Tuesday, 11 July 2017

সিলভান

        ্কল্পবিজ্ঞানের এই গল্পদুটো ম্যাজিক ল্যাম্প ওয়েব ম্যাগাজিনে বেরিয়েছিল, এই ব্লগে তাদের লিঙ্কদুটো তুলে দিলাম। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। প্রথমটা, অর্থাৎ জেনেটিক কোড জমা দেওয়ার পরে ম্যাজিক ল্যাম্পের কর্তৃপক্ষ বলেছিলেন গল্পটা অসমাপ্ত। আমার কিন্তু তা মনে হয়নি, ওঁরা আমার কথা মেনে গল্পটা নিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরে ওঁদের যুক্তি আবার ভেবে দেখলাম --  মনে হল ঠিকই বলেছেন -- ছোটোদের গল্প হিসাবে জেনেটিক কোড অসমাপ্তই। তাই কাহিনিটাকে শেষ করার চেষ্টা করেছিলাম। ম্যাজিক ল্যাম্পকে ধন্যবাদ, তাঁরা পরের এই অপারেশন ফ্রিডম গল্পটাও নিয়েছিলেন এবং বিশেষ রূপকথা সংখ্যাতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। বিশেষ করে বলতেই হবে অদৃজা ঘোষ ও শ্রীময় দাশের অলঙ্করণের কথা -- গল্পদুটো কারো ভালো লাগলে তার পিছনে ছবিগুলোরও ভূমিকাও কম নয়। 

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়



Sunday, 9 July 2017

পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি



পরমাণু থেকে কৃষ্ণশক্তি

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

There are more things in heaven and earth, Horatio,
Than are dreamt of in your philosophy.:
William Shakespeare in Hamlet

       বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড নিয়ে আলোচনার সময় আমরা দুটো অপেক্ষাকৃত নতুন কথা আজকাল প্রায়ই শুনতে পাই, কৃষ্ণ পদার্থ (dark matter) ও কৃষ্ণ শক্তি (dark energy)। বিজ্ঞানীরা এখনো এদের সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানেন না বললেই চলে। মহাবিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে গেলে কেন এই কৃষ্ণ বস্তু ও কৃষ্ণ শক্তির আমাদের দরকার, কেমন করে আমরা এদের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্ৰায় নিশ্চিত হলাম – তা নিয়ে আজ আমরা এই প্ৰবন্ধে আলোচনা করব। তবে তার আগে সাধারণ বস্তু বলতে আমরা কী বুঝি, তাদের গঠনই বা কী রকম তা জানা থাকলে তাদের সঙ্গে এই কৃষ্ণ পদাৰ্থ বা শক্তির প্রভেদ কোথায় তা বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে। তাই সাধারণ বস্তুর গঠন নিয়ে প্রথমেই একটু আলোচনা করে নেওয়া ভালো। সে জন্য আমাদের খুব সংক্ষেপে হলেও পদার্থবিজ্ঞানের অগ্ৰগতি সম্পর্কে জানতে হবে।
       আমাদের চারদিকে তাকিয়ে দেখলে আমরা হাজার হাজার রকমের পদার্থ দেখতে পাই।। জল, বাতাস, পাথর বা জীবের দেহ, প্রত্যেকের গঠন একেবারে আলাদা। কিন্তু প্রাচীন কাল থেকেই এক অংশের মানুষের বিশ্বাস ছিল এই নানা ধরনের পদার্থ, সবই কয়েকটা মাত্র মূল উপাদান দিয়ে তৈরি। গ্রিক দার্শনিক থালেসকে প্রথম আধুনিক বিজ্ঞানী বলে অনেকে মনে করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত কিছুর মূলে আছে জল। প্রাচীন ভারতীয়রা মনে করতেন যে পঞ্চভূত, অর্থাৎ ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ এবং ব্যোম, এই পাঁচটা মৌলিক পদার্থ দিয়েই সমস্ত বস্তুর সৃষ্টি।
       পরমাণুবাদের জন্ম হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। প্রাচীন গ্রিসে ডেমোক্রিটাস বলেছিলেন যে কোনো বস্তুকে যদি ভাগ করতে থাকি, তাহলে একসময় এমন এক কণা পাওয়া যাবে, যাকে আর টুকরো করা যাবে না। সেই অবিভাজ্য কণা হল পরমাণু। প্রাচীন ভারতে বৈশেষিক দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা কণাদও একই কথা বলেছিলেন। ভারতবর্ষে কণাদের পরবর্তীকালে বৌদ্ধ দার্শনিকরাও পরমাণুবাদের সমর্থনে আলোচনা করেছিলেন।
       পরমাণুবাদের মূল কথাই হল বস্তু, তাই পরমাণুবাদ প্রথম থেকেই ছিল বস্তুবাদের প্রতিভূ। বস্তুবাদের সবচেয়ে বড়ো বিরোধী হল ভাববাদ। ভাববাদীর কাছে চিন্তার স্থানই সর্বোচ্চ– জগৎ তাঁর মতে মন বা চৈতন্যের সৃষ্টি। পরমাণুবাদকে তাই ভাববাদী দর্শনের তীব্র আক্রমণের সম্মুখীন হতে হয়। গ্রিসে অ্যারিস্টটল ও প্লেটো পরমাণুবাদের সমর্থনে লেখা সমস্ত বই পুড়িয়ে দেওয়ার বিধান দিয়েছিলেন। ভারতে শঙ্করাচার্য পরমাণুবাদের উপর আক্রমণের নেতৃত্ব দেন। পরমাণুবাদকে সারা পৃথিবীতেই সাময়িকভাবে পিছু হটতে হয়। মধ্যযুগে আরব বিজ্ঞানীরা পরমাণুবাদের ক্ষীণ ধারাকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সময় তা আবার ইউরোপে প্রভাব বিস্তার করে।
       আধুনিক পরমাণুবাদের জন্ম হয়েছিলো এক ব্রিটিশ রসায়নবিদ জন ডালটনের হাত ধরে। রাসায়নিক বিক্রিয়াতে বিভিন্ন পদার্থ সুনির্দিষ্ট অনুপাতে অংশ নেয়, সেই তথ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বললেন যে সমস্ত পদার্থই অতি ক্ষুদ্র অবিভাজ্য পরমাণু দিয়ে গঠিত। কোনো একটা মৌলের সমস্ত পরমাণুই একরকম, তাদের ভরও এক। রাসায়নিক বিক্রিয়াতে এই পরমাণুরাই অংশ নেয় ও নানান যৌগিক পদাৰ্থ তৈরি করে। রাশিয়ায় বিজ্ঞানী মেন্ডেলিয়েভ পরমাণুর ধারণা থেকেই মৌলিক পদার্থদের পর্যায় সারণী (periodic table) তৈরি করেন। এই সারণীতে বিভিন্ন মৌলিক পদার্থকে তাদের রাসায়নিক ধর্ম অনুসারে সাজানো হয়েছিলো। পৃথিবীতে মোটামুটি 92 রকমের মৌল পাওয়া যায়, তাদের পরমাণু নানা ভাবে যুক্ত হয়ে অন্যান্য সমস্ত পদার্থের অণুকে তৈরি করে। গবেষণাগারে তৈরি পরমাণুদের ধরলে মোট মৌলের সংখ্যা এখন 118।
       ঊনবিংশ শতকের প্রায় শেষ পর্যন্ত আমাদের ধারণা ছিল যে পরমাণু অবিভাজ্য। 1896 সালে ইংল্যান্ডে জে জে টমসন দেখান যে পরমাণু ভেঙে অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভরসম্পন্ন ঋণাত্মক আধানের (charge) এক কণা পাওয়া যায়। তার নাম দেওয়া হল ইলেকট্রন। টমসন মনে করতেন পরমাণু হল ধনাত্মক আধান সম্পন্ন এক গোলক যার মধ্যে ইলেকট্রনগুলো আটকানো আছে।
       একটা কথা মনে রাখা দরকার। সমস্ত পদার্থ অণু পরমাণু দিয়ে তৈরি, একথা ধরে নিলে পদার্থের রাসায়নিক ধর্ম ব্যাখ্যা করতে সুবিধা হয় বটে, কিন্তু অধিকাংশ বিজ্ঞানী বিংশ শতকের শুরুতে যে পরমাণুর অস্তিত্বে বিশ্বাস করতেন তা নয়। টমসনকেও তাঁদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিলো। তবে ক্রমশ পরমাণুর সপক্ষে আরও অনেক সাক্ষ্য এবং যুক্তি পাওয়া গেলো।
       বিংশ শতকের প্রথম তিন দশক পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ এক অভূতপূর্ব বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যায়। সুইজারল্যান্ডের পেটেন্ট অফিসের এক ক্লার্ক 1905 সালে বিশ্বব্ৰহ্মান্ড সম্পর্কে আমাদের সমস্ত চিন্তাভাবনাকে পাল্টে দেন। তাঁর নাম আলবার্ট আইনস্টাইন, আর তাঁর সেই তত্ত্বের নাম বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ। তিনি দেখান যে স্থান আর কাল বা সময়কে আলাদা ভাবে আর বিচার করা যাবে না। এভাবেই আমরা চতুর্মাত্রিক বিশ্বের কথা জানতে পারি। দশ বছর পরে তিনি সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। আইজ্যাক নিউটনের পরে মাধ্যাকর্ষণের ক্ষেত্রে এ হল প্ৰথম মৌলিক অগ্রগতি
       এই তত্ত্ব থেকেই কৃষ্ণ গহ্বর (black hole) ও প্রসারণশীল বিশ্বের ধারণা বিজ্ঞানে প্রবেশ করে। একই সময় আইনস্টাইন পরমাণুর অস্তিত্বের পক্ষে এক প্রমাণ পেশ করেন। কী ছিল এই প্ৰমাণ? তরল বা গ্যাসের মধ্যে খুব ছোটো কোনো কণা থাকলে দেখা যায় সে ইতস্তত ছুটে বেড়ায়। প্রথম যে বিজ্ঞানী এই পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট করেছিলেন, সেই রবার্ট ব্রাউনের নামে এই গতির নাম ব্ৰাউনীয় গতি। আমরা সবাই দেখেছি অন্ধকার ঘরে জানলা দিয়ে রোদ পড়লে ধুলোর কণা কেমন ছুটে বেড়ায় – এ হল ব্ৰাউনীয় গতির এক উদাহরণ। আইনস্টাইন দেখান যে তরলের বা গ্যাসের অদৃশ্য অণু-পরমাণুরা ঐ ছোটো কণাকে চারদিক থেকে ধাক্কা মারছে, এটা ধরে নিলে ব্ৰাউনীয় গতির চমৎকার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এর পর আর অণু পরমাণুর অস্তিত্ব সম্পর্কে কারো কোনো সন্দেহ থাকল না। আলোকের কোয়ান্টাম তত্ত্বও তিনি এই বছরই আবিষ্কার করেন। কোয়ান্টাম তত্ত্বের কথায় আমরা পরে আসবো।
       ইতিমধ্যে নিউজিল্যান্ড থেকে এক বিজ্ঞানী, আর্নেস্ট রাদারফোর্ড, ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে গবেষণা করতে এসেছেন। 1911 সালে তিনি দেখালেন যে পরমাণুর প্রায় পুরোটাই শূন্যস্থান। কেন্দ্ৰে আছে নিউক্লিয়াস যার ভর পরমাণুর প্রায় পুরো ভরের সমান। পরমাণু কত বড়ো? মোটামুটি বলা যায় যে পরমাণুর ব্যাস হল এক সেন্টিমিটারের দশ কোটি ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ 10-10 মিটার। নিউক্লিয়াসের ব্যাস হল তারও দশ হাজার ভাগের এক ভাগ। করতে পারি, তাহলে নিউক্লিয়াসের আয়তন হবে তার কেন্দ্রে একটা মাছির মতো। গ্রহরা যেমন সূর্যের চারপাশে ঘোরে, রাদারফোর্ডের মডেলে ইলেকট্রনরা তেমনি নিউক্লিয়াসকে প্ৰদক্ষিণ করে। কী দিয়ে তৈরি নিউক্লিয়াস? নিউক্লিয়াসে আছে দু ধরনের কণা, প্রোটন ও নিউট্রন। প্রোটনদের আধান ধনাত্মক, নিউট্রনরা আধানহীন।

