Friday, 30 October 2020
বেকনপন্থী অক্ষয়কুমার: দ্বিশতবর্ষে ফিরে দেখা
Tuesday, 27 October 2020
বিকিরণরোধী গোময়, রাসেলের টিপট এবং কাণ্ডজ্ঞান
বিকিরণরোধী গোময়, রাসেলের টিপট এবং কাণ্ডজ্ঞান
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
খবরে দেখলাম যে গোবর দিয়ে তৈরি চিপ মোবাইল ফোনের বিকিরণ কমিয়ে দেবে বলে দাবি উঠেছে। ফেসবুক টুইটার হোয়াটসঅ্যাপের যুগে সামাজিক মাধ্যমে মাঝেমধ্যেই এরকম অদ্ভুত দাবি শোনা যায়, তাই খুব একটা পাত্তা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনি। কিন্তু বারবার খবরটা নজরে আসতে কৌতূহল হল; দেখলাম কথাটা বলেছেন রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগের প্রধান। অগত্যা আবার ইন্টারনেটের শরণাপন্ন হতে হল। জানতে পারলাম এই আয়োগ হল এক কেন্দ্রীয় সরকারী প্রতিষ্ঠান, তার কাজ হল দেশের গবাদি পশুর উন্নতি। আয়োগের প্রধান নিজে গোবরের এই ক্ষমতা দেখেছেন বলে দাবি করেছেন। তাঁর সেই পর্যবেক্ষণ কোন গবেষণা পত্রিকাতে বেরিয়েছে অথবা গোবরের কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের জন্য তা বিকিরণ রোধ করে সে বিষয়ে কোনো কথা চোখে পড়ল না।
কিছুদিন আগে কোনো একটি বিখ্যাত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে প্রতিষ্ঠানের এক শীর্ষস্থানীয় কর্তাব্যক্তি অম্লানবদনে প্রাচীন ভারতে বিমান নির্মাণ আবিষ্কার হয়েছিল বলে দাবি করলেন। ইংরাজরা সেই তত্ত্ব চুরি করেছিল। কিন্তু নিজেরা এরোপ্লেন বানালে ধরা পড়ে যাবে; তাই তারা আমেরিকানদের কাছে সেই কৌশল পাচার করে দেয়। তার থেকেই রাইট ভাইয়েরা প্লেন বানায়। তাঁর এই রোমহর্ষক গল্প শোনার পরে আমার বক্তৃতাতে আমি বিনম্রভাবে প্রতিবাদ করেছিলাম। এর পরে জনৈক শ্রোতা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘কিছু একটা নিশ্চয় ছিল, তা না হলে পুরাণ মহাকাব্যে এই কথা এলো কোথা থেকে? আমাদের অনুসন্ধান করে দেখা উচিত।’ প্রশ্নকর্তা একটি বিদ্যালয়ে বিজ্ঞানের শিক্ষক। মনে পড়লো আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে গণেশের ঘাড়ের উপরে হাতির মাথা যখন লাগানো হয়েছিল বলে পুরাণে আছে, কেউ তো ছিল যে এই প্লাস্টিক সার্জারিটা করেছিল।
খবরে পড়লাম ঐ আয়োগের প্রধান আরো বলেছেন যে সেই সব বিষয় নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, যাকে এতদিন গল্প মনে করা হত। প্রথমে শুনতে খারাপ লাগে না কথাটা, গবেষণা বা অনুসন্ধান করা তো ভালোই। একটু তলিয়ে দেখলে কিন্তু বিষয়টা অত সরল লাগবে না। বিজ্ঞানে ব্যবহৃত শব্দগুলি প্রতিদিনের ভাষা থেকেই নেওয়া, তার ফলে এই ধরনের সমস্যার সৃষ্টি। সাধারণ ভাষাতে আমরা অনেক সময় বলেই থাকি, ‘এটা তোমার থিওরি,’ অর্থাৎ তোমার বিশ্বাস, কিন্তু তা সত্যি নাও হতে পারে। বিজ্ঞানে ব্যাপারটা অনেকটা আলাদা। ধরুন ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের কথা। প্রথম যখন ডারউইন ও ওয়ালেস বিবর্তনের কথা বলেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার নাম দেয়া হয়েছিল তত্ত্ব বা থিওরি। তারপরে গত দেড় শতাব্দীতে তার পক্ষে এত প্রমাণ জড়ো হয়েছে যে কোনো বিজ্ঞানীর আর তা নিয়ে সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও তার নামটা থিওরিই রয়ে গেছে, যেমন আইস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদের পক্ষে অসংখ্য প্রমাণ সত্ত্বেও তাকে আমরা থিওরিই বলে থাকি। তার মানে এই নয় যে এই সব তত্ত্বে কখনো কোনো সামান্য পরিবর্তন হবে না, কিন্তু মোটের উপর কাঠামো যে এক থাকবে তা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। কিন্তু যে কোনো বিশ্বাসই বিজ্ঞানের থিওরি নয়, তাকে প্রমাণ করে দেখার দায়িত্বও বিজ্ঞানের নয়।
বিজ্ঞান কি পাল্টায় না? আজ যা গল্প, কাল তা সত্যি প্রমাণিত হতেও তো পারে। একথা ঠিক বিজ্ঞানের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল যে সে শেষ কথা বলতে পারে না। প্রতিনিয়ত নতুন উদ্ভাবন নতুন পর্যবেক্ষণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম হচ্ছে, বিজ্ঞান নিজেকে পরিবর্তন করছে। এই আত্মসংশোধন ও আত্মোন্নতি একান্তভাবেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অঙ্গ। তার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আজ যা জানি তা কাল ভুল প্রমাণিত হবে। একেবারে যে তা হয় না এমন নয়, কিন্তু সেই উদাহরণ খুবই কম; এবং বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা আরও দ্রুত কমে আসছে। কিন্তু যাঁরা বিজ্ঞানের প্রকৃতি বোঝেননি, তাঁদের অনেকের মধ্যে এক অদ্ভুত যুক্তি শোনা যায়। ‘মানুষের জীবনে গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব অবশ্যই পড়ে, আজ বিজ্ঞান সেটা ধরতে পারেনি তো কী হয়েছে, ভবিষ্যতেও পারবে না এরকম কথা কি বলা যায়? তোমরা প্রমাণ করে দেখাও যে আমি যা বলছি তা ভুল।’ এই ধরনের কথা শোনার দুর্ভাগ্য আমাদের অনেকের হয়েছে। বক্তাকে বোঝানো কঠিন যে কোনো কিছুর বিরুদ্ধ প্রমাণ নেই মানেই তা সত্যি হয়ে যায় না। তর্কশাস্ত্রে এই ধরনের কুযুক্তিকে বলে argumentum ad ignorantiam।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। বাইবেলে লেখা আছে ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিশাল অংশের মানুষ বিবর্তন তত্ত্বে বিশ্বাস করেন না। (অবশ্য কারোর বিশ্বাস অবিশ্বাসের উপর বৈজ্ঞানিক সত্য নির্ভর করে না।) তাঁদের অনেকেই বলেন বিবর্তন হল একটা থিওরি, আসলে সেটা সত্যি কিনা বিজ্ঞান এখনো নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না। খোলা মনে বিচার করতে হবে। এই খোলা মনে বিচার করার কথাটা বহু দিন ধরে শুনে আসছি। অনেক বছর আগে কলকাতার এক বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান একটি বক্তৃতা আয়োজন করেছিল। বিষয় ছিল ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন। ঈশ্বর প্রাণ বা মানুষের সৃষ্টি করেছেন, এই ধারণার পোশাকি নাম ছিল ক্রিয়েশনিজম। এখন সেটা বিজ্ঞানী মহলে উপহাসের পাত্র, তাই তার নতুন নাম হয়েছে ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন। সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক বিষয়ে বক্তৃতা কেন? উত্তর এলো, সব কিছু খোলা মনে বিচার করতে হবে, বিজ্ঞান তাই বলে। গোময়ের ক্ষেত্রে বা প্রাচীন যুগের বিমানের ক্ষেত্রেও সেই কথা কি প্রযোজ্য নয়?
