Thursday, 1 January 2026

জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার: শ্রদ্ধাঞ্জলি

 

জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার: শ্রদ্ধাঞ্জলি

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


গত ১৯ জুলাই প্রয়াত হয়েছেন বিখ্যাত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী জয়ন্ত বিষ্ণু নারলিকার। তবে শুধুমাত্র বিজ্ঞান নয়, একই সঙ্গে বহু ভিন্ন ভিন্ন দিকে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন নারলিকার; এমন মানুষ এখন বিরল। এই লেখাতে আমরা তাঁর জীবনের নানা দিক সংক্ষেপে ফিরে দেখব। তাঁর বিজ্ঞান গবেষণা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ এই প্রবন্ধে নেই, তার জন্য অনেক বড় পরিসর এবং আমার থেকে অনেক যোগ্যতর ব্যক্তির প্রয়োজন। তাই কিছু কিছু অপেক্ষাকৃত সহজবোধ্য বিষয়ের মধ্যেই বিজ্ঞান আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে। নারলিকার নিজেকে বলেছেন 'ডেভিলস অ্যাডভোকেট', তাঁর সেই ভূমিকার কথাও আসবে।

* * *

জয়ন্ত বিষ্ণুর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৯ জুলাই বর্তমান মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে, তখন সেটি ছিল দেশীয় রাজ্য। সেখানেই তাঁর পিতৃকুল ও মাতৃকুলের বংশানুক্রমিক বসবাস, কিন্তু বাবার কর্মসূত্রে ছোটবেলা থেকেই তিনি বেনারসে। বাবা বিষ্ণু বাসুদেব নারলিকার ছিলেন পদার্থবিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ; তিনি কেমব্রিজে গণিত নিয়ে পড়েছিলেন। সেখানে তিনি ছিলেন আইজ্যাক নিউটনের নামাঙ্কিত ছাত্র, তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন আর্থার এডিংটন, জোসেফ লার্মার প্রমুখ জগৎবিখ্যাত বিজ্ঞানীরা। ছাত্র বিষ্ণু বাসুদেবকেই পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য তাঁর প্রতিষ্ঠিত নতুন বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। পড়া শেষ করে দেশে ফিরে বিষ্ণু বাসুদেব সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের সূচনা করেন।

জয়ন্তের মায়ের পরিবারও ছিল উচ্চ শিক্ষিত। মা সুমতি ছিলেন সংস্কৃতে এম এ। এক মামা বসন্ত শঙ্কর হুজুরবাজার কেমব্রিজ থেকে ডক্টরেট করে পরিসংখ্যাবিদ্যাতে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন; তিনি পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যানবিদ্যা বিভাগের সূচনা করেন, জীবনের শেষ পনের বছর কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন। তবে জয়ন্তের জীবনে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন অপর এক মামা, তাঁর কথা পরে আসবে।

জয়ন্তের জীবনে বেশ কয়েকজনের গভীর প্রভাব আছে; তাঁদের মধ্যে প্রথমেই আসবেন তাঁর বাবা ও মায়ের নাম। বিজ্ঞান গবেষণার পথ বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তের পিছনে তাঁর বাবার বিশেষ ভূমিকা আছে, নারলিকার সে কথা বারেবারেই বলেছেন। অধ্যাপক বাবা ছেলের উপর কিছু চাপিয়ে দিতেন না। জয়ন্ত তাঁর তৃতীয় শ্রেণির এক গল্প বলতেন। এক শিক্ষক সব ছাত্রদের বাবারা কী করেন জিজ্ঞাসা করলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের স্কুল, সহপাঠীদের অনেকেই ছিল অধ্যাপকদের ছেলে, তারা তাদের বাবারা কোন বিষয়ে পড়ান সে কথা বলে। জয়ন্ত শুধু জানতেন বাবা প্রফেসর, তাই বললেন। শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন কোন বিষয়ের? জয়ন্ত জানেন না। শিক্ষক বললেন, 'তোমার বাবা অঙ্কের শিক্ষক।' জয়ন্ত খুব খুশী হলেন, অঙ্কই ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়।

গণিতের পরেই তাঁর দুই প্রিয় বিষয় ছিল পদার্থবিদ্যা ও সংস্কৃত, তবে পদার্থবিদ্যার পাঠক্রমে তিনি বিশেষ চ্যালেঞ্জ খুঁজে পাননি। সংস্কৃতের প্রতি ভালোবাসার পিছনে ছিলেন মা সুমতি, তিনি জয়ন্তকে কালিদাস ও ভবভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমরা দেখব সেই সংস্কৃতজ্ঞানও তাঁর কাজে লেগেছিল। আরো একজন তাঁর উপরে গভীর প্রভাব ফেলেন, তিনি জয়ন্তের মোরুমামা, পরবর্তীকালে মুম্বাইয়ের ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সের অধিকর্তা মোরেশ্বর শঙ্কর হুজুরবাজার। তিনি এমএসসি পড়ার জন্য বেনারসে এসে জয়ন্তদের বাড়িতে থাকতেন, জয়ন্ত তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বাড়ির দেওয়ালে ছিল দুটো ব্ল্যাকবোর্ড। মোরুমামা এসে প্রথম দিনেই একটা বোর্ডে জয়ন্তের জন্য একটা অঙ্ক লিখে দিলেন। জয়ন্ত অনেক চেষ্টা করে সেটার সমাধান করলেন, পরের দিন বোর্ডে নতুন অঙ্ক দেখা দিল। এভাবে চলল এক নতুন খেলা, অঙ্কটা কষতে পারলে জয়ন্ত জিততেন, না পারলে মোরুমামা।

গণিতের ভারতীয় দিকপালরা অনেকেই জয়ন্তদের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসতেন। বিষ্ণু বাসুদেবের সঙ্গে নিখিলরঞ্জন সেন, অমিয়চরণ ব্যানার্জি, রাম বিহারী বা বৈদ্যনাথস্বামীর আলোচনা শুনে জয়ন্ত অঙ্ক শেখেননি, কিন্তু বিষয়টার প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। ‘Men of Mathematics’, ‘The World of Mathematics’, ‘Living Biographies of Great Scientists’ ইত্যাদি বইও অঙ্কের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের কথাও জয়ন্ত সারা জীবন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। মোরুমামাও খেলার ছলে জয়ন্তকে সংস্কৃত ব্যাকরণের নানা দিক শিখিয়েছিলেন।

দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় জয়ন্ত পিথাগোরাসের উপপাদ্যের এক সংক্ষিপ্ত প্রমাণ আবিষ্কার করেছিলেন। স্কুলের পরীক্ষাতে সেটা লিখে পুরো নাম্বার পেয়েছিলেন; শিক্ষক ডেকে তাঁর পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ছাত্রকে সাবধান করে দেন, বোর্ডের পরীক্ষাতে নতুন কিছু না লেখাই বুদ্ধিমানের কাজ। পরীক্ষককে অনেক খাতা দেখতে হয়; তিনি চেনা ছবিটা না দেখতে পেলেই শূন্য বসিয়ে দিতে পারেন। গবেষণাও খুব মৌলিক হলে বা প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে গেলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে -- এই সমস্যার মুখোমুখি জয়ন্ত বারবার হয়েছেন। আমরা দেখব যে ঘটনাচক্রে তিনি এমন একজনের সঙ্গে গবেষক জীবন শুরু করেন, যিনি সব অর্থেই মৌলিক ও কালাপাহাড়। সেই ব্যক্তিটি হলেন ফ্রেড হয়েল, নারলিকারের জীবনে তাঁর প্রভাব অপরিমেয়।

ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পরে গণিত নিয়েই যে জয়ন্ত পড়বেন তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না। বেনারস বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে ভর্তি হলেন এবং শীর্ষস্থান অধিকার করলেন। এবার লক্ষ্য বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাবারই পুরানো কলেজ কেমব্রিজের ফিজউইলিয়াম হাউস। জামসেদজি টাটা এনডাওমেন্ট ফান্ডের বদান্যতায় আর্থিক সমস্যার সমাধান হল। তখন কেমব্রিজ থেকে ফিরে ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসে যোগ দেওয়াই ছিল রীতি, কিন্তু দেশ ছাড়ার আগে থেকেই জয়ন্ত গবেষণা করতেই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ১৯৫৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর নারলিকার জাহাজে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

কেমব্রিজের বিখ্যাত পরীক্ষা হল ট্রাইপস। গণিতে সে সময় তার জন্য তিনটি পরীক্ষা দিতে হত। প্রথম পরীক্ষাটি ছিল নিতান্তই প্রাথমিক স্তরের, কিন্তু পরের পরীক্ষাটিতে গণিতের নানা বিষয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের প্রয়োজন হত। নারলিকারের কাছে দ্বিতীয় স্তরটি বেশ কঠিনই লেগেছিল। বেনারসে যে বিষয় এক বছর ধরে পড়ানো হত, কেমব্রিজে সেটি দু' মাসে শেষ করতে হল। মোরুমামার কাছে পাওয়া সমস্যা সমাধানের তালিম এইসময় তাঁর বেশ উপকারে এসেছিল।

তৃতীয় বছর কয়েকটি বিশেষ বিষয় নিয়ে উচ্চতর পাঠ করতে হয়, তাই দ্বিতীয় বছরের পড়া তৈরির সঙ্গে সঙ্গে সেই নিয়ে চিন্তা করছিলেন নারলিকার। লাইব্রেরি থেকে ‘Nature of the Universe’ এবং ‘Frontiers of Astronomy’, এই দুটি বই সংগ্রহ করলেন তিনি। দুটিরই লেখক ফ্রেড হয়েল। হয়েলের কাছে তিনি দ্বিতীয় বছরে তড়িৎচৌম্বক তত্ত্ব পড়েছিলেন। সারা পৃথিবীতে এই বিষয় পড়ানো শুরু হয় কুলম্বের সূত্র থেকে, শেষ হয় ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণে। হয়েল পুরো বিষয়টাকে উল্টে দিয়ে শুরু করেছিলেন ম্যাক্সওয়েলের সমীকরণ থেকে। প্রথম শুধু ছাত্র নয়, তাদের শিক্ষকদের মধ্যেও বেশ বিভ্রান্তি সৃষ্টি হলেও হয়েলের যুক্তি পরে সকলের কাছে স্পষ্ট হয়েছিল। হয়েলের বই পড়ে নারলিকার তৃতীয় বছরে জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। জ্যোতির্বিদ্যাতে হয়েল পড়াতেন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ ও বিশ্বতত্ত্ব। পরীক্ষাতে ভালোই করলেন নারলিকার, পেলেন টাইসন পদক। বিষ্ণু বাসুদেব তিরিশ বছর আগে একই পদক পেয়েছিলেন, মাঝের বছরগুলিতে কোনো ভারতীয় সেই পদক পাননি। কলেজ ধরেই নিয়েছিল তিনি হয়েলের কাছেই গবেষণা করবেন, তাই সেই অনুযায়ী হয়েলের সঙ্গে দেখা করার তারিখ ও সময় নারলিকারকে জানিয়ে দেওয়া হল।

ফ্রেড হয়েল সেই সময় কেমব্রিজের অন্যতম বিখ্যাত বিজ্ঞানী সন্দেহ নেই; তাঁর গবেষণার বিস্তৃতি ও মৌলিকতার কথা সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছিল। গবেষণার বাইরেও হয়েলের পরিচিতি ছিল কল্পবিজ্ঞানের লেখক হিসাবে; তাঁর লেখা দি ব্ল্যাক ক্লাউড উপন্যাসটিকে অনেকেই বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কল্পবিজ্ঞানের মধ্যে রাখবেন। সোজা কথা সোজা ভাবে বলতে তিনি পিছিয়ে আসতেন না। কয়েক বছর পরের এক ঘটনা -- নিউট্রন তারা প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন জোসেলিন বেল, তিনি তখন ছাত্রী। সেই আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কার পান জোসেলিনের গাইড, জোসেলিনের নাম বাদ পড়ে। হয়েল সরাসরি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। অনেকেই মনে করেন যে বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর এই প্রতিবাদী রূপের জন্যই নোবেল পুরস্কারে তাঁর নাম আসেনি। নক্ষত্রের মধ্যে নিউক্লিয় বিক্রিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য উইলিয়াম ফাউলারকে ১৯৮৩ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। চারজন বিজ্ঞানী এই বিষয়ে একত্রে কাজ করতেন, ফাউলার তাঁদেরই একজন, কিন্তু হয়েল ছিলেন দলের নেতা। স্টিফেন হকিং গবেষণার জন্য প্রথমে হয়েলকেই বেছে নিয়েছিলেন, কিন্তু সেই বছর হয়েল ছাত্র নেননি। ঘটনাচক্রে হকিং-এর থিসিসের প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম হল হয়েল-নারলিকারের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব; সেখানে হকিং এই তত্ত্বের বিপক্ষে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে আনেন।

নির্দিষ্ট সময় হয়েলের বাড়িতে গেলেন নারলিকার। হকিং তাঁকে চারটি সমস্যার কথা বলেন, যার মধ্যে যে কোনো একটি নারলিকার গবেষণার বিষয় হিসাবে বেছে নিতে পারেন। এক ঘণ্টা কথাবার্তা হল, চলে আসার সময় নারলিকার সাহস করে জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি আমার গবেষণার বিষয় নিয়ে স্থিতাবস্থার তত্ত্বের কথা বললেন না তো?’ এক মুহূর্ত থেমে হয়েল উত্তর দিলেন, 'আমি বিশ্বাস করি যে নতুন গবেষক ছাত্রকে বিতর্কিত বিষয় থেকে আড়াল করে রাখা উচিত।' অবশ্য আমরা দেখব হয়েল-এর বিবেচনা শেষ পর্যন্ত কাজে আসেনি।