       দেখা গেলো পরমাণুর ধর্ম ভারি অদ্ভুত। ডেনমার্কের বিজ্ঞানী নিলস বোর দেখান যে ইলেকট্রনরা নিউক্লিয়াসের চারপাশে যে কোনো কক্ষপথে থাকতে পারে না, কেবল কয়েকটা নির্দিষ্ট কক্ষপথেই তারা নিউক্লিয়াসকে প্ৰদক্ষিণ করতে সক্ষম।প্ৰথম চিত্রে নাইট্রোজেন পরমাণুর রাদারফোর্ড-বোর মডেল দেখানো হয়েছে। নানা পরীক্ষার মাধ্যমে জানা গেলো জানা গেলো একই ইলেকট্রন একই সময়ে এক সঙ্গে দুই আলাদা পথে যেতে পারে। পরমাণুর এই সমস্ত অদ্ভুত আচরণের ব্যাখ্যা করার জন্য প্রয়োজন হল চিরাচরিত নিউটনিয় বলবিদ্যার বাইরে নতুন বিজ্ঞান।
       দুই জার্মান বিজ্ঞানী, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ও এরউইন শ্রয়ডিঙ্গার পৃথকভাবে গবেষণা করে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার (quantum mechanics) জন্ম দেন। জার্মানিতে উলফগ্যাঙ পাউলি ও ইংল্যান্ডে পল ডিরাক এই নতুন বিজ্ঞানকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। হাইজেনবার্গ দেখান যে আমরা কোনো কণার অবস্থান সম্পর্কে যত নিশ্চিত হতে চাইব, তার ভরবেগ সম্পর্কে আমরা তত কম নিশ্চিত হতে পারব। এরই নাম হাইজেনবার্গের অনিশ্চয়তা তত্ত্ব। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে যত ক্ষুদ্র কণা (বা কম দূরত্ব)। আমরা দেখতে চাইব, তত বেশি শক্তির প্রয়োজন হবে। তাই পদার্থের ক্ষুদ্রতম কণা দেখতে এখনো পর্যন্ত বৃহত্তম কণা ত্বরক (particle accelerator) লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার বা এল এইচ সি-র প্রয়োজন।
       ততদিনে বোঝা গেছে যে আমাদের চতুর্দিকে যত রকমের বল দেখতে পাই, তারা চার ধরনের মূল বলের রকমফের মাত্র। দুই ভরের মধ্যে আকর্ষণের জন্য দায়ী বলের নাম মাধ্যাকর্ষণ। গ্ৰহ নক্ষত্র বা ছায়াপথ (galaxy)–এদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে এই বল। মাধ্যাকর্ষণ বল বাকিদের থেকে অনেক কম শক্তিশালী।সবল বল প্রোটন নিউট্রনের মধ্যে কাজ করে এবং নিউক্লিয়াস গঠনে মূল ভূমিকা নেয়। দুর্বল বল বিশেষ ধরনের তেজস্ক্রিয়ার জন্য দায়ী। আধানদের মধ্যে তড়িৎচৌম্বক বল ক্রিয়া করে। আমাদের চারদিকে যত রকমের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই, তার প্রায় সবগুলোই তড়িৎচৌম্বক বলের মাধ্যমে ঘটে।
       প্রোটন নিউট্রনই কি শেষ কথা? নাকি তারাও আরও ছোটো কোনো মৌলিক কণা দিয়ে তৈরি? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বড়ো বড়ো কণা ত্বরক তৈরি হল।তাদের সবার উদ্দেশ্য ছিল নিউক্লিয়াসের ভিতরে অনুসন্ধান। উচ্চ শক্তির এই সমস্ত যন্ত্রে তৈরি হল আরও অনেক নতুন নতুন কণা। এরা সবাই কি মৌলিক? বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস হল না। 1968 সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ডে অতি উচ্চ শক্তির ইলেকট্রন প্রোটন কণার অভ্যন্তরে প্রবেশ করানো হল। দেখা গেলো প্রোটনের ভিতরে শক্ত তিনটে কণা আছে। মার্কিন বিজ্ঞানী মারে গেলম্যান আগেই বলেছিলেন যে প্রোটন নিউট্রনের অভ্যন্তরে উকি মারলে তিনটে নতুন কণা পাওয়া যাবে। গেলম্যান তাদের নাম দিয়েছিলেন কোয়ার্ক।
       প্রথমে তিনি তিন ধরনের কোয়ার্কের কথা বলেছিলেন। শীগগিরই কোয়ার্ক কণার সংখ্যা বেড়ে হল ছয়। তাদের নামগুলো ভারি মজার – আপ, ডাউন, চাম, স্ট্রেঞ্জ, টপ ও বটম। প্রায় সমস্ত নতুন কণাদের ভিতরে আছে কোয়ার্ক— এদের পোশাকি নাম হল হ্যাড্রন (hadron)। যেমন প্রোটন বা নিউট্রনের মধ্যে আছে তিনটে করে কোয়ার্ক। প্রোটন নিউট্রন ছাড়া বাকি সমস্ত হ্যাড্রনই খুবই ক্ষণস্থায়ী। হ্যাড্রনরা আগে যে চারটে বলের কথা বলেছি, তাদের সকলের দ্বারা প্রভাবিত হয়।
       ইলেকট্রন কি একা? না, তারও এক পরিবার আছে যার নাম লেপ্টন পরিবার। এরও সদস্য সংখ্যা ছয়। এর মধ্যে তিনটে অপেক্ষাকৃত ভারি ঋণাত্মক আধানের কণা, ইলেকট্রন, মিউয়ন ও টাউয়ন। আর এদের প্রত্যেকের সঙ্গে আছে একটা করে খুব হালকা কণা, যাদের সাধারণ নাম নিউট্রিনো। সাধারণভাবে লেপ্টনরা সবল ছাড়া বাকি তিন রকম বল দ্বারা প্রভাবিত হয় – অবশ্য নিউট্রিনোরা তড়িৎ নিরপেক্ষ বলে তড়িৎচৌম্বক বল তাদের উপর সরাসরি কাজ করে না।
       প্ৰথম সারণীতে কোয়ার্ক ও লেপ্টনের তালিকা দেওয়া হল। পাকিস্তানি বিজ্ঞানী আবদুস সালাম এবং দুই মার্কিন বিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়াইনবার্গ ও শেলডন গ্ল্যাশো দুর্বল ও তড়িৎচৌম্বক – এই দুই বলকে একই কাঠামোর মধ্যে বেঁধে দেন। তাঁদের তত্ত্ব ঠিক হলে আরও দু ধরনের নতুন মৌলিক কণা পাওয়া যাওয়া উচিত, W ও Z বোসন কণা।1984 সালের মধ্যে ইউরোপের সার্ন (CERN) গবেষণাগারে তাদের খুঁজে পাওয়া গেলো। এই W ও Z, এরা হল দুর্বল বলের কোয়ান্টাম। দ্বিতীয় সারণীতে চার রকম বলের কোয়ান্টামের অর্থাৎ বল কণার নাম দেওয়া আছে।

