Friday, 3 July 2020

বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার (১) - সিডনি


বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার 
১- সিডনি

শম্পা গাঙ্গুলী

হোটেল থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে আমরা সবাই সমুদ্রের পাড়ের উঁচু রাস্তা ধরে হাঁটছি। মাঝে মাঝে ছবি তোলার বিরতি। একটা অদ্ভুত ভাস্কর্য চোখ টানল। সূর্যের ঝকঝকে আলোয় আপাতভাবে শান্ত পোতাশ্রয়ের চিকচিকে জল আর দাঁড়িয়ে থাকা সুসজ্জিত মালবাহী বিশাল বিশাল জাহাজগুলো আমাকে উঁচু রাস্তা থেকে সমুদ্রের পাড়ে টেনে নামাল। আমার দেখাদেখি ঝুলনও নামল ঢালু ঘাসের কার্পেট বেয়ে। অপূর্ব দৃশ্য।

সিডনি হারবারের রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্র

একা
এবং কয়েকজন

 আমাদের লক্ষ্য লেডি ম্যাকুয়ারির চেয়ার। আমাদের মত সব পর্যটকের লক্ষ্যও তাই। সিডনির স্বাভাবিক পোতাশ্রয়ের উপদ্বীপ অংশের একদম শেষ বিন্দুতে সেই চেয়ার। উপরের রাস্তা থেকে খাড়াইভাবে নেমে আসা বেলেপাথরকে খোদাই করে বিশাল একটা হাতলছাড়া আরামকেদারার রূপ দিয়েছে। ১৮১০ সালে জেলের একদল বন্দী এর রূপকার। সেইসময় নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের গভর্নর ছিলেন মেজর জেনারেল লকলান ম্যাকুয়ারি। তাঁর স্ত্রী লেডি ম্যাকুয়ারির স্মৃতিতে ঐ চেয়ারটি খোদাই করা হয়েছিল। উপদ্বীপের ঐ শেষ বিন্দুতে বসে লেডি ম্যাকুয়ারি আশপাশের শোভা উপভোগ করতেন আর ব্রিটিশ জাহাজগুলো দেখতেন, যেগুলো পোতাশ্রয়ে এসে ভিড়ত। আমি আর ঝুলন সেখানে আগে পৌঁছলেও ওপরের রাস্তা ধরে আসা আমাদের দলের অন্যরাও একটু পরেই এসে গেল।পাথরের চেয়ারের গায়ে খোদাই পড়ে জানলাম যে উঁচু রাস্তা দিয়ে সবাই ওখানে পৌঁছল, সেটার নামও মিসেস ম্যাকুয়ারিস রোড, আর চেয়ারটা তৈরি শেষ হয়েছিল ১৮১৬ সালের জুন মাসে। ওর সামনে দাঁড়ালে পশ্চিমে পৃথিবী বিখ্যাত সিডনি অপেরা হাউস আর উত্তর-পশ্চিমে হারবার ব্রিজ। নিউইয়র্কের হেল গেট ব্রিজের অনুকরণে এটি তৈরি হয়। পৃথিবীর উচ্চতম এবং সবচেয়ে চওড়া স্টিলের ব্রিজ। সূর্যের আলোয় চকচকে নীল সমুদ্রের বুকে অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজকে পশ্চাৎপটে রেখে প্রচুর ছবি তোলা হল। আমরা ভেবেছিলাম হোটেলের থেকে বেরিয়ে ম্যাপ দেখতে হবে, কিন্তু এই জায়গাটা আসতে তার আর প্রয়োজন হয়নি। সমুদ্রকে অনুসরণ করেই পৌঁছে গেছি।

লেডি ম্যাকুয়ারির চেয়ার

সিডনির পথের মাঝে এক অদ্ভুত শিল্পকলা

ঐন্দ্রিলা আমাদের কলেজ জীবনের বন্ধু, অনেকদিন ধরে চাইছিল আমরা আর অনির্বাণের পরিবার ওর বাড়ি যাই। কলেজ জীবনে অনির্বাণ, গৌতম ছিল ওর ক্লাসমেট। আর আমি ছিলাম ব্যাচমেট। এখন ঐন্দ্রিলা আর ওর স্বামী ইন্দ্রনীলদা থাকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের কাছে শেপার্টনে। অনির্বাণের সঙ্গে ওর স্ত্রী ঝুলন আর ওদের ছেলে মুনু। অভিজিতরাও আমাদের সঙ্গী হল। অভিজিৎ আর কাবেরীও আমাদের পুরানো বন্ধু, কলেজে আমাদের থেকে জুনিয়র। ওদের ছেলে আহেল। সব মিলিয়ে আটজনের দল। সেই শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের দল। ঠিক হল, প্রথমে সিডনি, তারপর কেয়ার্ন্স এবং সবশেষে মেলবোর্ন হয়ে ঐন্দ্রিলাদের বাড়ি শেপার্টন। ২০১৮-এর অক্টোবরের ১৮ তারিখ সিডনির টিকিট কাটা হল আমাদের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রবল উত্তেজনা। অনির্বাণের ছেলে মুনুর পাসপোর্টের ভ্যালিডিটি ছমাসের কম হওয়ায় পাসপোর্ট রিনিউ করিয়ে সেটা হাতে পাওয়া নিয়ে খুব সমস্যায় পড়তে হল। ঝুলন তো ধরেই নিল ছেলের ভিসা না হওয়ায় ওদের যাওয়া বাতিল করতে হচ্ছে।কিন্তু অবশেষে শেষ মুহূর্তে পাসপোর্ট এল এবং দুর্গা পুজোর সময় বলে সময়ের অনেক আগেই আমরা সবাই দমদম এয়ারপোর্টে হাজিরা দিলাম। এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট ধরে কুয়ালালামপুর হয়ে সিডনি। এয়ারপোর্টেই গৌতমদের কলেজের প্রাক্তন ছাত্র প্রীতমের সঙ্গে দেখা। তার বাড়ি আমাদের বাড়ির কাছেই, সে চলেছে জাপান, পড়াশোনার কাজে।

আবার ফিরে আসি সিডনিতে। আমি আর গৌতম ওই চত্বরের বোটানিকাল গার্ডেনে স্বেচ্ছায় হারালাম। সমুদ্রের ধার দিয়ে অপেরা হাউসের দিকে এগিয়ে যাওয়া আমাদের দলের বাকিদের আশ্বাস দিলাম ঘুরপথে গেলেও আমরা ঠিক সময়ে অন্যদের ছুঁয়ে ফেলব।অপূর্ব পরিকল্পনায় বিশাল বাগানটা সাজানো। আর্থার জ্যাক্স নামে একজন শিল্পীর তৈরি এক অনবদ্য সৃষ্টির সামনে আমরা থমকে দাঁড়ালাম। শিল্পীর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা নেই। এক মেয়ে ঘোড়া ও তার শাবক।এত জীবন্ত ভাস্কর্য পৃথিবীতে বোধহয় খুব কমই আছে। এমনিতে গৌতম খুব একটা নিজের ছবি তুলতে আগ্রহী হয় না। কিন্তু দেখলাম ভাস্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে সানন্দে ছবি তুলল।

জীবন্ত এই ভাস্কর্যের সামনে গৌতম

 

কুইন্সল্যান্ড বটল ট্রি

পাশেই চোখে পড়ল একটা বড় গাছ। আরে, এই এডিনাম গাছ আমার বাগানেও আছে! কিন্তু তার উচ্চতা দু ফুট। আর এটার উচ্চতা প্রায় চল্লিশ ফুট। গুঁড়িটা যত মোটা হবে এই গাছের তত শোভা। এই গাছটার গুঁড়িটাও প্রায় চল্লিশ ফুট পরিধি হবে। কাছে গিয়ে দেখলাম এটা এডিনাম নয়। এর নাম কুইন্সল্যাণ্ড বটল ট্রি। এরকম আরও অসংখ্য বিরল প্রজাতির গাছে ভরা বোটানিকাল গার্ডেন। 

ঝাড়ুদার পাখি

এক জায়গায় দেখি পরপর কয়েকটা সাজানো রেস্তরাঁ। সে তো ঠিক আছে। কিন্তু প্রত্যেকটাতে রেস্তরাঁর সামনে অতিথিদের অভ্যর্থনায় দাঁড়িয়ে আছে একটি বা দুটি করে সারস জাতীয় সুন্দর পাখি। পায়ে কোনো শিকল নেই, মনে তাদের কোন ভয়ডরেরও বালাই নেই। আইবিস পাখি। কাছে গিয়ে ছবি তুললে কোনো আপত্তি করল না। লোকের এঁটো পাতগুলো দিব্যি চেটেপুটে সাফ করছে। আমাদের দেশের ঝাড়ুদার পাখি কাক সুশ্রী নয় বলে কি এখানকার রেস্তরাঁ মালিকরা তাদের এমন অনুমোদন দেয় না? নাকি ওদেশের মানুষ অনেক বেশি প্রকৃতি প্রেমিক!

