Sunday, 13 January 2019

জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণা


জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণা

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

      “জার্মান, ফরাসি, ইংরেজ, ইতালি প্রভৃতি বুধমন্ডলী-মণ্ডিত মহারাজধানীতে তুমি কোথায় বঙ্গভূমি? কে তোমার অস্তিত্ব ঘোষণা করে? সে বহু গৌরবর্ণ প্রতিভামণ্ডলীর মধ্য হতে এক যুবা যশস্বী বীর বঙ্গভূমির, আমাদের মাতৃভূমির নাম ঘোষণা করলেন, সে বীর জগৎ প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক, ডঃ জে সি বোস একা, যুবা বাঙ্গালি বৈদ্যুতিক, আজ বিদ্যুতবেগে পাশ্চাত্যমন্ডলীকে নিজের প্রতিভা মহিমায় মুগ্ধ করলেন ... সমগ্র বৈদ্যুতিকমন্ডলীর শীর্ষস্থানীয় আজ জগদীশ চন্দ্র বসু, ভারতবাসী, বঙ্গবাসী ধন্য বীর
      ১৯০০ সালে প্যারী বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, তিনি এভাবেই জগদীশচন্দ্রের বন্দনায় মুখর হয়েছিলেন। প্যারীর বিজ্ঞান প্রদর্শনী যে শতকের অন্তিমগ্নকে চিহ্নিত করেছিল সেই ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলাদেশের সমাজে শিক্ষাতে সাহিত্যে ধর্মে এক অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলআজ তাকে আমরা নবজাগরণ বা রেনেসাঁ বলে চিহ্নিত করি। সেই যুগের সমস্ত পুরোধাদের কথা স্মরণে রেখেও জগদীশচন্দ্রের কথা আলাদা করে বলতে হয়, কারণ আধুনিক বিজ্ঞানে তিনি আমাদের দেশে অগ্রপথিক। বিজ্ঞানের, বিশেষ করে মৌল বিজ্ঞানের, একটা আন্তর্জাতিক চরিত্র আছে। বিজ্ঞানীকে নিজের দেশকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলে না, তাঁর প্রতিযোগিতা হয় সারা বিশ্বের সমস্ত বিজ্ঞানীর সঙ্গে। সেখানে জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে সমসাময়িক  বিজ্ঞানীদের তুলনায় কী অবস্থায় ছিলেন সংক্ষেপে দেখে নেওয়া যাক। 
জগদীশচন্দ্র বসু ( নভেম্বর ৩০, ১৮৫৮ - নভেম্বর ২৩, ১৯৩৭)

