Friday, 15 November 2024

ফ্যাসিবাদ বিরোধী রবীন্দ্রনাথ

 

ফ্যাসিবাদ বিরোধী রবীন্দ্রনাথ

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়




ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনির নেতৃত্বে ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি ক্ষমতায় এসেছিল ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে। তার এক দশক পরে জার্মানিতে হিটলার ক্ষমতা দখল করেন। হিটলারের দলের নাম ছিল ন্যাশনাল সোশালিস্ট পার্টি (সংক্ষেপে নাৎসি) বা জাতীয় সমাজতন্ত্রী দল; অবশ্য সমাজতন্ত্র শুধুমাত্র দলের নামে সীমাবদ্ধ ছিল। ফ্যাসিবাদ আদতে কী? সাম্রাজ্যবাদের এক চরম এবং বিকৃত রূপ হল ফ্যাসিবাদ। প্রায়শই সে গণতন্ত্রের রূপ ধরে শুরু করে, সমাজতন্ত্রের কথা বলে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের আশাআকাঙ্ক্ষাকে পদদলিত করে বৃহৎ পুঁজির স্বার্থই রক্ষা করে। ইউরোপ যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঘাতে বিপর্যস্ত, তখন শ্রমিককৃষকের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম গণআন্দোলনকে নতুন শক্তি জুগিয়েছিল। বৃহৎ পুঁজিপতিরা সেই আন্দোলনকে ধ্বংস করতে তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধী ফ্যাসিবাদকে ব্যবহার করেছিল। ফ্যাসিবাদ প্রায়শই এক শ্রেণির মানুষকে শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে এবং তাদের বলির পাঁঠা বানায়। জাতীয়তাবাদের প্রতি আবেদন ছিল ইতালি ও জার্মানির দুই ফ্যাসিস্ট দলেরই মূল মন্ত্র, এবং সেই জাতীয়তাবাদের মূল মন্ত্রই ছিল জাতিবিদ্বেষ। মুসোলিনির একটি বক্তৃতা উদ্ধৃত করি, “I would say we can easily sacrifice 500,000 barbaric Slavs for 50,000 Italians ...”। নাৎসিদেরও এক মূল নীতি ছিল ইহুদি বিরোধিতা। নাৎসিরা ইহুদিদের নিচু শ্রেণির মানুষ মনে করত এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয় ও তার পরের দুঃখকষ্টের জন্য তাদের দায়ী করেছিল। নাৎসিরা সরকারে আসার পরে তাদের উপর নিপীড়ন চরমে উঠেছিল। নাৎসিরা ষাট লক্ষ ইহুদিকে খুন করেছিল।

ফ্যাসিবাদ সাধারণভাবে মুক্তচেতনার বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীদের বিরোধী। জার্মান সাহিত্যকে ‘অ-জার্মান’ প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আগুনে নিক্ষেপ করা হয় সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কার্ল মার্ক্স, বের্টোল্ট ব্রেখট, স্টিফেন জুইগ, আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো ইহুদি দার্শনিক বিজ্ঞানী বা সাহিত্যিকদের বই। এভাবেই জার্মানিতে চিন্তার জগতে আধিপত্য কায়েম করেছিল নাৎসিরা। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, যা উদারনৈতিক চিন্তার মূল ভিত্তি, তা ফ্যাসিবাদের পক্ষে অসহ্য ছিল। এখনি সাবধান না হলে আমাদের দেশও ভবিষ্যতে নাৎসি জার্মানির পথ নেবে, বিশেষ করে শিক্ষার স্বাধিকার যখন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণের সুযোগে মুক্ত চিন্তার উপরে আক্রমণ যখন ক্রমবর্ধমান।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব বিদেশি সাহিত্যিকের বই জার্মান ভাষায় সব থেকে বেশি অনুবাদ হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি সাম্রাজ্যবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদকে অন্তর থেকে ঘৃণা করতেন, তাঁর লেখায় বারবার তা আমরা দেখেছি। কাজেই ফ্যাসিবাদের তিনি বিরোধী হবেন, তাতে সন্দেহ থাকা উচিত নয়। তাই জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী শাসনের আগুন থেকে রবীন্দ্রনাথের বইও বাদ যায়নি। কিন্তু বাস্তব বড় বিচিত্র, রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষিও গোড়াতে ফ্যাসিবাদকে চিনতে ভুল করেছিলেন। তবে একবার নিজের ভুল বুঝতে পারার পরে তিনি সারা জীবন আপোসহীনভাবে তার বিরোধিতা করে গেছেন।

মুসোলিনি বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বমানবের সমর্থন ফ্যাসিবাদকে আন্তর্জাতিকক্ষেত্রে কিছুটা গ্রহণযোগ্য করতে পারে। তাই তিনি দুই অধ্যাপকের মারফত বিশ্বভারতীর জন্য অনেক বই উপহার পাঠান ও রবীন্দ্রনাথকে ইতালিতে আমন্ত্রণ জানান। ১৯২৬ সালে ইতালি ভ্রমণকালে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সরকারের অতিথি। সেখানে তাঁকে ঘিরে রেখেছিল ফ্যাসিস্ট পার্টির সদস্যেরা। তাঁকে তাদের পছন্দমতো জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। মুসোলিনি নিজে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। রবীন্দ্রনাথ ইতালির প্রকৃত অবস্থা না বুঝে মুসোলিনির প্রশংসা করেন; তাকে ফ্যাসিবাদের প্রতি সমর্থন বলে ফলাও করে দেশে বিদেশে প্রচার করা হয়।

রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়াতে প্রমাদ গুণেছিলেন প্রগতিশীল ফরাসি সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ রোমা রোলাঁ। তিনি প্রথম থেকেই ফ্যাসিবাদের বিরোধী। রবীন্দ্রনাথের ইতালি থেকে যান সুইজারল্যান্ড, সেখানে তিনি ছিলেন রোমা রোলাঁর অতিথি। রোলাঁ প্রথমে তাঁকে বোঝান যে মুসোলিনির স্বৈরশাসন কোনোরকম বিরোধিতাকে বরদাস্ত করে না। যে সমস্ত সরকার বিরোধীরা দেশ ছাড়তে পারেননি, তাঁদের অনেককেই হত্যা করা হয়েছে, বাকিদের স্থান হয়েছে কারাগারে। তারপরে তিনি মুসোলিনির অত্যাচারের শিকার কয়েকজনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ করান। রবীন্দ্রনাথ তখন বাস্তব পরিস্থিতি বুঝতে পারেন। আলোচনার সময় একটা কথা উঠে এসেছিল, ফ্যাসিস্টরা উচ্চকণ্ঠে বলত মুসোলিনি ইতালিকে অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছেন, যদিও সেটা আদৌ সত্য ছিল না। প্রসঙ্গত বলা যায়, আধুনিক কালে আমাদের দেশেও শাসকের ফ্যাসিবাদী আচরণের পক্ষে একই যুক্তি দেখানো হয়। তাই রবীন্দ্রনাথের প্রতিক্রিয়া আমাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন; তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন যে কেউ যদি রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বস্তুগত লাভের জন্য মানবতার আদর্শকে বিসর্জন দেয়, তাহলে তার নিন্দাই প্রাপ্য।

এর পরে দীনবন্ধু চার্লস এন্ড্রুজকে রবীন্দ্রনাথ এক চিঠি লিখেছিলেন যা লন্ডনের ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকাতে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি ফ্যাসিবাদের নিন্দা করে লেখেন, “ফ্যাসিবাদের কর্মপদ্ধতি ও নীতি সমগ্র মানবজাতির উদ্বেগের বিষয়। যে আন্দোলন নিষ্ঠুরভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করে, বিবেকবিরোধী কাজ করতে মানুষকে বাধ্য করে এবং হিংস্র রক্তাক্ত পথে চলে বা গোপনে অপরাধ সংঘটিত করে-সে আন্দোলনকে আমি সমর্থন করতে পারি এমন উদ্ভট চিন্তা আসার কোনো কারণ নেই। আমি বারবারই বলেছি, পশ্চিমের রাষ্ট্রগুলো সযত্নে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব লালন করে সারা পৃথিবীর সামনে ভয়াবহ বিপদের সৃষ্টি করেছে।” এর পরে ইতালির সংবাদমাধ্যম একযোগে রবীন্দ্রনাথের নিন্দা শুরু করে। পরে ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ানকে এই প্রসঙ্গেই এক সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথ বলেন যে কোনো দেশ যদি সমৃদ্ধির জন্য যদি অন্যায় পথ অবলম্বন করে, তা সমগ্র মানবজাতির পক্ষেই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এই সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিবাদী বিপদের স্বরূপ সম্যকভাবে উপলব্ধি করেন। ১৯২৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্যারিতে আঁরি বারব্যুস ও রোল্যাঁর নেতৃত্বে প্রথম ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন হয়, তার ঘোষণাপত্রে ভারতবর্ষ থেকে একমাত্র রবীন্দ্রনাথই স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই সঙ্গে তিনি বারব্যুসকে চিঠিতে লেখেন, “এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, আপনার আহ্বানে আমার সহানুভূতি আছে এবং আমি নিশ্চিতভাবে মনে করি যে এটা অন্যান্য অসংখ্য মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিনিধিত্ব করে আর যারা সভ্যতার গর্ভ থেকে হিংসার আকস্মিক বিস্ফোরণে হতাশ বোধ করছেন...।"

