Monday, 1 May 2017

সাধারণ আপেক্ষিকতা

সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের শতবর্ষ

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 

            এই বছর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের (General Theory of Relativity)  একশো বছর পূর্ণ হল। ঠিক এক শতাব্দী আগে ১৯১৬ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর এই তত্ত্বের পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন। ঘটনাক্রমে বছরই তাঁর সেই তত্ত্বের একটা ভবিষ্যৎ বাণী পরীক্ষাগারে প্রথমবার প্রমাণিত হয়েছে। বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে আইনস্টাইনের তত্ত্বটি বেশ দুরূহ। তবে অঙ্কের জটিলতাকে দূরে সরিয়ে রেখে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি বোঝা হয়তো সম্ভবএই লেখায় আমরা সেই চেষ্টাই করব।
            এক কথায় বলতে গেলে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ হল মহাকর্ষ বা মাধ্যাকর্ষণের তত্ত্ব। স্কুলে আমরা সবাই আইজ্যাক নিউটনের মাধ্যাকর্ষণের সূত্র পড়েছি। নিউটন বলেছিলেনব্রহ্মাণ্ডের যে কোনো দুটি বস্তু পরষ্পরকে আকর্ষণ করে। যদি দুটি বস্তুর ভর যথাক্রমে m M, এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব r হয়, তবে তাদের মধ্যে এই আকর্ষণ বলের মান হল
F = GmM/r2
এখানে G হল নিউটনের মহাকর্ষীয় ধ্রুবক।
            নিউটনের এই সূত্র বিজ্ঞানে তথা সমাজে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না। বিজ্ঞানী জোহানেস কেপলার গ্রহ উপগ্রহ ধূমকেতুদের গতিবিধি সংক্রান্ত নিয়মগুলি আবিষ্কার করেছিলেন। নিউটনের সূত্রের সাহায্যেই প্রথম সেগুলিকে ব্যাখ্যা করা গেল। একই সঙ্গে এই সূত্র যে কোনো বস্তু উপর থেকে মাটির দিকে কেমনভাবে পড়ে তা দেখিয়ে দিল। প্রায় দুহাজার বছর ধরে আরিস্টটল বিজ্ঞান সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। তাঁর তত্ত্বে গ্রহ নক্ষত্ররা ছিল অপরিবর্তনশীল, মাটির পৃথিবীর নিয়মের ঊর্ধ্বে। সে সময়ের কায়েমি স্বার্থ আরিস্টটলের মতকে খুব পছন্দ করত, কারণ যে কোনো রকম পরিবর্তন, তা সমাজ ধর্ম বা রাজনীতিযে ক্ষেত্রেই হোক না কেন, তার বিরোধিতাতে তাকে ব্যবহার করা যেত। সচেতনভাবে প্রকাশ্যে আরিস্টটলের তত্ত্বের বিরোধিতা যাঁরা প্রথম করেছিলেন, গ্যালিলিও তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। রোমান ক্যাথলিক চার্চের কোপে পড়ে তাঁর কী দশা হয়েছিল, তা আমাদের সকলের জানা।   
            গ্যালিলিওর মৃত্যুর এক বছর পর নিউটনের জন্ম। তিনি দেখালেন যে পৃথিবী আর আকাশের জ্যোতিষ্করা একই নিয়ম মেনে চলে। প্রোটেস্টান্ট ইংল্যাণ্ডে নিউটনকে অবশ্যই গ্যালিলিওর  মতো বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়নি। তবু নিউটনের নিজের কথা থেকেই জানা যায় যে আবিষ্কারের পর দীর্ঘকাল তিনি তাঁর সূত্র প্রচারের চেষ্টা করেন নি, কিন্তু সেটা একান্তই নিউটনের নিজস্ব খেয়ালিপনা। অনুজপ্রতিম বন্ধু এডমণ্ড হ্যালির উৎসাহে নিউটন তাঁর তত্ত্বকে সাধারণের গোচরে আনেন। হ্যালি নিজে নিউটনের সূত্র ব্যবহার করে দেখান যে অনেক ধূমকেতু প্রকৃত পক্ষে আমাদের কাছে কাছে বারবার ফিরে আসে। তিনি বলেছিলেন ১৬৮২ সালে যে ধুমকেতুটি দেখা গিয়েছিল, তা কমবেশি সাতাত্তর বছর পর পর ফিরে আসে। তাকে আবার পৃথিবী থেকে দেখা যাবে ১৭৫৯ সালে। ধূমকেতু যথা সময়ে দেখা দিয়েছিল, যদিও তা দেখার জন্য নিউটন বা হ্যালি কেউই তখন জীবিত ছিলেন না।  হ্যালির  সম্মানে আমরা সেই ধূমকেতুকে তাঁর নামে ডাকি  