      বিজ্ঞান চর্চার একটা প্রাথমিক শর্ত হল সমাজে বিজ্ঞানের ঐতিহ্য। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে জগদীশচন্দ্রের সে সৌভাগ্য ছিল না কারণ তিনি যখন কাজ শুরু করছেন, তার থেকে হাজার বছরেরও বেশি আগে ভারতে মৌলিক বিজ্ঞানের চর্চা প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই কানাগলিতে ঢুকে পড়েছিল।  প্রাচীন ভারতে বিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস আমাদের সবারই জানা; চরক, সুশ্রুত, আর্যভট্ট, ভাস্করাচার্য, শ্রীধরাচার্যদের নাম প্রাচীন যুগের বিজ্ঞানের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। কিন্তু তারপরেই আসে এক অন্ধকার যুগ। এই নিবন্ধে তার কারণ বিশ্লেষণ করার অবকাশ নেই, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর হিন্দু রসায়নের ইতিহাস গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে শঙ্করের মায়াবাদ ও জাতব্যবস্থাই ভারতের বিজ্ঞানের ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেছে। এমনকি ইসলামের অভ্যুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে আরবে মৌলিক বিজ্ঞানের যে চর্চা শুরু হয়েছিল, আমাদের দেশে তার বিশেষ কোনো প্রভাব পড়েনি। ফলে আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চার কোনো পরম্পরাই ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবশিষ্ট ছিল না। ভারতের সমাজে গুরুবাক্যের প্রতি যে প্রশ্নহীন আনুগত্য দেখানোই রীতি, তা কখনোই বিজ্ঞান চর্চার পাথেয় হতে পারে না। বিজ্ঞানের অগ্রগতি একমাত্র পুরাতনকে প্রশ্ন করা ও সম্ভব হলে তাকে ভুল প্রমাণ করার মাধ্যমেই সম্ভব। তাই যে সমাজে জগদীশচন্দ্রের জন্ম হয়েছিল, সেখানে বিজ্ঞান চর্চার পথ প্রশস্ত ছিল না।
      শুধু যে ভারতীয় সমাজ বিজ্ঞানচর্চার পক্ষে বাধাস্বরূপ ছিল তা নয়, পরাধীন ভারতবর্ষের ব্রিটিশ শাসকরাও বহুদিন পর্যন্ত তাঁর অনুকূল ছিলেন না। দেশে কোনো বিজ্ঞান চর্চার উপযোগী প্রতিষ্ঠান ছিল না সরকারি অর্থসাহায্য দূরে থাক, পদে পদে ছিল বিধিনিষেধ। ভারতীয়দের প্রাপ্য ছিল তাচ্ছিল্য আর অবহেলা। প্রেসিডেন্সি কলেজে  একই চাকরিতে জগদীশচন্দ্রের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল সাহেব অধ্যাপকদের অর্ধেক মাইনে, তিনি তা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। তিন বছর বিনা বেতনে চাকরি করার পরে ব্রিটিশ সরকার তাঁর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল। একটা পুরানো বাথরুমকে সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করেছিলেন, কলেজে এইটুকু জায়গাই জুটেছিল তাঁর পরীক্ষাগারের জন্য। ক্লাস এমনভাবে দেওয়া হত যাতে তাঁর গবেষণাতে ব্যাঘাত পড়ে। তাঁর শিক্ষক ও বিশ্বখ্যাত বৈজ্ঞানিক লর্ড র‍্যালেকে তিনি এক রবিবার তাঁর ল্যাবরেটরি দেখিয়েছিলেন বলে তাকে কলেজ কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর চিঠি ধরায় – কেন তিনি ছুটির দিনে এক বহিরাগতকে কলেজে ঢুকতে দিয়েছেন। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের প্রতিযোগিতা সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে, কিন্তু তাঁরা প্রায় কেউই এই ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হননি। সরকারের আনুকূল্য তাঁদের সঙ্গে ছিল। জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণাকে এই পটভূমিতে দেখলে আমাদের মনে হবে নবজাগরণের প্রাণপুরুষদের মধ্যেও তিনি অনন্য।
      খুব সংক্ষেপে জগদীশচন্দ্রের জীবনীর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। ভগবানচন্দ্র বসু ও বামাসুন্দরী দেবীর পুত্র জগদীশচন্দ্রের জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহে। বাবা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। বাবা ও মায়ের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মহত্ত্ব ছেলের মনে প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর শৈশব কেটেছিল বাবার কর্মস্থল ফরিদপুরে। দশ বছর বয়েসে কলকাতায় এসে প্রথমে হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। তারপর সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল এবং সেখান থেকে স্নাতকস্তরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ। ডাক্তারি পড়া জন্য ইংল্যান্ড যাত্রা করেছিলেন জগদীশ, কিন্তু শারীরিক কারণে ডাক্তারি ছেড়ে পদার্থবিদ্যা পড়া শুরু করেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ট্রাইপস’ এবং একই সঙ্গে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ানো শুরু করেন। কলেজের অধ্যক্ষ বা শিক্ষাদপ্তরের অধিকর্তা কেউই খুব উৎসাহী ছিলেন না, কিন্তু তখনকার ভাইসরয় লর্ড রিপনের হস্তক্ষেপে তাঁর যোগদানে বাধা কাটে।
      শুধুমাত্র শিক্ষাদান করে জগদীশচন্দ্র সন্তুষ্ট ছিলেন না। যে বয়সে সাধারণত অন্যান্য বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী শক্তির ক্ষয় শুরু হয়, সেই মধ্যতিরিশে জগদীশচন্দ্র সিদ্ধান্ত করলে যে বাকি জীবন তিনি বিজ্ঞান গবেষণাতে নিয়োজিত করবেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ভিতরে সামান্য পরিসরে সরকারি সাহায্য ছাড়াই যে গবেষণা শুরু করেছিলেন, তা তাঁকে বিজ্ঞানী মহলে খ্যাতি এনে দেয়। ১৮৯৬ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি দেয়। ১৯২০ সালে ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটির ফেলো হয়েছিলেন জাতিসঙ্ঘ বা লিগ অফ নেশনসের ইন্টারন্যাশনাল ইন্টালেকচুয়াল কোঅপারেশন কমিটির সদস্য হয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র।  ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বসু বিজ্ঞান মন্দির। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তিনি জগদীশচন্দ্রকে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু ঘটে।
      জগদীশচন্দ্র গবেষণা শুরু করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানে, ক্রমে তাঁর আগ্রহ উদ্ভিদের শারীরবিদ্যার প্রতি গিয়েছিল। উদ্ভিদ গবেষণাতে পদার্থবিজ্ঞানীর যন্ত্রপাতি ব্যবহার শুরু করেছিলেন জগদীশচন্দ্র। সে জন্য সে সময় প্রতিষ্ঠিত উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা তাঁর সমালোচনা করেছিলেন, কিন্তু আজ আমরা তাঁকে জীবপদার্থবিদ্যা বা বায়োফিজিক্সের একেবারে প্রথম যুগের অগ্রপথিক বলে চিহ্নিত করতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা হল যে তাঁর প্রয়োজনের সমস্ত যন্ত্রপাতি তাঁর নির্দেশমতো এদেশের স্বল্পশিক্ষিত কারিগররাই বানাতেন। তিনি পাট, গন্ধক ইত্যাদি সাধারণ বস্তু ব্যবহার করে রেডিয়োতরঙ্গের নানা ধর্ম প্রমাণ করেছিলেন। সম্পূর্ণ নিজের আর্থিক সঙ্গতির উপর নির্ভর করে বিদেশের গবেষণাগারের তুল্য যন্ত্র নির্মাণ করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে মেধার কোনো বিকল্প হয় না। তরুণ গবেষকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘সর্বদা শুনিতে পাওয়া যায় যে, আমাদের দেশে যথোচিত উপকরণবিশিষ্ট পরীক্ষাগারের অভাবে অনুসন্ধান অসম্ভব এ কথা যদিও অনেক পরিমাণে সত্য, কিন্তু ইহা সম্পূর্ণ সত্য নহে ... আমাদের অনেক অসুবিধা আছে, অনেক প্রতিবন্ধক আছে সত্য, কিন্তু পরের ঐশ্বর্যে আমাদের ঈর্ষা করিয়া কি লাভ? অবসাদ ঘুচাও দুর্বলতা পরিত্যাগ কর মনে কর, আমরা যে অবস্থাতে পড়ি না কেন সে-ই আমাদের প্রকৃষ্ট অবস্থা ভারতই আমাদের কর্মভূমি, এখানেই আমাদের কর্তব্য সমাধা করিতে হইবে    
      শুধুমাত্র উদ্ভিদবিজ্ঞানে পদার্থবিদ্যার পদ্ধতির প্রয়োগ নয়, বহু ক্ষেত্রেই জগদীশচন্দ্র ছিলেন তাঁর সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের থেকে অনেকটা অগ্রসর।  ১৯৭৭ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন নেভিল মট, তাঁর মতে জগদীশচন্দ্র তাঁর সময়ের থেকে অন্তত ষাট বছর এগিয়ে ছিলেন। তিনি আরো বলেছেন যে পি বা এন শ্রেণির অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর হল আধুনিক ইলেকট্রনিক্সের প্রাণ, জগদীশচন্দ্রের গবেষণাতেই প্রথম তাদের ধারণা পাওয়া যায়।
      জগদীশচন্দ্র গবেষণা শুরু করেন তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ বিষয়ে, তিনি বিজ্ঞানী অলিভার লজের লেখা ‘হাইনরিখ হার্জ এন্ড হিজ সাকসেসরস’ বইটি পড়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। হার্জ ছিলেন এ বিষয়ে  সে যুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মাইকেল ফ্যারাডে দেখান যে তড়িৎ ও চুম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক আছে। ডায়নামোর সৃষ্টির মাধ্যমে বিদ্যুৎ সৃষ্টি হয়েছিল বলে ফ্যারাডের গবেষণাগারকে আধুনিক সভ্যতার আঁতুড়ঘর বললে অত্যুক্তি হয় না। জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল দেখান যে তড়িৎচৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত আছে এক তরঙ্গআলো একধরনের তড়িৎচৌম্বক তরঙ্গ। এরপর ১৮৮৬ সালে হার্জ নিজের ল্যাবরেটরিতে রেডিয়োতরঙ্গ সৃষ্টি করতে ও ধরতে সক্ষম হন।
      জগদীশচন্দ্র এই রেডিয়োতরঙ্গ বিষয়েই কাজ শুরু করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি প্রথম রেডিয়োতরঙ্গ তৈরি করতে এবং তা ধরতে সক্ষম হন। রেডিয়ো আবিষ্কারক হিসাবে যাঁদের নাম আসে, তাঁদের একজন, মার্কনি ১৮৯৭ সালে প্রথমবার প্রকাশ্যে পরীক্ষা করে দেখান। অপরজন হলেন রাশিয়ার আলেকজান্ডার পোপভ, তিনিও ১৮৯৫ সালের আগে কাজটা করে উঠতে পারেন নি। কিন্তু জগদীশচন্দ্র বেতার সম্প্রচার নয়, মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণাতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি তাঁর এই সংক্রান্ত গবেষণার কোনো পেটেন্ট নেননি। তার সুযোগ নিয়েছিলেন মার্কনি, যাঁদের মতো গবেষকদের বিজ্ঞানী ও বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক জে ডি বার্নাল বলেছেন ‘শৌখিন সুযোগসন্ধানী বিজ্ঞানকর্মী’।
      পেটেন্ট না নেওয়ার ক্ষেত্রে জগদীশচন্দ্রের চিন্তাধারা খুবই সুস্পষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন আবিষ্কারই মুখ্য, আবিষ্কারক গৌণ। তাঁর আবিষ্কারের ব্যবসায়িক ব্যবহারের এক প্রস্তাবকে ফিরিয়ে দিয়ে তিনি রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘বন্ধু, তুমি যদি এদেশের টাকার উপর মায়া দেখিতেটাকাটাকা কি. ভয়ানক সর্বগ্রাসী লোভ। আমি যদি এই যাঁতাকলে একবার পড়ি, তাহা হইলে উদ্ধার নাই। দেখ, আমি যে কাজ লইয়া আছি, তাহা বাণিজ্যিক লাভালাভের উপায় মনে করি না। আমার জীবনের দিন কমিয়া আসিতেছে, আমার যাহা বলিবার তাহার সময় পাই না ...’।  ব্যক্তি জগদীশচন্দ্রের ক্ষেত্রে এই মনোভাব নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু হয়তো এর ফল আমাদের দেশে বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের অনুকূল হয়নি। একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে বিজ্ঞানের জগতে তাঁর নিজের অবদান প্রতিষ্ঠার পক্ষে অন্তরক হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর এই মনোবৃত্তি।
      জগদীশচন্দ্র যে রেডিয়োতরঙ্গ তৈরি করেছিলেন তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য ছিল এক থেকে পাঁচ মিলিমিটার। তাঁর তৈরি গ্রাহকযন্ত্রের নাম তিনি দিয়েছিলেন কৃত্রিম অক্ষিপট বা আর্টিফিসিয়াল রেটিনা।  তিনিই প্রথম মিলিমিটার তরঙ্গ তৈরি করেছিলেন যা আজকাল কৃত্রিম উপগ্রহের সঙ্গে যোগাযোগে ও কম্পিউটার নেটওয়ার্কে ব্যবহার হয়। এই তরঙ্গের প্রতিফলন, প্রতিসরণ, অপবর্তন, সমবর্তন ইত্যাদি ধর্ম প্রমাণ করার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি দেয়। বেতারযন্ত্রে গ্রাহককে বলা হয় কোহেরার। মার্কনি যে কোহেরার ব্যবহার করেন, আধুনিক ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে তা জগদীশচন্দ্রের ডিজাইন মেনে তৈরি। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে রেডিয়ো আবিষ্কারক হিসাবে কোনো একজনকে চিহ্নিত করাটা অনৈতিহাসিক, অনেক বিজ্ঞানীই স্বাধীনভাবে এই বিষয়টিতে অবদান রেখেছেন।