       হিগস বোসনের কথা না বললে এই লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব (Quantum field theory) ক্ষুদ্রতম কণাদের ধর্ম ব্যাখ্যা করার ব্যাপারে সবচেয়ে কার্যকরী তত্ত্ব হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্বকে ভরযুক্ত কণাদের বিষয়ে প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যা আছে, তার কাজ করার কথা একমাত্র ভরশূন্য কণাদের উপর। অথচ প্রথম সারণীতে যত বস্তু কণার নাম দেওয়া আছে, তাদের কেউই ভর শূন্য নয়। তাই বিজ্ঞানীরা অনুমান করলেন যে বস্তুকণারা আসলে ভরশূন্য, কিন্তু বিশ্বব্যাপী এক ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়ার মাধ্যমে তারা ভরা পায়। এই ক্ষেত্রই হল হিগস ক্ষেত্র। হিগস বোসন, এল এইচ সিতে যার আবিষ্কার সারা পৃথিবীতে সাড়া ফেলেছে, তা হল এই হিগস ক্ষেত্রের কোয়ান্টাম বা কণা। আমরা সকলেই জানি যে পিটার হিগস ও ফ্রান্সোয়া এঙ্গলার্ট বস্তুকণার ভর কোথা থেকে এলো তা ব্যাখ্যা করার জন্য 2013 সালে নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন।
       এখন দেখা যাক আমরা চারদিকে যে বিশ্বকে দেখতে পাই, তা শুরু হয়েছিলো কেমন করে। যখন থেকে মানুষ তার তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের বাইরে ভাবতে শিখেছে, তখন থেকে সে ব্ৰহ্মাণ্ড সৃষ্টির রহস্য সমাধান করতে চেয়েছে। তবে মাত্র কয়েক বছর হল আমরা প্রমাণসহ বিজ্ঞানসম্মত কোনো উত্তর দিতে সক্ষম হয়েছি। আমরা সবাই বোধহয় সৃষ্টির আদিতে মহা বিস্ফোরণ (Big Bang) –এর কথা শুনেছি। আজ থেকে 1380 কোটি বছর আগের সেই বিস্ফোরণে সৃষ্টির যাত্রা শুরু হয়েছিলো। সৃষ্টির আদিতে ছিল এক বিন্দু যার ঘনত্ব ছিল অসীম। কী হয়েছিলো সৃষ্টির আদি মুহূর্তে? প্ৰথমে তাপমাত্রা এত বেশি ছিল যে কোয়ার্করা প্রোটন বা নিউট্রনে আবদ্ধ ছিল না। কিন্তু মহাবিশ্ব যত প্রসারিত হল, তাপমাত্ৰা ততই কমতে লাগল। কেটে গেলো এক সেকেন্ডের এক লক্ষ ভাগের এক ভাগ সময়।তাপমাত্রা নেমে এলো 1014 অর্থাৎ এক কোটি কোটি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নীচে।
       কোয়ার্করা এই তাপমাত্রায় প্রোটন নিউট্রন গঠন করতে পারলো, তারা আর ভেঙে পড়ছে না। মোটামুটি তিন মিনিট পরে তাপমাত্রা নেমে আসে একশো কোটি ডিগ্রি সেন্টিগ্ৰেডে। একটা করে প্রোটন ও নিউট্রন মিলে এখন তৈরি করলো প্ৰথমে ডয়টেরিয়াম বা ভারি হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস। প্ৰায় সঙ্গে সঙ্গেই, অর্থাৎ কুড়ি মিনিটের মধ্যে সেই ডয়টেরিয়াম থেকে তৈরি হল হিলিয়াম নিউক্লিয়াস। হিলিয়াম নিউক্লিয়াসে আছে দুটো প্রোটন ও দুটো নিউট্রন। হিলিয়ামের থেকে ভারি নিউক্লিয়াস আর এই সময় তৈরি হল না। ডয়টেরিয়াম অবশিষ্ট থাকলো না বললেই চলে।
       বিশ্বে তখনো পরমাণু তৈরি সম্ভব নয়, কারণ ঐ উচ্চ তাপমাত্রায় ইলেকট্রনরা নিউক্লিয়াসের আকর্ষণে আবদ্ধ থাকবে না।প্ৰায় তিন লক্ষ বছর পরে উষ্ণতা এতটা কমল যে পরমাণু অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্ভব হল। ব্ৰহ্মাণ্ডে সেই সময় ছিল মূলত হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম পরমাণু। আরও বেশ কিছু কোটি বছর পরে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে হাইড্রোজেন গ্যাসের পরমাণুরা মিলে তারকার জন্ম দিলো। বিরাট হাইড্রোজেনের মেঘ মাধ্যাকর্ষণের টানে সংকুচিত হল। যত তা ছোটো হয়, তত তার তাপমাত্রা বাড়ে। একসময় তার ভিতরে শুরু হল তাপ পারমাণবিক নিউক্লিয় সংযোজন বিক্রিয়া। সৃষ্টি নিউক্লিয়াস। তারপর যখন তারকার মৃত্যু ঘটলো, সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সেই ভারি নিউক্লিয়াসরা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়লো। হাইড্রোজেন ছাড়া পৃথিবীর, কিংবা আমার আপনার দেহের, প্রতিটি পরমাণুর নিউক্লিয়াসের জন্ম হয়েছিলো কোনো এক তারকার অভ্যন্তরে।
       উপরের বর্ণনা থেকে আমরা ব্ৰহ্মাণ্ড সম্পর্কে কিছু কথা জানলাম। তবু বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে যায় যাদের উত্তর এখনো আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরে। কোয়ার্ক ও লেপ্টনের সংখ্যা ছয় কেন? আমরা জানিনা। কোয়ার্ক লেপ্টনরাই কি শেষ কথা, না তাদের ভাঙলে আরও ক্ষুদ্র কণা পাওয়া যাবে? আইনস্টাইন চেয়েছিলেন সমস্ত রকম বলকে একসঙ্গে মেলাতে। তিনি সফল হননি। আমরা আজও চেষ্টা করে চলেছি চার রকম বলকে এক সূত্রে বাঁধতে। সাফল্য কি আসবে? এরকম বহু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছে পদার্থবিদ্যা।
       কিন্তু মৌলিক কণা সম্পর্কিত এই সমস্ত প্রশ্নের বাইরেও বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড সম্পর্কিত আমাদের তত্ত্বে আরও নানা সমস্যা থেকে গেছে। তাদের সমাধান করতে গিয়েই আমাদের কৃষ্ণ পদার্থ ও কৃষ্ণ শক্তির কথা কল্পনা করতে হয়েছে। কী ধরনের সমস্যা? প্রথমে কৃষ্ণ পদার্থের কথা আলোচনা করা যাক।
       শুরু করা যাক আমাদের সৌরজগৎ থেকে। আমরা জানি যে সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ বুধ 88 দিনে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে। সবচেয়ে দূরের গ্রহ আমরা এখন যাকে ধরি, সেই নেপচুন সময় নেয় 164.8 বছর। প্লুটো আরও একটু দূরে আছে, তার সময় লাগে 248 বছর। বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার সপ্তদশ শতকে গ্রহদের গতিবিধি সংক্রান্ত তিনটি সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন। গ্রহদের সূর্যের চারদিকে আবর্তন বেগ (v) ও সূর্য থেকে তাদের দূরত্ব (d) – এদের মধ্যে সম্পর্ক কেপলারের সূত্র থেকে নিচের আকারে প্রকাশ করা যায়।

অর্থাৎ বেগের বর্গ সূর্য থেকে দূরত্বের ব্যস্তানুপাতী। অন্য ভাবে বললে, সূর্য থেকে কোনো গ্রহের দূরত্বকে যদি ঐ গ্রহের বেগের বর্গ দিয়ে গুণ করি, তাহলে যে সংখ্যাটা পাওয়া যাবে, তার মান সমস্ত সৌর গ্রহের জন্য সমান। শুধু গ্রহ নয়, সৌরজগতে যে বস্তুই সূর্যের আকর্ষণে বাঁধা পড়ে আছে, তা সে গ্রহ, গ্রহাণু বা ধূমকেতু যাই হোক না। কেন, তাদের সকলের ক্ষেত্রে ঐ গুণফলের মান সমান।
       নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র থেকে এটা সহজেই প্রমাণ করা যায়। যদি গ্রহদের ঘূর্ণন বেগকে সূর্য থেকে দূরত্বের সঙ্গে দেখাই তাহলে পরের পাতায় প্রথম লেখচিত্রের মতো দেখাবে। এখানে বাঁদিক থেকে আটটি বিন্দু, যথাক্রমে বুধ থেকে নেপচুন, এই আটটি গ্রহকে এবং সবচেয়ে দূরের বিন্দুটি প্লুটোকে সূচিত করছে। বিন্দুদের সংযোগকারী রেখা স্থায়ী কক্ষপথ দেখাচ্ছে। সৌরজগতে কোনো বস্তুর ক্ষেত্রে সূর্য থেকে দূরত্ব ও গড় বেগকে এই লেখচিত্রে দেখালে যদি তার অবস্থান ছবিতে ঐ রেখাটার থেকে উপরের দিকে হয়, তাহলে সে সূর্যের আকর্ষণে আর বাঁধা থাকবে না


       আমরা যে গ্যালাক্সির বাসিন্দা তার নাম আকাশগঙ্গা। আকাশগঙ্গা একটা সপিৰ্ল (spiral) গ্যালাক্সি। দ্বিতীয় চিত্রে অন্য এক সর্পিল গ্যালাক্সি দেখানো হয়েছে। বাইরে গিয়ে ছবি তুলতে পারলে আকাশগঙ্গাকে অনেকটা এই রকমই দেখাবে। আকাশগঙ্গার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দূরত্ব হল মোটামুটি এক লক্ষ আলোকবর্ষ। সূর্য ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে সাতাশ হাজার আলোকবর্ষ। দূরে অবস্থান করে। আকাশগঙ্গাতে নক্ষত্রের সংখ্যা দশ হাজার কোটি থেকে চল্লিশ হাজার কোটির মধ্যে।
চিত্রপ ২ঃ সর্পিল গ্যালাক্সি। বাইরে থেকে আকাশগঙ্গাকে এই রকম দেখতে লাগে

       দ্বিতীয় লেখচিত্রে (পরের পাতায়) আমাদের আকাশগঙ্গার কেন্দ্র থেকে দূরত্বের সঙ্গে সঙ্গে নক্ষত্রদের গড় বেগ দেখানো হয়েছে। ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে দূরত্ব কিলো পারসেক এককে প্রকাশ করা হয়েছে। এক কিলো পারসেক অর্থাৎ এক হাজার পারসেক বা মোটামুটি 3260 আলোকবর্ষ। সৌরজগৎ ও ছায়াপথের গঠনের মধ্যে পার্থক্য আছে। সৌরজগতের মোট ভরের প্রায় 99.9% হল সূর্যের ভর, ছায়াপথের ক্ষেত্রে ভরের সবটাই কেন্দ্রে থাকে না, ছড়িয়ে থাকে। তাই ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে যত বাইরের দিকে যাব, নক্ষত্রদের বেগ প্রথমে বাড়বে। কিন্তু একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের পরে তা কমতে শুরু করার কথা। তখন তা মোটামুটি কেপলারের সূত্র মেনে চলবে। নক্ষত্র, মহাজাগতিক মেঘ ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে আমরা ছায়াপথের যে ভর অনুমান করি, তাতে করে হিসাব মতো নক্ষত্রদের বেগ লেখচিত্রে A রেখা বরাবর কমার কথা। বাস্তবে দেখা যায় যে নক্ষত্রদের বেগ মোটামুটি B রেখা বরাবর পরিবর্তিত হয়। প্রায় এক লক্ষ আলোকবর্ষ, তার মানে ছায়াপথের বাইরের দিক পর্যন্ত, নক্ষত্রদের বেগ কমছে না বললেই চলে। প্রত্যাশিত বেগ ও প্রকৃত বেগের পার্থক্য তীর চিহ্ন দিয়ে দেখানো হয়েছে। কালো বিন্দু দিয়ে সূর্যের অবস্থান বোঝানো হয়েছে। আমরা যে ভর দেখতে পাই, সেই অনুযায়ী সূর্যের অবস্থান (A রেখার উপর) ও প্রকৃত যে বেগ আমরা দেখি (B রেখার উপর), তাদের মধ্যে পার্থক্য প্রায় 65 কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। সূর্যের তো তাহলে ছায়াপথের মধ্যে বাঁধা থাকারই কথা নয়। অথচ আমরা নিশ্চিত ভাবে জানি সূর্য সাড়ে চারশো কোটি বছর, অর্থাৎ তার জীবনের পুরোটা, এই ছায়াপথেই কাটিয়েছে।

