Friday, 19 September 2025

সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের উৎস সন্ধানে

 

সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের উৎস সন্ধানে

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগ ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেমের উপর জোর দিচ্ছেন। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে এই বিষয়ে পড়ানোর নির্দেশ এসেছে। ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম — এই বাক্যবন্ধের সঠিক বাংলা রূপান্তর কী হবে আমি জানি না; কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রকের এই বিষয়ে যে ওয়েবসাইট আছে, তাতে লেখা আছে ভারতীয় জ্ঞান পরম্পরা। পরম্পরা কথা থেকে অবশ্য বোঝা যাচ্ছে কী বলতে চাওয়া হয়েছে, কিন্তু সিস্টেম শব্দটা সেই অর্থে আগে কোথাও ব্যবহার হয়েছে কিনা জানি না।

নাম যাই হোক, বিষয়টি বেশ বিতর্কিত সন্দেহ নেই। বিজ্ঞানে প্রাচীন ভারতের নিঃসন্দেহে অনেক অবদান আছে, কিন্তু তা ইতিহাসের বাইরে আলাদা করে পড়াবার প্রয়োজন কেন পড়ল জানি না। হাজার হাজার বছর আগের মানুষ যে সমস্ত সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল, তারা তাদের মতো করে সেই সমস্যার সমাধান করেছিল। সেই ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি, কিন্তু তাদের সরাসরি আজকের সমস্যার সমাধানে প্রয়োগ করা যাবে না। যে ছাত্র বা গবেষক কম্পিউটার সায়েন্স বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করবে, এই সমস্ত বিষয় তাদের কী উপকারে লাগবে? তবে এই প্রবন্ধে আমরা সেই আলোচনায় যাব না। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগ এই বিষয়ে যে পাঠ্যসূচী ঘোষণা করেছে, সেখানে বৌধায়ন-পিথাগোরাসের উপপাদ্যের উল্লেখ আছে। শ্রেণিকক্ষে পিথাগোরাসের উপপাদ্যই পড়ানো হয়, গণিত শিখতে ইতিহাসের প্রয়োজন নেই বলেই তা নিয়ে আলোচনা হয় না। এই লেখাতে আমরা এই বিশেষ উপপাদ্যটির ইতিহাস ফিরে দেখব।

পিথাগোরাসের উপপাদ্যের কথা আমরা সবাই জানি — সমকোণী ত্রিভুজের ভূমির (a) বর্গ ও লম্বের (b) বর্গের যোগফল অতিভুজের (c) বর্গের সমান। গণিতের ভাষায় বলতে পারি, a2+ b2=c2। অন্য ভাবে বললে, অতিভুজকে বাহু ধরে একটা বর্গক্ষেত্র আঁকলে তার ক্ষেত্রফল, লম্ব ও ভূমির উপরে আঁকা দুই বর্গক্ষেত্রের ক্ষেত্রফলের যোগফলের সমান। এর বিপরীতটাও সত্য, অর্থাৎ যদি দুই বাহুর বর্গের সমষ্টি তৃতীয় বাহুর বর্গের সমান হয়, তাহলে প্রথম দুই বাহুর মধ্যের কোণটি সমকোণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি আয়োগের পাঠক্রমে এটিকে পিথাগোরাসের সঙ্গে শুল্বসূত্রকার বৌধায়নের নামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

পিথাগোরাসের উপপাদ্যটিকে নানা ভাবে প্রমাণ করা যায়, ২০১৭ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লেখক ৩৭০টি প্রমাণের কথা বলেছেন। গত কয়েক বছরে ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে উপপাদ্যটিকে অনেকে প্রমাণ করেছেন, যা একসময় মনে করা হত অসম্ভব। ২০২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দুই স্কুল ছাত্রী ত্রিকোণমিতি ব্যবহার করে নতুন এক প্রমাণ আবিষ্কার করেছেন। কিন্তু উপপাদ্যটি যে পিথাগোরাস প্রথম প্রমাণ করেছিলেন, তার পক্ষে কোনো নিশ্চিত তথ্য আমাদের জানা নেই। তাই আমরা এই লেখাতে এটিকে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র বলব। (কেন উপপাদ্য না বলে সূত্র বলছি তার কারণ পরে বোঝা যাবে।) পিথাগোরাস ছিলেন গ্রিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী, তাঁর জীবনকাল আনুমানিক ৫৭০-৪৯৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। তাঁর সম্পর্কে অনেক গল্প প্রচলিত আছে, তার মধ্যে একটি হল তিনি এই উপপাদ্যটি প্রমাণ করে আনন্দে দেবতার উদ্দেশ্যে একটি বা একাধিক ষাঁড় বলি দিয়েছিলেন। কিন্তু সমকালীন সাক্ষ্য থেকে পিথাগোরাস যে এই প্রমাণ করেছিলেন তেমন কোনো খবর পাওয়া যায় না। পিথাগোরাস নিজে ছিলেন নিরামিষাশী ও পশু বলির বিরোধী, তাই গল্পটা নিয়েও সন্দেহ আছে। কেন পিথাগোরাসের নাম এই উপপাদ্যটির সঙ্গে যুক্ত হল তা জানা যায় না।

ইউক্লিড ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তাঁর বিখ্যাত জ্যামিতি বই এলিমেন্টস-এ এই বিশেষ উপপাদ্যটির দুটি প্রমাণ দিয়েছিলেন। বিপরীত উপপাদ্যটির প্রমাণ ইউক্লিডের লেখাতেই প্রথম পাওয়া যায়। পিথাগোরাসের নাম ইউক্লিড করেননি। তবে পিথাগোরাস এই উপপাদ্যের কথা নিঃসন্দেহে জানতেন, কারণ তিনি এটি ব্যবহার করেই প্রথম দেখিয়েছিলেন যে 2-এর বর্গমূল একটি অমূলদ সংখ্যা, তাকে দুটি পূর্ণ সংখ্যার অনুপাত হিসাবে প্রকাশ করা যায় না।

এবার আসি বৌধায়নের কথায়। ভারতের প্রাচীনতম গণিত বিষয়ক যে বই আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে তা হল শুল্বসূত্র। শুল্ব শব্দের অর্থ হল দড়ি। শুল্বসূত্রে বিভিন্ন প্রকার যজ্ঞবেদি নির্মাণের কথা বলা আছে। শুল্বসূত্রের বেশ কয়েকজন লেখক আছে, তাঁদের মধ্যে কালের বিচারে প্রথম হলেন বৌধায়ন। বৌধায়নের লেখাতে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রটির কথা আছে। এর থেকে পুরানো কোনো উৎসে সূত্রটি এত স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়নি। প্রাচীন ভারতের অন্যান্য নিদর্শনের মতোই শুল্বসূত্রের কাল নির্ণয় বেশ কঠিন; বিভিন্ন মতে আটশো থেকে দু'শো খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এসেছে। সব সূত্রগুলি এক সময়ে লেখা নয়। বৌধায়ন খুব সম্ভব পিথাগোরাসের পূর্ববর্তী।

তাহলে কি বৌধায়নকেই আমরা সমকোণী ত্রিভুজের উপপাদ্যের আবিষ্কর্তা বলব? প্রশ্ন হল আমরা উপপাদ্যের আবিষ্কার বলতে কী বোঝাতে চাই? আমাদের স্কুলের জ্যামিতি বইতে উপপাদ্যের প্রমাণ দেওয়া থাকে। সারা পৃথিবীতেই জ্যামিতির মডেল হল ইউক্লিডের বই। সেখানে কয়েকটি স্বতঃসিদ্ধ থেকে সমস্ত উপপাদ্যগুলি প্রমাণ করা হয়েছে। শুল্বসূত্রে কোথাও এই অর্থে প্রমাণ পাওয়া যাবে না। আধুনিক অর্থে তাকে উপপাদ্য না বলে সে জন্য সূত্র বলাই শ্রেয় মনে হয়েছে। ভারতে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের প্রথম প্রমাণ পাওয়া যায় দ্বাদশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় ভাস্করাচার্যের লেখাতে। সঙ্গের ছবিতে সেই প্রমাণটি দেখানো হল। তবে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে প্রমাণটি আরো প্রাচীন।

 

ভাস্করের দেওয়া সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রের প্রমাণ


এই উপপাদ্যটির আমাদের জানান প্রাচীনতম প্রমাণটি অবশ্য এলিমেন্টস-এর থেকেও অনেক পুরানো, সেটি পাওয়া গেছে চিনের চৌ পে সুয়ান চিং বইতে। সেখানে এক কাহিনিতে গণিতবিদ শ্যাঙ কাও অভিজাত শাসক ঝাউ গঙ্গকে সূত্রটি প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। যদিও তারিখটা নিশ্চিত নয়, কিন্তু এটিই আমাদের জানা প্রমাণগুলির মধ্যে যে সব থেকে পুরানো তা নিয়ে সন্দেহ নেই। কায়রো ম্যাথামেটিকাল প্যাপিরাসে (কাল ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ন'টি গাণিতিক সমস্যা দেওয়া আছে যাদের সমাধানের জন্য আলোচ্য সূত্রটির প্রয়োজন হয়।