Portrait of man in black with shoulder-length, wavy brown hair, a large sharp nose, and a distracted gaze Edmond Halley 072.jpg
 নিউটন            এডমণ্ড হ্যালি
     এত সমস্ত সাফল্যের মধ্যেও নিউটনের তত্ত্ব নিয়ে দুটো সমস্যা ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্যোর্তিবিদরা সৌরজগতের গ্রহদের দিকে দূরবিন তাক করে তাদের গতিবিধি লক্ষ্য করছিলেন এবং নিউটনের সূত্র ব্যবহার করে অঙ্ক কষে মেলাচ্ছিলেন। সৌরজগতে বাকি সব গ্রহের হিসাব মিলে গেলেও জ্যোর্তিবিজ্ঞানী লে ভেরিয়ের ১৮৪০ সাল নাগাদ লক্ষ্য করেন যে বুধের কক্ষপথের ক্ষেত্রে নিউটনের তত্ত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের একটা তফাত রয়ে যাচ্ছে তফাতটা খুব সামান্য, কিন্তু নিউটনের উপর বিজ্ঞানীদের তখন এতটাই অগাধ বিশ্বাস যে তাঁরা এটুকু গণ্ডগোলও মেনে নিতে রাজি ছিলেন না। ইউরেনাস গ্রহ আবিষ্কারের পর যখন দেখা গেল তার চলাফেরা অঙ্ক কষে মেলানো যাচ্ছে না, তখন লে ভেরিয়ের মনে করেছিলেন যে অজানা কোনো এক গ্রহের আকর্ষণ এঁর জন্য দায়ী। তিনি হিসাব করে বলেছিলেন আকশের কোন দিকে গ্রহটাকে পাওয়া যাবে। জোহান গটফ্রিড গ্যালে নামে অপর এক জ্যোর্তিবিদ সেই মতো নতুন গ্রহ নেপচুনকে খুঁজে বার করেন। একই রকম ভাবে বুধ নিয়ে সমস্যা মেটাতে কোনো কোনো বিজ্ঞানী তখন ভেবেছিলেন যে সূর্যের আরও কাছে একটা গ্রহ আছে, কিন্তু সূর্যের ঔজ্জ্বল্যের জন্য তাকে দেখা যায় না। তার আকর্ষণের জন্যই বুধের চলাফেরার হিসাব মেলানো যাচ্ছে না। এই অদেখা গ্রহের নাম দেয়া হয় ভালকান। তবে শত চেষ্টাতেও ভালকানের দেখা মিলল না। সমস্যা সমাধানের আরও নানা রকম চেষ্টা  হয়েছিল, কিন্তু কোনোটাই কাজে আসেনি।
            অপর সমস্যাটা তখনই বোঝা যায়নি। আমরা জানি সূর্য পৃথিবী থেকে প্রায় পনের কোটি কিলোমিটার দূরে। আমরা এও জানি যে শূন্যে আলোর বেগ প্রতি সেকেণ্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার। আলো সূর্য থেকে পৃথিবী পর্যন্ত আসতে সাড়ে আট মিনিট মত সময় নেয়। তাই যদি এই মুহূর্তে সূর্য নিভে যায়, আমাদের তা বুঝতে সময় লাগবে সাড়ে আট মিনিট। কিন্তু যদি সূর্য কোনো কারণে হঠাৎ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়? পৃথিবী সহ সমস্ত গ্রহেরা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের টানে বাঁধা পড়ে আছে, সূর্য না থাকলে তারা সবাই ছিটকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু কখন? নিউটনের তত্ত্ব অনুযায়ী সূর্য নিশ্চিহ্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী তার টান থেকে ছাড় পেয়ে যাবে --একেবারেই সময় লাগবে না। টেকনিকাল কথায় বললে নিউটনের তত্ত্ব হল action at a distance তত্ত্ব-- যা ঘটে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত জায়গায় তার প্রভাব পড়ে। এটা মেনে চললে সূর্য নিশ্চিহ্ন হলে সেই খবর মহাবিশ্বের সর্বত্র একই সময়েই পৌঁছে যাবে। এটা কল্পনা করা একটু শক্তআমার ঘরের কাছের খবর আমি যখন পাব, একই সঙ্গে সবচেয়ে দূরের ছায়াপথেও তা যাবে আবার হয় নাকি?       