কেন এমন হল – তার একটা উত্তর আছে। গ্যালাক্সির গতি, বিভিন্ন গ্যালাক্সির মধ্যে আকর্ষণ, এরকম নানা তথ্য থেকে গ্যালাক্সিদের ভর বার করা সম্ভব। আবার গ্যালাক্সির বিভিন্ন ধরনের নক্ষত্রের ও অন্যান্য বস্তুর সংখ্যা দেখে তাদের ভর থেকে গ্যালাক্সির মোট ভর হিসাব করা যায়। আরও একটা ভারি সুন্দর পদ্ধতিতে গ্যালাক্সিদের ভর বার করা যায়। কোনো গ্যালাক্সির পাশ দিয়ে আসার সময় তার মাধ্যাকর্ষণের জন্য আলো বেঁকে যায়। আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে প্রথম এই কথা বলেছিলেন |
       লেন্সের কাজ আলোকে বাঁকানো – গ্যালাক্সি এখানে লেন্সের মতো কাজ করছে। তৃতীয় চিত্রে দেখা যাচ্ছে দূরের কোনো গ্যালাক্সি থেকে আলো আসার সময় অন্য গ্যালাক্সিদের আকর্ষণে বেঁকে গেলে কেমন দেখায়। বৃত্তচাপের মতো যে আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে, তা হল একটাই গ্যালাক্সি। সামনের উজ্জ্বল গ্যালাক্সির টানে আলো বেঁকে ঐরকম রেখার সৃষ্টি করেছে। আলো কতটা বেঁকেছে তা হিসাব করে যে গ্যালাক্সির টানে আলো পথ পরিবর্তন করলো তার ভর নির্ণয় করা যায়।

চিত্র ৩: গ্যালাক্সির লেন্স। রেখাগুলি আসলে একটাই গ্যালাক্সি, তার আলো সামনের গ্যালাক্সির মাধ্যাকর্ষণে বেঁকে গিয়ে ঐরকম আকার নিয়েছে

        এই সমস্ত বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে দেখা যাচ্ছে যে মাধ্যাকর্ষণ থেকে নির্ণয় করা ভর, তারকার সংখ্যা হিসাব করে পাওয়া ভরের থেকে অন্তত পাঁচগুণ বেশি। সংখ্যা গুণে যে ভর আমরা পাই, তার মধ্যে আবার উজ্জ্বল তারকাদের অবদান মাত্র দুই শতাংশ, বাকিটা আছে বিরাট মহাজাগতিক মেঘ, মৃত তারা বা খুব অনুজ্জ্বল তারকাদের মধ্যে। কিন্তু এ তো গেলো ভরের ছয় ভাগের এক ভাগ। অবশিষ্ট পাঁচ ভাগ সম্পর্কে কি কিছু জানা আছে?
       সত্যি কথা বলতে প্রায় কিছুই জানা নেই। যেটুকু জানি তা সবই হল না-বাচক, অর্থাৎ এই পদার্থ কী নয়। বিজ্ঞানে তার গুরুত্বও কম। নয়, কারণ তার থেকে আমাদের খোঁজার পরিধিকে আমরা কমিয়ে আনতে পারি। ধরা যাক বলের কথা আগের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে অদেখা এই পদার্থ মাধ্যাকর্ষণে অংশ গ্রহণ করে। দুর্বল বলের নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে যে তা খুব দুর্বল – তাই তা এই নতুন পদার্থের উপর কাজ করে কিনা নিশ্চিত ভাবে বলা এখনো পর্যন্ত আমাদের সাধ্যের বাইরে। চোখে আমরা দেখতে পাচ্ছিনা, তার মানে আলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাই আমরা তাদের নাম দিয়েছি। অন্ধকার বা কৃষ্ণ পদার্থ। আলো হল তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ, অর্থাৎ তড়িৎচৌম্বক বল কৃষ্ণ পদার্থের উপর ক্রিয়া করে না। তার মানে হল যে এই পদার্থ তড়িৎ নিরপেক্ষ, এর কোনো তড়িৎ আধান নেই।
       এমন কি হতে পারে যে কৃষ্ণ পদার্থ আসলে সাধারণ পদার্থের পরমাণু? হয়তো তা এমন জায়গায় আছে যে আমরা দেখতে পাচ্ছিনা – আমাদের ছায়াপথেই সেই পরমাণুরা আছে। না, তা নয়। কৃষ্ণ পদার্থ যে প্রোটন নিউট্রন দিয়ে তৈরি সাধারণ পদার্থ নয়, তার অন্য প্রমাণ আছে। সৃষ্টির সেই আদি মুহূর্তে প্রোটন বা নিউট্রনের ঘনত্ব আমরা জানি। হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম কতটা তৈরি হয়েছিলো, কতটা ভারি হাইড্রোজেন অবশিষ্ট আছে, সেটা আমরা মাপতে পেরেছি। তার থেকে আমরা সে সময় সাধারণ পদার্থের ঘনত্ব জানি। কৃষ্ণ পদার্থ যদি আসলে প্রোটন নিউট্রন দিয়ে সাধারণ পদার্থ হতো, তাহলে এই পরিমাণগুলো একেবারেই আলাদা হতো। তা যখন নয়, সবল বলও কৃষ্ণ পদার্থের উপর নিশ্চয় কাজ করে না।
       সাধারণ অণু পরমাণু প্রোটন নিউট্রন বা ইলেকট্রন দিয়ে কৃষ্ণ পদার্থ তৈরি নয়। তাত্ত্বিকরা নানা রকমের কণার কথা বলছেন। তাদের মধ্যে এক ধরনের কণার সঙ্গে আমাদের এই লেখায় সাক্ষাৎ হয়েছে – তা হল নিউট্রিনো। আগেই দেখেছি যে দুর্বল ও মাধ্যাকর্ষণ, এই দুই বল নিউট্রিনোর উপর কাজ করে। খুব সম্প্রতি বোঝা গেছে নিউট্রিনোর ভর আছে। তিন ধরনের নিউট্রিনোর ভর সম্পর্কে একটা ধারণাও পাওয়া গেছে। দুটো কারণে দেখা যাচ্ছে যে নিউট্রিনো কৃষ্ণ পদার্থের মূল অঙ্গ হতে পারে না।
       প্রথমত, তার ভর যথেষ্ট নয়। কিন্তু ভরের পরিমাণ জানার আগেও বোঝা গিয়েছিলো যে নিউট্রিনো দিয়ে গ্যালাক্সির ভর সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ নিউট্রিনোরা প্ৰায় আলোর বেগে চলে। মহা বিস্ফোরণের পরে ছড়িয়ে থাকা পদার্থ মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে এক এক জায়গায় জোট বাঁধে। এভাবেই গ্যালাক্সিদের গঠন হয়েছিলো। এখানে কৃষ্ণ পদার্থের একটা বিরাট ভূমিকা ছিল, কারণ সাধারণ পদার্থের থেকে তার পরিমাণ বেশি বলে তার মাধ্যাকর্ষণও বেশি। প্রায় আলোর গতিতে দৌড়োতে থাকা কোনো কণা দিয়ে গ্যালাক্সির সৃষ্টি ব্যাখ্যা করা কঠিন।
তাত্ত্বিকেরা আরও নানা ধরনের কণার কথা বলেছেন। তবে তাদের আলোচনা করতে গেলে এই প্ৰবন্ধ আরও জটিল হয়ে পড়বে। বিশ্বে তাদের খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলছে। অন্য অনেক মতামতও এসেছে যাদের কিছু কিছু আমাদের জানা মাধ্যাকর্ষণের নিয়মকে পাল্টাতে চেয়েছে।

