Thursday, 1 August 2024

অন্য এক গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

অন্য এক গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায় 


 


প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের নাম আমরা সকলেই জানি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো রকম প্রথাগত ডিগ্রি ছাড়াই তিনি পর্যবেক্ষণ ও অনুসন্ধিৎসাকে সম্বল করে বিজ্ঞান জগতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে গেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডিএসসি উপাধি দিয়েছিল। বিজ্ঞান লেখক ও বিজ্ঞান পত্রিকার সম্পাদক হিসাবে তাঁর পরিচিতিও কম নয়। দীর্ঘদিন জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকার সম্পাদনার ভার তিনি সামলেছেন। এক সময় বিজ্ঞানের লেখা বিশেষ আসত না, ফলে স্বনামে ও বেনামে বহু লেখা তাঁকে লিখতে হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা আটশোরও বেশি, এখনো পর্যন্ত তাঁর সব লেখার সন্ধান পাওয়া যায় নি। যুগান্তর পত্রিকার ছোটদের পাততাড়ি বিভাগেও তিনি 'বিজ্ঞানী' ছদ্মনামে বহু লেখা লিখেছেন। বাংলার কীটপতঙ্গ বইটির জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন। তবে এই ছোট্ট লেখাতে আমরা বিজ্ঞান বা বিজ্ঞান সাহিত্য নয়, গোপালচন্দ্রের জীবনের অন্য দুএকদিক নিয়ে আলোচনা করব।

প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে যথার্থ বিজ্ঞানসচেতনতার উল্টোদিক হল সমাজসচেতনতা। গোপালচন্দ্র জন্মসূত্রে ছিলেন ব্রাহ্মণ; তাঁদের পারিবারিক বৃত্তি ছিল পুরোহিতগিরি। খুব ছোটবেলাতে বাবা মারা যাওয়ার পরে দরিদ্র পরিবারকে সাহায্য করার জন্য স্কুলে পড়ার সময়েই তাঁকে সেই কাজ অবলম্বন করতে হয়েছিল। সেই যুগে সমাজে ব্রাহ্মণদের প্রতিপত্তি ছিল প্রবল। তাঁর নিজের গ্রামেও তার অন্যথা ছিল না। গোপালচন্দ্র কিন্তু মন থেকে এই ব্যবস্থাকে মেনে নিতে পারেননি। তাই সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্ণের পুরুষ ও নারীদের লেখাপড়া ও হাতেকলমে কাজ শেখানোর জন্য 'কমল কুটির' নামের একটি সংগঠন তৈরি করেছিলেন। গরিব নমঃশূদ্রদের নিয়ে নিয়মিত আলোচনায় বসতেন তিনি, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার সাহস তাঁদের দিতেন। গ্রামের জমিদারবাড়ির পুজোতে তাঁদের প্রবেশাধিকার ছিল না, কিন্তু বিসর্জনের ভার পড়ত তাঁদেরই উপর। তাঁর প্রেরণাতে নমঃশূদ্ররা এই ব্যবস্থার প্রতিবাদ করেছিলেন, বলেছিলেন অষ্টমীতে অঞ্জলি দিতে না দিলে তাঁরা আলাদা পুজো করবেন। এ বড় কম কথা নয়, প্রায় সমবয়সী মেঘনাদ সাহাকে একই সময়ে এমনকি কলকাতার হিন্দু হস্টেলেও সরস্বতী পুজোতে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এ জন্য গ্রামের সমাজপতিদের রোষের মুখে পড়তে হয়েছিল গোপালচন্দ্রকে। কিন্তু তার জন্য মানুষে মানুষে এই কৃত্রিম ভেদাভেদ তিনি মেনে নিতে পারেননি। অনেক বছর পরে কলকাতার দাঙ্গার সময় মুসলমান ডিমবিক্রেতাকে অন্যদের আপত্তি উপেক্ষা করে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন।

বিজ্ঞানে তাঁর অনুসন্ধিৎসার কাছে ভয়ডর হার মানত। আমরা অনেকেই তাঁর ভৌতিক আলো প্রবন্ধ পড়েছি। মনে করিয়ে দিই, আলেয়ার আলো দেখে অন্যরা যখন তাকে ভৌতিক কাণ্ড সাব্যাস্ত করেছেন, তখন তিনি তার রাসায়নিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। উপস্থিত এক ভদ্রলোক তাঁকে রাত্রিবেলা গ্রামের 'পাঁচীর মার ভিটা'-তে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ দেন; তাহলে ভূতের অস্তিত্ব সম্পর্কে তাঁর মত পরিবর্তন হবে। সে সময় তিনি ভূতে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই করতেন না। কিন্তু সংস্কারের জন্য রাত্রে গা ছমছম করে। তা সত্ত্বেও তিনি দুই ভদ্রলোককে সঙ্গে করে রাত্রে পাঁচীর মার ভিটাতে যান। সেখানে আলো দেখে দুই সঙ্গী আগেই ভয়ে পিছিয়ে যান, কিন্তু অনুসন্ধিৎসা গোপালচন্দ্রকে সামনে টেনে নিয়ে যায় এবং তিনি দেখেন যে একটা পচে যাওয়া গাছের গুঁড়িই হল সেই আলোর উৎস।

তরুণ বয়সে গোপালচন্দ্রের এক শিক্ষা হয়েছিল। তাঁর ভাইয়ের অসুখ, কিন্তু চিকিৎসাতে সারছে না। গোপালচন্দ্র বুঝলেন রোগের কারণ লুকিয়ে আছে মনে। তিনি মা শশিমুখীকে বললেন যে রাত্রে আপদ বিনাশিনী দেবী এসে তাঁকে ভাইয়ের জন্য ওষুধ দিয়ে গেছেন, মাদুলি করে সেটি পরিয়ে দিতে হবে। অব্যর্থ কাজ হল, ভাই সুস্থ হয়ে উঠল। আপদ বিনাশিনী দেবীর প্রতি মায়ের ভক্তি এমনই আকার নিল, যে গোপালচন্দ্র সত্যি কথাটা প্রকাশ করার পরেও তাতে বিন্দুমাত্র কমতি হল না। গোপালচন্দ্র বুঝেছিলেন অন্ধবিশ্বাসের ভিত নড়ানো কত কঠিন কাজ।

আমরা যারা ছোটদের মধ্যে বিজ্ঞান প্রচার করতে চাই, তাদের জন্য গোপালচন্দ্রের একটা কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলে, বিজ্ঞানের মতো জটিল বিষয়ে ছোটদেরকে কেমন করে আগ্রহী করা যাবে। গোপালচন্দ্র উত্তরে বলেছিলেন, প্রত্যেক শিশুই একটি ক্ষুদে বিজ্ঞানী; তারা সব সময়েই জানতে চায়, বুঝতে চায়। আমরা বড়রাই তাদের নিরুৎসাহিত করি, ভুল পথে চালনা করি। তাঁর ভাষায়, গ্রামে সাপুড়েদের ডুগডুগি বাজানো শুনে ছোটরা সাপ বিষধর প্রাণী জেনেও তাকে দেখতে জড়ো হয়, তেমনি আমাদের কাজ বিজ্ঞানের ডুগডুগি বাজানো; ছেলেমেয়রা নিজেরাই বিজ্ঞান শিখতে আসবে। সেই ডুগডুগি বাজানোর জন্যই তিনি জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকাতে 'করে দেখ' বিভাগ চালু করেছিলেন।

আগেই দেখেছি তিনি তরুণ বয়সে ভূতে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস কোনোটাই করতেন না, তবে প্রমাণ চাইতেন। পরে তাঁর মত আমরা জ্ঞান ও বিজ্ঞান পত্রিকাতে প্রকাশিত 'স্পিরিচুয়ালিজম বা প্রেততত্ত্ব' প্রবন্ধ থেকে দেখতে পাই। সেখানে তিনি খুব সহজ কথায় বিজ্ঞান কাকে বলে বুঝিয়েছিলেন; মানুষের অজানা কোনো রহস্য বিষয়ে অনুসন্ধান অবশ্যই বিজ্ঞান, যদি তা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা হয়। নানা রকম বুজরুকির নজির তুলে দেখিয়েছিলেন যে সমস্ত পরীক্ষাতে প্রতারণার সুযোগ আছে, একমাত্র সেই সমস্ত পরীক্ষাতেই প্রেতের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি শেষ করেছিলেন যে কথা বলে, তা তাঁর বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের আদর্শের সঙ্গে মিলে যায়; “প্রাকৃতিক নিয়মের প্রতি একটু গভীরভাবে মনঃসংযোগ করলে সহজেই প্রতীত হয় - জীবন হইতে জীবনের উৎপত্তি হইতেছে, এবং এই জীবন প্রবাহ অবিচ্ছিন্ন। ... দেহাতিরিক্ত কোন অতি প্রাকৃত প্রেতযোনির জন্মান্তর পরিগ্রহের সম্ভাবনাও থাকে না। কাজেই এইরূপ বিশ্বাসের মূল ভিত্তিতেই টান পড়ে।" শেষ জীবনে রোগভোগে কষ্ট পেলেও কখনো সেই যন্ত্রণা কমানোর জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেননি গোপালচন্দ্র। ভুল করেও কোনো দেবদেবীর নাম মুখে আনতেন না। একদিন বাড়ির লোককে বলে দিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পরে যেন অশৌচ পালন না করা হয়। বিজ্ঞানে নিবেদিত প্রাণ গোপালচন্দ্র আমাদের সকলেরই আদর্শ।