আমাদের বুঝতে হবে যে সেই সময় ভারতের একমাত্র জওহরলাল নেহরু ছাড়া অন্য কেউই ফ্যাসিবাদের বিপদ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন না। অন্যান্য বুদ্ধিজীবী বা রাজনৈতিক নেতারা হয় সে বিষয়ে কিছুই জানতেন না, নয়ত তার গুণমুগ্ধ ছিলেন। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় মডার্ন রিভিউ পত্রিকাতে তার প্রশংসা করেন। সুভাষচন্দ্র বিদেশ থেকে এক বিবৃতিতে বলেন মুসোলিনি হলেন সেই যুগে জগতের শ্রেষ্ঠ মানুষ। রোমা রোলাঁ এই সমসস্যার কথা জানতেন এবং ফ্যাসিবাদের বিরোধিতার জন্য নানা ভাবে ভারতীয়দের প্রতি আবেদন জানিয়েছিলেন।

সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ছিলেন ইহুদি; হিটলার ক্ষমতায় আসার ঠিক আগে তিনি দেশ ছাড়েন। নাৎসি জার্মানি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি দখল করে নেয়, তাঁর তত্ত্ব ক্লাসে পড়ানো বন্ধের নির্দেশ দেয় এবং নানাভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা করে। জার্মানিতে ইহুদিদের উপর অত্যাচারের খবর শুনে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৪ সালে ইজরায়েল মেসেঞ্জার সংবাদপত্রে এক চিঠিতে লেখেন, "…if the brutalities we read of are authentic, then no civilised conscience can allow compromise with them. The insults offered to my friend Einstein have shocked me to the point of torturing my faith in modern civilisation.”

ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের মধ্যের সম্পর্ক রবীন্দ্রনাথের কাছে ধরা পড়েছিল। তাই ১৯৩৩ সালে 'কালান্তর' প্রবন্ধে তিনি লেখেন, "সভ্য য়ুরোপের সর্দার-পোড়ো জাপানকে দেখলুম কোরিয়ায়, দেখলুম চীনে, তার নিষ্ঠুর বলদৃপ্ত অধিকার লঙ্ঘনকে নিন্দা করলে সে অট্টহাস্যে নজির বের করে য়ুরোপের ইতিহাস থেকে। আয়র্লণ্ডে রক্তপিঙ্গলের যে উন্মত্ত বর্বরতা দেখা গেল, অনতিপূর্বেও আমরা তা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারতুম না। তার পরে চোখের সামনে দেখলুম জালিয়ানওয়ালাবাগের বিভীষিকা। যে-য়ুরোপ একদিন তৎকালীন তুর্কিকে অমানুষ বলে গঞ্জনা দিয়েছে তারই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে প্রকাশ পেল ফ্যাসিজ্‌মের নির্বিচার নিদারুণতা। একদিন জেনেছিলুম আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা য়ুরোপের একটা শ্রেষ্ঠ সাধনা, আজ দেখছি য়ুরোপে এবং আমেরিকায় সেই স্বাধীনতার কণ্ঠরোধ প্রতিদিন প্রবল হয়ে উঠছে। ... পোলিটিকাল মতভেদের জন্যে ইটালি যে দ্বীপান্তরবাসের বিধান করেছে, সে কীরকম দুঃসহ নরকবাস, সে-কথা সকলেরই জানা আছে। য়ুরোপীয় সভ্যতার আলোক যে-সব দেশ উজ্জ্বলতম করে জ্বালিয়েছে, তাদের মধ্যে প্রধান স্থান নিতে পারে জর্মনি। কিন্তু আজ সেখানে সভ্যতার সকল আদর্শ টুকরো টুকরো করে দিয়ে এমন অকস্মাৎ, এত সহজে উন্মত্ত দানবিকতা সমস্ত দেশকে অধিকার করে নিলে, এও তো অসম্ভব হল না। যুদ্ধপরবর্তীকালীন য়ুরোপের বর্বর নির্দয়তা যখন আজ এমন নির্লজ্জভাবে চারিদিকে উদঘাটিত হতে থাকল তখন এই কথাই বার বার মনে আসে, কোথায় রইল মানুষের সেই দরবার যেখানে মানুষের শেষ আপিল পৌঁছবে আজ। মনুষ্যত্বের 'পরে বিশ্বাস কি ভাঙতে হবে-- বর্বরতা দিয়েই কি চিরকাল ঠেকাতে হবে বর্বরতা। কিন্তু সেই নৈরাশ্যের মধ্যেই এই কথাও মনে আসে যে, দুর্গতি যতই উদ্ধতভাবে ভয়ংকর হয়ে উঠুক, তবু তাকে মাথা তুলে বিচার করতে পারি, ঘোষণা করতে পারি তুমি অশ্রদ্ধেয়, অভিসম্পাত দিয়ে বলতে পারি "বিনিপাত", বলবার জন্যে পণ করতে পারে প্রাণ এমন লোকও দুদিনের মধ্যে দেখা দেয়, এই তো সকল দুঃখের, সকল ভয়ের উপরের কথা।"

১৯৩৬ সালে স্পেনের জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদ স্পেনে নির্বাচিত গণতন্ত্রী পপুলার ফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। জার্মানি ও ইতালি ফ্রাঙ্কোকে সাহায্য করেছিল, কিন্তু ফ্রান্স বা ব্রিটেন নিরপেক্ষ থাকে। দেশ বিদেশের বুদ্ধিজীবী দল পপুলার ফ্রন্টের পক্ষে গৃহযুদ্ধে অংশ নেন। ভারত থেকে অংশ নিয়েছিলেন মহারাষ্ট্রের তরুণ গোপাল হুদ্ধার। শহিদ হন র‌্যালফ ফক্স, ক্রিস্টোফার কডওয়েল, জন কর্নফোর্ড, জুলিয়ান বেল, ফ্রেডরিকো গার্সিয়া লোরকার মতো বিখ্যাত বুদ্ধিজীবীরা প্রমুখ। এক ক্ষোভবার্তায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, “স্পেনে বিশ্বসভ্যতাকে বিপদগ্রস্ত ও পদদলিত করা হচ্ছে। স্পেনীয় জনগণের গণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে ফ্রাঙ্কো বিদ্রোহের পতাকা উড্ডীন করেছে। আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ বিদ্রোহীদের সহায়তা করার জন্য সৈন্য ও অর্থ ঢালছে। ভাড়াটে সৈনিকেরা ও বিদেশী ফৌজ স্পেনের সুন্দর ভূমির উপর দিয়ে যাচ্ছে- আর পিছনে যাচ্ছে মৃত্যু, নির্জনতা...। স্পেনীয় জনগণের এই চরম পরীক্ষা এবং দুর্দশার মুহূর্তে আমি মানবতার বিবেকের নিকট আবেদন করছি। স্পেনের জনগণের ফ্রন্টকে সাহায্য করা হোক। স্পেনের জনগণকে সাহায্য করা হোক, লক্ষ লক্ষ কণ্ঠকে সাহায্য করা হোক; স্পেনের জনগণকে সাহায্য করা হোক, লক্ষ লক্ষ কণ্ঠে গর্জে উঠুক প্রতিক্রিয়া। অভিযান বন্ধ কর, গণতন্ত্রের সপক্ষে কোটি কোটি মানুষ এগিয়ে আসুক-এগিয়ে আসুক সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক সাফল্যের জন্য।”


১৯৩৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ব্রাসেলসে যে বিশ্বশান্তি কংগ্রেস অনুষ্টিত হয় সেখানে ‘ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ’ থেকে একটি ইস্তাহার প্রকাশ করা হয়। লেখা হয়, "ভারত অপেক্ষা ভারতের বাহিরে অবস্থা অধিকতর তমসাচ্ছন্ন। ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরি খাদ্যের পরিবর্তে অস্ত্র যোগাইয়া এবং সংস্কৃতির সুযোগের পরিবর্তে সাম্রাজ্য গঠনের প্রলোভন দেখাইয়া নিজের সমরবাদের মুখোশ খুলিতেছে। আবিসিনিয়াকে পদানত করিতে ইটালি যে উপায় অবলম্বন করিয়াছে, তাহা যুক্তি ও সভ্যতার প্রতি বিশ্বাসী সকলকে আঘাত করিয়াছে।" ইস্তাহারে স্বাক্ষর করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, মুন্সী প্রেমচাঁদ, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, জওহরলাল, প্রমথ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় এবং নন্দলাল বসু। রবীন্দ্রনাথ পৃথক এক বাণীতে বলেছিলেন, “...উন্নত প্রতিক্রিয়া ও জঙ্গীবাদ আজ সভ্যতার ভাগ্য নিয়ে খেলা করছে আর সংস্কৃতি ধ্বংসের উপক্রম করছে। এ সময়ে আমাদের নীরব থাকা হবে অপরাধ। সমাজের প্রতি আমাদের যে কর্তব্য তার ঘোর ব্যত্যয় করা হবে। ...যুদ্ধকে আমরা ঘৃণা করি। যুদ্ধকে আমরা চিরতরে পরিহার করতে চাই, যুদ্ধে আমাদের কোনো স্বার্থ নেই। যুদ্ধ মারফৎ কদর্য ফ্যাসিজম চিরস্থায়ী করতে চায়।"

