Saturday, 22 June 2024

বোসন, নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু

 

বোসন, নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 


 


আজ থেকে একশো বছর আগে সত্যেন্দ্রনাথ বসু তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেছিলেন। আইনস্টাইনকে তিনি সেটি পাঠিয়েছিলেন, আইনস্টাইন তার গুরুত্ব বুঝতে পেরে সেটি নিজেই জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। এর পরে আইনস্টাইন সেই কাজটিকে আরো বিকশিত করেন, এই ভাবেই বোস আইনস্টাইন সংখ্যায়নের সৃষ্টি। যে সমস্ত কণারা এই সংখ্যায়ন মেনে চলে অনেক পরে বিজ্ঞানী পল ডিরাক তাদের নাম দেন বোসন। এই ইতিহাস জ্ঞান ও বিজ্ঞান-এর পাঠকদের সকলেরই জানা। সত্যেন্দ্রনাথের গবেষণার দু' বছরের মধ্যে এনরিকো ফের্মি দেখান যে আর এক ধরনের কণা আছে যারা অন্য এক ধরনের সংখ্যায়ন মেনে চলে, পরে ডিরাকও সেই সংখ্যায়ন স্বাধীনভাবে আবিষ্কার করেন। সেই সংখ্যায়নের নাম ফের্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন, যে সমস্ত কণা তাকে অনুসরণ করে, তাদের নাম ফের্মিয়ন।

বোসনের উদাহরণ হল ফোটন, আবার ইলেকট্রন প্রোটন নিউট্রন কোয়ার্ক ইত্যাদি কণা হল ফের্মিয়নের উদাহরণ। আমরা জানি নিউক্লিয়াসের মধ্যে থাকে প্রোটন ও নিউট্রন, তাই সচরাচর নিউক্লিয়াসের আলোচনার সময় বোসনের কথা মনে না আসতেই পারে। কিন্তু নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানেও বোসনের ভূমিকা আছে, এই লেখাতে আমরা খুব সংক্ষেপে সেই দিকে চোখ রাখব।

ফোটন ছাড়া প্রথম যে বোসন কণা আবিষ্কার হয়েছিল, তা হল পাই মেসন, বা সংক্ষেপে পায়ন। ১৯৩৫ সালে জাপানি বিজ্ঞানী হিদেকি ইউকাওয়া নিউক্লিয়াসের মধ্যে প্রোটন নিউট্রনদের মধ্যে বলকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এক নতুন কণার প্রস্তাব করেন, পরে তার নাম দেওয়া হয় পাই মেসন। মেসন কথাটা এসেছে গ্রিক ভাষা থেকে, শব্দটার অর্থ হল মধ্যবর্তী। প্রোটনের ভর হল ইলেকট্রনের ১৮৩৬ গুণের কাছাকাছি, এই দুই কণার মধ্যবর্তী ভরের কোনো কণার কথা তখন জানা ছিল না। ইউকাওয়া অঙ্ক কষে দেখিয়েছিলেন এই নতুন কণাটির ভর হওয়া উচিত ইলেকট্রনের দু'শো থেকে তিনশো গুণ। অবশ্য এই ধরণের কণার নামকরণ নিয়ে বেশ বিতর্ক হয়েছিল, মেসোট্রন ও মেসোটন এই দুটো নামও ব্যবহার হত। মেসন নামের প্রস্তাব করেছিলেন হোমি জেহাঙ্গির ভাভা।

পরীক্ষাগারে পায়নের আবিষ্কারের ঘটনা বেশ চিত্তাকর্ষক। ইউকাওয়ার তত্ত্ব প্রকাশের দু' বছরের মধ্যেই মহাজাগতিক রশ্মির মধ্যে বিজ্ঞানীরা অনুরূপ ভরের একটি কণা খুঁজে পান, কিন্তু পরে দেখা যায় সেটি আলে ইউকাওয়ার প্রস্তাবিত পায়ন নয়। সেটি একটি ফের্মিয়ন, তখন তাকে বলা হত মিউ মেসন, এখন আমরা বলি মিউয়ন। আমাদের দেশে দেবেন্দ্রমোহন বোস ও তাঁর ছাত্রী বিভা চৌধুরি পায়ন কণা আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হননি। ব্রিটেনে সিসিল পাওয়েল নিশ্চিতভাবে কণাটির চিহ্ন খুঁজে পান। তার পরেই ১৯৪৯ সালে ইউকাওয়া ও ১৯৫০ সালে পাওয়েলকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।

আমরা এখন জানি পায়ন হল তিন রকম, π+, π0, π- এর পরে আরো অনেক মেসন আবিষ্কার হয়েছে, তাদের অনেকের ভর প্রোটনের থেকে অনেক বেশি, তবে মেসন কথাটাই চালু হয়ে গেছে। আধুনিক যুগের ভাষায় বললে আমরা বলি যে সমস্ত কণা একটা কোয়ার্ক ও একটা অ্যান্টিকোয়ার্ক বা প্রতিকোয়ার্ক দিয়ে তৈরি, তাদের বলে মেসন। এখনো পর্যন্ত প্রায় দু'শো মেসনের সন্ধান পাওয়া গেছে, তাদের অনেকেরই ভর এত বেশি যে নিউক্লিয়াসের মধ্যের বলে তাদের বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। তবে তারা সবাই বোসন।

বোস ঘনীভবন বা বোস কন্ডেনসেশন কথাটা অনেকে শুনেছেন, জ্ঞান ও বিজ্ঞান-এর এই সংখ্যাতেই অন্য লেখাতে সেই নিয়ে আলোচনা আছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় পদার্থ সাধারণভাবে কঠিন তরল ও গ্যাসীয়, এই তিন দশাতে অবস্থান করে। বোস ঘনীভূত অবস্থাকে বলা হয় সম্পূর্ণ নতুন এক দশা, তার সঙ্গে সাধারণ পদার্থের কোনো মিল নেই। বোসনের বৈশিষ্ট্য হল যে একই শক্তিস্তরে যত খুশি বোসন থাকতে পারে। ফলে অতি শীতল তাপমাত্রায় সমস্ত কণা নিচের শক্তিস্তরে চলে গিয়ে এই ঘনীভূত অবস্থার সৃষ্টি করে। তাত্ত্বিকভাবে দেখানো হয়েছে যে বিশেষ পরিস্থিতিতে পায়নের ক্ষেত্রেও এই ঘনীভূত অবস্থা বা পায়ন কন্ডেনসেশনের সৃষ্টি করতে পারে। তবে পরীক্ষাগারে পায়ন কন্ডেনসেট সৃষ্টি এখনো আমাদের ক্ষমতার অতীত। নিউট্রন তারা হলো ভারি তারকার জীবনের শেষ অবস্থা, তা প্রায় সম্পূর্ণ নিউট্রন দিয়ে তৈরি। এই তারার ঘনত্ব খুব বেশি, এক চামচ পদার্থেভর হবে দশ কোটি টন। এই অতি ঘন অবস্থায় পায়ন ঘনীভবন হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

মৌলিক কণা বা কণাসমষ্টির এক ধর্ম হল স্পিন। এই স্পিনকে প্লাঙ্কের ধ্রুবকের সঙ্গে যুক্ত করে লেখা যেতে পারে s= nh /2π. বোসনের ক্ষেত্রে n-এর মন পূর্ণসংখ্যা অর্থাৎ 0, 1,,2,.. হতে পারে। ফের্মিয়নের ক্ষেত্রে মান হয় অর্ধপূর্ণ সংখ্যা অর্থাৎ 1/2, 3/2, 5/2,... এমন। পায়নের জন্য n-এর মান 0। পায়নের থেকে ভারি দুটি মেসন হল ওমেগা ও রো (ρ)। এই দুটির জন্যই n=1। নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যাতে আধুনিক এক তত্ত্বে নিউক্লিয় কণাদের মধ্যে বলকে ফোটন ও এই তিনটি মেসন বয়ে নিয়ে যায় ধরে নিয়ে নিউক্লিয়াসের গঠন ও অন্যান্য ধর্ম খুব সফলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

