Friday, 19 September 2025

সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের উৎস সন্ধানে

 

সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের উৎস সন্ধানে

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগ ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের উপর জোর দিচ্ছেন। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে এই বিষয়ে পড়ানোর নির্দেশ এসেছে। ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম — এই বাক্যবন্ধের সঠিক বাংলা রূপান্তর কী হবে আমি জানি না; কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের এই বিষয়ে যে ওয়েবসাইট আছে, তাতে লেখা আছে ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা। পরম্পরা কথা থেকে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে কী বলতে চাওয়া হয়েছে, কিন্তু সিস্টেম শব্দটা সেই অর্থে আগে কোথাও ব্যবহার হয়েছে কিনা জানি না।

নাম যাই হোক, বিষয়টি বেশ বিতর্কিত সন্দেহ নেই। বিজ্ঞানে প্রাচীন ভারতের নিঃসন্দেহে অনেক অবদান আছে, কিন্তু তা ইতিহাসের বাইরে আলাদা করে পড়াবার প্রয়োজন কেন পড়ল জানি না। হাজার হাজার বছর আগের মানুষ যে সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, তারা তাদের মতো করে সেই সমস্যার সমাধান করেছিল। সেই ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, কিন্তু তাদের সরাসরি আজকের সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করা যাবে না। যে ছাত্র বা গবেষক কম্পিউটার সায়েন্স বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করবে, এই সমস্ত বিষয় তাদের কী উপকারে লাগবে? তবে এই প্রবন্ধে আমরা সেই আলোচনায় যাব না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগ এই বিষয়ে যে পাঠ্যসূচী ঘোষণা করেছে, সেখানে বৌধায়ন-পিথাগোরাসের উপপাদ্যের উল্লেখ আছে। শ্রেণিকক্ষে পিথাগোরাসের উপপাদ্যই পড়ানো হয়, গণিত শিখতে ইতিহাসের প্রয়োজন নেই বলেই তা নিয়ে আলোচনা হয় না। এই লেখাতে আমরা এই বিশেষ উপপাদ্যটির ইতিহাস ফিরে দেখব।

পিথাগোরাসের উপপাদ্যের কথা আমরা সবাই জানি — সমকোণী ত্রিভুজের ভূমির (a) বর্গ ও লম্বের (b) বর্গের যোগফল অতিভুজের (c) বর্গের সমান। গণিতের ভাষায় বলতে পারি, a2+ b2=c2 অন্য ভাবে বললে, অতিভুজকে বাহু ধরে একটা বর্গক্ষেত্র আঁকলে তার ক্ষেত্রফল, লম্ব ও ভূমির উপরে আঁকা দুই বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের যোগফলের সমান। এর বিপরীতটাও সত্য, অর্থাৎ যদি দুই বাহুর বর্গের সমষ্টি তৃতীয় বাহুর বর্গের সমান হয়, তাহলে প্রথম দুই বাহুর মধ্যের কোণটি সমকোণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগের পাঠক্রমে এটিকে পিথাগোরাসের সঙ্গে শুল্বসূত্রকার বৌধায়নের নামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

পিথাগোরাসের উপপাদ্যটিকে নানা ভাবে প্রমাণ করা যায়, ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লেখক ৩৭০টি প্রমাণের কথা বলেছেন। গত কয়েক বছরে ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে উপপাদ্যটিকে অনেকে প্রমাণ করেছেন, যা একসময় মনে করা হত অসম্ভব। ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই স্কুল ছাত্রী ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে নতুন এক প্রমাণ আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু উপপাদ্যটি যে পিথাগোরাস প্রথম প্রমাণ করেছিলেন, তার পক্ষে কোনো নিশ্চিত তথ্য আমাদের জানা নেই। তাই আমরা এই লেখাতে এটিকে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র বলব। (কেন উপপাদ্য না বলে সূত্র বলছি তার কারণ পরে বোঝা যাবে।) পিথাগোরাস ছিলেন গ্রিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী, তাঁর জীবনকাল আনুমানিক ৫৭০-৪৯৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তাঁর সম্পর্কে অনেক গল্প প্রচলিত আছে, তার মধ্যে একটি হল তিনি এই উপপাদ্যটি প্রমাণ করে আনন্দে দেবতার উদ্দেশ্যে একটি বা একাধিক ষাঁড় বলি দিয়েছিলেন। কিন্তু সমকালীন সাক্ষ্য থেকে পিথাগোরাস যে এই প্রমাণ করেছিলেন তেমন কোনো খবর পাওয়া যায় না। পিথাগোরাস নিজে ছিলেন নিরামিষাশী ও পশু বলির বিরোধী, তাই গল্পটা নিয়েও সন্দেহ আছে। কেন পিথাগোরাসের নাম এই উপপাদ্যটির সঙ্গে যুক্ত হল তা জানা যায় না।