আমরা জানি যে প্রাচীন যুগের বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে যোগাযোগ ছিল। তাই কোনো একটি আবিষ্কার বা উদ্ভাবনের খবর অন্যত্র পৌঁছানো অস্বাভাবিক নয়। আবার যোগাযোগ স্বাভাবিকভাবেই ছিল খুব ধীরগতিতে, তাই একই আবিষ্কার স্বাধীনভাবে বিভিন্ন সভ্যতায় হওয়াও সম্ভব। প্রাচীন কালের অনেক কথাই আমাদের এখনো অজানা; তথ্যের অভাবে এই নিয়ে কথা না বলাই শ্রেয়। যে অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বৌধায়ন-পিথাগোরাসের উপপাদ্য বলতে চেয়েছে, সেই অর্থে এটিকে শ্যাং কাও উপপাদ্য বলা উচিত। কিন্তু আমরা দেখব যে সূত্রটি নিঃসন্দেহে আরো প্রাচীন।

এবার আসি পিথাগোরিয় ত্রয়ীর কথায়। যদি তিনটি সংখ্যা a, b ও c-র জন্য a2+ b2=c2 শর্তটি পূরণ হয় তাহলে তাকে বলা হয় পিথাগোরিয় ত্রয়ী। উদাহরণ হিসাবে (3,4,5), (5,12,13) এই ত্রয়ী দুয়ের কথা ভাবা যেতে পারে, যেখানে প্রথম দুটির বর্গ যোগ করলে তৃতীয়টির বর্গ পাওয়া যাবে। আবার যে কোনো ত্রয়ীকে পূর্ণ সংখ্যা দিতে গুণ করলে এক নতুন ত্রয়ী পাওয়া যারে পারে, যেমন (3,4,5) ত্রয়ীটিকে দুই বা তিন দিয়ে গুণ করে পাই যথাক্রমে (6,8,10) ও (9,12,15); এগুলিও পিথাগোরিয় ত্রয়ী। স্পষ্টতই পিথাগোরিয় ত্রয়ী ও সমকোণী ত্রিভুজের তিনটি বাহুর সম্পর্কটি পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত। পিথাগোরিয় ত্রয়ীর ইতিহাস কত প্রাচীন?

বৌধায়নের শুল্বসূত্রে বেশ কয়েকটি পিথাগোরিয় ত্রয়ীর কথা আছে। কিন্তু পিথাগোরিয় ত্রয়ীর ইতিহাস বহু প্রাচীন। মেসোপটেমিয় (অর্থাৎ বর্তমান ইরাক) সভ্যতার এক বহু পুরানো মাটির ট্যাবলেট প্লিম্পটন 322-র বয়স মেপে জানা গেছে সেটি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টাদশ শতকের নিদর্শন। সেখানে যে সংখ্যাগুলি আছে, সেটিকে পিথাগোরিয় ত্রয়ীর আলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। নিচের সারণীতে সেই ট্যাবলেটের কয়েকটি সংখ্যা সেই রূপে দেখানো হল।


সারণী ১ - প্লিম্পটন 322 ট্যাবলেটে পাওয়া পিথাগোরিয় ত্রয়ী

a

b

c

119

120

169

3367

3456

4825

4601

4800

6649

12709

  13500

 18541 

4961

6480

8161

1771

2700

3229

1679

2400

2929

স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে এই সংখ্যাগুলো ট্যাবলেটের লিপিকার কেমন করে পেলেন? ট্যাবলেটে পাওয়া অধিকাংশ ত্রয়ীর সংখ্যাগুলি পরস্পর মৌলিক, অর্থাৎ কোনো অপেক্ষাকৃত ছোট ত্রয়ীকে পূর্ণসংখ্যা দিয়ে গুণ করে এগুলি পাওয়া সম্ভব নয়। আধুনিক কম্পিউটার ছাড়া শুধুমাত্র আন্দাজ করে বা আকস্মিক ভাবে এত বড়বড় ত্রয়ী পাওয়া সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। এই নিয়ে বিভিন্ন মত আছে, এখনো পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

আরো একটি প্রায় সমসাময়িক ট্যাবলেট YBC 7289-এ একটি বর্গক্ষেত্র এঁকে তার কর্ণ বরাবর 2-এর বর্গমূল লেখা আছে। এটিও স্পষ্টতই সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রটিকে ব্যবহার করা হয়েছে; সূত্রটি থেকে দেখা যায় যে কর্ণ ও বাহুর অনুপাত হল 2-এর বর্গমূল। প্রাচীনকালে এই বর্গমূলটির এর থেকে সঠিক মান পাওয়া যায় নি, দশমিকের পরে ছয় ঘর পর্যন্ত মানটা ঠিক।

  

প্লিম্পটন 322


বৌধায়ন কি সূত্রটির কোনো প্রমাণ আবিষ্কার করেছিলেন বা জানতেন? বিখ্যাত বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক সমরেন্দ্রনাথ সেন লিখেছেন যে প্রমাণটি নিঃসন্দেহে বৌধায়নের জানা ছিল, যদিও তার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য বা যুক্তি তিনি দেননি। এখানেই প্রশ্ন আসে যে প্রমাণ না জেনে সূত্রটি আবিষ্কার করা কি সম্ভব? এই প্রসঙ্গে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য তাঁর The Origin of Geometry in India: A Study of the Sulbasutras বইতে লিখেছেন যে প্রাচীন ভারতে জ্যামিতির ইতিহাস জানতে হলে আমাদের কিছু পুরানো ধারণা পরিত্যাগ করতে হবে। ইউক্লিডের জ্যামিতিই একমাত্র মডেল নয়; শুধুই ভারতে নয়, অন্য সভ্যতাতেও জ্যামিতি ইউক্লিডিয় পদ্ধতিতে সূচনা হয়নি। ইউক্লিডিয় বিমূর্ত পদ্ধতি প্রাচীন সভ্যতাতে কোনো কাজে আসত না। বলা হয় যে নীল নদে বন্যার পরে জমির মাপ ঠিক করতে গিয়ে প্রাচীন মিশরে জ্যামিতির সূচনা হয়েছিল। অবশ্য এটাই একমাত্র মত নয়; বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ঐতিহাসিক ভি গর্ডন চাইল্ডের মতে ছুতোরের কাজ করতে গিয়ে জ্যামিতির সূচনা হয়। বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন কারণে জ্যামিতির আবির্ভাব অস্বাভাবিক নয়। শুল্বসূত্রেও যজ্ঞের বেদি নির্মাণ করতে গিয়ে অর্থাৎ একান্তভাবেই হাতে কলমে কাজ করতে গিয়ে জ্যামিতির সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে। সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র ছাড়া প্রাচীন যুগের বিরাট বিরাট যে সমস্ত নির্মাণের হদিস আমরা পাই, সেগুলো বানানো সম্ভব হত কি? আমরা প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার নগর পরিকল্পনার কথা জানি, সমকোণে রাস্তাগুলি ছেদ করত, বাড়ি তৈরির নির্দিষ্ট পদ্ধতি ছিল। সমকোণী ত্রিভুজের সূত্র ছাড়া তাকে রূপায়ণ করা কঠিন হত। দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় অনুমান করেছেন যে সিন্ধুসভ্যতার জ্যামিতি জ্ঞানের সাহায্য পেয়েছিল শুল্বসূত্র, কারণ তার থেকে পুরানো জ্যামিতি জ্ঞানের কোনো নিদর্শন প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে পাওয়া যায় না।

প্রাচীন কালের ইঞ্জিনিয়ারিঙের সব থেকে বিখ্যাত নিদর্শন হল 2600 খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ তৈরি গিজার গ্রেট পিরামিড। গিজার পিরামিডে নানা জায়গায় সমকোণী কাঠামো বানাতে এই সূত্রের ব্যবহার হয়েছে। যেমন একটি ত্রিভুজের ভূমি 115.2 মিটার, লম্ব 146.6 মিটার ও অতিভুজ 186.4 মিটার। দশমিকে প্রথম ঘর পর্যন্ত এই মাপ পুরোপুরি সঠিক। এই সব ত্রিভুজে সমকোণ অর্থাৎ নব্বই ডিগ্রির মাপে ত্রুটি আছে দশ হাজার ভাগের এক ভাগেরও কম। এখানেও বোঝা যায় যে প্রমাণ জানা থাক বা না থাক, সূত্রটি সম্পর্কে তাদের সম্যক ধারণা ছিল।