       কৃষ্ণ পদার্থের কথা শেষ হওয়ার আগে আমরা দেখবো যে দ্বিতীয় লেখচিত্রে নক্ষত্রদের যে বেগ দেখা যাচ্ছে তার ব্যাখ্যা কী? কৃষ্ণ পদার্থ সমেত ছায়াপথের সম্ভাব্য গঠন চতুর্থ চিত্রে দেখানো হয়েছে। আমরা যে উজ্জ্বল ছায়াপথ দেখতে পাই, তা আসলে ছায়াপথের এক অত্যন্ত ছোট অংশ – কৃষ্ণ পদার্থের এক বিশাল বিস্তারের ভিতর দিকে তার অবস্থান। অঙ্ক কষে দেখা যায় যে ছায়াপথের এই গঠন ধরে নিলে সহজেই নক্ষত্রদের বেগ ব্যাখ্যা করা যায়।
       কৃষ্ণ পদার্থের কথা শেষ হলেও আমাদের গল্প কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। সৃষ্টির আদি মুহূর্ত থেকে ব্ৰহ্মাণ্ড প্রসারিত হয়ে চলেছে। ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে? দু ধরনের ভবিষ্যতের কথা আমরা চিন্তা করতে পারতাম। ধরা যাক আমরা একটা পাথর নিয়ে উপর দিকে ছুড়ে দিয়েছি। পাথরটা যত উপরে যাবে তত তার বেগ কমবে। একসময় সে থেমে যাবে, তারপর আবার মাটিতে ফিরে আসবে। এর জন্য মাধ্যাকর্ষণ বল দায়ী। যদি একটা নির্দিষ্ট বেগ, যাকে আমরা বলি মুক্তি বেগ, অন্তত সেই বেগে ছুড়তে পারি, তাহলে পাথরের বেগ কমবে কিন্তু তা আর ফিরে আসবে না। ব্ৰহ্মাণ্ডেরও এই দুই ধরনের পরিণতির কথা চিন্তা করা যায়। এখানেও মাধ্যাকর্ষণ বলাই কাজ করে। তাই আমরা ভাবতাম যে বিশ্ব যত প্রসারিত হচ্ছে, তার প্রসারণ বেগ নিশ্চয় তত কমছে।
       যদি গোড়ায় মহা বিস্ফোরণের সময় যথেষ্ট বেগ নিয়ে শুরু না করে থাকে, তাহলে বিশ্ব আবার একসময় সংকুচিত হতে শুরু করবে এবং অবশেষে আবার এক বিন্দুতে মিলিত হবে। কিন্তু যদি অন্তত মুক্তি বেগ নিয়ে যাত্রা করে থাকে, তাহলে তার প্রসারণ আবহমান কাল ধরে চলতেই থাকবে। অবশ্য প্রসারণের বেগ ক্রমশ কমবে। গ্যালাক্সিরা একে অপরের থেকে কী বেগে দূরে সরে যাচ্ছে, তা মেপে আমাদের বিশ্বের বর্তমান সময়ে প্রসারণ বেগ বার করা সম্ভব।
       কিন্তু সুদূর অতীতে, অর্থাৎ কয়েকশো কোটি বছর আগে প্রসারণের বেগ কি মাপতে পারব? পারব, কারণ আমাদের কয়েকটা টাইম মেশিন আছে। তবে সেই টাইম মেশিনে করে অতীত বা ভবিষ্যতে যাওয়া যায়না, শুধু অতীতকে দেখা যায়। তাদের আমরা সহজ কথায় দূরবিন বলি। আলো এক বছরে যতটা রাস্তা যেতে পারে, তাকে বলে এক আলোকবর্ষ। আমাদের থেকে পাঁচশো কোটি আলোকবর্ষ দূরে যে মহাজাগতিক বস্তু আছে, তার যে আলো আজি আমার দূরবিনে এসে পৌঁছালো, সে যাত্রা শুরু করেছিলো পাঁচশো কোটি বছর আগে। অর্থাৎ আমরা পাঁচশো কোটি বছর আগের অবস্থায় ঐ বস্তুকে আজ দেখতে পাচ্ছি। কাজেই ঐ সমস্ত দূরের নক্ষত্রদের গতিবিধি থেকে কয়েকশো কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের প্রসারণ বেগ আমরা মাপতে পারি।
       1998 সালে দুই দল বিজ্ঞানী সেই কাজটাই করছিলেন। তাঁরা দেখছিলেন প্রসারণ বেগ কতটা কমছে – তার থেকে ব্ৰহ্মাণ্ডের ঘনত্ব (অন্যভাবে বললে সাধারণ আপেক্ষিকতা অনুযায়ী স্থান কালের বক্রতা) নির্ণয় করা সম্ভব। তাঁদের ব্যবহৃত পদ্ধতিও বেশ চিত্তাকর্ষক, কিন্তু সে আলোচনায় আমরা যাব না।এই কাজ করতে গিয়ে দেখা গেলো যে মহাবিশ্বের প্রসারণ বেগ এখন আর কমছে না। প্রথম কয়েকশো কোটি বছর ধরে কমলেও ছশো কোটি বছর আগে থেকে বেগ আবার বাড়তে শুরু করেছে।
       পাথরটাকে যখন উপর দিকে ছুঁড়লাম, তখন যদি তার বেগ না কমে বাড়তে থাকে, তখন আমরা কী ভাববো? আমরা ভাববো যে নিশ্চয় কোনো বিকর্ষণ বল এখানে কাজ করছে। মহাজগতের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিকর্ষণ, যা মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে ক্রিয়া করছে। কেন সে সম্পর্কে আমাদের বিশেষ কিছুই জানা নেই। অজানা সেই কারণের নাম আমরা দিয়েছি। অন্ধকার বা কৃষ্ণ শক্তি। প্ল্যাঙ্ক কৃত্রিম উপগ্রহের থেকে পাওয়া তথ্য থেকে 2013 সালের হিসাব অনুযায়ী মহাবিশ্বের 68.3% শক্তি এই অন্ধকার শক্তির মধ্যে লুকিয়ে আছে। অবশিষ্ট অংশের মধ্যে মধ্যে 4.9% হল কোয়ার্ক লেপ্টন বা অণু পরমাণু গঠিত সাধারণ বস্তু। বাকি 26.8% হল কৃষ্ণ পদার্থ। ব্ৰহ্মাণ্ডের প্রসারণ বেগ যে বাড়ছে তা আবিষ্কারের জন্য 2011 সালে সল পেরিমাটার, ব্রায়ান স্মিড ও অ্যাডাম রিসকে পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়।
সৃষ্টির আদিতে কিন্তু যে হারে ব্ৰহ্মাণ্ড প্রসারিত হচ্ছিল, তা পরে ক্রমশ কমে আসে। কিন্তু আবার তা পরে বাড়তে থাকে। এ এক অদ্ভুত ঘটনা। ব্ৰহ্মাণ্ড যখন আয়তনে ছোট ছিল, তখন বস্তুর ঘনত্ব ছিল বেশি। তাই মাধ্যাকর্ষণই ছিল প্রধান বল, যার জন্য প্রসারণের হার কমে যাচ্ছিল। বিশ্ব যত প্রসারিত হল, বস্তুর ঘনত্ব গেলো তত কমে। ছশো কোটি বছর আগে থেকে অন্ধকার শক্তির প্রভাবে প্রসারণের হার আবার বাড়তে থাকে।তার মানে প্রসারণের ফলে বস্তুর ঘনত্ব যে হারে কমছে, কৃষ্ণ শক্তির ঘনত্ব সেই হারে কমছে না।
       বহুদিন থেকে, হয়তো মানব সভ্যতার সূচনা থেকে, মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল ছিল। বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে পদার্থবিদ্যা আমাদের তার উত্তর দিয়েছে।গ্যালাক্সিরা একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যত সময় যাবে, তত তাদের পরস্পরের থেকে দূরে যাওয়ার বেগ বাড়বে। গ্যালাক্সির সমস্ত তারা একে একে নিভে যাবে। নতুন নক্ষত্র সৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে। অবশেষে চিরকালীন অন্ধকারে ডুবে যাবে মহাবিশ্ব।
       কৃষ্ণ শক্তি আসলে কী? তার সম্পর্কে আমরা কৃষ্ণ পদার্থের থেকেও কম জানি। কোনো কোনো বিজ্ঞানী একটা কথা বলেছেন। আইনস্টাইন যখন আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে বিশ্বের জন্য তাঁর সমীকরণ লিখেছিলেন, তখন দেখেছিলেন যে তার থেকে স্থিতিশীল বিশ্ব পাওয়া সম্ভব নয়। অথচ তখনো পর্যন্ত আমরা জানতাম যে মহাবিশ্ব স্থিতিশীল। তাই তিনি জোর করে সমীকরণের মধ্যে এক নতুন পদ ঢুকিয়ে ছিলেন। তার নাম তিনি দিয়েছিলেন মহাজাগতিক ধ্রুবক। কিন্তু পরে যখন আবিষ্কার হয় যে বিশ্ব স্থিতিশীল নয়, প্রসারিত হচ্ছে, তখন তিনি ঐ অংশকে প্রত্যাহার করে নেন।
       আইনস্টাইন বলেছিলেন যে মহাজাগতিক ধ্রুবক তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল। বিজ্ঞানীরা এখন সেই “ভুল” দিয়ে অন্ধকার শক্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব অনুযায়ী শূন্যস্থানের নিজের শক্তি আছে – তা মাপাও সম্ভব হয়েছে। সেই শক্তির হিসাব থেকে বিশ্বের প্রসারণ বৃদ্ধির একটা মান পাওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত আমাদের হিসাব আসল প্রসারণের থেকে অনেক বেশি। কতো বেশি? 10120 (একের পিঠে একশো কুড়িটা শূন্য) গুণ বেশি। কাজেই সমস্যার সমাধান এখনো বহু দূরে। আরও কিছু কিছু তত্ত্ব আছে যারা কৃষ্ণ শক্তির ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর পাওয়া যায় নি।
       পদার্থবিজ্ঞানে সামনের কয়েক বছর খুব আকর্ষণীয় হতে পারে। ঊনবিংশ শতকের শেষে পদার্থবিদরা মনে করেছিলেন যে তাঁদের বিজ্ঞানের আর বিশেষ কিছু জানার বাকি নেই। তাঁদের সেই আত্মপ্ৰসাদের কাঁচের ঘর নতুন শতাব্দীর পাঁচ বছরের মধ্যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও আপেক্ষিকতাবাদের আঘাতে চুরমার হয়ে যায়। আমরা যখন ভাবতে শুরু করেছিলাম যে মহাবিশ্বকে আমরা মোটামুটি বুঝতে পেরেছি, তখনই দেখা গেলো যে মহাবিশ্বের মাত্র পাঁচ শতাংশ আমাদের চেনা পদার্থ দিয়ে তৈরি, বাকি পঁচানব্বই শতাংশ সম্পর্কে আমরা প্রায় কিছুই জানি না। একবিংশ শতাব্দীর সূচনায় কি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে? নতুন কোনো আবিষ্কার কি আমাদের সামনে নতুন কোনো জগতকে খুলে দেবে? সময়ই সে কথা বলবে।
(প্ৰকাশ : জ্ঞান ও বিজ্ঞান, মার্চ ২০১৪, আলোকচিত্র: নাসা)
পুনশ্চ: এই লেখাটা ছাপার পর সুপারনোভা ও কৃষ্ণ শক্তি বিষয়ে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। তা নিয়ে আবার লেখার ইচ্ছা আছে।
















