Saturday, 30 June 2018

শেক্সপিয়র থেকে বিটোভেনের দেশে : ১ম পর্ব


শেক্সপিয়র থেকে বিটোভেনের দেশে

প্রথম পর্ব


শম্পা গাঙ্গুলী

        ভিসা অফিসে আমার আর গৌতমের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সকাল সাড়ে দশটায়। বজবজ স্টেশনে গিয়ে দিশেহারা অবস্থা। ট্রেন বন্ধ, তার ছিঁড়েছে। তখন প্রায় নটা বাজে। রাস্তা লোকে লোকারণ্য। গাড়ি-ঘোড়া পাওয়া শক্ত, পেলেও ওঠা কঠিন। অটোয় চেপে তখন আমরা একটা ট্যাক্সি পাওয়ার আশায় মরিয়াবাটা থেকে জিঞ্জিরাবাজার পর্যন্ত ওভারব্রিজের কাজের জন্য তলার সড়ক পথের চড়াই-উৎরাই, আধঘণ্টার পথ দেড় ঘণ্টায় অতিক্রম -- এসব আমাদের সে যুগের ঘোড়ায় টানা রথে চড়ার সুখ এনে দিল। সারথি অবশ্য আমাদের আশ্বস্ত করল, একটা ট্যাক্সি ধরিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত তার রথ আমাদের গন্তব্যের দিকে অবিচলভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
       শুভদা আর অর্পিতাদি ইংল্যান্ড সফরে আমাদের সঙ্গী। ওদের ভিসা অফিসে যাবার সময়টা আরও ঘণ্টা দুয়েক পরে। ট্রেন বিভ্রাটের আগাম পূর্বাভাস ওদের খানিক সতর্ক করলেও ভোগান্তি হল প্রায় একই। ইংল্যান্ড যাত্রার আগে ভিসা পাওয়া নিয়েও সকলকেই বেশ ভুগতে হল। আমাদের চারজনের কাছেই ভিসা অফিস থেকে পরপর ই-মেল এলো, প্রায় কোনো কাগজই ইংল্যান্ডের অফিসে পৌঁছায়নি অগত্যা আবার সব ডকুমেন্ট স্ক্যান করে ই-মেল কর। আমাদের বেড়ানোর নীল নক্সা অনেক দিন আগেই ছকা হয়ে গেছে। ইংল্যান্ডে লন্ডন শহর ও স্ট্রাটফোর্ড-আপন-এভন ধরে চারদিন। তারপর যাব স্কটল্যান্ডশুভায়ুর বাড়িতে। সেখানে তিন দিন তার আতিথেয়তায় না থাকলে আমাদের বন্ধু ডাক্তারটি ভয়ানক চটবে। স্কটল্যান্ডের পরে প্যারি। সেখানে আরও তিন দিন কাটিয়ে শুভদারা ফেরত আসবে। আমি আর গৌতম প্যারি থেকে যাব বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস। পাপান, আমাদের ছেলে ওখানে আমাদের সাথে সফর সঙ্গী হবে। সেখানে দুদিন ঘোরার পরে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য জার্মানির বন শহরপাপান ওখানেই থাকে,  পাশের শহরে কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় এম এস সি করছে। আরো দিন পাঁচেক কাটিয়ে তারপর কলকাতায় ফেরা।
       এবারের ইয়োরোপ ভ্রমণের জন্য আমি স্কুলের পুরো গরমের ছুটিটাই রেখেছি। সেজন্য প্রস্তুতিও বিস্তর। কলকাতায় মে মাস আর ইংল্যান্ডের বা জার্মানির মে মাস, তফাৎ অনেক। ওখানে ঐ সময় যখন তখন বৃষ্টির সম্ভাবনা। আর বৃষ্টি মানেই প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তাই প্রত্যেকের উইন্ডচিটার আর ভাল মতো গরম পোশাক আবশ্যক। তাই যাওয়ার আগে একসঙ্গে দফায় দফায় মিটিং, ইটিং আর মার্কেটিং। কিছু কিছু মিউজিয়ামের অগ্রিম টিকিট, হোটেল বুকিং, একটা শহর থেকে অন্য শহরে যাবার ট্রেন বা বাসের টিকিট অগ্রিম কাটা। যাত্রার দিন প্রায় এগিয়ে আসছে। ইংল্যান্ডের ভিসা না পেলে ফরাসি ভিসার জন্য আবেদন করাই যাবে না। অথচ ইংল্যান্ডের ভিসার কোনো খবরই নেই। অনেকদিন আগে থেকেই শুভদা গৌতমকে বলে রেখেছিল শেক্সপিয়রের জন্মস্থান স্ট্রাটফোর্ড-আপন-এভন জীবনে একবার উনি যদি না দেখেন তাহলে ইংরাজির শিক্ষক হিসাবে নিজেকে ব্যর্থ মনে করবেন। শুভদার শেক্সপিয়রের প্রতি এই গভীর শ্রদ্ধাই আমাদের ইংল্যান্ডে যাবার কথা ভাবিয়েছে। এদিকে প্লেনের আর মাত্র দিন পনের বাকি। কোনো ভিসাই হয়নি জটিল ভিসা জটে যাওয়া হচ্ছে না এমনটাই মনে হল। শুভদা তো মুখ কালো করে লোকজনের সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল। অবশেষে মেঘ কাটল। আংশিক। ইংল্যান্ড-এর ভিসা যাও বা পাওয়া গেল যাবার মাত্র দশ দিন আগে, সমস্যা হল ফ্রান্সের ভিসায়। শুভদার পাসপোর্টে কিছু গণ্ডগোল ছিল, সেটা আগেই ঠিক করে নিয়েছিল। ব্রিটিশ কনসুলেট সেটা মেনে নিলেও ফরাসি ভিসা অফিস তা মানল নাপ্যারি ভ্রমণে আমরা একসঙ্গে থাকব না, এটা ভেবেই খুব মন খারাপ হল। শুভদাও বেশ ভেঙে পড়ল। সান্ত্বনা একটাই। শেক্সপিয়রের দেশে শুভদাদের সঙ্গে আমরা পাড়ি দিচ্ছি অবশেষে
       ২১ মে, ২০১৭ মাঝরাতে বজবজ থেকে রওনা। বড় একটা টাটা সুমো গাড়িতে আমরা মাত্র চারজন। বেড়িয়ে ফেরার প্রায় মাস চারেক পর শুভদা বলেছিল, সেদিন গাড়িতে চড়ার পরে টানা একঘণ্টা আমরা নাকি কেউ কারোর সঙ্গে একটাও কথা বলিনি। মনে হয় যাওয়াটা যে হচ্ছে সেটাই অবিশ্বাস্য ঠেকছিল। আমার অবশ্য গলার একটা সমস্যার জন্য কথা বলা তখন বারণ ছিল, অন্যদের কথা বলতে পারব না। জেট এয়ারওয়েজের প্লেন, ২২শে মে ভোর ৫টা ৩৫মিনিটে। কলকাতা থেকে মুম্বাই। সেখান থেকে ব্রিটেনের প্লেন সকাল সাড়ে এগারোটায়। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে নামলাম তখন ওখানকার সময় সন্ধে সাড়ে সাতটা
       লন্ডন বেসিন ইংল্যান্ডের দক্ষিণ পূর্ব কোণে টেমস নদীর পাড়ে মোহনার কাছে। স্কুলের পাঠ্য বইতে পড়েছি। সেখানে সত্যিই যাচ্ছি। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বাটে সরার মত আকৃতি চক, নানা ধরণের বেলেপাথর, লন্ডন ক্লে নামক কাদাপাথরে তৈরি হয়েছিল, সেই প্যালিওসিন-ইওসিন যুগে। চারপাশে ঘিরে আছে স্বল্প উচ্চতার ভৃগু বা এস্কার্পমেন্ট, যেগুলো ঢালু হয়ে নেমে এসেছে বেসিনের দিকে। টেমস নদী এই বেসিনের মাঝখান দিয়ে পশ্চিম থেকে পুবে বয়ে গেছে নর্থ সি-র দিকে
       ব্যস্ততা আর বসতির ঘনত্বের নিরিখে লন্ডনের কেন্দ্র থেকে পরপর অনেকগুলি জোন গড়ে উঠেছে। এক থেকে ছ’নম্বর জোন পর্যন্ত বৃত্তাকার, জোন-১ হল একদম কেন্দ্রে। পরের তিনটে জোন আর বৃত্ত নয়, উত্তরপশ্চিম কোণে ত্রিভুজ আকারে। হিথরো এয়ারপোর্ট ছ’নম্বর জোনে, সেখান থেকে  হিথরো কানেক্ট ট্রেনে পিকাডেলি লাইন ধরে এক ঘণ্টা পরে প্যাডিংটন স্টেশনে নামলাম। গুগল ম্যাপে জিপিএস-এ দেখাচ্ছে অ্যাপার্টমেন্ট স্টেশন থেকে হাঁটা পথ ঘর বুকিং করেছিলেন হরজিৎ নামে একজন পাঞ্জাবি ভদ্রলোকের মেয়ে। ওনারা বহু বছর ধরে ইংল্যান্ডে আছেন। হরজিতের কথায় পরে আসছি। যে ঠিকানা আমরা পেয়েছিলাম, সেটা ছিল অসম্পূর্ণ। ফলে স্টেশন থেকে বেরিয়ে অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজে পেতে আমাদের আরও এক ঘণ্টা লেগে গেল। ভারি ভারি লাগেজ নিয়ে একেবারে নাজেহালঅবশেষে বাড়ির ম্যানেজারকে ফোনে পেয়ে আর এক বয়স্ক পথচারীর সহায়তায় গন্তব্যে পৌঁছলাম। অ্যাপার্টমেন্টটা বিশাল, কিচেন সমেত মোট তিনটে বড় বড় ঘর। একটা কথা জানাই, একবেলাও অন্তত রান্না করে খেতে পারলে বিদেশ ভ্রমণের খরচ অনেকটা কম হয়। এ অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়েছে গৌতমের সঙ্গে ঘুরে। তাই আমরা এই ট্রিপেও ঘর ভাড়া কিছু বেশি পড়লেও কিচেনেট সহ ঘর নিয়েছি সব জায়গায়। ব্রেকফাস্ট আর ডিনার ঘরেই সারতাম। তাই সেদিন পৌঁছেই ডিনারের তোড়জোড় শুরু করলাম। ব্যাগ হাতে গৌতম গেল বাজারে মানে কাছের সুপারমার্কেটে।
       যাবার আগে নেট ঘেঁটে হোমওয়ার্ক আমি আর গৌতম ভালই করেছিলাম। পরদিন সকালে গৌতম আর শুভদা প্যাডিংটন স্টেশন থেকে সারাদিন ঘোরার পাস কিনে আনল। দাম ভালোই, এক একজনের জন্য সাড়ে বারো পাউন্ডতাতে সারাদিন সুড়ঙ্গের টিউব (জোন-১ থেকে ৩ অবধি) বা শহরের মধ্যেকার যে কোনো বাস সবই যতবার খুশি চড়া যাবে। এছাড়া এতে আছে টু ফর ওয়ান-এর সুবিধা। মানে অনেক দ্রষ্টব্য স্থানে একজনের টিকিটে আরেকজনের ফ্রি।
       আমাদের প্রথম গন্তব্য ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবের দিকে রওনা দিলাম। এই অ্যাবে হল ব্রিটেনের এক ঐতিহাসিক চার্চ যেখানে বহু বিশিষ্ট মানুষের সমাধি রয়েছে হয়েছে অনেক রাজা ও রাণীর অভিষেক কিন্তু হতাশ হলাম। সেদিন ওটা বিশেষ কারণে বেলা আড়াইটেতে খুলবে। হাঁটতে হাঁটতে ওয়েস্টমিনিস্টার রাজপ্রাসাদের উত্তর প্রান্তের বিখ্যাত বিগ বেনের কাছে গেলাম বিশাল ঘড়িটা নয় কিন্তু, আসলে তার পেল্লাই সাইজের ঘণ্টাটার ডাক নাম বিগ বেন।
বিগ বেন