বিজ্ঞান কি সত্যিই সেই কথা বলে? থালা বাজানো বা বিদ্যুতের আলো নিভিয়ে প্রদীপ জ্বালানোর কথা বলার সময় প্রধানমন্ত্রী বলেননি যে তাতে করোনা ভাইরাস নির্মূল হবে, কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে সেই কথার ব্যাপক প্রচার হয়েছে। খোলা মনে তার বিচার করতে হবে কি? গুজরাটের গরুর দুধে সোনা পাওয়ার কথা পরীক্ষা করে দেখতে হবে কি? খোলা মনে বিচার করলে শুধু আমাদের জীবনে গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব, ইন্টালিজেন্ট ডিজাইন বা গোময়ের বিকিরণরোধী ক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকব কেন? বিষাক্ত সাপে কামড়ালে ওঝা বাঁচাতে পারবে কিনা খোলা মনে বিচার করব। মাঝেমাঝে শোনা যায় অমুক জায়গায় এক বৃদ্ধাকে ডাইনি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তাহলে খোলা মনে বিচার করা উচিত মৃতা সত্যি সত্যিই ডাইনি ছিল কিনা। কথাটা প্রমাণ করার দায়িত্ব কার?
বিজ্ঞানী দার্শনিক এবং সাহিত্যে নোবেলজয়ী বার্ট্রান্ড রাসেল বিজ্ঞানে প্রমাণের দায়িত্ব কার তা একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছিলেন। তিনি প্রস্তাব দিলেন যে পৃথিবী আর মঙ্গলের মধ্যের কোনো এক কক্ষপথে একটা টিপট সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। রাসেলকে ভুল প্রমাণ করার জন্য কি আমরা মহাকাশযান পাঠিয়ে তন্নতন্ন করে সেই চায়ের পাত্রটা খুঁজব? পৃথিবী আর সূর্যের মধ্যের ফাঁকা জায়গায় সাতাশ লক্ষ কোটি পৃথিবীকে ধরানো যায়। এই সব জায়গা আমরা খুঁজে দেখব, নাকি রাসেলকেই বলব আপনি প্রমাণ করুন। করোনা ভাইরাসের সামনে থালা বাজিয়ে দেখব তা ধ্বংস হয় কিনা, নাকি যিনি বলছেন তাঁকে বলব আপনি দেখান? ভাবিজির পাঁপড় খেয়ে ডাক্তাররা পিপিই না পরে করোনা রোগীর চিকিৎসা করতে যাবেন, নাকি যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সেই কথা বলেছিলেন তাঁকে বলবেন যে আপনি প্রমাণ দিন?
বিজ্ঞান ভুল সংশোধনের মধ্যে দিয়ে এগোয়। তা বলে আমার বা আপনার বিশ্বাস সম্পর্কে বিজ্ঞানের কথা আজ না মিললেও কাল বা পরশু কিংবা কয়েকশো বছর পরে তা মিলে যাবে, এ যুক্তি চলে না। কোনো সন্দেহ নেই যে বিজ্ঞানের মূল কথা হল সংশয় এবং তা দূর করার জন্য পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা নিরীক্ষা। কিন্তু তার আগে কিঞ্চিৎ কাণ্ডজ্ঞানেরও প্রয়োজন হয়। ধরা যাক কোনো সুপ্রভাতে মানুষের মাথার জায়গায় হাতির মাথা বসানো সম্ভব হল। (দয়া করে এখানেই পড়া বন্ধ করবেন না, এটা একটা অসম্ভব উদাহরণ মাত্র।) হাতির মস্তিষ্ক যুক্ত এই নতুন ‘হাঁসজারু’ কি মানুষের মতো চিন্তা করবে? হাতির স্বরযন্ত্রে মানুষের মতো কথা বলা সম্ভব? এরোপ্লেন আবিষ্কার হয়ে গেছে, কিন্তু মাটিতে ঘোড়ায় টানা রথের থেকে উন্নত কোনো যান পাওয়া যাচ্ছে না এও কি মানতে হবে? গরুর পেটের ভিতরে নিউক্লিয়ার অ্যাক্সিলারেটর বা রিঅ্যাক্টর নেই; সে যে পরমাণু বাইরে থেকে খাদ্য পানীয় বা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে নেয়, দুধের মধ্যে তার বাইরে কোনো পরমাণু থাকা সম্ভব নয়। তাহলে গরুর দুধের মধ্যে সোনা রুপো প্লাটিনাম খুঁজতে যাব কেন? কোন ধরনের পদার্থ বিকিরণ রোধ করে আমরা জানি; গোবরে তার চিহ্নমাত্র নেই, তাহলে হঠাৎ করে গোবরকে নিয়েই বা পড়ব কেন? গোবরের এই অসাধারণ ক্ষমতা কোথা থেকে এলো যে বিষয়ে কোনো কথা তো শুনলাম না। যুক্তির তোয়াক্কা না করলে অসংখ্য প্রকল্প দেওয়া যায়, কাণ্ডজ্ঞান প্রয়োগ না করে সেগুলো সবই পরীক্ষা করে দেখতে হবে? তাহলে তো অন্য সমস্ত গবেষণা বন্ধ করে দিয়ে হয়।
রাষ্ট্রীয় কামধেনু আয়োগের প্রধান নাকি একথাও বলেছেন আমরা আমাদের বিজ্ঞানকে ভুলতে বসেছি। আমাদের দেশের প্রাচীন বিজ্ঞানের ঠিক কোন পুঁথিতে গোময়ের মাধ্যমে রেডিওবিকিরণ আটকানোর কথা আছে জানি না; এই ধরনের অবাস্তব দাবি আমাদের প্রাচীন সাহিত্য সংস্কৃতির উত্তরাধিকারেরই অপমান করে। আগে যে শিক্ষকের কথা বলেছিলাম, তাঁকে পাল্টা জিজ্ঞাসা করেছিলাম আমাদের কল্পনাকে এত সংকুচিত ভাবছেন কেন? আজকের কল্পবিজ্ঞান লেখকদের বই দুহাজার বছর পরে পড়লে তখনকার পাঠক কি বলবেন একবিংশ শতাব্দীতে মানুষ মুহূর্তের মধ্যে এক গ্যালাক্সি থেকে অন্য গ্যালাক্সিতে যাওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছিল? রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে।’ আমরা কি খুঁজতে বসব যে চোখ থেকে আলো বেরোয় কিনা; নাকি সেটা বৈজ্ঞানিক সত্য নয় বলে তাঁর সেই লেখাকে বাতিল করে দেব? পুরাণ মহাকাব্য ধর্মগ্রন্থ আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ, তাদেরকে সেই ভাবেই পড়া উচিত। সেখানে বিজ্ঞান খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন।
পিপলস রিপোর্টার ওয়েব পত্রিকাতে প্রকাশিত
Monday, 19 October 2020
Monday, 12 October 2020
ইউরেনিয়ার অভিশাপ
ইউরেনিয়ার অভিশাপ
গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়
সম্পাদক লেখা দিতে বলেছেন, বিষয় ‘বিজ্ঞান অভিশাপ না আশীর্বাদ’।
এই শিরোনামে রচনা প্রথম কবে লিখতে হয়েছিল খেয়াল নেই, তবে যতদূর মনে আছে তখন হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যেতাম। বিভিন্ন ক্লাসে পরীক্ষাতে সম্ভবত একাধিকবার লিখতে হয়েছিল। তারপর একসময় স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে গেলাম, কোনো রচনা লেখার আর প্রয়োজন হয়নি। কাজেই বেচারি ইউরেনিয়া নিঃশ্বাস ছেড়ে বেঁচেছিলেন। তখন কি আর তিনি ভেবেছিলেন যে বিচারকের হাতুড়ি নিয়ে ‘আবার সে আসিবে ফিরিয়া’?
