Thursday, 9 July 2020

বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার (২) - কেয়ার্ন্স


বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার 

(২)- কেয়ার্ন্স

শম্পা গাঙ্গুলী

এই লেখার আগের পর্ব সিডনি

পরদিন প্লেনে চেপে কেয়ার্ন্স। ঘণ্টা তিনেকের পথ। এয়ারপোর্ট থেকে একটা বড় গাড়িতে আমরা আটজনের দল লাগেজ সমেত ধরে গেলাম। ড্রাইভার পাঞ্জাবি। বেশ মিশুকে। হোটেল হাইডস আগে থেকেই অনলাইনে বুক করাই ছিল। এই অঞ্চলের সবচেয়ে পুরনো আর বড় হোটেল। তবে অনেকটা অংশ পরে বাড়ানো হয়েছে, আধুনিক ভাবে সাজানো সেই দিকটা। হোটেলটার মূল অংশটা অতি প্রাচীন, তৈরির সময় থেকে একই রকম রেখে সংরক্ষিত আছে---সাবেকি আমলের আসবাব ঐতিহ্য যেন আরও বাড়িয়েছে।

হাইডস হোটেল ও তার একতলায় আইরিশ পাব

কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের কেয়ার্ন্সের মূল আকর্ষণ দুটো। প্রথমটা হল পৃথিবী বিখ্যাত অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ। দ্বিতীয়টা হল অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বৃষ্টি অরণ্য। দুটোই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। কেয়ার্ন্সে আমরা তিনদিন ছিলাম। প্রথম রাতে আমার ঘুমই এলো না। দুটো কারণে। প্রথমত পরের দিন গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ দেখতে যাবার উত্তেজনায়। দ্বিতীয়ত, হোটেলে পুরানো অংশটায় আমি আর গৌতম ছিলাম, তার ঠিক নিচে একটা আইরিশ পাব, যেখানে কিছু বিদেশি ছেলেমেয়ের সারা রাত নাচ গান হৈ হল্লা আমার ঘুম কেড়ে নিয়েছিল।


পরদিন ‘রিফ ম্যাজিক’ ক্যাটামেরানে করে আমরা রওনা দেব প্রবাল প্রাচীর দর্শনে। টিকিট আমাদের অনেক আগেই কাটা ছিল।প্রত্যেকের টিকিটের দাম পড়েছিল দুশো ঊনচল্লিশ ডলার করে। এই ডলার হল অস্ট্রেলিয়ান ডলার, এর দাম তখন ছিল পঞ্চাশ টাকার একটু বেশি। ক্যাটামেরানে করে নানা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে সারাদিনের ঘোরা। উপকূলের কাছাকাছি ফ্রিঞ্জ রিফ এখন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। বিশ্ব উষ্ণায়নে সমুদ্র জলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং মানুষের অন্যান্য নানা ক্রিয়াকলাপ এর জন্য দায়ী। আমরা গেলাম আউটার ব্যারিয়ার রিফে। সকাল আটটায় মার্লিন জেটিতে পৌঁছলাম, ক্যাটামেরান ছেড়ে দিল নটায় ।



গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের পথে  
            

চারদিকের উন্মুক্ত প্রশান্ত মহাসাগরের গাঢ় নীল জলের শোভা উপভোগ করতে করতে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে আমরা আউটার ব্যারিয়ার রিফে মেরিন ওয়ার্ল্ড অ্যাক্টিভিটি প্লাটফর্মে পৌঁছলাম। জাহাজের দুলুনিতে বমি হবার আশঙ্কায় অনেকেই দেখলাম জাহাজের একতলার পেছনে গিয়ে ভিড় করেছে। গৌতম ছাড়া আমাদের মধ্যে আর কারোর এমন অসুবিধা হয়নি। জাহাজের দোতলার ডেকে একজন মাঝবয়সী মহিলার সঙ্গে আলাপ হল। ব্যাঙ্গালোরে থাকেন। আমাদের দলের কেউ প্রবাল প্রাচীর দেখতে জলে নামব কিনা জানতে চাইলেন। আমার আগ্রহ ছিল। কিন্তু সাঁতার জানি না বিন্দুমাত্র। বারাসাতে বাবার বসত বাড়ির কাছে পাইওনিয়রের সানবাঁধানো পুকুরে বাবা আমার ছোটবেলায় গ্রীষ্মের বা পুজোর ছুটিতে নিয়ে গেলে বেশ কয়েক বার প্রয়াস চলেছে আমাকে সাঁতার শেখানোর। কোমরে গামছা বেঁধে বা কলার ভেলায় বা টায়ারে করে ভাসিয়ে। কিন্তু বাঁধানো পাড় আঁকড়ে কোমর জলে পা ছোঁড়ার বেশি এগোয়নি। সেই আমি কোন সাহসে বলুন তো প্রশান্ত মহাসাগরে ঝাঁপ দেব!

ব্যাঙ্গালোরের মহিলা মোটামুটি সাঁতার জানেন। তাঁর আমেরিকাবাসী ছেলে বলে দিয়েছেন যে অস্ট্রেলিয়া গেলে গ্রেট ব্যারিয়ারে স্কুবা ডাইভিং-এর সাহস না হলেও অবশ্যই অন্তত যেন স্নুবা ডাইভিং করেন। নইলে জীবন বৃথা। উনি বললেন সাঁতার না জানলেও অল্প সময়ের ট্রেনিং নিয়ে গাইডের সাহায্যে স্নুবা ডাইভিং করা যায়। শুনে আমার উৎসাহ বাড়ল। ভাবলাম জীবনে দ্বিতীয়বার তো প্রবাল প্রাচীরের কাছাকাছি আসব না। সাবমারসিবলের গ্লাস বটম বোটে করে প্রবাল দেখব তার একটু পরেই। কিন্তু জলে নেমে প্রবালদের ছুঁতে তো পারব না! আন্দামানে স্নরকেলিং করেছিলাম। তাতে তো মাথাটা জলের সামান্য নিচে রেখে প্রবাল দেখা। খানিক দোলাচলের পর সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম। গৌতম তো আশাই করেনি। আমার অ্যাডভেঞ্চার প্রীতি দেখে ও ঘাবড়ে গেল। আমাদের দলে গৌতমই একমাত্র সাঁতার জানে। তাই স্কুবা করবে ভেবেছিল। সেখানে পিঠে অক্সিজেন সিলিন্ডার বেঁধে জলের তলায় নিজের মত ঘুরে ঘুরে সবকিছু দেখা যায়। কিন্তু আমি স্নুবা করব শুনে ও ওর সিদ্ধান্ত বদল করল---আমার সঙ্গেই থাকবে। স্নুবার খরচ মাথা পিছু একশ পঁচিশ ডলার। আমরা আধঘণ্টার একটা ট্রেনিং নিলাম। জানলাম স্নুবা হল স্কুবা ডাইভিং আর স্নরকেলিং এর মাঝামাঝি। অর্থাৎ গাইড আমাদের জলের প্রায় পনের ফিট তলায় নামাবে। মুখে মাস্ক পরানো থাকবে। মাস্কের লাগোয়া লম্বা পাইপের মাধ্যমে জলের তলায় আমাদের মাছেদের মত সাঁতার আর শ্বাস প্রশ্বাস চালাতে হবে। কোন কারণে মাস্ক খুলে গেলে বিপদ সংকেত দেখালে গাইড জলের ওপরে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।পায়ে মাছেদের মত ফিন মানে পাখনা আর গায়ে ওদের দেওয়া ওয়েট স্যুট পরতে হবে।


সব প্রস্তুতি সেরে আমাদের গাইড টমাসের হাত ধরে এবার জলে নিমজ্জন। জলের তলায় যত নামছি সে যে কী অনুভূতি আমি কথায় বর্ণনা দিতে পারব না। আমাদের দুজনের মাঝখানে গাইড। চারপাশে ছোট বড় নানান মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। বেশ কিছুটা নামার পর গাইড আমাদের হাত ছেড়ে দিল। পায়ের তলায় দেখি প্রবালের ঢিবি। আমার তো ভয় পাবার কথা। কিন্তু ভয়ের বদলে শরীরে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ অনুভূত হল। গৌতম আমার হাত শক্ত করে ধরল। পায়ের পাতার লম্বা পাখনা নাড়িয়ে আমরা সমুদ্রের তলায় মাছেদের মত শ্বাস নিতে নিতে নানান রং বেরঙের মাছেদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। যেন কোন খেয়ালি শিল্পীর তুলির টানে নানা উজ্জ্বল জীবন্ত জল-প্রজাপতি! আর পায়ের নিচে চারিপাশে এক আশ্চর্য স্বপ্নের ফুল বাগান সাজিয়ে তুলেছে নানা আকার ও রঙের প্রবাল। গৌতম পাথুরে প্রবালের ওপর দাঁড়াল। কলকাতা থেকে সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের তলায় পৃথিবী বিখ্যাত প্রবাল প্রাচীর ছুঁল। আমিও। খুব সাবধানে! চারপাশে জীবন্ত প্রবালের জলে দোল খাওয়া রাশি রাশি সূক্ষ্ম শুঁড়ের অনুভূতি এড়িয়ে পাথুরে কঙ্কালে। মনে নীল আর্মস্ট্রং-এর অনুভূতি। হঠাৎ বিপত্তি। পায়ের নীচে জীবন্ত প্রবাল আর পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া একটা অদ্ভুত প্রজাতির মাছ দেখতে গিয়ে আমার মুখের মাস্ক গেল সরে। অনেকটা নোনা জল খেলাম। সাহায্যের জন্য টমাসকে ইশারা করতেই সে হাজির। তাড়াতাড়ি জলের ওপর নিয়ে গেল। জলের ওপর কিছুক্ষণ ভেসে থেকে আবার নামলাম। কী ভীষণ উত্তেজনা! জলের তলায় টমাসের সঙ্গে আমাদের দুজনের বেশ কয়েকটা ছবিও তুলে নিল রিফ ম্যাজিকের ফটোগ্রাফার।

গাইডের সাথে সমুদ্রতলে গৌতম ও আমি

এর মধ্যে আরেক বিপত্তি। জলের তলায় তো কথা বলা যায় না, তাই হাতের সঙ্কেতের সাহায্যে কাজ চালাতে হয়, সেগুলো আমাদের আগে বলে দিয়েছিল। সমুদ্রের তলায় আমরা যখন নানা অজানা অনুভূতি আর অভিজ্ঞতায় বিভোর-- গৌতমকে টমাস জিজ্ঞাসা করেছিল কেমন লাগছে। ফেসবুকের বুড়ো আঙুল তোলা লাইক চিহ্নের সঙ্গে সকলেই পরিচিত। গৌতম তাই দেখাল, ভুলে গিয়েছিল যে জলের তলায় ওই সঙ্কেতের মানে আমি উপরে যেতে চাই, টমাস সোজা গৌতমের আপত্তি অগ্রাহ্য করে ওকে টেনে উপরে তুলে দিল। আবার সেখান থেকে টমাসকে কথায় বুঝিয়ে নিচে নামা।

গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রবাল প্রাচীর। প্রায় তিন হাজার আলাদা আলাদা রিফ নিয়ে এই প্রাচীর তৈরি। অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের কুইন্সল্যান্ড রাজ্যের উপকূল ঘেঁসে এই কোরাল সাগর। প্রবাল পলিপস নামে এক ক্ষুদ্র জলজ জীবের শরীরের নীচের অংশ থেকে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসৃত হয়ে জমাট বেঁধে স্টোন কোরাল বা পাথুরে প্রবালের কঙ্কাল তৈরি করে। এই ভাবে প্রায় দু কোটি বছর আগে থেকে এই অঞ্চলে সমুদ্রের তলায় কোটি কোটি পলিপস উপনিবেশ গড়ে তুলেছে। মৃত কঙ্কাল রাজ্যের উপর জীবিত উপনিবেশ বেড়েই চলেছে। মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর যে কটা উল্লেখযোগ্য বস্তু দৃশ্যমান তার মধ্যে গ্রেট ব্যারিয়াব রিফ অন্যতম।এখানে অনেক রকমের প্রজাতির অস্তিত্ব আছে। ১৯৮১ সালে এটাকে বিশ্ব হেরিটেজ সাইটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এর দেখভাল করে অস্ট্রেলিয়ান মেরিন পার্ক অথরিটি।

কিন্তু ঐতিহ্যবাহী প্রবাল প্রাচীর ‘গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে’র স্বাস্থ্য বর্তমানে গভীর সঙ্কটে। সরকারের সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, এই রিফের অবস্থা ‘খারাপ’ থেকে ‘আরও খারাপ’ হয়ে গিয়েছে। গবেষকদের কথায়, ‘প্রবাল প্রাচীর বাঁচানোর কাজ এতটা কঠিন কখনো ছিল না’। এর জন্য দায়ী করা হয়েছে মানুষের কর্মকাণ্ড এবং তার জেরে বেড়ে চলা বিশ্বের তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে। ২৩০০ কিলোমিটার বিস্তৃত এই প্রাচীরে নতুন প্রবাল তৈরি প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গিয়েছে। যেগুলি আছে, তার অবস্থাও বেশ খারাপ। অস্ট্রেলিয়ার আইন অনুযায়ী, পাঁচ বছর অন্তর এই গ্রেট রিফের স্বাস্থ্য নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করতে হয়। ২০০৯ সালে প্রকাশিত প্রথম রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, ‘এটি যে পরিস্থিতিতে রয়েছে তাতে ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে’। ২০১৪-র রিপোর্টে প্রথম বিপদের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। ২০১৯-এর রিপোর্টে তো চরম বার্তা দিয়ে দিল। গবেষকদের মতে, সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে। সে সময়ে এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যায় সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা। যার জেরে প্রবাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, একে কেন্দ্র করে বেঁচে থাকা প্রাণীকুলও বিপদে পড়ে।


জলের তলার নানা ছবি

প্রবাল প্রাচীরের এই সঙ্কটের জন্য পরিবেশবিদদের অনেকে অস্ট্রেলিয়া সরকারের উদাসীনতাকে দায়ী করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দশ বছর সময় পেয়েও কোনও সদর্থক পদক্ষেপ করতে পারেনি সরকার। প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিষয়টা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে দরবার করতে পারতেন। গ্রিনহাউজ গ্যাসের নির্গমন কমাতে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে পারতেন। কিন্তু বিষয়টা গুরুত্ব না দেওয়ায় ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। আমাদের জাহাজের একটা দল নানা ভিডিও, ছবির  মাধ্যমে এই সঙ্কট বোঝালেন। দিনে দিনে পৃথিবী গরম হওয়ার জন্য সমুদ্রের জল গরম হচ্ছে, লবণের পরিমাণ বাড়ছে। কোথাও আবার বরফ গলা জলে জলতল বেড়ে পাড় ধুয়ে প্রবাল নষ্ট করছে। ঝড় এবং দূষণ বাড়ছে, উষ্ণ সমুদ্রস্রোত এল নিনো আসছে আরো ঘনঘন। পরিবেশের এরকম বেয়াড়া রকমের পরিবর্তন প্রবাল প্রাচীর নষ্ট করছে। বিশেষত উপকূল সংলগ্ন ফ্রিঞ্জ কোরাল প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। উষ্ণায়নের জন্য কোরাল ব্লিচিং এর কথাও জানলাম। প্রবাল পলিপসের কোশে zooxanthellae নামক এক ধরনের মিথোজীবী এককোশী জীব থাকে যারা সূর্যের আলোয় সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে ও প্রবালের পলিপদের প্রায় নব্বই শতাংশ শক্তি যোগায়। কিন্তু উষ্ণতা বাড়লে এই শক্তিদায়ী  zooxanthellae কোরাল থেকে বেরিয়ে যায়। একেই বলে কোরাল ব্লিচিং

তারপর অন্য একটা ভয়ের কথা শুনলাম। প্রবালদের জীবন যাপন এবং বংশ বৃদ্ধি বিপন্ন করে তুলেছ এক ধরনের কাঁটাওয়ালা বিশাল তারামাছ --- যাদের নাম Crown of thorns starfish. উপক্রান্তীয় সমুদ্রের উপকূলে এরা ঘন বসতি গড়ে তুলছে। চট করে মনে পড়ে গেল প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে লেখা প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘কাঁটা’ গল্পটা। বিষাক্ত এই তারামাছের কবলে পড়ে কিভাবে প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেই ঘনাদার ঐ গল্পের সূচনা। প্রশান্ত মহাসাগরের এই ভয়ঙ্কর অ্যাকান্থ্যাস্টার প্লানচি-যার আরেক নাম ‘কাঁটার মুকুট’---তার প্রভাবে প্যাসিফিক একেবারে ডেড সি হয়ে যেত, যদি না ঘনাদা ক্যারোলিন দ্বীপপুঞ্জের ইফালিক অ্যাটলে এক দুর্ধর্ষ অভিযানে গিয়ে টাইটন চোরাচালানদের ধরতেন। মাপ করবেন, আমি গল্পের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম। কিন্তু অত দিন আগেও প্রেমেন্দ্র মিত্র যে আশঙ্কার কথা বলেছিলেন, তার বৈজ্ঞানিক সত্যতা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই। হাত দেড়েক চওড়া এই তারা মাছের ষোল থেকে একুশটা পর্যন্ত বাহু হয়। সমস্তটাই সাংঘাতিক কাঁটায় ভরা। সে কাঁটায়  এমন বিষ থাকে যা গায়ে ফুটলে শরীর অসাড় হয়ে যায়। রক্তবীজের মত এ অভিশাপের বংশ বৃদ্ধি ঘটছে, এ কাঁটার মুকুটের খিদে এমন রাক্ষুসে যে এদের একটা ঝাঁক মাসে আধ মাইল প্রবাল প্রাচীর সাফ করে ফেলতে পারে, আর করছেও তাই। ট্রাইটন শামুক তারই যম। শৈশবেই অ্যাকান্থ্যাস্টার প্লানচি খেয়ে ফেলে তাদের বংশ বৃদ্ধি করতে দেয় না। তারা এই কাঁটায় ভরা তারা মাছেদের গন্ধ পেয়ে তাদের দিকে চলে যায়। উল্টোদিকে এ অ্যাকান্থ্যাস্টার প্লানচিও এদের গন্ধ পেয়ে দূরে পালাতে চায়। মুশকিল হচ্ছে এই ট্রাইটন শামুক সত্যিই লুপ্তপ্রায়, কিন্তু বিরল নয়। গবেষণা করে প্রবাল প্রাচীর অঞ্চলে এদের প্রজনন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

জল থেকে উঠে দেখি ঝুলন আর মুনু স্নরকেলিং করছে। গৌতমও গেল সেদিকে। আমরা জাহাজে রাজকীয় লাঞ্চ সারলাম। অনেক ধরনের কাঁচা মাছ খেলাম। সুশি। বমির ভয়ে গৌতম বিশেষ কিছু খেল না। দুপুরে সাবমারসিবল ও গ্লাসবটম বোটে করে আরও দূরের সমুদ্রের তলার প্রবালদের আর রঙিন মাছেদের রাজ্যে গেলাম। মন ভরে উঠল। অ্যাক্টিভিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ওরা বিভিন্ন মাছেদেরও খাবার দিল। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ জড়ো হচ্ছিল। ওয়ালি নামে ওদের একটা বিরাট প্রায় পোষা মাছ নানা রকমের খেলা দেখাচ্ছিল পর্যটকদের। বিকেলে ফেরার সময় দেখি জলের তলায় পর্যটকদের যে সব ছবি ওরা তুলেছিল তার ব্লুপ্রিন্ট ডিসপ্লেতে রেখেছে। স্কুবা বা স্নুবা যারা করেছিল তারা প্রায় সবাই কিনছে। আমিও আমাদের জলের তলার ছবিগুলোর একটা কিনে নিলাম চড়া দামে, পঁচিশ ডলার দিয়ে---পর্যটক হিসাবে অমূল্য স্মৃতির মূল্য দিতে।

ওয়ালি - মেরিন ওয়ার্ল্ডের  পোষা মাছ

পরদিন যাব কেয়ার্ন্সের দ্বিতীয় আকর্ষণ, কুরান্ডার জঙ্গলে। কেয়ার্ন্স শহর থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে একেবারে উত্তর কুইন্সল্যান্ডে। কুরান্ডা হেরিটেজ ট্রেনে আমাদের টিকিট অনেকদিন আগেই কাটা ছিল। ঐতিহ্যশালী এই ট্রেনে চাপার আগে তাই স্মৃতির আখর হল নিজেদের তোলা অসংখ্য ছবি। সমুদ্রতল থেকে প্রায় চারশো মিটার উঁচুতে পাহাড় ঘেরা ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য। প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুসন্ধান হদিশ দেয়, ইউরোপীয় উপনিবেশ গড়ে ওঠার আগে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার আদিম মানুষের কাছে অঞ্চলটা ছিল প্ল্যাটিপাসের দেশ। প্ল্যাটিপাস হল একিডনা ছাড়া একমাত্র স্তন্যপায়ী যারা ডিম পাড়ে। অস্ট্রেলিয়ারা  আদিবাসীদের গল্পে আছে  উভচর প্রাণী হংস-চঞ্চু অর্থাৎ প্ল্যাটিপাসের জন্ম হয়েছিল বাইলারগুন আর ডারুর মিলনে। বাইলারগুন হল র‍্যাকালি, অর্থাৎ জলের ইঁদুর। সে ডারু হাঁসকে পছন্দ করে বউ করে এনেছিল। ২০০০ সালের সিডনি অলিম্পিকের একটা ম্যাসকট ছিল এই প্ল্যাটিপাস। তাছাড়া এরা আছে অস্ট্রেলিয়ার মুদ্রায়, স্ট্যাম্পে, গানে।