১৯৩৭ সালে ভারতে তৈরী হল রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধ বিরোধী সঙ্ঘ। এই সংগঠনে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের লেখক, শিল্পী, রাজনীতিবিদরা যুক্ত হলেন। তাঁদের মধ্যে মুন্সী প্রেমচাঁদ, নন্দলাল বসু, জওহরলাল নেহেরু, তুষারকান্তি ঘোষ, শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে, জয়প্রকাশ নারায়ণ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। সোমেন্দ্রনাথ ঠাকুর হয়েছিলেন সাধারণ সম্পাদক।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জাগ্রত বিশ্ববিবেকের প্রতিভূ। যেখানেই ফ্যাসিবাদ তার নখদাঁত বার করেছে, রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিবাদ করেছেন। ১৯৩৫ সালে ইতালি সাম্রাজ্যবিস্তারের লক্ষে বিনা প্ররোচনায় আবিসিনিয়া আক্রমণ করে। সেই প্রেক্ষিতে অমিয় চক্রবর্তীর অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন ‘আফ্রিকা’ কবিতাটি। এই কবিতার প্রায় প্রতিটি স্তবক ফ্যাসিবাদের হাতে নিপীড়িত মানবসভ্যতার হাহাকারের চিৎকার, “আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে/ প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস,/ যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল/ অশুভ ধ্বনিতে ঘোষণা করল দিনের অন্তিমকাল,/ এসো যুগান্তের কবি,/ আসন্ন সন্ধ্যার শেষ রশ্মিপাতে/দাঁড়াও, ওই মানহারা মানবীর দ্বারে;/ বলো ‘ক্ষমা করো’/ হিংস্র প্রলাপের মধ্যে/ সেই হোক/ তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।”

১৯৩৭ সালে জাপানের চিন আক্রমণের পরে তিনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন এবং অসুস্থতার মধ্যেও চিনের জনগণের উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠান। চিনা শহর নানকিং-এর পতনের পর তিনি ‘যেদিন চৈতন্য মোর’ কবিতায় লিখছেন,
“…
মহাকালসিংহাসনে/ সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,/ কন্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী/ কুৎসিত বীভৎসা পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন/ নিত্যকাল রবে যা স্পন্দিত লজ্জাতুর ঐতিহ্যের/ হৃৎস্পন্দনে, রুদ্ধ কন্ঠ ভয়ার্ত এ শৃঙ্খলিত যুগ যবে/ নিঃশব্দে প্রচ্ছন্ন হবে আপন চিতার ভস্মতলে।”

জাপানের হাতে ১৯৩৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর নানকিং শহরের পতন ঘটে। তিন লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে জাপানি সৈন্য। এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে ২৫ ডিসেম্বর রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,

'‌নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,/ শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস/ বিদায় নেবার আগে তাই/ ডাক দিয়ে যাই/ দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে/ প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে।'‌ (প্রান্তিক-১৮)
জাপানের সৈনিকেরা যুদ্ধযাত্রার পূর্বে ‘ভগবান বুদ্ধে’র মূর্তির সামনে যুদ্ধ জয়ের জন্য প্রার্থনা করছে। একদিকে হিংসার আগুনে সভ্যতাকে পুড়িয়ে দেওয়া, অন্যদিকে এই অপকর্মের সমর্থনে অহিংস নীতির পথিকৃৎ ‘ভগবান বুদ্ধে’র শরণ নেওয়া সৈনিকদের এই দ্বিচারিতা ও ভণ্ডামি দেখে রচনা করেন সুপরিচিত ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি’ কবিতাটি —
“
যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে।/ ওদের ঘাড় হল বাঁকা, চোখ হল রাঙা/ কিড়মিড় করতে লাগল দাঁত।/
মানুষের কাঁচা মাংসে যমের ভোজ ভরতি করতে/ বেরোলো দলে দলে।/ সবার আগে চলল দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে/ তাঁর পবিত্র আশীর্বাদের আশায়।”

জাপানি কবি নোগুচি আগে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সাদরে বরণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়ে নোগুচি এক খোলা চিঠিতে তাঁর সমালোচনা করে জাপানি যুদ্ধোন্মাদনাকে সমর্থন করেন। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর তীব্র বাদানুবাদ হয়েছিল। রাসবিহারী বসু তখন জাপানে, তিনিও রবীন্দ্রনাথকে এক বার্তা পাঠিয়ে ভারতের জাপানবিরোধী আন্দোলন বন্ধ করার জন্য প্রয়াসের আহ্বান জানান, রবীন্দ্রনাথ কড়া ভাষায় তাঁকে ভর্ৎসনা করেন এবং সেই বার্তাবিনিময় সংবাদপত্রে প্রকাশ করতে দেন।

১৯৩৮ সালে মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড চেকোশ্লোভাকিয়া ভাগ করে জার্মানির হাতে তুলে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তার বিরোধিতা করেছিল, কিন্তু ইঙ্গ-ফরাসি সরকার তার কথা শুনতে অস্বীকার করে। কারণ তাদের পরিকল্পনা ছিল নাৎসি জার্মানি ও সভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধানো। এই সময় রবীন্দ্রনাথ চেক রাষ্ট্রপ্রধান এডুয়ার্ড বেনেসকে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। মিউনিখ চুক্তির ছাপ পড়েছে নবজাতকের এই কবিতাতে।

“উপর আকাশে সাজানো তড়িৎ-আলো-- / নিম্নে নিবিড় অতিবর্বর কালো / ভূমিগর্ভের রাতে--/ ক্ষুধাতুর আর ভূরিভোজীদের / নিদারুণ সংঘাতে / ব্যাপ্ত হয়েছে পাপের দুর্দহন,/ সভ্যনামিক পাতালে যেথায় / জমেছে লুটের ধন।…/

বিদীর্ণ হল ধনভাণ্ডারতল,/ জাগিয়া উঠিছে গুপ্ত গুহার / কালীনাগিনীর দল।/ দুলিছে বিকট ফণা,/ বিষনিশ্বাসে ফুঁসিছে অগ্নিকণা। …/ ঐ দলে দলে ধার্মিক ভীরু/ কারা চলে গির্জায় / চাটুবাণী দিয়ে ভুলাইতে দেবতায়।/ দীনাত্মাদের বিশ্বাস, ওরা / ভীত প্রার্থনারবে / শান্তি আনিবে ভবে।"

১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। পোল্যান্ডের সমর্থনে কলকাতায় ইন্দো-পোলিশ সমিতি গঠিত হয়, রবীন্দ্রনাথ তার সভাপতি হতে রাজি হন। রবীন্দ্রনাথ ১৯৪০ সালের ২০শে জুন অমিয় চক্রবর্তীকে চিঠিতে লিখলেন, “‌এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড ফ্রান্স জয়ী হোক একান্ত মনে এই কামনা করি। কেননা মানব – ইতিহাস ফ্যাসিজমের নাৎসিজমের কলঙ্ক প্রলেপ আর সহ্য হয় না।”‌ তার আগে ২৪ মে লিখেছিলেন, ইংরাজের পরাজয়ে "যারা উত্তেজিত উৎসাহ প্রকাশ করছে তারা কাপুরুষ। তারা নিজেরা অক্ষম বলেই সক্ষমদের সংকটে উল্লাস বোধ করছে।"

ফ্যাসিবাদবিরোধী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রেরনা ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। নাৎসিদের সাথে যুদ্ধে যেদিন প্যারির পতন হয় সেদিন স্বাধীন প্যারি বেতার কেন্দ্রে সবশেষ যে নাটকটি পরিবেশিত হয় তা হল আন্দ্রে জিদ অনুদিত রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’। নাটকের শেষ পংক্তিতে ছিল অমলকে বলো সুধা তাকে ভোলে নি। একসঙ্গে তারা একটি পংক্তি যোগ করে ‘স্বাধীনতাকে বলো প্যারি তাকে ভোলে নি’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির নানা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বন্দিরা মৃত্যুর মুখোমুখি পরিস্থিতিতে একশো পাঁচবার ডাকঘর নাটক অভিনয় করেছিল। তার মধ্যে ওয়ারশতে এক অনাথআশ্রমের শিশুদের অভিনয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। সেই শিশুদের নৃশংসভাবে গ্যাসচেম্বারে হত্যা করা হয়েছিল, তার আগে ডাকঘর অভিনয় করে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার সাহস তারা পেয়েছিল।