ইউক্লিড ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তাঁর বিখ্যাত জ্যামিতি বই এলিমেন্টস-এ এই বিশেষ উপপাদ্যটির দুটি প্রমাণ দিয়েছিলেন। বিপরীত উপপাদ্যটির প্রমাণ ইউক্লিডের লেখাতেই প্রথম পাওয়া যায়। পিথাগোরাসের নাম ইউক্লিড করেননি। তবে পিথাগোরাস এই উপপাদ্যের কথা নিঃসন্দেহে জানতেন, কারণ তিনি এটি ব্যবহার করেই প্রথম দেখিয়েছিলেন যে 2-এর বর্গমূল একটি অমূলদ সংখ্যা, তাকে দুটি পূর্ণ সংখ্যার অনুপাত হিসাবে প্রকাশ করা যায় না।

এবার আসি বৌধায়নের কথায়। ভারতের প্রাচীনতম গণিত বিষয়ক যে বই আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে তা হল শুল্বসূত্র। শুল্ব শব্দের অর্থ হল দড়ি। শুল্বসূত্রে বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞবেদি নির্মাণের কথা বলা আছে। শুল্বসূত্রের বেশ কয়েকজন লেখক আছে, তাঁদের মধ্যে কালের বিচারে প্রথম হলেন বৌধায়ন। বৌধায়নের লেখাতে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রটির কথা আছে। এর থেকে পুরানো কোনো উৎসে সূত্রটি এত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। প্রাচীন ভারতের অন্যান্য নিদর্শনের মতোই শুল্বসূত্রের কাল নির্ণয় বেশ কঠিন; বিভিন্ন মতে আটশো থেকে দু'শো খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এসেছে। সব সূত্রগুলি এক সময়ে লেখা নয়। বৌধায়ন খুব সম্ভব পিথাগোরাসের পূর্ববর্তী।

তাহলে কি বৌধায়নকেই আমরা সমকোণী ত্রিভুজের উপপাদ্যের আবিষ্কর্তা বলব? প্রশ্ন হল আমরা উপপাদ্যের আবিষ্কার বলতে কী বোঝাতে চাই? আমাদের স্কুলের জ্যামিতি বইতে উপপাদ্যের প্রমাণ দেওয়া থাকে। সারা পৃথিবীতেই জ্যামিতির মডেল হল ইউক্লিডের বই। সেখানে কয়েকটি স্বতঃসিদ্ধ থেকে সমস্ত উপপাদ্যগুলি প্রমাণ করা হয়েছে। শুল্বসূত্রে কোথাও এই অর্থে প্রমাণ পাওয়া যাবে না। আধুনিক অর্থে তাকে উপপাদ্য না বলে সে জন্য সূত্র বলাই শ্রেয় মনে হয়েছে। ভারতে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় দ্বাদশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের লেখাতে। সঙ্গের ছবিতে সেই প্রমাণটি দেখানো হল। তবে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে প্রমাণটি আরো প্রাচীন।

 

ভাস্করের দেওয়া সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের প্রমাণ


এই উপপাদ্যটির আমাদের জানান প্রাচীনতম প্রমাণটি অবশ্য এলিমেন্টস-এর থেকেও অনেক পুরানো, সেটি পাওয়া গেছে চিনের চৌ পে সুয়ান চিং বইতে। সেখানে এক কাহিনিতে গণিতবিদ শ্যাঙ কাও অভিজাত শাসক ঝাউ গঙ্গকে সূত্রটি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। যদিও তারিখটা নিশ্চিত নয়, কিন্তু এটিই আমাদের জানা প্রমাণগুলির মধ্যে যে সব থেকে পুরানো তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কায়রো ম্যাথামেটিকাল প্যাপিরাসে (কাল ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) 'টি গাণিতিক সমস্যা দেওয়া আছে যাদের সমাধানের জন্য আলোচ্য সূত্রটির প্রয়োজন হয়।

