Thursday, 24 August 2017
Saturday, 19 August 2017
মায়া ক্যালেন্ডার
মায়া ক্যালেন্ডার
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
যাক, ভালোয় ভালোয় দিনটা
কেটে গেলো। কোন দিনটা? কেন? একুশে ডিসেম্বর, ২০১২। ঐ দিন তো মায়া ক্যালেন্ডার শেষ
হয়ে গেলো। তাই, সবাই বলছিল যে ঐ দিনটাই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।
এই পর্যন্ত পড়ে নিশ্চয়
ভাবছেন আরো এগোবেন কিনা। আপনাদের দোষ দেবো না। আমি হলেও হয়তো তাই করতাম। সত্যিই
তো পৃথিবী ধ্বংস হয়নি। কিন্তু এই ধরনের কথা হয়তো শুনেছেন। কখনো ভেবেছেন কী ক্যালেন্ডার
শেষ হল মানে কী? একটা বছর শেষ হয়ে গেলে আর একটা নতুন বছর আসে। ২০১২ শেষ হল, ২০১৩
সাল এলো। ক্যালেন্ডার শেষ হল কেন বলা হচ্ছে?
আসলে মায়া ক্যালেন্ডারটা
একটু জটিল। আমরা সাধারণত যেভাবে বছর গুনি, মায়া সভ্যতাতে ঠিক তেমনভাবে হিসেব করা
হতো না। আসুন দেখি মায়া সভ্যতা কেমন ভাবে দিনের হিসেব রাখতো।
![]() |
মায়া সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত চিহ্ন, পিরামিড |
মনে রাখবেন মায়া সভ্যতা হল
মধ্য আমেরিকার, এখন সেই জায়গা মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, এল সালভাডোর, হন্ডুরাস,
নিকারাগুয়া, কোস্টা রিকা, এই সমস্ত দেশের মধ্যে পড়ে। মায়া সভ্যতার সবচেয়ে
উন্নতির সময় ছিল খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতক থেকে নবম শতক। আমাদের মতো সপ্তাহ, মাসের হিসাব
তাদের সঙ্গে মিলবে না। কারণ মায়া সভ্যতার সঙ্গে ইউরোপ আর এশিয়ার যোগাযোগ ছিল না।
তবে ৩৬৫ দিনে এক বছর, এই হিসাবটা সাধারণত মিলে যাওয়ার কথা। কারণটাও সহজ, পৃথিবী
সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরতে যত সময় নেয়, তাকেই আমরা এক বছর ধরি। সময়টা
মোটামুটি ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। মনে রাখতে হবে এই সময়ের দৈর্ঘ্যটা
আস্তে আস্তে বাড়ছে।
মায়ারা তিনরকম ক্যালেন্ডার
ব্যবহার করতো। সেগুলোর হিসেব আলাদা আলাদা। সবচেয়ে ছোটো বছরটার নাম ছিল সলকিন
(Tzolkin)। ২৬০ দিনে এক সলকিন বছর। কেন ২৬০ দিন? বিশেষজ্ঞরা একমত হতে পারেন নি।
সেই নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শেষ হবে না। মায়া সভ্যতা সম্পর্কে আমরা খুব কম জানি। স্পেনের
সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণে মায়া সভ্যতা, যা তখন এমনিই পতনোন্মুখ, তা ধ্বংস হয়ে যায়।
খুব কম তথ্যই আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে।
সলকিনের জন্য মায়ারা দুরকম
হিসেবে দিন গুনতো। একটাতে মোট তেরোটা দিন ছিল যাদের ১ থেকে ১৩ পর্যন্ত সংখ্যা
দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। অন্যটাতে কুড়িটা দিনের নাম ছিল। পাঠক নিশ্চয় খেয়াল
করেছেন যে সলকিনকে বারো বা অন্যকোনো রকম মাসে ভাগ করা হয়নি। প্ৰত্যেকটা দিনকে
একটা সংখ্যা আর একটা নাম দিয়ে চিহ্নিত করা হতো। তার মানে ১৩ × ২০ = ২৬০ দিন পরে
হিসাবটা আবার নতুন করে শুরু হতো। সেই হিসেবে সলকিনে ২৬০ দিন ছিল। সলকিন সাধারণত
ধর্মীয় বা যাদুবিদ্যাতে কাজে লাগতো।
মায়ারা কী তাহলে ৩৬৫ দিনের
সৌর বছরের হিসেব রাখতো না? সৌর বছর কেন দরকার, তা নিশ্চয় কাউকে বুঝিয়ে বলতে হবে না।
বর্ষা বা শীত তো আর সলকিন মেনে আসবে না। কাজেই চাষবাস, শিকার – এ সমস্তের জন্য সৌর
বছরের হিসাব না করলে চলে না। হাব (Haab) বলে আর একটা বছর ছিল, তাতে ছিল ৩৬৫ দিন।
হাবে আঠারোটা মাস ছিল, যার প্রত্যেকটাতে ছিল কুড়িটা দিন। সব শেষে পাঁচটা দিন যোগ
করা হতো। ঐ দিনগুলোকে অশুভ মনে করা হতো।
প্ৰসঙ্গত বলে রাখি মায়ারা
দীর্ঘদিন ধরে গ্রহ তারাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছিলো। তাই তারা বুঝেছিল যে ৩৬৫
দিনে ঠিক এক বছর হয় না। একটা হিসেব বলছে যে তারা বছরের দৈর্ঘ্য যা বার করেছিলো
তার সঙ্গে আধুনিক হিসেবের তফাত কুড়ি সেকেন্ডেরও কম। কেউ কেউ অবশ্য বলছেন যে এতটা
মিলে যাওয়া সমাপতন নেহাতই অর্থাৎ কিছুটা ভুল করে হয়ে গেছে। এ নিয়ে বিতর্ক চলছে।
একটা তারিখ ধরি, মনে করুন ১
লা জানুয়ারি। ২০১২ আর ২০১৩ সালে এই দুটো তারিখকে আলাদা করি বছরের সংখ্যা ধরে।
মায়ারা বছরের সংখ্যার হিসেব রাখতো না। হাব আর সলকিন বাহান্ন বছর (বা হাব) পরে পরে
মিলে যায়। তার মানে যদি কোনো দিনকে একই সঙ্গে সলকিন ও হাবের হিসাবে দেখানো যায়,
তাহলে বাহান্ন বছরের মধ্যে যে কোনো দিনকে ঠিকঠাক ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব। বাহান্ন
বছর পরে আবার ঐ সলকিন ও হাবের মাপটা ফিরে আসবে। কিন্তু মায়া সভ্যতা এতে সন্তুষ্ট
হয়নি। তারা একটা দীর্ঘ হিসাব কল্পনা করেছিলো। দেখা যাক সেটা কী রকম।
মায়ারা দিনকে বলতো কিন।
কুড়ি কিনে এক উইনাল। আঠারো উইনালে এক টুন, কুটি টুনে এক কাটুন। কুড়ি কাটুনে এক
বাকটুন। সহজ কথায় এক বাকটুনে ১৪৪০০০ দিন বা মোটামুটি ৩৯৪ বছর। এর চেয়ে বড়ো
হিসেব সম্ভবত আছে, তার নাম পিকটুন। কতো বাকটুনে এক পিকটুন? পিকটুন আছে কিনা তা
নিয়েই পণ্ডিতরা একমত নন, কাজেই পিকটুন কত বড়ো সে তর্ক শেষ হওয়ার নয়।
আমাদের গল্পে এই কথাটা কতোটা
গুরুত্বপূর্ণ, তা আমরা এখনি দেখব। তবে একথা ঠিক, পিকটুন ছাড়াও দীর্ঘ বছরের হিসেবে
চট করে কোনো তারিখ ঘুরে আসবে না। তাই মায়া পিরামিড বা অন্যান্য জায়গায় বাকটুন
থেকে কিন, এই পাঁচটা চিহ্ন দিয়ে তারিখ খোদাই করে রাখা হতো। খেয়াল করবেন, পিকটুন
লেখা থাকতো না বলেই মনে হয়- কারণ তার দরকার হতো না।
পণ্ডিতেরা মনে করেন যে মায়া
দীর্ঘ বছরের হিসেব শুরু হয়েছিলো আজকের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসেবে ১১ই
আগস্ট, ৩১১৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে। ভাববেন না যে মায়ারা ঐ দিন থেকে হিসেব রাখছে,
সেটা শুরু হয়েছিলো অনেক পরে। মায়ারা বিশ্বাস করতো যে ঐ দিন বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ড
সৃষ্টি হয়েছিলো। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ৩৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগের কোনো তারিখ মায়া
সভ্যতার ধ্বংসাবশেষে খোদাই করা দেখেন নি।
![]() |
১১ই আগস্ট, ৩১১৪ খ্রিস্ট পূর্ব, মায়াদের মতে বিশ্ব সৃষ্টির দিন |
সে না
হয় হল, কিন্তু ক্যালেন্ডারের শেষ কথাটা আসছে কোথা থেকে? ২০শে ডিসেম্বর, ২০১২
মায়া দীর্ঘ বছরের হিসেবে এই তারিখটা হল ১২ বাকটুন ১৯ কাটুন ১৯ টুনা ১৭ উইনাল ১৯
কিন। এটাকে সংক্ষেপে লেখা হয় ১২.১৯.১৯.১৭.১৯। মায়ারা দীর্ঘ বছরের হিসেব শূন্য
থেকে শুরু করতো। তার মানে পরের দিনটা হল ১৩.০,০,০,০।
তার
পরের হিসেব নিয়ে পণ্ডিতরা একমত নন। কেউ বলেন যে যে দীর্ঘ বছরের হিসেবটা নতুন করে
শুরু করতে হবে। তার কারণ মায়ারা ক্যালেন্ডারের প্রথম দিনটা ০.০.০.০.০ না লিখে
১৩.০.০.০.০ লিখেছে। কেন সে নিয়েও মতভেদ আছে। এটা সবাই মানেন যে ১৩ সংখ্যাটা
মায়াদের কাছে বেশ মঙ্গলময় তাৎপর্য নিয়ে আসতো। সেই হিসেব ধরলে ২১শে ডিসেম্বর,
২০১২ বছরের হিসেব নতুন করে শুরু হওয়ার কথা। তার মানে পরের দিনটা হল ০.০.০.০.১। এই
হিসেবেই ২১ শে ডিসেম্বর, ২০১২ মায়া ক্যালেন্ডারের হিসেব শেষ হয়ে নতুন হিসেব শুরু
হওয়ার কথা। অন্য কেউ আবার বলেন ক্যালেন্ডারে এর পরের দিন অর্থাৎ ২২শে ডিসেম্বর,
২০১২ মায়া হিসেবে হবে ১৩.০.০.০.১, এভাবে চলবে। যাঁরা এই কথা বলেন, তাঁদের মধ্যে