       পার্লামেন্ট ভবন চত্বরে একটা সুউচ্চ টাওয়ারের ওপরের দিকের চারদিকের দেওয়ালে চারটে বিশাল বিশাল ঘড়ি যাদের বহু দূর থেকে দেখা যায়। পাশেই টেমস নদী। (আমাদের কলকাতার লেকটাউনের মোড়েই একটা বিগ বেনের ছোটো রেপ্লিকা আছে না!)  লন্ডনের প্রথম কমিশনার স্যার বেঞ্জামিন হল, তাঁর নাম অনুসারে ঘণ্টাটার নামকরণ উল্টোদিকের রাস্তা থেকে এই ছিয়ানব্বই মিটার উচ্চতার ক্লক টাওয়ারটা ঘাড় উঁচু করে খানিক সময় ধরে দেখলাম কলকাতার শহিদ মিনারের থেকে দ্বিগুণ উঁচু। 
       বিগ বেন দেখে আমরা এগোলাম সেই বিখ্যাত নদী টেমসের পাড়ে। পৃথিবীর ব্যস্ততম নদী বন্দর নর্থ সি-তে মেশার আগে নদীটা ফানেলের মতো ক্রমশ চওড়া হয়ে শহরের দক্ষিণ পূর্বে বাঁক নিয়েছে। নদীর ওপারে লন্ডন আই দেখা যাচ্ছে। একশ পঁয়ত্রিশ মিটার উঁচু গগনচুম্বী এই ইলেকট্রিক নাগরদোলায় চাপলে নাকি সারা লন্ডন শহর দৃশ্যপটে আসেকিন্তু আমাদের হাতে সময় কম, আর টিকিটও আগে কাটা হয়নি। তাই নদীর দক্ষিণ পাড়ের লন্ডন আইকে ব্যাকগ্রাউণ্ডে রেখে উত্তর পার থেকে ছবি তোলা
লন্ডন আইয়ের সামনে শুভদা- অর্পিতাদি

      
ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজে উঠে টেমসের বুকে ব্যস্ততা চোখে পড়ল। সামনে নদীর বুকে অসংখ্য জলযানের সমাগম
ব্রিজের একপাশে লন্ডন আই এর বিশাল উঁচু ঘূর্ণি চক্র, অন্যপাশে পার্লামেন্ট স্কোয়ারের অসংখ্য অফিস, আদালত, বিগ বেন ও অন্যান্য প্রাসাদ। শুভদা মনে করাল প্রায় দুশো বছর আগে এই ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে ওয়ার্ডসওয়ার্থ  “Composed Upon Westminister Bridge” কবিতাখানা লিখেছিলেন।
The City now doth, like a garment, wear
The beauty of the morning; silent, bare,
Ships, towers, domes, theatres, and temple lie
Open unto the fields, and to the sky
….. Ne’er saw I , never felt, a calm so deep!
The river glideth at his own sweet will:
ওয়েস্টেটমিনিস্টার ব্রিজ থেকে টেমস

       এখন সেই খোলা প্রান্তর, নিস্তব্ধতা, জনমানবশূন্য পরিবেশ নেই। সকালের সূর্যের নরম আলোয় শহরটা আজও ঢেকে যায়---একই ভাবে। কিন্তু সেই প্রশান্তির আবরণে গভীর অনুভূতিটুকু চারদিকের অস্থিরতায় খুঁজে পায় কি এযুগের কবি মন? আমরা যেদিন লন্ডনে পৌঁছলাম, ২২ মে ২০১৭, সেদিনই তো ম্যানচেস্টারে এক আত্মঘাতী মানববোমা আরিয়ানা গ্র্যান্ডের একটি মিউজিক কন্সার্টে তেইশটি তাজা প্রাণ কেড়ে নিলো আরও আছে। বেড়িয়ে তখনও ফেরত আসিনি। ছেলের সাথে বেলজিয়ামে ছিলাম। শুনলাম, লন্ডন ব্রিজে সন্ত্রাসবাদীর গাড়ি বেশ কয়েকজন নিরীহকে চাপা দিয়েছে এসব নিত্য ঘটনা আমাদের যেন গা সওয়া। উদগ্রীব শুধু নিজের বা নিকটজনের প্রাণটুকু নিয়ে। এযুগের কবি মনেও এসবের ছায়া পড়ে বৈকি! তবে সেটা প্রশান্তির নয়, অশান্তির।
       বাকিংহাম প্রাসাদে যাব। পার্লামেন্ট স্কোয়ারের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার রাস্তাটা চমৎকার, সেন্ট জেমস পার্কের মধ্যে দিয়েপ্রাসাদের সামনে সাতান্ন একর আয়তনের বড় পার্কটা সুসজ্জিতমাঝ বরাবর বিশাল দিঘি। রবিন, ব্ল্যাক বার্ড, ওয়াটার ফাউল, পেলিক্যান পাখির দলের জলকেলি; তীরে এসে মাঝে মধ্যে ভ্রমণ পিপাসুদের সাথে সেলফি তোলাতেও যেন আপত্তি নেই। পার্কটা ঘুরলাম আমরা দু-দলে ভাগ হয়ে, জোড়ায় জোড়ায়আমি আর গৌতম পুরো পার্কটা চক্কর দিলাম। এক জায়গায় দেখি অজানা সৈনিকদের শহিদ বেদী। তার পিছনে বিশাল খোলা চত্বর হর্স গার্ডস প্যারেড সুসজ্জিত ঘোড়ার পিঠে ঝকমকে পোশাকে সিপাহীর দল সেখানে কুচকাওয়াজ করছে। খুব ভিড়। দূর থেকেই দেখলাম।
সেন্ট জেমস পার্কের ভিতরে 

       বাকিংহাম প্রাসাদে বিভিন্ন দিক দিয়ে ঢোকার জন্য মূল ফটকের আগে সুন্দর সুন্দর সব সেরিমোনিয়াল গেট আছে সাউথ অ্যান্ড ওয়েস্ট আফ্রিকা গেট, কানাডা গেট আর অস্ট্রেলিয়া গেট। আমরা অস্ট্রেলিয়া গেট দিয়ে প্রাসাদ চৌহদ্দিতে ঢুকলাম। সামনেই মূল প্রাসাদ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। লন্ডনের রাজা, রাণী ও তাঁদের পরিবারের বর্তমান বাসস্থান। ‘কুইন্স গ্যালারী’ বাদে অন্যত্র সাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ। বাকিংহামের ডিউকের জন্য ১৭০৩ সালে এটি তৈরি হয়েছিল এর ষাট বছর পর রাজা তৃতীয় জর্জ এই এস্টেটটি কিনে নেন ও তাঁর স্ত্রী শার্লটকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন। ১৮৩৭ সালে যখন রাণী ভিক্টোরিয়ার অভিষেক হয় তখন সাময়িক ভাবে এই প্রাসাদের নামকরণ  করা হয় ‘রাণীর বাড়ি’। প্রতি সোম, বুধ, শুক্রবার এই প্রাসাদের সামনে সকাল সাড়ে এগারটায় গার্ড পরিবর্তন দেখার জন্য বহু পর্যটকের সমাগম ঘটে। কিন্তু সেদিন মঙ্গলবার, তাই দেখা হল না। আগে ২০১৫ সালে ইতালিতে ভ্যাটিকানের সামনে বিখ্যাত সুইস সেনার ‘চেঞ্জ অফ গার্ড’ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান দেখেছিলাম।
বাকিংহাম প্যালেসের সামনে দর্শনার্থীদের ভিড়

       বেশ খানিকটা সময় বাকিংহাম প্যালেসের সামনে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল চত্বরে কাটালাম। ১৮৩৭ থেকে ১৯০১ রাণী ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের এই সময়কালকে ইংল্যান্ডের স্বর্ণযুগ মনে করা হয়। তাঁর মৃত্যুর দশ বছর পর ১৯১১ সালে বিরাশি ফুট উঁচু সাদা মার্বেলের এই স্মৃতিস্তম্ভ প্রতিষ্ঠা করা হয়। বৃত্তাকার মনুমেন্টের অন্য দিকগুলোতে ন্যায়, সত্য ও দানশীলতার প্রতীক রূপে দেবদূতদের মূর্তি খোদাই করা আছে। মনুমেন্টটির চূড়ায় আছে জয়ের প্রতীক স্বরূপ সোনার গিল্টি করা ‘উইংড ভিকট্রি’ তাকে ঘিরে আছে সাহসিকতা ও দৃঢ়তার প্রতীক দুটি মূর্তি। মহারাণীর সময়কালে সমুদ্রপথে বাণিজ্যে আর ঔপনিবেশিক রাজত্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছিল সবচেয়ে বেশিনৌশক্তি ছিল দেশের প্রতিরক্ষার এক বিরাট সহায়। তাই সেই স্মৃতিতে আশপাশটা ভরিয়ে তুলেছে অসাধারণ কিছু মৎস্য-কন্যা ও সামুদ্রিক প্রাণীর মূর্তি। নৌশক্তির চিহ্ন ধরা আছে জাহাজের সম্মুখভাগের প্রতিরূপ খোদাই কাজে। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কেন্দ্রের এই স্তম্ভের আশপাশে কিছু ব্রোঞ্জের মূর্তি আছে, সেগুলো শান্তি, অগ্রগতি, কৃষি ও শিল্পের প্রতীক।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল

          ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখে আমরা যখন বেরিয়ে যাচ্ছি, তখন দেখি প্রাসাদের সামনে দিয়ে ঘোড়ার পিঠে চড়ে এক সুসজ্জিত শোভাযাত্রা আসছেরাজা রাণীর দেশে এসেছি বলে কথা! চট করে এমন শোভাযাত্রা দেখার সৌভাগ্য হয় না। ‘চেঞ্জ অফ গার্ড’ দেখা না হলেও শোভাযাত্রাটা মন ভরে দেখলাম। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো আর কি!
বাকিংহাম প্যালেসের সামনে শোভাযাত্রা

       প্রাসাদের বিশাল চত্বর থেকে বেরিয়ে বাসে চেপে কেনসিংটন প্যালেস। সপ্তদশ শতক থেকে ব্রিটিশ রাজপরিবারের আবাসস্থল। বিশাল কেনসিংটন বাগানের ভিতরে এই প্রাসাদ। বর্তমানে এর অনেকটা অংশই খুলে দেওয়া হয়েছে সাধারণ দর্শকদের জন্য। সাজানো বাগানে ছিল বিশাল বিশাল কাঠবিড়ালি, অত বড় কাঠবিড়ালি আগে কখনো দেখিনি। অর্পিতাদি ক্লান্ত হয়ে বাগানের চেয়ারে গা এলিয়ে দিল। বাগানের শোভা আর কাঠবিড়ালি দেখে মন ভরাবে সিদ্ধান্ত নিলোপ্রাসাদমুখো হল না। ইন্টারনেটে পড়েছিলাম এখানে টু ফর ওয়ানের সুযোগ আছে, কিন্তু ওদের ছাপা লিস্টে নেইসেই কথা বলাতে কিন্তু কাউন্টারের কর্মচারীরা ফোন করে জেনে আমাদের সুবিধাটা পাইয়ে দিল। এক একটা টিকিটের দাম সতেরো পাউন্ড, অর্থাৎ হোমওয়ার্ক করে যাওয়ার ফলটা আমরা হাতেনাতে পেয়েছিলাম। যদিও অর্পিতাদি বাইরেই রয়ে গেল প্রাসাদে বিভিন্ন সময়কার রাজা রাণীর ব্যবহার্য পোশাক, অস্ত্র, আসবাব, বর্ম ইত্যাদি রাখা আছে। বিশেষ করে রাণীদের ঘরগুলো দ্বিতীয় মেরী ও রাজাদের ঘরগুলো দ্বিতীয় জর্জের আমলের মত করে সাজানো নিচে প্রিন্সেস ডায়নার ঘরে জাপানি দর্শকদের এত ভিড় যে আমরা ঢোকার সুযোগই পেলাম না।
কিংস গ্যালারি, কেনসিংটন প্যালেস