            তবে action at a distance তত্ত্বের ক্ষেত্রে সমস্যাটা প্রকৃতপক্ষে আরও জটিল ১৯০৫ সালে আইনস্টাইন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব (Theory of Special Relativity) প্রকাশ করেন। এখানে তিনি দেখান যে স্থান কাল আলাদা বা পরষ্পর বিচ্ছিন্ন নয়। আমরা কোনো বস্তুর অবস্থান বোঝাতে তিনটে মাত্রা ব্যবহার করি। সময়কে আমরা আলাদা ভাবে মাপি। আইনস্টাইন দেখালেন যে এরা সবাই মিলে এক চতুর্মাত্রিক জগৎ সৃষ্টি করে যাকে আমরা বলি দেশকাল। এই তত্ত্বেই তাঁর সেই বিখ্যাত সমীকরণ E=mc2 প্রথম খুঁজে পাওয়া যাবেঅর্থাৎ ভর শক্তির মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আইনস্টাইন ধরে নিয়েছিলেন শূন্যস্থানে আলোর বেগ পর্যবেক্ষক নিরপেক্ষ খুব জটিলতার মধ্যে না গিয়ে একটা সিদ্ধান্ত আমরা এখান থেকে খুঁজে পেতে পারিশূন্যস্থানে আলোর থেকে দ্রুত কোনো কিছু যেতে পারে না। তাহলে সূর্য ধ্বংসের খবরটা সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে আসতে পারে না, তার জন্যও অন্তত সাড়ে আট মিনিট সময় লাগবে। সূর্য জ্বলছে কিনা সে খবরটা আমাদের কাছে এনে দেয় আলো। সূর্য নিশ্চিহ্ন হওয়ার খবরটা খবরটা তাহলে কে বয়ে নিয়ে আসবে? নিউটনের তত্ত্ব বিষয়ে নিরুত্তর।     
            নাম থেকেই বোঝা যায় যে আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ বিশেষ ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সব সময় নয়। সোজা ভাষায় বললে যদি বস্তুর বেগ না পাল্টায় তাহলে তার গতিবিধি বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু যদি বেগ একই না থাকে? যদি একটা পাথরের টুকরোকে উপরে তুলে ছেড়ে দিই, তাহলে তা পৃথিবীর দিকে পড়বে তো বটেই, যতক্ষণ ধরে পড়বে তার বেগও ততক্ষণ বাড়তে থাকবে। এই রকম বেগ পরিবর্তনকে আমরা বলি ত্বরণ। আইনস্টাইন এই ধরণের বেগ নিয়ে চিন্তা করছিলেন। তাঁর সেই ভাবনার ফলই হল সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ।
            বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের সবটাই আইনস্টাইন প্রায় এক সঙ্গে প্রকাশ করেছিলেন। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ কিন্তু তাঁর দীর্ঘ পাঁচ বছরের পরিশ্রমের ফসল। এর জন্য তাঁকে অঙ্কশাস্ত্রের একটা বিষয় শিখতে হয়েছিল। তাঁকে সেই tensor calculus শিখিয়েছিলেন তাঁর বন্ধু গণিতবিদ মার্সেল গ্রসম্যানসেই ইতিহাসে না গিয়ে সংক্ষেপে দেখা যাক শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইন কোথায় পৌঁছোলেন।


Einstein 1921 by F Schmutzer - restoration.jpg   ETH-BIB-Grossmann, Marcel (1878-1936)-Portrait-Portr 01239.tif (cropped).jpg
আইনস্টাইন             মার্সেল গ্রসম্যান