ফ্যাসিস্ট আক্রমণে ফ্রান্সের পতনের সংবাদে রবীন্দ্রনাথ এতটাই উত্তেজিত ও বিচলিত হয়ে পড়েন যে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জরুরী তারবার্তা পাঠিয়ে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করতে আহ্বান জানান৷ ইতিহাস অন্য পথে চলেছিল; পশ্চিম রণঙ্গনে জয়লাভের পরে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছিল। ফ্যাসিস্টদের প্রতিরোধে দুই কোটি মানুষের জীবনের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে মূল ভূমিকা পালন করেছিল সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে সেই দেশ ভ্রমণ করে লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত বই রাশিয়ার চিঠি। সাধারণ মানুষের উন্নয়নের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রচেষ্টার প্রতি তাঁর পক্ষপাত ছিল স্পষ্ট। রোগশয্যাতেও রবীন্দ্রনাথ ফ্যাসিস্ট বাহিনির বিরুদ্ধে সোভিয়েত জনগণের প্রতিরোধের খবর রাখতেন৷ ‘বাইশে শ্রাবণ’ গ্রন্থে রানী মহলানবিশের বর্ণনা থেকে জানা যায়, যেদিন জার্মানদের অগ্রগতিতে একটু বাধা পড়ার খবর থাকত সেদিন কবি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কাগজ পড়তেন৷ যেদিন জার্মান বাহিনির সাফল্যের খবর থাকত হেডলাইন পড়েই কাগজ ছুঁড়ে ফেলে দিতেন৷ মৃত্যুর আগেও তার অন্যথা হয়নি। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “১৯৪১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ। কবি মৃত্যুশয্যায়। তবু উদ্বিগ্ন হয়ে বার বার জানতে চাইছেন, প্রশান্ত মহলানবিশের কাছে – ‘কী পরিস্থিতি রণাঙ্গণের? প্রশান্ত মহলানবিশ জানান, ‘এখনো এগিয়ে চলেছে দস্যু বাহিনী,’ কবি ডুবে যান নীরব বিষণ্ণতায়।…অবশেষে শেষবারের জন্য সংজ্ঞা এলো কবির। চোখে একই স্বপ্ন। কিন্তু প্রশান্ত মহলানবিশের উত্তর এবার ভিন্ন। ‘সোভিয়েত বাহিনী প্রতিরোধ করেছে।’ রবীন্দ্রনাথ উৎসাহে অধীর হয়ে উঠেন, বলেন, ‘পারবে, দানবকে ঠেকাতে ওরাই পারবে।” ফ্যাসিবাদের পরাজয় কবি দেখে যাননি, কিন্তু তার অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত ছিলেন। মানুষের উপর বিশ্বাস তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত রেখেছিলেন।



তথ্যসূত্রঃ

ভারতে জাতীয়তা আন্তর্জাতিকতা ও রবীন্দ্রনাথ - নেপাল মজুমদার

রবিজীবনী - প্রশান্তকুমার পাল

বাইশে শ্রাবণ - রানী মহলানবীশ

রবীন্দ্র রচনাবলী, পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রকাশিত সংস্করণ

রবীন্দ্রজীবনকথা - প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

 

 প্রকাশ নিশিত  ২০২৪









Wednesday, 23 October 2024

আইনস্টাইনের প্রাগ, প্রাগের আইনস্টাইন

 


আইনস্টাইনের প্রাগ
, প্রাগের আইনস্টাইন


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

সম্প্রতি ইউরোপে এমন এক শহরে আমার স্ত্রী শম্পা ও আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল যেখানে আলবার্ট আইনস্টাইন জীবনের কিছু দিন কাটিয়েছিলেন। শহরটি হল প্রাগ, বর্তমানে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী, চেকভাষায় বলে প্রাহা। সেখানে আইনস্টাইন অল্প দিনই ছিলেন, এক বছরের সামান্য বেশী। কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাসে সেই অল্প সময়ের অভিঘাত খুব কম নয়। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রের পক্ষে সেই শহর দর্শনকে তীর্থযাত্রা বললে নিশ্চয় বাড়িয়ে বলা হবে না। ।

আইনস্টাইনের জন্ম ১৮৭৯ সালের ১৪ মার্চ জার্মানির উল্ম শহরে। তিনি উচ্চতর পড়াশোনা করেন সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফেডারেল পলিটেকনিকে। পাস করার কয়েকবছর পরে তিনি সুইজারল্যান্ডের বার্নে পেটেন্ট অফিসে কেরানির চাকরি পেয়েছিলেন। সেখানে কাজ করার সময়েই তিনি পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট করেন ও ১৯০৫ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গবেষণাগুলি সম্পূর্ণ করেন। সেগুলি প্রকাশিত হওয়ার পরেই বিজ্ঞানীমহলে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। আইনস্টাইন ১৮৯৬ সালেই জার্মানির নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন, কয়েক বছর পরে ১৯০১ সালে তিনি হয়েছিলেন সুইজারল্যান্ডের নাগরিক। সেভাবেই কাটান ১৯৪০ সাল পর্যন্ত, তারপর মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।

পেটেন্ট অফিসের কেরানি আইনস্টাইন প্রথম অ্যাকাডেমিক চাকরি পান বার্ন বিশ্ববিদ্যাল। বার্নের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, সেখান থেকে সুইজারল্যান্ডেরই জুরিখে, এবার অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। পরের গন্তব্য প্রাগের চার্লস (জার্মান উচ্চারণে কার্ল)-ফার্ডিনান্ড জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়। যখন জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় জানতে পেরেছিল আইনস্টাইন ছাড়ার কথা ভাবছেন, একধাপে মাইনে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রাগে তাঁর আলোচনার কেউ ছিলেন না। জুরিখে তিনি সুখী ছিলেন বলেই সকলের মত। কেন জুরিখ ছেড়েছিলেন আইনস্টাইন আমরা জানি না, কেবল আইনস্টাইনের সহযোগী ও জীবনীকার বিজ্ঞানী আব্রাহাম পাইস তাঁর গ্রন্থ 'সাটল ইজ দ্য লর্ড'-এ একটি চিঠি উদ্ধৃত করেছিলেন যার থেকে মনে হয় অন্য অধ্যাপকদের সঙ্গে আইনস্টাইনের কিছু বিরোধ হয়েছিল। তা যদি সত্যি হয়, তা নিশ্চয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, প্রাগে আসার এক বছরের মধ্যেই তিনি আবার জুরিখ ফিরে যেতে মনস্থ করেন।

আইনস্টাইনের নাম বিবেচনার সময় তাঁর বিষয়ে বিখ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী কোয়ান্টাম তত্ত্বের জনক মাক্স প্লাঙ্ককে তাঁর মতামত জিজ্ঞাসা করা হয়। প্লাঙ্ক লিখেছিলেন আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা স্পর্ধাতে ও সম্ভাব্য সুদূরkকিকপ্রসারী প্রভাবে এযাবৎ তাত্ত্বিক বিজ্ঞান এবং জ্ঞানতত্ত্বের সমস্ত প্রগতিকে ছাড়িয়ে যায়। যদি আইনস্টাইনের গবেষণা সঠিক প্রমাণিত হয়, এবং তাঁর ধারণা তা হবে, তাহলে তিনি বিংশ শতাব্দির কোপার্নিকাসরূপে বন্দিত হবেন।প্লাঙ্ক আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বকে সঠিকভাবেই অনুধাবন করেছিলেন। কোপার্নিকাসের তত্ত্ব যেমন পৃথিবীকে ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রীয় স্থান থেকে বিচ্যুত করে আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা করেছিল, আপেক্ষিকতা তত্ত্ব্ও তেমনি স্থান-কাল সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনাকেই পরিবর্তন করে দিয়েছিল। আপেক্ষিকতা তত্ত্ব বিজ্ঞানের বাইরেও শিল্পকলা বা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও নতুন ধারার জন্ম দিয়েছিল।

অবশ্য নিয়োগের পথে কিছু বাধা ছিল। আইনস্টাইন প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে বিশ্বাস কিশোর বয়সেই ত্যাগ করেছিলেন। নিজের সম্পর্কে লেখার সময় ধর্মপরিচয়ের জায়গায় তিনি লিখেছিলন, undenominational অর্থাৎ কোনো বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত নন। বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির অন্যতম শর্ত ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরির সম্রাটের প্রতি বিশ্বস্ততার প্রতিজ্ঞাপাঠ, কর্তৃপক্ষের মনে হয় সম্প্রদায়ভুক্ত না হলে তার প্রতিজ্ঞার কোনো দাম নেই। অবশেষে আইনস্টাইন পরিচয়ে লিখেছিলেন মোসাইক, অর্থাৎ স্বেচ্ছায় যে কোনো সম্প্রদায়ে অংশ নিতে তিনি ইচ্ছুক। এটা যথেষ্ট হয়েছিল।