কেউ কেউ বলেন যে ১৪.০.০.০.০-এর পর (তারিখটা ২৬শে মার্চ, ২৪০৭) আর এগোবে না। পরের
দিনটা হবে ১.০.০.০.১। এঁদেরে দুপক্ষেরই মতে একসময় বছর নতুন করে গুনতে শুরু করতে হবে।
অন্য অনেকেই বলেন যে ২০ বাকটুনে এক পিকটুন, সুতরাং এই বাকটুনের হিসেব শেষ হয়ে এক পিকটুন
হবে ১৩ই অক্টোবর, ৪৭৭২ তারিখে। তখন পাঁচটার বদলে ছটা চিহ্ন দিয়ে তারিখ লিখতে হবে।
পিকটুনের চেয়েও বড়ো মাপ আছে। কাজেই বছর গোনা কখনোই নতুন করে শুরু হবে না।
পণ্ডিতদের এই তর্ক শেষ হওয়ার নয়। তর্কটাও নেহাতই পণ্ডিতীয়, মায়াদেরও সাধারণ
ভাবে এত দীর্ঘ সময় লেখার দরকার হতো না।
কিন্তু
মায়া বিশেষজ্ঞরা একটা বিষয়ে এক মত। এক বাকটুন যেদিন শেষ হল, সেদিন মায়াদের কাছে
আনন্দের দিন, পৃথিবী ধ্বংস বা ঐ জাতীয় গল্প নেহাতই আধুনিক মানুষের কষ্ট কল্পনা
যাকে ব্যবহার করে কেউ কেউ ব্যাবসা ফেঁদেছিলো। আবারও এরকম কোনো দিনের গল্প শীগগিরি
শোনা যাবে। সেই দিনটাও ২০১২ সালের ২১শে ডিসেম্বরের মতো আসবে, আবার চলেও যাবে।
(প্ৰকাশ: নর্থ স্টার জানুয়ারি ২০১৩)
Tuesday, 15 August 2017
প্লুটো
নতুন
দিগন্ত: প্লুটো
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
শিল্পীর চোখে প্লুটো
থেকে চ্যারন ও সূর্য (চিত্র:NASA/Southwest
Research
Institute/Alex Parker)
উপরের
ছবিটা ফটো নয়, শিল্পীর আঁকা। এক ফালি বাঁকা চাঁদ ছোট্ট সূর্যের আলোতে আলোকিত।
আমাদের সৌরজগতের কোথায় এই ছবিটা সত্যি হতে পারে বলতে পার? কোথাকার আকাশে উপগ্রহের
চেহারা সূর্যের থেকে অনেক বড়? এ হল বামন গ্রহ (Dwarf planet) প্লুটো,
এখনো পর্যন্ত আমাদের সৌরজগতের সবচেয়ে দূরের যে সদস্যকে খুব কাছ থেকে
ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ১৯ জানুয়ারি ২০০৬, মার্কিন
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল মহাকাশযান নিউ
হরাইজন অর্থাৎ নতুন দিগন্ত। দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর যাত্রার পর সে প্লুটোর সবচেয়ে কাছে
পৌঁছয় ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই। সেখান
থেকে পাঠায় ছবিসহ নানা তথ্য। শুধু
প্লুটো নয়, নিউ
হরাইজন তার থেকেও আরো দূরে অনুসন্ধান চালাচ্ছে। সৌরজগতের সৃষ্টি ও গঠন নিয়ে অনেক নতুন খবর দিয়েছে সে।
প্লুটোকে
আমরা ছোটবেলায় গ্রহই বলতাম। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের এক আন্তর্জাতিক সংস্থা
ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন ২৪ আগস্ট ২০০৬ ভোটাভুটির মাধ্যমে স্থির
করে যে প্লুটো এখন থেকে আর গ্রহ নয়,
তাকে বামন গ্রহ বলতে হবে। সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে আট। বামন
গ্রহের সংখ্যা বর্তমানে পাঁচ। তবে এটা আরো
বাড়তে পারে বলে অনুমান। গ্রহের যে সংজ্ঞা তাঁরা ঠিক করেছেন তা হল যে তাকে নিজের
অভিকর্ষের টানে গোলাকার হতে হবে এবং তার কক্ষপথের আশেপাশের বস্তুকে আকর্ষণের
মাধ্যমে নিজের কাছে টেনে নিতে হবে। আমরা জানি প্লুটো নেপচুনের কক্ষপথের ভিতরে চলে
আসে, তার মানে তা নেপচুনকে আকর্ষণ
করতে পারে নি। তাই প্লুটো আর গ্রহ নয়। অন্য বামন গ্রহগুলো হল হল সিয়ারিজ,
হাউমিয়া, মাকেমাকে ও এরিস। এদের
মধ্যে সিয়ারিজ হল মঙ্গল ও বৃহস্পতির মধ্যের গ্রহাণুপুঞ্জের বৃহত্তম সদস্য, বাকিদের
কথা পরে বলছি।
শিল্পীর
চোখে নিউ হরাইজন, প্লুটো ও চ্যারন (চিত্র:
NASA/Johns Hopkins University Applied Physics
Laboratory/Southwest Research Institute
বিজ্ঞানীরা
ভেবেছেন প্লুটোর সামাজিক অবস্থানের পরিবর্তন দরকার। তা না হলে ভবিষ্যতে আরো যে
সমস্ত বস্তু সূর্যের চারপাশে আবিষ্কার হবে তাদের নামকরণে সমস্যা হতে পারে। এমন
ঘটনা নতুন নয়, সিয়ারিজকে
প্রথমে গ্রহই বলা হত, পরে কাছাকাছি আরো গ্রহাণু পাওয়ার পরে
তা পাল্টানো হয়। সাধারণ লোকের কিছু প্রশ্ন আছে। প্লুটো নেপচুনকে সরাতে পারেনি বলে
যদি গ্রহ না হয়, তাহলে নেপচুনই বা গ্রহ কেন? সেও তো প্লুটোকে সরাতে পারে নি। কিছু বিজ্ঞানী তো মনে করিয়ে দিয়েছেন যে
এমনকি গ্রহরাজ বৃহস্পতিও তার কক্ষপথকে পরিষ্কার করতে পারে নি, প্রায় একই কক্ষপথে অনেক ছোটো ছোটো গ্রহাণু আছে। গ্রহের সংজ্ঞা ঠিক করার
সময় প্লুটোকে ব্যতিক্রম হিসাবে রেখে দিলে কি চলত না? এই
ধরণের বিতর্ক ছাড়াও প্লুটো কিন্তু বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের বস্তু। তা না হলে এত খরচ
করে আর মহাকাশযান পাঠানো কেন?
কেন
বিজ্ঞানীরা প্লুটো বা সৌরজগতের বাইরের অংশ নিয়ে এত কৌতূহলী? সে কথা জানার আগে প্লুটো আবিষ্কারের গল্প আর নিউ
হরাইজন অভিযানের আগে পর্যন্ত প্লুটো সম্বন্ধে কী জানা আছে অল্প কথায় বলে নেয়া
যাক। ১৯৩০ সাল পর্যন্ত আমরা আটটা গ্রহের কথা জানতাম। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দূরের
গ্রহ নেপচুনের কক্ষপথ নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল
না। তাই অনেক বিজ্ঞানী ভেবেছিলেন যে আরো দূরে অজানা এক গ্রহ আছে যার টানে নেপচুনের
চলার পথ পাল্টে যাচ্ছে। কক্ষপথ যা হওয়া উচিত, আর দূরবিন
দিয়ে পর্যবেক্ষণ থেকে যা পাওযা গেছে, তাদের মধ্যে পার্থক্য
থেকে বিজ্ঞানীরা নতুন গ্রহের অবস্থান আর ভর বার করার চেষ্টা করেছিলেন। এতে
আশ্চর্যের কিছু নেই, নেপচুনও এইভাবে ইউরেনাসের কক্ষপথের
পরিবর্তন থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল। ১৯০৫ সাল থেকে খোঁজ চলছিল তাই আরো একটি গ্রহের যা
নেপচুনকে আকর্ষণ করছে। অবশেষে লাওয়েল মানমন্দিরে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লাইড টমবাউ (Clyde
Tombaugh) ১৯৩০ সালে প্লুটোকে আবিষ্কার করেন। প্লুটো অবস্থান
বিজ্ঞানীরা অঙ্ক কষে যা বলে ছিলেন তার সঙ্গে মোটামুটি মিলেও গিয়েছিল। কিন্তু আমরা
এখন জানি নেপচুনের কক্ষপথ পরিবর্তনে প্লুটোর ভূমিকা সামান্যই, আর তাছাড়া তখনকার পর্যবেক্ষণে প্রচুর ভুল ছিল। তাই অঙ্কের সঙ্গে প্লুটো
অবস্থান মিলে যাওয়া একেবারেই সমাপতন।
প্লুটোর আবিষ্কর্তা
ক্লাইড টমবাউ
সূর্য
থেকে প্লুটোর গড় দূরত্ব প্রায় ছ’শ কোটি কিলোমিটার। দূরত্বটা এতই বেশি যে সেকেন্ডে
তিন লক্ষ কিলোমিটার বেগে গেলেও সূর্য থেকে আলো প্লুটোতে পৌঁছতে সময় নেয় প্রায় ছ
ঘণ্টা।
তুলনায় পৃথিবীতে পৌঁছতে আলোর লাগে সাড়ে আট
মিনিট। বিজ্ঞানী কেপলার আবিষ্কার করেছিলেন গ্রহরা সূর্যকে উপবৃত্তাকার পথে
প্ৰদক্ষিণ করে। তবে বুধ ছাড়া বাকি সব গ্রহের কক্ষপথই প্রায় বৃত্তাকার।
জ্যামিতিতে উপবৃত্তের উৎকেন্দ্রিকতা বলে একটা ধর্ম আছে যা দিয়ে উপবৃত্ত ও বৃত্তের
মধ্যে পার্থক্য মাপা হয়। যার উৎকেন্দ্রিকতা যত কম, সে তত বৃত্তের কাছাকাছি যায়। যেমন পৃথিবীর
কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা ০.০১৭। প্লুটোর উৎকেন্দ্রিকতা প্রায় ০.২৫।
প্লুটো যখন সূর্যের সবচেয়ে কাছে আসে তখন সূর্য থেকে তার দূরত্ব পৃথিবী ও সূর্যের
গড় দূরত্বের ৩০ গুণ; যখন সবচেয়ে দূরে থাকে তখন তা বেড়ে
হয়ে যায় ৫০ গুণ। এজন্য প্লুটো কখনো কখনো নেপচুনের থেকে সূর্যের বেশি কাছে চলে
আসে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৯৯, এই সময় নেপচুন ছিল প্লুটোর থেকে দূরে।
আবার এমন ঘটনা ঘটবে ২২৩১ সালে। প্লুটোর কক্ষপথ অন্য এক দিক থেকেও গ্রহদের থেকে
আলাদা, তারা যে তলে ঘোরে, প্লুটোর কক্ষপথ তার সঙ্গে ১৭