কুরান্ডা হল অস্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসীদের গ্রাম। এই মহাদেশে এদের বলে অ্যাবরিজিনাল পিপল। অন্য অনেক দেশের মতোই এখানেও আদি অধিবাসীরা পরবর্তীকালে আসা ইউরোপীয়দের চাপে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে মানুষের পা প্রথম কবে পড়েছিল, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ধারণা করা হয় পঞ্চাশ হাজার থেকে এক লাখ বছর আগে আধুনিক মানুষ এই মহাদেশের মূল ভূখণ্ডে পা রেখেছিল। মানবজাতির জন্মস্থান হল আফ্রিকা মহাদেশ। বিজ্ঞানীরা মনে করেন সেখান থেকে বেশ কয়েকবার মাইগ্রেশন বা পরিযানের ফলে সারা পৃথিবীতে মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে। আধুনিক মানুষ অর্থাৎ হোমো স্যাপিয়েন্সেরও মাইগ্রেশনের একাধিক ঢেউ আসে। তার প্রথমটির একটা অংশ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে ভারতে এসেছিল। তাদেরই বংশধররা আবার বর্তমান মায়ানমার হয়ে মালয় উপদ্বীপের রাস্তা ধরে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপে বসতি স্থাপন করে। অবশ্যই তখন দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা মানুষের ক্ষমতার বাইরে, কিন্তু দ্বীপ থেকে দ্বীপে ক্যানোজাতীয় নৌকার মারফত যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া তুষার যুগের সময় সমুদ্রতল ছিল আরো নিচে, ফলে দ্বীপগুলোর মধ্যে দূরত্ব ছিল আজকের থেকে কম। এভাবেই নৌকাতে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপ থেকে অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছেছিল মানুষ। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ দিকে রয়েছে বৃহৎ দ্বীপ তাসমানিয়া। চল্লিশ হাজার বছর আগে তুষার যুগে সেও মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ল্যান্ডব্রিজ বা ভূমি-সেতু দিয়ে যুক্ত ছিল। যেমন সেই সময় শ্রীলঙ্কাও একই রকম ভাবে জোড়া ছিল ভারতের সঙ্গে। অস্ট্রেলিয়া থেকে ভূমি-সেতু ধরে তাসমানিয়াতে পৌঁছেছিল আধুনিক মানুষ।

       আধুনিক কালে জেনেটিক বিশ্লেষণ প্রত্নতত্ত্ববিদদের এই সমস্ত প্রকল্পের পক্ষে জোরালো সমর্থন জুগিয়েছে। আমাদের দেহকোশে দুই জায়গায় ডিএনএ আছে, নিউক্লিয়াসে ও মাইটোকনড্রিয়াতে। নিউক্লিয়াসের ডিএনএ-র অর্ধেক আসে বাবার দেহ থেকে, অর্ধেক যোগায় মায়ের ডিম্বাণু। তাই প্রতি প্রজন্মে সেই ডিএনএ-র জিনবিন্যাসে পরিবর্তন হয়। মাইটোকনড্রিয়ার ডিএনএর উৎস শুধুই ডিম্বাণু, তাই মায়ের থেকে সন্তানের দেহকোশে তা অপরিবর্তিতভাবে সঞ্চালিত হয়। বংশ পরম্পরাতে তার কোনো পরিবর্তন হয় না। এ জন্য একমাত্র মাইটোকন্ড্রিয়ার ডিএনএ বিশ্লেষণ করেই আধুনিক মানুষের জন্মস্থান যে আফ্রিকা তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের সকলের সেই আদি মাতার নাম দেওয়া হয়েছে লুসি,  তার মাইটোকনড্রিয়ার ডিএনএ আমরা সবাই বহন করছি। ফিলিপাইন্স, ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার অধিবাসীদের ও অ্যাবরিজিন পিপলদের মাইটোকনড্রিয়ার তুলনা করেই বোঝা সম্ভব হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার আদি অধিবাসীরা কতদিন আগে মূল জনগোষ্ঠীর থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

 মনে প্রশ্ন জাগে যে অস্ট্রেলিয়াতে মানুষের পদার্পণ কি নিছকই দুর্ঘটনা? এমন কি হয়েছিল যে মাছ ধরতে বেরিয়ে কয়েকটা নৌকা ঝড়ের দাপটে অস্ট্রেলিয়া গিয়ে পৌঁছেছিল, আর ফিরতে পারেনি? তারাই কি অস্ট্রেলিয়ার সব আদি অধিবাসীদের পূর্বপুরুষ? জেনেটিক ভেরিয়েশন বিশ্লেষণ করে বোঝা গেছে যে তা নয়। যে আদি গোষ্ঠী থেকে সমস্ত অ্যাবরিজিনদের জন্ম, তাদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল অন্তত একহাজার। তার সঙ্গে পুরুষদের সংখ্যাটাও যোগ করতে হবে। এতজন মানুষ নিশ্চয় আকস্মিকভাবে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে ওঠেনি, তার জন্য প্রয়োজন হয়েছিল পরিকল্পনার।

আদি অধিবাসীরা ছিল মূলত হান্টার-গ্যাদারার অর্থাৎ শিকারী-সংগ্রহকারী। ছোট ছোট অনেক গোষ্ঠীতে তারা বিভক্ত ছিল। তারা ছিল যাযাবর বা আধা যাযাবর। আদি গোষ্ঠী ‘জ্যাবুগে’রা কুরান্ডাতে বাস করছে প্রায় দশ হাজার বছর। পশু শিকার করে আর মাছ ধরে বছরের পর বছর দিব্যি তাদের চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সোনার ও টিনের খনির সন্ধান শ্বেতাঙ্গদের টেনে আনল এই গহন বনে। ১৮৮৬ সালে কেয়ার্ন্স থেকে হার্বারটন অবধি রেলপথ তৈরির কাজ শুরু হল, কাজে লেগেছিল  প্রায় পনেরোশো শ্রমিক। শ্বেতাঙ্গদের অনুপ্রবেশের আগে জ্যাবুগেরা সংখ্যায় প্রায় চার-পাঁচ হাজার ছিল, কিন্তু তথাকথিত সভ্য মানুষদের সাথে তাদের অস্তিত্বের লড়াই শুরু হওয়ার পর তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা তছনছ হয়ে গেল। ১৮৯০ সালের মাঝামাঝি স্পীওয়া হত্যাকাণ্ড তার সাক্ষী। তারা সংখ্যায় কমতে লাগল। ১৮৯৬ সাল থেকে এখানে পাহাড়ের গায়ে কফি চাষ শুরু করল ইউরোপিয়ানরা। সেখানে শ্রমিক হিসাবে কাজ জুটল আদি অধিবাসীরদের। তিন প্রজন্ম ধরে শ্বেতাঙ্গদের আধিপত্য এদের ভিটেমাটির জন্য লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করেছে। জীবন যাপন, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক বন্ধন সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। তাদের এই দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে ১৯৯৩ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার ওই অঞ্চলে ‘জ্যাবুগে’ সম্প্রদায়ের কিছু অধিকার স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের নিজেদের ঐতিহ্য বজায় রেখে চিরাচরিত পদ্ধতিতে জীবন যাপনের অধিকার তাদের থাকবে।বব্যারন গিরিখাত বামা পরিকল্পনা তারা ২০১৮ সালে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। সেটা মানা হলে এই সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের লড়াইটা কিছুটা সুনিশ্চিত হবে, বিলুপ্তি কিছুদিনের জন্য হলেও পিছোবে।

ঐতিহ্যবাহী কুরান্ডা রেলে ভ্রমণের স্মৃতি          

সেইসব লড়াকু মানুষদের গ্রাম কুরান্ডাতে যাচ্ছি ভেবে বেশ রোমাঞ্চ হতে লাগল ট্রেনে উঠেই। ট্রেনটার ভিতরে  নানান ছবি এই অঞ্চলের ইতিহাসকে তুলে ধরেছিল। একই সঙ্গে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ছিল সেই যুগের বর্ণনা আমাদের সফরকে আরো সমৃদ্ধ করেছিল।  জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেনযাত্রার সুযোগ আগেও হয়েছে, তবে এত দীর্ঘ নয়। ব্যারন জলপ্রপাতের স্টেশনে ট্রেন বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ালো। আমরা সবাই ট্রেন থেকে নেমে পায়ে-চলা ব্রিজে উঠে আরও খানিকটা পথ জঙ্গলের ওপর দিয়ে পেরিয়ে ব্যারন গিরিখাতের বেশ কাছাকাছি পৌঁছলাম। চারপাশে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের শোভা, ব্যারন নদীর জলপ্রপাতও চমৎকার! তবে হিমালয়ের রূপের বৈচিত্র্যের সঙ্গে এর তুলনা চলে না।

ব্যারন জলপ্রপাত      

কুমীরের মাংসের সসেজ

জঙ্গল আর পাহাড়ের বুক চিরে প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রেন যাত্রার পর আমরা কুরান্ডা গ্রামে ঢুকলাম। খুব হতাশ হলাম। কোনো আদিবাসী গ্রামের লেশমাত্র নেই। একজন আদিবাসী দেখলাম মাটিতে বসে ডিজেরিডু বাজাচ্ছে, তার সারা গায়ে নানা রঙের আঁকিবুঁকি কাটা। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরানো এই বাদ্যযন্ত্র ইউক্যালিপটাস গাছের কাণ্ড দিয়ে তৈরি হয়। উই পোকায় খাওয়া ফাঁপা কাণ্ড আদি অধিবাসীরা বনের মধ্যে খুঁজে বেড়ায়। কাণ্ডের ভেতরটা পুরো ফাঁকা করে বিশাল বাঁশির মত এই যন্ত্র এরা তৈরি করে, বাঁশির মত করেই বাজায়। কিন্তু ঐ একজন ছাড়া আর কোনো আদিবাসী আমাদের চোখে পড়ল না। চারদিকে কারুশিল্প কলা, আর্ট গ্যালারি, মনিহারি দোকান বাজার আর রেস্তরাঁ চড়া দামে পসরা সাজিয়ে পর্যটকদের ঠকাচ্ছে। আমি খুব মুষড়ে পড়লাম। এত টাকা খরচ করে এই দেখার আশায় নিশ্চয়ই আসিনি। আর আসার পথের প্রকৃতি খুবই সুন্দর ঠিকই। কিন্তু সুউচ্চ হিমালয় তার কোণায় কোণায় আপন খেয়ালে এর চেয়ে ঢের বেশি সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে সেজে থাকে সারা বছর। আমি আর ঝুলন সুন্দরভাবে সাজানো একটা পার্কে বসে সুখ-দুঃখের গল্পে মাতলাম। আমাদের খিদে নেই জেনে অন্যরা খুঁজে খুঁজে একটা জার্মান দোকানে গিয়ে কুমীর আর এমু পাখির মাংস দিয়ে লাঞ্চ সারল।



