Tuesday, 14 November 2017

দারুচিনির দ্বীপ পর্ব ১ - সিগিরিয়া





দারুচিনির দ্বীপ
পর্ব ১- সিগিরিয়া

শম্পা গাঙ্গুলী
       
        অবশেষে চলে এল শ্রীলঙ্কা যাত্রার দিন। অভিজিত আর কাবেরী গৌতমের সহকর্মী, কলেজ জীবন থেকে আমাদের বন্ধুও বটে। অনির্বাণও তাই। কাবেরীদের ছেলে আহেল, অনির্বাণের স্ত্রী ঝুলন আর ওদের ছেলে মৈত্রেয় --- সব মিলিয়ে আমরা আটজন। প্লেনের সময়টা পালটে হয়েছে রাত দুটো। তার অনেক আগেই এয়ারপোর্টে পৌঁছোতে হল, কার পুজোর সময় ষষ্ঠীর দিনে গাড়ি পাওয়া শক্ত, রাস্তাতেও ভিড় কম হয় না।
        বিমানযাত্রা নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই, খালি প্লেনের ডিনার কারোরই পছন্দ হল না। ঘুমানোর চেষ্টা করেও লাভ হলো না। শ্রীলঙ্কাতে ভিসা আগে করাতে হয় না। আগে থেকে ইন্টারনেটে ইলেকট্রনিক ট্রাভেল অথরাইজেশন করে রাখা ছিল, কলম্বো এয়ারপোর্টে সেটা দেখিয়ে পাসপোর্টে ছাপ মারিয়ে নিলাম। তারপরেই অভিজিত আর অনির্বাণ গিয়ে ডলার ভাঙিয়ে শ্রীলঙ্কার টাকা কিনে আনল। ভারতে বসে শ্রীলঙ্কার টাকা কিনতে পারিনি, তাই আমরা আমেরিকান ডলার কিনে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমেরিকান টুরিস্টদের কল্যাণে ওটাই সবচেয়ে সুবিধার কারেন্সি। আমাদের এক টাকায় শ্রীলঙ্কার দুটাকার একটু বেশি পাওয়া যায়।
        গাড়ি আগে থেকে বুক করা ছিল। ফোরটিন সিটার গাড়ি, ড্রাইভারের নাম পালিথা জয়রত্নে। অনর্গল ইংরাজি বলেন --– অবশ্য সেটাই ছিল আমাদের চাহিদা। ভদ্রলোকের থেকে পরে নানা সময় অনেক সাহায্য পেয়েছি।
পালিথার সঙ্গে আমরা
        আমাদের প্রথম গন্তব্যস্থান সাংস্কৃতিক ত্রিভুজ। অনুরাধাপুরা-সিগিরিয়া-পোলোন্নারুয়া, এই তিন প্রাচীন রাজধানী নিয়ে এই ত্রিভুজ প্রাচীন শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড়ো পরিচায়ক। আমরা চলেছি কলম্বো থেকে উত্তরপূর্বে হাবারানার দিকে। রাস্তাটা ভারি সুন্দর। দুপাশে সবুজে ঢাকা। তবে শ্রীলঙ্কার এই অংশ বেশ শুকনো, বছরে মাত্র দু-তিন মাস সামান্য বৃষ্টি হয়। রাস্তাঘাট বেশ পরিষ্কার। শ্রীলঙ্কাতে একটা কথা বারবার বলতেই হয় --– পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিকে এখানকার মানুষজনের সবসময় নজর থাকে। গরম যথেষ্ট, গাড়িটা এয়ার কন্ডিশনড, তাই রক্ষে।  
        অক্টোবর মাস শ্রীলঙ্কায় টুরিস্ট সিজন নয়। তাই সব জায়গাতেই হোটেল বেশ ফাঁকা। আমরা আগে থেকেই হাবারানার লে গ্রাঁ মোন ( উচ্চারণ যেমন খুশি করে নিন, বানানটা Le Grand Meaulnes) হোটেলে ঘর ঠিক করে রেখেছিলাম। ফরাসি সাহিত্যিক আঁরি আলবান-ফুর্নিয়ের সাতাশ বছরের জীবনে একটিই উপন্যাস লিখেছিলেন, সেটিই ফরাসি সাহিত্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্য কীর্তি হিসাবে স্বীকৃত। সেই উপন্যাসের নামেই হোটেলের নাম। হোটেলটা খুঁজে পেতে একটু সময় লেগেছিল, লোকবসতি থেকে সামান্য দূরে। গাছপালা ভর্তি বাগানের মধ্যে কলোনিয়াল বাংলোর মতো বাড়ি। ঘরগুলোও খুবই সুন্দর, ঘরের ভিতরে ফুটবল খেলা যায় বলে সত্যের অপলাপ করতে চাই না, কিন্তু বাস্কেটবল নিঃসন্দেহে সম্ভব।


