Saturday, 29 March 2025

পুস্তক সমালোচনা দ্বি-জাতি তত্ত্বঃ ভারতের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়

দ্বি-জাতি তত্ত্বঃ ভারতের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়

ডক্টর জগদিন্দ্র মন্ডল

দিগন্ত প্রকাশনী

প্রকাশ ২০২৪

দাম ২৫০ টাকা


জগদিন্দ্র মন্ডল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত মনোবিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তিনি বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন, পাশাপাশি বিজ্ঞান অনুষদের ডীন হিসাবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের পঠনপাঠন ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। নবতিপর এই মানুষটি কৈশোরে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ও দেশভাগের সাক্ষী হয়েছেন, ছিন্নমূল উদ্বাস্তুর জীবন যাপন করেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ ও স্বাধীনতালাভ দেখেছেন। এই প্রত্যেকটি ঘটনাই উপমহাদেশের ইতিহাসে মাইলফলক, এবং তাদের নিয়ে ঐতিহাসিক, সমাজতাত্ত্বিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন। সেই সবের থেকে আলোচ্য বইটি কিছুটা পৃথক; কারণ লেখক মনোবিজ্ঞানী, তিনি নিজের বিশেষজ্ঞতার প্রেক্ষিতে সেই ঘটনাগুলি বিশ্লেষণ করেছেন।

মহাত্মা গান্ধী, মহম্মদ আলি জিন্না, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র, সেখ মুজিবর রহমান -- সেই ইতিহাসের মূল কুশীলবদের গুরুত্বপূর্ণ যুগান্তকারী সিদ্ধান্তসমূহকে মনোবিজ্ঞানের আলোকে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। বিশেষ দৃষ্টি দিয়েছেন মহম্মদ আলি জিন্নার প্রতি; তাঁর চিন্তাধারাতে অনেক অসঙ্গতির উল্লেখ করে বলেছেন যে ডায়রেক্ট অ্যাকশনের মতো রাজনৈতিক নৈরাজ্যবাদী আহ্বানের পিছনে ছিল অহমের আধিপত্য-বাসনা। মনোবিজ্ঞানের দিক থেকে দেখিয়েছেন দ্বিজাতি তত্ত্ব কতট অবাস্তব।

কয়েকটি প্রশ্ন লেখক তুলেছেন, যেগুলি আমাদের মতো সাধারণ মানুষেরও মনে আসে। রবীন্দ্রনাথের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা সত্ত্বেও কেন গান্ধীজি জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর পাঞ্জাবে যাওয়ার রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন; কেনই বা আন্দোলন শুরুর সময় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরামর্শ করলেও গান্ধীজী প্রত্যাহারের সময় তাঁর সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করেন নি? কেন প্রগতিশীল জিন্নাকে সরিয়ে রেখে তিনি মুসলিম সমাজের সংস্কারাচ্ছন্ন অংশের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন? দেশভাগ রুখতে কংগ্রেসের নেতারা সত্যই কতটা আগ্রহী ছিলেন? সুভাষচন্দ্র ও কংগ্রেসের সম্পর্ক ছিন্ন না হলে কি ইতিহাসের ধারা অন্য দিকে বইত?

রবীন্দ্রনাথের দুই সুবিখ্যাত সাহিত্যকীর্তি, ছোটগল্প 'কাবুলিওয়ালা' এবং 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসকে মনোবিদ্যার দিক থেকে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। দেখিয়েছেন সন্দীপের প্রশংসাতে কেমনভাবে বিমলার মধ্যে আত্মপ্রেমের জন্ম হয় ও দু'জনের মানসিক দ্বন্দ্ব নিরসনে 'অহম-রক্ষণ' কৌশল হিসাবে অবদমন ও অপযুক্তিকরণ কেমনভাবে কাজ করেছে। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে মনোবিদ্যার এই প্রকাশ নেহাত কাকতালীয় নয়। চিঠিপত্র উদ্ধৃত করে লেখক দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ মনোবিজ্ঞানের আধুনিকতম তত্ত্বের খবর রাখতেন, এবং ইউরোপীয় সাহিত্যে তার অভিঘাত নিয়ে সচেতন ছিলেন।

বারবার রবীন্দ্রনাথের কাছে ফিরে গেছেন লেখক; তাঁর রচনার আলোতে উপমহাদেশের ইতিহাসকে বুঝতে চেয়েছেন। বইয়ের এক বড় অংশ জুড়ে আছেন সেখ মুজিবর রহমান। লেখকের কথায়, 'মুজিবের উপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যিনি, যাঁর জীবন দর্শন, দেশ-চেতনা ও আন্তর্জাতিক চেতনা সঞ্চার - তিনি হলেন রবীন্দ্রনাথ।' মুজিবর রহমানের জীবনের নানা ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে লেখক নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হাজির করেছেন। অন্য সচেতন প্রগতিশীল মানুষের মতোই লেখক বাংলাদেশের জন্মের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার বিজয় ও দ্বিজাতি তত্ত্বের পরাজয় দেখেছেন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলী এই ব্যাখ্যার উপরে এক প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিলেও উপমহাদেশের ইতিহাসে একাত্তরের ঘটনার অভিঘাতকে অস্বীকার করা যাবে না।

বইটির মুদ্রণ, কাগজের গুণমান ও বিশেষ করে বানানের বিষয়ে আরো যত্নশীল হওয়া উচিত ছিল। চমৎকার একটি আলোচনাতে সেগুলি মাঝেমাঝেই ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। আশা করা যাক পরবর্তী সংস্করণে এই ত্রুটিগুলি সংশোধিত হবে।


গৌতম গঙ্গোপাধ্যায়

প্রকাশ গণশক্তি, ২২ মার্চ, ২০২৪ 







No comments:

Post a Comment