দুটি বোসনের স্পিন যোগ করলে তা আবার পূর্ণসংখ্যা দিয়েই প্রকাশিত হবে, দুটি ফের্মিয়নের ক্ষেত্রেও তাই। যেমন কোয়ার্ক বা অ্যান্টিকোয়ার্কের স্পিনের জন্য n-এর মান 1/2। আগে দেখেছি একটি কোয়ার্ক ও একটি অ্যান্টিকোয়ার্কের সাহায্যে মেসন কণা গঠিত হয়। দুটি কণার স্পিনকে যোগ করলে মোট স্পিনের জন্য n-এর মান 0 বা 1 হতে পারে; অর্থাৎ তারা বোসন।

আমরা সবাই অতিপরিবাহিতা বা সুপারকন্ডাক্টিভিটির নাম শুনেছি। সুপারকন্ডাক্টিভিটির প্রথম ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তিন বিজ্ঞানী, জন বার্ডিন, লিওন কুপার এবং জন শ্রিফার; সেই কৃতিত্বের জন্য তাঁরা ১৯৭২ সালে নোবেপ পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনজনের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে এই তত্ত্বকে বলা হয় বিসিএস তত্ত্ব। তাঁরা দেখান অতি নিম্ন তাপমাত্রায় ধাতুর দুটি ইলেকট্রন মিলে একটি ইলেকট্রন যুগ্ম তৈরি করে, একে বলে কুপার যুগ্ম। ইলেকট্রনের স্পিনও কোয়ার্কের মতন, অর্থাৎ কুপার যুগ্ম হল বোসন, তার জন্য n=0। বিজ্ঞানীরা দেখেন যে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যে দুই ধরনের ফের্মিয়ন কণা প্রোটন ও নিউট্রন আছে, তাদের মধ্যেও এই ধরনের যুগ্মন বল খুব শক্তিশালী হয়। ফলে নিউক্লিয়াসের মধ্যেও দুটি প্রোটন বা দুটি নিউট্রন মিলে কুপার যুগ্ম তৈরি করতে পারে। এইভাবে বিসিএস তত্ত্বকে নিউক্লিয়াসের নানা ধর্মের ব্যাখ্যাতে খুব সফলভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে। এই কুপার যুগ্ম কোনো মৌলিক কণা নয়, মেসনের সঙ্গে তাদের এই দিক দিয়ে অনেক পার্থক্য আছে। এমন নয় যে কোনো যুগ্মে দুটি বিশেষ কণাই আছে। এই লেখাতে আমরা সেই আলোচনাতে যাচ্ছি না।

এর পরে ১৯৭০-এর দশকে নিউক্লিয় পদার্থবিজ্ঞানে বোসনকে ব্যবহারের এক নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন আকিতো আরিমা ও ফ্রান্সিস্কো ইয়াকেলো। তাঁদের মডেলে দু'টি প্রোটন বা দু'টি নিউট্রন মিলে যে বোসন তৈরি করতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে n-এর মান হতে পারে 0, 2, 3 বা 4; এদের বলা হয় যথাক্রমে s, d, f g বোসন। (পরমাণুর গঠনের ক্ষেত্রে কৌণিক ভরবেগের অনুরূপ নামকরন থেকে বোসনের নামগুলি নেওয়া হয়েছে।) সব থেকে সরল মডেলে থাকে কেবল s d বোসন। এর পরে গ্রুপ থিওরি ও প্রতিসাম্যের ধারণার য়োগ করে তাঁরা নিউক্লিয়াসের আকার ও তার মধ্যের শক্তিস্তর সম্পর্ক নির্ণয় করেন। সেই জটিল আলোচনা এই প্রবন্ধের সীমার বাইরে। তবে একটা কথা বলাই যায় যে তাঁদের গবেষণা থেকে দেখা যায় কিছু কিছু নিউক্লিয়াস এক বিশেষ আকার নেয় যা আগে জানা ছিল না। পরীক্ষাগারে তা প্রমাণিত হয়েছে।

আমরা দেখলাম যে সত্যেন্দ্রনাথ সরাসরি নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা বিষয়ে গবেষণা না করলেও বোসন কণার ধারণা নিউক্লিয় বিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিউক্লিয় বিজ্ঞান সম্পর্কেও তাঁর যথেষ্ট জ্ঞান ছিল; সেই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করে এই লেখা শেষ করব, অবশ্য আগেও জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকাতে এই ঘটনার কথা লিখেছি। । যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সূচনা করেছিলেন শ্যামাদাস চ্যাটার্জি, তিনি ছিলেন বসু বিজ্ঞান মন্দিরে দেবেন্দ্রমোহন বসুর ছাত্র। ১৯৩৮ সালের একেবারে শেষে আবিষ্কার হয় যে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস দু'টুকরো হয়ে যায়, একে বলে ফিশন বা বিভাজন। সেই বিষয়ে কাজ করার সময় শ্যামাদাস দেখলেন যে নিউট্রন উৎস সরিয়ে নিলেও ফিশনের সঙ্কেত তাঁর ডিটেক্টরে ধরা পড়ছে। দেবেন্দ্রমোহন সেই সময় দার্জিলিঙে, তাঁর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ নেই। সত্যেন্দ্রনাথ বসু তখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ছুটিতে কলকাতায় এসেছেন, শ্যামাদাস তাঁর কাছে গিয়ে বিষয়টা খুলে বললেন। সত্যেন্দ্রনাথ প্রথমে বলেন মহাজাগতিক রশ্মির কথা। শ্যামাদাস ইউরেনিয়ামকে সিসের চাদর দিয়ে মুড়ে মহাজাগতিক রশ্মি কমানোর ব্যবস্থা করলেন, কিন্তু সঙ্কেত আসা কমল না। সত্যেন্দ্রনাথ তখন অনুমান করলেন যে ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াস নিজে নিজেই ভেঙে যাচ্ছে। সে সময় নিউক্লিয় বিভাজন ব্যাখ্যা করার জন্য নিল্‌স বোর ও জন হুইলারের তত্ত্ব ব্যবহার করা হত, সেই অনুযায়ী এই ঘটনা অসম্ভব। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ চিরকালই পরীক্ষানিরীক্ষাকে তত্ত্বের থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন; তিনি শ্যামাদাসকে তাঁর গবেষণার কথা ছাপানোর পরামর্শ দেন। শ্যামাদাসও সেই মতো গবেষণাপত্রটি লিখে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু দেবেন্দ্রমোহন কলকাতাতে ফিরে এসে শ্যামাদাসের পরীক্ষা দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি; হয়তো তাঁর মনে হয়েছিল যে নিল্‌স বোরের তত্ত্বে ভুল থাকতে পারে না। তিনি শ্যামাদাসকে গবেষণাপত্র ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেন। ঠিক দু’মাস পরে দুই সোভিয়েত বিজ্ঞানী ফ্লেরভ ও পেত্রাক ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের নিজে নিজে ভেঙে পড়ার কথা প্রকাশ করেন।

 

প্রকাশিত জ্ঞান ও বিজ্ঞান, জুলাই ২০২৪

Wednesday, 1 May 2024

ইতিহাসে গ্রহণ

 