লে গ্রাঁ মোনঃ  ঘর বারান্দা ও বাইরের বাগান

        দুপুরের খাওয়া সেদিন হোটেলেই সারলাম, ভাত আর নানা রকম প্রায় সিদ্ধ তরকারি, মশলাপাতি বিশেষ নেই। সেকি, দারুচিনির দ্বীপে এসে মশলা ছাড়া খাবার খেতে হবে, মনটা বিদ্রোহ করে উঠল। বাকিরা বলল, হবে হবে, সাত দিন তো থাকব। আমার ভাগ্যবিধাতা নিশ্চয় মুচকি হেসেছিলেন, দেখতে পাইনি।
        খেয়ে দেয়েই বেরিয়ে পড়া, গন্তব্য সিগিরিয়া রক। গৌতম লাফাতে শুরু করেছে আর অনর্গল বকবক করছে। অনেক কষ্টে বুঝলাম বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখক আর্থার সি ক্লার্কের ফাউন্টেনস অফ প্যারাডাইস উপন্যাসে সিগিরিয়ার কথা আছে, অবশ্য ক্লার্ক এটাকে প্রায় ন’শো কিলোমিটার দক্ষিণে বিষুবরেখার একদম উপরে নিয়ে গিয়েছিলেন --– গল্পকারদের পক্ষে সবই সম্ভব! টিকিট কাটতে হল, সার্কভুক্ত দেশের লোক বলে আমাদের জন্য দাম অন্য বিদেশিদের তুলনায় অর্ধেক।
        দেড় কিলোমিটার লম্বা, এক কিলোমিটার চওড়া আর দুশো মিটার উঁচু ওই গ্রানাইট পাথরটা এক সমভূমির মাঝখানে একেবারে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে আছে, হঠাৎ দেখলে অবাক লাগবে। দু’শো কোটি বছরের এক পুরোনো আগ্নেয়গিরি ক্ষয়ে গিয়ে এখন এইটুকুই অবশিষ্ট আছে। আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে শ্রীলঙ্কার মেসোলিথিক যুগে আদিম মানুষের পা পড়ে ঘন জঙ্গলাকীর্ণ দৈত্যাকার এই পাথরে। প্রাগৈতিহাসিক এই  বিশাল শিলাস্তুপে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দি থেকেই বৌদ্ধ সাধুসন্ন্যাসীদের আবাসস্থল ছিল। প্রাচীন সিংহলি পুঁথি কুলবংশ থেকে জানা যায় খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতকে উপপত্নী গর্ভে রাজা ধাতুসেনের পুত্র কাশ্যপের জন্ম হয় বাবাকে হত্যা করে তিনি সিংহাসনে বসেছিলেন। তিনিই ৪৯৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এই শিলাস্তুপের ওপর এক সুসজ্জিত ও সুরক্ষিত দুর্গপ্রাসাদ গড়ে তোলেন। সেই রাজধানী থেকেই তাঁর শাসন চলত। বৈমাত্রেয় ভাই যুবরাজ মৌদগলায়ন (এখানকার বানানে মৌজ্ঞল্লান) ভারতে পালিয়ে গিয়ে সৈন্য সংগ্রহ করেনপাহাড়ের গা কেটে বারোশো সিঁড়ি, মাঝে মধ্যে খুবই সরু প্রাকৃতিক খিলান মৌদগলায়নের পক্ষে  কাশ্যপকে আক্রমণ করা শক্ত ছিল সন্দেহ নেই, ধীরে ধীরে উঠতে গিয়েই আমাদের পা ব্যথা হয়ে গিয়েছিল --- গৌতম আর আমি ছাড়া বাকি সবাই মাঝপথে রণে ভঙ্গ দিয়েছিল। কিন্তু কেন জানি না, রাজা কাশ্যপ সৎভাইয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময় ওই পাথরের দুর্গের উপর থেকে নেমে এসেছিলেনসেই যুদ্ধেই তাঁর মৃত্যু হয়। সিগিরিয়ার গৌরবের দিনও শেষ হয়ে আসে।
কাশ্যপের উদ্যানের খাল
        সিগিরিয়াকে রাজা কাশ্যপ সাজিয়েছিলেন তাঁর কল্পনার স্বর্গের অনুকরণে। পাথরের নিচে সমতলে ফোয়ারা আর পুকুর সমেত বাগান বানিয়েছিলেন, সেটা সেই সময়ে একটা আশ্চর্য দ্রষ্টব্য হয়েছিল সন্দেহ নেই। বিশেষ করে ফোয়ারাগুলোর জন্য দেড় হাজার বছর আগে পাইপ বসাতে হয়েছিল ভাবলেই কেমন লাগে। পাথরের উপর থেকে কিছু কিছু আরো প্রাচীন বসতিও চোখে পড়ে।
প্রাচীন বসতি
 


সিগিরিয়ার অপ্সরাদের সঙ্গে দেখা করার পথ

কিছুটা উঠে তারপর একটা ঢাকা জায়গা। এই জায়গায় লোহার ঘোরানো সিঁড়ি পেরিয়ে যেতে হয়। কষ্টেসৃষ্টে উঠে হঠাৎ হতচকিত হয়ে গেলাম। এ তো অজন্তার ছবির মতোই --- সেই ফ্রেস্কো, সেই অপ্সরা। আজ থেকে  দেড় হাজার বছর আগে কাশ্যপ এখানে পাথরের দেয়ালে স্বর্গের অপ্সরাদের ছবি আঁকিয়েছিলেন। কালের নিয়মে রোদ বৃষ্টিতে তার প্রায় পুরোটাই আজ বিলুপ্ত, শুধু একটা ছোট জায়গায় পাথরটা ছাদের মতো কিছুটা এগিয়ে থাকায় সামান্য কয়েকটা দেয়াল চিত্র বেঁচে গেছে।