আমরা জানি যে প্রাচীন যুগের বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ ছিল। তাই কোনো একটি আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের খবর অন্যত্র পৌঁছানো অস্বাভাবিক নয়। আবার যোগাযোগ স্বাভাবিকভাবেই ছিল খুব ধীরগতিতে, তাই একই আবিষ্কার স্বাধীনভাবে বিভিন্ন সভ্যতায় হওয়াও সম্ভব। প্রাচীন কালের অনেক কথাই আমাদের এখনো অজানা; তথ্যের অভাবে এই নিয়ে কথা না বলাই শ্রেয়। যে অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বৌধায়ন-পিথাগোরাসের উপপাদ্য বলতে চেয়েছে, সেই অর্থে এটিকে শ্যাং কাও উপপাদ্য বলা উচিত। কিন্তু আমরা দেখব যে সূত্রটি নিঃসন্দেহে আরো প্রাচীন।

এবার আসি পিথাগোরিয় ত্রয়ীর কথায়। যদি তিনটি সংখ্যা a, b c-র জন্য a2+ b2=c2 শর্তটি পূরণ হয় তাহলে তাকে বলা হয় পিথাগোরিয় ত্রয়ী। উদাহরণ হিসাবে (3,4,5), (5,12,13) এই ত্রয়ী দুয়ের কথা ভাবা যেতে পারে, যেখানে প্রথম দুটির বর্গ যোগ করলে তৃতীয়টির বর্গ পাওয়া যাবে। আবার যে কোনো ত্রয়ীকে পূর্ণ সংখ্যা দিতে গুণ করলে এক নতুন ত্রয়ী পাওয়া যারে পারে, যেমন (3,4,5) ত্রয়ীটিকে দুই বা তিন দিয়ে গুণ করে পাই যথাক্রমে (6,8,10) (9,12,15); এগুলিও পিথাগোরিয় ত্রয়ী। স্পষ্টতই পিথাগোরিয় ত্রয়ী ও সমকোণী ত্রিভুজের তিনটি বাহুর সম্পর্কটি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। পিথাগোরিয় ত্রয়ীর ইতিহাস কত প্রাচীন?

বৌধায়নের শুল্বসূত্রে বেশ কয়েকটি পিথাগোরিয় ত্রয়ীর কথা আছে। কিন্তু পিথাগোরিয় ত্রয়ীর ইতিহাস বহু প্রাচীন। মেসোপটেমিয় (অর্থাৎ বর্তমান ইরাক) সভ্যতার এক বহু পুরানো মাটির ট্যাবলেট প্লিম্পটন 322-র বয়স মেপে জানা গেছে সেটি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতকের নিদর্শন। সেখানে যে সংখ্যাগুলি আছে, সেটিকে পিথাগোরিয় ত্রয়ীর আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। নিচের সারণীতে সেই ট্যাবলেটের কয়েকটি সংখ্যা সেই রূপে দেখানো হল।


সারণী ১ - প্লিম্পটন 322 ট্যাবলেটে পাওয়া পিথাগোরিয় ত্রয়ী

a

b

c

119

120

169

3367

3456

4825

4601

4800

6649

12709

  13500

 18541 

4961

6480

8161

1771

2700

3229

1679

2400

2929

স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে এই সংখ্যাগুলো ট্যাবলেটের লিপিকার কেমন করে পেলেন? ট্যাবলেটে পাওয়া অধিকাংশ ত্রয়ীর সংখ্যাগুলি পরস্পর মৌলিক, অর্থাৎ কোনো অপেক্ষাকৃত ছোট ত্রয়ীকে পূর্ণসংখ্যা দিয়ে গুণ করে এগুলি পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক কম্পিউটার ছাড়া শুধুমাত্র আন্দাজ করে বা আকস্মিক ভাবে এত বড়বড় ত্রয়ী পাওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। এই নিয়ে বিভিন্ন মত আছে, এখনো পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