       বাইরের হোটেলে লাঞ্চ সেরে ডবলডেকার বাসে করে কলকাতাসম জ্যাম ঠেলে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় দুপুর তিনটে। সামারে এই মিউজিয়াম সাড়ে পাঁচটায় বন্ধ। টিকিট লাগে না, কিন্তু সিকিউরিটি চেকিংয়ের বিশাল লাইন অত বড় মিউজিয়াম এত অল্প সময়ে দেখতে হলে কিছু ঘর বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় নেইআমরা আবার দুটো দলে ভাগ হয়ে নিজেদের পছন্দ মতো ঘরে ঘুরতে লাগলাম। এত কিছু দেখেছি সব মনেও নেই, লেখাও সম্ভব নয়। কয়েকটার কথাই বলি
রসেট্টা পাথর
ফারাও তৃতীয় আমেনহোটেপের মূর্তি

       
      প্রথমে গেলাম ইজিপ্ট ও ব্যাবিলন গ্যালারিতে। ঢুকেই চোখে পড়ল ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের বিরাট আবক্ষ মূর্তি। কাছেই ছিল সেই বিখ্যাত রসেট্টা পাথর। এর ওপর প্রাচীন গ্রিক ভাষা এবং প্রাচীন মিশরের দুটো ভাষাতে ১৯৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে একটা আদেশনামা খোদাই করা হয়েছিল --- মিশরের মেমফিসের পুরোহিতরা ফারাও পঞ্চম টলেমিকে দেবতা বলে ঘোষণা করেছিলেন। প্রাচীন গ্রিক লিপি পণ্ডিতরা পড়তে পারতেন, কিন্তু প্রাচীন মিশরীয় লিপি তাঁদের অজানা ছিলএই পাথরে যেহেতু একই আদেশনামা দুটো ভাষায় লেখা ছিল, তাই গ্রিক লিপির মাধ্যমে তাঁরা মিশরীয় চিত্রলিপিগুলি পড়তে শেখেন। মিশরের সর্বপ্রাচীন চিত্রলিপি বা হায়ারোগ্লিফের এইভাবে আজকের যুগে পাঠোদ্ধার হয় এবং তার থেকে অন্যান্য প্রাচীন লিপিগুলো পড়া সম্ভব হয়। রসেট্টা পাথরকে এজন্য প্রাচীন মিশর সভ্যতার চাবিকাঠি বলা হয়।
ফারাও দ্বিতীয় রামেসিসের মূর্তির সামনে লেখিকা

       চোখে পড়ল আসিরীয় সম্রাট দ্বিতীয় আসুরনাসিরপালের নিমরুদের প্রাসাদের ডানাওয়ালা সিংহের মূর্তি। এরা নাকি সম্রাটকে দৈত্যদানবের হাত থেকে বাঁচাত। ফারাও তৃতীয় আমেনহোটেপের দুটি মূর্তিই চোখ টেনে নেয়। এগিয়ে যেতে যেতে আমরা প্রাচীন গ্রিস ও রোমান সভ্যতায় ঢুকে পড়লাম। রয়েছে বিরাট একটা সমাধি মন্দিরখ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক সভ্যতার প্রাচীন এই নমুনাটাকে তুরস্কে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। সেখান থেকে পুনরুদ্ধার করে পুরোপুরি নতুন করে বসানো হয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে গ্রিক-রোমান সভ্যতার আরও অনেক মূর্তি ভারি সুন্দর যেমন রয়েছে হারকিউলিস, হার্মেস, বা প্রেমের গ্রিক দেবী আফ্রোদিতি --- যাঁর রোমান নাম ভেনাস আমাদের বেশি চেনা
খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকের গ্রিক সমাধি মন্দির
ভেনাস মূর্তি
     
      গ্রিক, রোমান, মিশর, আসিরীয়, ব্যাবিলন সভ্যতার কথা আমরা তো জানি। কিন্তু অবাক করে দেয় আফ্রিকা, আমেরিকা, জাপান, চীন, মেসোপটেমিয়া, ইজরায়েল তথা আরও নানান দেশের নিদর্শনগুলির সংগ্রহ মনে পড়ছে মধ্য-আমেরিকার আজটেক সভ্যতার দুমুখো সাপ। নিখুঁত ভাবে তৈরি হয়েছে কাঠ, পাইন রজন আর নীলকান্ত মণি দিয়ে। অনুমান করা হয় এটি পুনর্জন্মের প্রতীক।
মেরিন ক্রোনোমিটার

       অপেক্ষাকৃত আধুনিক যুগের নিদর্শনের মধ্যে দেখেছিলাম প্রথম যুগের মেরিন ক্রোনোমিটার। সমুদ্রপথে দ্রাঘিমা নির্ণয় করতে অমূল্য ভূমিকা নিয়েছিল এই ঘড়ি। জাহাজ চালনাতে যুগান্তর এনে তা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিস্তারের সহায়ক হয়ে উঠেছিল। দেখলাম অ্যস্ট্রোলেব যন্ত্র যার সাহায্যে প্রাচীনকালে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান নির্ণয় করা হত ইশতারের মূর্তি গিলগামেশের গল্পটা মনে করাল। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মহাকাব্যের নায়ক গিলগামেশকে বিয়ে করতে চেয়েছিল দেবী ইশতার। রাজি না হওয়ায় ইশতার তাকে নানাভাবে হত্যার চেষ্টা করে। কিন্তু গিলগামেশ সব চেষ্টাই ব্যর্থ করে দেয়। খ্রিস্ট জন্মের দুহাজার বছর আগে রচিত এই গিলগামেশের মহাকাব্যকেই পৃথিবীর প্রাচীনতম সাহিত্য ধরা হয়।
ইশতারের মূর্তি
ইস্টার আইল্যান্ডের মূর্তি

       দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে চিলির থেকে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে এক প্রত্যন্ত দ্বীপ ইস্টার আইল্যাণ্ড। এর দুহাজার কিলোমিটারের মধ্যে কোনো মানুষ বাস করে না। অথচ এই দ্বীপে আছে কয়েকশো বিরাট বিরাট মূর্তিব্যাসল্ট পাথরের এই  বিশালাকার মাথাগুলোর গড় উচ্চতা চার মিটার আর ওজন চোদ্দ টন। এগুলো যারা বানিয়েছিল সেই উপজাতি আজ পৃথিবী থেকে লুপ্ত। কেনই বা বানিয়েছিল, সেই রহস্যময় ইতিহাসটাও অজানা। মূর্তিগুলোর একটা ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রাখা। আফ্রিকার নাইজেরিয়া থেকে পাওয়া ষোড়শ শতকের অলঙ্কৃত কাঠের ফলক, জাপানের যোদ্ধা সামুরাইদের মূর্তি ও বর্ম, ভারতের দেবদেবী ও বুদ্ধের মূর্তি, মানুষ ও পশুর অসংখ্য মমি -- কত আর লিখব? একটা বিখ্যাত দ্রষ্টব্যের কথা বলেই ব্রিটিশ মিউজিয়াম থেকে বিদায় নেব। প্রাচীন একটা জাহাজ ষষ্ঠ শতাব্দীতে  ইংল্যান্ডের কাছে সমুদ্রে ডুবে গিয়েছিল১৯৩৭ সালে সেটি উদ্ধার করা হয়। এত বছর পরেও তার থেকে প্রায় অবিকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে বহু স্বর্ণালঙ্কার, রৌপ্য পাত্র, মূল্যবান শিরস্ত্রাণ ইত্যাদি।
ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে উদ্ধার হওয়া শিরস্ত্রাণ
       সন্ধেবেলায় ক্লান্ত হয়ে ফিরে এসে সবাই মিলে হাতে হাত লাগিয়ে গল্প করতে করতে রান্না সারলাম। পরেরদিন সকালে পূর্ব পরিকল্পনা মাফিক আমরা যাব শুভদার সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত শেক্সপিয়রের জন্মভিটেতে আমরা যেদিন লন্ডন রওনা দিয়েছিলাম তার পরের দিন আমাদের বহুদিনের বন্ধু টুনুদি তার ছেলে চিরঞ্জিত আর মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে নিজের ব্যবসার কাজে একসঙ্গে রথ দেখা ও কলা বেচা করতে লন্ডনে গিয়েছিল। টুনুদির কলকাতায় হারমোনিয়াম, গিটার এই সমস্ত বাজনার দোকানব্যাবসার কাজে দেশের অনেক জায়গায় যাতায়াত। কিন্তু এবার একেবারে লন্ডনেওরা ওখানে আতিথেয়তা পেয়েছিল হরজিৎ শাহ নামে একজন পাঞ্জাবি ভদ্রলোকের বাড়িতে, লন্ডনের উপকণ্ঠে হেইস এন্ড হার্লিংটনে তাঁরও ঐ একই ব্যবসা পৃথিবীব্যাপী, সেই সূত্রেই টুনুদির সঙ্গে আলাপ আমাদের পরিকল্পনা শুনে আমরা কলকাতা ছাড়ার আগেই ভদ্রলোক প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে টুনুদিরা, আমরা এবং ওনার পরিবারের সকলে মিলে একসঙ্গে শেক্সপিয়রের জন্মস্থানে যাওয়া যেতে পারেতার জন্য একটা পনেরো সিটারের গাড়ি উনি ব্যবস্থা করে রাখবেন। আমরা তো আহ্লাদে আটখানা। বিদেশে গিয়ে একশো ষাট কিলোমিটার দূরের অজানা জায়গায় সারাদিনের জন্য ঘোরার যাবতীয় ব্যবস্থা করা সহজ কথা নয়। উনি সমস্ত ব্যবস্থা করেছেন।  
       সেদিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে প্যাডিংটন স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে আমাদের যেতে হল হেইস এন্ড হার্লিংটন স্টেশনে। সেখান থেকে উনি গাড়ি করে ওনার বাড়ি নিয়ে গেলেন, যেখানে আগে থেকেই টুনুদিরা আছে। আমরা এগারো জনের একটা দল পিকনিক করার মেজাজে হৈ হৈ করতে করতে শহর ছেড়ে পাড়ি দিলাম লন্ডনের উত্তর-পশ্চিমের কোলাহল বিহীন, দূষণমুক্ত, প্রাকৃতিক মনোমুগ্ধকর শোভায় ভরা শেক্সপিয়রের দেশে।
এ্যানি হ্যাথওয়ের কুটিরের সামনে
       স্ট্রাটফোর্ড শহরের উপকণ্ঠে ছোট্ট নদী শটারির তীরে এ্যানি হ্যাথওয়ের কুঁড়েঘর। বন্ধূর ভূপ্রকৃতির অরণ্যঘেরা উপত্যকায় নিবিড় প্রশান্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শেক্সপিয়রের থেকে আট বছরের বড় ধনী কৃষকের মেয়ে এ্যানি হ্যাথওয়েকে তিনি বিয়ে করেন ১৫৮২ সালে। তাঁদের বিবাহিত জীবনে তিনটি সন্তান ছিল। জায়গাটা ঘুরে দেখার পর বাগানের মধ্যে গাড়িতে বসেই আমরা খাওয়া দাওয়া সারলাম। আমার খুব ইচ্ছে করছিল বাগানের লনে বসে গাছের ছাওয়ায় যদি পিকনিক করা যেত; কিন্তু আশপাশের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে ভেবে মনের ইচ্ছা মনেই রাখলাম। হরজিতের স্ত্রী আর বৌদি মিলে আমাদের খাবার-দাবার সকালে বাড়ির থেকে বানিয়েই এনেছিলেন
শেক্সপিয়রের বাড়ির সামনে