এক জায়গায় দেখি অনেক পুরানো একটা বটগাছ। গাছের পাশে একটা বোর্ডে কবি এইলিন চঙের লেখা একটা কবিতা। এইলিন চঙ সিডনির রয়াল বোটানিকাল গার্ডেনের পোয়েট ইন রেসিডেন্স ছিলেন। রাজাদের রাজসভা আলো করে কবিরা থাকতেন, রাজাদের প্রশংসা করার জন্য। কিন্তু একটা বাগানের গাছেদের জন্যও একজন কবি? এটা আমাদের ভাবনার বাইরে ছিল। এই মহিলা কবির বয়স খুবই কম। ১৯৮০ সালে সিঙ্গাপুরে তাঁর জন্ম। সাতাশ বছর বয়সে তিনি অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সারির কবি। সিডনির জনসংখ্যার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল পঁয়তাল্লিশ শতাংশ লোকের জন্ম অস্ট্রেলিয়ার বাইরে এবং আরো আশ্চর্যের বিষয় হল এই শহরে প্রায় আড়াইশো ভাষার চল আছে। পঁয়ত্রিশ শতাংশের বেশি লোকের মাতৃভাষা ইংরাজি নয়। বিবিধ ভাষা আর সংস্কৃতির মিলন ঘটেছে এই শহরটাতে।

এক জায়গায় দেখি একটা পদ্ম-পুকুর। তার পাশেই এই বাগানের প্রধান জলাশয়টা আছে। সেখানে পাওয়া যায় অনেক ইল মাছ। এগুলো লঙ ফিন ইল প্রজাতির। বেশ কয়েকবার জলাশয়টা পরিষ্কার করার সময়ে মাছগুলোকে বার করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আবার এখানে এই মিষ্টি জলে চলে আসে। কি অদ্ভুত! ভাবছিলাম, এটা কিভাবে সম্ভব! সমুদ্র তো প্রায় একশো মিটার দূরে। ইল মাছেদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে এক চমৎকার তথ্য জানলাম। এরা আসলে মিষ্টি জলের মাছ। চরিত্রে কিছুটা আমাদের সাধের ইলিশের মত হলেও ইলিশের বিপরীতগামী। এরা ষাট বছর অবধি বাঁচে। মেয়ে মাছ ডিম পাড়ার সময়ে এরা সিডনির মিষ্টি জল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় দুহাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয় নির্জন নিউ ক্যালিডোনিয়া দ্বীপে। এক সঙ্গে প্রায় এক থেকে দু কোটি ডিম পাড়ে। ডিম পেড়েই এরা মারা যায়। সেখানে লার্ভাগুলো যখন বড় হয় তখন তাদের দাঁত থাকে। মীনগুলো জলের স্রোতে মূল ভূখণ্ডের পাড়ে আসে। তারা একটু বড় হলেই তাদের দাঁত খসে যায়। চারা মাছগুলো তখন ডাঙার মিষ্টি জলে ঢুকে পড়ে। যে কোন বাধা অতিক্রম করেই তরুণ মাছের দল নদী, জলাশয়ে চলে আসে। নদীর বাঁধ থাকলে সেটা যেমন টপকায়, তেমনি ঘাসের লনও। পূর্ণ বয়স্ক হয় এই সব মিষ্টি জলেই। প্রায় ষাট বছর বয়স হলে তারা আবার সমুদ্রে পাড়ি দেয় ডিম পাড়ার জন্য। সেজন্যই স্বাভাবিক কারণেই বাগানের এই মিষ্টি জলের আশয় এতই পছন্দ যে পরিষ্কারের সময়ে বার বার এদের বার করে সমুদ্রে ছেড়ে দিলেও এরা তীর থেকে উঠে এসে বাগানের ঘাসের লন টপকে আবার ঢুকে পড়ে জলাশয়ে কৈশোর, যৌবন কাটাবার টানে।

পিছনে সিডনি হারবার ব্রিজ

       বাকি দলের সঙ্গে আমরা যখন আবার মিশে গেলাম, আমাদের অনুপস্থিতি নিয়ে কেউ অনুযোগ করল না। প্রতিবারই বেড়াতে গিয়ে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাঝে মাঝে হারিয়ে গিয়ে বেশি ঘুরপথে হাঁটা আমরা পছন্দ করি সে কথা আমাদের এই দল দিব্যি জানে। তাই বিচক্ষণ গ্রুপ লিডার অভিজিত বা এই দলের অন্যদের সঙ্গে ঘুরে আমরা বেশ আনন্দ পাই।

       অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে আদিম মানুষের অস্তিত্ব ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা বিভিন্নভাবে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। সে কথা আমার লেখায় পরে আবার আসবে। সিডনিতে তিরিশ হাজার বছর আগে আদিবাসীদের অস্তিত্ব ছিল। ১৭৭০ সালে বিখ্যাত অভিযাত্রী জেমস কুক প্রথম অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে আসেন। এখন যেখানে সিডনি, তার ঠিক দক্ষিণে একটা খাঁড়িতে উনি জাহাজ নোঙর করেন। সেই খাঁড়ির এখন নাম বোটানি বে। সেই সময় ব্রিটেনের সরকার বন্দীদের দ্বীপান্তর করার জন্য জায়গা খুঁজছিল। কুকের অভিযানের সংবাদ পেয়ে সর্বপ্রথম এখানেই ক্যাপ্টেন ফিলিপের নেতৃত্বে কয়েকটা জাহাজ ভর্তি করে বন্দী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বোটানি বে জায়গাটা বসবাসের অযোগ্য হওয়ায় বন্দিদের সিডনি কোভের পোর্ট জ্যাকসনে স্থানান্তরিত করা হয় ১৭৮৮ সালে। সেই থেকে অপরাধীদের অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো শুরু হয়। এভাবেই এই মহাদেশের প্রথম উপনিবেশ হিসাবে সিডনির জন্ম।

স্বাভাবিকভাবেই শহরটা খুব তাড়াতাড়ি নানা অপরাধমূলক কাজে ভরে যেতে লাগল। প্রথম যুগের একজন অপরাধীর কথা বলি। আয়ারল্যাণ্ডের ডাবলিন শহরের ডোন্যাহো নামে আঠারো বছরের অপরাধমূলক কাজে জড়িত এক বন্দীকে এই শহরে ১৮২৫ সালে আনা হল। বন্দীদের জোর করে কাজ করানো হত। সে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সিডনি হাইওয়েতে বেশ কয়েকটা দুঃসাহসী ডাকাতি করে নিউ সাউথ ওয়েলসের অন্য বন্দীদের চোখে আর গরীব মানুষের কাছে রাতারাতি নায়ক হয়ে উঠল। দুঃসাহসিকতার জন্য তাকে অন্য বন্দিরা ‘বোল্ড জ্যাক’ নামে ডাকত। সিডনির খবরের কাগজগুলোর শিরোনামে চলে এলো জ্যাক। দলবল সহ ধরা পড়ল। ফাঁসির আদেশও হল। কিন্তু সে জেল থেকে পালায়। অবশেষে ১৮৩০ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

       সিডনি অপেরা হাউসের দিকে আমরা এগোতে লাগলাম। রাতের কালো আকাশ আর সমুদ্রের মিলনস্থলে আলো ঝলমলে অপেরা হাউসের ছবি আমাদের ছোটবেলা থেকেই খুব চেনা। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে কুইজের ভিজুয়াল রাউন্ডের চেনা প্রশ্ন। সিডনি বন্দরের বেনেলং পয়েন্টের নীলাম্বুরাশিতে নৌকার অসংখ্য সুদৃশ্য পালের পিছনের এই সৌধটিবিশ্বের কোটি কোটি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে জেগে আছে, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ২০০৭ সালে জায়গা করে নিয়েছে। জান উটজান নামের ডেনমার্কের এক স্থাপত্যবিদ সিডনি অপেরা হাউসের নকশা তৈরি করেন।

সিডনির জগৎবিখ্যাত অপেরা হাউস ও হার্বার ব্রিজ
যুবরাজ-যুবরাণীর জন্য অপেক্ষা

অপেরা হাউসের কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখি সেখানে অনেক লোকের জমায়েত। বোঝাই যায় বিশেষ কেউ আসবে সেদিন ওখানে। অস্ট্রেলিয়া স্বাধীন দেশ, কিন্তু তার রাষ্ট্রপ্রধান ব্রিটেনের রাণী। শুনলাম একটু পরেই নাকি যুবরাজ হ্যারি আর তার বউ মেগান আসবে সেখানে। আমাদের তাড়া ছিল, তাই যুবরাজ-যুবরাণীর সঙ্গে দেখা না করেই এগিয়ে গেলাম। ক্যাটামেরানে করে যাব ডার্লিং হারবারের কাছে বারাঙ্গারু। সেখান থেকে ‘সি লাইফ’, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণী সম্পদের অমূল্য ভাণ্ডারের নমুনা আছে।

