Sunday, 16 June 2019

শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ মারে গেল-ম্যান


প্রয়াত হলেন কোয়ার্কের আবিষ্কর্তা মারে গেল-ম্যান


মারে গেল-ম্যান (১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯২৯ -২৪ মে, ২০১৯)[By I, Joi, CC BY 2.5]

        প্রয়াত হলেন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী মারে গেল-ম্যান। সাধারণ মানুষের মধ্যে তিনি হয়তো খুব পরিচিত ছিলেন না, কিন্তু বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধের সেরা পদার্থবিজ্ঞানীদের কোনো তালিকা থেকেই তাঁর নাম বাদ যাবে না। বিজ্ঞানের ইতিহাসে কণাদ বা ডেমোক্রিটাস যে পরমাণুবাদের সূচনা করেছিলেন, তার সর্বশেষ ও সর্বোচ্চ রূপ হল মৌলিক কণার কোয়ার্ক মডেল সেই তত্ত্বে যাঁর সবচেয়ে বেশি অবদান তিনি মারে গেল-ম্যান।
        গেল-ম্যানের জন্ম ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯২৯ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। তাঁর পরিবার পূর্ব ইউরোপ থেকে আমেরিকাতে এসেছিলমহামন্দার সময় তাঁরা তীব্র আর্থিক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যানতবে গেল-ম্যান শিশু বয়স থেকেই ছিলেন প্রতিভাবান, তিনি ছাত্রবৃত্তির সুযোগে পড়াশোনা চালাতে পেরেছিলেন। ১৯৪৮ সালে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্নাতক হবার পরে তিনি মাত্র বাইশ বছর বয়সে ১৯৫১ সালে ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে ডক্টরেট করেন, সুপারভাইসর ছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ভিক্টর ভাইসকফ। তাঁর প্রতিভার দিকে দৃষ্টি পড়েছিল বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমারের। তিনি গেল-ম্যানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান চর্চার সবথেকে বিখ্যাত কেন্দ্র প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভ্যান্সড সায়েন্সে আমন্ত্রণ জানান। ১৯৫৪ সালে গেল-ম্যান শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি বিখ্যাত বিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মির সঙ্গে কাজ করেছিলেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে।
        উনিশশো চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে পরীক্ষামূলক কণাপদার্থবিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি ঘটেছিল। মহাজাগতিক রশ্মির মধ্যে অনেক নতুন ক্ষণস্থায়ী কণার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল। এই কণাদের নানা ধর্ম বিজ্ঞানীদের সমস্যায়  ফেলেছিল। কিছু কণা ছিল যাদের জীবনকাল এক সেকেন্ডের এক হাজার কোটি ভাগের এক ভাগ। শুনতে খুব কম মনে হলেও বিজ্ঞানীদের কাছে তা ছিল অপ্রত্যাশিত রকম বেশি, তত্ত্ব অনুযায়ী এই সমস্ত কণার আয়ু হওয়া উচিত ছিল এক সেকেন্ডের একশো কোটি কোটি কোটি ভাগের এক ভাগের কাছাকাছিএর কারণ হিসাবে গেল-ম্যান ১৯৫৩ সালে এই দীর্ঘস্থায়ী কণাদের জন্য স্ট্রেঞ্জনেস নামের এক নতুন কোয়ান্টাম সংখ্যার প্রস্তাব করেনমোট চার রকম বল আছে, স্ট্রং ফোর্স বা পীন বল, তড়িৎচৌম্বক বল, উইক ফোর্স বা ক্ষীণ বল এবং মাধ্যাকর্ষণ। এদের মধ্যে চতুর্থটি খুবই দুর্বল, তাকে হিসাবে আনার প্রয়োজন নেই। গেল-ম্যান বলেন কোনো স্ট্রেঞ্জ কণা যখন ভেঙে যায়, তখন তার স্ট্রেঞ্জনেস সংখ্যার পরিবর্তন ঘটে। পীন বল বা তড়িৎচৌম্বক বল স্ট্রেঞ্জনেস সংখ্যার পরিবর্তন ঘটাতে পারে না, তা পারে একমাত্র ক্ষীণ বল।  নামেই বোঝা যাচ্ছে এই বলের শক্তি খুব কম, সেজন্য কণার ভেঙে পড়ার হারও অনেক কম, তার স্থায়িত্বকাল বেশিগেল-ম্যান তাঁর তত্ত্ব থেকে নতুন কিছু কণার কথা বলেন, অচিরেই তাদের খুঁজে পাওয়া যায়।
        ১৯৫৮ সালে অপর এক বিখ্যাত বিজ্ঞানী রিচার্ড ফেইনম্যনের সঙ্গে তিনি ক্ষীণ বলের এক তত্ত্ব প্রকাশ করেছিলেন। একই সময় ই সি জি সুদর্শন ও  রবার্ট মার্শাক অনুরূপ তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন। তাঁদের তত্ত্ব ক্ষীণ বলের সম্পর্কে সাম্প্রতিকতম আবিষ্কারকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হয়।
        দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুই দশকে অনেক নতুন নতুন কণাত্বরক তৈরি হয়েছিল যেখানে ইলেকট্রন প্রোটন জাতীয় কণাদের উচ্চ শক্তিতে সংঘর্ষ ঘটানো হচ্ছিল। তার ফলে সৃষ্টি হচ্ছিল আরো অনেক নতুন কণাএত রকমের কণা আবিষ্কারের পরে তাদের শ্রেণিবিভাগের প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছিল। একই সঙ্গে মনে হচ্ছিল যে এই সমস্ত কণা, সবাই মৌলিক হতে পারে না। গেল-ম্যান এই নিয়ে চিন্তা করছিলেনএই কণাদের দুভাগে ভাগ করা যায়। যে সমস্ত কণা পীন বলের বিক্রিয়াতে অংশ নেয় তাদের বলে হ্যাড্রন, যারা নেয় না, তাদের বলে লেপ্টন। যেমন প্রোটন, নিউট্রন হল হ্যাড্রন, ইলেকট্রন হল লেপ্টন। ১৯৬১ সালে গেল-ম্যান হ্যাড্রনদের শ্রেণিবিভাগের এক নতুন পদ্ধতি খুঁজে পান। এর ব্যাখ্যা জটিল গণিত ছাড়া সম্ভব নয়। সহজ কথায় বললে, সবচেয়ে হালকা হ্যাড্রনদের আটটিকে এক দলে ফেলা যায়। বৌদ্ধধর্মের অষ্টাঙ্গিক মার্গের কথা মনে রেখে গেল-ম্যান একে বলেন এইটফোল্ড ওয়ে। এর ফলে পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্ম ও  কণাপদার্থবিদ্যার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তিনি তাঁর খেয়ালের জন্য অনুতাপ করেছিলেন।
        এইটফোল্ড ওয়ে নজরকাড়া সাফল্য পায়। তার কারণ হিসাবে গেল-ম্যান ১৯৬৪ সালে বললেন প্রোটন নিউট্রন আসলে মৌলিক কণিকা নয়, তারা প্রত্যেকে তিনটি করে কোয়ার্ক কণা দিয়ে তৈরি। কোয়ার্ক শব্দটা তিনি পেয়েছিলেন জেমস জয়েসের ‘ফিনেগান্স ওয়েক’ উপন্যাসে। তাঁর তত্ত্বে আপ, ডাউন ও স্ট্রেঞ্জ তিনরকমের কোয়ার্ক ছিল এখন অবশ্য আমরা জানি মোট ছ’রকমের কোয়ার্ক আছে। তাঁর এই মৌলিক গবেষণার জন্য তিনি ১৯৬৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি কোয়ার্কদের কালার বলে আরও এক ধর্মের কথা বলেনরঙ বলতে আমরা যা বুঝি তার সঙ্গে কালারের কোনো সম্পর্ক নেই। পীন বলের তত্ত্বের মূল স্তম্ভ এই কালার।
        পরবর্তীকালে গেল-ম্যান জটিল সিস্টেম বা তন্ত্রের বিজ্ঞান বিষয়ে উৎসাহী হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর বই, ‘দি কোয়ার্ক এন্ড দি জাগুয়ার’ এ বিষয়ে তাঁর চিন্তাভাবনার পরিচয় বহন করে। পরিবেশ আন্দোলনে অবদানের জন্য তিনি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর মৃত্যুতে কণাপদার্থবিদ্যার সবচেয়ে গৌরবময় যুগের এক মহীরুহের পতন ঘটল।
                                                                        গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

Sunday, 26 May 2019

সদ্যোজাত শিশু কী কাজে লাগে?


  ‘সদ্যোজাত শিশু কী কাজে লাগে?’