            আইনস্টাইন দেখলেন যে মাধ্যাকর্ষণ এবং ত্বরণসম্পন্ন গতিকে একই নিয়মে বাঁধা যায় সেই নিয়মই হল সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ নিউটনের তত্ত্বে মাধ্যাকর্ষণ হল একটা বল নতুন তত্ত্বে মহাকর্ষ বল নয় -- দেশকালের বিকৃতি। এই বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করা যাক। নিউটনের প্রথম গতিসূত্র অনুসারে বস্তুর উপর বল প্রয়োগ না করলে সে সমবেগে সরলরেখায় চলতে থাকবে। আমরা জানি পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে। সূর্যের আকর্ষণ বল তাকে সরল রেখায় যেতে দেয় না, এই ছিল নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের কথা। আইনস্টাইন দেখালেন যে পৃথিবী আসলে সোজা রাস্তায়ই যাচ্ছে, কিন্তু সূর্যের টানে সোজা রাস্তাটাই গেছে বেঁকে। যে বস্তুর ভর যত বেশি, তার দেশকালকে বিকৃত করার ক্ষমতাও বেশি। ধরুন একটা রবারের পর্দা টানটান করে অনুভূমিক ভাবে বেঁধে রেখেছি। আমরা যদি একটা হালকা মার্বেলের গুলি নিয়ে গড়িয়ে দিই, সেটা ঠিক সরলরেখা বরাবর যাবে। এবার পর্দার ঠিক মাঝখানে একটা ভারি বাটখারা রেখে দিলাম। আমরা দেখব যে এবার মার্বেলের গুলিটা বাটখারাটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার দিকে বেঁকে গেল। তার মানে কি  বাটখারা আর গুলির মধ্যে আকর্ষণ বল কাজ করছে? তা নয়, বাটখারা পর্দাকে বাঁকিয়েছে, গুলিটা সেই বাঁকা পথ অনুসরণ করছে। ঠিক তেমনি ভর (বা শক্তি) তার আশেপাশে দেশকালকে বাঁকিয়ে দেয়, সেই দেশকালের বক্রতার জন্য অন্য বস্তুর পথ বেঁকে যায়। আমাদের মনে হয় আকর্ষণ বল কাজ করছে। শেষ বিচারে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদকে আমরা জ্যামিতি বলতেই পারি, তবে এই জ্যামিতি আমরা স্কুলে যে ইউক্লিডিয় জ্যামিতি পড়েছি তার থেকে আলাদা। এখানে সমান্তরাল রেখারা মিলে যেতে পারে, ত্রিভুজের তিন কোণের সমষ্টি একশ আশি ডিগ্রির চাইতে কম বা বেশি হতে পারে। যে বস্তুর ভর বা শক্তি যত বেশি, তার আশপাশের দেশকালকে বক্র করার ক্ষমতাও তত বেশি।   


 Spacetime Curvature
সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুসারে পৃথিবীর কাছে দেশকাল (চিত্রঃ NASA)

            তাহলে কি নিউটন ভুল? একজন পুরোপুরি ঠিক, অন্যজন পুরোপুরি ভুল -- বিজ্ঞান এভাবে এগোয় না। আইনস্টাইন দেখালেন যে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মান যদি খুব বেশি না হয়, তাহলে তাঁর এবং নিউটনের হিসাবের কোনো পার্থক্য হয় না বললেই চলে। এক মাত্র যেখানে মাধ্যাকর্ষণ খুব জোরালো,  সেখানেই আমরা দুই তত্ত্বের মধ্যে তফাত খুঁজে পাব। তেমনই এক জায়গা হল সূর্যের আশপাশ, সেখানে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের মান বেশি। বুধ সূর্যের খুব কাছে আছে, তাই বুধের কক্ষপথের হিসাব নিউটনের সূত্র থেকে মেলে না। আইনস্টাইনের তত্ত্ব থেকে বুধের কক্ষপথের হিসাব ঠিকঠাক মিলে গেল।    
            সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ আরও অনেকগুলি ভবিষ্যৎ বাণী করে। কিন্তু ১৯১৬ সালের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের মধ্যে একটাই মাত্র মিলিয়ে দেখা সম্ভব ছিল। তত্ত্ব অনুসারে আলোর উপরেও মাধ্যাকর্ষণ কাজ করবে। তাই তীব্র ক্ষেত্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় আলো বেঁকে যাবে। নিউটন আইনস্টাইন, দুজনের তত্ত্বই এই কথা বলে। কিন্তু আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুসারে এই বেঁকে যাওয়ার পরিমাণ নিউটনের তত্ত্বের দুগুণ। সহজেই এই ভবিষ্যৎ বাণী মিলিয়ে দেখতে পাওয়া উচিত, অবশ্য যদি সেরকম জোরালো মহাকর্ষ ক্ষেত্র পাওয়া যায়। কোথায় তাকে পাওয়া যাবে