ইতিহাসে গ্রহণ

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


গ্রহণ কেন হয় এখন সকলেই জানেন। বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের তারিখ, সময় ও কোথা থেকে তা দেখা গিয়েছিল তা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব হয়েছে। এই লেখাতে আমরা দেখব গ্রহণের সম্পর্কে আধুনিক হিসাব থেকে আমরা কেমন করে ইতিহাসের সাল তারিখ নির্ণয় করতে পারি। প্রাচীন যুগের ইতিহাস কাব্য ইত্যাদিতে যে সমস্ত সন তারিখ ব্যবহার করা হত, তাদের সঙ্গে প্রায়শই আমাদের আধুনিক হিসাবের কোন মিল থাকে না; অনেক সময় রাজা পরিবর্তন হলে নতুন ক্যালেন্ডার শুরু হত, বা পাশাপাশি দুই জায়গায় সম্পূর্ণ আলাদা পদ্ধতি অনুসরণ করা হত। এই সমস্ত কারণে নানা ঘটনা ঠিক কবে ঘটেছিল তা জানা বেশ দুরূহ। প্রায় সব প্রাচীন সমাজই গ্রহণকে অমঙ্গলের চিহ্ন হিসাবে দেখত বা ভয় পেত। তাই সেযুগের মানুষ অনেক নথিপত্র সাহিত্য ইত্যাদিতে এই 'ভয়ঙ্কর' ঘটনার বিবরণ লিখে রাখত। সেই সমস্ত বিবরণ থেকে আধুনিক বিজ্ঞান সেগুলি কবে হয়েছিল তা বার করার চেষ্টা করেছে। তার সঙ্গে পুরানো যুগের তারিখের হিসাব মিলিয়ে আমরা প্রাচীন আর আধুনিক ক্যালেন্ডারকে এক জায়গায় আনতে পারি। ইতিহাসের গ্রহণ বিজ্ঞানেরও কাজে লাগে; সে কথাও আমরা সংক্ষেপে শুনব।

 
মূল বিষয়ে যাওয়ার আগে খুব সংক্ষেপে গ্রহণ সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলে নিই। আমরা জানি যে প্রতি অমাবস্যাতে সূর্যগ্রহণ বা প্রতি পূর্ণিমাতে চন্দ্রগ্রহণ হয় না, কারণ চাঁদের পৃথিবীকে পরিক্রমণের কক্ষতল ও পৃথিবীর সূর্যকে পরিক্রমণের কক্ষতল পরস্পরের মধ্যে ৫.১৪ ডিগ্রি কোণ করে থাকে। চাঁদের পথ যে দুই বিন্দুতে পৃথিবীর পরিক্রমণ তলকে ছেদ করে সেই দুটিকে বলা হয় নোড বা চন্দ্রপাত। আমাদের দেশে আর্যভাট যখন গ্রহণের সঠিক কারণ নির্ণয় করেন তখন তিনি প্রাচীন পুরাণ অনুসরণ করে এই দুই বিন্দুর নাম দিয়েছিলেন রাহু ও কেতু। চাঁদ যখন এই দুটি নোডের কাছাকাছি থাকে, তখন গ্রহণ হওয়া সম্ভব।



বিশেষ করে সূর্যগ্রহণ ইতিহাসের কাল নির্ণয়ে অনেক কাজে লাগে কারণ চাঁদের ছায়া খুব ছোট বলে সূর্যগ্রহণ, বিশেষ করে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ খুব কম পরিসর স্থানের মধ্যে হয়। তাই কোনো স্থানে পরপর দুটি সূর্যগ্রহণের মধ্যে ৩৭০ বছরের কাছাকাছি পার্থক্য থাকে। সেই জন্য কোনো জায়গায় সূর্যগ্রহণের বর্ণনা পেলে সেই গ্রহণের তারিখ সম্পর্কে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া যায়। চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়ে, ফলে পৃথিবীর যে অংশে রাত সেখান থেকেই চন্দ্রগ্রহণ দৃশ্যমান হয়। তাই যে কোনো জায়গায় থেকে পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ অনেক ঘনঘন হয়। কোনো ঘটনা বারবার ঘটলে তার থেকে বিশেষ একটাকে আলাদা করা শক্ত; তা সত্ত্বেও চন্দ্রগ্রহণকে ইতিহাসের কালনির্ণয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। আর একটা কথা মনে রাখতে হবে, তা হল পৃথিবী ও চাঁদের কক্ষপথ বৃত্তাকার নয়, উপবৃত্তাকার। ফলে চাঁদ সূর্য ও পৃথিবীর আপেক্ষিক অবস্থান পাল্টে গেলে পৃথিবী বা চাঁদের ছায়ার আকার ছোট বড় হয়। তার উপর গ্রহণের স্থায়িত্বকাল ও কোন জায়গা থেকে সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে নির্ভর করে। তেমনি গ্রহণের প্রকৃতিও এই আপেক্ষিক অবস্থানের উপর নির্ভর করে; যেমন সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ যদি পৃথিবী থেকে অনেকটা দূরে থাকে, তাহলে তার পক্ষে পুরো সূর্যকে ঢাকা সম্ভব হয় না, তখন বলয়গ্রাস হয়। তাই প্রাচীন ইতিহাস, কাব্য, পুরাণ বা অন্য কোনো সূত্রে যদি গ্রহণের বর্ণনা থাকে, তাহলে তার সঙ্গে মিলিয়ে সেই ঘটনা ঠিক কবে ঘটেছিল তা নির্ণয় করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিজ্ঞানের যে শাখা এভাবে জ্যোতির্বিদ্যা ও ইতিহাসের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করে তাকে বলে প্রত্নজ্যোতির্বিদ্যা।

এখানে আরো একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, তা হল পৃথিবীর ঘূর্ণনকাল চিরকাল একই রকম নয়। পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য আস্তে আস্তে বাড়ছে, তার জন্য দায়ী চাঁদের টানপৃথিবী নিজের চারদিকে তেইশ ঘণ্টা ছাপ্পান্ন মিনিটে একবার পাক খায়, একে বলে নাক্ষত্র দিনচাঁদ পৃথিবীর চারদিকে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় সাতাশ দিন সাত ঘণ্টার মতো। এটা কিন্তু দুটো পূর্ণিমা বা দুটো অমাবস্যার মধ্যের পার্থক্য নয়, সেটা সাড়ে উনত্রিশ দিন। এ হল চাঁদের নাক্ষত্র মাসদেখা যাচ্ছে চাঁদ অনেক আস্তে ঘোরে; ফলে পৃথিবীর মহাসমুদ্রের যে জলরাশি পৃথিবীর ঘূর্ণনের সঙ্গে এগিয়ে যেতে চায়, চাঁদ তাকে পিছন থেকে টেনে ধরে। এর জন্য জলরাশি ও সমুদ্রতলের মধ্যে ঘর্ষণ হয় ও পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারপাশে ঘূর্ণন বেগ কমে যায়। একশো কোটি বছর আগে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য ছিল আঠারো ঘণ্টার মতো। কুড়ি কোটি বছরে পরে তা বেড়ে হবে পঁচিশ ঘণ্টা। গত কয়েক হাজার বছরে পৃথিবীর ঘূর্ণন গতির এই পরিবর্তনকেও হিসাবে না আনলে কোনোভাবেই গ্রহণের সময় মেলানো যায় না। পৃথিবীর আবর্তন ও পরিক্রমণ এবং চাঁদের পথ মিলে এমন হয় যে কোনো জায়গায় সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণ ঘটলে তার মোটামুটি ৫৪ বছর (বিয়াল্লিশটি সাধারণ বছর ও বারোটি অধিবর্ষ) ৩৪ দিন পরে আবার একই রকম গ্রহণ হয়। প্রাচীন সুমের সভ্যতা এই সময়কাল আবিষ্কার করেছিল। প্রাচীন যুগে অবশ্য গ্রহণের কারণ প্রথমে জানা ছিল না। তবে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণের পরে সুমের সভ্যতার পুরোহিত বা জ্যোতির্বিদরা এই সময়ের অন্তরের বিষয়টা জানতে পেরেছিলেন।

