চিড়িয়াখানা
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি।
জঙ্গলে রাস্তা
হারানোর গল্প অনেক শুনেছি, কিন্তু এতদিন ভাবতাম সে সব বোকাদের হয়। তোমারাই বলো,
সোজা যাওয়াটা কোনো ব্যাপার হল? ঠিক করে নিলাম
কোনদিকে যাব, সামনে গাছ বা ঝোপ পড়লে তার পাশ দিয়ে ঘুরে যাব। এতে ভুল হতে যাবে কেন?
বড়মামি অনেক করে আমাকে
বলেছিল, ‘দেখ, বেলা আর বেশি নেই। আজকের দিনটা আমাদের বাড়িতে থেকে যা। কাল সকালের বাসেই রওনা হয়ে যাবি। এমনিই জঙ্গলের ভিতর দিয়ে
রাস্তা। গুলিয়ে যেতেই পারে। সন্ধে হয়ে গেলে আরো বিপদে পড়বি।’
‘ভারি তো
জঙ্গল, বাঘ ভাল্লুক আছে যে ভয় পেতে হবে?’
‘তা নেই,
শিয়ালের চেয়ে বড়ো কোনো জন্তু আর এই জঙ্গলে নেই। বাঘ চিতাবাঘ তো ইংরেজরা কবেই
মেরে শেষ করে দিয়েছে। মাঝে মধ্যে একটা ভাল্লুক ছিটকে ছাটকে এসে
পড়ে। তবু রাতটা থেকে
গেলেই পারিস।’ বড়মামা বলল।
একটু আগে খরগোসকে ভয় পাব বলে ঠাট্টা করে এখন কিনা বলে
থেকে যা! ‘না, না। কাল সকালেই আমাকে আবার বেরোতে হবে। দেরি হলে সমস্যা। রাত হবে কেন, কতটুকু আর
রাস্তা? হলেও অসুবিধা নেই। আজ পূর্ণিমা, চাঁদের আলোতে দেখে দেখে চলে যাব। তোমরা একদম চিন্তা করো না।’
এসেছিলাম অফিসের
কাজে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ। কদিন থাকতে হবে। জায়গাটা পশ্চিমবঙ্গ আর ঝাড়খণ্ডের সীমান্তের কাছেই। খুব সুন্দর পরিবেশ। পাশেই ডুগাডুগি নদী। একসময় এখানে অনেক সাহেব থাকত, তাদেরই একটা বাড়িতে হোটেল চালু হয়েছে।
সেখানেই উঠেছি।
ম্যাকলাস্কিগঞ্জ আসছি শুনে মা বার বার
করে বলে দিয়েছিল, বড়মামার সঙ্গে যেন দেখা করে আসি। মামারা থাকে বেতড় বলে একটা গ্রামে। একদিন সকালে বেরিয়ে
বড়মামাদের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। জঙ্গলের ধার ধরে বাসের রাস্তা, দারুণ দৃশ্য। জঙ্গলের মধ্যেই প্রায় মামাদের বাড়ি। ফোন করেই গিয়েছিলাম, মামার বাড়িতে সময়টাও ভালোই কাটল। বিপদটা হল ফেরার সময়। বেতড়ে সারাদিনে দুটো বাস
আসে, দুটোই ম্যাকলাস্কিগঞ্জ থেকে। বিকেল তিনটের সময় বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে শুনি বিকেলের বাস
ক্যানসেল।
‘এখানে একটা
গাড়ি পাওয়া যাবে না?’ আমি বড়মামাকে জিজ্ঞাসা করি।
‘গাড়ি বেতড়ে
শুধু আমাদেরই আছে, কিন্তু সে তো রাঁচিতে। গাড়ি মানে জিপ, এখানের রাস্তার পক্ষে সবচেয়ে ঠিক। একটু মেরামত করতে দিয়েছি। ড্রাইভার সঙ্গে গেছে। পরশু ফিরবে।’ ‘আসার সময় তো বাসে প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগলো। শর্ট কাট রাস্তা নেই? আমাকে কাল
সকালে বেরোতেই হবে। সকালের বাসে গেলে তো এগারটার আগে পৌঁছনো যাবে না।’
‘বাস ঘুরে
ঘুরে এসেছে। জঙ্গলের ভিতরের রাস্তা দিয়ে বেশি দূর নয়,
কিলোমিটার দশেক হবে। কিন্তু তুই শহরের লোক, দশ কিলোমিটার হাঁটতে পারবি? তাও আবার বনের মধ্যে দিয়ে? ফোনের টাওয়ার
পাবি না। জঙ্গলে ঘোরার অভ্যাস নেই, খরগোশ দেখে ভির্মি খেতে পারিস। তখন আবার তোকে খুঁজতে লোক পাঠাতে
হবে।’
সম্মানে লেগে
গেল। ‘তুমি রাস্তাটা বলে দাও। আমি ঠিক চলে যাব।’
আপত্তি মামির ছিল, কিন্তু আমি কিছুতেই থাকব না বুঝে হাল ছেড়ে দিল। বারবার করে বলে
দিল, পৌঁছেই যেন ফোন করে দিই। মামা রাস্তাটা
ভালো করে বুঝিয়ে দিল। তখন তো মনে হয়েছিল সোজা। পায়ে চলা একটা পথ ধরে কিছুটা যেতে
হবে।
ডানদিকের দুটো রাস্তা ছেড়ে তিন নম্বরটা
ধরতে হবে। সেটা পড়বে গিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মাঠের মতো একটা ফাঁকা জায়গায়। তার মাঝে