আরো একটি প্রায় সমসাময়িক ট্যাবলেট YBC 7289-এ একটি বর্গক্ষেত্র এঁকে তার কর্ণ বরাবর 2-এর বর্গমূল লেখা আছে। এটিও স্পষ্টতই সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রটিকে ব্যবহার করা হয়েছে; সূত্রটি থেকে দেখা যায় যে কর্ণ ও বাহুর অনুপাত হল 2-এর বর্গমূল। প্রাচীনকালে এই বর্গমূলটির এর থেকে সঠিক মান পাওয়া যায় নি, দশমিকের পরে ছয় ঘর পর্যন্ত মানটা ঠিক।

  

প্লিম্পটন 322


বৌধায়ন কি সূত্রটির কোনো প্রমাণ আবিষ্কার করেছিলেন বা জানতেন? বিখ্যাত বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক সমরেন্দ্রনাথ সেন লিখেছেন যে প্রমাণটি নিঃসন্দেহে বৌধায়নের জানা ছিল, যদিও তার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা যুক্তি তিনি দেননি। এখানেই প্রশ্ন আসে যে প্রমাণ না জেনে সূত্রটি আবিষ্কার করা কি সম্ভব? এই প্রসঙ্গে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর The Origin of Geometry in India: A Study of the Sulbasutras বইতে লিখেছেন যে প্রাচীন ভারতে জ্যামিতির ইতিহাস জানতে হলে আমাদের কিছু পুরানো ধারণা পরিত্যাগ করতে হবে। ইউক্লিডের জ্যামিতিই একমাত্র মডেল নয়; শুধুই ভারতে নয়, অন্য সভ্যতাতেও জ্যামিতি ইউক্লিডিয় পদ্ধতিতে সূচনা হয়নি। ইউক্লিডিয় বিমূর্ত পদ্ধতি প্রাচীন সভ্যতাতে কোনো কাজে আসত না। বলা হয় যে নীল নদে বন্যার পরে জমির মাপ ঠিক করতে গিয়ে প্রাচীন মিশরে জ্যামিতির সূচনা হয়েছিল। অবশ্য এটাই একমাত্র মত নয়; বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক ভি গর্ডন চাইল্ডের মতে ছুতোরের কাজ করতে গিয়ে জ্যামিতির সূচনা হয়। বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন কারণে জ্যামিতির আবির্ভাব অস্বাভাবিক নয়। শুল্বসূত্রেও যজ্ঞের বেদি নির্মাণ করতে গিয়ে অর্থাৎ একান্তভাবেই হাতে কলমে কাজ করতে গিয়ে জ্যামিতির সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে। সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র ছাড়া প্রাচীন যুগের বিরাট বিরাট যে সমস্ত নির্মাণের হদিস আমরা পাই, সেগুলো বানানো সম্ভব হত কি? আমরা প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনার কথা জানি, সমকোণে রাস্তাগুলি ছেদ করত, বাড়ি তৈরির নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল। সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র ছাড়া তাকে রূপায়ণ করা কঠিন হত। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় অনুমান করেছেন যে সিন্ধুসভ্যতার জ্যামিতি জ্ঞানের সাহায্য পেয়েছিল শুল্বসূত্র, কারণ তার থেকে পুরানো জ্যামিতি জ্ঞানের কোনো নিদর্শন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে পাওয়া যায় না।

প্রাচীন কালের ইঞ্জিনিয়ারিঙের সব থেকে বিখ্যাত নিদর্শন হল 2600 খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তৈরি গিজার গ্রেট পিরামিড। গিজার পিরামিডে নানা জায়গায় সমকোণী কাঠামো বানাতে এই সূত্রের ব্যবহার হয়েছে। যেমন একটি ত্রিভুজের ভূমি 115.2 মিটার, লম্ব 146.6 মিটার ও অতিভুজ 186.4 মিটার। দশমিকে প্রথম ঘর পর্যন্ত এই মাপ পুরোপুরি সঠিক। এই সব ত্রিভুজে সমকোণ অর্থাৎ নব্বই ডিগ্রির মাপে ত্রুটি আছে দশ হাজার ভাগের এক ভাগেরও কম। এখানেও বোঝা যায় যে প্রমাণ জানা থাক বা না থাক, সূত্রটি সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা ছিল।