স্বপ্নপুরণঃ শেক্সপিয়ারের জন্মস্থানে শুভময় রায়

       পরের গন্তব্য অ্যাভন নদীর তীরে স্ট্রাটফোর্ড, ১৫৬৪ সালে যেখানে জন্মেছিলেন ইংরাজি তথা পৃথিবীর সর্বকালের দিকপাল সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়র। ঊনবিংশ শতকের গোড়ায় তাঁর বাড়িটি নষ্ট হতে চলেছিল ও বিক্রি হয়েই যাচ্ছিল। কিন্তু জাতীয় আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ১৮৬০ সালে বাড়িটি সঙ্গরক্ষণ করা সম্ভব হয়। তাতে চার্লস ডিকেন্সের ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি অন্যান্য সাহিত্যিকদের সঙ্গে নিয়ে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে অপেশাদার নাটক মঞ্চস্থ করে প্রায় তিন হাজার পাউণ্ড সংগ্রহ করেন ও বাড়িটা বাঁচাতে সফল হন এখনো ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডে উপকণ্ঠের একটা গ্রামের মত করে সাজানো আছে পুরো পরিবেশটা শেক্সপিয়রের ছেলেবেলা কেটেছিল যেখানে সেই কাঠের বাড়িটা এখন ঐতিহ্যমণ্ডিত মিউজিয়াম আমরা যার যার নিজের মতো করে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম।
শেক্সপিয়রের জন্মস্থানের ভিতরে

       ঘরগুলোর সমস্ত কিছু যেমন -- পালঙ্ক, বালিশ, কম্বল, জামাকাপড়, আসবাব পত্র সেই সময়ের মতো করে সাজানো আছে। এমনকি ফায়ার প্লেসের পাশে রাখা ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্টের খাবারদাবার আর পাত্র গুলো এমনভাবে রাখা, যেন মনে হবে এক্ষুণি কেউ খেতে বসবে। শেক্সপিয়রের বাবার চামড়ার ব্যবসা ছিল। তখনকার দিনে ঘরোয়া পদ্ধতিতে ভেড়া, কুকুর, ছাগল, হরিণের কাঁচা চামড়া ট্যান করা হত। তার যাবতীয় সরঞ্জাম আর ট্যান করা চামড়া দেওয়ালে টাঙানো আছে। নরম মোমবাতির আলো, অখণ্ড নিস্তব্ধতার মাঝে কাঠের মেঝেতে আমাদের পদশব্দ, প্রতিটি ঘরে সেই যুগের পোষাকে দাঁড়িয়ে থাকা ডেমন্সট্রেটরের ভারি গলায় প্রেক্ষাপট বর্ণনা সত্যিই সেদিন আমাদের ষোড়শ শতকের ইংল্যান্ডের নিরিবিলি শহরতলিতে নিয়ে গিয়েছিল। নীচে নেমে পেছনের বাগানে দেখি খোলা আকাশের নীচে সেজেগুজে অল্পবয়সী কিছু ছেলে মেয়ে শেক্সপিয়রের কোনো নাটকের অংশ মঞ্চস্থ করছে। তাদের ঘিরে উৎসাহী দর্শকের ভিড়। দর্শক যেমন ফরমায়েশ করছে তারা সঙ্গে সঙ্গে সেই নাটকের কোনো সংলাপ অভিনয় করে দেখাচ্ছেগৌতম অনুরোধ করল ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটক থেকে কোনো অংশ অভিনয় করতে। মুহূর্তের মধ্যে এক সুবেশিনী নাটক থেকে অ্যান্টনির বিখ্যাত সেই বক্তৃতা অসাধারণ অভিনয় করে দেখাল। মুগ্ধ হয়ে এরপর ‘রোমিও জুলিয়েট’ ফমায়েশ করে ফেললাম। তাতেও তৎক্ষণাৎ তাদের পারদর্শিতা অবাক করল। বুঝলাম প্রতিদিন তারা দিনের অনেকটা সময় দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য শেক্সপিয়রের নাটক অভিনয় করে। বাগানের এক কোণায় দেখি রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি। জানলাম ১৯৯৬ সালে সেটার আবরণ উন্মোচন করেছিলেন জ্যোতি বসু। দুজন মহাকবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার -- পৃথিবীর দুটি ভাষার দুই মহাসিন্ধুর যেন মিলন ঘটেছে। শেক্সপিয়রের লেখনী রবীন্দ্রনাথকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
স্ট্রাটফোর্ডের রাস্তায় গৌতম- চারদিকে শুধুই শেক্সপিয়র
শেক্সপিয়রের নতুন বাড়ির বাইরে, নানা মুহূর্তে
  
             কাছেই শেক্সপিয়রের নতুন বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এগারোজনের দল একজায়গায় জড়ো হলে, তবে তো সেখানে যাওয়া!  কিন্তু শুভদাকে তো আমরা কেউ বহুক্ষণ দেখতেই পাচ্ছি না। ভাবলাম আত্মস্থ হয়ে কোথাও শেক্সপিয়রের চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে আছে হয়তো। তারপর দেখি আমাদের আগেই গেটের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বুদ্ধির গোড়ায় বুঝি ধোঁওয়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়েছিল। ১৫৯৭ সালের মে মাসে পুরানো বাড়ির খুব কাছেই অনেকটা এলাকা নিয়ে নতুন বাড়িটি কিনেছিলেন শেক্সপিয়রসে বাড়ির বাগানটাও দেখার মতো করে সাজানো। নতুন বাড়িটাকেও মিউজিয়াম বানানো হয়েছে। বাইরের উঠোনে টাইলস বসানো হয়েছে কবির রচিত এক একটি সনেটের প্রথম পংক্তি খোদাই করে। বাগানের গাছগুলোকে ছাঁটা হয়েছে তাঁর নাটকের এক একটা চরিত্র কল্পনা করে। ভাবুন তো একবার! কি অসাধারণ চিন্তা! আমরা অনেকক্ষণ ঐ বাগানে সময় কাটিয়েছিলাম। শেক্সপিয়রের বড় মেয়ে সুসানার বাড়িও দেখলাম। সেখান থেকে খুব কাছেই আমি, গৌতম আর শুভদা গেলাম ঐতিহাসিক ট্রিনিটি চার্চে, যেখানে শেক্সপিয়রের সমাধি আছে। সেই পবিত্র চার্চের একটা অংশে শেক্সপিয়র, তাঁর স্ত্রী অ্যানা হ্যাথওয়ে, বড় মেয়ে সুসানা ও তাঁর স্বামী জন হলের সমাধি আছে। শেক্সপিয়রের মৃত্যুর পর তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তাঁর বড় মেয়ে সুসানা পেয়েছিল কোনো খোদাই লিপি বা কারুকার্য নেই শেক্সপিয়রের সমাধিতে। এত অনাড়ম্বর সমাধি দেখে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগছিল, এত বড় মানুষটার সমাধি এত সাদামাটা  হওয়ার কারণ কী?
মহাকবির নিরাড়ম্বর সমাধি

             বিকেলে চারপাশের প্রকৃতির নীরবতার মাঝে গাড়ি করে সবাই মিলে গল্প করতে করতে ফেরার পালা। ফিরলাম সেই হরজিতের বাসায়, যার আতিথেয়তায় টুনুদিরা ছিল। এই হরজিৎ শাহ ভদ্রলোকটির জীবন বেশ অন্যরকম। উনি পাঞ্জাবের কোনো একটি কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন খুব ভাল ভাবে।  কিন্তু ভবিষ্যৎ ইঞ্জিনিয়ার হবার জন্য নয়ওনাদের পরিবারের কাপড়ের ব্যবসা ছিলসেই সূত্রে উনি ইংল্যাণ্ডে আসেন। সেখানে ওনার বাবার ইংল্যন্ডবাসী এক বন্ধুর মেয়ে জ্যাসমিতকে বিয়ে করে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবসা শুরু করেন। ওনার  দোকানে একদিন গিল্ডহল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সঙ্গীতের প্রফেসর কোনো একটি বাদ্যযন্ত্র কিনতে আসেন। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বিষয়ে হরজিতের জ্ঞান আর আগ্রহ দেখে উনি হরজিৎকে উৎসাহিত করেন এতটাই যে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে পড়াশুনা ও পরবর্তীকালে ছয় বছর গবেষণায় লিপ্ত রাখে হরজিৎকে। ওনার গবেষণার বিষয় ছিল ভারতীয় ঘরানার বাদ্যযন্ত্রের ওপর আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবভারতের বাদ্যযন্ত্রের ঐতিহ্যশালী ভাবধারা অটুট রেখে তাতে পশ্চিমী দুনিয়ার প্রযুক্তির প্রয়োগ। পাশ্চাত্যের নানা আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মাঝে ভারতের বাদ্যযন্ত্রগুলো একসময়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছিল- ডিজাইনে, প্রযুক্তিতে, চাহিদায়। উপযুক্ত পারিশ্রমিকের অভাবে ভারতের অনেক পারদর্শী কারিগর তাদের এই ধুঁকতে থাকা বংশগত পেশা থেকে সরে যায় বা চরম দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটায়। এযুগের মেশিন দুনিয়াতেও ভারতের সুদক্ষ কারিগরদের খুঁজে বার করে তাঁদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে তাঁর গবেষণালব্ধ জ্ঞান প্রয়োগে আলোড়ন ফেলেছেন ভারতের চিরাচরিত তারের যন্ত্র সেতার, তানপুরা, সারেঙ্গী, গিটার, দিলরুবা, বীণায়। ভারতীয় ঘরানার প্রাচীনের সঙ্গে নতুন প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটিয়ে তৈরি করেছেন জটিল এবং সূক্ষ্ম হাতে তৈরি যন্ত্র। নানা ধরনের ঢোল, তবলা, হারমোনিয়ামও ওনার পরীক্ষামূলক প্রচেষ্টা বিশ্বে এখন একনম্বরে। এই কাজের জন্য তিনি দিনের পর দিন কাটিয়েছেন ভারতের নানান প্রান্তে। যোধপুর, উদয়পুর, বেনারসের অলিতে গলিতে যারা তবলা বানায়-- কতদিন কাটিয়েছেন তাদের ডেরায়, ঘুরেছেন তবলার প্রযুক্তিগত জ্ঞানলাভের জন্য। উলুবেড়িয়াতে প্রত্যন্ত এলাকায় দিনের পর দিন ঘুরেছেন সেতার, এসরাজ, তানপুরা ইত্যাদি তারের যন্ত্রের কারিগরদের বাড়িতে সুরের ঝংকারের ইতিকথা হাতে কলমে জানতে। হারমোনিয়ামের জন্য কখনো দিল্লী, সরস্বতী বীণা কোন সুরে বাজে তা রপ্ত করতে কখনো যেতে হয়েছে তাঞ্জাভুর। ভারতীয় হারমোনিয়ামের রীডে উন্নতমানের সুর লহরীর খোঁজে উনি পাড়ি দিয়েছেন ইতালি, চেক, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, অস্ট্রিয়াতে অগুন্তিবার।  আবার কখনো গুজরাটের পালিটানায় বা হাওড়ার উলুবেড়িয়াতে কাটিয়েছেন সেই সব মানুষের সঙ্গে, যারা হারমোনিয়ামের রিড বানাতে পটু যে বাদ্যযন্ত্রের জন্য যে ধরণের কাঠ লাগে তার খোঁজে উনি কখনো ছুটেছেন কানাডা তো কখনো অন্য কোনো দেশে। একটা থিসিস জমা দেবার জন্য কেউ সারা পৃথিবী জুড়ে ছুটোছুটি করে? কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওনার থিসিস জমা দেবার আগেই সেই প্রফেসর মারা যান। এবং ঐ বিষয়ে রিসার্চ করানোর মত উপযুক্ত গাইডের অভাব থাকায় পিএইচডি ডিগ্রীটা ওনার আজও হয়নি। তবে খাতায় কলমে ডিগ্রী না থাকলে কি হবে, ওনার হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র পৃথিবীর বহু দেশে ছড়িয়ে আছে। দিল্লিতে আছে ওনার নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি  বাদ্যযন্ত্রের কারখানা যেখানে ভারতের বিভিন্ন কোণ থেকে খুঁজে খুঁজে এনেছেন সুদক্ষ যন্ত্রীদের। বাদ্যযন্ত্রের দোকান ওনার শুধু ভারত বা ইংল্যান্ডেই নেই, আছে আরও অনেক দেশে। বিভিন্ন বাজনার সুর, তাল ছন্দ যেন গাঁথা আছে ওনার শরীরের তন্ত্রীতে, মজ্জায়, রক্তে আর মননের একাগ্রতায়, ভালবাসায়। ইংল্যান্ডের ওনার দোকান ‘জ্যাস মিউজিক্যালস’ এ কত শিল্পীদের আনাগোনা, কত শিল্পীমনের আদানপ্রদান, কত সুরবাহার। সে দোকান যেন এক সংগ্রহশালা। সেখানে একশ বছরের পুরানো লন্ডনের বার্লিং এণ্ড বার্লিং কোম্পানির প্যাডেল হারমোনিয়াম যেমন আছে তেমনি আছে ওনার হাতের তৈরি সর্বাধুনিক মানের হারমোনিয়ামও
             সেদিন সারাদিনের গাড়ি করে ঘোরা, খাওয়া সবই হল হরজিৎ-এর আতিথেয়তায়। আমাদের কিছুই করতে দিলেন না। এমনকি রাতের ডিনারও ওনার স্ত্রী জ্যাসমিত অসীম আন্তরিকতায় খাইয়ে তবে ছাড়লেন। ফেরার সময়ে বেশ রাত্রি হল। ভদ্রলোক আমাদের হেইস এণ্ড হার্লিংটন স্টেশনে গাড়ি করে নামিয়ে দিয়ে গেলেন। কিন্তু অত রাতে দেখি কাউন্টারে লোক নেই, অটোমেটিক মেশিনেও কেন জানি না কিছুতেই টিকিট কাটা গেল নাকী করি? ওখানকার ট্রেনগুলোতে টি টি ওঠে, তার কাছে টিকিট কেনা যায়ভাবলাম ট্রেনে উঠেই টিকিট কাটব। ট্রেনের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত ঘুরে এলো গৌতম। কোনো টিটি সেদিন রাতে চোখে পড়ল না। আমাদের বেশ চিন্তা হল, বিদেশে এসে কিনা শেষে বিনা টিকিটের জন্য ফাইন হবে? প্যাডিংটন স্টেশনে গুটি গুটি সবাই এগোচ্ছি, দেখি বেরোনোর সব গেটগুলোই খোলা। ট্রেনে টিটি ছিল না বলে সব গেট খুলে রেখেছে।
                                                   