সিগিরিয়া দেয়ালচিত্র
        আবার ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম। একটু উপরের দিকে এগিয়েই বিখ্যাত মিরর ওয়াল। কাশ্যপের আদেশে সেকালের ইঞ্জিনিয়াররা এত মসৃণ দেওয়াল বানিয়েছিল যে শোনা যায় তাতে ফ্রেস্কোর অপ্সরাদের প্রতিচ্ছবি দেখা যেত। একজন কর্মচারী দেখালেন কেমন ভাবে সেই দেয়াল আজও আলো প্রতিফলন করছে। গৌতম পিছন থেকে বাংলায় বলল, ‘ওই অ্যাঙ্গেলে আলো ফেললে আমাদের বাড়ির দেয়ালও আয়নার মতো দেখাবে।’ আসলে এর ওপরেও পড়েছে মহাকালের ছাপ, সেই মসৃণত্ব এখন শুধুই গল্পকথা
        পরবর্তীকালের দর্শকদের পক্ষে ঐ মসৃণ দেয়ালের উপর লেখার লোভ সম্বরণ করা সম্ভব হয়নি। রাজা কাশ্যপের মৃত্যুর পরে সিগিরিয়াতে ছিল এক বৌদ্ধ বিহার। খ্রিস্টিয় ষষ্ঠ শতক থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত  সেই বিহারে যে তীর্থ যাত্রীরা আসত, তাদের অনেকেই ওই দেওয়ালের উপর তাদের কথা তামিল, সিংহলি বা সংস্কৃত ভাষায় লিখে যেত। সিগিরিয়া গ্রাফিটির উপর মোটা মোটা বই লেখা হয়েছে। আজ থেকে হাজার বছর পরে কি তাজমহলের দেয়ালে যারা তাদের নাম লিখে গেছে তাদের কথা ইতিহাস বইতে থাকবে? তবে আজকের দিনে ঐতিহাসিক সৌধের উপর দাগ কাটাটা নিশ্চয় অপরাধ। ওই দেয়াল লিখন থেকেই জানা যায় একসময় এখানে পাঁচশো অপ্সরার ছবি ছিলএখনো পর্যন্ত ছশো পঁচাশি জনের লেখা উদ্ধার করা গেছে। যেমন বীর-বিদুর লিখেছেন কবিতা,
                শীতল শিশিরবিন্দুসিক্ত
                পুষ্পগন্ধবাহ
                মৃদুমন্দ পবনে যূথী পদ্ম
                বসন্তরৌদ্রে নৃত্যরত।
                সুবর্ণবর্ণী অপ্সরাদের কটাক্ষপাতে আমার চিত্ত চঞ্চল।
                আমার হৃদয় স্বর্গচিন্তা ধারণেও অক্ষম,
                তাকে হরণ করেছে এক নারী
                এই পাঁচশত অপ্সরামধ্যে সে একক (ইংরাজি তর্জমা থেকে অক্ষমের আক্ষরিক অনুবাদ)

        আরো একটু এগোলাম, তারপরেই বিখ্যাত সিংহসোপান। দুর্গের প্রবেশ পথ। মূল প্রাসাদের গেটহাউসে একসময় ছিল ষাট ফুট উঁচু এক সিংহমূর্তি। এখন অবশিষ্ট আছে শুধু পাথরে খোদাই করা বিশাল থাবা, তবে সে দুটোও সত্যিই দেখার মত। এই Lion’s Paw-এর ভেতর দিয়ে গেছে বিখ্যাত Lion Staircase, যেখান দিয়ে হাঁটার সময়ে আমার মনে হচ্ছিল যেন স্বর্গে উঠছি এই মূর্তির জন্যই এই পাথরের নাম হয়েছিল সিংহগিরি, আজ যা সিগিরিয়া। সিংহসোপান বেয়ে উপরে উঠে প্রাসাদ, আজ আর প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই, শুধু ভিতটা পড়ে আছে। একসময়ে রকের ওপরের প্রাসাদটা ছিল অনেকটা মৌচাকের মত --- প্রায় দেড় হেক্টর এলাকা জুড়ে ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া মালভূমির মত চ্যাপ্টা অংশে বানিয়ে ছিলেন রাজা কাশ্যপ
সিগিরিয়া রকে সিংহসোপানের সামনে
সিংহসোপান
        
সিগিরিয়ার রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ

নামতে শুরু করলাম। সূর্য ঢলে পড়েছে। পুবদিকে হঠাৎ তাকিয়ে দেখি সিগিরিয়া রকের বিপুলাকার ছায়া পাশের বনে ঢাকা সমতল ভূমির ওপর দিয়ে দৌড়োতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে যেন ছায়াটাকে সত্যিই সরে যেতে দেখছিমালভূমির ওপরটা তখন প্রায় ফাঁকা। মালভূমির পশ্চিমপ্রান্ত একেবারে সরলরেখা বলেই এমন দৃশ্য। বিষুবরেখার কাছে সূর্য খুব দ্রুত ডোবে, তাই পূর্ব প্রান্তে সিগিরিয়ার ছায়াটা অত তাড়াতাড়ি সরছিল। মন ক্যামেরায় অনেকদিন ধরা থাকবে ওই ছায়ার সরণ। আমাদের সঙ্গে নামছে শুধু একপাল বাঁদর। অত্যন্ত সভ্যভব্য, এমনকি দাঁতও খিঁচোয় না। এরা নিশ্চয় শ্রীরামচন্দ্রের সঙ্গে এসেছিল তারপর আর ফিরে যায়নি, এখানে সেটল করে গেছে অন্ধকারে বার দুয়েক রাস্তা হারিয়ে অবশেষে খুঁজে পেলাম কার পার্ক যেখানে বাকিরা আমাদের জন্য বহুক্ষণ অপেক্ষা করছিল।
সিগিরিয়া রকের ছায়া
সূর্য ডোবার পালা