সিডনি হার্বার ব্রিজের তলা দিয়েই যেতে হল ক্যাটামেরানে, ছবি তোলার অনেক সুযোগ পাওয়া গেল। সি লাইফকে বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যায়না যে ভেতরে অত বড় এক্যোরিয়াম! বিশাল পরিসর, আর মাটির নিচে অনেকগুলো তলা পর্যন্ত যাতায়াত করার অবকাশ, ভেতরের সংগ্রহশালাটাকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। প্রথমেই ঢুকে দেখি একটা অংশে লেখা ‘শিপ রেক’। সমুদ্রের তলায় জাহাজডুবি হলে সেই ভাঙা জাহাজের বিভিন্ন অংশে ধীরে ধীরে যে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী, উদ্ভিদের কলোনি গড়ে ওঠে তার বিশদ নমুনা। নানা ধরনের শামুক, ঝিনুক, ছোট ছোট মাছ, প্রাণী, উদ্ভিদ ইত্যাদি। নয়ন জুড়ানো বিভিন্ন ধরনের রঙিন প্রবাল- যেমন সান কোরাল, হ্যামার কোরাল ও আরও নানা প্রবাল দেখে মনে পড়ছিল ছোটবেলার একটা গল্প। ছোটবেলায় মামার বাড়িতে গেলে দাদু টাইটানিক জাহাজডুবির গল্প বলত নাতি নাতনিদের। ঠোঁটে ডান হাত ঠেকিয়ে দাদু একটা জাহাজের জোরাল লম্বা ভোঁ দিয়ে জাহাজটাকে সমুদ্রে ভাসাত। তারপর নানা গল্পের জাল বুনে শেষে রাতের অন্ধকারে হিমশৈলে প্রবল ধাক্কা মেরে জাহাজটা যখন ডুবত তখন দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নামত। তারপর ডুবন্ত জাহাজের আনাচে কানাচে মৎস্য কন্যা, রঙিন মাছ আর প্রবালদের গল্প আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিত। কতবার যে ওই গল্পটা শুনেছি! সি লাইফে ডুবন্ত জাহাজের নানা রঙের প্রবাল,মাছ, সামুদ্রিক সাজানো প্রাণ সম্ভার লিখতে বসে দাদুর বলা গল্পটা আর তার সঙ্গের কল্পনারাজ্য---যেন ছোটবেলার গল্পলোকে ঢুকে পড়লাম।

\

রঙিন প্রবাল



সি-লাইফের জুরাসিক গ্যালারির প্রবেশ পথ

যাক ফিরে যাব সিডনির সি লাইফে। পাশের একটা অংশে দেখি লেখা ‘জুরাসিক সি’। জুরাসিক উপযুগে, অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক প্রাণের স্পন্দন যেন অনুভূত সেখানে। খুব সুন্দর দেখতে বিশাল বিশাল নটিলাস শামুক দেখলাম। আছে বিশাল বিশাল লাঙফিস। এদের ফুসফুস আছে। মাডস্কিপার কার্বোনিফেরাস যুগের বহু প্রাচীন মাছ। ইতিহাস বলে এরা ডাইনোসরের থেকেও প্রাচীন। এদের পাখনাগুলো ডানার মত। আবার মুখের সামনের দিকের অংশ পাখিদের মত। দেখলে মনে হবে রুপোলী রঙের একটা পাখি যেন জলের তলার কাদার ভেতর থেকে পোকা মাকড় খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। এদের সবাইকেই বলে জীবন্ত জীবাশ্ম।

লাঙফিশ
মাডস্কিপার




ড্রাগন বটে, তবে লম্বা মাত্র কয়েক ইঞ্চি
পিলচার্ডের ঝাঁক

এর পরের অংশটার নাম সিডনি হারবার। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকুলের অগভীর সমুদ্রে পাথুরে সমুদ্রতলে বাস করে সামুদ্রিক ড্রাগন। এক জায়গায় দেখি অপূর্ব উজ্জ্বল নীল রঙের সামুদ্রিক ড্রাগন। গায়ে হলুদ ডোরা কাটা দাগ। কোনোটা আবার লাল। কোন শিল্পীর তুলির সূক্ষ্ম টান তাদের সারা শরীরে? শরীরের আকৃতিও কি শৈল্পিক? মন্থর গতিতে এক্যোরিয়ামের তলার পাথুরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের শরীরেও নানা অংশে গাছের পাতার মত পাখনা। না, সেগুলো তাদের ঘোরাফেরায় সাহায্য করে না। শত্রুকে ফাঁকি দিতে তারা সহজেই জলের তলার জঙ্গলে মিশে গিয়ে ছদ্মবেশে থাকতে পারে। সৃষ্টি কতখানি নিপুণ! কত যত্নশীল! এই লিফি সি-ড্রাগন ছাড়াও দেখলাম উইডি সি-ড্রাগন। তারা অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের অগভীর সমুদ্রের তলার ঘাসের জমিতে বাঁচে। মাত্র কয়েকইঞ্চি লম্বা এই দু ধরনের সামুদ্রিক ড্রাগনের ক্ষেত্রেই মেয়ে ড্রাগন পুরুষ ড্রাগনের লম্বা লেজের তলার দিকে একসঙ্গে অনেকগুলো ডিম পাড়ে। পুরুষ ড্রাগন ডিমগুলো প্রায় ন-সপ্তাহ ধারণ করে। তারপর ডিম ফুটে বাচ্চা বার হবার সময় হলে তারা এক দু দিন ধরে পাম্প করে, পাথরের গায়ে বা সমুদ্রের ঘাসের গায়ে লেজের ঝাপট মেরে নতুন সামুদ্রিক ড্রাগনের জন্ম দেয়। জন্মেই নতুন এই প্রজন্ম স্বাধীন। বাঁচার তাগিদে প্ল্যাঙ্কটনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। স্টোন ফিস, অস্ট্রেলিয়ান পিলচার্ট, ব্লু ট্যান সার্জেন ফিস, দু-রঙা এঞ্জেল মাছ, ক্লাউন মাছ, লেমন ড্যামসেল, পায়জামা স্কুইড ইত্যাদি ছিল সিডনি হারবারের প্রধান আকর্ষণ।

আরও ভিতরে ঢুকে আবার অবাক হলাম। এই অংশটার নাম দেখলাম শার্ক ভ্যালি। মনে হল এক অজানা সমুদ্রের তলায় পাড়ি দিয়েছি। একাধিক বিশাল বিশাল কাঁচের টানেল দিয়ে ঘোরের বশে যেন হেঁটে চলেছি। আমাদের চারপাশে সাম্রাজ্য চালাচ্ছে গভীর সমুদ্রের প্রাণীকুল। সমুদ্র মৃদু আলোকিত, তাই রক্ষে।প্রা য় ছয় ফুট লম্বা একটা বিশাল হাঙর হঠাৎ দেখি আমার মাথার ওপর কাঁচের ওপারে। মাথার ওপর দিয়ে যাবার সময় হাঁ করা মুখের বড় বড় রাক্ষুসে দাঁতগুলো নিচের মানুষগুলোর রক্ত জমাট করে দিচ্ছিল। সত্যি সত্যি অত বড় হাঙরের পেটের তলায় দাঁড়িয়ে আমারও একটা শিরশিরানি অনুভূতি হচ্ছিল। জানলাম ওটা পোর্ট জ্যাকসন হাঙর। বহু প্রাচীন বিশাল বিশাল সামুদ্রিক কচ্ছপ খুব ধীর গতিতে সাঁতার কাটছে। মনে পড়ে গেল পুরাণের একটা গল্প। দেবাসুর অমৃত উদ্ধার করতে গিয়ে মৈনাক পর্বতকে মন্থন দণ্ড হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। সমুদ্রে যাতে তলিয়ে না যায়, সেজন্য কূর্মাবতার সেই পর্বতকে তার পিঠে ধারণ করেছিলেন। একটা মাছ দেখলাম, শঙ্কর মাছের মত কাঁটাওয়ালা লম্বা লেজ। পিঠের দিক থেকে দেখলে ঈগল পাখির মত দেখতে। গাঢ় বিশাল পিঠে উজ্জ্বল সাদা গোল গোল স্পট। নাম হোয়াইট স্পটেড ঈগল রে। সোনালি রঙের গোল্ডেন ট্রেভালি, জায়েন্ট শভেল নোস, রিফ শার্ক, গ্রে নার্স শার্ক---এরকম নানা বড় প্রজাতির মাছ এখানে আছে।এখানে সবচেয়ে বড় প্রজাতির মাছ হল কুইন্সল্যাণ্ড গ্রোপার। এই মাছটা এত বড় যে হাঙরগুলোও ভয় পায়, একে এড়িয়ে চলে। 