সূত্র কথাটি বিজ্ঞানে সাধারণত পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষাতে পাওয়া কতকগুলি সিদ্ধান্তের জন্য ব্যবহার করা হয়। যেমন শক্তির সংরক্ষণ সূত্র বা রসায়নে ডালটনের সূত্র এ সবই পরীক্ষানিরীক্ষা করে পাওয়া দিয়েছিল। সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রটির উল্লেখ থাকা মানেই যে তার আধুনিক গণিতের পদ্ধতিতে অর্থাৎ স্বতঃসিদ্ধ থেকে অগ্রসর হয়েই তার প্রমাণ জানা ছিল এমন নাও হতে পারে। মানুষকে বহু জায়গায় বহুবার সমকোণী ত্রিভুজকে ব্যবহার করতে হয়েছে। পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রে পৌঁছানোও অস্বাভাবিক নয়।

আধুনিক গণিত মূলত স্বতঃসিদ্ধভিত্তিক, অর্থাৎ সেখানে অবরোহী যুক্তি কাজ করে। প্রাচীন বিজ্ঞানের চরিত্রও ছিল একই রকম, সেখানে একটি বা কয়েকটি সাধারণ সত্য ধরে নেওয়া হত, তার প্রমাণের প্রয়োজন পড়ত না। সেগুলিকে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হত। এর ফলে সেখানে পরীক্ষানিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণের বিশেষ স্থান ছিল না। আধুনিক বিজ্ঞান কিন্তু আরোহী যুক্তিতে বিশ্বাসী; সেখানে নানা পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা থেকে আমরা সাধারণ সত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে সাধারণ সত্যটি পরিবর্তন করার বা বাতিল করার সুযোগ থাকে, এভাবেই আধুনিক বিজ্ঞান এগোয়। সেই অর্থে প্রাচীন গণিতের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞানের সাদৃশ্য পাওয়া যায়।


তথ্যসূত্র

The Origin of Geometry in India: A Study of the Sulbasutras, Ramkrishna Bhattacharya

পিথাগোরাস ত্রয়ী: একটি পরিক্রমা, ভূপতি চক্রবর্তী

History of Science and Technology in Ancient India, Debiprasad Chattopadhyay

God Created the Integers: The Mathematical Breakthroughs that Changed History, Edited with Commentary by Stephen Hawking

Science in Saffron: Skeptical Essays on the History of Science, Meera Nanda

Mathematics, Samarendranath Sen, in A Concise History of Science in India, Chief Editor Debendramohan Bose, Editors Samarendranath Sen and B V Subbarayappa

 

প্রকাশঃ জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার, শারদ ২০২৫  



Monday, 15 September 2025

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সালতামামি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সালতামামি

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


ইদানীং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স বিষয়ে বহু কথা শোনা যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাকে বলে, তার বিভিন্ন দিক, তার বৈজ্ঞানিক, প্রাযুক্তিক ও সামাজিক তাৎপর্য এই সংখ্যার নানা প্রবন্ধে আলোচিত হয়েছে। নিউরাল নেটওয়ার্ক, মেশিন লার্নিং, ডিপ লার্নিং এই ধরনের কিছু পরিভাষা এই লেখাতে ব্যবহৃত হয়েছে, যাদের ব্যাখ্যা সেই সব প্রবন্ধে পাওয়া যাবে। এই লেখাতে আমরা শুধুমাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাসের বিভিন্ন মাইলফলকের কথা শুনব।

আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স বাক্যবন্ধটি অপেক্ষাকৃত নতুন, ১৯৫৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডার্টমাউথ কলেজে আয়োজিত এক আলোচনাচক্রে এক গবেষণাপত্রে এটি প্রথম ব্যবহার হয়। লেখক ছিলেন চারজন -- জন ম্যাকার্থি, মার্ভিন মিনস্কি, নাথানিয়েল রচেস্টার ও ক্লড শ্যানন। তবে বাস্তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তির জন্ম বিংশ শতকে হলেও তার অনেক আগেই মানুষের কল্পনাতে তা এসেছে; সাহিত্যে তার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই। জোনাথন সুইফট তাঁর গালিভার্স ট্রাভেলস-এ লাপুটা দ্বীপে এমন এক 'ইঞ্জিন'-এর কথা বলেছিলেন যার হাতল ঘুরিয়ে দর্শন, কবিতা বা গণিত বিষয়ক বই পাওয়া যায়। প্রথম সার্থক কল্পবিজ্ঞান হিসাবে অনেকেই মেরি শেলির ফ্রাঙ্কেনস্টাইন-এর (১৮২১) কথা বলেন। সেই উপন্যাসে ডক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন যে মানুষকে সৃষ্টি করেছিলেন, তাকে আমরা হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্তরে ফেলতে পারি। তবে তার মস্তিষ্ক মানুষের শবদেহ থেকে পাওয়া গিয়েছিল। যন্ত্রের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা প্রথম বলেছিলেন স্যামুয়েল বাটলার। ১৮৬৩ সালে তিনি ডারউইন অ্যামং দি মেশিন্‌স- প্রবন্ধে তিনি যন্ত্রের বিবর্তন ও বুদ্ধির উন্মেষ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তার চার বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল ডারউইনের যুগান্তকারী গ্রন্থ অরিজিন অফ স্পিসিস। বাটলারের চিন্তার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অন্যতম অঙ্গ মেশিন লার্নিং-এর সূত্র খুঁজে পাই। বিংশ শতাব্দীতে আরো অনেকেরই নাম করা যেতে পারে। ক্যারল চাপেক-এর নাটকে যন্ত্রমানব মানুষের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। সেই নাটক থেকেই ইংরাজি ভাষাতে রোবট শব্দটির আবির্ভাব হয়। আর্থার সি ক্লার্ক ২০০১-এ স্পেস ওডিসি উপন্যাসে কম্পিউটার HAL মানসিক দ্বন্দ্বের শিকার হয়েছে, আবার তার পরের উপন্যাস ২০১০-এ স্পেস ওডিসিতে কম্পিউটার বিজ্ঞানী চন্দ্র তাকে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছেন। বাস্তবে না হোক, সাহিত্যে অনেকদিন আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক বুদ্ধির কাছে এসে পৌঁছেছে।

গালিভার্স ট্রাভেলস হল মূলত ব্যাঙ্গধর্মী রচনা, সুইফটের গল্পের 'ইঞ্জিন'-ও রেমন লুল ও গটফ্রিড লিবনিৎজের এমন এক প্রস্তাবকে বিদ্রূপ করেছিলেন, যার মধ্যে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক চিন্তার সন্ধান আমরা পাই। রেমন লুল (১২৩২-১৩১৬) ছিলেন স্পেনের এক ধর্মযাজক, তিনি খ্রিস্টধর্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য কতকগুলি সাধারণ নীতির উপর নির্মিত এক যুক্তিশাস্ত্রের কথা বলেছিলেন। লুলের চিন্তাকে প্রসারিত করে ক্যালকুলাসের অন্যতম আবিষ্কারক লিবনিৎজ ১৬৬৬ সালে প্রস্তাব করেন যে মানুষের চিন্তারও এক বর্ণমালা আছে, এবং যে কোনো জটিল ধারণাকে স্বল্পসংখ্যক সরল ধারণার সাহায্যে প্রকাশ করা যায়। লিবনিৎজ অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলেন নি, কিন্তু চিন্তাকে এভাবে প্রকাশের কথা বলে তিনি সেই পথ খুলে দিয়েছিলেন।

মেশিন লার্নিং-এর এক স্তম্ভ হল বেইজের উপপাদ্য। ইংরাজ দার্শনিক গণিতবিদ ও যাজক টমাস বেইজ এই উপপাদ্যটি আবিষ্কার করেন, তবে তিনি সেটি নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর দু' বছর পরে ১৭৬৩ সালে সেটি প্রকাশিত হয়। এর পর ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি ইংরাজ গণিতবিদ জর্জ বুল বলেন যে মানুষ যেভাবে যুক্তি দিয়ে চিন্তাভাবনা করে, তাকে গণিতের সমীকরণের আকারে প্রকাশ করা সম্ভব। বুলের প্রস্তাবিত বীজগণিত হল আধুনিক কম্পিউটারের প্রাণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত কম্পিউটারের মাধ্যমেই রূপায়িত করা হচ্ছে। চার্লস ব্যাবেজকে মনে করা হয় যন্ত্রের সাহায্যে গণনা অর্থাৎ কম্পিউটারের আবিষ্কারক। ১৮২০-র দশকে তাঁর তৈরি ডিফারেন্স ইঞ্জিনকে প্রথম যন্ত্রগণক বা কম্পিউটার বলা হয়। কাউন্টেস আডা লাভলেস ব্যাবেজের ইঞ্জিনের জন্য প্রথম প্রোগ্রাম লিখেছিলেন।

