Thursday, 19 May 2022

চিড়িয়াখানা

চিড়িয়াখানা

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

      

       রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি

       জঙ্গলে রাস্তা হারানোর গল্প অনেক শুনেছি, কিন্তু এতদিন ভাবতাম সে সব বোকাদের হয় তোমারাই বলো, সোজা যাওয়াটা কোনো ব্যাপার হল? ঠিক করে নিলাম কোনদিকে যাব, সামনে গাছ বা ঝোপ পড়লে তার পাশ দিয়ে ঘুরে যাব এতে ভুল হতে যাবে কেন?

       বড়মামি অনেক করে আমাকে বলেছিল, ‘দেখ, বেলা আর বেশি নেই আজকের দিনটা আমাদের বাড়িতে থেকে যা কাল সকালের বাসেই রওনা হয়ে যাবি এমনিই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে রাস্তা গুলিয়ে যেতেই পারে সন্ধে হয়ে গেলে আরো বিপদে পড়বি

       ‘ভারি তো জঙ্গল, বাঘ ভাল্লুক আছে যে ভয় পেতে হবে?’

       ‘তা নেই, শিয়ালের চেয়ে বড়ো কোনো জন্তু আর এই জঙ্গলে নেই বাঘ চিতাবাঘ তো ইংরেজরা কবেই মেরে শেষ করে দিয়েছে মাঝে মধ্যে একটা ভাল্লুক ছিটকে ছাটকে এসে পড়ে তবু রাতটা থেকে গেলেই পারিস।’ বড়মামা বলল

       একটু আগে খরগোসকে ভয় পাব বলে ঠাট্টা করে এখন কিনা বলে থেকে যা! ‘না, না কাল সকালেই আমাকে আবার বেরোতে হবে দেরি হলে সমস্যা রাত হবে কেন, কতটুকু আর রাস্তা? হলেও অসুবিধা নেই আজ পূর্ণিমা, চাঁদের আলোতে দেখে দেখে চলে যাব তোমরা একদম চিন্তা করো না

       এসেছিলাম অফিসের কাজে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ কদিন থাকতে হবে জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ আর ঝাড়খণ্ডের সীমান্তের কাছেই খুব সুন্দর পরিবেশ পাশেই ডুগাডুগি নদী। একসময় এখানে অনেক সাহেব থাকত, তাদেরই একটা বাড়িতে হোটেল চালু হয়েছে। সেখানেই উঠেছি।

ম্যাকলাস্কিগঞ্জ আসছি শুনে মা বার বার করে বলে দিয়েছিল, বড়মামার সঙ্গে যেন দেখা করে আসি মামারা থাকে বেতড় বলে একটা গ্রামে একদিন সকালে বেরিয়ে বড়মামাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম জঙ্গলের ধার ধরে বাসের রাস্তা, দারুণ দৃশ্য জঙ্গলের মধ্যে প্রায় মামাদের বাড়ি ফোন করেই গিয়েছিলাম, মামার বাড়িতে সময়টাও ভালোই কাটল বিপদটা হল ফেরার সময় বেতড়ে সারাদিনে দুটো বাস আসে, দুটোই ম্যাকলাস্কিগঞ্জ থেকে বিকেল তিনটের সময় বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে শুনি বিকেলের বাস ক্যানসেল

       ‘এখানে একটা গাড়ি পাওয়া যাবে না?’ আমি বড়মামাকে জিজ্ঞাসা করি

       ‘গাড়ি বেতড়ে শুধু আমাদেরই আছে, কিন্তু সে তো রাঁচিতে গাড়ি মানে জিপ, এখানের রাস্তার পক্ষে সবচেয়ে ঠিক একটু মেরামত করতে দিয়েছি ড্রাইভার সঙ্গে গেছে পরশু ফিরবে      ‘আসার সময় তো বাসে প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগলো শর্ট কাট রাস্তা নেই? আমাকে কাল সকালে বেরোতেই হবে সকালের বাসে গেলে তো এগারটার আগে পৌঁছনো যাবে না

       ‘বাস ঘুরে ঘুরে এসেছে জঙ্গলের ভিতরের রাস্তা দিয়ে বেশি দূর নয়, কিলোমিটার দশেক হবে কিন্তু তুই শহরের লোক, দশ কিলোমিটার হাঁটতে পারবি? তাও আবার বনের মধ্যে দিয়ে?  ফোনের টাওয়ার পাবি না। জঙ্গলে ঘোরার অভ্যাস নেই, খরগো দেখে ভির্মি খেতে পারিস। তখন আবার তোকে খুঁজতে লোক পাঠাতে হবে।’

       সম্মানে লেগে গেল ‘তুমি রাস্তাটা বলে দা আমি ঠিক চলে যাব     

       আপত্তি মামির ছিল, কিন্তু আমি কিছুতেই থাকব না বুঝে হাল ছেড়ে দিল। বারবার করে বলে দিল, পৌঁছেই যেন ফোন করে দিই। মামা রাস্তাটা ভালো করে বুঝিয়ে দিল। তখন তো মনে হয়েছিল সোজা। পায়ে চলা একটা পথ ধরে কিছুটা যেতে হবে  ডানদিকের দুটো রাস্তা ছেড়ে তিন নম্বরটা ধরতে হবে। সেটা পড়বে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মাঠের মতো একটা ফাঁকা জায়গায়তার মাঝে কিন্তু এক ধার করে একটাই বড়ো গাছ আছে। সেই গাছের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডান দিকে আর একটা পায়ে চলা পথ বেরিয়েছে। সেটা দিয়ে কিছুটা এগোলেই ডুগাডুগি নদী। এবার বাঁদিকে ঘুরে তার ধার ধরে ধরে গেলেই ম্যাকলাস্কিগঞ্জ এর মধ্যে শক্ত আছেটা কী? মামা এমনকি একটা কাগজে ম্যাপের মতো করে রাস্তাটা এঁকেও দিয়েছে।

       শক্ত কী আছে টের পেলাম যখন দেখলাম কোনটা মানুষের পায়ে চলার রাস্তা বুঝতে পারছি না। তার আগে পর্যন্ত দিব্যি যাচ্ছিলাম। মনোরম পরিবেশ। সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছিল একপাল গরুর গলার ঘণ্টার আওয়াজ। কাঠের ঘণ্টারা একসঙ্গে বাজলে যে এত শ্রুতিমধুর হতে পারে, না শুনলে তোমাদের বিশ্বাস হবে না। গ্রাম ছেড়ে জঙ্গলে ঢোকার পরেও বহুক্ষণ সেই আওয়াজ কানে আসছিল। কিন্তু তার পরেই হল সমস্যা। ডানদিকের কোন রাস্তাটা তিন নম্বর? অনেক চিন্তা করে যেটা ধরলাম, সেটা কিছুটা গিয়েই শেষ হয়ে গেল। আবার ফিরে আসতে হল। তার পরের রাস্তাটাও একই ব্যাপার। আবার ফিরে এসে পিছিয়ে এসে আগের একটা রাস্তা ধরতে হল। অবশেষে একটা মাঠ পেলাম।

       রাস্তা হারানোর জন্য কিছুটা ঘুরতে হয়েছে। রোদ তখন পড়ে এসেছে। শীতকাল হলেও হাঁটাহাঁটি করে বেশ গরম লাগছিল পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছলাম। মাঠটা একটা ফুটবল গ্রাউন্ডের মতো বড়ো। কিন্তু এটার কথাই কী মামা বলেছিল? মাঠের মধ্যে গাছ একটা নয়, দুটো। আমি শহরের লোক, গাছ বিশেষ চিনি না। গাছ দুটোর মধ্যে একটা ছোটোই, কিন্তু ঝুরি নেমেছেঅনুমান করলাম সেটা বট জাতীয় কিছু হবে। গাছটা ছোট হলে কী হবে, ঝুরিগুলো বেশ মোটা মোটা, গুঁড়ির মতোই লাগছে। শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের বটগাছটার কথা মনে পড়ে গেল।

       কোন গাছটার কথা মামা বলেছিল? পরপর দুটো গাছ, তাদের দুটোরই পাশে একটা করে রাস্তা। আরো কয়েকটা পায়ে চলা পথ এদিক ওদিক বেরিয়েছে। মামা নিশ্চয় গুলিয়ে ফেলেছে। ওই বটগাছ নাকি, তার পাশ দিয়েই একটা রাস্তা গেছে। সেটাই ধরলাম।

       জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতেই আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। শালগাছ, সেগুন গাছ -- তাদের মাথায় বিকেলের রোদ বটে, কিন্তু তা নিচে এসে পৌঁছচ্ছে না। আমায় যেতে হবে উত্তর দিকে। কিন্তু রাস্তাটা এঁকেবেঁকে গেছে। কিছুক্ষণ পরে কোন দিকে যাচ্ছি গুলিয়ে ফেললাম।

       নদীটাই বা কোথায়? অনেকটা পরে গাছের ফাঁক দিয়ে সামনে কিছুটা ফাঁকা জায়গা দেখতে পাচ্ছি, ওইটাই নিশ্চয় নদীটা। পা চালিয়ে এগোলাম।

       যা: বাবা, এ যে আরো একটা মাঠ। ঘুরে ঘুরে কী আগের মাঠটাতেই এসে পড়লাম নাকি? না না, এটায় তো মাত্র একটা গাছ।  আগের মাঠে যে বটগাছের মতো দেখতে গাছটা ছিল, সেটা নেই। মামা কি তাহলে এই মাঠটার কথাই বলেছিল? আমি কী ভুল করে অন্য দিকে চলে গিয়েছিলাম? নিশ্চয় তাই হবে। ম্যাপটা দেখি তো।

       পকেটে হাত দিয়ে দেখি ম্যাপ নেই। নিশ্চয় রুমাল বার করতে গিয়ে পড়ে গেছে। ঠিক আছে, আমার মনে আছে গাছের দিকে মুখ করে ডান দিকের রাস্তা। এগোচ্ছি, হঠাৎ খেয়াল পড়ল ঘাসের উপর সাদা মতন কী একটা পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখি একটা কাগজ। নিশ্চয় একটু আগে এখান দিয়ে কেউ গেছে। কাগজটা তার পকেট থেকেই পড়েছে। দুপুরে এখানে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল – ঘাস এখনো ভিজে কিন্তু কাগজটা মোটামুটি শুকনোই।

       কৌতূহলবশত হাতে তুলে নিলাম কাগজটা। আরে এটা যে মামার আঁকা সেই ম্যাপটা -- এটা এখানে কী করে এলো?

       আবার ভালো করে দেখলাম। না, একটাই তো গাছ। আমি তো এখানে আসিনি। তাহলে কাগজটা এখানে এলো কোথা থেকে? 