* * *

স্থিতাবস্থার তত্ত্ব নারলিকারের গবেষণার অনেকটা অংশ জুড়ে আছে। আমরা এখন জানি যে মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে; গ্যালাক্সিরা একে অন্যের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। বিষয়টি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আবিষ্কার করেছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডুইন হাবল। তার অনেক আগেই আইনস্টাইন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতা ব্যবহার করে ব্রহ্মাণ্ডের জন্য সমীকরণ লিখে আধুনিক বিশ্বতত্ত্বের সূচনা করেছিলেন। তাঁর সমীকরণ দেখিয়েছিল যে ব্রহ্মাণ্ড হয় সংকুচিত না হয় প্রসারিত হতে বাধ্য। তখন তিনি সেই সমীকরণে একটি অতিরিক্ত রাশি যোগ করে তাকে স্থিতিশীল রেখেছিলেন। হাবলের আবিষ্কারের পরে তিনি সেই অতিরিক্ত রাশিকে বলেছিলেন তাঁর জীবনের সব থেকে বড় ভুল। অবশ্য সেই ভুলকে আমরা এখন ব্রহ্মাণ্ডকে ব্যাখ্যা করার জন্য ব্যবহারের চেষ্টা করছি, কিন্তু সে ভিন্ন প্রসঙ্গ।

ব্রহ্মাণ্ড প্রসারিত হচ্ছে, সুতরাং আমরা আমরা যদি সময়ের পিছনদিকে হাঁটি তাহলে এমন হতেই পারে যে আদিতে মহাবিশ্ব একটি মাত্র বিন্দুতে সীমাবদ্ধ ছিল, তার ঘনত্ব ছিল অসীম। এই ধরনের বিন্দুকে আমরা বলি সিঙ্গুলারিটি বা ব্যতিক্রমী বিন্দু। আজ থেকে মোটামুটি তেরোশো আশি কোটি বছর আগে এক মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে ব্রহ্মাণ্ডের জন্ম। সেই আদি মুহূর্ত থেকে তা প্রসারিত হয়ে চলেছে। বিশ্বতত্ত্বে এখন এই বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের তত্ত্বই সাধারণভাবে স্বীকৃত। হয়েল ছিলেন এর বিরোধী; বিগ ব্যাং কথাটা তিনিই ব্যাঙ্গ করে বানিয়েছিলেন, কিন্তু সেটাই চালু হয়ে গেছে।

বিগ ব্যাং তত্ত্বে মহাবিশ্বের প্রসারণ বেগ মেপে তার থেকে মহাবিশ্বের বয়স নির্ণয় করা যায়। সেই সময় এই তত্ত্বে একটা বড় সমস্যা ছিল যে সেই বয়স অনেক নক্ষত্রে বয়সের থেকেও কম। (পরবর্তীকালে অবশ্য এই সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, দেখা গেছে যা মাপা হয়েছিল, প্রসারণের বেগ আসলে তার থেকে অনেক কম।) এই তত্ত্বের ক্ষেত্রে আরো একটা সমস্যা হল যে পদার্থবিজ্ঞানের কোনো সমীকরণ ব্যতিক্রমী বিন্দুতে অর্থাৎ অসীম ঘনত্বে কাজ করে না।

১৯৪৮ সালে হয়েল এবং আলাদা ভাবে হেরম্যান বন্ডি ও টমাস গোল্ড এমন এক তত্ত্বের প্রস্তাব করেন যেখানে ব্যতিক্রমী বিন্দুর প্রয়োজন নেই। তাঁদের তত্ত্বে সৃষ্টির কোনো আদি নেই, তা চিরকালই বর্তমান। প্রশ্ন আসে যে পর্যবেক্ষণ দেখাচ্ছে যে গ্যালাক্সিগুলি পরস্পরের থেকে দূরে চলে যাচ্ছে, তাহলে তো অসীম সময়ে তাদের দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে যাওয়া উচিত। কেন আমরা গ্যালাক্সিদের দেখতে পাচ্ছি? হয়েলরা বললেন যে তার কারণ ব্রহ্মাণ্ডে সব সময় পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। এই হার খুবই কম, পরীক্ষাগারে তা পর্যবেক্ষণ করা অসম্ভব বললেই চলে। সেই পদার্থ থেকে আবার নতুন গ্যালাক্সির সৃষ্টি হচ্ছে। একে বলে সতত স্বতঃসৃষ্টির তত্ত্ব।

প্রথম দিকে এই দুই বিরোধী তত্ত্বের মধ্যে খুব একটা বিচারের সুযোগ ছিল না, কিন্তু পরবর্তীকালে পর্যবেক্ষণ থেকে স্থিতাবস্থার তত্ত্ব নিয়ে বেশ কিছু আপত্তি ওঠে। দূরের গ্যালাক্সি থেকে আমাদের কাছে আলো আসতে অনেক সময় লাগে। যদি আলো আসতে এক কোটি বছর লাগে, তাহলে সেই আলো আমাদের এক কোটি বছর আগের খবর এনে দেয়। বিগ ব্যাং তত্ত্বে মহাবিশ্ব পরিবর্তিত হচ্ছে, স্থিতাবস্থার তত্ত্ব অনুযায়ী তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্ব চিরকালই একরকম, তার কোনো পরিবর্তন হয় না। নারলিকারের হয়েলের সঙ্গে গবেষণাতে যোগ দেওয়ার অল্প দিন পরেই কেমব্রিজের রেডিও জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্টিন রাইল ও তাঁর সহযোগীরা মহাকাশের যে সমস্ত উৎস থেকে রেডিও তরঙ্গ বেরোয়, সেগুলিকে তীব্রতা অনুযায়ী সাজাচ্ছিলেন। দেখা গেল অপেক্ষাকৃত দুর্বল উৎসের সংখ্যা বেশি। সাধারণভাবে ধরা যায় যে উৎস যত দূরে আছে, সে তত দুর্বল। আবার যে যত বেশি দূরে আছে তার থেকে সঙ্কেত আসতে তত বেশি সময় লাগে। এর অর্থ অতীত কালে রেডিও উৎসের সংখ্যা বেশি ছিল। স্থিতাবস্থার তত্ত্বে তা হওয়ার কথা নয়।

হয়েলকে এই সমস্যার সমাধানে নারলিকার সাহায্য করেছিলেন। তাঁরা দেখালেন যে যে মহাবিশ্ব সর্বত্র সমসত্ত্ব (অর্থাৎ একই রকম) নয়, এবং কোনো গ্যালাক্সি রেডিও উৎস হিসাবে কাজ করবে কিনা, সেই সম্ভাবনা তার বয়সের উপর নির্ভরশীল। আমাদের কাছের গ্যালাক্সিদের বয়স স্বাভাবিকভাবেই কম, কারণ তাদের মধ্যেকার পদার্থ সবে তৈরি হয়েছে। দূরের গ্যালাক্সিদের বয়স বেশি, তাই তাদের রেডিও উৎস হিসাবে কাজ করার সম্ভাবনা বেশি। ১৯৬২ সালে তাঁদের এই যৌথ গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়। এভাবেই হয়েল না চাইলেও কয়েকমাসের মধ্যেই নারলিকার স্থিতাবস্থার তত্ত্বের গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।

রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিতে এই গবেষণাটি নিয়ে বক্তৃতা দিতে হবে ১৯৬১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, সেখানে রাইলও থাকবেন। রাইল খুবই বিখ্যাত বিজ্ঞানী, তের বছর পরে তিনি নোবেল পুরস্কার পাবেন। হয়েল অন্য এক জরুরি কাজ থাকায় যেতে পারবেন না, নারলিকারকেই তাঁদের গবেষণার কথা বলতে হল। সেই অগ্নিপরীক্ষায় সহজে উত্তীর্ণ হলেন তিনি, অনেকেই তাঁর বক্তৃতার প্রশংসা করলেন। তখনো তাঁর বয়স তেইশ পেরোয়নি। নারলিকার লিখেছেন যে সেই দিন থেকেই গবেষণাতে তিনি এক নতুন আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলেন। যদি গবেষণা সঠিকভাবে করা হয়, অধিকাংশ মানুষের মতের বিপক্ষে গিয়েও তাকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

এর পরে হয়েল ও নারলিকার বিভিন্ন প্রকার অসমসত্ত্ব মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে রেডিওউৎসের বিভিন্ন বিন্যাস পৃথিবী থেকে কেমন দেখতে লাগবে তা দেখান। এর জন্য নারলিকারকে কম্পিউটার ব্যবহার করতে হয়েছিল। তখন ডেস্কটপ বা ল্যাপটপের কথা কেউ স্বপ্নেও ভাবে নি। কিবোর্ড নয়, কম্পিউটারকে নির্দেশ দিতে হত পাঞ্চ কার্ডের মধ্যে ছিদ্র করে। একটা কার্ডে এক লাইন ইন্সট্রাকশন দেওয়া যেত। সপ্তাহে একদিন কেমব্রিজ থেকে লন্ডনে গিয়ে সকাল ঠিক দশটার সময় আইবিএম কম্পিউটার টেকনিশিয়ানের হাতে একতাড়া পাঞ্চ কার্ড তুলে দিতেন নারলিকার। ইন্সট্রাকশনে ভুল আছে কিনা জানতে পারতেন বিকেলে। ভুল না থাকলে গণনার একটা উত্তর পেতেন। বিশ্বতত্ত্ব গবেষণাতে কম্পিউটারের প্রয়োগের এটাই সম্ভবত প্রথম উদাহরণ।

পিএইচডি-র সময় নারলিকার আর একটি উল্লেখযোগ্য কাজ করেছিলেন, তবে সেটা বেশ জটিল। নিউটনের যে তিনটি গতিসূত্র আছে, সেগুলি অজড়ত্বীয় নির্দেশতন্ত্রে কাজ করে না। অস্ট্রিয়ান দার্শনিক ও পদার্থবিজ্ঞানী আর্ন্সট মাখ প্রশ্ন তুলেছিলেন যে আমাদের যে স্থানীয় জড়ত্বীয় নির্দেশতন্ত্র, দূরের গ্যালাক্সিরাও সেই একই জড়ত্বীয় নির্দেশতন্ত্রে অবস্থান করে কেন? তারা তো আমাদের থেকে অনেক দূরে আছে। নারলিকার দেখালেন যে পদার্থের স্বতঃসৃষ্টি থেকে এর ব্যাখ্যা করা যায়।

নারলিকার ১৯৬৩ সালে ডক্টরেট সম্পূর্ণ করেন। অল্প দিন পরেই এমন এক আবিষ্কার হয় যাকে কোনোভাবেই স্থিতাবস্থার তত্ত্বের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা যায় না। তা হল কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বেল ল্যাবরেটরির দুই বিজ্ঞানী আর্নো পেনজিয়াস ও রবার্ট উইলসন মাইক্রোওয়েভ ধরার নতুন এক হর্ন অ্যান্টেনা পরীক্ষা করতে গিয়ে আবিষ্কার করেন যে আকাশের সব দিক থেকে সমান পরিমাণ সঙ্কেত আসছে। আরো কয়েকজন বিজ্ঞানীর সঙ্গে আলোচনার পরে বোঝা গেল যে এ হল মহাবিশ্বের জন্মমুহূর্তের চিহ্ন। মহাবিশ্ব যখন বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে জন্ম নিয়েছিল, তখন তা ছিল প্রচণ্ড উত্তপ্ত। যত সে প্রসারিত হয়েছে, তত সে ঠাণ্ডা হয়েছে। সেই আদি বিকিরণ এখন মাইক্রোওয়েভের রূপ নিয়েছে। একেই বলা হয় কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড। স্থিতাবস্থার তত্ত্বে এই বিকিরণের বা আরো কিছু কিছু আধুনিক পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব নয়। সেই তত্ত্বে মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের সুযোগ আছে, কিন্তু তার চরিত্র পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মেলে না।

১৯৯০ সালে নারলিকার, হয়েল, জিওফ্রে বারবিজ, চিপ আর্প, ও চন্দ্র বিক্রমসিঙ্ঘে নেচার পত্রিকায় বিশ্বতত্ত্ব যে পথে চলেছে তার সমালোচনা করেন; সেই সমালোচনার কিছু এই লেখার পরের পর্যায়ে পাওয়া যাবে। বিগ ব্যাং তত্ত্বের সব থেকে বড় প্রবক্তারা ১৯৯১ সালে তার উত্তর দিয়েছিলেন, সেখানে তাঁরা বলেন বিগ ব্যাং-এর জায়গা নিতে পারে এমন কোনো তত্ত্ব নেই। সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে ১৯৯৩ সালে নারলিকার, হয়েল ও জিওফ্রে বারবিজ প্রায়-স্থিতাবস্থার তত্ত্বের প্রস্তাব করেন। এখানেও মহাবিশ্বের কোন সূচনা নেই, তা চিরকালই বর্তমান এবং সেখানে সবসময়েই পদার্থ সৃষ্টি হয়ে চলেছে। সমগ্র মহাবিশ্ব সতত প্রসারণশীল, কিন্তু স্থানীয়ভাবে তার অংশবিশেষ ছোট বড় হয়। এই ছোট বড় হওয়ার সময়কাল হল পাঁচহাজার কোটি বছর। স্থিতাবস্থার তত্ত্বের যাদের জায়গা দেওয়া যাচ্ছিল না, এমন কিছু পর্যবেক্ষণের ব্যাখ্যা এই নতুন গবেষণাতে পাওয়া যায়। এর সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হল যে এখানেও ব্যতিক্রমী বিন্দুকে এড়ানো যায়।

১৯৬০-এর দশকে হয়েল ও নারলিকার মাধ্যাকর্ষণের এক তত্ত্ব প্রস্তাব করেন যা মাখের অপর এক শর্ত মেনে চলে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাকে এই তত্ত্বের এক বিশেষ রূপ হিসাবে পাওয়া যায়। আগেই বলেছি হকিং এই তত্ত্বের সমালোচনা করেন, অন্য অনেকেই এই তত্ত্বের নানা সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। হকিং ও নারলিকার তার কিছু কিছু উত্তরও দিয়েছিলেন, কিন্তু মূল তত্ত্ব বা তার সমালোচনা বিষয়ে আলোচনা এই প্রবন্ধের পরিসরে সম্ভব নয়।