Thursday, 25 July 2024

ভুলে যাওয়া বিজ্ঞানী ফণীন্দ্রনাথ ঘোষ

 

ভুলে যাওয়া বিজ্ঞানী ফণীন্দ্রনাথ ঘোষ


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


আমাদের অবিভক্ত ২৪ পরগণা জেলাতেই জন্মেছিলেন একজন, যিনি এখন প্রায় বিস্মৃত। অথচ এক সময় পশ্চিমের বিজ্ঞান জগতে তাঁর পরিচিতি ছিল Best Measuring Man of the East এই নামে। আমরা যে সমস্ত বিজ্ঞানীদের মনে রেখেছি, তাঁদের সেই কীর্তির পিছনে অনেকেই থাকেন যাঁরা পাদপ্রদীপের আলো থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে যাঁরা গবেষণার পরিকাঠামো নির্মাণে জীবনের অনেকটা সময় ব্যয় করেন, ইতিহাস তাঁদের কথা ভুলে যায়। ফণীন্দ্রনাথ ঘোষ বা পি এন ঘোষ তেমনই এক ব্যক্তিত্ব।

ফণীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৮৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগণার মজিলপুর গ্রামে। ছোটবেলাতেই তাঁর বাবা মারা যান, তারপর বেশ কষ্টের মধ্যেই তাঁকে পড়াশোনা চালাতে হয়েছিল। স্থানীয় মজিলপুর এইচ ই স্কুল থেকেই ম্যাট্রিক পাস করেন, তারপরে ভর্তি হন কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে। সেখানে পদার্থবিদ্যার অনার্স নিয়ে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বি এ ডিগ্রি পান। (তখনো বিএসসি ডিগ্রি চালু হয়নি) দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছিলেন, তবে সেই বছর পদার্থবিদ্যা রসায়ন মিলিয়ে তিনিই প্রথম। এরপরে পদার্থবিদ্যাতে স্নাতকোত্তর শিক্ষার জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।

তখন এম এ পড়ানো হত প্রেসিডেন্সি কলেজে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদান তখনো শুরু হয়নি। সেই সূচনাপর্বের কথা আমাদের লেখাতে আসবে। ১৯০৮ সালে তিনি এম এ পরীক্ষাতে পাস করেন। পরীক্ষাতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার ফলে সরকারি চাকরির সুযোগ তাঁর সামনে এসেছিল। কিন্তু তাঁর ইচ্ছা ছিল প্রযুক্তির দিকে, তাই ভারতের প্রাচীনতম ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান জেসপ ইঞ্জিনিয়ারিঙ ওয়ার্ক্সে তিনি শিক্ষানবীশ হিসাবে কাজ শুরু করেন। এ কথা বলা প্রয়োজন যে সেটা ছিল খুবই বিরল ঘটনা, কারণ তখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালিদের মধ্যে পরিশ্রমের কাজে প্রতি খুবই অনীহা ছিল। কিন্তু ফণীন্দ্রনাথ ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া।

তবে ইচ্ছা থাকলেও সেই মুহূর্তে তাঁকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর আশা ছাড়তে হয়েছিল, কারণ আর্থিক অনটন। শিক্ষানবীশের কাজে বিশেষ বেতন মিলত না, ভবিষ্যতেরও কোনো স্থিরতা ছিল না। তাই ১৯১০ সাল থেকে তিনি বঙ্গবাসী কলেজে পড়ানো শুরু করেন। তবে ইঞ্জিনিয়ারিংকে একেবারে তযাগ করেননি, একই সঙ্গে তিনি নানা শিল্পকে প্রযুক্তি বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। আমরা দেখব যে এই কাজ তিনি সারাজীবন করে গেছেন।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় উপাচার্য হওয়ার পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরেই পড়ানো শুরু হয়, তার আগে তা হত শুধু কলেজে। বিজ্ঞান কলেজ শুরু হয়েছিল ১৯১৪ সালে দুই ব্যারিস্টারের অর্থসাহায্যে; তারকনাথ পালিত দিয়েছিলেন প্রায় চোদ্দ লক্ষ টাকা, রাসবিহারী ঘোষ দিয়েছিলেন দশ লক্ষ টাকা। তাঁদের দুজনের সেই মোট দান আজকের হিসাবে কয়েকশো কোটি টাকা। পদার্থবিদ্যা বিভাগে দুই প্রধান অধ্যাপক পদ ছিল পালিত ও ঘোষ অধ্যাপক; ১৯১৪ সালে সেই দুই পদে যথাক্রমে চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন ও দেবেন্দ্রমোহন বসুকে নিয়োগ করা হয়। রামন ছিলেন সরকারি চাকুরে, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিতে দেরি হয়েছিল। দেবেন্দ্রমোহন বসু যোগদানের পরে চাকরির শর্ত অনুসারে গবেষণা করতে জার্মানিতে দু' বছরের জন্য যান। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য সেখানে আটকে পড়েন; ১৯১ সালের আগে তিনিদেশে ফিরতে পারেননি।

ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ১৯১৬ সালে, কিন্তু বিভাগে কোনো শিক্ষক নেই। এই পরিস্থিতিতে আশুতোষ অবিলম্বে দু'জন শিক্ষক নিয়োগ করেন এবং কয়েকজন গবেষক ছাত্রকে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশ দেন। ফণীন্দ্রনাথের পড়ানোর সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, তাই আশুতোষ তাঁকে পদার্থবিদ্যা বিভাগে নিয়োগ করেন। সেই হিসাবে তিনি বিভাগের প্রথম দুই পূর্ণসময়ের শিক্ষকের মধ্যে একজন হিসাবে। মাইনে ছিল ২০০ টাকা, বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট ২৫ টাকা। একই সময়ে গবেষক হিসাবে যোগ দিয়ে যাঁরা পদার্থবিদ্যা বিভাগে ক্লাস নিতে শুরু করেন, তাঁদের মধ্যে তিনজনের নাম সবাই আমরা জানি, শিশিরকুমার মিত্র, মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

পরের বছর রামন বিভাগে যোগ দিলেন। ফণীন্দ্রনাথের তখন ৩৩ বছর বয়েস, গবেষণা শুরুর পক্ষে বয়সটা বেশিই। কিন্তু বয়সে চার বছরের ছোট রামনের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি তাঁর অধীনে গবেষণা শুরু করেন। ১৯১৮ সালে রমনের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি প্রথম গবেষণাপত্র ছাপেন। নেচার পত্রিকাতে প্রকাশিত সেই চিঠিটির শিরোনাম ছিল, “Colour and Striae in Mica”। এই চিঠিতে লেখকদের ঠিকানা ছিল ২১০ বৌবাজার স্ট্রিট; এ ছিল ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স-এর সেই সময়ের ঠিকানা। রামন বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনেও কাজ করতেন। এখন অবশ্য কালটিভেশন চলে গেছে যাদবপুরে, বৌবাজার স্ট্রিটের সেই ঠিকানায় এখন গোয়েঙ্কা কলেজ অবস্থিত।

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী লর্ড র‍্যালের মতো বিশেষজ্ঞ চিঠিটির প্রশংসা করেছিলেন, চিঠির নিচে তাঁর দীর্ঘ মন্তব্য ছাপা হয়েছিল। র‍্যালে কিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন, সেইগুলি মাথায় রেখে আরো বিস্তৃতভাবে কাজ করে ফণীন্দ্রনাথ পরের বছর প্রসিডিংস অফ দি রয়্যাল সোসাইটিতে একটি গবেষণাপত্র ছাপিয়েছিলেন। এবারের কাজ কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের পালিত ল্যাবরেটরিতেই একাই করেছিলেন, লেখকের ঠিকানাতে লেখা ছিল বিজ্ঞান কলেজ। সেই বছরই ফিজিক্যাল রিভিউ পত্রিকাতে আরো একটি গবেষণাপত্র ছাপান পি এন ঘোষ। এই তিনটি ও ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের প্রসিডিংসে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রের উপর ভিত্তি করে তিনি “The colours of the striae in mica and other optical investigations” থিসিস জমা দেন ও ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টর অফ ফিলোজফি ডিগ্রি পান। থিসিসের পরীক্ষক ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের গণিতের অধ্যাপক দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক ও উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক ইয়োহানেস ব্রুল ও ভারতবর্ষের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলির সর্বোচ্চ অধিকর্তা এবং রয়্যাল সোসাইটির ফেলো গিলবার্ট ওয়াকার। ব্রুল ছিলেন জার্মান, উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক হলেও তাঁর পড়াশোনা ছিল ভৌত বিজ্ঞানে।