       এইবার সত্যি সত্যি ভয় করতে লাগল। পুরোপুরি অন্ধকার তখনো হয়নি, কিন্তু আমার গা ছমছম করছে। কলকাতায় বসে বিদ্যুতের আলোয় যেসব ভূতের গল্প পড়ে তোমাদের মতো আমারও হাসি পেত, তাদের কয়েকটা মনে এলো। ফিরে যাব নাকি? কিন্তু কোন দিক দিয়ে? ফিরতেও তো সময় লাগবে। ফিরে গেলে আবার মামার টিটকিরি শুনতে হবে। শাঁখের করাত দিয়ে  স্কুলে বাক্যরচনা করতে হয়েছে যাদের, তারা নিশ্চয় অবস্থাটা বুঝতেই পারছ।

       সামনের দিকেই যাই। আগের বার যে পথটা ধরেছিলাম, সেটা বাদ দিয়ে আর একটু এগোলাম। আগেই খেয়াল করেছিলাম, ওই গাছটার পরেই রয়েছে আরো একটা পথমানুষ চলাচল করার রাস্তা, ঘাস বিশেষ গজায়নি। মামা এটার কথাই হয়তো বলেছিল।

       সন্ধে হয়ে এসেছে, জঙ্গলের ভিতরে আলো বলতে ভরসা সঙ্গের মোবাইল। ফোনে টাওয়ার নেই, কাজেই মামাকে পথ জিজ্ঞাসা করার উপায় নেই। রাস্তাটা দিয়ে পায়ে পায়ে এগোলাম। শীতকাল বলে সাপখোপের ভয় নেই, সেটাই বাঁচোয়া। মোবাইলের টর্চটা মাঝে মাঝে জ্বালাচ্ছি। টানা জ্বালিয়ে রাখতে সাহস হচ্ছে না, কতক্ষণ এই জঙ্গলে ঘুরতে হবে কে জানে? হঠাৎই দেখি রাস্তা আর নেই, সামনে একটা গাছ।

       আলো আঁধারিতে দেখলাম গাছটা ছোটো, কিন্তু মোটা মোটা ঝুরি নেমেছে। ঠিক যেন মাঠের সেই ভ্যানিশ হয়ে যাওয়া গাছটা। রাস্তাটা হঠাৎ শেষ হবে কেন? মাঠের সেই গাছটাই গেল কোথায়? গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। মনকে বোঝালাম, এটা সেই গাছটা হতে পারে না, সেটা ছিল মাঠের মধ্যে। সব বটগাছই হয়তো আমার মতো শহরের ছেলের কাছে একরকম দেখতে লাগে।

       পাশ কাটিয়ে এগিয়ে দেখব রাস্তাটা পাওয়া যায় কিনা? নাকি পিছনে ফিরব? পিছন দিকে তাকানো মাত্র হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে গলার কাছে উঠে গেল। রাস্তার ঠিক মাঝখানে অন্ধকারের মধ্যে তিনটে লাল আলোর বিন্দু জ্বলছে, ঠিক যেন তিনটে চোখ। মাটি থেকে দোতলা বাড়ির কাছাকাছি উঁচুতে। মোবাইল পকেটে রেখেছিলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে বার করলাম, আলো জ্বালার আগেই ধুপধাপ শব্দ করে বিরাট চেহারার কি যেন একটা জঙ্গলে ঢুকে গেল। পিছনের গাছটার পাতাগুলোতে একই সঙ্গে সড়সড় আওয়াজ হল, কিন্তু সেদিকে মন দেওয়ার মতো অবস্থা আমার ছিল না।

       এতো বড় কোন জন্তু এখানে আছে? তিনটে চোখ কেমন করে, লাল রঙেরই বা কেন? এমন সব প্রশ্ন মাথায় এলো, কিন্তু সবার আগে মনে হল – প্রাণীটা হিংস্র নয় তো? আমাকে কি দেখতে পেয়েছে?

       পিছন দিকে আর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, বটগাছটার পাশ দিয়েই যেতে হবে। পিছনে ঘুরলাম।

       গাছটা নেই।

       আমাকে তোমরা ভিতু ভাবতেই পারো, কিন্তু বাজি রেখে বলতে পারি তোমাদেরও তখন একই অবস্থা হত। পাগুলো যেন মাটির সঙ্গে স্ক্রু করে কেউ আটকে দিয়েছে। শীতের মধ্যেও ঘামতে শুরু করে দিয়েছি। একটা আস্ত গাছ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে যেতে পারে নাকি? আলো জ্বাললাম। পায়ে চলা পথটা ফিরে এসেছে। মাটিতে কিছু দাগ মতো আছে, কিন্তু তার বেশি নয়। একি ভোজবাজি নাকি?

       হতবাক হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানিনা। তারপর একেবারে পড়িমরি দৌড় মারলাম। কোনদিকে জানি না, অন্তত এই জায়গা থেকে পালাতেই হবে। পাঁচ মিনিট ছুটেছি বোধহয়। অন্তত তিনবার হোঁচট খেয়ে পড়েছি, বেশিও হতে পারে।  তারপর দাঁড়াতেই হল। আর দম নেই।     

       জোরে জোরে হাঁপাচ্ছি, স্কুল ছাড়ার পরে দৌড়োদৌড়ির অভ্যাস নেই। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলাম। অন্ধকার হয়ে গেছে, মোবাইলের আলোটা নিশ্চয় কোনো সময় বন্ধ করেছিলাম, মনে নেই কখন। কাজেই কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কোথায় এসেছি আর  কোনদিকে যেতে হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে সারা রাত এই জঙ্গলেই কাটাতে হবে। কিন্তু যেখানে তিনচোখো দানবরা পিছু নেয় আর জঙ্গলের গাছরা ঘুরে বেড়ায় সেখানে সারারাত তো দূরের কথা এক মিনিট থাকার কথাও ভাবতে পারছি না।

       হঠাৎ খেয়াল হল, আমি তো আর হাঁপাচ্ছি না, তাহলে জোরে জোরে নিঃশ্বাসের শব্দ কোথা থেকে আসছে?

       নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেললাম, কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলাম। মনে হল আওয়াজটা ডান দিক থেকে আসছে। আস্তে আস্তে নিঃশব্দে ফিরলাম সেদিকে। আওয়াজটা উপর থেকে আসছে।

       মাথাটা ক্রমশ উপরে তুলতে লাগলাম। সামনের গাছটা বোধহয় কুড়ি ফুট উঁচু হবে, অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না কী গাছ। তার উপরের দিকের একটা ডালে বসে আছে কিছু একটা। হনুমান, নাকি অন্য কিছু? আলোটা জ্বালব নাকি? আমাকে দেখতে পেয়ে যাবে। কিন্তু দৌড়ের সময় আমি যা আওয়াজ করেছি, তাতে করে এক কিলোমিটারের মধ্যে কোন জন্তুর কি জানতে বাকি আছে?

       কাঁপা কাঁপা হাতে আবার মোবাইলের টর্চটা জ্বাললাম। চোখ সয়ে যেতে দেখি ...

       কী বলব? এরকম কোনো জন্তুর কথা কখনো কল্পনাতেই আসেনি। সত্যি কথা বলতে সেটা প্রাণী না অন্য কিছু, তাই বুঝতে পারছিলাম না। ঠিক যেন একটা পিরামিডকে কেউ মাঝখান থেকে কেটে উপরের দিকটা বাদ দিয়ে দিয়েছে। মাথা পা হাত ডানা লেজ কিচ্ছু নেই, চওড়ায় ফুট চারেক, দু ফুট উঁচু। যন্ত্র মনে হতেই পারত, কিন্তু শরীরটা পালকজাতীয় কিছুতে ঢাকা, নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো করে দেহটা বাড়ছে কমছে। কেমন করে কিছু দিয়ে না ধরে গাছের ডালে বসে আছে বুঝতে পারলাম না।

       প্রথমেই মনে হল ভূত নিশ্চয়! কিন্তু মাথা কাটা যাওয়া পিরামিডের মতো কোনো ভূতের কথা কেউ শুনেছে? মানুষ মরে যদি ভূত হয়, তাহলে গাছ মরেও হয়তো ভূত হতে পারে। কিন্তু পিরামিড মরে কেমন করে? আর তার কি প্রাণ ছিল যে মরে ভূত হবে? ভূত হলেও সে মিশর ছেড়ে ঝাড়খণ্ডে আসবে কেন? পিরামিডের মাথা কাটা গেলে কি সে কন্ধকাটা ভূত হয়? ভূতে কি নিঃশ্বাস নেয়? এক রাতের মধ্যে চলমান গাছ, পিরামিডের ভূত, তেচোখো দানব! আমি নিশ্চয় পাগল হয়ে গেছি।

       এই সমস্ত কথা যখন ভাবছিলাম, তখন আমি কিন্তু বোকার মতো দাঁড়িয়েছিলাম না। এক পা এক পা করে পিছচ্ছিলামদূরত্বটা যখন ফুট কুড়ি হয়েছে, দেখি পিরামিডটা গাছ থেকে লাফিয়ে নামল। অমনি নিচের দিকে চারটে পায়ের মতো কি বেরিয়ে এলো। ওরে বাবা, আমার দিকে আসছে যে! আবার পিছন ফিরে দৌড় মারলাম। পিছন থেকে একটা শিসের মতো আওয়াজ কানে এসেছিল, খুব তীক্ষ্ণ। মনে পড়ল বিদেশের গল্পে ব্যানশি ভূতের কথা পড়েছিলাম, তারা নাকি এইরকম কাঁদে। কিন্তু সে তো আয়ারল্যান্ডের গল্প। অবশ্য ম্যাকলাস্কিগঞ্জে একসময় অনেক মেমসাহেব থাকত, তাদের কেউ মরে কী ব্যানশি হয়ে থাকতে পারে? এত বিপদের মধ্যেও কিন্তু মোবাইলটা হাত থেকে ছাড়িনি। টর্চটা নেভানোর কথা এবার অবশ্য মাথায় আসেনি।

       কয়েক মিনিটও হয়নি, সেই গাছভূতের থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। তাই এখন আর খুব দম নেই। জোরে দৌড়োতে পারছি না। পিছন ফিরে দেখব সে সাহস নেই। কোনো আওয়াজ শুনতে পাইনি, অবশ্য আমি নিজেই যা আওয়াজ করছি, তাতে অন্য কোনো শব্দ কানে আসা শক্ত।       

       দৌড়োতে দৌড়োতে হঠাৎ বুঝলাম আশপাশে গাছ আর নেই। পায়ের তলার জমিটা নেমে গেছে। কোনোরকমে টাল সামলালাম। একটা শব্দ কানে এলো। জলের আওয়াজ। নিশ্চয় ডুগাডুগি নদীর কাছে এসে পড়েছি।

       মোবাইলের আলোটা নিভিয়ে দিলাম। চাঁদের আলো এসে পড়েছে। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধে দাঁড়িয়ে রইলাম। স্রোতের শব্দ, ঝিঁঝিঁর ডাক, দূরের রাতচরা পাখির ডাক – আর কোনো শব্দ কানে আসছে না। শুনেছি গরমকালে নাকি ডুগাডুগি নদী প্রায় শুকিয়ে যায়এখন শীতকাল, কিন্তু কদিন আগে ভারি বৃষ্টি হয়েছিল। এখনো মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই নদীতে বেশ জল।

       মামা কী যেন বলেছিল! ডানদিক না বাঁদিক? কোনদিকে ঘুরব? আবার ম্যাপটা বার করলাম। মোবাইলের আলো জ্বাললাম। আচ্ছা, বাঁদিকে ঘুরতে হবে। নদীর ধার ধরে ভয়ে ভয়ে রওনা দিলাম। ভেবেছিলাম আওয়াজ করব না, কিন্তু কাদায় পা পড়ে প্যাচপ্যাচ আওয়াজ হচ্ছে। নদীর ধার ছেড়ে একটু ওপরের শক্ত ডাঙায় উঠে এলাম।