সূত্র কথাটি বিজ্ঞানে সাধারণত পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষাতে পাওয়া কতকগুলি সিদ্ধান্তের জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন শক্তির সংরক্ষণ সূত্র বা রসায়নে ডালটনের সূত্র এ সবই পরীক্ষানিরীক্ষা করে পাওয়া দিয়েছিল। সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রটির উল্লেখ থাকা মানেই যে তার আধুনিক গণিতের পদ্ধতিতে অর্থাৎ স্বতঃসিদ্ধ থেকে অগ্রসর হয়েই তার প্রমাণ জানা ছিল এমন নাও হতে পারে। মানুষকে বহু জায়গায় বহুবার সমকোণী ত্রিভুজকে ব্যবহার করতে হয়েছে। পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রে পৌঁছানোও অস্বাভাবিক নয়।

আধুনিক গণিত মূলত স্বতঃসিদ্ধভিত্তিক, অর্থাৎ সেখানে অবরোহী যুক্তি কাজ করে। প্রাচীন বিজ্ঞানের চরিত্রও ছিল একই রকম, সেখানে একটি বা কয়েকটি সাধারণ সত্য ধরে নেওয়া হত, তার প্রমাণের প্রয়োজন পড়ত না। সেগুলিকে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হত। এর ফলে সেখানে পরীক্ষানিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের বিশেষ স্থান ছিল না। আধুনিক বিজ্ঞান কিন্তু আরোহী যুক্তিতে বিশ্বাসী; সেখানে নানা পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা থেকে আমরা সাধারণ সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে সাধারণ সত্যটি পরিবর্তন করার বা বাতিল করার সুযোগ থাকে, এভাবেই আধুনিক বিজ্ঞান এগোয়। সেই অর্থে প্রাচীন গণিতের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।


তথ্যসূত্র

The Origin of Geometry in India: A Study of the Sulbasutras, Ramkrishna Bhattacharya

পিথাগোরাস ত্রয়ী: একটি পরিক্রমা, ভূপতি চক্রবর্তী

History of Science and Technology in Ancient India, Debiprasad Chattopadhyay

God Created the Integers: The Mathematical Breakthroughs that Changed History, Edited with Commentary by Stephen Hawking

Science in Saffron: Skeptical Essays on the History of Science, Meera Nanda

Mathematics, Samarendranath Sen, in A Concise History of Science in India, Chief Editor Debendramohan Bose, Editors Samarendranath Sen and B V Subbarayappa

 

প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার, শারদ ২০২৫  



Monday, 15 September 2025

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সালতামামি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সালতামামি

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স বিষয়ে বহু কথা শোনা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাকে বলে, তার বিভিন্ন দিক, তার বৈজ্ঞানিক, প্রাযুক্তিক ও সামাজিক তাৎপর্য এই সংখ্যার নানা প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। নিউরাল নেটওয়ার্ক, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং এই ধরনের কিছু পরিভাষা এই লেখাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যাদের ব্যাখ্যা সেই সব প্রবন্ধে পাওয়া যাবে। এই লেখাতে আমরা শুধুমাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাসের বিভিন্ন মাইলফলকের কথা শুনব।

আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স বাক্যবন্ধটি অপেক্ষাকৃত নতুন, ১৯৫৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজে আয়োজিত এক আলোচনাচক্রে এক গবেষণাপত্রে এটি প্রথম ব্যবহার হয়। লেখক ছিলেন চারজন -- জন ম্যাকার্থি, মার্ভিন মিনস্কি, নাথানিয়েল রচেস্টার ও ক্লড শ্যানন। তবে বাস্তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির জন্ম বিংশ শতকে হলেও তার অনেক আগেই মানুষের কল্পনাতে তা এসেছে; সাহিত্যে তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। জোনাথন সুইফট তাঁর গালিভার্স ট্রাভেলস-এ লাপুটা দ্বীপে এমন এক 'ইঞ্জিন'-এর কথা বলেছিলেন যার হাতল ঘুরিয়ে দর্শন, কবিতা বা গণিত বিষয়ক বই পাওয়া যায়। প্রথম সার্থক কল্পবিজ্ঞান হিসাবে অনেকেই মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-এর (১৮২১) কথা বলেন। সেই উপন্যাসে ডক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন যে মানুষকে সৃষ্টি করেছিলেন, তাকে আমরা হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্তরে ফেলতে পারি। তবে তার মস্তিষ্ক মানুষের শবদেহ থেকে পাওয়া গিয়েছিল। যন্ত্রের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা প্রথম বলেছিলেন স্যামুয়েল বাটলার। ১৮৬৩ সালে তিনি ডারউইন অ্যামং দি মেশিন্‌স- প্রবন্ধে তিনি যন্ত্রের বিবর্তন ও বুদ্ধির উন্মেষ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তার চার বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল ডারউইনের যুগান্তকারী গ্রন্থ অরিজিন অফ স্পিসিস। বাটলারের চিন্তার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম অঙ্গ মেশিন লার্নিং-এর সূত্র খুঁজে পাই। বিংশ শতাব্দীতে আরো অনেকেরই নাম করা যেতে পারে। ক্যারল চাপেক-এর নাটকে যন্ত্রমানব মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সেই নাটক থেকেই ইংরাজি ভাষাতে রোবট শব্দটির আবির্ভাব হয়। আর্থার সি ক্লার্ক ২০০১-এ স্পেস ওডিসি উপন্যাসে কম্পিউটার HAL মানসিক দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছে, আবার তার পরের উপন্যাস ২০১০-এ স্পেস ওডিসিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানী চন্দ্র তাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছেন। বাস্তবে না হোক, সাহিত্যে অনেকদিন আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক বুদ্ধির কাছে এসে পৌঁছেছে।