      জগদীশচন্দ্রের সমর্থনে ভগিনী নিবেদিতার প্রয়াস সুবিদিত, তাঁর মাধ্যমেই জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের মার্কিন শিষ্যা সারা বুলের সঙ্গে জগদীশচন্দ্রের যোগাযোগ হয়েছিল। বিবেকানন্দের চেষ্টায় সারা বুল জগদীশচন্দ্রের হয়ে তাঁর এই কৃত্রিম অক্ষিপটের পেটেন্ট নিয়েছিলেন। এটি হল গ্যালেনা বা লেড সালফাইড নামক অর্ধপরিবাহী নির্মিত গ্রাহকযন্ত্র। জগদীশচন্দ্রই প্রথম অর্ধপরিবাহীকে এই কাজে ব্যবহার করেন। আধুনিক যুগে আলোর গ্রাহক হিসাবে অর্ধপরিবাহী নির্মিত ফটোডায়োডের ব্যবহার হয়, গ্যালেনাও সেই কাজে সক্ষম। এই বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়েই তিনি এন ও পি এই দুই শ্রেণির অর্ধপরিবাহীর সম্মুখীন হন এবং দেখেন যে এই দুই ধরনের অর্ধপরিবাহী দিয়ে তৈরি যন্ত্র তড়িৎপ্রবাহের সুপরিচিত ওহমের সূত্র মেনে চলে না। এই কাজের মধ্যে ভবিষ্যতের ডায়োডের ইঙ্গিত ছিল, কিন্তু জগদীশচন্দ্রসহ কোনো বিজ্ঞানীই সে কথা সে যুগে বুঝতে পারেননি। বিজ্ঞানের অগ্রগতির সেই স্তরে তা সম্ভবও ছিল না। তাঁর এই গবেষণা পরবর্তীকালে সলিড স্টেট ফিজিক্স বা কঠিন পদার্থের বিজ্ঞানের সূচনাতে কিছুটা সাহায্য করেছিল।  
      জগদীশচন্দ্র তাঁর অর্ধপরিবাহী গবেষণার তাৎপর্য যে বুঝতে পারেননি, তা তাঁর কথা থেকেই স্পষ্ট। ১৯০১ সালে তিনি যখন গ্যালেনা নির্মিত গ্রাহকযন্ত্রের কথা আলোচনা করছেন, তখন তিনি মূলত তা ব্যবহার করে বিদ্যুতের প্রভাবে জড় ও জীবের প্রতিক্রিয়ার উপর জোর দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে সংক্ষেপে তাঁর পদার্থবিজ্ঞান গবেষণার আলোচনা সমাপ্ত করা যাক। তিনি দুটি প্রিজম ব্যবহার করে রেডিয়ো তরঙ্গের তীব্রতা পরিবর্তনের যে পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন, তা ১৯৯৫ সালে আরিজোনার রেডিও মানমন্দিরে কাজা লাগানো হয়। রেডিয়ো তরঙ্গের জন্য প্রথম ওয়েভগাইড বা তরঙ্গচালক তাঁর সৃষ্টি। মাইক্রোওয়েভ বা মিলিমিটার ওয়েভে বহুলব্যবহৃত শিঙার মতো আকৃতির হর্ন অ্যন্টেনা তিনি তৈরি করেছিলেন। তিনি প্রথম সূর্য থেকে রেডিয়োতরঙ্গের কথা বলেন এবং অনুমান করেন যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে তাকে শোষণ করে নেয়। ১৮৯৭ সালের তাঁর সেই কথা প্রমাণ হতে সময় লেগেছিল আরো অর্ধেক শতাব্দী।
      জগদীশচন্দ্রের সাফল্য আলোচনার সঙ্গে সঙ্গেই বলতে হবে যে পদার্থবিজ্ঞানে ১৮৯৭ সালে ইলেকট্রন আবিষ্কারের সঙ্গে  যে নবযুগের সূচনা ঘটেছিল এবং কোয়ান্টম তত্ত্ব ও আপেক্ষিকতা তত্ত্ব যে বিপ্লব ঘটিয়েছিল, জগদীশচন্দ্র সে বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন ছিলেন। তিনি তখন গবেষণার নতুন ক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে তাঁর ছাত্র বিখ্যাত রসায়নবিজ্ঞানী জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মন্তব্য দিয়ে আলোচনার এই পর্যায়ের যবনিকা ফেলা যাক। ‘A physicist cannot help regretting that Bose should have left this promising and then unexplored region of physical investigations—in which he could have been a pioneer—for physics-physiological investigations, where his appearance was resented by the orthodox physiologists and his work was much hampered by their opposition.
      জগদীশচন্দ্রের গবেষণার কালকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমভাগ ১৮৯৫ সাল থেকে ১৮৯৯ সাল পর্যন্ত যখন তিনি বেতারতরঙ্গ বিষয়ে কাজ করেছেন। ১৮৯৯ সাল থেকে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা দিক পরিবর্তন করতে থাকে। গ্রাহক যন্ত্র নির্মাণের সময় তিনি দেখেন যে কিছু কিছু পদার্থ বারবার ব্যবহার করলে তাদের প্রতিক্রিয়া ক্রমশ শ্লথ হতে থাকে, কিন্তু সময় দিলে তারা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে। তাঁর সামনে সুযোগ এসেছিল কঠিন পদার্থের বিজ্ঞানের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার, কিন্তু জগদীশচন্দ্রের  প্রতিভা বেছে নিয়েছিল অন্য পথ। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর মনে আসে জীবের প্রতিক্রিয়া ও ক্লান্তির কথা। তিনি পরীক্ষা করে দেখান যে জড় ও জীবের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে খুব স্পষ্ট সাদৃশ্য আছে। এর থেকে তিনি ভাবতে শুরু করেন যে জড় ও জীবের মধ্যে একটা ঐক্য আছে। উপনিষদের মধ্যে তিনি তাঁর মতের সমর্থন খুঁজে পান। এই অত্যন্ত বিতর্কিত প্রসঙ্গে আলোচনা এই প্রবন্ধের পরিসরে করা সম্ভব নয়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি  প্রাচীন শাস্ত্রে তাঁর মতের সমর্থন খুঁজে নিতেই পারেন, কিন্তু অন্য বিজ্ঞানীদের কাছে, বিশেষ করে পশ্চিমের বিজ্ঞান জগতে, তাঁর এই ধরনের চিন্তা অনেকটাই অবৈজ্ঞানিক মনে হয়েছিল। জগদীশচন্দ্র এই নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন, কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনে হয়েছিল তিনি নিজের মতের সমর্থন করতে গিয়ে সেই পরীক্ষার ফলকেও ছাড়িয়ে অনেক দূর এগিয়ে যাচ্ছেন যা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একেবারেই অনভিপ্রেত।  একই সঙ্গে তিনি সেই সময় পা রাখছেন বিজ্ঞানের এক নতুন জগতে, উদ্ভিদবিজ্ঞানে, যে বিষয়ে তাঁর কোনো প্রথাগত শিক্ষা নেই। পদার্থবিদ্যা থেকে আহরিত তাঁর পদ্ধতি সে যুগের প্রতিষ্ঠিত উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে অবোধ্য ঠেকেছিল। এই দুইয়ের যুগপৎ ফল হল এই যে উদ্ভিদের শারীরবিদ্যা বিষয়ে তাঁর পরবর্তী গবেষণা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিজ্ঞানজগতে অনেকটাই অবহেলিত হয়ে পড়ে। ফলে সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ পথিক রয়ে গেছেন। ১৯০২ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত দ্বিতীয় বহুবিতর্কিত পর্বে তিনি জড় ও জীবের ঐক্য সন্ধান করেছেন। তৃতীয় পর্ব শুরু হয়েছিল ১৯০২ সালে যখন তিনি উদ্ভিদের শারীরবিদ্যাতে মনোনিবেশ করেছেন। প্রবন্ধ শেষের আগে আমরা খুব সংক্ষেপে এই তৃতীয় ভাগের দিকে চোখ রাখি।
      একটা কথা এখানে বলে রাখা প্রয়োজন। সাধারণভাবে শোনা যায় জগদীশচন্দ্র গাছের প্রাণ আছে একথা আবিষ্কার করেন। কথাটা সর্বৈব ভুল। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ উদ্ভিদের প্রাণের কথা জানে। জগদীশচন্দ্র দেখান যে বাইরে থেকে বিভিন্ন ধরনের উত্তেজনার প্রয়োগ করলে উদ্ভিদ ও প্রাণীর সাড়া একই রকম হয়। এই অতি সাধারণ কথাটা এখানে বলতে হল, কারণ পাঠ্য পুস্তক থেকে শুরু করে বহু জায়গায় এই ভ্রান্তি চোখে পড়ে।
      উদ্ভিদের শারীরবিদ্যা সংক্রান্ত জগদীশচন্দ্রের গবেষণার প্রথমেই বলতে হয় তাঁর তৈরি নানা অত্যন্ত সুবেদী যন্ত্রের কথা যার সাহায্যে তিনি উদ্ভিদের নড়াচড়াকে কোটিগুণ পর্যন্ত বিবর্ধিত করে দেখিয়েছেন। এসের অদ্যে রয়েছে ক্রেস্কোগ্রাফ, রেসোন্যান্ট রেকর্ডার, প্লান্ট ফাইটোগ্রাফ, ফটোসিন্থেটিক রেকর্ডার, ইত্যাদি যন্ত্র। এই সমস্ত যন্ত্রের সাহায্যে তিনি দেখালেন যে আপাতদৃষ্টিতে যে উদ্ভিদ নড়াচড়াতে সক্ষম নয়, তারাও লজ্জাবতী লতা বা বনচাঁড়াল উদ্ভিদের মতোই সাড়া দেয়, শুধুমাত্র তাদের সাড়া অনেক মৃদু। বিষ প্রয়োগে তাদের মৃত্যুযন্ত্রণা প্রাণীরই অনুরূপ। তিনি দেখান যে উদ্ভিদের এ ধরনের সাড়া বিদ্যুৎনির্ভর। বাইরে থেকে প্রয়োগ করা উত্তেজনার প্রভাবে উদ্ভিদের দেহে বিদ্যুৎপ্রবাহ নিয়ে তিনি কাজ করেন। কোশের মধ্যে তড়িৎদ্বার প্রবেশ করিয়ে তিনি দেখান যে ফ্লোয়েম ও প্রোটোজাইলেম কলার মধ্য দিয়ে এই প্রবাহ হয়। সে সময় তাঁর এই মত প্রায় কেউ স্বীকার না করলেও পরবর্তীকালে উদ্ভিদের শরীরে তড়িৎ মাধ্যমে সঙ্কেত বহন ও তার পর্যায়ক্রমিক আচরণের মাধ্যমে জৈব ছন্দের সমর্থনে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। উদ্ভিদের বৃদ্ধির উপর আলো, তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ, রেডিয়োতরঙ্গ ইত্যাদির প্রভাব তিনি নিরূপণ করেন। তিনি বলেন যে উদ্ভিদের কোশ ব্যাটারি বা তড়িৎচালক কোশের মতোই শক্তি সঞ্চয় করে রাখে। আলোকের বিকিরণের প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের শক্তি কোশে জমা থাকে ও বৃদ্ধি ইত্যাদি শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতে কাজে লাগে।
      সালোক সংশ্লেষের সময় বেরোনো অক্সিজেনের মাত্রা তিনি মেপেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন যে এই প্রক্রিয়ায় কিছু উদ্ভিদ ম্যালিক অ্যাসিড তৈরি করে। উদ্ভিদের মূল থেকে পাতায় জল যাওয়ার পদ্ধতির নাম রসের ঊর্ধ্বগমন। সাধারণভাবে মনে করা হয় যে এর জন্য দায়ী, শিকড়ের চাপ, জাইলেম কলার কৈশিকতা এবং গাছের পাতার প্রস্বেদন প্রক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট টান অর্থাৎ একেবারেই ভৌত প্রক্রিয়া।। জগদীশচন্দ্র সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে এই জলশোষণ উদ্ভিদ কোশের স্বাভাবিক ধর্ম। সে সময় অবশ্য তাঁর মতকে অবহেলা করা হয়েছিল। কিন্তু এক শতাব্দী পরেও যে রসের ঊর্ধ্বগমন প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, তার থেকে বোঝা যায় যে উদ্ভিদবিজ্ঞানে শিক্ষিত না হয়েও তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে চিহ্নিত করে তার সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানে তাঁর আরো নানা উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে, কিন্তু স্থানাভাবে তা নিয়ে আলোচনা করা গেল না।
      জগদীশচন্দ্র তাঁর গবেষণার কথা সাধারণের জন্য বাঙলায় লিখে প্রকাশ করতেন, সেই যুগে এটা খুব কম কথা ছিল না। এর জন্য তাঁকে বিজ্ঞান সংক্রান্ত পরিভাষা সৃষ্টি করতে হয়েছিল।  রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ও নিবেদিতা তাঁর গবেষণাতে আগ্রহী হয়েছিলেন। পরাধীন ভারতে বিশেষ করে শিক্ষিত বাঙালীদের মধ্যে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা বিষয়ে একটা কৌতূহল জেগেছিল। জগদীশচন্দ্রের সাফল্য ছিল ভারতীয়দের ক্ষমতা সম্পর্কে ইংরেজদের তাচ্ছিল্যের মনোভাবের সমুচিত প্রত্যুত্তর। জগদীশচন্দ্র নিজেও নবজাগ্রত জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমকেই তাঁর গবেষণার প্রেরণা হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।
        জগদীশচন্দ্রের বিজ্ঞান গবেষণা বিষয়ে ইতি টানার আগে একটা কথা বলা প্রয়োজন। তাঁর গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যোগ্য উত্তরসূরি আসেনি। তার কারণ আলোচনার জন্য পৃথক নিবন্ধের প্রয়োজন। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে সেই সময় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসছিল, যার ফলে ছাত্ররা সেই দিকেই আকৃষ্ট হচ্ছিল। প্রফুল্লচন্দ্র বা রমন কলকাতাতে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে যে ধরনের পরম্পরা বা স্কুল তৈরি করেছিলেন, নিজের গবেষণা প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও জগদীশচন্দ্রের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। জীববিজ্ঞানের সীমাহীন সম্ভাবনার কথা আমরা আজ বলে থাকি, কিন্তু সে যুগে তার কথা কারো মাথায় আসেনি। ফলে সারা জীবনই জগদীশচন্দ্র নিঃসঙ্গ পথিক রয়ে গেলেন।