       মোবাইলের ব্যাটারি বেশিক্ষণ থাকবে না, তাই সারাক্ষণ আলো জ্বালিয়ে খরচ করছি না, অল্প অল্প করে জ্বালাচ্ছি। পূর্ণিমার চাঁদ উঠে গেছে, খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। একটু একটু করে এগোচ্ছি আর একটু একটু করে সাহস ফিরে পাচ্ছি। তাও বার বার পিছন দিকে তাকাচ্ছিলাম। একবার দুবার মনে হল যেন একটা বিরাট ছায়া আমার পিছু নিয়েছে। পিছনে আলো ফেললাম, কিন্তু কিছু বুঝতে পারলাম না।

       আরো একটু এগোতেই দেখলাম যে নদীর ধারটা এমন ঘন ঝোপঝাড়ে ভর্তি যে তার মধ্যে দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। হয় আবার বনের মধ্যে ঢুকতে হবে, না হয় নদী পেরোতে হবে। কিন্তু নদীতে স্রোত বেশ, তার উপর শীতের সন্ধে। নামার প্রশ্নই ওঠে না। আবার জঙ্গলে ঢুকতে হবে ভাবতেই গা হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কিন্তু  অন্য কোনো উপায় নেই।  তবু আমি আবার বাজি রেখে বলতে পারি আমার মতো সাহস তোমাদের কারোর হতো না। পারতে আবার জঙ্গলে ঢুকতে? যদি জানতে ওইরকম ভূতগুলো সব বনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে? আমি কিন্তু চার পাঁচবারের বেশি ভাবিনি।

       মোবাইলের আলোতে দেখলাম একটা পায়ে চলা পথের মতো। নিশ্চয় এখান দিয়ে যেসব মানুষ যায়, তারা বনের মধ্যে দিয়েই চলে। সেই পথটাই ধরলাম। বনের মধ্যে অন্ধকার। মাঝে মাঝে শুকনো পাতার খড়খড় আওয়াজ, যেন ভারি কোনো প্রাণী চলে যাচ্ছে। কাছে নয়, এই যা বাঁচোয়া। মোবাইলের আলোটা জ্বালিয়ে নিয়েছি। আরো একটু এগিয়েছি, একটা জায়গায় এসে পড়লাম যেখানে রাস্তাটা দুটো ভাগ হয়েছে। আমার বাঁদিকেরটাই ধরা দরকার নিশ্চয়, কিন্তু ...

       বাঁদিকের রাস্তাটার ঠিক মাঝখানে একটা ঝুরিওলা গাছ। ঠিক আগের গাছটার মতো। তার পাশ দিয়ে যেতে সাহসে কুলাল না। অগত্যা ডানদিকের রাস্তাটাতেই পা বাড়ালাম। একটা বেশ বড় গাছকে পেরোতেই ধড়ে প্রাণ এলো। একটা ঝোপের ওধারে একজন মানুষ। অন্ধকারে খুব ভালো দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু মানুষ তো বটে। নিশ্চয় ম্যাকলাস্কিগঞ্জের দিকে যাচ্ছে। ওর সঙ্গ ধরে নিতে হবে। আর যদি ওদিকে নাও যায়, অন্তত রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে তো পারবে।

       ‘দাদা, শুনছেন?’ না না, হিন্দিতে বলি। ঝাড়খন্ডে আছি। ‘ভাইসাব, শুনিয়ে।‘

       লোকটা আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। তারপর কোনো কথা না বলে ঝোপঝাড় ভেঙে আমার দিকে আসতে থাকল। যাক, এবার নিশ্চিন্ত। ‘আপ কিস তরফ যায়েঙ্গে? মুঝে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ যানা হ্যায়।’

       কোনো উত্তর নেই। বোবা নাকি? খালি ঝোপঝাড় ভাঙার আওয়াজ। যাক গে, আর তো কয়েক সেকেন্ড পরেই সামনাসামনি দেখা হয়ে যাবে।

       লোকটা আমার কাছাকাছি এসে গেছে, হঠাৎ একটা কান ফাটানো শিসের শব্দ। তারপরেই একটা জাল গিয়ে লোকটার গায়ে পড়ল। সে ছটফট করছে এমন সময় একটা প্রাণী আমার পাশ দিয়ে গিয়ে লোকটার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।  মোবাইলটা তখনো আমার হাতে, তার টর্চটাও জ্বলছে। সেই আলোতে লোকটা যে প্রাণীটার সঙ্গে লড়াই করছে তাকে দেখতে পেলাম। সেই মাথাকাটা পিরামিড ভূত! য়াবছা আলোতে মনে হল মানুষটা পোশাক পরে নেই।  হয়তো ধুতি কি লুঙ্গি জাতীয় কিছু ছিল, ধস্তাধস্তিতে খুলে গেছে।

       এখন কি করি? একটা মানুষ চোখের সামনে মরে যাবে, কিছু করব না? কিন্তু ভূতের সঙ্গে লড়াই করব কেমন করে? তাও পিরামিড ভূত! সে আবার মাছ ধরার মতো করে জাল দিয়ে মানুষ ধরে! তবু কিছু একটা করা উচিত, এই ভেবে যেই ওদিকে এক পা এগিয়েছি, সাপের মতো কী একটা আমার কোমর জড়িয়ে ধরল। প্রথমেই মনে হল অজগর, কিন্তু হাত দিয়ে দেখলাম সাপের মতো পিচ্ছিল নয়, অনেকটা খসখসে। কিছু বোঝার আগেই দেখলাম আমার পা আর মাটিতে নেই, আমি ঝুলছি। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম সেই গাছটা তার একটা ঝুরি দিয়ে আমাকে জাপটে ধরেছে। সর্বনাশ! এতো সেই সত্যজিৎ রায়ের গল্পের সেপ্টোপাস। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।

       জ্ঞান যখন ফিরল, বুঝতে পারলাম আমি নরম কিছুর উপর শুয়ে আছি। একটা গলা শুনলাম, ‘ডরনা মাৎ। অব ক্যায়সে হ্যায় আপ?‘

       যাক, এ যাত্রা ভূতের হাত থেকে বেঁচে গেছি তাহলে। চোখ খুললাম। ঘন অন্ধকার। প্রথমে মাতৃভাষাই মনে এলো, ‘আপনি কে?’

       সামান্য বিরতি, তারপরে বাংলায় শুনলাম, ‘ভয় পাবেন না। এখন কেমন বোধ করছেন?’

       ‘আমি কোথায়? এখানে এলাম কেমন করে? আলো জ্বালাননি কেন?’

       ‘আপনি যেখানে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, এই জায়গাটা তার থেকে খুব দূরে নয়। আমরাই আপনাকে নিয়ে এসেছি। এখানে আলো জ্বালানোর একটু অসুবিধা আছে।‘ গলাটা যেন কেমন! যান্ত্রিক!

       ‘জঙ্গলের মধ্যে আছি এখনো!’ আমি উত্তেজনায় উঠে বসলাম, ‘এখুনি পালিয়ে চলুন। এখানে ভূত আছে। জানি বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু গাছভূত, পিরামিড ভূত আমি দেখেছি।  গাছভূত আমাকে ধরেছিল, আর পিরামিড ভূত একটা অন্য লোককে। এতক্ষণে তার ঘাড় মটকে দিয়েছে। আপনি না এসে পড়লে আমারও একই দশা হত।’

       ‘ভূত!’ গলায় একটু যেন অবাক ভাব। ‘ওহ, মৃত্যুর পরে মানুষ যা হয় বলে আপনি মনে করেন।‘ এ আবার কি রকম কথা? ভূত কাকে বলে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে এখন?

       ‘শুধু মানুষ নয়। আজ দেখলাম গাছ, এমনকি পিরামিডের মতো জড় বস্তুরও ভূত হয়।‘

       একটু নিস্তব্ধতা, তারপর একটা অন্য গলার আওয়াজ, কিন্তু ভাষাটা বুঝতে পারলাম না। তারপরেই আবার সেই শিসের আওয়াজ। এখানেও সেই! আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম।

       ‘বসুন, বসুন। ভয় পাবেন না, ভয় পাবেন না। ভয়ের কিছু নেই।‘ আগের গলাটা ফিরে এলো।

       ‘কেন বলছেন না আপনারা কারা? ‘আপনারা কি ভূত?’ কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করি। বসার কথাই আসে না, মনে মনে দৌড়োনোর জন্য তৈরি হলাম।

       ‘বিশ্বাস করবেন আমার কথা? যদি বলি আমরা এসেছি অনেক দূর থেকে। আপনাদের গ্রহে বাধ্য হয়ে নামতে হয়েছে।‘

       আমাদের গ্রহ! মানে এরা ...।

       মুখে কথা সরছিল না। বোধহয় পুরো সাড়ে তিন মিনিট চুপ করে ছিলাম। কখন যেন বসে পড়েছি। এতক্ষণে খেয়াল করলাম, যেটাতে শুয়ে বা বসে ছিলাম, সেটা ঠিক বিছানা নয়, আবার চেয়ারও নয়। বরঞ্চ হেলান দিয়ে বসলে আগেকার দিনের আরাম কেদারার মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু একটু আগেই তো বিছানার মতো ছিল!  তারপরেই মনে হল, আমি হলাম পৃথিবীর প্রথম মানুষ যে অন্য গ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলেছে। মানসচক্ষে দেখতে পেলাম খবরের কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে আমার ছবি আর ইন্টারভিউ। কিন্তু সাক্ষাৎকারে তো এদের সম্পর্কে কিছু বলতে হবে।

       ‘আপনি কি মঙ্গল গ্রহের লোক? আমাদের নহাকাশযান আপনাদের খুঁজে পায়নি কেন? নাকি শুক্র থেকে এসেছেন? উড়ন্ত চাকিতে করে এসেছেন? আপনি বাংলা জানলেন কেমন করে? এখানে নেমেছেন কেন?’ একবার শুরু করার পরে আমি আর কথা থামাতে পারছিলাম না। কত কিছু জানার আছে।

       ‘এক এক করে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, আপনি বিচলিত হবেন না। মঙ্গল বা শুক্র গ্রহ বলতে আপনি যে দুটো গ্রহের নাম করেছেন, সেখান থেকে আমরা আসিনি। আপনাদের সৌরজগতে আমার জন্ম নয়। আমি যে তারার বাসিন্দা, তার কোনো নাম আপনাদের ভাষাতে নেই। উড়ন্ত চাকি বলতে যদি আপনি মহাকাশযান বলেন, তাহলে হ্যাঁ, আমি মহাকাশযানেই এসেছি। তবে সেটাকে চাকির মতো দেখতে নয়। আমি পৃথিবীর কোনো ভাষাই জানি না। আমি যা ভাবছি, যন্ত্র তাকে আপনার ভাষায় অনুবাদ করে দিচ্ছে। আমার এই যন্ত্রটাকে আপনি হয়তো কম্পিউটার বলবেন, সে পৃথিবীর সব ভাষাই জানে। ও প্রথমে আপনার ভাষাটা ভুল বুঝেছিল, পরে আপনার কথা শুনে সংশোধন করে নিয়েছে।

       ‘এখানে বলতে কি আপনি আপনাদের গ্রহ না এই জঙ্গল কোনটা বোঝাচ্ছেন? যে সব গ্রহে বুদ্ধিমান জীব আছে, কিন্তু তারা এখনো ছায়াপথের অন্য সভ্যতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি, সেই সব গ্রহে নামা আমাদের নিষিদ্ধ। পৃথিবীও তাদের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমাদের মহাকাশযানের অ্যান্টিগ্রাভিটি ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তার মেরামত করতে আমাদের নামতে হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম এমন জায়গায় নামব যাতে মানুষের নজরে না পড়ি। তাই এই জঙ্গল বেছে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু এখানেও যে একজন মানুষের মুখোমুখি পড়ে যাব, তা ভাবিনি।‘

       ‘একজন কেন? আমি ছাড়া অন্য একটা লোকও ছিল তো?’