ইতিমধ্যে আশুতোষ বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো নতুন নতুন বিষয়ে গবেষণা শুরুর চেষ্টা করছিলেন। তাঁর আগ্রহে ১৯১৯ সালে রাসবিহারী ঘোষ আবার এগারো লক্ষ টাকা দিয়েছিলেন, সেই টাকাতে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা ও রসায়নের (Applied Physics ও Applied Chemistry) দুটি অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করা হয়। ডক্টরেট করার পরেই ফণীন্দ্রনাথ ঘোষকে পদার্থবিদ্যাতে পাঁচশো টাকা বেতন ও একশো টাকা গৃহভাতাতে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যার ঘোষ অধ্যাপক পদে নিয়োগ করা হয়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ইংল্যান্ড ও আমেরিকাতে কাজ করার জন্য দু’বছরের ছুটির জন্য আবেদন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে পূর্ণ বেতনে ছুটি অনুমোদন করে, একই সঙ্গে তাঁর বিদেশে খরচের জন্য তিন হাজার টাকা মঞ্জুর হয়। পরের বছর পি এন ঘোষ লন্ডন থেকে যন্ত্র কেনার জন্য একশো পাউন্ডের জন্য আবেদন করেন, ঘোষ তহবিলের ম্যানেজমেন্ট বোর্ড সেই অর্থও মঞ্জুর করে, শর্ত ছিল যন্ত্রটি হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি। জার্মানিতে সিমেন্স কোম্পানিতেও তিনি কিছুদিন কাটান। তিনি কলকাতাতে ফিরে আসেন ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে। অল্পদিন জার্মানিতে কাটালেও তিনি জার্মান ভাষাটা ভালোই রপ্ত করছিলেন।

১৯২৫ সালে থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা আলাদা বিষয় হিসাবে পড়ানো শুরু হয়, তবে আলাদা বিভাগ হিসাবে তা রূপ নেয় ১৯৩০ সালে। কিন্তু বাস্তবে ফণীন্দ্রনাথ আলাদা বিভাগেই কাজ করছিলেন, ১৯২৪ সাল থেকেই দেখি সেনেট বা সিন্ডিকেটের কার্যবিবরণীতে ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা বিভাগের উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। প্রথম বছর ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যাতে ছাত্রের সংখ্যা ছিল মাত্র তিন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর প্রচেষ্টার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিল। তাই বিভাগের ল্যাবরেটরি তৈরির জন্য এককালীন বাহান্ন হাজার টাকা ও বাৎসরিক কুড়িহাজার টাকা মঞ্জুর হয়। ১৯২৮ সালে ফণীন্দ্রনাথ যে বর্ণালীবীক্ষন ল্যাবরেটরি তৈরি করেন, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাইরে দীর্ঘদিন সেটিই ছিল এই বিষয়ে গবেষণার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র। ১৯৩৭ সালে যোগাযোগ বিষয়ক পরীক্ষাগারের জন্য আরো পঁচিশ হাজার টাকা মঞ্জুর হয়।

মনে রাখতে হবে শুধু টাকাতেই হয় না, ফণীন্দ্রনাথকে নিজের হাতে করে ল্যাবরেটরি তৈরি করতে হয়েছিল। দীর্ঘদিন বিভাগে তাঁকে নিয়ে শিক্ষকের সংখ্যা ছিল মাত্র দুই। তাই হয়তো এই পর্বে তাঁর গবেষণাপত্রের সংখ্যা খুব বেশি নয়। একটি ছোট ঘর ও দুটি ডিসি মোটর দিয়ে শুরু করে তিনি যে ল্যাবরেটরি তৈরি করেছিলেন, ইউরোপ আমেরিকার বাইরে তার তুলনা সেই যুগে বিশেষ ছিল না। সেই জন্যই তাঁকে বলা হত Best Measuring Man of the East। তাঁকে সহায়তা করেছিলেন বিভাগের অপর শিক্ষক পূর্ণচন্দ্র মহান্তি, যিনি ফণীন্দ্রনাথের পরে বিভাগের প্রধান হয়েছিলেন। বর্ণালীবীক্ষণ, তড়িৎপ্রবাহ ইত্যাদি বিষয়ে ফণীন্রনাথ কাজ করতেন এবং নানা যন্ত্র বানিয়েছিলেন। সারা জীবনে নানা সম্মান পেয়েছেন ফণীন্দ্রন্তাহ। ১৯৪১ সালে বেনারসে অনুষ্টিত বিজ্ঞান কংগ্রেসে তিনি পদার্থবিদ্যা বিভাগের সভাপতি হয়েছিলেন। তিনি হয়েছিলেন ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর কাল্টিভেশন অফ সায়েন্সের ফেলো, এগারো বছর তিনি এই সংস্থার প্রকাশিত গবেষণা পত্রিকা ইন্ডিয়ান জার্নাল অফ ফিজিক্স-এর সম্পাদকমণ্ডলীর কর্মসচিব ছিলেন। তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল সায়েন্স অ্যাকাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ফেলো।

ফণীন্দ্রনাথ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সার্ভে কমিটি অফ বেঙ্গল-এর সভাপতি ও বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ বোর্ডের সহ-সভাপতি হিসাবে কাজ করেছিলেন। চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রিজের জন্য তিনি শিল্প পরিস্থিতি ও ভবিষতের পথের রূপরেখা বিষয়ে একটি বিস্তৃত রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস সভাপতি হওয়ার পরে মেঘনাদ সাহার উদ্যোগে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস ন্যাশনাল প্ল্যানিং কমিটি তৈরি করেছিল; পি এন ঘোষ তার বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সংক্রান্ত উপসমিতির সভাপতি হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পরে তাঁর প্রিয় ব্যবহারিক পদার্থবিদ্যা বিভাগে তাঁর ছাত্ররা তাঁর এক আবক্ষমূর্তি স্থাপন করেছে। তিনি যে বিভাগের সূচনা করেছিলেন, তখন তা বিজ্ঞানের মধ্যে গণ্য হলেও বর্তমানে সেখানে বি টেক ও এম টেক পড়ানো হয়, গবেষণাও হয় প্রযুক্তি বিষয়ে। আজ যে শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গাঁটছড়ার উপরে জোর দেওয়া হয়, আমাদের দেশে পদার্থবিদ্যার ক্ষেত্রে সেই কাজটি প্রথম যাঁরা করেছিলেন, ফণীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে অন্যতম।



তথ্যসূত্রঃ

  • Phanindra Nath Ghosh, A. K. Sengupta, Biographical Memoirs of the Members of the Indian National Science Academy

  • The Dazzling Dawn: Physics Department of Calcutta University (1916-1936), Gautam Gangopadhyay, Anirban Kundu and Rajinder Singh, Shaker Verlag

  • সোনাঝরা দিনগুলি, গোতম গঙ্গোপাধ্যায় ও অনির্বাণ কুণ্ডু, জয়ঢাক

  • Minutes of the Senate and Syndicate of the University of Calcutta for various years

  • Prof P N Ghosh – A Memoir of the Best Measuring Man of the East, Kaushik Das Sharma, Hindred Tears of the Department of Applied Physics, University of Calcutta (1925-2024), University of Calcutta

Thursday, 4 July 2024

পিটার হিগস, হিগস ক্ষেত্র ও হিগস বোসন

 

পিটার হিগস, হিগস ক্ষেত্র ও হিগস বোসন

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

গত ৮ এপ্রিল প্রয়াত হলেন ২০১৩ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী পিটার হিগস। তাঁর জন্ম ইংল্যান্ডে ১৯২৯ সালের ২৯ মে। পড়াশোনা ব্রিস্টলে, সেই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ছিলেন কিংবদন্তী পদার্থবিজ্ঞানী পল ডিরাক। ডিরাকের বিভিন্ন কৃতিত্বের কথা শুনে তাঁর পদার্থবিজ্ঞানে আগ্রহ জন্মায়। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে তিনি পদার্থবিদ্যাতে বিএসসি, এমএসসি ও গবেষণা করে ডক্টরেট করেন। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা শুরু করেন, ১৯৯৬ সালে অবসর নেওয়ার পরে তাঁকে সেই প্রতিষ্ঠানেই এমিরিটাস অধ্যাপক করা হয়। ২০১২ সালে সার্নের লার্জ হ্যাড্রনিক কোলাইডার বা এলএইচসি-তে যে বোসন কণাটির সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, তার প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে ১৯৬৪ সালে হিগস তার কথা প্রথম বলেছিলেন। সেই অত্যন্ত মৌলিক গবেষণার স্বীকৃতিতেই হিগসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