গৌতমের তোলা প্রজাপতির ছবি

দক্ষিণ গোলার্ধের সবচেয়ে বড় প্রজাপতির সংরক্ষণশালা কুরান্ডাতে। সেখানে প্রায় পনেরশো ধরণের ক্রান্তীয় প্রজাপতির বাস। তাদের প্রজনন পরীক্ষাগারেও বহু প্রজাতির প্রজাপতির গুটিপোকা থেকে প্রজাপতি হবার বিভিন্ন পর্যায়গুলো দেখার মত। সব জেনেও আমার ওখানে ঢুকতে মন চাইল না। কুরান্ডা গ্রাম নিয়ে মনের হতাশাটা কিছুতেই কাটছিল না। ভাবলাম ব্যাঙ্গালোরে আমার দেখা প্রজাপতি সংরক্ষণশালার থেকে এখানে বেশি কিছু পাব না, তাই ঐ স্মৃতিটাই ঝালাতে লাগলাম। আধ ঘণ্টা পর আমাদের দলের বাকিরা যখন বাইরে বেরিয়ে এলো, আলাদা কোন তৃপ্তির ছাপ ওদের চোখে মুখে পেলাম না। একমাত্র ঝুলনের গায়ে দু দু’বার প্রজাপতি বসেছিল বলে অনির্বাণকে একটু চিন্তিত দেখলাম। ওখানে ‘বার্ড ওয়ার্ল্ড’ নামে পাখির একটা সংরক্ষণশালাও ছিল। তাতে নাকি সাড়ে তিনশোর বেশি রকমের বিরল প্রজাতির পাখি উড়ে বেড়ায়। আমাজন অরণ্যের বিখ্যাত ম্যাকাও আছে। ক্যাসুয়েরি, লরিকিট, কাকাতুয়াও হাজির। কিন্তু ঢোকার ফি এক একজনের সাড়ে উনিশ ডলার। একটু আগেই চোদ্দ ডলার করে প্রজাপতি দেখেছে সবাই। তাছাড়া মেলবোর্নে গিয়ে আমাদের একটা চিড়িয়াখানা দেখার পরিকল্পনা আছে। তাই ওখান থেকে ফেরার জন্য তৈরি হলাম।

স্কাইরেল

ফেরাটার জন্য উত্তেজনা ছিল সকলেরই। কুরান্ডাতে যাওয়াটা ঐতিহ্যশালী ট্রেনে হলেও ফেরাটা রেখেছিলাম আকাশপথে, পরিবেশ-বান্ধব স্কাইরেলে। বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গিয়ে বেশ কয়েকবার রোপওয়েতে চড়েছি, কিন্তু এ অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বের প্রাচীনতম এক গভীর ঘন ক্রান্তীয় বৃষ্টি অরণ্য--- যেখানে গা ছমছম করা পরিবেশে পুরানো কোনো কোনো গাছ হাজার হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রায় দুশো ফুট উচ্চতায় মাথা তুলে নানা বিবর্তনের ইতিহাসের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে, প্রকৃতির নানা জীবকে বংশানুক্রমে বাঁচিয়ে রেখেছে---তেমন এক অরণ্যের মাথার ওপর দিয়ে দেড় ঘণ্টা সময় ধরে সাড়ে সাত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করা! খুব কম মানুষের কপালে এমন বিরল অভিজ্ঞতা জোটে। স্কাইরেলের কুরান্ডা স্টেশনে গন্ডোলা কেবল কারে ছজন করে বসার জায়গা। আমরা দলে আট। আমি আর গৌতম বাদে অন্যরা একটা কাঁচ দিয়ে ঘেরা গন্ডোলাতে চাপল। আমরা তার পরেরটায়। আমাদের সঙ্গে এক প্রবীণ ইংরেজ দম্পতি। স্মিথফিল্ড হল শেষ স্টেশন। মাঝপথে পাঁচশ পঁয়তাল্লিশ মিটার উচ্চতায় রেড পিক স্টেশনে নেমে কেবল কার পরিবর্তন করতে হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা চারজন সঙ্গী। নিচের বিস্তীর্ণ অরণ্যের মহীরুহের নিবিড় বনভূমি, গিরিমালা, নদী, দ্বীপ--- সব যেন স্বপ্নের জগৎ। বিশাল বিশাল লতাগুল্ম বড় বড় গাছগুলোকে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে রেখেছে, মাথায় চাঁদোয়ার মতো হয়ে কোনো কোনো জায়গায় বনের তলার দিকটা অন্ধকার করে দিয়েছে। অনেক নিচে পাহাড়ের খাদ, সাত-আটশো ফুট নিচে তো হবেই। গিরিখাতের ওপর দিয়ে যাবার সময় গন্ডোলাটা দুরন্ত হাওয়ায় ভয়ানক দুলছিল। ঘূর্ণির প্রবাহে মাঝে মাঝে থমকে যাচ্ছিল আমাদের আকাশযান। বুঝি বিকল হল ভেবে আমাদের হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে যাবার জোগাড়।

আমাদের উল্টো দিকের ইংরেজ মহিলা অসম্ভব ভীতু। হাবভাব দেখে মনে হল তিনি জীবনের আসন্ন অন্তিম সময়ের প্রহর গুনছেন। সাহেবকে জড়িয়ে ধরে  ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে প্রশ্ন করলেন-‘Listen Thomas, why did you bring me here? If it falls whether it will fall over the canopy or on the ground?’


চিন্তান্বিত টমাস

 

অনেক উঁচু উঁচু গাছের মাথায় মাথায় এক অদ্ভুত ধরনের বিশাল পাখির বাসা দেখতে পেলাম। সরু লম্বা সাদা সাদা চাঁছা কাঠের তৈরি বড় বড় চুবড়ির মত দেখতে। রেড পিক স্টেশনে কেবল কার পাল্টাতে নামলাম। সেখানে আশপাশের ঘন বনের ভেতর দিয়ে ঝুলন্ত ব্রিজের ওপর দিয়ে আমরা অনেকটা পথ হাঁটলাম। চারদিকের নিস্তব্ধতায় আদিম গা ছমছমে অনুভূতি। রেড পিক থেকে ফেরার সময়ে সেই দম্পতিকে দেখি স্টেশনের তলায় হলঘরে বসে কী সব আলোচনা করছেন। কে জানে? আকাশপথ থেকে বনপথই হয়ত ঐ ইংরেজ মহিলার কাছে বেশি নিরাপদ। ফিরবেন নিশ্চয়ই! কিন্তু কী ভাবে? স্মিথফিল্ড স্টেশন অবধি বাকি পথটাও ফিরলাম ঐরকম শ্বাসরোধ করা অভিজ্ঞতায়। গন্ডোলা থেকে  দূরের নীল সমুদ্রকে দেখতে পাওয়াটা ছিল আমাদের বাড়তি পাওনা।


স্কাইরেল থেকে তোলা ছবি

কেয়ার্ন্সে গিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তলার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে প্রবাল দেখা আর তার পরের দিনই ক্রান্তীয় গভীর অরণ্যের দুশো আড়াইশো ফিট বৃক্ষরাজির ওপর দিয়ে আকাশপথে গন্ডোলায় ভ্রমণ, দুটোই আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। সেদিন রাতেও হোটেলের তলার আইরিশ পাব আমাকে ঘুমাতে দিল না। পরদিন মেলবোর্ন যাব। প্লেন সকাল সওয়া ছটায়। অনির্বাণের তাড়ায় আমরা অনেক আগে এয়ারপোর্টে ঢুকলাম। মেলবোর্নে আমাদের জন্য গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে ঐন্দ্রিলা আর ইন্দ্রনীলদা। (ক্রমশ)

প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, মার্চ, ২০২০

এই লেকার পরের পর্ব

বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার - ফিলিপ আইল্যান্ড ও মেলবোর্ন (১)

বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার (শেষ পর্ব)



অতিমারী – কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞান

অতিমারী – কুসংস্কার নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞান

গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

       বর্তমানে আমরা এক অতিমারীর ছায়াতে বাস করছি, পৃথিবীর প্রায় কোনো মানুষের এই রকম অভিজ্ঞতা নেই। একই মাত্রার রোগের কথা জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে এক শতাব্দী – সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটা নিশ্চিত যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্বে স্প্যানিশ ফ্লু কমপক্ষে দেড় কোটি লোকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, আসল সংখ্যাটা এর তিনগুণও হতে পারে। অনুমান করা হয় পৃথিবীর প্রতি তিন জন মানুষের এক জন এই রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারও আগে ব্ল্যাক ডেথ প্লেগের জন্য মধ্যযুগে ইউরোপের অর্ধেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। বিউবোনিক প্লেগ, বসন্ত বা কলেরার কথাও সকলেরই জানা।

       মহামারী শব্দটার সঙ্গে সবাই পরিচিত ছিলাম, অতিমারী শব্দটা অনেকের কাছেই নতুন। মহামারী যখন অনেক দেশে বা মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তার নাম হয় অতিমারী। বিভিন্ন দেশের মধ্যে আধুনিক উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যই করোনা বা কোভিড-১৯ এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পেরেছে। স্প্যানিশ ফ্লু যে সারা পৃথিবীতে থাবা বসিয়েছিল, তার কারণ হল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বিভিন্ন দেশের মধ্যে সৈন্য চলাচল। ব্রিটিশ ভারত থেকে বাণিজ্য ও সৈন্য চলাচলের পথ ধরে কলেরা ইন্দোনেশিয়া থেকে রাশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। ইউরোপের এত মৃত্যু ঘটালেও ব্ল্যাক ডেথ প্লেগ ভারতে আসেনি, তার কারণ মধ্য যুগে ভারত ও ইউরোপের মধ্যে যোগাযোগ ছিল খুবই কম। ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের যাওয়ার আগে অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার মানুষ বসন্ত রোগের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। 

       মহামারী বা অতিমারীতে মৃত্যু সংখ্যা সব সময়েই খুব বেশি। ১৯০০ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে ভারতবর্ষেই অন্তত আশি লক্ষ মানুষ কলেরার জন্য মারা যান। ১৯৭৯ সালে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন বা হু বসন্ত রোগের ভাইরাসকে নির্মূল ঘোষণা করেছিল, তার আগে শুধু বিংশ শতাব্দীতেই বসন্ত রোগের জন্য তিরিশ থেকে পঞ্চাশ কোটি লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল। অথচ গত চল্লিশ বছরে বার্ড ফ্লু, এইচআইভি, সিভিয়ার অ্যাকিউট রেস্পিরেটরি সিন্ড্রোম বা সার্স, ইবোলা, ম্যাড কাউ ডিজিজ ইত্যাদি রোগ অতিমারী হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।  করোনার বিপদকে ছোটো ভাবার কোনো কারণ নেই, কিন্তু দেখা যাচ্ছে এতে মৃত্যুর হার কালাজ্বর, কলেরা, বসন্ত বা স্প্যানিশ ফ্লু-এর থেকে অনেক কম। তার কারণ কী?