       ‘না, আপনি ছাড়া কোনো মানুষ আজ রাতে জঙ্গলে ছিল না।‘        

       ‘তাহলে আমি কি ভুল দেখলাম? অন্ধকার ছিল, ঝোপের মধ্যে থেকে বেরোনোর আগেই লোকটার উপরে সেই পিরামিড ভূত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তবু মানুষই তো মনে হল। ওহো বুঝেছি, সেই লোকটা আসলে আপনি। কিন্তু আপনাকে আক্রমণ করেছিল যে পিরামিডের মতো প্রাণী, আমাকে ধরে মেরে ফেলছিল যে চলমান গাছ, এরা কোথা থেকে এলো?’

       আবার একটু শিস আর অচেনা গলার আলোচনা। তারপরে আগের যান্ত্রিক স্বরটা ফিরে এলো। ‘বিভিন্ন গ্রহের অচেনা অজানা প্রাণী, অবশ্যই যারা বুদ্ধিমান নয়, তাদের নিয়ে আমরা  বিভিন্ন গ্রহের  চিড়িয়াখানাতে সরবরাহ করি। এখানে নামার পরেই সেই রকম একটা প্রাণী আমাদের মহাকাশযান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাই যতক্ষণ মহাকাশযানের ইঞ্জিন সারানো হচ্ছিল, ততক্ষণ আমরা কয়েকজন সেটাকে ধরব বলে বেরিয়েছিলাম। সেই প্রাণীটাকেই আপনি জঙ্গলে দেখেছিলেন।‘

       ‘একটা মাত্র প্রাণী নয়। আপনাদের অনেক প্রাণী নিশ্চয় পালিয়েছে। পিরামিড আর গাছের কথা তো বললাম, তাছাড়া একটা তিন চোখওলা বিশাল প্রাণীও দেখেছি জঙ্গলে।‘ আমি বলি। ‘আপনারা ভালো করে দেখুন।‘

       ‘না, না। একটাই প্রাণী পালিয়েছিল। তাকে ধরেও আনা হয়েছে। আমাদের ক্ষমা করবেন, আমরা আপনার কাছেই ছিলাম, আমাদের দেখে আপনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।‘

       ‘বারবার কোথায়? একবারই তো আমার কাছে এসেছিলেন। ভাগ্যিস আপনারা ছিলেন, নাহলে আজ ঐ সেপ্টোপাস মানে গাছ দৈত্যের খাবার হওয়াই নিয়তি ছিল আমার। কিন্তু আপনারা ভালো করে দেখুন। গাছ, পিরামিড, তেচোখো দানব – এরকম অনেক কিছু আমি দেখেছি। এসব প্রাণী আমাদের পৃথিবীর নয়।‘

       ‘তা আমরা জানি।‘ কণ্ঠে একটু কি কৌতুকের ছোঁয়া। বলা শক্ত। আবার একটু আলোচনা। ‘আপনার ডানদিকে তাকান।‘

       ডানদিকে একটা আলো জ্বলে উঠল। মনে হয় পর্দাতে ছবি দেখছি। আমি তাকিয়ে দেখলাম। একটা ঘর মতো, তার মেঝেতে বসে আছে একটা মানুষ। একেবারে উলঙ্গ, গায়ে একটা পোশাক নেই। ‘এই সেই প্রাণী যে পালিয়ে গিয়েছিল।‘

       ‘এ তো একটা মানুষ।‘

       ‘ভালো করে দেখুন।‘ ক্যামেরা এবার মানুষটার উপর জুম করল।

       মানুষের মতো দেখতে বটে, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যাচ্ছে আসলে মানুষ নয়। দুটো হাত দুটো পা আর মাথা আছে, কিন্তু এইটুকুই মানুষের সঙ্গে মিল। আঙুলের জায়গায় তিনটে করে শুঁড়ের মতো প্রত্যঙ্গ। তার প্রত্যেকটাতে অক্টোপাসের মতো শোষক। মুখ একেবারেই মানুষের মতো নয়। মাথার উপরে মুখের মতো একটা গর্ত। তার দুপাশে দুটো ছোটো ছোটো শিঙ, তার উপরে মাছের মতো গোল গোল দুটো চোখ। তাতে বুদ্ধিমত্তার কোনো চিহ্ন নেই। কান জাতীয় কিছু নেই। অন্ধকারে একে মানুষ বলে ভুল করেছিলাম, আলোতে সেই ভুল কখনো হবে না।

       ‘এই রকম দুই হাত দুই পা দুই চোখ আছে এমন প্রাণী ছায়াপথে খুব বিরল, পৃথিবীর বাইরে একটি গ্রহেই তাদের এখনো পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তাই চিড়িয়াখানাতে এই প্রাণীর চাহিদা খুব বেশি। বুঝতেই পারছেন এর সঙ্গে আপনার চেহারার মিল অনেক।  তাই জঙ্গলের মধ্যে প্রথমে আপনাকে এই প্রাণীটা বলে ভুল করেছিলাম। আপনাকে ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। তাছাড়া এই প্রাণীটা খুব হিংস্র, তাই আপনার কারো কোনো ক্ষতি যাতে না করে সে জন্য আপনার কাছাকাছি আমাদের একজনকে অন্তত থাকতে হয়েছিল। শেষ মুহূর্তে যে আপনাকে ওখান থেকে সরিয়ে আনতে হয়েছিল, কারণ প্রাণীটা যদি কোনো কারণে জাল কেটে বেরিয়ে আসত, তাহলে আপনাকে আক্রমণ করতে পারত। আপনি যে তাতে ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, আমি তার জন্যে দুঃখিত।‘

       আমার মনে একটা সন্দেহ দানা বাঁধছিল। ‘আপনাকে  কেমন দেখতে? আমি দেখতে চাই।‘

       ‘ভয় পাবেন না তো?’

       ‘না না। ভয় পাব কেন?’

       ‘আচ্ছা, তাহলে আলো জ্বালাচ্ছি।‘ হঠাৎ করে উজ্জ্বল আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। দৃষ্টিশক্তি  তারপরে দেখি একটা বিরাট ঘরের মধ্যে বসে আছি। দেওয়ালগুলো ধাতুর তৈরি। ঘরের মাঝে একটা কাঁচের দেওয়াল। তার ওপাশে ...

       সেই বটগাছের মতো গাছ, তার পাশে সেই মাথা কাটা পিরামিড। অন্য পাশে একটা প্রাণী যাকে দেখেই বুকটা ধড়াস করে উঠল। অন্তত পনের ফুট উঁচু, পা অনেকটা শামুকের পায়ের মতো মাংসল। মুখটা দেখলেই ভয় লাগে, অনেকটা হাঙরের মতো দাঁতগুলো বেরিয়ে আছে। তিনটে চোখ মুখের সামনের দিকে। দুপাশে দুটো হাত আছে, কিন্তু আবার বুকের মাঝখান থেকে দুটো ছোট হাত বেরিয়ে আছে। সেই হাতে ধরা আছে একটা যন্ত্র। আমাকে চমকে উঠতে দেখে সেই যন্ত্রটা মুখের কাছে নিয়ে এলো। ‘চিন্তা করবেন না, আপনার কোনো ক্ষতি আমরা করবো না। আমাদের থেকে বুদ্ধিমান কোনো প্রাণীর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বুঝতেই পারছেন আমরা একই গ্রহের প্রাণী নয়। আরো অনেক অন্য গ্রহের ক্রু আছে আমাদের যানে, কিন্তু তারা আপনাদের গ্রহের আবহাওয়া বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারবে না।‘ ও, এতক্ষণ তাহলে এই আমার সঙ্গে কথা বলছিল। 

       ‘না না, ভয় পাবো কেন?’ আমি ঢোক গিলে বললাম। ‘আপনারা আমার সঙ্গে চলুন। আমাদের সরকারের সঙ্গে কথা বলবেন। সারা পৃথিবীর মানুষ আপনাদের কথা শুনতে চাইবে।’

       ‘না, আমি প্রথমেই বলেছি পৃথিবীর সভ্যতা এখন যে স্তরে, তাতে করে তার সঙ্গে যোগাযোগ আমাদের নিষিদ্ধ। এতে করে আপনাদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। আপনারা যে সমস্ত সমস্যার সামনে এখন দাঁড়িয়ে, তার সমাধান আপনাদেরই করতে হবে। কোনো সভ্যতাই অন্য কারো উপর নির্ভর করতে পারে না। ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাওয়াতে বাধ্য হয়ে নামতে হয়েছে। আপনাকেও আমাদের পরিচয় দেব কিনা তা নিয়ে আমাদের দ্বিধা ছিল। ‘

       ‘কিন্তু আমি তো সবাইকে বলে দেব যে আপনারা এখানে আছেন। কাল থেকেই তো এখানে লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে।‘

       ‘আমাদের ইঞ্জিন ঠিক হয়ে গেছে। আর অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা রওনা হব। অ্যান্টিগ্রাভিটি ইঞ্জিন আপনাদের প্রাগৈতিহাসিক রকেটের মতো নয় যে আগুন বেরোবে আর বিকট আওয়াজ হবে। দূর থেকে কেউ বুঝতেই পারবে না। তারপরেও আপনি যদি কাউকে আমাদের কথা বলেন, তাহলে লোকে আপনাকে কী মনে করবে আপনি ভেবে দেখুন।‘ 

       আমি একেবারে চুপ করে গেলাম। কোনো প্রমাণ ছাড়া এসব কথা বললে লোকে আমাকে পাগল বলবেই।

       ‘বুঝতে পেরেছেন। আপনার পকেটে যে যন্ত্রটা আছে, তাতে আমাদের ছবি নেই আমরা দেখে নিয়েছি। সাবধানতার জন্য আমরা ওটার শক্তির উৎসটাকে শেষ করে দিয়েছি।‘ তার মানে মোবাইল ফোনের ব্যাটারি ডেড, বাইরে থেকে মহাকাশযানের ছবি তোলা ছবি তোলা যাবে না। ‘এখান থেকে লোকালয় আর দূরে নয়। পাশ দিয়ে যে নদীটা গেছে, সেটা ধরে স্রোতের উল্টোদিকে হাঁটলে সেখানে পৌঁছে যাবেন। আপনাকে বিদায় জানাই। আমাদের এবার যেতে হবে। যদি আপনি আমাদের যানের উড়ান দেখতে চান, দেখতেই পারেন। তবে কিছুটা দূরে থাকবেন, না হলে অ্যান্টিগ্রাভিটি ফিল্ডের আওতায় পড়ে যেতে পারেন।‘