            সূর্যের কাছাকাছি সেই রকম জোরালো মহাকর্ষ ক্ষেত্র আছে, তাই নক্ষত্রের আলো যখন সূর্যের পাশ দিয়ে যায়, তখন তা বেঁকে যাওয়ার কথা। তবে সূর্যের পিছনের তারা দেখা শক্ত, সূর্যের অতি উজ্জ্বল আলো সবাইকে ঢেকে দেয় একমাত্র পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় সেই সব জ্যোতিষ্কদের দেখতে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু পূর্ণ সূর্যগ্রহণ অনেক দিন পরে পরে হয় সূর্যের পাশ দিয়ে গেলে আলো কতটা বাঁকবে ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন তা অঙ্ক কষে বার করেন। তার আগের বছর থেকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছেজার্মানি তার মধ্যে জড়িত। তাই জার্মান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ঠিক না ভুল, তা দেখার জন্য সে সময় সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের কোনো সুযোগ আসেনি। সে সুযোগ প্রথম এলো যুদ্ধবিরতির মাস পরে, ১৯১৯ সালের ২৯ মে দক্ষিণ আমেরিকাতে আফ্রিকাতে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের সময় পরাজিত যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানির বিজ্ঞানীদের পক্ষে তখন সেরকম কোনো অভিযান পাঠানো কোনোমতেই সম্ভব ছিল না। সেই দায়িত্ব তুলে নিলেন জার্মানির শত্রু দেশ ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা। সে সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটনের উৎসাহে দুটি অভিযান পাঠানো হয় দক্ষিণ আমেরিকা আফ্রিকাতে। এডিংটন নিজে গিয়েছিলেন আফ্রিকা সূর্যগ্রহণের সময় তোলা ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যায় আইনস্টাইনের হিসাব একদম ঠিক। এর পরই আইনস্টাইনের খ্যাতি সারা বিশ্বে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে এই একটি ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে বিজ্ঞান সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে, তার একটা আন্তর্জাতিক চরিত্র আছে।   
            গত একশ বছরে আইনস্টাইনের তত্ত্বকে আরও অনেকবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে। প্রতিবারই সে সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে দুটো সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক। সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ অনুযায়ী  মহাকর্ষ ক্ষেত্রে সময় ধীর গতিতে চলে। পৃথিবীতেই পরীক্ষা করে এই বিষয়টা প্রমাণিত হয়েছে। পৃথিবীর কাছে মাধ্যাকর্ষণ ক্ষেত্র অপেক্ষাকৃত বেশি তীব্রপৃথিবী থেকে যত দূরে যাব, তার মান কমে যাবে।  তার মানে সমুদ্রতলের কাছে একটা ঘড়ি যে রকম সময় দেখাবে, পাহাড়ের উপরে গেলে সে আরো একটু তাড়াতাড়ি চলবে (এর সঙ্গে ঘড়ির কলকব্জার কোনো সম্পর্ক নেই, পাহাড়ের উপরের থেকে সমুদ্রতলে সময় ধীরে চলে।) তফাতটা খুব কম, এক সেকেণ্ডের ক্ষেত্রে এক লক্ষ কোটি ভাগের এক ভাগেরও কম। কিন্তু আধুনিক ঘড়িতে এই পরিমাণ পার্থক্য মাপা যায়। মেপে দেখা গেছে আইনস্টাইনের তত্ত্ব পুরোপুরি নির্ভুল। জি পি এস পদ্ধতির নাম আমরা সবাই শুনেছি, অনেকেরই মোবাইল ফোনে জি পি এস পাওয়া যাবে। এই পদ্ধতিতে বিশেষ সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ দুইকেই হিসাবের মধ্যে ধরতে হয়।