সেই যুগে অধ্যাপকদের ধর্মবিশ্বাস ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাগে আইনস্টাইনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল পল এহ্‌রেনফেস্টের, এহ্‌রেনফেস্টের মৃত্যু পর্যন্ত সেই বন্ধুত্ব বজায় ছিল। তিনি প্রাগ ত্যাগ করার সময় নিজের পদে এহরেনফেস্টের নিয়োগের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু এহ্‌রেনফেস্ট নিজেকে ধর্মত্যাগী বলে ঘোষণা করেছিলেন বলে প্রাগে তাঁর চাকরি হয়নি। এহ্‌রেনফেস্ট বিয়ে করেছিলেন রাশিয়ান বিজ্ঞানী তাতিয়ানা আফানাসিয়েভাকে। তাতিয়ানা ছিলেন রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ অনুসারী, তার নিয়মে ভিন্ন ধর্মে বিবাহ নিষিদ্ধ। এহ্‌রেনফেস্ট ইহুদি; দু’জনেই তখন নিজেদের ধর্মত্যাগী বলে ঘোষণা করেছিলেন।

প্রাগের আরো অনেক কিছুরই মতো চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় সম্রাট চার্লসের নামাঙ্কিত। আইনস্টাইন যখন প্রাগে এসেছিলেন, সেখানে ছিল দুটি বিশ্ববিদ্যালয় -- চার্লস ফার্ডিনান্ড চেক ও চার্লস ফার্ডিনান্ড জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়। আদিতে এরা আদিতে ছিল একটিই প্রতিষ্ঠান, সেই সময় প্রাগ ছিল বোহেমিয়ার রাজধানী, প্রধান ভাষা ছিল জার্মান। ১৮৪৮ সালে চেক ভাষাতে পড়ানো শুরু হয়, তারপর নানা বিরোধের পরে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাগ হয়ে যায় প্রতিষ্ঠান। তার অনেক আগেই প্রাগে চেক ভাষাভাষীরা সংখ্যাগুরু হয়ে গেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার একটিই বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা মিলে যায়, চার্লস ইউনিভার্সিটি। চতুর্থ চার্লস ছিলেন চতুর্দশ শতকে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট। অবশ্য ঐতিহাসিক দিক থেকে বিচার করলে এই রকম ভুল নাম খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। চার্লস রোম শহরে কাটিয়েছিলেন কয়েক ঘণ্টা, তাঁর শাসনাধীন এলাকাকে সাম্রাজ্য বলতে গেলে কল্পনাকে বহুদূর বাড়াতে হবে, আর তার পবিত্রতা অন্য সব সাম্রাজ্যের থেকে বেশি ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু এটা ঠিক যে চার্লস প্রাগকে ইউরোপে এক মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন। প্রাগের বহু প্রাচীন ও নবীন কাঠামোই তাঁর স্মৃতি বহন করে। কিন্তু আমার মতো বিজ্ঞানের ইতিহাসে উৎসুকদের কাছে চার্লস অন্য কারণে পরিচিত। তিনিই পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের রাজদরবার প্রাগে স্থানান্তরিত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর দুই শতাব্দীরও বেশি পরে সেখানে দেখা হবে দুই মহান জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহে ও জোহানেস কেপলারের, ইতিহাস বইবে অন্য খাতে।

আইনস্টাইনকে প্রাগ মনে রেখেছে কী? টুরিস্টদের অবশ্য দ্রষ্টব্যের মধ্যে আইনস্টাইনের কোনো উল্লেখ পেলাম না। কিন্তু টাইকো ও কেপলারের মূর্তির উল্লেখ পেলাম প্রাগ ভ্রমণের এক ওয়েবসাইটে। খুব কাছে নয়, তবে প্রাগ স্টেশনে নেমেই স্থানীয় পরিবহনের তিনদিনের টিকিট কাটা ছিল, তাই অসুবিধা হল না। সেদিন গিয়েছিলাম কাফকা মিউজিয়ামে। সে এক অনন্য অভিজ্ঞতা, এই লেখার জন্য প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। তবে প্রাগে কাফকাকে এড়ানোর উপায় নেই, তিনি আসবেন এই লেখায়। মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে গুগল ম্যাপকে জিজ্ঞাসা করলাম, মূর্তিদুটির হদিস ও যাওয়ার উপায় বসে বাতলে দিল। সামনেই ট্রাম স্টপ। আমাদের শহর থেকে ট্রাম উঠে গেলে কী হবে; ধোঁয়া ছাড়ার ব্যাপার নেই বলে ইউরোপের বহু শহরেই দেখেছি ট্রামের প্রতাপ অব্যাহত। তিনদিন প্রাগে ছিলাম, একবার ট্রলি বাসে উঠেছিলাম, বাকি সমস্ত সময়েই ট্রামে করে ঘুরেছি।

গুগল বলে দিয়েছিল ট্রাম আসার সময় হয়ে এসেছে, তাই শম্পা আর আমি মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে পা চালালাম ট্রাম স্টপের দিকে। যেতে না যেতেই ট্রাম হাজির। সিটে বসেও সামনের রড শক্ত করে ধরে রেখেছিলাম। কলকাতার অভিজ্ঞতা থেকে প্রাগের ট্রামে প্রথম দিনই হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিয়েছিলাম, ট্রামের বেগ যে এত হতে পারে তা ধারণাতেই ছিল না। লন্ডন, বার্লিন, রোম, মেলবোর্ন, বুদাপেস্ট, ত্রিয়েস্তে -- আমার অভিজ্ঞতাতে এসব শহরের কোনোটিতেই ট্রামকে এত জোরে যেতে দেখিনি। একটু পরেই ডিসপ্লে বোর্ড দেখে নেমে পড়লাম গন্তব্যস্থানে। ডানদিকে তাকাতেই দেখলাম একটা ছোট্ট ঘাসজমির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন দুই মহাকায়। আমরা দুজন ছাড়া আশপাশে জনপ্রাণী নেই। শম্পা আমার ছবি তুলে দিয়েছিল, তবে সূর্যের অবস্থানের জন্য ছবি খুব ভালো উঠল বলতে পারি না। মূর্তির তলাতে শুধু দুজনের নাম লেখা, হয়তো যাঁরা দেখতে আসবেন তাঁদের জন্য সেটুকুই যথেষ্ট মনে করেছেন শহরের কর্তারা। টাইকোর হাতে কোণ মাপার যন্ত্র কোয়াড্রান্ট, কেপলারের হাতে গোল করা গণিতের কাগজ।


 টাইকো ব্রাহে ও জোহানেস কেপলার

টাইকো ছিলেন পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের রাজকীয় জ্যোতির্বিদ। তারও আগে ডেনমার্কের রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডরিকের পৃষ্ঠপোষণাতে তিনি তৈরি করেছিলেন ইউরানিবর্গ মানমন্দির। কেপলার কিছুদিন ছিলেন টাইকোর সহকারী, দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ হয়েছিল প্রাগে। দুজনের সম্পর্ক কোনোদিনই খুব ভালো হয়নি। কেপলার ছিলেন কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বে বিশ্বাসী, টাইকো বিশ্বাস করতেন সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। কিন্তু দূরবিন আবিষ্কারের আগে আকাশে গ্রহনক্ষত্রদের গতিবিধি সম্পর্কে টাইকোর থেকে ভালো পর্যবেক্ষণ কেউ করেননি, টাইকো মারা যাওয়ার পরে কেপলার সেই সমস্ত তথ্য হাতে পান। হঠাৎই মৃত্যু হয়েছিল টাইকোর, মৃত্যুশয্যাতে তিনি কেপলারকে অনুরোধ করেছিলেন, 'দেখো আমার জীবন যেন বৃথা না যায়।’ কেপলার তাঁর কথা রেখেছিলেন। কেপলারের দৃষ্টিশক্তি ছিল খুব খারাপ, তাই পর্যবেক্ষণ তাঁর ক্ষমতার বাইরে ছিল। কিন্তু গণিতে সে যুগে তাঁর সমকক্ষ কেউ ছিল না। টাইকোর সংগৃহীত তথ্যের উপর ভিত্তি করে তিনি গ্রহদের গতিবিধি সংক্রান্ত তিনটি সুত্র দিয়েছিলেন যেগুলো আমরা সবাই স্কুলে পড়েছি। সেই সূত্রগুলি ব্যবহার করে নিউটন মাধ্যাকর্ষণের সূত্রেও পোঁছেছিলেন। সেটা ছিল সপ্তদশ শতাব্দী। কেপলার প্রাগে যে বাড়িতে থাকতেন, সেটা এখন এক মিউজিয়াম। কিন্তু এবারে সেখানে যাওয়ার সময় হল না।

টাইকো ও কেপলারকে ছেড়ে আবার ট্রাম, এবার লক্ষ্য প্রাগের প্রাচীনতম ব্রিজ। প্রাগের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে ভ্লাটভা নদী। প্রাচীন শহর তার পূর্ব পাশে, অন্যদিকে প্রাগ দূর্গ। দ্বাদশ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত এই দুই প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম ছিল একটিই ব্রিজ। ঠিক ধরেছেন, তার নাম চার্লস ব্রিজ। এখানে হাঁটতে ভালবাসতেন আইনস্টাইন। এখন অবশ্য আঠারোটি ব্রিজ নদীর উপর দিয়ে শহরকে আষ্টেপিষ্টে বেঁধেছে। এ ব্রিজ শুধুই পদাতিকদের জন্য, টুরিস্টদের অন্যতম দ্রষ্টব্য। ছবি তোলার বাধ্যতামূলক কর্তব্য সমাধা করে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম কাফে লুভর।