গ্রহণের সব থেকে প্রাচীন সম্ভাব্য রেকর্ড আবিষ্কার হয়েছে আয়ারল্যান্ডের লখ ক্রিউ নামের এক জায়গায়। সেখানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের কথা পাথরের খোদাই করে ছবির আকারে লিখে রাখা হত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তা থেকে ৩৩৪০ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর হওয়া এক সূর্যগ্রহণের কথা জানা যাচ্ছে। কাছেই পাওয়া গেছে প্রায় পঞ্চাশটি পুড়িয়ে মারা মানুষের দেহাবশেষ, সম্ভবত গ্রহণের সময় দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য এদের বলি দেওয়া হয়েছিল। প্রাচীন চিনে মনে করা হত গ্রহণের সময় এক ড্রাগন সূর্য বা চন্দ্রকে গিলে খায়, তাই তাকে ভয় দেখানোর জন্য আকাশে তীর ছোঁড়া হত এবং ঢাকঢোল বাজিয়ে হৈহল্লা করে তাড়ানোর চেষ্টা করা হত। এ জন্য গ্রহণের খবর বলা ছিল জ্যোতির্বিদদের দায়িত্ব। চিনের প্রাচীন গ্রন্থ সু চিং থেকে জানা যায় একবার সম্রাটের দুই জ্যোতির্বিদ আগে থেকে এক সূর্যগ্রহণের কথা বলতে পারেনি বলে তাদের শিরশ্ছেদ করা হয়। গ্রহণের অনেকদিন পরে এই ঘটনার কথা লেখা হয়েছিল বলে তারিখ নিয়ে মতবিরোধ আছে; অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন ২১৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ২২ অক্টোবর এই গ্রহণটি ঘটেছিল। তবে এই সমস্ত ইতিহাস নিয়ে কিছুটা সমস্যা থেকেই যায়। যেমন সিরিয়ায় পাওয়া এক মৃৎফলকে ১২২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ৫ মার্চ এক সূর্যগ্রহণের কথা আছে বলে মনে করা হত, কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাতে তা আদৌ গ্রহণের বর্ণনা কিনা তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাচীন চিনের জ্যোতির্বিদরা আগে থেকে সূর্যগ্রহণের তারিখ বলতে পারতেন এমন কোনো প্রমাণ নেই, তাই সু চিং-এর কাহিনিটা সত্য কিনা বলা শক্ত। সূর্যগ্রহণের কথা লিখে রাখার প্রাচীনতম নিশ্চিত উদাহরণ অবশ্য চিনের ইতিহাস থেকেই পাওয়া গেছে। সেই গ্রহণটি হয়েছিল ৭০৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১৭ জুলাই।

ইতিহাস থেকে জানা যায় যে গ্রিসের পণ্ডিত থালেস  আগে থেকে এক সূর্যগ্রহণের বিষয় ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন, সেটা মিলে যাওয়াতে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ অবশ্য থালেস গ্রহণের সময়কালের হিসাব জানতেন কিনা তাই নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে অন্যরা বলেন যে থালেস নিজে মিশরে গিয়েছিলেন, এবং সুমের সভ্যতার সঙ্গে মিশর ও গ্রিসের যোগাযোগ ছিল; তাই গল্পটার সত্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আধুনিক হিসাবে জানা গেছে সেই সূর্যগ্রহণ ঘটেছিল ৫৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মে মাসের ২৮ তারিখ। তবে থালেস নিসন্দেহে গ্রহণের প্রকৃত কারণ জানতেন না; খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে গ্রিক দার্শনিক অ্যানাক্সাগোরাস প্রথম বলেন গ্রহণের কারণ হল চাঁদ ও পৃথিবীর ছায়া।

বিখ্যাত গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস তাঁর বই 'হিস্টরি'-তে তিনবার দিনের বেলা অন্ধকার নেমে আসার কথা লিখেছেন; মনে করা হয় সেগুলি ছিল সুর্যগ্রহণের বর্ণনা। গ্রিস ছিল অনেক নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত, তাদের আলাদা আলাদা ক্যালেন্ডার ছিল; ফলে বিভিন্ন ঘটনার সময়কাল নিয়ে কিছুটা সমস্যা থেকে গেছে। তার সমাধানের জন্য হেরোডোটাসের ব্যবহার করা তারিখের সঙ্গে আধুনিক যুগের সাল তারিখের হিসাব মেলাতে এই সূর্যগ্রহণদের ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছে। এই তিনটির মধ্যে একটি হল থালেসের সূর্যগ্রহণ। সেই সময়েই দুই দেশ (বর্তমান ইরানের) লিডিয়া ও মেডিয়ার মধ্যে যুদ্ধ হচ্ছিল, গ্রহণের কারণে ভয় পেয়ে দুই পক্ষ শান্তি স্থাপন করে। এই ভাবে সেই যুদ্ধের তারিখ জানা গেছে। অবশ্য সেই নিয়েও বিতর্ক আছে, কারণ সেই গ্রহণটা হয়েছিল সূর্যাস্তের ঠিক আগে; সেই যুগে সাধারণত এরকম সময়ে যুদ্ধ হত না। দ্বিতীয় একটি গ্রহণের কথা আছে গ্রিক ও পারসিকদের যুদ্ধের প্রসঙ্গে, সেটির তারিখও নির্ণয় করা গেছে। সেটি হয়েছিল ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ২ অক্টোবর। এই তারিখটি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এর অল্পদিন আগেই অপর একটি সূর্যগ্রহণের বর্ণনা হেরোডোটাস লিখেছেন বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন, কিন্তু সে সময় ওই অঞ্চলে ওইরকম কোনো সূর্যগ্রহণ ঘটেনি। অবশ্য এই সমস্ত ঘটনা যখন ঘটেছিল, হেরোডোটাস তখন নেহাতই শিশু; অন্য সূত্র থেকে শুনে বা জেনে লিখেছিলেন বলে হয়তো তাঁর ভুল হয়েছিল।

প্রাচীন গ্রিসের আর এক বিখ্যাত ঐতিহাসিক থুকিদিদিস স্পার্টা ও এথেন্সের মধ্যে পেলেপোনোশীয় যুদ্ধের ইতিহাস লিখেছিলেন। তাঁর লেখা থেকে দুটি সূর্যগ্রহণ ও একটি চন্দ্রগ্রহণের বর্ণনা পাওয়া গেছে যেগুলির তারিখ সন্দেহাতীতভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। ঐতিহাসিকরা বলেন যে সেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এবং শেষ হয়েছিল ৪০৪ খ্রিস্ট পুর্বাব্দে। গ্রহণগুলির তারিখ এই সময়কালকে সমর্থন করে। সূর্যগ্রহণদুটি ঘটেছিল ৪৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ৩ আগস্ট ও ৪২৪ খ্রিস্টপুর্বাব্দের ২১ মার্চ। চন্দ্রগ্রহণটি হয় ২৭ আগস্ট, ৪১৩ খ্রিস্টপুর্বাব্দে।

গ্রহণ থেকে বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের এবং মিশরের ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের রাজত্বকাল হয়তো ঠিকমতো জানা সম্ভব। বাইবেলের একটি অনুচ্ছেদকে বলয়গ্রাসের বর্ণনা ধরে নিয়ে দুই বিজ্ঞানী সম্প্রতি জানিয়েছেন সেই বিশেষ গ্রহণটি ঘটেছিল ১২০৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ৩০ অক্টোবর। বাইবেলে যে ঘটনার বর্ণনা আছে, তাকে প্রাচীন মিশরের রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে সেই সময়ের ফারাওদের রাজত্বকাল ঠিকভাবে জানা সম্ভব বলে বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেছেন। অন্য একটি বিশেষ সূর্যগ্রহণের বর্ণনা ৭৬৩ খ্রিস্টপুর্বাব্দের ১৫ জুনের সূর্যগ্রহণের সঙ্গে মিলে যায়। এই তারিখটা যে সঠিক তা নিয়ে ঐতিহাসিকরা নিশ্চিত, কারণ আসিরিয়ার রেকর্ড থেকে সেইদিন আসুর নগরীতে সূর্যগ্রহণ ও তার ফলে অশান্তির উল্লেখ আছে। এই তারিখকে ভিত্তি করে আসুর সাম্রাজ্যের তিন শতাব্দীর সময়কালের সম্রাটদের রাজত্বকাল সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়েছে।