        রাত্রে হোটেলের বাইরে শহরের রেস্তরাঁতে খেতে যাব। ভেবেছিলাম হেঁটেই চলে যাব, কিন্তু পালিথা বাদ সাধলেন। রাতে সামনের রাস্তায় হাতি বেরোয়, এখানে কয়েকদিন আগেই একজন হাতির আক্রমণে মারা গেছে। আমাদের হোটেল চত্বরেও নাকি বাগানের গাছের ফল খেতে আসে। তাই বাইরের মেন গেটটা শুনলাম কখনোই বন্ধ করা হয় না। বন্ধ করলে গেটের দামটাই যাবে, হাতিকে তো আর আটকানো যাবে না। গেট রাখার দরকার কী কে জানেকালকে হাতি দেখতে আমাদের মিনেরিয়া ন্যাশনাল পার্ক যাওয়ার কথা, তার আগেই গজরাজরা আমাদের দেখতে আসবেন নাকি?
        অগত্যা গাড়িতেই বেরোনো হল। স্থানীয় খাবার খাব, তাই জুটল চিকেন কোট্টু। রুটি আর মশলাদার মুরগির মাংস একসঙ্গে মিশিয়ে টুকরো টুকরো করে কাটা, শ্রীলঙ্কার রোড সাইড খাবারের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। স্বাদের চেয়েও ইন্টারেস্টিং সেটাকে টুকরো করাটা, বোর্ডের ওপরে চপারটা দ্রুত তালে প্রায় বাজনার মতো আওয়াজ তোলে। (ক্রমশ)
        
দ্বিতীয় পর্বঃ পোলোন্নারুয়া ও মিনেরিয়া

চতুর্থ পর্ব - ক্যান্ডি ও নুয়ারা এলিয়া


(সৃষ্টির একুশ শতক পত্রিকার ১৪২৪ সালের উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত)














Wednesday, 1 November 2017

পদার্থবিজ্ঞানী জন বার্ডিন


জন বার্ডিন – এক অসাধারণ পদার্থবিজ্ঞানী
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