       গত একশো বছরে চিকিৎসা বিজ্ঞান দ্রুত এগিয়েছে। রোগের জন্য দায়ী জীবাণুকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তার ওষুধ বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, ম্যালেরিয়ার জীবাণু আবিষ্কার, বা কালাজ্বরের ওষুধ উদ্ভাবনের জন্য শুধু আমাদের দেশেই কোটি কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছে।   আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে যুগান্তর এনেছে পেনিসিলিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিক, যদিও তার অতিব্যবহারও বিপদ ডেকে আনছে। পেনিসিলিন আবিষ্কার হয়েছিল ১৯২৮ সালে, তার এক দশকের মধ্যে তার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছিল।একই সঙ্গে  বোঝা গেছে যে জীবনযাত্রার চরিত্রও মহামারীর দ্রুত প্রসারের জন্য দায়ী। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে শত্রুর অস্ত্রে যত সৈন্য মারা গিয়েছিল, তার থেকে বেশি মারা গিয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লুতে। ট্রেঞ্চের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অল্প জায়গার মধ্যে অনেক সৈন্যকে থাকতে হয়েছিল – ফলে ফ্লুয়ের দ্রুত সংক্রমণ ঘটেছিল। কলেরাকে ছড়িয়ে পড়া থেকে আটকাতে গেলে ওষুধের থেকেও বেশি প্রয়োজন পরিশ্রুত জলের ব্যবস্থা। ম্যালেরিয়ার বা ডেঙ্গুর জন্য মশাকে দূরে রাখা জরুরি। এই খুব সাধারণ জ্ঞানের জন্যও কিন্তু বিজ্ঞান গবেষণার প্রয়োজন হয়েছিল।

       করোনার বিপদকে এই পরিপ্রেক্ষিতেই ভাবতে হবে। তার থেকে রক্ষা পাওয়ার চাবিকাঠি বিজ্ঞানের হাতেই আছে। সারা পৃথিবী করোনা রোগের টিকা আবিষ্কারের জন্য গবেষকদের দিকে তাকিয়ে আছে। মাস্ক ব্যবহার, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বা সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং-এর মাধ্যমে সংক্রমণ কমানোর কথা আমাদের বিজ্ঞানই বলেছে। ইউরোপের বহু দেশ এই পদ্ধতি অবলম্বন করে করোনাকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। ডাক্তাররা নানারকম ওষুধ নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করছেন, ফলে শুরুতে করোনাতে মৃত্যুর হার যা ছিল, এখন তার থেকে অনেক কমে এসেছে। 

       চিকিৎসা বিজ্ঞান যখন খুব একটা এগোয় নি, সেই সময়টা কেমন ছিল? তখন ঈশ্বর দেবতা বা মর্তে তাঁদের প্রতিনিধি বাবা পির সন্ত ওঝাদের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া গতি ছিল না। কলেরা হলে তাই ওলাবিবি বা ওলাইচণ্ডীর পুজো করতে হত, বসন্ত হলে মা শীতলার কাছে হত্যে দিতে হত, কিংবা জলপড়া তেলপড়া ইত্যাদির ব্যবস্থা করতে হত। দুঃখের কথা স্বাধীনতার এত বছর পরেও আমাদের দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সাধারণ গরীব মানুষের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। তাই কোথাও কোথাও মানুষ দৈবের কাছে আশ্রয় খুঁজছে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।

       আশ্চর্য লাগে যখন দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের থেকেও একই রকম আচরণ দেখতে পাওয়া যায়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার সময় একবার থালা বাটি বাজানোর আর একবার বিদ্যুতের আলো নেভানোর নিদান দিলেন। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা করোনা নিরাময়ের সংগ্রামের প্রথম সারিতে আছেন, থালা বাজিয়ে সম্মান দেখানোর পরিবর্তে তাঁদের দরকার ছিল পিপিই, মাস্ক ইত্যাদির। আলো নিভিয়ে করোনার বিরুদ্ধে দেশের ঐক্য দেখানো হল কিনা জানি না, তবে ইলেকট্রিসিটি গ্রিডের ইঞ্জিনিয়ারদের কয়েক রাতের ঘুম চলে গেল। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেন নি যে হাততালি দিলে বা আলো নেভালে করোনা চলে যাবে, কিন্তু সোশাল মিডিয়া মুহূর্তের মধ্যেই করোনা ভাইরাসের উপর শব্দ বা আলোর প্রভাব নিয়ে অপবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাতে ভরে গেল; তাদের মধ্যে কয়েকটা আবার তথাকথিত গবেষণার জার্নালেও জায়গা করে নিলো। অবশ্য সেই জার্নালের নাম কোনো সিরিয়াস গবেষক কখনো শোনেননি, কিন্তু তাতে কী? আধুনিক যুগে কোনো ধারণাকে সত্য বলে ধরে নিতে সাক্ষ্যপ্রমাণের আর প্রয়োজন হয় না, বিশেষজ্ঞের জ্ঞান আর আমার অজ্ঞানতার মূল্য সমান। ফল যা হওয়ার তাই হল, অতিমারীর মধ্যে অকাল দেওয়ালির আবির্ভাব।

       এই ধরনের হাস্যকর সিদ্ধান্তের পিছনের কারণ জানি না, কিন্তু সন্দেহ নেই যে এর ফলে সমস্যার গভীরতা থেকে দৃষ্টি সরে যায়। বর্তমান সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির সম্পর্ক খুব নিবিড় নয়। পুরাণে করোনা ভাইরাসের কথা খোঁজাতেই বোধ করি তাঁরা বেশি স্বচ্ছন্দ।  আধুনিক যুগের সমস্যার জটিলতা বোঝাতে অক্ষমতার জন্যই হঠাৎ লকডাউনের মতো সরল সমাধানের দিকে তাঁরা আকৃষ্ট হলেন। ভুলে গেলেন কোনো উন্নত দেশ শুধুমাত্র লকডাউনকেই করোনা প্রতিরোধের উপায় করেনি, তার সঙ্গে ব্যাপক পরীক্ষা, আইসোলেশন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। রাজনৈতিক নেতাদের এই দূরদৃষ্টির অভাব অন্যত্রও সংক্রমিত হয়েছে। নীতি আয়োগের সদস্য ইন্টারনেট থেকে পাওয়া একটি লেখচিত্র দেখিয়ে দাবি করলেন যে মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে দেশ থেকে করোনা নির্মূল হয়ে যাবে। সেই গ্রাফ থেকে ওই সিদ্ধান্তে পৌঁছালে যে কোনো বিজ্ঞানের ছাত্র পরীক্ষাতে শূন্য পেত।

       করোনা রোধে বিজ্ঞানই পথ দেখাবে, অন্য কোনো উপায় নেই।  এমনিতেই আমরা মোট জাতীয় উৎপাদনের মাত্র ০.৬ শতাংশ বিজ্ঞান প্রযুক্তি গবেষণা খাতে খরচা করি; চীন, দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের মতো এশীয় দেশগুলিও এর কয়েক গুণ বেশি ব্যয় করে। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেই বরাদ্দও হয় স্থির হয়ে আছে, নয় কমছে।  এখন হঠাৎ করে বিজ্ঞানীদের দিকে তাকালেই বা গবেষণার জন্য অর্থ বরাদ্দ করলেই তার থেকে ফলের আশা করা যায় না, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।


প্রকাশঃ গণনাট্য, জানুয়ারি-এপ্রিল, ২০২০ সংখ্যা

                                                             

      

 

 


Friday, 3 July 2020

বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার (১) - সিডনি


বিষুবরেখার দক্ষিণে প্রথমবার 
১- সিডনি

শম্পা গাঙ্গুলী

হোটেল থেকে সকাল সকাল বেরিয়ে আমরা সবাই সমুদ্রের পাড়ের উঁচু রাস্তা ধরে হাঁটছি। মাঝে মাঝে ছবি তোলার বিরতি। একটা অদ্ভুত ভাস্কর্য চোখ টানল। সূর্যের ঝকঝকে আলোয় আপাতভাবে শান্ত পোতাশ্রয়ের চিকচিকে জল আর দাঁড়িয়ে থাকা সুসজ্জিত মালবাহী বিশাল বিশাল জাহাজগুলো আমাকে উঁচু রাস্তা থেকে সমুদ্রের পাড়ে টেনে নামাল। আমার দেখাদেখি ঝুলনও নামল ঢালু ঘাসের কার্পেট বেয়ে। অপূর্ব দৃশ্য।