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

        এই উক্তিটা অনেক বিজ্ঞানীর নামে চালু আছে। যত দূর জানি, একজনের সপক্ষে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায় – তিনি বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। তবে তিনি শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না। লেখক, সম্পাদক, প্রকাশক, কূটনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী -- ফ্রাঙ্কলিনের বিশেষজ্ঞতার তালিকার শেষ হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, তখন সাত জন দার্শনিক, লেখক ও রাজনীতিক তাতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেFounding Fathers, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠাতা - তাঁদের মধ্যে ফ্রাঙ্কলিন একজন। তবে ফ্রাঙ্কলিনকে কোনো ভাবেই গজদন্তমিনারনিবাসী বলা যাবে না। যে মানুষটি বজ্রবারণ দণ্ড বা বাইফোকাল চশমা আবিষ্কার করেছিলেন, তিনিই আবার আমেরিকার প্রথম দমকলবাহিনী তৈরি করেছিলেন।
       ১৭৮৩ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন অসুস্থতা নিয়েও প্যারিসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেদিনই প্রথম মানুষ মাটির মায়া কাটিয়ে আকাশে পাড়ি দিতে সফল হয়েছিল। গরম হাওয়া ভরা বেলুন যখন তার যাত্রীকে নিয়ে দূরে মিলিয়ে যাচ্ছিল, তখন উপস্থিত জনতার মধ্যে বিশিষ্টতম ব্যক্তিকে প্রশ্ন শুনতে হয়েছিল, ‘এটা কী কাজে লাগবে?’ ফ্রাঙ্কলিনের চটজলদি উত্তর, ‘সদ্যোজাত শিশু কী কাজে লাগে?’
       এত কথা বলতে হল, কারণ সম্প্রতি কেরালা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় এক নির্দেশনামা জারি করে জানিয়েছিলেন যে গবেষণার বিষয় নির্বাচনের সময় জাতীয় স্বার্থের কথা বিবেচনা করতে হবে। অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে গবেষণা চলবে না। নির্দেশনামাতে কোন বিষয়টা প্রাসঙ্গিক বা জাতীয় স্বার্থ কী তা ব্যাখ্যা করা হয় নি। অনুমান করা অসঙ্গত নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় বা তারও উপরের কোনো কর্তৃপক্ষ তা স্থির করে দেবেন। গবেষণার ফল যাঁরা আগে থেকেই জেনে ফেলেন, তাঁরা নিশ্চয় ‘সদ্যোজাত শিশু কী কাজে লাগে?’, সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন।
       গবেষণার পায়ে বেড়ি পড়ানোর এই প্রয়াস নিয়ে যথেষ্ট তোলপাড় হয়েছে। ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা মীনা পিল্লাই বোর্ড অফ স্টাডিজ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি এক সাক্ষাৎকারে এই নির্দেশিকাকে অগণতান্ত্রিক আখ্যা দিয়েছেন, কারণ তাঁর মতে গবেষণার বিষয়বস্তু বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা একজন গবেষককে দিতেই হবে আগে থেকে গবেষণার ঠিক করে দিয়ে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করছি।
        আমাদের রাজ্যে প্রখ্যাত অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরির উদ্যোগে শুরু হয়েছিল গবেষণার উপর বাধানিষেধে প্রতিবাদ করা  এক অনলাইন আবেদন, তাতে এখনো পর্যন্ত বারো হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। আবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে গবেষণা কোন পথে যাবে, তা আগে থেকে জানা থাকলে তার আর প্রয়োজন নেই। পূর্বনির্ধারিত তালিকাতে তাকে বেঁধে রাখার চেষ্টা নবীন গবেষকের সৃষ্টিশীলতার স্ফুরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অন্যত্রও প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে। দেশব্যাপী চাপেই হয়তো কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক এক প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে তারা এরকম কোনো নির্দেশনামা জারি করেনি।
       এলাহাবাদের হরিশচন্দ্র রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক তাপস দাস সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রের বাংলা সংস্করণে ‘গবেষণায় হস্তক্ষেপের চেষ্টা: ঈশানকোণে সিঁদুরে মেঘ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখে সাম্প্রতিক অতীতের কথা তুলে আমাদের সাবধান করে দিয়েছেন, ‘ সার্বিক শিক্ষাকে ধ্বংস করে দেওয়ার প্রচেষ্টার এটা প্রাথমিক রূপ। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে গবেষণার ফতোয়া জারি করার পরবর্তী ধাপ হিসেবে বলা হতে পারে পুরোহিততন্ত্র বা জ্যোতিষ না পড়ালে অনুমোদন পাবে না কলেজগুলো, বা প্রার্থনাসংগীতে হীরকের রাজা ভগবান না গাইলে জুটবে না মিড ডে মিল।‘
       ভিন্ন মতও নিশ্চয় আছে। একটা মন্তব্য চোখে পড়ল -- রাষ্ট্র যখন অর্থ বরাদ্দ করছে, তখন সে তো গবেষণার বিষয়বস্তু ঠিক করে দিতেই পারে।‘ আপাতদৃষ্টিতে কথাটার মধ্যে যুক্তি নেই এমন বলা চলে না। আমাদের দেশে গরীব মানুষের সংখ্যা অনেক, এমন গবেষণা হওয়া প্রয়োজন যা তাদের কাজ আসবে – এই দাবী করাটা কি অন্যায়?
      যে গবেষণা এখনি মানুষের উপকারে লাগে না, রাষ্ট্র তাকে উৎসাহ দেবে কেন? এই প্রসঙ্গে অনেক কথাই বলা যেতে পারে। সারা পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী বা সমাজবিজ্ঞানী বললে যাদের নাম মনে আসে, তাঁদের কেউই রকম পূর্বনির্ধারিত বিষয়ে গবেষণা করেছেন বলে জানা নেই। শিশু জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে সে ভবিষ্যতে কী করবে তা বলা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি গবেষণা শুরুর পূর্বে তা জাতীয় বা অন্য কোনো স্বার্থে ব্যবহার করা যাবে কিনা তা নির্ধারণও অসম্ভব। তাপস দাস তাঁর লেখাতে উদাহরণ দিয়েছেন, বাইনারি নাম্বার সিস্টেম নিয়ে যখন গবেষণা করেছিলেন টমাস হ্যারিয়েট, হুয়ান লবকোভিৎস বা গটফ্রিড লাইবনিৎস, তখন কি কেউ ভাবতে পেরেছিলো এই বিশুদ্ধ তাত্ত্বিক জ্ঞানই  একদিন পৃথিবীর সমস্ত কম্পিউটারের প্রধান চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়াবে? আইনস্টাইন যখন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ প্রকাশ করেছিলেন, তখন কি তিনি বলতে পারতেন যে ভবিষ্যতে তাঁর তত্ত্বকে ব্যবহার করে জিপিএস আপনাকে পথের নির্দেশ বাতলে দেবে? এরকম অসংখ্য ঘটনার কথা বলা যেতে পারে। একটা সাম্প্রতিক উদাহরণ মনে করা যাক। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা www এখন আমাদের রোজকার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।  সার্নের গবেষণাগারে মৌলিক কণা বিষয়ে গবেষণার জন্য একাধিক কম্পিউটারের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়োজনে তার জন্ম হয়েছিল। তখন কি কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল তিরিশ বছরের মধ্যে তা এরকম সর্বব্যাপী হইয়ে দাঁড়াবে? গবেষণার পূর্বেই তার প্রাসঙ্গিকতা নির্ধারন করা আর শিশুর জন্মমুহূর্ত বিচার করে ভাগ‍্যগণনা করার মধ্যে পার্থক্য নেই।
      সংবাদপত্র বা সোশ্যাল মিডিয়াতে এই বিধিনিষেধ নিয়ে কিছু আলোচনা হয়েছে, হয়তো পাঠকদের চোখেও তা পড়েছে। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে মুক্ত চিন্তার দিক থেকে বিচার করলে গবেষণার উপর নিয়ন্ত্রণ আদৌ কাম্য নয়।  কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ঘুরপথে গবেষণাতে ঢুকে পরেছে। আজকের দিনে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানে গবেষণা করতে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, গবেষককে স্বাভাবিকভাবেই সেদিকে খেয়াল রেখে তার গবেষণার বিষয় ঠিক করতে হচ্ছে। তাত্ত্বিক বিজ্ঞান, সমাজবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়েও গবেষকদের নিজের খুশিমতো বিষয় নির্বাচন কঠিন হয়ে পড়েছে। গবেষণা সম্মেলনগুলিতে নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর আলোচনা হয়, গবেষণা পত্রিকাতে প্রচলিত ক্ষেত্রের খুব বাইরের প্রবন্ধ ছাপা শক্ত হয়ে পড়েছে চাকরিসন্ধানী তরুণ গবেষকের কাছে মূল ধারার বাইরে কাজ করা হঠকারিতার নামান্তর, সরকারি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে কোনো বিষয়কে  উৎসাহ দেয় না 
      আমাদের দেশের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা না করলে এক্ষেত্রে সমস্যার গভীরতা বোঝা হয়তো সম্ভব হবে না। সেই আলোচনাতে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা বলে রাখা ভালো। পেশাগত কারণেই আমার বিজ্ঞানের জগতের সঙ্গে পরিচিতি বেশি, তাই আলোচনাতে বিজ্ঞানের কথাই বেশি আসবে। সমাজবিদ্যা বা মানববিদ্যা সম্পর্কে আমি অল্প কথাই লিখতে পারি – তাতেও ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা যথেষ্ট। কিন্তু এমন জটিল বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে তাদের বাদ দেওয়া সম্ভব নয়, বিশেষ করে যখন বিজ্ঞানের থেকেও বেশি আক্রমণ তাদের উপর নেমে আসছে।           