       ঘরের একপাশে একটা দরজা খুলে গেল। আমি কিছু বোঝার আগেই যে চেয়ার বা বিছানাতে বসে ছিলাম, সেটা আমাকে নিয়েই সোজা সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিছুটা দূরে গিয়ে আস্তে করে মাটিতে নামিয়ে দিল। সেটা নিশ্চয় আবার দরজা দিয়ে ঢুকে গেল, আমি দেখতে পাইনি। তারপরে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।

       পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে দেখলাম মহাকাশযানটা বেশ বড় একটা পাঁচ কি ছ’তলা বাড়ির মতো। একটা মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এক মিনিট দাঁড়ানোর পরেই একটা খুব গম্ভীর আওয়াজ শুরু হল। সেটা খুব জোরে নয়, কিন্তু হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। তারপরেই যানটা আস্তে আস্তে উঠতে শুরু করল, যেন কোন তাড়া নেই। টিভিতে যেমন রকেট উৎক্ষেপণ দেখেছি, একেবারেই সেরকম নয়। যানের সঙ্গে কাছের গোটা দুয়েক বড় বড় পাথরও আকাশে উড়তে শুরু করল। আস্তে আস্তে ছোট হতে হতে আকাশে মিলিয়ে গেল।

       এতক্ষণ যা বললাম, তা তোমরা বিশ্বাস করবে কিনা তা তোমাদের অভিরুচি। তবে যদি প্রমাণ চাও, তাহলে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে গিয়ে ওখানকার লোককে জিজ্ঞাসা করো গত বছর মাঘ মাসের পূর্ণিমার রাতে ডুগাডুগি নদীর পাশ থেকে দুটো বড় বড় পাথর অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল কিনা। ওরা ভূত প্রেত পিশাচের কথা বলতে পারে, পাথরের চোরাচালানের কথা বলতে পারে, অন্য কিছুও বলতে পারে, কিন্তু সত্যি গল্পটা তোমাদের আমি আজ বললাম।   

 

 

প্রকাশ ঃ এ যুগের কিশোর বিজ্ঞানী গ্রীষ্ম ও বর্ষা সংখ্যা ২০২১

        

      

      

      

      


Friday, 13 May 2022

পিশাচের নখ

 

পিশাচের নখর

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়


সকালে রাজা বিক্রমাদিত্য উজ্জয়িনীর রাজসভাতে বসে কালিদাসের কাব্য পাঠ শুনছেন। এমন সময় সভার প্রবেশপথে খুব তর্কবিতর্কের শব্দ পাওয়া গেল। মহারাজ বিরক্ত হয়ে উচ্চকণ্ঠে বললেন, 'দ্বারী, কি হয়েছে?’

মহারাজ, এক ভিল্ল আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়। আমি বলেছি মহারাজ এখন ব্যস্ত, কিন্তু সে কিছুতেই শুনতে রাজি নয়।'

'ঠিক আছে, ওকে আসতে দাও।'

একটি বয়স্ক মহিলা এসে দাঁড়াল। বলল, 'আমার ছেলেকে ছেড়ে দে, ও কিছু করেনি।'

ভিল্লদের সমাজে সবাই সমান। তাই তুমি আপনি এসব শব্দের ব্যবহার নেই। বিক্রমাদিত্য জানতেন, তাই তিনি কিছু মনে করেন নি। তিনি বললেন, 'কে তোমার ছেলে? কী করেছে সে?’

'আমার ছেলে শম্ভকে কোটাল ধরে নিয়ে গেছে। বলছে ও নাকি কাকে মেরেছে। আমি জানি ও কোনো মানুষের গায়ে হাত দেবে না। তুই কোটালকে বল ওকে ছেড়ে দিতে।'

'ঠিক আছে, অপেক্ষা করো। আমি কোটালকে ডেকে পাঠাচ্ছি।

বেশ কিছুক্ষণ পরে শহরের কোটাল এসে অভিবাদন করে দাঁড়ালেন।

বিক্রমাদিত্য জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোট্টপাল, এই ভিল্ল রমণী বলছে ওর পুত্রকে তুমি বিনা দোষে বন্দি করেছ।’

কোটাল বললেন, 'মহারাজ, কাল রাত্রে নগরের এক পান্থশালাতে এক অদ্ভুত হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সাক্ষীও একজন আছে, সে বলছে এ এক পিশাচের কীর্তি। মহারাজ, এক ভিল্ল সেই সময় পান্থশালার বাইরের গাছের তলায় ছিল। কে না জানে যে ভিল্লরা সবাই পিশাচসিদ্ধ হয়? তাই আমি তাকে বন্দী করেছি। আমি নিশ্চিত যে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সে দোষ স্বীকার করবে।'

শম্ভর মা কেঁদে উঠে বলল, 'রাজা, আমি জানি কোটাল কেমন করে জিজ্ঞেস করে। আমার শম্ভ বড় নরম, চাবুকের ঘা সহ্য করতে পারবে না। তুই ওকে ছেড়ে দে।'

বিক্রমাদিত্য কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। কালিদাস বললেন, 'মহারাজ, অনুমতি দিলে আমি একবার অনুসন্ধান করে দেখতে পারি।'

কালিদাসের বুদ্ধির উপর গভীর আস্থা ছিল বিক্রমাদিত্যের। তিনি বললেন, ‘আপনি! যান। তবে সাবধান। প্রেত পিশাচ ডাকিনী এদের এড়িয়ে চলবেন।' বিক্রমাদিত্যের কথাতে কৌতুকের আভাস পেয়ে কালিদাস মুহূর্তের জন্য তাঁর মুখের দিকে তাকালেন। তারপর অভিবাদন করে সভা ত্যাগ করলেন, সঙ্গে কোটাল ও সেই ভিল্ল। কালিদাস মহিলাকে বললেন, 'আমি কোটালের সঙ্গে যাচ্ছি। তুমি বাড়ি যাও। যদি শম্ভ নির্দোষ হয় নিশ্চয় দেবাদিদেব মহাদেবের আশীর্বাদে সে মুক্তি পাবে।' কোটাল কোনো কথা বলল না, তবে তার মুখের ভাবেই সুস্পষ্ট সে কালিদাসের সঙ্গে একমত নয়।

কোটালকে একা পেয়ে কালিদাস জিজ্ঞাসা করলেন, 'সুমলয়, তুমি কি করে নিশ্চিত হয়েছ যে এই হত্যা পিশাচের কাজ?’

'কালিদাস, আমি জানি তুমি পিশাচে বিশ্বাস করো না। কিন্তু সাক্ষী আছে যে ওই পিশাচকে দেখেছে।'

কালিদাস বললেন, 'পিশাচের কথা যদি মেনেও নিই, তাহলেও ওই ভিল্লকেই কেন বন্দী করেছ?’

'পিশাচ কেন হঠাৎ করে কোনো মানুষকে আক্রমণ করবে? ঘটনাস্থলের কাছে একমাত্র ঐ শম্ভই ছিল। আর জানোই তো বনচারী জাতি ভিল্ল কিরাত শবররা রাক্ষস পিশাচ এদের পূজা করে। অন্য আর কে পিশাচকে ডেকে আনবে?

কালিদাস বললেন 'তোমার ঐ যে সাক্ষী পিশাচকে দেখেছে বলেছে, সেই হয়তো আসল আততায়ী।'

'দেখো কালিদাস, আমার কাজ আমি জানি। তাকেই আমি প্রথম সন্দেহ করেছিলাম। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমি তার নিকটে কোনো অস্ত্র পাইনি।'

কালিদাস বললেন, 'আমি তোমার সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলতে চাই। শম্ভর সঙ্গেও কথা বলব।'

'সম্রাটের অনুমতি পেয়েছ, তোমার যথা ইচ্ছা তুমি করো। কিন্তু দেখবে আমি সঠিক দোষীকেই বন্দি করেছি। বিকর্ণকে সেই পান্থশালাতেই প্রহরাধীন রেখেছি। শম্ভ কারাগারে আছে। শবদেহের কিন্তু সৎকার হয়ে গেছে। অপঘাতে মৃত্যু, তাই অধিক সময় রাখতে সাহস হয়নি।'

'গতস্য শোচনা নাস্তি, যা হয়ে গেছে তা নিয়ে আর ভেবে কী হবে? যা সম্ভব তাই নিয়েই কাজ করতে হবে। শবদেহ তুমি পরীক্ষা করেছিলে?’

নিশ্চয়। বুকের কাছে এক গভীর ক্ষত, পিশাচের নখের চিহ্ন। তাছাড়া সারা দেহে আরো কয়েক স্থানে নখরাঘাত ছিল।'

'নখ না সূক্ষ্ম ছুরিকা?’

'পার্থক্য করতে পারব না, তবে চাক্ষুষ দেখেছে যে সাক্ষী, সে নখের কথাই বলেছে।'

কারাগারই কাছে, সেখানেই প্রথম গেলেন কালিদাস। কোটালের ঘরে দুজনে বসলেন, তারপর প্রহরীকে দিয়ে শম্ভকে ডেকে আনা হল।

'এ তো নেহাতই বালক,' কালিদাস সবিস্ময়ে বললেন। সত্যিই তাই, শম্ভের বয়স বেশি নয় গোঁফের রেখা ফুটেছে মাত্র। হাতদুটো দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। খুবই ভয় পেয়ে গেছে, তা চোখমুখের চেহারাতেই স্পষ্ট।

'বালক তো কী হয়েছে? ভিল্লরা জন্ম থেকেই পিশাচসিদ্ধ হয়।' কোটাল বলল।

'তা হলে তো একে বন্দিশালাতে রাখা খুব বিপজ্জনক। দরজা কি পিশাচকে আটকাতে পারবে?’ কালিদাস নির্বিকার গলায় বললেন। তারপর নরম গলায় জিজ্ঞাসা করলেন, 'তোমার নাম শম্ভ?’

'হ্যাঁ।'

উজ্জয়িনীর মাঘমাসের মেলা বিখ্যাত, দূর দূর থেকে মানুষ সেখানে ক্রয়বিক্রয়ের জন্য আসে। এক মাস ব্যাপী মেলা গতকাল শেষ হল। শম্ভ এসেছিল শিকার করা হরিণের চামড়া বিক্রি করতে।

'শম্ভ, অত রাতে তুমি পান্থশালার বাইরে কি করছিলে?’