ধর্মগ্রন্থ, পুরাণ বা মহাকাব্যের বর্ণিত ঘটনার তারিখ নির্ণয়ের চেষ্টাও হয়েছে। এগুলি মূলত মানুষের কল্পনা, তবে তার মূলে কোনো বাস্তব ঘটনার বীজ নিহিত থাকতে পারে ধরে নিয়ে বিজ্ঞানীরা এগিয়েছেন। গ্রিক মহাকাব্য ইলিয়াড হল ট্রয়ের যুদ্ধের কাহিনি; অন্যদিকে ওডিসি হল যুদ্ধের শেষে ইথাকা-র রাজা ওডিসিউসের ঘরে ফেরার বৃত্তান্ত। মহাকাব্যের কাহিনি অনুযায়ী ওডিসিউস পথে অনেক বিপদে পড়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত দশ বছর ধরে যাত্রার পরে তিনি যেদিন রাজ্যে ফিরে আসেন সেদিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। গ্রহণের সময় অন্য গ্রহদের অবস্থানের বর্ণনা থেকে দুই বিজ্ঞানী দেখিয়েছেন যে ওডিসির এক বিশেষ অংশে বুধগ্রহের অবস্থানের কথা বলা হয়েছে বলে ধরে নিলে ১১৭৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ১৬ এপ্রিলের সূর্যগ্রহণের সঙ্গে ওডিসির সেই গ্রহণের বর্ণনা মিলে যায়। অবশ্য তাঁরা সাবধান করেছেন যে এর থেকে ওডিসির সত্যতা প্রমাণ হয় না; তা নেহাতই রূপকথা। এমন হতেই পারে যে ওই সূর্যগ্রহণকে মূলভিত্তি ধরে নিয়েই কবি ওডিসিউসের অভিযানের গল্প তৈরি করেছিলেন। তাছাড়া প্রাচীন মহাকাব্যের অনেক অংশকে আধুনিক যুগে ব্যাখ্যা করার সময় ভুল থাকতেই পারে। ওডিসিউসের অভিযান স্পষ্টতই কল্পনা, সেখানে যে সমস্ত দৈত্যদানবের কথা আছে তাদের অস্তিত্ব পৃথিবীতে কোনোদিন ছিল না। কিন্তু ট্রয়ের যুদ্ধ সত্যিই ঘটেছিল; ট্রয় নগরীর চিহ্ন পাওয়া গেছে যা থেকে অনুমান করা হয় যে তা সম্ভবত ১১৯০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকছি কোনো সময় ধ্বংস হয়েছিল। পুরাণ ও ইতিহাস মিলে ট্রয়ের যুদ্ধের বিভিন্ন রকম তারিখ পাওয়া যায়। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক প্লেটো সেই তারিখটি অনুমান করেছিলেন যে ১১৯৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ, অন্যদিকে প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানী এরাটোস্থেনেসের মতে ট্রয় ধ্বংস হয়েছিল ১১৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। অন্যান্য নানা প্রাচীন সূত্রে ট্রয়ের যুদ্ধের জন্য খ্রিস্টপূর্বাব্দ ১৩৩৩ থেকে ১১৩৫ সালে পর্যন্ত নানা রকমের তারিখ অনুমান করা হয়েছে। যদি ওডিসির সূর্যগ্রহণের বর্ণনা সত্য হয়, ট্রয়ের যুদ্ধের একেবারে সঠিক সময় জানা যাবে।

গ্রহণকে ব্যবহার করে মহাভারতের কাল নির্ণয়েরও চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ওডিসির মতো গ্রহনক্ষত্রের অবস্থানের নিখুঁত বর্ণনা মহাভারতে পাওয়া যায় না। মহাভারতের কাহিনিতে আছে অর্জুন কর্তৃক জয়দ্রথ বধের সময় সূর্যাস্তের অল্প সময় আগে কৃষ্ণ চক্র দিয়ে সূর্য আড়াল করেছিলেন, সেই ঘটনাকে অনেকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের বর্ণনা বলে মনে করেন। অন্যত্র আছে যে ব্যাসদেব যুদ্ধের আগে ধৃতরাষ্ট্রকে বলেছেন যে এমনকি কার্তিক মাসের পূর্ণচন্দ্রও ম্লান হয়ে গেছে। সেটি যদি চন্দ্রগ্রহণের বর্ণনা হয়, তাহলে মহাভারতের কাহিনি থেকে গণনা করে দেখা যায় তার তেরো দিন পরেই যুদ্ধের মধ্যবর্তী সূর্যগ্রহণটি ঘটেছিল; অবশ্য এখানে দিনের ভগ্নাংশকে হিসাবে ধরা হচ্ছে না। কুরুক্ষেত্রের উপর এই দুই গ্রহণ কবে ঘটেছিল তা বিচার করে কাল নির্ণয়ের চেষ্টা হয়েছে।