ডিগ্রি কোণ করে আছে। সূর্যের চারদিকে ঘুরতে প্লুটোর সময় লাগে প্ৰায় ২৪৮ বছর।
১৯৭৮
সালে ২২ জুন মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী জেমস ক্রিস্টি ও রবার্ট হ্যারিংটন আবিষ্কার করেন যে
প্লুটোর একটা চাঁদ আছে। এই উপগ্রহের নাম দেয়া
হল চ্যারন। প্লুটো ও তার চাঁদের আয়তন খুব কাছাকাছি, প্লুটোর ব্যাস হল ২,৩৮০
কিলোমিটার, আর চ্যারনের ১,২০০ কিলোমিটার। তাদের মধ্যে দূরত্ব হল মাত্র ১৯,০০০ কিলোমিটার। প্লুটো
শুধু যে গ্রহদের থেকে ছোট তা নয়, আমাদের চাঁদ সমেত সৌরজগতে সাতটা উপগ্রহ আছে যারা প্লুটোর থেকে বড়। প্লুটোর
ভর পৃথিবীর সাড়ে চারশো ভাগের এক ভাগ আর চ্যারনের ভর প্লুটোর আট ভাগের এক ভাগ।
গ্রহ এবং উপগ্রহের মধ্যে এত কাছাকাছি ভর সৌরজগতে আর কোথাও নেই। প্লুটোর
মাধ্যাকর্ষণও একেবারেই দুর্বল। তোমাদের কারো ওজন পঞ্চাশ কিলো হলে, প্লুটোতে তার ওজন হবে সাড়ে তিন কিলো। তাই পৃথিবীতে সে যদি সাড়ে তিন ফুট
লাফাতে পারে, প্লুটোতে লাফাবে পঞ্চাশ ফুট। এখানে একটা কথা
বলে রাখি, এত দূরে আছে বলে প্লুটো বা চ্যারনের সম্বন্ধে
তথ্যগুলিতে কিছু ভুল ছিল। নিউ
হরাইজন অনেক বেশি নির্ভুল খবর আমাদের দিয়েছে।
প্লুটো-চ্যারনের
ভর এত কাছাকাছি হওয়ার জন্য এবং তাদের মধ্যে দূরত্ব এত কম বলে এমন এক বৈশিষ্ট্য
তাদের আছে যা সৌরজগতে আর নেই। আমাদের চাঁদ নিজের চারদিকে ঘুরতে যত সময় নেয়, পৃথিবীর চারদিকে ঘুরতেও একইসময় নেয়। সেজন্য আমরা
চাঁদের শুধু একটা দিকই দেখতে পাই। তেমনি চাঁদের আকাশে পৃথিবীকে সবসময় একই
জায়গায় দেখা যায়। পৃথিবীর আকর্ষণের জন্য আস্তে আস্তে চাঁদের ঘূর্ণন বেগ হ্রাস পেয়েছে। প্লুটোর ক্ষেত্রে
ব্যাপারটা আরো অদ্ভুত। প্লুটো-চ্যারনের নিজেদের মধ্যে টানাপড়েনের জন্য প্লুটো ও
চ্যারন, দুজনেরই ঘূর্ণন বেগই হ্রাস
পেয়েছে। তাই ঠিক পৃথিবীর চাঁদের মতো চ্যারন প্লুটোর চারদিকে যে সময় নিয়ে ঘোরে,
নিজের অক্ষের উপরেও সেই সময়ে এক বার পাক খায়। প্লুটো নিজেও একই
সময়ে নিজের অক্ষের চারপাশে একবার ঘুরে আসে। তার ফলে চ্যারনের আকাশে যেমন প্লুটো
সবসময় এক জায়গায় স্থির থাকে আর তার একটা দিকই দেখা যায়, ঠিক তেমনি প্লুটোর
আকাশেও চ্যারন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে একটাই মুখ দেখায়। প্লুটোর এক দিন হল
পৃথিবীর ৬.৪ দিনের সমান। আরো একটা খবর জানা গেছে। তোমাদের মধ্যে অনেকে হয়তো জানো
মহাকাশে একটা দূরবীন বসানো হয়েছিল যার নাম হাবল দূরবিন। সেই দূরবিনের ছবি থেকে জানা গেছে যে প্লুটোর আরো চারটে ছোটো ছোটো
চাঁদ আছে। তাদের নাম দেয়া হয়েছে হাইড্রা, নিক্স, কেরবেরস ও স্টিক্স।
হাবল দূরবীন থেকে
প্লুটো, চ্যারন, হাইড্রা
ও নিক্স। (চিত্র: NASA, ESA, H. Weaver JHUAPL. A. Stern SwRI, and the HST
Pluto Companion Search Team)
প্লুটো আর তার উপগ্রহগুলোর নাম এলো কোথা
থেকে? প্লুটো হল গ্রিক পুরাণের পাতালপুরীর বা মৃত্যুলোকের দেবতা। অক্সফোর্ডের এগার
বছর বয়সের ছোট্ট মেয়ে ভেনিশিয়া বার্নি এই নামটা লাওয়েল মানমন্দিরে পাঠিয়েছিল। লাওয়েল
মানমন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পার্সিভ্যাল লাওয়েল। তাঁর নাম ও পদবীর প্রথম দুই
অক্ষর হল P ও L,
প্লুটোর নামের প্রথম দু অক্ষরই তাই। তাই সেই নামটাকেই পছন্দ করা হল। ২০১৭ সালে ভেনিশিয়ার নামে প্লুটোর বুকে এক গহ্বরের নাম দেওয়া হয়েছে
বার্নি গহ্বর। স্টিক্স হল পাতালপুরীর নদী, মৃতদের আত্মাকে সেই নদী পার করায় যে
মাঝি তার নাম চ্যারন। তবে মাঝি চ্যারনের গ্রিক উচ্চারণ হল কারেন, আর উপগ্রহের
ক্ষেত্রে প্রথম ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণটা ‘চ’ আর “শ’-এর মাঝামাঝি। নিক্স হল রাত্রির
দেবী ও চ্যারনের মা। হাইড্রা হল পাতালপুরীর পাহারাদার ন’মাথাওয়ালা সাপ। কেরবেরসও
পাতালপুরীর প্রবেশদ্বারের পাহারাদার, সে হল হাইড্রার ভাই, তিন মাথাওয়ালা কুকুর। সাপের
ভাই কুকুর! পুরাণকারদের কল্পনাশক্তির অন্তত অভাব ছিল না। নিক্স আর হাইড্রা
আবিষ্কার হয়েছিল ২০০৫ সালে, তাদের নামকরণের সময় নিউ হরাইজন মহাকাশযানের আদ্যক্ষর N আর H, এই দুটো মনে রাখা
হয়েছিল। কেরবেরসকে খুঁজে পাওয়া যায় ২০১১ সালে, আর স্টিক্সকে ২০১২ সালে। তাদের নাম
দেওয়ার সময়ে ভোট নেওয়া হয়েছিল, তবে পাতালপুরীর সঙ্গে যুক্ত নয় বলে সবচেয়ে বেশি ভোট
পাওয়া ভালকানকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। চ্যারন ছাড়া বাকি উপগ্রহগুলো একেবারেই পাথরের
টুকরো যাদের মাপ মোটামুটি দশ থেকে পঞ্চাশ কিলোমিটার।
এবার দেখা যাক কেন
প্লুটোকে নিয়ে বিজ্ঞানীরা এত চিন্তিত। সত্যি কথা বলতে প্লুটো এতই ছোট যে অনেকেই
একে গ্রহ বলতে রাজি ছিলেন না। সৌরজগতে ভিতরের দিকে যে গ্রহগুলো আছে, অর্থাৎ বুধ, শুক্ৰ, পৃথিবী ও
মঙ্গল, তাদের গঠন হল পাথুরে। এর পর আছে গ্যাস দানব গ্রহেরা,
বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস
ও নেপচুন। প্লুটো এদের সবার থেকে আলাদা। প্লুটোর ঘনত্ব হল জলের মোটামুটি দুগুণ। এর
থেকে অনুমান করা গিয়েছিল যে প্লুটো ধূমকেতুদের মতো পাথর আর বরফ দিয়ে তৈরি। পরবর্তীকালে
প্লুটো, মাকেমাকে বা হাউমিয়ার থেকে প্রতিফলিত আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়
বরফ শুধু জলের নয়, নাইট্রোজেন, মিথেন আর অ্যামোনিয়া গ্যাসও জমাট বেঁধে আছে। সেজন্য
অনেকে একে ধূমকেতুর মধ্যে ফেলতে চাইছিলেন। তোমাদের মনে হতে পারে, ধূমকেতুর তো লেজ থাকে। আসলে সূর্যের কাছে এলে তাপে ধূমকেতুর বরফ গলে যায়,
তারপর সৌর বায়ু ও আলোর চাপে তা তৈরি করে সেই বিশাল লেজ। নেপচুন পেরিয়ে গেলে এরকম অনেক ছোটো বড় পাথরের
টুকরো বা বরফে তৈরি ধূমকেতু দেখা যায়। যে বিজ্ঞানী এটা প্রথম বলেছিলেন, সেই জেরার্ড কাইপারের নামে নেপচুনের ওপাশের সৌরজগতের একটা অঞ্চলকে বলা হয়
কাইপার বেল্ট। এখানে অন্তত কয়েক লক্ষ এরকম ধূমকেতু আছে।
প্লুটোকে গ্ৰহ না বলার আরেক কারণ হল কাইপার
বেল্টের কোনো কোনো সদস্যের খোঁজ পাওয়া গেছে যারা বেশ বড়। এখানেই আছে আরো দুটো
বামন গ্রহ; মাকেমাকে আর হাউমিয়ার ব্যাস প্লুটোর অর্ধেকের থেকে বেশি। আরো দূরে আছে
এরিস, সে আয়তনে প্রায় প্লুটোর সমান। এদের সঙ্গে প্লুটোর অনেক মিল আছে। এরা সবাই
বরফ আর পাথর দিয়ে তৈরি, এদের
সকলের কক্ষপথের উৎকেন্দ্রিকতা বেশি। শুধু তাই নয়, এদের
সকলের কক্ষপথ অন্য সব গ্রহ যে তলে ঘোরে, তার সঙ্গে অনেকটা
কোণ করে আছে। একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাইপার বেল্টের সদস্যরা আলোকপাত করতে
পারে। এদের মধ্যে বরফের পরিমাণ এত বেশি যে পৃথিবীতে জল এলো কোথা থেকে, সে রহস্যের সমাধান সূত্র হয়তো এদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে।
কাইপার বেল্ট নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের শেষ
নেই। তাঁরা মনে করেন। শুধু জলের উৎসের নয়,
সৌরজগৎ সৃষ্টির ব্যাখ্যার চাবিকাঠিও লুকিয়ে আছে। এখানে। সৌরজগৎ কী
ভাবে তৈরি হয়েছিল? সাড়ে চারশো কোটি বছরেরও বেশি আগে ছিল এক
বিশাল ধুলো ও গ্যাসের মেঘ যা মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে জমাট বেঁধে সূর্য ও অন্যান্য
গ্রহ তৈরি। এত কোটি কোটি বছরে সৌরজগতের ভিতরের দিকের বড় পাথরের টুকরোর এত
ধাক্কাধাক্কি হয়েছে যে গোড়ায় তারা কেমন ছিল তা বোঝার আর উপায় নেই। কিন্তু