ইউরেনিয়া কে? প্রাচীন গ্রিকরা সমস্ত সাহিত্য শিল্পকলা ইত্যাদির প্রেরণাদাত্রী হিসাবে মোট নয়জন মিউজ বা দেবীকে খুঁজে পেয়েছিলেন। তাঁরা সবাই দেবরাজ জিউস ও স্মৃতিশক্তির দেবী নিমোজিনির সন্তান। অবশ্য তারও আগে তাঁদের আকাশের দেবতা ইউরেনাস ও পৃথিবীর দেবী গাইয়ার সন্তান মনে করা হত। তাহলে তাঁরা সম্পর্কে হবেন জিউসের পিসি এবং নিমোজিনির বোন। খুবই জটিল সম্পর্ক! যাকগে, মোদ্দা কথা হল ইউরেনিয়া হলেন জ্যোতির্বিদ্যার মিউজ।
প্রাচীন ভারত বিদ্যার সমস্ত দায়িত্ব দেবী সরস্বতীর হাতে তুলে দিয়েছিল, কিন্তু মিউজদের সঙ্গে আধুনিক যুগের বিশেষজ্ঞদের মিল পাওয়া যাবে। শুধু কবিতার জন্যই চারজন আলাদা আলাদা মিউজ ছিলেন। মহাকাব্য লেখাতে যিনি প্রেরণা দিতেন, গীতিকবিতা তাঁর ডিপার্টমেন্ট ছিল না, আবার প্রেমের কবিতার দায়িত্ব নিয়েছিলেন অন্য একজন। নাটকের ক্ষেত্রে ট্রাজেডি আর কমেডি আলাদা আলাদা জায়গা থেকে অনুপ্রেরণা পেত। মিউজদের তালিকায় বিজ্ঞানের একটা শাখারই নাম ছিল, তা হল জ্যোতির্বিদ্যা। ইউরেনিয়ার হাতে থাকত গ্লোব আর কম্পাস। কম্পাস মানে দিকনির্দেশক চুম্বক নয়। প্রাচীন গ্রিকরা সেটা আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি, সেটা করেছিল চিনারা। এটা হল কাঁটা কম্পাস, সেটা ছোটবেলায় আমার জ্যামিতি বাক্সে থাকত।
কেউ প্রশ্ন করতেই পারেন শুধু জ্যোতির্বিদ্যার দেবীকেই সব বিজ্ঞানের দায়িত্ব দিলাম কেন? তার কারণ আর কিছু নয়, সায়েন্স শব্দটা প্রাচীন হলেও আমরা যে অর্থে এটাকে ব্যবহার করি তা নিতান্তই আধুনিক, অষ্টাদশ শতকের আগে এই মানেটা চলত না। আর জ্যোতির্বিদ্যা শুধু প্রথম আধুনিক অর্থে বিজ্ঞান নয়, বহুদিন পর্যন্ত ছিল একমাত্র বিজ্ঞান। গ্রহ নক্ষত্রের নিয়ম মাফিক চলাফেরা, তাদের পরিবর্তনহীনতা মানুষকে একটু মানসিক স্বস্তি দিত। সমস্ত প্রাচীন সভ্যতাই তাই আকাশে স্বর্গকে খুঁজে পেয়েছিল, মৃত্যুর পরে মানুষের সেখানেই স্থান হত।
মজাটা হল ইউরেনিয়াও পরবর্তীকালে কবিতার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, তখন অবশ্য গ্রিক সভ্যতা অস্তাচলে। মধ্যযুগে ইউরোপে বিজ্ঞান গবেষণা শুধুমাত্র প্রাচীন পণ্ডিতদের পুঁথি পড়ে তাদের টীকা ভাষ্য রচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ইউরেনিয়া মনে হয় বেকার হয়ে পড়েছিলেন, তাই খ্রিস্টধর্মের তত্ত্ব নিয়ে কবিতার প্রেরণা জোগানোর কাজটা তখন তাঁর ঘাড়ে পড়েছিল। এ বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের লেখালেখি পড়ে মনে হয় দায়িত্বটা বেশ কঠিন ছিল, ভদ্রমহিলা ঠিক পেরে ওঠেন নি।
এই দেখুন। লিখতে বসেছিলাম বিজ্ঞান অভিশাপ না আশীর্বাদ, চলে গেলাম ইউরেনিয়ার গল্পে। আচ্ছা বলুন তো, ১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের ছ’তারিখের আগে কোনো দেশে কোনো স্কুলের ছাত্রকে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ বিষয়ে রচনা লিখতে হত কি? বিজ্ঞান আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবে জেনে আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে বসেছিলাম; ইউরেনিয়া সমেত সব মিউজকে ছুটি দিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর তো শুধু অ্যাটম বোম নয়, এলো রেডিয়েশন বা পেস্টিসাইড পয়জনিং, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স, গ্লোবাল ওয়ার্মিং, এরকম কত কী! ছোটবেলায় এসব যদি জানা থাকত!
অভিশাপ আর আশীর্বাদের মধ্যে তফাত করাটা সবসময় সহজ নয়। রচনাতে লিখতাম প্রয়োগ কিভাবে করা হবে তার উপর নির্ভর করছে বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ -- নিউক্লিয়ার বোমা খারাপ, কিন্তু রেডিওথেরাপি, এমআরআই ভালো। এবার ইতিহাস বই খুলুন, দেখবেন চাষবাস শুরুর আগে মানুষ ছিল যাযাবর, কুড়িয়ে বাড়িয়ে আর শিকার করে যা জুটত, তাই খেত। কৃষিকাজ আবিষ্কার হল মানুষের ইতিহাসে দ্বিতীয় বিপ্লব, এর ফলে গ্রাম ও নগর তৈরি সম্ভব হয়েছে, সভ্যতার অগ্রগতি হয়েছে। তাহলে কৃষি আবিষ্কার নিশ্চয় বিজ্ঞানের আশীর্বাদ। জানেন কি চাষবাস শুরু করার আগে মানুষের গড় আয়ু ছিল তেত্রিশ বছর। বারো হাজার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যে কৃষি আবিষ্কার হয়, তার পরে সেই গড়টা কমে দাঁড়িয়েছিল পঁচিশ বছর? যাযাবররা মাটির সঙ্গে বাঁধা থাকত না, এক জায়গায় খাবার শেষ হয়ে গেলে অন্য জায়গায় চলে যেত, তাদের স্বাস্থ্য ছিল অনেক ভালো, দুর্ভিক্ষ বা মহামারী কাকে বলে জানত না। তাহলে মানুষ কৃষি বেছে নিয়েছিল কেন? খুব সহজ, সংখ্যাধিক্য। এমনি এমনি তো প্রাচীন মিশরের দেবী হেকেট একই সঙ্গে নীল নদে বন্যা, কৃষি এবং প্রজননশক্তির দায়িত্ব পাননি? যাযাবর মানুষের থেকে এক জায়গায় থিতু মানুষের সন্তানসংখ্যা সব সময়েই বেশি হবে। তাই ডারউইনের সূত্র মেনে কৃষিকাজই প্রজাতির বিকাশের পক্ষে যোগ্যতর। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে আবার তেত্রিশ বছর ছুঁল সবে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে। তাহলে কৃষি আবিষ্কার কি বারো হাজার বছরব্যাপী অভিশাপ?