প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, জুন ২০১৮

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

Monday, 11 June 2018

বিজ্ঞানীর বিবেক

আমার প্রথম দিকের লেখা। বিষয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পরমাণু বোমা সংক্রান্ত গবেষণা।  বেশ বড় বলে দুই কিস্তিতে প্রকাশিত হয়েছিল  'এখন পর্যাবরণ' পত্রিকার ডিসেম্বর ২০০৩ ও জানুয়ারি ২০০৪ সংখ্যায়। 
 

বিজ্ঞানীর বিবেক

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ভারতের দ্বিতীয় পরমাণু বোমা পরীক্ষার পর সারা দেশে বহু লোক এর পক্ষে বা বিপক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের যাঁরা পরিচালক তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ সাধারণভাবে সকলেরই পরিচিত। পরমাণু অস্ত্র বিষয়ে তাঁদের সমর্থন থাকাই স্বাভাবিক। দেশের বিজ্ঞানীদের এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি কী অনে তাকেরই অজানা। দেশের বিজ্ঞানচর্চার মূল কেন্দ্রগুলির মধ্যে যেগুলি সরাসরি সরকারের অধীন নয় তার প্রায় প্রত্যেকটিতে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে দেশব্যাপী যে সমর্থন ও উচ্ছ্বাসের জোয়ার দেখা গিয়েছিল তার তলায় চাপা পড়ে গিয়েছিল প্রতিবাদের কণ্ঠ। কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে যে বহু বিজ্ঞানী প্রতিবাদে যোগ দেননি অথবা সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন। পরমাণু বোমা প্রকল্পে অনেক বিজ্ঞানী কাজ করেছেন বা এখনও করছেন। এই পটভূমিতে দাঁড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম পরমাণু বোমা প্রকল্পের সূচনাপর্বে এবং অব্যবহিত পরে প্রকল্পে যুক্ত বিজ্ঞানীদের ভূমিকা আলোচনা হয়তো বর্তমানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে এই নিবন্ধ পরমাণু বোমা তৈরির বিজ্ঞান বিষয়ে নয়। বিজ্ঞানীরাও মানুষ, গবেষণাগারের বাইরে। তারা আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই । তাঁদের রুজিরোজগার, সংসার ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত। তাঁরাও ভুল করেন, আবার তা সংশোধনের চেষ্টা করেন। সেই মানুষগুলিকে নিয়েই এই প্রবন্ধ।

বিজ্ঞানের তত্ত্বগুলি বিমূর্ত ও নৈর্ব্যাক্তিক। সমাজের উপর তা নির্ভর করে না। কিন্তু গবেষণা ও বিজ্ঞানের প্রয়োগ একান্তভাবেই সমাজনির্ভর। গ্যালিলিওর সময়ে যেআধু নিক বিজ্ঞানের জন্ম তার উত্তরাধিকার নিহিত আছে বিজ্ঞানীর সত্যের প্রতি ভালবাসার মধ্যে, প্রকৃতিকে বোঝার প্রচেষ্টার মধ্যে। বিংশ শতাব্দিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত গবেষণাগারের বাইরে তাঁর কাজের প্রয়োগ নিয়ে তিনি ছিলেন উদাসীন। বিজ্ঞানের গজদন্ত-মিনারের মধ্যে আশ্রয় নিয়ে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকাই তাঁর কাছে ছিল শ্রেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যে সিদ্ধান্তের ভার আরোপিত হয়েছিল তা বহনের প্রস্তুতি তাঁর ছিল না। এ বিষয়ে বিখ্যাত পদার্থবিদ রিচার্ড ফেইনম্যানের একটি মন্তব্য স্মরণ করা যেতে পারে। সফল পরমাণু বোমা পরীক্ষার পর মানসিক অবস্থা বোঝাতে তিনি লিখেছেন, ‘... আমরা একটা ভাল উদ্দেশ্যে কাজ শুরু করেছিলাম। উদ্দেশ্য সাধনের জন্য পরিশ্রম করা আনন্দ ও উত্তেজনার বিষয় চিন্তা করা তখন একেবারে বন্ধ।' এই সমাজবিমুখীনতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন এক বিলাস যা গবেষকের পক্ষে আর উপভোগ করা সম্ভব নয়। অথচ চারশ বছরের বিজ্ঞানচর্চার উত্তরাধিকার অস্বীকার করাও তার পক্ষে সহজ নয়। এই দুয়ের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায় বিজ্ঞানীর বিবেক। পরমাণু বোমা প্রকল্পে যুক্ত বিজ্ঞানী জেমস্ ফ্রাঙ্ক Emergency Committee of the Atom Scien tists -এর সামনে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে বলেছিলেন 'আমাদের নৈর্ব্যক্তিকতাই রাজ নৈতিক বিবাদে কোনো পক্ষ নিতে বাধা দেয়, কারণ ন্যায় সেখানে কখনই একপক্ষীয় নয়। তাই আমরা সহজ পথ বাছি এবং আশ্রয় খুঁজি আমাদের গজদন্ত মিনারে। আমরা মনে করেছিলাম যে আমাদের গবেষণার ভালো বা খারাপ কোনো প্রয়োগই আমাদের দায়িত্ব নয়।' বিশ্ববিশ্রুত গবেষকের এই স্বীকারোত্তির প্রতিধ্বনি শোনা যায় সংশ্লিষ্ট আরও অনেকের কণ্ঠে।

পরমাণু বোমা সৃষ্টির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আলোচনা করতে হয় তার পট ভূমিকা। বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড পরমাণুর কেন্দ্রীণ বা নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে নিউক্লিয় বিজ্ঞানের জন্ম। নিউক্লিয়াসের মধ্যে যে অমিত শক্তি নিহিত আছে তা মুক্তির জন্য কয়েকজন বিজ্ঞানী কাজ করে চলেছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অটো হান, হান্স বেথে, এনরিকো ফার্মি, লিও জিলার্ড, লিজে মিটনার, আইরিন জোলিও কুরি প্রমুখ। ১৯৩০-এর দশকে ধীরে ধীরে তাঁদের গবেষণার তাৎপর্য পরিষ্কার হয়ে আসে গবেষক মহলে। পরীক্ষাগারের বাইরে তখন চলছে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন। ইউরোপের বিজ্ঞান গবেষণার পীঠস্থান ছিল জার্মানি। ১৯৩৩ সালে হিটলারের নেতৃত্বে নাৎসিরা ক্ষমতায় আসে। নাৎসি মতবাদের এক মূল স্তম্ভ ছিল অন্ধ ইহুদিবিদ্বেষ এবং পরমত অসহিষ্ণুতা। নাৎসিদের হাতে পরবর্তী বারো বছরে খুন হয় ষাট লক্ষ ইহুদি। বিশ্ববিদ্যালয় গুলিতে ইহুদি চিন্তাবিদ এবং যাঁরাই নাৎসি দর্শনের বিরোধী তাদের ওপর নেমে আসে অত্যাচার। শুধুমাত্র নাৎসি জার্মানি বা তার সহযোগী ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ইতালি নয়, ইউ রোপের বহু বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নাৎসি ছাত্ররা তাদের বিরোধীদের উপর আক্রমণ চালায়। ফলে অনেক বিজ্ঞানী দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। 'নতুন দুনিয়া" মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাঁদের সাদরে গ্রহণ করে। এঁদের মধ্যে আইনস্টাইনের নাম সকলেরই জানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনার পর জার্মানির অধিকৃত দেশগুলি থেকেও অনেক বিজ্ঞানী আমেরিকায় চলে যান। এই সময় থেকেই বিজ্ঞান গবেষণার শীর্ষস্থান আমেরিকার দখলে যায়। দেশত্যাগী বিজ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই পরমাণু বোমা তৈরিতে সাহায্য করেন। নাৎসিদের মতবাদের ভয়াবহতার প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে তাঁরা হিটলারের হাতে পরমাণু বোমার সম্ভাবনাতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিষয়ে দুশ্চিন্তা তাঁদের বাধ্য করে জার্মানির বিরোধী পক্ষকে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা দিতে। অনেকেই জানেন যে আইনস্টাইন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি এফ. ডি. রুজভেল্টকে পর মাণু গবেষণার গুরুত্ব বোঝাতে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠি লিখতে তাঁকে উৎসাহিত করেছিলেন লিও জিলার্ড, ইউজিন উইগনার এবং এডওয়ার্ড টেলার। এঁরা সবাই নাৎসি দের অত্যাচারে ইউরোপ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

