Saturday, 28 October 2023

ক্যালেন্ডারের গল্প

 

ক্যালেন্ডারের গল্প

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


আজকে তোমাদের ক্যালেন্ডারের গল্প শোনাব। ভাবছ ক্যালেন্ডারের মধ্যে আবার নতুন কী আছে? ওই প্রতিবছর হয় পয়লা জানুয়ারি নয়তো পয়লা বৈশাখ নতুন ক্যালেন্ডার আসে, কোনোটা দেয়ালে টাঙানো হয়, কোনোটা টেবিলে বা পকেটে রাখি। সেগুলোও নিশ্চয় ক্যালেন্ডার, কিন্তু আমাদের গল্পগুলো তার থেকে পুরোনো। এতই পুরোনো যে অনেক গল্পের শুরু কবে সবাই ভুলে গেছে। প্রাচীন রোমানরা মাসের প্রথম দিনটাকে বলত ক্যালেন্ডস, সেই থেকে ক্যালেন্ডার শব্দটা এসেছে। আমাদের দেশে আমরা বলি পঞ্জিকা বা পাঁজি। আয়ারল্যান্ডে এমন কবরের সন্ধান পাওয়া গেছে যার ভিতরে একটি সমাধি আছে। একমাত্র একুশে ডিসেম্বর, অর্থাৎ মকর সংক্রান্তির দিনে সূর্যোদয়ের সময় সেই সমাধি সূর্যের আলোতে কয়েক মিনিটের জন্য সরাসরি আলোকিত হয়। এইরকম স্থাপত্য আমাদের দেশেও আছে। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে কেরালাতে তৈরি শ্রীপদ্মনাভস্বামীর মন্দিরে গোপুরমের পাঁচটি স্তরের জানালা ভেদ করে সূর্যাস্তের সময় সূর্যের আলো ঢুকতে পারে মহাবিষুব ও জলবিষুবের দিনে, ঐ দু’দিন সূর্য বিষুবরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয় ইংল্যান্ডের বিখ্যাত স্টোনহেঞ্জও বছরের হিসাব রাখার জন্য তৈরি হয়েছিল। এদের ক্যালেন্ডার বলবে কিনা তা তোমরাই ঠিক করো।

পয়লা জানুয়ারি, কি পয়লা বৈশাখ, কি মহরম মাসের এক তারিখ, যেদিনই বছরটা শুরু হোক না কেন, ক্যালেন্ডার বানাতে হলে দুটো জিনিস জানতে হয়। এক হল বছরটা কত লম্বা? মানে কত দিন পরে আবার নতুন বছর আসবে। আর দু’নম্বরটা হল ঠিক কোন দিনে বছর শুরু হবে। এখন এই দ্বিতীয়টা নানা কারণে আলাদা আলাদা, তার কয়েকটা উদাহরণ আমরা দেখব। কিন্তু প্রথমটাতেও যে সবাই একমত, তা কিন্তু নয়। এক বছরে কত দিন? তোমরা বলবে ৩৬৫ দিন, আর লিপ ইয়ার হলে ৩৬৬। ঠিক, কিন্তু এটাই একমাত্র উত্তর নয়। যেমন ইসলামিক ক্যালেন্ডারে এক বছরে ৩৫৪ কিংবা ৩৫৫ দিন। সেটার কারণ আমরা জানি, একটু পরেই সেখানে আসব। কিন্তু মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতা দু’রকম ক্যালেন্ডার ব্যবহার করত, তার একটাতে ছিল ২৬০ দিন। মায়া সভ্যতা স্পেনের আক্রমণে ধ্বংস হয়ে গেছে, তাই কেন তারা বছরে ২৬০ দিন রেখেছিল, তা জানার আর উপায় নেই।

আচ্ছা ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিন কোথা থেকে এলো? এখন আমরা জানি যে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একপাক ঘুরতে সময় নেয় ৩৬৫ দিনের একটু বেশি, ঠিকঠাক মাপটায় আমরা পরে আসছি। তার ফলে গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত সব ঠিক এক বছর পরে ঘুরে আসে। নিশ্চয় জানো যে পৃথিবী ঠিক সোজা দাঁড়িয়ে সূর্যের চারদিকে ঘোরে না, একটু হেলে আছে। কোনো এক সময় সূর্য উত্তর গোলার্ধের উপরে বেশি লম্বভাবে কিরণ দেয়, তখন সেখানে গ্রীষ্মকাল। আবার ছ’ মাস পরে সূর্য উত্তর গোলার্ধের উপর তেরচা ভাবে কিরণ দেয়, তখন সেখানে শীতকাল। কিন্তু প্রাচীন যুগের মানুষ তো এসব জানত না, তাহলে তারা বছর গুনত কেমন করে?

অনেক রকম পদ্ধতি তারা নিয়েছিল। প্রথম ক্যালেন্ডার তৈরি হয়েছিল মিশরে। ভূগোল বইতে পড়েছ মিশরের সভ্যতা হল নীলনদের দান। মরুভূমির মধ্যে দিয়ে নদী বয়ে চলেছে, বছরের একটা নির্দিষ্ট সময় সেখানে বন্যা আসত। কূল ছাপিয়ে নদী তীরকে প্লাবিত করত, রেখে যেত জল আর উর্বর পলিমাটি। সেইখানে সারা বছরের জন্য ফসল চাষ হত। কবে নাগাদ বন্যা আসবে আগে জানা গেলে তৈরি থাকা যায়, জল নামার সঙ্গে সঙ্গে বীজ বোনা যায়। মিশরিয়রা দেখল যখন সূর্য ওঠার ঠিক আগে পূর্ব আকাশে আকাশের সব থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্র লুব্ধকের উদয় হয়, তার কয়েকদিনের মধ্যেই নীলনদে বন্যা আসে। তারা গুনে দেখল দু’বার এই ঘটনার মধ্যে মোটামুটি ৩৬৫ দিনের তফাত। তার থেকেই তারা বছর মেপে ফেলল। আসলে হিসেবটা ৩৬৫ দিনের থেকে একটু বেশি, মোটামুটি এক দিনের চার ভাগের এক ভাগ। তাহলে প্রতি চারবছরে এক দিন বেশি হয়। মিশরিয়রা সেটা বুঝতে পেরেছিল, কিন্তু সেটাকে হিসেবে আনার প্রয়োজন মনে করেনি। সেজন্য প্রতি চার বছরে এক দিনের গোলমাল হত। কবে থেকে তারা বছর গুনতে শুরু করেছিলে, তাই নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে তর্ক আছে, তার মধ্যে আমরা যাব না। কিন্তু খ্রিস্ট জন্মের তিন হাজার বছর আগে যে তারা এভাবে বছর গুনতে শুরু করেছিল তাই নিয়ে সন্দেহ নেই। প্রতি চার বছরে একদিনের গণ্ডগোল মানে ১৪৬০ বছরে এক বছরের গণ্ডগোল। বুঝতেই পারছ গোনা শুরুর কয়েকশো বছর পরেই লুব্ধকের উদয়ের সঙ্গে বন্যার আর কোনো সম্পর্ক রইল না। তৃতীয় টলেমি যখন ২৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মিশরের সম্রাট হলেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে প্রতি চার বছরে এক দিন যোগ করা হোক, এখন আমরা যাকে লিপ ইয়ার বা অধিবর্ষ বলি। কিন্তু টলেমি ছিলেন গ্রিক, আলেকজান্ডার মিশর দখল করে নিয়েছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পরে সেখানে গ্রিকরাই সম্রাট বা ফারাও হয়ে শাসন করতে শুরু করেন। বছরের হিসেব রাখত পুরোহিতরা, তারা গ্রিক সম্রাটের আদেশকে গুরুত্ব দেয়নি। সে যাই হোক, মিশরিয়রাই প্রথম ৩৬৫ দিনে বছর গুনেছিল।

অন্যভাবেও কিন্তু এই হিসেবটা করা যায়। প্রতিদিন যদি সূর্য একই জায়গায় উদয় হয় বা অস্ত যায় না। একুশে জুন কর্কটসংক্রান্তির দিনে সূর্য সব থেকে উত্তর দিকে উদয় হয়, তারপর সে দক্ষিণদিকে চলতে শুরু করে। বাইশে ডিসেম্বর দক্ষিণতম বিন্দুতে যায়, আবার তারপর উত্তর দিকে রওনা দেয়। সেই দেখেই বছরের হিসাব করা যায়। ঠিক তেমনি ঠিক দুপুর বেলা একটা খাড়া ভাবে রাখা লাঠির ছায়া কোনদিকে পড়ে আর কত বড় হয়, তাই দেখেও বছর মাপা যায়। ধরো, বেশ কয়েকবছর ধরে কর্কটক্রান্তি রেখার উপরে কোনদিন দুপুরবেলা লাঠির ছায়া থাকে না, তার থেকে হিসেব করলে দেখা যাবে বছর ৩৬৫ দিনের থেকে ছ’ ঘণ্টা বেশি। ভারত, মেসোপটেমিয়া, চিন, এই সমস্ত দেশে এভাবেই হয়তো বছরের হিসেব করা হয়েছিল। কিন্তু নীল নদের বন্যার সঙ্গে যোগ রেখে লুব্ধক উদয়ের সঙ্গে নতুন বছর শুরু করার হিসাব মিশরিয়রা করেছিল, অন্যদের বছরের শুরুটা সেই দিনে পড়ার কোনো কারণ নেই। যেমন আমাদের যে বঙ্গাব্দ, তার পয়লা বৈশাখ ছিল মার্চ মাসের একুশ তারিখ অর্থাৎ মহাবিষুব, সেই দিন সূর্য বিষুবরেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয়।