কাইপার বেল্টের সদস্যরা একজন আরেকজনের থেকে অনেক দূরে দূরে আছে, তাই তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে অনেক কম। সেজন্য তাদের মধ্যে সেই প্ৰাথমিক
দশা অনেকাংশে এখনো বজায় আছে। বস্তুত এদের গ্রহের আদি অবস্থা বা ভ্রূণ বলা যেতে
পারে। এদের থেকে সৌরজগৎ সৃষ্টির ব্যাপারে অনেক খবর পাওয়া যাবে বলে বিজ্ঞানীরা
আশাবাদী।
প্লুটোর আরো এক বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের
আকর্ষণ করেছে। প্লুটোর খুব পাতলা হলেও একটা বায়ুমণ্ডল আছে যা মূলত নাইট্রোজেন
দিয়ে তৈরি। পৃথিবী ছাড়া আর মাত্র তিনটি গ্রহ বা উপগ্রহের বায়ুমণ্ডল নাইট্রোজেন
ভিত্তিক। তাই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল কী ভাবে তৈরি হল সে নিয়ে খবর হয়তো প্লুটো দিতে
পারবে। কিন্তু সে খবর পেতে গেলে প্লুটোর কাছে যেতে হত তাড়াতাড়ি। প্লুটো পৃষ্ঠে
তাপমাত্রা মোটামুটি –২৩০
ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। এখন প্লুটো সূর্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্লুটো যখন সূর্যের
সবচেয়ে কাছে থাকে, তখন সূর্য থেকে প্রতি বর্গমিটারে যে
শক্তি পায়, তা পৃথিবীতে প্রতি বর্গমিটারে যা পড়ে তার ন’শ
ভাগের এক ভাগ। সবচেয়ে দূরে যখন যায় তখন এই পরিমাণটা হয়ে যাবে আড়াই হাজার ভাগের
এক ভাগ। ফলে তাপমাত্রা এখন আরো কমছে। আর কয়েক দশকের মধ্যে প্লুটোর সম্পূর্ণ
বায়ুমণ্ডল জমাট বেঁধে যাবে। তখন আবার কয়েক শতাব্দী অপেক্ষা করতে হবে।
তাড়াতাড়ি প্লুটো পৌঁছনোর জন্য মহাকাশযান
পাঠানো সহজ কথা নয়। রকেটে বেশি জ্বালানি দেয়া সম্ভব নয়, কারণ সেই জ্বালানিকেও তো বয়ে নিয়ে যেতে হবে। তাই
দূরে যে সমস্ত যান পাঠানো হয়, তারা এক বিশেষ ধরণের পথ
অবলম্বন করে, যেখানে জ্বালানি লাগে কম কিন্তু সময় লাগে
বেশি। কিন্তু ২০০৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারির আগে উৎক্ষেপণ হয়েছে বলে এক বিশেষ সুযোগ পাওয়া
গেছে। পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে নিউ হরাইজন যাত্রা করেছিল ঘণ্টায় ৫৮,০০০ কিলোমিটার বেগে। যত দূরে সে যাচ্ছে, তার বেগ তত কমছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি
২০০৭ নিউ হরাইজন বৃহস্পতির পাশ দিয়ে গিয়েছিল, তখন বৃহস্পতির মাধ্যাকর্ষণকে গুলতির
মতো ব্যবহার করে তার গতিবেগ বাড়ানো হয়েছিল ঘণ্টায় ১৪,০০০ কিলোমিটার। ২
ফেব্রুয়ারির পরে উৎক্ষেপণ হলে যান আর বৃহস্পতির পাশ দিয়ে যেত না। প্লুটো পৌছতে
সময় লাগত পাঁচ বছর বেশি। আর ১৫ ফেব্রুয়ারির পরে যাত্রা শুরু হলে সময় লেগে যেত
একশ বছরেরও বেশি। তাই এই সুযোগ না নিতে পারলে আরো কয়েকশো বছর অপেক্ষা করতে হত।
প্লুটো অভিযানের জন্য অর্থ সাহায্য মার্কিন সরকার একসময় বন্ধ করে দিয়েছিল। তখন
মনে হয়েছিল বোধহয় এই শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। শখের জ্যোতির্বিজ্ঞানী
ও অন্যান্য বিজ্ঞানীদের দাবীতে শেষপর্যন্ত ৭৫ কোটি ডলার পায় মার্কিন মহাকাশ
গবেষণা সংস্থা নাসা (NASA) । সম্ভব
হয় এই অভিযান ।
২০১৫ সালের ১৪ই জুলাই প্লুটো-চ্যারনের যুগ্মগ্রহের
খুব কাছ দিয়ে যানটি বেরিয়ে যায়। সেখানে
থামার কোনো উপায় ছিল না, কারণ
জ্বালানি তখন প্রায় শেষ। তোমরা হয়তো ভাবছ থামতে আবার জ্বালানি লাগবে কেন। যারা
ওপরের দিকের ক্লাসে পড়া তারা জানো নিউটনের গতিসূত্রে বলা হয়েছে বাইরে থেকে
বলপ্রয়োগ না করলে বস্তু থামবে না। মহাকাশে তো যানের উপর কোনো ঘর্ষণজনিত বাধা নেই। তাই থামার উপায় হল রকেটকে উল্টো করে চালানো। যারা লঞ্চ বা স্টিমারে চেপেছ তাদের নিশ্চয় মনে আছে তীরের কাছে এলে
জলযানকে উল্টোদিকে চালাতে হয়। গ্রহের বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণকে ব্যবহার করেও ব্রেক
করা যায়। কিন্তু প্লুটোর বায়ুমণ্ডল অনেক পাতলা – তাই সে সুযোগ নেই। প্লুটো থেকে ১২,৫০০ কিলোমিটার দূর
দিয়ে আর ঠিক চোদ্দ মিনিট পর চ্যারনের থেকে ২৯,০০০ কিলোমিটার
দূর দিয়ে ঘণ্টায় ৫০,০০০ কিলোমিটারের বেশি বেগে বেরিয়ে যায়
নিউ হরাইজন। মাঝে যন্ত্রপাতিতে কিছু সমস্যা হয়েছিল, কিন্তু সৌভাগ্যবশত বিজ্ঞানীরা
তা কাটিয়ে ওঠেন।
তোমরা নিশ্চয় বুঝতেই পেরেছ যে মহাকাশযানে
কোন মানুষ ছিল না।
দূরের অভিযানে মানুষ পাঠানো এখনো আমাদের সাধ্যের
বাইরে। প্লুটো বা চ্যারন কী দিয়ে তৈরি তা জানার জন্য যানে ছিল দৃশ্য আলো, অবলোহিত ও অতিবেগুনি রশ্মিবিশ্লেষক যন্ত্র। ছিল
টেলিস্কোপিক ক্যামেরা, সৌরবায়ু ও প্লুটোর বায়ুমণ্ডল
বিশ্লেষক যন্ত্র। এরা সবই কাজে লেগেছে প্লুটোর কাছে যাওয়ার পর। কলোরাডো
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বানানো একটি যন্ত্র সারা পথ ধরে মহাজাগতিক ধূলিকণা
বিশ্লেষণ করতে করতে গেছে। এই
সব অত্যাধুনিক যন্ত্র থেকে যা তথ্য পাওয়া গেছে তার বিশ্লেষণ এখনো চলছে, আরো বহু
বছর লাগবে এই কাজে। তার থেকে সৌরজগৎ সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরো অনেক বাড়বে সন্দেহ
নেই। যানের মধ্যে রাখা আছে প্লুটো আবিষ্কারক টমবাউয়ের চিতাভষ্ম।
অল্প কথায় দেখে নেয়া যাক প্লুটো সম্পর্কে কী
নতুন খবর দিয়েছে নিউ হরাইজন। প্রথমত বলতেই হয় যে সমস্ত ছবি পাঠিয়েছে তাদের কথা।
তোমরা নাসার ওয়েবসাইটে ক্লিক করে দেখে নিতে পারো। প্লুটোর
বিষুবরেখার কাছে মাথা তুলেছে পর্বতশ্রেণী, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ছ’কিলোমিটার। ওই
পুঁচকে গ্রহে প্রায় এভারেস্টের কাছাকাছি উঁচু পাহাড়! এই পর্বতশ্রেণির নাম দেওয়া হয়েছে
তেনজিং মন্টিজ। পাশেই আছে হিলারি মন্টিজ। কাদের নামে এই নাম নিশ্চয়
তোমাদের বলতে হবে না। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যে এই পর্বতশ্রেণির বয়স মাত্র দশ কোটি
বছর, আমাদের সৌরজগতের বয়স সাড়ে চারশো কোটি বছরের তুলনায় শিশু।
প্লুটোর বুকে মাথা তুলেছে তেনজিং পর্বতশ্রেণি (সামনে বাঁদিকে), হিলারি
পর্বতশ্রেণি (দূরে)। ডানদিকে রয়েছে স্পুটনিক প্ল্যানিশিয়া (চিত্রঃ NASA/Johns Hopkins University
Applied Physics Laboratory/Southwest Research Institute)
বয়স মাপে কেমন করে? যুগযুগ ধরে উল্কা ইত্যাদির
সঙ্গে সংঘর্ষে প্লুটোর বুকে গহ্বর তৈরি হচ্ছে। পৃথিবীতেও তা হচ্ছে, কিন্তু সমুদ্র
ও বায়ুস্রোত তা ঢাকা দিয়ে দেয়। চাঁদে এ সব নেই, তাই চাঁদের বুকে যুগযুগের সংঘর্ষের
চিহ্ন রয়ে গেছে। সেই গহ্বরের সংখ্যা থেকে প্লুটোর বুকে ভূতাত্ত্বিক গঠনের বয়স মাপা
যায়। কিন্তু প্লুটোর অভ্যন্তর তো তার অনেক দিন আগে ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার কথা, তাহলে
এই পর্বতশ্রেণি সৃষ্টি হল কেমন করে আমাদের জানা নেই। আছে বরফে ঢাকা প্রায় আট লক্ষ
বর্গকিলোমিটার ব্যাপী এলাকা স্পুটনিক
প্ল্যানিশিয়া, যা হিল টমবাউ রিজিওর অংশ। এখানেও কোনো গহ্বর নেই, মনে হচ্ছে এর বয়স
এক কোটি বছরেরও কম। এখানেই সৌরজগতের সবচেয়ে বড় হিমবাহের সন্ধান পাওয়া গেছে, কিন্তু
জলের বরফের নয়, এ হল জমাট বাঁধা নাইট্রোজেনের হিমবাহ। জলের বরফ আছে, কিন্তু -২৩০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড
তাপমাত্রায় তা জমে শক্ত পাথরের রূপ নিয়েছে। মিথেনের পরিমাণ যা আশা করা হয়েছিল, তার
থেকে অনেক কম। প্লুটোতে সম্ভবত শীতল আগ্নেয়গিরি আছে। গলিত ম্যাগমা নয়, তারা নাইট্রোজেন,
অ্যামোনিয়া বা জলের বরফ উদ্গিরণ করে।