সিডনি হারবারের রৌদ্রকরোজ্জ্বল সমুদ্র

একা
এবং কয়েকজন

 আমাদের লক্ষ্য লেডি ম্যাকুয়ারির চেয়ার। আমাদের মত সব পর্যটকের লক্ষ্যও তাই। সিডনির স্বাভাবিক পোতাশ্রয়ের উপদ্বীপ অংশের একদম শেষ বিন্দুতে সেই চেয়ার। উপরের রাস্তা থেকে খাড়াইভাবে নেমে আসা বেলেপাথরকে খোদাই করে বিশাল একটা হাতলছাড়া আরামকেদারার রূপ দিয়েছে। ১৮১০ সালে জেলের একদল বন্দী এর রূপকার। সেইসময় নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের গভর্নর ছিলেন মেজর জেনারেল লকলান ম্যাকুয়ারি। তাঁর স্ত্রী লেডি ম্যাকুয়ারির স্মৃতিতে ঐ চেয়ারটি খোদাই করা হয়েছিল। উপদ্বীপের ঐ শেষ বিন্দুতে বসে লেডি ম্যাকুয়ারি আশপাশের শোভা উপভোগ করতেন আর ব্রিটিশ জাহাজগুলো দেখতেন, যেগুলো পোতাশ্রয়ে এসে ভিড়ত। আমি আর ঝুলন সেখানে আগে পৌঁছলেও ওপরের রাস্তা ধরে আসা আমাদের দলের অন্যরাও একটু পরেই এসে গেল।পাথরের চেয়ারের গায়ে খোদাই পড়ে জানলাম যে উঁচু রাস্তা দিয়ে সবাই ওখানে পৌঁছল, সেটার নামও মিসেস ম্যাকুয়ারিস রোড, আর চেয়ারটা তৈরি শেষ হয়েছিল ১৮১৬ সালের জুন মাসে। ওর সামনে দাঁড়ালে পশ্চিমে পৃথিবী বিখ্যাত সিডনি অপেরা হাউস আর উত্তর-পশ্চিমে হারবার ব্রিজ। নিউইয়র্কের হেল গেট ব্রিজের অনুকরণে এটি তৈরি হয়। পৃথিবীর উচ্চতম এবং সবচেয়ে চওড়া স্টিলের ব্রিজ। সূর্যের আলোয় চকচকে নীল সমুদ্রের বুকে অপেরা হাউস, হারবার ব্রিজকে পশ্চাৎপটে রেখে প্রচুর ছবি তোলা হল। আমরা ভেবেছিলাম হোটেলের থেকে বেরিয়ে ম্যাপ দেখতে হবে, কিন্তু এই জায়গাটা আসতে তার আর প্রয়োজন হয়নি। সমুদ্রকে অনুসরণ করেই পৌঁছে গেছি।

লেডি ম্যাকুয়ারির চেয়ার

সিডনির পথের মাঝে এক অদ্ভুত শিল্পকলা

ঐন্দ্রিলা আমাদের কলেজ জীবনের বন্ধু, অনেকদিন ধরে চাইছিল আমরা আর অনির্বাণের পরিবার ওর বাড়ি যাই। কলেজ জীবনে অনির্বাণ, গৌতম ছিল ওর ক্লাসমেট। আর আমি ছিলাম ব্যাচমেট। এখন ঐন্দ্রিলা আর ওর স্বামী ইন্দ্রনীলদা থাকে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের কাছে শেপার্টনে। অনির্বাণের সঙ্গে ওর স্ত্রী ঝুলন আর ওদের ছেলে মুনু। অভিজিতরাও আমাদের সঙ্গী হল। অভিজিৎ আর কাবেরীও আমাদের পুরানো বন্ধু, কলেজে আমাদের থেকে জুনিয়র। ওদের ছেলে আহেল। সব মিলিয়ে আটজনের দল। সেই শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের দল। ঠিক হল, প্রথমে সিডনি, তারপর কেয়ার্ন্স এবং সবশেষে মেলবোর্ন হয়ে ঐন্দ্রিলাদের বাড়ি শেপার্টন। ২০১৮-এর অক্টোবরের ১৮ তারিখ সিডনির টিকিট কাটা হল আমাদের। কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রবল উত্তেজনা। অনির্বাণের ছেলে মুনুর পাসপোর্টের ভ্যালিডিটি ছমাসের কম হওয়ায় পাসপোর্ট রিনিউ করিয়ে সেটা হাতে পাওয়া নিয়ে খুব সমস্যায় পড়তে হল। ঝুলন তো ধরেই নিল ছেলের ভিসা না হওয়ায় ওদের যাওয়া বাতিল করতে হচ্ছে।কিন্তু অবশেষে শেষ মুহূর্তে পাসপোর্ট এল এবং দুর্গা পুজোর সময় বলে সময়ের অনেক আগেই আমরা সবাই দমদম এয়ারপোর্টে হাজিরা দিলাম। এয়ার এশিয়ার ফ্লাইট ধরে কুয়ালালামপুর হয়ে সিডনি। এয়ারপোর্টেই গৌতমদের কলেজের প্রাক্তন ছাত্র প্রীতমের সঙ্গে দেখা। তার বাড়ি আমাদের বাড়ির কাছেই, সে চলেছে জাপান, পড়াশোনার কাজে।

আবার ফিরে আসি সিডনিতে। আমি আর গৌতম ওই চত্বরের বোটানিকাল গার্ডেনে স্বেচ্ছায় হারালাম। সমুদ্রের ধার দিয়ে অপেরা হাউসের দিকে এগিয়ে যাওয়া আমাদের দলের বাকিদের আশ্বাস দিলাম ঘুরপথে গেলেও আমরা ঠিক সময়ে অন্যদের ছুঁয়ে ফেলব।অপূর্ব পরিকল্পনায় বিশাল বাগানটা সাজানো। আর্থার জ্যাক্স নামে একজন শিল্পীর তৈরি এক অনবদ্য সৃষ্টির সামনে আমরা থমকে দাঁড়ালাম। শিল্পীর সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা নেই। এক মেয়ে ঘোড়া ও তার শাবক।এত জীবন্ত ভাস্কর্য পৃথিবীতে বোধহয় খুব কমই আছে। এমনিতে গৌতম খুব একটা নিজের ছবি তুলতে আগ্রহী হয় না। কিন্তু দেখলাম ভাস্কর্যটির সামনে দাঁড়িয়ে সানন্দে ছবি তুলল।

জীবন্ত এই ভাস্কর্যের সামনে গৌতম

 

কুইন্সল্যান্ড বটল ট্রি

পাশেই চোখে পড়ল একটা বড় গাছ। আরে, এই এডিনাম গাছ আমার বাগানেও আছে! কিন্তু তার উচ্চতা দু ফুট। আর এটার উচ্চতা প্রায় চল্লিশ ফুট। গুঁড়িটা যত মোটা হবে এই গাছের তত শোভা। এই গাছটার গুঁড়িটাও প্রায় চল্লিশ ফুট পরিধি হবে। কাছে গিয়ে দেখলাম এটা এডিনাম নয়। এর নাম কুইন্সল্যাণ্ড বটল ট্রি। এরকম আরও অসংখ্য বিরল প্রজাতির গাছে ভরা বোটানিকাল গার্ডেন। 

ঝাড়ুদার পাখি

এক জায়গায় দেখি পরপর কয়েকটা সাজানো রেস্তরাঁ। সে তো ঠিক আছে। কিন্তু প্রত্যেকটাতে রেস্তরাঁর সামনে অতিথিদের অভ্যর্থনায় দাঁড়িয়ে আছে একটি বা দুটি করে সারস জাতীয় সুন্দর পাখি। পায়ে কোনো শিকল নেই, মনে তাদের কোন ভয়ডরেরও বালাই নেই। আইবিস পাখি। কাছে গিয়ে ছবি তুললে কোনো আপত্তি করল না। লোকের এঁটো পাতগুলো দিব্যি চেটেপুটে সাফ করছে। আমাদের দেশের ঝাড়ুদার পাখি কাক সুশ্রী নয় বলে কি এখানকার রেস্তরাঁ মালিকরা তাদের এমন অনুমোদন দেয় না? নাকি ওদেশের মানুষ অনেক বেশি প্রকৃতি প্রেমিক!

এক জায়গায় দেখি অনেক পুরানো একটা বটগাছ। গাছের পাশে একটা বোর্ডে কবি এইলিন চঙের লেখা একটা কবিতা। এইলিন চঙ সিডনির রয়াল বোটানিকাল গার্ডেনের পোয়েট ইন রেসিডেন্স ছিলেন। রাজাদের রাজসভা আলো করে কবিরা থাকতেন, রাজাদের প্রশংসা করার জন্য। কিন্তু একটা বাগানের গাছেদের জন্যও একজন কবি? এটা আমাদের ভাবনার বাইরে ছিল। এই মহিলা কবির বয়স খুবই কম। ১৯৮০ সালে সিঙ্গাপুরে তাঁর জন্ম। সাতাশ বছর বয়সে তিনি অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ার প্রথম সারির কবি। সিডনির জনসংখ্যার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল পঁয়তাল্লিশ শতাংশ লোকের জন্ম অস্ট্রেলিয়ার বাইরে এবং আরো আশ্চর্যের বিষয় হল এই শহরে প্রায় আড়াইশো ভাষার চল আছে। পঁয়ত্রিশ শতাংশের বেশি লোকের মাতৃভাষা ইংরাজি নয়। বিবিধ ভাষা আর সংস্কৃতির মিলন ঘটেছে এই শহরটাতে।

এক জায়গায় দেখি একটা পদ্ম-পুকুর। তার পাশেই এই বাগানের প্রধান জলাশয়টা আছে। সেখানে পাওয়া যায় অনেক ইল মাছ। এগুলো লঙ ফিন ইল প্রজাতির। বেশ কয়েকবার জলাশয়টা পরিষ্কার করার সময়ে মাছগুলোকে বার করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আবার এখানে এই মিষ্টি জলে চলে আসে। কি অদ্ভুত! ভাবছিলাম, এটা কিভাবে সম্ভব! সমুদ্র তো প্রায় একশো মিটার দূরে। ইল মাছেদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে এক চমৎকার তথ্য জানলাম। এরা আসলে মিষ্টি জলের মাছ। চরিত্রে কিছুটা আমাদের সাধের ইলিশের মত হলেও ইলিশের বিরীতগামী। এরা ষাট বছর অবধি বাঁচে। মেয়ে মাছ ডিম পাড়ার সময়ে এরা সিডনির মিষ্টি জল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় দুহাজার কিলোমিটার পাড়ি দেয় নির্জন নিউ ক্যালিডোনিয়া দ্বীপে। এক সঙ্গে প্রায় এক থেকে দু কোটি ডিম পাড়ে। ডিম পেড়েই এরা মারা যায়। সেখানে লার্ভাগুলো যখন বড় হয় তখন তাদের দাঁত থাকে। মীনগুলো জলের স্রোতে মূল ভূখণ্ডের পাড়ে আসে। তারা একটু বড় হলেই তাদের দাঁত খসে যায়। চারা মাছগুলো তখন ডাঙার মিষ্টি জলে ঢুকে পড়ে। যে কোন বাধা অতিক্রম করেই তরুণ মাছের দল নদী, জলাশয়ে চলে আসে। নদীর বাঁধ থাকলে সেটা যেমন টপকায়, তেমনি ঘাসের লনও। পূর্ণ বয়স্ক হয় এই সব মিষ্টি জলেই। প্রায় ষাট বছর বয়স হলে তারা আবার সমুদ্রে পাড়ি দেয় ডিম পাড়ার জন্য। সেজন্যই স্বাভাবিক কারণেই বাগানের এই মিষ্টি জলের আশয় এতই পছন্দ যে পরিষ্কারের সময়ে বার বার এদের বার করে সমুদ্রে ছেড়ে দিলেও এরা তীর থেকে উঠে এসে বাগানের ঘাসের লন টপকে আবার ঢুকে পড়ে জলাশয়ে কৈশোর, যৌবন কাটাবার টানে।