কিন্তু এক ধার করে একটাই বড়ো গাছ আছে। সেই গাছের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে ডান দিকে আর
একটা পায়ে চলা পথ বেরিয়েছে। সেটা দিয়ে কিছুটা এগোলেই ডুগাডুগি নদী। এবার বাঁদিকে ঘুরে তার ধার ধরে ধরে গেলেই ম্যাকলাস্কিগঞ্জ। এর মধ্যে শক্ত আছেটা কী? মামা এমনকি একটা কাগজে ম্যাপের
মতো করে রাস্তাটা এঁকেও দিয়েছে।
শক্ত কী আছে টের পেলাম
যখন দেখলাম কোনটা মানুষের পায়ে চলার রাস্তা বুঝতে পারছি না। তার আগে পর্যন্ত
দিব্যি যাচ্ছিলাম। মনোরম পরিবেশ। সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছিল একপাল গরুর গলার ঘণ্টার
আওয়াজ। কাঠের ঘণ্টারা একসঙ্গে বাজলে যে এত শ্রুতিমধুর হতে পারে, না শুনলে তোমাদের বিশ্বাস
হবে না। গ্রাম ছেড়ে জঙ্গলে ঢোকার পরেও বহুক্ষণ সেই আওয়াজ কানে আসছিল। কিন্তু তার
পরেই হল সমস্যা। ডানদিকের কোন রাস্তাটা তিন নম্বর? অনেক চিন্তা করে যেটা ধরলাম, সেটা কিছুটা গিয়েই শেষ হয়ে গেল। আবার ফিরে আসতে হল। তার পরের রাস্তাটাও একই ব্যাপার। আবার ফিরে
এসে পিছিয়ে এসে আগের একটা রাস্তা ধরতে হল। অবশেষে
একটা মাঠ পেলাম।
রাস্তা
হারানোর জন্য কিছুটা ঘুরতে হয়েছে। রোদ তখন পড়ে এসেছে। শীতকাল হলেও হাঁটাহাঁটি করে বেশ গরম লাগছিল। পকেট থেকে রুমাল বার করে মুখ মুছলাম। মাঠটা একটা ফুটবল গ্রাউন্ডের
মতো বড়ো। কিন্তু এটার কথাই কী মামা বলেছিল? মাঠের মধ্যে গাছ একটা নয়, দুটো। আমি
শহরের লোক, গাছ বিশেষ চিনি না। গাছ দুটোর মধ্যে একটা ছোটোই, কিন্তু ঝুরি নেমেছে। অনুমান করলাম
সেটা বট জাতীয় কিছু হবে। গাছটা ছোট হলে কী হবে, ঝুরিগুলো বেশ মোটা মোটা, গুঁড়ির
মতোই লাগছে। শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেনের বটগাছটার কথা মনে পড়ে গেল।
কোন গাছটার
কথা মামা বলেছিল? পরপর দুটো গাছ, তাদের দুটোরই পাশে একটা করে রাস্তা। আরো
কয়েকটা পায়ে চলা পথ এদিক ওদিক বেরিয়েছে। মামা নিশ্চয় গুলিয়ে ফেলেছে। ওই বটগাছ
নাকি, তার পাশ দিয়েই একটা রাস্তা গেছে। সেটাই ধরলাম।
জঙ্গলের মধ্যে
ঢুকতেই আবার অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। শালগাছ, সেগুন গাছ -- তাদের মাথায় বিকেলের রোদ বটে, কিন্তু তা নিচে এসে পৌঁছচ্ছে
না। আমায় যেতে হবে উত্তর দিকে। কিন্তু রাস্তাটা এঁকেবেঁকে
গেছে। কিছুক্ষণ পরে কোন দিকে যাচ্ছি গুলিয়ে
ফেললাম।
নদীটাই বা
কোথায়? অনেকটা পরে গাছের ফাঁক দিয়ে সামনে কিছুটা ফাঁকা জায়গা দেখতে পাচ্ছি, ওইটাই
নিশ্চয় নদীটা। পা চালিয়ে এগোলাম।
যা: বাবা, এ যে
আরো একটা মাঠ। ঘুরে ঘুরে কী আগের মাঠটাতেই এসে পড়লাম নাকি? না না, এটায় তো মাত্র
একটা গাছ। আগের মাঠে যে বটগাছের মতো দেখতে
গাছটা ছিল, সেটা নেই। মামা কি তাহলে এই মাঠটার কথাই বলেছিল? আমি কী ভুল করে অন্য
দিকে চলে গিয়েছিলাম? নিশ্চয় তাই হবে। ম্যাপটা দেখি তো।
পকেটে হাত
দিয়ে দেখি ম্যাপ নেই। নিশ্চয় রুমাল বার করতে গিয়ে পড়ে গেছে। ঠিক আছে, আমার মনে আছে
গাছের দিকে মুখ করে ডান দিকের রাস্তা। এগোচ্ছি, হঠাৎ খেয়াল পড়ল ঘাসের উপর সাদা মতন
কী একটা পড়ে আছে। কাছে গিয়ে দেখি একটা কাগজ। নিশ্চয় একটু আগে এখান দিয়ে কেউ গেছে।
কাগজটা তার পকেট থেকেই পড়েছে। দুপুরে এখানে এক পশলা বৃষ্টি হয়েছিল – ঘাস এখনো ভিজে
কিন্তু কাগজটা মোটামুটি শুকনোই।
কৌতূহলবশত
হাতে তুলে নিলাম কাগজটা। আরে এটা যে মামার আঁকা সেই ম্যাপটা -- এটা এখানে কী করে
এলো?
আবার ভালো করে
দেখলাম। না, একটাই তো গাছ। আমি তো এখানে আসিনি। তাহলে কাগজটা এখানে এলো কোথা
থেকে?