প্লুটোতে বায়ুমণ্ডল আছে
আগেই জানা ছিল, নিউ হরাইজন জানিয়েছে তার চাপ পৃথিবীর সমুদ্রতলের বায়ুচাপের এক লক্ষ
ভাগের এক ভাগ। অবশ্য প্লুটো সূর্য থেকে যত দূরে যাবে, বায়ুচাপ তত কমবে। সেই বায়ুমণ্ডলে
আছে মূলত নাইট্রোজেন, তাছাড়া পাওয়া যাবে কার্বন মনোক্সাইড আর মিথেন। বায়ুমণ্ডলের
রং নীল, কিন্তু তার কারণ এখনো নিশ্চিত জানা নেই। প্লুটোর কম অভিকর্ষের জন্য
বায়ুমণ্ডলের অণুদের মহাকাশে মিলিয়ে যাওয়ার কথা। নিউ হরাইজন জানিয়েছে যে আগে যা
হিসাব করা হয়েছিল, প্লুটো থেকে গ্যাসের অণু বেরিয়ে যাচ্ছে আসলে তার হাজার ভাগেরও
কম।
নিউ হরাইজন থেকে চ্যারন (চিত্রঃNASA/JHUAPL/SwRI)
চ্যারনের বুকে উল্কা গহ্বরের সংখ্যা খুব কম।
বোঝা যায় যে চ্যারনের পৃষ্ঠতলের বয়স বেশি নয়, পুরানো উল্কার ক্ষত ঢাকা পড়ে গেছে।
কেমন করে নতুন তল তৈরি হয়েছে, বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারছেন না। চ্যারনে এক খাত পাওয়া
গেছে, যা পৃথিবীর গভীরতম গিরিখাত গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের থেকে দ্বিগুণ গভীর আর
চারগুণ লম্বা। বিজ্ঞানীদের অনুমান চ্যারনের অভ্যন্তরে ছিল জলের মহাসমুদ্র, তা জমে গিয়ে
চ্যারনের বাইরের আবরণ ফাটিয়ে এই গিরিখাত সৃষ্টি করেছে। চ্যারনের উত্তর মেরুর রং
লালচে। কেউ কেউ বলেছেন প্লুটো থেকে বেরিয়ে যাওয়া মিথেন, নাইট্রোজেন ইত্যাদি গ্যাস
চ্যারনের টানে ধরা পড়েছে; সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে তা এক ধরনের জৈব অণু
গঠন করেছে, তাই এই রং। চ্যারন বা হাইড্রার ছবি থেকে মনে হচ্ছে সেখানে জলের বরফ
আছে।
নিউ হরাইজন থেকে প্লুটোর উপগ্রহদের এইরকম দেখতে লেগেছে (চিত্রঃNASA/JHUAPL/SwRI)
প্লুটোর সঙ্গে সাক্ষাতের পর মহাকাশযান
কাইপার বেল্টের মধ্যে দিয়ে চলছে। সেখানকার
সদস্যদের সম্পর্কে আরো কিছুদিন যান নানা অজানা তথ্য পাঠাবে। তার
থেকে সৌরজগতের উৎপত্তি সম্পর্কে আরো অনেক কিছু জানা যাবে। অনেক খবরও জানা যাবে
ধূমকেতুদের সম্পর্কে। তার থেকে একটা বিশেষ আকর্ষণীয় বিষয়ে হয়তো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো
সম্ভব – তা হল পৃথিবীতে ডাইনোসরদের
বিলুপ্তির কারণ। জীবাশ্ম প্রমাণ থেকে দেখা যায় যে সারা পৃথিবীতে ডাইনোসররা প্রায়
একই সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছিল। অনেকে মনে করেন যে এর কারণ হল ঐ সময় পৃথিবীতে এক
ধূমকেতু আঘাত করেছিল। তার ফলে যে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে তার ফলেই এই বিলুপ্তি।
ধূমকেতুদের গঠন সম্বন্ধে জানতে পারলে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। ২০১৯ সালের ১
জানুয়ারি আল্টিমা থুলি নামের একটা কাইপার বেল্টের সদস্যকে মাত্র সাড়ে তিনহাজার
কিলোমিটার দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছে নিউ হরাইজন।
নিউ হরাইজনের ক্যামেরাতে ৬৭০০ কিলোমিটার দূর থেকে
আল্টিমা থুলি (চিত্রঃNASA/Johns Hopkins Applied Physics Laboratory/Southwest Research
Institute, National Optical Astronomy Observatory)
সমস্ত যন্ত্রপাতি নিশ্চয় কিছুদিন পরে খারাপ
হয়ে যাবে। কিন্তু যানের গতি স্তব্ধ হবে না। সূর্যের আকর্ষণে তাকে বেঁধে রাখা যাবে
না। মহাশূন্যে কোনো উল্কা বা ধূমকেতুর সঙ্গে তার সংঘর্ষের সম্ভাবনাও প্রায় নেই
বললেই চলে কারণ তারা সাধারণত অনেক দূরে দূরে থাকে। মানুষের তৈরি এখনো পর্যন্ত
সবচেয়ে দ্রুতগামী যান নিউ হরাইজন চলবে তার অনন্ত যাত্রাপথে। হয়তো কয়েক কোটি বছর পরে অন্য কোনো নক্ষত্রের অন্য কোনো সভ্য
প্রাণীর কাছে সে পৌঁছে দেবে পৃথিবীর মানুষের এই বার্তা – আমরাও ব্ৰহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে ব্ৰতী। তখনো
যদি মানব সভ্যতার অস্তিত্ব থাকে, তা হয়তো বা পাড়ি দিয়েছে
অন্য নক্ষত্ৰলোকেও। এমন ভাবতে ইচ্ছা হয় যে ভবিষ্যতের মানুষেরই অন্য কোনো
মহাকাশযানের সঙ্গে দেখা হতে পারে আজকের এই যানের। তখনকার মানুষ হয়তো বিজ্ঞানপ্রযুক্তিতে
আরো অনেক দূর এগিয়ে গেছে। প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সঙ্গে আধুনিক মানুষের যে তফাৎ
আমাদের সঙ্গে আমাদের সেই ভবিষ্যতের পার্থক্য তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি হবে নিশ্চয়।
সুদূর অতীত থেকে আসা এই বার্তাকে তারা কী দৃষ্টিতে দেখবে ? বিজ্ঞানীরা
মনে করেন প্রযুক্তি সভ্যতার তিনটি স্তর আছে। আমরা এখন প্রথম ধাপের একেবারে শৈশবে
অবস্থান করি। শিশুর প্রচেষ্টা বয়স্কদের প্রশ্ৰয় লাভ করে। আমাদের সাধ্য সামান্য
হলেও শুধু উচ্চাশার বলে যে পথে আমরা পা বাড়িয়েছি, সেই
পথেরই তো ভবিষ্যতের পথিক তারা। নিশ্চয় তারা এই চেষ্টাকে সম্ভ্রমের চোখেই দেখবে।
মানুষ আর পশুর মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হল পশু আকাশের নক্ষত্ৰজগৎ সম্বন্ধে উৎসাহী
নয়। মনুষ্যত্বের সাধনাকে জ্ঞান লাভের প্রচেষ্টার থেকে আলাদা করা যায় না। সেই সাধনাতে
তোমরা সবাই নিশ্চয় অংশীদার হবে।
(কিশোর
ভারতী, জুলাই ২০০৭ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘সৌরজগতের
সীমান্তপ্রহরী প্লুটো’ নামে। নিউ হরাইজন মিশন থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে
পুনর্লিখিত)
Monday, 14 August 2017
মাদাম কুরিঃ জীবন সংগ্রামের অন্য নাম
মাদাম কুরিঃ জীবনসংগ্রামের অন্য
নাম
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
আমরা সবাই
মাদাম মেরি কুরির নাম জানি। ১৯১১ সালে তিনি রসায়নে
নোবেল পুরস্কার পান। সেই কথা মনে রাখতে ২০১১ সালকে আন্তর্জাতিক রসায়ন বিজ্ঞান
বর্ষ হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিলো। জানতে ইচ্ছা করে প্রতি বছরই তো রসায়নে নোবেল
পুরস্কার দেওয়া হয় – তাহলে মাদাম কুরির নোবেল পাওয়ার বছরকেই আলাদা করে কেন বেছে
নেয়া হয়েছিলো? বড় বড় বিজ্ঞানী অনেক আছেন। বিজ্ঞান ও মানব সভ্যতার প্রতি তাঁদের
অবদানের কথা চিন্তা করলে আমাদের মাথা নত হয়ে আসে।কিন্তু তাদের মধ্যেও যাঁরা
সংগ্রাম করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছেছেন, তাঁদের জীবন আমাদের কাছে প্রেরণা। মাদাম
কুরি তেমনই একজন। আমাদের পুরুষশাসিত সমাজ তাঁর সামনে নানা বাধার দেয়াল তুলেছিল,
কারণ তিনি নারী। প্রতিকূল পরিস্থিতি ও দারিদ্র তাঁর বিজ্ঞান চর্চায় বারবার
ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। সে সমস্ত বাধা অতিক্রম করে তিনি তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর
রেখেছেন।
মাদাম কুরি, ১৯০৪ (চিত্রঃ নোবেল
আর্কাইভ)
তাঁর জীবনের
একটা ঘটনার কথা বলে শুরু করা যাক। ১৯১০ সালে নভেম্বর মাসে ফ্রেঞ্চ আকাদেমি অফ
সায়েন্সে পদার্থবিদ্যা বিভাগে একটি সদস্যপদ খালি হয়। মাদাম কুরি তার সাত বছর আগে
পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পেয়েছেন। ফ্রান্সের সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় প্যারি
বিশ্ববিদ্যালয় বা সরবোনে তিনি পড়ান। কাজেই তাঁর যোগ্যতা নিয়ে কারো সন্দেহ থাকতে
পারে না। মাদাম যে এ ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন তা নয়, কিন্তু বন্ধুবান্ধব ও
অনুরাগীদের আগ্রহে তিনি দরখাস্ত করেন। তাঁর প্রতিযোগী ছিলেন এদুয়ার্দ ব্রানলি
নামের অপর এক পদার্থবিদ। কে এই ব্ৰানিলি?