হিগস লোকচক্ষুর অন্তরালে কাজ করাই পছন্দ করতেন, তিনি মোবাইল ফোন, ইমেল বা ইন্টারনেট ব্যবহার করতেন না। হিগস বোসনের কথা আমরা সবাই জানি, কিন্তু ঘটনাচক্রে কণাটির সঙ্গে একমাত্র তাঁর নাম যুক্ত হওয়াটাকে তিনি মোটেই খুশি হননি, তার পরিবর্তন চেয়েছিলেন। সার্নে সেই কণাটি আবিষ্কার হয় ২০১২ সালে। তার পরে প্রচারমাধ্যম তাঁকে নিয়ে যে মাতামাতি শুরু করেছিল, তা তাঁর নিতান্তই অপছন্দ ছিল। ২০১৩ সালের নোবেল পুরস্কারের তালিকাতে তাঁর নাম থাকবে বলে সকলেই অনুমান করেছিলেন। ঘোষণার দিনটা ছিল ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর। সহকর্মী, সংবাদমাধ্যম, বন্ধু, আত্মীয় সবাইকে এড়াতে হিগস ঘোষণার সময়ের আধ ঘণ্টা আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। এডিনবার বন্দর তাঁর বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয়, কিছুক্ষণ সেখানে হাঁটাহাঁটি করার পরে সমুদ্রের ধারে এক পাবে বসেই দুপুরের খাবার সারলেন। তারপরে ঢুকলেন এক শিল্প প্রদর্শনীতে। ঘণ্টা চারেক পরে যখন বাড়ি ফিরছেন, এক প্রতিবেশী তাঁকে দেখতে পেয়ে গাড়ি থামিয়ে নেমে এলেন। 'প্রফেসর হিগস, অভিনন্দন। আমার মেয়ে লন্ডন থেকে ফোন করে আপনার পুরস্কারের খবরটা দিয়েছে।' মোবাইল ফোন তিনি ব্যবহার করেন না, তাই সুইডিশ অ্যাকাডেমি পদার্থবিদ্যাতে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করার পরে অন্যতম প্রাপক পিটার হিগসের সঙ্গে কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারেনি। বাড়ি ফিরে গিয়ে তিনি ফোনের রেকর্ড করা মেসেজগুলো শুনে নিলেন।

এই ছিলেন পিটার হিগস; কখনোই নিজেকে সামনে আনতে চাইতেন না। যখন সার্নে সাংবাদিক সম্মেলন করে হিগস বোসন কণার আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করা হয়, হিগস সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকরা তাঁকে ঘিরে ধরতে তিনি শুধু বলেছিলেন সেই দিনটা এই সমস্ত বিজ্ঞানীর যাঁরা কয়েক বছর ধরে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কণাটির সন্ধান পেয়েছেন। সেদিন তিনি কিছু বলবেন না। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন যে তিনি আশা করেননি যে তাঁর জীবৎকালে কণাটি খুঁজে পাওয়া যাবে। তাই সার্নের আবিষ্কারের খবর পেয়ে প্রথমে তাই তাঁর ভালো লেগেছিল, কিন্তু তার পরেই মনে হয়েছিল যে তাঁর শান্তিপূর্ণ জীবন শেষ হতে চলেছে। কিছুটা মজা করেই হয়তো বলেছিলেন, ওই একটি কণা তাঁর জীবনকে ধ্বংস করে দিল।

নিজেকে আড়াল করার এই অভ্যাস কিন্তু কোনোভাবেই দুর্বলতা নয়। অন্য অনেক বিজ্ঞানীর মতো হিগস গজদন্তমিনারে বাস করতেন না, বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ ছিল। নিজের মত স্পষ্ট করে জানাতে তিনি ভয় পেতেন না। উনিশশো ষাট ও সত্তরের দশকে এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উত্তাল ছাত্র আন্দোলনের সংগঠকদের উপরে শাস্তি নামিয়ে আনতে চেয়েছে, বিরোধিতা করেছেন পিটার হিগস। এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয় বর্ণবিদ্বেষী দক্ষিণ আফ্রিকার কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে; প্রতিবাদ করেছেন হিগস। এ সব কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। বিজ্ঞানের বিষয়েও কোনো আপোস করেন নি। নিউক্লিয় অস্ত্র বিরোধী আন্দোলন সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্টের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন, কিন্তু তা যখন নিউক্লিয় বিদ্যুতেরও বিরোধিতা করে, তখন তিনি তার থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তেমনি পরিবেশবাদী গ্রিনপিস সংগঠনের সদস্য হইয়েছিলেন, কিন্তু সেই সংগঠন যখন জিন প্রযুক্তির বিরোধিতা শুরু করে, তখন তিনি সদস্যপদ ত্যাগ করেন। প্যালেস্টাইনের প্রতি ইজরায়েলের মনোভাবের প্রতিবাদে তিনি জেরুজালেমে দিয়ে উলফ পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে তিনি নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার এই সম্মান রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। ২০১২ সালে অবশ্য তিনি অনুরূপ এক সম্মান গ্রহণ করেছিলেন, কারণ তাঁকে ভুল বোঝানো হয়েছিল যে ব্রিটেনের রাণীই সেই সম্মান দেন, তার সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী লিওন লেডারম্যান তাঁর বেস্ট সেলার বইতে হিগস কণার নাম দিয়েছিলেন গড পার্টিকল অর্থাৎ ঈশ্বরকণা; সেই নামেই কণাটি পরিচিত হয়ে যায়। হিগস ঈশ্বরে বিশ্বাস করতেন না, তাই তিনি এতে খুব বিরক্ত হয়েছিলেন।

তাঁর গবেষণা এত স্বীকৃতি পেলেও ব্যক্তি হিগস কিন্তু অনেক দিক থেকেই বর্তমান বিজ্ঞানীমহলের অধিকাংশের থেকে আলাদা। এই 'পাবলিশ অর পেরিশ'-এর যুগেও প্রবন্ধ ছাপার ইঁদুর দৌড়ে তিনি কখনোই নাম লেখান নি। ১৯৬৪ সালের পরে তাঁর মোট প্রকাশিত বিজ্ঞানপ্রবন্ধের সংখ্যা দুই অঙ্কে পোঁঁছায়নি। তিনি নিজেই বলেছিলেন আধুনিক কালে তিনি চাকরিই পেতেন না। এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর চাকরি যায়নি তার একমাত্র কারণ ছিল যে ১৯৮০ সালেই তাঁর নাম নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রস্তাবিত হয়েছিল, কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল যে হয়তো তিনি একদিন পুরস্কার পাবেন। হিগসের নিজের কথায়, 'না পেলে যে কোনো সময় ছাঁটাই করা যাবে।'

হিগসের গবেষণার তাৎপর্য অল্প কথায় বলা কঠিন। সংক্ষেপে বলা যায়, মৌলিক কণাদের জন্য আমাদের এখনো পর্যন্ত সব সেরা তত্ত্বের নাম হল স্ট্যান্ডার্ড মডেল। মহাবিশ্বে আমাদের জানা বল চার প্রকার, মাধ্যাকর্ষণ, তড়িৎচৌম্বক বল, পীন বা সবল বল এবং ক্ষীণ বা দুর্বল বল। স্ট্যান্ডার্ড মডেলের মধ্যে প্রথমটিকে স্থান দেওয়া সম্ভব হয়নি, কিন্তু বাকি তিনটি বলের সাহায্যে মৌলিক কণারা কেমনভাবে নিজেদের মধ্যে ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া করে, তার ব্যাখ্যা স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে পাওয়া যায়।

এই সমস্ত বলকে বয়ে নিয়ে যায় কয়েকটি বোসন কণা। অর্থাৎ যে সমস্ত কণা বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে, এই বছর যে পরিসংখ্যান আবিষ্কারের শতবর্ষ। এদের মধ্যে তড়িৎচৌম্বক বল যে বলকণার মাধ্যমে যায়, তা হল ফোটন। দুটি আধানযুক্ত কণা বা ইলেকট্রন কেমনভাবে পরস্পরের মধ্যে ক্রিয়াবিক্রিয়া করে? সহজ কথায় বললে, একটি ইলেকট্রন একটি ফোটন ছাড়ে, অন্যটি সেই ফোটনটিকে ধরে নেয়। পদার্থবিজ্ঞানের যে সর্বাধুনিক তত্ত্ব এই ক্রিয়াপ্রতিক্রিয়াকে ব্যাখ্যা করে তার নাম কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স বা আলোকতড়িৎবিদ্যা। তড়িৎচৌম্বক বলের সীমা অসীম পর্যন্ত বিস্তৃত, সেই তথ্যকে ব্যবহার করে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার হাইজেনবার্গ অনিশ্চয়তা সূত্র থেকে বলা যায় যে ফোটনের স্থিরভর শূন্য।

কোয়ান্টাম ইলেক্ট্রোডায়নামিক্স পদার্থবিদ্যার সব থেকে সফল তত্ত্ব এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু এর মূলে একটা সমস্যা আছে; তা হল অসীম রাশির সমস্যা। কিছু কিছু রাশি অঙ্ক কষে বার করতে গেলে উত্তর আসে অসীম। এখন অসীম মান তো আর পরীক্ষাগারে মাপা যায় না, আর ধরুন, ইলেকট্রনের ভর বা আধান, তা তো অসীম হতে পারে না। এখানে বিজ্ঞানীরা একটা কায়দা করলেন। ধরুন ইলেকট্রনের ভর হল দুটি রাশির বিয়োগফল, তার একটা বার করার কোনো উপায় নেই, আর অঙ্ক থেকে দ্বিতীয়টা আসছে অসীম। বিজ্ঞানীরা বললেন, প্রথমটাও অসীম; আর দুটো অসীম সংখ্যার বিয়োগফল হল একটা সসীম ছোট সংখ্যা। গণিতবিদরা এটা মোটেই পছন্দ করেন না, কিন্তু দেখা গেছে যে এই কায়দা মাত্র কয়েক জায়গায় প্রয়োগ করতে পারলেই কেল্লা ফতে, তারপর অঙ্ক আর পরীক্ষার ফল একেবারে কাঁটায় কাঁটায় মিলে যাচ্ছে। এই কাজের জন্য সিন-ইতিরো তোমোনাগা, জুলিয়ান শুইঙ্গার ও রিচার্ড ফাইনম্যান নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন।