            আলো যে শুধু বেঁকে যায় তা নয়, মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে সময় ধীরে চলার ফলস্বরূপ তার কম্পাঙ্কও যায় কমে। দৃশ্য আলোকে যদি রামধনুর সাতটা রঙে ভেঙে নিই, তাহলে বেগুনি আলোর কম্পাঙ্ক বেশি, তারপর কমতে কমতে লাল আলোর ক্ষেত্রে কম্পাঙ্ক সবচেয়ে কম হয়। কম্পাঙ্ক কমে যাওয়ার অর্থ আলোর রঙ লালের দিকে যাওয়া, তাই একে বলে লোহিতাপসরণ (red shift) দূরের জ্যোতিষ্ক থেকে আসা আলোর জন্য মহাকর্ষজ লোহিতাপসরণ প্রথমেই লক্ষ্য করা গিয়েছিল, এখন পৃথিবীর পরীক্ষাগারেও তা মাপা গেছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তা আইনস্টাইন সমীকরণ মেনে চলে।
            ২০১৬ সালে আইনস্টাইনের তত্ত্বের সমর্থনে আরও একটি জোরালো প্রমাণ পাওয়া গেছে। অবশ্য এখন আর কেউ সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে না। তাহলেও বিজ্ঞানের যে কোনো তত্ত্বকেই বারবার পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়, সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ তার ব্যতিক্রম হতে পারে না। এই বিষয়টা একটু বিশদে আলোচনা করা যাক 
            ১৯১৬ সালে আইনস্টাইন দেখিয়েছিলে যে দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে দেশকালের যে সামান্য বিকৃতি হয়, তা এক তরঙ্গ সমীকরণ মেনে চলে। ধরুন পুকুরের জলে একটা ঢিল ফেলা হল, দেখব যে জলে ঢেউ উঠল। ঠিক তেমনি যদি দেশকালকে কোনোভাবে নাড়াচাড়া করি, তাহলে তার যে তোলপাড় হবে সেটা ঠিক জলের ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে পড়বে। (মহাকর্ষীয় ঢেউ বা তরঙ্গের বেগ আলোর বেগের সমান হওয়ার কথা।) বাস্তব সমস্যাটা হল সাধারণত এই ঢেউয়ের তীব্রতা এতই ক্ষীণ তাকে যন্ত্রে ধরাটা শক্ত দীঘার সমুদ্রে একটা পাথর ফেললে পুরীতে সে ঢেউ পৌঁছোবে না। কিন্তু ইন্দোনেশিয়াতে ভূমিকম্পের ফলে যে সুনামি তৈরি হয়েছিল, তার বিপজ্জনক প্রভাব এসে পড়েছিল ভারতবর্ষে। তেমনি মহাকর্ষের ঢেউকে দেখতে গেলে খুব জোরে দেশকালকে নাড়া দিতে হবে আমাদের পরীক্ষাগারে সেরকম জোরদার ঢেউ তৈরি আমাদের ক্ষমতার বাইরে, কিন্তু মহাবিশ্বে এমন অনেক ঘটনাতে অতি তীব্র মহাকর্ষীয় ঢেউ তৈরি হয় অবশ্য ধরণের ঘটনা আমাদের কাছাকাছি হবে, সে সম্ভাবনা খুব কম সেটা এক দিক দিয়ে ভালো, কারণ এরকম কোনো ঘটনা আমাদের আশেপাশে ঘটলে তা পৃথিবী থেকে প্রাণের চিহ্ন মুছে দিতে পারে। কিন্তু দূ্রের কোনো জায়গায় মহাকর্ষের ঢেউ তৈরি হলে সেখান থেকে তা আমাদের কাছে আসতে আসতে স্বাভাবিক ভাবেই দুর্বল হতে পড়ে -- তাই আমাদের যন্ত্রে তাকে ধরা সহজ নয়।  দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করেও বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় ঢেউয়ের সন্ধান পাচ্ছিলেন না  
            মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে ধরা না গেলেও তার অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীদের সন্দেহ ছিল না কারণ সেই তরঙ্গের পরোক্ষ প্রমাণ আগেই পাওয়া গিয়েছিল। আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী যদি দুটি বিশাল ভর খুব কাছাকাছি থেকে পরষ্পরকে প্রদক্ষিণ করে, তাহলে তাদের থেকে তীব্র মাত্রায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বেরোনোর কথা। অন্য তরঙ্গদের মতো মহাকর্ষীয় তরঙ্গও শক্তি বহন করে। তার ফলে ভর দুটির শক্তি কমতে থাকে, তারা পরষ্পরের কাছে আসে এবং তাদের আবর্তনকাল কমতে থাকে। মহাকাশে দুটি নিউট্রন তারা পাওয়া গেছে যারা খুব কাছ থেকে পরষ্পরকে প্রদক্ষিণ করে নিউট্রন তারাদের ভর সূর্যের মোটামুটি দেড় থেকে দু গুণের মধ্যে হয়। রকম ক্ষেত্রে সত্যিই আবর্তনকাল কমতে দেখা গেছে এবং সেই হিসাবটাও সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সঙ্গে মিলে যায়। এই আবিষ্কারের জন্য রাসেল হালস জোসেফ টেলর ১৯৯৩ সালে পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার পান। নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের এই ভিডিওগুলোতে মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ বিকিরণের জন্য আবর্তনরত নিউট্রন তারাদের আবর্তনকাল কেমন করে পাল্টায় করে তার অ্যানিমেশন দেখানো হয়েছে।
            মহাকর্ষীয় তরঙ্গ অবশেষে সরাসরি ধরা পড়ল যে যন্ত্রে, তার নাম লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি, সংক্ষেপে লাইগো (LIGO) কোন ধরণের ঘটনা দেশকালকে এতটা আলোড়িত করতে পারে যে তার রেশ আমাদের যন্ত্রে এসে ধরা দেবে? বিজ্ঞানীরা বললেন সবচেয়ে জোরালো আলোড়ন ওঠে যখন দুটো কৃষ্ণ গহ্বর বা ব্ল্যাক হোল একসঙ্গে মিলে যায়। এই কৃষ্ণ গহ্বরকেও সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সমীকরণ থেকে পাওয়া যায়, কিন্তু সে প্রসঙ্গে এখন  যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
            লাইগো মহাকর্ষীয় তরঙ্গের ধাক্কাতে কোনো বস্তুর আকারের যে সামান্য পার্থক্য হয়, তাকে মাপার চেষ্টা করে। পার্থক্যের পরিমাণ খুবই কম, একটা দণ্ডের দৈর্ঘ্য পালটাবে এক কোটি কোটি কোটি ভাগের এক ভাগেরও কম। যন্ত্রটা দেখতে ইংরেজি L-অক্ষরের মত, যার এক একটা বাহু চার কিলোমিটার লম্বা। আমেরিকার হ্যানফোর্ড আর লিভিংস্টনে দুটো এইরকম L বসানো আছে। দুই বাহু বরাবর দুটো লেজার রশ্মি পাঠিয়ে আবার তাদের প্রতিফলিত করে ফিত্রিয়ে এনে মিলিয়ে দিলে তার থেকে বাহু দুটোর দৈর্ঘ্য সমান কিনা নিখুঁতভাবে মাপা যায়। মাপটা নেওয়াও যায় খুব নিখুঁতভাবে। বাহু দুটোর ওপর মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এসে পড়লে তাদের দৈর্ঘ্য খুব সামান্য পালটাবে কিন্তু লম্বভাবে থাকার ফলে দুটো বাহুর পাল্টানোর পরিমাণটা আলাদা আলাদা হবে এই পার্থক্যটাকে  লেজার রশ্মি দিয়ে মাপা সম্ভব। লাইগো বিষয়ে আরো বিশদ তথ্য এখানে পাওয়া যাবে। 