হাঙর হ্রদের বিভীষিকা



  

কূর্মাবতার ও ঈগল রে

এরপর তলার থেকে ওপরে উঠলাম, ডুগং আইল্যান্ডে। সমুদ্রের তলায় এরা হল একমাত্র স্তন্যপায়ী যারা পুরোপুরি শাকাহারী। ডুগং হচ্ছে মালয়েশিয়ান কথা, মানে সামুদ্রিক নারী ।প্রথমে ওঠার সময় এর বিশাল ছায়া দেখলাম। তারপর আসল চেহারা। নাম পিগ। লম্বায় দশ ফুট। ওজন চারশ কেজি। প্রতিদিন আশি কেজি করে এর সবজি লাগে। শুনলাম পিগের সঙ্গী উরু গত বছর মে মাসে মারা গেছে। অতীতে এদের দেখেই নাকি নাবিকরা মৎস্য-কন্যা বলে ভুল করত। পৃথিবীতে মোট তিনটি বন্দী ডুগং আছে। বাকি দুটি আছে ইন্দোনেশিয়া আর জাপানে।


জলের পাখি

এবার নেমে এসে আমরা গেলাম পেঙ্গুইন এক্সপিডিশনে। অভিযানে যাবার আগে আমাদের একটা করে পশমের কোট পরিয়ে দিল। তারপর একটা নৌকায় চারজন করে বসে একটা বরফ শীতল মেরু প্রদেশের অভিযাত্রী দলের মত ঢুকে পড়লাম মেরুরাজ্যের পেঙ্গুইনদের কলোনিতে। নানা প্রজাতির, নানা বয়সের, নানা উচ্চতার পেঙ্গুইন ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শরীরের তুলনায় ছোট ছোট পায়ে দুলে দুলে হাঁটি হাঁটি পা করে বেড়াচ্ছে। চারদিকের ছোট বড় ঢিবিগুলো বরফে ছেয়ে আছে। একে ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি, তার মধ্যে দেখি আমাদের নৌকা ভ্রমণের পথে এক জায়গায় ওপর থেকে ঝরনা নেমে আসছে। এ বাবা, ভিজে যাব তো! এমনটা ভাবছি। দেখি আমাদের নৌকাটা সেখানে পৌঁছাতেই ঝরনাটা থেমে গেল। চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ। এতগুলো পেঙ্গুইন, অথচ কোন কোলাহল নেই। কেমন শান্ত পরিবেশ। ডাঙায় এরা এত ধীরে হাঁটে। কিন্তু স্বচ্ছ জলের ভেতর দেখলাম এরা খুব দ্রুত সাঁতার কাটছে। পাখিরা যেমন ডানা দিয়ে আকাশে ওড়ে, এরাও তেমনি এরো-ডাইনামিক আকৃতির জন্য সমুদ্রের তলায় ডানার সাহায্যে ওড়ে বলা যায়। লিটল পেঙ্গুইন বাইরেও ছিল সাউথ কোস্ট শিপ রেকে। এখানে দেখলাম কিং পেঙ্গুইন আর জেন্টু পেঙ্গুইন। কিং পেঙ্গুইনই সব চেয়ে ভাল সাঁতারু।

ওখান থেকে বেরিয়ে একটা জায়গায় দেখি লোকজন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু করছে। জায়গাটায় লেখা--- ডিসকভারি রক পুল। অর্থাৎ সমুদ্রের উপকূলে পাথুরে ভূমি হলে, ঢেউ আছড়ে পড়ে বা শিলা গঠনকালে সেখানে নানা আকারের ছোট বড় গর্ত তৈরি হয়। সেই গর্তগুলোতে নানা শামুক, সামুদ্রিক উদ্ভিদ, প্রাণী জন্মায়। স্টার ফিশ, নানা কীট দেখা যায়। এখানে দেখলাম তারই একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা করাচ্ছে। দর্শকদের রক পুলের প্রাণীদের হাতে করে নাড়াচাড়া করতে দিচ্ছে। আমরাও নানা প্রবাল কীট, মাছ হাতে নিলাম।

                                       রক পুলের নমুনা


সিডনি স্কাইলাইন

   সি-লাইফ থেকে বেরিয়ে সিডনি শহরটাকে হেঁটে হেঁটে চক্কর মারলাম। সহায় গুগল ম্যাপ ভব! বিখ্যাত হাইড পার্কে ঢুকলাম। তখন ওখানে ফুড কার্নিভ্যাল উৎসব চলছিল। ভারতীয় পাঞ্জাবী ও মোগলাই খানাও হাজির ছিল বটে। নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র এটা। তাই প্রচুর দেশি বিদেশি লোকের সমাগম লক্ষ্য করলাম। ঝুলন, কাবেরী গেল ওদেশীয় খাবারের সঙ্গে আমাদের দেশজ খাবারের তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ করতে, বিদেশে পাড়ি দিয়েও আমাদের দেশীয় খাবারগুলো গন্ধে-বর্ণে কতটা অটুট ভারতীয় আছে, ইত্যাদি। আমি আর গৌতম বিখ্যাত সেন্ট মেরিজ ক্যাথিড্রালমুখী হলাম। উদ্দেশ্য চার্চটা বাইরে থেকে দেখে ক্যামেরা বন্দী করা। চার্চ সংলগ্ন পার্ক বিশাল এলাকা নিয়ে। অদ্ভুত সুন্দর কিছু গাছ দেখলাম। সারাদিন ধরে হাঁটার ধকল ছিল। তাই আমাদের দলের বাকিরা পার্কে বসে খানিক জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। অস্ট্রেলিয়া বহুদিন ব্রিটেনের কলোনি ছিল বলেই বোধহয় অনেক কিছুই ব্রিটেনের নামানুসারে হয়েছে। যেমন এর আগে ছিল সেন্ট জেমস স্টেশন, এখন দেখলাম হাইড পার্ক। এই নামগুলো তো গতবছর লন্ডনেও দেখেছি! হাতে সময় কম, ফিরে লাগেজ গুছিয়ে পরদিন কেয়ার্ন্সের উদ্দেশ্যে রওনা। তাই হাইড পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে এসে আমরা হোটেলে ফিরলাম। মনে আছে গৌতম আর আমি রাতে একটা থাই রেস্তরাঁতে বেশ জমিয়ে ডিনার সেরেছিলাম, বাকিরা অবশ্য ক্লান্তির জন্য হোটেলেই ডিনার সেরেছিল।

সেন্ট মেরিজ ক্যাথিড্রাল ও তার সামনের মূর্তি (নিচে)
\ (ক্রমশ)
এই লেখার পরের পর্বগুলিঃ
প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, মার্চ, ২০২০