              পদার্থবিজ্ঞানী বললেই আমাদের প্রায় সকলের মনে যে নামগুলো আসে, তাঁদের সবাইকেই আমরা তাত্ত্বিক জগতের মানুষ ভাবতেই অভ্যস্ত। আমরা কল্পনাতে দেখতে পাই একজন চিন্তাবিদ ঘরে বসে কেবল মাত্ৰ চিন্তা করে বা খাতায় কলমে অঙ্ক কষে বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন করছেন। কেন জানি না, আমরা নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের কথা মনে রাখতে পারি, কিন্তু ভুলে যাই তাঁর আলোকবিজ্ঞান সংক্রান্ত যুগান্তকারী পরীক্ষানিরীক্ষার কথা।
       আমাদের সংস্কৃতিতে সম্ভবত হাতে কলমে কাজ করাকে এখনো অবজ্ঞার চোখে দেখা হয়। জাতিপ্ৰথাতে ধরে নেয়া হতো বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্ৰাহ্মণরা কোনোরকম কায়িক পরিশ্রম করবেন না, তাঁদের কাজ ছিল বিশুদ্ধ চিন্তার মাধ্যমে বিশ্বজগতের রহস্য উন্মোচন। এই পরিস্থিতি আমাদের দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল তা নয়। প্রাচীন গ্রীসের দর্শনের দুই মূল স্তম্ভ সক্রেটিস ও প্লেটো তো বলেই দিয়েছিলেন পরীক্ষানিরীক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই, কল্পনাই আসল। প্রকৃতির রহস্য মানুষের মনের কাছেই ধরা দেবে।
       এই চিন্তা ভাবনা প্রায় দু হাজার বছর মানুষের উন্নতির পথ রুদ্ধ করে রেখেছিল। একটা সহজ উদাহরণ নেয়া যাক। অষ্টাদশ ও নবিংশ শতকের শিল্পবিপ্লবের চালিকাশক্তি সরবরাহ করেছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন। এই ইঞ্জিন প্রথম তৈরি হয়েছিল খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীতে। কিন্তু পরীক্ষামূলক বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছিল ষোড়শ শতকে, গ্যালিলিওর হাত ধরে। তাই নবিংশ শতাব্দীর আগে বাষ্পের শক্তি প্রযুক্তির উন্নতিতে ব্যবহার হতে পারে নি। যাঁরা বিজ্ঞান বলতে কেবল তাত্ত্বিক গবেষণাই বোঝেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে যে পদার্থবিদ্যা একটি পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান। গণিতের সঙ্গে তার এইখানেই পার্থক্য। পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার সঙ্গে হাত ধরাধরি করেই অগ্রসর হতে হবে পদার্থবিদ্যার তত্ত্বকে।
       তবে আধুনিক যুগ মূলত বিশেষ জ্ঞানের যুগ। তাই প্রায় কোনো বিজ্ঞানীর পক্ষেই একইসঙ্গে তাত্ত্বিক ও পরীক্ষামূলক, এই দুই শাখায় অবাধ বিচরণ সম্ভব নয়। কিন্তু প্রয়োগের প্রয়োজনে তত্ত্ব, এভাবে যাঁরা পরীক্ষাগারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে কাজ করেছেন তাঁদের মধ্যে এক উজ্জ্বল নাম জন বার্ডিন। বার্ডিন ছিলেন তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী, তাঁর গবেষণাকে তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন পরীক্ষাগারে নতুন যন্ত্র উদ্ভাবনে। তিনি প্রথম ব্যক্তি, যিনি একই বিষয়ে দুবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আমরা সবাই মাদাম কুরির নাম জানি। তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন দুবার, কিন্তু দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে, রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে। তেমনি লাইনাস পাউলিং রসায়ন ও শান্তিতে এই পুরস্কার পান। বার্ডিন পদার্থবিজ্ঞানে ১৯৫৬ ও ১৯৭২ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাঁর পরে ফ্রেডরিক স্যাঙ্গার রসায়নে দুবার নোবেল জয় করেন।
       বার্ডিনের জন্ম হয়েছিল ১৯০৮ সালের ২৩শে মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাডিসনে। তাঁর বাবা চার্লস ছিলেন শরীরতত্ত্বের অধ্যাপক। মা অ্যালথিয়া একসময়ে স্কুলে শিক্ষকতা করতেন, পরবর্তী কালে তিনি শিল্পকলা বিষয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন। ছোটো বেলা থেকেই তাঁর গণিত খুব প্রিয় ছিল বার্ডিনের। স্কুল পাস করার পর কোন বিষয় নিয়ে পড়বেন? একদিকে তিনি সেসময় বাবার মতো অধ্যাপক হতে চাইছিলেন না, অন্যদিকে এমন এক বিষয় খুঁজছিলেন যেখানে অঙ্ক করার সুযোগ অনেক বেশি। তিনি শেষ পর্যন্ত উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য ভর্তি হন। তাঁর মনে হয়েছিল যে চাকরির সুযোগ ইঞ্জিনিয়ারদের অনেক বেশি।
       ১৯২৮ সালে ইঞ্জিনিয়ারিঙে বি.এস. ও ১৯২৯ সালে এম.এস. ডিগ্রি লাভ করেন জন। ইঞ্জিনিয়ারিঙের সঙ্গে সঙ্গে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের যে সমস্ত বিষয় তাঁর ভালো লেগেছিল, সবগুলি তিনি পড়েছিলেন। পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল জয়ী জন ভ্যান ভ্লেক ছিলেন তাঁর অন্যতম উপদেষ্টা। এছাড়াও বহু প্রবাদপ্রতিম বিজ্ঞানী যেমন ওয়ার্নার হাইজেনবাৰ্গ, পল ডিরাক বা আর্নল্ড সমারফেল্ড সেসময় ইউরোপ থেকে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কিছুদিনের জন্য গিয়েছিলেন, তাঁরাও বার্ডিনকে অনুপ্রাণিত করেন। পাস করার পর কিছুদিন তিনি খনিজ তৈল সংক্রান্ত গবেষণাতে ভূপদার্থবিদ হিসাবে কাজ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর আর সেই কাজ ভালো লাগে নি। অবশেষে ১৯৩৩ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে স্নাতকস্তরে ভর্তি হন। সেখান থেকেই তিনি ১৯৩৬ সালে সলিড স্টেট বা কঠিন পদার্থের বিজ্ঞানে পি. এইচ. ডি. ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি গবেষণা করেছিলেন নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ইউজিন উইগনারের অধীনে। শেষ দিকে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা করেন।