আমি জানি তোমরা এক্ষুনি বলবে যে পয়লা বৈশাখের ছুটি তো ১৫ এপ্রিল পাই। আসলে সূর্য দেখে আর নক্ষত্র দেখে বছরের হিসেব করলে একটু তফাত হয়, তার কারণ পৃথিবীর অয়নচলন। এটা একটু জটিল, আসলে পৃথিবীর অক্ষ মোটামুটি ছাব্বিশ হাজার বছরে কক্ষতলের সঙ্গে লম্বের সাপেক্ষে একপাক ঘুরে আসে। কিন্তু আমাদের বঙ্গাব্দের পঞ্জিকায় সেটাকে হিসাবে রাখা হয়নি। ফলে ২০২৩ সালে মে মাসের গরমে রবীন্দ্রজয়ন্তী হল, আর ১৫০২৩ সালে সোয়েটার গায়ে দিয়ে পঁচিশে বৈশাখ পালন হবে। বঙ্গাব্দ কে কবে শুরু করেছিলেন তাই নিয়ে তর্ক আছে, তার মধ্যে না ঢুকে একটা কথা বলতেই পারি। বঙ্গাব্দ শুরুর হিসাবের পরে চোদ্দশো তিরিশ বছরে পয়লা বৈশাখ পিছিয়ে পিছিয়ে পনেরই এপ্রিলে চলে গেছে। এই অয়নচলন বিষয়টা আবিষ্কার করেছিলেন গ্রিক বিজ্ঞানী হিপ্পারকস খ্রিস্ট জন্মের একশো বছর আগে। কিন্তু আমাদের পঞ্জিকায় সেটা আর কেউ ঢোকায় নি। জ্যোতিষীরা জন্মের সময় কোন রাশি ছিল জানতে চায়। রাশি আর কিছু নয়, আকাশে সূর্যের গতিপথে বারোটা নক্ষত্রমণ্ডলের কল্পনা করা হয়েছে, তাদের বলে রাশি। কিন্তু বছর পিছিয়ে যাওয়ার ফলে রাশির হিসেবেও গণ্ডগোল হয়ে গেছে। অবশ্য রাশি ঠিক থাকলেও জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণী মেলার কোনো কারণ নেই, সূর্য আকাশে কোথায় আছে তার সঙ্গে মানুষের ভবিষ্যতের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। জ্যোতিষীরা যা বলে সবই ভুলভাল, কিন্তু তাদের হিসেবের গোড়াতেও ভুল আছে।

সূর্যকে ধরে বছর হিসেব করার কারণ আছে। কবে ফসল রোপণ করতে হবে, শীত শুরুর আগে কবে পশুপালকরা পাহাড় থেকে তাদের ভেড়ার পাল নিয়ে নেমে আসবেন, বর্ষার শেষে রাজা কবে যুদ্ধযাত্রা করবেন বা শিকার করতে বেরোবেন, এ সমস্তই ঋতুর উপর নির্ভর করত। আগেই বলেছি পৃথিবী ও সূর্যের আপেক্ষিক অবস্থানের জন্যই ঋতু পরিবর্তন হয়। মানুষের জীবনের জন্য এই বছরটাই হল সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, একে বলে ক্রান্তীয় বা সৌর বছর। কিন্তু অন্য এক ধরনের বছরও আছে।

আকাশে সব থেকে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক নিশ্চয় সূর্য, কিন্তু রাতের আকাশের চাঁদও মানুষের মন কেড়ে নিয়েছিল। চান্দ্র বছরের হিসাব সৌর বছরের থেকে বেশি পুরানো, চাঁদকে দেখে ক্যালেন্ডার বানানোর সব থেকে বড় সুবিধা হল চাঁদের কলা। পূর্ণিমার দিনের থালার মতো চাঁদ ক্ষয় পেতে পেতে অমাবস্যাতে অদৃশ্য হয়ে যায়, তারপর আবার বাড়তে বাড়তে পূর্ণিমাতে ফিরে আসে। এই বিষয়টা বোঝা খুব সোজা। এক অমাবস্যা থেকে আরেক অমাবস্যা বা এক পূর্ণিমা থেকে আরেক পূর্ণিমার মধ্যে মোটামুটি সাড়ে ঊনত্রিশ দিনের তফাত থাকে। একে বলে এক চান্দ্র মাস। যদি বারোটা চান্দ্র মাসের হিসেব করি, তাহলে হয় ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিনের মাঝামাঝি। এই সংখ্যাটা ৩৬৫ দিনের সৌর বছরের কাছাকাছি, তাই বারো চান্দ্র মাসে এক বছর গোনা শুরু হয়েছিল। ইসলামিক হিজরি ক্যালেন্ডার চান্দ্র মাস মেনে চলে, তাই প্রতিবছর ইদ মহরম ইত্যাদি সৌর বছর বা বঙ্গাব্দের হিসাবে দশ থেকে এগারো দিনে আগে পড়ে। একে বলে চান্দ্র ক্যালেন্ডার। হজরত মহম্মদ যে বছর তাঁর অনুগামীদের সঙ্গে নিয়ে মক্কা থেকে মদিনা গিয়েছিলেন, সেই বছর থেকে হিজরি সাল গোনা শুরু হয়।

বছরকে বারো মাসে ভাগ করার ধারণাটা এসেছিল চান্দ্র মাস থেকে, কিন্তু পরে অনেক সময় তাকে চাঁদের কলার থেকে আলাদা করা হয়। মিশরিয়রা ধরেছিল তিরিশ দিনে এক মাস, তার সঙ্গে চাঁদের কলার কোনো সম্পর্ক নেই। বারো মাসে ৩৬০ দিন, শেষ পাঁচ দিনকে তারা কোনো মাসের মধ্যে ফেলে নি। চাঁদের সঙ্গে বঙ্গাব্দের মাসেরও কোনো সম্পর্ক নেই। তাই বঙ্গাব্দ হল বিশুদ্ধ সৌর ক্যালেন্ডার। বুঝতেই পারো চাঁদের কলার সম্পর্ক আছে তিথির সঙ্গে। ইদের মতোই দুর্গাপুজোও এগোতে থাকে, কিন্তু তার একটা সীমা আছে। মহালয়া হল এমন অমাবস্যা তিথি যাকে আশ্বিন মাসে পড়তেই হবে। তার পরের পক্ষকে বলা হয় দেবীপক্ষ, দুর্গাপুজো সেই সময় হয়। এক মহালয়ার পরে আবার তেরো নম্বর অমাবস্যাই মহালয়া, কিন্তু এগোতে এগোতে যখন সেই অমাবস্যাটা ভাদ্র মাসে চলে যায়, তখন তার পরের অমাবস্যাতে মহালয়া পালন করা হয়। এভাবে চান্দ্র ক্যালেন্ডারকে যদি সৌর ক্যালেন্ডারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়, তখন তাকে বলে চান্দ্রসৌর ক্যালেন্ডার। দুই ক্যালেন্ডারের মধ্যে বছরে দশ বা এগারো দিনের তফাত হয়, সেই কারণে ভারতীয় পাঁজিতে তিন বছর অন্তর একটি অতিরিক্ত মাস যোগ করা হয় যাকে বলে মলমাস। অনেক ক্যলেন্ডারেই এই রকম ব্যবস্থা আছে।

এখানে একটা কথা বলে রাখি, সাধারণভাবে দিন কত লম্বা তা মাপা হয় এক মধ্যাহ্ন থেকে পরের মধ্যাহ্নের মধ্যের সময় দিয়ে। রাত বারোটা থেকে দিনের শুরু হয়েছে অনেক পরে। বঙ্গাব্দে দিন শুরু হয় সূর্যোদয় থেকে। হিজরি ক্যালেন্ডার চাঁদ মেনে চলে, তার দিনের শুরু সূর্যাস্ত থেকে। হিন্দুরা যে তিথি গণনা করেন, তা কিন্তু সৌর দিনের মাপের থেকে আলাদা; সেটা চান্দ্রমাসের হিসাবেই হয়। দিনেরও অনেক গল্প আছে, সে সব পরে কখনো বলা যাবে।

প্রতি চারবছরে একটা অধিবর্ষের নিয়ম চালু করেছিলেন রোমের শাসক জুলিয়াস সিজার। তাঁর পরে রোমের সম্রাট হন অগাস্টাস। জুলিয়াস মিশর দখল করেছিলেন, অগাস্টাস সেখানে অধিবর্ষ চালু করেন। জুলিয়াসের আগে রোমে বছর গোনা হত ৩৫৫ দিনে অর্থাৎ মোটামুটি বারোটি চান্দ্র মাস। দু’বছর অন্তর তার সঙ্গে বাইশ বা তেইশ দিন যোগ করা হত, কিন্তু তার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। ফলে জুলিয়াস সিজারের সময় দু’মাসের বেশি ফারাক হয়ে যাচ্ছিল। সিজার মিশরের থেকে ৩৬৫ দিনের সৌর বছরটিকে নিলেন, আর খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালকে বাড়িয়ে করলেন ৪৪৫ দিনের। তিনি মাসের সঙ্গে চাঁদের কোনো সম্পর্ক রাখলেন না, এবং অধিবর্ষের নিয়ম চালু করলেন। একে বলা হয় জুলিয়াসের ক্যালেন্ডার।

কিন্তু বছরের আসল দৈর্ঘ্য হল ৩৬৫.২৪২২ দিন, অধিবর্ষের নিয়মে প্রতি চার বছরে ০.০৩১২ দিন বেশি যোগ হয়ে যাচ্ছিল। ১৫৮২ সালে পোপ দ্বাদশ গ্রেগরির আগ্রহে আবার ক্যালেন্ডার সংশোধন করা হয়। সমস্যাটা ছিল মূলত ধর্মীয়, যিশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার ও পুনরুত্থানের যে উৎসব সেই ইস্টারের তারিখ নিয়ে গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল। তাই গ্রেগরি নিয়ম করলেন শতাব্দীর ক্ষেত্রে অধিবর্ষ তখনই প্রযোজ্য হবে যদি তা চারশো দ্বারা বিভাজ্য হয়। অর্থাৎ ১৯০০ সাল অধিবর্ষ ছিল না, ২১০০ সালও অধিবর্ষ হবে না, কিন্তু ২০০০ সাল ছিল অধিবর্ষ। এর ফলে সমস্যাটা পুরোপুরি চলে যায় নি, তবে তিন হাজার বছর না পেরোলে একদিনের নড়চড় হবে না। জুলিয়াস সিজার ও দ্বাদশ গ্রেগরির যুগের মধ্যে এগারো দিন গণ্ডগোল হয়েছিল, তাই তিনি নির্দেশ দেন যে ১৫৮২ সালের ৪ অক্টোবর বৃহস্পতিবারের পরের দিন হবে ১৫ অক্টোবর শুক্রবার। আস্তে আস্তে সব দেশই এই নিয়ম মেনে নিয়েছে, এই ক্যালেন্ডার গ্রেগরির ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত। রাশিয়া ১৯১৭ সালের বিপ্লবের আগে পর্যন্ত জুলিয়াস সিজারের ক্যালেন্ডার মেনে চলত, বিপ্লবের পরে গ্রেগরির ক্যালেন্ডার অবলম্বন করে। আগের ক্যালেন্ডারে বিপ্লব হয়েছিল অক্টোবর মাসে, পরের হিসাবে সেটা ছিল নভেম্বর মাস। তাই পুরানো বইতে রুশ বিপ্লবকে অক্টোবর বিপ্লব বলা হত।

সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর, এদের মানে হল সপ্তম, অষ্টম, নবম, ও দশম মাস। কিন্তু ক্যালেন্ডারে তো তা নয়। আসলে রোমে বছর শুরু হত পয়লা মার্চ থেকে, সেই জন্যই এই নাম। খ্রিস্টজন্মের সাড়ে চারশ বছর আগে রোমে জানুয়ারি থেকে নতুন বছর গোনা শুরু হয়। তখন ছিল চান্দ্র মাস, তাতে থাকত আটাশ বা ঊনত্রিশ দিন। তার চারশো বছর পরে জুলিয়াস সিজার সব মাসগুলোকে হয় তিরিশ না হয় একতিরিশ দিনে চালু করেছিলেন। খালি ফেব্রুয়ারি মাসে আছে আটাশ দিন, অধিবর্ষে সেটা হয় ঊনত্রিশ দিন। জুলিয়াস ও অগাস্টাসের শাসনকে স্মরণীয় করে রাখতে বছরের সপ্তম ও অষ্টম মাসের নাম রাখা হয় জুলাই ও আগস্ট। কোথাও কোথাও গল্প শুনবে যে অগাস্টাস নিজের নামের মাস যাতে ছোট না হয় তার জন্য ফেব্রুয়ারি থেকে একদিন নিয়ে নিয়েছিলেন। ওটা গল্পই, অগাস্টাস সম্রাট হওয়ার আগেই অষ্টম মাসে একত্রিশ দিন ছিল।

একটা কথা বলে রাখি, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সব সময় সমান নয়, আমাদের যখন গ্রীষ্মকাল, তখন আমরা সূর্যের থেকে একটু বেশি দূরে থাকি। গ্রীষ্মকালের সঙ্গে সূর্য পৃথিবীর দূরত্বের কোনো সম্পর্ক নেই। বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার দেখিয়েছিলেন যে গ্রহ যখন সূর্যের থেকে বেশি দূরে থাকে তখন তার বেগ কমে যায়। সেই কারণে উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল বেশি লম্বা। এই কারণেই আমাদের বঙ্গাব্দের হিসাবে গ্রীষ্মকালের মাসগুলি অপেক্ষাকৃত বড় রাখা হয়। যেমন ১৪৩০ বঙ্গাব্দে বৈশাখ, আষাঢ়, ভাদ্র ও চৈত্র মাসে আছে একত্রিশ দিন করে, জ্যৈষ্ঠ ও শ্রাবণ মাসে বত্রিশ দিন, আবার পৌষ ও মাঘ মাসে উনতিরিশ দিন। পৃথিবীর গতির কথা জানা না থাকলেও উদয় বা অস্তের সময় সূর্যের অবস্থান পর্যবেক্ষণ থেকেই প্রাচীন পঞ্জিকাকাররাই এই ধরনের হিসাবে পৌঁছেছিলেন।

আমার কথা শেষ করার সময় এসেছে। আরো অনেক রকম ক্যালেন্ডার আছে, তাদের প্রত্যেকের অনেক গল্প আছে। ইচ্ছা করলে তোমরাও বই বা ইন্টারনেট ঘেঁটে তাদের সম্পর্কে জানতে পারো। দুটো খুব ভালো বইয়ের কথা বলি, পলাশ বরন পালের লেখা 'সাল তারিখের ইতিহাস' ও প্রদীপ্ত সেনের 'সন-তারিখের পাঁচালি'; উপরের অনেকগুলো কথাই এদের থেকে নেওয়া। 

খুশির হাওয়া পত্রিকার শারদীয় ১৪৩০ সংখ্যায় প্রকাশিত


 

Image by Freepik

Thursday, 26 October 2023

বার বার আক্রান্ত বিবর্তনবাদ

 

বার বার আক্রান্ত বিবর্তনবাদ 

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 


শুরু করা যাক একটা পুরানো গল্প দিয়ে। গল্পটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, তবে যে কোনো দেশের হতেই পারত, এখনো হয়তো পারে। ১৯২৫ সালে টেনেসি প্রদেশের ডেইটন শহরের এক স্কুলশিক্ষক জন স্কোপ্‌সকে আইনভঙ্গের দায়ে আদালতে হাজির হতে হয়। কোন আইন তিনি ভেঙেছিলেন? অল্পদিন আগেই টেনেসির আইনসভা বিপুল গরিষ্ঠতাতে এক আইন পাস করেছিল; বাইবেলে লেখা আছে ইশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তার বিরোধী কোনো তত্ত্ব স্কুলে পড়ানোকে অপরাধ বলে গণ্য করা হবে। স্পষ্টতই লক্ষ্য ছিল ডারউইনের বিবর্তনবাদ। তবে সকলেই যে মুখ বুজে এই আইন মানতে তৈরি ছিলেন তা নয়, কারণ তাঁরা বুঝেছিলেন যে শুধু বিবর্তনবাদ নয়, এ হল আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনোবৃত্তি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপরে আক্রমণ। আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন শিক্ষকদের কাছে আহ্বান জানায় আইন ভাঙার জন্য, তার জন্য আদালতে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা তারা দেবে। স্কোপ্‌স রাজি হন, তিনি স্কুলে বিবর্তনের ক্লাস নেন। আইন ভাঙার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।

স্কোপ্‌সের পক্ষে দাঁড়ান আমেরিকার সব থেকে বিখ্যাত উকিলদের একজন, ক্ল্যারেন্স ড্যারো। ড্যারো ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন প্রগতিশীল, তিনি সানন্দে এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। টেনেসির আইনের পিছনে ছিলেন রাজনীতিবিদ উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ান। তিনি সরকারপক্ষের উকিলদের সঙ্গে যোগ দেন। স্কোপ্‌স যে আইন ভেঙেছিলেন তা তিনি অস্বীকার করেননি, কাজেই সেদিক দিয়ে বিচারের বিশেষ কিছু ছিল না। আসলে ড্যারোরা আদালত নয়, মানুষের কাছে নিজেদের যুক্তি নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সরকার পক্ষ ড্যারোকে সেই সুযোগ দিচ্ছিলেন না। ড্যারো তখন এক অভাবনীয় কাজ করেছিলেন, তিনি বিপক্ষের উকিল ব্রায়ানকে বাইবেল বিশেষজ্ঞ হিসাবে সাক্ষ্য দিতে ডেকেছিলেন, এবং বাইবেল থেকে নানা উদাহরণ দেখিয়ে বলতে বাধ্য করেছিলেন যে বাইবেলে যা লেখা আছে তার সবটাই আক্ষরিক সত্যি নয়, কিছু কথা রূপক বলে ধরতে হবে। ড্যারোর এক বিখ্যাত প্রশ্ন ছিল, বাইবেলে লেখা আছে সৃষ্টির চতুর্থ দিনে ঈশ্বর সূর্য চন্দ্র সৃষ্টি করেছিলেন, তাহলে তার আগের তিন দিন রাত কেমন করে হয়েছিল? বিচারে স্কোপ্‌সের অবশ্যই শাস্তি হয়েছিল, তবে পরে টেনেসি সুপ্রিম কোর্ট একটা নিয়মগত ভুল দেখিয়ে তা বাতিল করে দেয়। 

উইলিয়াম জেনিংস ব্রায়ানকে (বাঁদিকে বসে) জেরা করছেন ক্ল্যারেন্স ড্যারো, (দাঁড়িয়ে)।  বিচারের সপ্তম দিনে প্রচণ্ড গরমের জন্য কোর্টের বাইরে বিচার চলেছিল।

 

আমেরিকাতে বিবর্তনবাদ প্রচারের কাজ করেছিল এই বিচার যা ইতিহাসে স্কোপ্‌স মাঙ্কি ট্রায়াল নামে প্রসিদ্ধ হয়ে আছে। ডারউইনের মতবাদের বিরোধিতাতে বাঁদরের কথা আসা নতুন কিছু নয়। বিজ্ঞানের ইতিহাসে সব থেকে বিখ্যাত বিতর্ক হয়েছিল ১৮৬০ সালে অক্সফোর্ডে। তার একদিকে ছিলেন এক বিখ্যাত বিজ্ঞানী, অন্যদিকে এক ধর্মযাজক। বিষয় ছিল ডারউইনের বিবর্তনবাদ। ঠিক আগের বছর ১৮৫৯ সালে প্রকাশিত হয়েছে চার্লস ডারউইনের সেই কালজয়ী গ্রন্থ যাকে 'অরিজিন অফ স্পিসিস' (পুরো নাম হল On the Origin of Species by Means of Natural Selection, or the Preservation of Favoured Races in the Struggle for Life) এই সংক্ষিপ্ত নামে আমরা সবাই চিনি। আলোচনাতে অনেকে অংশ নিলেও মূল তর্ক হয়েছিল দুজনের মধ্যে। একদিকে ছিলেন সে যুগের বিখ্যাত বক্তা বিবর্তনবাদের তীব্র বিরোধী বিশপ স্যামুয়েল উইলবারফোর্স; অন্যদিকে বিশিষ্ট বিজ্ঞানী টমাস হাক্সলি যিনি নিজেকে বলতেন ডারউইনের বুলডগ। তর্কটা বেঁধেছিল বিবর্তনবাদের পক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ নিয়ে, কিন্তু উইলবারফোর্স যুক্তির পরিবর্তে কথার কারিকুরিতে হাক্সলিকে পরাজিত করার চেষ্টা করছিলেন। একসময় হাক্সলিকে ব্যাঙ্গ করে জিজ্ঞাসা করেন তাঁর ঠাকুর্দা না ঠাকুমা, কে বাঁদর ছিলেন। হাক্সলি উত্তরে বলেন যে পূর্বপুরুষ বাঁদর বলে তাঁর কোনো লজ্জা নেই, তিনি লজ্জিত হতেন যদি তিনি জানতেন যে তাঁর পূর্বপুরুষ সত্যকে সুবিধামতো বিকৃত করেছিলেন। স্পষ্টতই ইঙ্গিতের লক্ষ্য ছিলেন উইলবারফোর্স। কয়েকবছর আগে আমাদের দেশের সেই সময়ের কেন্দ্রীয় উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সত্যপাল সিং মশাইও বলেছিলেন যে কেউ তো বাঁদর থেকে মানুষ হতে দেখেনি, সুতরাং বিবর্তন তত্ত্বটাই ভুল; জানি না হাক্সলির যুক্তির কী উত্তর তিনি দেবেন।