উনিশশো চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশককে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সূচনাপর্ব বলা যেতে পারে। ১৯৪৩ সালে দুই মার্কিন গবেষক ওয়ারেন ম্যাকুলোক ও ওয়াল্টার পিটস এক গবেষণাপত্রে স্নায়ুতন্ত্রকে কতকগুলি আদর্শায়িত কৃত্রিম নিউরোন অর্থাৎ স্নায়ুকোষের জালিকা বা নেটওয়ার্ক হিসাবে প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রস্তাবিত কৃত্রিম নিউরোনগুলি বুলের বীজগণিতকে রূপায়িত করতে পারে। এ থেকেই পরবর্তীকালে নিউরাল নেটওয়ার্ক ও ডিপ লার্নিং-এর চিন্তা আসে। ১৯৫৬ সালে মার্ভিন মিনস্কি ও ডিন এডমন্ডস তৈরি করেছিলেন প্রথম কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক SNARC (Stochastic Neural Analog Reinforcement Calculator)। তখন ছিল ভ্যাকুয়াম টিউবের যুগ, তিন হাজার ভ্যাকুয়াম টিউব ব্যবহার করে চল্লিশটি কৃত্রিম নিউরোনের নেটওয়ার্ক সৃষ্টি করা হয়।

ব্রিটিশ বিজ্ঞানী অ্যালান টুরিং-কে আধুনিক কম্পিউটার বিজ্ঞানের জনক মনে করা হয়, তিনি ১৯৫০ সালে এমন এক পরীক্ষার কথা বলেন যাতে উত্তীর্ণ হলে কোনো যন্ত্রকে বুদ্ধিমান বলা যাবে। টুরিং অবশ্য বাস্তব বুদ্ধিমান যন্ত্র নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন এমন নয়, তিনি সেই যন্ত্রের মূলনীতিগুলি স্পষ্ট করতে চেয়েছিলেন। প্রথম যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সন্দেহাতীতভাবে টুরিং পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হয় তা হল GPT-4.5 ; ২০২২ সালে নেচার পত্রিকাতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে সেই খবর প্রকাশ করা হয়। এই লেখার জন্য ChatGPT-র সাহায্য নেওয়া হয়েছে, তা GPT-4.5-এর উপরেই তৈরি। ১৯৫৯ সালে আর্থার স্যামুয়েল প্রথম মেশিন লার্নিং এই শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন; এক বিশেষ খেলাতে কম্পিউটার প্রোগ্রাম যদি তার স্রষ্টা প্রোগ্রামারের থেকেও বেশি ভালো খেলতে পারে, সেই ধরনের প্রোগ্রামকে তিনি মেশিন লার্নিং নাম দিয়েছিলেন। 

অ্যালান টুরিং

১৯৫০-এর দশকের গবেষকরা ভেবেছিলেন অল্পদিনের মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সৃষ্টি করা যাবে, তাই বিভিন্ন সরকার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গবেষণাখাতে অনেক অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু উনিশশো সত্তরের দশক থেকে বোঝা যায় যে বিষয়টা অত সহজ হবে না, তারপর থেকে অর্থের স্রোত শুকিয়ে এসেছিল। মাঝে উনিশশো আশির দশকের সূচনাতে আবার এই বিষয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হলেও তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯০-এর দশকে আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা পুরোদমে শুরু হয়। টুরিং টেস্টে উত্তীর্ণ না হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বেশ কিছু সাফল্য পেতে শুরু করে। প্রথম কোনো কম্পিউটার দাবাতে ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার রেটিং পায় ১৯৮১ সালে। ১৯৯৭ সালে দাবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ ডিপ ব্লু সুপার কম্পিউটারের কাছে পরাজিত হন। ডিপ ব্লু আইবিএম কোম্পানির তৈরি, তাদেরই নির্মিত ওয়াটসন ২০১১ সালে জিওপার্ডি খেলাতে মানুষ চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দেয়।

ডিপ ব্লু-তে ছিল ২৫৬টি প্রসেসর যারা সমান্তরালভাবে কাজ করে এক সেকেন্ডে কুড়ি কোটি সম্ভাব্য চাল গণনা করতে পারে। ফলে ডিপ ব্লু যে কোনো পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতের চোদ্দটি চাল পর্যন্ত বিশ্লেষণ করে। ভাষাতত্ত্ববিদ নোয়াম চমস্কি বলেছিলেন যে এভাবে দাবা খেলা জেতা আর বুলডোজারের মেশিনের অলিম্পিকে ওয়েটলিফটিং স্বর্ণপদক জেতা একই ব্যাপার। চিনের এক প্রাচীন খেলা গো দাবার থেকেও জটিল। ২০১৬ সালে গুগলের আলফাগো কম্পিউটার বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় দক্ষিণ কোরিয়ার লী সেডলকে হারিয়ে দেয়। আলফাগো ডিপ ব্লু-এর মতো অসংখ্য চালের বিশ্লেষণ করে না, নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাকে মানুষের মতো খেলতে শেখানো হয়েছে। তার স্ট্র্যাটেজির মৌলিকত্ব দর্শকদের স্তম্ভিত করে দিয়েছিল।

২০১২ সালে আলেক্স ক্রিজেভস্কি তৈরি করেন আলেক্সনেট। তাঁকে সাহায্য করেছিলেন ইলিয়া সুতস্কেভার ও জিওফ্রে হিনটন। আলেক্সনেট হল এক নিউরাল নেটওয়ার্ক যা ছবির বস্তুকে চিনতে পারে। আলেক্সনেটে ছিল সাড়ে ছয় লক্ষ নিউরোন ও ছ' কোটি প্যারামিটার। আলেক্সনেট থেকেই ডিপ লার্নিং-এর সূচনা হল বলা যেতে পারে।

একুশ শতকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে বিকাশ ঘটেছে তার সমস্ত বিবরণ এই লেখার পরিসরে দেওয়া অসম্ভব। শতাব্দীর সূচনা থেকেই আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স সাধারণ দৈনন্দিন কাজেও ব্যবহার হতে শুরু হয়ে গেছে। ২০০২ সালে রুম্বা কোম্পানি প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে আসে। তার সব থেকে বড় গুণ ছিল সে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যেত না। ২০০৯ সালে গুগল চালকবিহীন গাড়ি তৈরি করে। এখন বহু দেশেই এই ধরনের গাড়িকে রাস্তায় দেখতে পাওয়া যায়। ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ আমরা অনেকেই ব্যবহার করি। সেগুলি তো বটেই, গোটা ইন্টারনেটই এআই-এর উপর নির্ভর করে। ২০১০-এর দশকে ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরি হয়। অ্যাপলের সিরি (২০১১), মাইক্রোসফটের কর্টানা (২০১৪), বা আমাজনের আলেক্সার (২০১৪) মতো ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রোগ্রাম মোবাইল বা কম্পিউটারে মুখের কথাকে কম্পিউটারের ভাষাতে পরিবর্তন করে, কম্পিউটার বা মোবাইল সেই নির্দেশ পালন করে।

গত এক দশকে আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্সে লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলদের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। এই সমস্ত মডেলে মানুষের ভাষাকে ও কম্পিউটারের ভাষাতে রূপান্তরিত করে, আবার কম্পিউটারের ভাষাকেও মানুষের বোধ্য আকারে অনুবাদ করে। অনেক মডেলে ২০১৮ সালে উদ্ভাবিত Bidirectional encoder representations from transformers (BERT) ব্যবহার করা হয় । আগে GPT-র কথা এসেছে, এটি একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল। আরো অনেক এই ধরনের মডেল আছে, যেমন Qwen, Gemini, Granite ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ছাপ রেখেছে বিজ্ঞানের নানা শাখাতে, তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ এই লেখাতে নেই। উল্লেখ করা যায় যে ২০২৪ সালে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন দুই বিভাগেই নোবেল পুরস্কারজয়ীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়েছেন। পদার্থবিজ্ঞানে দুই নোবেলজয়ী জন হপফিল্ড ও জিওফ্রে হিন্টন নিউরাল নেটওয়ার্কের সাহায্যে মেশিন লার্নিং পদ্ধতির বিকাশের জন্য পুরস্কার পেয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে প্রোটিনের গঠন সংক্রান্ত এক পঞ্চাশ বছরের পুরানো সমস্যার সমাধানের জন্য ডেমিস হাসাবিস ও জন জাম্পারকে রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। এই পুরস্কারের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে এই যুগে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এই লেখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাযুক্তিক বিকাশের কয়েকটি বিশেষ ধাপের কথাই বলা হল। বিশেষ করে চেতনা ও বুদ্ধিমত্তার সম্পর্ক, বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক দিক নিয়ে আরো অনেক গবেষণা হয়েছে যাদের উল্লেখ এই লেখার সীমাবদ্ধ পরিসরে সম্ভব হল না। কম্পিউটার প্রযুক্তির যে দ্রুত বিকাশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্মেষে সাহায্য করেছে তার বিষয়েও এই প্রবন্ধে কিছু বলা হল না। এই সংখ্যার অন্যান্য লেখাতে আরো অনেক বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ এই লেখা তৈরি করতে ChatGPT-র সাহায্য নেওয়া হয়েছে। শুভাশিস মুখোপাধ্যায়ের লেখা বোধবিজ্ঞান বইটি থেকেও নানা তথ্য পেয়েছি। বন্ধু নবেন্দু চাকি লেখাটি পড়ে তাঁর মতামত জানিয়েছেন।