            অবশেষে গত বছর ১৪ই সেপ্টেম্বর হ্যানফোর্ড এবং লিভিংস্টনের দুটো যন্ত্রেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ধরা পড়ল। তাদের মধ্যে সময়ের পার্থক্য এক সেকেণ্ডের হাজার ভাগের ভাগদুটো আলাদা জায়গায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আলাদা আলাদা সময়ে পৌঁছেছিল বিজ্ঞানীরা হিসাব করে বললেন পৃথিবী থেকে ১৪০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে সূর্যের থেকে ৩০ গুণ এবং ৩৫ গুণ ভারি দুটো কৃষ্ণ গহ্বর পরষ্পরের সঙ্গে মিলে একটা কৃষ্ণ গহ্বরের জন্ম দিয়েছে। নতুন গহ্বরটা সুর্যের থেকে ৬২ গুণ ভারি। বাকি ভরটা, যা সূর্যের ভরের তিনগুণ, তার শক্তি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ রূপে বেরিয়ে এসেছে। ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে বিজ্ঞানীরা ২০১৬ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন যে অবশেষে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ আমাদের যন্ত্রে ধরা পড়েছে। তার পরে আরও একবার দুটি কৃষ্ণ গহ্বরের মিলিত হওয়ার সঙ্কেত লাইগোতে পাওয়া গেছে। এই লিঙ্কে দুটো কৃষ্ণ গহ্বর মিলিত হলে মাধ্যাকর্ষণ তরঙ্গ কেমনভাবে বেরোবে দেখতে পাবেন।
            আইনস্টাইনের তত্ত্বের যে কটা ভবিষ্যৎ বাণী পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয়েছে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্ব প্রমাণ হওয়ার পর তার সবকটাই মিলে গেছে। লাইগো সারা পৃথিবীতেই সাড়া ফেলেছে।  ইতিমধ্যে তৃতীয় লাইগো ভারতবর্ষে বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। যে সময় ভারতের অসামরিক বিজ্ঞানপ্রযুক্তি খাতে সরকারি খরচ ক্রমশই কমানো হচ্ছে, সে সময় এটা একটা সুসংবাদ সন্দেহ নেই।
             আইনস্টাইনের ভবিষ্যৎ বাণী পরীক্ষাগারে প্রমাণিত হতে এক শতাব্দী লেগে গেল, খুব সামান্য কথা নয়। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ এক অনন্য কীর্তিচিরায়ত বা ক্লাসিকাল পদার্থবিদ্যার সর্বশেষ বিজয়স্তম্ভ। এই গবেষণাতে আইনস্টাইন ছিলেন প্রায় একা, তাঁর সমকালীন কোনো বিজ্ঞানী বিষয়ে গবেষণা করছিলেন না। একক চেষ্টাতে তিনি এই বিশাল সৌধ রচনা করেছিলেন। এই তত্ত্বের সমীকরণগুলি এতই জটিল যে মাত্র কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে তাদের সমাধান করা সম্ভব হয়েছে। তবে সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদ এত ভাবে নানা পরীক্ষাতে সফল হলেও তার একটা সমস্যার সমাধান এখনো সুদূরপরাহত - আধুনিক কোয়ান্টম বলবিদ্যার সঙ্গে তার মেলবন্ধন এখনো ঘটানো যায়নি। বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বা রজার পেনরোজ এই বিষয়ে গবেষণা করছেন। আধুনিক স্ট্রিং থিওরিও সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু এখনো তাতে সাফল্য আসেনি।

প্রকাশঃ ছাত্রসংগ্রাম শারদ ১৪২৩/২০১৬

6 comments:

  1. অসাধারণ লেখা। এর থেকে সহজে এই জটিল বিষয়টি সাধারনের কাছে তুলে ধরা হয় তো সম্ভব না :) ��

    ReplyDelete
  2. "If the special theory hadn't been discovered by Einstein, it would have been discovered within 3 or 4 years by....different people...
    If general theory hadn't been created by Einstein, then it probably wouldn't have been invented to this day.": Paul Dirac

    ReplyDelete