রাস্তার দুপাশে দুই কাফে, কাফে (বা চেক ভাষায় কাভার্না) লুভর ও কাভার্না স্লাভিয়ান। প্রথমটি ছিল জার্মান, দ্বিতীয়টি চেক বুদ্ধিজীবীদের মিলনস্থল, হয়তো আমাদের কলেজস্ট্রিটের ইন্ডিয়ান কফি হাউসের মতোই। আমাদের লক্ষ্য প্রথমটি, অর্থাৎ ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত কাফে লুভর। শতাব্দীপ্রাচীন কাফের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনে একসময় সরকারের রোষদৃষ্টিতেও পড়েছিল কাফে। ভেলভেট বিপ্লবের পরে আবার নতুন করে খুলেছে।

ঢুকেই একটা বোর্ড, সেখানে লেখা আছে কারা এক সময় এই কাফেতে আসতেন। সেই তালিকাতে আছেন নাট্যকার কারেল চাপেক। আমি নিজেকে সাহিত্যবোদ্ধা বলে দাবি করতে পারি না, চাপেকের একটির বেশি লেখা আমি পড়িনি। কিন্তু যে কোনো কল্পবিজ্ঞানপ্রেমীকেই পড়তে হয় চাপেকের নাটক আর ইউ আর (ইংরাজি অনুবাদে আর ইউ আর - রসাম'স ইউনিভার্সাল রোবটস)। যে কাহিনি মানুষকে একটা নতুন শব্দ দান করেছিল, রোবট।


 বিংশ শতাব্দীর শুরুতে কাফে লুভর

বোর্ডে চাপেকের আগেই তাঁর থেকে অনেক বেশি বিখ্যাত একটি নাম লেখা আছে, বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যিক ফ্রাঞ্জ কাফকা। কাফকার সঙ্গে আসতেন তাঁর বন্ধু ম্যাক্স ব্রড। কাফকার মৃত্যুর সময় ব্রডকে তাঁর সমস্ত সাহিত্য পুড়িয়ে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন, বন্ধু সে কথা শোনেননি। তাঁর সম্পাদনাতেই প্রকাশিত হয়েছিল কাফকার সাহিত্যকীর্তি। আধুনিক প্রাগে বিখ্যাততম নামটি হল ফ্রাঞ্জ কাফকা।



বর্তমানে কাফে লুভরের প্রবেশপথ



 
কাফে লুভরের বোর্ডে পাশাপাশি আইনস্টাইন ও কাফকা

আর আসতেন আইনস্টাইন। নিউটনের আড়াইশো বছর পরে তাঁর মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের সত্যতা নিয়ে প্রথম যিনি প্রশ্ন যিনি তুলেছিলেন। আব্রাহাম পাইসের মতে সঠিকভাবে বললে প্রাগেই প্রথম তিনি পথের দিশা পেয়েছিলেন। সেই নিয়ে খুব সামান্য কিছু কথা আমাদের লেখাতে আসবে, তার আগে বিংশ শতাব্দীর দুই বিখ্যাততম ইহুদি কাফকা ও আইনস্টাইনের সম্পর্কের কথা শেষ করে নিই। তাঁরা দুজনে যে শুধু কাফে লুভরেই যেতেন এমন নয়। আইনস্টাইনের সহকর্মী হুগো বার্গমান আইনস্টাইনকে ওল্ড টাউন স্কোয়ারে তাঁর শাশুড়ি বার্থা ফান্টার বৈঠকখানায় নিয়ে যেতেন, সেখানে ভিড় জমাতেন প্রাগের সেরা মস্তিষ্করা। বেহালা বাজাতে ভালোবাসতেন আইনস্টাইন, আরো তিনজন সহযোগীর সঙ্গে বৈঠকখানাতে প্রায়ই তাঁর দুই প্রিয় সঙ্গীতস্রষ্টা বাখ বা মোৎজার্টের সুরঝঙ্কার তুলতেন বেহালাতে। বৈঠকখানাতে যেতেন ম্যাক্স ব্রড, এবং ফ্রাঞ্জ কাফকা। ম্যাক্স ব্রডের লেখা কেপলারের জীবনীভিত্তিক উপন্যাসে আইন্সটাইনের ছায়া পড়েছে বলে অনেকে মনে করতেন, স্বয়ং ব্রড অবশ্য সে কথা উড়িয়ে দেন। অন্তত একবার আইনস্টাইন সেই বৈঠকখানাতে আপেক্ষিকতা নিয়ে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, কাফকা সেখানে কখনো কখনো অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি পাঠ করতেন। জানতে ইচ্ছা করে শ্রোতাদের কাছে কোনটি বেশি দুরূহ ঠেকেছিল।

পাইস তাঁর বইতে কাফকার নাম উল্লেখ করেন নি। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘আইনস্টাইন ইন বোহেমিয়া’ বইতে মাইকেল গর্ডিন অনুমান করেছেন যে অন্তত একবার দুজনের দেখা হয়েছিল। কিন্তু দুজনের কেউই সেই কথা মনে রাখেননি। তিরিশের দশকে কাফকার উপন্যাস পড়েছিলেন আইনস্টাইন, তাঁর ভালো লাগেনি। এক প্রেমিকাকে ১৯২০ সালের চিঠিতে আপেক্ষিকতার কথা লিখেছিলেন কাফকা। কিন্তু কেউই কখনো জানানি যে তাঁরা একে অপরকে চিনতেন।


 
ওল্ড টাউন স্কোয়ারের দেওয়ালে আইনস্টাইন

আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট ছিল শহরের পশ্চিম পাশে, আঠারোটা ব্রিজের মধ্যে একটার ধারে। সেখান থেকে আইনস্টাইনের বাসস্থান হেঁটে তিন মিনিট। মাঝে একটা ছোট্ট পার্ক। পরপর দুটো ব্রিজ আছে, তার কোনোটা দিয়েই হয়তো আইনস্টাইন রোজ হেঁটে নদী পেরোতেন, গন্তব্য ছিল হয়তো কাফে লুভর, হয়তো বা ইউনিভার্সিটি, বা হয়তো শহরের প্রাণকেন্দ্র ওল্ড সিটি স্কোয়ারে, যেখানে রয়েছে ইউরোপের প্রাচীনতম অ্যাস্ট্রোনমিকাল ক্লক। গুগল দেখাচ্ছিল যে বাড়িটি চব্বিশ ঘণ্টা খোলা। তাই ভোরবেলা পা চালালাম লেসনিকা ৭-এর দিকে। গিয়ে দেখলাম, আমার বুঝতে ভুল হয়েছিল, ওই ঠিকানাতে কোনো মিউজিয়াম নেই। লেসনিকা ৭ হল একটা অ্যাপার্টমেন্ট, সেখানে অনেক মানুষ বাস করেন। আইনস্টাইনের স্মৃতিতে বাড়ির সামনে দেওয়ালে তাঁর মাথার এক ভাস্কর্য রাখা আছে, এইটুকু স্মৃতি সে বহন করে। এই লেখার শুরুতেই সেই ছবি আছে।

আইনস্টাইন তাঁর পরিবার নিয়ে ১৯১১ সালের মার্চ মাসের শেষে বা এপ্রিল মাসের শুরুতে এই বাড়ির তিন বেডরুমের এক ফ্ল্যাটে এসে উঠেছিলেন। বাড়িটি তখন নতুন। আর বিশেষ আকর্ষণ ছিল ইলেকট্রিসিটি, যা সবে প্রাগে এসেছে। এখন প্রাগ, বিশেষ করে তার সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট ছবির মতন সাজানো। প্রতি বছর সত্তর লক্ষেরও বেশি পর্যটককে সে আকর্ষণ করে। আইনস্টাইনের সময়ে তা ছিল না। লেসনিকা তখন ছিল শিল্পাঞ্চল, ধোঁয়া ও ধুলোতে ঢাকা। সুইজারল্যান্ডের খোলামেলা পরিবেশ থেকে এসে মানিয়ে নিতে আইনস্টাইনের কোনো অসুবিধা হয় নি। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন প্রথমা স্ত্রী মিলেভা, দুই শিশু পুত্র হান্স আলবার্ট ও এডওয়ার্ড। আর ছিলেন এক গৃহ-পরিচারিকা। মিলেভার অবশ্য প্রাগের পরিবেশ পছন্দ হয়নি, সেই কারণেই প্রাগে আইনস্টাইনের বেশিদিন থাকা হয়নি। মিলেভার সঙ্গে আইনস্টাইনের সম্পর্ক তখন ক্রমান্বয়ে খারাপ হওয়ার পথে।