       ১৯৩৮ সালে বার্ডিন মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। ১৯৪১ সালে জাপান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অনেক বিজ্ঞানী যুদ্ধের কাজে অংশ নেন। সহকর্মীদের উপরোধে বার্ডিন যুদ্ধসংক্রান্ত গবেষণাতে যোগদান করেন। তিনি মূলত সমুদ্রে টর্পেডো ও মাইন বিস্ফোরণ থেকে জাহাজ ও ডুবোজাহাজকে রক্ষা করার বিষয়ে কাজ করেছিলেন। ১৯৪৩ সালে পরমাণু বোমা নির্মাণকারী মানহাটন প্রজেক্টে যোগদান করার অনুরোধ তিনি পারিবারিক কারণে ফিরিয়ে দেন।
       যুদ্ধের পর নতুন করে গবেষণার কাজ শুরু করতে হবে। কর্তৃপক্ষ তাঁর গবেষণার গুরুত্ব আগেও বুঝতে পারেনি এখনো তাঁর মাইনে সামান্যই বাড়াতে তারা রাজি হল। প্রশ্নটা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত আর্থিক চাহিদার নয়। বার্ডিনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল খুবই সাদাসিধে, পরবর্তী কালেও তিনি মাইনে নিয়ে কখনোই খুব একটা মাথা ঘামান নি। মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিজ্ঞানীরা, বিশেষ করে পদার্থবিজ্ঞানীরা যে সম্মান লাভ করেছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিজ্ঞানীরা আর কখনো পাননি। আমেরিকার সাধারণ মানুষ মনে করতেন যে পরমাণু অস্ত্রের জনক হিসেবে তাঁরা আমেরিকাকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত করেছেন। সে সময় তাই অন্যান্য পদার্থবিজ্ঞানীরা গবেষণার সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেন অনেক বেশি। মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যুদ্ধের আগে তিনি গবেষণার সুযোগ কমই পেয়েছিলেন, কারণ বার্ডিন যে পদার্থবিজ্ঞানের যে নতুন দিগন্তে গবেষণা করছিলেন, সেই সলিড স্টেট বিজ্ঞানের গুরুত্ব কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারেন নি। যুদ্ধের পর বিখ্যাত বেল ল্যাবরেটরি সলিড স্টেট বিজ্ঞানের গবেষণা শুরু করছিল। তারা তাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিগুণ বেতনের প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৪৫ সালেই তিনি সেখানে যোগদান করেন।
       বেল ল্যাবে বার্ডিন অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে কাজ শুরু করেন। অর্ধপরিবাহী বলতে তখন দুটি পদার্থের কথা জানা ছিল, সিলিকন ও জাৰ্মেনিয়াম। তিনি যে দলে কাজ করতেন, তার পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের নেতা ছিলেন উইলিয়াম শকলি। শকলির সঙ্গে তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই আলাপ ছিল। তাঁর অপর এক পূর্বপরিচিত ওয়াল্টার ব্রাটেন ছিলেন তাঁর সহকর্মী। ব্রাটেন ও তাঁর মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে উঠল গভীর। ব্রাটেন বিভিন্ন পরীক্ষা চালাতেন, বার্ডিন সেগুলির ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করতেন। বেল ল্যাবে তাদের তৈরি যন্ত্রগুলির কোনোটিই কাজ করছিল না। এর কারণ কী?
       সবাই ধরে নিচ্ছিল ইলেকট্রনের প্রবাহ অর্ধপরিবাহীর সমস্ত আয়তন জুড়ে হয়। বার্ডিন দেখালেন যে তা নয়, প্রবাহ কেবল উপরের তল দিয়েই হচ্ছে। তিনি অর্ধপরিবাহীর ক্ষেত্রে পরিবাহীর বাইরের তলে ইলেকট্রন প্রবাহের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা দেন। বেল ল্যাবে তাঁরা ভালভ অর্থাৎ ভ্যাকুয়াম টিউব ব্যবহার করে বিবর্ধক বা অ্যামপ্লিফায়ারের পরিবর্তী হিসাবে কোনো সলিড স্টেট যন্ত্র বানানোর চেষ্টা করছিলেন। যাঁরা পুরানো রেডিয়ো দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয় রেডিয়োর ভিতরে ভালভের কথা মনে আছে। এই ভালভ ব্যবহারের অনেক রকম সমস্যা ছিল। ভালভ সহজেই ভেঙে বা নষ্ট হয়ে যেত। ভালভ গরম করতে হতো, তাই শক্তিক্ষয় হতো অনেক বেশি। তার উপরে ভালভ ছিল অনেক বড়।
       বহু পরীক্ষানিরীক্ষার পরে অবশেষে বার্ডিন ও ব্রাটেন ১৯৪৭ সালের ২৩শে ডিসেম্বর জার্মেনিয়াম দিয়ে এমন যন্ত্র বানাতে সক্ষম হলেন যা ভালভের থেকে অনেক গুণে উন্নত। সেই যন্ত্র হল ট্রানজিস্টর পরবর্তী কালে সিলিকন দিয়েও যা বানানো সম্ভব হয়। শকলি একার চেষ্টাতে পরে আরো উন্নত ট্রানজিস্টর বানাতে সক্ষম হন। ইতিমধ্যে শকলির সঙ্গে বার্ডিনের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছিল। বেল ল্যাব ছেড়ে ১৯৫১ সালে তিনি ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক পদে যোগ দেন।