      প্রথমত, গবেষণার জন্য বরাদ্দ অর্থের অধিকাংশটাই ব্যয় হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে, মানববিদ্যা বা সমাজবিদ্যার ভাগে জোটে খুবই কম। ভারতবর্ষে গবেষণার অর্থবরাদ্দের সিংহভাগ আসে সরকারি কোষাগার থেকে। গাড়ি নির্মাণ,  সফটওয়্যার ও ওষুধশিল্প ছাড়া গবেষণাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ খুবই কম। ফোর্বস পত্রিকার হিসাবমত ২০১৭ সালে পৃথিবীতে গবেষণাখাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগকারী ২৫০০টি কোম্পানির মধ্যে ভারতীয় কোম্পানির সংখ্যা মাত্র ২৫ – তাদের মধ্যে ১৯টিই আবার উপরোল্লিখিত ওই তিনটি ক্ষেত্রে কাজ করে। পক্ষান্তরে ওই তালিকায় চিনের ৩০১টি কোম্পানির নাম আছে।
      দ্বিতীয়ত, সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণও মোটেই সন্তোষজনক নয়।  ২০১৮ সালের মোট জাতীয় উৎপাদন অর্থাৎ জিডিপির ০.৬ শতাংশ গবেষণাতে খরচ হয়েছিল। শতাংশের হিসাবে গত দুই দশকে এই পরিমাণটা মোটামুটি একই থেকেছে। বাড়েনি তো বটেই, গত দু বছরে সামান্য কমেছে। উন্নত পশ্চিমী দেশের কথা ছেড়ে দিন, এশিয়ার দেশ চিন, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের মোট জিডিপির যথাক্রমে ২.১ শতাংশ, ৩.১ শতাংশ ও ৪.২ শতাংশ ব্যয় করে গবেষণাখাতে।
      এই সামান্য অর্থ খরচেরও আবার কয়েকটি স্তর আছে। রাজ্য সরকারগুলি সরাসরি গবেষণা ক্ষেত্রে নামমাত্র খরচ করে, প্রায় পুরোটাই আসে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে। দেশে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের জন্য গবেষণার অর্থের অধিকাংশটা বরাদ্দ থাকে। ভাবা পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র, ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের মতো বৃহদাকার সংস্থাগুলির কথা বলা বাহুল্য মাত্র। এ ছাড়াও কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর এবং জীবপ্রযুক্তি দপ্তরের অধীনে যথাক্রমে কুড়িটি ও তেরটি স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান আছে। পরমাণু শক্তি দপ্তরের অধীনে আছে তেরটি সংস্থা। ভারতীয় কৃষি গবেষণা নিগমের অধীন সংস্থার সংখ্যা একশর কাছাকাছি। সিএসআইআরের অধীনে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা চুয়াল্লিশ। ষোলটি আইআইটি, সাতটি আইআইএসইআর সহ আরো ছোটবড় নানা সরকারপোষিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান সারা দেশে আছে। এদের খরচ জোগানোর পরে বাজেট বরাদ্দের খুব সামান্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য অবশিষ্ট থাকে। সারা পৃথিবীতে যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গবেষণা হয়, আমরা সেখানে কেন্দ্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী। আমাদের সবচেয়ে ভালো গবেষণা পরিকাঠামো ও বিজ্ঞানীরা রয়েছেন, সেখানে অধিকাংশ ছাত্রের প্রবেশাধিকার নেই। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অর্থাভাবে শিক্ষকের অভাবে পঙ্গু।
      গবেষণা বরাদ্দের এই পরিপ্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে যে সামান‍্য পরিমাণ গবেষণা সম্ভব, তার উপরে এই ধরনের বাধা নিষেধের পিছনে জাতীয় স্বার্থের কথা শুনলে তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ জাগে বৈকি। কেরালা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন, ২০০৯ সালে এর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সমাজবিদ্যা, মানববিদ্যা ও বিজ্ঞান-প্রযুক্তি সমস্ত বিষয় মিলিয়ে মোট অধ্যাপকের সংখ্যা দেড়শোর কাছাকাছি। দেশে বহু কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানে এর থেকে অনেক বেশি সংখ্যায় গবেষক কাজ করেন। মানবসম্পদ উন্নয়ন দপ্তরের হিসাবেই কেরালা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় পশ্চাৎপদ। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই কেন এই ধরনের নির্দেশনামা জারি হল? তাপস দাস অনুমান করেছেন যে হয় এর পিছনে আছে কর্তৃপক্ষের অতি উৎসাহ, কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের কাছাকাছি আসার চেষ্টা। অথবা, রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরাই এই ঘটনাকে পরীক্ষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন সোজা কথায় জল মাপার জন্য। এই ধরনের ঘটনা সরকারি ভাবে ঘটালে কী ধরণের প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, এবং রাষ্ট্র কতখানি বাধার সম্মুখীন হতে পারে শিক্ষানুরাগীদের থেকে।      
      সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা অপেক্ষাকৃত সহজ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি অনেক সময় অত সহজে মাথা নোয়াতে রাজি হয় না – স্বাধিকার, গবেষকের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা  ইত্যাদি নানা কথা বলে যা শাসঙ্কদের পক্ষে অরুচিকর। ২০১৭ সালে বিজ্ঞানপ্রযুক্তি দপ্তর সিএসআইআর ও জৈবপ্রযুক্তি দপ্তরের সঙ্গে একত্রে এক কমিটি তৈরি করে, তার পোশাকি নাম ‘Scientific Validation and Research on Panchgavya’ নামেই বোঝা যাচ্ছে কমিটি কী করবে। শুধু গবেষণা নয়, পঞ্চগব্যের উপকারিতা সম্পর্কে জানাই আছে, তার সত্যতা প্রমাণ করাও এই কমিটির কাজ। এই কমিটির মূল দায়িত্ব দেয়া হয় আইআইটি দিল্লির উপর। বিশেষ কোনো প্রতিবাদ আইআইটির অধ্যাপক বা গবেষকদের মধ্যে থেকে শোনা যায়নি। ভাবুন তো, রাস্তা পেরিয়ে আইআইটি ক্যাম্পাসের ঠিক উল্টোদিকে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান, তাকে এই দায়িত্ব দেওয়া কি সরকারি দপ্তরের পক্ষে সম্ভব হতো? কেন্দ্রীয় সরকারি হিসাবেই গত তিন বছর ধরে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম স্থান অধিকার করে আছে। সেই কারণেই তো জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশবিরোধী প্রমাণ করার জন্য সরকারি দল, সরকারের সমর্থকদের চেষ্টার অন্ত নেই। গবেষণার উপর বিধিনেষেধ চাপানোর চেষ্টাকে এই প্রেক্ষিতেই দেখতে হবে।
      আমাদের রাজ্যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়েও আমাদের রাজ্যের শাসক দলের একই রকম মাথাব্যাথা। অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরি এক বক্তৃতাতে বলেছিলেন, ‘কী রাজ্যে কী কেন্দ্রের এক্তিয়ারে যেগুলি সবচেয়ে সফল অগ্রণী প্রতিষ্ঠান, মূল্যায়ন তালিকায় যারা পুরোভাগে থাকে, তাদের প্রতিই কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে খড়্গহস্ত। অন্য প্রতিষ্ঠানের হিংসা-তাণ্ডব-ভাঙচুর, দুর্নীতি-অনাচার, বিভ্রাট-অপশাসন সব কিছুর সঙ্গে তাঁদের দিব্যি সহাবস্থান, সেগুলি ছোট করে দেখাতে, তার হয়ে সাফাই গাইতে এমনকী অস্তিত্ব অস্বীকার করতে তাঁরা উন্মুখ।‘ এখানে একটা বড় সুবিধা হল যে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসার সীমিত, তাই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক ভাবেই বিশেষ সুবিধাভোগী ও সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তাদের উপর আক্রমণ শাসক দলের কাছে সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের একটা সহজ রাস্তা।
      বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চাপের কাছে মাথা নোয়ালে কী হতে পারে, তার এক উদাহরণ হল বরোদার মহারাজা সয়াজি রাও বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাক্তনীদের মধ্যে একজন বেঙ্কটরমন রামকৃষ্ণন। তিনি ২০০৯ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি রয়াল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট। তাঁর আগে যাঁরা এই পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন তাঁদের মধ্যে আছেন আইজ্যাক নিউটন। এমন একজন বিজ্ঞানী তাঁর পুরানো বিশ্ববিদ্যালয়ের সামান্য নতুন বছরের ডায়েরি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন -- কেন? ২০১৭ সালের ডায়েরিতে আছে ভারতের বিজ্ঞানীদের কথা সেখানে আর্যভট্ট, জগদীশচন্দ্র, সি ভি রমন, রামানুজন ও বিক্রম সারাভাই যে জায়গা পেয়েছেন, এটা তাঁদের সৌভাগ্য। গুরুত্বের দিক থেকে নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের সঙ্গে নিশ্চয় রমন এফেক্টের তুলনা চলতে পারে না।  ইস্কুলে পড়ানো হয় যে পরমাণুর নিউক্লিয়াস আবিষ্কার করেছিলেন রাদারফোর্ড। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা খুঁজে বার করেছেন যে তথ্যটা ভুল, আসলে নিউক্লিয়ার প্রযুক্তির জন্মদাতার নাম ঋষি কণাদ। ডায়েরিতে আছেন রকেট ও এরোপ্লেনের আবিষ্কর্তা ঋষি ভরদ্বাজ, কসমেটিক সার্জারির আবিষ্কর্তা সুশ্রুত, মহাবিশ্বতত্ত্বের জন্মদাতা কপিল মুনি বা নক্ষত্রবিজ্ঞানী গর্গ মুনি। এঁদের তুলনায় জগদীশচন্দ্ররা কোথায়? কোথা থেকে এই সমস্ত খবর পাওয়া গেল? রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের তাত্ত্বিক দীননাথ বাটরার বই থেকে। ভারতের প্রাচীন গৌরবকে সকলের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যই ডায়েরি।