Wednesday, 29 April 2020

মারিয়েটা ব্লাউঃ বিস্মৃতপ্রায় বিজ্ঞানী


 
মারিয়েটা ব্লাউঃ বিস্মৃতপ্রায় বিজ্ঞানী

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

মৌলিক কণা সৃষ্টি ও তার ধর্ম নিরূপণ পদার্থবিজ্ঞানের একটা মূল লক্ষ্য। আইনস্টাইনের E=mc2 সমীকরণ অনুযায়ী সংঘর্ষরত কণাগুলোর গতিশক্তি (E) বেশী হয়, তাহলে তারা অনেক নতুন কণা তৈরির ভর (m) যোগান দিতে পারবে। কিন্তু প্রথম যুগের কণাত্বরক দিয়ে কণাদের গতিশক্তি খুব একটা বাড়ানো যেত না। তাই অজানা মৌলিক কণার উৎস ছিল মহাজাগতিক রশ্মি। মহাবিশ্বে নানা ঘটনায় অনেক মৌলিক কণা তৈরি হয় এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই নতুন মৌলিক কণাগুলো প্রায় সবই খুব ক্ষণস্থায়ী, তাদের খুঁজে পাওয়ার উপায় কী? বিজ্ঞানীরা ক্লাউড চেম্বার বা মেঘকক্ষ ব্যবহার করছিলেন, কিন্তু তার একটা সমস্যা ছিল যে সেটা খুব অল্প সময় চালু থাকে, তারপর তাকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম দিতে হয়। যে সময় যন্ত্রটা চালু নেই, সেই সময় নতুন কণা এলে আমরা তাদের খুঁজে পাব না।  বিজ্ঞানীরা তাই পর্যবেক্ষণের অন্য পদ্ধতি খুঁজছিলেন।  ভারতে বিভা চৌধুরী ও তাঁর শিক্ষক দেবেন্দ্রমোহন বসু ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার করে নতুন এক কণা আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন, এই ব্লগের অন্য লেখাতে সেই গল্প শোনা যাবে। নিউক্লিয় বিজ্ঞানে কাজ করার সময় ফটোগ্রাফিক প্লেটের বিকাশ ঘটাবেন এক মহিলা বিজ্ঞানী, কিন্তু দুঃখের বিষয় হল বিজ্ঞানের ইতিহাসে তাঁর বিশেষ উল্লেখ পাওয়া যায় না। এই প্রবন্ধে আমরা  সেই বিস্মৃতপ্রায় মারিয়েটা ব্লাউয়ের কথা শুনব।
মারিয়েটা ব্লাউয়ের জন্ম ১৮৯৪ সালের ২৯ এপ্রিল অস্ট্রিয়ার ভিয়েনার এক উচ্চশিক্ষিত ও সংস্কৃতিমনস্ক ইহুদি পরিবারে। তাঁর বাবা মার্কাস ব্লাউ ছিলেন আইনজীবী, মায়ের নাম ফ্লোরেন্টাইন। মারিয়েটা ছিলেন তাঁদের তৃতীয় সন্তান ও একমাত্র কন্যা। মার্কাস ছিলেন সঙ্গীতের সমঝদার, ভিয়েনার সংস্কৃতিজগতের এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। সঙ্গীতের স্বরলিপি ছাপার জন্য তাঁদের পারিবারিক কোম্পানি ইউরোপের সর্বত্র পরিচিত ছিল। বাবার থেকে ব্লাউ পেয়েছিলেন জীবনব্যাপী সঙ্গীতপ্রীতি। স্কুল থেকেই গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান ছিল তাঁর পছন্দের বিষয়। মেয়েদের জন্য অস্ট্রিয়াতে উচ্চ শিক্ষার দরজা  ব্লাউয়ের জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই, তাই তাঁর পূর্বসূরি লিজে মাইটনারের মতো অন্তত তাঁর শিক্ষাতে ছেদ ঘটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য যে মাটুরা পরীক্ষাতে পাস করতে হত তাতে খুবই সাফল্যের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেন মারিয়েটা। ১৯১৪ সালের নভেম্বর মাসে ভর্তি হলেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাফল্যের সঙ্গে পড়াশোনা করে ১৯১৯ সালে ব্লাউ পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছিলেন। তাঁর গবেষণার সুপারভাইসর ছিলেন ফ্রাঞ্জ এক্সনার এবং পরীক্ষক ছিলেন স্টেফান মেয়ার। মহিলাদের বিজ্ঞান গবেষণাতে স্থান দেওয়ার ব্যাপারে তাঁদের দুজনেরই উৎসাহ ছিল। ব্লাউয়ের গবেষণার বিষয় ছিল পদার্থ কর্তৃক গামা রশ্মির শোষণ।
দু’বছর ব্লাউ বার্লিনের এক এক্স-রশ্মি টিউব বানানোর কারখানায় কাজ করার পর ফ্রাঙ্কফুর্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাক্তারি ছাত্রদের এক্স-রশ্মি ছবি তোলার কায়দা শেখানোর চাকরি পান। এই সময়ে ফটোগ্রাফিক ইমালশন বা অবদ্রবের উপর সাধারণ আলো ও এক্স-রশ্মির প্রভাব নিয়ে দুটি গবেষণাপত্র ছাপান। নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা থেকে অনেক দূরে মনে হলেও এই দুই চাকরিই তাঁর কাজে লেগেছিল। দুই জায়গাতেই তিনি ফটোগ্রাফিক প্লেটের উপরে বিকিরণের ক্রিয়া নিয়ে কাজ করছিলেন। আমরা দেখব যে ভবিষ্যতে তাঁর গবেষণা সেই পথেই যাবে।