অসীম থেকে অসীম বাদ দেওয়ার এই পদ্ধতিটা কাজ করে, কারণ ফোটনের স্থিরভর শূন্য। সমস্যা বাঁধল দুর্বল বা ক্ষীণ বলের জন্য। তার সীমা খুব ছোট, নিউক্লিয়াসের থেকেও ছোট। অনিশ্চয়তা সূত্র ব্যবহার করে দেখা যায় যে যে বোসন কণারা এই বলকে বয়ে নিয়ে যাবে, তাদের ভর খুব বেশী হতে হবে, প্রোটনের একশো গুণের কাছাকাছি। ক্ষীণ বলের তত্ত্ব প্রথম দিয়েছিলেন এনরিকো ফের্মি, তারপর অনেক পরীক্ষানিরীক্ষার পরে তা অনেক বদলেছে। ১৯৫৭ সালে রবার্ট মার্শাক ও ভারতীয় বিজ্ঞানী জর্জ সুদর্শন প্রথম দেখান ক্ষীণ বলের রূপটা ঠিক কী। ক্ষীণ বল কাদের উপর কাজ করে? ইলেকট্রন বা কোয়ার্ক জত্তীয় কণা এবং নিউট্রিনোদের উপরে; এরা সবাই ফের্মিয়ন অর্থাৎ ফের্মি-ডিরাক পরিসংখ্যান মেনে চলে। তাদেরও ভর আছে, অবশ্য নিউট্রিনোর যে ভর আছে তা আমরা অল্প দিন হল জেনেছি। সমস্যা হল যে দুর্বল বলের ওই রূপটা একমাত্র ভরহীন বোসন ও ফের্মিয়নের জন্যই কাজ করে। ভরশূন্য কণাদের তত্ত্ব থেকে অসীমকে বাদ দেওয়ার কোনো উপায় জানা নেই।

এই সমস্যার সমাধানে প্রায় একই সময়ে কয়েক দল বিজ্ঞানী আলাদা আলাদা ভাবে প্রস্তাব করেন যে মৌলিক কণাগুলি আসলে ভরহীন, কিন্তু মহাবিশ্বে এমন এক বিশেষ ফিল্ড বা ক্ষেত্র আছে যার সঙ্গে ক্রিয়ার মাধ্যমে তারা বল পায়। এই ক্ষেত্রের নাম আমরা পরে দিয়েছি হিগস ক্ষেত্র। এখানে যে পদ্ধতি কাজ করে তা হল ভগ্ন প্রতিসাম্য। এই বিষয়টা আরো জটিল, তাই এই সংক্ষিপ্ত নিবন্ধে সেই আলোচনাতে যাচ্ছি না। মূল কথা হল যে ফের্মিয়ন বা বোসনরা গোড়াতে ভরশূন্য হিসাবেই থাকে, ফলে অসীম রাশির সমস্যা থাকে না। হিগস ক্ষেত্রের প্রতিসাম্য ভাঙার ফলে ফের্মিয়ন বা বোসনরা ভর পায়, কিন্তু তার জন্য অসীমের সমস্যাটা আর ঘুরে আসে না।

হিগস ক্ষেত্রের সঙ্গে যে কণার ক্রিয়ার পরিমাণ যত বেশি, তার ভর তত বেশি। বিজ্ঞানী মহলে একটা সুপরিচিত উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করা যাক। একটি ঘরের দুপাশে দুটি দরজা আছে; ঘরে বেশ কিছু লোক ইতস্তত ঘোরাফেরা করছেন। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষ যদি এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যান, তাঁর বিশেষ সময় লাগবে না, কারণ তাঁর সঙ্গে কারোরই কথা হবে না। কিন্তু যদি এমন একজন ঢোকেন যাঁর কয়েকজনের সঙ্গে পরিচিতি আছে, স্বাভাবিকভাবেই তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে বা গতি কমিয়ে অন্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন, ফলে তাঁর ঘর পেরোতে সময় লাগবে। আর যদি প্রবেশকারী কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি হন, তাঁর সঙ্গে কথা বলতে, সেলফি তুলতে, অটোগ্রাফ নিতে হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে; ফলে তাঁর অনেকটাই বেশি সময় লাগবে। আমাদের উপমাতে ঘরের মধ্যের মানুষজন হলেন হিগস ক্ষেত্র এবং প্রবেশকারী হলেন মৌলিক কণা; ক্ষেত্রের সঙ্গে ক্রিয়ার মাধ্যমে কণার ভরের সৃষ্টি হচ্ছে। ভরশূন্য কণা আলোর গতিতে চলাফেরা করে, ভর বৃদ্ধি পেলে তার বেগ কমে যায়। ক্রিয়া যত বেশি, ভরও তত বেশি।

প্রায় একই সময়ে বেলজিয়ামের ব্রাসেলস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রাঁসোয়া আংলেয়ার ও রবার্ট ব্রাউট, এডিনবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পিটার হিগস, এবং লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের জেরাল্ড গুরালনিক, রিচার্ড হ্যাগেন, ও টমাস কিবল প্রায় একই ধরনের প্রস্তাব করেন। হিগস একটি অতিরিক্ত কথা বলেছিলেন। এই তত্ত্বকে প্রমাণ করব কেমন করে, বিজ্ঞান প্রমাণ ছাড়া কিছু মানে না। মহাবিশ্বের সর্বত্রই এই ক্ষেত্র অবস্থান করে, কাজেই আমাদের পক্ষে দেখা সম্ভব নয় সত্যিই ক্ষেত্রের বাইরে গেলে কণাদের ভর শূ্ন্য হয়ে যায় কিনা। হিগস বলেছিলেন যে এই ক্ষেত্রকে কখনো কখনো একটা কণার আকারে দেখা যাবে। আগের উপমাতে ফিরে যাই, ধরা যাক ঘরে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছেন, সেই কথা শুনতে অনেকে ভিড় করবে। আবার শ্রোতাদের মধ্যে একজন অন্য একজনকে বলতে গেলেন, আরো কয়েকজন শুনতে এলেন, তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা চালালেন। এভাবে একটা জটলা ঘরের এক পাশ থেকে অন্য পাশে চলে গেল। হিগস বোসন হিগস ক্ষেত্রের সেইরকম এক উত্তেজনা, একে আমাদের যন্ত্রে খুঁজে পাওয়া গেলে প্রমাণ হবে যে বিজ্ঞানীদের ধারণা ঠিক। এই কণাটি বোসন, কারণ এ বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মেনে চলে।

আমরা আগে বলেছি যে মোট চার রকমের বল আছে। বিজ্ঞানীরা অনেকেই মনে করেন যে এগুলো আসলে একটা বলেরই রকম ফের। আইনস্টাইন তাঁর জীবনের শেষ প্রায় চল্লিশ বছর এই বিষয়টা প্রমাণ করার চেষ্টা করে বিফল হয়েছেন। তাঁর মৃত্যুর পরে আমরা সেই লক্ষ্যে কিছুটা এগিয়েছি। এ বিষয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হল দুর্বল এবং তড়িৎচুম্বক বলকে এক জায়গায় নিয়ে আসা। এই কাজটা মূলত করেছেন দুই মার্কিন বিজ্ঞানী স্টিভেন ভাইনবার্গ ও শেলডন গ্লাসো এবং পাকিস্তানজাত বিজ্ঞানী আবদুস সালাম। এই বলের নাম হল ইলেক্ট্রো-উইক বল। তত্ত্বটা যদি ঠিক হয় তাহলে তিনটে বলকণা পাওয়া যাওয়া উচিত। এরাই হল দুর্বল বলের কণা যাদের কথা আগে বলেছি। এদের মধ্যে দুটোকে আমরা বলি W+ ও W-; এদের আধান যথাক্রমে ইলেকট্রন ও পজিট্রনের সমান। তৃতীয় কণাটার নাম Z0, এর তড়িতাধান নেই। ১৯৭৯ সালে এই তিন বিজ্ঞানী তাদের কাজের জন্য নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। ইলেক্ট্রোউইক বল যে সত্যিই অসীম মানদের তাডাতে পারে, তা দেখানোর জন্য জেরার্ড এট হুফ্‌ট ও মার্টিন ভেলটম্যানকে ১৯৯৯ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষাগারে প্রোটনের থেকে ভারী কণা বানাতে হলে চাই বিশাল কণাত্বরক। তখনো এলএইচসি তৈরি হয়নি। সার্নে সুপার প্রোটন সাইক্লোট্রনে ১৯৮৩ সালে প্রোটন প্রোটন সংঘর্ষে এই দুই কণার সন্ধান পাওয়া গেলো। দেখা গেল W+ বোসনের ভর 80.4 GeV, আর Z0 বোসনের ভর 91.2 GeV। (আইনস্টাইনের সূত্র থেকে আমরা সাধারণত কণার ভরকে শক্তির এককে লিখে থাকি। 1 GeV=1000 MeV। প্রোটনের ভর হল 938.3 MeV, ইলেকট্রনের ভর 0.511 MeV।) বিরাট এক বিজ্ঞানীদল এই কাজটা করেছিলেন যার নেতৃত্বে ছিলেন কার্লো রুবিয়া এবং সাইমন ভ্যান ভার মির। পরের বছরই এঁরা দুজন তাঁদের কৃতিত্বের জন্য নোবেল পুরস্কার পান। পীন বলের তত্ত্বকেও কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্সের মতো একই রকম রূপ দেওয়া সম্ভব হয়েছে, সেই আলোচনাতেও আর যাচ্ছি না। সেখানে বলকণার ভর শূন্য, তাই হিগস ক্ষেত্রের কোনো ভুমিকা নেই।