প্রকাশঃ জাগ্রত বিবেক নভেম্বর ২০১৮

Monday, 24 December 2018

অসি নদীর তীরে


ম্যাজিক ল্যাম্প ওয়েবজিনের শারদীয় ২০১৮ সংখ্যায়  প্রকাশিত গল্প। পত্রিকার লিঙ্ক দেয়া রইল।
http://www.magiclamp.net.in/2018/10/blog-post_68.html
অলঙ্করণ করেছেন পার্থ মুখার্জী, তাঁকে ধন্যবাদ।

গল্পটা নিচেও দেওয়া রইল।







অসি নদীর তীরে

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

দিতির কথা
        ‘দিতি, দিতি?’
        কাল সেই লাল তারাটাকে সূর্য ডোবার পরে দুটো পাহাড়ের মাঝখানে উঠতে দেখেছি, আজকেই রওনা হতে হবে। তাই সকালবেলাটা খুব ব্যস্ত। এর মধ্যেই নমুচি দৌড়ে দৌড়ে আসছে। ছেলেটা বড্ড চঞ্চল। ‘কী হল? এখন গোছগাছ করার সময়, বিরক্ত করছিস কেন?
        ‘অদিতি বলছে ওরা আমাদের সঙ্গে যাবে না নমুচি হাঁপাতে হাঁপাতে বলে।
        ‘যাবে না মানে? কারা যাবে না? কোথায় যাবে না?’ বুঝতেই পারছিলাম না নমুচি কী বলছে।
        ‘ওরা এই জায়গাটাতেই থাকবে। তুই একটু অদিতির সঙ্গে কথা বল। ও না গেলে শ্রীও নির্ঘাত থেকে যাবে
        আচ্ছা -- শ্রী আমাদের সঙ্গে যাবে না, এটাই তাহলে নমুচির চিন্তার কারণ। আমি শরঘাসের মাদুরটাকে দড়ি দিয়ে বাঁধছিলাম, হাতের কাজটা শেষ করে উঠে দাঁড়ালাম। ‘ঠিক আছে। তুই যা, তোর জিনিসপত্র ঠিকঠাক কর। আমি অদিতির কাছে যাচ্ছি 
        যাব বটে, কিন্তু অদিতি আমার কথা শুনবে কিনা সন্দেহ। আমার মা দনু ছিল আমাদের দলের প্রধান। মাত্র তিন চাঁদ আগে একা একা জঙ্গল থেকে ফেরার সময় আমার মায়ের উপর একটা সিংহ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। মা লড়াই করে সিংহটাকে মেরে ফেলেছিল, কিন্তু নিজেও বাঁচেনি। মায়ের পর আমাদের দলের প্রধান কে হবে, সেই নিয়ে অনেক ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল। অদিতির মা আর আমার মা ছিল বোন। অদিতি ভেবেছিল ও আমার থেকে বড়, তাই ওই এবার থেকে আমাদের দলটাকে চালাবে। অদিতির দিকেও কিছু মহিষ ছিল, কিন্তু বেশি লোকজন আমাকেই চেয়েছিল। তাই আমিই আমার মায়ের জায়গা নিয়েছি। জানি অদিতি আমাকে পছন্দ করে না, কিন্তু অদিতিরা থেকে যাবে মানে কী? চিরকাল বৃষ্টি শুরুর ঠিক আগে আগে আমাদের এই জায়গা ছেড়ে যেতেই হয়। আমার মায়ের কাছে শুনেছি, তার মায়েরাও এই সময় পাহাড়টাকে টপকে উল্টো দিকে চলে যেত, আবার শীত শেষ হলে ফিরে আসতনমুচি কী শুনতে কী শুনেছে! তবু অদিতির কাছে যাওয়ার আগে শুক্রকে ডেকে নিলাম ওর বুদ্ধির উপর আমার সবচেয়ে বেশি ভরসা।
        অদিতি তাঁবুর বাইরে বসে ছিল, যাওয়ার জন্য কোনো গোছগাছই শুরু করে নি। ‘অদিতি, তুই নাকি আমাদের সঙ্গে যাবি না?’
        অদিতি অন্যদিকে মাথা ঘুরিয়ে রেখেই জবাব দিল, ‘ঠিকই শুনেছিস। আমরা এই নদীর ধারটাতেই থেকে যাব
        ‘থেকে যাবি মানে? আমাদের মা দিদিমারা কোনোদিন এখানে বর্ষা কাটিয়েছে? মহিষাসুর কালকেই মোষের পালকে এই জঙ্গল থেকে পাহাড়ের পিছনে পাঠিয়ে দিয়েছে। চিরকাল আমরা মহিষরা ওদের সঙ্গে যাই। জঙ্গলে হরিণ, ছাগল, নীলগাই – কিছুই তো নেই। শেষ হরিণ মেরেছি এক সপ্তাহ হয়ে গেলতুই খাবি কি?‘
        ‘ঘাসের বীজ খাব। নদীর পারে ওই মাঠের ওপর ঘাসের বীজ ছড়িয়ে দিয়েছি, দেখবি তার থেকে নতুন বীজ পাব। নদীর থেকে মাছ ধরব। জন্তুর দরকার নেই। জঙ্গলে অনেক বিপদ – সিংহ, ভাল্লুক, নেকড়ে, হাতিতোর মাটাও তো জঙ্গলেই মরল। মাছ আর ঘাসের বীজ – এতেই আমাদের চলে যাবে এবার অদিতি আমার দিকে তাকাল। ‘তোর ছেলে মেয়ে হয়নি এখনো, তুই দল চালানোর কী জানিস? তোর দলে আমরা আর থাকব না। আমি একা নই, আরো অনেকে আমার সঙ্গে থাকবে
        ‘আমি তোর অনেক পরে জন্মেছি, তাই এখনো আমার ছেলেমেয়ে হয়নি। সেটা কি আমার দোষ? বেশি লোক চেয়েছে বলেই তো আমি দলটাকে চালাই। তুই বোকা, তাই বুঝতে পারছিস না বৃষ্টির পরে নদীটা ফুলে উঠবে। ঘাস তো মরে যাবে, তখন তোরা খাবি কী?’ আমার রাগ হয়ে গেল।
        আমার কোনো কথা অদিতি শুনলই না। শুক্রও অনেক বোঝাল। সবচেয়ে খারাপ লাগল যে শুধু অদিতি নয়, আরো কয়েকটা মহিষ ওর সঙ্গে থেকে গেল। শ্রী নমুচির সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু অদিতি ছোটবোনকে মারধোর করে তাঁবুর মধ্যে বেঁধে রেখে দিয়েছিল।
        সেদিন যখন আমরা বাকিরা রওনা হলাম, সূর্য মাথার উপরে। আমি আর নমুচি ছিলাম সবার পিছনে ‘চিন্তা করিস নাকদিন পরই ওরা ঠিক বুঝতে পারবে এখানে থাকলে ওরা বাঁচবে না। দেখবি এক চাঁদও যাবে না, ওরা হাজির হয়ে যাবে আমি নমুচিকে বললাম।
        শুক্র ছিল কাছেই। আমার কথা শুনে শুধু বলল, ‘নারে দিতি, হয়তো ওরা আর আমাদের সঙ্গে আসবে না
        ‘না এলেও আমরা তো শীত পেরোলেই আবার আসব। নমুচি, ততদিন যদি ওরা টিকে থাকে, তাহলে শ্রীকে আবার দেখতে পাবি

                                        *       *       *

        ভোর হয়েছে। তাঁবু থেকে বেরিয়ে দাঁড়ালাম। পাহাড় থেকে নেমে এসেছি গতকাল।
        ‘মা,’ নিশুম্ভও ওর তাঁবু থেকে বেরিয়েছে। ‘কালকেই পৌঁছে যাব
        হ্যাঁ, কালকেই আমাদের পুরানো জায়গায় পৌঁছে যাব। এখানে এলেই অদিতির কথা মনে আসে। শুক্রই ঠিক বলেছিল, অদিতিরা আমাদের সঙ্গে আর আসেনি। ওরা নদীর কাছেই থেকে গেছে আর একেবারে অন্য রকম জীবন বেছে নিয়েছে। আমরা মহিষাসুরের বংশ। ছোটোবেলা থেকে বুড়োবুড়িদের কাছে শুনে আসছি যে মহিষাসুর আমাদের মহিষদের মাঠ জঙ্গল নদী সব দিয়ে দিয়েছিল, তার বদলে শুধু মোষের পালের পিছন পিছন যেতে বলেছিল। মহিষাসুরের কথা শুনতেই হয়, সবাই জানি সে রেগে গেলে পাহাড়ের থেকেও বড় বুনো মহিষ হয়ে আসে। তার নিঃশ্বাসে আগুন বেরোয়, শিংগুলো গিয়ে তারাতে ঠেকে। গোটা দলকে সে পায়ের তলায় পিষে মারবে। চিরটা কাল তাই আমরা মহিষরা মোষের পালের পিছনে পিছনে যাই বর্ষা থেকে শীত, এই সময়টা কাটাই পাহাড়ের ওপারে, বাকিটা নদীর পাশে। কিন্তু অদিতিরাও তো মহিষ, ওরা যে মোষের দলের পিছনে না গিয়ে এক জায়গায় থেকে গেল, মহিষাসুর কি সেটা দেখতে পায়নি? তা না হলে অদিতিরা বেঁচে গেল কেমন করে?
        অদিতিরা যে বর্ষায় নদীর ধারে থেকে গিয়েছিল, তার পরের বসন্তে আমরা আবার ফিরে আসি এইখানে। আমার বড় ছেলে শুম্ভ তখন পেটে। এসে দেখলাম অদিতিদের সঙ্গে কয়েকটা নেকড়েও যোগ দিয়েছে। নেকড়েদের সঙ্গে আমাদের মহিষদের কোনোদিনই সদ্ভাব নেই। ওরা থাকত নদীর উল্টো পারে। একবার নদী পেরিয়ে এসে একটা জোয়ান মোষকে শিকার করেছিল। সেই নিয়ে আমাদের সঙ্গে ওদের তিনদিন যুদ্ধ হয়েছিল। পাঁচজন মহিষ আর সাতজন নেকড়ে মারা যাওয়ার পরে নেকড়েরা নদী পেরিয়ে পালিয়ে যায়। সেই নেকড়েদের সঙ্গে মহিষদের বন্ধুত্ব কেমন করে হয়?
        প্রতিবার অদিতিদের দলটাকে দেখি আর অবাক হয়ে যাই। ওরা মহিষাসুরকে আর মানে কিনা কে জানে। আমার তো মনে হয় ওরা ঘাসকে পুজো করে -- সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত দেখি তার জন্যই কাজ করে যায়। যে ঘাসের বীজের জন্য এত করে, তার আবার একটা নাম দিয়েছে – ধানগাছ। এক তো মাঠের পর মাঠ ধানগাছ লাগিয়েছে সারাক্ষণ সেই দিকেই নজর -- পাখি তাড়াচ্ছে, ধানগাছের পাশ থেকে অন্য ছোটো গাছ উপড়ে দিচ্ছে, নদী থেকে জল তুলে এনে দিচ্ছে প্রতি বছর এসে দেখি নতুন নতুন জায়গায় ধানগাছ -- তার জন্য এমনকি জঙ্গলেরও একটা দিক কেটে পরিষ্কার করেছে। শিকারে যায় না বললেই হয়। খালি যে হরিণগুলো ওদের ধানগাছ খেতে আসে, তাদের মেরে মাংস খায়। মোষের দলকে অবশ্য মারে না, তাড়িয়ে দেয় -- তা না হলে আমাদের সঙ্গে লড়াই বেঁধে যেতকোনো বুড়ো মোষ যখন আর হাঁটতে পারে না, তখন তাকে মেরে তার মাংস খেলে মহিষাসুর কিছু মনে করে না। কিন্তু বাচ্চা কি জোয়ান মোষের গায়ে আমাদের মহিষদের মধ্যে যদি কেউ হাত ঠেকাই, তাহলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। তা না হলে মহিষাসুর আমাদের সবাইকে মেরে ফেলবে।
        পরের দিন আমরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নদীর ধারে পা দেব। এবারে নতুন কী দেখব মহিষাসুরই জানে।