এইবার সত্যি
সত্যি ভয় করতে লাগল। পুরোপুরি অন্ধকার তখনো হয়নি, কিন্তু আমার গা ছমছম করছে। কলকাতায়
বসে বিদ্যুতের আলোয় যেসব ভূতের গল্প পড়ে তোমাদের মতো আমারও হাসি পেত, তাদের কয়েকটা
মনে এলো। ফিরে যাব নাকি? কিন্তু কোন দিক দিয়ে? ফিরতেও তো সময় লাগবে। ফিরে গেলে আবার
মামার টিটকিরি শুনতে হবে। শাঁখের করাত দিয়ে
স্কুলে বাক্যরচনা করতে হয়েছে যাদের, তারা নিশ্চয় অবস্থাটা বুঝতেই পারছ।
সামনের দিকেই যাই।
আগের বার যে পথটা ধরেছিলাম, সেটা বাদ দিয়ে আর একটু এগোলাম। আগেই খেয়াল করেছিলাম,
ওই গাছটার পরেই রয়েছে আরো একটা পথ। মানুষ চলাচল করার রাস্তা, ঘাস বিশেষ গজায়নি। মামা এটার কথাই
হয়তো বলেছিল।
সন্ধে হয়ে
এসেছে, জঙ্গলের ভিতরে আলো বলতে ভরসা সঙ্গের মোবাইল। ফোনে টাওয়ার নেই, কাজেই মামাকে
পথ জিজ্ঞাসা করার উপায় নেই। রাস্তাটা দিয়ে পায়ে পায়ে এগোলাম। শীতকাল বলে সাপখোপের
ভয় নেই, সেটাই বাঁচোয়া। মোবাইলের টর্চটা মাঝে মাঝে জ্বালাচ্ছি। টানা জ্বালিয়ে
রাখতে সাহস হচ্ছে না, কতক্ষণ এই জঙ্গলে ঘুরতে হবে কে জানে? হঠাৎই দেখি রাস্তা আর
নেই, সামনে একটা গাছ।
আলো আঁধারিতে
দেখলাম গাছটা ছোটো, কিন্তু মোটা মোটা ঝুরি নেমেছে। ঠিক যেন মাঠের সেই ভ্যানিশ হয়ে
যাওয়া গাছটা। রাস্তাটা হঠাৎ শেষ হবে কেন? মাঠের সেই গাছটাই গেল কোথায়? গায়ে কাঁটা
দিয়ে উঠল। মনকে বোঝালাম, এটা সেই গাছটা হতে পারে না, সেটা ছিল মাঠের মধ্যে। সব বটগাছই
হয়তো আমার মতো শহরের ছেলের কাছে একরকম দেখতে লাগে।
পাশ কাটিয়ে
এগিয়ে দেখব রাস্তাটা পাওয়া যায় কিনা? নাকি পিছনে ফিরব? পিছন দিকে তাকানো মাত্র
হৃৎপিণ্ডটা যেন লাফিয়ে গলার কাছে উঠে গেল। রাস্তার ঠিক মাঝখানে অন্ধকারের মধ্যে
তিনটে লাল আলোর বিন্দু জ্বলছে, ঠিক যেন তিনটে চোখ। মাটি থেকে দোতলা বাড়ির কাছাকাছি
উঁচুতে। মোবাইল পকেটে রেখেছিলাম। কাঁপা কাঁপা হাতে বার করলাম, আলো জ্বালার আগেই
ধুপধাপ শব্দ করে বিরাট চেহারার কি যেন একটা জঙ্গলে ঢুকে গেল। পিছনের গাছটার পাতাগুলোতে
একই সঙ্গে সড়সড় আওয়াজ হল, কিন্তু সেদিকে মন দেওয়ার মতো অবস্থা আমার ছিল না।
এতো বড় কোন জন্তু
এখানে আছে? তিনটে চোখ কেমন করে, লাল রঙেরই বা কেন? এমন সব প্রশ্ন মাথায় এলো,
কিন্তু সবার আগে মনে হল – প্রাণীটা হিংস্র নয় তো? আমাকে কি দেখতে পেয়েছে?
পিছন দিকে আর
যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, বটগাছটার পাশ দিয়েই যেতে হবে। পিছনে ঘুরলাম।
গাছটা নেই।
আমাকে তোমরা ভিতু
ভাবতেই পারো, কিন্তু বাজি রেখে বলতে পারি তোমাদেরও তখন একই অবস্থা হত। পাগুলো যেন
মাটির সঙ্গে স্ক্রু করে কেউ আটকে দিয়েছে। শীতের মধ্যেও ঘামতে শুরু করে দিয়েছি। একটা
আস্ত গাছ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মিলিয়ে যেতে পারে নাকি? আলো জ্বাললাম। পায়ে চলা
পথটা ফিরে এসেছে। মাটিতে কিছু দাগ মতো আছে, কিন্তু তার বেশি নয়। একি ভোজবাজি নাকি?
হতবাক হয়ে
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানিনা। তারপর একেবারে পড়িমরি দৌড় মারলাম। কোনদিকে জানি না,
অন্তত এই জায়গা থেকে পালাতেই হবে। পাঁচ মিনিট ছুটেছি বোধহয়। অন্তত তিনবার হোঁচট
খেয়ে পড়েছি, বেশিও হতে পারে। তারপর
দাঁড়াতেই হল। আর দম নেই।
জোরে জোরে
হাঁপাচ্ছি, স্কুল ছাড়ার পরে দৌড়োদৌড়ির অভ্যাস নেই। আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হলাম।
অন্ধকার হয়ে গেছে, মোবাইলের আলোটা নিশ্চয় কোনো সময় বন্ধ করেছিলাম, মনে নেই কখন।
কাজেই কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কোথায় এসেছি আর
কোনদিকে যেতে হবে, কিছুই বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে সারা রাত এই জঙ্গলেই
কাটাতে হবে। কিন্তু যেখানে তিনচোখো দানবরা পিছু নেয় আর জঙ্গলের গাছরা ঘুরে বেড়ায়
সেখানে সারারাত তো দূরের কথা এক মিনিট থাকার কথাও ভাবতে পারছি না।
হঠাৎ খেয়াল
হল, আমি তো আর হাঁপাচ্ছি না, তাহলে জোরে জোরে নিঃশ্বাসের শব্দ কোথা থেকে আসছে?
নিঃশ্বাস বন্ধ
করে ফেললাম, কান খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলাম। মনে হল আওয়াজটা ডান দিক থেকে আসছে।
আস্তে আস্তে নিঃশব্দে ফিরলাম সেদিকে। আওয়াজটা
উপর থেকে আসছে।
মাথাটা ক্রমশ
উপরে তুলতে লাগলাম। সামনের গাছটা বোধহয় কুড়ি ফুট উঁচু হবে, অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে
না কী গাছ। তার উপরের দিকের একটা ডালে বসে আছে কিছু একটা। হনুমান, নাকি অন্য কিছু?
আলোটা জ্বালব নাকি? আমাকে দেখতে পেয়ে যাবে। কিন্তু দৌড়ের সময় আমি যা আওয়াজ করেছি,
তাতে করে এক কিলোমিটারের মধ্যে কোন জন্তুর কি জানতে বাকি আছে?
কাঁপা কাঁপা হাতে
আবার মোবাইলের টর্চটা জ্বাললাম। চোখ সয়ে যেতে দেখি ...