শম্ভ বলল, 'কাল সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। অত রাতে জঙ্গলে যাব না। সকাল হলে চলে যাব। তাই গাছের তলায় রাত কাটাচ্ছিলাম।'

কালিদাস জিজ্ঞাসা করলেন না যে শম্ভ কেন পান্থশালায় আশ্রয় নেয়নি। ভিল্লরা চতুর্বর্ণের মধ্যে পড়ে না, তারা অচ্ছুৎ। কোনো বাড়িতে ওদের ঢুকতে দেওয়া হয় না।

শম্ভ বলে চলে, ‘এমন সময় পান্থশালার বাইরের এক ঘর থেকে খুব জোর চিৎকার ভেসে আসে। আমি ছুটে যেতে গিয়েও সামলে নিই, আমি তো ঘরে ঢুকতে পারব না। তারপর অনেক লোক এসে সেই ঘরের সামনে জড়ো হয়, দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে ভিতরে ঢোকে। অনেকক্ষণ চেঁচামেচি চলে। একটু শান্ত হলে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ আমাকে লাথি মেরে তুলে এই প্রহরীরা জিজ্ঞাসা করে আমি কে। আমি যেই বলেছি আমি ভিল্ল শম্ভ, সঙ্গে সঙ্গে একজন বলল, "এই নিশ্চয় পিশাচ ডেকে এনেছে।" তারপর আমাকে এখানে এনে বেঁধে রেখেছে। আমার জিনিসপত্র সব নিয়ে নিয়েছে। আমি এত বলছি যে পিশাচকে কেমন করে ডাকতে হয় আমি জানি না, কেউ আমাকে বিশ্বাস করছে না।'

কালিদাস কোটালের দিকে তাকালেন। কোটাল বললেন, 'ওর সমস্ত সামগ্রী নিরাপদে রাখা আছে।'

কালিদাস উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, 'আমরা পান্থশালাতে যাব। শম্ভও আমাদের সঙ্গে চলুক।' কোটাল প্রহরীকে ইঙ্গিত করলেন, সে শম্ভর হাতে বাঁধা দড়ির অন্য প্রান্ত নিজের হাতে নিল। কালিদাস বললেন, 'শম্ভের বাঁধন খুলে দাও, ও পলায়ন করবে না। করলে যাবেই বা কোথায়? এই নগরীতে ওকে কে আশ্রয় দেবে? প্রহরী সঙ্গে চলুক।’

সবাই পায়ে হেঁটে পান্থশালাতে উপস্থিত হলেন। মাঘ মাস, তাই সূর্য মাথার উপরে উঠলেও রোদের তাত নেই। এই পান্থশালা উজ্জয়িনীর বাসিন্দাদের খুবই প্রিয় জায়গা। অন্যদিনে এখানে জায়গা পাওয়াই শক্ত। অথচ আজ তা প্রায় নির্জন। দরজার বাইরে এক প্রহরী বসে ছিল, কোটালকে দেখে উঠে দাঁড়াল। কোটাল বললেন, 'বিকর্ণ কোথায়?’

'ভিতরে। ও চলে যেতে চাইছিল, আমি বলেছি আপনার অনুমতি ছাড়া এই ওকে যেতে দেওয়া যাবে না।'

'ঠিক আছে। আমরা ভিতরে যাচ্ছি। তুমি এখানেই থাকো। এই ভিল্লকে এখানেই রেখে গেলাম।' কোটাল বললেন।

পান্থশালার অধিকারী সৌগন্ধ তাঁদের দেখে দৌড়ে এলেন। কালিদাসকে উজ্জয়িনীতে কে না চেনে, তাছাড়া তিনি আগে বেশ কয়েকবার এই পান্থশালাতে এসেছেন। কোটালের সঙ্গে তাঁকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'রাজকবি, আপনি?’

'মহারাজ পাঠিয়েছেন এই হত্যার ব্যাপারে অনুসন্ধান করতে।'

'কবি, এ পিশাচের কাণ্ড। ভয়ে সব নাগরিক আমার পান্থশালা এড়িয়ে যাচ্ছে। যজ্ঞ করে এই স্থানকে পিশাচমুক্ত করতে হবে বলে পুরোহিত বিধান দিয়েছেন, তার ব্যয় অনেক।'

'কাল রাত্রে কী হয়েছিল?’

'একমাস পূর্বে দুই জন এসে একটি ঘর নেয়। আগেও তারা কয়েকবার এখানে রাত্রিবাস করেছে। দুজনেই বণিক, অন্য নগর থেকে মেলায় এসেছিল। একজনের নাম বিকর্ণ, অন্যজনের নাম চণ্ড। প্রতিদিন সকালে তারা মেলায় যায়, সন্ধ্যাতে ফিরে আসে। গতকাল ফেরার পর দুজনেই ক্লান্ত ছিল, তাই তারা স্নানাগার ব্যবহার করতে চায়। পান্থশালার পশ্চাতে এক পুষ্করিণী আছে, সাধারণত সবাই তা ব্যবহার করে। কিন্তু গতকাল বিকর্ণ বলে যে এই শীতে গরম জলই তাদের পছন্দ। আগেও তারা কয়েকদিন স্নানাগারটি ব্যবহার করেছে। সেটি বিশেষ করে চণ্ডের খুবই প্রিয় ছিল। স্নানকক্ষ পান্থশালার বাইরে, কিঙ্কর সেখানে জল গরম করার জন্য আগুন জ্বেলে দিয়ে চলে আসে। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ এক প্রচণ্ড ভয়ার্ত চিৎকার স্নানকক্ষের দিকে থেকে আসে। সচকিত হয়ে আমি এক মশাল জ্বালিয়ে সেখানে ছুটে যাই, আরো অনেকেই আমার সঙ্গে ছিল। কিন্তু স্নানাগারের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। ভিতর থেকে তখনো গোঙানির শব্দ ভেসে আসছিল। আমরা দুএকজন দরজাতে ধাক্কা দিতে থাকি, শেষে স্থির হয় দরজা ভেঙে ফেলতে হবে। কিন্তু হঠাৎই দরজা নিজে থেকেই খুলে যায়। দেখি সারা কক্ষ কটুগন্ধ ধোঁয়াতে পরিপূর্ণ। আমাদের সকলের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। একটু অপেক্ষা করার পর কক্ষে প্রবেশ সম্ভব হয়। তখন দেখি চণ্ড ও বিকর্ণ দুইজনেই পড়ে আছে। রক্তে চারদিক ভেসে যাচ্ছে। দুজনকে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে আসি। চণ্ড তখন মৃত। আমাদের আশঙ্কা ছিল বিকর্ণও তাই, কিন্তু দেখলাম সে অচৈতন্য। আমি তখন কোটালকে খবর দিই, বৈদ্যকেও ডেকে পাঠাই।

'বৈদ্য এসে চিকিৎসা করলে বিকর্ণের জ্ঞান ফিরে আসে। প্রথমে সে ভয়ে কথা বলতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পরে বলল ...’

কালিদাস হাত তুলে বললেন, 'আমি বিকর্ণের কাছেই সে কথা শুনে নেব। ওর সঙ্গে এখন কথা বলা সম্ভব?’

'নিশ্চয়। ও এখন সুস্থ। তবে প্রচণ্ড ভয় পেয়েছে, উজ্জয়িনী ছেড়ে চলে যেতে চাইছে।'

'তাহলে ওকে একটু ডাকুন। আমরা ওর সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চাই। '

সৌগন্ধ বেরিয়ে গিয়ে বিকর্ণকে পাঠিয়ে দিলেন। কোটাল তাকে বললেন, 'বসুন। আপনাকে ইনি কয়েকটি প্রশ্ন করবেন কালকের ঘটনা নিয়ে।'

'আমার যা বলার তো আমি বলেছি। আমাকে উজ্জয়িনী ত্যাগের অনুমতি দিন। আমি আর এক রাত্রিও এখানে থাকতে চাই না, পিশাচ যদি ফিরে আসে? এমনিও আমি ও চণ্ড আজ বিকালে একদল বণিকের সঙ্গে ফিরে যাব স্থির করেছিলাম।'

বণিকরা এক নগর থেকে অন্য নগরে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করে। পথের অনেক জায়গাতেই জঙ্গল, হিংস্র পশু ও দস্যুর ভয় আছে।

কালিদাস বললেন, 'আপনার গৃহ কোথায়?’

'আপনি কে? আপনার প্রশ্নের উত্তর কেন দেব?’

কোটাল বললেন, 'ইনি মহাকবি কালিদাস। মহারাজ বিক্রমাদিত্য অনুসন্ধানের জন্য এঁকে পাঠিয়েছেন।'

'মহাকবি? আমি তো একজন মহাকবিরই নাম জানি। তিনি বাল্মীকি।'

কালিদাস বললেন, 'আপনি সঠিকই বলেছেন। মহাকবি একজনই, যদিও বেদব্যাসকেও হয়তো আমরা সেই সম্মান দিতে পারি।'

'তা মহাকবির এই বিষয়ে আগ্রহের কারণ কী? নতুন কোনো মহাকাব্য রচনা করবেন?

বিকর্ণের কথাতে বিচলিত হলেন না কালিদাস। বললেন, 'কবির নয়, মহারাজের প্রতিনিধির প্রশ্নের উত্তর দিন।'

মহারাজের নাম শুনে বিকর্ণ একটু নিরস্ত হল। 'আমি মাহিষ্মতীর অধিবাসী।' মাহিষ্মতী উজ্জয়িনীর থেকে তেরো যোজন দূরের এক নগর।

'চণ্ড কি আপনার পূর্বপরিচিত?’

'চণ্ড ও আমি একত্রে বাণিজ্য করে থাকি। আমরা নানা শৌখিন দ্রব্য এক শহর থেকে অন্য শহরে ক্রয় বিক্রয় করে থাকি। মাঘী মেলাতে এসেছিলাম। উজ্জয়িনী ত্যাগের পূর্বেই এই ঘটনা। জানি না চণ্ডের স্ত্রীপুত্রকে কী উত্তর দেব।'

'এবার বাণিজ্য কেমন হয়েছে?’

'সত্য বলতে আশানুরূপ নয়। এই মেলার জন্য চণ্ডই সমস্ত সামগ্রী সংগ্রহ করেছিল, তার কোনোটির জন্যই বিশেষ মূল্য পাওয়া যায় নি। এবারের যাত্রা একেবারেই বৃথা বললেই হয়।'

'আপনারা কোথায় বিপণি সাজিয়েছিলেন?’

'মহাকাল মন্দিরের কাছে শিপ্রা যেখানে উত্তরদিকে বাঁক নিয়েছে, সেইখানে।'

'কাল কী ঘটেছিল?