*       *       *

        নদীর ধারে আমাদের পুরানো জায়গা – সেখানে আমি আর শুক্র তাঁবু খাটাচ্ছি, এমন সময় শুম্ভ এসে বলল, ‘তোরা একটু এদিকে আয়। ঝামেলা করছে
        একটা লোক দেখি খুব চেঁচামেচি করছে। আমি চিনি না যখন, নিশ্চয় নেকড়ে ছিল, অদিতির দলে ভিড়েছেআমি গিয়ে বলি, ‘কী হল?’
        ‘তোরা আমার জায়গায় থাকতে পারবি না। এখুনি চলে যা, না হলে জোর করে বার করে দেব লোকটা তড়পিয়ে বলে। শুম্ভ মনে হল হাসি চাপছে। স্বাভাবিক। লোকটা আমার থেকেও বেঁটে, শুম্ভের পাশে  একেবারে বাচ্চা ছেলের মতো লাগছে-- একবারেই না খেতে পাওয়া রোগা চেহারা। সে নাকি আমাদের জোর করে বার করে দেবে!
        ‘তোর জায়গা মানে? জমি কি তোর আমার হয় নাকি? তুই তো এখানে ঘাস লাগাসনি যে আমরা এখানে থাকলে তোর ঘাস মরে যাবে। তাহলে?’ আমি অবাক হয়ে বলি। জমি তো মহিষাসুর সবাইকে দিয়েছে, কিন্তু কোনটা কার কী করে বলব? আমরা যখন মরার পরে মাটির তলায় মহিষাসুরের রাজ্যে যাব, তখন কী জমি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারব নাকি?
        ‘হ্যাঁ, এটা আমার জমি। আমি এখানে ঘাস লাগাব কি না, সেটা আমার ব্যাপার। তোদের এখানে থাকতে দেব না
        ‘প্রতি বসন্তে আমরা এখানেই তাঁবু গাড়ি। তুই বললেই হল এই জায়গা তোর? আমরা এখানেই থাকব। তুই যা পারিস করে নে 
        কিছুক্ষণ পরের কথা। আমি নদী থেকে জল আনতে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে একজন আমাকে ডাকল। দেখি অদিতি কয়েক বছর ওকে দেখিনি, ইচ্ছা করেই বোধহয় এতদিন আমাদের এড়িয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু এ কী চেহারা হয়েছে! প্রথমে চিনতেই পারছিলাম না। ওর আর আমার বয়সের ফারাক আর কতটুকু, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে ও যেন অনেক বড়। চামড়া ঝুলে গেছে, অর্ধেক চুল উঠে গেছে, কুঁজো হয়ে হাঁটছে।
        ‘দিতি, তোরা বৃকভানুর জায়গা দখল করেছিস। অন্য জায়গায় যা
        ‘প্রতিবারই তো আমরা ওই জায়গাটাতেই থাকি। ওটা ওর হল কেমন করে? ও কি জায়গাটা বানিয়েছে?’
        ‘গ্রামে নিয়ম হয়েছে কেউ যদি কোনো জায়গা প্রথমে নিজের বলে নিয়ে নেয়, তাহলে অন্যরা আর তাকে না বলে সেখানে কিছু করতে পারবে না। বৃকভানু নদীর ধারে ওই জায়গাটা নিয়েছে
        ‘গ্রাম কাকে বলে?’ আমি জানতে চাইলাম।
        ‘আমরা যেখানে থাকি, সেই জায়গাটাকে বলি গ্রাম’ হ্যাঁ, ওরা তো এখন আর আমাদের মতো ঘুরে বেড়ায় না। আমি দূর থেকে দেখেছি, ওরা কাদার তৈরি তাবুতে থাকে। দরকার মতো গুটিয়ে নেয়া যায় না, সেরকম তাঁবু কী কাজে লাগে কে জানে?
        ‘দেখ অদিতি, বৃকভানু তো জায়গাটাকে নিজের বলার আগে আমাদের জিজ্ঞাসা করেনি। আমরা ওর কথা শুনব কেন?’
        ‘দিতি,তোরা তো কোথাও বেশীদিন থাকিস না-- তোদের কাছে সব জায়গাই সমান। ওর জমিটুকু ছেড়ে দে তোরা সামনের ঝোরাটার পাশে চলে যা। ওই জায়গাটা কারোর নয়      
        ‘ঠিক আছে, তুই তো নিয়মটা জানিস। আমি এক একা ঠিক করতে পারি না -- বাকিদের সঙ্গে কথা বলি 
        ‘আচ্ছা অদিতি একটু ইতস্তত করে বলল, ‘যাবি নাকি আমার সঙ্গে, দেখবি আমি কেমন আছি?’
        এত দিন কেটে গেছে বলেই বোধহয় অদিতির সুর অনেক নরম। নাকি ও দেখাতে চায় আমাদের দলের থেকে বেরিয়ে গিয়ে ও কত ভালো আছে? আমারও কৌতূহল হচ্ছিল, জলভরা ভারি চামড়ার থলিটা একটা গাছের ডালে ঝুলিয়ে দিলাম। ‘চল
        অদিতি বলল, ‘তোর ভিস্তিটা সঙ্গে নিবি না? যদি কেউ নিয়ে নেয়?’
        ‘এখানে তো আমরা মহিষরাই আছি। যদি আমাদের মধ্যে কারোর দরকার হয়, নিয়ে যাবে। তাতে অসুবিধা কী?’
        আমার দিকে কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাল অদিতি, তারপরে বলল, ‘চল তাহলে
        বর্ষার জল যাতে না পৌঁছোয়, সেজন্য অদিতিদের থাকার জায়গাটা নদীর থেকে একটু দূরে। হাঁটতে হাঁটতে বললাম, ‘শ্রীকে অনেকদিন দেখিনি।’
        ‘ভালোই আছে। ওর ছেলেমেয়েরা গ্রামের দক্ষিণদিকের অনেকটা জমিতে ধানগাছ লাগিয়েছে। শ্রী সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ওদিকেই থাকে, যে পাখিগুলো ধান খেতে আসে সেগুলোকে তাড়ায়
        ‘আর তোর ছেলে?’
        ‘কোন ছেলের কথা বলেছিস?’
        ‘মিত্রের কথাই তো জানি। তোর কয় ছেলে?’
        ‘আমার ছেলেমেয়ে মিলিয়ে মোট বারোজন। আর মাটির তলায় রেখেছি আরো পাঁচজনকে
        আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ‘বারো আর পাঁচ। মানে ...’ আঙ্গুলে গুনে হিসেব করি, ‘তেরো, চোদ্দ, পনেরো, ষোলো, সতেরো সতেরোটা বাচ্চা হয়েছে তোর? তার মধ্যে পাঁচটা মারা গেছে!’
        হ্যাঁ। আমাদের সকলেরই অনেক ছেলেমেয়ে। ধানগাছের দেখাশোনা করতে সবসময়েই লোক লাগে
        ‘তাহলে তোদের দলে এখন কত লোক আছে?’
        ‘তা বাচ্চা বুড়ো সব মিলিয়ে আট কুড়ির বেশি। বাচ্চাই বেশি
        অদিতিরা বেরোনোর আগে আমরা ছিলাম সাত কুড়ি মহিষ। দেড় কুড়ি শীত পার করে তবে আমরা আবার তার কাছে পৌঁছেছি। অথচ ওদের দলে প্রথমে ছিল দুই কুড়িরও কম। কয়েকটা নেকড়ে এসেছিল বটে। কিন্তু সে আর কজন! এক কুড়ি হবে। ‘শ্রীর ছেলেমেয়ে কটা?’
        ‘ওর ছেলেমেয়ে কম, মাত্র পাঁচটা। তিন চার বছরে একটা বাচ্চা হচ্ছিলতাই তো ওর খুব দুঃখ  
        অদিতির কথায় বুঝলাম ওদের মেয়েদের বয়স হলে প্রায় প্রতি বছরই বাচ্চা হয়। তার অর্ধেকই বাঁচে না। তবু প্রতি বছরই বাচ্চা হতে হয়!
        অদিতির সঙ্গে গেলাম ও যেটাকে গ্রাম বলছে সেই জায়গায়। কি বিচ্ছিরি গন্ধ! কুকুরগুলোর না খেতে পাওয়া চেহারা। যেদিকে তাকাই বাচ্চাকাচ্চা, ধুলোকাদা মাখামাখি করে খেলছে।
        বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। শরীর খারাপ লাগতে শুরু করেছিল।

নিশুম্ভের কথা
        ‘অদিতি নেই?’ দিতি বলল।
        ‘না, অদিতি নেই। শুধু অদিতি কেন, শ্রী, মিত্র, সরস্বতী এরাও মরে গেছে। তুই যাদের চিনতিস, তাদের প্রায় কেউ বেঁচে নেই’ প্রতি বছর যখন পাহাড় পেরিয়ে  আসি, দেখি গ্রামটা আরো বড় হয়েছে।  কিন্তু এবার অদিতিদের কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুম্ভকে অদিতির খোঁজে পাঠিয়েছিল দিতি, ওর কাছেই  শুনছিলাম।
        ‘কী হয়েছিল?’ ঠিকই প্রতিবারই ওদের যেন আরো জবুথবু দেখতাম। খুব তাড়াতাড়ি বুড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা বলে চারজনেই একই বছরে মরে যাবে?
        ‘গ্রামের কেউ জানে না। কিন্তু শীতের পরেই এক অদ্ভুত রোগ এসেছেগায়ে গুটি বেরোচ্ছিল। যাদের হয়েছে, তাদের অর্ধেক আর বাঁচে নি। বাকিদেরও মুখেচোখে এমন গর্ত গর্ত হয়ে গেছে যে দেখলেই ঘেন্না পাবে। ওদের পুরুত বলেছে নাকি শাপ লেগেছে
        এই আর এক নতুন নাম গত কয়েক বছর ধরে শুনছি। পুরুত। ভাবতেই পারি না মহিষাসুরের কাছে আমার কথা পৌঁছোতে গেলে নিজে বললে চলবে না, পুরুত বলে একটা লোক লাগবে!
        ‘শুম্ভ সকলকে বল এখান থেকে আমরা দূরে কোথাও চলে যাব। ওদের ওপর মহিষাসুরের অভিশাপ লেগেছেএখানে থাকলে আমরা কেউ বাঁচব না,’ দিতি বলল।
        সূর্য ডোবার আগে আমরা আমাদের তাঁবু গুটিয়ে নিলাম। যেতে যেতে একবার ফিরে তাকালাম পুরানো জায়গার দিকে।     