কী বলব? এরকম
কোনো জন্তুর কথা কখনো কল্পনাতেই আসেনি। সত্যি কথা বলতে সেটা প্রাণী না অন্য কিছু,
তাই বুঝতে পারছিলাম না। ঠিক যেন একটা পিরামিডকে কেউ মাঝখান থেকে কেটে উপরের দিকটা
বাদ দিয়ে দিয়েছে। মাথা পা হাত ডানা লেজ কিচ্ছু নেই, চওড়ায় ফুট চারেক, দু ফুট উঁচু।
যন্ত্র মনে হতেই পারত, কিন্তু শরীরটা পালকজাতীয় কিছুতে ঢাকা, নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো
করে দেহটা বাড়ছে কমছে। কেমন করে কিছু দিয়ে না ধরে গাছের ডালে বসে আছে বুঝতে পারলাম
না।
প্রথমেই মনে
হল ভূত নিশ্চয়! কিন্তু মাথা কাটা যাওয়া পিরামিডের মতো কোনো ভূতের কথা কেউ শুনেছে? মানুষ
মরে যদি ভূত হয়, তাহলে গাছ মরেও হয়তো ভূত হতে পারে। কিন্তু পিরামিড মরে কেমন করে?
আর তার কি প্রাণ ছিল যে মরে ভূত হবে? ভূত হলেও সে মিশর ছেড়ে ঝাড়খণ্ডে আসবে কেন? পিরামিডের
মাথা কাটা গেলে কি সে কন্ধকাটা ভূত হয়? ভূতে কি নিঃশ্বাস নেয়? এক রাতের মধ্যে চলমান
গাছ, পিরামিডের ভূত, তেচোখো দানব! আমি নিশ্চয় পাগল হয়ে গেছি।
এই সমস্ত কথা
যখন ভাবছিলাম, তখন আমি কিন্তু বোকার মতো দাঁড়িয়েছিলাম না। এক পা এক পা করে পিছচ্ছিলাম। দূরত্বটা
যখন ফুট কুড়ি হয়েছে, দেখি পিরামিডটা গাছ থেকে লাফিয়ে নামল। অমনি নিচের দিকে চারটে
পায়ের মতো কি বেরিয়ে এলো। ওরে বাবা, আমার দিকে আসছে যে! আবার পিছন ফিরে দৌড় মারলাম।
পিছন থেকে একটা শিসের মতো আওয়াজ কানে এসেছিল, খুব তীক্ষ্ণ। মনে পড়ল বিদেশের গল্পে
ব্যানশি ভূতের কথা পড়েছিলাম, তারা নাকি এইরকম কাঁদে। কিন্তু সে তো আয়ারল্যান্ডের
গল্প। অবশ্য ম্যাকলাস্কিগঞ্জে একসময় অনেক মেমসাহেব থাকত, তাদের কেউ মরে কী ব্যানশি
হয়ে থাকতে পারে? এত বিপদের মধ্যেও কিন্তু মোবাইলটা হাত থেকে ছাড়িনি। টর্চটা নেভানোর
কথা এবার অবশ্য মাথায় আসেনি।
কয়েক মিনিটও
হয়নি, সেই গাছভূতের থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। তাই এখন আর খুব দম নেই। জোরে দৌড়োতে
পারছি না। পিছন ফিরে দেখব সে সাহস নেই। কোনো আওয়াজ শুনতে পাইনি, অবশ্য আমি নিজেই
যা আওয়াজ করছি, তাতে অন্য কোনো শব্দ কানে আসা শক্ত।
দৌড়োতে দৌড়োতে
হঠাৎ বুঝলাম আশপাশে গাছ আর নেই। পায়ের তলার জমিটা নেমে গেছে। কোনোরকমে টাল
সামলালাম। একটা শব্দ কানে এলো। জলের আওয়াজ। নিশ্চয় ডুগাডুগি নদীর কাছে এসে পড়েছি।
মোবাইলের
আলোটা নিভিয়ে দিলাম। চাঁদের আলো এসে পড়েছে। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধে দাঁড়িয়ে রইলাম। স্রোতের
শব্দ, ঝিঁঝিঁর ডাক, দূরের রাতচরা পাখির ডাক – আর কোনো শব্দ কানে আসছে না। শুনেছি
গরমকালে নাকি ডুগাডুগি নদী প্রায় শুকিয়ে যায়। এখন শীতকাল,
কিন্তু কদিন আগে ভারি বৃষ্টি হয়েছিল। এখনো মাঝে মাঝে বৃষ্টি হচ্ছে। তাই নদীতে বেশ
জল।
মামা কী যেন
বলেছিল! ডানদিক না বাঁদিক? কোনদিকে ঘুরব? আবার ম্যাপটা বার করলাম। মোবাইলের আলো
জ্বাললাম। আচ্ছা, বাঁদিকে ঘুরতে হবে। নদীর ধার ধরে ভয়ে ভয়ে রওনা দিলাম। ভেবেছিলাম
আওয়াজ করব না, কিন্তু কাদায় পা পড়ে প্যাচপ্যাচ আওয়াজ হচ্ছে। নদীর ধার ছেড়ে একটু
ওপরের শক্ত ডাঙায় উঠে এলাম।
মোবাইলের
ব্যাটারি বেশিক্ষণ থাকবে না, তাই সারাক্ষণ আলো জ্বালিয়ে খরচ করছি না, অল্প অল্প
করে জ্বালাচ্ছি। পূর্ণিমার চাঁদ উঠে গেছে, খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। একটু একটু
করে এগোচ্ছি আর একটু একটু করে সাহস ফিরে পাচ্ছি। তাও বার বার পিছন দিকে
তাকাচ্ছিলাম। একবার দুবার মনে হল যেন একটা বিরাট ছায়া আমার পিছু নিয়েছে। পিছনে আলো
ফেললাম, কিন্তু কিছু বুঝতে পারলাম না।
আরো একটু
এগোতেই দেখলাম যে নদীর ধারটা এমন ঘন ঝোপঝাড়ে ভর্তি যে তার মধ্যে দিয়ে যাওয়া সম্ভব
নয়। হয় আবার বনের মধ্যে ঢুকতে হবে, না হয় নদী পেরোতে হবে। কিন্তু নদীতে স্রোত বেশ,
তার উপর শীতের সন্ধে। নামার প্রশ্নই ওঠে না। আবার জঙ্গলে ঢুকতে হবে ভাবতেই গা হাত
পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। কিন্তু অন্য কোনো উপায়
নেই। তবু আমি আবার বাজি রেখে বলতে পারি
আমার মতো সাহস তোমাদের কারোর হতো না। পারতে আবার জঙ্গলে ঢুকতে? যদি জানতে ওইরকম
ভূতগুলো সব বনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে? আমি কিন্তু চার পাঁচবারের বেশি ভাবিনি।
মোবাইলের
আলোতে দেখলাম একটা পায়ে চলা পথের মতো। নিশ্চয় এখান দিয়ে যেসব মানুষ যায়, তারা বনের
মধ্যে দিয়েই চলে। সেই পথটাই ধরলাম। বনের মধ্যে অন্ধকার। মাঝে মাঝে শুকনো পাতার
খড়খড় আওয়াজ, যেন ভারি কোনো প্রাণী চলে যাচ্ছে। কাছে নয়, এই যা বাঁচোয়া। মোবাইলের আলোটা
জ্বালিয়ে নিয়েছি। আরো একটু এগিয়েছি, একটা জায়গায় এসে পড়লাম যেখানে রাস্তাটা দুটো
ভাগ হয়েছে। আমার বাঁদিকেরটাই ধরা দরকার নিশ্চয়, কিন্তু ...