কিন্তু অন্য কোনো তথ্য হিসাবে না ধরে এই কাজ প্রায় অসম্ভব, কারণ এই ধরনের ঘটনা মোটেই বিরল নয়। এখানেই সমস্যা শুরু হয়েছে। আর্যভাট লিখেছিলেন কলিযুগের শুরুতে সূর্য, চন্দ্র ও সমস্ত গ্রহ মেষ রাশিতে অবস্থান করেছিল। এখানে অবশ্য খালি চোখে যে সমস্ত গ্রহ দেখা যায় তাদের কথাই ধরতে হবে। তাঁর হিসাব মতো কলিযুগের শুরুর তারিখ হবে ৩১০২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। মহাভারতে লেখা আছে কলি যুগ আগতপ্রায়, তাই তেরো দিনের ফারাকে দুই গ্রহণের সাক্ষ্য মিলিয়ে অনেকে সিদ্ধান্ত করেছেন যে মহাভারতের যুদ্ধ ঘটেছিল ৩১৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। অবশ্য আর্যভাটের পক্ষে গ্রহদের গতিবিধির নিখুঁত হিসাব জানা সম্ভব ছিল না, প্রকৃতপক্ষে সেই রকম কোনো ঘটনা সে সময় ঘটেনি। অনেক উৎসাহী তো এমনকি মহাভারতের যুদ্ধকে ৫৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারছেন মহাভারতকে অতি প্রাচীন প্রমাণ করার পিছনে শুধুমাত্র ঐতিহাসিক প্রেরণা কাজ করছে না। তা করতে গিয়ে যে শুধুমাত্র প্রত্নতত্ত্ব বা ইতিহাসের সাক্ষ্যকে অবহেলা করা হয়েছে তা নয়, মহাভারত থেকেও সুবিধামতো তথ্য নেওয়া বা বাদ দেওয়া হয়েছে। যেগুলি এই প্রাচীনত্বের দাবীর সঙ্গে মেলে না, তাদের উল্লেখও করা হয় না। এমনিই উপরের দুটি ঘটনা সত্যিই গ্রহণ কিনা মহাভারতে লেখা নেই। এই ধরনের প্রাচীন সাহিত্যে কোন মহাজাগতিক ঘটনার কথা লেখা হয়েছে তা অনেক সময়েই স্পষ্ট নয়, গবেষক নিজের মতো করে তার ব্যাখ্যা করেন। মনে রাখতে হবে যে আর্যভাট ৪৯৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম চন্দ্রসূর্য গ্রহণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, কিন্তু ব্রহ্মগুপ্ত, বরাহমিহির বা লল্লের মতো পরবর্তী জ্যোতির্বিদরা সেই ব্যাখ্যা স্বীকার না করে রাহু কেতুর গল্পে ফিরে যান। মহাভারত আর্যভাটের বহু যুগ আগে লিখিত। প্রত্নতত্ত্বও এত প্রাচীনত্বের পক্ষে সাক্ষ্য দেয় না, যেমন ভারতে অত প্রাচীন যুগে কোনো ঘোড়ার কঙ্কাল পাওয়া যায়নি, কিন্তু মহাভারতের যুগে ঘোড়া ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরাণের হিসাব থেকে মহাভারতের কালকে খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীর থেকে পুরানো বলা সম্ভব নয়। আধুনিক জিনতত্ত্ব প্রমাণ করে দিয়েছে যে মহাভারত যাদের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, খ্রিস্টজন্মের দুহাজার বছর আগে সেই ইন্দোইরানিয় জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ভারতে ছিল না। ওডিসি ও মহাভারতের কালনির্ণয়ের প্রচেষ্টা থেকে একটা পুরানো কথা আবার বলা যায়, মহাকাব্য ইতিহাস নয়, তাকে কাব্য হিসাবে পড়াই শ্রেয়। দ্বিতীয় আর একটা কথা মনে রাখা প্রয়োজন; শুধুমাত্র জ্যোতির্বৈজ্ঞনিক সাক্ষ্য যথেষ্ট নয়, তার সঙ্গে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ঐতিহাসিক কালে কিছু কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারতের ইতিহাসের কাল নির্ণয়ে গ্রহণকে কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছে। সাহিত্যে বা ইতিহাস ছাড়াও ভারতের ইতিহাসে গ্রহণ সম্পর্কে অন্যেক সাক্ষ্য পাওয়া যায়। গ্রহণকে অমঙ্গল ভেবে সেই সময় বা তার পরে অনেকে মন্দিরে দান করতেন, তাম্রপত্রে সেই সব কথা লেখা আছে। অবশ্য অনেক সময়েই গ্রহণের পরে দান করা হত, কারণ আগে থেকে গ্রহণ সম্পর্কে জানা সম্ভব ছিল না। আর্যভাটের তত্ত্বে বিশ্বাস না করলেও তাঁর নিয়ম অনুসরণ করে গ্রহণ সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করা হত, তবে তার প্রথম লিখিত নজির অনেক পরে পাওয়া যায়। তাম্রপত্র থেকে জানা যায় কালাচুরি রাজ রত্নদেবের সময় পদ্মনাভ নামের এক জ্যোতিষী এক পূর্ণগ্রাস চন্দ্রগ্রহণ সম্পর্কে সঠিক ভবিষ্যৎবাণী করার পুরস্কার হিসাবে একটি গ্রাম পেয়েছিলেন। সেই গ্রহণটি হয়েছিল ১১২৮ সালের ৮ নভেম্বর। ভারতীয় প্রাচীন সাহিত্যে গ্রহণের কথা থাকলেও নবম শতাব্দীর আগে তারিখের উল্লেখ বিশেষ পাওয়া যায় না। তাম্রপত্র থেকে প্রথম যে গ্রহণের খবর জানা যায় তা ছিল এক পূর্ণ সূর্যগ্রহণ, ঘটেছিল ৪৪০ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে।

পদ্মনাভকে প্রদত্ত তাম্রপত্রগুলির একটি

অন্তত একটি ক্ষেত্রে ভারতের ইতিহাসে গ্রহণের সময় থেকে রাজার রাজত্বকালকে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা গেছে। কনৌজরাজ যশোধর্মনের সভাকবি বাকপতিরাজ রাজার প্রশস্তি করে লেখা গৌড়বাহ কাব্য লিখেছিলেন। সেখানে তিনি রূপক অর্থে রাজার প্রশংসা করতে গিয়ে যে বর্ণনা ব্যবহার করেছেন তার সঙ্গে সূর্যের বলয়গ্রাসের অনেক মিল আছে। ভারতীয় সাহিত্যে তার আগে বলয়গ্রাসের এমন নিখুঁত বর্ণনা এর আগে পাওয়া যায় না, তাই কবি যে স্বচক্ষে তা দেখেছিলেন তা অনুমান করা অসঙ্গত হবে না। কনৌজে সেইরকম একটি গ্রহণ হয়েছিল ৭৩৩ সালের ১৪ আগস্ট। যশোধর্মন ৭২৫ থেকে ৭৪৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন।

লেখা শেষ করার আগে খুব সংক্ষেপে দেখা যাক গ্রহণের ইতিহাস বিজ্ঞানকে কেমন ভাবে সাহায্য করেছে। আগেই দেখেছি যে চাঁদের টানের জন্য পৃথিবীর ঘূর্ণন আস্তে আস্তে কমছে। তাছাড়াও এই হার হিমযুগের জন্য সমুদ্রতলের পরিবর্তন, ভূমিকম্প, পৃথিবীর কেন্দ্রমণ্ডল ও পৃথিবীর গুরুমণ্ডলের মধ্যেকার ঘর্ষণ ইত্যাদির উপরেও নির্ভর করে। শুধুমাত্র সমুদ্রতল ও জলরাশির ঘর্ষণকে হিসাবে আনলে দেখা যায় প্রতি শতাব্দীতে দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ার কথা ২.৩ মিলিসেকেন্ড। দিনের দৈর্ঘ্য এত নিখুঁতভাবে আমরা খুব অল্প দিনই মাপতে পারছে, তাই সেই হিসাবটা কতটা ঠিক কেমন করে জানব? প্রাচীন সূর্যগ্রহণের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্ত করেছেন যে খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতক থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত দিনের দৈর্ঘ্য প্রতি শতাব্দীতে গড়ে ১.৮ মিলিসেকেন্ড করে বাড়ছে। এই পার্থক্যের মূল কারণ লুকিয়ে আছে ভূবিদ্যার মধ্যে; তাই পৃথিবীর অভ্যন্তর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার থেকে পাওয়া সম্ভব। এভাবেই ইতিহাস ও জ্যোতির্বিজ্ঞান পরস্পরকে সাহায্য করার মাধ্যমে জ্ঞানচর্চাকে পুষ্ট করছে। 

 

প্রকাশিতঃ বিজ্ঞানভাষ বার্ষিক সংকলন ২০২৩

Monday, 29 April 2024

পিটার হিগস (১৯২৯-২০২৪)

পিটার হিগস (১৯২৯-২০২৪)

 গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

 

দিনটা ছিল ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর। চুরাশি বছরের পিটার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ঘোষণা হতে আধ ঘণ্টা বাকি আছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন। এডিনবার বন্দর তাঁর বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়, কিছুক্ষণ সেখানে হাঁটাহাঁটি করার পরে সমুদ্রের ধারে এক পাবে বসেই দুপুরের খাবার সারলেন। তারপরে ঢুকলেন এক শিল্প প্রদর্শনীতে। ঘণ্টা চারেক পরে যখন বাড়ি ফিরছেন, এক প্রতিবেশী তাঁকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন। 'প্রফেসর হিগস, অভিনন্দন। আমার মেয়ে লন্ডন থেকে ফোন করে আপনার পুরস্কারের খবরটা দিয়েছে।'

'কী পুরস্কার?’ পিটার অবশ্য জানতেন কোন পুরস্কার সেদিন ঘোষণা হবে। এও জানতেন যে সেই বছর তাঁর নামই পুরস্কারের তালিকায় থাকার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি। তাই সহকর্মী, সংবাদমাধ্যম, বন্ধু, আত্মীয় সকলের ফোন এড়ানোর জন্যই তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। মোবাইল ফোন তিনি ব্যবহার করেন না, তাই সুইডিশ অ্যাকাডেমি পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করার পরে অন্যতম প্রাপক পিটার হিগসের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারেনি। বাড়ি ফিরে গিয়ে তিনি ফোনের রেকর্ড করা মেসেজগুলো শুনে নিলেন।