*       *       *

        আবার বর্ষার পর পাহাড় পেরিয়ে আসা। আমারও বয়স হয়েছে। ছোটোবেলাতে সেই প্রথমবার যখন নদীটার ধারে নিজের পায়ে হেঁটে এসেছিলাম, পাহাড় পেরিয়েছিলাম যাদের সঙ্গে, তাদের সকলকেই মহিষাসুর ডেকে নিয়েছে। গত শীতে দিতিও মহিষাসুরের কাছে চলে গেছে। চার কুড়ি আটটা শীত দিতি দেখেছিল, আমাদের দলে কখনো কেউ এতদিন বাঁচেনি। শুম্ভ অনেক আগেই সাপের কামড়ে মরে গেছে। তার পরে পরেই বাজপাখিদের সঙ্গে আমাদের লড়াই হয়েছিল। ওরা একটা জোয়ান মহিষকে মেরেছিল।  যুদ্ধে বাজপাখিদের হারিয়ে দিয়েছি আমরা, কিন্তু আটজন মহিষও মারা যায়। পুরানোদের মধ্যে আমিই শুধু পড়ে আছি। 
        দিতির কাছে শুনেছিলাম এই নদীর ধারে গ্রাম শুরু করেছিল দু কুড়ি লোক, তাদের প্রধান ছিল অদিতি বলে একটা মেয়ে। আমি অদিতিকে ছোটোবেলায় দেখেছিলাম। দিতি বলেছিল অদিতি নাকি ওর থেকে মাত্র কয়েক শীত বড়। কিন্তু আমি অদিতিকে যখন দেখেছি, এমন দেখতে হয়ে গিয়েছিল যে দিতি মরার সময়েও ও রকম বুড়ো হয়নি। অদিতির অনেক ছেলেমেয়ে। বড়ো দুই ছেলে মিত্র আর বরুণকে আমার মনে আছে। আর মনে আছে অদিতির বড়ো মেয়ে সরস্বতীর কথা।
        অদিতি, মিত্র, সরস্বতী সবাই একই বসন্তে মহিষাসুরের অভিশাপে মারা গিয়েছিল। সে বছর অনেক লোককেই মহিষাসুর টেনে নিয়েছিল। এমন নাকি হয়েছিল যে মাটিতে দেওয়ার লোক পাওয়া যাচ্ছিল না। কিন্তু এখন আবার ওদের গ্রামে অনেক লোক। নেকড়ের দলটা আর নেই, অধিকাংশই এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। বাকি নেকড়েগুলো নাকি চলে গেছে, কোথায় কেউ জানে না। 
        শিকার তো এরা কবে ছেড়ে দিয়েছে। চারদিকের জঙ্গল কেটে ধানগাছ লাগিয়েও নাকি ওদের খাওয়া জুটছিল না। তাই কিছু লোক কিছুটা আরো একটা গ্রাম বানিয়েছে। সেটার আবার একটা নাম দিয়েছে, বরুণা। অদিতির ছেলে বরুণ নাকি এখানে প্রথম এসে থেকেছিল। পুরানো গ্রামটাকে ওরা বলে পুর। প্রথম যখন এই রকম নাম শুনেছিলাম, খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জায়গার আবার নাম হয় নাকি? এই যে আমরা তাঁবু খাটিয়েছি এই মাঠটাতে, এটাই আমাদের জায়গা। এই জায়গার যদি একটা নাম দিই, বর্ষার আগে আমরা যখন এখান থেকে চলে যাব, তখন কি নামটাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব? কিন্তু এখন একটা কথা বলতেই হয়, পুর আর বরুণার নাম দেওয়াতে দুটো গ্রামকে আলাদা করতে সুবিধা হচ্ছে। 
        আরো একটা কাজ ওরা করেছে নদীটাকে এমন ভাবে ঘুরিয়ে দিয়েছে যে জলটা বর্ষাকালে আর গ্রামগুলোতে বা ঘাসের ক্ষেতে উঠে আসে না। তাই প্রতি বছর বর্ষার সময় গ্রামটাকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়ার দরকার পড়ে না। ওরা বলে নদীতে বাঁধ দিয়েছে। নদীকে যে বাঁধা যায়, না দেখলে বিশ্বাস হত না। একটা বড় হ্রদ মত হয়েছে, তার থেকে আবার গর্ত কেটে জল ক্ষেতে ঢুকিয়েছে। যে এই পুরো কাজটা দেখভাল করেছে, তাকে আমি চিনি। বিশ্বকর্মা নাম তার।
        দিতির পরে আমাদের দলের প্রধান হয়েছে নিকষা। ও আমাকে বলতে এসেছিল কাল হরিণের ছাল নিয়ে বরুণাতে যাওয়া হবে। তার বদলে কী পাওয়া যায় দেখি। আমিও যেন ওদের সঙ্গে যাই

*       *       *

        ‘তুই অদিতিকে দেখেছিস?’ লোকটা খুব অবাক হয়ে গেছে।
        ‘হ্যাঁ। আমি তখন ছোটো। প্রতিবছর তো আমরা এখানে আসি। তখন দেখা হত
        লোকটা কেমন অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকাল। বলল, ‘তুই বরুণকেও চিনতিস?’
        ‘চিনব না কেন? বরুণ আর আমি একই বছর জন্মেছিলাম
        ‘বরুণ আমার মায়ের বাবা কিন্তু আমি দেখিনি, আমার জন্মের আগেই দেবতাদের কাছে চলে গেছে বরুণকে চিনত এমন একজনও বেঁচে নেই।’
        ‘দেবতারা কারা? বরুণ তো মরে গেছে। মরার পরে আমরা তো মহিষাসুরের কাছে চলে যাই।’
        লোকটা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাল। বলল, ‘সে তোরা অসুররা যাস হয়তো। ভালো কাজ করলে, ঠিকমতো পুজো দিলে দেবতাদের রাজা ইন্দ্র আমাদের ডেকে নেয়। পুজো আমরা সবাই দিই, ইন্দ্র রাগ করলে বৃষ্টিই হবে না, তাহলে ধান জন্মাবে কেমন করে? ছাড় ওসব কথা, ও পুরুতের ব্যাপার
        ওরা তাহলে নিজেদের আর অসুর মনে করে না। সে যা পারে করুক, ওদের ভুল ভাঙানোর দায়িত্ব আমার নয়। বরঞ্চ দেখি ছালটার বদলে কী পাই।
        হরিণের ছালটায় হাত বুলিয়ে লোকটা বলল, ‘দু থলি ধানের বীজ দেব এটার বদলে
        ঘাসকে ওরা বলে ধানসব কিছুই ধানের বীজ হিসাবে মাপা হয়। আমার একটা ছোট ছুরি দরকার ছিল, কিন্তু পুরের কামার ধান ছাড়া কিছু নেবে না। একদিক দিয়ে অবশ্য ভালোই হয়েছে, না হলে এত ঘাসের বীজ নিয়ে আমি কী করতাম? ‘তিন থলি লাগবে
        একটু না না করে লোকটা রাজি হয়ে গেল। চলে যাওয়ার সময় ওর চোখ পড়ল আমি কোন জিনিসের উপর বসে আছি। বলল, ‘সিংহের চামড়াটার জন্য কত নিবি?’
        ‘এটা দেওয়ার নয়। আমি প্রথম একা যে সিংহটাকে মেরেছিলাম, এটা তার চামড়া। এই চামড়া আমরা কাউকে দিই না, নিজের নিজের কাছেই রাখি। মরার পরে এটা আমার সঙ্গে পুঁতে দেওয়া হবে। এটা পরেই তখন মহিষাসুরের মুখোমুখি হব।’
        বরুণা থেকে আসার সময় আবার লোকটাকে দেখলাম। আরেকজনের সঙ্গে কথা বলছিল আর আমার দিকে দেখাচ্ছিলকয়েকটা ছাড়া ছাড়া শব্দ শুনতে পেলাম। দানব, অসুর, জাদু, অমর, দৈত্য – এই রকম কয়েকটা কথা। কী বোঝাচ্ছিল কে জানে? লোকটা বোধ হয় নিকষার মেয়ে জরার বয়সী, কিন্তু দেখে নিকষার থেকে বড়ো মনে হচ্ছে। ওহো, জরার কথায় মনে পরে গেল। জরার মেয়ে তাড়কার জন্য একটা কড়ি আর লাল পাথরের মালা নেব। আবার পিছন ফিরলাম।

মারীচের কথা

        ‘দিদিমা, কেকশী,’ আমি চিৎকার করে ডাকি। ‘কোথায় তুই?’
        ‘কে ডাকিস?’ তাঁবুর ভিতর থেকে কেকশী সাড়া দিল।
        ‘আমি, মারীচ। বাইরে আয়, খুব দরকার
        ‘দাঁড়া রে বাবা। বয়স হয়েছে, এখন কি আর দৌড়োদৌড়ি করতে পারি?’  কেকশী আস্তে আস্তে বাইরে এলো। ‘কি হয়েছে?’
        ‘আমাদের থাকতে দেবে না বলছে
        ‘কে বলছে? কোথায় থাকতে দেবেনা? একটু আস্তে আস্তে বল।’
        আমি একটু দম নিয়ে বলতে শুরু করলাম। আগামী কাল আমাদের বসন্ত কাটানোর জায়গায় পৌঁছানোর কথা। কিন্তু একটু আগে পাঁচটা লোক এসেছে গ্রাম থেকে, বলছে এবার ওরা আমাদের ওদের জায়গায় থাকতে দেবে না
        ‘থাকতে দেবে না! কেন? ওদের জায়গা মানে কী?‘ 
        ‘তা আমি জানি না। বলছে আমরা নাকি চোর, ফসলের ক্ষতি করি, ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে যাই
        ‘চল দেখি
        গ্রামের লোকগুলো অপেক্ষা করছিল। কেকশী গিয়ে সামনে দাঁড়াল, বলল, ‘হ্যাঁরে, তোরা নাকি বলছিস আমাদের ঢুকতে দিবি না
        ‘এই বুড়িটা কে? তোদের মোড়ল কোথায়? তাকে আসতে বল ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বুড়ো সে বলল।  
        ‘মুখ সামলে কথা বল। আমি তাড়কার নাতনি, সিংহিকার মেয়ে কেকশী। মোড়ল মানে কি জানি না। মহিষদের যা বলতে চাস, আমাকেই বল কেকশী অতি কষ্টে রাগ সামলে রেখেছে।
        ‘শোন তবে। আমরা সাবধান করে দিতে এসেছি। কোনো গ্রামের  লোক তোদের চায় না। তোরা এখুনি এখান থেকে চলে যা
        ‘আমরা যাব কি না যাব তোরা বলার কে?’
        ‘আমাদের জায়গায় কাকে থাকতে দেব কাকে দেব না আমরা ঠিক করব। তোরা যেখানে তাঁবু গাড়িস, সেখানে এবার ধান চাষ করব আমরা
        আমি বললাম, ‘এত তো জায়গা পড়ে আছে। বন কেটে তো উজাড় করে দিয়েছিস। সেখানে চাষ কর না, কে বারণ করছে?’
        ‘বড়োদের মাঝে কথা বলিস না
        এবার আমার রাগ হতে লাগল। ‘আমার মনে হলে আমি বলব। তুই আমাকে বারণ করার কে? তোর নাম কি?’
        ‘আমি পুর গ্রামের মোড়ল, আমার নাম কশ্যপ। আমার কথা না শুনলে ভুগতে হবে, এই সাবধান করে দিলাম। চোরদের আমরা ত্রিসীমানায় ঢুকতে দেব না
        ‘কী চুরি করেছি আমরা?’ আমিও গলা চড়িয়ে বলি।
        ‘তোরা আমাদের সব গাছের ফল চুরি করে খেয়ে নিসনি গতবার?‘
        ‘গাছ তোদের হয় কেমন করে? মহিষাসুর গাছ দিয়েছে, তাতে ফল হয়েছে। সেগুলো যে পেড়ে নেবে তার। চিরকাল আমরা এই কথাই জানি,’  কেকশী বলল।
        ‘বাজে কথা রাখ। আমার জমিতে যে গাছ হয়েছে, তার সবকিছু আমার
        ‘তোর জমি মানে কী? তুই বানিয়েছিস?’
        অনেকক্ষণ ধরে তর্ক চলল। ওরা আমাদের কোনো কথাই শুনতে রাজি নয়। দু বছর আগে ওদের গ্রামের একটা ছেলে শিশুপাল আমাদের সঙ্গে চলে এসেছিল। কশ্যপের ধারণা আমরা ওকে জাদুতে ভুলিয়ে ধরে রেখেছি। সত্যি বলছি আমরা কোনো জাদু করিনি। ও নতুন নতুন জায়গা দেখতে ভালোবাসে বলে আমাদের সঙ্গ ধরেছিল। শিশুপালকে ডেকে কশ্যপকে দেখালাম, ‘ওকেই জিজ্ঞাসা কর আমরা কোনো জাদু করেছি কিনা?’
        ‘ও কী আর বলতে পারবে। শিশুপাল, তুই আমাদের সঙ্গে চল। বাড়ি ছাড়ার আগে তোর বাবা মায়ের কথা একটুও ভাবলি না?’
        শিশুপাল রাজি নয়, ও আমাদের সঙ্গেই থাকতে চায়। কশ্যপ ওর একটা হাত ধরে টেনে নিতে শুরু করল। এবার কেকশী খুব রেগে গেল। বলল, ‘হাত ছাড় ওর। ওকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার তুই কে? ও তো নিজেই আমাদের সঙ্গে থাকতে চেয়েছে
        কশ্যপ বলল, ‘ওর বাবা মা ওকে ফিরত নিয়ে যেতে বলেছে  
        কেকশী বলল, ‘শিশুপাল বড় হয়েছে, নিজেই ঠিক করতে পারে কী করবে
        এতক্ষণ কশ্যপের সঙ্গীরা কোনো কথা বলছিল না। কশ্যপ ওদের দিকে একটা ইঙ্গিত করল, সঙ্গে সঙ্গে বাকি চারজন এগিয়ে এসে শিশুপালকে ধরল। আমার খুব রাগ হয়ে গেল। আমি ওদের মধ্যে একটা লোকের চোয়ালে জোরে ঘুষি মারলাম। গ্রামের লোকগুলো এমনিই কমজোরি হয়, সে শিশুপালকে ছেড়ে চোয়ালে হাত দিয়ে বসে পড়ল। বাকি তিনজন আমার দিকে ফিরল। ওদের কোমরে ছুরি ছিল, একজনের সঙ্গে বল্লমও ছিল, কিন্তু সেসবে হাত দেওয়ার সময়ই দিলাম না। শুধু একটা বর্শা দিয়ে সিংহ শিকার করেছি আমি, কতগুলো কাদাঘাঁটা লোক আমার সঙ্গে পারবে কেন? খালি হাতই যথেষ্ট, কয়েক মুহূর্ত পরেই তিনজনই মাটিতে পড়ে রইল।
        কশ্যপ ভয়ে পিছিয়ে গেছে, কিন্তু আমার মাথায় তখন রক্ত উঠে গেছে। আমি এগিয়ে গিয়ে ওর ঘাড় ধরলাম। বিড়বিড় করে কী সব বলছিল, আমি কোনো কথা না শুনে ওকে মাথার উপর তুলে ধরলাম। আমাদের সবকটা তাঁবু ছেড়ে গিয়ে ওকে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। ওর খুব একটা লাগেনি, ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল। এর মধ্যে আমাদের দলের আরো লোক এসে গেছে। তারা দেখলাম বাকি লোকগুলোকে টানতে টানতে নিয়ে আসছে। ওদের ছুরি আর বল্লম কেড়ে নিয়েছে। সবগুলোকে ধাক্কা মেরে কশ্যপের পাশে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
        আমি বললাম, ‘আমরা আগের জায়গায়ই যাব, দেখি তোরা কী করতে পারিস