বাঁদিকের
রাস্তাটার ঠিক মাঝখানে একটা ঝুরিওলা গাছ। ঠিক আগের গাছটার মতো। তার পাশ দিয়ে যেতে
সাহসে কুলাল না। অগত্যা ডানদিকের রাস্তাটাতেই পা বাড়ালাম। একটা বেশ বড় গাছকে
পেরোতেই ধড়ে প্রাণ এলো। একটা ঝোপের ওধারে একজন মানুষ। অন্ধকারে খুব ভালো দেখা
যাচ্ছে না, কিন্তু মানুষ তো বটে। নিশ্চয় ম্যাকলাস্কিগঞ্জের দিকে যাচ্ছে। ওর সঙ্গ ধরে
নিতে হবে। আর যদি ওদিকে নাও যায়, অন্তত রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে তো পারবে।
‘দাদা,
শুনছেন?’ না না, হিন্দিতে বলি। ঝাড়খন্ডে আছি। ‘ভাইসাব, শুনিয়ে।‘
লোকটা আমার
দিকে মুখ তুলে তাকাল। তারপর কোনো কথা না বলে ঝোপঝাড় ভেঙে আমার দিকে আসতে থাকল।
যাক, এবার নিশ্চিন্ত। ‘আপ কিস তরফ যায়েঙ্গে? মুঝে ম্যাকলাস্কিগঞ্জ যানা হ্যায়।’
কোনো উত্তর
নেই। বোবা নাকি? খালি ঝোপঝাড় ভাঙার আওয়াজ। যাক গে, আর তো কয়েক সেকেন্ড পরেই
সামনাসামনি দেখা হয়ে যাবে।
লোকটা আমার
কাছাকাছি এসে গেছে, হঠাৎ একটা কান ফাটানো শিসের শব্দ। তারপরেই একটা জাল গিয়ে
লোকটার গায়ে পড়ল। সে ছটফট করছে এমন সময় একটা প্রাণী আমার পাশ দিয়ে গিয়ে লোকটার উপর
ঝাঁপিয়ে পড়ল। মোবাইলটা তখনো আমার হাতে,
তার টর্চটাও জ্বলছে। সেই আলোতে লোকটা যে প্রাণীটার সঙ্গে লড়াই করছে তাকে দেখতে
পেলাম। সেই মাথাকাটা পিরামিড ভূত! য়াবছা আলোতে মনে হল মানুষটা পোশাক পরে নেই। হয়তো ধুতি কি লুঙ্গি জাতীয় কিছু ছিল,
ধস্তাধস্তিতে খুলে গেছে।
এখন কি করি?
একটা মানুষ চোখের সামনে মরে যাবে, কিছু করব না? কিন্তু ভূতের সঙ্গে লড়াই করব কেমন
করে? তাও পিরামিড ভূত! সে আবার মাছ ধরার মতো করে জাল দিয়ে মানুষ ধরে! তবু কিছু একটা
করা উচিত, এই ভেবে যেই ওদিকে এক পা এগিয়েছি, সাপের মতো কী একটা আমার কোমর জড়িয়ে
ধরল। প্রথমেই মনে হল অজগর, কিন্তু হাত দিয়ে দেখলাম সাপের মতো পিচ্ছিল নয়, অনেকটা খসখসে।
কিছু বোঝার আগেই দেখলাম আমার পা আর মাটিতে নেই, আমি ঝুলছি। মাথা ঘুরিয়ে দেখলাম সেই
গাছটা তার একটা ঝুরি দিয়ে আমাকে জাপটে ধরেছে। সর্বনাশ! এতো সেই সত্যজিৎ রায়ের
গল্পের সেপ্টোপাস। তারপর আমার আর কিছু মনে নেই।
জ্ঞান যখন
ফিরল, বুঝতে পারলাম আমি নরম কিছুর উপর শুয়ে আছি। একটা গলা শুনলাম, ‘ডরনা মাৎ। অব ক্যায়সে
হ্যায় আপ?‘
যাক, এ যাত্রা
ভূতের হাত থেকে বেঁচে গেছি তাহলে। চোখ খুললাম। ঘন অন্ধকার। প্রথমে মাতৃভাষাই মনে
এলো, ‘আপনি কে?’
সামান্য
বিরতি, তারপরে বাংলায় শুনলাম, ‘ভয় পাবেন না। এখন কেমন বোধ করছেন?’
‘আমি কোথায়?
এখানে এলাম কেমন করে? আলো জ্বালাননি কেন?’
‘আপনি যেখানে
অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন, এই জায়গাটা তার থেকে খুব দূরে নয়। আমরাই আপনাকে নিয়ে এসেছি।
এখানে আলো জ্বালানোর একটু অসুবিধা আছে।‘ গলাটা যেন কেমন! যান্ত্রিক!