এখানে বলে রাখি যে ডারউইন ও আলফ্রেড রাসেল ওয়ালেস আলাদা আলাদা ভাবে একই সময়ে বলেছিলেন যে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তন হয়, সঠিক অর্থে তাই এটি দুজনেরই তত্ত্ব। এমন নয় যে বিবর্তনের কথা আগে কেউ বলেন নি, লামার্কের বিবর্তন তত্ত্বের কথা আমরা সবাই জানি। ডারউইনের ঠাকুর্দা ইরাসমাস ডারউইনও ছিলেন বিজ্ঞানী, তিনিও বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু বিবর্তন কেন হবে সে কথা ডারউইন ও ওয়ালেসের আগে কেউ বুঝতে পারেননি। তবে ডারউইন বিবর্তনবাদের সমর্থনে বিপুল পরিমাণ তথ্য জোগাড় করেছিলেন, এবং ওয়ালেস কখনো কখনো তাঁর নিজের তত্ত্বের বৈপ্লবিক তাৎপর্য থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন। তাই অনেক সময়েই বিবর্তনতত্ত্বকে ডারউইনবাদও বলা হয়। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মতো পরিচিত বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজন এই লেখাতে নেই। সংক্ষেপে বলা যায় যে যে কোনো প্রজাতির জীবদের মধ্যে বিভিন্ন কারণে নতুন চরিত্রের প্রকাশ ঘটে। জীবজগতে যে নতুন চরিত্রগুলি পরিবেশে ঐ জীবের বংশবৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে কোনো সুবিধা দেয়, সেগুলি স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্যদিকে যেগুলি বংশবৃদ্ধিতে জীবকে অসুবিধাজনক অবস্থানে ফেলে, সেই পরিব্যক্তিগুলি লুপ্ত হয়ে যায়। এই পদ্ধতিকে বলে অভিযোজন; এর মাধ্যমে নতুন চরিত্র পুঞ্জীভূত হতে হতে শেষ পর্যন্ত নতুন প্রজাতির জন্ম হয়। একেই বলে প্রাকৃতিক নির্বাচন। প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন প্রজাতির উদ্ভব আমাদের পৃথিবীর এই বৈচিত্রময় জীবজগৎ কেমনভাবে সৃষ্টি হয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করেছে।

জীববিজ্ঞানের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এই বিবর্তনবাদ, তাকে পাঠ্যসূচী থেকে বাদ দেওয়ার কাহিনির পুনরাবৃত্তি হচ্ছে আমাদের দেশে। ভারতের ইতিহাসের উপর আক্রমণ আমাদের দেশে বহুদিনই শুরু হয়েছে। পুরাণকথা আর ইতিহাসকে সচেতনভাবে গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অযোধ্যার রামমন্দির তার একটা ফলশ্রুতি। বোঝা কমানোর নামে ইতিহাসের পাঠক্রমে রদবদল করা হচ্ছে, মাধ্যমিক স্তর থেকে বিবর্তনবাদকে এই সুযোগে ছেঁটে ফেলা হল। রসায়নে পর্যায়সারণী বা পদার্থবিদ্যাতে তড়িৎচৌম্বক আবেশ বা শক্তির উৎসের মতো বিষয়ও বাদ দেওয়া হচ্ছে, তবে তারা সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্রের রিপোর্টের ভাষায় কোল্যাটারাল ড্যামেজ। শুধু ইতিহাস বা জীববিজ্ঞান পাঠক্রমের বোঝা হালকা করলে অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সহজেই বোঝা যাবে, তাই অন্য বিজ্ঞানেও হাত পড়েছে। পর্যায়সারণী না পড়িয়ে রসায়ন শেখানো যায় সে কথা যাঁরা ভাবতে পেরেছেন, তাঁদের চিন্তাপদ্ধতি আমার বুদ্ধির অগম্য। কিন্তু রসায়নে পর্যায় সারণীর যেখানে স্থান, জীববিজ্ঞানে বিবর্তন তত্ত্ব তার থেকে অনেক বেশি কেন্দ্রীয় অবস্থানে আছে। আমাদের চারদিকের জীবজগতের বৈচিত্রকে বোঝার অন্য কোনো উপায় নেই। মনোবিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব, এমনকি পদার্থবিজ্ঞানেও বিবর্তনবাদ নতুন পথ দেখাচ্ছে। পরিবেশ, অতিমারী, ওষুধ ও তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ইত্যাদি মৌলিক সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে বিবর্তনবাদের মধ্যে। তাই দেশের আঠারোশোর বেশি বিজ্ঞানী এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন, তবে তাতে বড়কর্তাদের মত পাল্টায়নি।

তবে একটা কথা পাঠক্রম রচয়িতাদের সমর্থনে বলতেই হবে, তাঁরা অন্তত বিবর্তনবাদকে ভুল বলেননি, উঁচু ক্লাসের পাঠক্রমে রেখে দিয়েছেন। পুরোটাই বাদ দিয়ে দিতে পারতেন; উচ্চশিক্ষা দপ্তরের মন্ত্রী সত্যপাল সিং তো সেই দাবীই তুলেছিলেন। তাঁর হাস্যকর যুক্তি নিয়ে আলোচনা করে পাঠকের সময় নষ্ট করতে চাই না, কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়; বিজ্ঞানে এত নানা বিষয় থাকা সত্ত্বেও কেন ডারউইনের তত্ত্বই বারবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে?

উইলিয়াম ব্রায়ান কেন বিবর্তনবাদের বিরোধিতা করেছিলেন? বাইবেলে লেখা আছে ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশাল অংশের মানুষ বিবর্তন তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না। ব্রায়ানের  মনে হয়েছিল যে সেই তত্ত্ব স্কুলে পড়লে বাইবেল ও খ্রিস্টধর্ম থেকে ছাত্রছাত্রীদের বিশ্বাস চলে যাবে। বিদ্যালয়ের পাঠক্রম থেকে যাঁরা ডারউইনবাদকে বাদ দিচ্ছেন, তাঁদের আশঙ্কার কারণ বুঝতে আগের বাক্যটাতে খ্রিস্টধর্মের জায়গায় যে কোনো ধর্ম এবং বাইবেলের জায়গায় তার ধর্মগ্রন্থের কথা বসিয়ে নিতে পারেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের এক স্কুলে ডারউইনের তত্ত্বের কথা বলাতে এক শিক্ষকের হেনস্থার খবর এখনো পুরানো হয়নি। আমাদের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার তাদের বুদ্ধিমতো ধর্মের ভিত্তিতে দেশ চালাতে চায়, তার জন্য দেশ মধ্যযুগে ফিরে গেলেও তাদের কিছু আসে যায় না। চাইলেই তো আর অতীতে ফিরে যাওয়া যায় না, একবিংশ শতাব্দীর সমস্যার সমাধান হাজার হাজার বছরের পুরানো বইতে পাওয়া যাবে না। তবে সে কথা আমাদের নীতি নির্ধারকদের কে বোঝাবে, তাঁরা তো মেঘনাদ সাহার ভাষায় 'সবই ব্যাদে আছে', সেই কথাতে বিশ্বাসী!

কোনো ধর্মগ্রন্থই যুক্তিপ্রমাণের ধার ধারে না, সেখানে আপ্তবাক্যই যথেষ্ট। প্রাচীন ও মধ্যযুগে তাকে কেউ প্রশ্ন করার কথা ভাবতে পারত না। কিন্তু আধুনিক জগৎ অনেকটা এগিয়ে গেছে, বিজ্ঞান হল এই যুগের মন্ত্র। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মও এখন অনেক সময়েই নিজেকে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ করতে চায়। প্রায়ই নানা ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতির সমর্থনে বিজ্ঞান থেকে যুক্তি খোঁজা হয়, যদিও প্রায় সব ক্ষেত্রেই তা অপযুক্তি। তাই বিজ্ঞানের অন্য শাখার উপর মৌলবাদীদের বিদ্বেষ খুব প্রবল নয়। কিন্তু বিবর্তনবাদ সম্পর্কে তারা সবাই খড়্গহস্ত, কারণ সেখানে ঈশ্বরের কোনো স্থান নেই। বিবর্তনবাদ পুরোপুরি বস্তুবাদসম্মত যুক্তিতে জীবজগতের উদ্ভবের ব্যাখ্যা দেয়। এবং সেই কারণেই বিবর্তনবাদ সকলের অবশ্যপাঠ্য। আমরা যে সায়েন্টিফিক টেম্পার বা বৈজ্ঞানিক মনোবৃত্তির কথা বলি, এমন তো নয় যে একমাত্র বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানের ছাত্রদের জন্যই তা প্রযোজ্য; আধুনিক সমাজে সকলেরই সেই মনোবৃত্তি থাকা উচিত। বিবর্তনবাদ তা গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাই দশম শ্রেণির পরে যারা ইতিহাস বা শিক্ষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়বে, বা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে, তাদেরও বিবর্তনবাদ শেখাটা জরুরি।