ইলেক্ট্রো-উইক তত্ত্বের সাফল্যের পরে বিজ্ঞানীরা বোঝেন যে হিগসদের তত্ত্বের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে। হিগস বোসন কণাকে যন্ত্রে তৈরি করা মোটেই সহজ নয়, কারণ এর ভর খুব বেশি। আধুনিক গবেষণাগারে কণাত্বরক দিয়ে উচ্চশক্তিতে দুটি কণার সংঘর্ষ ঘটিয়ে নতুন কণা সৃষ্টি করা হয়। আমরা আইনস্টাইনের ভর ও শক্তির সমতুল্যতা সূত্র জানি, সুতরাং বেশি ভরের কণা সৃষ্টি করতে হলে সংঘর্ষের শক্তি অবশ্য বেশি হতে হবে। যে কণাত্বরক যত বড়, তা দিয়ে তত উচ্চশক্তির সংঘর্ষ ঘটানো সম্ভব। অবশ্য হিগস কণার ভর কত তা স্ট্যান্ডার্ড মডেল থেকে জানা যায় না, তবে ভর কম হলে আমাদের ছোটখাটো কণাত্বরকে তাকে আগেই খুঁজে পাওয়া যেত। পৃথিবীর সব থেকে বড় কণাত্বরক, এলএইচসি, যার রিংটার পরিধি হল সাতাশ কিলোমিটার, তা দিয়েই শেষ পর্যন্ত হিগস বোসনকে খুঁজে পাওয়া গেল; দেখা গেল তার ভর প্রোটনের ভরের মোটামুটি একশো তেত্রিশগুণ, 125.1 GeV। হিগস বোসন খুবই স্বল্পস্থায়ী, সৃষ্টির পরে পরেই তা ভেঙে অন্য অনেক কণা সৃষ্টি হয়। সেই সমস্ত কণা আমাদের যন্ত্রে ধরা পড়ে, তার থেকে বোঝা গেল যে সত্যিই হিগস কণা তৈরি হয়েছিল। এই গবেষণাতে ভারত সহ অনেক দেশের বিজ্ঞানীরা যুক্ত ছিলেন। হিগস বোসনের সন্ধান পাওয়ার পরের বছরেই হিগস ও ফ্রাঁসোয়া আংলেয়ারকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল।

তাঁর আবিষ্কারকে ঘিরে এত উত্তেজনা হিগস নিজে অপছন্দ করতেই পারেন, কিন্তু সন্দেহ নেই যে হিগস ও অন্যান্যরা বিজ্ঞানের এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দিয়েছেন। নোবেল পুরস্কারের আগেই হিগস পদার্থবিজ্ঞানের প্রায় সমস্ত পরিচিত পুরস্কারই পেয়েছেন, তাদের মধ্যে আছে হিউজেস পদক, রাদারফোর্ড পদক, উল্‌ফ পুরস্কার, ডিরাক পদক, সাকুরাই পদক, অস্কার ক্লাইন সম্মান, ইত্যাদি। নোবেল পুরস্কারের পরে পাওয়া সম্মানের মধ্যে আছে বিজ্ঞানে পৃথিবীর প্রাচীনতম পুরস্কার, রয়্যাল সোসাইটির কপলি পদক। পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানীদের জীবনচরিত

 


বাংলা সাহিত্যে বিজ্ঞানীদের জীবনচরিত

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


স্মরণীয় ব্যক্তিদের জীবনী লেখার রীতি অনেক আগে থেকেই আছে। প্রাচীনকালে সাধারণত রাজাবাদশা বা তাঁদের পারিষদদের জীবন সাহিত্যের বিষয় হত। আমাদের দেশে বাণভট্টের হর্ষচরিত, কল্‌হনের রাজতরঙ্গিনী -- এমন আরও অনেক উদাহরণ আছে। তার সহজ কারণ হল কবি বা লেখকরা সমাজের উঁচুতলার লোকদের অনুগ্রহের উপর নির্ভর করতেন। ছাপাখানা আবিষ্কার হওয়ার আগে বইয়ের দাম ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, সুতরাং তাঁদের অন্য কোনো উপায়ও ছিল না।

এই কারণে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া অভিজাত নয় এমন মানুষদের সম্পর্কে আমাদের কাছে প্রায় কোনো খবরই এসে পৌঁছায়নি। যেমন সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি কালিদাস, তাঁর সম্পর্কে আমরা খুব কম জানি। কোথায় তাঁর জন্ম, কোথায় তিনি কাব্য রচনা করেছিলেন, কোন রাজার রাজসভায় ছিলেন, তাঁর রচনা থেকে সেই সব খবর বার করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু তার অনেকটাই অনুমান; পণ্ডিতরাও তা নিয়ে একমত নন। একই কথা প্রাচীন যুগের বিজ্ঞানীদের সম্পর্কেও বলা চলে। আবার আমাদের দেশে সাল তারিখ লেখার ব্যাপারে এক অদ্ভুত ঔদাসীন্য ছিল, সেই কারণে প্রাচীন বিজ্ঞানীদের মধ্যে একমাত্র আর্যভাট ছাড়া আর কোনো বিখ্যাত বিজ্ঞানীর জন্মকাল আমরা জানি না। আর্যভাট নিজের বইতে নিজের জন্মকাল লিখে গেছেন, কিন্তু তিনি ভারতের কোন অংশের মানুষ ছিলেন, তা জানা নেই।

আরো একটা কারণে সাধারণ মানুষের কথা সাহিত্যে লেখা হত না। পুরানো কালে মানুষের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে ছিল ঈশ্বর, ধর্ম, পরলোক, ইত্যাদি। তাই সে যুগের সাহিত্যেও এই সমস্ত নিয়েই বেশি ব্যাস্ত ছিল। রামায়ণ মহাভারতের মতো মহাকাব্য হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ ধর্মগ্রন্থ হিসাবে ভক্তিভরে পড়ে আসছে। রাজাদের ছাড়া তাই জীবনী লেখা হয়েছিল ধর্মপুরুষদের। যেমন শ্রীচৈতন্যদেবের জীবন নিয়ে লেখা কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্য চরিতামৃত। লোচন দাসের চৈতন্যমঙ্গল বা বৃন্দাবন দাসের লেখা চৈতন্য ভাগবত বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুগের জীবনীদের মধ্যে পড়বে।

আধুনিক যুগে কিন্তু মানুষ ও প্রকৃতি এসে দাঁড়িয়েছিল আমাদের চিন্তাভাবনার কেন্দ্রে; তখন থেকে যাঁরা আমাদের সেই চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করেছেন, সেই সব মানুষের জীবনী লেখার প্রয়োজন মনে হয়েছিল। আধুনিক যুগকে যে আমরা বিজ্ঞানের যুগ বলি, তার কারণ নিছক এই নয় যে এই যুগে অনেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও উদ্ভাবন হয়েছে। বিজ্ঞানের একটা বৈশিষ্ট্য হল যে যা আমরা জানি, তাকেই আরো ভালোভাবে জানতে চাওয়া, তাকে প্রশ্ন করা, পরীক্ষানিরীক্ষার মাধ্যমে তাকে যাচাই করা। মধ্য যুগে এই কথা বিশেষ কারো মাথায় আসেনি। ধর্মগ্রন্থে যা লেখা আছে বা প্রাচীন মনীষিরা যা বলে গেছেন, তাকে চোখ বুজে বিশ্বাস করাটাই ছিল অভ্যাস। আধুনিক বিজ্ঞান ঠিক এই জায়গাকে ধাক্কা দিয়েছিল; তার ফলেই আধুনিক যুগের জন্ম হয়েছিল। এখনি আমরা যে সমস্ত লেখার কথায় আসব, তাদের একটির থেকে উদ্ধৃত করি, “তৎকালীন লোকদিগের এই রীতি ছিল, পূবাচার্যেরা যাহা নির্দেশ করিয়া গিয়াছিলেন, কোনও বিষয়, তাহার বিরুদ্ধ বা বিরুদ্ধবৎ আভাসমান হইলে, তাঁহা শুনিতে চাহিতেন না।" আজ থেকে একশো পঁচাত্তর বছর আগে এই কথাটা কে লিখেছিলেন? ছাত্রদের জন্য লেখা 'জীবনচরিত' বইতে লিখেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