‘জঙ্গলের
মধ্যে আছি এখনো!’ আমি উত্তেজনায় উঠে বসলাম, ‘এখুনি পালিয়ে চলুন। এখানে ভূত আছে।
জানি বিশ্বাস করবেন না, কিন্তু গাছভূত, পিরামিড ভূত আমি দেখেছি। গাছভূত আমাকে ধরেছিল, আর পিরামিড ভূত একটা অন্য
লোককে। এতক্ষণে তার ঘাড় মটকে দিয়েছে। আপনি না এসে পড়লে আমারও একই দশা হত।’
‘ভূত!’ গলায়
একটু যেন অবাক ভাব। ‘ওহ, মৃত্যুর পরে মানুষ যা হয় বলে আপনি মনে করেন।‘ এ আবার কি
রকম কথা? ভূত কাকে বলে তা নিয়ে আলোচনা করতে হবে এখন?
‘শুধু মানুষ
নয়। আজ দেখলাম গাছ, এমনকি পিরামিডের মতো জড় বস্তুরও ভূত হয়।‘
একটু
নিস্তব্ধতা, তারপর একটা অন্য গলার আওয়াজ, কিন্তু ভাষাটা বুঝতে পারলাম না। তারপরেই
আবার সেই শিসের আওয়াজ। এখানেও সেই! আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠলাম।
‘বসুন, বসুন। ভয়
পাবেন না, ভয় পাবেন না। ভয়ের কিছু নেই।‘ আগের গলাটা ফিরে এলো।
‘কেন বলছেন না
আপনারা কারা? ‘আপনারা কি ভূত?’ কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করি। বসার কথাই আসে না,
মনে মনে দৌড়োনোর জন্য তৈরি হলাম।
‘বিশ্বাস
করবেন আমার কথা? যদি বলি আমরা এসেছি অনেক দূর থেকে। আপনাদের গ্রহে বাধ্য হয়ে নামতে
হয়েছে।‘
আমাদের গ্রহ!
মানে এরা ...।
মুখে কথা
সরছিল না। বোধহয় পুরো সাড়ে তিন মিনিট চুপ করে ছিলাম। কখন যেন বসে পড়েছি। এতক্ষণে
খেয়াল করলাম, যেটাতে শুয়ে বা বসে ছিলাম, সেটা ঠিক বিছানা নয়, আবার চেয়ারও নয়।
বরঞ্চ হেলান দিয়ে বসলে আগেকার দিনের আরাম কেদারার মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু একটু আগেই
তো বিছানার মতো ছিল! তারপরেই মনে হল, আমি
হলাম পৃথিবীর প্রথম মানুষ যে অন্য গ্রহের প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলেছে। মানসচক্ষে
দেখতে পেলাম খবরের কাগজের প্রথম পাতা জুড়ে আমার ছবি আর ইন্টারভিউ। কিন্তু সাক্ষাৎকারে
তো এদের সম্পর্কে কিছু বলতে হবে।
‘আপনি কি
মঙ্গল গ্রহের লোক? আমাদের নহাকাশযান আপনাদের খুঁজে পায়নি কেন? নাকি শুক্র থেকে
এসেছেন? উড়ন্ত চাকিতে করে এসেছেন? আপনি বাংলা জানলেন কেমন করে? এখানে নেমেছেন কেন?’
একবার শুরু করার পরে আমি আর কথা থামাতে পারছিলাম না। কত কিছু জানার আছে।
‘এক এক করে সব
প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি, আপনি বিচলিত হবেন না। মঙ্গল বা শুক্র গ্রহ বলতে আপনি যে
দুটো গ্রহের নাম করেছেন, সেখান থেকে আমরা আসিনি। আপনাদের সৌরজগতে আমার জন্ম নয়। আমি
যে তারার বাসিন্দা, তার কোনো নাম আপনাদের ভাষাতে নেই। উড়ন্ত চাকি বলতে যদি আপনি
মহাকাশযান বলেন, তাহলে হ্যাঁ, আমি মহাকাশযানেই এসেছি। তবে সেটাকে চাকির মতো দেখতে
নয়। আমি পৃথিবীর কোনো ভাষাই জানি না। আমি যা ভাবছি, যন্ত্র তাকে আপনার ভাষায়
অনুবাদ করে দিচ্ছে। আমার এই যন্ত্রটাকে আপনি হয়তো কম্পিউটার বলবেন, সে পৃথিবীর সব
ভাষাই জানে। ও প্রথমে আপনার ভাষাটা ভুল বুঝেছিল, পরে আপনার কথা শুনে সংশোধন করে
নিয়েছে।
‘এখানে বলতে
কি আপনি আপনাদের গ্রহ না এই জঙ্গল কোনটা বোঝাচ্ছেন? যে সব গ্রহে বুদ্ধিমান জীব
আছে, কিন্তু তারা এখনো ছায়াপথের অন্য সভ্যতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেনি,
সেই সব গ্রহে নামা আমাদের নিষিদ্ধ। পৃথিবীও তাদের মধ্যে পড়ে। কিন্তু আমাদের
মহাকাশযানের অ্যান্টিগ্রাভিটি ইঞ্জিন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তার মেরামত করতে আমাদের
নামতে হয়েছে। আমরা ভেবেছিলাম এমন জায়গায় নামব যাতে মানুষের নজরে না পড়ি। তাই এই
জঙ্গল বেছে নিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু এখানেও যে একজন মানুষের মুখোমুখি পড়ে যাব, তা
ভাবিনি।‘
‘একজন কেন?
আমি ছাড়া অন্য একটা লোকও ছিল তো?’
‘না, আপনি
ছাড়া কোনো মানুষ আজ রাতে জঙ্গলে ছিল না।‘
‘তাহলে আমি কি
ভুল দেখলাম? অন্ধকার ছিল, ঝোপের মধ্যে থেকে বেরোনোর আগেই লোকটার উপরে সেই পিরামিড
ভূত ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তবু মানুষই তো মনে হল। ওহো বুঝেছি, সেই লোকটা আসলে আপনি।
কিন্তু আপনাকে আক্রমণ করেছিল যে পিরামিডের মতো প্রাণী, আমাকে ধরে মেরে ফেলছিল যে
চলমান গাছ, এরা কোথা থেকে এলো?’