পিছনে সিডনি হারবার ব্রিজ

       বাকি দলের সঙ্গে আমরা যখন আবার মিশে গেলাম, আমাদের অনুপস্থিতি নিয়ে কেউ অনুযোগ করল না। প্রতিবারই বেড়াতে গিয়ে অন্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মাঝে মাঝে হারিয়ে গিয়ে বেশি ঘুরপথে হাঁটা আমরা পছন্দ করি সে কথা আমাদের এই দল দিব্যি জানে। তাই বিচক্ষণ গ্রুপ লিডার অভিজিত বা এই দলের অন্যদের সঙ্গে ঘুরে আমরা বেশ আনন্দ পাই।

       অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে আদিম মানুষের অস্তিত্ব ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা বিভিন্নভাবে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। সে কথা আমার লেখায় পরে আবার আসবে। সিডনিতে তিরিশ হাজার বছর আগে আদিবাসীদের অস্তিত্ব ছিল। ১৭৭০ সালে বিখ্যাত অভিযাত্রী জেমস কুক প্রথম অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলে আসেন। এখন যেখানে সিডনি, তার ঠিক দক্ষিণে একটা খাঁড়িতে উনি জাহাজ নোঙর করেন। সেই খাঁড়ির এখন নাম বোটানি বে। সেই সময় ব্রিটেনের সরকার বন্দীদের দ্বীপান্তর করার জন্য জায়গা খুঁজছিল। কুকের অভিযানের সংবাদ পেয়ে সর্বপ্রথম এখানেই ক্যাপ্টেন ফিলিপের নেতৃত্বে কয়েকটা জাহাজ ভর্তি করে বন্দী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বোটানি বে জায়গাটা বসবাসের অযোগ্য হওয়ায় বন্দিদের সিডনি কোভের পোর্ট জ্যাকসনে স্থানান্তরিত করা হয় ১৭৮৮ সালে। সেই থেকে অপরাধীদের অস্ট্রেলিয়ায় পাঠানো শুরু হয়। এভাবেই এই মহাদেশের প্রথম উপনিবেশ হিসাবে সিডনির জন্ম।

স্বাভাবিকভাবেই শহরটা খুব তাড়াতাড়ি নানা অপরাধমূলক কাজে ভরে যেতে লাগল। প্রথম যুগের একজন অপরাধীর কথা বলি। আয়ারল্যাণ্ডের ডাবলিন শহরের ডোন্যাহো নামে আঠারো বছরের অপরাধমূলক কাজে জড়িত এক বন্দীকে এই শহরে ১৮২৫ সালে আনা হল। বন্দীদের জোর করে কাজ করানো হত। সে কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে সিডনি হাইওয়েতে বেশ কয়েকটা দুঃসাহসী ডাকাতি করে নিউ সাউথ ওয়েলসের অন্য বন্দীদের চোখে আর গরীব মানুষের কাছে রাতারাতি নায়ক হয়ে উঠল। দুঃসাহসিকতার জন্য তাকে অন্য বন্দিরা ‘বোল্ড জ্যাক’ নামে ডাকত। সিডনির খবরের কাগজগুলোর শিরোনামে চলে এলো জ্যাক। দলবল সহ ধরা পড়ল। ফাঁসির আদেশও হল। কিন্তু সে জেল থেকে পালায়। অবশেষে ১৮৩০ সালের সেপ্টেম্বরে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

       সিডনি অপেরা হাউসের দিকে আমরা এগোতে লাগলাম। রাতের কালো আকাশ আর সমুদ্রের মিলনস্থলে আলো ঝলমলে অপেরা হাউসের ছবি আমাদের ছোটবেলা থেকেই খুব চেনা। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে কুইজের ভিজুয়াল রাউন্ডের চেনা প্রশ্ন। সিডনি বন্দরের বেনেলং পয়েন্টের নীলাম্বুরাশিতে নৌকার অসংখ্য সুদৃশ্য পালের পিছনের এই সৌধটিবিশ্বের কোটি কোটি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে জেগে আছে, ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় ২০০৭ সালে জায়গা করে নিয়েছে। জান উটজান নামের ডেনমার্কের এক স্থাপত্যবিদ সিডনি অপেরা হাউসের নকশা তৈরি করেন।

সিডনির জগৎবিখ্যাত অপেরা হাউস ও হার্বার ব্রিজ
যুবরাজ-যুবরাণীর জন্য অপেক্ষা

অপেরা হাউসের কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখি সেখানে অনেক লোকের জমায়েত। বোঝাই যায় বিশেষ কেউ আসবে সেদিন ওখানে। অস্ট্রেলিয়া স্বাধীন দেশ, কিন্তু তার রাষ্ট্রপ্রধান ব্রিটেনের রাণী। শুনলাম একটু পরেই নাকি যুবরাজ হ্যারি আর তার বউ মেগান আসবে সেখানে। আমাদের তাড়া ছিল, তাই যুবরাজ-যুবরাণীর সঙ্গে দেখা না করেই এগিয়ে গেলাম। ক্যাটামেরানে করে যাব ডার্লিং হারবারের কাছে বারাঙ্গারু। সেখান থেকে ‘সি লাইফ’, যেখানে সামুদ্রিক প্রাণী সম্পদের অমূল্য ভাণ্ডারের নমুনা আছে।

সিডনি হার্বার ব্রিজের তলা দিয়েই যেতে হল ক্যাটামেরানে, ছবি তোলার অনেক সুযোগ পাওয়া গেল। সি লাইফকে বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যায়না যে ভেতরে অত বড় এক্যোরিয়াম! বিশাল পরিসর, আর মাটির নিচে অনেকগুলো তলা পর্যন্ত যাতায়াত করার অবকাশ, ভেতরের সংগ্রহশালাটাকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। প্রথমেই ঢুকে দেখি একটা অংশে লেখা ‘শিপ রেক’। সমুদ্রের তলায় জাহাজডুবি হলে সেই ভাঙা জাহাজের বিভিন্ন অংশে ধীরে ধীরে যে বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী, উদ্ভিদের কলোনি গড়ে ওঠে তার বিশদ নমুনা। নানা ধরনের শামুক, ঝিনুক, ছোট ছোট মাছ, প্রাণী, উদ্ভিদ ইত্যাদি। নয়ন জুড়ানো বিভিন্ন ধরনের রঙিন প্রবাল- যেমন সান কোরাল, হ্যামার কোরাল ও আরও নানা প্রবাল দেখে মনে পড়ছিল ছোটবেলার একটা গল্প। ছোটবেলায় মামার বাড়িতে গেলে দাদু টাইটানিক জাহাজডুবির গল্প বলত নাতি নাতনিদের। ঠোঁটে ডান হাত ঠেকিয়ে দাদু একটা জাহাজের জোরাল লম্বা ভোঁ দিয়ে জাহাজটাকে সমুদ্রে ভাসাত। তারপর নানা গল্পের জাল বুনে শেষে রাতের অন্ধকারে হিমশৈলে প্রবল ধাক্কা মেরে জাহাজটা যখন ডুবত তখন দুপুর গড়িয়ে সন্ধে নামত। তারপর ডুবন্ত জাহাজের আনাচে কানাচে মৎস্য কন্যা, রঙিন মাছ আর প্রবালদের গল্প আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিত। কতবার যে ওই গল্পটা শুনেছি! সি লাইফে ডুবন্ত জাহাজের নানা রঙের প্রবাল,মাছ, সামুদ্রিক সাজানো প্রাণ সম্ভার লিখতে বসে দাদুর বলা গল্পটা আর তার সঙ্গের কল্পনারাজ্য---যেন ছোটবেলার গল্পলোকে ঢুকে পড়লাম।

\

রঙিন প্রবাল



সি-লাইফের জুরাসিক গ্যালারির প্রবেশ পথ

যাক ফিরে যাব সিডনির সি লাইফে। পাশের একটা অংশে দেখি লেখা ‘জুরাসিক সি’। জুরাসিক উপযুগে, অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক প্রাণের স্পন্দন যেন অনুভূত সেখানে। খুব সুন্দর দেখতে বিশাল বিশাল নটিলাস শামুক দেখলাম। আছে বিশাল বিশাল লাঙফিস। এদের ফুসফুস আছে। মাডস্কিপার কার্বোনিফেরাস যুগের বহু প্রাচীন মাছ। ইতিহাস বলে এরা ডাইনোসরের থেকেও প্রাচীন। এদের পাখনাগুলো ডানার মত। আবার মুখের সামনের দিকের অংশ পাখিদের মত। দেখলে মনে হবে রুপোলী রঙের একটা পাখি যেন জলের তলার কাদার ভেতর থেকে পোকা মাকড় খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে। এদের সবাইকেই বলে জীবন্ত জীবাশ্ম।

লাঙফিশ
মাডস্কিপার




ড্রাগন বটে, তবে লম্বা মাত্র কয়েক ইঞ্চি
পিলচার্ডের ঝাঁক

এর পরের অংশটার নাম সিডনি হারবার। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ উপকুলের অগভীর সমুদ্রে পাথুরে সমুদ্রতলে বাস করে সামুদ্রিক ড্রাগন। এক জায়গায় দেখি অপূর্ব উজ্জ্বল নীল রঙের সামুদ্রিক ড্রাগন। গায়ে হলুদ ডোরা কাটা দাগ। কোনোটা আবার লাল। কোন শিল্পীর তুলির সূক্ষ্ম টান তাদের সারা শরীরে? শরীরের আকৃতিও কি শৈল্পিক? মন্থর গতিতে এক্যোরিয়ামের তলার পাথুরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের শরীরেও নানা অংশে গাছের পাতার মত পাখনা। না, সেগুলো তাদের ঘোরাফেরায় সাহায্য করে না। শত্রুকে ফাঁকি দিতে তারা সহজেই জলের তলার জঙ্গলে মিশে গিয়ে ছদ্মবেশে থাকতে পারে। সৃষ্টি কতখানি নিপুণ! কত যত্নশীল! এই লিফি সি-ড্রাগন ছাড়াও দেখলাম উইডি সি-ড্রাগন। তারা অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের অগভীর সমুদ্রের তলার ঘাসের জমিতে বাঁচে। মাত্র কয়েকইঞ্চি লম্বা এই দু ধরনের সামুদ্রিক ড্রাগনের ক্ষেত্রেই মেয়ে ড্রাগন পুরুষ ড্রাগনের লম্বা লেজের তলার দিকে একসঙ্গে অনেকগুলো ডিম পাড়ে। পুরুষ ড্রাগন ডিমগুলো প্রায় ন-সপ্তাহ ধারণ করে। তারপর ডিম ফুটে বাচ্চা বার হবার সময় হলে তারা এক দু দিন ধরে পাম্প করে, পাথরের গায়ে বা সমুদ্রের ঘাসের গায়ে লেজের ঝাপট মেরে নতুন সামুদ্রিক ড্রাগনের জন্ম দেয়। জন্মেই নতুন এই প্রজন্ম স্বাধীন। বাঁচার তাগিদে প্ল্যাঙ্কটনের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। স্টোন ফিস, অস্ট্রেলিয়ান পিলচার্ট, ব্লু ট্যান সার্জেন ফিস, দু-রঙা এঞ্জেল মাছ, ক্লাউন মাছ, লেমন ড্যামসেল, পায়জামা স্কুইড ইত্যাদি ছিল সিডনি হারবারের প্রধান আকর্ষণ।