গালিভার্স ট্রাভেলস হল মূলত ব্যাঙ্গধর্মী রচনা, সুইফটের গল্পের 'ইঞ্জিন'-ও রেমন লুল ও গটফ্রিড লিবনিৎজের এমন এক প্রস্তাবকে বিদ্রূপ করেছিলেন, যার মধ্যে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক চিন্তার সন্ধান আমরা পাই। রেমন লুল (১২৩২-১৩১৬) ছিলেন স্পেনের এক ধর্মযাজক, তিনি খ্রিস্টধর্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য কতকগুলি সাধারণ নীতির উপর নির্মিত এক যুক্তিশাস্ত্রের কথা বলেছিলেন। লুলের চিন্তাকে প্রসারিত করে ক্যালকুলাসের অন্যতম আবিষ্কারক লিবনিৎজ ১৬৬৬ সালে প্রস্তাব করেন যে মানুষের চিন্তারও এক বর্ণমালা আছে, এবং যে কোনো জটিল ধারণাকে স্বল্পসংখ্যক সরল ধারণার সাহায্যে প্রকাশ করা যায়। লিবনিৎজ অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলেন নি, কিন্তু চিন্তাকে এভাবে প্রকাশের কথা বলে তিনি সেই পথ খুলে দিয়েছিলেন।

মেশিন লার্নিং-এর এক স্তম্ভ হল বেইজের উপপাদ্য। ইংরাজ দার্শনিক গণিতবিদ ও যাজক টমাস বেইজ এই উপপাদ্যটি আবিষ্কার করেন, তবে তিনি সেটি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দু' বছর পরে ১৭৬৩ সালে সেটি প্রকাশিত হয়। এর পর ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি ইংরাজ গণিতবিদ জর্জ বুল বলেন যে মানুষ যেভাবে যুক্তি দিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তাকে গণিতের সমীকরণের আকারে প্রকাশ করা সম্ভব। বুলের প্রস্তাবিত বীজগণিত হল আধুনিক কম্পিউটারের প্রাণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত কম্পিউটারের মাধ্যমেই রূপায়িত করা হচ্ছে। চার্লস ব্যাবেজকে মনে করা হয় যন্ত্রের সাহায্যে গণনা অর্থাৎ কম্পিউটারের আবিষ্কারক। ১৮২০-র দশকে তাঁর তৈরি ডিফারেন্স ইঞ্জিনকে প্রথম যন্ত্রগণক বা কম্পিউটার বলা হয়। কাউন্টেস আডা লাভলেস ব্যাবেজের ইঞ্জিনের জন্য প্রথম প্রোগ্রাম লিখেছিলেন।