মারিয়েটা ব্লাউ (By Source, Fair use, https://en.wikipedia.org/w/index.php?curid=31802482)
এখন ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ, ফটোগ্রাফির প্লেট হয়তো অনেকেই দেখেনি। একটা পাতলা কাঁচের প্লেটের উপরে রুপোর যৌগ সিলভার আয়োডাইডের (বা ব্রোমাইডের) ইমালশন বা অবদ্রব লাগানো থাকে। আলো এসে পড়লে সিলভার আয়োডাইড সিলভার অর্থাৎ  রুপো এবং আয়োডিনে ভেঙে যায়। রুপো প্লেটের গায়ে এঁটে যায়। আলোর পরিবর্তে যদি কোনো কণা প্লেটের মধ্যে দিয়ে যায়, তাহলে সেও সিলভার আয়োডাইডকে ভাঙতে ভাঙতে যাবে, ফলে প্লেটের গায়ে বিন্দু বিন্দু রুপো জমা পড়বে। এই বিন্দুগুলো দেখে বোঝা যায় যে কণা কোন পথ দিয়ে গেছে। এখানে সবচেয়ে বড়ো সুবিধা হল যে ফটোগ্রাফিক প্লেটকে যতক্ষণ খুশি রেখে দেয়া যায়, সারাক্ষণই সে সক্রিয় থাকবে। কোনো কণা  যদি তার মধ্যে দিয়ে যায়, তাহলে সে পথের একটা চিহ্ন রেখে দেবে। প্লেটের জায়গায় ফিল্মও ব্যবহার করা যায়। এখন অবশ্য আমরা প্লেট বলতে ফিল্মই বুঝি।
মায়ের অসুস্থতার জন্য ব্লাউ ফ্রাঙ্কফুর্টের চাকরি ছেড়ে ১৯২৩ সালে ভিয়েনা ফিরে ইন্সটিটিউট ফর রেডিয়াম রিসার্চে যোগ দেন, অবশ্য সেই কাজ ছিল অবৈতনিক। ভিয়েনার এই ইন্সটিটিউট মহিলাদের বিজ্ঞান গবেষণাতে উৎসাহ দিত, এর জন্য বিশেষ করে ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা ফ্রাঞ্জ এক্সনার ও বিশেষ করে তাঁর উত্তরসূরি স্টেফান মেয়ারের নাম উল্লেখ করতে হয়। আমরা দেখেছি যে ব্লাউয়ের পিএইচডির পিছনে এঁদের দুজনের ভূমিকা ছিল। এই ইন্সটিটিউটে ১৯২০ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত সময়ে মোট বত্রিশ জন মহিলা এবং পঁয়ষট্টি জন পুরুষ বিজ্ঞানী গবেষণা করেন। বিজ্ঞানীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ছিলেন মহিলা, এর পিছনে ছিলেন মেয়ার। শুধু  বিজ্ঞানীর সংখ্যা নয়, গবেষণাপত্রের সংখ্যাতেও একই অনুপাত লক্ষ্য করা যায়। এই সময়কালে তাঁদের মধ্যে আটজন পুরুষ ও চারজন মহিলা দশের বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। দুজন পুরুষ ছাড়া বাকি দশজনেরই প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা বারো থেকে পনেরোর মধ্যে। সেই চারজন মহিলা হলেন মারিয়েটা ব্লাউ, এলিজাবেথ রোনা, এলিজাবেথা কারা-মিহাইলোভা এবং বার্টা কার্লিক।
১৯২৩ থেকে ১৯৩৮ ব্লাউ ভিয়েনার ইন্সটিটিউটে কাটান। ১৯২৫ সালে তিনি ফটোগ্রাফিক ফিল্মের মধ্যে দিয়া প্রোটন বা আলফা কণা গেলে তার চিহ্ন কেমন হবে সেই বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। তার পিছনেও এক কাহিনি আছে। ভিয়েনার দুই বিজ্ঞানী হান্স পেটারসন ও গেরহার্ড কির্শ এবং ব্রিটেনের বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্নেস্ট রাদারফোর্ড ও জেমস চ্যাডউইকের মধ্যে এক বিতর্ক শুরু হয়েছিল। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল বিকিরণের মধ্যে আলফা কণা বা উচ্চশক্তির প্রোটনের সংখ্যা গোনার পদ্ধতি। জিঙ্ক সালফাইড বা ওই ধরনের অনেক পদার্থ আছে যার উপর তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পড়লে একটা আলোর ঝলক দেখা যায়। এই ঘটনাকে বলে  প্রতিপ্রভা। ভিয়েনাতে বিজ্ঞানীরা এই আলোর ঝলক গুনে কণার সংখ্যা গুনছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই দীর্ঘকাল কাজ করতে হলে গণকের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকত। রাদারফোর্ড গোনার জন্য তাঁর ছাত্র হান্স গাইগারের উদ্ভাবিত কাউন্টার ব্যবহার করছিলেন। এই প্রসঙ্গে আমাদের বিস্তারিত আলোচনাতে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, শুধু একথা বলা যায় যে রাদারফোর্ডরা সেই বিতর্কে জিতেছিলেন। এই বিতর্ক চলাকালীনই পেটারসন তরুণী ব্লাউকে অবদ্রব ব্যবহার করে বিকিরণ গোনা সম্ভব কিনা তা দেখার  দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে পেটারসন এই বিষয়ে আর উৎসাহ দেখাননি; কিন্তু ব্লাউ এই গবেষণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান।
বিকিরণ যে ইমালশনের মধ্যে ছাপ রেখে যায়, সে কথা অনেক আগে থেকেই জানা ছিল। তেজস্ক্রিয় বিকিরণ আবিষ্কারই হয়েছিল ফটোগ্রাফিক ফিল্মে, সেই গল্প আমরা সবাই জানি। এক্স-রশ্মিতে ফটোগ্রাফিক প্লেট ব্যবহার ছিল খুবই সাধারণ পদ্ধতি, কিন্তু আলফা বা  উচ্চশক্তির প্রোটনের জন্য তার ব্যবহারে  বেশ কিছু সমস্যা ছিল। ব্লাউ ইমালশনের উন্নতির জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে যান। ১৯২৭ সালে তিনি দেখালেন যে তাঁর তৈরি করা ইমালশন ব্যবহার করে প্রোটনের সংখ্যা গোনা সম্ভব। ব্রিটিশ কোম্পানি ইলফোর্ড ব্লাউয়ের পরামর্শে ক্রমান্বয়ে ইমালশন ও ফিল্মকে কণা দেখার উপযোগী করে তোলে। ব্লাউ দেখালেন যে তাঁর পদ্ধতিতে আলফা ও প্রোটনকে সহজেই আলাদা করে চেনা যায়।
 ১৯৩২ থেকে ১৯৩৮ ব্লাউ ও তাঁর সহযোগী ও একদা ছাত্রী অপর এক মহিলা বিজ্ঞানী হার্থা ওয়ামবাখার এই নিয়ে আরও কাজ করেছিলেন, সে জন্য তাঁরা যৌথভাবে বিজ্ঞানে অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে সম্মানের সূচক লিবেন পুরস্কার পেয়েছিলেন। মূলত তাঁদের দুজনের চেষ্টাতেই নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যাতে ইমালশনের ব্যবহার চালু হয়। মহাজাগতিক রশ্মি দেখার জন্য ১৯৩৭ সালে ব্লাউ ও ওয়ামবাখার পরপর ফটোগ্রাফিক প্লেট সাজিয়ে এক পাহাড়ের চূড়ায় রাখলেন। চারমাস পরে তাঁরা যখন প্লেটগুলো পরীক্ষা শুরু করলেন, তখন উচ্চ শক্তি প্রোটনের পথরেখা দেখতে পেলেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা তাঁরা দেখতে পেলেন কতকগুলো তারার মতো চিহ্ন, যেখানে একটা কেন্দ্রীয় বিন্দু থেকে কয়েকটা রেখা নানা দিকে বেরিয়ে গেছে। এদের আমরা এখন স্টার বলি। এরা এলো কোথা থেকে?  ব্লাউ ও ওয়ামবাখার ‘নেচার’ পত্রিকাতে এক গবেষণা পত্র লিখে দেখালেন যে মহাজাগতিক রশ্মি উচ্চশক্তির কণারা ইমালশনের নিউক্লিয়াসকে ধাক্কা মেরে ভেঙে ফেলেছে। নিউক্লিয় বিক্রিয়া দেখার নতুন এক পদ্ধতি আবিষ্কার হল।
সারা পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় পদার্থবিদরা নড়েচড়ে বসলেন। ব্লাউয়ের সহকর্মী বার্টা কার্লিক  সালের শেষে হান্স পেটারসনকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘I don’t know … if you realize of what first rate importance the phenomenon [disintegration stars] is for the present state of the whole field of nuclear physics. The theoreticians are quite excited about it, Heisenberg takes personally the most vivid interest in it and is in continual correspondence with Blau and Wambacher… Sir Raman was quite wild about it and took plates to India.’ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম আবিষ্কারক ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ছিলেন সেই সময়ের শীর্ষস্থানীয় পদার্থবিদদের একজন। হাইজেনবার্গ ও সি ভি রমন, দুই নোবেলজয়ীর গবেষণা্র ক্ষেত্র আলাদা, কিন্তু দুজনেই ব্লাউদের কাজের বিষয়ে উৎসাহী হয়েছিলেন। ১৯৩৮ সালের ভারতের কংগ্রেসে এসেছিলেন দুই বিদেশি বিজ্ঞানী জিওফ্রে টেলর ও ভবিষ্যতের নোবেলজয়ী ওয়াল্টার বোথে। তাঁর ব্লাউদের পদ্ধতিতে কেমন করে মহাজাগতিক রশ্মি ধরা যায় তা আলোচনা করেছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞানী দেবেন্দ্রমোহন বসু। তিনি কলকাতায় ফিরে এই বিষয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। তিনি ও তাঁর ছাত্রী বিভা চৌধুরী কেমন করে এক বিরাট আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছেছিলেন, সে কথা এই ব্লগের অন্য লেখাতে আছে।
এত গুরুত্বপূর্ণ কাজের পরেও ইন্সটিটিউটে ব্লাউয়ের বেতনের চাকরি জুটছিল না -- কারণ তিনি প্রথমত ইহুদি, দ্বিতীয়ত মহিলা। জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্লাউ ইন্সটিটিউটের কাজের থেকে সময় বার করে বাইরে পড়াতেন, বিভিন্ন রিসার্চ ইন্সটিটিউটে অল্প সময়ের জন্য কাটাতেন, ফটোগ্রাফিক ফিল্ম বানানোর কোম্পানিদের পরামর্শ দিতেন। ইউরোপে ইহুদিবিদ্বেষ নতুন ছিল না, কিন্তু জার্মানিতে হিটলারের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে তা চারদিকে আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। অস্ট্রিয়াতে নাৎসি পার্টি ছিল নিষিদ্ধ, কিন্তু গোপনে গোপনে অনেকেই তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। রেডিয়াম ইন্সটিটিউটের বিজ্ঞানীদের অনেকেই নাৎসি মনোভাবাপন্ন ছিলেন, তাঁরা এই সময়েই ইহুদি ব্লাউয়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ওয়ামবাখারও।