বেল ল্যাবে (বাঁ দিক থেকে) বার্ডিন, শকলি ও ব্রাটেন
        আধুনিক সভ্যতাতে ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। ইলেকট্রনিকস বিপ্লবের জন্ম দিয়েছিল এই একটি আবিষ্কার। ট্রানজিস্টর বললে মনে পড়ে যায় ট্রানজিস্টর রেডিয়োর কথা। ট্রানজিস্টর ব্যবহার করা হয় বলেই তাদের ঐ রকম নাম। ছোটো রেডিয়ো তৈরি করাই বার্ডিনদের আবিষ্কার ছাড়া সম্ভব ছিল না। প্রথম ট্রানজিস্টর ছিল তখন ব্যবহৃত ভালভের থেকে পঞ্চাশগুণ ছোটো, এখন তাকে দেখতে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হতে পারে। ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ছোটো হতে হতে এখন আই. সি. বা ইনটিগ্রেটেড সার্কিটে পরিণত হয়েছে। আধুনিক টিভি, মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, সর্বত্রই এর ব্যবহার।
       আবিষ্কারের ষাট বছর পরেও ট্রানজিস্টরের গুরুত্ব সামান্য মাত্রও হ্রাস পায় নি। অন্য ধরনের ট্রানজিস্টর পরে আবিষ্কৃত হয়েছে, কিন্তু তারা সবাই সেই প্রথম ট্রানজিস্টরের নীতি অনুসরণ করে। ট্রানজিস্টরের আরো একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল তার দ্রুত কাজ করার ক্ষমতা। আধুনিক কম্পিউটার বানানো এটা ছাড়া সম্ভবই হতো না। একটি আধুনিক মাইক্রোপ্রসেসরে দুশো কোটি ট্রানজিস্টর থাকে পারে। ২০০২ সালের হিসেবে সে বছরই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মাথাপিছু ছয় কোটি ট্রানজিস্টর বানানো হয়েছিল।

       ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর। বার্ডিন সকালবেলার প্রাতরাশ বানাতে বানাতে রেডিয়ো শুনছিলেন। হঠাৎ শুনলেন তিনি শকলি ও ব্রাটেনের সঙ্গে যৌথভাবে অর্ধপরিবাহী বিষয়ে তাদের গবেষণা ও ট্রানজিস্টর বানানোর জন্য নোবেল পুরষ্কার পাচ্ছেন। তাঁর স্ত্রী জেন তখনো ঘুম থেকে ওঠেননি, ফ্রাইং প্যান ফেলে তাঁকে দৌড়ে গিয়ে সুখবরটা দিলেন বার্ডিন।
       ১৯৫৬ সালের ১০ই ডিসেম্বর সুইডেনের স্টকহোমে তিনজনের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেন সুইডেনের রাজা ষষ্ঠ গুস্তাভ। বার্ডিন তাঁর তিন সন্তানের মধ্যে শুধু ছোটো মেয়েকে অনুষ্ঠানে নিয়ে এসেছিলেন। অপর দুই ছেলের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটাতে তিনি চান নি। রাজা এই নিয়ে বার্ডিনের কাছে অনুযোগ জানালে বার্ডিন তাঁকে কথা দেন পরের বার এই ভুল আর হবে না।
       ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন ইলেকটিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপক। তাঁর প্রয়াসেই অর্ধপরিবাহী বিষয়ে গবেষণার কাজ শুরু হয় ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। পদার্থবিদ্যা বিভাগে তাঁর নেতৃত্বে শুরু হয় অতিপরিবাহিতা বিষয়ে গবেষণা। তাঁর প্রথম পি.এইচ. ডি. ছাত্র ছিলেন নিক হোলোনিয়াক। পরবর্তী কালে হোলোনিয়াক এল ই ডি বা লাইট এমিটিং ডায়োড আবিষ্কার করেন।
       ১৯৫১ সাল থেকেই বার্ডিন অতিপরিবাহিতা বিষয়ে গবেষণা শুরু করেন। আমরা সবাই জানি যে তড়িৎ প্রবাহ কোনো তারের মধ্যে দিয়ে গেলে তাকে উত্তপ্ত করে তোলে। এর কারণ তারটি তড়িৎকে বাধা দেয়; এই বাধার নাম রোধ বা রেজিসট্যান্স। চল্লিশ বছর আগে ডাচ বিজ্ঞানী কামেরলিং ওনেস দেখান যে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় (–260° সেন্টিগ্রেডের কাছে) কোনো ধাতুর রোধ শূন্য হয়ে যায়। এই ঘটনাকে বলে অতিপরিবাহিতা। এর কোনো ব্যাখ্যা দিতে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। অবশেষে ১৯৫৭ সালে বার্ডিন, লিয়ন কুপার ও বার্ডিনের ছাত্র জন শ্রিফার অতিপরিবাহিতার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হন। তাঁদের তিন জনের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে এই তত্ত্বকে বলা হয় বিসিএস (BCS) তত্ত্ব। প্রায় একই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে নিকোলাই বোগোলিউবভও অনুরূপ তত্ত্ব দিয়েছিলেন।
       কী বলেছিলেন বার্ডিনরা? বিজ্ঞানের জটিল তত্ত্বকে সংক্ষেপে প্রকাশ করা কঠিন। সংক্ষেপে বলা যায়, তাঁরা বলেছিলেন যে অতি নিম্ন তাপমাত্রায় ধাতুর মধ্যে ইলেকট্রনগুলি জোড় বাঁধে। কুপারের নামে এরকম দুটি ইলেকট্রনের জোড়কে বলা হয় কুপার যুগ্ম। এই যুগের ধর্ম এমনই যে ধাতুর অণুগুলির সঙ্গে এর কোনো ক্রিয়া প্ৰতিক্রিয়া থাকে না। সাধারণ তাপমাত্রায় এই ক্রিয়া প্ৰতিক্রিয়াই ইলেকট্রনের চলার পথে বাধা দিয়ে রোধের জন্ম দেয়। অতি শীতল ধাতুতে তা অনুপস্থিত, তাই রোধও শূন্য হয়ে যায়।
       বিসিএস তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবেই কোয়ান্টাম তত্ত্ব। আমরা জানি যে অতি ক্ষুদ্র বস্তু, যেমন অণু পরমাণু, এদের ধর্ম ব্যাখ্যা করার জন্য কোয়ান্টাম বলবিদ্যার প্রয়োজন। কিন্তু সাধারণত আমরা সরাসরি যে বস্তু দেখতে পাই, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের চিরায়ত পদার্থবিজ্ঞান যথেষ্ট। কিন্তু অতিপরিবাহিতা হল এমন এক ধর্ম যা যদিও দৃষ্টিগ্রাহ্য বস্তুতে দেখা যায়, কোয়ান্টাম তত্ত্ব ছাড়া ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল যে তা ইলেকট্রনদের মধ্যে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার চরিত্রের উপর নির্ভরশীল নয়। সে জন্য অতিপরিবাহিতা ছাড়া অন্যত্রও এই তত্ত্বের প্রয়োগ হয়েছে। ইলেকট্র, অণু পরমাণু, এদের মধ্যে যে বল কাজ করে তা হল তড়িৎচৌম্বক বল। নিউক্লিয়াসের মধ্যে প্রোটন ও নিউটনদের মধ্যে যে বল কাজ করে তা হল সবল বা Strong বল। এই বল তড়িৎচৌম্বক বলের থেকে একশগুণেরও বেশি শক্তিশালী। কিন্তু বিসিএস তত্ত্বের প্রয়োগ নিউক্লিয়াসের মধ্যেও সফলভাবে করা হয়েছে।
       পরবর্তী কালে দেখা গেছে যে কোনো কোনো পদার্থে অতিপরিবাহিতা অপেক্ষাকৃত উচ্চ তাপমাত্রাতেও পাওয়া যায়। বিসিএস তত্ত্ব সম্পূর্ণভাবে এই ধরনের অতিপরিবাহিতার ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম হয়নি। এই ঘটনা এখনো গবেষণার বিষয়। তবে অতিপরিবাহিতার ক্ষেত্রে বিসিএস তত্ত্বই হল যে কোন তাত্ত্বিক আলোচনার মূল কাঠামো। অতিপরিবাহিতার গুরুত্ব আলাদা করে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। আমরা সবাই জানি যে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে ব্যবহারকারীর কাছে নিয়ে যেতে প্রচুর ক্ষতি হয়। কারণ যে পরিমাণ শক্তি পাঠানো হয়, তারের রোধের জন্য তার একটা বড় অংশ যাওয়ার পথেই খরচ হয়ে যায়। যদি সাধারণ তাপমাত্রায় অতিপরিবাহী কোনো পদার্থ (যা আজ পর্যন্ত বানানো সম্ভব হয়নি) ব্যবহার করা যেত, তাহলে এই শক্তিক্ষয়ের সমস্যা আর থাকত না।
       এখনই শক্তিশালী তড়িৎচৌম্বক জাতীয় যে সমস্ত যন্ত্রে অতি উচ্চ তড়িৎ প্রবাহ প্রয়োজন তাদের নির্মাণে অতিপরিবাহিতার প্রয়োগ করা হয়। আমাদের জানা অনেক ডাক্তারি যন্ত্রে যেমন এমআরআই, ইত্যাদিতে এর ব্যবহার হয়। এছাড়া উচ্চশক্তির কণাত্বরকে (Particle Accelerator) এধরনের চুম্বক ব্যবহার হয়। জার্মানি ও জাপানে এমন ট্রেন নিয়ে পরীক্ষা চলছে যা চলার সময় চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে লাইনের থেকে উপরে উঠে থাকবে। এখানেও এমন চুম্বকের ব্যবহার করা হয়। এছাড়া অতিপরিবাহিতার বিভিন্ন ধর্ম ব্যবহার করে তড়িৎপ্রবাহের মাত্ৰা অতি সূক্ষ্মভাবে নির্ণয়ের বিভিন্ন যন্ত্র তৈরি হয়েছে। বার্ডিনদের তত্ত্বের গুরুত্ব বুঝে ১৯৭২ সালে তাঁদের তিনজনকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। এবার অবশ্য বার্ডিন আর ছেলেমেয়েদের সবাইকে স্টকহোমে নিয়ে যেতে ভুল করেন নি।
       এত অসাধারণ সাফল্য সত্ত্বেও বার্ডিন খুব সাধারণ ভাবেই থাকা পছন্দ করতেন। প্রতিবেশীদের বা বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতে ছিল তাঁর আনন্দ। প্রতিবেশীদের কেউ কেউ এমনি কি তাঁর কৃতিত্ব সম্পর্কে জানতেনই না। গলফ খেলতে ভালবাসতেন। অনেক প্রতিভাই তারা যে সাধারণের থেকে পৃথক, তা তাঁদের আচরণের মধ্যে দিয়ে বুঝিয়ে দেন। বার্ডিন ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। তিনি সাধারণ থাকতেই ভালবাসতেন। অনেক সময় সেজন্য প্রচার মাধ্যম তাঁকে অবহেলাই করে গেছে।
       ১৯৯১ সালের ৩০শে জানুয়ারি তাঁর মৃত্যু হয়। নোবেল পুরস্কার ছাড়াও তিনি অনেক সম্মান পেয়েছিলেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি তাঁকে অ্যামেরিকান সমাজে বিশিষ্ট অবদানের জন্য বিশেষ পুরস্কার দিয়েছিলেন। সোভিয়েত অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স তাঁকে লোমোনোসভ পুরস্কারে সম্মানিত করেছিল। বিখ্যাত লাইফ পত্রিকা যে একশ বিশিষ্ট ব্যক্তি বিংশ শতাব্দীকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন, তাঁদের তালিকা প্ৰকাশ করেছিল। তাঁদের মধ্যে সগৌরবে ছিল বার্ডিনের নাম।
       তাঁর জন্মশতবর্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি ডাকটিকিট ছাপা হয়েছে। তবে তাঁর কৃতিত্বের জন্য পৃথক কোনো স্মারকের প্রয়োজন নেই। আমাদের চারদিকের অসংখ্য আধুনিক যন্ত্রের মধ্যেই তাঁর অবদান ছড়িয়ে আছে। গত পঞ্চাশ বছরে যে কজন মানুষের কাজ সারা বিশ্বের মানুষের জীবনকে আমূল পাল্টে দিয়েছে, তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতে তো নিশ্চয়, হয়তো প্রথমেই থাকবেন জন বার্ডিন।