এই প্রসঙ্গে হয়েল ও হকিং-কে নিয়ে একটি বহুশ্রুত ঘটনা আছে, যা চলচ্চিত্রায়িতও হয়েছে। বর্ণনা অনুসারে হকিং হয়েলকে তাঁর তত্ত্বের একটি ভুল দেখিয়ে দেন, এবং হয়েল জবাব দিতে পারেননি। সেই প্রশ্ন করার সুযোগ হকিং পেয়েছিলেন কারণ নারলিকার আগেই তাঁকে তাঁদের গবেষণাপত্র দেখিয়েছিলেন। সেজন্য হয়েল নারলিকারের উপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। নারলিকার লিখেছেন যে ঘটনাটা এমন নয়। হকিং একটা প্রশ্ন করেন, কিন্তু তাঁর কথার জড়তার জন্য হয়েল সেটি বুঝতে পারেননি। নারলিকার তার উত্তর দেন, এবং আলোচনা পরের প্রশ্নে চলে যায়। সেই সময় হয়েল নারলিকারের এই বক্তৃতার সংবাদপত্রে বিস্তৃতভাবে লেখা হয়েছিল, এবং কোথাও হকিং-এর প্রশ্নকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

উপরের বিজ্ঞান আলোচনা থেকে কোনো পাঠকের যদি মনে হয় নারলিকারের গবেষণার বিশেষ কোনো গুরুত্ব আধুনিক বিশ্বতত্ত্বে নেই, তাহলে তাঁকে বলি বিজ্ঞান এক দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়, যেখানে যে কোনো নতুন তত্ত্বের পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি ও প্রমাণ হাজির করাটা আবশ্যিক। উনিশশো পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে স্থিতাবস্থা বা বিগ ব্যাং-এর মধ্যে বেছে নেওয়া সম্ভব ছিল না, পরে বিগ ব্যাং-এর পক্ষে বেশি প্রমাণ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানে নানা তত্ত্ব থাকে, পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে তার একটি হয়তো সত্য প্রমাণিত হয়। তা বলে বিজ্ঞানের বিকাশে অন্য তত্ত্বদের গুরুত্ব কমে যায় না। আধুনিক বিজ্ঞানের দার্শনিকদের মধ্যে একেবারে প্রথমে যাঁর নাম আসে, সেই কার্ল পপারের মতে কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হল যে তা এমন ভবিষৎবাণী করবে যাকে ভুল প্রমাণ করলে সেই তত্ত্বকে বাতিল করা যাবে। স্থিতাবস্থার তত্ত্বের একটা বড় গুণ হল তাকে ভুল প্রমাণ করা সহজ।

নারলিকারের অপেক্ষাকৃত সহজবোধ্য এক গবেষণার কথা দিয়ে এই পর্যায় শেষ করি। এখানেও হয়েলের ভূমিকা আছে। হয়েল ও তাঁর অপর এক ছাত্র চন্দ্র বিক্রমসিঙ্ঘে মহাজাগতিক মেঘের মধ্যে জৈব যোগের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। তাঁদের মনে হয় যে প্রাণের প্রথম সৃষ্টি হয়তো মহাকাশেই হয়, সেখান থেকেই তা পৃথিবীতে এসেছ। এই অত্যন্ত বিতর্কিত তত্ত্বের জন্য পরীক্ষা চালিয়েছিলেন নারলিকার। তিনি প্রস্তাব করেন যে বায়ুমণ্ডলের একদম উপরের স্তরে বেলুনের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখা হোক; যদি এমন কোনো জীবাণুর সন্ধান পাওয়া যায় যার অস্তিত্ব পৃথিবীতে নেই, বা যার পক্ষে সেই উচ্চতাতে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়, তাহলে হয়েলদের তত্ত্ব প্রমাণিত হবে। ইসরো ও অন্যান্যদের সাহায্যে একবার পরীক্ষা করে দেখা হয়, কিন্তুই অন্যদের উৎসাহের অভাবেই সম্ভবত এই নিয়ে কাজ আর বিশেষ এগোয়নি।

* * *

“Cosmologists are often wrong but never in doubt.”

২০১৮ সালে এক গবেষণা পত্রিকাতে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা লিখেছিলেন নারলিকার; প্রবাদপ্রতিম রাশিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী লেভ লান্দাউয়ের উপরের উদ্ধৃতিটি দিয়ে তিনি লেখাটি শুরু করেছিলেন। তার দশ বছর আগে লিখেছিলেন Scientific research: What it means to me। ২০১৫ সালে তিনি লিখেছিলেন ‘Trials and tribulations of playing the devil's advocate’ এই প্রবন্ধ।

পাঠকদের কারো কারো হয়তো ডেভিলস অ্যাডভোকেট কথাটা অপরিচিত মনে হতে পারে। এটি এসেছে লাতিন advocatus diaboli বাক্যবন্ধ থেকে। (বাংলা অনুবাদ খুঁজে পাচ্ছি শয়তানের মুখপাত্র, কিন্তু সেই অনুবাদ মূলের অর্থ বহন করে বলে মনে হচ্ছে না। খ্রিস্টধর্মের ডেভিল কোনো মামুলি শয়তান নয়, স্বয়ং ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বী।) আপনাদের নিশ্চয় মাদার টেরেসাকে সন্ত বলে ঘোষণার কথা মনে আছে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মে কাউকে সন্ত ঘোষণার আগে এক বিতর্কের আয়োজন করতে হত, যেখানে তাঁর পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তিজাল বিস্তার করা হত। বিপক্ষে যুক্তি দেওয়ার জন্য একজন অবশ্যই থাকতেন, তাঁকেই বলা হত ডেভিলস অ্যাডভোকেট। মাদার টেরেসাকে সন্ত ঘোষণা সময় তাঁর অন্যতম সমালোচক ক্রিস্টোফার হিচেন্স সেই ভূমিকা নিয়েছিলেন। অবশ্য হিচেন্সের মতো সব ডেভিলস অ্যাডভোকেটই বিরোধী মনোভাব পোষণ করতেন না, কিন্তু বিপক্ষের যুক্তিগুলি তাঁদের বলতেই হত

বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ডেভিলস অ্যাডভোকেটরা এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। প্যারাডাইস লস্ট-এ ডেভিলকে দিয়ে মিলটন বলিয়েছিলেন, "Better to reign in hell than serve in heaven"; বিজ্ঞানে তেমনি স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটাকেই কেউ কেউ জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য বেছে নেন। এই বছর আমরা কোয়ান্টাম বলবিদ্যার শতবর্ষ পালন করছি। পদার্থবিজ্ঞানের এই সফলতম তত্ত্বটির সব থেকে বড় সমালোচক ছিলেন আলবার্ট আইনস্টাইন; সারা জীবন তিনি এই তত্ত্বকে মেনে নিতে পারেননি। অথচ কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জন্ম যে কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে আইনস্টাইন তাঁর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, এবং সেই বিষয়েই তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। আইনস্টাইন বিজ্ঞানীদের কোয়ান্টাম বলবিদ্যা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ও পরীক্ষানিরীক্ষা করতে বাধ্য করেছেন, তাতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যা সমৃদ্ধ হয়েছে। আইনস্টাইনের এক আপত্তিকে ভুল প্রমাণ করার জন্য মাত্র তিন বছর আগে পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। নারলিকার নিজেকে বিশ্বতত্ত্ব বা কসমোলজির ক্ষেত্রে ডেভিলস অ্যাডভোকেট রূপেই দেখেছেন। বিশ্বতত্ত্বের মূল ধারা সম্পর্কে নানা প্রশ্ন তিনি তুলেছেন, লেভ লান্দাউয়ের উদ্ধৃতিটি মনে রেখে কসমোলজিস্টদের মনে ডাউট বা সন্দেহের সঞ্চার ঘটাতে চেয়েছেন।

ডেভিলস অ্যাডভোকেট নারলিকার বিগ ব্যাং তত্ত্বের নানা সমস্যার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। যে সব সমস্যা সাধারণভাবে চোখ এড়িয়ে যেত বা মাদুরের তলায় লুকিয়ে রাখা হত, সেগুলি তিনি বাইরে আনতেন। বিগ ব্যাং তত্ত্বে কণা পদার্থবিদ্যা ও বিশ্বতত্ত্ব হাত ধরেছে; নারলিকার প্রশ্ন তুলেছেন সেই মিলন প্রসঙ্গে। তিনি বলেছেন কণা পদার্থবিদরা অনেক সময়েই অনেক কিছু কল্পনা করেন, যাদের কোনো প্রমাণ নেই। সেগুলিকে বিশ্বতত্ত্ব নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাঁরা ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেন। অপর পক্ষে বিগ ব্যাং মডেলে বিশ্বসৃষ্টির আদি মুহূর্ত আমাদের পর্যবেক্ষণের বাইরে, তা অনুমান মাত্র, কিন্তু কণা পদার্থবিদরা তার উপরেই নিজেদের তত্ত্ব নির্মাণ করেন। কাজেই এই তত্ত্বকে সঠিক বলার সময় এখনই আসেনি, এই ছিল তাঁর বক্তব্য। কোনো কোনো নক্ষত্রের বয়স মেপে দেখা যাচ্ছে বিগ ব্যাং ব্রহ্মাণ্ডের থেকে তারা পুরানো, কেমন করে তা সম্ভব -- এই প্রশ্ন নারলিকার ও স্থিতাবস্থার তত্ত্বের অন্য প্রবক্তারা তুলেছেন। সেই সমস্ত নক্ষত্রের বয়স বার বার মাপা হয়েছে, তার জন্য নক্ষত্রের মডেল ও পর্যবেক্ষণ দুইকেই আরো নিখুঁত করা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এভাবেই নানা পরস্পর বিরুদ্ধ মতের থেকে শিক্ষা নিয়ে বিজ্ঞান এগোয়।

নারলিকারের লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তার বুদ্ধিদীপ্ত রসিকতা। বিগ ব্যাং মডেলের চারটি বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের জন্য ইনফ্লেশন মডেলের প্রস্তাব করা হয় নারলিকার লিখছেন যে এই সমস্যাগুলোর কথা আগেই জানা ছিল কিন্তু সেগুলো নিয়ে বিশেষ চিন্তাভাবনা করা হত না। নারলিকারের বক্তব্য, এই সমস্ত সমস্যার উৎস হল বিশ্বসৃষ্টির আদি মুহূর্ত সম্পর্কে আমাদের কল্পনা। যদি বিশ্বের কোনো সৃষ্টি মুহূর্ত না থাকে, তাহলে এদের প্রশ্নই আসে না। নারলিকারের অননুকরণীয় উপমা, 'যতক্ষণ না রোগের চিকিৎসা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, ততক্ষণ রোগটাকে অস্বীকার করাই হল বাজার অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য। ইনফ্লেশন চিকিৎসা আবিষ্কারের পরেই বিশ্বতত্ত্বে এই চারটি সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।'

তবে ডেভিলস অ্যাডভোকেট হওয়া সহজ নয়। বিজ্ঞানকে আমরা যতই নৈর্ব্যক্তিক ভাবি না কেন, বিজ্ঞানীরাও মানুষ; তাঁদেরও পছন্দ অপছন্দ আছে। অধিকাংশ মানুষ যে তত্ত্বে বিশ্বাস করে, তার বিরোধী কোনো মত, সে ঠিক হোক বা ভুল, তা প্রকাশ করা সহজ নয়। গবেষণাপত্র ছাপতে দেরি হয়, অনেক সময় সরাসরি বাতিল হয়ে যায়। কনফারেন্স বা সেমিনারে বলার সুযোগ আসে কম। এই সমস্ত অসুবিধার মধ্যেও নিজেকে স্থির থাকতে হয়; নারলিকার তা পেরেছিলেন। বিজ্ঞানে অবদানের স্বীকৃতিতে তাঁর প্রাপ্ত সম্মানের মধ্যে আছে পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ সম্মান, কেমব্রিজের অ্যাডামস প্রাইজ এবং ফ্রান্সের জুলে জ্যানসন পুরস্কার।

* * *

নারলিকারদের মাধ্যাকর্ষণ তত্ত্ব বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। বিদেশে তো বটেই দেশেও খবরের কাগজে এটির বেশ প্রচার হয়েছিল। নারলিকার কিছুদিনের জন্য যখন দেশে এসেছিলেন, তখন তাঁকে নিয়ে যে উন্মাদনা দেখা দেয় তা তাঁকে অবাক করে দিয়েছিল। নানা জায়গায় বক্তৃতা দিতে হত যেখানে শ্রোতা ছিল স্কুল ছাত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। দু'টি বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া তিনি তাঁর গবেষণা নিয়ে অন্যদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাননি। কেবল আমেদাবাদে বিষ্ণু বাসুদেবের একসময়ের ছাত্র প্রহ্লাদ চুনিলাল বৈদ্য ও কলকাতাতে সত্যেন্দ্রনাথ বসু এই বিষয়ে গবেষকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। প্রসঙ্গত বলা যায় বৈদ্য সাধারণ আপেক্ষিকতার একটি বিশেষ সমাধান আবিষ্কার করেছিলেন, যা বর্তমানে বৈদ্য মেট্রিক নামে পরিচিত। প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী মহম্মদ আলি করিম চাগলার সঙ্গে তাঁর আলাদা আলাদা ভাবে সাক্ষাৎ হয়, দুজনেই তাঁকে ভারতে ফিরে গবেষণার আমন্ত্রণ জানান।