        ভেঙ্কটরমন বলেছেন যে বিজ্ঞানে ভারতের সত্যিকারের অবদানের দিকে নজর না দিয়ে ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে বিজ্ঞান খূঁজে বার করাটা হতাশাজনক। যাঁরা এই কাজ করছে, তাঁরা ভাবছেন যে তাঁরা দেশপ্রেমিক, কিন্তু এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের তথা দেশের দুর্নামই হচ্ছে। সেনেটে বিতর্কের সময় সেনেট সদস্য জিগর ইনামদার বলেন, ‘বিজেপির সদস্য ও আর এস এস কর্মী হিসাবে আমি গর্বিত যে আমরা ভারতের প্রকৃত ঐতিহ্যকে সামনে আনছি। কে প্রমাণ করতে পারবে যে মুনিঋষিরা এই সমস্ত আবিষ্কার করেন নি? আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে রামচন্দ্র পুষ্পক বিমানে ভ্রমণ করতেন। আমাদের সেটা শুধু প্রমাণ করতে হবে।’ পঞ্চগব্যই হোক বা পুষ্পক বিমান, বিশ্বাসই আসল, বিজ্ঞানের কাজ তাকে প্রমাণ করা -- চারশো বছরের বৈজ্ঞানিক প্রগতির পিছনের দর্শনকে এভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায়!
      গবেষণার ক্ষেত্রে কোনটা প্রাসঙ্গিক আর কোনটা নয়, কোনটা জাতীয় স্বার্থে আর কোনটা নয়, তা বিচার করার সহজ উপায় নেই  এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে সামাজিক প্রয়োজনের গবেষণার অগ্রাধিকার প্রাপ্য। কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজ – এই দুটো এক নয়। রাষ্ট্রের স্বার্থ  আর তার শাসকদের স্বার্থ অভিন্ন -- সমাজের অধিকাংশ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে তা না মেলাটাই স্বাভাবিক। তাই গবেষণার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার কাকে দিতে হবে তা বিচার রাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিলে কী হতে পারে, তা কয়েকটা সাম্প্রতিক উদাহরণ থেকে স্পষ্ট। পঞ্চগব্য নিয়ে গবেষণার জন্য টাকার অভাব হয় না, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা ইউজিসির অধীনে দেশের যে সমস্ত মানবীবিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র আছে, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে এক কলমের আঁচড়ে তাদের বাজেট ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে অধিকাংশ কেন্দ্রের পক্ষে গবেষকদের বেতন দেওয়াই সম্ভব হবে না। এর আগে ২০১৭ সালে ইউজিসি এক সিদ্ধান্তে সামাজিক বৈষম্য বিষয়ে গবেষণারত কেন্দ্রগুলিকে অর্থসাহায্য বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েও দেশব্যাপী প্রতিবাদের মুখে পিছিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু পিছনের দরজা দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকরী করার চেষ্টা অব্যাহত। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক দশ মাস বেতন না পেয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন। মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সের মানবীবিদ্যা ও সামাজিক বৈষম্য বৈষম্য বিষয়ে গবেষণারত কেন্দ্রদুটির গবেষকদের এই বছর পুনর্নবীকরণ হয়নি। অর্থাৎ ঢাকঢোল পিটিয়ে হাতে না মেরে চুপিসাড়ে ভাতে মারার পন্থা নেওয়াটাই সুবিধাজনক। সমস্ত বিষয়েই গবেষণায় কোপ পড়ছে, গবেষকরা মাসের পরে মাস ফেলোশিপ পাচ্ছেন না – এ সবই সত্য, কিন্তু আরো লক্ষণীয় যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেই বিভাগগুলি যারা সমাজের বঞ্চিত অংশকে নিয়ে কাজ করছেন।
      এখানে আরো একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। ব্যক্তি বা ব্যক্তিগত উদ‍্যোগের লক্ষ্য আশু মুনাফা, তাই পৃথিবীতে যেখানে যেখানে বেসরকারি উদ্যোগ গবেষণাতে অর্থ বিনিয়োগ করেছে, তা সবসময়েই একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য মাথায় রেখে। কিন্তু রাষ্ট্রের লক্ষ্য আরো সুদূরপ্রসারী, কারণ তার আয়ু সাধারণত ব্যক্তি মানুষের থেকে অনেক গুণ বেশি। এক প্রজন্মের লাভের কথা মাথায় রেখে গবেষণাতে শৃঙ্খলিত করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেওয়া হবে – সেটা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে অনুচিত। মানবীবিদ্যা বা সামাজিক বৈষম্য নিয়ে গবেষণাতে লাভক্ষতি বিচার কোন মাপকাঠিতে হবে?  
      আমাদের রাজ্যেও যে উচ্চশিক্ষাতে পরিস্থিতি খুব অন্য রকম তা বলতে পারি না। এখানে রাজ্য সরকারের পক্ষে গবেষণাতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা শক্ত, কারণ সরকার গবেষণাতে সাহায্য করে না। কিন্তু অন্য পথ আছে, এবং সরকার তা গ্রহণে পরাঙ্মুখ নন। আমাদের শিক্ষামন্ত্রী সগর্বে বলতে পারেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপের অধিকার তাঁর আছে, কারণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইনে দেন। এ বিষয়ে অনেক প্রতিবাদ হলেও তাঁকে সেই মন্তব্য প্রত্যাহার করেছে বলে চোখে পড়েনি। জানতে ইচ্ছা করে আইনমন্ত্রী বিচারালয় সম্পর্কে এই মন্তব্য করলে কী হত। জনগণের টাকাকে নিজের টাকা মনে করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার ভিতর দিয়ে যে মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণার প্রতিফলন হচ্ছে, তার সঙ্গে কেন্দ্রের শাসকদলের মনোবৃত্তির কোনো পার্থক্য নেই। দুঃখের বিষয় হল আমাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের এক অংশ ভয়ে হোক বা ভক্তিতে, এই মধ্যযুগীয় ফরমানকে মাথা পেতে নিচ্ছেন।  সুকান্ত চৌধুরির যে বক্তৃতা থেকে আগে উদ্ধৃতি দিয়েছি, সেখানে তিনি তাঁর এক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। অপর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের জনৈক অধ্যাপককে তিনি রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বক্তৃতা দিতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই অধ্যাপক বলেন যে তাঁকে রেজিস্ট্রার বা নিবন্ধকের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। প্রথমত, অধ্যাপকরা নিবন্ধকের অধীন নন, পদমর্যাদায় তাঁর উপরে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা হল যে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বক্তৃতা দিতে গেলে বাংলার অধ্যাপককে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে?
      আশঙ্কাটা এখানেই। গবেষক যদি ‘জাতীয় স্বার্থ’ মেনে শিক্ষার স্বাধিকারকে শিকেয় তুলে রাখেন, তাহলে শেষ বিচারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শাসকরা সবসময়েই মুক্ত চিন্তার বিরোধী, কারণ কোনো বিশেষ চিন্তা নয়, যে কোনো ধরনের চিন্তাই তাদের পক্ষে বিপদজনক। সারা পৃথিবীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এই গণতান্ত্রিক চিন্তা ও বাকস্বাধীনতার প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নেয়। তাই স্বৈরাচারী শাসকের পক্ষে তাদের উপর বেড়ি পড়ানোর চেষ্টাই স্বাভাবিক। সেই কারণেই অধ্যাপক-গবেষকদের উপর আচরণবিধি চাপিয়ে দেওয়া হয়, গবেষণার বিষয় বেছে দেওয়া হয়। সারা দেশে একই পাঠক্রম চালু করার সময় বা শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের সময় যাঁরা সেগুলি কার্যকরী করবেন, সেই শিক্ষকদের যতটা সম্ভব অন্ধকারে রাখা হয়।
      ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া বার্কলের বিখ্যাত দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ জুডিথ বাটলারের ২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘The Criminaliztion of Knowledge’ থেকে অংশবিশেষ উদ্ধৃত করি। ‘If and when the government or any other external power intervenes with political interests in the university to mandate or censor its curriculum, its direction, its standards, then the autonomous judgement of the faculty is undermined, and knowledge is restricted and distorted. The exercise of the freedom to think is punishable under such conditions. And when administrators ally with those external powers, they participate in the destruction of their own institutions.’ আমাদের দেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ অধ্যাপকদের মধ্য থেকেই নিযুক্ত হন। দুঃখ এই যে সামান্য সুযোগসুবিধার লোভে তাঁরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানকেও জলাঞ্জলি দিতে উন্মুখ হয়ে আছেন। জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে গবেষণাকে বন্ধ করে দেওয়ার এই চেষ্টাকে আমরা সবাই কি মুখ বুজে মেনে নেব? নাকি গলা তুলে বলব, ‘সদ্যোজাত শিশুর মধ্যে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, তাকে নিজের মতো বিকশিত হতে দিতে হবে।‘