প্রকাশঃ জ্ঞান ও বিজ্ঞান, জুলাই 2025

Saturday, 23 August 2025

বোধবিজ্ঞান – কগনেটিভ সায়েন্স-এর একটি পর্যালোচনা

 

বোধবিজ্ঞান – কগনেটিভ সায়েন্স-এর একটি পর্যালোচনা

লেখক: শুভাশিস মুখোপাধ্যায়

প্রকাশক: সাহিত্য সংসদ

প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৫

মূল্য: ৩০০ টাকা


বিজ্ঞান প্রতিনিয়ত এগিয়ে চলে, নানা ধারায় সে ভাগ হয়ে নতুন নতুন বিষয়ের জন্ম দেয়। মধ্যযুগে যার নাম ছিল ন্যাচারাল ফিলোসফি বা প্রাকৃতিক দর্শন, তা পরবর্তীকালে রসায়ন, পদার্থবিদ্যা জীববিদ্যা ইত্যাদি শাখাতে বিভক্ত হয়েছে। প্রতিটি শাখা আবার নানা উপশাখার জন্ম দিয়েছে। আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের আর এক নতুন চরিত্রের বিকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করছি  দেখছি নানা শাখা এসে এক জায়গায় মিলে সম্পূর্ণ নতুন এক ক্ষেত্রের জন্ম দিচ্ছে। তেমনই এক নতুন বিষয় হল বোধবিজ্ঞান বা কগনেটিভ সায়েন্স, যেখানে এসে মিলেছে কম্পিউটার বিজ্ঞান, তথ্যবিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মনোবিদ্যা, নৃবিজ্ঞান সহ আরো নানা আপাত-সম্পর্কহীন বিষয়। আমার সীমিত জ্ঞানে এই বিষয়ে সাধারণের জন্য লেখা কোনো বইয়ের কথা আমার জানা নেই। জ্ঞানচর্চার এই অপেক্ষাকৃত নবীন ক্ষেত্রটি নিয়ে বাংলা ভাষাতে বই প্রকাশ করার জন্য লেখক ও প্রকাশককে ধন্যবাদ জানাই।

আমাদের মস্তিষ্ক সম্পর্কে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্য উঠে আসছে, তা সত্ত্বেও অনেক কিছুই এখনো আমাদের অজানা থেকে গেছে। যন্ত্র বা 'মনুষ্যেতর' প্রাণীর ক্ষেত্রে যেভাবে ব্যবচ্ছেদ করে অনুসন্ধান করা যায়, মানব মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে তা সম্ভব নয়। অবশ্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ব্যবচ্ছেদ নিয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন উঠেছে, এবং তা মোটেই তুচ্ছ নয়। মস্তিষ্ক সম্পর্কে গবেষণা, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যবিজ্ঞান, এই তিনের মিলনে আধুনিক বোধবিজ্ঞানের জন্ম। ক্ষেত্রটি নতুন বলেই সূচনাতে লেখক তিনটি অধ্যায় বোধবিজ্ঞান কী, এবং তার উৎস কোথা থেকে তা নিয়ে ব্যয় করেছেন। শুরুর কাজ চালানোর জন্য তিনি বোধবিজ্ঞান সম্পর্কে একটা ধারণাকে প্রথমেই সংজ্ঞায়িত করেছেন। প্রাথমিকভাবে তা মানবদেহের সঙ্গে সংযুক্ত, কিন্তু বিষয় থেকে যত বিষয়ান্তরে গেছেন, ততই সেই ধারণাটা আরো বিমূর্ত রূপ নিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আসে চোমস্কির সার্বজনীন ব্যাকরণের কথা, যা হয়তো মানুষের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর করে না। চোমস্কি দেখিয়েছেন, Poverty of stimulus বা উদ্দীপনের অভাব সত্ত্বেও শিশুরা ভাষা শিখতে সক্ষম; অর্থাৎ ব্যাকরণের হয়তো ভাষানিরপেক্ষ অস্তিত্ব আছে। সেই ধারণা থেকেই মনে হয় যে বোধবিজ্ঞানকে আর শুধুমাত্র মানবিকীবিদ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন নয়, প্রকৃতিবিজ্ঞানের বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যেই তার চর্চা করতে হবে।

কম্পিউটার বলতে আমরা সাধারণত প্রযুক্তির কথাই ভাবি। বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় তার অভাবনীয় উন্নতির কথা, যার ফলে এখন বিশাল বিশাল তথ্যভাণ্ডারকে মুহূর্তের মধ্যে বিশ্লেষণ ও ব্যবহার করা যাচ্ছে। লেখক চার্লস ব্যাবেজ, অ্যালান টুরিং বা জন ফন নয়ম্যানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন; ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে এই বিশেষ বিষয়টিতে অন্তত প্রযুক্তির আগে প্রয়োজন হয়েছে বিজ্ঞানের, যা প্রযুক্তি বিকাশের পথ দেখিয়েছে। ব্যাবেজের যুগে তাঁর পরিকল্পিত অ্যানালিটিক ইঞ্জিন বানানো সম্ভব হয়নি, কিন্তু কম্পিউটার প্রযুক্তি সেই মৌলিক কাঠামোকে স্বীকার করেই অগ্রসর হয়েছে। আধুনিক কম্পিউটারের কর্মপদ্ধতি ইউনিভার্সাল টুরিং মেশিনের মধ্যেই পাওয়া গিয়েছিল, এক অর্থে সমস্ত আধুনিক কম্পিউটারই হল ইউনিভার্সাল টুরিং মেশিনের রূপভেদ।

মানুষের মন কে কি যন্ত্র হিসাবে দেখা যায়? এই আলোচনা প্রসঙ্গে দেখলাম মন যে ঠিক কী, তা নিয়ে এখনো কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। নানা যুগ তাদের কালের সর্বোচ্চ যন্ত্রকে মডেল হিসাবে রেখে মানুষের মনকে বুঝতে চেয়েছে। সেই কারণে চার্লস ব্যাবেজ ভিক্টোরিয়ার যুগে তাঁর প্রস্তাবিত কম্পিউটারকে ইঞ্জিন নাম দিয়েছিলেন; আধুনিক যুগে আমরা কম্পিউটারকে দিয়ে মানব মনের বিচার করার চেষ্টা করি। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে মানুষের মন কি 'কম্পিউটেবল' বা 'গণনাক্ষম’ এই প্রশ্ন নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীই চিন্তা করেছেন; অ্যালান টুরিং, রজার পেনরোজ বা কুর্ট গোডেল তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। যন্ত্র হোক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,তার পক্ষে কি সত্যিই মানব মনের প্রতিরূপ হওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের অজানা। তার একটা কারণ হল মানব মনেরও অনেক কিছুই এখনো আমাদের জ্ঞানের বাইরে। অবশ্য তার অর্থ এই নয় যে তা বিজ্ঞানের অতীত। তবে এ বিষয়ে আধুনিক চিন্তাভাবনা সম্প্রতিই শুরু হয়েছে, এখনো অনেকটা পথ আমাদের যেতে হবে।