ডারউইনের বিরোধিতার নানা রূপ আছে। একটা হল যা আমাদের মন্ত্রীমশাই বলতে চেয়েছিলেন, অর্থাৎ বিবর্তন তত্ত্বের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। আধুনিক বই পড়তে হবে না, একটু কষ্ট করে তিনি যদি 'অরিজিন অফ স্পিসিস' বইটা পড়ে নিতেন, তাহলে তাঁর হয়তো এই কথাটা বলার সাহস হতো না। ইংরাজিতে বাক্যবন্ধটা হল থিওরি অফ ইভলিউশন, তাই এমন কথা শোনার দুর্ভাগ্য হয়েছে, ও তো থিওরি, প্রমাণিত সত্য নয়। বিজ্ঞানে ব্যবহৃত শব্দগুলি প্রতিদিনের ভাষা থেকেই নেওয়া, তার ফলে এই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি। সাধারণ ভাষাতে আমরা অনেক সময় বলেই থাকি, ‘এটা তোমার থিওরি,’ অর্থাৎ তোমার বিশ্বাস, কিন্তু তা সত্যি নাও হতে পারে। বিজ্ঞানে ব্যাপারটা অনেকটা আলাদা। প্রথম যখন ডারউইন ও ওয়ালেস বিবর্তনের কথা বলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার নাম দেয়া হয়েছিল তত্ত্ব বা থিওরি। তারপরে গত দেড় শতাব্দীতে তার পক্ষে এত প্রমাণ জড়ো হয়েছে যে কোনো বিজ্ঞানীর আর তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও তার নামটা থিওরিই রয়ে গেছে, যেমন ভৌতবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম তত্ত্ব বা আইস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের পক্ষে অসংখ্য প্রমাণ সত্ত্বেও তাদের আমরা থিওরিই বলে থাকি।

তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞানের এই সব তত্ত্বে কখনো কোনো সামান্য পরিবর্তন হবে না, কিন্তু মোটের উপর কাঠামো যে এক থাকবে তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। বিজ্ঞান কি পাল্টায় না? আজ যা গল্প, কাল তা সত্যি প্রমাণিত হতেও তো পারে। একথা ঠিক বিজ্ঞানের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল যে সে শেষ কথা বলতে পারে না। প্রতিনিয়ত নতুন উদ্ভাবন নতুন পর্যবেক্ষণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হচ্ছে, বিজ্ঞান নিজেকে পরিবর্তন করছে। এই আত্মসংশোধন ও আত্মোন্নতি একান্তভাবেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অঙ্গ। তার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আজ যা জানি তা কাল একেবারে ভুল প্রমাণিত হবেই। একেবারে যে তা হয় না এমন নয়, কিন্তু সেই উদাহরণ খুবই কম; এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা আরও দ্রুত কমে আসছে।

বিজ্ঞানের পোশাক পরা অবিজ্ঞানের থেকে দ্বিতীয় ধরনের বিরোধিতা আসে। অনেক বছর আগে কলকাতার এক বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান একটি বক্তৃতা আয়োজন করেছিল, বিষয় ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন। ঈশ্বর প্রাণ বা মানুষের সৃষ্টি করেছেন, এই ধারণার পোশাকি নাম ছিল ক্রিয়েশনিজম। এখন সেটা বিজ্ঞানী মহলে উপহাসের পাত্র, তাই তার নতুন নাম হয়েছে ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন, কিন্তু সেটা একই রকম অবিজ্ঞান। ফেসবুকের বিজ্ঞানীরা যেমন ম্যাক্রোইভোলিউশন আর মাইক্রোইভোলিউশন নিয়ে ভারি ভারি পোস্ট করেন (আজকের যুগের ভাষায় হ্যাজ নামান), ইন্টালিজেন্ট ডিজাইনের প্রবক্তাদের বক্তব্যও তার থেকে উন্নত কিছু নয়। তাঁরা ফিরে যেতে চান যেই যুগে, যখন ঈশ্বরের ইচ্ছায় জগৎ চলত। বিবর্তন তত্ত্ব প্রকাশের পরে তা আর হওয়ার নয়, তাই ডারউইনের উপরে রাগ স্বাভাবিক।

তৃতীয় এক পক্ষ আছেন যাঁরা ডারউইনের তত্ত্বকে পুরাণের মধ্যে খুঁজে পান, যেমন আজকাল সব নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনকেই ধর্মগ্রন্থে বা পুরাণে পাওয়া যায়। অবশ্য কেন জানি না বিজ্ঞানীরা আবিষ্কারটি করার আগে ধর্মগ্রন্থে তার উল্লেখ সবসময়েই তাঁদের সকলের চোখ এড়িয়ে যায়। তবে বিবর্তনবাদের উপর সাম্প্রতিকতম আক্রমণের সঙ্গে তার খুব একটা সম্পর্ক নেই, তাই সেই আলোচনাতে গেলাম না। আগ্রহীরা মেঘনাদ সাহা ও অনিলবরণ রায়ের মধ্যে যে বিতর্ক হয়েছিল, সেই প্রবন্ধগুলি পড়ে নিতে পারেন।

ইতিহাস না পড়ালে ইতিহাস পাল্টে যাবে না, তেমনি বিবর্তনতত্ত্ব না পড়ালে তা মিথ্যা হয়ে যাবে না। কিন্তু ক্ষতি হবে আমাদের সমাজের, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের। প্রকৃতিকে চেনার সব থেকে বড় হাতিয়ার হল বিবর্তন তত্ত্ব, তা না জানলে মানুষ অন্ধ থেকে যাবে। তাতে কিছু সুবিধাভোগী মানুষের লাভ নিশ্চয়, দুর্ভাগ্যক্রমে তাঁরাই এখন আমাদের নীতিনিয়ন্তা। তাই প্রয়োজন আরো ব্যাপক মাত্রায় প্রতিবাদের, কারণ অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকবে না। পৃথিবী যখন এগিয়ে চলেছে, উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে 'ভ্রান্তিবিলাস সাজে না দুর্বিপাকে।'


 

 

পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সংঘ মহেশতলা আঞ্চলিক কমিটির পত্রিকা 'জীবনের সপক্ষে' আশ্বিন ১৪৩০ সংখ্যায় প্রকাশিত।  

Saturday, 5 August 2023

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ

 জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
    গত বছর আকাশে উড়েছিল জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, বা সংক্ষেপে ওয়েব। এর মূল নির্মাতা মার্কিন মহাকাশ সংস্থা ন্যাশনাল এরোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, সংক্ষেপে নাসা; তবে অন্য কিছু দেশও প্রকল্পের অংশীদার। অ্যাপোলো অভিযানের সময় নাসার অধিকর্তা জেমস ওয়েবের নামে এই দূরবিনটির নাম দেওয়া হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে প্রায় চোদ্দ বছর পরিশ্রম করে আটশো আশি কোটি ডলার (বা সত্তর হাজার কোটি টাকা) খরচ করে বানানো এই টেলিস্কোপ আমাদের সৃষ্টির আরো গোড়ার দিকের খবর এনে দেবে। সবে সে কাজ শুরু করেছে, ইতিমধ্যেই কিন্তু তার পাঠানো বেশ কিছু ছবি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই লেখাতে আমরা খুব সংক্ষেপে ওয়েবের গঠন ও তার কাছ থেকে আমরা কী আশা করছি সেই কথা জানব।