'কাল সারা দিনের পরে আমরা ভীষণ ক্লান্ত ছিলাম। চণ্ড আসার সময় বলেছিল যে উষ্ণ জলে স্নান করলে শরীর সুস্থ হবে, আমিও সম্মত হই। অবশ্য তার জন্য সৌগন্ধকে দুটি তাম্রমুদ্রা দিতে হল। যা হোক, আমরা যখন স্নান করছিলাম, হঠাৎ এক পূতিগন্ধময় ধূমে ঘর ভর্তি হয়ে যায়। কিছু বোঝার আগেই সেই ধোঁয়া থেকে বেরিয়ে আসে এক পিশাচ। সে আমাদের আক্রমণ করে। সামনে ছিল চণ্ড, প্রথমে তাকে আঁচড় দেয়, তারপর তাকে পুতুলের মতো তুলে ধরে উন্মত্ত পিশাচ দীর্ঘ নখ দিয়ে তার হৃৎপিণ্ডকে বিদ্ধ করে। আমি স্নানকক্ষের দরজা খোলার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু নিশ্চয় ইন্দ্রজাল প্রয়োগে তা রুদ্ধ করে রেখেছিল। চণ্ডের মৃতদেহ ফেলে রেখে পিশাচ আমাকে আক্রমণ করে। পালাতে গিয়ে আমার ঊরুতে তার নখের আঁচড় লাগে। যখন আমি জীবনের আশা ত্যাগ করেছি, ঠিক সেই সময় দরজাতে কেউ আঘাত করে। পিশাচ তখন অদৃশ্য হয়ে যায়। আমি অচৈতন্য হয়ে পড়েছিলাম, আমার আর কিছুই মনে নেই।'

বিকর্ণ তার ঊরুতে পিশাচের নখের চিহ্ন দেখায়। তিনটি সমান্তরাল আঁচড়, দীর্ঘ তবে গভীর নয়।

'ঠিক আছে, কিন্তু আপনি এখনি পান্থশালা ত্যাগ করবেন না,' কালিদাস বললেন।

বিকর্ণ আর থাকতে রাজি নয়, কিন্তু কোটালও তাঁকে এখনি ছাড়বেন না। কিছুক্ষণ তর্কাতর্কির পরে বিকর্ণ চলে গেল। কালিদাস বললেন, 'সুমলয়, বিকর্ণই যে হত্যা করেনি, তা তুমি জানলে কেমন করে? হয়তো ও অভিনয় করেছিল। অপর কেউ তো স্নানকক্ষে ছিল না, ও যা বলছে তা সত্য না হতেই পারে। গায়ের আঁচড় হয়তো আমদের বিপথে চালিত করার জন্য নিজেই করেছে।'

কোটাল বললেন, 'দেখো কালিদাস, আমি প্রথমেই সেই কথা ভেবেছিলাম। তাই চণ্ডের শব পরীক্ষা করি। তার বুকের যে গভীর ক্ষত, তা যদি পিশাচের না হয়, তাহলে তা তো কোনো অস্ত্রের হবে। বিকর্ণের নিকট কোনো অস্ত্র ছিল না। আমার প্রহরীরা আতঙ্কে স্নানকক্ষে প্রবেশ করতে চায় নি। তাই আমি নিজে সেই ঘর পরীক্ষা করেছি। সেই ঘরে কোনো অস্ত্র পাওয়া যায়নি। স্নানকক্ষের আশপাশও উত্তমরূপে দেখেছি।'

'আমি নিজে একবার দেখব। কিন্তু শম্ভকে বন্দি করেছ কেন?’

'পিশাচ আবাহন কেউ একজন তো করেছে। এই সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অবিলম্বে কোনো ব্যবস্থা না নিলে নগরে আতঙ্কের সৃষ্টি হবে। অধিবাসীরা যখন জানতে পারবে যে মূল অপরাধীকে বন্দি করা হয়েছে তাহলে তারা আশ্বস্ত হবে।'

'তার জন্য ঐ বালককে শাস্তি দেবে, হত্যা করবে?’

'সামান্য এক ভিল্ল বালক, তার জীবন মৃত্যুতে কী আসে যায়?’

কালিদাস আগেই শম্ভকে দোষী সাব্যাস্ত করার উদ্দেশ্য অনুমান করেছিলেন। শুধু সুমলয় নয়, উজ্জয়িনীর অধিকাংশ নাগরিকই ভিল্ল জাতি সম্পর্কে একই মত পোষণ করে। কালিদাসের অনুমান মহারাজ বিক্রমাদিত্য সেই দলে পড়েন না, কিন্তু জনমতের কাছে তিনিও নিরুপায়। চতুর্বর্ণ প্রথার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁরও নেই।

'বিকর্ণ বা চণ্ডের কাছে অর্থ কী পরিমাণ আছে?’ তিনি সুমলয়কে জিজ্ঞাসা করলেন।

'বিকর্ণ ঠিকই বলেছে, মাসকালব্যপী মেলার অন্তে তাদের দু'জনের কাছে মুদ্রার পরিমাণ সামান্যই।'

কালিদাস স্নানকক্ষে ঢুকলেন। ঘরটি বেশ বড়। একপার্শ্বে আগুন জ্বেলে জল গরম করার বন্দোবস্ত আছে। অন্যপাশে একটি জলপূর্ণ গভীর পরিখা। স্বচ্ছ জল, তলদেশ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। চতুর্দিকে রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে। কক্ষের একটিই দরজা, জানালা নেই। প্রচণ্ড শীতেও ভিতরের হাওয়া গরম রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা। বেশিক্ষণ দেরি করলেন না; সুমলয় নিজের কাজে খুবই দক্ষ, ছুরিকার মতো অস্ত্র তার চোখ এড়িয়ে যাবে না।

বেরিয়ে এসে কালিদাস শম্ভকে জিজ্ঞাসা করলেন সে রাত্রে কোথায় ছিল। শম্ভের ইঙ্গিত অনুসরণ করে কালিদাস দেখলেন যে সেই গাছতলা থেকে স্নানকক্ষের দরজা স্পষ্ট দেখা যায়।

'কাল আর্তনাদের পরে কাউকে ঐ কক্ষ থেকে পলায়ন করতে দেখেছিলে?’ তিনি অম্ভকে প্রশ্ন করলেন।

'না, আমি নজর রেখেছিলাম। দরজা বন্ধ ছিল, অন্যরা আসার পরেই দরজা খোলে।'

পান্থশালা থেকে বিদায় নিয়ে কালিদাস অন্যমনস্কভাবে ইতস্তত পায়চারি করছিলেন। কবিকে এমন দেখতে অভ্যস্ত উজ্জয়িনীর নাগরিকরা। দূর থেকেই তারা অভিবাদন করছিল, কালিদাস কাউকেই উত্তর দিচ্ছিলেন না, তিনি গভীর চিন্তায় মগ্ন। শম্ভকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হল প্রকৃত আততায়ীকে চিহ্নিত করা। তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস যে বিকর্ণই এই হত্যা করেছে। কটুগন্ধ ধোঁয়া সৃষ্টি কঠিন নয়, নানা রকমের ওষুধ বা শুষ্ক লতাপাতাচূর্ণ দিয়ে তা সম্ভব। দরজা খুলে দিয়ে দূরে গিয়ে অজ্ঞানের অভিনয় করাও সহজ; যারা প্রথমে প্রবেশ করেছে, ধোঁয়ার জন্য তাদের দৃষ্টি বিগ্নিত হয়েছিল। কিন্তু অস্ত্রটির সন্ধান না পেলে কোনোভাবেই তা প্রমাণ করা যাবে না। ছুরিকাটিকে কোথায় লুকাল বিকর্ণ?

সচকিত হয়ে কালিদাস দেখলেন শিপ্রা নদীতীরে মেলাস্থলে পোঁছেছেন তিনি। কিছু দোকান শূন্য, কিন্তু অনেকেই তখনো তাদের সামগ্রী পেটিকাবদ্ধ করছে। তিনি একজনকে জিজ্ঞাসা করে বিকর্ণদের বিপণির সন্ধান পেলেন। সেটি শূন্য, তবে পাশের একটি দোকানি তখনো ছিল।

কালিদাস জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এটি কি চণ্ড ও বিকর্ণের বিপণি?’

'হ্যাঁ। শুনেছি চণ্ডকে কাল এক পিশাচ হত্যা করেছে। ওরা যে সমস্ত সামগ্রী বিক্রয় করত, তাতে আশ্চর্য নয়।'

কেন, কী বিক্রয় করত?’

'বিদেশি দ্রব্য, নানা স্থান থেকে সংগ্রহ করত। কোনোটির মধ্যে হয়তো কোনো পিশাচ আবদ্ধ ছিল, সে প্রতিহিংসা নিয়েছে। তবে ওরা যে মূল্যে বিক্রয় করত, তার জন্য সম্ভবত এই ধরনের ঝুঁকি নিতে হত।'

'অধিক মূল্য, তাহলে কি ক্রেতা পায়নি?’

'কী যে বলেন? ইদানিং প্রাচীন চিরাচরিতের প্রতি কারো আগ্রহ নেই, উজ্জয়িনীর নাগরিকরা বিদেশি সামগ্রী ক্রয়ের জন্য আকুল। দেশীয় দ্রব্যের প্রতি কারো আকর্ষণ নেই। আমার অর্ধেক পসরা অবিক্রীত, কিন্তু বিকর্ণদের বিপণি মেলা শেষের পূর্বেই শূন্য হয়ে পড়েছিল।' দোকানি দুঃখের সঙ্গে বলে।

কালিদাস মাথা নাড়লেন। তাঁর অনুমান সত্য, বিকর্ণরা ভালোই লাভ করেছিল। কিন্তু সেই মুদ্রা রাখল কোথায়? হঠাৎ একটা কথা মনে হল তাঁর। তিনি শুনেছেন যে বণিকেরা পথিমধ্যে দস্যুর হাত থেকে অর্থ রক্ষার জন্য এক কৌশল অবলম্বন করে। তারা স্থানীয় কোনো কুসীদজীবীর কাছে অর্থ জমা রেখে একটি প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে। অন্য নগরীতে বা অন্য রাজ্যে সেই কুসীদজীবীর প্রতিনিধি সেই পত্র দেখে অর্থ প্রত্যর্পণ করে, এর জন্য সামান্য কিছু দক্ষিণা দিতে হয়। রাজকোষাধ্যক্ষ বলছিলেন যে এভাবে বণিকরা কর ফাঁকিও দিচ্ছে। বিকর্ণ ও চণ্ড কি সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করেছিল? সুমলয়কে জিজ্ঞাসা করতে হবে বিকর্ণের কাগজপত্রের মধ্যে সেই রকম কোনো পত্র আছে কিনা।

কিন্তু সব থেকে বড় কথা হল, অস্ত্রটা কোথায়? বিকর্ণ বলতেই পারে যে কর এড়ানোর জন্য সে আয়ের পরিমাণ প্রকাশ করেনি, কিন্তু হত্যার প্রমাণ কোথায়?

অদূরে একটি বিরাট শিবিকার দিকে তাঁর দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। 'ওটি কার?’