এই সংক্ষিপ্ত আলোচনাতে বইটির অনেক দিকই তুলে ধরা সম্ভব হল না। বিজ্ঞানের নানা ক্ষেত্র বোধবিজ্ঞানে অবদান রেখেছে, বা বর্তমানেও রাখছে। তাদের অনেকগুলি সম্পর্কেই বর্তমান আলোচকের জ্ঞান নিতান্তই সীমিত। আধুনিক যুগ হলে ইন্টারডিসিপ্লিনারি বা আন্তঃবিভাগীয় গবেষণার যুগ। আমরা ক্রমশই বুঝতে পারছি যে বিজ্ঞানকে নানা ভাগ করে আমরা যে আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে রাখতাম, সেগুলি নিতান্তই কৃত্রিম; বাস্তবে তাদের অস্তিত্ব নেই। সেই কারণেই রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় জীববিজ্ঞানীকে, কম্পিউটার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পদার্থবিদ্যাতে পুরস্কার পান। যদি আপনি বিজ্ঞানের আধুনিকতম বিষয় নিয়ে উৎসাহী হন, তাহলে এই বইটি আপনার অবশ্যপাঠ্য। তবে মনে রাখবেন, ‘বোধবিজ্ঞান' এমন বই নয় যে খবরের কাগজের প্রবন্ধের মতো করে তাকে পড়া যাবে। যে সমস্ত বিষয়ের বই আমাদের মাতৃভাষাতে প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে, তাদের ভাষা আপাতভাবে একটু কঠিন মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিজ্ঞানের অনেক ক্ষেত্রই আছে, যেখানে শব্দচয়ন মোটেই সরল নয়; কিন্তু বহু বছর ধরে সেই শব্দগুলি ব্যবহৃত হচ্ছে বলে এখন আর আমাদের সেগুলি পড়তে সমস্যা হয় না। যে কোনো ভাষাতে যখন প্রথম কোনো বিষয় আলোচিত হয়, তখন অনেক শব্দই অচেনা ঠেকে। এমন বইকে আত্তীকরণের জন্য সময় দিতে হবে, তবে সেই সময় দিলে পাঠক যে লাভবান হবেন তাতে সন্দেহ নেই।

লেখক এই জটিল এবং নতুন বিষয়টিকে অসাধারণ নৈপুণ্যের সঙ্গে দুই মলাটের মধ্যে উপস্থাপন করেছেন। বইটির মুদ্রণ খুবই সুন্দর, চোখে পড়ার মতো কোনো প্রমাদ নেই। অসাধারণ প্রচ্ছদ নির্মাণ করেছেন সৌম্যেন পাল। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলা জনপ্রিয় বিজ্ঞান বইয়ের তালিকার প্রথমদিকেই থাকবে 'বোধবিজ্ঞান'।

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


প্রকাশঃ জ্ঞান ও বিজ্ঞান আগস্ট ২০২৫

Saturday, 19 July 2025

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা - কেন করব?

 

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা - কেন করব?

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

স্বাধীনতার পরের বছরেই আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর উদ্যোগে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা ও প্রসারের জন্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ। প্রতিষ্ঠা দিবসেই প্রকাশিত হয়েছিল পরিষদের মুখপত্র জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার প্রথম সংখ্যা। সেখানে 'রামেন্দ্র'র পথ না জগদীশ-প্রফুল্ল'র পথ', এই নামের একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন সুপরিচিত সমাজবিজ্ঞানী বিনয়কুমার সরকার। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান প্রসারের জন্য অনেক পরিশ্রম করেছেন। তাঁর প্রায় সমসাময়িক জগদীশচন্দ্র ও প্রফুল্লচন্দ্র আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণাতে আমাদের দেশে পথিকৃৎ। বিশেষ করে জগদীশচন্দ্র তাঁর গবেষণা বাংলা ভাষায় লিখে প্রকাশ করেছিলেন। বিনয়কুমার প্রশ্ন করেছিলেন বিজ্ঞান পরিষদ কোন পথে এগোবে? সে কি বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান গবেষণা করার দিকে নজর দেবে? নাকি শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের মধ্যে বিজ্ঞান প্রসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

বিনয়কুমার নিজের মতো করে প্রশ্নের একটা উত্তর দিয়েছিলেন, কিন্তু আট দশক পরে সেই উত্তর নিয়ে আলোচনার সম্ভবত বিশেষ প্রয়োজন নেই। এই সময়ের মধ্যে পৃথিবীর বিজ্ঞান জগতের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ১৯৪৮ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ অবশ্যই শেষ হয়েছিল, কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে তার অভিঘাত তখনো পুরোপুরি বোঝা যায় নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত ইউরোপই ছিল বিজ্ঞান গবেষণাতে অগ্রগণ্য। কিন্তু হিটলারের ফ্যাসিস্ট শাসন থেকে প্রাণ বাঁচাতে ইউরোপের বিজ্ঞান জগতের রথীমহারথীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইউরোপে নানা দেশের বিজ্ঞানীরা নিজেদের ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা করতেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পরে তাঁরা বাধ্য হয়েই ইংরাজিতে তাঁদের গবেষণা প্রকাশ করতে থাকেন। বিজ্ঞানের ভারকেন্দ্র চলে যায় নতুন দুনিয়াতে।

গত তিন দশকে তার সঙ্গে দুটি বিষয় যুক্ত হয়েছে। প্রথমত, অতি দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রসার যা আগে কল্পনাতীত ছিল; গোটা পৃথিবীটাই একটা গ্রামের সমতুল্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাকে আমরা বলি ভুবন-গ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজ। দূরের দেশের কোনো ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষকেও একটা ইমেল লিখলে পরের মিনিটেই আমরা তার উত্তর আশা করি। আরও জরুরি প্রয়োজন হলে সরাসরি ফোন বা মেসেজ করি। এর সুযোগে ইংরাজি বাস্তবিকপক্ষে একমাত্র আন্তর্জাতিক ভাষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয়ত, একাকী বা অল্প কয়েকজন মিলে বিজ্ঞান গবেষণার যুগ এখন অতীত। বহু প্রকল্প এতই ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোনো একটি দেশের পক্ষে তার ভার বহন সম্ভব হচ্ছে না। গবেষণা এখন প্রকৃত অর্থেই আন্তর্জাতিক, নানা প্রকল্পে একই সঙ্গে হাজার হাজার বিভিন্ন ভাষাভাষী বিজ্ঞানী কাজ করেন; তাঁদের মত বিনিময়ের স্বাভাবিক মাধ্যম হল ইংরাজি। বিজ্ঞান বিষয়ক প্রায় সমস্ত প্রধান গবেষণাপত্রিকাগুলি এখন ইংরাজি ভাষাতেই প্রকাশিত হয়। ইউরোপের উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে ইংরাজি ভাষাতে শিক্ষাদান ক্রমশই বেড়ে চলেছে।

এখানে দু' একটা ব্যতিক্রমের কথা উল্লেখ করতে হয়, তার মধ্যে অন্যতম হল চিন। বিজ্ঞানপ্রযুক্তি গবেষণাতে মোট বিনিয়োগের হিসাবে চিন এখন দ্বিতীয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরেই। চিনের নীতিপ্রণেতারা বিশ্বাস করেন বিজ্ঞান প্রযুক্তিই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, এবং জনগণের মধ্যে বিজ্ঞান প্রসার করতে হলে তাদের মাতৃভাষাই সব থেকে উপযুক্ত। তাই চিনা ভাষাতে বিজ্ঞান প্রসারে তাঁরা অর্থ বিনিয়োগ করছেন। তা সত্ত্বেও সেখানেও গবেষণাতে ইংরাজির ব্যবহার ক্রমশই বেড়ে চলেছে, কারণগুলো আগেই বলেছি। বিজ্ঞানচর্চার চরিত্রটাই হল আন্তর্জাতিক, এবং সেখানে ইংরাজি বর্তমানে একমাত্র মাধ্যম। জাপানের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে।

আগেই দেখেছি আন্তর্জাতিকভাবে ইংরাজি এখন বিজ্ঞানে যোগাযোগের ভাষা। কাজেই আমরা চাইলেও সম্ভবত তার থেকে মুখ ফিরিয়ে বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞানচর্চা করা খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু যদি সেটা করতেও চাই, আমাদের সামনে অনেকগুলি প্রতিবন্ধকতা কাজ করবে। ইংরাজির সঙ্গে পাল্লা দিতে গেলে যে কোনো ভাষার প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার পরম্পরা, সদিচ্ছা এবং বিনিয়োগ। বিজ্ঞানচর্চার পরম্পরা আমাদের সমাজে নেই, দু' একজন বড় বিজ্ঞানী থাকলেও তা দিয়ে পরম্পরা গড়ে ওঠে না। আবার শুধুমাত্র পরম্পরা দিয়ে মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা সম্ভব নয়, পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি তার উদাহরণ। সেখানে জার্মানি, ইতালি বা ফ্রান্সের মতো বিজ্ঞানে অগ্রসর দেশেও মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চা কমে এসেছে। ঐতিহাসিকভাবেই ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য আমাদের দেশে ইংরাজি ভাষার চল আছে, এবং বিশেষ করে সমাজের উঁচুতলার মধ্যে তা আরও বাড়ছে। বহুভাষাভাষী ভারতবর্ষে বাংলা একটা প্রাদেশিক ভাষা মাত্র, এবং অবিরত তাকে হিন্দি ভাষার আগ্রাসনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমাদের দেশে বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ হাস্যকর রকম কম; এই মুহূর্তে তা চিনের ন' ভাগের এক ভাগ, এবং ক্রমেই আরও কমছে। সেই অতি সামান্য বিনিয়োগের একাংশকে মাতৃভাষাতে বিজ্ঞান গবেষণার মতো কাজে খরচ করার চিন্তা বিলাসিতা ছাড়া কিছুই নয়।