প্রায় একই সঙ্গে গবেষণাক্ষেত্রে ঘটেছিল। আর একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন যার প্রভাব তখনই বোঝা যায় নি। বিজ্ঞান গবেষণা চিরকালই ছিল খরচসাপেক্ষ। বিজ্ঞানীরা এতদিন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অতি সামান্য অনুদান এবং ব্যক্তিগত সাহায্যের উপর নির্ভরশীল ছিলেন। ১৯৩০-এর দশক থেকেই রাষ্ট্র গবেষণাতে অর্থসাহায্য করতে শুরু করে যা বিজ্ঞানীরা সাদরে গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রের অনুদানের ক্ষমতা অনেক বেশি তাই নতুন ও উন্নতমানের যন্ত্রপাতিতে গবেষণাগারগুলি আধুনিক হয়ে ওঠে। কিন্তু অনেকেই ভুলে গিয়েছিলেন সেই ইংরাজি প্রবাদবাক্য 'He who pays the piper calls the tune'। গবেষণার দিকনির্দেশ অনেক সময়েই চলে যায় রাষ্ট্রশক্তির হাতে। রাষ্ট্র যখন গবেষণাকে মারণাস্ত্র তৈরির কাজে লাগায়, তখন অনেকের পক্ষে তাকে আর অস্বীকার করার কোনো পথ থাকে না।

আবার আগের কথায় ফিরে আসি। যদিও অধিকাংশ বিজ্ঞানী পরমাণু গবেষণার সামাজিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য বিষয়ে অচেতন ছিলেন কিছু ত্রিশের দশকের মধ্যভাগ থেকেই আস্তে আস্তে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৫ সালে লিও জিলার্ড বিজ্ঞানীদের কাছে আবেদন জানান স্বেচ্ছা প্রণোদিতভাবে গবেষণার ফল প্রকাশ বন্ধ রাখতে। কিন্তু তাঁর অনুরোধ সাধারণভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর আইনস্টাইনের চিঠি আগেই উল্লেখিত হয়েছে। আইনস্টাইন ও অন্যান্যদের উদ্বেগের মূল কারণ ছিল ১৯৩৮ সালের বার্লিনের কাইজার উইলহেল্‌ম ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের পরমাণু বিভাজনে সাফল্যলাভ। এরপরই বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানী ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ ঐ ইনস্টিটিউটের অধিকর্তা হন। মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে জার্মানিতে তখনও যে বিজ্ঞানীরা আছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র হাইজেনবার্গের পক্ষেই পরমাণু বোমা নির্মাণ সম্ভব। মিত্রপক্ষের বিজ্ঞানীরা এই সময় থেকেই দুটি কারণে জার্মানিতে তাঁদের সহকর্মীদের সঙ্গে যোগা যোগ বন্ধ করে দেন। প্রথমত নাৎসিরা জোর করে বা ভয় দেখিয়ে জার্মান বিজ্ঞানীদের থেকে কাজ আদায় করে নিতে পারে। দ্বিতীয় কারণ একটু জটিল। লেনার্ড ও স্টার্ক এই দুই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী নাৎসিদের পক্ষ সমর্থন করেছিলেন। মার্কিন মহলে তখন জার্মানির রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত যে কোন বিজ্ঞানীর ভূমিকা সন্দেহ জনক মনে হয়। ইহুদিদের উপর নাৎসিদের অত্যাচারের সময় চুপ করে থাকাও তখন এক ধরনের অপরাধ বলে তাঁরা মনে করেছিলেন। তাঁদের পক্ষে তখন জানা সম্ভব ছিল না হাইজেনবার্গ ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে দেশত্যাগ করতে মনস্থ করেছিলেন, কিন্তু অশীতিপর বিজ্ঞানী কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জনক ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক তাঁকে নিবৃত্ত করেন। প্ল্যাঙ্ক তাঁকে বোঝান যে, যাঁরা সরাসরি অত্যাচারিত নয় তাঁরা বিদেশে চাকরি নিলে যাঁদের অনেক বেশি প্রয়োজন তাঁরা বর্ণিত হবেন। ব্যক্তিগত মতামতও অনেক সময় গুরুত্ব পায়। এডওয়ার্ড টেলার জানতেন যে তাঁর প্রাক্তন বন্ধু কার্ল ফ্রেডরিক ভন ওয়াইজেকার নাৎসিদের মতবাদের সমর্থক। তাই তিনি যখন জার্মানির ইউরেনিয়াম প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত হন তখন টেলার মার্কিন সামরিক মহলকে পরমাণু বোমা তৈরির জন্যে চাপ দিতে শুরু করেন। এর মধ্যে যে ওয়াইজেকারের মনের আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে তা তাঁর অজানা ছিল। জার্মান বিজ্ঞানীদের ভূমিকা যথাস্থানে আলোচনা করব। যুদ্ধ শুরুর পর ব্রিটেনে রুডলফ ই পিয়ের্লস ও অটো রবার্ট ফ্রিশ সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করেন। তাঁরা দেখান যে পরমাণু বোমা একটি সম্ভবপর প্রকল্প। এরপর ব্রিটিশ সরকারের উদ্যোগে গবেষণা শুরু হয়।

জাপানের পার্ল হারবার আক্রমণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও পরমাণু বোমা গবেষণা শুরু হয়। রুজভেল্ট এ বিষয়ে সংগঠনের দায়িত্ব দেন মেজর জেনারেল লেসলি গ্রোভকে। প্রকল্পের নাম হয় ম্যানহাটান প্রকল্প। বিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহাইমার হলেন প্রকল্পের অধিকর্তা। নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে লস এলামসে মূল গবেষণাগার স্থাপিত হয়। এছাড়াও ওক রিজ ও শিকাগোতেও প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ব্রিটেনের পরমাণু প্রকল্পে কর্মরত বিজ্ঞানীরাও এখানে যোগ দেন। বস্তুতপক্ষে এই প্রকল্পে যে রকম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের সমাবেশ ঘটেছিল তা পৃথিবীর ইতিহাসে আগে বা পরে কখনও হয় নি। বহু বিজ্ঞানীর অনলস প্রচেষ্টাতে প্রথম পরমাণু বোমা পরীক্ষা হয় ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে। বোমা বিস্ফোরণের জ্যোতি ওপেনহাইমারের মনে এনে দেয় ভগবদ্গীতার বিশ্বরূপ দর্শন।

দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ্ যুগপদুত্থিতা ।

যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাদ্ভাস্তস্য মহাত্মনঃ ।।

( যদি যুগপৎ সহস্র সূর্য উত্থিত হয়, তা সেই পরমাত্মার জ্যোতির সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে)। কিন্তু এ তো ভগবানের বিশ্বরূপ নয় — এ নটরাজের কালরূপ-মৃত্যুর দ্যোতক। তাই আবার তিনি আশ্রয় খুঁজলেন গীতার মধ্যে।


কালেহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো লোকান্ সমাহর্তুমিহঃ প্রবৃত্তঃ।

ঋতহপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে যেহবস্থিতা প্রত্যনীকেষু যোধাঃ।।


( আমি লোকক্ষয়কারী কাল – বর্তমানে সংহারে প্রবৃত্ত। তুমি যুদ্ধ না করলেও বিপ ক্ষের যোদ্ধাগণ জীবিত থাকবেন না)। অর্থাৎ এই মারণ অস্ত্র তৈরিতে ওপেনহাইমার নিমিত্ত মাত্র।

ওপেনহাইমারের দর্শন সকলের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তার মূল কারণ ছিল জার্মানদের বোমা বানানোর অক্ষমতা সম্বন্ধে মিত্রপক্ষের বিজ্ঞানীরা এর আগেই নিশ্চিত ছিলেন। ব্রিটেনে বিজ্ঞানীরা জানতেন যে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপকরা তখনও নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন। এর সঙ্গে তুলনা করতে হবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেখানে গোটা দেশের প্রায় সমস্ত প্রথমশ্রেণীর পদার্থবিদরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অদৃশ্য থেকে হয়ে গেছেন এবং তাদের কারও সঙ্গে সেই মুহূর্তে যোগাযোগ করা অসাধ্য প্রায়। কী ঘটেছিল জার্মানির বোমা তৈরির প্রকল্পে?

বস্তুতপক্ষে জার্মানির পরমাণু অস্ত্র বানানোর প্রচেষ্টা সম্পর্কে আজও বিশেষজ্ঞরা একমত নন। তার একটা কারণ অবশ্যই। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাতে সর্বময় সন্দেহের বাতাবরণ। ফলে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগ প্রায় অদৃশ্য হয়ে পড়েছিল। ফ্রিজ হাউটারম্যান জার্মান ডাক বিভাগের হয়ে পরমাণু গবেষণা করতেন এবং প্রায় কোনো তথ্যই প্রকাশ করতেন না। Federation of American Scientists (এই সংস্থার কথা পরে আসবে)-এর মুখপত্রে সংস্থার সভাপতি জে.এফ. স্টোন ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছেন যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকাল থেকেই জার্মান বিজ্ঞানীরা পরমাণু বোমার সম্ভাবনাকে কমিয়ে দেখানোর জন্য এক নীরব সহমত গঠন করেন। তাঁরা হিটলারের হাতে এই অস্ত্র তুলে দিতে চান নি। তারা সরকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে মানবজাতির সেবা করেছিলেন। যুদ্ধোত্তর কালে হাইজেনবার্গ লিখেছেন তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির পরাজয়ের সঙ্গে সঙ্গে জার্মানিতে পদার্থবিদ্যার গবেষণার যাতে মৃত্যু না হয় তা নিশ্চিত করা। এজন্য তিনি তরুণ বিজ্ঞানীদের সৈন্যদল থেকে এনেছিলেন বোমা গবেষণার নাম করে তাঁদের প্রাণ রক্ষা করতে। ২০০০ সালে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে হাল বেথে এবং রবার্ট ইয়ুঙ্ক তাঁর গ্রন্থ 'Brighter Than a Thousand Suns'-এ এই মত সমর্থন করেন। ওয়াইজেকারের কথা আগেই বলেছি। অর্থাৎ জার্মান বিজ্ঞানীরা সচেতনভাবে বোমা বানানো থেকে বিরত ছিলেন। হাইজেনবার্গের একদা সহকর্মী রুডলফ পিয়ের্লসের মতে হাইজেনবার্গ ও অন্যান্য জার্মান বিজ্ঞানীরা পরমাণু বোমা বানানোর প্রযুক্তিগত বাধাগুলিকে অনেক বড়ো ভেবেছিলেন। তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন যে বোমা বানানো সম্ভব নয়, সুতরাং কোনো নৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের সম্মুখীন তাঁদের হতে হয় নি।