নারলিকার কখনোই ইংল্যান্ডেই স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার কথা ভাবেননি, তিনি ঠিক করেছিলেন ১৯৭২ সালের মধ্যেই দেশে ফিরবেন। ১৯৬৯ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লিখে দেশে ফিরে মুম্বাইয়ের টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ইন্দিরা গান্ধী ও টাটা ইন্সটিটিউটের অধিকর্তা এম জি কে মেনন দুজনেই তাঁকে স্বাগত জানান। নারলিকার ১৯৭২ সালেই দেশে ফিরে টাটা ইন্সটিটিউটে অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন ও তত্ত্বীয় জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা বিভাগের নেতৃত্ব দেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে টিনু পদ্মনাভন, অজিত কেমভাবি, তরুণ সৌরদীপ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। বিশ্বতত্ত্ব ও জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ে বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন নারলিকার, সেগুলি বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হয়।

আশির দশকে নারলিকার অন্য কয়েকজনের সঙ্গে ভারতে জ্যোতির্বিদ্যা গবেষণা পরিকাঠামোর উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। সেই সূত্রে ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণার প্রসারের উদ্দেশ্যে নারলিকারকে জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠানের পরিকল্পনা তৈরির ভার দেয়। পরিকল্পনাটি জমা দেওয়ার পরে কমিশনের চেয়ারম্যান যশ পাল নারলিকারকে অধিকর্তা হয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানটি তৈরির দায়িত্ব দেন। (এই সময় ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষণার প্রসারের জন্য দুটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। দ্বিতীয়টি হল দিল্লীর নিউক্লিয়ার সায়েন্স সেন্টার, যার বর্তমান নাম ইন্টার-ইউনিভার্সিটি অ্যাক্সিলারেটর সেন্টার। বর্তমান লেখকের গবেষণা জীবন সেই প্রতিষ্ঠানে শুরু হয়েছিল। ভারতে জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞান ও নিউক্লিয় পদার্থবিদ্যা প্রসারে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ ভূমিকা আছে।)

নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা মোটেই সহজ নয়, আমাদের মতো দেশে তো নয়ই। নারলিকারের অনুরোধে বিখ্যাত স্থপতি চার্লস কোরিয়া প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা তৈরি করেন। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি পেতে সমস্যা হচ্ছিল। উপায়ান্তর না দেখে নারলিকার শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে চিঠি লেখেন, তবে চটজলদি কোনো উত্তর তিনি আশা করেননি। হঠাৎই একদিন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী শঙ্কর রাও চবন তাঁকে ডেকে বলেন যে প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে জমির বিষয়ে সাহায্য করার নির্দেশ এসেছে। সঙ্গে সঙ্গে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কুড়ি একর জমি মঞ্জুর হয়। নারলিকারের তত্ত্বাবধানে সেখানে তৈরি হয় ইন্টার-ইউনিভার্সিটি কনসর্টিয়াম ফর অ্যাস্ট্রোনমি এন্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স যা এখন সারা পৃথিবীতেই পরিচিত নাম।

অধিকর্তা হিসাবে নারলিকার প্রতিষ্ঠানে অন্যদের মতামত শুনতেন ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতেন। একটা ঘটনার উল্লেখ করা যায়। একবার নারলিকার একজন বিজ্ঞানীকে প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য অন্য সদস্যদের কাছে তাঁর জীবনপঞ্জী পাঠান। অধিকাংশ সদস্যই, যাঁদের অনেকেই আবার নারলিকারের ছাত্র, নারলিকারের পছন্দের বিপক্ষে মত দেন, এবং সেটা তিনি মেনে নেন। অধিকর্তা হিসাবে বা বিরাট বিজ্ঞানী হিসাবে নিজের মত অন্যের উপর চাপিয়ে তিনি দেননি।

* * *

নারলিকারের আগ্রহ শুধুমাত্র বিজ্ঞান গবেষণা বা শিক্ষাতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ‘The Scientific Edge: The Indian Scientist from Vedic to Modern Times’ বইয়ের ভূমিকাতে তিনি লিখেছেন, ‘When as a young lad of twenty-two I enrolled myself as a research student in science, my aim was to restrict my attention and career to research in astronomy. More than four decades later, I see that aim as confining myself to the proverbial ivory tower.’ গজদন্ত মিনারের বাইরের সেই নারলিকারের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়ে এই প্রবন্ধ শেষ হবে।

একই সঙ্গে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতে ব্যুৎপত্তির বিরল উদাহরণ হলেন নারলিকার। মা ও মোরুমামার কাছে শেখা ছোটবেলার সংস্কৃত শিক্ষা তাঁর কাজে লেগেছে। অপর এক জ্যোতির্বিদ রাজেশ কোছারের সঙ্গে তিনি প্রাচীন ও আধুনিক ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাস লিখেছেন। কারেন্ট সায়েন্স পত্রিকাতে একটি বিশেষ প্রবন্ধের কথা আমার মনে আছে। আকাশের কর্কট রাশিতে ১০৫৪ সালে এক সুপারনোভা বিস্ফোরণ হয়। চিনের প্রাচীন রেকর্ডে আছে যে তিন সপ্তাহ ধরে দিনের বেলাও সেই সুপারনোভাকে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ান উপজাতিরা ও এক আরবি চিকিৎসক সেটা দেখেছিলেন। অথচ ইউরোপের কোথাও সেই সুপারনোভার রেকর্ড নেই। নারলিকার ও সরোজা ভাটে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে সেই বিস্ফোরণের খবর খুঁজেছিলেন, কিন্তু নিশ্চিতভাবে কিছু পাননি।

নারলিকার ছিলেন বিজ্ঞান সচেতনতা প্রসারের অক্লান্ত যোদ্ধা; নানা বক্তৃতা ও লেখালেখির মাধ্যমে তিনি আজীবন সেই প্রয়াসে ব্রতী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দেশের অগ্রগতির জন্য বিজ্ঞানমনস্কতা অত্যন্ত জরুরি। সাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান প্রচারের জন্য তিনি ১৯৯০ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কার ও ১৯৯৬ সালে ইউনেস্কোর কলিঙ্গ পুরস্কার পেয়েছিলেন। জ্যোতিষের বিরুদ্ধে তিনি বিশেষভাবে সরব ছিলেন। ২০০৮ সালে অনেক জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণী সংগ্রহ করে তার পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করে তিনি দেখিয়েছিলেন জ্যোতিষ কোনোমতেই বিজ্ঞান নয়। এই পরীক্ষাতে তাঁর সঙ্গী ছিলেন যুক্তিবাদী নরেন্দ্র দাভোলকার, যিনি কুসংস্কারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পরবর্তীকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ২০০১ সালে কেন্দ্রীয় সরকার যখন উচ্চশিক্ষাতে জ্যোতিষ পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, নারলিকার তখন প্রবন্ধ লিখে তার প্রকাশ্য বিরোধিতা করেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘… there has so far been no rational justification for astrological statements. Promoting it as part of higher education and encouraging the adoption of its decision-making process for various sectors is a giant leap backwards in time.’ বৈদিক সাহিত্যে কোথাও মানুষের ভবিষ্যতের উপর গ্রহদের প্রভাবের কথা নেই, আলেকজান্ডারের সঙ্গে জ্যোতিষ ভারতে আসে। নিজের মতের স্বপক্ষে তিনি সূর্যসিদ্ধান্ত উদ্ধৃত করেন। প্রবন্ধের শেষে নারলিকার লেখেন আমাদের দেশ উন্নত দেশের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করছে, সে জন্য প্রয়োজন মানবসম্পদের যুক্তিপূর্ণ ও সঠিক ব্যবহার। তাকে আরো কুসংস্কারের পথে ঠেলে দিয়ে তা সম্ভব নয়।