এদুয়ার্দ
ব্রানলির নাম এখন খুব বেশী লোক জানেন না। তিনি প্রথম বেতার গ্রাহক যন্ত্র বা রেডিও
রিসিভার তৈরি করেন। মার্কনি রেডিও আবিষ্কারের জন্য ১৯০৯ সালে নোবেল পুরস্কার পান।
আমরা সবাই এখন জানি যে রেডিও আবিষ্কার মার্কনির একক কৃতিত্ব নয়, তার পিছনে
জগদীশচন্দ্ৰ বোসের অবদান কম নয়। সে যা হোক, ফরাসিরা অন্তত মনে করতো যে ব্রানলিকে
অন্যায় ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। রোমান ক্যাথলিক ধর্মের শীর্ষ ধর্মগুরু পোপ তাঁকে
খুব পছন্দ করতেন। প্যারি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে তিনি ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে
পড়ানোর চাকরি নিয়েছিলেন।
আমরা নিশ্চয় ভাবব
দুজনের মধ্যে কোন প্রার্থীর বিজ্ঞানে অবদান বেশী তাই নিয়েই নিশ্চয় আলোচনা চলবে।
আসলে কিন্তু হল ঠিক উল্টো। এক দল বিজ্ঞানী মাদামের বিরোধিতা করলেন — একমাত্র কারণ
তিনি নারী। তাদের কাছে বিজ্ঞান গবেষণাগার পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত। মাদামের
সাফল্যের ইতিহাস তাঁদের মনে একান্ত মূল্যহীন। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন আর একদল
যাঁরা মাদামের মুক্ত চিন্তাকে মেনে নিতে প্ৰস্তুত ছিলেন না। ব্রানলিকে তাঁরা
সমর্থন করেন। কারণ তিনি ধর্মনিষ্ঠ খ্রিস্টান।
অন্যদিকে মাদাম কুরি ধর্মে বিশেষ বিশ্বাসী ছিলেন না, তাঁর এগারো বছর বয়সে তাঁর
মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। মাদামকে এমন কথাও শুনতে
হয়েছিল যে তিনি পোলিশ ইহুদি, যদিও ইহুদি তিনি ছিলেন না। পোল্যান্ডে জন্ম হলেও
তাঁর উচ্চতর পড়াশোনা ও গবেষণা সমস্তই প্যারিতে। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারি ছিল
সবচেয়ে মুক্ত ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির পীঠস্থানদের অন্যতম। স্বাধীনতা, সাম্য ও
বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ফরাসি বিপ্লবের সেই আঁতুড়ঘরে নারী বলে বা ধর্ম
নিয়ে উৎসাহী বিশ্বাসী নয় বলে এক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীকেও তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন
হতে হয়েছিল।
১৯১১ সালের
২৩ শে জানুয়ারি নির্বাচন হয়। মাত্র দু ভোটে মাদাম কুরি পরাজিত হন। নির্বাচনে
মাদামকে হারানোর জন্য নানা অসৎ পথেরও সাহায্য তাঁর বিপক্ষকে নিতে হয়েছিল। এর পরে
তাঁর চরিত্র নিয়েও কুৎসা প্রচার শুরু হয়েছিল। এমনকি তাঁর বাড়িও আক্রান্ত
হয়েছিল। তাতে মাদামের কিছু আসে যায় নি। শুরুতেই বলেছি সে বছর তিনি রসায়নে নোবেল
পুরস্কার পান। এবার আর কারোর সঙ্গে ভাগ করে নয়, দুটি নতুন মৌল পোলোনিয়াম ও
রেডিয়াম আবিষ্কারের জন্য তিনি একাই পুরস্কারটি জয় করেন। তবে মাদাম নোবেল
বক্তৃতার সময় মনে করিয়ে দেন যে তাঁর এই কৃতিত্বের সমান অংশীদার ছিলেন তাঁর
স্বামী পিয়ের কুরি। পিয়ের ১৯০৬ সালে মারা যান। মৃত্যুর পরে নোবেল পুরস্কার দেয়া
হয় না, তাই তাঁর নাম এবারে মাদামের পাশে লেখা ছিল না।
আজ পর্যন্ত
দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র চার জন – মাদাম কুরিই তাঁদের মধ্যে প্রথম। এই
বিরল সম্মান যিনি পেয়েছেন, তাঁকে সামান্য আকাদেমির সদস্যপদ নিয়ে চিন্তিত হতে হবে
কেন? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই দিতে হবে। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে বিজ্ঞান নিজে
যুক্তি মেনে চলতে পারে, কিন্তু বিজ্ঞানীরাও মানুষ। যে সমাজের তাঁরা অংশ, তা তাঁদের
চিন্তাভাবনাকে অনেকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। নারীরা যে বুদ্ধিতে পুরুষদের সমান, তা
মেনে নিতে সে সময়ের সমাজ তৈরি ছিল না। তারই প্রতিফলন পড়েছিল বিজ্ঞানীদের আচরণেও।
কিন্তু ভাবতে আশ্চর্য লাগে যে এই ভুল ভাঙতে ফ্রেঞ্চ আকাদেমির আরো পঞ্চাশ বছরের
বেশী সময় লেগেছিল। ১৯৬২ সালে প্রথম কোনো মহিলাকে সদস্য পদ পান – তাঁর নাম মার্গারিট
পেরি, তিনি মাদামের কাছেই গবেষণা করে ডক্টরেট পেয়েছিলেন।
তবে লড়াই
মাদামের কাছে নতুন নয়— আরো অনেক বেশি। কষ্ট তাঁকে জীবনে করতে হয়েছিল। তাঁর জন্ম
হয়েছিল ১৮৬৭ সালের ৭ই নভেম্বর পোল্যান্ডের ওয়ারশতে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে
ছোটো ছিলেন তিনি। নাম ছিল মারিয়া স্ক্লোদোভস্কা। সবাই আদর করে বলতো মানিয়া। সে
সময় পোল্যান্ড স্বাধীন ছিল না। – প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও জারের শাসনাধীন রাশিয়ার
মধ্যে দেশটা ভাগ হয়ে গিয়েছিল। ওয়ারশ ছিল রাশিয়ার অধীনে। পোল্যান্ডের সংস্কৃতি
ধ্বংস করতে রাশিয়ান শাসকদের চেষ্টার শেষ ছিল না। স্কুলে পোলিশ ভাষায় পড়ানো হতো
না। গোটা পোল্যান্ডে কোনো আধুনিক ল্যাবরেটরি ছিল না। বাবা ভ্ৰাদিশ্লাভ ছিলেন অঙ্ক
ও পদার্থবিদ্যাতে পণ্ডিত। কিন্তু পোল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর
জন্য তার চাকরি যায়। তারপরে অনেক কম মাইনের একটা চাকরি জোটে বটে, কিন্তু সংসার
চালানো তাঁর পক্ষে বেশ কষ্টকর হয়ে পড়ে। দারিদ্রের জন্যই তাঁর বড়ো মেয়ের শৈশবেই
মৃত্যু হয়। স্ত্রী ব্রোনিস্লাভাও যক্ষ্মা রোগে প্রায় বিনা চিকিৎসাতে মারা যান।
এর মধ্যেও
চলছে ছোটো মানিয়ার পড়াশোনা – সব পরীক্ষাতেই প্রথম যে নাম, তা হল মারিয়া স্ক্লোদোভস্কা।
কিন্তু ষোলো বছর বয়সে স্কুল পাস করার পরে পড়াশোনায় ছেদ টানতে হয়। গোটা পোল্যান্ডে
মেয়েদের উচ্চশিক্ষার কোনো সুযোগ ছিল না। মানিয়া ও তার দিদি ব্রোনিয়া, দুজনেরই
পড়ার ইচ্ছা খুব, কিন্তু উপায় কী? মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে ফ্রান্সের
রাজধানী প্যারিতে, কিন্তু সেখানে পড়ার খরচ, আসবে কোথা থেকে? তখন পোল্যান্ডে গোপনে
কয়েকজন তরুণ তরুণী মিলে পড়াশোনা করতেন। ধরা পড়লে শাস্তি নিশ্চিত, তাই লুকিয়ে
আজ এক বাড়িতে কাল অপর এক বাড়িতে তাঁরা মিলিত হতেন। এর নাম ছিল ভাসমান
বিশ্ববিদ্যালয়। দুই বোনই তাতে যোগ দেন, কিন্তু সে আর কতটুকু? দুধের স্বাদ কি ঘোলে
মেটে?
মানিয়ার
মাথায় একটা পরিকল্পনা এলো – দিদিকে বললেন, “তুই প্যারিতে পড়তে যা। আমি কাজ করে
তোকে টাকা পাঠাবো। যখন তুই রোজগার করতে পারবি, তখন তুই আমার খরচ দিবি৷” দিদি এক মত
নয়, “আমি কেন? তুই তো আগে পড়তে যেতে পারিস।” মানিয়া বোঝালেন, “তোর বয়স কুড়ি,
আমার সতেরো। তোরই আগে পড়তে যাওয়া দরকার।’
ব্রোনিয়া ও মানিয়া (বাঁদিকে),
১৮৮৬
সেই রকমই হল।
ব্রোনিয়া প্যারির মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হলেন। মানিয়া নিলেন বাচ্ছাদের পড়ানোর
চাকরি। স্কুলে পড়ানো নয়, গভর্নেস হিসেবে ছাত্রের বাড়িতে থেকে তার দেখাশোনাও
করতে হতো। এভাবেই কেটে গেলো প্ৰায় আট বছর। এর মধ্যে মানিয়া বই জোগাড় করে নিজে
পড়াশোনার চেষ্টা করতেন। একই সঙ্গে গরিব চাষিদের ছেলেমেয়েদের সাক্ষর করানোর কাজও
অনেক দিন করেছেন, যদিও জারের শাসনে সে কাজটা ছিল বেআইনি। ধরা পড়লে হয়তো শাস্তি হতো
সাইবেরিয়াতে নির্বাসন।
অবশেষে ১৮৯১
সালে মারিয়া রওনা হলেন প্যারি। ব্রোনিয়া এর মধ্যে বিয়ে করেছেন। অপর এক পোলিশ
ডাক্তারকে। মানিয়া প্ৰথমে দিদির কাছেই উঠলেন। ভর্তি হলেন সরবোনে। সরবোন অর্থাৎ
প্যারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ইউরোপের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি। সেখানে তাঁর নাম
লেখা হল মেরি স্ক্লোদোভস্কা।
মেরি বুঝলেন
যে সহপাঠীদের থেকে তিনি অনেক পিছিয়ে আছেন। সেটাই স্বাভাবিক, কারণ পড়াশোনার বিশেষ
সুযোগ গত আট বছরে তিনি পাননি। তার উপরে পড়তে হয় ফরাসি ভাষায়, যেটা তাঁর
মাতৃভাষা নয়। দিদির সঙ্গে থাকলে সামাজিকতার জন্য পড়ার কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। তাই
অনেক কষ্ট হলেও আলাদা একটা ঘর নিলেন। অনেকদিন এমন হয়েছে যে না খেয়ে অজ্ঞান হয়ে
পড়েছেন। জামাইবাবু খবর পেয়ে এসে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন। প্যারির
প্রচণ্ড শীতে যখন আগুন জ্বালানোর পয়সা থাকতো না, তখন একমাত্র উপায় ছিল যত পোশাক
আছে এক সঙ্গে পরে নেয়া, যদি ঠাণ্ডাটা একটু কম লাগে। এর মধ্যে চলছে পড়াশোনা।
প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন পদার্থবিজ্ঞান পড়ার জন্য। পরে মনে হল অঙ্কটাও পড়ে নিলেও
তো হয়। ১৮৯৩ সালে পদার্থবিজ্ঞানে এমএসসি পরীক্ষার ফল বেরোল। প্রথম হয়েছেন মেরি স্ক্লোদোভস্কা।
পরের বছর অঙ্কে দ্বিতীয়। ইতিমধ্যে একটা বৃত্তি পেয়েছিলেন, তাই একটু হলেও কষ্টটা
কমেছে। চাকরি পাওয়ার পরে প্রথম সুযোগেই মেরি বৃত্তির সমস্ত পয়সা ফিরত দিয়ে
দিয়েছিলেন, যদিও সে রকম কোনো শর্ত ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন যে তাঁর মতো অসুবিধায়
পড়া অন্য কোনো ছাত্ৰ যেন সুযোগটা পায়।
ক্লাসের
পড়াশোনা তো শেষ হল, এখন চান গবেষণা করতে। কিন্তু সুযোগ কোথায়? গোটা ফ্রান্সে তখন
পর্যন্ত কোনো নারী কোনো বিষয়ে ডক্টরেট করেন নি। এমনকি কেউ আছেন যিনি মেরিকে কাজ
করতে একটু জায়গা দেবেন? এসময় আলাপ হল পিয়ের কুরি নামের এক পদার্থবিজ্ঞানীর
সঙ্গে। তিনি প্যারির মিউনিসিপ্যাল স্কুলে পড়ান। তখনই পদার্থবিদ হিসেবে পিয়ারের
বেশ সুনাম হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন যে চৌম্বক পদার্থ একটি নিদিষ্ট তাপমাত্রাতে
হঠাৎ অচৌম্বক পদার্থে পরিণত হয়। তাঁর সম্মানে একে আমরা কুরি তাপমাত্রা বলি। তিনি
ও তাঁর ভাই জ্যাক এক নতুন অত্যন্ত সুবেদী ইলেকট্রোমিটার বানিয়েছেন। ইলেকট্রোমিটার
হল বৈদ্যুতিক আধান বা চার্জ মাপার যন্ত্র। মেরি ও পিয়ের, দুজনের আরো অনেক মিল
ছিল। পিয়ের ধর্মে বিশ্বাস করেন না। তাঁর পরিবার চিরকালই উদারপন্থী। তাঁর বাবা
ইউজিন ১৮৪৮ ও ১৮৭১ –এর বিপ্লবে সাধারণ মানুষের পক্ষ নিয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন।
দুজনেরই
দুজনকে ভালো লেগে গেলো। পিয়েরের যে কাজ করার অনেক বড়ো গবেষণাগার ছিল তা নয়, তবু
তাঁর ছোটো ঘরের মধ্যেই মেরিরও একটু জায়গা হল। এক বছর পরে ১৮৯৫ সালে তাঁদের বিয়ে হল।
একেবারেই ধাৰ্মিক আচারবিহীন ছিল সেই অনুষ্ঠান। এক আত্মীয় মেরিকে বিয়ের পোশাকটা
কিনে দিতে চেয়েছিলেন। খ্রিস্টানদের বিয়ের পোশাক সাধারণত সাদা রঙের হয়। মারি
তাঁকে অনুরোধ করেন গাঢ় রঙের পোশাক দিতে, কারণ তাঁর তখন বাইরে পরার আর মাত্র একটাই
পোশাক ছিল। ঘন নীল রঙের সেই পোশাক তিনি বহুদিন ল্যাবরেটরিতে ব্যবহার করেছিলেন।
মেরির উৎসাহে
পিয়ের ডক্টরেটের থিসিস জমা দিলেন। ডক্টরেট পাওয়ার পরে তাঁর পদোন্নতি হয়। কিন্তু
গবেষণার সুযোগ বাড়ল। না। একটা ছোটো ঘরে মেরি কাজ শুরু করেছিলেন। সেখানে জায়গা না
হওয়ায় বাইরে একটা প্রায় চালার মতো ঘরকে তাঁরা দুজনে ল্যাবরেটরি বানিয়ে নেন। কী
করছিলেন মেরি?