*       *       *

        আবার বর্ষা এসেছে, মহিষের দল পাহাড়ে উঠতে শুরু করেছে। আমাদের এই জায়গা ছেড়ে যাওয়ার সময় হয়েছে।
        কশ্যপের সঙ্গে গণ্ডগোলের পর থেকে সব গ্রামের লোকরা আমাদের এড়িয়ে চলেছে। আমরাও কোনো গ্রামে যাইনি। শিশুপালের বাবা মা ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিল, শিশুপাল যায়নি।
        পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে চিরকাল আমরা মহিষের দলের পিছনে যাচ্ছি। কিন্তু মহিষের সংখ্যাও অনেক কমে এসেছে। অনেক অনেক বছর আগে নাকি মহিষের দলের শেষ দেখা যেত না। এখন দুই কুড়ি কুড়ির বেশি নেইবেশি মহিষ এখানে থাকতই বা কোথায়? প্রতি বছর যখন আসি, দেখি পাহাড়ের এপারে বন আরো বেশি বেশি কেটে ফেলছে গ্রামের লোকজন। সেই জায়গাগুলো বেড়া দিয়ে ঘিরে ধান চাষ করেছে। কেকশী বলে ও জরার কাছে শুনেছে এখানে আগে দুটো মাত্র গ্রাম ছিল, পুর আর বরুণা। এখন সেখানে আটটা গ্রাম। নদীর ওপারেও আরো দুটো গ্রাম হয়েছে, সেখানেও চাষ শুরু হয়েছে। সব মিলিয়ে যে কত মানুষ থাকে গুনে শেষ করা যাবে না। অতগুলো লোক সকাল থেকে রাত ধানগাছের পিছনে পড়ে আছে! কাদা ঘেঁটে কী আনন্দ পায় ওরা?
        সবচেয়ে আশ্চর্য লাগে ওদের বাচ্চাগুলোকে দেখলে। অধিকাংশই না খেতে পাওয়া চেহারা। তবু প্রতি বছর ওদের মেয়েদের বাচ্চা হয়। এই রকম দুর্বল চেহারার বাচ্চা আমাদের দলে একটা শীতও টিকবে না। গতবছর দেখেছিলাম একটা ছেলেকে, তার জন্ম থেকেই একটা হাত চলে নাএই ছেলেটা কোন কাজে লাগবে? এই রকম কিছু দেখলে আমরা তাকে জন্মের পরেই জঙ্গলে ফেলে আসি। মহিষাসুর তাকে নিজের কাছে টেনে নেয়
        জিনিসপত্র গোছাচ্ছি, এমন সময় হয়গ্রীব দৌড়োতে দৌড়োতে এলো‘এখুনি আয়? কেকশী ডাকছে।’
        ‘কী হয়েছে?’
        ‘একটা জোয়ান মহিষকে মেরে ফেলেছে।’
        ‘সে কি? কে মেরেছে?’  
        ‘পুরের কয়েকটা লোক।’
        আমাদের দলের অনেক লোক জমা হয়েছে। কেকশী বলল, ‘চল, এখনই গ্রামের লোকদের সঙ্গে কথা  বলি। এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার। মহিষাসুরের রাগ কমাতে হবে! তা না হলেই সর্বনাশ।’
        আমাদের দল বেঁধে আসতে দেখে পুরের বাসিন্দারাও অনেকে বেরিয়ে এসেছে। কেকশীর বড় ছেলে খর ছিল আমার পাশে। বলল, ‘মনে হচ্ছে ওরা গণ্ডগোলের জন্য তৈরি।’
        ঠিকই বলেছেসকলের হাতেই অস্ত্র -- তলোয়ার, বল্লম, তীরধনুক। সবার আগে কশ্যপ। দেখলাম একটা মেয়েও নেই তাদের মধ্যে। সারাক্ষণ গ্রামের আশেপাশে বাচ্চাদের দেখতে পেতাম, তারাও আর নেই।
        ‘কশ্যপ,’ কেকশী বলল, ‘তোদের লোক একটা মহিষকে মেরেছে। তাদের শাস্তি দিতে হবে। মহিষ মারার একমাত্র শাস্তি মৃত্যু। তোরা ব্যবস্থা নিবি, না আমাদের হাতে ছেড়ে দিবি?’
        ‘তাতে হয়েছেটা কী? আমাদের ধানের ক্ষেতে ফসল খেতে এসেছিল। বেড়া ভেঙে ঢুকেছে। আমরা হরিণ মারি, শুয়োর মারি, সেই রকম মোষও মেরেছি। তোরা হরিণ মেরে মাংস খাস না?’
        ‘জানিস না মহিষ আমাদের কাছে পবিত্র? তোরাও তো আমাদের মতোই মহিষমহিষাসুর রেগে গেলে কী হয় তা জানিস?’
        ‘ঐ সব ছেলেভুলানো গল্প অন্যদের বলিস। আমরা কোনোদিন তোদের মতো মোষের দলের পিছনে পিছনে ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম না। আমরা মা অদিতির সন্তান, আমাদের দেবতা ইন্দ্র। তার অস্ত্র বজ্র। তার সঙ্গে কোনো অসুর পারবে না।’
        ‘মহিষাসুরের নিন্দা করিস না। ভালো হবে না। শেষবারের মতো বলছি, যে মেরেছে তাকে আমাদের হাতে তুলে দে’ কেকশী বলল।
        আমার দিকে আঙ্গুল তুলে কশ্যপ বলল, ‘সেদিন জাদুর বলে আমার চারজন প্রহরীকে হারিয়ে দিয়েছিলি বলে ভেবেছিস যা খুশি করবি? শোন ডাইনি বুড়ি, তোর জাদু এখানে খাটবে না। এই গ্রামকে ইন্দ্র রক্ষা করছে।’
        কেকশী বলল, ‘তোদের শেষ করতে আমাদের জাদু লাগে না। আমরা একজন জোয়ান ছেলে বা মেয়েকে বেছে নিচ্ছিমহিষটাকে যে মেরেছে, তাকে বল তার সঙ্গে খালি হাতে কিংবা তলোয়ার নিয়ে লড়াই করতে। যদি সে জিতে যায়, তাহলে বুঝব মহিষাসুর আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।’     
        পিছন থেকে একটা জোয়ান ছেলে এগিয়ে এলোকাশ্যপকে বলল, ‘বাবা, অনেকক্ষণ  ধরে ডাইনি বুড়িটার কথা শুনছি। এবার আমাকে বলতে দাও।’ আমাদের দিকে ফিরে বলল, ‘আমি মেরেছি মোষটাকে। কী করবি তোরা?’
        ‘শাস্তি তোকে পেতে হবে। বল কার সঙ্গে লড়াই করবি, ছেলে না মেয়ে?’
        লোকটা আমাদের সবার দিকে একবার তাকাল। বলল, ‘মেয়েরা আবার লড়াই করতে জানে নাকি?’ তারপর আমার সামনে এসে বলল, ‘তুই আগের দিন চারটে বুড়োকে হারিয়ে নিজেকে খুব বড়ো ভেবেছিস না? দেখি তোর তলোয়ারের দৌড় কত। লড়লে তোর সঙ্গেই লড়ব।’ 
        কেকশী মাথা নাড়ল, ‘ঠিক আছে, তুই মারীচের সঙ্গেই যুদ্ধ কর।’
        কশ্যপ এসে ছেলের হাত ধরে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। ‘পূষণ, তুই জানিস না। ওটা মানুষ নয়, সাক্ষাৎ দৈত্য। আমাকে মাথার উপর তুলে ধরেছিল যেন আমি একটা পালকের বস্তাওর সঙ্গে তুই পারবি না। অন্য কাউকে বেছে নে।’
        ‘দৈত্য তো কী? আমার মতো তলোয়ার চালাতে আর কে পারে এই আটটা গ্রামে? তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, দৈত্য হোক, পিশাচ হোক, রাক্ষস হোক, আজই ওর শেষ দিন।’      
        বাকিরা সরে সরে আমাদের জন্য একটা গোল মতো জায়গা করে দিল। আমি কোমর থেকে তলোয়ারদুটো খুললাম। পূষণ আমার সামনে জায়গা নিলোডান হাতে তলোয়ার, বাঁ হাতে কাঠের উপর চামড়া দিয়ে মোড়া একটা ঢাল। ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি।

