পড়ে গেছে। এই মতের দুটো সমস্যা আছে। কোনো মৌলের পরমাণুর বিভিন্ন ভর হয়, তাদের বলে আইসোটোপ। চাঁদের পাথরের আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে তা সৌরজগতের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মেলে না, কিন্তু পৃথিবীর সঙ্গে একদম মিলে যায়। কাজেই চাঁদ ও পৃথিবী আলাদা জায়গায় তৈরি হওয়ার কথা ভাবা শক্ত। দ্বিতীয়ত তাহলে চাঁদের কক্ষপথ এত বৃত্তাকার না হয়ে অনেক লম্বাটে হত।
       যে মতটা এখন সবচেয়ে বেশি বিজ্ঞানী সমর্থন করেন, তা হল মহাসংঘাত (Giant impact) প্রকল্প। এতে মনে করা হয় সৌরজগৎ সৃষ্টির পরে পরে মঙ্গলের মতো বড় একটা গ্রহ আদি-পৃথিবীকে ধাক্কা মেরেছিল, তার ফলে অনেক ছোট ছোট টুকরো ছিটকে বেরিয়ে যায়, সেগুলো জমাট বেঁধে চাঁদের জন্ম। পৃথিবীর বাইরের দিকের অংশে লোহার পরিমাণ কম, কেন্দ্রে বেশি; কেন্দ্র থেকে বেশি অংশ বেরোয়নি বলে চাঁদে লোহার পরিমাণ কম। চাঁদ ও পৃথিবীর পাথরের আইসোটোপ একরকম কেন, তা ব্যাখ্যার জন্য এই তত্ত্বকে অনেকটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। এখনও কিছু সমস্যা আছে, তবু মনে হচ্ছে যে এই তত্ত্বই শেষ পর্যন্ত চাঁদের জন্মকে বোঝাতে পারবে।
       আমাদের সভ্যতায় চাঁদের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে, কারণ প্রথম ক্যালেন্ডার বানাতে চাঁদ সাহায্য করেছিল। দিনের হিসাব রাখা সোজা, সূর্য উঠলেই নতুন দিন, কিন্তু প্রাচীনকালে মাস বা বছর হিসাব করা সহজ ছিল না। এক বছরে মোটামুটি বারোটা পূর্ণিমা-অমাবস্যা হয়। সে জন্য প্রাচীনকালে সব সভ্যতাই বছরে বারো মাস ধরে হিসেব করত। তিথি নক্ষত্রের হিসাব হয় চাঁদের কলাকে ধরে, যেমন সরস্বতী পুজো হয় মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে। হিজরি মাস শুরু হয় শুক্লা প্রতিপদ মানে অমাবস্যার পরের দিন থেকেহিজরি বছর হল চান্দ্র বছর, এক বছরে ঠিক বারোটা অমাবস্যা বারোটা পূর্ণিমাই থাকে। এক হিজরি বছরে তাই ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিন। প্রাচীন জ্যোতির্বিদরা সৌর জগতের মডেল বানানোর সময় পূর্ণিমা অমাবস্যা ও গ্রহণের দিন, রাতের আকাশে চাঁদের অবস্থান, এ সমস্ত বার করার চেষ্টা করতেন। তবে তাঁদের মডেলের কেন্দ্রে সূর্য ছিল না, ছিল পৃথিবী, তাই সেগুলো অনাবশ্যক জটিল হয়ে পড়েছিল। আকাশে চাঁদের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে সমুদ্রের মধ্যে জাহাজ কোথায় আছে বার করা হত। এই সব নিয়ে পরে কোনোদিন আলোচনা করা যাবে।
        অনেক পুরানো কথা হল, এবার একটু ভবিষ্যতের কথা বলি। চাঁদে মানুষ নেমেছে পঞ্চাশ বছর হয়ে গেল, আমরা কবে চাঁদে থাকতে পারব? কেমন করে চাঁদে বাস করা সম্ভব অল্প কথায় দেখা যাক। প্রথমত, চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই, তাই মহাজাগতিক রশ্মি আর সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকে আটকানোর কেউ নেই চাঁদের দিন আর রাত দুটোই পৃথিবীর প্রায় পনের দিনের । বায়ুমণ্ডল না থাকার ফলে দিনের তাপমাত্রা উঠে যায় ১১০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে আর রাতের তাপমাত্রা নেমে যায় -১৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডেছায়াতে আর রোদে তাপমাত্রার পার্থক্যও হয় বিরাট। এ সবের থেকে বাঁচতে হলে বাস করতে হবে মাটির