গবেষণাগারে পিয়ের ও মেরি
ঊনবিংশ শতকের
শেষ দশকে পদার্থবিজ্ঞানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার হয়েছিলো। রন্টজেন
আবিষ্কার করেন এক্স-রশ্মি। তার পরেই আঁরি বেকারেল দেখেন যে ইউরেনিয়াম থেকে খুব
বেশী শক্তি নিয়ে কিছু রশ্মি বার হয়। একে বলা হল তেজস্ক্রিয়তা বা রেডিওঅ্যাক্টিভিটি।
এক্স-রশ্মি বিজ্ঞানীদের আকর্ষণ কেড়ে নিলেও তারা বেকারেলের কাজ নিয়ে ততটা সচেতন
ছিলেন না। মেরি বেকারেলেরই কাছে কাজ শুরু করলেন এই বিষয়ে। রেডিওঅ্যাক্টিভিটি
শব্দটাও মেরিরই বানানো।
মেরি
আবিষ্কার করলেন যে ইউরেনিয়াম একা নয়, থোরিয়ামও আরো এক মৌলিক পদার্থ যার
তেজস্ক্রিয়তা ধর্ম আছে। তিনি দেখালেন যে তেজস্ক্রিয়তা ইউরেনিয়াম বা থোরিয়াম
মৌলেরই ধর্ম। এই ধাতু দুটি মৌলিক পদার্থ হিসবেই থাকুক, কিংবা অন্য মৌলের সঙ্গে
মিলে যৌগ তৈরি করুক, তেজস্ক্রিয়তার কোনো পরিবর্তন হয় না। বেকারেলও একই কথা
বলেছিলেন, মেরি সেটা প্রমাণ করে দেখান। এই কাজে তাঁর সহায় হয়েছিলো পিয়েরের
আবিষ্কার করা ইলেকট্রোমিটার।
মেরি আরো
একধাপ এগিয়ে গেলেন, তিনি বললেন যে তেজস্ক্রিয়তা আসলে ইউরেনিয়াম পরমাণুর ধর্ম।
আমরা তো স্কুলেই এ কথা পড়েছি। আমরা জানি যে এটা আসলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ধর্ম।
নিউক্লিয়াস আবিষ্কার কিন্তু আরো প্ৰায় পনের বছর পরের ঘটনা। মেরি যখন একথা বলছেন,
তখন পরমাণুর অস্তিত্বে যে সমস্ত বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন তা নয়। পরমাণুর ভিতর থেকে
যদি তেজস্ক্রিয় রশ্মি বেরোয়, তাহলে নিশ্চয় পরমাণুর ভিতরের গঠনটা খুব সরল নয় –
বিজ্ঞানীদের অধিকাংশের পক্ষে এই কথাটা মেনে নেওয়া সহজ হয়নি। প্রায় একই সময়ে ইংল্যান্ডে
জে জে টমসন দেখিয়েছেন যে পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন নামে এক কণা থাকে। টমসন লিখেছেন
যে তিনি রয়্যাল সোসাইটিতে তাঁর আবিষ্কারের কথা ঘোষণার পরে জনৈক বিশিষ্ট বিজ্ঞানী
তাঁকে বলেছিলেন যে টমসন নিশ্চয় তাঁদের সঙ্গে মজা করছেন। সে সময় তাই
তেজস্ক্রিয়তা যে পরমাণুর ধর্ম তা বলা মোটেই সহজ ছিল না। মেরির এই আবিষ্কারের কথা ফ্রেঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স-এ ঘোষণা করেন তাঁর শিক্ষক গ্যাব্রিয়েল লিপম্যান। দিনটা ছিল ১৮৯৮ সালের ১২ এপ্রিল। মেরি উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একমাত্র সদস্যদেরই অ্যাকাডেমিতে বলার অধিকার ছিল।
ইউরেনিয়াম
প্রকৃতিতে যে আকরিক থেকে পাওয়া যায়, তার নাম পিচব্লেন্ড। মেরি দেখলেন পিচব্লেন্ড
যতটা তেজস্ক্রিয়, তা শুধু ইউরেনিয়াম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মেরির আবিষ্কারে
উৎসাহিত হয়ে পিয়েরও তাঁর সঙ্গে কাজ শুরু করলেন। বিজ্ঞানের জগতে সবচেয়ে সফল ও
সবচেয়ে বিখ্যাত দাম্পত্য উদ্যোগের সূচনা এভাবে মেরির আবিষ্কার থেকেই শুরু হল।
কিন্তু আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না। এর মধ্যে ১৮৯৮ সালে তাঁদের প্রথম কন্যা
আইরিনের জন্ম হয়েছে। এই আইরিন পরবর্তীকালে তাঁর স্বামী ফ্রেডরিক জোলিওর সঙ্গে
নোবেল পুরস্কার পান। আইরিন হবেন বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার জয়ী দ্বিতীয় মহিলা,
যদিও তাঁর মা তা দেখার জন্য বেঁচে থাকবেন না।
নানা
পরীক্ষানিরীক্ষা করে কুরিরা নিশ্চিত হলেন যে নতুন কোনো তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থ
এর মধ্যে আছে। অনেক চেষ্টার পরে একটি মৌলিক পদার্থের অস্তিত্ব প্রমাণে তাঁরা সক্ষম
হলেন। পিয়ের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী নাম দেবে এই নতুন মৌলের? মেরি মুহূর্তের
জন্য ভাবলেন। তাঁর মনে পড়ে গেলো তাঁর স্বদেশ পোল্যান্ডের কথা – সেই স্বদেশ যা তিন
বিদেশী শক্তির হাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন, যার অস্তিত্ব পৃথিবীর মানচিত্রে নেই। তাই নতুন
মৌলের নাম হল পোলোনিয়াম সেটা ছিল ১৮৯৮ সালের মাঝামাঝি।
একই ফ্রেমে তিন নোবেলজয়ী, পিয়ের,
আইরিন ও মেরি
কিন্তু
এখানেই শেষ নয়। কুরিরা দেখলেন যে পোলোনিয়াম দিয়েও পিচব্লেন্ডের তেজস্ক্রিয়তা
পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছেনা। নিশ্চয় আরো কোনো নতুন মৌলিক পদার্থ তার মধ্যে
আছে। চলল আরো প্ৰয়াস। মাদাম কুরি তাঁর ডায়েরিতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা লিখে রাখতেন।
একদিন লিখেছেন আইরিন হাঁটতে শিখেছে। কিছুদিন পরে আইরিনের যে পনেরটি দাঁত বেরিয়েছে
সে কথাও লেখা আছে। মাঝখানের পাতাটিতে লেখা আছে যে তাঁরা নতুন একটি মৌল আবিষ্কারে
সক্ষম হয়েছেন। তার নাম তাঁরা দিলেন রেডিয়াম। এর তেজস্ক্রিয়তা ইউরেনিয়ামের থেকে
অনেক বেশি। প্ৰচণ্ড কষ্ট তাঁদের করতে হয়েছিল। কাজ শুরুর সময় তারা ভেবেছিলেন এক টন
পিচব্লেন্ড থেকে অন্তত দশ কিলো রেডিয়াম পাবেন। বাস্তবে পেলেন এক গ্রামের
অর্ধেকেরও কম। পরিমাণ যতই কম হোক, ঊনবিংশ শতকের শেষে নতুন মৌল আবিষ্কার করা যে
কোনো রসায়ন বিজ্ঞানীর কাছে ছিল কৃতিত্বের শেষ কথা। সেই কাজে কুরিরা সফল হয়েছেন
এক বার নয়, দু-দুবার। রেডন মৌলটা তাঁরাই প্রথম দেখেছিলেন, যদিও চিনতে পারেন নি। এখনো পর্যন্ত তাঁরা গবেষণার জন্য কোনো রকম আর্থিক সাহায্য
কাছে পান নি। সমস্ত খরচা চলতো পিয়েরের সামান্য মাইনে থেকে।
পিয়ের এর
আগে সরবোনে চাকরির চেষ্টা করেও বিফল হয়েছেন। অনেক কম যোগ্যতা সম্পন্ন একজন সেই
চাকরিটা পেয়েছেন। এমন সময় সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সেখানে
যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানালো। মাইনে ভালো, সুযোগ সুবিধা অনেক, এবং সবার উপরে আকর্ষণ হল
মেরির জন্যও একটা পদ তাঁরা ভেবে রেখেছেন। কুরিরা প্রথমে ফ্রান্স ছাড়ার ব্যাপারে
মনস্থির করে ফেললেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁরা ভেবে দেখলেন যে এর ফলে তাদের
গবেষণার ক্ষতি হবে। সমস্ত যন্ত্রপাতি তো ফ্রান্সে ফেলে যেতে হবে। কয়েকজন বিশিষ্ট
ফরাসি বিজ্ঞানী, যাঁদের মধ্যে একজন হলেন বিখ্যাত আঁরি পঁয়কেয়ার, কুরিদের দেশ
ছাড়ার সম্ভাবনাতে বিচলিত হয়ে বিষয়টা নিয়ে উদ্যোগী হলেন। সরবোনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
এক প্রতিষ্ঠানে পিয়েরের চাকরি হল। মেরিরও একটা মেয়েদের স্কুলে পড়ানোর কাজ জুটল।
আর্থিক
অবস্থা একটু ভালো হলেও ফ্রান্সে যথাযোগ্য সম্মান জুটছে না। ফ্রেঞ্চ আকাদেমির
সদস্যপদের জন্য পিয়েরের চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলো। নিশ্চয় মনে পড়ছে। পরবর্তীকালে
মাদাম কুরির জীবনে কী ঘটেছিল! পিয়েরের শুভানুধ্যায়ীরা কয়েকজন তাঁর কাজের জন্য ফ্রান্সের
রাষ্ট্ৰীয় সম্মান লিজিয়ন অফ অনার দেওয়ার প্রস্তাব করেন। পিয়ের বিজ্ঞানীদের
জন্য এই সমস্ত সম্মানের পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি লিখে পাঠালেন যে সম্মানের চেয়ে
গবেষণাগারের প্রয়োজন তাঁর কাছে অনেক বেশী। পরবর্তীকালে মাদাম কুরিও এই সম্মান
প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯০৩ সাল।