পুরানো কথা অনেক হল, এবার সামনের দিকে তাকানো যাক। এই করোনার যুগে একটা কথা খুব শোনা যাচ্ছে। এআই অর্থাৎ আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স। আপনি যখন গুগলকে কোনো কিছু খুঁজতে বলেন, কর্টানা অ্যালেক্সা বা সিরিকে নিজের রুটিন ঠিক করার দায়িত্ব দেন, ওলা বা উবের জাতীয় অ্যাপক্যাবের শরণাপন্ন হন, তখন আপনি এআই-এর সাহায্য চাইছেন। এআই–এর একটা বড় সুবিধা হল খুব দ্রুত বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা -- করোনার ওষুধ বা ভ্যাকসিনের জন্য অনেক বিজ্ঞানী তাই তার উপর নির্ভর করছেন। গুগল সার্চে ঠাণ্ডা লাগা, মাথা ধরা, জ্বর ইত্যাদি কতবার খোঁজা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে গুগল ফ্লু ট্রেন্ডস অ্যালগরিদম ব্রিটেনের জাতীয় হেলথ সার্ভিসের দশদিন আগে ফ্লু এপিডেমিক পর্যায়ে চলে যাচ্ছে কিনা বলতে পারে, স্বাস্থ্য দপ্তর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। পাশাপাশি আপনার ই-মেল, মেসেজ, গত কদিনে কোন শব্দটা বেশি খুঁজেছেন, কোন ধরনের খবর পড়েছেন, এসব দেখে আপনি কোন জিনিসটা কিনতে পারেন থেকে শুরু করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেবেন কিনা সবই অনুমান করতে পারে এআই। অরওয়েলের নাইন্টিন এইটিফোর যদি বাস্তবে নেমে আসে? গল্পকথা নয়, ব্রেক্সিটের গণভোট বা গত মার্কিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এআই-এর সাহায্যে ফেসবুক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে আলাদা আলাদা ব্যক্তির জন্য আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে প্রচার চালানো হয়েছিল। আবার বলি, স্কুলের রচনাতে লিখতাম এ হল বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগ। কিন্তু ঠিক কোনখানে দাঁড়িটা টানব? আগে অটোমেশনের জন্য চাকরি যাওয়ার কথা শুনলে বলতাম অন্তত বুদ্ধির কাজ তো যন্ত্র করতে পারবে না। এখন? ডাক্তার উকিল শিক্ষক, এমনকি লেখক সঙ্গীতকার সবাই যদি সমাজে অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে?
কিছু শিশু জন্মগত শারীরিক ত্রুটি নিয়ে জন্মায়, তাদের এবং তাদের বাবা মা পরিবারের অবস্থাটা আমরা কিছুটা অনুমান করতে পারি। বিজ্ঞান আমাদের মুক্তির উপায় দেখাচ্ছে -- জিন টেলরিং। অনেক সময়েই এই ত্রুটিগুলো জেনেটিক, সংশ্লিষ্ট জিনটা পাল্টে দাও। মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীতে হয়েছে, মানুষের ক্ষেত্রেও দু’বছর আগে চিনে এক বিজ্ঞানী সে কাজ করেছিলেন। নিশ্চয় আমরা চাইব জন্মগত ত্রুটি দূর করতে, কিন্তু ঠিক কোথায় থামব? সন্তানের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে চাওয়াটা কি অন্যায়? তার রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ানো? পেশীর শক্তি বৃদ্ধি, হাড় মজবুত করা? দৃষ্টিশক্তি বাড়ানো? বুদ্ধিবৃত্তি? এই সুপারম্যান বা সুপারওম্যানদের সন্তানরাও তাদের ক্ষমতা নিয়ে জন্মাবে। শাসকরা চিরকালই শাসিতদের থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখতে চেয়েছে, কিন্তু বাস্তবে দু’দলের জিনে কোনো পার্থক্য ছিল না। এখন? বিজ্ঞান তাহলে কি কিছু লোকের জন্য আশীর্বাদ আর বাকিদের জন্য অভিশাপ?
শেষ করতে হবে, সুতরাং এখানেই থামা যাক। সত্যি সত্যি কি আর ইউরেনিয়া বলে কেউ আছেন যিনি আমার রচনাটা পড়বেন? হাসালেন, এখন কেউ আর ইউরেনিয়াকে বিশ্বাস করে নাকি? কিন্তু দুহাজার বছর আগে তো করত; সুতরাং সমাজবিদ্যার আধুনিকতম এক তত্ত্ব অনুযায়ী সে যুগে তাঁর অস্তিত্ব ছিল। ভাগ্যিস আমি দু’হাজার বছর আগে লেখাটা লিখতে বসিনি; এইরকম উদ্দেশ্যহীন লেখা পড়লে তিনি নির্ঘাত আমাকে অভিশাপ দিতেন।
প্রকাশিত হয়েছিল খোয়াবনামা খবরে, তার লিঙ্ক এইখানে রইল।
Sunday, 11 October 2020
পদার্থবিজ্ঞানের নোবেল, ২০২০
গুরুচন্ডা৯ ওয়েব পোর্টালে প্রকাশিত হয়েছে এই লেখাটা।
প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১১, ২০২০
Tuesday, 6 October 2020
গ্রহ চুরির গল্প
গ্রহ চুরির গল্প
টাকা গয়না জমি বাড়ি এমনকি পুকুর চুরি পর্যন্ত শুনেছি, কিন্তু গ্রহ চুরি! সে আবার কী? গ্রহ তো পকেটে বা থলিতে পুরে নিয়ে আসা যায় না, ব্যাঙ্কের ভল্টে বা মাটির নিচে পুঁতে রাখাও সম্ভব নয়। কিন্তু সত্যিই গ্রহ চুরির গল্প বেরিয়েছিল যে সে জায়গায় নয়, সায়েন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকার 2004 সালের ডিসেম্বর সংখ্যায়, শিরোনাম ছিল ‘‘The Case of the Pilfered Planet’, অর্থাৎ গ্রহ চুরির মামলা। সেই মামলার কথা জানতে গেলে আমাদের কিছুটা বিজ্ঞান আর কিছুটা ইতিহাস শুনতে হবে।
আমাদের সৌরজগতে আটটা গ্রহ আছে। অবশ্য আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন গ্রহের সংখ্যা ছিল নয়, পরে প্লুটোকে বামন গ্রহ বলে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটাতে আমরা বাস করি। খালি চোখে দেখা যায় বুধ, শুক্র, মঙ্গল বৃহস্পতি আর শনি, এই পাঁচটা গ্রহকে; মানুষ যেদিন থেকে আকাশের জ্যোতিষ্কদের চিনতে শিখেছে, প্রায় সেই সময় থেকেই এদের কথা জেনেছে। প্রাচীনকালে অবশ্য সূর্য ও চাঁদকেও গ্রহ ধরা হত, তার সঙ্গে আমাদের দেশে রাহু ও কেতু বলে দুটো গ্রহের কথা ধরে নবগ্রহের কথা চালু ছিল।