ওয়ামবাখার ১৯৩৪ সালে নাৎসি পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ইন্সটিটিউটের তিন নাৎসি সমর্থক বিজ্ঞানী হঠাৎ করে বলতে শুরু করলেন যে ব্লাউ ওয়ামবাখারকে কৃতিত্ব থেকে বঞ্চিত করছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের সঙ্গে ওয়ামবাখারের অবৈধ সম্পর্ক ছিল। কিন্তু সেটা মূল কারণ নয়, ব্লাউয়ের বিরুদ্ধে এই আক্রমণের প্রধান কারণ ছিল তিনি ইহুদি। তাঁরা দাবি করেন যে গবেষণাপত্রে প্রথম ফটোগ্রাফিক প্লেটে নিউক্লিয় বিক্রিয়ার কথা লেখা হবে, তার লেখকের তালিকাতে ওয়ামবাখারের নাম ব্লাউয়ের আগে বসাতে হবে। ব্লাউ যে ওয়ামবাখারের অনেক আগে থেকে এ বিষয়ে গবেষণা করছেন, তাঁর পরামর্শেই যে ইমালশন ও ফটোগ্রাফিক প্লেটের উন্নতি ঘটেছে, ওয়ামবাখার যে ব্লাউয়ের কাছেই কাজ শিখেছেন, সে সবের কোনো দাম নেই। অন্য সহকর্মীরা জানতেন ব্লাউ কখনোই অন্য কাউকে তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত করেননি। স্বভাবগতভাবে চুপচাপ হলেও চাপের কাছে মাথা নোয়ান নি ব্লাউ।
কিন্তু ইন্সটিটিউটের পরিবেশ ব্লাউয়ের পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। জার্মানির অস্ট্রিয়া দখল তখন সময়ের অপেক্ষা। তাই কিছুদিনের মানসিক শান্তির জন্য ব্লাউ নরওয়ের অধ্যাপিকা এলেন গ্লেডিচের আমন্ত্রণে অসলো রওনা হলেন। যেদিন তিনি অস্ট্রিয়া ছাড়েন, ঘটনাচক্রে সেদিনই অস্ট্রিয়া ও জার্মানি এক হয়ে যায়। ইহুদি ব্লাউয়ের আর দেশে ফেরার কোনো সুযোগই ছিল না। ডাইরেক্টর মেয়ার সহ এগারো জন বিজ্ঞানীর চাকরি যায়। ওয়ামবাখার কিছুদিন পরে একা একটা গবেষণাপত্র লেখেন। তাতে যে কাজের কথা লিখেছিলেন সেটা যে ব্লাউ ও তিনি দুজনে মিলেই করেছেন সে কথা তিনি গোপন করেন। ব্লাউয়ের আগের অবদানকে তিনি খুবই তুচ্ছ করে দেখান। ইমালশনের মধ্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া প্রসঙ্গে এক নাৎসি বিজ্ঞানীর মন্তব্যের কথা বলেন যিনি কোনোদিন ইমালশন নিয়ে কাজও করেননি। সব  থেকে বড় কথা হল ইমালশনের মধ্যে মহাজাগতিক রশ্মি যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া ঘটবে, তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে না, কিন্তু ব্লাউয়ের চেষ্টাতে ইমালশনের উন্নতির ফলেই তা দেখা সম্ভব হয়েছিল। আরও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হল বারো বছর পরে নোবেল কমিটি ব্লাউয়ের অবদান আলোচনার সময় ওয়ামবাখারের সেই লেখাকে বিবেচনায় এনেছিলেন। তাই বিজ্ঞানের সব সেরা সম্মান তাঁর অধরা থেকে যায়। সেই কথায় আমরা পরে আসব।
ইউরোপ থেকে ব্লাউ চলে যান মেক্সিকো। আইনস্টাইনের ছিলেন ব্লাউয়ের গুণগ্রাহী। তাঁর চেষ্টাতে মেক্সিকো টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে একটা চাকরি পান ব্লাউ। তাঁকে সেখানে গবেষণার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আইনস্টাইন মেক্সিকো সরকারের কাছে একাধিকবার চিঠি লিখেছিলেন। “I am taking the liberty of drawing your attention to a case close to my heart. …I know Miss Blau as a very capable experimental physicist who could render valuable service to your country. She is an experimental investigator in the field of radio-activity and cosmic rays.” মেক্সিকোর শিক্ষামন্ত্রীকে এই চিঠি লিখেছিলেন আইনস্টাইন। কিন্তু মেক্সিকোতে গবেষণার কোনো সুযোগই ছিল না। ১৯৪৪ সালে নিউইয়র্কে ইন্টারন্যাশনাল রেয়ার মেটালস রিফাইনারি কোম্পানিতে একটা চাকরি পেলেন, আবারও আইনস্টাইনের উদ্যোগে। এখানে সন্তুষ্ট না হয়ে দু’বার চাকরি পাল্টান। ১৯৪৮ সালে আমেরিকার কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ শুরু করার পরে তিনি নিজের পছন্দের গবেষণাতে ফিরতে পারলেন। আমেরিকাতে ব্রুকহাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি ও ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন চাকরি করেছিলেন ব্লাউ।
রিফাইনারি কোম্পানিতে চাকরির সময় ব্লাউ ভিয়েনাতে তাঁর সহকর্মী বার্টা কার্লিকের এক গবেষণাকে কিছুটা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা দেখেছি প্রতিপ্রভ পদার্থতে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ পড়লে আলোর ঝলক দেয়। কার্লিক বিকিরণের সংখ্যা গোনার জন্য ফটোসেল ব্যবহার করছিলেন, কিন্তু সেই পদ্ধতি খুব একটা কাজ করত না। ব্লাউ ও তাঁর সহযোগী ফটোসেলের জায়গায় ফটোমাল্টিপ্লায়ার টিউব বলে একটি যন্ত্র ব্যবহার শুরু করেছিলেন। যদিও এই বিষয়ে তিনি অল্পদিনই কাজ করেছিলেন, কিন্তু পৃথিবীতে তাঁরাই প্রথম এই বিষয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। পদার্থবিদ্যাতে ফটোগ্রাফিক প্লেটের ব্যবহার এখন হয় না বললেই চলে,  বিকিরণ গোনার জন্য আমরা ইলেকট্রনিক্সের সাহায্য নিই।  প্রতিপ্রভ পদার্থ ও ফটোমাল্টিপ্লায়ার টিউব ইলেকট্রনিক্সেরই অঙ্গ, আজও শিল্প ও আধুনিক গবেষণাতে বহু জায়গায় তাদের ব্যবহার চলে। কিন্তু কোম্পানির চাপে এই গবেষণা আর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় নি। পরে ব্লাউ আবার ইমালশন ব্যবহারে ফিরে যান। ব্রুকহাভেনে নতুন তৈরি কণাত্বরকে থেকে যে মেসন পাওয়া যাচ্ছিল, ব্লাউ দেখান যে ইমালশনের মধ্যে নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে সে আরও নতুন মেসন কণা তৈরি করে।
কিন্তু আমেরিকাতে ধীরে ধীরে গবেষণার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলেন ব্লাউ। নিজের পছন্দের মতো যন্ত্রপাতি পাচ্ছিলেন না। আবারও আইনস্টাইন তাঁর জন্য চিঠি লিখেছিলেন। ব্রুকহাভেন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির ডাইরেক্টর স্যামুয়েল গোউডস্মিটকে এক চিঠিতে তিনি লেখেন ‘It is well known that Marietta Blau has shown really original achievements. However, it would be very unfortunate if such a personality would be condemned to inactivity due to the shortage of scientific tools. . . Of course, Marietta Blau does not know about this letter.’ গোউডস্মিটের উত্তর থেকে ব্লাউয়ের পরিস্থিতিটা আমরা বুঝতে পারি। ‘Physics has changed so drastically from the days of simple experimentation that group work has become an unfortunate necessity. Miss Blau's temperament is not adapted to the type of regimentation which occurs nowadays when only intense cooperations make it possible to obtain meager results from a tremendously expensive piece of apparatus.’ একা একা অল্প খরচে নিজে বানানো যন্ত্রপাতি দিয়ে গবেষণা করার দিন শেষ, সময় এসেছে দল বেঁধে গবেষণার। ব্লাউ এই নতুন জগতের সঙ্গে মানাতে পারছিলেন না। এমনকি ফটোগ্রাফিক প্লেটে কণার চিহ্ন পরীক্ষা করার জন্য একদল কর্মী থাকলেও ভিয়েনার দিনগুলির মতো সেই কাজটা তিনি নিজেই করতেন।
শেষপর্যন্ত সমসাময়িক বিজ্ঞান থেকে বিচ্ছিন্ন ব্লাউ ১৯৬০ সালে অবসর নিয়ে ভিয়েনা ফিরে যান। তাঁর স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থা সেই সময় খুবই খারাপ ছিল, চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। অস্ট্রিয়াতে ফিরে আসার অন্যতম কারণ ছিল যে অবসরের পরে তাঁর আয় ছিল মাত্র দু’শো ডলার, তাতে আমেরিকাতে থাকা ও চিকিৎসার খরচ চালানো সম্ভব ছিল না। আরও কয়েকবছর তিনি ভিয়েনার রেডিয়াম ইন্সটিটিউটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি শ্রয়ডিঙ্গার পুরস্কারও পেয়েছিলেন।