আবার একটু শিস
আর অচেনা গলার আলোচনা। তারপরে আগের যান্ত্রিক স্বরটা ফিরে এলো। ‘বিভিন্ন গ্রহের
অচেনা অজানা প্রাণী, অবশ্যই যারা বুদ্ধিমান নয়, তাদের নিয়ে আমরা বিভিন্ন গ্রহের চিড়িয়াখানাতে সরবরাহ করি। এখানে নামার পরেই সেই
রকম একটা প্রাণী আমাদের মহাকাশযান থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। তাই যতক্ষণ মহাকাশযানের ইঞ্জিন
সারানো হচ্ছিল, ততক্ষণ আমরা কয়েকজন সেটাকে ধরব বলে বেরিয়েছিলাম। সেই প্রাণীটাকেই
আপনি জঙ্গলে দেখেছিলেন।‘
‘একটা মাত্র
প্রাণী নয়। আপনাদের অনেক প্রাণী নিশ্চয় পালিয়েছে। পিরামিড আর গাছের কথা তো বললাম,
তাছাড়া একটা তিন চোখওলা বিশাল প্রাণীও দেখেছি জঙ্গলে।‘ আমি বলি। ‘আপনারা ভালো করে
দেখুন।‘
‘না, না।
একটাই প্রাণী পালিয়েছিল। তাকে ধরেও আনা হয়েছে। আমাদের ক্ষমা করবেন, আমরা আপনার
কাছেই ছিলাম, আমাদের দেখে আপনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন।‘
‘বারবার
কোথায়? একবারই তো আমার কাছে এসেছিলেন। ভাগ্যিস আপনারা ছিলেন, নাহলে আজ ঐ সেপ্টোপাস
মানে গাছ দৈত্যের খাবার হওয়াই নিয়তি ছিল আমার। কিন্তু আপনারা ভালো করে দেখুন। গাছ,
পিরামিড, তেচোখো দানব – এরকম অনেক কিছু আমি দেখেছি। এসব প্রাণী আমাদের পৃথিবীর নয়।‘
‘তা আমরা
জানি।‘ কণ্ঠে একটু কি কৌতুকের ছোঁয়া। বলা শক্ত। আবার একটু আলোচনা। ‘আপনার ডানদিকে
তাকান।‘
ডানদিকে একটা
আলো জ্বলে উঠল। মনে হয় পর্দাতে ছবি দেখছি। আমি তাকিয়ে দেখলাম। একটা ঘর মতো, তার
মেঝেতে বসে আছে একটা মানুষ। একেবারে উলঙ্গ, গায়ে একটা পোশাক নেই। ‘এই সেই প্রাণী
যে পালিয়ে গিয়েছিল।‘
‘এ তো একটা
মানুষ।‘
‘ভালো করে
দেখুন।‘ ক্যামেরা এবার মানুষটার উপর জুম করল।
মানুষের মতো
দেখতে বটে, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যাচ্ছে আসলে মানুষ নয়। দুটো হাত দুটো পা আর
মাথা আছে, কিন্তু এইটুকুই মানুষের সঙ্গে মিল। আঙুলের জায়গায় তিনটে করে শুঁড়ের মতো
প্রত্যঙ্গ। তার প্রত্যেকটাতে অক্টোপাসের মতো শোষক। মুখ একেবারেই মানুষের মতো নয়।
মাথার উপরে মুখের মতো একটা গর্ত। তার দুপাশে দুটো ছোটো ছোটো শিঙ, তার উপরে মাছের
মতো গোল গোল দুটো চোখ। তাতে বুদ্ধিমত্তার কোনো চিহ্ন নেই। কান জাতীয় কিছু নেই। অন্ধকারে
একে মানুষ বলে ভুল করেছিলাম, আলোতে সেই ভুল কখনো হবে না।
‘এই রকম দুই
হাত দুই পা দুই চোখ আছে এমন প্রাণী ছায়াপথে খুব বিরল, পৃথিবীর বাইরে একটি গ্রহেই
তাদের এখনো পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তাই চিড়িয়াখানাতে এই প্রাণীর চাহিদা খুব বেশি। বুঝতেই
পারছেন এর সঙ্গে আপনার চেহারার মিল অনেক। তাই
জঙ্গলের মধ্যে প্রথমে আপনাকে এই প্রাণীটা বলে ভুল করেছিলাম। আপনাকে ভয় দেখানোর
উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। তাছাড়া এই প্রাণীটা খুব হিংস্র, তাই আপনার কারো কোনো
ক্ষতি যাতে না করে সে জন্য আপনার কাছাকাছি আমাদের একজনকে অন্তত থাকতে হয়েছিল। শেষ
মুহূর্তে যে আপনাকে ওখান থেকে সরিয়ে আনতে হয়েছিল, কারণ প্রাণীটা যদি কোনো কারণে
জাল কেটে বেরিয়ে আসত, তাহলে আপনাকে আক্রমণ করতে পারত। আপনি যে তাতে ভয় পেয়ে
গিয়েছিলেন, আমি তার জন্যে দুঃখিত।‘
আমার মনে একটা
সন্দেহ দানা বাঁধছিল। ‘আপনাকে কেমন দেখতে?
আমি দেখতে চাই।‘
‘ভয় পাবেন না
তো?’
‘না না। ভয়
পাব কেন?’
‘আচ্ছা, তাহলে
আলো জ্বালাচ্ছি।‘ হঠাৎ করে উজ্জ্বল আলোতে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। দৃষ্টিশক্তি তারপরে দেখি একটা বিরাট ঘরের মধ্যে বসে আছি।
দেওয়ালগুলো ধাতুর তৈরি। ঘরের মাঝে একটা কাঁচের দেওয়াল। তার ওপাশে ...