আমাদের সৌরজগতে ইউরেনাস ও নেপচুন এই দুটো, প্লুটোকে ধরলে তিনটে, গ্রহ দূরবিন দিয়ে আবিষ্কার হয়েছে। ইউরেনাস অবশ্য খুব অনুকূল পরিস্থিতিতে খালি চোখে দেখা যায়। যেমন প্রাচীন গ্রীক বিজ্ঞানী হিপ্পার্কাস 128 খ্রিস্টপূর্বাব্দে দেখেছিলেন, কিন্তু গ্রহ বলে চিনতে পারেননি। অন্য নক্ষত্রজগতে অবশ্য কয়েক হাজার গ্রহ গত পঁচিশ বছরে আবিষ্কার হয়েছে, সেই আলোচনা এই বইয়ে পরে পাওয়া যাবে। এখানে আমরা নেপচুন আবিষ্কারের কথা শুনব, তবে তার ভূমিকা হিসাবে ইউরেনাসের কথাও আসবে। সেই ইতিহাসের মধ্যেই গ্রহ চুরির মামলা লুকিয়ে আছে।
গ্রহ কাকে বলে আমরা সবাই জানি। সহজ কথায় নক্ষত্রের চারদিকে ঘোরে, নিজের অভিকর্ষের প্রভাবে গোলকাকার হয়ে গেছে এবং তার রাস্তা থেকে ছোটখাটো পাথরের টুকরোটাকরা সব পরিষ্কার করে দিয়েছে, এমন বস্তুদের বলে গ্রহ। এ কথাও অবশ্য মনে রাখতে হবে যে গ্রহের ভিতরে নিউক্লিয় বিক্রিয়া হয় না। অনেক সময় দুই বা তারও বেশি তারকা একে অন্যকে প্রদক্ষিণ করে, তাদের আমরা নিশ্চয় গ্রহ বলব না।
দূরবিন দিয়ে তো লক্ষ লক্ষ জ্যোতিষ্ক দেখা যায়। তার মধ্যে কোনটা গ্রহ আর কোনটা গ্রহ নয় বুঝব কেমন করে? ছোটবেলায় পড়েছি গ্রহের আলো স্থির, তারার আলো মিটমিট করে। কিন্তু সেটা কাছের গ্রহদের জন্য সঠিক। তারারা আমাদের চোখে বিন্দুর মতো দেখতে, তাই বাতাসের প্রতিসরণের জন্য মনে হয় মিটমিট করছে। কিন্তু প্রথম যুগের দূরবিনে ইউরেনাস বা নেপচুনকেও বিন্দুর মতোই দেখাত, তখনকার জ্যোতির্বিদদের পক্ষে কোনোভাবেই শুধু কেমন দেখতে লাগছে তা দিয়ে গ্রহ নক্ষত্রের মধ্যে তফাত করা সম্ভব ছিল না। তাঁদের তাই অন্য রাস্তা বেছে নিতে হয়েছিল।
আকাশের তারারা অনেক দূরে আছে, তাই তাদের স্থির মনে হয়। অবশ্য পৃথিবীও স্থির নয়, সে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে; কিন্তু তার জন্য তারকাদের অবস্থানে খুব কম পার্থক্য হয়। সেই পার্থক্যও মাপা গেছে, তার থেকে আমরা আমাদের কাছের তারকাদের দূরত্ব নির্ণয় করি। এই বইয়ের পরের একটা লেখাতে সেই পদ্ধতির কথা বলা আছে। তারকাদের জন্য এই পার্থক্যটা প্রথম যুগে দেখা সম্ভব ছিল না। আমাদের সৌরজগতের গ্রহরা যেহেতু সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, তাই আকাশে তাদের স্থান পরিবর্তন হয়। সেই দেখে গ্রহ আর নক্ষত্রের মধ্যে তফাত করা সম্ভব।
একটা উদাহরণ দেখা যাক। উইলিয়াম হার্শেল দূরবিনে দেখে 1781 সালের মার্চ মাসে ইউরেনাস আবিষ্কার করেন। কেমন করে তিনি বুঝলেন যে সেটা গ্রহ তা পরের পাতার ছবি থেকে বোঝা যাবে। মার্চ মাসের 13 থেকে 18 তারিখ প্রত্যেকদিন তিনি আকাশের একটা বিশেষ অঞ্চল দেখছিলেন এবং বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের অবস্থান নোট করছিলেন। তাঁর দূরবিনে সেই জায়গাতে বিভিন্ন জ্যোতিষ্ককে কেমন দেখা যাচ্ছিল তা ছবিতে দেওয়া আছে। খুব ভালো করে দেখলে বোঝা যাবে এর মধ্যে মাত্র একটা আলোকবিন্দুই জায়গা পাল্টেছে। যেমন A, B, C এগুলোর আপেক্ষিক অবস্থান স্থির, সুতরাং এগুলো নক্ষত্র। এদের সাপেক্ষে D চিহ্নিত আলোকবিন্দুটি স্থান পরিবর্তন করছে। সুতরাং D হল নতুন গ্রহ, এটাই ইউরেনাস। D একটা চাকতির মতো দেখাচ্ছে, সেটা গ্রহ হওয়ারই কথা।
হার্শেল দূরবিন দিয়ে ইউরেনাসকে যেমন দেখেছিলেন |
যত সহজে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টা তত সহজ ছিল না। ছবিতে রাতের আকাশে ফটো তুললে কেমন হতো সেটা দেখানো হয়েছে, 1781 সালে ফটোগ্রাফির কথা কল্পনাতেও ছিল না। হার্শেল প্রথমে ভেবেছিলেন এটা একটা ধূমকেতু। ইউরেনাস নামটাও হার্শেলের দেওয়া নয়, তিনি ইংল্যান্ডের তখনকার রাজা পঞ্চম জর্জের নামে গ্রহটার নাম দিয়েছিলেন। সে নাম অবশ্য বিশেষ কেউ মানেননি। ইউরোপে প্রচলিত গ্রহদের নামগুলো ছিল গ্রিক বা রোমান দেবতাদের নামে, সেই অনুযায়ী গ্রিক পুরাণের আকাশের দেবতার নামে গ্রহটার নাম দেওয়া হল ইউরেনাস।
হার্শেলকে গ্রহ আবিষ্কারের জন্য বছরের পর বছর আকাশ পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছিল। মনে রাখতে হবে শনির পরে যে আরও গ্রহ থাকতে পারে, সেটাই অনেকে বিশ্বাস করতে পারতেন না। নেপচুনও আবিষ্কার হয়েছিল দূরবিন দিয়ে দেখে, কিন্তু মাত্র একরাতের মধ্যে। তার কারণ আকাশের কোথায় সেটা পাওয়া যাবে তা বিজ্ঞানীরা আগেই অঙ্ক কষে বার করেছিলেন। এর পিছনে একটা বড় গল্প আছে যেটা আবিষ্কারের দেড়শো বছর পরে অমাপ্তিতে পৌঁছেছে। আজ আমরা সেটাই শুনব।
লে ভেরিয়ের | |
অ্যাডামস |