Friday, 7 July 2017

গ্যালিলিও



গ্যালিলিও ও আধুনিক যুগ
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
       পৃথিবীর ইতিহাসে ২০০৯ সাল বহু স্মরণীয় ঘটনার জয়ন্তী হিসাবে চিহ্নিত। চারশো বছর আগে বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার প্রকাশ করেন গ্রহদের গতিবিধি সংক্রান্ত তাঁর বিখ্যাত দুটি সূত্র। এই নিয়মগুলি জানা না থাকলে নিউটনের পক্ষে মাধ্যাকর্ষণ সূত্র আবিষ্কার করা কঠিন হতো। দুশো বছর আগে ১৮০৯ সালে চার্লস ডারউইন জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার ঠিক পঞ্চাশ বছর পরে প্রকাশিত হয়েছিল বিবর্তন তত্ত্ব সংক্রান্ত তাঁর সেই চিরস্মরণীয় গ্রন্থ যার সংক্ষিপ্ত নাম অরিজিন অফ স্পিসিস। মানুষের চিন্তার ইতিহাসে এই বইয়ের প্রভাব যে কতখানি, তা আজ আর কাউকে বলার দরকার নেই। ভারতের বিখ্যাত বিজ্ঞানী হোমি ভাবারও জন্মশতবার্ষিকী এ বছর পালিত হচ্ছে।
       ডারউইনের বিবর্তনতত্ত্বের মতোই আরেক এক যুগান্তকারী ঘটনার জয়ন্তী পালিত হচ্ছে এই বছর। ঠিক চারশ বছর আগে ইতালির এক বিজ্ঞানী খবর পেয়েছিলেন যে, হল্যান্ডে লিপার্শে নামের এক চশমার দোকানদার দুটি লেন্স ব্যাবহার করে দূরের জিনিসকে বড় করে দেখার এক যন্ত্র বানিয়েছেন। সেই বিজ্ঞানী তখন পদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। শোনা মাত্র তিনি ঠিক করলেন যে তিনি ঐরকম এক যন্ত্র বানাবেন। বানিয়েও ফেললেন, আর তারপর তার মুখ আকাশের দিকে ফেরালেন। যন্ত্রে চোখ রাখার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর আধুনিক যুগের সূচনা ঘটল। সেই বিজ্ঞানীর নাম গ্যালিলিও গ্যালিলি, আর তাঁর যন্ত্রের নাম দূরবিন।
জাস্টাস সুস্টেরমানস অঙ্কিত গ্যালিলিওর প্রতিকৃতি
       গ্যালিলিওর জন্ম হয় ১৫৬৪ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি, ইতালির পিসাতে। তাঁর বাবা ভিনসেঞ্জো গ্যালিলি ছিলেন এক সঙ্গীতজ্ঞ। গ্যালিলিও যেমন বিজ্ঞানের আধুনিক যুগের সূচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়, তেমনি ইউরোপের সঙ্গীতের মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে আনার ব্যাপারে ভিনসেঞ্জোর ভূমিকাও কম নয়। গ্যালিলিওর প্রথম পড়াশোনা হয় ফ্লোরেন্সের কাছে ভ্যালেমব্রোসার কাছে এক খ্রিস্টান মঠের স্কুলে। তখন গোটা ইউরোপেই পড়াশোনা এই রকম স্কুলেই হতো। একটু বড়ো হলে ১৫৮১ সালে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হলেন গ্যালিলিও। ডাক্তারি কেন? কারণ তখন পেশার মধ্যে শুধু ডাক্তারিতেই উপাৰ্জন একটু ভালো ছিল। 
        কিন্তু ডাক্তার হওয়া গ্যালিলিওর হলো না। একবার বিজ্ঞান এবং অঙ্ক পড়া শুরু করার পরে তাঁর মনে হলো যে এ দুটি বিষয় নিয়েই তিনি জীবন কাটাবেন। ১৫৮৫ সালে তিনি যখন বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লেন, কোনো ডিগ্রিই তাঁর নামের পাশে লেখা ছিল না। ডিগ্রি না। থাকলে কি হবে, তরল ব্যবহার করে ওজন মাপার এক নতুন যন্ত্র এবং সরল দোলক বা পেন্ডুলামের সূত্র আবিষ্কার করার জন্য তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাপই তো জীবনে শেষ কথা নয়, আমাদের রবীন্দ্রনাথেরও তো কোনো প্রথাগত ডিগ্রি ছিল না, কিন্তু তাঁর মতো পণ্ডিত দেশে কজন ছিলেন?
       পেন্ডুলামের ঐ সূত্র কিন্তু গ্যালিলিও ল্যাবরেটরিতে বসে আবিষ্কার করেন নি। ১৫৮৩ সালে উনিশ বছর বয়সী গ্যালিলিও পিসার ক্যাথিড্রালে প্রার্থনা করতে গেছেন। একটা ঝুলন্ত বাতিতে তখন সবে আগুন দেয়া হয়েছে। গ্যালিলিও দেখলেন যে বাতিটা প্ৰথমে জোরে দুলছিল, আস্তে আস্তে তা থেমে যাচ্ছে। কিন্তু জোরে বা আস্তে যেমনই দুলুক না কেন, একবার দুলতে একই সময় লাগছে। কেমন করে মাপবেন? নিজের নাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নিঃসন্দেহ হলেন। তাঁর তখন মনে হলে – ব্যাপারটা কি শুধু ঐ বাতিটার জন্যই সত্যি? পরীক্ষা করে দেখলেন যে নিয়মটা সবরকম দোলকের জন্যই খাটে। এই তাঁর প্রথম সূত্র – সরল দোলকের দোলনকাল তার বিস্তারের উপর নির্ভর করে না, দোলকটি বেশি বা কম জোরে দুলুক না কেন, একটি পূর্ণ দোলনের জন্য একই সময় লাগে। পরে তিনি দোলনের আরো দুটি সূত্র আবিষ্কার করেন। পরবর্তীকালে গ্যালিলিওর আবিষ্কারের ও মতামতের উপর ভিত্তি করে যান্ত্রিক ঘড়ি তৈরি করেন হল্যান্ডের বিখ্যাত বিজ্ঞানী হাইজেন্স। আগেকার সূর্যঘড়ি, বালিঘড়ি, এসবের থেকে এই নতুন ঘড়ি ছিল অনেক উন্নত – একে ছাড়া আধুনিক বিজ্ঞানের এগিয়ে চলা সম্ভব হত না।
       কিছুদিন বাড়িতে ছাত্রদের পড়িয়ে চালালেন, তারপর ১৫৮৯ সালে পিসাতে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন গ্যালিলিও। তবে চাকরি তাঁর বেশিদিন টেকে নি। প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও দার্শনিক অ্যারিস্টটল তখন ছিলেন বিজ্ঞানের শেষ কথা। তাঁর মতের বিরোধিতা করার জন্য ১৫৯২ সালে গ্যালিলিওর চাকরি যায়। কী বলেছিলেন গ্যালিলিও? সে কথায় আমরা পরে আসছি।
       পিসাতে জায়গা না হলেও গ্যালিলিওর কোনো সমস্যা হলো না। ইতালির পদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্ক পড়ানোর কাজ তিনি ১৫৯২ সালেই পেলেন। ১৬১০ সাল পর্যন্ত তিনি পদুয়াতে ছিলেন। এই সময় তিনি দোলকের বাকি সূত্রগুলি আবিষ্কার করেন। কোনো বস্তুকে উপর থেকে ছেড়ে দিলে তার বেগ কেমন ভাবে পাল্টাবে, কত উপর থেকে পড়তে সময় কত লাগবে – এই সংক্রান্ত নিয়মগুলিও তিনি এই সময়ই প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় একটা সমস্যা নিয়ে অনেক বিজ্ঞানী মাথা ঘামাচ্ছিলেন। কোনো বস্তুকে উপর দিকে কোণ করে ছুড়ে দিলে সে কোন পথ ধরে যাবে? কামান কোন দিকে তাক করতে হবে, সেটা জানার জন্য এই অঙ্কটা করা দরকার ছিল। গ্যালিলিও দেখালেন যে বায়ুর ঘর্ষণকে উপেক্ষা করলে পথটা জ্যামিতির একটা নির্দিষ্ট আকার মেনে চলবে যার নাম অধিবৃত্ত বা parabola। শুনতে খুব সহজ লাগিলেও সে সময় এই কাজ করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গ্যালিলিওই প্রথম বললেন যে ঐ বস্তুটার গতি এমন ভাবে দুভাগে ভাগ করে নেয়া যায় যে একটা ভাগের উপর অন্য ভাগের কোনো প্রভাব থাকে না। এভাবে উপর নিচের গতির ও অনুভূমিক গতিকে আলাদা করার পদ্ধতি তাঁরই আবিষ্কার। তিনিই প্রথম যিনি বুঝেছিলেন যে পদার্থবিদ্যার সমস্যা সমাধান করতে গেলে অঙ্ক ছাড়া চলবে না। পদুয়ার পর ফ্লোরেন্স, ১৬১০ সালে সেখানকার শাসনকর্তা মেদিচিদের দরবারে তিনি গণিতজ্ঞ হিসেবে নিযুক্ত হন।
নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩ – ১৫৪৩)
       ১৫৪২ সালে কোপার্নিকাস বলেছিলেন যে সূর্য স্থির, পৃথিবী সহ সমস্ত গ্রহ তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কজন তাতে বিশ্বাস করতো? প্রাচীন কালের বিরাট পণ্ডিত অ্যারিস্টটল বলেছেন। পৃথিবী স্থির, আর এক প্ৰাচীন বিজ্ঞানী টলেমি তার উপর ভিত্তি করে সৌরজগতের মডেল বানিয়েছেন, তাঁরা কি ভুল করতে পারেন? বিশ্বাস করতেন গ্যালিলিও, কিন্তু তার প্রচারে তিনি খুব উৎসাহী ছিলেন না। কেপলারকে ১৫৯৭ সালে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে লোকের ঠাট্টার ভয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোপার্নিকাসের মত সমর্থন করতে পারছেন না। এমন কোনো উপায় কি নেই যাতে সহজেই সকলের কাছে প্রমাণ করা যায় কোপার্নিকাসই ঠিক? সুযোগ এলো ১৬০৯ সালে। দূরবিন দিয়ে আকাশের দিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে এক নতুন জগৎ যেন তাঁর সামনে খুলে গেলো। 
       কী দেখেছিলেন গ্যালিলিও? চাঁদের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন পাহাড় আর গহ্বর। দেখলেন চাঁদের বুকে পড়েছে পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত হওয়া সূর্যের আলো। শুক্র গ্রহের দিকে তাকালেন। আমরা পূর্ণিমা ছাড়া অন্যসময় চাঁদকে পুরোপুরি দেখতে পাইনা, শুধু যে অংশে সূর্যের আলো পড়ে সেটুকু দেখি। একে বলে চাঁদের কলা। গ্যালিলিও অবাক হয়ে দেখলেন শুক্রগ্রহেরও কলা আছে। সূর্যের দিকে দূরবিন ঘুরিয়ে চোখে পড়ল কালো কালো দাগ যাদের আমরা এখন বলি সৌরকলঙ্ক। দেখলেন অগুন্তি নতুন তারা যাদের খালি চোখে দেখা যেত না। আকাশগঙ্গা তাঁর কাছে আসল রূপে ধরা দিল, দেখলেন যে সাদা ঐ পথ আসলে অগুন্তি তারার সমষ্টি। গ্যালিলিওর জন্য সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের উপহার নিয়ে এল। বৃহস্পতি গ্ৰহ। দেখলেন তার চারদিকে চারটি চাঁদ যারা বৃহস্পতিকে প্ৰদক্ষিণ করছে। চোখের সামনে দেখতে পেলেন কোপার্নিকাসের সৌরজগত। 