        ওয়েব হল মূলত অবলোহিত আলোর টেলিস্কোপ, যদিও দৃশ্য আলোর লাল ও কমলা আলোতেও সে কাজ করে। আলো হল তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ, তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বিভিন্ন রকম হতে পারে। খুব ছোট তরঙ্গদৈর্ঘ্য হলে আমরা তাকে বলি গামা রশ্মি, তারপর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা এক্স রশ্মি, অতিবেগুনি পেরিয়ে আসে দৃশ্য আলোতে। দৃশ্য  আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য হল চারশো থেকে সাতশো ন্যানোমিটার, তার মধ্যে বেশির দিকটা হল কমলা ও লাল রঙের আলো। সাতশো ন্যানোমিটারের থেকে বেশি কিন্তু এক মিলিমিটারের কম তরঙ্গদৈর্ঘ্য হলে তাকে আমরা বলি অবলোহিত বা ইনফ্রারেড  আলো; এরপর আসবে মাইক্রোওয়েভ ও রেডিও তরঙ্গ। অবলোহিত আলো আমরা চোখে দেখতে পাই না বটে, কিন্তু টের পাই। উনুনের কাছে হাত বাড়ালে যে তাপ অনুভূত হয়, তা অবলোহিত আলোর জন্য; বা বিজ্ঞানের ভাষায় বলে তাপীয় বিকিরণ হল অবলোহিত তরঙ্গ। অবলোহিত আলোর অস্তিত্ব আবিষ্কার হয়েছিল জ্যোতির্বিদ্যার সূত্রেই। 1800 সালে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী উইলিয়াম হার্শেল সৌর বর্ণালীর বিভিন্ন অংশে থার্মোমিটার রেখে উষ্ণতা বৃদ্ধি মাপছিলেন। তিনি দেখেছিলেন যে লাল আলোর পরে বর্ণালীর যেখানটা অন্ধকার, সেখানে উষ্ণতা বৃদ্ধি সব থেকে বেশি। এখন আমরা জানি এর মূলে আছে অবলোহিত রশ্মি। জেমস ওয়েব ছ'শো ন্যানোমিটার থেকে 28.5 মাইক্রোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে কাজ করে।
    উপরে যে ক'ধরনের তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের কথা বললাম তার সবগুলিই জ্যোতির্বিদ্যাতে কাজে লাগে। সবগুলির আলোচনা না করে আমরা শুধু অবলোহিত আলোর গুরুত্ব সম্পর্কে কয়েকটা কথা বলি। মহাকাশে আছে গ্যাস ও ধূলিকণার তৈরি বিশাল বিশাল মহাজাগতিক মেঘ; তাদের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে আলোর সময় লাগতে পারে কয়েকশো বছর। অবলোহিত আলোর জ্যোতির্বিদ্যা থেকে আমরা জানতে পারি এরা কী দিয়ে তৈরি। দূরের নক্ষত্র থেকে যখন আলো এই সব মেঘের মধ্যে দিয়ে আসে, তখন সেই মেঘের অণুগুলি তার থেকে অবলোহিত আলোর বা রেডিওতরঙ্গের কিছু তরঙ্গদৈর্ঘ্য শোষণ করে নেয়, ফলে সেই নক্ষত্রের আলোর বর্ণালীতে সেই জায়গাগুলি কালো দেখায়। কোন অণু কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে শোষণ করবে তা নির্দিষ্ট, তাই বর্ণালীর কোন জায়গাগুলো অন্ধকার তা দেখে আমরা মেঘ কী দিয়ে তৈরি জানতে পারি। আবার কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডল কী দিয়ে তৈরি, তাও এভাবে জানা সম্ভব।
    অবলোহিত জ্যোতির্বিদ্যার একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এই মহাজাগতিক মেঘের সঙ্গে যুক্ত। এই মেঘগুলি নিজের মাধ্যাকর্ষণে সংকুচিত হয়ে নক্ষত্রের জন্ম দেয়। একটা পাথরকে হাত থেকে ছেড়ে দিলাম, সে পৃথিবীর দিকে পড়বে। শুধু তাই নয়, পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বেগও বাড়বে। স্কুলে পড়েছি যে এই বেগ পরিবর্তনের হারকে বলে অভিকর্ষজ ত্বরণ। পাথরটা পৃথিবীর দিকে পড়ছে, কারণ পৃথিবীর আকর্ষণ। নিউটনের সূত্র অনুযায়ী সমস্ত বস্তুকণা এক অন্যকে আকর্ষণ করে। মহাজাগতিক কোনো মেঘের প্রতিটি অংশ এক অপরকে আকর্ষণ করছে, সুতরাং সে ক্রমশ ছোট হয়ে আসবে, অবশ্য যদি না তার বিপরীতে কোনো বল কাজ করে। পাথরটা যেমন পৃথিবীর যত কাছে যাচ্ছিল, তত তার বেগ বাড়ছিল, ঠিক তেমনি এই বিভিন্ন অংশগুলি যখন একে অপরের কাছে আসে, তাদের বেগ ক্রমশই বাড়তে থাকে। আমরা জানি যে তাপ হল গতিশক্তির রূপ, সুতরাং অংশগুলির বেগ বাড়ার অর্থ হল মেঘের মধ্যে তাপ উৎপন্ন হচ্ছে। এভাবে এক সময় সে এই উত্তপ্ত হয় যে তার মধ্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া শুরু হয়। বিক্রিয়া শুরুর আগের অবস্থাকে বলে প্রোটোস্টার বা আদ্যনক্ষত্র। আবার বাদামি বামন (Brown Dwarf) নামে এক শ্রেণির নক্ষত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের শক্তির মুখ্য উৎস হল মাধ্যাকর্ষণজনিত সংকোচন। আদ্যনক্ষত্র, বাদামি বামন বা গ্রহদের তাপমাত্রা অপেক্ষাকৃত কম, তারা দৃশ্য আলোতে বিশেষ বিকিরণ করে না, কিন্তু অবলোহিত আলোতে উজ্জ্বল দেখায়। তাই এদের সম্পর্কে জানার সব থেকে বড় হাতিয়ার হল অবলোহিত আলো। বিশেষ করে আমরা আশাতে আছি যে ধূলিকণার মেঘ ভেদ করে আসা অবলোহিত আলো বিশ্লেষণ করে আদি নক্ষত্রদের জন্মের খবর দেবে ওয়েব।
    বিশেষ করে প্রথম যুগের নক্ষত্রদের জন্মের সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল আছে। আমাদের মহাবিশ্বের বয়স হল মোটামুটি 1380 কোটি বছর, আমাদের অনুমান যে ব্রহ্মাণ্ডের জন্মের দশ কোটি বছরের মধ্যে প্রথম নক্ষত্রদের জন্ম হয়েছিল। সেই নক্ষত্ররা সম্ভবত ছিল অনেক বড়, এবং হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম দিয়ে তৈরি, কারণ তখনো পর্যন্ত সামান্য লিথিয়াম ছাড়া অন্য এই দুটি মৌলই মহাবিশ্বে ছিল। তারা খুব তাড়াতাড়ি তাদের জ্বালানি ফুরিয়ে ফেলে, এবং মৃত্যুর সময় বাকি ভারি মৌল তৈরি করে যা মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী কালের নক্ষত্রদের মধ্যের ভারি মৌলদের উৎস এই নক্ষত্রগুলি। কিন্তু এখনো আমরা এই সমস্ত নক্ষত্রদের সন্ধান পাইনি, আমাদের কাছের এই প্রাচীন নক্ষত্ররা অনেকদিন মৃত। তাদের সন্ধান করতে হবে অনেক দূরের মহাকাশে, কারণ সেখান থেকে আলো এসে আমাদের টেলিস্কোপে ধরা দিতে অনেক সময় নেবে। আমরা আশাতে আছি যে ওয়েব আমাদের প্রথম যুগের নক্ষত্রদের সন্ধান দেবে, এবং তার থেকে আমরা গ্যালাক্সিদের সৃষ্টি সম্পর্কেও জানতে পারব।     অপর এক কারণে দূরের খবর পেতে গেলে অবলোহিত আলোর টেলিস্কোপ বেশি কাজে দেয়। আমরা জানি যে আমাদের মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে, গ্যালাক্সিরা একে অন্যের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। স্কুলে ডপলার ক্রিয়ার কথা পড়েছি; কোনো তরঙ্গ উৎস যখন আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তখন আমাদের কাছে তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেড়ে যায়। দূরের গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোর ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে, ফলে যে আলো দৃশ্য আলো হিসাবে যাত্রা শুরু করেছিল, সে আমাদের কাছে অবলোহিত আলো হিসাবে এসে পৌঁছোচ্ছে। 