মেরি ডক্টরেট উপাধি পেলেন। সে দিনটা ছিল ২৫ জুন। ফ্রান্সের প্রথম মহিলা ডক্টরেট! দিদি ব্রোনিয়ার আগ্রহে
মেরি একটা নতুন পোশাক করালেন। সেটাও কালো রঙের, সেটাও দীর্ঘদিন গবেষণাগারে ব্যবহার
হয়েছিলো। মেরির বাবা এর মধ্যে মারা গেছেন। দিদিও ফিরে গেছেন পোল্যান্ডে, সেখান
থেকে তিনি এই অনুষ্ঠানের জন্য প্যারিতে এসেছিলেন। মেরির পরীক্ষকরা বললেন যে এই
উপাধির জন্য মেরির মতো ভালো কাজ আগে কেউ করেন নি। ভুল তাঁরা বলেন নি। সে বছরই
নোবেল পুরস্কার ভাগ করে দেওয়া হল বেকরেল ও কুরি দম্পতির মধ্যে। কুরিরা অবশ্য
অসুস্থতা ও কাজের চাপের জন্য ব্যক্তিগত ভাবে পুরস্কার নিতে যেতে পারেন নি।
মেরির নোবেল
জয়ের পিছনে একটা ইতিহাস আছে। তেজস্ক্রিয়তা বিষয়ে কাজের জন্য বেকরেল ও পিয়েরের
নাম মনোনীত হয়েছিল। পিয়ের তা জানতে পেরে নোবেল কমিটিকে লেখেন যে তাঁর মতে মেরিও
তাঁর কৃতিত্বের সমান অংশীদার। নোবেল কমিটি তাঁর যুক্তি মেনে নেয়। ১৯০১ সালে,
অর্থাৎ নোবেল পুরস্কারের প্রথম বছরেই মেরির নামে একটি মনোনয়ন জমা পড়েছিল।
বৌশার্ড নামের জনৈক চিকিৎসক তাঁর নাম প্ৰস্তাব করেছিলেন। সেই প্ৰস্তাবের উপর
ভিত্তি করে মেরির নাম তালিকায় ঢোকানো হল।
জানতে ইচ্ছে
করে যে মেরির নাম কেন বাদ পড়েছিলো। রসায়নবিদরা বলেছিলেন যে এই পুরস্কার নতুন
মৌলিক পদার্থ আবিষ্কারের জন্য নয়। তাঁরা রসায়নে নোবেল পুরস্কারের জন্য কুরিদের
নাম আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলেন, কিন্তু নতুন মৌল সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য
অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু বেকারেলের পরে যখন পিয়েরের নাম আসে, তখন কি মেরির নাম
মনে আসাটা উচিত ছিল না? নাকি মহিলা বলে তাঁকে প্ৰথমে উপেক্ষা করা হয়েছিল? অনুরূপ
আর এক ঘটনার কথা মনে পড়ে যায়। ১৯০৩ সালেই ব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটিতে তাঁরা
দুজনে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু মেরির সেখানে বক্তৃতা দেওয়ার অধিকার ছিল না।
কেন এক
ডাক্তার মেরির নাম প্রস্তাব করেছিলেন? কুরিদের কাজ চিরকালই ডাক্তারদের খুব
পছন্দের, কারণ ক্যান্সারের চিকিৎসাতে রেডিয়াম প্রায় প্রথম থেকে ব্যবহার হচ্ছিলো।
কুরিরা পিচব্লেন্ড থেকে রেডিয়াম বার করার পদ্ধতির কোনো অংশ যদি পেটেন্ট নিতেন,
তাহলে চিরকালের জন্য তাঁদের আর্থিক সমস্যা দূর হতো। কিন্তু দুজনেই বিশ্বাস করতেন
যে বিজ্ঞানে সমস্ত মানুষের অধিকার, তাই তাঁরা পেটেন্ট নেওয়ার কোনো চেষ্টা করেন নি।
নোবেল
পুরস্কারের পর সরবোনে পিয়েরের অধ্যাপনার চাকরি জুটল। অনেক টালবাহানার পর তাঁর
গবেষণাগার তৈরি করতেও সরকার রাজি হলেন। মাইনে বছরে দশ হাজার ফ্রাঁ। মেরিও কাজ করার
সুযোগ পেলেন। তবে অধ্যাপক নয়, গবেষণাগারের প্রধান হিসেবে। মাইনে চব্বিশশো ফ্রাঁ।
মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
১৯০৬ সালে এক
পথ দুর্ঘটনাতে পিয়েরের মৃত্যু হয়। এর আগে তাঁদের দ্বিতীয় মেয়ে ইভ জন্মেছে।
মাদাম অত্যন্ত দুঃখ পেলেও নিজেকে শক্ত করলেন। ফরাসি সরকার মাদামকে পেনশন দিতে
চাইলে তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। কাজ না করে অর্থ তিনি নেবেন না। বন্ধুদের চেষ্টায়
সরবোনে পিয়েরের জায়গায় তাঁকে নিয়োগ করা হয়। ফ্রান্সের ইতিহাসে প্ৰথম
অধ্যাপিকা।
কাজ বন্ধ রইল
না। উদয়াস্ত পরিশ্রম করে মাদাম পিচব্লেন্ড থেকে রেডিয়াম আলাদা করতে সক্ষম হলেন।
এর পরই ১৯১১ সালে তাঁকে রসায়নে গড়ে ওঠে। রেডিয়াম ইন্সটিটিউট। এখন সেখানে দেড়
হাজারেরও বেশী লোক কাজ করেন। সারা পৃথিবী থেকে তরুণ গবেষকরা মাদামের সঙ্গে কাজ
করার জন্য সেখানে যেতেন। আমাদের সত্যেন্দ্রনাথ বসুও তাদের মধ্যে একজন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় মোবাইল
এক্স-রে ভ্যানে মাদাম কুরি
প্রথম
বিশ্বযুদ্ধের সময় মাদাম আহত সৈনিকদের সেবায় নিজেকে নিয়োগ করেন। এক বন্ধুকে
চিঠিতে তিনি লিখছেন যে পোল্যান্ডের জন্য যখন কাজ করা সেই মুহূর্তে সম্ভব নয়, তখন
তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্বদেশের জন্যই আত্মনিয়োগ করবেন। দুই মেয়েও তাঁর সঙ্গে যোগ
দেয়। মাদাম যুদ্ধক্ষেত্রে হাসপাতালে এক্স-রে করার ব্যবস্থা করেন। তার ফলে যে কত
সৈন্যের প্রাণ বেঁচেছিল তা বলা বাহুল্য। তাঁর দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কারের সমস্ত
টাকা তিনি দেশের স্বার্থে গঠিত এক ফাণ্ডে গচ্ছিত রাখেন, যদিও তিনি ভালোই জানতেন যে
টাকাগুলো আর ফেরত পাওয়া যাবে না। তাঁর নোবেল পদকগুলোও তিনি জমা দিতে গিয়েছিলেন –
সোনাটা সরকার গলিয়ে ব্যবহার করতে পারবে। আমাদের সৌভাগ্য যে ফরাসি সরকার সেগুলো
গ্ৰহণ করে নি।
মাদাম শেষ জীবনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
তখন বিজ্ঞানীরা তেজস্ক্রিয়তার বিপদ সম্পর্কে আজকের মতো সচেতন ছিলেন না। মাদাম কুরির
নোটবই আজও বিশেষ রেডিয়েশন নিরোধী পোশাক না পড়ে নাড়াচাড়া করা যায় না। মাদাম সারা
কর্মজীবন তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করেছেন। শেষ পর্যন্ত তার থেকে যে রোগ হয়, তাতেই
তাঁর মৃত্যু হয়। দিনটা ছিল ১৯৩৪ সালের ৪ঠা জুলাই। তাঁকে তাঁর স্বামী পিয়েরের পাশে
সমাহিত করা হয়। ষাট বছর পর ১৯৯৫ সালে, ফ্রান্সের বিশিষ্ট মানুষদের যেখানে শেষ সমাধি,
সেই প্যারির প্যান্থিয়নে তাঁদের দুজনকে আবার সমাহিত করা হয়েছে। মেরিই প্রথম মহিলা
যিনি নিজের কৃতিত্বে সেখানে স্থান করে নিয়েছেন।
যদি কয়েকটি
কথায় বিজ্ঞানে মাদামের দানকে চিহ্নিত করতে হয়, তাহলে বলতে হবে যে তাঁর কাজের
ফলেই নিউক্লিয় বিজ্ঞানের সম্ভাবনার কথা বিজ্ঞানীদের মাথায় আসে। পরমাণু যে বিরাট
শক্তির ভাণ্ডার, তা দেখানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি তার গঠন সম্পর্কে আমাদের কৌতূহলী করে
তুলেছিলেন। রেডিয়োকেমিস্ট্রি বিজ্ঞানের তিনিই পথিকৃৎ। তাঁর আবিষ্কারের ফলেই আরো
বহু তেজস্ক্রিয় মৌল আবিষ্কার হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে রেডিয়াম দিয়েই
ক্যান্সারের চিকিৎসা প্ৰথম সম্ভব হয়েছিল।
আইনস্টাইন
ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি লিখেছেন যে মাদামই তাঁর জানা একমাত্র ব্যক্তি যিনি
খ্যাতি অর্জন করার পরও এক বিন্দু পাল্টান নি। অনেক পরে পঞ্চাশের দশকে এক
সাক্ষাতকারে তিনি আরো বলেছিলেন যে শুধু বিজ্ঞান বা মানব সভ্যতায় অবদান নয়,
মাদামের নৈতিকতা, বিচার শক্তি ও চরিত্রের দৃঢ়তার জন্যও তিনি তাঁকে শ্রদ্ধা করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে রেখে আইনস্টাইনের মন্তব্য, ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীরা
যদি মাদামের মতো বিনয়ী হতেন, হয়তো পরিস্থিতি অন্যরকম হতো।
১৯২৭ সালের সলভে কনফারেন্সঃ সে
সময় বিজ্ঞানের সবচেয়ে বিখ্যাত এই কনফারেন্সে মাদাম কুরিই ছিলেন একমাত্র মহিলা
(প্ৰকাশ:
জনবিজ্ঞানের ইস্তাহার, জানুয়ারি ২০১৭, পরিমাৰ্জিত)
Subscribe to:
Posts (Atom)