কেন বিজ্ঞানপ্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ক্রমশই কমছে? তার কারণ বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকরা প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ও পুরাণের মধ্যে বিজ্ঞান খুঁজতেই বাসত। তাঁদের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান শুধু অপ্রয়োজনীয় নয়, রীতিমত বিপজ্জনক; কারণ বিজ্ঞান শুধু একটা বিষয় নয়। বিজ্ঞান একটা দর্শন, চোখ বুজে কোনো কিছুকে বিশ্বাস করতে বারণ করে, প্রশ্ন করতে ও যুক্তির সাহায্যে বিচার করতে শেখায়। বিশেষ করে আমাদের সমাজে যা কিছু পুরানো তাদের প্রতি একটা অহৈতুকী ভক্তি লক্ষ্য করা যায়, শাসকরা তার সুযোগ নিচ্ছেন। বিজ্ঞান ঠিক সেই পুরানোকেই প্রশ্ন করে। তাই সমাজপতিরা চিরকালই বিজ্ঞানকে অপছন্দ করেন।

বিজ্ঞান গবেষণা ও সাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান প্রসারের বাইরে আরও একটা বিষয় আছে, তা হল বিজ্ঞান শিক্ষা। আমি একে দুই ভাগে ভাগ করতে চাই, উচ্চ শিক্ষা ও বিদ্যালয়ে শিক্ষা। প্রথমেই আসি উচ্চ শিক্ষার কথায়। প্রশ্ন আসে, বিজ্ঞানপ্রযুক্তিতে উচ্চশিক্ষার পরে ছাত্র বা ছাত্রীটি কী করবে? পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ এতই কম যে রাজ্য ত্যাগ করা ছাড়া তাদের সামনে বিশেষ পথ খোলা নেই। সেক্ষেত্রে ইংরাজি ভাষাতে অন্তত চলনসই জ্ঞান প্রয়োজন। সারা দেশেও বিজ্ঞানপ্রযুক্তিতে শিক্ষিতদের জন্য যে ক'টি নতুন চাকরি হচ্ছে তাদের অধিকাংশই তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে। সেখানে ইংরাজি ছাড়া গত্যন্তর নেই।

এর পাশাপাশি রয়েছে উচ্চশিক্ষার বাস্তব চিত্র। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত শতাব্দীতে অনার্স ও পাস পরীক্ষাতে বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র ইংরাজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাতেও হত। কিন্তু আমার জ্ঞানত পদার্থবিদ্যার অনার্সে একজন পরীক্ষার্থীও বাংলা ভাষাতে উত্তর লিখেছে বলে শুনিনি; সে জন্য এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে বাংলা প্রশ্নপত্র বন্ধ হয়ে যায়। এর পিছনে একটা কারণ হয়তো ভালো পাঠ্যপুস্তকের অভাব, কিন্তু ব্যক্তিগত জ্ঞান থেকে বলতে পারি যে অন্তত পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে সেই যুক্তি খাটে না। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদের উদ্যোগে গত শতাব্দীর শেষ দুই দশকে অনেকগুলি পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তক ছাপা হয়েছিল, যেগুলি যে কোনো আন্তর্জাতিক পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারত। সেগুলি লিখেছিলেন অমলকুমার রায়চৌধুরি বা সমরেন্দ্রনাথ ঘোষালের মতো দিকপাল বিজ্ঞানী ও অধ্যাপকেরা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি ছাত্রছাত্রীরাও শ্রেণিকক্ষে বাংলা ভাষাতে পড়ানোকেই পছন্দ করে। তা সত্ত্বেও পরীক্ষাতে বাংলাতে উত্তর লেখার চেষ্টা ছাত্রছাত্রীরা করেনি। তার কারণ আগের আলোচনা থেকেই পাওয়া যাবে। বর্তমানে অবশ্য বাংলা পুস্তকগুলি বিশেষ পাওয়া যায় না। পেলেও লাভ হত না, কারণ এর মধ্যে পাঠক্রম অনেক পরিবর্তন হয়ে গেছে; কিন্তু আমাদের রাজ্য সরকার নতুন বই ছাপা বা পুরানোর পুনর্মুদ্রণ কোনোটাতেই আগ্রহী নন।

বিদ্যালয় স্তরের সমস্যাটা অন্য রকম। সেখানে বাংলা পাঠ্যপুস্তক পাওয়া যায়, এবং এখনো পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী বাংলা ভাষার মাধ্যমেই পড়াশোনা করে। কিন্তু সমাজের এলিট বা উচ্চশ্রেণি বাংলা মাধ্যম থেকে মুখ ফিরিয়েছেন, সম্ভব হলে তাঁরা বাংলা ভাষাটাকেই ত্যাগ করতে চান। তার পিছনে অনেক আর্থসামাজিক কারণ আছে, বিশেষ করে কাজের সুযোগের কথা আগেই বলেছি। তার সঙ্গে আছে সমাজের তথাকথিত নিম্নস্তরকে দূরে রেখে নিজেদের জন্য একটা আলাদা জগৎ সৃষ্টির প্রয়াস। তাই এখন যখন 'অন্য' শ্রেণির মানুষরাও কষ্ট করে হলেও ছেলেমেয়েদের ইংরাজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, তখন উচ্চ শ্রেণি তাদের ছেলেমেয়েদের জন্য বেছে নিচ্ছেন তথাকথিত আন্তর্জাতিক স্কুল। সেখানে বাংলা না পড়ালেও ইংরাজির পাশাপাশি ফরাসি জার্মান বা স্প্যানিশের মতো ভাষা পড়ানো হয়, যদিও ইংরাজির এই আধিপত্যের যুগে সেই জ্ঞান বাস্তবে কোন কাজে লাগবে জানি না।

এ ঘটনা নতুন নয়; আমাদের ইতিহাসেই এর উদাহরণ আছে। সংস্কৃত সাধারণ মানুষের ভাষা ছিল না, তা ছিল সমাজের উচ্চবর্ণের উচ্চ শ্রেণির ভাষা। সাধারণ মানুষ কথা বলতেন প্রাকৃতে। এভাবেই সমাজের উচ্চশ্রেণি নিম্নবর্গের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলেছিল। ইউরোপেও মধ্যযুগে পণ্ডিতরা লাতিন ভাষায় বিদ্যাচর্চা করতেন, নিজেদের মধ্যে মত বিনিময় করতেন। সাধারণ মানুষ সেই ভাষা ব্যবহার করতেন না।

বাংলা একটা দেশের মাতৃভাষা, কিন্তু সেই বাংলাদেশে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির চর্চা সম্পর্কে আমার খুব বেশি জানা নেই। তবে যেটুকু জানি, তার থেকে মনে হয় এই সমস্যাগুলো সে দেশেও কমবেশি আছে। বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান গবেষণা বা উচ্চ শিক্ষার সমস্যাগুলির সমাধান সুদূরপরাহত। সমাজের এলিট শ্রেণি বিদ্যালয়ে স্তরেই বাংলা ভাষাকে ত্যাগ করছেন। আমরা যতই ভাষাদিবস পালন করি, বা রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে বলি শিক্ষায় মাতৃভাষাই মাতৃদুগ্ধ, সমাজের মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। বরঞ্চ আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন হল, সত্যিই কি বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান চর্চা বা বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো প্রয়োজন আছে? নাকি এ শুধুমাত্র নস্টালজিয়া? শৈশবে কৈশোরে বাংলা ভাষাতে পড়াশোনা করেছিলাম, সেই অতীতে ফিরে যাওয়ার বন্ধ্যা প্রয়াস?