এই ছিলেন পিটার হিগস; কখনোই নিজেকে সামনে আনতে চাইতেন না। তার আগের বছর যখন সার্নে সাংবাদিক সম্মেলন করে হিগস বোসন কণার আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করা হয়, হিগস সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরতে তিনি শুধু বলেছিলেন সেই দিনটা এই সমস্ত বিজ্ঞানীর যাঁরা কয়েক বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কণাটির সন্ধান পেয়েছেন। সেদিন তিনি কিছু বলবেন না।

নিজেকে আড়াল করার এই অভ্যাস কিন্তু কোনোভাবেই দুর্বলতা নয়। এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ষাট ও সত্তরের দশকে উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকদের উপরে শাস্তি নামিয়ে আনতে চেয়েছে, বিরোধিতা করেছেন পিটার হিগস। বিশ্ববিদ্যালয় বর্ণবিদ্বেষী দক্ষিণ আফ্রিকার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে, প্রতিবাদ করেছেন পিটার হিগস। বিজ্ঞানের বিষয়েও কোনো আপোস করেন নি। পরমাণু অস্ত্র বিরোধী সংগঠনের সদস্য হয়েছেন, আবার সেই সংগঠন যখন পরমাণু শক্তির বিরোধিতা করেছে, তার সম্পর্ক ত্যাগ করেছেন। পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন, কিন্তু যখন তিনি মনে করলেন যে জিন প্রযুক্তির বিরোধিতা করে গ্রিনপিস বিজ্ঞানবিরোধী কাজ করছে, তার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন।

আজ থেকে ষাট বছর আগে ১৯৬৪ সালে পিটার হিগস কণা পদার্থবিদ্যার এক প্রধান সমস্যার সমাধানের পথ দেখিয়েছিলেন। শুধু তিনি নন, প্রায় একই সময়ে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রাঁসোয়া আংলেয়ার ও রবার্ট ব্রাউট, এবং লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের জেরাল্ড গুরালনিক, রিচার্ড হ্যাগেন, ও টমাস কিবল প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব করেন। সমস্যাটা ছিল এই যে কনা পদার্থবিদ্যার প্রধান ভরসা যে স্ট্যান্ডার্ড মডেল, যা সুন্দভাবে সেই বিজ্ঞানের সমস্ত কিছুকে ব্যাখ্যা করতে পারে, সেখানে ভরযুক্ত কণাকে স্থান দেওয়া যাচ্ছে না। অদ্ভুত এক পরিস্থিতি, যেখানে ইলেকট্রনের মতো কণার ভর আছে আমরা জানি, কিন্তু অঙ্কের উত্তর মেলাতে গেলে তাকে শূন্য ধরতে হবে। তিন দল বিজ্ঞানীই একই কথা বললেন, বললেন কণাগুলি আসলে ভরশূন্যই, মহাবিশ্বব্যাপী এক বিশেষ ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়া করেই তারা ভর পায়। কিন্তু প্রমাণ কী? এমন তো কোনো জায়গা নেই সেখানে ঐ বিশেষ ক্ষেত্রটি নেই, কাজেই কণাকে ভরশূন্য করা যাবে না। হিগস বলেছিলেন, এই ক্ষেত্রকে কখনো কখনো একটা কণার আকারে দেখা যাবে। ওই বিশেষ ক্ষেত্রটির নাম দেওয়া হয়েছিল হিগস ক্ষেত্র, আর কণাটির নাম হিগস বোসন। বোসন, কারণ তা সত্যেন্দ্রনাথ বসু আবিষ্কৃত বোস সংখ্যায়ন মেনে চলে। প্রসঙ্গত, এই বছর বোস সংখ্যায়ন আবিষ্কারের শতবর্ষ।

পরের প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা হিগস কণার সন্ধান চালিয়েছিলেন। কণাটার ভর নিশ্চয় খুব বেশি, তাই আইনস্টাইনের সূত্র অনুযায়ী তাকে দেখতে অনেকটা শক্তিকে একজায়গায় আনতে হবে। অবশেষে সার্নের সাতাশ কিলোমিটার পরিধির কণাত্বরক লার্জ হ্যাড্রনিক কলাইডারে ধরা পরেছিল সেই কণা। প্রায় ছ'হাজার বিজ্ঞানীর সেই দলে অনেক ভারতীয়ও ছিলেন, ছিলেন আমাদের কলকাতার সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স-এর গবেষকরা। তার পরের বছর হিগস ও আংলেয়ারকে মৌলিক কণার ভরের উদ্ভব সংক্রান্ত আবিষ্কারের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। আগে থেকেই অনুমান করে পুরস্কার ঘোষণার দিন শহর ছেড়ে পাহাড়ে চলে যেতে চেয়েছিলেন হিগস, কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়। অগত্যা বাড়ি ছেড়ে সমুদ্রতীরের পাবে অবস্থান।

অন্তর্মুখী হিগস নিজের নামে কণার নামকরণে খুশি হননি, তিনি অন্য নাম প্রস্তাব করেছিলেন। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যান তাঁর বেস্ট সেলার বইতে হিগস কণার নাম দিয়েছিলেন গড পার্টিকল অর্থাৎ ঈশ্বরকণা। নাস্তিক হিগসের সেই নামও বিশেষ অপছন্দের ছিল। আত্মপ্রচারবিমুখ হিগস ছিলেন আজকের বিজ্ঞান দুনিয়াতে ব্যতিক্রম। যখন প্রতিমুহূর্তেই বিজ্ঞানীরা প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য ব্যাস্ত, গুণমানের পরিবর্তে সংখ্যাই যখন মূল কথা, তখন সেই বিখ্যাত কাজটির পরে সারা জীবনে তিনি দশটি প্রবন্ধও লেখেননি। তিনি নিজেই বলেছিলেন যে এই যুগে তিনি চাকরিই পেতেন না; এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ছাঁটাই করেনি তার একমাত্র কারণ ১৯৮০ সালেই তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল।

হিগসের জন্ম হয় ইংল্যান্ডে ১৯২৯ সালের ২৯ মে। তাঁর স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন কিংবদন্তী পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক। ডিরাকের বিভিন্ন কৃতিত্বের কথা শুনে হিগসের পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহ জন্মায়। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে তিনি পদার্থবিদ্যাতে বিএসসি, এমএসসি ও ডক্টরেট করেন। ১৯৬০ সালে তিনি এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন, ১৯৯৬ সালে অবসর নেওয়ার পরে তিনি হয়েছিলেন সেই প্রতিষ্ঠানের এমিরিটাস অধ্যাপক। অবশেষে ৯৪ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর প্রয়াণ ঘটল। 

 

সৃষ্টির একুশশতক-এ পাঠিয়েছি   

ছায়াহীনের কাহিনি

ছায়াহীনের কাহিনি

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 

 

ছোটবেলায় ভূতের গল্পে কায়াহীনদের খুঁজে পেতাম, ইদানীং নতুন শব্দ শিখেছি ছায়াহীন। কায়াহীন হওয়া খুব ভালো নয়, তবে অনুমান করি এই লেখা যাঁরা পড়ছেন তাঁদের অনেকেই কর্কটক্রান্তি এবং মকরক্রান্তি রেখার মধ্যের অঞ্চলে বাস করেন; ইচ্ছা করলেই তাঁরা বছরের মধ্যে দুইদিন ছায়াহীন হতে পারবেন। কাজটা শক্ত নয়, শুধু ঠিক দুপুরবেলা খোলা আকাশের নিচে এসে দাঁড়াতে হবে। তবে ছায়া হারিয়ে গেছে বলে চিন্তিত হবেন না, শুধু একটু লাফ দিলেই তাকে আপনার পায়ের নিচে দেখতে পাবেন। এই বিশেষ দিনটিকে বলে জিরো শ্যাডো ডে বা ছায়াহীন দিবস।