উনিশশো চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশককে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সূচনাপর্ব বলা যেতে পারে। ১৯৪৩ সালে দুই মার্কিন গবেষক ওয়ারেন ম্যাকুলোক ও ওয়াল্টার পিটস এক গবেষণাপত্রে স্নায়ুতন্ত্রকে কতকগুলি আদর্শায়িত কৃত্রিম নিউরোন অর্থাৎ স্নায়ুকোষের জালিকা বা নেটওয়ার্ক হিসাবে প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রস্তাবিত কৃত্রিম নিউরোনগুলি বুলের বীজগণিতকে রূপায়িত করতে পারে। এ থেকেই পরবর্তীকালে নিউরাল নেটওয়ার্ক ও ডিপ লার্নিং-এর চিন্তা আসে। ১৯৫৬ সালে মার্ভিন মিনস্কি ও ডিন এডমন্ডস তৈরি করেছিলেন প্রথম কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক SNARC (Stochastic Neural Analog Reinforcement Calculator)। তখন ছিল ভ্যাকুয়াম টিউবের যুগ, তিন হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব ব্যবহার করে চল্লিশটি কৃত্রিম নিউরোনের নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা হয়।

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিং-কে আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের জনক মনে করা হয়, তিনি ১৯৫০ সালে এমন এক পরীক্ষার কথা বলেন যাতে উত্তীর্ণ হলে কোনো যন্ত্রকে বুদ্ধিমান বলা যাবে। টুরিং অবশ্য বাস্তব বুদ্ধিমান যন্ত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন এমন নয়, তিনি সেই যন্ত্রের মূলনীতিগুলি স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন। প্রথম যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সন্দেহাতীতভাবে টুরিং পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হয় তা হল GPT-4.5 ; ২০২২ সালে নেচার পত্রিকাতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে সেই খবর প্রকাশ করা হয়। এই লেখার জন্য ChatGPT-র সাহায্য নেওয়া হয়েছে, তা GPT-4.5-এর উপরেই তৈরি। ১৯৫৯ সালে আর্থার স্যামুয়েল প্রথম মেশিন লার্নিং এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন; এক বিশেষ খেলাতে কম্পিউটার প্রোগ্রাম যদি তার স্রষ্টা প্রোগ্রামারের থেকেও বেশি ভালো খেলতে পারে, সেই ধরনের প্রোগ্রামকে তিনি মেশিন লার্নিং নাম দিয়েছিলেন। 

অ্যালান টুরিং

১৯৫০-এর দশকের গবেষকরা ভেবেছিলেন অল্পদিনের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি করা যাবে, তাই বিভিন্ন সরকার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গবেষণাখাতে অনেক অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু উনিশশো সত্তরের দশক থেকে বোঝা যায় যে বিষয়টা অত সহজ হবে না, তারপর থেকে অর্থের স্রোত শুকিয়ে এসেছিল। মাঝে উনিশশো আশির দশকের সূচনাতে আবার এই বিষয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯০-এর দশকে আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা পুরোদমে শুরু হয়। টুরিং টেস্টে উত্তীর্ণ না হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বেশ কিছু সাফল্য পেতে শুরু করে। প্রথম কোনো কম্পিউটার দাবাতে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার রেটিং পায় ১৯৮১ সালে। ১৯৯৭ সালে দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ ডিপ ব্লু সুপার কম্পিউটারের কাছে পরাজিত হন। ডিপ ব্লু আইবিএম কোম্পানির তৈরি, তাদেরই নির্মিত ওয়াটসন ২০১১ সালে জিওপার্ডি খেলাতে মানুষ চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দেয়।

ডিপ ব্লু-তে ছিল ২৫৬টি প্রসেসর যারা সমান্তরালভাবে কাজ করে এক সেকেন্ডে কুড়ি কোটি সম্ভাব্য চাল গণনা করতে পারে। ফলে ডিপ ব্লু যে কোনো পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের চোদ্দটি চাল পর্যন্ত বিশ্লেষণ করে। ভাষাতত্ত্ববিদ নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন যে এভাবে দাবা খেলা জেতা আর বুলডোজারের মেশিনের অলিম্পিকে ওয়েটলিফটিং স্বর্ণপদক জেতা একই ব্যাপার। চিনের এক প্রাচীন খেলা গো দাবার থেকেও জটিল। ২০১৬ সালে গুগলের আলফাগো কম্পিউটার বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় দক্ষিণ কোরিয়ার লী সেডলকে হারিয়ে দেয়। আলফাগো ডিপ ব্লু-এর মতো অসংখ্য চালের বিশ্লেষণ করে না, নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাকে মানুষের মতো খেলতে শেখানো হয়েছে। তার স্ট্র্যাটেজির মৌলিকত্ব দর্শকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল

২০১২ সালে আলেক্স ক্রিজেভস্কি তৈরি করেন আলেক্সনেট। তাঁকে সাহায্য করেছিলেন ইলিয়া সুতস্কেভার ও জিওফ্রে হিনটন। আলেক্সনেট হল এক নিউরাল নেটওয়ার্ক যা ছবির বস্তুকে চিনতে পারে। আলেক্সনেটে ছিল সাড়ে ছয় লক্ষ নিউরোন ও ছ' কোটি প্যারামিটার। আলেক্সনেট থেকেই ডিপ লার্নিং-এর সূচনা হল বলা যেতে পারে।

একুশ শতকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে বিকাশ ঘটেছে তার সমস্ত বিবরণ এই লেখার পরিসরে দেওয়া অসম্ভব। শতাব্দীর সূচনা থেকেই আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স সাধারণ দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহার হতে শুরু হয়ে গেছে। ২০০২ সালে রুম্বা কোম্পানি প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে আসে। তার সব থেকে বড় গুণ ছিল সে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যেত না। ২০০৯ সালে গুগল চালকবিহীন গাড়ি তৈরি করে। এখন বহু দেশেই এই ধরনের গাড়িকে রাস্তায় দেখতে পাওয়া যায়। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ আমরা অনেকেই ব্যবহার করি। সেগুলি তো বটেই, গোটা ইন্টারনেটই এআই-এর উপর নির্ভর করে। ২০১০-এর দশকে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি হয়। অ্যাপলের সিরি (২০১১), মাইক্রোসফটের কর্টানা (২০১৪), বা আমাজনের আলেক্সার (২০১৪) মতো ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম মোবাইল বা কম্পিউটারে মুখের কথাকে কম্পিউটারের ভাষাতে পরিবর্তন করে, কম্পিউটার বা মোবাইল সেই নির্দেশ পালন করে

গত এক দশকে আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্সে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলদের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। এই সমস্ত মডেলে মানুষের ভাষাকে ও কম্পিউটারের ভাষাতে রূপান্তরিত করে, আবার কম্পিউটারের ভাষাকেও মানুষের বোধ্য আকারে অনুবাদ করে। অনেক মডেলে ২০১৮ সালে উদ্ভাবিত Bidirectional encoder representations from transformers (BERT) ব্যবহার করা হয় । আগে GPT-র কথা এসেছে, এটি একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। আরো অনেক এই ধরনের মডেল আছে, যেমন Qwen, Gemini, Granite ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাপ রেখেছে বিজ্ঞানের নানা শাখাতে, তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ এই লেখাতে নেই। উল্লেখ করা যায় যে ২০২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন দুই বিভাগেই নোবেল পুরস্কারজয়ীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছেন। পদার্থবিজ্ঞানে দুই নোবেলজয়ী জন হপফিল্ড ও জিওফ্রে হিন্টন নিউরাল নেটওয়ার্কের সাহায্যে মেশিন লার্নিং পদ্ধতির বিকাশের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রোটিনের গঠন সংক্রান্ত এক পঞ্চাশ বছরের পুরানো সমস্যার সমাধানের জন্য ডেমিস হাসাবিস ও জন জাম্পারকে রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই পুরস্কারের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এই যুগে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই লেখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাযুক্তিক বিকাশের কয়েকটি বিশেষ ধাপের কথাই বলা হল। বিশেষ করে চেতনা ও বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক, বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক দিক নিয়ে আরো অনেক গবেষণা হয়েছে যাদের উল্লেখ এই লেখার সীমাবদ্ধ পরিসরে সম্ভব হল না। কম্পিউটার প্রযুক্তির যে দ্রুত বিকাশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্মেষে সাহায্য করেছে তার বিষয়েও এই প্রবন্ধে কিছু বলা হল না। এই সংখ্যার অন্যান্য লেখাতে আরো অনেক বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ এই লেখা তৈরি করতে ChatGPT-র সাহায্য নেওয়া হয়েছে। শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের লেখা বোধবিজ্ঞান বইটি থেকেও নানা তথ্য পেয়েছি। বন্ধু নবেন্দু চাকি লেখাটি পড়ে তাঁর মতামত জানিয়েছেন।


প্রকাশঃ জ্ঞান ও বিজ্ঞান, জুলাই 2025