 
    কিন্তু অবলোহিত আলোর জ্যোতির্বিদ্যার কিছু সমস্যা আছে। আমাদের পৃথিবীর মাটিতে সবরকমের অবলোহিত আলো এসে পৌঁছোয় না, কারণ বায়ুমণ্ডল তাকে শোষণ করে নেয়। নিচের ছবিটাতে আমাদের বায়ুমণ্ডল অবলোহিত আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে কতটা মাটি পর্যন্ত পৌঁছোতে দেয় সেটা দেখানো হয়েছে। যেমন দেখা যাচ্ছে চোদ্দ থেকে ষোল মাইক্রনের মধ্যে কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যই এসে পৌঁছায় না, কার্বন ডাই অক্সাইড তার সবটাই শোষণ করে নেয়।  মূলত জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই অক্সাইড, ওজোন এই গ্যাসগুলি অবলোহিত আলোকে শোষণ করে।
     জ্যোতির্বিদ্যার পক্ষে এই শোষণ বিশেষ অসুবিধাজনক। বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলে যে সমস্ত অণু আছে, তাদের কথা ধরা যাক। আমরা কোনো দূরের গ্রহের বায়ুমণ্ডলে জল আছে কিনা জানতে চাই, কারণ তা প্রাণ সৃষ্টির সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু আমাদের বায়ুমণ্ডলের জলের অণুরা তাদের নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে শোষণ করবেই। ফলে বায়ুমণ্ডলের নিচে বসে ওই সমস্ত অণু দেখা সম্ভব নয়, তার জন্য আমাদের বায়ুমণ্ডলকে যতটা সম্ভব পেরিয়ে যেতে হবে। সে জন্য আগে পাহাড়ের উপরে শুষ্ক জায়গাকে অবলোহিত আলোর পর্যবেক্ষণের জন্য পছন্দ করা হত। স্বাভাবিকভাবেই মহাকাশে টেলিস্কোপ বসাতে পারলে সব থেকে ভালো হয়। এই সমস্ত কারণেই ওয়েব নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
    টেলিস্কোপ যত বড় করা যায় তত ভালো। দূরবিনে যে প্রতিসারক বা প্রতিফলক, অর্থাৎ লেন্স বা আয়না ব্যবহার করা হয়, তার মুখের খোলা অংশকে বলে উন্মেষ (Aperture)। দূরবিন ব্যবহারের একটা বড় কারণ হল তার আলো সংগ্রহ করার ক্ষমতা। উন্মেষের ক্ষেত্রফল তার ব্যাসের বর্গের সমানুপাতে বাড়ে। ক্ষেত্রফল যত বেশি হয়, তত বেশি জায়গা থেকে আলো নিয়ে এসে ফোকাস করা হয়। ফলে তত অনুজ্জ্বল জ্যোতিষ্ককে টেলিস্কোপে দেখা যায়। সেই কারণে খুব সাধারণ টেলিস্কোপ বা বাইনোকুলারেই খালি চোখে অদৃশ্য নক্ষত্রদের দেখতে পাওয়া যায়।
    দূরবিনের আর একটা বড় ধর্ম হল বিভেদন। আলো ব্যবহার করে যে কোনো যন্ত্রে কত ছোট কোণ মাপা যায়, তার একটা সীমা আছে, তাকেই বলে বিভেদন। আলোর তরঙ্গধর্ম থেকে প্রমাণ করা যায় যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি l এবং যে যন্ত্র দিয়ে আলো দেখছি তার উন্মেষের ব্যাস d হলে
    যন্ত্রের বিভেদন = 252000 X l/d
বিভেদনের মাপটা এখানে সেকেন্ডে দেওয়া আছে। এই সেকেন্ড হল কোণের মাপ। দেখা যাচ্ছে দূরবিন যত বড় হয়, বিভেদন তত কমে, অর্থাৎ তত নিখুঁত কোণ মাপা যায়। এটা খুব জরুরি বিষয় কারণ এর ফলে আমরা আকাশে কোনো জ্যোতিষ্কের অবস্থান নিখুঁতভাবে মাপতে পারি বা দুটো কাছাকাছি জ্যোতিষ্ককে আলাদা আলাদা ভাবে দেখতে পারি। যে আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য যত বেশি, তার বিভেদন তত খারাপ। রেডিও তরঙ্গের তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনেক বড় বলে রেডিও টেলিস্কোপে বিশাল বিশাল ডিশ ব্যবহার করা হয়। বিভেদন কমানোর অন্য অনেক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়, কিন্তু সেই আলোচনাতে আমরা এই লেখাতে যাব না। কিন্তু একটা বিষয় সহজেই বোঝা যায়, অবলোহিত আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য সাধারণ দৃশ্য আলোর থেকে অনেক বড়, তাই তার জন্য বড় উন্মেষ দরকার। এমন নয় যে ওয়েব মহাকাশে পাঠানো প্রথম অবলোহিত টেলিস্কোপ, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে সব থেকে বড়। আগে এই রেকর্ড ছিল হার্শেল টেলিস্কোপের দখলে, ওয়েবের আয়নার 6.5 মিটার ব্যাস হার্শেলের তুলনায় প্রায় দুগুণ।
    ওয়েবের বর্ণনাতে যাওয়ার আগে খুব সংক্ষেপে টেলিস্কোপ সম্পর্কে আরো দু'একটা সাধারণ কথা বলে নিই। দুরবিন দু'ধরনের হয়। প্রতিসারক দূরবিনে লেন্স ব্যবহার করা হয়, আর প্রতিফলক দূরবিনে তার জায়গায় থাকে বক্রতল আয়না। বিভিন্ন কারণে দ্বিতীয়টা বানানো অনেক সহজ, তার সুবিধাও অনেক বেশি। একটা সুবিধা খুব সহজেই বোঝা যায়। আমরা সবাই জানি যে প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আলো গেলে সে নানা রঙে (অর্থাৎ নানা তরঙ্গদৈর্ঘ্যে) ভেঙে যায়। তার কারণ হল বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর প্রতিসরাঙ্ক এক নয়। তাই লেন্সে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোর ফোকাস দৈর্ঘ্য আলাদা আলাদা। একে বলে বর্ণাপেরণ (Chromatic aberration)। বিভিন্ন রঙের আলো বিভিন্ন বিন্দুতে ফোকাস হয় বলে প্রতিবিম্ব ঝাপসা দেখায়। আয়নাতে এই সমস্যা নেই, তাই সমস্ত আধুনিক বড় দূরবিনে আয়না ব্যবহার করা হয়। এই বক্রতল আয়নার আকার হল অধিবৃত্তাকার (Paraboloid), তার ফলে ফোকাস আরো ভালো হয়।
    ওয়েবের আলোক সংবেদন ক্ষমতা হাবল স্পেস টেলিস্কোপের একশো গুণ। আমরা আশা করছি যে মহাবিশ্বের জন্মের কুড়ি কোটি বছর পরের খবর সে দেবে। মূল আয়নাটি (primary mirror) আঠারোটি ষড়ভুজ দিয়ে তৈরি, আয়নাদের হালকা করার জন্য বেরিলিয়াম ধাতুর উপর পাতলা সোনার আস্তরণ দিয়ে তৈরি হয়েছে। ফলে হাবলের থেকে অনেক বড় হলেও ওয়েবের ভর হাবলের অর্ধেক। গতবছর 25 ডিসেম্বর ফরাসি গায়না থেকে এরিয়ে-5 রকেটে সে যাত্রা শুরু করেছিল, রকেটের মধ্যে ধরানোর জন্য আয়নাটা ভাঁজ করে রাখা ছিল, মহাকাশে যাওয়ার পরে তাকে খোলা হয়েছে। জেমস ওয়েবকে বসানো হইয়েছে পৃথিবী থেকে পনের লক্ষ কিলোমিটার দূরে, আমাদের যেদিকে সূর্য তার উল্টোদিকে। টেকনিকাল ভাষায় এই অবস্থানকে বলে L2 বা দ্বিতীয় লাগ্রাঞ্জ বিন্দু, এখানে যে কোনো বস্তু পৃথিবীর সঙ্গে সমানতালে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এত দূরে পৃথিবী বা চাঁদের ছায়া তার উপর বিশেষ পড়বে না, তার ফলে তাপমাত্রার বিশেষ হেরফের হবে না। সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাপমাত্রা পরিবর্তনের জন্য আয়নার মাপের পরিবর্তন হতে পারে। যন্ত্রপাতি সমস্ত সৌরশক্তি চালিত, কিন্তু সূর্যের আলো এবং পৃথিবী ও চাঁদের তাপীয় বিকিরণ তার অবলোহিত আলোর পর্যবেক্ষণে বাধা দেবে। তাই ওয়েবের একদিকে রয়েছে টেনিস কোর্টের মতো বড় একটা সানশিল্ড, টেলিস্কোপকে এই তিন জ্যোতিষ্ক থেকে সে ঢেকে রাখে।
    অবলোহিত টেলিস্কোপের তাপমাত্রা কম রাখাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা না হলে টেলিস্কোপ থেকে যে তাপীয় বিকিরণ বেরোয় তা মহাকাশের বিকিরণ পর্যবেক্ষণে বাধা সৃষ্টি করে। তাপমাত্রা কমালে সেই বিকিরণ কমে। অন্যন্য টেলিস্কোপে শীতলীকরণের জন্য তরল হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম ব্যবহার করা হয়, কিন্তু মহাকাশে সেই পদ্ধতি নিলে দূরবিন কিছুদিন পরে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে যায়। যেমন হার্শেল টেলিস্কোপের তরল হিলিয়াম শেষ হওয়ার ফলে সে চার বছরের বেশি চলেনি। ওয়েবের ক্ষেত্রে শীতলীকরণের জন্য তরল গ্যাস নয়, সানশিল্ড, রেডিয়েটর ও যান্ত্রিক কুলার ব্যবহার করা হয়েছে।
    ওয়েব আছে দৃশ্য আলোর কাছাকাছি তরঙ্গদৈর্ঘ্যের অবলোহিত আলোর (Near infrared)  জন্য একটি ক্যামেরা ও একটি বর্ণালী বিশ্লেষণ, অন্য তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য আরো দুটি যন্ত্র। নতুন মাইক্রোশাটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে একসঙ্গে অনেকগুলি জ্যোতিষ্ক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওয়েব সবে পূর্ণ শক্তিতে কাজ শুরু করেছে। নিচে  কয়েকটা ছবি থেকে  দেখানো হল, এর থেকে ওয়েবের ক্ষমতা সম্পর্কে একটু ধারণা হয়তো পাওয়া যাবে। বিজ্ঞানীরা এখন ওয়েব থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে ব্যস্ত। আশা করা যায় কিছুদিনের মধ্যেই  অনেক নতুন চমকপ্রদ খবর পাওয়া যাবে, যা আমাদের মহাবিশ্বকে জানতে চিনতে সাহায্য করবে।


সৌরজগতের বাইরের গ্রহে জলের উপস্থিতি

নেপচুনের বলয়


(লেখাটি মুক্তমন পত্রিকার ডিসেম্বর ২০২২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে। সমস্ত আলোকচিত্র নাসার ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া হয়েছে। )


















Thursday, 23 March 2023

বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাঃ সমস্যা ও প্রতিকার

বিজ্ঞান শিক্ষা ও গবেষণাঃ সমস্যা ও প্রতিকার

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

একটা কথা আমরা সবাই বহুবার শুনেছি, বিজ্ঞান কোনো বিষয় নয়, তা হল বিশ্বজগৎ সম্পর্কে জানার এক পদ্ধতি। নিঃসন্দেহে আমাদের চারপাশের জগৎকে জানার আরো পদ্ধতি আছে, বিজ্ঞান তাদের সকলের থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র। তার কারণ বিজ্ঞান বাস্তবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে, প্রকৃতি থেকে তত্ত্ব নিয়ে তত্ত্ব রচনা করে, পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ না করে কোনো পূর্বানুমান চাপিয়ে দেয় না। এ সবই হল বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য। বৈজ্ঞানিক গবেষণা মাত্রেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করে সে কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু শেষ বিচারে সেই গবেষণাই সফল হয় যার এই বৈশিষ্ট্যগুলি আছে। স্বাভাবিক ভাবেই বিজ্ঞানে পরীক্ষানিরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে এই নয় যে বিজ্ঞানে তত্ত্বের কোনো জায়গা নেই বা তার স্থান দ্বিতীয় সারিতে। তবে যে তত্ত্ব পরীক্ষার ফলের সঙ্গে মিলবে না, তাকে হয় বাতিল করতে হবে নয়তো তার পরিবর্তন করতে হবে। আধুনিক কালে বিজ্ঞানের কোনো কোনো শাখাতে তথ্যের পরিমাণ বিপুল বৃদ্ধি পেয়েছে, উদাহরণ স্বরূপ জ্যোতির্বিদ্যা বা জিনতত্ত্বের কথা বলা যেতে পারে। এই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের জন্য নানা নতুন পদ্ধতি প্রকরণ উদ্ভাবন করতে হয়েছে।

বুঝতে অসুবিধা নেই যে বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে হাতে কলমে শিক্ষা বা পর্যবেক্ষণের বিষয়টা ভীষণই অবহেলিত। বিদ্যালয় স্তরে পাঠক্রমে থাকলেও বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরির পাট নেই বললেই চলে। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় স্তরেও ল্যাবরেটরি ক্লাস গতানুগতিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। বিজ্ঞানের আধুনিকতম বিষয়গুলিকে সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে শিক্ষক শিক্ষিকাদের খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না, তাঁদের অধিকাংশই ক্লাস নেওয়া ও প্রশাসনিক কাজে এতই ভারাক্রান্ত যে ল্যাবরেটরিতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি আলাদা করে খেয়াল রাখার সুযোগ তাঁদের থাকে না। অর্থাভাবে ল্যাবরেটরির অবস্থাও সঙ্গিন; সেখানে নতুন যন্ত্র কেনা দূরের কথা, কোনো একটি যন্ত্র খারাপ হলে সারানোর বা পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে না। ফলে একদম বাঁধা পথের বাইরে যাওয়াকে বাধ্য হয়েই নিরুৎসাহ করতে হয়। প্রয়োজন ল্যাবরেটরিগুলির আধুনিকীকরণ, হাতে কলমে বিজ্ঞান শিক্ষার উপরে জোর দেওয়া, মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে সমস্যার সমাধানের উপর জোর দেওয়া। তার জন্য শিক্ষাখাতে বরাদ্দ অনেক বাড়ানো দরকার, যেখানে আমরা শুধু উন্নত নয়, অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের থেকেও অনেক পিছিয়ে।