এটা নিশ্চিত যে হাইজেনবার্গ মিত্রপক্ষের বিজ্ঞানীদের কাছে সঙ্কেত পাঠাতে চেয়ে ছিলেন। জার্মানি ডেনমার্ক অধিকারের পর হাইজেনবার্গ তাঁর শিক্ষক স্থানীয় প্রবাদপ্রতিম ডেনিশ পদার্থবিদ নিলস বোর-এর সঙ্গে দেখা করেন। বোরের মৃত্যুর পর পাওয়া হাইজেনবার্গকে লেখা ডাকে না দেওয়া এক চিঠি থেকে জানা যায় যে হাইজেনবার্গ তাকে পরমাণু বোমার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। তা মিত্রপক্ষকে সতর্ক করার জন্য না কি মৌন সম্মতির মাধ্যমে উভয়পক্ষকেই গবেষণা থেকে বিরত হওয়ার অনুরোধ করতে অথবা ভয় দেখিয়ে বা জোর করে বোরকে জার্মান পক্ষে আনার জন্যে- - তা আজ আর জানার কোনো উপায় নেই। হাইজেনবার্গের সমালোচকরা তৃতীয় বিকল্পটিকে বেছে নিয়েছেন। তবে ইহুদি বিজ্ঞানীদের হিটলারের কবল থেকে উদ্ধার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর কাজে বোরের সক্রিয়তার কথা হাইজেনবার্গের অজানা থাকার কথা নয় তাই সেটি সম্ভবপর বলে মনে হয় না। যুদ্ধোত্তর কালে জার্মান পরমাণু বিজ্ঞানীরা একবাক্যে বলেছেন যে তাদের লক্ষ্য ছিল রিঅ্যাক্টর তৈরি, বোমা নয়। যদি একথা মেনে নেওয়া হয় যে প্রযুক্তিগত বাধাগুলিকে অনেক বড়ো মনে করার জন্যই তাঁরা বোমা বানানোর পথে যান নি - সেক্ষেত্রে অবচেতন মনে বোমা সম্পর্কে বিতৃষ্ণার থেকে প্রকৃত গবেষণাতে অনীহার কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যাই হোক না কেন - ইতিহাসের পরিহাসে টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা ফ্যাসিবাদী শক্তির হাতে ভয় করতম অস্ত্র তুলে দেন নি অথচ গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা সেই অস্ত্রই তুলে দেন রাষ্ট্রের হাতে। রাষ্ট্রশক্তির সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের জ্ঞান কতটা সীমিত ছিল তা বোঝার জন্য একটি ঘটনার উল্লেখই যথেষ্ট। জার্মানির ইউরেনিয়াম প্রকল্পের অগ্রগতি বোঝার জন্য মার্কিন সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে বিজ্ঞানী স্যামুয়েল গোডস্মিটের নেতৃত্বে এক অনুসন্ধানকারী দল পাঠানো হয়। অনুসন্ধানের ফলে জার্মান পরমাণু বোমার অস্তিত্ব নেই বুঝতে পেরে গোডস্মিট সহযোগী এক মেজরকে বলেন যে মার্কিন পক্ষের আর পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না। মেজর উত্তর দেন যে অস্ত্র যদি আমেরিকানদের হাতে থাকে তারা তা ব্যবহার করবেই। ইতিহাস প্রমাণ করে দিয়েছে বিজ্ঞানীর সমাজ বিষয়ে অনভিজ্ঞতা।


বিপক্ষের হাতে পরমাণু বোমা নেই তা বোঝার পর কী করেছিলেন বিজ্ঞানীরা? পূর্বোল্লিখিত প্রবন্ধে জে. এফ. স্টোন লিখেছেন ১৯৪৩ সালের গ্রীষ্মকালেই বোঝা গিয়েছিল জার্মানরা বোমা বানাতে পারবে না। কিন্তু ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা তা জানা সত্ত্বেও মানহাটান প্রকল্পে কর্মরত বিজ্ঞানীদের জানানোর সক্রিয় প্রচেষ্টা করেন নি এবং যখন তাঁরা তা করলেন তখন তাঁদের মত রাজ নৈতিক মহলে গ্রাহ্য হয় নি। যদিও সমস্ত বিজ্ঞানী যে একরকম পথ নিয়েছেন তা নয়। জার্মানির পরমাণু বোমা নেই জানার পর জোসেফ রটব্ল্যাট মানহাটান প্রকল্প থেকে পদত্যাগ করেন। ১৯৪৪-এর শেষভাগ থেকেই অনেক বিজ্ঞানী বোমা প্রয়োগের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করতে থাকেন। বিজ্ঞানী নিলস্ বোর যিনি ইতিমধ্যে আমেরিকা পালিয়ে এসে মানহাটান প্রকল্পে সহায়তা করেছেন তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সঙ্গে দেখা করে পরমাণু অস্ত্রের আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলেন। তাঁর প্রস্তাব কোনো গুরুত্ব পায় নি।

এরপরই রুজভেল্টের মৃত্যু হয় এবং তীব্র কমিউনিস্ট বিরোধী ট্রুম্যান রাষ্ট্রপতির ভার গ্রহণ করেন। জেমস্ ফ্র্যাঙ্ক, লিও জিলার্ড এবং ইউজিন রাবিনোভিচের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী একটি রিপোর্ট তৈরি করেন এবং ১৯৪৫ সালের জুন মাসে তদানীন্তন মার্কিন সমর-সচিব হেনরি স্টিমসনের কাছে পেশ করেন। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের ফলে তাঁদের নিজেদের উপর যে অপরিসীম নৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ পড়েছিল এই রিপোর্ট হল তাঁদেরই পক্ষ থেকে এবিষয়ে প্রকাশিত প্রথম যৌথ প্রয়াস। এতে পরমাণু শক্তির উপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয় এবং পরবর্তীকালে মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতা সম্বন্ধে নিখুঁত ভবিষ্যদ্বাণী করা হয় ৷

শিকাগোতে জিলার্ড বিশেষ সক্রিয় ছিলেন। ৩ জুলাই তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতির কাছে এক আবেদনে নৈতিক কারণে পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগে বিরত থাকতে বলেন। একই সঙ্গে এই আবেদন পত্রটি তিনি সহকর্মীদের মধ্যে স্বাক্ষরের জন্য পাঠান। সহকর্মীদের উদ্দেশ্যে এক চিঠিতে তিনি লেখেন যে সাধারণ জার্মানরা নাৎসিদের অনৈতিক কার্যকলাপের বিরোধিতা না করার জন্য সমালোচনার পাত্র। মানহাটান প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা এক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাস করেও যদি পরমাণু বোমার বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকেন তবে তাঁদের কোনো অজুহাতই থাকবে না। ওক রিজের বিজ্ঞানীরা রাষ্ট্রপতির কাছে দুটি পৃথক আবেদন পাঠান। প্রথমটিতে আঠার জন ও দ্বিতীয়টিতে সাতযট্টি জন স্বাক্ষর করেন। তাঁরা আবেদন জানান যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগের আগে যেন এই নতুন অস্ত্রের ক্ষমতা শত্রুপক্ষকে জানানো ও দেখানো হয়। তাঁরা মনে করেন যে এই পথ ভবিষ্যতে যুদ্ধ বন্ধ করতে ফলপ্রসূ হবে। ১৭ জুলাই রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে জিলার্ড আরও একটি আবেদন পাঠান। শিকাগোতে কর্মরত ঊনসত্তর জন বিজ্ঞানী এতে স্বাক্ষর করেন। তাঁরা জাপানের বিরুদ্ধে প্রয়োগের আগে আলোচনা ও অস্ত্রের শক্তি প্রদর্শনের অনুরোধ করেন। তাঁরা পরমাণু অস্ত্র প্রয়োগের পর এমন এক পরিস্থিতির ভবিষ্যদ্বাবাণী করেন যেখানে বিবদমান দুপক্ষের নগরগুলি সর্বদা ধ্বংসের আশঙ্কায় থাকবে।

এই আবেদন নিবেদনে কোনো ফল হল না। কারণ ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি তখন তাদের শত্রু পরিবর্তন করে ফেলেছে। জার্মানি বা জাপান নয়, যুদ্ধোত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নই তখন নতুন প্রতিপক্ষ। প্রকৃতপক্ষে মার্কিন সামরিক মহল এই আবেদন প্রথমে রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছতে বাধা দিয়েছে এবং এমন সময়ে পৌঁছে দিয়েছে যখন সমস্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়ে গেছে। শেষ যে আবেদন পত্রটির কথা পূর্ব অনুচ্ছেদে বলেছি সেটি যখন প্রকাশ পায় তখন দেখা গেছে আবেদনকারীদের অনেকের স্বাক্ষরের নামের পাশেই তাঁদের প্রকল্প থেকে কর্মবিচ্যুতির তারিখ লেখা রয়েছে। অনুমান করা অসঙ্গত নয় আবেদন কারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবেই তাঁদের বরখাস্ত করা হয়। এর সঙ্গে মনে রাখতে হবে ততদিনে দুশ কোটি ডলার খরচ হয়ে গেছে বোমা তৈরিতে। কাজেই সামরিক কর্তৃপক্ষের উপরও যুদ্ধে তা কত কার্যকরী তা দেখানোর চাপ ছিল।

প্রশ্ন উঠতে পারে এমন পরিস্থিতিতেও কেন বিজ্ঞানীরা বোমা বানানোর কাজ করেছিলেন। জোসেফ রটব্ল্যাটের মতে এটা হল যা চলছে তাকে চলতে দেওয়ার মনোবৃত্তি। লস এলামসে কর্মরত বৈজ্ঞানিকদের মানসিকতার প্রতিভূ হিসাবে রুডলফ্ পিয়ে লসের মতামত দেখা যাক।

পিয়ের্লসের মতো বিজ্ঞানীরা আশা করে ছিলেন যে পরমাণু অস্ত্র মিত্রপক্ষকে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে। কিন্তু ইঙ্গ-মার্কিন সরকার একমাত্র খুব বিশেষ ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার করবেন। কোনো নগরের উপর, কোনো বিপদসঙ্কেত ছাড়াই এটা প্রয়োগ হবে তা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেন নি। পিয়ের্লস লিখেছেন কোনো জনবিরল জায়গায় প্রয়োগ করে বোমার কার্য ক্ষমতা দেখানোই যেত, আর নাগাসাকিতে বোমা ফেলার কোনো কারণই ছিল না। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, অপর এক বিজ্ঞানী ব্রায়ান ফিল্ড লিখেছেন যে হিরোসিমাতে বোমা ফেলার পর তিনি উল্লাস ই করলেও দ্বিতীয় বোমা ফেলার সংবাদে বিরক্ত হয়ে পড়েন। অস্ত্রপ্রয়োগের আগে বিবেচনার জন্য বিজ্ঞানীরা ভরসা করেছিলেন নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানীদের উপর যাঁরা সামরিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবেন। ওপেনহাইমার, ফার্মি ছাড়াও এই নেতৃস্থানীয় বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে ছিলেন আর্নেস্টো লরেন্স এবং আর্থার কম্পটন। কিন্তু সে আশা তাঁদের পূরণ হয় নি। উপরোক্ত চারজনকে নিয়ে গঠিত কমিটি নৈতিক প্রশ্ন এবং বিজ্ঞানীদের প্রতিবাদ বিষয়ে আলোচনাই করেন নি। তাঁরা সুপারিশ করেন যে জাপান যুদ্ধে আমেরিকানদের জীবন বাঁচানো তাঁদের দায়িত্ব এবং সরাসরি সামরিক ক্ষেত্রে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করা ছাড়া তা সম্ভব নয়। এঁরা চারজনই বিজ্ঞানী হিসেবে সমস্ত সহকর্মীর শ্রদ্ধার পাত্র এবং মানবিক দিক থেকেও সংবেদনশীল। কিন্তু প্রয়োজনের সময় তাঁরা তাঁদের কর্তব্যপালনে ব্যর্থ হলেন।