এহ্‌রেনফেস্ট ছাড়াও আর একজন তরুণ বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে খুঁজে বার করে তাঁর সঙ্গে কাজ করতে এসেছিলেন। তিনি আবার আইনস্টাইনের সঙ্গেই জুরিখ গিয়েছিলেন। তাঁর নাম অটো স্টার্ন। ১৯৪৩ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পাবেন। তাঁর দখলে এক রেকর্ড আছে, যা ভাঙা শক্ত। বিভিন্ন সময়ে তাঁর নামে মোট বিরাশিটি নোবেল মনোনয়ন জমা পড়েছিল, অন্য যে কোনো নোবেল পুরস্কারজয়ীর থেকে অনেক বেশি। কিন্তু জীবনের এই পর্বে আইনস্টাইন যা নিয়ে ভাবছিলেন, স্টার্নের কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

এই সময়েই তাঁর কাছে এসে পোঁছেছিল এক আমন্ত্রণপত্র। শিল্পপতি আর্ন্সট সলভের পৃষ্ঠপোষণাতে পৃথিবীর সেরা পদার্থবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদদের নিয়ে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে আয়োজিত হবে সলভে কনফারেন্স, সেখান আইনস্টাইনও আমন্ত্রিত। এর পর থেকে সলভে কনফারেন্স নিয়মিত অনুষ্ঠিত হত। আইনস্টাইন গিয়েছিলেন ব্রাসেলস, সেখানে অনেক প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীর সংগে তাঁর প্রথম আলাপ হয়েছিল। প্রথম সলভে কনফারেন্সে তাঁর থেকে বয়সে কম আমন্ত্রিত একজনই ছিলেন। প্রাগে থাকাকালীন আইনসস্টাইনের নাম প্রথমবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়, করেছিলেন উইলিয়াম ভীন।

ষোল মাস প্রাগে ছিলেন আইনস্টাইন। ১৯১২ সালের জুলাই মাসের ২৫ তারিখে তিনি জুরিখে ফিরে যান। প্রাগে থাকাকালীন এগারটি গবেষণাপত্র লিখেছিলেন আইনস্টাইন, যে কোনো বিচারেই যা বিস্ময়কর। কিন্তু যে বিষয়টি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, তা হল এই সময়েই তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা নিয়ে সঠিক পথে চিন্তাভাবনা শুরু করেছিলেন। সাধারণ আপেক্ষিকতা হল মাধ্যাকর্ষণের তত্ত্ব, নিউটনের পরে এই বিষয়ে প্রথম ও এখনো পর্যন্ত একমাত্র প্রতিষ্ঠিত পদক্ষেপ। এই পর্বে তিনি সূর্যের পাশ দিয়ে আসার সময় নক্ষত্রের আলো কতখানি বাঁকবে তা হিসাব করেছিলেন। ১৯১৯ সালে এই পরিমাপই তাঁকে বিশ্বখ্যাতি এনে দেবে। কিন্তু প্রাগের হিসাবে ভুল ছিল, সেই সময় তিনি স্থানকালের বক্রতাকে হিসাবে ধরেননি, ফলে উত্তর এসেছিল সঠিক পরিমাণের অর্ধেক। এই সময়েই আইনস্টাইন আরো দেখিয়েছিলেন যে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যাব। নীল আলোর এর ফলে লাল দেখাবে বলে একে অভিকর্ষজ লোহিতাপসরণ বলা হয়। অবশ্য তার প্রমাণ পেতে সময় লেগেছিল আরো তেতাল্লিশ বছর। প্রাগ পর্বেই আইনস্টাইন বুঝতে পেরেছিলেন যে মাধ্যাকর্ষণ তিনি যা অনুমান করছেন, তার থেকে অনেক বেশী জটিল। কিন্তু প্রাগে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করার মতো কোনো বিজ্ঞানী ছিলেন না। জুরিখে ফিরে তিনি পাবেন পুরানো বন্ধু গণিতবিদ মার্সেল গ্রসম্যানকে, যাঁর গণিতের জ্ঞান তাঁকে সাহায্য করেছিল। পরের চার বছর তিনি সেই গবেষণাতেই ব্যয় করবেন। ১৯১৬ সালে তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বের পূর্ণ রূপ দেবেন।

আমাদেরও প্রাগ ছাড়ার সময় হল। প্রাগ থেকে আইনস্টাইন গিয়েছিলেন উত্তরে, আমাদের গন্তব্য দক্ষিণে হাঙ্গারির রাজধানী বুদাপেস্ট। বার্লিনে সত্যেন্দ্রনাথ বসু আইনস্টাইনের সঙ্গে যে বাড়িতে দেখা করতেন, তার খোঁজ করতে গিয়ে হতাশ হয়েছিলাম। সেই বাড়ির আর অস্তিত্ব নেই। যেমন অস্তিত্ব নেই তাঁর অপর ফ্ল্যাটের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা আইনস্টাইনের বাড়িকে রেয়াত করেনি। প্রাগে অন্তত তাঁর বাসস্থানটি আছে, যদিও তার ভিতরে আইনসস্টাইনের কোনো চিহ্ন আর নেই। অবশ্য বার্লিনের কাছে পটসডামে আইনস্টাইনের গ্রীষ্মাবকাশের বাড়িটি এখন মিউজিয়াম, সেটি দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সুযোগ পেলে পরে সে কথা বলা যাবে। আইনস্টাইন নিজে প্রাগের স্মৃতিকে কেমনভাবে দেখতেন? আপেক্ষিকতা বিষয়ক আঁর বইটি চেক ভাষাতে অনুবাদ হয়েছিল, ভূমিকাতে আইনস্টাইন লিখেছিলেন, (ইংরাজি অনুবাদে) “I’m pleased that this little book in which the main thoughts of the theory of relativity are portrayed is now published in the national language of the country in which I found the necessary composure to give the basic thought of the general theory of relativity (1908) step by step a more definite shape so it could be realized. In the quiet rooms of the Theoretical Physical Institute of the Prague German University in the Vinicna ulice I discovered in 1911 that the equivalence principle demands a refraction of the rays of light at the sun of a sum that can be observed ... Also the still not really confirmed consequence of the red shift of the spectral lines I discovered in Prague.”

প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, ২০২৪


Sunday, 13 October 2024

কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা ও রসায়নবিদ এলিস বল

 

কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা ও রসায়নবিদ এলিস বল

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়




আজ তোমাদের এমন একজনের গল্প শোনাব, যিনি মারা গিয়েছিলেন মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে। তার অল্পদিন আগে তিনি কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসাতে এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অকালমৃত্যুর পরে অন্যরা তাঁর কাজকে নিজেদের বলে প্রকাশ করেন। কিন্তু সত্য চিরকাল চাপা থাকে না, তাই মৃত্যুর আশি বছরের বেশি পরে হলেও শেষ পর্যন্ত সঠিক মানুষই স্বীকৃতি পেয়েছেন।

যাঁর গল্প বলছি, তাঁর নাম এলিস অগুস্টা বল। এলিস ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ, তাঁর বাবা জেমস প্রেসলি বল ছিলেন উকিল, সম্পাদক এবং আলোকচিত্রগ্রাহক বা ফটোগ্রাফার। মা লরাও আলোকচিত্রীর কাজ করতেন। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে এলিস ছিলেন তৃতীয়, বড় দুই দাদার নাম উইলিয়াম ও রবার্ট, ছোট বোন অ্যাডি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন প্রদেশের সব থেকে বড় শহর সিয়াটলে ১৮৯২ সালের ২৪ জুলাই এলিসের জন্ম হয়েছিল।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১২ সালে ফার্মাসিউটিকাল কেমিস্ট্রি বা ভেষজ রসায়ন নিয়ে স্নাতক হলেন এলিস। তার দু' বছর পরে হলেন ফার্মাসি বা ভেষজবিদ্যাতে স্নাতক। এই সময় জার্নাল অফ দি আমেরিকান কেমিক্যাল সোসাইটিতে তিনি ও তাঁর শিক্ষক দশ পাতার এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেই সময় কোনো মহিলার পক্ষে গবেষণাপত্র ছাপানোই ছিল বিরল ঘটনা, এক কৃষ্ণাঙ্গ মহিলার জন্য তা ছিল আরো অসাধারণ।

স্নাতক হওয়ার পরে মাস্টার্স করবেন ঠিক করলেন এলিস। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই তাঁকে ছাত্রী হিসাবে পেতে চেয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তিনি হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের হনলুলুতে কলেজ অফ হাওয়াই-এ ভর্তি হলেন। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ হল প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রদেশ। ছোটবেলাতে তাঁর পরিবার এক বছর হাওয়াইতে কাটিয়েছিলেন, সেই স্মৃতি থেকেই তিনি সেই কলেজকে বেছে নিয়েছিলেন। সেই কলেজ এখন হয়েছে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে মাস্টার্স করার সময় কাভা নামের একটি ভেষজ উদ্ভিদের শিকড়ে কী কী রাসায়নিক দ্রব্য থাকে তা গবেষণা করে আবিষ্কার করেন। কাভা মাথা যন্ত্রণা, উৎকণ্ঠা, বৃক্কের রোগ ইত্যাদির চিকিৎসাতে ব্যবহার হয়। এলিস হলেন হাওয়াই কলেজের প্রথম নারী ও প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মাস্টার্স। এর পরে তিনি সেখানেই পড়ানো শুরু করেন, এক্ষেত্রেও কৃষ্ণাঙ্গ ও নারী দুই ক্ষেত্রেই তিনি প্রথম।