আমার মতে এই সমস্যার মূল আরো গভীরে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর এ হিস্ট্ররি অফ হিন্দু কেমিস্ট্রি বইতে আমাদের দেশে বিজ্ঞানের অধোগতির কারণকে সঠিকভাবেই নির্দেশ করেছিলেন। হাতের কাজকে অবজ্ঞা করে চিন্তাকে প্রাধান্য দেওয়ার মাধ্যমে পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণকে অবহেলা করা হয়েছে যা স্পষ্টতই বিজ্ঞানের পরিপন্থী। শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ শিক্ষা দেয় এই জগৎ মিথ্যা, তাই সেই মিথ্যা সম্পর্কে কষ্ট করে জ্ঞানার্জনের প্রয়োজন কী? পাশ্চাত্য সমাজও এই দুই আবর্তের মধ্যে পড়েছিল, রেনেশাঁস ও সপ্তদশ শতকের বিজ্ঞানের বিপ্লব সেখান থেকে বিজ্ঞান চর্চাকে বার করে এনেছিল। আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য যে এখানে সেই রকম কোনো বিপ্লব হয়নি, ফলে আমাদের বিজ্ঞান অবিজ্ঞানের সঙ্গে আপোস করেই চলছে। আলাদা করে উদাহরণ দেয়ার দরকার নেই, প্রতিদিন আমরা আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেই তা দেখতে পাচ্ছি। তাই কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারদের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষার গুরুত্ব বিশেষ নেই; পক্ষান্তরে বেসরকারি পুঁজির কাছে তা একমাত্র মুনাফার ক্ষেত্র। নতুন জাতীয় শিক্ষানীতির মতো শিক্ষাবিরোধী বিজ্ঞানবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে সেইরকম প্রতিবাদ আমরা করতে পারিনি। বিজ্ঞান যদি বইয়ের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে, সমাজ যদি তাকে প্রয়োজনীয় না মনে করে, তাহলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

এই সমস্যা থেকে বেরোবার উপায় কী? বৃহত্তর সমাজ বিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি না করলে এর সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের বুঝতে হবে একবিংশ শতাব্দীর সমস্যার সমাধান পাঁচশো হাজার বা দুহাজার বছরের পুরানো দর্শনে, বইতে বা সংস্কারে খুঁজে পাওয়া যাবে না, তার জন্য প্রয়োজন আধুনিক পদ্ধতি যা একমাত্র বিজ্ঞান প্রযুক্তি দিতে পারে। নানা বিজ্ঞান সংগঠন এই উদ্দেশ্যে কাজ করছে, কিন্তু প্রয়োজনের পক্ষে তা নিতান্ত অপ্রতুল। এখানে শুধু শিক্ষক নয়, সমাজের সমস্ত অংশকে ভূমিকা নিতে হবে।

সমাজের মানসিকতা পরিবর্তন নিঃসন্দেহে সময়সাপেক্ষ, কিন্তু তাছাড়াও অনেক কিছু করার আছে। বর্তমানে আমাদের দেশে একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীক্ষাতে সাফল্য। তার উপরে জয়েন্ট, নিট, ইত্যাদি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শিক্ষার কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁততে উদ্যত। প্রথমত সেখানে হাতে কলমে কাজের উপরে কোনো গুরুত্বই নেই। বিজ্ঞানের প্রধান হাতিয়ারই সেখানে অবহেলিত। দ্বিতীয়ত, প্রতিযোগিতার বাজারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জায়গা নিচ্ছে কোচিং ক্লাস ও গৃহশিক্ষকতা। এগুলি যে আগে ছিল না, তা নয়, এবং তখনো তারা প্রকৃত শিক্ষার পরিপন্থী ছিল। তার কারণ দু'একটি ব্যতিক্রম থাকলেও সাধারণভাবে এই ধরনের শিক্ষণের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় পরীক্ষাতে নাম্বার পাওয়া, শিক্ষা সেখানে গৌণ। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষাতে এগুলি বর্তমানে প্রায় সর্বব্যাপী হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নের ক্ষেত্রে সমাধানের পরিবর্তে কেমন করে মুখস্থবিদ্যা বা নানা শর্টকাটের সাহায্যে সমস্যার গভীরে না ঢুকে উত্তর খুঁজে বার করা যায় সেটাই শেখানো হচ্ছে। এই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তাই প্রায়শই সৃজনশীলতা দেখতে পাওয়া যায় না, বিজ্ঞানমনস্কতাও খুঁজে পাওয়া যায় না।

এই সমস্যা অবশ্য নতুন নয়, তবে বর্তমানে তার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। মূলগতভাবে এটিও সামাজিক সমস্যা; শিক্ষান্তে চাকরির সংখ্যা ক্রমশ কমছে, এবং চাকরি পেলেও প্রায়শই তার বেতন খুবই কম। এই ধরনের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাতে সাফল্য জীবনে প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত করতে পারে। তাই বিপুল সংখ্যায় ছাত্রছাত্রী এই সমস্ত পরীক্ষাতে বসছে। ফলে পরীক্ষার অন্য কোনো পদ্ধতির কথা চিন্তা করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে বিজ্ঞানের ক্লাসে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ক্রমশই কমছে। অবিলম্বে আমাদের শিক্ষা ও পরীক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন প্রয়োজন যাতে করে ছাত্রছাত্রীরা আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে আসে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিশাল সংখ্যক শূন্য পদ পূরণ না করে তা সম্ভব নয়। কিন্তু তার জন্যেও প্রয়োজন সরকারি সাহায্য, যা বাড়ার বদলে ক্রমশ কমছে।

গবেষণার জগতের কছে আমাদের আশা ছিল বেশি, কিন্তু সেখানেও গতানুগতিকতাই মুখ্য হয়ে দঁড়িয়েছে। আমাদের ছাত্রছাত্রীদের আমরা নতুন পথে যেতে উৎসাহী করি না, কারণ সেখানে বাধাবিপত্তি অনেক। পদোন্নতি, নতুন প্রকল্পের জন্য অর্থ অনুমোদন ইত্যাদির বিচারে গবেষণার মানের জায়গা নিয়েছে গবেষণাপত্রের সংখ্যা। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ বেড়েছে, আমাদের বিজ্ঞানীরা অনেক বেশি সংখ্যক আন্তর্জাতিক প্রকল্পে অংশ নিতে পারছেন। এটা নিঃসন্দেহে সদর্থক দিক। কিন্তু দেশে গবেষণা খাতে সরকারি বরাদ্দ ক্রমশই কমছে, বেসরকারি পুঁজিও কয়েকটি সীমিত ক্ষেত্র ছাড়া অর্থলগ্নিতে উৎসাহী নয়। ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা দেশে কাজ লাগানো যাচ্ছে না। বেসরকারি ক্ষেত্রের কছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হয়তো দুরাশা, কিন্তু সরকারও যে সমস্ত গবেষণাতে আশু লাভ তার বাইরে কিছুতে উৎসাহী নয়। এর ফলে বিজ্ঞান গবেষণা তো পিছিয়ে পড়ছেই। নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনও সম্ভব হচ্ছে না, সেখানেও বাঁধা পথের বাইরে চলাকে উৎসাহ দেওয়া হয় না। উচ্চশিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সংখ্যাও ক্রমশ কমছে, ফলে প্রথম থেকেই মৌল বিজ্ঞান পাঠেই ছাত্রছাত্রীদের অনীহা দেখা যায়; তাদের মধ্যেও যে ক'জন গবেষণাতে আসে, তারা প্রায়ই হতাশাতে ডুবে যায়। সবসেরা প্রতিষ্ঠানগুলিতেও তাই আত্মহত্যার কথা প্রায়ই শোনা যায়। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলি মনোবিদদের সাহায্য নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু তা মূল রোগ নয়, শুধুমাত্র উপসর্গের চিকিৎসা করতে পারে।

প্রতিবেশী দেশ চিনের দিকে তাকালে আমরা হয়তো এই সমস্যা সমাধানের কিছু দিশা পেতে পারি। তিরিশ বছর আগেও চিন নিঃসন্দেহে বিজ্ঞান গবেষণাতে ভারতের থেকে পিছিয়ে ছিল। কিন্তু সে দেশের সরকার বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে দেশের ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞান শিক্ষা-গবেষণাতে উৎসাহিত হয়েছে, এবং সরকারি ক্ষেত্রও তাদের কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। তৃতীয় বিশ্ব তো বটেই, এমনকি পশ্চিমী উন্নত দেশ থেকেও এখন গবেষকরা চিনের গবেষণাগারগুলিতে জায়গা পাচ্ছেন। ফলে এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিন আমাদের থেকে অনেকদূর এগিয়ে গেছে এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখাতে একদম প্রথম সারিতে জায়গা করে নিচ্ছে।

শেষে একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার কথা বলি। আমাদের সেরা প্রতিভাগুলি রয়েছে কেন্দ্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যেখানে বেতন ও গবেষণার সুযোগসুবিধা অপেক্ষাকৃত বেশি; কিন্তু সেখানে মুষ্টিমেয় ছাত্রছাত্রীর প্রবেশাধিকার আছে। পৃথিবীর সমস্ত উন্নত দেশে গবেষণাতে নেতৃত্ব দেয় বিশ্ববিদ্যালয়, ভুললে চলবে না আমাদের দেশেও জগদীশচন্দ্র, রামন, মেঘনাদ, সত্যেন্দ্রনাথ সকলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় তাঁদের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজগুলি করেছিলেন, এবং সমতুল্য কোনো কাজ আজ পর্যন্ত দেশের কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠানে হয়নি। স্বাধীনতার পরে নেহরু-ভাভা মডেলে আমাদের দেশে বিজ্ঞান গবেষণা কয়েকটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। হয়তো সদ্য স্বাধীন দেশের পক্ষে সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়কে সাহায্য করা সম্ভব ছিল না, কিন্তু সেই আপতকালীন ব্যবস্থাই স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছর পরে নিয়মে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা প্রায়শই গর্ব করি যে ভবিষ্যৎ আমাদের, কারণ আমাদের দেশ তরুণদের দেশ। কিন্তু সেই তরুণদের বৃহত্তর অংশকে আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা থেকে দূরে রেখে আমরা কিছুতেই উন্নত দেশের সারিতে পৌঁছাতে পারব না।

 

প্রকাশঃ স্মরণিকা, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় স্মারক বিজ্ঞান মেলা ও প্রদর্শনী, ২০২৩