Wednesday, 24 April 2019

ভারতের প্রথম মহিলা উদ্ভিদবিজ্ঞানী: জানকী আম্মাল

প্রকাশ নন্দ ঘোষ লেন ওয়েবজিন, এপ্রিল ২০১৯ সংখ্যা। পত্রিকা কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ।

ভারতের প্রথম মহিলা উদ্ভিদবিজ্ঞানী: জানকী আম্মাল

আলোর দিশারীঃ পুষ্টিবিজ্ঞানী কমলা ভাগবত সোহনি


একপর্ণিকা ওয়েবজিনের এপ্রিল ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাশিত। সম্পাদককে ধন্যবাদ।


আলোর দিশারীঃ পুষ্টিবিজ্ঞানী কমলা ভাগবত সোহনিঃ

সত্যেন্দ্রনাথ বসু

এই লেখাটি একপর্ণিকা পত্রিকার জানুয়ারি ২০১৯ সংখ্যায় প্রকাডশিত হয়েছিল। লিঙ্কটা দেওয়া আছে।

আলোর দিশারীঃ সত্যেন্দ্রনাথ




লেখাটা নিচে দেওয়া রইল।





সত্যেন্দ্রনাথ
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

      ১৯২৪ সালের মার্চ মাস। বন্ধুর আমন্ত্রণে বন্ধু এলাহাবাদ থেকে ঢাকা এসেছেন
      ‘তোমাকে দুটো পেপার দিচ্ছি, একটা পাউলির আর অন্যটা আইনস্টাইন ও এরেনফেস্টের। দুটোই গত বছর বেরিয়েছে। তুমি বিশেষ করে পাউলির প্রবন্ধটা পড়ে দেখো, প্লাঙ্কের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটা অদ্ভুত সমীকরণ এমনি এমনি ধরে নিয়েছে, কোথা থেকে সেটা এলো বোঝার চেষ্টাই করেনি। আমার বিশ্বাস এটা কেমন করে এলো তা উদ্ধার করতে তুমি পারবে’ বন্ধুকে বললে মেঘনাদ সাহা
      মেঘনাদ ফিরে যাওয়ার পরে বিজ্ঞানী উলফগ্যাং পাউলির লেখা পেপার অর্থাৎ গবেষণাপত্রটা হাতে তুলে নিলেন তাঁর বন্ধু
      কয়েকমাস পরের কথা। সমীকরণটা কোথা থেকে এলো তা বুঝতে পেরেছেন মেঘনাদের বন্ধুএকটা চিঠি লিখলেন। তারিখ দিলেন ৪ জুন, ১৯২৪নিচে সই করলেন, এস এন বোস।  চিঠিটা ভাঁজ করে খামে ভরলেন, তার সঙ্গে দিলেন একটি গবেষণাপত্রখামের উপর প্রাপকের নাম লিখলেন, ‘প্রফেসর আলবার্ট আইনস্টাইন।’
      এই গল্পটা সবারই হয়তো জানা। এস এন বোসের পুরো নাম নিশ্চয় তোমাদের বলতে হবে না। আজ থেকে ঠিক একশো পঁচিশ বছর আগে জন্মেছিলেন বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সেই দিনটা ছিল ১৮৯৪ সালের ১লা জানুয়ারি। ১৯২৪ সালের সেই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হলে তিনি সারা পৃথিবীর বিজ্ঞানীদের মধ্যে পরিচিত হয়ে যাবেন সেই সময় পর্যন্ত তাঁর জীবনের কিছু গল্প তোমাদের আজ বলি।


১৯২৫ সালে সত্যেন্দ্রনাথ

ঈশ্বর মিল লেনে সত্যেন্দ্রনাথের বাড়ি
      সত্যেন্দ্রনাথদের পুরানো বাড়ি ছিল নদীয়ার বড়জাগুলিয়া গ্রামে, তবে তাঁর জন্ম কলকাতার জোড়াবাগানে। তাঁর বাবা সুরেন্দ্রনাথ কলকাতাতে চাকরি করতেন। মায়ের নাম ছিল আমোদিনী দেবীসত্যেন্দ্রনাথ প্রথমে পড়া শুরু করেন বাড়ির কাছে নর্মাল স্কুলে। তোমরা অনেকেই নিশ্চয় জানো সেই স্কুলে রবীন্দ্রনাথ কিছুদিন পড়েছিলেন। তার পরে তাঁদের পরিবার কলকাতার গোয়াবাগানে ২২ নম্বর ঈশ্বর মিল লেনের বাড়িতে উঠে আসে। তখন তিনি ভর্তি হলেন কাছের নিউ ইন্ডিয়ান স্কুলে।