এতক্ষণে সবাই বুঝতে পেরেছেন আকাশে সূর্য আপাতচলনের মাধ্যমে যদি ঠিক মাথার উপর আসে, তখন তার কিরণ লম্বভাবে পড়ে। তাই কোনো মানুষ তার নিচে দাঁড়ালে তার ছায়া দেহের বাইরে বেরোয় না, তাই দেখা যায় না। যে দিন এই ঘটনা ঘটে, সেই দিনকে আমরা ছায়াহীন দিবস বলি। বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা দিনে ছায়াহীন দিবস হতে পারে। কোপার্নিকাসের সময় থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তবে পৃথিবীর ঘূর্ণন অক্ষটা সেই প্রদক্ষিণ তলের সঙ্গে মোটামুটি সাড়ে তেইশ ডিগ্রি কোণ করে থাকে বলে প্রতিদিন মধ্যাহ্নের সূর্যকে আকাশে একই জায়গায় দেখা যায় না। সূর্য লম্বভাবে কর্কটক্রান্তি রেখার উপর আলো দেয় কর্কট সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ ২০ বা ২১ জুন; ঠিক তেমনি মকর সংক্রান্তির দিন অর্থাৎ ২১ বা ২২ ডিসেম্বর দেয় মকরক্রান্তি রেখার উপর। (অবশ্য আমরা এখন মকরসংক্রান্তি পালন করি ১৪ বা ১৫ জানুয়ারি, তার কারণ আমাদের দেশের পঞ্জিকাতে অয়নচলনের বিষয়টা ধরা হয়নি; আমাদের পঞ্জিকা সৌর বছর নয়, নাক্ষত্র বছর মেনে চলে। নাক্ষত্র বছরের সময়কাল সৌর বছরের থেকে সামান্য বেশি, ফলে আমাদের পঞ্জিকাতে সংক্রান্তি ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে সে অন্য আলোচনা।) কাজেই এই দুই রেখার মধ্যে যারা বাস করি, উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়নের সময় বছরে দু'দিন সূর্য দুপুরবেলা ঠিক আমাদের মাথার উপরে থাকে। যেমন কলকাতার অক্ষাংশে এই বছর ছায়াহীন দিবস হবে ৫ জুন ও ৮ জুলাই; সেই দুদিন ঠিক দুপুরবেলা আপনি আপনার ছায়াকে ঝেড়ে ফেলতেই পারেন। তবে ঘড়িতে কখন বারোটা বাজবে সেই হিসেব করে ঘর থেকে বেরোলে কিন্তু ঠকবেন, কারণ আপনার ঘড়ি খুব সম্ভবত ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম মেনে চলে, যেটা হল এলাহাবাদের স্থানীয় সময়। সুতরাং আপনার ঘড়িতে যখন দুপুর বারোটা, তখন সূর্য এলাহাবাদের উপর লম্বভাবে থাকে। ৫ জুন কলকাতায় ছায়াকে ঝেড়ে ফেলতে পারবেন ঠিক এগারটা বেজে পঁয়তিরিশ মিনিটে। কলকাতায় না থাকলে অসুবিধা নেই, এই সমস্ত হিসাবগুলো অ্যাস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির ওয়েবসাইট https://astron-soc.in/outreach/activities/zero-shadow-day/ থেকে নেওয়া। আপনি সেই সাইট থেকে আপনার এলাকার ছায়াহীন দিবসের খবর দেখে নিতেই পারেন।

এবার একটু পিছিয়ে যাওয়া যাক। ছায়াহীন দিবসের কথা ইতিহাসে প্রথম খুঁজে পাওয়া যায় খ্রিস্টজন্মের দু'শো বছরেরও বেশী আগে। পৃথিবী যে গোল, তা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রিসে প্রথম বলেছিলেন সম্ভবত পিথাগোরাস। গ্রিক বিজ্ঞানী এরাটোস্থেনেস খুব জরুরি একটা কাজ ছায়াহীন দিবসে করেছিলেন, তা হল তিনিই প্রথম পৃথিবীর পরিধি মেপেছিলেন। তিনি থাকতেন আলেকজান্দ্রিয়াতে, আলেকজান্ডার প্রতিষ্ঠিত মিশরের সেই শহর সেই যুগে ছিল গ্রিক জ্ঞানবিজ্ঞানের কেন্দ্র। এরাটোস্থেনেস জানতেন সিয়েন শহরে বছরের এক বিশেষ দিন ছায়াহীন দিবস, অর্থাৎ মধ্যাহ্ন সূর্য সিয়েন-এর উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়। আলেকজান্দ্রিয়া সিয়েনের উত্তরদিকে, সেখানে সেই দিন দুপুরবেলা একটা লাঠি সোজা দাঁড় করালেও তার ছায়া দেখা যায়। এরাটোস্থেনেস সেই ছায়ার কোণ মেপে বার করলেন সেই দিন সূর্য আলেকজান্দ্রিয়ার উপর লম্ব দিকের সঙ্গে 7.2 ডিগ্রি কোণ করে আছে। পায়ে হেঁটে সিয়েন ও আলেকজান্দ্রিয়ার দূরত্ব মেপে পাওয়া গেল 5,000 স্টেডিয়া। (স্টেডিয়ন হল প্রাচীন গ্রিসে ব্যবহৃত দৈর্ঘ্যের একক, বহুবচনে স্টেডিয়া; স্টেডিয়াম কথাটা তার থেকেই এসেছে।) এরাটোস্থেনেস জানেন কোনো বিন্দুর চারদিকে মোট 360 ডিগ্রি কোণ হয়। তাহলে, পৃথিবীর পরিধি = 5,000 ´ 360/7.2 = 250,000 স্টেডিয়া। এরাটোস্থেনেসের লেখা মূল বইটি পাওয়া যায়নি, কিন্তু পরবর্তীকালে জ্যোতির্বিদদের লেখাতে তার বিবরণ পাওয়া যায়। এই হিসাবটা আছে ক্লিওমেডেসের লেখাতে, স্ট্রাবো লিখেছেন যে এরাটোস্থেনেস পরিধি মেপে পেয়েছিলেন 2,52,000 স্টেডিয়া। এঁরা দুজনেই এরাটোস্থেনেসের দুই শতাব্দী পরের মানুষ। 


 

পাঠক নিশ্চয় বিরক্ত হয়ে ভাবছেন স্টেডিয়ন কেন, মাইল বা কিলোমিটারে বললেই তো হত। এক স্টেডিয়ন হল ছ'শো ফুট, কিন্তু সমস্যা হল প্রাচীন গ্রিসে বিভিন্ন শহরে ফুটের মাপ আলাদা আলাদা হত। প্রথম শতাব্দীর বিখ্যাত বিশ্বকোষ 'ন্যাচারালিস হিস্টরিয়া’-তে তার লেখক প্লিনি দ্য এল্ডার (অর্থাৎ বড় প্লিনি, একজন ছোট প্লিনিও ছিলেন, তিনি বড় প্লিনির ভাগনে) এরাটোস্থেনেসের স্টেডিয়নের সঙ্গে মিশরে সেই সময় প্রচলিত মাপের সম্পর্ক দিয়েছিলেন। তার থেকে হিসাব করে পাই এক স্টেডিয়ন = 157.5 মিটার। স্ট্রাবোর দেওয়া পরিধির মাপকে কিলোমিটারে লিখলে হয় 39,690 কিলোমিটার। উত্তর দক্ষিণ বরাবর পৃথিবীর পরিধি হল 40,008 কিলোমিটার, মানে এরাটোস্থেনেসের মাপে ভুল ছিল এক শতাংশেরও কম! ক্লিওমেডেসের হিসাব নিলেও ত্রুটি দুই শতাংশের কম থাকবে। সে যুগের হিসাবে এই মাপকে খুবই নিখুঁত বলতে হবে। সুতরাং বিজ্ঞানের ইতিহাসে ছায়াহীন দিবসের তাৎপর্য কম নয়। 

প্রতিদিন রোব্বার ডট ইন-এর জন্য