        *       *       *

        বাঁ বাহুতে তলোয়ারের কোপ বসেছিল গভীর নয়, রক্তও বন্ধ হয়ে গেছে কিন্তু হাতটা এখন কদিন ব্যবহার করতে পারব না
        শুক্র লতাপাতা দিয়ে ক্ষতটা বাঁধছিল বলল, ‘পূষণ বলে লোকটা যদি জানত ও আমাদের সেরা তলোয়ারবাজের মুখোমুখি হচ্ছে? যদি তোকে না বেছে অন্য কাউকে বাছত? কেকশী কি তাহলে তার সঙ্গে লড়তে দিত?’
        ‘সবই মহিষাসুরের ইচ্ছা তা না হলে কশ্যপের সঙ্গে আমারই গণ্ডগোল লাগবে কেন? পূষণ জানত ওদের লোকদের কে হারিয়েছে; তাকে মেরে বীর হওয়ার চেষ্টা ওর কাছে স্বাভাবিক তবে মহিষ যখন ও  মেরেছিল, মহিষাসুর ওকে শাস্তি দিতই -- সেটা আমার হাত দিয়ে হয়েছে আমার জায়গায় তুই থাকলেও একই হত আর এই কাদাঘাঁটা নোংরাঘাঁটা লোকগুলো যুদ্ধের জানেটা কী? সারাদিন তো শুধু ধানের ক্ষেতে বসে পাখি তাড়ায়।’ 
        শুক্র মাথা নেড়ে বলল, ‘তোদের দুজনের মতো অস্ত্র চালানো আমি আগে কখনো দেখিনি তুই নিশ্চয় পূষণের থেকে ভালো, কিন্তু আমাদের অন্য কেউ ওর সঙ্গে পারত না ও যখন শেষকালে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিল, তোর মনে হয়নি ওকে ছেড়ে দিই?’
        ‘কেন মনে হবে? আমাদের নিয়মই তো আছে, জোয়ান মহিষ মারলে তার শাস্তি মৃত্যু আমি যদি  ওকে ছেড়ে দিতাম, তাহলে মহিষাসুর আমার উপর রাগ করত না?’
        আমাদের  যাওয়ার সময় হয়েছে শুক্র আমার পিঠে বোঝাটা বেঁধে দিল আমি ডানহাতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম পূষণ তার পাপের উচিত শাস্তি পেয়েছে গ্রামের লোকদের উপর আমার আর কোনো রাগ নেই আমার কেন, কোনো মহিষেরই নেই ওদেরও সেটা বোঝা উচিত দূর থেকে পুর গ্রামটাকে একবার দেখে নিলাম একটা লোককেও দেখতে পেলাম না এই প্রথম দিনের বেলাও ধানের ক্ষেতে কেউ কাজ করছে না
        এখান থেকে যাওয়ার সময় আমরা প্রথম দিন যেখানে তাঁবু গাড়ি, সেই জায়গায় পৌঁছোতে সন্ধে হয়ে গেল সকলেই ভীষণ ক্লান্ত, তাড়াতাড়ি তাঁবুর ভিতরে ঢুকে পড়ল আমিও ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম
        সবসময়ই বুনো জন্তুদের ভয় দেখাতে মাঝখানে আগুন জ্বেলে রাখা হয়, প্রহরীও থাকে তার চিৎকারেই ঘুম ভেঙে গেল লোয়ারটা হাতে করে তাঁবুর বাইরে এলাম ঘুমচোখে প্রথমে বুঝতে পারিনি তারপরেই বুঝলাম, একদল লোক আমাদের আক্রমণ করেছে
        কিন্তু কারা? বাজপাখিরা তো এদিকে আসে না শুনেছিলাম অনেক অনেকদিন আগে এখানে একদল নেকড়ে ছিল কিন্তু তাদের তো আর খুঁজে পাওয়া যায় না তাহলে কারা? অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না প্রহরীরা প্রথমেই আগুনটা নিভিয়ে দিয়েছে, না হলে আগুনের সামনে এলেই তীরের বা বল্লমের লক্ষ্যে পড়তাম
        অন্ধকারের মধ্যেই লড়াই করছি একটা ছায়ামূর্তি সামনে এলো, আমার দিকে বল্লম দিয়ে খোঁচা মারল, পাশ কাটিয়ে তলোয়ার চালালাম তলোয়ারটা কিছুতে আটকাল, লোকটাও আর্তনাদ করে পড়ে গেল তার জায়গা নিলো আরো একটা তারও কাঁধে একটা গভীর কোপ বসালাম এবার আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরেছে এভাবে কতক্ষণ লড়াই করা যায়? তাও আমার বাঁ হাতটা অচল এক ফাঁকে এদিক ওদিক তাকিয়ে বুঝলাম, আমাদের সকলেরই এক অবস্থা যে কজন দাঁড়িয়ে আছি,  প্রত্যেককেই তিন চারজনের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে একে একে সবাই মাটিতে পড়ছে
         পিছোতে গিয়ে কিছু একটাতে পা আটকে হোঁচট খেয়ে পড়লাম বুঝলাম একটা মৃতদেহের উপর পড়েছি উঠে বসার চেষ্টা করলাম বুকে একটা লাথি আমাকে শুইয়ে দিল একটা পা এসে তলোয়ার সমেত ডান হাতটা চেপে ধরল কবজির হাড়টা মট করে ভেঙে গেল।
        ‘আমার ছেলেকে মারার প্রতিশোধ এভাবেই নিলাম 
        কশ্যপের গলা কিন্তু এতগুলো লোক এলো কোথা থেকে? শুধু পুরের লোকের তো ক্ষমতা হবে না তিন কুড়ি মহিষের টক্কর নেওয়ার, তা সে যতই আচমকা আক্রমণ করুক না কেন
        কশ্যপ বলল, ‘নে আগুন লাগা, ছাই করে দে।’ একটার পর একটা আগুন জ্বলে উঠল আশেপাশে তাকিয়ে বুঝলাম আমাদের তাঁবুগুলো পুড়িয়ে দিচ্ছে। আগুনের আলোতে এবার দেখতে পেলাম আক্রমণকারীদের মুখ। শুধু পুর নয়, সব গ্রামেরই মানুষ মনে হয় আছে ওদের মধ্যে কত লোক এসেছে গুনতে পারছি না, আর আমরা বাচ্চা জোয়ান বুড়ো মিলে তিন কুড়িরও কম। একজনের সঙ্গে একজনের যুদ্ধে আমরা নিশ্চয় জিততাম, কিন্তু এই কাদাঘাঁটা ভীতু লোকগুলো সেভাবে লড়বে ভাবাটাই আমার ভুলমহিষাসুরের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার সময় এসেছে। তাকে বলব, তুমিই এর প্রতিশোধ নিও।
        কশ্যপ হাতের তলোয়ারটা উঁচিয়ে ধরল ‘পূষণের কাছে পাঠালাম তোকে

অসুরযুদ্ধের কথা

        ‘কি শুনবি আজ?’
        ‘অসুরদের কিভাবে কশ্যপ হারিয়েছিল সেই গল্পটা বলো একজন বলে
        ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। দৈত্যদের সঙ্গে যুদ্ধের গল্প বলো আরো কয়েকজন সায় দেয়।  
        ‘ঠিক আছে, শান্ত হয়ে বস।
        ‘অনেকদিন আগে দুই বোন ছিল, দিতি আর অদিতি। দিতির সন্তানরা হলো দৈত্য। তারা ধর্ম মেনে চলত না। তারা জাদু জানত। ইচ্ছামতো রূপ ধারণ করতে পারত। মোষের রূপ ধরে এসে তারা মানুষের ক্ষেত উজাড় করে খেয়ে নিত। দৈত্যরা জাদু জানত বলে তাদের মেরে ফেলা যেত না। তারা নিজেদের বলত অসুর।
        ‘অদিতির সন্তানদের বলা হত আদিত্য। তারা সবাই ধর্মপথে থাকত। দেবরাজ ইন্দ্রকে উপাসনা করত। অদিতির ছেলে ছিল মিত্র, বরুণ আর বিশ্বকর্মা। অদিতির মেয়ের নাম ছিল শ্রী। আদিত্যরা দেশে ধর্মরাজ্য স্থাপন করেছিল। সেখানে সবাই সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করত। মিত্র ছিল রাজ্যের রাজা।
        ‘অদিতির ছেলেমেয়েদের প্রজারা সবাই ভালোবাসতো দেখে দিতির খুব হিংসা হত। একদিন দিতি নিজের বোনকেই অভিশাপ দিল যে সে আর তার ছেলেমেয়ে সবাই বসন্ত রোগে মরে যাবে। অদিতি আর ছেলেমেয়েদের সকলের রোগ হল। শ্রী, মিত্র আর অদিতি মারা গেল। তখন বরুণ আর বিশ্বকর্মা ইন্দ্রের   তপস্যা করল।  ইন্দ্র খুশি হয়ে দুই ভাইকে রোগমুক্ত করলেন। বরুণ মিত্রের জায়গায় সিংহাসনে বসল।
        ‘বরুণ রাজা হয়ে অসি নদীর তীরে একটা নগর স্থাপন করল। সেখানে দেবরাজের মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে একটা বিশাল মন্দির বানালো। তাকে সাহায্য করেছিল বিশ্বকর্মা। অসুররা দেখল বিপদ, ইন্দ্রের কৃপা থাকলে তো এদের হারানো যাবে না। তখন তারা জাদুবলে অসি নদীকে ঘুরিয়ে মন্দিরের দিকে পাঠিয়ে দেয়। বরুণ আর বিশ্বকর্মা দুজনে মিলে একরাতের মধ্যে নদীতে বাঁধ দিয়ে মন্দির আর নগরকে বাঁচায় মন্দির রক্ষা করেছে বলে ইন্দ্র খুশি হয়ে এদের দুজনকে দেবতা করে দিলেন।
        ‘বরুণের পরে রাজা হল তার ছেলে কশ্যপ। কশ্যপের ছেলের নাম পূষণ। পূষণ ছিল রূপে গুণে অস্ত্রচালনায় অতুলনীয়।  রাজ্যের সবাই তাকে খুব ভালোবাসতো
        ‘অসুরদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল মারীচ। সে পূষণকে দেখে হিংসায় জ্বলে মরত। কিন্তু সামনাসামনি যুদ্ধে পূষণকে যে হারাতে পারবে না সেটা সে জানত। তাই ডাকিনী কেকশীকে গিয়ে সে বলল, পূষণকে কেমন করে হারানো যায়? কেকশী মন্ত্র পড়ে মারীচকে অদৃশ্য করে দিল। মারীচ তখন পূষণকে হত্যা করল।
        ‘পূষণের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে কশ্যপ ক্রোধে আগুন হয়ে গেল। সে একাই দৈত্যদের পুরী আক্রমণ করল। দৈত্যপুরীর দ্বার এক আঘাতে ভেঙে ফেলল কশ্যপ। যত দৈত্য সামনে এলো, একে একে সবাই তার অস্ত্রাঘাতে মারা গেল। অবশেষে মারীচ কশ্যপের মুখোমুখি হল। কিন্তু পুত্রহারা পিতার ক্রোধের তেজ সে সহ্য করতে পারল না। তাকে হত্যা করেও কশ্যপের রাগ কমল না। তার ক্রোধে পৃথিবী ভস্ম হয়ে যায় যায়, তখন দেবরাজ ইন্দ্র তাকে বললেন, ক্রোধকে মুষ্টিতে নিয়ে দৈত্যদের প্রাসাদে ছুঁড়ে মারো। কশ্যপ তাই করল।  মুহূর্তে দৈত্যপুরীতে আগুন লেগে গেল। একজন দৈত্যও আর রক্ষা পেল না