ইউরেনাস আবিষ্কার হল বটে, কিন্তু নিউটনের মাধ্যাকর্ষণের সূত্র থেকে তার চলাফেরার হিসেব মেলানো যাচ্ছিল না। নিউটনের সূত্রটা শুনতে সোজা, দুটো বস্তু থাকলে তাদের কক্ষপথ বার করাও খুবই সহজ। কিন্তু দুইয়ের বেশি বস্তু থাকলে অঙ্কটা প্রচণ্ড শক্ত। এই হিসাবটা আমরা এখনো কম্পিউটার ছাড়া খুব নিখুঁতভাবে করতে পারি না। 1845 সালে কম্পিউটারের প্রশ্নই আসে না। এ ক্ষেত্রে সূর্য, বৃহস্পতি, শনি ইউরেনাস, সবাইকে একসঙ্গে ধরে অঙ্কটা কষতে হয়েছিল। তাতেও যখন মিলছিল না, তখন দুই বিজ্ঞানী জন অ্যাডামস বা তাঁর পরে উরবাইন লে ভেরিয়ের আরও একটা অজানা গ্রহকে হিসেবে এনে অঙ্কটা মেলানোর চেষ্টা করেন। তার থেকে তাঁরা দুজনে আলাদা আলাদা ভাবে নতুন গ্রহটার ভর কক্ষপথ ইত্যাদি বার করেছিলেন, বলেছিলেন আকাশের কোথায় এই নতুন গ্রহটাকে পাওয়া যাবে। উরবাইন লে ভেরিয়ের ছিলেন ফরাসি, জন অ্যাডামস ব্রিটিশ। তাঁরা কেউই নিজেরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করতেন না, কাজেই তাঁরা অন্যদের সাহায্য চেয়েছিলেন।
গ্যালে |
ডি অ্যারেস্ট |
লে ভেরিয়ের নিজের দেশের জ্যোতির্বিদদের অনুরোধ করলেন কিন্তু তাঁরা কেউ পাত্তা দেন নি। তিনি তখন নানা দেশের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের কাছে চিঠি লিখে আকাশে তাঁর নির্দেশিত জায়গা পর্যবেক্ষণ করার অনুরোধ জানান। তাঁর কথার গুরুত্ব দিয়েছিলেন জার্মানির বার্লিন মানমন্দিরের বিজ্ঞানী জোহান গ্যালে। তিনি আর তাঁর এক অল্পবয়সী সহযোগী হাইনরিখ ডিঅ্যারেস্ট চিঠির কথা মতো আকাশের ঠিক জায়গায় দূরবিন তাক করেন। সেই দিনটা ছিল 1846 সালের 23 সেপ্টেম্বর। ডিঅ্যারেস্টের হঠাৎ মনে পড়ল রাতের আকাশে ঠিক ওই জায়গার তারাদের অবস্থানের একটা পুরানো ছবি বার্লিন মানমন্দিরে আছে। দুজনে মিলে সেই ছবিটার সঙ্গে সেদিন রাতের তারাগুলোর অবস্থান একটা একটা করে মেলাচ্ছিলেন, হঠাৎ ডিঅ্যারেস্ট বললেন, ‘ম্যাপে এই তারাটা নেই!’ আধঘণ্টাতেই একটা গ্রহ আবিষ্কার হয়ে গেল। পরের দিন দেখা গেল সেটা সত্যিই একটু জায়গা পাল্টেছে। গ্যালে সঙ্গে সঙ্গে লে ভেরিয়েরকে লিখে পাঠালেন যে তাঁর গণনা অনুযায়ী গ্রহটা পাওয়া গেছে। রোমানদের সমুদ্রের দেবতার নামে তার নাম দেওয়া হয় নেপচুন।
এবার আসি অ্যাডামসের কথায়। নেপচুন আবিষ্কারের ঘোষণার পরে রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনোমার অর্থাৎ ব্রিটেনের গ্রিনউইচ মানমন্দিরের প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ এয়ারি বলেন যে জন অ্যাডামস বলে একজন তাঁকে আগেই বলেছিলেন ঠিক কোথায় নতুন গ্রহটাকে পাওয়া যাবে। নেপচুন আবিষ্কারের পরে তাঁর কাগজটা খুলে তিনি দেখেছেন যে অ্যাডামসও আকাশের প্রায় একই জায়গার কথা লিখেছিলেন। তাই নেপচুন আবিষ্কারের সমান গৌরব অ্যাডামসেরও প্রাপ্য। ফ্রান্স আর ব্রিটেনের বিজ্ঞানীরা কিছুদিন এই নিয়ে তর্কাতর্কি করেন, শেষে সবাই মেনে নিয়েছিলেন যে সেই দুজনেই আবিষ্কারের সমান ভাগীদার।
নেপচুন আবিষ্কারের যে গল্পটা চালু আছে, তার এই জায়গাটা বেশ ইন্টারেস্টিং। 1845 সালের অক্টোবর মাসে বিকেল সাড়ে তিনটের সময় লণ্ডনে এয়ারির বাড়িতে একজন দেখা করতে এসেছিলেন। আগেও তিনি দুবার এসেছিলেন, কিন্তু কোনোবারই এয়ারি বাড়ি ছিলেন না। এয়ারি পরিবার তখন রাতের খাবার খেতে বসেছিলেন। এয়ারির নির্দেশ ছিল কোনো কারণেই যেন ডিনারের সময় তাঁদের বিরক্ত করা না হয়। তাই বাড়ির খানসামা তাঁকে ফিরিয়ে দেয়। আগন্তুক তখন একটা কাগজে কিছু লিখে এয়ারির জন্য রেখে যান। দুপুর সাড়ে তিনটের সময় রাতের খাবার! এয়ারি একটু অদ্ভুত মানুষ ছিলেন সন্দেহ নেই। তবে সন্ধে হলেই জ্যোতির্বিদরা আকাশ পর্যবেক্ষণে লেগে যান, তাই তাঁদের অফিসের সময় অন্যদের সঙ্গে মেলে না। সেই আগন্তুকই ছিলেন জন অ্যাডামস।
অ্যাডামস ওই অঙ্কটা কষেছিলেন 1845 সালের সেপ্টেম্বর মাসে, দূরবিন দিয়ে কোথায় দেখলে গ্রহটাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, সেই কথা তিনি এয়ারিকে লিখে দিয়েছিলেন। সে যা হোক, প্রচলিত গল্প হল এয়ারি অ্যাডামসকে পাত্তা দেননি। প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানী তরুণের কথা শোনেননি বলেই নেপচুন আবিষ্কারের গৌরব ইংরেজদের হাত থেকে ফসকে যায়। পরবর্তীকালে অনেকেই এর জন্য এয়ারিকে প্রচুর গালমন্দ করেছেন। বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক আইজ্যাক আসিমভের মতে এয়ারি ছিলেন অহংকারী সংকীর্ণমনা ও হিংসুটে, তিনি গ্রিনউইচ মানমন্দিরটাকে নিজের জমিদারির মতো চালাতেন, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় নিয়ে তিনি এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে একটা গ্রহ আবিষ্কারের গুরুত্বও তিনি বুঝতে পারেন নি। এই সমালোচনা এয়ারির প্রাপ্য নয়, কিন্তু অন্য একটা অত্যন্ত অন্যায় কাজ তিনি করেছিলেন। সেই কথায় আমরা পরে আসব।