      বাবা সুরেন্দ্রনাথ ছেলের লেখাপড়ার প্রতি ভালোবাসার কথা বুঝতে পেরেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর অঙ্কের প্রতি ঝোঁক। দুষ্টুমি করলে তাকে হাতে চক ধরিয়ে মেঝেতে অঙ্ক কষতে বললেই হল, সব দুষ্টুমি নিমেষে উধাও। তাই ঠিক করলেন ছেলেকে  কলকাতার সবচেয়ে ভালো স্কুলে পড়াবেন। ক্লাস টেনে ভর্তি করে দিলেন কলেজ স্ট্রিটের হিন্দু স্কুলে। তখন ক্লাস টেনকে বলা হত ফার্স্ট ক্লাস।
      হিন্দু স্কুলে অঙ্ক শেখাতেন কলকাতার সবচেয়ে  নামকরা অঙ্কের শিক্ষক উপেন্দ্রনাথ বক্সি।  তাঁর খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। তিনিই একবার অঙ্কে সত্যেন্দ্রনাথকে একশোতে একশো দশ দিয়েছিলেন। কারণ সত্যেন্দ্রনাথ প্রশ্নপত্রে যতগুলো অঙ্ক ছিল সবগুলোই করে দিয়েছিলেন। এই গল্পটা তোমরা অনেকেই জানো। তিনি গর্ব করে বলতেন সত্যেন্দ্রনাথ ভবিষ্যতে পিয়ের লাপ্লাস বা অগুস্তো লুই কশির মতো বড়ো গণিতবিদ হবেন। তবে শুধু অঙ্ক নয়, সত্যেন্দ্রনাথ সব বিষয়েই ভালো ছিলেন। টেনিসন বা রবীন্দ্রনাথের কবিতা অনর্গল বলতে পারতেন, কালিদাসের মেঘদূত তাঁর কণ্ঠস্থ ছিল।
      ১৯০৮ সালে তাঁর স্কুলের শেষ পরীক্ষা দেওয়ার কথা, তখন সেই পরীক্ষার নাম ছিল এনট্রান্স। কিন্তু পরীক্ষার দুদিন আগে চিকেন পক্স বা জল বসন্ত হওয়ার ফলে তাঁর সে বছর আর পরীক্ষায় বসা হয়নি। পরের বছর এনট্রান্সে হলেন পঞ্চম। প্রথম হয়েছিলেন হিন্দু স্কুলেরই চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য, কিন্তু তার পরের বছরেই তিনি মারা যান। সেই বছরের আরো কয়েকজন ছাত্রের নাম আমাদের গল্পে পরে আসবে। একজনের নাম সবাই জানো, তৃতীয় হয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা। তিনি ছিলেন ঢাকার জুবিলি স্কুলের ছাত্র। ওই একবারই সত্যেন্দ্রনাথ কোনো পরীক্ষাতে প্রথম হন নি।
      হিন্দু স্কুল থেকে রাস্তা পেরিয়েই প্রেসিডেন্সি কলেজ, সত্যেন্দ্রনাথ সেখানে ভর্তি হলেন। তাঁর প্রেসিডেন্সি কলেজের সময়ের কথা সংক্ষেপে দেখে নিইপ্রথমে দুই বছরের ইন্টারমিডিয়েট সায়েন্স বা আইএসসি, যাকে আমরা এখন হায়ার সেকেন্ডারি বলি।  তিনি বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞান -- পড়তে হত পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, শারীরবিদ্যা এবং ইংরাজি। দু’বছরে পরে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতে প্রথম হয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ, দ্বিতীয় মেঘনাদ সাহা। তৃতীয় হয়েছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজেরই নিখিলরঞ্জন সেন
      এবার তিনি গণিতে অনার্স এবং পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে পাস নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। নতুন সহপাঠী পেলেন মেঘনাদ সাহাকে, তিনি এসেছেন ঢাকা থেকে। ১৯১৩ সালে বিএসসি পাস করলেন, প্রথম তিনজনের নাম যথাক্রমে সত্যেন্দ্রনাথ, মেঘনাদ ও নিখিলরঞ্জন। তার পরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজেই মিশ্র গণিতে এমএসসি কোর্সে ভর্তি হয়েছিলেন। দু বছর পরে পরীক্ষার ফল বেরোল।  প্রথম সত্যেন্দ্রনাথ, দ্বিতীয় মেঘনাদ। নিখিলরঞ্জন সে বছর পরীক্ষা দেননি। তাঁর সেই সময়ের নাম্বার রেকর্ড হয়ে আছে।
সত্যেন্দ্রনাথের এমএসসি পরীক্ষার মার্কশীট
      সত্যেন্দ্রনাথের শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজনের নাম তোমরা সবাই জানো। পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন জগদীশচন্দ্র, রসায়ন বিভাগে ছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। সত্যেন্দ্রনাথ মোটেই একেবারে বাধ্য ছাত্র ছিলেন না, ক্লাসে চঞ্চল সত্যেনকে সামলানোর এক কায়দা বার করেছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। ক্লাসে যাওয়ার সময় বেয়ারা একটা টুল বয়ে নিয়ে যেত, প্রফুল্লচন্দ্রের ক্লাসে সত্যেনকে শিক্ষকের পাশে বসে থাকতে হত। প্রেসিডেন্সি কলেজে একবার এক শিক্ষক হ্যারিসন এক ছাত্রের উদ্দেশ্যে কটূক্তি করেছিলেন। ছাত্ররা প্রতিবাদ জানিয়েছিল, তাদের নেতাদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। হ্যারিসন ক্ষমা চেয়েছিলেন।
      অঙ্কের শিক্ষকদের মধ্যে দুজনের নাম বলি, দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক ও শ্যামাদাস মুখোপাধ্যায় দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন আপেক্ষিকতাবাদ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ কলেজে পড়াকালীন সত্যেন্দ্রনাথ ওয়ার্কিং মেনস ইন্সটিটিউট নামে মাণিকতলার একটি নাইট স্কুলে পড়াতেন, সেখানে গরীব বাড়ির বাচ্চারা পড়ত। স্কুলটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলার বিপ্লবীরা।  দেবেন্দ্রনাথ ছিলেন স্কুলটির প্রধান। প্রেসিডেন্সি কলেজের উজ্জ্বল ছাত্র শ্যামাদাসের জ্যামিতি বিষয়ে গবেষণা দেশে বিদেশে সুনাম কুড়িয়েছিল। ১৯০৯ সালে তিনি ডিফারেনশিয়াল জ্যামিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপপাদ্য ‘Four Vertex Theorem’ প্রথম প্রমাণ করেছিলেনসত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল খুব ঘনিষ্ঠ  মিহিজামে শ্যামাদাসের একটি বাড়ি ছিল, দীর্ঘ ছুটির সময় সেখানে তিনি ছাত্রদের নিয়ে যেতেনঅঙ্ক আটকে গেলে তাদের বলতেন, ‘শনিবার সত্যেনকে বলিস’। অনেক শনিবার সেখানে যেতেন সত্যেন্দ্রনাথ, হাতে থাকত একটা ছড়ি। নদীর ধারে বালির উপরে ছড়ি দিয়ে অঙ্কগুলো কষে দিতেন তিনি।
      শরীরবিজ্ঞানে অধ্যাপক ছিলেন সুবোধচন্দ্র মহলানবীশ, তিনি প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের কাকা। তিনি ছিলেন সারা এশিয়ার প্রথম শরীরবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ।  ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষাতে শরীরবিজ্ঞানে তিনি সত্যেন্দ্রনাথকে একশোতে একশো দিয়েছিলেন। ইংরাজি বিভাগে শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন হিউ মেলভিল পার্সিভাল সত্যেন্দ্রনাথের খাতা দেখার পরে যা নাম্বার পেয়েছিলেন, তার সঙ্গে তিনি আরো অতিরিক্ত দশ নম্বর যোগ করে লিখে দিয়েছিলেন, “This Boy has originality.” দেশ ছাড়ার আগে তিনি সত্যেন্দ্রনাথকে ডেকে আশীর্বাদ করে গিয়েছিলেন।
      কারা ছিলেন তাঁর শিক্ষক, কী বই তাঁকে পড়তে হত, এ সমস্ত নিয়ে আরো বেশি জানতে চাইলে এই লেখাটা দেখতে পারো। 
      মাস্টারমশাইদের কথা তো হল, এবার তাঁর কলেজের বন্ধুদের কয়েকজনের কথা বলি। মেঘনাদ সাহার কথা নিশ্চয় আলাদা করে বলতে হবে না, সাহা আয়নন সমীকরণের জন্য তিনি বিশ্ববিখ্যাত। নিখিলরঞ্জন সেন পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছিলেন, তাঁকে এদেশে ফলিত গণিতের জন্মদাতা বলা হয়। পদার্থবিদ্যা পড়েছিলেন স্নেহময় দত্ত ও শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষদ্বিতীয়জনের কথা পরে আসবে। স্নেহময় দত্ত যৌগ অণুর বর্ণালীবিশ্লেষণের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পরে পশ্চিমবঙ্গের ডায়রেক্টর অফ পাবলিক ইনস্ট্রাকশন ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অর্থাৎ নিবন্ধকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ ও জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখার্জি পড়েছিলেন রসায়ন, প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর এই দুই প্রিয় ছাত্রকে ডাকতেন ‘বড় জ্ঞান’ আর ‘ছোট জ্ঞান’। জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ তড়িৎবিশ্লেষ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসাবে সারা পৃথিবীতে পরিচিত ছিলেন। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ওয়াল্টার নার্নস্টের বইতে তাঁর সপ্রশংস উল্লেখ আছে। তিনি সি ভি রমনের পরে বাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সের ডিরেক্টর হয়েছিলেন। স্বাধীন ভারতে প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি অর্থাৎ খড়গপুর আইআইটির প্রথম ডিরেক্টর, তার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য হয়েছিলেন তিনি। জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখার্জি মৃত্তিকা ও কৃষিবিজ্ঞানে এদেশের পথিকৃৎদের মধ্যে একজন। তিনি ইন্ডিয়ান এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা হয়েছিলেন। রুরকির সেন্ট্রাল বিল্ডিং রিসার্চ  ইনস্টিটিউটের তিনি প্রথম অধিকর্তা। ভাবতে অবাক লাগে একটা কলেজে একটা বছরে এই সমস্ত ছাত্ররা ছিলেন যাঁদের প্রত্যেকেরই কৃতিত্ব সম্পর্কেই আলাদা আলাদা করে লেখা যায়!
তারকা সমাবেশ। বসে বাঁদিক থেকেঃ মেঘনাদ সাহা, জগদীশচন্দ্র বসু ও জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ; দাঁড়িয়ে বাঁদিক থেকেঃ স্নেহময় দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, দেবেন্দ্রমোহন বসু, নিখিলরঞ্জন সেন, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও এন সি নাগ