টুম্যান তাঁর ডায়েরিতে বলেছেন যে তিনি সম্পূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুর উপর বোমা ফেলতে নির্দেশ দেন যাতে মহিলা ও শিশুদের প্রাণহানি না ঘটে। প্রকৃত সামরিক দলিলে এই চিন্তাভাবনার কোন নজির নেই। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রথমে চারটি শহরকে বাছা হয়েছিল যেগুলির কোনোটিরই বিশেষ সামরিক গুরুত্ব ছিল না। ইঙ্গ-মার্কিন রাজ নৈতিক ও সামরিক মহল যুদ্ধের পর বলেন যে পরমাণু বোমাতে যত লোক মারা গেছে, জাপান আক্রমণ ও অধিকার করতে গেলে জাপানিদেরই প্রাণহানি হত তার চেয়ে বেশি। অনেক বিজ্ঞানীও তাই মনে করতেন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না যে জাপান তখন আত্মসমর্পনের জন্য প্রস্তুত এবং ইঙ্গ-মার্কিন নেতৃত্ব তা জানতেন। এখানে একটা কথা মনে রাখতে হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এমন একটা মানসিক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। যে অসামরিক লক্ষ্যবস্তুর উপর আক্রমণ স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে পড়েছিল। ফলে শহরের উপর বোমা নিক্ষেপের বিষয়ে নৈতিক আপত্তি ওঠে নি। কিন্তু যে অস্ত্রে কার্যত নিজেদের কোনো ঝুঁকি ছাড়াই শত্রুদেশের একটি বিরাট শহরকে এক মুহূর্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা যায় তাকে অন্য অস্ত্রের থেকে পৃথকভাবে দেখা প্রয়োজন।

হিরোসিমা ও নাগাসাকিতে বোমা বিস্ফোরণে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল তা অনেকেরই জানা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় দুই লক্ষাধিক ব্যক্তি। দীর্ঘকাল যন্ত্রণা ভোগের পর মৃত্যুর সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি। বোমার ভয়াবহতা তার নির্মাতাদের অধিকাংশকেই বিষণ্ণ করে তোলে। রাজ নীতিবিদরা যখন বোমার গুণগানে ব্যস্ত তখনই উইলি হিগিনবোথামের নেতৃত্বে Association of Atom Scientists গঠিত হয় জনগণকে এর ভয়াবহতা সম্বন্ধে সচেতন করার জন্য। ১১ অগস্ট নাগাসা কিতে বোমা পড়ার দুদিন পরই, নিলস বোর লন্ডনের 'দি টাইমস' পত্রিকায় লেখেন যে সভ্যতা এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর পূর্ণ অধিকার এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধান ছাড়া পরমাণু অস্ত্রের উপর কোনো নিয়ন্ত্রণই ফলপ্রসূ হওয়া সম্ভব নয়। তিনি পরবর্তীকালে এই প্রস্তাব রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাছে এক খোলা চিঠির মাধ্যমেও দিয়েছিলেন। পরমাণু গবেষণা সামরিক নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য মার্কিন সেনেটে একটি বিল আসে। নবগঠিত Federation of Atom Scientists (পরে যার নাম হয় Federation of American Scientists বা FAS)-এর চেষ্টাতে এই বিল পাস হতে পারে নি। FAS প্রথম থেকেই পরমাণু অস্ত্রের উপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের দাবি রাখে। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন পরমাণু বোমা পরীক্ষার তীব্র সমালোচনা করে FAST বিজ্ঞানীদের অনেকেরই মনে হয় যে সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তাধারা পরিস্থি তির মোকাবিলায় অক্ষম। আইনস্টাইন বলেছিলেন যে প্রথম পরমাণু বোমা কেবল হিরোসিমা শহর নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত প্রাচীন রাজনৈতিক মতাদর্শকেও ধ্বংস করেছে। তিনি এক আন্তর্জাতিক সরকারের কথা বলেন রাষ্ট্রসমূহ যার নিয়ম মানতে বাধ্য থাকবে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে তিনি কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের কথা বলেন নি। আইনস্টাইন ও জিলার্ডের চেষ্টায় তৈরি হয় Emergency Committee of Atom Scientists। প্রথম সভাপতি হন আইনস্টাইন।

সোভিয়েত ইউনিয়নও এরপর পরমাণু অস্ত্র বিস্ফোরণ ঘটায়। এর পরই ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ট্রুম্যান হাইড্রোজেন বোমা তৈরির সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। মার্কিন জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়। আইনস্টাইন,জিলার্ড, কম্পটন, বেথে, ফার্সি ও রাবি প্রকাশ্যে বিরোধিতা করেন। গণিতবিদ নর্মান উইনার লেখেন যে বিজ্ঞানীর এই গবেষণা তাদের হাতেই ক্ষমতা তুলে দেয় যাদের সে বিশ্বাস করে না। থিওডোর হাউস্কা লেখেন যে বিজ্ঞানীদের খ্যাতি হয়েছে মৃত্যুর দৌতা করার জন্য।

একথা ভাবলে ভুল হবে যে সমস্ত বিজ্ঞানী বিরোধিতার দলে যোগ দিয়েছিলেন। এডওয়ার্ড টেলার বা জন ভন নয়ম্যানের মতো বিজ্ঞানীদের উৎসাহেই হাইড্রোজেন বোমা তৈরির কাজ শুরু হয়। টেলার যে মতে বিশ্বাস করতেন তা পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্রের কর্ণধারদের মুখে আজও শোনা যায় -- শান্তির জন্য অস্ত্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভন নয়ম্যানের তীব্র কম্যুনিস্ট বিদ্বেষ। অপর এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিজ্ঞানীদের উপর চাপ। আগেই বলেছি, রাষ্ট্রশক্তি পিছনের দরজা দিয়ে গবেষণার উপর নিয়ন্ত্রণ চালু করেছিল। এসময় মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সর্ববৃহৎ সাহায্যকারী ছিল সামরিক কর্তৃপক্ষ। জীবিকার প্রয়োজনে অনেক বিজ্ঞানীকেই সামরিক কাজে সহায়তা করতে হয় । জেনারেল গ্রোভস এটা আগেই অনুমান করেছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে অধিকাংশ বিজ্ঞানী যারা পরমাণু বোমা বানানোর বিরোধিতা করছেন তাঁরা আবার ফিরে আসবেন। অনেকক্ষেত্রেই তা ঘটেছিল। এমন কি হান্স বেথের মতো বিজ্ঞানীও হাইড্রোজেন বোমা বানানোর কাজে যোগ দিয়েছিলেন যদিও তিনি নিজে বলেছেন যে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন হাইড্রোজেন বোমা বানানো অসম্ভব। ব্রিটেনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির বিরোধিতা করার জন্য Atomic Scientists' Association গঠিত হয় ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে। অথচ ব্রিটেন যখন পরমাণু বোমা বানানো শুরু করে তখন সংগঠনের কর্তাব্যক্তিরাই তাকে সমর্থন করেন। অবশেষে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে সংগঠন বন্ধই হয়ে যায়। টেলারের কার্যকলাপ বিশেষভাবে নিন্দার্হ। জে.এফ.স্টোন লিখেছেন মানবজাতি যে ভয়ঙ্কর বিপদের সম্মুখীন তাতে বিজ্ঞানী হিসেবে সবচেয়ে বেশি দায় টেলারের। মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতাতে টেলারের দায়িত্ব অপরিসীম। পরমাণু বোমা যেমন গবেষণা থেকে স্বাভাবিক ভাবে উঠে এসেছিল হাইড্রোজেন বোমা কিন্তু তা নয়। হাইড্রোজেন বোমা তৈরির সেই মুহূর্তে কোনো কারণ ছিল না। টেলার যদি রাজনৈতিক ও সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হাইড্রোজেন বোমার বিষয়ে ব্যাখ্যা না করতেন, তাহলে হয়ত তা বানানো পেছিয়ে যেত। পরবর্তীকালেও রোনাল্ড রেগানের ব্যর্থ ‘তারকা যুদ্ধ' বা Star Wars-এর উৎসাহদাতা হিসেবে টেলারের বিশেষ ভূমিকা ছিল। বিজ্ঞান জগতের এক দুর্বলতা হল যে সর্বব্যাপী ভীতির সময় কোনো রাজনীতি মনস্ক ও দৃঢ়চেতা বিজ্ঞানী যদি তাঁর সহকর্মীদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে রাজি থাকেন তবে তিনি মানবতা বিরোধী কাজেও বিজ্ঞানকে নিয়োজিত করতে পারেন।

বিজ্ঞানীদের প্রতিবাদ প্রতিরোধ কিন্তু শেষ হয়ে যায় নি। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ও আইনস্টাইন বিভিন্ন দেশের সরকার ও জনগণের কাছে এক যৌথ বিবৃতিতে বিরোধ বিদীর্ণ বিশ্বে হাইড্রোজেন বোমার বিভীষিকা সম্পর্কে সচেতন হতে আহ্বান জানান। বিজ্ঞানীদের কাছে তাঁদের আবেদন ছিল এই বিপদ হ্রাসের জন্য পদক্ষেপের। এটি আইনস্টাইনের শেষ বিবৃতি, স্বাক্ষরদানের দুদিন পরেই তাঁর মৃত্যু হয়। অন্যান্য স্বাক্ষরদাতারা ছিলেন ম্যাক্স বর্ন, পার্সি ব্রিজম্যান, লিওপোল্ড ইনফেল্ড, ফ্রেডরিক জোলিও কুরি, হেরম্যান মুলার, লিনাস পাউলিং, সিসিল পাওয়েল, হিদেকি ইউকাওয়া এবং জোসেফ রটব্ল্যাট। রাসেলের চেষ্টায় ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে লন্ডনে বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলন হয় । এখানে পরমাণু অস্ত্রের ধ্বংস ক্ষমতা, অসামরিক পারমাণবিক গবেষণার ঝুঁকি, নিরস্ত্রীকরণের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা ও বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব বিষয়ে আলোচনা হয়।

১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে কানাডার নোভা স্কটিয়াতে হয় প্রথম পাগওয়াশ সম্মেলন। যুদ্ধ ও শান্তিতে পরমাণু শক্তির বিপদ, পরমাণু শক্তির উপর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের সমস্যা ও আন্তর্জাতিক স্তরে বিজ্ঞানীদের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন সহ ১০টি দেশের ২২ জন বিজ্ঞানী মিলিত হন। এর থেকেই সূচনা হয় এক স্থায়ী সংগঠনের The Pugwash Conferences on Science and World Affairs। দীর্ঘদিন পরে এই সংস্থা ও এর কর্ণধার জোসেফ রটব্ল্যাট যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান।

এই নিবন্ধে দেখানোর চেষ্টা করেছি অধিকাংশ বিজ্ঞানী কিভাবে পরবর্তীকালে পরমাণু অস্ত্রের বিরোধিতা করেছেন। প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করা সকলের পক্ষে সম্ভব হয় নি - তাই অনেকের প্রতিবাদ প্রকাশ্যে আসে নি। আবার রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে এসে ক্ষমতার স্বাদও অনেককে প্রলুব্ধ করেছিল অস্ত্র তৈরিতে সহায়তা করতে। বোমা বিস্ফোরণের পর বিজ্ঞানীদের সামাজিক সম্মান অনেক বেড়ে যায়। এমন অনেক বিষয়ে তাঁদের মতামত চাওয়া হয় যা তাঁদের জ্ঞানের বাইরে। যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন বিশেষজ্ঞের মত চেয়েছিল পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে। এর ফলে বিজ্ঞানীদের উপর চাপ বেড়ে যায়। পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে বিজ্ঞানীদের ভূমিকার নিন্দা করার আগে একটা কথা যেন আমরা বিস্মৃত না হই। বিজ্ঞানীরা এই বাড়তি সম্মানকে তাঁদের প্রাপ্য বলে মেনে নিয়ে চুপ করে যেতে পারতেন। তা না করে তাঁরা রাজনৈতিক ও সামরিক মহলের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে দেশব্যাপী জনমতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সমাজকে সচেতন করতে চেয়েছেন সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে। রাজনীতিবিদদের উপর তাঁদের আস্থা আমাদের কাছে বোকামি মনে হতে পারে। এ বিষয়ে রুডলফ পিয়ের্লসের একটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করব, ‘Perhaps the Scientist who is used to rational arguments makes the mistake of expecting politicians to act ra tionally'


প্রকাশঃ এখন পর্যাবরণ, ডিসেম্বর ২০০৩ ও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০০৪