সেটা ছিল উনিশ শতক, যখন বিদেশি শাসনের হাত ধরে আসা আধুনিক দর্শন ও সংস্কৃতি যখন আমাদের সমাজকে ধাক্কা মারতে শুরু করেছে। জীবনী কেন পড়ব, তার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বইয়ের ভূমিকাতে বলেছেন, "প্রথমতঃ, কোন কোন মহাত্মারা অভিপ্রেতসাধনে কৃতকার্য্য হইবার নিমিত্ত যেরূপ অক্লিষ্ট পরিশ্রম, অবিচলিত উৎসাহ, মহীয়সী সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তর অধ্যবসায় প্রদর্শন করিয়াছেন ... তৎসমুদায় আলোচনা করিলে এক কালে সহস্র উপদেশের ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। দ্বিতীয়তঃ, আনুষঙ্গিক তত্তদ্দেশের তত্তৎকালীন রীতি, নীতি, ইতিহাস ও আচার পরিজ্ঞান হয়।" বিদ্যাসাগর যেমন মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী থেকে প্রেরণা ও উপদেশ নিতে বলছেন, তেমনি তাঁরা যে সমাজের মানুষ সেই সমাজ সম্পর্কেও জ্ঞানলাভ করতে বলছেন।

এটি বিদ্যাসাগরের মৌলিক রচনা নয়, রবার্ট চেম্বার ও উইলিয়াম চেম্বার্স ইংরাজিতে যে সমস্ত জীবনী লিখেছিলেন, তাদের কয়েকটির অনুবাদ। বিদ্যাসাগর বিজ্ঞানজগতের লোক ছিলেন না; সেই সময় আমাদের দেশে আধুনিক বিজ্ঞানের পড়াশোনাও শুরু হয়নি। কিন্তু তিনি অনুবাদের জন্য যাঁদের জীবনী বেছে নিয়েছিলেন, তাঁদের অধিকাংশই বিখ্যাত বিজ্ঞানী। তোমরা সবাই তাঁদের নাম জানো -- কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, উইলিয়াম হার্শেল, ক্যারোলাস লিনিয়াস। বিদ্যাসাগর ছিলেন সব অর্থেই একজন আধুনিক মানুষ। নারীদের শিক্ষা বিস্তার, বিধবা বিবাহের প্রচলন, এ সমস্ত কথা তোমরা সবাই জানো। তিনি বুঝেছিলেন যে এঁদের মতো বিজ্ঞানীদের গবেষণা থেকেই আধুনিক যুগের জন্ম। তাঁর আশা ছিল যে এই সব জীবনী আমাদের দেশের মানুষকে আধুনিক বিজ্ঞানের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সচেতন করবে, পুরানো রীতিনীতিকে প্রশ্ন করতে শেখাবে এবং এক আধুনিক সমাজের দিকে নিয়ে যাবে। বিদ্যাসাগরকে আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক বলা হয়; অর্থাৎ বাংলা গদ্যের প্রায় সূচনালগ্নেই বিজ্ঞানীদের জীবনী ছাত্রদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল।

বিদ্যাসাগর এর বাইরে বিজ্ঞান বা বিজ্ঞানী নিয়ে বিশেষ কিছু লেখেননি, কিন্তু তাঁর অন্য সূত্র থেকে তাঁর মত সম্পর্কে জানা যায়। তোমরা বড় হয়ে বিজ্ঞানের দর্শন সম্পর্কে পড়বে। ইংরেজ দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকনকে আধুনিক বিজ্ঞানের দর্শনের জনক বলে অনেকে মনে করেন; তিনি পরীক্ষানিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের উপর জোর দিয়েছিলেন । বিদ্যাসাগরের চিঠি ও অন্যান্য কিছু কাগজপত্র থেকে জানা যায় তিনি বেকনের মতকেই অনুসরণ করতেন। বিদ্যাসাগরের বন্ধু অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন বেকনের আর একজন ভাবশিষ্য, তিনি বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান নিয়ে অনেক বই লিখেছিলেন।

অক্ষয়কুমারের পরে বাংলায় বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখিতে যাঁর নাম করতে হয়, তিনি হলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী। প্রেসিডেন্সি কলেজ যখন থেকে বিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়ানো শুরু করে, সেই বছর তিনি রসায়নে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিলেন। বিজ্ঞান বিষয়ে অনেক লেখালেখি করলেও বিজ্ঞানীদের জীবনী তিনি একটি মাত্র লিখেছেন, তা হল হেরমান ফন হেলমহোলজ্‌-এর জীবনী। হেলমহোলজ্‌ উনিশ শতকের বিখ্যাততম বিজ্ঞানীদের অন্যতম, তোমরা স্কুলে যে শক্তির নিত্যতা সূত্র পড়েছ, তার কথা তিনিই প্রথম বলেছিলেন। পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও শারীরবিদ্যা নানা বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। তিনি ১৮৯৪ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস পরে রামেন্দ্রসুন্দর এক প্রবন্ধে তাঁর গবেষণার বিস্তারিত পরিচয় দিয়েছিলেন।

ছোটরা এই লেখাটি পড়ে নিশ্চয় লাভবান হবে, কিন্তু এই লেখাটি তিনি আলাদা করে ছোটদের জন্য লেখেননি। তিনি কলেজে পড়াতেন, তাই তাঁর অধিকাংশ বিজ্ঞান লেখাই বড় ছাত্রদের জন্য। এবার আর একজনের কথা বলি, আঁর লেখা তোমরা সবাই পড়েছ, তিনি সুকুমার রায়। মজার মজার নানা লেখার জন্য বিখ্যাত হলেও তিনি বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের নিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর প্রবন্ধ লিখেছেন, সে সবই ছোটদের জন্য। সুকুমার ১৯০৭ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে একই সঙ্গে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে অনার্স নিয়ে পাস করেন। তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরি তাঁকে ইংল্যান্ডে পাঠান। সেখানে তিনি ফটোগ্রাফি ও প্রিন্টিং, অর্থাৎ আলোকচিত্র ও মুদ্রণ বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। বিজ্ঞানের অনেক প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন, আর ছোটদের জন্য লিখেছিলেন আর্কিমিডিস, গ্যালিলিও, লুই পাস্তুর ও ডারউইনের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবনী। খুব অল্পবয়সে সুকুমার মারা যান, এ বাংলা সাহিত্যের এক অপূরণীয় ক্ষতি।

আমরা তাঁর ডারউইন প্রবন্ধটার দিকে একটু চোখ রাখি। সুকুমার বিজ্ঞানের মূল কথাটাই কত সহজ করে লিখেছেন দেখো; "ছেলেবেলায় ভাবিতাম, পণ্ডিতদের খুব বুদ্ধি বেশি, তাই তাঁহারা অনেক কথা জানিতে পারেন। কিন্তু এখন দেখিতেছি কেবল তাহা নয়। বুদ্ধি ত বটেই, তাছাড়া আরও কয়েকটি জিনিস চাই, যাহা না থাকিলে কেহ কোনদিন যথার্থ পণ্ডিত হইতে পারে না। তাহার মধ্যে একটি জিনিস, ঠিকমতো দেখিবার শক্তি। সাধারণ লোকে যেমন দুই-একবার চোখ বুলাইয়া মনে করে ইহার নাম 'দেখা'—পণ্ডিতের দেখা সেরকম নয়। তাঁহারা একই বিষয় লইয়া দিনের পর দিন দেখিতেছেন, তবু দেখার আর শেষ হয় না।" বারবার একই জিনিস দেখতে হবে, সেই দেখাকেও প্রশ্ন করতে হবে -- বিজ্ঞানের এক মূল কথা।

একটু বড় উদ্ধৃতি হলেও দেখো কি চমৎকার ভাষায় সুকুমার ডারউনের বিবর্তনতত্ত্ব বুঝিয়েছেন! "ডারুইন দেখিলেন, মানুষের বুদ্ধিতে যেমন নানারকম বাছাবাছি চলে, প্রাণিজগতেও সর্বত্রই স্বাভাবিকভাবে সেইরূপ বাছাবাছি চলে। যারা রুগ্ন যারা দুর্বল মরিবার সময় তাহারাই আগে মরে, যাহারা বাহিরে নানান অবস্থার মধ্যে আপনাকে বাঁচাইয়া রাখিতে পারে, তাহারাই টিকিয়া যায়। কাহারও গায়ে জোর বেশি, সে লড়াই করিয়া বাঁচে; কেহ খুব ছুটিতে পারে, সে শত্রুর কাছ হইতে পলাইয়া বাঁচে; কাহারও চামড়া মোটা, সে শীতে কষ্ট সহিয়া বাঁচে; কাহারও হজম বড় মজবুত, সে নানা জিনিস খাইয়া বাঁচে; কাহারও গায়ের রং এমন যে হঠাৎ চোখে মালুম হয় না, সে লুকাইয়া বাঁচে। বাঁচিবার মতো গুণ যাহার নাই সে বেচারা মারা যায়, আর সেই সব গুণ আর লক্ষণ যাহাদের আছে তাহারাই বাঁচিয়া থাকে, তাহাদেরই বংশ বিস্তার হয়, আর বংশের মধ্যে সেইসব বাছা বাছা গুণগুলিও পাকা হইয়া স্পষ্ট হইয়া উঠে। এইরূপ আপনাকে বাঁচাইবার জন্য সংগ্রাম করিতে করিতে, বাহিরের নানা অবস্থার মধ্যে প্রত্যেক জন্তুর চেহারা নানারকম গড়িয়া ওঠে।"