ছাত্রদের মধ্যে বিজ্ঞানের আগ্রহ জাগানোর জন্য একটা চমৎকার উপায় তিনি অবলম্বন করেছিলেন। ছোটরা কেউ তাঁর অটোগ্রাফ চাইলে তিনি সেভাবে সই দিতেন না; বলতেন বিজ্ঞানের কোনো প্রশ্ন তাঁকে লিখে পাঠাতে, তিনি তার উত্তর পোস্টকার্ডে লিখে নিচে সই করে পাঠাতেন। এমন ভাবে অনেকগুলি প্রশ্ন ও উত্তর জমা হওয়ার পরে তাদের এক অংশকে নিয়ে মারাঠি বিজ্ঞান পরিষদ একটি বই প্রকাশ করেছে। ছোটদের বিজ্ঞানে আগ্রহী করার জন্য মারাঠি ও ইংরাজি ভাষায় অনেকগুলি বই নারলিকার লিখেছেন, এবং সেগুলি যথেষ্ট সমাদর পেয়েছে। তাঁর লেখা ‘The Lighter Side of Gravity’ রাশিয়ান, স্প্যানিশ ও জাপানি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। কার্ল সাগান-এর সিরিয়াল কসমস যখন দূরদর্শনে দেখানো হয়েছিল, প্রতিটি এপিসোডের শুরুতে হিন্দিতে তিনি তার মুখবন্ধ করতেন -- এর ফলে ব্জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসাবে তিনি সাধারণের কাছে পরিচিতি পেয়েছিলেন। এর পরে তাঁর তত্ত্বাবধানে মহাকাশ নিয়ে তৈরি সিরিয়াল ব্রহ্মাণ্ড-এর সতেরটি এপিসোড ১৯৯৪-১৯৯৫ সালে দূরদর্শনে দেখানো হয়।

হয়েলের থেকে প্রেরণা পেয়েই নারলিকার কল্পবিজ্ঞান রচনা শুরু করেছিলেন। তিনি এক কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখে বেনামে সেটি মারাঠি বিজ্ঞান পরিষদের এক প্রতিযোগিতাতে পাঠান, সেটিই প্রথম পুরস্কার পাওয়ার পরে তিনি নিজের নাম প্রকাশ করেছিলেন। উৎসাহ পেয়ে তিনি তার পরে বেশ কিছু কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখেছেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিজ্ঞানের প্রচার, তাই গল্প লিখতে গিয়ে কখনোই তিনি বিজ্ঞানকে বিকৃত করেননি। তাঁর ধূমকেতু গল্পটি চলচ্চিয়ত্রায়িত হয়েছে, সেখানে তিনি জ্যোতিষীদের ভণ্ডামির কথা তুলে ধরেছেন। দূরদর্শনে সেটি প্রচারিত হয়েছিল। তাঁর উপন্যাস 'বামন পরত না আলা' আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিপদগুলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। কিছু গল্প তিনি নিজে ইংরাজিতে অনুবাদ করেছেন। বাংলাতেও কয়েকটি গল্পের অনুবাদ হয়েছে। বেনারস, কেমব্রিজ, মুম্বাই ও পুনে -- এই চার নগরে তাঁর জীবন নিয়ে মারাঠি ভাষাতে লেখা তাঁর আত্মজীবনী 'চার নগরান্তলে মাঝে বিশ্ব' সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়।

নারলিকার ১৯৬৬ সালে মঙ্গলা রাজওয়াড়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন গণিতের অধ্যাপক। দুজনে মিলে লিখেছেন ‘Fun and Fundamentals of Mathematics'। তাঁদের তিন কন্যাই বিজ্ঞানকে পেশা হিসাবে বেছে নিয়েছেন। একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে শেষ করি। নারলিকার মেয়েকে মুম্বাইতে টাটা ইন্সটিটিউটের কাছের কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ানে ভর্তির জন্য গেছেন। স্কুলের প্রিন্সিপাল তাঁকে বলেন এই ধরনের স্কুলে কেন্দ্রীয় সরকারি অফিসারদের, যাঁদের বদলির চাকরি, তাঁদের সন্তানরাই আগে সুযোগ পায়। যে সরকারি অফিসার মুম্বাইয়ের কেন্দ্রীয় স্কুলগুলি দেখাশোনা করেন, প্রিন্সিপালের পরামর্শে তাঁর কাছে আবেদন করেন নারলিকার। দু' তিন দিনের মধ্যেই ফোন করে অফিসারটি জানান যে তাঁর দরখাস্ত মঞ্জুর হয়েছে; কারণ দশ বছর আগে সেই অফিসার নারলিকারের বক্তৃতা শুনেছিলেন। নারলিকার স্ত্রীকে বললেন, 'জ্যোতির্বিদ্যার বক্তৃতা তাহলে কাজে লাগে।'


তথ্যসূত্র

  1. J. V. Narlikar, Trials and tribulations of playing the devil’s advocate, Research in Astronomy and Astrophysics, Vol. 15, p. 1 (2015)

  2. J. V. Narlikar, The evolution of modern cosmology as seen through a personal walk across six decades, European Physical Journal H Vol. 43, p. 43 (2018)

  3. J.V. Narlikar, Scientific research: What it means to me, Mens Sana Monographs, Vol. 6, p. 135, (2008)

  4. Face to face with Professor Jayant V. Narlikar: Prof. D. J. Saikia talks to Prof. Jayant V. Narlikar, Resonance, Vol. 24, p. 1029 (2019)

  5. J.V. Narlikar, The story of IUCAA, Jayant Narlikar's Blog

  6. J.V. Narlikar, Vedic astrology or jyotirvigyan: Neither vedic nor vigyan, Economic and Political Weekly, Vol. 36, p. 2113, (2001)

  7. Ajit Kembhavi, Some scientific works of Jayant Narlikar, Resonance, Vol. 30, p. 889 (2025)

  8. Biman B. Nath, J V Narlikar: The accessible astronomer, Resonance, Vol. 30, p. 884 (2025)

  9. Ashish Mahabal, Prof. Narlikar’s contributions to Marathi literature, Resonance, Vol. 30, p. 901 (2025)

  10. Naresh Dadhich, IUCAA: A novel experiment, Resonance, Vol. 30, p. 881 (2025)


  

পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চ প্রকাশিত 'এ যুগের কিশোর বিজ্ঞানী' পত্রিকার ত্রিশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে নারলিকার (ছবি অনির্বাণ কুণ্ডুর সৌজন্যে প্রাপ্ত

জলঘড়ি পত্রিকার আগস্ট-নভেম্বর ২০২৫ সংখ্যাতে প্রকাশিত