কাভা বিষয়ে তাঁর চুয়াল্লিশ পাতার থিসিসটি হাওয়াই কুষ্ঠ চিকিৎসাকেন্দ্রের ডাক্তার হ্যারি হলমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি এলিসের কাছে এক বিশেষ সমস্যার সমাধানের জন্য এলেন। সে কথায় যাওয়ার আগে সেই সময় কুষ্ঠ রোগীদের অবস্থা সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। কুষ্ঠ রোগের বিশেষ কোনো চিকিৎসা ছিল না। ভীষণ সংক্রামক হওয়াতে সুপ্রাচীন কাল থেকেই কুষ্ঠ রোগীকে জনবসতি থেকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হত। তোমরা যদি বেন হুর সিনেমাটা দেখ তাহলে যীশু খ্রিস্টের সময় কুষ্ঠরোগীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হত জানতে পারবে। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে আগে এই রোগ ছিল না, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকদের মাধ্যমে সেই রোগ সেখানে যায়। ১৮৬৬ সাল থেকে হাওয়াইয়ের আদি অধিবাসীদের কুষ্ঠ হলে তাদের জোর করে এক দুর্গম উপদ্বীপ কালাউপাপাতে পাঠিয়ে দেওয়া হত, সেখানে শুধু কুষ্ঠরোগীরাই থাকত, কোনো কোনো সময় রোগীর আত্মীয়রাও তাদের সঙ্গে যেত। নৌকা ছাড়া কালাউপাপাতে যাওয়ার বিশেষ উপায় ছিল না, মৃত্যু পর্যন্ত সেখানেই থাকতে হত। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক জ্যাক লন্ডন কালাউপাপা সম্পর্কে বলেছিলেন নরকের গহ্বর, পৃথিবীর সব থেকে অভিশপ্ত স্থান। ১৮৯০ সালে প্রায় ১১০০ মানুষ সেই উপদ্বীপে থাকতেন। শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে অবশ্য অন্য ব্যবস্থা, তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারত।

সেই যুগে কুষ্ঠ রোগের প্রধান ওষুধ ছিল চালমুগরার তেল। চিন বা ভারতে দীর্ঘদিন ধরে এই তেল চামড়ার রোগের চিকিৎসাতে ব্যবহার হত। ১৮৫৪ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক ফ্রেডরিক মোয়াট কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসার জন্য চালমুগরার কথা প্রথম পশ্চিমী ডাক্তারদের সামনে আনেন। মোয়াট তিরিশ বছর ভারতে ছিলেন, তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পড়িয়েছিলেন। ১৮৫৩ সালে তিনি কলকাতাতে এক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব ব্রিটিশ সরকারের কাছে পাঠান, যদিও সরকার সেই মুহূর্তে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

চালমুগরার তেল ব্যবহার করা ছিল প্রচণ্ড কঠিন। তা এতই বিস্বাদ ছিল যে খেলে বমি হয়ে যেত। প্রচণ্ড আঠালো বলে তা বাইরে থেকে লাগানো যেত না কারণ চামড়া তা শোষণ করে না। চালমুগরার তেল জলে দ্রাব্য নয়, ফলে ইঞ্জেকশন আকারে দিলে তা চামড়ার নিচে ফোস্কার মতো হয়ে থেকে যেত, ছড়িয়ে পড়ত না। হলমান এলিসকে এই সমস্যার সমাধানের অনুরোধ করেন।

এলিস দেখেন যে চালমুগরার তেলে আছে চালমুগরিক অ্যাসিড এবং হাইডনোকার্পিক অ্যাসিড। এবার তিনি তার থেকে জীবাণুনাশী ফ্যাটি অ্যাসিডগুলো আলাদা করে তাদের এস্টার তৈরি করেন। এস্টারগুলো জলে দ্রাব্য, ফলে ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরে তা রক্তস্রোতের মাধ্যমে শরীরের অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দেখা গেল এস্টারে রূপান্তরের পরেও তাদের জীবাণুনাশী ক্ষমতার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

কিন্তু এই বিষয়টা প্রকাশের আগেই ১৯১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর এলিসের মৃত্যু হয়।অসুস্থতার জন্য কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে তিনি সিয়াটল ফিরে এসেছিলেন। কোন অসুখ তাঁর হয়েছিল তা নিয়ে সন্দেহ আছে। হাওয়াইয়ের এক খবরের কাগজে লেখা হয়েছিল যে গ্যাসমুখোশের কার্যকারিতা দেখানোর সময় তিনি দুর্ঘটনাবশত বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাসের কবলে পড়েন। সেই সময় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল যেখানে অস্ত্র হিসেবে গ্যাস ব্যবহার করা হচ্ছিল, তাই গ্যাসমুখোশ কেমনভাবে ব্যবহার করা হয় সরকার থেকে সাধারণ মানুষকে তা শেখানো হচ্ছিল। হাওয়াই কলেজ অবশ্য দুর্ঘটনার কথা অস্বীকার করে। তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটে মৃত্যুর কারণ হিসাবে যক্ষার কথা বলা হয়েছে।

এলিসকে চালমুগরার তেল বিষয়ে গবেষণাতে সাহায্য করছিলেন তাঁর কলেজের রসায়নের অধ্যাপক আর্থার ডিন। এলিসের মৃত্যুর পরে তিনি আর এক রসায়নের অধ্যাপক রিচার্ড রেনশ্যালের সঙ্গে চালমুগরার তেলকে ব্যবহার করার এই কায়দাকে ডিন পদ্ধতি নাম দিয়ে প্রকাশ করেন; সেখানে এলিস বলের কোনো উল্লেখই ছিল না। ডিন তার আগে বা পরে কখনোই ওষুধ নিয়ে কোনো কাজ করেননি।

এই নতুন পদ্ধতি খুবই ভালো কাজ করছিল। ১৯২০ সালে এক ডাক্তার রিপোর্ট করেন যে হাওয়াইতেই ৭৮ জন রোগীকে এই ভাবে ইঞ্জেকশন দিয়ে সুস্থ করা সম্ভব হয়েছে। ১৯১৯ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে নতুন কোনো রুগীকে কালাউপাপাতে পাঠানো হয়নি। বস্তুত অ্যান্টিবায়োটিকের আগে পর্যন্ত এটি ছিল কুষ্ঠ রোগ চিকিৎসার প্রধান পদ্ধতি, অবশ্য সব সময় তাতে সাফল্য আসত না। কুষ্ঠ হয় যে জীবাণুর জন্য তার নাম মাইকোব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি; সালফোন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের পরে তার বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব হয়। আর্থার ডিন পরে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, তাঁর নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নাম রাখা হয়।

এলিস নিজের কথা বলার জন্য পৃথিবীতে ছিলেন না, কিন্তু ছিলেন হলমান। তিনি ১৯২২ সালে এক গবেষণাপত্রে সরাসরি বল পদ্ধতির কথা বলেন, এবং লেখেন ডিন পদ্ধতির সঙ্গে বল পদ্ধতির মূলগত কোনো তফাত নেই। তা সত্ত্বেও এলিস বলের কথা প্রায় সবাই ভুলে গিয়েছিল। এলিসের মৃত্যুর অনেক দশক পরে স্ট্যানলি আলি ও হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্যাথরিন টাকারা প্রায় কুড়ি বছর পরিশ্রম করে পুরানো কাগজপত্র খুঁজে প্রমাণ করেন যে এলিস বলই চালমুগরার তেলকে ব্যবহারের উপযোগী করেছিলেন।

২০০০ সালে হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র চালমুগরা গাছের সামনে এলিসের স্মৃতিতে একটি ফলক বসিয়েছেন। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে ২৯ ফেব্রুয়ারিকে এলিস বল দিন হিসাবে পালন করা শুরু হয়, ২০২২ থেকে সেটি পালটে ২৮ ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে। লন্ডন স্কুল অফ ট্রপিকাল মেডিসিন এন্ড হাইজিনের মূল ভবনের দেওয়ালে তাঁর নাম খোদাই করে রাখা হয়েছে। হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা দাবি তুলেছে ডিন হলের নাম পরিবর্তন করে এলিস বল হল রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞরা একমত যে এলিস বল সেই যুগে যা করেছেন, অসাধারণ প্রতিভা না থাকলে তা সম্ভব নয়। কোনো সন্দেহ নেই যে সে যুগে একজন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর পক্ষে এই সাফল্য অর্জন ছিল আরো কঠিন কাজ। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে প্রয়াত হলেও তাঁর গবেষণা হাজার হাজার মানুষকে নরকযন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করেছে। 

প্রকাশ: সায়ন্তনী ২০২৪ পুজো সংখ্যা