এবার কয়েকজন জীবনীকারের কথা বলব, যাঁরা নিজেরাও বিখ্যাত বিজ্ঞানী। তোমরা সবাই তাঁদের নাম জানো। প্রথমজন হলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, যিনি আমাদের দেশে আধুনিক রসায়ন গবেষণার সূচনা করেন। তিনি বাংলাতে অনেক লেখালেখি করেছেন, এমনকি স্কুলের ছাত্রদের জন্য জীবন বিজ্ঞান বইও লিখেছেন। তবে জীবনী প্রবন্ধ তিনি একটি লিখেছেন, লুই পাস্তুরের উপর সেই লেখাটিতে তাঁকে সাহায্য করেছিলেন সত্যপ্রসাদ রায়চৌধুরী।

পরের দু'জন প্রফুল্লচন্দ্রের ছাত্র সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহা। দুজনের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব ছিল; তাঁরা একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন, গবেষণা করেছেন, আবার একসঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন। এত ব্যস্ততার মধ্যেও তাঁরা লেখালেখি করেছেন, এবং সেখানে কয়েকজন বিজ্ঞানীর সম্পর্কে লিখেছেন। সেই লেখার সবগুলিকে ঠিক জীবনী বলব না। অনেক সময় তাঁরা তাঁদের পরিচিত সমসাময়িক কয়েকজন বিজ্ঞানীর গবেষণা সম্পর্কে লিখেছেন, সেই প্রসঙ্গে হয়তো কখনো কখনো জীবনের কথাও এসেছে। যেমন ১৯২১ ও ১৯২২ সালে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত তিন বিজ্ঞানীর কথা লিখেছেন মেঘনাদ, তাঁরা হলেন আলবার্ট আইনস্টাইন, নিলস বোর ও ফ্রান্সিস অ্যাস্টন। মেঘনাদের সঙ্গে এঁদের সকলেরই আলাপ ছিল। বিজ্ঞানের বাইরেও আইনস্টাইন ও অ্যাস্টনের জীবনের কিছু কথা সেখানে জানতে পারি। সত্যেন্দ্রনাথ কয়েকজন বিজ্ঞানীর জীবন নিয়ে লিখেছেন; তাঁদের মধ্যে আছেন গ্যালিলিও, আইনস্টাইন, মাদাম কুরি। তোমরা নিশ্চয় আইনস্টাইন ও সত্যেন্দ্রনাথের সম্পর্কের কথা জানো, কলেজে পদার্থবিদ্যাতে বোস-আইনস্টাইন সমীকরণ পড়ানো হয়। মাদাম কুরির ল্যাবরেটরিতে সত্যেন্দ্রনাথ কয়েকমাস কাটিয়েছেন। লেখা থেকে দেখতে পাই দুজনের প্রতিই সত্যেন্দ্রনাথের ছিল অসীম শ্রদ্ধা।

মেঘনাদ বা সত্যেন্দ্রনাথের মতো বিজ্ঞানীরা কেন হঠাৎ বিজ্ঞানীদের জীবন নিয়ে লিখতে বসলেন? গ্যালিলিওর সম্পর্কে প্রবন্ধের শেষে সত্যেন্দ্রনাথ লিখেছেন, “ (গ্যালিলিও) বলেছিলেন নিজে পরীক্ষা, বিচার ও যাচাই করে নিতে হবে সব সত্যকে -- শুধু আপ্তবাক্যকে বিশ্বাস করে জীবনকে গড়ে তুললে ভুল হবে।" আমরা বুঝতে পারি যে সত্যেন্দ্রনাথ গ্যালিলিও জীবনের মাধ্যমে আমাদের বিজ্ঞানের পদ্ধতি সম্পর্কে শিক্ষা দিতে চাইছেন। অ্যাস্টন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মেঘনাদ লিখেছেন তিনি পড়াশোনাতে মোটেই ভালো ছিলেন না। "তাঁহার খুব প্রখর বুদ্ধি বা প্রতিভা নাই। কিন্তু আছে অদম্য উৎসাহ, ও অধ্যবসায় ও চেষ্টা।" তার জোরেই তিনি নোবেল পুরস্কারের যোগ্য কাজ করেছেন। সুকুমারও প্রায় একই কথা লিখেছেন ডারউইন সম্পর্কে, “তাঁহাকে কেহ বুদ্ধিমান বলিয়া জানিত না, মাস্টারেরা তাঁহার উপর কোনদিনই কোন আশা রাখেন নাই—বরং সকলে দুঃখ করিত 'এ ছেলেটার আর কিছু হইবে না।' অথচ এই ছেলেই কালে এক অসাধারণ পণ্ডিত হইয়া সমস্ত পৃথিবীতে আপনার নাম রাখিয়া গিয়াছেন।" তোমাদেরও বলি, একটা দুটো পরীক্ষাতে খারাপ হয়েছে বলে ভেঙে পড়ার কিছু নেই। ডারউইন বা অ্যাস্টনের জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

আমরা যে সব লেখার কথা বললাম, সেগুলি এক একটা প্রবন্ধ, অল্প কথায় যেখানে জীবনের পরিচয় দেওয়া আছে। সাধারণত সেগুলি নানা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সুকুমার রায়ের প্রায় সব লেখাই ছোটদের পত্রিকা সন্দেশ-এ বেরিয়েছিল। প্রফুল্লচন্দ্রের লেখা পাস্তুরের জীবনীটি প্রকাশিত হয়েছিল বিখ্যাত প্রবাসী পত্রিকাতে। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান প্রচারের জন্য সত্যেন্দ্রনাথ বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরিষদের পত্রিকা জ্ঞান ও বিজ্ঞান-এ তঁর অনেকগুলি লেখা বেরিয়েছিল।

তোমাদের হয়তো মনে হচ্ছে, এতক্ষণ শুধু বিদেশী বিজ্ঞানীদের কথাই বললাম, আমাদের ভারতবর্ষের বিজ্ঞানীদের জীবনী নিয়ে কি কেউ লেখেননি? নিশ্চয় লিখেছেন, কিন্তু ভালো লেখা এসেছে অনেক পরে। তার একটা কারণ আগেই বলেছি, প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞানীদের সম্পর্কে আমরা খুব কম খবর পেয়েছি। তাই তাঁদের জীবনীতে তথ্য কম, গল্প বেশি। ভারতে আধুনিক বিজ্ঞানের চর্চা শুরু হয়েছিল দুজনের হাত ধরে, আচার্য জগদীশচন্দ্র ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ দুজনেই এঁদের সম্পর্কে লিখেছেন। কিন্তু তাঁরা এঁদের ছাত্র, তাই সেই সব লেখাকে জীবনী না বলে স্মৃতিচারণ বলাই ভাল। পরবর্তীকালে ভারতীয় ও বিদেশী বিজ্ঞানীদের পূর্ণাঙ্গ জীবনীও লেখা হয়েছে বেশ কিছু, তার মধ্যে অনেকগুলিতে তাঁদের গবেষণার কথা আলোচনা আছে। তোমরা আরো বড় হলে তা বুঝতে পারবে। কিন্তু পুরোপুরি না বুঝলেও সেইসব বই পড়তে তোমাদের ভাল লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস। প্রকৃতিবিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের জগদীশচন্দ্রের অধীনে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষণা করেছিলেন, তিনি লিখেছেন জগদীশচন্দ্রের জীবনী। সত্যেন্দ্রনাথের ছাত্রী পূর্ণিমা সিংহ প্রথম মহিলা যিনি ভারতের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যাতে ডক্টরেট করেছেন। তিনি তাঁর মাস্টারমশায়ের জীবনী লিখেছেন। মেঘনাদ ও সত্যেন্দ্রনাথের ছাত্ররা অনেকেই বিজ্ঞানে নাম করেছিলেন, তাঁরা তাঁদের শিক্ষকদের কথা লিখেছেন। এঁদের মধ্যে জয়ন্ত বসু ও শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়ের নাম উল্লেখযোগ্য। প্রফুল্লচন্দ্র, সি ভি রামন, মেঘনাদ, সত্যেন্দ্রনাথ, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ, গোপালচন্দ্র, শ্রীনিবাস রামানুজন, হোমি ভাভা বা তাঁদের সমসাময়িক ভারতীয় বিজ্ঞানীদের জীবনকথা আরো অনেকেই লিখেছেন। এই লেখাতে আমরা আর সেই সব কথাতে যাব না, তোমরা তোমাদের বাবা মা বা স্কুলের শিক্ষকশিক্ষিকাদের থেকে অনেক বিজ্ঞানীর জীবনীর খবর পাবে। পুরানো লেখা উদ্ধৃতির সময় সেই যুগের বানান ও ভাষা পাল্টালাম না, আশা করি তোমাদের পড়তে অসুবিধা হবে না।

 

ছোটদের আলোলিকা শারদীয় ২০২৪