এই গল্পটা চালু বটে, কিন্তু আসলে সত্যি নয়। নেপচুন আবিষ্কারের পরে পরেই এয়ারি পুরো বিষয়টা লিখেছিলেন, অ্যাডামস তার কোনো প্রতিবাদ করেননি। আমরা এয়ারির বিবরণী থেকে ঘটনাপরম্পরা জেনে নিই। এয়ারি অ্যাডামসের কথা খুব ভালোই জানতেন, কারণ অ্যাডামস গবেষণা করতেন কেমব্রিজে। কেমব্রিজ মানমন্দিরের বিজ্ঞানী জেমস চ্যালিস এয়ারিকে চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে অ্যাডামস এই বিষয়ে কাজ করছেন, চ্যালিস মারফত এয়ারি অ্যাডামসকে ইউরেনাসের কক্ষপথ সম্পর্কে নিজের পর্যবেক্ষণও পাঠিয়েছিলেন।
ডিনারের সময় এয়ারির বাড়িতে অ্যাডামসের আসার গল্পটাও ঠিক নয়। চ্যালিস এয়ারিকে জানিয়েছিলেন অ্যাডামস তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যাবেন। অ্যাডামস সেপ্টেম্বর মাসের শেষে এয়ারির বাড়ি গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তখন ফ্রান্সে। তিনি ফিরে চ্যালিসকে চিঠি লিখে জানান যে অ্যাডামসের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়নি, অ্যাডামস যেন চিঠিতে বিষয়টা ব্যাখ্যা করেন। অ্যাডামস তারপর গিয়েছিলেন গ্রিনউইচ মানমন্দিরে এয়ারির অফিসে, সেটা সে বছর অক্টোবর মাসের শেষের দিক। এয়ারি সেদিনও ছিলেন না, অ্যাডামস তখন তাঁর হিসেবের কাগজটা রেখে আসেন। তাতে লেখা ছিল যে ইউরেনাসের কক্ষপথ যে হিসেবের সঙ্গে মিলছে না, তার জন্য দায়ী এক অনাবিষ্কৃত গ্রহ। আকাশের কোথায় সেই গ্রহটাকে খুঁজতে হবে, সেটাও তিনি লিখে দিয়েছিলেন। গল্পে যেমন শোনা যায়, এয়ারি কাগজটাকে মোটেই তেমন উপেক্ষা করেন নি। তিনি তার পরেই কয়েকটা ব্যাখ্যা জানতে চেয়ে অ্যাডামসকে চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু অ্যাডামস উত্তর দেননি।
আমাদের কাহিনি এবার পৌঁছবে ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ফ্রান্সে। 1845 সালের 10 নভেম্বর প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে লে ভেরিয়ের দেখান ইউরেনাসের কক্ষপথ হিসাবের সঙ্গে মিলছে না। পরের বছর 1 জুন এক লেখাতে হিসাব না মেলার কারণ হিসাবে এক নতুন গ্রহের প্রস্তাব করেন তিনি। এয়ারি এই লেখাটা পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই কিছু ব্যাখ্যা চেয়ে লে ভেরিয়েরকে চিঠি পাঠান। তাঁর উত্তর আসার আগেই এক মিটিঙে এয়ারি, চালিস ও জন হার্শেলের দেখা হয়। জন হার্শেল হলেন উইলিয়াম হার্শেলের ছেলে এবং সে যুগের বিখ্যাত বিজ্ঞানী। সেই সময় তাঁরা এই নতুন গ্রহ দেখার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন, অ্যাডামসের কথাও ওঠে। ইতিমধ্যে লে ভেরিয়েরের ব্যাখ্যা এয়ারির কাছে এসে পৌঁছায়। এর পরই এয়ারি চালিসকে চিঠি লিখে নতুন গ্রহ খোঁজার উপর জোর দেন।
চ্যালিস সেই কাজ শুরু করেন 1846 সালের 29 জুলাই। ইতিমধ্যে অ্যাডামস আবার নতুন করে গণনা করেন এবং সেপ্টেম্বরের গোড়াতে এয়ারিকে সেটা পাঠান। লে ভেরিয়েরও 31 আগস্ট আবার গণনা করেন। এয়ারি দেখেন যে দু’য়ের মধ্যে অনেকটাই মিল আছে। চ্যালিস সেই অনুযায়ী খোঁজা শুরু করেন, কিন্তু বিশেষ এগোতে পারেন নি। তার কারণ হল নেপচুন আকাশে খুব ধীরে সরে। তার বছর হল আমাদের 165 বছরের সমান। তার মানে আকাশে 165 বছরে নেপচুন ঘোরে 360 ডিগ্রি, এক মাসে 0.18 ডিগ্রি। তুলনার জন্য বলা যায় চাঁদ আমাদের চোখে 0.5 ডিগ্রি কোণ উৎপন্ন করে, অর্থাৎ তিন মাসে নেপচুন আকাশে দূরের নক্ষত্রদের সাপেক্ষে চাঁদের ব্যাসের পরিমাণ সরবে। তাই বেশ কিছুদিন পর্যবেক্ষণ না করলে কখনোই নিশ্চিত হওয়া যায় না যে আলোকবিন্দুটা সরেছে কিনা। সেই সময় চ্যালিস পাননি। কারণ লে ভেরিয়েরের অনুরোধ বার্লিনের মানমন্দিরে পৌঁছোয় সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহে, আর 23 তারিখ রাতেই গ্যালে ও ডিঅ্যারেস্ট গ্রহটা আবিষ্কার করেন। পরে বোঝা গেছে চালিস 4 আগস্ট গ্রহটাকে দেখতেও পেয়েছিলেন, কিন্তু আকাশের ভালো ম্যাপ না থাকার ফলে চিনতে পারেননি।
এর পরে এয়ারি আর অন্য সব ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা অনেক লেখালেখি করে প্রমাণ করেন যে অ্যাডামস লে ভেরিয়েরের আগেই অঙ্কটা কষেছিলেন, কিন্তু ঘটনাচক্রে তাঁর গবেষণার কথাটা জনসমক্ষে আসে নি। তাই লে ভেরিয়েরের থেকে তাঁর কৃতিত্ব কোনো অংশে কম নয়। আমি উপরের আলোচনাতে এয়ারির সেই বিবরণের সাহায্য নিয়েছি। লে ভেরিয়ের মোটেই এতে খুশি হন নি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এয়ারির বিবরণ মেনে নিয়ে অ্যাডামস ও লে ভেরিয়ের দুজনকেই সমান কৃতিত্ব দেওয়া হয়। আমরা দেখলাম যে এয়ারিকে তাহলে বিশেষ দোষ দেওয়া যায় না, তিনি অ্যাডামসের কাজকে যথেষ্টই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নেহাতই ঘটনাচক্রে ইংল্যান্ডে নেপচুন আবিষ্কার হয়নি; জার্মানদের কাছে কিছুদিন আগের আকাশের মানচিত্র ছিল, চালিসের কাছে ছিল না। সুতরাং ব্রিটিশ আর ফরাসি বিজ্ঞানীদের কৃতিত্ব সমান।