'বহুদূর দেশ থেকে এসেছে। আপনি যদি এই কয়দিন ওই বিদেশির সামগ্রী ক্রয়ের জন্য মানুষের উৎসাহ দেখতেন, বুঝতে পারতেন। আমাদের পিতা পিতামহের কালে এমন কথা কেউ চিন্তাও করতে পারত না।' দোকানি সম্ভবত সেই সুদূর অতীতের কথা চিন্তা করেই ক্ষোভে মাথা নাড়ল।

কৌতূহলী কালিদাস সেই শিবিরের দিকে গেলেন। দরজাতে একজন প্রহরী ছিল, সে কালিদাসের পথ আটকাতে যাচ্ছিল, কিন্তু ভিতর থেকে এক শ্বেতকায় বিদেশি বেরিয়ে এসে তাকে ইঙ্গিত করে সরিয়ে দিলেন। বললেন, 'মহাকবি, আপনাকে নিকটে পেয়ে আমি ধন্য। সুদূর রোম পর্যন্ত আপনার খ্যাতি ছড়িয়েছে। আশা ছিল উজ্জয়িনীতে আপনার সাক্ষাৎ পাব, তা পূর্ণ হল। অরেলিয়াসের শিবিরে আপনাকে স্বাগত জানাই কবিবর।'

কথায় একটু টান থাকলেও অরেলিয়াস নামের সেই বিদেশীর ব্যাকরণে কোনো ভুল নেই। কালিদাসের কৌতূহল বেড়ে গেল। 'আপনি কি রোম নগরের অধিবাসী?’ রোম অনেকের কাছেই এক অর্ধকাল্পনিক শহর। প্রাচীন যবন সভ্যতার স্থান নিয়েছে এই নগরী।

'হ্যাঁ। তবে কবি, আমি সেই নগরী ছেড়েছি প্রায় এক বৎসর হয়ে গেল। আমি পূর্বেও কয়েকবার ভারত ভূখণ্ডে এসেছি, দীর্ঘদিন থেকেছি। আসুন, আপনাকে আমার পণ্য সামগ্রী কিছু দেখাই।'

কত দেশ থেকে কত রকমের সামগ্রী। অধিকাংশ স্থানের নামই কালিদাস শোনেন নি। একটি পুঁথি কালিদাসের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ভাষাটা অবশ্য তাঁর জানা নেই, কিন্তু চিত্র থেকে পরিষ্কার যে সেটি সূর্য চন্দ্র গ্রহাদির পরিক্রমণের উপরে লিখিত। অরেলিয়াস বললেন সেটি টলেমি নামক এক জ্যোতিষীর লেখা, সমগ্র রোম সাম্রাজ্য নাকি এই পঞ্জিকাই অনুসরণ করে। কালিদাসের সে বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান নেই, তবে জ্যোতিষবিদ্যার পণ্ডিত মাত্রেই রোমকপঞ্জিকার ব্যবহারে অভ্যস্ত। বরাহমিহির প্রায়শ বিক্রমাদিত্যের সভাতে বলেন যে সূর্যসিদ্ধান্ত ও রোমকসিদ্ধান্ত প্রায় সমতুল্য। অরেলিয়াস হাসতে হাসতে অন্য এক পুঁথি দেখালেন। বললেন, 'প্রাচীন গ্রিক জ্যোতিষীরা মহান, কিন্তু কখনো কখনো তাঁরা উদ্ভট ধারণা পোষণ করতেন। এই দেখুন, এই গ্রন্থে বলেছে সূর্য স্থির, পৃথিবী চলমান।'

'গ্রিক কারা?’ কালিদাসও হাসতে হাসতে জানতে চান।

'সংস্কৃত ভাষাতে তাদের বলে যবন।'

কালিদাস শেষ পর্যন্ত বিদায় চাইলেন। অরেলিয়াস বললেন, 'আপনাকে একটি সামগ্রী দেখাতে ইচ্ছা করি।' একটি জলভর্তি পাত্র নিয়ে কালিদাসকে বললেন, 'এর ভিতরে যে ক্ষুদ্র মূর্তিটি আছে, সেটি আপনাকে দিতে চাই।'

কালিদাস উঁকি মেরে দেখলেন পাত্রটিতে জল ছাড়া আর কিছুই নেই। জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনি কি আমার সঙ্গে কৌতুক করছেন?’

অরেলিয়াস হেসে বললেন, 'আপনার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটছে। পাত্রের অভ্যন্তরে হাত দিন।'

কালিদাস তাই করলেন। হাতে কিছু ঠেকল। তুলে আনলেন জল থেকে। দেখলেন একটি কাচনির্মিত মৎস্যমূর্তি। কালিদাস অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে। কাচের সামগ্রী উজ্জয়িনীতে মোটেই দুর্লভ নয়, কিন্তু তা রঙীন বা ঘোলাটে। এমন স্বচ্ছ কাচ তিনি কখনো দেখেন নি। হাতে ধরে আছেন, কিন্তু চোখ যেন তাকে অনুসরণ করতে পারছে না। বিস্ময়ে উচ্চারণ করলেন, 'অপূর্ব। এর মূল্য কত?’

অরেলিয়াস এক পা পিছিয়ে গেলেন। বললেন, ‘মহাকবি আমার তুচ্ছ উপহার স্বীকার করুন। আপনার গৃহে এটি থাকলে কখনো কখনো এই রোমককে আপনার মনে পড়বে।'

'ধন্যবাদ। এর মূল্য আমার কাছে অনেক। কিন্তু এই ভঙ্গুর বস্তুটিকে তো খুব সাবধানে রাখতে হবে।'

অরেলিয়াস হেসে বললেন, 'না কবি, এর ধর্ম এমন যে এই কাচ বেশ কঠিন, সহজে ভাঙে না। কিন্তু এ প্রায় জলের মতোই স্বচ্ছ। এটিও আলেকজান্দ্রিয়াতেই তৈরি, কিন্তু এই কাচ নির্মাণের রহস্য অতি গুপ্ত, আমারও অজ্ঞাত। এই আশ্চর্য দেখার জন্য অনেক ধনাঢ্য নাগরিক এই কাচের সামগ্রী কিনেছেন।'

কালিদাস চমকে উঠলেন, তারপরে অরেলিয়াসকে প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কি উজ্জয়িনীতে এই সামগ্রী অনেক বিক্রয় করেছেন?’

'সে কটি এনেছিলাম সবগুলিই বিক্রীত, কেবল এই ক্ষুদ্র মৎস্যটি অবশিষ্ট ছিল। আমি এই উজ্জয়িনীর ক্রেতাদের উপরেই ভরসা করেছিলাম, ভারতের অন্য কোন নগরের নাগরিকরা এই সব দুর্মূল্য বস্তু কিনতে সক্ষম হবে? '

'ক্রেতাদের সবাইকে স্মরণ করতে পারবেন?’

'কবি, আপনি আমাকে কৌতূহলী করে তুলছেন। মাসাধিক কাল এই মেলা চলছে, সকল ক্রেতাকে মনে আনতে পারব না। কিন্তু কেন?’

'দেখলে মনে পড়বে?’

'সম্ভবত।'

'ধন্যবাদ। আমাকে যেতে হবে। আপনাকে অনুরোধ, আজ উজ্জয়িনী ত্যাগ করবেন না।'

'কৌতূহল বৃদ্ধি পাচ্ছে। আজ নগর ত্যাগ এমনিই আমার পক্ষে সম্ভব নয়।'

কালিদাস কোটালের কার্যশালার উদ্দেশে চললেন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি সেখানে ছিলেন। 'সুমলয়, আততায়ীর অস্ত্র আমি খুঁজে পেয়েছি।’

'কোথায়?’

'পান্থশালায় এসো আমার সঙ্গে।'

দুজনে দ্রুতপদে পান্থশালায় পৌঁছালেন। মাঘ মাসের বেলা দীর্ঘস্থায়ী হয় না, সন্ধ্যা নামছে। মহাকাল মন্দিরে আরতি শুরু হয়েছে। কালিদাস বাইরের প্রহরীকে বললেন, 'সৌগন্ধকে বলো অবিলম্বে একটি মশাল ও একটি বস্ত্র দিতে।'

মশাল নিয়ে পান্থশালার অধিকারী নিজেই উপস্থিত। 'কী হয়েছে কবিবর?’

কালিদাস শুধু সংক্ষেপে বললেন, 'আমার সঙ্গে আসুন।'

স্নানাগারে পৌঁছে কালিদাস প্রথমে বস্ত্রটি পরে নিজের পরিধেয় খুলে রাখলেন। বললেন, 'মশালটি তুলে ধরুন।' তারপর বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে শীতল জলে ভরা পরিখাতে নেমে পড়লেন। পরিখার জল কালিদাসের কণ্ঠ পর্যন্ত উঠেছে। সকলের বিমূঢ় দৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি জলের মধ্যে এদিক ওদিক ঘুরতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ ডুব দিয়ে বিজয়গর্বে কিছু তুলে আনলেন। উপরে উঠে এসে দ্রুত অঙ্গ শুষ্ক করে নিজের বস্ত্র পরে নিলেন। 'এই নাও আততায়ীর অস্ত্র, পিশাচের নখ। আমরা ধাতুনির্মিত ছুরিকার সন্ধান করছিলাম, তাই আমাদের চক্ষুর সম্মুখের বস্তুই দেখতে পাইনি।'

মশালের আলোতে কালিদাসের হাতে ঝলমল করছে একটি স্বচ্ছ ছুরিকা। কাচ নির্মিত, দৈর্ঘ্য বিঘৎ পরিমাণ, তার অগ্রভাগটি সূচের মতো সূক্ষ্ম। কালিদাস সাবধান করে দিলেন, 'অগ্রভাগ কিন্তু অতি শাণিত।'

সুমলয় সাবধানে সুদৃশ্য ছুরিকাটি হাতে নিলেন। 'অসাধারণ, কালিদাস, অসাধারণ। কিন্তু এটি যে বিকর্ণেরই তা কী করে প্রমাণ হবে?'

'রোমক বণিক অরেলিয়াসকে এই ছুরিকা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করো সে বিকর্ণকে এটি বিক্রয় করেছে কিনা। বিকর্ণ ও চণ্ড এবারে মেলাতে অনেক লাভ করেছিল, তার অংশ থেকে চণ্ডকে বঞ্চিত করার জন্য বিকর্ণ এই হত্যা করেছে। অরেলিয়াস এই কাচ নির্মিত বস্তু বিক্রয়ের সময় সবাইকে দেখাচ্ছিল যে জলের মধ্যে তা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়, তাই দেখে তার মস্তিষ্কে হত্যার পরিকল্পনা আসে; ভেবেছিল ছুরিকাটি পরিখার তলদেশে থাকলে তার সন্ধান কেউ পাবে না, কখনোই তার দোষ প্রমাণ করা যাবে না।'

'কিন্তু এটি তো কাচ নির্মিত, নিজের বিরুদ্ধে এমন প্রমাণটিকে ভেঙে ফেলেনি কেন?’

'কাচ নির্মিত হলেও এ ক্ষণভঙ্গুর নয়। একাধিক খণ্ড হলেও তাদের থেকে পূর্বের আকার অনুমান করা কঠিন হবে না। তা ছাড়া বণিক মানুষ, সহজে দুর্মূল্য বস্তুকে নষ্ট করতে চায়নি। সম্ভবত ভেবেছিল পিশাচের ভয়ে কেউ স্নানকক্ষে আসবে না, পরে কোনো অবসরে সে এটি উদ্ধার করে নেবে। কিন্তু প্রহরীর চোখ এড়িয়ে তা করতে সক্ষম হয়নি। আমি নিশ্চিত যে তুমি ওর কাগজপত্রের মধ্যে সন্ধান করলে কোনো কুসীদজীবীর কাছে অর্থ জমা রাখার প্রমাণপত্র পাবে। শম্ভকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও করো।'

তারপর নিজের মনেই বললেন, 'সুমলয় তুমি বলেছিলে আমি পিশাচে বিশ্বাস করি না। করি, খুব দৃঢ়ভাবেই করি। অর্থলোভ, হিংসা, পরপীড়ন এই সমস্তই তো পিশাচ। কিন্তু তারা বাইরে নয়, মানুষের মনের অভ্যন্তরে বাস করে।

 

প্রকাশঃ এ যুগের কিশোর বিজ্ঞানী শারদ 1428