      এমএসসি পাস করার পরে দু জায়গায় চাকরির দরখাস্ত করেছিলেন, কিন্তু চাকরি তাঁর হয় নি। নিয়োগকর্তারা পরিষ্কার বলেন যে এত প্রতিভাধর কাউকে তাঁরা চান না। অল্প গৌরীপুর রাজ্যের রাজপুত্রকে পড়িয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। সেই ছাত্র পরে ভারতীয় সিনেমাতে অভিনেতা ও পরিচালক হিসাবে বিখ্যাত হয়েছিলেন, তাঁর নাম প্রমথেশ বড়ুয়া।
      কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান কলেজ ছিল বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষের হাতে তৈরি। বিজ্ঞান কলেজের ইতিহাস তোমরা এখানে পড়তে পারো।  আশুতোষ কয়েকজন সদ্য পাস করা ছাত্রকে গবেষণার জন্য নিয়োগ করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ, মেঘনাদ, শৈলেন্দ্রনাথ। সত্যেন্দ্রনাথকে আপেক্ষিকতাবাদ, মেঘনাদ সাহাকে বিকিরণ তত্ত্ব এবং শৈলেন্দ্রনাথ ঘোষকে ধাতুর পাউডারের তড়িৎ পরিবাহিতা নিয়ে গবেষণার জন্য মাসে ১৫০ টাকা করে স্কলারশিপ দেয়া হয়। এছাড়া প্রথম দুজনের বই কেনার জন্য ৫০০ টাকা এবং শৈলেন্দ্রনাথের গবেষণার যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ২০০০ টাকা বরাদ্দ হয়এঁরা সবাই স্বাধীনভাবে গবেষণা শুরু করেন।
      ১৯১৬ সালে এমএসসি ক্লাস শুরু হবে বিজ্ঞান কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগেদু’বছর আগে নিযুক্ত হয়েছিলেন দুই অধ্যাপক তাঁদের একজন সি ভি রমন কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে, তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের ছাড়পত্র পাননি। অন্যজন দেবেন্দ্রমোহন বসু উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানিতে গিয়েছিলেনবিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়াতে আটকা পড়েছেন। ছাত্রদের পড়াবে কে?  দুই বন্ধুর সম্পর্কে আশুতোষ খবর নিয়েছেন। গণিতের ছাত্র হলে কি হবে, তারা যে পদার্থবিদ্যা পড়াতে পারবে সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত। সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদকে ম্যাথামেটিকাল ফিজিক্স পড়ানোর ভার দিলেনএজন্য তাদের স্কলারশিপের পরিমাণ বেড়ে হল ২০০ টাকা। সত্যেন্দ্রনাথ তাছাড়াও জেনারেল প্রপার্টিস ল্যাবরেটরিতে ছাত্রদের প্র্যাকটিকাল করাতেন। প্রথমে ফলিত গণিত বিভাগে যোগ দিলেও সেই বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গণেশ প্রসাদের সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে দুজনেই পুরোপুরি পদার্থবিদ্যা বিভাগে চলে আসেন। শৈলেন্দ্রনাথকে আশুতোষ দায়িত্ব দিয়েছিলেন ল্যাবরেটরি তৈরি করার। কিন্তু তিনি  বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকার জন্য পুলিসের নজরে পড়েন এবং অল্পদিনের মধ্যেই আশুতোষেরই পরামর্শে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রথম যুগের গল্প এই লেখাতে পাওয়া যাবে।
      এমএসসি সিলেবাসে কোনো বইয়ের নাম ছিল না, ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে মৌলিক গবেষণাপত্র থেকে পড়ানো হবে। তোমরা বড় হয়ে দেখবে বিংশ শতাব্দীর প্রথম পঁচিশ বছর হল পদার্থবিজ্ঞানে কোয়ান্টাম বিপ্লবের যুগ, কয়েকবছরের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ নিজেও তার এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবেন। তখন আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান সবে জন্ম নিচ্ছে, তার বই বিশেষ লেখা হয়নি যা ছিল তাদের অধিকাংশই জার্মান ভাষায়দুই বন্ধুই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মান শেখার ক্লাসে ভর্তি হন, মেঘনাদ অবশ্য ভাষাটা কিছুটা জানতেন। ভেবেচিন্তে দুই বন্ধু সাহস করে চিঠি লিখলেন আইনস্টাইনকে, অনুমতি চাইলেন তাঁর আপেক্ষিকতা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রগুলি অনুবাদ করে ছাপার। অনুমতি দিলেন আইনস্টাইন  আইনস্টাইন ও হেরম্যান মিনকাওস্কির আপেক্ষিকতা সংক্রান্ত গবেষণাপত্রগুলির ইংরাজি অনুবাদ  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয়। ভূমিকা লিখেছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ। এটিই আইনস্টাইনের গবেষণাপত্রগুলির পৃথিবীতে প্রথম ইংরাজি অনুবাদ।
      দুই বন্ধু হাতড়াচ্ছেন গবেষণার পথ। গ্যাসের অবস্থার সমীকরণ সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র লিখে ফেললেন, তাঁদের দুজনের একত্রে প্রথম পেপার। এই বিষয়ে আরো একটি পেপার তাঁরা  লিখেছিলেন এই সময়। এই গবেষণা তাপগতিবিদ্যার সঙ্গে যুক্ত। তাপগতিবিদ্যার আণুবীক্ষণিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করে স্ট্যাটিসটিকাল মেকানিকস। সাহা সমীকরণ ও বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন দুইই স্ট্যাটিসটিকাল মেকানিকসের মধ্যে পড়ে, তাই সেই যৌথ গবেষণাকে তাঁদের ভবিষ্যৎ পথে প্রথম পদক্ষেপ মনে করা যেতে পারে। সত্যেন্দ্রনাথ এই সময় আর একটি গবেষণা পত্র লেখেন পরমাণুর শক্তি স্তর বিষয়ে কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রয়োগ, ১৯১৩ সালে নিলস বোর এ বিষয়ে তাঁর গবেষণাটি প্রকাশ করেছিলেন। কলকাতায় থাকার সময় আরো দুটি গবেষণাপত্র লিখেছিলেন তিনি, সেগুলো গণিত বিষয়ে।
      কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদ সত্যেনের জুটল না। আশুতোষের সঙ্গে তাঁর বনিবনা হচ্ছিল না, একবার আশুতোষের করা প্রশ্নপত্রে একটা অঙ্কের ভুল নিয়ে দুজনের তর্ক হয়ে গেল। ১৯২১ সালে যোগ দিলেন নতুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার রিডার পদে। আশুতোষ অবশ্য তখন বেশি মাইনে দিয়ে কলকাতায় রাখতে চেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথকে, রাজি হননি তিনিঢাকা থেকে মেঘনাদকে চিঠিতে লিখলেন সত্যেন, ‘মাসখানেকের উপর তোমাদের দেশে এসেছি। এখানকার কাজ এখনও আরম্ভ হয়নি। তোমাদের ঢাকা কলেজে জিনিস অনেক ছিল, কিন্তু অযত্নে তাদের যে দুর্দশা হয়েছে তা বোধ হয় নিজেই জান।’ ১৯৪৫ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঢাকা থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাবেন, হবেন খয়রা অধ্যাপক
      এমএসসি পড়াকালীন সত্যেন্দ্রনাথের বিয়ে হয় সেই সময়ের  বিখ্যাত ডাক্তার যোগীন্দ্রনাথ ঘোষের মেয়ে ঊষাবতীর সঙ্গে। তখন এই রকম অল্প বয়সে বিয়ে হওয়াটাই ছিল রীতি। সত্যেন বিয়ের সময় দুটো শর্ত করেছিলেন।  প্রথমত, তাঁর বিয়েতে কোনো পণ নেওয়া যাবে না। দ্বিতীয় শর্ত ছিল তাঁর বিয়েতে তাঁর সঙ্গে যাবে তাঁর দু’শো ঘনিষ্ঠ বন্ধু!
      সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধুর সংখ্যা সেই সময়েই কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিল। তাঁকে এক সময় বলা হত আড্ডার রাজা। নিজের বাড়ির থেকে তিনি বন্ধুদের বাড়িতে বেশি সময় কাটাতেন। অধিকাংশ সময় কেটে যেত সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চায়। সত্যেন্দ্রনাথ খুব ভালো এসরাজ ও বাঁশী বাজাতে পারতেন। কলেজের বন্ধুদের মতোই কলেজের বাইরের বন্ধুরাও অনেকেই পরবর্তী জীবনে বিখ্যাত হয়েছিলেন, কয়েকজনের নাম তোমাদের বলি। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ছেলে বিখ্যাত গায়ক দিলীপ রায়, শিল্পী যামিনী রায়, সাহিত্যিক প্রমথনাথ বিশী ও ধুর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নাট্যকার ও অভিনেতা অমৃতলাল বসু, কবি অমিয় চক্রবর্তী ও বিষ্ণু দে, ভাষাতাত্ত্বিক সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ঐতিহাসিক সুশোভন সরকারের মতো মানুষ ছিলেন তাঁর বন্ধুঢাকাতে সত্যেন্দ্রনাথরা বারো জন মিলে ‘বারো জনা’ নামের একটা ক্লাব বানিয়েছিলেন। এই ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার, পদার্থবিজ্ঞানী সতীশরঞ্জন খাস্তগীর প্রমুখ।
      ঢাকাতে থাকাকালীন সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা করেছিলেন, সেই কাহিনি আমাদের গল্পের শুরুতেই বলেছি।  তাঁর সেই কাজ তাপগতিতত্ত্বের সঙ্গে যুক্ত। এর থেকেই কোয়ান্টাম স্ট্যাটিসটিকসের জন্ম দেয় যা ১৯০০ সালে আবিষ্কৃত ম্যাক্স প্লাঙ্কের কৃষ্ণ বস্তুর বিকিরণ সংক্রান্ত কোয়ান্টাম তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসু ১৯১৯ সালে জার্মানি থেকে ভারতে ফেরার সময় কিছু নতুন জার্মান বই নিয়ে আসেন, প্লাঙ্কের লেখা তাপগতিতত্ত্ব বইটা তিনি সত্যেন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন।
      আলোর কণা ফোটনের পরিসংখ্যান তাঁর এই বিখ্যাত গবেষণাপত্রটি তিনি প্রথম ইংল্যান্ডের ফিলজফিকাল ম্যাগাজিনে পাঠিয়েছিলেন, সম্ভবত তাঁরা এর তাৎপর্য বুঝতে পারেন নি। তখন সত্যেন্দ্রনাথ সেটা পাঠালেন আইনস্টাইনকে। আইনস্টাইনের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব বুঝতে পেরে নিজেই সেটা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে ছাপানোর ব্যবস্থা করেন। প্রবন্ধের শেষে আইনস্টাইন লিখেছিলেন, ‘আমার মতে প্লাঙ্কের সূত্রকে বোস যেভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক অগ্রগতি।’  সত্যেন্দ্রনাথের গবেষণা ছিল ফোটন বা আলোর কোয়ান্টাম সম্পর্কে, আলোর কণার স্থিরভর শূন্য। আইনস্টাইন ভরবিশিষ্ট কণাদের জন্য এই পরিসংখ্যানকে প্রসারিত করেন।