এই প্রশ্নের উত্তর আমি আমার মতো করে দেওয়ার চেষ্টা করব, তবে তার আগে আমাদের দেশে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু কথা বলতে চাই। আমাদের সমাজে আধুনিক বিজ্ঞানকে বাইরে থেকে এনে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে, এখনো পর্যন্ত আমাদের জীবনের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিশেষ নেই। ঐতিহাসিক কারণেই আমাদের জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চা প্রাচীন রীতিনীতির সঙ্গে সমঝোতা করে চলেছে। ঔপনিবেশিক শাসকরা যখন বিদেশি শাসনের যৌক্তিকতা হিসাবে আমাদের সমাজের পশ্চাতপদতার কথা বলতেন, তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে আমাদের নবজাগরণ প্রাচীন ভারতীয় সমাজকে মহিমান্বিত করেছিল। কিন্তু এর ফলে প্রাচীন সমাজের অযৌক্তিক দিকগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ব্যাহত হয়েছে, এবং বাস্তবে বিজ্ঞানবিপ্লব করা সম্ভব হয়নি। যেখানে বিজ্ঞানবিপ্লব সফল হয়েছে, সেই পশ্চিমি দুনিয়াতে বিজ্ঞানীদের মধ্যে অলৌকিক বা আধিদৈবিকে বিশ্বাস তলানিতে ঠেকেছে। যাঁরা ব্যক্তিগতভাবে ধর্মে বিশ্বাস করেন তাঁরাও তাঁদের বিজ্ঞানচর্চাকে তার থেকে পৃথক রাখেন। সেখানে যে কোনো মানুষই বাইবেল বা অন্য ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত অলৌকিক ঘটনাকে বিজ্ঞানপ্রযুক্তির মোড়কে উপস্থিত করার চেষ্টা করেন না তা নয়, কিন্তু তা নিতান্তই ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই সমাজের উচ্চশ্রেণি সেই প্রচেষ্টাকে সমর্থনের চেষ্টা করে না বা কোনো প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী তাতে যোগ দেন না।

আমাদের মতো অনেক সমাজে পরিস্থিতিটা অন্যরকম। বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করলেই কেউ বিজ্ঞানমনস্ক হবে এমন কথা বলা যায় না। বিজ্ঞানের বিপ্লব না হওয়ার ফলেই আমাদের বিজ্ঞানীদের মধ্যেও নানা অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা বাসা বেঁধে আছে। আগে সেগুলি তেমন প্রকাশ পেত না বা প্রচার হত না। এই সর্বব্যাপী সমাজমাধ্যমের যুগে তা সহজেই সামনে আসছে, ফলে যে সাধারণ মানুষটি আগে তাঁর অবৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনাকে লুকিয়ে রাখতেন, তিনি এখন তা প্রকাশ্যে আনতে দ্বিধা বোধ করছেন না, এবং তাঁর মতো অনেকেই তাঁকে সমর্থন করছেন। তার ফল হল ভোটের মুখাপেক্ষী আমাদের শাসকরা সমাজের পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পরিবর্তে তাদেরই জয়গান গাইছেন। যুক্তিবাদ, বিজ্ঞান সব কিছু শিকেয় তুলে সমাজকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে।

বর্তমানে বিজ্ঞান নিজেই আক্রান্ত হচ্ছে। বিজ্ঞানপ্রযুক্তির চোখ ধাঁধানো বিকাশ সত্ত্বেও গরিব মানুষের অবস্থার উন্নতি হয়নি; অন্যদিকে ধনী আরও ধনী হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি বেশ ব্যয়সাপেক্ষ, ফলে সমাজের উঁচুতলা তার দখল নিচ্ছে। মানুষের মনে যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছে, তা শাসকদের আসন টলিয়ে দিতে পারে। শাসকরা তাই তাকে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী ধারণার বিরুদ্ধে চালনা করার চেষ্টা করছেন এবং অনেক সময়েই সফল হচ্ছেন। পুরানো ধ্যানধারণার বাড়বাড়ন্ত ঘটছে, ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে যুক্তিবাদের জায়গা নিচ্ছে কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস ও রহস্যবাদ।

এই পরিস্থিতিতে অবিজ্ঞান, অপবিজ্ঞান ও অযুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইটা কঠিনতর হয়ে পড়েছে। তাহলে উপায় কী? আমরা ইতিহাসের পাতা খুলি। গ্যালিলিওর বিচারের কথা আমরা সবাই জানি। গ্যালিলিও সূর্যকে স্থির পৃথিবীকে চলমান বলে বাইবেল বিরোধী কথা বলছেন, ক্যাথলিক চার্চের সামনে এটাই একমাত্র সমস্যা ছিল না। সমস্যাটা এটাও ছিল যে তিনি তাঁর বই লাতিনে না লিখে ইতালিয় ভাষাতে লিখছেন, যাতে করে শুধু পণ্ডিতরা নয়, সাধারণ মানুষেও তাঁর কথা বুঝতে পারেন। এর ফলে ধর্মের উপর থেকে মানুষের বিশ্বাস টলে যেতে পারে, এবং বাস্তবেও তাই হয়েছিল। নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকার গণিত নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের অবোধ্য ছিল, সেই বই লাতিনেই লেখা। কিন্তু আলোকবিদ্যা সংক্রান্ত তাঁর অধিকাংশ পরীক্ষানিরীক্ষা যে কোনো উৎসাহী মানুষই করে দেখতে পারেন, তাই সচেতনভাবেই তাঁর অপটিক্স বইটি তিনি ইংরাজি ভাষাতেই লেখেন। আধুনিক বিজ্ঞান মূলগতভাবে প্রাচীন বিজ্ঞান থেকে পৃথক; সেখানে প্রাচীন পুস্তক বা পণ্ডিতদের কথায় বিশ্বাস না করে পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের উপর জোর দেওয়া হয়, আপ্তবাক্যের জায়গা নিয়েছে যুক্তি। স্বাভাবিকভাবেই সে যুগে সমাজের উপরের শ্রেণির তা পছন্দ ছিল না, কিন্তু সাধারণের বোধগম্য ভাষাতে বিজ্ঞানের প্রকাশের ফলে যে বিপ্লব শুরু হয়েছিল, তাকে আটকানোর ক্ষমতা তাঁদের ছিল না।

আরও প্রাচীন এক উদাহরণের কথা বলতে পারি। মধ্যযুগে ইউরোপ, ভারত বা চিনে যখন বিজ্ঞানচর্চা কানাগলিতে ঢুকে পড়েছিল, তখন তাকে উদ্ধার করেছিল আরব সভ্যতা। আরব সভ্যতার সেই যুগে বিজ্ঞানের চালনাশক্তি হয়েছিল বিদেশি ভাষা থেকে আরবিতে অনুবাদ। বহু গ্রিক, সংস্কৃত, চিনা বইয়ের অনুবাদ হয়েছিলে, খলিফারা ছিলেন সেই কাজের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। গ্রিক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী অ্যারিস্টটলের অনেক বইয়ের গ্রিক মূলটি আর পাওয়া যায় না, আরবিতে অনুবাদ হয়েছিল বলে সেগুলি রক্ষা পেয়েছে। এভাবেই নিজের ভাষাতে চর্চার মাধ্যমেই আরব সভ্যতা বিজ্ঞানে প্রাচীন যুগকে ছাড়িয়ে অনেক মৌলিক অবদান রেখেছিল। আরব সাম্রাজ্য স্পেন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। আবার যখন তা পিছু হটতে শুরু করে, ইউরোপের পণ্ডিতরা আরবি ভাষায় লেখা বইপত্র হাতে পান। জ্ঞানবিজ্ঞানের বই আরবি থেকে অনুবাদের মাধ্যমে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল। অবশ্য প্রথমে সেই অনুবাদ হয়েছিল পণ্ডিতদের ভাষা লাতিনে, কিন্তু তার পরে তা স্থানীয় ভাষাতেও অনুবাদ হয়েছিল।

উপরের দুটি উদাহরণ থেকে দেখতে পাই সমাজে বিজ্ঞানকে দৃঢ়প্রতিষ্ঠ করতে গেলে মাতৃভাষার মাধ্যমেই সেটা সম্ভব। আমাদের প্রয়োজন সংস্কৃতির পরিবর্তন; তা মাতৃভাষার মাধ্যমে যত সহজে সম্ভব, অন্য কোনো ভাষার মাধ্যমে তত সহজে নয়। শুধু বিজ্ঞান পরিষদ নয়, আমরা যারা সমাজের সুস্থ বিকাশ চাই, সমাজকে বৈজ্ঞানিক ধারণার ভিত্তিতে সংগঠিত করতে চাই, আমাদের সকলের সামনে যে পথ খোলা তা হল রামেন্দ্র'র পথ, অর্থাৎ মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান প্রসার। তা যে স্কুল কলেজের শ্রেণিকক্ষে করতে হবে এমন নয়, জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বইও সেই কাজ সাফল্যের সঙ্গে করতে পারে। অবিজ্ঞান ও অযুক্তির বিরুদ্ধে যে পথকে রামেন্দ্র'র পথ বলে এই লেখাতে চিহ্নিত করতে চাওয়া হয়েছে, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী নিজেও সেই পথে স্থির থাকতে পারেননি; তবে সে অন্য প্রসঙ্গ। আরব সভ্যতার ইতিহাস এই শিক্ষাও দেয় যে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের জন্য সংগ্রামকে কখনোই বন্ধ করা যাবে না, তা হলে আবার আমরা পশ্চাৎপদতার কানাগলিতে ঢুকে পড়ব। 

 

প্রকাশ - সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনা, নববর্ষ সংখা- ১৪৩২