আরও ভিতরে ঢুকে আবার অবাক হলাম। এই অংশটার নাম দেখলাম শার্ক ভ্যালি। মনে হল এক অজানা সমুদ্রের তলায় পাড়ি দিয়েছি। একাধিক বিশাল বিশাল কাঁচের টানেল দিয়ে ঘোরের বশে যেন হেঁটে চলেছি। আমাদের চারপাশে সাম্রাজ্য চালাচ্ছে গভীর সমুদ্রের প্রাণীকুল। সমুদ্র মৃদু আলোকিত, তাই রক্ষে।প্রা য় ছয় ফুট লম্বা একটা বিশাল হাঙর হঠাৎ দেখি আমার মাথার ওপর কাঁচের ওপারে। মাথার ওপর দিয়ে যাবার সময় হাঁ করা মুখের বড় বড় রাক্ষুসে দাঁতগুলো নিচের মানুষগুলোর রক্ত জমাট করে দিচ্ছিল। সত্যি সত্যি অত বড় হাঙরের পেটের তলায় দাঁড়িয়ে আমারও একটা শিরশিরানি অনুভূতি হচ্ছিল। জানলাম ওটা পোর্ট জ্যাকসন হাঙর। বহু প্রাচীন বিশাল বিশাল সামুদ্রিক কচ্ছপ খুব ধীর গতিতে সাঁতার কাটছে। মনে পড়ে গেল পুরাণের একটা গল্প। দেবাসুর অমৃত উদ্ধার করতে গিয়ে মৈনাক পর্বতকে মন্থন দণ্ড হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন। সমুদ্রে যাতে তলিয়ে না যায়, সেজন্য কূর্মাবতার সেই পর্বতকে তার পিঠে ধারণ করেছিলেন। একটা মাছ দেখলাম, শঙ্কর মাছের মত কাঁটাওয়ালা লম্বা লেজ। পিঠের দিক থেকে দেখলে ঈগল পাখির মত দেখতে। গা বিশাল পিঠে উজ্জ্বল সাদা গোল গোল স্পট। নাম হোয়াইট স্পটেড ঈগল রে। সোনালি রঙের গোল্ডেন ট্রেভালি, জায়েন্ট শভেল নোস, রিফ শার্ক, গ্রে নার্স শার্ক---এরকম নানা বড় প্রজাতির মাছ এখানে আছে।এখানে সবচেয়ে বড় প্রজাতির মাছ হল কুইন্সল্যাণ্ড গ্রোপার। এই মাছটা এত বড় যে হাঙরগুলোও ভয় পায়, একে এড়িয়ে চলে। 

হাঙর হ্রদের বিভীষিকা



  

কূর্মাবতার ও ঈগল রে

এরপর তলার থেকে ওপরে উঠলাম, ডুগং আইল্যান্ডে। সমুদ্রের তলায় এরা হল একমাত্র স্তন্যপায়ী যারা পুরোপুরি শাকাহারী। ডুগং হচ্ছে মালয়েশিয়ান কথা, মানে সামুদ্রিক নারী ।প্রথমে ওঠার সময় এর বিশাল ছায়া দেখলাম। তারপর আসল চেহারা। নাম পিগ। লম্বায় দশ ফুট। ওজন চারশ কেজি। প্রতিদিন আশি কেজি করে এর সবজি লাগে। শুনলাম পিগের সঙ্গী উরু গত বছর মে মাসে মারা গেছে। অতীতে এদের দেখেই নাকি নাবিকরা মৎস্য-কন্যা বলে ভুল করত। পৃথিবীতে মোট তিনটি বন্দী ডুগং আছে। বাকি দুটি আছে ইন্দোনেশিয়া আর জাপানে।


জলের পাখি

এবার নেমে এসে আমরা গেলাম পেঙ্গুইন এক্সপিডিশনে। অভিযানে যাবার আগে আমাদের একটা করে পশমের কোট পরিয়ে দিল। তারপর একটা নৌকায় চারজন করে বসে একটা বরফ শীতল মেরু প্রদেশের অভিযাত্রী দলের মত ঢুকে পড়লাম মেরুরাজ্যের পেঙ্গুইনদের কলোনিতে। নানা প্রজাতির, নানা বয়সের, নানা উচ্চতার পেঙ্গুইন ছোট ছোট দলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শরীরের তুলনায় ছোট ছোট পায়ে দুলে দুলে হাঁটি হাঁটি পা করে বেড়াচ্ছে। চারদিকের ছোট বড় ঢিবিগুলো বরফে ছেয়ে আছে। একে ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি, তার মধ্যে দেখি আমাদের নৌকা ভ্রমণের পথে এক জায়গায় ওপর থেকে ঝরনা নেমে আসছে। এ বাবা, ভিজে যাব তো! এমনটা ভাবছি। দেখি আমাদের নৌকাটা সেখানে পৌঁছাতেই ঝরনাটা থেমে গেল। চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ। এতগুলো পেঙ্গুইন, অথচ কোন কোলাহল নেই। কেমন শান্ত পরিবেশ। ডাঙায় এরা এত ধীরে হাঁটে। কিন্তু স্বচ্ছ জলের ভেতর দেখলাম এরা খুব দ্রুত সাঁতার কাটছে। পাখিরা যেমন ডানা দিয়ে আকাশে ওড়ে, এরাও তেমনি এরো-ডাইনামিক আকৃতির জন্য সমুদ্রের তলায় ডানার সাহায্যে ওড়ে বলা যায়। লিটল পেঙ্গুইন বাইরেও ছিল সাউথ কোস্ট শিপ রেকে। এখানে দেখলাম কিং পেঙ্গুইন আর জেন্টু পেঙ্গুইন। কিং পেঙ্গুইনই সব চেয়ে ভাল সাঁতারু।

ওখান থেকে বেরিয়ে একটা জায়গায় দেখি লোকজন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে কিছু করছে। জায়গাটায় লেখা--- ডিসকভারি রক পুল। অর্থাৎ সমুদ্রের উপকূলে পাথুরে ভূমি হলে, ঢেউ আছড়ে পড়ে বা শিলা গঠনকালে সেখানে নানা আকারের ছোট বড় গর্ত তৈরি হয়। সেই গর্তগুলোতে নানা শামুক, সামুদ্রিক উদ্ভিদ, প্রাণী জন্মায়। স্টার ফিশ, নানা কীট দেখা যায়। এখানে দেখলাম তারই একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা করাচ্ছে। দর্শকদের রক পুলের প্রাণীদের হাতে করে নাড়াচাড়া করতে দিচ্ছে। আমরাও নানা প্রবাল কীট, মাছ হাতে নিলাম।

                                       রক পুলের নমুনা


সিডনি স্কাইলাইন

   সি-লাইফ থেকে বেরিয়ে সিডনি শহরটাকে হেঁটে হেঁটে চক্কর মারলাম। সহায় গুগল ম্যাপ ভব! বিখ্যাত হাইড পার্কে ঢুকলাম। তখন ওখানে ফুড কার্নিভ্যাল উৎসব চলছিল। ভারতীয় পাঞ্জাবী ও মোগলাই খানাও হাজির ছিল বটে। নিউ সাউথ ওয়েলস প্রদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক কেন্দ্র এটা। তাই প্রচুর দেশি বিদেশি লোকের সমাগম লক্ষ্য করলাম। ঝুলন, কাবেরী গেল ওদেশীয় খাবারের সঙ্গে আমাদের দেশজ খাবারের তুলনামূলক বিচার বিশ্লেষণ করতে, বিদেশে পাড়ি দিয়েও আমাদের দেশীয় খাবারগুলো গন্ধে-বর্ণে কতটা অটুট ভারতীয় আছে, ইত্যাদি। আমি আর গৌতম বিখ্যাত সেন্ট মেরিজ ক্যাথিড্রালমুখী হলাম। উদ্দেশ্য চার্চটা বাইরে থেকে দেখে ক্যামেরা বন্দী করা। চার্চ সংলগ্ন পার্ক বিশাল এলাকা নিয়ে। অদ্ভুত সুন্দর কিছু গাছ দেখলাম। সারাদিন ধরে হাঁটার ধকল ছিল। তাই আমাদের দলের বাকিরা পার্কে বসে খানিক জিরিয়ে নেওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। অস্ট্রেলিয়া বহুদিন ব্রিটেনের কলোনি ছিল বলেই বোধহয় অনেক কিছুই ব্রিটেনের নামানুসারে হয়েছে। যেমন এর আগে ছিল সেন্ট জেমস স্টেশন, এখন দেখলাম হাইড পার্ক। এই নামগুলো তো গতবছর লন্ডনেও দেখেছি! হাতে সময় কম, ফিরে লাগেজ গুছিয়ে পরদিন কেয়ার্ন্সের উদ্দেশ্যে রওনা। তাই হাইড পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে এসে আমরা হোটেলে ফিরলাম। মনে আছে গৌতম আর আমি রাতে একটা থাই রেস্তরাঁতে বেশ জমিয়ে ডিনার সেরেছিলাম, বাকিরা অবশ্য ক্লান্তির জন্য হোটেলেই ডিনার সেরেছিল।

সেন্ট মেরিজ ক্যাথিড্রাল ও তার সামনের মূর্তি (নিচে)
\ (ক্রমশ)
এই লেখার পরের পর্বগুলিঃ
প্রকাশঃ সৃষ্টির একুশ শতক, মার্চ, ২০২০