        তোমাদের মনে হতেই পারে এ আর নতুন কথা কী? কোপার্নিকাস। তো কবেই বলে গেছেন যে সূর্য স্থির, পৃথিবী তাকে প্ৰদক্ষিণ করে। কিন্তু আগেই বলেছি কোপার্নিকাসের মত খুব একটা প্রভাব ফেলে নি। তার কারণ সাধারণ মানুষ সহজে বুঝবে এমন কোনো প্রমাণ কোপার্নিকাসের তত্ত্ব থেকে পাওয়া যায়নি। বরঞ্চ বিপক্ষের লোকরা অনেক কথাই বলতেন, যার কোনো উত্তর দেয়া যেত না। এবার গ্যালিলিও অনেক প্রশ্নের জবাব নিয়ে এলেন। বিরুদ্ধবাদী পণ্ডিতরা বলতেন যে পৃথিবী অন্য গ্রহদের থেকে আলাদা, কারণ তাদের আলো আছে, পৃথিবীর নেই। গ্যালিলিও দেখলেন পৃথিবীও নিশ্চয় আলো দেয়, যা চাঁদের উপর পড়ে। কিন্তু আমরা তো দেখতেই পাচ্ছি পৃথিবীর আলো নেই। গ্যালিলিও বুঝলেন কোনো গ্রহেরই নিজের আলো নেই, সূর্যের আলো যেখানে পড়ে না সেই জায়গা অন্ধকার থাকে। তাই তো আমরা শুক্রের চাঁদের মতো কলা দেখতে পাই। তাই পৃথিবী ও অন্য গ্রহদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, সূর্যের আলোর প্রতিফলনেই তাদের সকলের ঔজ্জ্বল্য। শুধু তাই নয়, তিনি দেখান যে শুক্রের কলার যে বাড়া কমা দেখা যায়, তা টলেমির সৌরজগতের মডেলে ব্যাখ্যা করতে পারে না। তিনি এও দেখালেন যে পৃথিবীকে চলমান ধরে নিলেই এক মাত্র সহজে বৃহস্পতির চাঁদদের গ্রহণের সময় বার করা যায়।
       অ্যারিস্টটলের মত খণ্ডন করতে গিয়ে গ্যালিলিও বলবিদ্যার জগতে যুগান্তর নিয়ে আসেন। অ্যারিস্টটলপন্থীরা প্রশ্ন করতেন যে পৃথিবী যদি চলমান হয়, তাহলে কোনো বস্তুকে উপর থেকে ছেড়ে দিলে তা ঠিক নিচে পড়বে কেন, তার তো পিছিয়ে যাওয়া উচিত। তাঁরা জানতে চাইলেন, পৃথিবী যদি গতিশীল হয়, তাহলে চাঁদ কেমন করে পৃথিবীর সঙ্গে সবসময় থাকে? গ্যালিলিও তাদের বললেন, যে বৃহস্পতি যদি চারটি চাঁদকে সঙ্গে নিয়ে চলতে পারে, তাহলে পৃথিবী কেন পারবে না? তিনি উদাহরণ দিলেন যে চলমান জাহাজের মাস্তুল থেকে কোনো বস্তুকে নিচে ফেললে তা মাস্তুলের গোড়াতেই পড়ে, জাহাজের গতির জন্য পিছন দিকে চলে যায় না। তেমনি পৃথিবীতে পতনশীল বস্তু সোজা নিচের দিকেই পড়ে, পিছিয়ে যায় না। পরীক্ষার মাধ্যমে সবাইকে তিনি দেখিয়ে দিলেন, তিনিই ঠিক বলছেন।
       গ্যালিলিওর দূরবিন চিন্তার জগতে বিপ্লব এনে দিল। যদি বৃহস্পতির চারদিকে প্ৰদক্ষিণ করতে পারে কোনো চাঁদ, তাহলে পৃথিবীই কেন্দ্রে আর সমস্ত কিছুই পৃথিবীকে প্ৰদক্ষিণ করে, একথা আর বলা যাবে না। দূরবিন দিয়ে আকাশের দিকে তাকানোর পরে তাঁর মনে হলো যে কোপার্নিকাসের মতের পক্ষে প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখন তাঁর নাগালের মধ্যে। সবাইকে তা জানানোর জন্য তাই ১৬১০ সালে বেরোল তাঁর বই, 'তারকাজগতের দূত'। বই ছাপার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচুর বিক্রি হতে লাগল। চারদিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল, আর সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে গেল বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ডের এই নতুন চিত্র।
       গ্যালিলিও চিন্তার জগতে এক বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না। বিশ্ব ব্ৰহ্মাণ্ড সম্পর্কে মূলত অ্যারিস্টটলের মতকেই মেনে নিত এত দিন মানুষ। প্লেটো, অ্যারিস্টটল বা পরবর্তী কালে খ্রিস্টান দার্শনিকদের মতে আকাশে যা দেখা যাচ্ছে, তা হল স্বর্গের অংশ। সেই কারণেই তারা ত্রুটিহীন, নিখুঁত। তার কোনো পরিবর্তন হবে না, কারণ তার কোনো উন্নতি করা সম্ভব নয়। সেজন্য নক্ষত্রের জন্ম মৃত্যু হয় না, তাদের নিজেদের মধ্যে আপেক্ষিক অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়না। কেমন করে জানব যে তারা স্বর্গের অংশ? অ্যারিস্টটল বলেছিলেন যে কোনো চলমান বস্তুর উপর বল প্রয়োগ না করলেও সে নিজে থেকেই থেমে যাবে। কারণ স্থিতাবস্থা হল পৃথিবীর কোনো বস্তুর স্বাভাবিক অবস্থা।  গ্ৰহ নক্ষত্ররা চিরকাল চলমান, কারণ তারা পৃথিবীর নিয়ম নীতির ঊর্ধ্বে। বুঝতেই পারো যারা চায় না যে সমাজে কোনো পরিবর্তন হোক, রাজা, জমিদার বা যাজকের মতো সমাজের মাথারা, তারা এই স্থিতাবস্থার ধারণাকে খুব পছন্দ করবে।
       শুধু কোপার্নিকাসকে সমর্থন করেই থামলেন না গ্যালিলিও। তিনি দেখালেন যে বস্তুর গতিতে স্থিতাবস্থার আলাদা করে কোনো গুরুত্ব নেই। অসাধারণ কয়েকটি পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি দেখালেন যে ঘর্ষণ বা অন্য কোনো বল না থাকলে সচল বস্তু চিরকাল সচল থাকবে। তাই আকাশের গ্রহ তারার মধ্যে আলাদা করে কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। একই নিয়মে সমস্ত কিছু চালিত হয়। এমন ভাবে কোপার্নিকাস ও গ্যালিলিওর মত প্রচারের সঙ্গে সঙ্গেই দুহাজার বছরের এই পুরনো সমাজব্যবস্থায় ফাটল ধরল। 
        গ্রহ নক্ষত্রদের আর স্বর্গের অংশ বলা যাচ্ছে না। তারা নিখুঁত নয় – গ্যালিলিও দূরবিন দিয়ে চাঁদের পাহাড় আর গহ্বর, সূর্যের কলঙ্ক দেখিয়ে দিচ্ছেন। তাহলে আর স্বর্গ এই মাটির পৃথিবীর থেকে আলাদা কোথায়? গ্যালিলিও আগেই দেখিয়েছিলেন যে আকাশের নক্ষত্ররা চিরকাল একই রকম থাকে না। ১৬০৪ সালে এক নতুন তারা আকাশে দেখা যায়। আজ আমরা জানি, যে তা ছিল এক তারকার মৃত্যু বা নোভা বিস্ফোরণের চিহ্ন। অ্যরিস্টটলপন্থীরা বললেন যে নতুন তারাটা নিশ্চয় পৃথিবীর খুব কাছে, কারণ তাদের মতে স্বর্গের তো কোনো পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নয়। গ্যালিলিও দূরত্ব হিসেব করে বললেন সেটি গ্রহদের থেকে অনেক দূরে আছে, তাকে কোনোভাবেই আমাদের সৌরজগতের অংশ হিসেবে ভাবা যাবে না। তাই স্বৰ্গও অপরিবর্তনীয় বা চিরস্থায়ী নয়। স্বর্গে যদি পরিবর্তন হতে পারে, তাহলে পৃথিবীতে এক দলের লোকই চিরকাল রাজত্ব করবে। কেন? স্বর্গীয় নিয়মের দোহাই দিয়ে যে ধর্মযাজকরা বা রাজারাজড়ারা সমাজে কর্তৃত্ব করছেন, তাদের পক্ষে এতো মহা সর্বনাশের কথা! তাই সমাজপতিরা গ্যালিলিওর বিচার করে তাঁকে শাস্তি দিয়েছিলেন। সে কথা পরে বলছি।
       গ্যালিলিও শুধুমাত্র আকাশের জ্যোতিষ্কদের উপর গবেষণাতেই সন্তুষ্ট রইলেন না। পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন পার্থিব ঘটনার সম্পর্কে অনুসন্ধান করলেন গ্যালিলিও। এও আর এক নতুন চিন্তাধারা। পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে দিয়েই বিশ্বজগত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে হবে, প্রাচীন দর্শনের বই পড়ে তা সম্ভব নয় – গ্যালিলিওর এই মত স্থিতাবস্থার দর্শনের একেবারে মূলেই কুঠারাঘাত করল। অ্যারিস্টটল বলেছিলেন যে দুটি পতনশীল বস্তুর মধ্যে ভারী বস্তুটি আগে মাটিতে পড়বে। তার পর প্রায় দু হাজার বছর পণ্ডিতরা প্ৰায় কেউই এর বিরোধিতা করেননি। এগিয়ে এলেন গ্যালিলিও। তিনি বললেন যে বাতাসের ঘর্ষণকে উপেক্ষা করলে দুটি বস্তুই একই সঙ্গে নীচে পড়বে। তাঁর আগে যে এ বিষয়ে অ্যারিস্টটলের মতের সমালোচনা কেউ করেন নি তা নয়, কিন্তু গ্যালিলিও প্রথম প্রকাশ্যে পরীক্ষাটা করেও দেখালেন। তোমরা সবাই নিশ্চয় পিসার হেলানো মিনারের উপর থেকে দুটি বল ফেলে করা তাঁর পরীক্ষার গল্প শুনেছ। যদিও সত্যিই গ্যালিলিও ঐ মিনারেই পরীক্ষাটা করেছিলেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে, তবে আমরা জানি যে তিনি বিভিন্ন টাওয়ারের উপর থেকে দুরকম ওজনের বল ফেলে তাঁর ছাত্রদের দেখাতেন। ঠিক কোন সময় থেকে গ্যালিলিও প্রকাশ্যে অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা শুরু করেন বলা কঠিন, তবে অনেকেই মনে করেন যে এই কারণেই পিসার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্যালিলিওর চাকরি গিয়েছিল।