সেই বটগাছের
মতো গাছ, তার পাশে সেই মাথা কাটা পিরামিড। অন্য পাশে একটা প্রাণী যাকে দেখেই বুকটা
ধড়াস করে উঠল। অন্তত পনের ফুট উঁচু, পা অনেকটা শামুকের পায়ের মতো মাংসল। মুখটা
দেখলেই ভয় লাগে, অনেকটা হাঙরের মতো দাঁতগুলো বেরিয়ে আছে। তিনটে চোখ মুখের সামনের
দিকে। দুপাশে দুটো হাত আছে, কিন্তু আবার বুকের মাঝখান থেকে দুটো ছোট হাত বেরিয়ে
আছে। সেই হাতে ধরা আছে একটা যন্ত্র। আমাকে চমকে উঠতে দেখে সেই যন্ত্রটা মুখের কাছে
নিয়ে এলো। ‘চিন্তা করবেন না, আপনার কোনো ক্ষতি আমরা করবো না। আমাদের থেকে
বুদ্ধিমান কোনো প্রাণীর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বুঝতেই পারছেন আমরা একই গ্রহের
প্রাণী নয়। আরো অনেক অন্য গ্রহের ক্রু আছে আমাদের যানে, কিন্তু তারা আপনাদের
গ্রহের আবহাওয়া বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারবে না।‘ ও, এতক্ষণ তাহলে এই আমার সঙ্গে কথা
বলছিল।
‘না না, ভয়
পাবো কেন?’ আমি ঢোক গিলে বললাম। ‘আপনারা আমার সঙ্গে চলুন। আমাদের সরকারের সঙ্গে
কথা বলবেন। সারা পৃথিবীর মানুষ আপনাদের কথা শুনতে চাইবে।’
‘না, আমি
প্রথমেই বলেছি পৃথিবীর সভ্যতা এখন যে স্তরে, তাতে করে তার সঙ্গে যোগাযোগ আমাদের
নিষিদ্ধ। এতে করে আপনাদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হতে পারে। আপনারা যে সমস্ত
সমস্যার সামনে এখন দাঁড়িয়ে, তার সমাধান আপনাদেরই করতে হবে। কোনো সভ্যতাই অন্য কারো
উপর নির্ভর করতে পারে না। ইঞ্জিন খারাপ হয়ে যাওয়াতে বাধ্য হয়ে নামতে হয়েছে।
আপনাকেও আমাদের পরিচয় দেব কিনা তা নিয়ে আমাদের দ্বিধা ছিল। ‘
‘কিন্তু আমি
তো সবাইকে বলে দেব যে আপনারা এখানে আছেন। কাল থেকেই তো এখানে লোকে লোকারণ্য হয়ে
যাবে।‘
‘আমাদের
ইঞ্জিন ঠিক হয়ে গেছে। আর অল্পক্ষণের মধ্যে আমরা রওনা হব। অ্যান্টিগ্রাভিটি ইঞ্জিন
আপনাদের প্রাগৈতিহাসিক রকেটের মতো নয় যে আগুন বেরোবে আর বিকট আওয়াজ হবে। দূর থেকে
কেউ বুঝতেই পারবে না। তারপরেও আপনি যদি কাউকে আমাদের কথা বলেন, তাহলে লোকে আপনাকে
কী মনে করবে আপনি ভেবে দেখুন।‘
আমি একেবারে
চুপ করে গেলাম। কোনো প্রমাণ ছাড়া এসব কথা বললে লোকে আমাকে পাগল বলবেই।
‘বুঝতে
পেরেছেন। আপনার পকেটে যে যন্ত্রটা আছে, তাতে আমাদের ছবি নেই আমরা দেখে নিয়েছি।
সাবধানতার জন্য আমরা ওটার শক্তির উৎসটাকে শেষ করে দিয়েছি।‘ তার মানে মোবাইল ফোনের
ব্যাটারি ডেড, বাইরে থেকে মহাকাশযানের ছবি তোলা ছবি তোলা যাবে না। ‘এখান থেকে
লোকালয় আর দূরে নয়। পাশ দিয়ে যে নদীটা গেছে, সেটা ধরে স্রোতের উল্টোদিকে হাঁটলে সেখানে
পৌঁছে যাবেন। আপনাকে বিদায় জানাই। আমাদের এবার যেতে হবে। যদি আপনি আমাদের যানের
উড়ান দেখতে চান, দেখতেই পারেন। তবে কিছুটা দূরে থাকবেন, না হলে অ্যান্টিগ্রাভিটি
ফিল্ডের আওতায় পড়ে যেতে পারেন।‘
ঘরের একপাশে
একটা দরজা খুলে গেল। আমি কিছু বোঝার আগেই যে চেয়ার বা বিছানাতে বসে ছিলাম, সেটা
আমাকে নিয়েই সোজা সেই দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কিছুটা দূরে গিয়ে আস্তে করে মাটিতে
নামিয়ে দিল। সেটা নিশ্চয় আবার দরজা দিয়ে ঢুকে গেল, আমি দেখতে পাইনি। তারপরে দরজাটা
বন্ধ হয়ে গেল।
পূর্ণিমার
চাঁদের আলোতে দেখলাম মহাকাশযানটা বেশ বড় একটা পাঁচ কি ছ’তলা বাড়ির মতো। একটা মাঠের
মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এক মিনিট দাঁড়ানোর পরেই একটা খুব গম্ভীর আওয়াজ শুরু হল। সেটা
খুব জোরে নয়, কিন্তু হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। তারপরেই যানটা আস্তে আস্তে উঠতে শুরু
করল, যেন কোন তাড়া নেই। টিভিতে যেমন রকেট উৎক্ষেপণ দেখেছি, একেবারেই সেরকম নয়।
যানের সঙ্গে কাছের গোটা দুয়েক বড় বড় পাথরও আকাশে উড়তে শুরু করল। আস্তে আস্তে ছোট
হতে হতে আকাশে মিলিয়ে গেল।
এতক্ষণ যা বললাম, তা তোমরা বিশ্বাস করবে কিনা তা তোমাদের অভিরুচি। তবে যদি প্রমাণ চাও, তাহলে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে গিয়ে ওখানকার লোককে জিজ্ঞাসা করো গত বছর মাঘ মাসের পূর্ণিমার রাতে ডুগাডুগি নদীর পাশ থেকে দুটো বড় বড় পাথর অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল কিনা। ওরা ভূত প্রেত পিশাচের কথা বলতে পারে, পাথরের চোরাচালানের কথা বলতে পারে, অন্য কিছুও বলতে পারে, কিন্তু সত্যি গল্পটা তোমাদের আমি আজ বললাম।
প্রকাশ ঃ এ যুগের কিশোর বিজ্ঞানী গ্রীষ্ম ও বর্ষা সংখ্যা ২০২১