কিন্তু যুদ্ধের পরে তাঁর পুরানো ইন্সটিটিউটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো হয়নি। কারণ ভিয়েনাতে ইহুদি বিদ্বেষ তখনও বেশ ব্যাপকভাবেই ছিল। জার্মানির অধীনে থাকার সময় ইন্সটিটিউটের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ নথি থেকে ব্লাউয়ের নাম হয় বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অথবা তাঁর গবেষণাকে তুচ্ছ করে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের পরেও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। নাৎসি সমর্থক বিজ্ঞানীরা তখনো ইন্সটিটিউটে গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ১৯৫০ সালে ওয়ামবাখারের ক্যান্সারে মৃত্যু হয়। তাঁর স্মৃতিচারণের সময় তাঁকেই ইমালশনের মধ্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়ার একমাত্র আবিষ্কারক বলা হয়। যাঁরা নাৎসিদের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না বা তাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন, তাঁরাও যুদ্ধ পরবর্তীকালে নাৎসি সমর্থক বিজ্ঞানীদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের পথে না গিয়ে সহাবস্থানের পথে বেছে নিয়েছিলেন। যাঁরা পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন, দেশে ফেরার পরেও তাঁরা বাইরের লোকই রয়ে গিয়েছিলেন। নাৎসি শাসনাধীন বহু প্রতিষ্ঠানেই এই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। অস্ট্রিয়া সরকারও ব্লাউকে আর্থিক সাহায্যের বা তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো চেষ্টা করেন নি। ব্লাউয়ের বন্ধু ও সহকর্মী বার্টা কার্লিক ছিলেন নাৎসি বিরোধী, তিনি ব্লাউয়ের সঙ্গে যুদ্ধের সময় যোগাযোগ রেখেছিলেন, একাধিক ইহুদি বিজ্ঞানীকে পালাতে সাহায্যও করেছিলেন। তিনি যখন ব্লাউ আর ওয়ামবাখারের কৃতিত্বকে তুলনীয় বললেন, ব্লাউ আর সহ্য করতে পারেন নি।  ১৯৬৪ সালের পরে তিনি আর ইন্সটিটিউটে পা রাখেননি। ২৭ জানুয়ারি ১৯৭০ ফুসফুসের ক্যানসারে তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তিনি সত্যিই বিস্মৃত, তাঁর মৃত্যুর পরে এমনকি রেডিয়াম ইন্সটিটিউটেও কোনো শোকসভা হয়নি।
দেশ ছাড়ার পরে ব্লাউয়ের গবেষণাতে ছেদ পড়েছিল। মেক্সিকোতে গবেষণার কোনো সুযোগই ছিলনা। ব্লাউ অস্ট্রিয়া ছাড়ার পর ওয়ামবাখার কাজ নিয়ে বিশেষ এগোতে পারেননি। ১৯৩৮ সাল নাগাদ ব্রিটিশ বিজ্ঞানী সিসিল পাওয়েল ব্লাউয়ের গবেষণা থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে  সালে এই বিষয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য তাঁর গবেষণাতে ছেদ পড়েছিল, তখন ভালো ফটোগ্রাফিক প্লেট যুদ্ধের প্রয়োজন ছাড়া পাওয়া যেত না। ১৯৪৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে কোডাক ও ইলফোর্ড কোম্পানি থেকে আবার ভালো প্লেট গবেষণার জন্য পাওয়া যায়, তাদের মানও ইতিমধ্যে অনেক উন্নত হয়েছে। পাওয়েল সরাসরি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে প্লেটের আরও উন্নতি ঘটান। পাওয়েল ও তাঁর সহযোগীরা ব্রিটেনের ব্রিস্টলে সেই উন্নত প্লেট নিয়ে কাজ শুরু করে পরপর অনেক নতুন কণা খুঁজে পেলেন। ১৯৫০ সালে পাওয়েল পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ফটোগ্রাফিক প্লেটের সাহায্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া বিষয়ে গবেষণার পদ্ধতির উন্নতি ঘটানো ও তার সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের মেসন আবিষ্কারে জন্য তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
পাওয়েলকে নোবেল দেওয়া উচিত হয়নি, একথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। মহাজাগতিক রশ্মি ধরার জন্য ফটোগ্রাফিক প্লেটের অনেক উন্নতি তাঁর ল্যাবরেটরি থেকে হয়েছিল। ভারতে বিভা চৌধুরী ও দেবেন্দ্রমোহন বসু পাই মেসন আবিষ্কারের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন বটে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে সেটা বলতে পারেননি। তাঁদের নাম নোবেলের জন্য কেউ মনোনীত করেনি। পাওয়েল নিশ্চিত ভাবে পাই মেসনকে সনাক্ত করেছিলেন। কিন্তু ব্লাউয়ের কৃতিত্বকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।  ১৯৪১ সালে রিভিউজ অফ মডার্ন ফিজিক্সে একটি লেখাতে ইমালশন নিয়ে সেই সময় পর্যন্ত গবেষণার আলোচনাতে ব্লাউয়ের নামের উল্লেখ আছে উনিশ বার, অন্য যে কারো থেকে বেশি। ব্লাউ ও ওয়ামবাখারের নাম নোবেলের জন্য মনোনীত করেছিলেন কোয়ান্টাম বলবিদ্যার দুই আবিষ্কারকের একজন, বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী এরউইন শ্রয়ডিঙ্গার। ওয়ামবাখারের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন থাকেই, কারণ ব্লাউ নিঃসন্দেহে ছিলেন নেত্রী। ব্লাউয়ের পরে ওয়ামবাখার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও একা বিশেষ কিছুই করতে পারেননি। এত সত্ত্বেও ব্লাউয়ের নাম নোবেল কমিটি ভুলে গেল কেমন করে?   
১৯৫০ সালে নোবেল কমিটি তার সদস্য অ্যাক্সেল লিন্‌ধকে ব্লাউদের বিষয়ে রিপোর্ট তৈরির দায়িত্ব দেয়। তিনি ইলফোর্ড কোম্পানির ইমালশন উন্নতিতে ব্লাউয়ের অবদানের কথা উল্লেখ করলেন না। আশ্চর্য এই যে লিন্‌ধ তার আগের বছরই সিসিল পাওয়েলের জন্যও রিপোর্ট লিখেছিলেন, এবং সেখানে ইমালশনের উন্নতিতে ব্লাউ ও ওয়ামবাখারের অবদানের কথা ছিল। ওয়ামবাখারের যে প্রবন্ধের কথা আগে বলেছি, তার উল্লেখ করে লিন্‌ধ ইমালশনের মধ্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া দেখার বিষয়ে ব্লাউয়ের কৃতিত্বকে আদৌ গুরুত্ব দেননি। পাওয়েলকে পুরস্কার দেওয়ার আগে বক্তৃতাতে লিন্‌ধ ইমালশনের মধ্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু তা কে প্রথম দেখেছিলেন তার উল্লেখ করেননি। পাওয়েল তাঁর নোবেল বক্তৃতাতে ১৯৪৫  সালের আগের কোনো গবেষণার উল্লেখ করেননি। নোবেল কমিটি বাস্তব পরিস্থিতিকেও অবহেলা করেছিল। লিন্‌ধ রিপোর্টে লিখেছিলেন যে ১৯৩৮ সালের পর ওয়ামবাখার গবেষণাপত্র ছাপালেও ব্লাউ ছাপাননি। এই ব্লগের অন্য লেখাতে নিউক্লিয় ফিশন আবিষ্কারের ক্ষেত্রে মাইটনারের ভূমিকা আছে, তাঁর জন্য নোবেল পুরস্কারের আলোচনার সময়ও একবার একই রকম মন্তব্য এসেছিল -- নিউক্লিয় বিভাজন আবিষ্কারের পরে দুই বছর তিনি কোনো গবেষণা করেননি। দুজনকেই কোন পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, তা বিবেচনার প্রয়োজন ছিল। আরও দু’বার ব্লাউয়ের নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। মাইটনারকে নানা ভাবে পদার্থবিজ্ঞানী মহল মনে রেখেছে,  ব্লাউয়ের ক্ষেত্রে আমরা সেই সান্ত্বনাটুকুও পাই না। আরও দুঃখজনক এই বিস্মৃতির পিছনে যুদ্ধোত্তর পর্বের বিজ্ঞানীদের দায়িত্বও কম নয়। 
ব্লাউকে বিস্মৃতির পিছনে আরও কয়েকটা কারণ মনে রাখতে হয়। প্রথমত, কণাত্বরক বা পার্টিকল অ্যাকসিলারেটরের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ফটোগ্রাফিক প্লেটের গুরুত্ব কমতে থাকে। মহাজাগতিক রশ্মি বিজ্ঞানীর ইচ্ছামতো আসবে না, অনেকদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করলে হয়তো দু’একটা সংঘর্ষ বা নতুন কণা দেখা সম্ভব। কণাত্বরকের পরীক্ষার সময় নিজের ইচ্ছামতো বেছে নেওয়া যায়, পরীক্ষাতে প্রতি সেকেন্ডে হাজার হাজার এইরকম ঘটনা পাওয়া যায়, তার জন্য দরকার হয়েছিল আধুনিক ইলেকট্রনিক্স। ব্লাউ সেই বিষয়ে কাজ শুরু করেছিলেন বটে, কিন্তু ইলেকট্রনিক্সের অতি দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। উনিশশো পঞ্চাশের দশক থেকেই নিউক্লিয় বা কণা পদার্থবিদ্যাতে ফটোগ্রাফিক প্লেটের ব্যবহার কমতে শুরু করে। আমরা এও দেখেছি যে দলবদ্ধভাবে গবেষণার সঙ্গেও তিনি মানিয়ে নিতে পারেননি। দ্বিতীয়ত, ব্লাউ অনেক দিন ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্পে চাকরি করেছেন, সারা কর্মজীবনই শিল্পের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে গবেষণা করেছেন। বর্তমানে আমরা বিজ্ঞান ও শিল্পের যোগস্থাপনের উপরে জোর দিয়ে থাকি। কিন্তু উনিশশো পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কারের দিকে তাকালে দেখতে পাব সেই সময়ে সাধারণভাবে সেই সমস্ত গবেষণাই স্বীকৃতি পেয়েছে যা মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচন করেছে, কিন্তু যা ঠিক ‘কেজো’ নয়, যার সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের যোগাযোগ কম। তাই এত সাফল্য সত্ত্বেও মারিয়েটা ব্লাউ আজ এক বিস্মৃত নাম।

প্রকাশঃ তরী পত্রিকা ১৪২৭