আইনস্টাইনকে লেখা সত্যেন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত চিঠি
      সত্যেন্দ্রনাথের সেই যুগান্তকারী আবিষ্কার ব্যাখ্যা করাটা খুব সহজ নয়, তাই তার বিশদ আলোচনায় না গিয়ে মূল কথাগুলো দেখে নিই। প্রথমত সত্যেন্দ্রনাথের আগে পর্যন্ত প্লাঙ্কের সূত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একই সঙ্গে আলোর তরঙ্গ ও কণিকা ধর্ম ব্যবহার করতে হত, সত্যেন্দ্রনাথ প্রথম ফোটনকে পুরোপুরি কণা ধরে সূত্রটা প্রমাণ করেন। দ্বিতীয়ত, বোসের হিসাব অনুযায়ী একই কম্পাঙ্কের আলোর দুটি ফোটনের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এখন আমরা জানি যে সমস্ত মৌলিক কণাই এই নীতি মেনে চলে, যেমন দুটো ইলেকট্রন অবিকল একরকম।  তৃতীয়ত, একটা শক্তিস্তরে একসঙ্গে কতগুলো ফোটন থাকতে পারবে তার কোনো সীমা নেই। পরে বোঝা গিয়েছিল যে ইলেকট্রন প্রোটনের ব্যাপারটা উল্টো, একটা শক্তিস্তরে একটার বেশি কণা থাকতে পারে না। যে সমস্ত কণা বোসের সূত্র মেনে চলে অর্থাৎ একটা শক্তিস্তরে যত খুশি থাকতে পারে, তাদের নাম দেওয়া হয়েছে বোসন। ইলেকট্রন প্রোটনের  মতো কণাদের বলে ফের্মিয়ন, তারা এনরিকো ফের্মি ও পল ডিরাকের পরিসংখ্যান মেনে চলে। মহাবিশ্বে দুই রকম মৌলিক কণা পাওয়া যায়, বোসন আর ফের্মিয়ন।
পল ডিরাক ও সত্যেন্দ্রনাথ (১৯৫৭)
      বোসন নামের পিছনে একটা গল্প আছে। ১৯৫৭ সালে পল ডিরাক কলকাতায় এসেছিলেন, সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে আনার জন্য বিমানবন্দরে গিয়েছিলেন, সঙ্গে বেশ কয়েকজন ছাত্র। ডিরাককে তিনি বললেন, ‘আমরা দুজন গাড়ির সামনে বসি, ছাত্ররা সবাই পিছনে।‘ ডিরাক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘অত জন ছাত্র গাড়ির পিছনে ধরবে কেমন করে?’ সত্যেন্দ্রনাথ বলেছিলেন যে ছাত্ররা বোস আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে, ওরা সবাই এক জায়গায় থাকতে পারবে। ডিরাক এর পরে বোসন শব্দটা মেনে তৈরি করেন।

      সত্যেন্দ্রনাথের ১৯২৪ সালের এই কাজ মৌলিক কণা সম্পর্কে আমাদের সমস্ত চিন্তা ভাবনাকে পাল্টে দিয়েছিলকিন্তু তা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে এই লেখা আর শেষ হবে না। পরবর্তীকালে অতিপরিবাহিতা বা সুপারকন্ডাক্টিভিটি, অতিপ্রবাহী বা সুপারফ্লুইড, বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন ইত্যাদি যে সমস্ত আবিষ্কার নোবেল পুরস্কার পেয়েছে, তাদের ব্যাখ্যা করতে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানকে প্রয়োজন হয়।
      নিজের নাম প্রচারে সত্যেন্দ্রনাথ একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না। তাই বিজ্ঞানী মহলের বাইরে সাধারণের মধ্যে তাঁর বিশেষ পরিচিতি ছিল না। ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন, তখন আইনস্টাইন তাঁকে বোসের খবর জিজ্ঞাসা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ প্রমথ চৌধুরি বা অমিয় চক্রবর্তীর মতো সত্যেন্দ্রনাথের বন্ধুদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন, অথচ তাঁর সম্পর্কে কিছুই জানতেন না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে খবর নেন ও পরবর্তীকালে তাঁর ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থটি সত্যেন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেন।
      সত্যেন্দ্রনাথের জীবনের অধিকাংশটাই আমাদের আলোচনার বাইরে রয়ে গেল, তা নিয়ে পরে লেখার ইচ্ছা রইল। কেমন মানুষ ছিলেন তিনি তা বোঝাতে একটা গল্প বলে শেষ করি। ১৯২৪ সালে প্লাঙ্কের সূত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ধরে নিয়েছিলেন যে ফোটন কণাদের স্পিন বা নিজস্ব কৌণিক ভরবেগ আছে। আইনস্টাইন অনুবাদের সময় স্পিন কথাটা বাদ দিয়ে  আলোর দুই ধরনের পোলারাইজেশন বা সমবর্তনের কথা বলেন। তরঙ্গের সমবর্তন হয়, কিন্তু কণিকার সমবর্তনের কোনো অর্থ নেই। সত্যেন্দ্রনাথের তত্ত্বে কিন্তু আলোকে তরঙ্গ নয়, কণা ধরা হয়েছিল। মৌলিক কণার স্পিনের কথা তখনো পর্যন্ত কেউ জানত না। এক বছর পরে জর্জ উলেনবেক ও স্যামুয়েল গোল্ডস্মিট প্রথম ইলেকট্রনের স্পিনের কথা বলেন। অনেক বছর পরে সত্যেন্দ্রনাথকে যখন এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেন স্পিন আবিষ্কার হয়েছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ;  কে প্রথম সে কথা বলেছিল সে ব্যাপারটা নিতান্তই গৌণ।  এই রকম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক আবিষ্কারের দাবী স্বচ্ছন্দে ছেড়ে দিতে পারেন এমন মানুষ পৃথিবীতে সত্যি বিরল।