তলায়। চাঁদে অনেক বিরাট বিরাট লাভা নল আছে, তাদের সিল করে বায়ু ধরে রেখে তার ভিতরেই থাকা যায়শক্তির অভাব হবে না। অভিকর্ষ পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ, তাই সহজেই বিশাল বিশাল সোলার প্যানেল বসানো সম্ভব। তার জন্য দরকারি সিলিকন চাঁদেই পাওয়া যাবে। ভারতবর্ষের চন্দ্রযান মিশন চাঁদে জল খুঁজে পেয়েছে। জলের তড়িদবিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পাওয়া যাবে। এমনকি কৃত্রিম আলো ব্যবহার করে গাছদের সালোক সংশ্লেষ করানো সম্ভব। আর অনেকরকম পরিকল্পনা করা যায়।
       আমাদের পৃথিবীতে অনেক সমস্যা, এত খরচ করে চাঁদে মানুষের বাসস্থান বানিয়ে লাভ কী? কয়েকটা লাভের কথা বলি। চাঁদের বিপরীত দিকে যদি দূরবিন বা রেডিও টেলিস্কোপ বসাতে পারি, তাহলে তা পৃথিবীর যে কোনো টেলিস্কোপের থেকে শক্তিশালী হবে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল অনেক তরঙ্গকে শোষণ করে নেয়, বায়ুতে প্রতিসরণের জন্য অসুবিধা হয়। তাছাড়া শহরের আলো, মোবাইল টিভি রেডিওর সিগন্যাল এগুলো না আটকাতে পারলে টেলিস্কোপের পক্ষে কাজ করা শক্ত। চাঁদে বায়ুমণ্ডল নেই, উল্টো দিকে পৃথিবী থেকে কোনো সিগন্যাল পৌঁছবে না। অভিকর্ষ কম বলে অনেক বড় টেলিস্কোপ  বানানো যাবে। চাঁদের বায়ুচাপ প্রায় শূন্য, পৃথিবীতে আমরা অনেক খরচ করে ঐরকম অত্যুচ্চ ভ্যাকুয়াম বা বায়ুশূন্য স্থান  বানাতে পারি। ইলেকট্রনিক্স শিল্পের মতো যে সমস্ত শিল্পে ভ্যাকুয়াম লাগে, সেগুলো সহজে চাঁদে স্থাপন করা সম্ভব। তোমরা সার্নের লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডারের কথা জানো। ওইরকম কণাত্বরক বা অ্যাকসিলারেটর চাঁদে বানানো খুব সহজ, বায়ুশূন্য স্থান আলাদা করে বানাতে হবে না, সুপারকন্ডাক্টর তারকে ঠাণ্ডা করার ঝামেলা অনেক কম। তবে যে কারণে ভবিষ্যতে চাঁদে বসবাসের খরচা উঠে যেতে পারে তা হল হিলিয়ামের এক আইসোটোপ হিলিয়াম-৩ যা পৃথিবীতে নেই বললেই চলে। সূর্যে নিউক্লিয় সংযোজন বা ফিউশন প্রক্রিয়াতে শক্তি তৈরি হয়। আমরা হাইড্রোজেন বোমাতে সেই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়েছি, কিন্তু এখনো তাকে নিয়ন্ত্রণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে উঠতে পারিনি। তা করতে পারলে অনেক সুবিধা হবে, গ্রিন হাউস গ্যাসের ব্যাপার নেই, তেজষ্ক্রিয়তার ভয় নেই। ফ্রান্সে এক আন্তর্জাতিক প্রয়াসে ফিউশন রিঅ্যাক্টর বানানো হচ্ছে, আমাদের দেশও তার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। পৃথিবীতে হিলিয়াম-৩ পাওয়া গেলে রিঅ্যাক্টর বানানো অনেক সহজ হতোসূর্য থেকে হিলিয়াম-৩ সৌর বায়ুর সঙ্গে বেরিয়ে আসে, কিন্তু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল তাকে আটকে দেয়। চাঁদের মাটিতে কোটি কোটি বছর ধরে হিলিয়াম-৩ জমা পড়েছে, তাকে তুলে পৃথিবীতে পাঠাতে পারলে খরচ উঠে আসতে পারে। মানুষ শেষ চাঁদে নেমেছিল ১৯৭২ সালে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা আবার ২০২৪ সালে চাঁদে মানুষ পাঠাতে এবং ২০২৮ সাল থেকে চাঁদে স্থায়ী বেস বানাতে চাইছে। চীন চাঁদের হিলিয়াম-৩ উত্তোলনের পরিকল্পনা করছে। জাপান ২০৩০ সাল থেকে স্থায়ী ভাবে চাঁদে অভিযাত্রীদল রাখার ব্যাপারে চিন্তা করছে। আমরা আশায় থাকি।  

প্রকাশিতঃ কিচির মিচির শারদীয় সংখ্যা ২০১৯ ঃ সম্পাদিত