এত বিস্তারিত আলোচনার কি দরকার ছিল? ছিল, তার কারণ এই গল্পটাও পুরোপুরি সত্যি নয়, তবে সেটা বোঝা গেছে অনেক পরে। 1960 সাল পর্যন্ত রয়্যাল গ্রিনউইচ অবজারভেটরি নেপচুন আবিষ্কার সংক্রান্ত কাগজপত্র কাউকে দেখতে দেয়নি। তার পরে ফাইলটা হারিয়েই যায়। ফাইলটা শেষ নিয়েছিলেন রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনোমারের সহকারী ওলিন এগেন, তিনি 1960 সাল নাগাদ এয়ারি ও চালিসের জীবনী লিখছিলেন। এগেনকে জিজ্ঞাসা করলেই বলতেন যে ফাইল তিনি ফেরত দিয়ে দিয়েছিলেন। এগেন তার পর ইংল্যান্ড ছাড়েন, অস্ট্রেলিয়া ও সবশেষে চিলির মানমন্দিরে কাজ করছিলেন। 1998 সালে তিনি মারা যান। তারপর অর্থাৎ নেপচুন আবিষ্কার হওয়ার দেড়শো বছর পরে তাঁর কাগজপত্রের মধ্যে গ্রিনউইচ মানমন্দিরের সেই ফাইলটা পাওয়া যায়। সমস্ত কাগজপত্র আবার কেমব্রিজে ফেরত আসে।
বার্লিন মানমন্দিরের আকাশের ম্যাপ |
খুঁজে পাওয়া সেই কাগজপত্রই আমাদের নেপচুন আবিষ্কারের কাহিনিকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করেছে। সঙ্গের ছবিটা বার্লিন মানমন্দিরের সেই আকাশের ম্যাপ, যার উপর গ্যালে ভেরিয়েরের ভবিষ্যৎবাণী ও নেপচুনের প্রকৃত অবস্থান এঁকে দিয়েছিলেন। অ্যাডামসের প্রথম হিসাবটা একই ছবিতে দেখানো হয়েছে। মনে রাখতে হবে গ্যালে অ্যাডামসের কথা জানতেন না। দেখতে পাচ্ছি অ্যাডাম প্রথমে যে হিসেব দিয়েছিলেন সেটা নেপচুনের প্রকৃত অবস্থানের বেশ কাছাকাছি, কিন্তু ভেরিয়েরের হিসাবটা অবশ্যই আরও নিখুঁত। কিন্তু এও জানা গেছে যে অ্যাডামস পরবর্তীকালে যে হিসাব দিয়েছিলেন, সেটা অনেক বেশি ভুল ছিল। এয়ারি সেই কথাটা এড়িয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, অ্যাডামস প্রথম যে হিসাবটা দিয়েছিলেন, সেটা কেমন করে পেয়েছিলেন তা লেখার প্রয়োজন বোধ করেন নি – শুধু কতগুলো সংখ্যার উপর নির্ভর করে কোনো জ্যোতির্বিদই কাজ শুরু করতে রাজি হতেন না। এয়ারি যখন গণনার ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন, তখন অ্যাডামস কোনো উত্তর দেননি। লে ভেরিয়েরের গণনা এতই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে সেটা জার্মানি ও ইংল্যান্ড দুই দেশের জ্যোতির্বিদদের প্রভাবিত করেছিল। অ্যাডামস যে একই কাজ করেছেন, সে কথা এয়ারি লে ভেরিয়েরকে কখনো লেখেন নি – কাজেই তিনি আদৌ অ্যাডামসের কথায় বিশ্বাস করেছিলেন কিনা সে প্রশ্ন থেকে যায়। বাস্তবটা হল ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা নিজেদের দেশের লোকের কৃতিত্বকে অনেক বড় করে দেখিয়েছিলেন - তার জন্য সুবিধামতো কিছু তথ্য বেছেছিলেন ও কিছু বাদ দিয়েছিলেন। অর্থাৎ চালিস ও বিশেষত এয়ারি মোটেই অ্যাডামসকে অবজ্ঞা করেন নি, বরঞ্চ তাঁর যা স্বীকৃতি পাওনা তার থেকে অনেক বেশি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। সায়েন্টিফিক আমেরিকান পত্রিকার সেই প্রবন্ধের উপশিরোনাম ছিল ‘Did the British Steal Neptune?’ তাই এই প্রবন্ধে গ্রহ চুরি কথাটা বোধহয় খুব ভুল নয়। গ্রহটাকে চুরি না করলেও তার আবিষ্কারের কৃতিত্বটা চুরি নিশ্চয় হয়েছিল, এবং করেছিলেন ব্রিটেনের কয়েকজন বিজ্ঞানী।
এখানেই একটা কথা বলে রাখা ভালো। অ্যাডামস তো বটেই, এমনকি লে ভেরিয়েরও নেপচু্নের কক্ষপথ বা ভর যা বার করেছিলেন, তার সঙ্গে প্রকৃত মানের অনেকটাই পার্থক্য আছে। 1846 সালে কক্ষপথের ফারাকটা কমই ছিল, কিন্তু যদি জ্যোতির্বিদরা সেই সময়ে পর্যবেক্ষণ না করে কয়েক বছর দেরি করতেন, তাহলে তাঁরা হিসাবের সঙ্গে অনেকটাই তফাত পেতেন। সেটার কারণ অবশ্য পুরোটাই অঙ্কের ভুল নয়। ইউরেনাসের কক্ষপথ সম্পর্কে আমাদের পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু ত্রুটি ছিল, তার জন্যও অঙ্কে ভুল রয়ে গিয়েছিল।
উপরের ছবিদুটো গ্যালিলিওর নোট থেকে নেওয়া। ছবিতেই লেখা আছে প্রথম ছবিটা ডিসেম্বর 27, 1612 আর দ্বিতীয় ছবিটা হল পরের বছর জানুয়ারি মাসের 29 তারিখের।এই নোটদুটো গ্যালিলিওর বৃহস্পতি পর্যবক্ষণের। ছবিদুটোর মাঝখানে বড় গোলটা হল বৃহস্পতি, ছোট ছোট গোল দিয়ে গ্যালিলিও উপগ্রহগুলোর অবস্থান দেখিয়েছেন। ছবিতে বাঁদিকে ভাঙ্গা রেখা দিয়ে যে তারকাচিহ্নটি যুক্ত, এখন আমরা জানি যে সেটাই ছিল নেপচুন। গ্যালিলিও প্রথমে ওটাকে সাধারণ তারকাই ভেবেছিলেন নিশ্চয়, কিন্তু পরের ছবিতে দেখা যাচ্ছে যে সেই জ্যোতিষ্কটা যে একমাসের মধ্যে জায়গা পাল্টেছে সেটা গ্যালিলিও বুঝতে পেরেছিলেন। কেন তিনি তা প্রকাশ করেননি, তা অনুমানের বিষয়। এমন হতেই পারে যে সৌরজগতে যে আরও কোনো অজানা গ্রহ থাকতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন নি। মনে রাখতে হবে হার্শেল আরো সত্তর বছর পরে ইউরেনাস আবিষ্কার করেছিলেন। এ কথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে গ্যালিলিওর আগে কেউ নেপচুন দেখতে পাননি -- কারণ খালি চোখে তা সম্ভব নয়। গ্যালিলিওই প্রথম দূরবিন দিয়ে আকাশ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, এবং সেই সময় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দূরবিনটি ছিল গ্যালিলিওর কাছে, তিনি নিজের হাতে সেটা বানিয়েছিলেন।
এই লেখাটা প্রকাশিত হয়েছিল চার পর্বে বিবিধ ডট ইন অনলাইন ওয়েব ম্যাগাজিন কাম পোর্টালে। পর্বগুলোর লিঙ্ক ১, ২, ৩, ৪।