       পতনশীল বস্তুর গতি সংক্রান্ত মাপজোক করা সে সময় নির্ভুল ভাবে সরাসরি করা ছিল কঠিন, তাই গ্যালিলিওকে পরোক্ষ পদ্ধতির সাহায্য নিতে হয়েছিল। তিনি একটি মসৃণ নততলে একটি বল গড়িয়ে পরীক্ষা করেন। তখন গতিবিদ্যার শৈশব অবস্থা, তাই গ্যালিলিওর পক্ষে জানা সম্ভব হয় নি যে তাঁর পরীক্ষাতে বলের ঘূর্ণনের হিসাব ধরতে হবে। তাই গ্যালিলিওর মাপে অনেক ভুল ছিল, কিন্তু তার জন্য তাঁর কৃতিত্বকে বিন্দুমাত্র ছোটো করা যাবে না। প্রকল্প বা হাইপোথিসিস উত্থাপন ও পরীক্ষার মাধ্যমে তার সত্যতা যাচাই করার যে পদ্ধতি গ্যালিলিও শুরু করেছিলেন, তা আধুনিক বিজ্ঞানের এক মূল স্তম্ভ।
       গ্যালিলিওর মতে পরীক্ষা নিরীক্ষা ও প্রমাণ ছাড়া কোনো কিছুই স্বীকার করা যাবে না। তাঁর সময়ের দর্শনের পণ্ডিতরা দূরবিন দিয়ে তাকাতেই রাজি হলেন না। কারণ তাঁরা তো চিন্তাভাবনা করেই ব্ৰহ্মাণ্ডটা কেমন তা জেনে গেছেন, সেখানে প্রত্যক্ষ প্রমাণের কোনো প্রয়োজন নেই। পক্ষান্তরে পতনশীল বস্তুর গতি সম্পর্কে গ্যালিলিওর নিজের প্রথমে যে মত ছিল, পরীক্ষার ফল দেখে তার পরিবর্তন করতে হয়। অর্থাৎ চিন্তা করে বিশ্ব সম্পর্কে জানা যাবে না, বাস্তবে যেটা দেখা যাচ্ছে সেটাকেই ঠিক বলে মেনে নিতে হবে। এই মত ছড়িয়ে পড়লে কি লোকে আর ধর্মগ্রন্থ বা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে বিনা প্রশ্নে মেনে নেবে?
       তাই সহজে সমাজ গ্যালিলিওকে মেনে নেয় নি। শুধু তো অ্যারিস্টটলের বিরোধিতা নয়, তিনি তো সমস্ত প্রতিষ্ঠিত চিন্তাভাবনাকেই অস্বীকার করছেন। তার উপর গ্যালিলিও আবার তাঁর মত ১৬৩২ সালে ইতালিয়ান ভাষাতে প্রকাশ করলেন, সেকালের পণ্ডিতদের মতো সাধারণের অবোধ্য ল্যাটিন ভাষাতে নয়। সাধারণ মানুষের তাই সত্যি কথাটা জানতে কোনো অসুবিধা হলো না। গ্যালিলিও নিজে কিন্তু খ্রিস্টধর্মে গভীর বিশ্বাস রাখতেন। তিনি শুধু চেয়েছিলেন যে ধর্ম তার নিজের জায়গায় থাকুক, তা যেন বাস্তব জগতে হস্তক্ষেপ না করে। বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের বর্ণনা কোপার্নিকাস আর টলেমির মধ্যে কে ঠিকঠাক করেছেন, তা বাইবেল ঠিক করে দেবে না। কিন্তু সে সময়ের সমাজের যাঁরা মাথা, তাঁরা গ্যালিলিওর লেখা পড়ে প্ৰমাদ গুনলেন। ধর্ম তাদের কাছে প্রচলিত ব্যবস্থাকে বজায় রাখার হাতিয়ার, তাকে বাস্তব জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করলে তাঁদের সেই অস্ত্রটাই অকেজো হয়ে যাবে। 
        তাই রোমান ক্যাথলিক চাৰ্চ শুরু করল গ্যালিলিও বিচার। প্ৰায় সত্তর বছরের বৃদ্ধ বিজ্ঞানীকে রোমে ডেকে পাঠানো হলো। বিচারে পরে তাঁকে বাকী জীবন বন্দী থাকার শাস্তি দেওয়া হলো। শুধুমাত্র সমকালীন বিজ্ঞানী মহলে তাঁর প্রভাবের জন্যই তাঁকে ব্রুনোর মতো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। তাঁকে দিয়ে জোর করে বলিয়ে নেয়া হলো যে তিনি ভুল বলেছিলেন। তাঁকে ফ্লোরেন্সে গৃহ বন্দী করে রাখা হয় এবং তাঁর মতকে ভুল বলে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন যে গ্যালিলিওকে শাস্তি দেওয়ার জন্য জাল নথিপত্র পেশ করা হয়েছিলো।
গ্যালিলিওর বিচার, শিল্পী ক্রিস্টিয়ানো বানতি
       ১৬৩৩ সালের সেই বিচার আজ ইতিহাস, ১৯৯২ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চ ঘোষণা করেছে যে গ্যালিলিওর বিচার আসলে দু পক্ষের ভুল বোঝাবুঝির ফল। বুঝতে অসুবিধা নেই যে গ্যালিলিও চার্চকে ভুল বোঝেন নি, প্রতিষ্ঠিত ধর্ম গ্যালিলিওর মতো লোকদের বুঝতে চিরকালই অক্ষম। তবে সত্যকে অস্বীকার করলেই তো আর তা মিথ্যা হয়ে যাবে না। তাই পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের যে ভিত্তি স্থাপন গ্যালিলিও করলেন, তার উপরই আধুনিক বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে। গ্যালিলিওকে শাস্তি দেবার ফলে সমাজপতিরা যা চেয়েছিলেন, হলো ঠিক তার উল্টো। সমকালীন বিজ্ঞানী মহলে তাঁর খ্যাতি ও প্রভাব ছিল সবার উপরে। তাঁর পরিণতি দেখে বিজ্ঞানীরা ধর্মের কর্তৃত্ব সম্পর্কে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন। তাই বিজ্ঞানের উপর প্রতিষ্ঠিত ধর্মের প্রভাব হ্রাসের সূচনা হিসাবে ১৬০৯ সালকে চিহ্নিত করা যেতে পারে।
       শেষ জীবনে অর্থাৎ ১৬৩৭ সালে গ্যালিলিও অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। গৃহবন্দী অন্ধ বিজ্ঞানীর গবেষণাতে বিন্দুমাত্র ভাঁটা পড়েনি, ইউরোপের অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে চিঠি মারফত মত বিনিময় করেছেন। ১৬৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গতিবিদ্যা সংক্রান্ত নতুন বই। তিনি যে পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন, পরবর্তীকালে নিউটন সেখান থেকেই গবেষণা শুরু করেন। ১৬৪২ সালের ৮ই জানুয়ারি গ্যালিলিওর মৃত্যু হয়।
       বিজ্ঞানের ইতিহাসে গ্যালিলিওর সবচেয়ে বড়ো কৃতিত্ব কী? তিনি জ্যোতির্বিদ্যাতে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন। গণিত ও পদার্থবিদ্যার মেল বন্ধন ঘটিয়ে আধুনিক পদার্থবিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। গতিবিদ্যার সূত্র প্রয়োগ করে জোয়ার ভাটার ব্যাখ্যা দেন ও ভাসমান বস্তুর উপর গবেষণা করেন। শব্দবিজ্ঞানের সূচনা তাঁর হাতে, তিনি সে বিষয়ে বহু সূত্র আবিষ্কার করেন এবং তাদের ব্যাখ্যা দেন। তারের বাদ্যযন্ত্র সংক্রান্ত তাঁর গবেষণা আধুনিক যুগকে মনে করিয়ে দেয়। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রভূত উন্নতিসাধন করেন গ্যালিলিও। এত সত্ত্বেও তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি স্থাপন। তিনি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর জন্য পরীক্ষার উপর জোর দেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা যে আগের প্রায় সমস্ত বিজ্ঞানী (আর্কিমিডিস এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম) পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেও তা অধিকাংশ সময় ছিল দেখানোর জন্য, কোনো কিছু মাপার জন্য নয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে পরীক্ষা নিরীক্ষা ও নিখুঁত পরিমাপের উপর। গ্যালিলিওই এই পদ্ধতির সূচনা করেছিলেন। বস্তুর গতি বর্ণনা করতে গিয়ে প্রাচীন দার্শনিকরা তার নিজস্ব প্রকৃতির কথা বলতেন, গ্যালিলিও তার জায়গায় যে ধর্ম দেখা যায়, মাপা যায়, তার উপর জোর দিলেন। তোমরা যারা বড়ো হয়ে বিজ্ঞান করবে, তারা দেখবে যে এই পদ্ধতি কতখানি আধুনিক। সরল দোলকের দোলনকাল মাপার কথা আগেই বলেছি। ঠিক তেমনি, চাঁদে পাহাড় দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার উচ্চতা মাপার কাজটাও তিনি করেন। আকাশে নতুন তারা দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার দূরত্ব মাপার চেষ্টা করেন। দুটি বস্তু একসঙ্গে ফেললে মাটিতে পড়ার সময় তাদের মধ্যে কতখানি ব্যবধান থাকবে সেটা নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। তিনিই প্ৰথম বলেন যে বাতাসের বাধার জন্যই যে তারা একসঙ্গে পড়তে পারছে না। সৌর কলঙ্ক পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে তার থেকে সূর্যের নিজের চারপাশে ঘুরতে কতো সময় লাগে সেটা বার করেন। দূরত্ব মেপে দেখান যে সৌরকলঙ্করা সূর্যেরই অংশ। তিনিই প্ৰথম আলোর বেগ মাপার চেষ্টা করেন যদিও একাজে তিনি সফল হননি। প্ৰথম থার্মোমিটারও তিনি তৈরি করেন। তাঁর পরামর্শেই তাঁর ছাত্র টরিশেলি বায়ুচাপ মাপার যন্ত্র ব্যারোমিটার তৈরি করেন।
       কিন্তু বিজ্ঞানের বাইরেও যে বিরাট সমাজ আছে, গ্যালিলিও সেখানে মানুষের চিরন্তন প্রচলিত ব্যবস্থার শৃঙ্খল ভাঙা মুক্ত জিজ্ঞাসার প্রতীক। প্রত্যক্ষ পরীক্ষার উপর নির্ভর করা, প্রাচীন দর্শনকে প্রমাণ হিসেবে গণ্য না করা, বাস্তব জগত থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করতে চাওয়া, এসমস্ত চিন্তাধারা নিয়ে গ্যালিলিও প্রথম আধুনিক মানুষ। ১৬০৯ সালে যখন তিনি প্রথম তাঁর নিজের তৈরি দূরবিনে চোখ রেখেছিলেন, শুধু বিজ্ঞানে নয়, সমাজেও আধুনিক যুগের সূচনা হয়েছিল বললে অত্যুক্তি হবে না।

(কিশোর জ্ঞানবিজ্ঞন পত্রিকার শারদ ২০০৯ সংখ্যায় প্রকাশিত, পরিমার্জিত)








Thursday, 29 June 2017

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কলেজঃ সূচনা পর্ব
















































কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইতিহাস কিশোরদের জন্য জয়ঢাক ওয়েবপত্রিকায় লিখেছিলাম। সেটা এখানেপাওয়া যাবে।